বিশ্বায়ন এবং নারী

এম এম আকাশ:


 

ভূমিকা
একজন নারীর জীবনে বিশ্বায়ন একদিকে যেমন সুযোগের স্বর্ণ দুয়ার খুলে দেয় তেমনি তার মধ্যে তৈরি করে অজানা-অচেনা জগতের ভীতি। শুধু ভীতি নয়, কখনও কখনও তা বাস্তব ক্ষতি ও বেদনায়ও পরিণত হয়। বিশ্বায়ন নারীকে অন্য নারীর জগতের সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দেয়। গ্রামের গৃহবন্দি নারী মোবাইলের মাধ্যমে বা টেলিভিশনের স্যাটেলাইট চ্যানেলের বদান্যতায় দেখতে পায় কীভাবে তার মতোই একজন একাকী নারী ঢাকা শহরে পোশাক শিল্পে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। কীভাবে সেই পোশাক শিল্পের পণ্য বহু হাত ঘুরে আমেরিকার হাল ফ্যাশান তরুণীর প্রিয় পোশাকে পরিণত হচ্ছে। যুগ যুগ ধরে গ্রামের মহিলারা কুটিরে বসে ছেলে-মেয়েদের কাপড় সেলাই করে যে ক্ষিপ্র অঙ্গুলীর অধিকারী হয়েছেন তা আজ বিশ্বায়নের কল্যাণে সর্বাধুনিক পোশাক তৈরির কাজে নিয়োজিত হয়েছে। ‘ক’-এর মা, ‘খ’-এর বোন অথবা ‘গ’-এর বউ এখন আর অন্যের পরিচয়ে পরিচিত হচ্ছেন না। তার ভুলে যাওয়া নাম এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ পরিচয় নিয়ে বিশেষ একজন শ্রমিকের পরিচয়পত্র নিয়ে জগতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলতে পারছেন আমার নিজস্ব পরিচয় আছে। আমি শুধু একজনের মা বা বোন বা কন্যা বা বধূ নই। তবে বিশ্বায়নের এই ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও মর্যাদা সর্বত্র সমানভাবে বিকশিত হয়নি। যদিও নারীদের মনের আয়নায় এর একটি স্থায়ী ছায়াপাত ঘটে গেছে।
অ-আধুনিক চিরায়ত নারীদের আজন্ম লালিত অভ্যাস বিশ্বায়নের এই হাতছানিতে সবসময় দ্বিধাহীনভাবে সাড়া দিতে সক্ষম হয় না। ভয় থাকে অনেক কিছুর। বাড়ির নিরাপদ আশ্রয় ছাড়ার ভয়। রানা প্লাজার মতো ছাদ ভেঙে অকাল মৃত্যুর ভয়। রাত-বিরাতে ঘরে ফেরার সময় আকস্মিক হামলার ভয়। সবচেয়ে বড় ভয় নিজের সংসার কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়। নষ্ট মেয়ে অপবাদের ভয়। বিশ্বায়ন নারীকে সমুদ্রযাত্রার আহ্বান জানায়, সুযোগ উন্মুক্ত করে দেয় ঠিকই; কিন্তু এমন কোনো নিশ্চিত গ্যারান্টি দিতে পারে না যে সমুদ্রপথে ঝড়ে আক্রান্ত হয়ে সে কখনোই ডুবে যাবে না। এ যেন অনেকটা এক নিরুদ্দেশ তীর্থযাত্রার মতো। কূলে ফেরার গ্যারান্টি নেই। পথেই মৃত্যু হতে পারে। তাই বিশ্বায়ন নারীর মনে এক অনিবার্য দোলাচলের সৃষ্টি করছে এবং তাকে নিক্ষেপ করেছে এক অস্থির দ্রুত পরিবর্তনশীল ঘূর্ণিপাকে। এই ঘূর্ণিপাককে আমাদের বিশ্লেষণ করতে হবে তার ইতিবাচক-নেতিবাচক উভয় দিক থেকে। আমরা চাই না চাই এর থেকে আমাদের আজ আর কোনো পরিত্রাণ নেই। তাই কীভাবে নারীর কল্যাণে এর সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করা যায় সেটাই আজ আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। এ প্রবন্ধের মূল প্রশ্ন ও উত্তর একে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হবে।
বিশ্বায়ন কী?
মানব সমাজের প্রারম্ভে যেসব শিকারি গোত্রকে আমরা দেখতে পাই তাদের চরিত্র ছিল ‘বিচরণশীল’। কোনো এক জায়গায় বেশি দিন তাদের পক্ষে থাকা সম্ভব ছিল না। কারণ শিকার করতে করতে ঐ জায়গার বা ঐ অঞ্চলের পশু-পাখি ফল-মূল ফুরিয়ে যেত এবং গোত্রের জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলেও তাদের পক্ষে ঐ সীমিত জায়গায় বসবাস করা অসম্ভব হয়ে উঠত। অতএব শিকারি সমাজ বিশ্বের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে বেড়াতে বাধ্য হতো। অনুমান করা যায় যে এ সময় গোত্রে গোত্রে ‘বনের’ মালিকানা নিয়ে ঝগড়া ও লড়াই হতো এবং সম্ভবত পরাজিত গোত্রের সদস্যদের ‘দাসে’ পরিণত করে বৃহত্তর দাস সমাজের সূচনা হয়েছিল।
গোত্রের বিচরণশীলতা বা চারণশীল মানব গোষ্ঠীর (Nomadic Tribes) ঘুরে বেড়ানোকে আমরা ‘বিশ্বায়ন’ বলছি না। কিন্তু দাস সমাজ যখন স্থিতিশীল হয়ে গ্রিসে বা প্রাচ্যের কোথাও কোথাও (মিসরে, মধ্যপ্রাচ্যে, আফ্রিকায়) সাম্রাজ্য হিসেবে গড়ে উঠল তখন পৃথিবীতে একটি নতুন প্রক্রিয়ার সূচনা ঘটেÑ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রক্রিয়া। তখন দাস সাম্রাজ্যের অধীনে রাজ্যে-রাজ্যে দাসের বাণিজ্য, বিভিন্ন পণ্যের বাণিজ্য, সৈন্যদের আগমন-প্রত্যাগমন শুরু হয়ে গেল। এই আন্তর্জাতিক লেনদেনই হচ্ছে বিশ্বায়নের প্রাথমিক সূত্রপাত।
বিশ্বায়নকে তাই আমরা সংজ্ঞায়ন করতে পারি ‘আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্রমবিবর্তনশীল এক প্রক্রিয়া হিসেবে’। এই লেনদেনের আধেয় (Content) ক্রমশ পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে, গুণের দিক থেকে বিচিত্র থেকে বিচিত্রতর হয়েছে এবং তাদের পরিসরও বিস্তৃত থেকে আরও বিস্তৃততর হয়েছে। এক কথায় বলা যায়, প্রাচীন সাম্রাজ্যের পত্তনের পর থেকে বিশ্বায়নের এই প্রক্রিয়া ক্রমাগত কম-বেশি প্রসারিত হয়ে চলেছে। কোনো মানবগোষ্ঠী, কোনো অঞ্চল বা কোনো দেশ যদি সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবনযাপনে নিয়োজিত হয়, তাহলে তা প্রবাহমান বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ঠিকই; কিন্তু শেষ পর্যন্ত আত্মতাগিদেই তাকে আবার আপন খোলস ভেঙে বিশ্বায়নের রথে চড়তে হয় নতুবা বিশ্বায়নের রথ নিষ্ঠুরভাবে তাকে মাড়িয়ে সামনে অগ্রসর হয়ে যায়।
বিশেষ করে মুদ্রাভিত্তিক (স্বর্ণই হোক বা টাকাই হোক!) অর্থনীতির সূচনার পর থেকে সারাবিশ্বে বিশ্বায়নের প্রবাহমান শক্তি প্রায় অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই অপ্রতিরোধ্য লেনদেনের প্রক্রিয়াগুলো হচ্ছে-
ক. পণ্যের লেনদেন
খ. পুঁজির লেনদেন
গ. শ্রমের লেনদেন
ঘ. জ্ঞান ও প্রযুক্তির লেনদেন
ঙ. তথ্যের লেনদেন
চ. সাংস্কৃতিক লেনদেন
ছ. মনের লেনদেন
জ. অন্যান্য নানা ধরনের সম্পর্কের বহুমুখী মাত্রায় ও গভীরতায় নিত্যনতুন লেনদেনের উদ্ভব হচ্ছে প্রতিদিন। যার বস্তুগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে একবিংশ শতকের সর্বগ্রাসী যোগাযোগ বিপ্লব। আর অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে মুদ্রা ও অর্থ।
তাই সব মিলিয়ে বিশ্বায়নকে আমরা একটি বহুমুখী-জটিল-বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে পাচ্ছি এবং এই প্রক্রিয়ার দুটি পরস্পরবিরোধী অনিবার্য দিক হচ্ছেÑ
ক. ক্রমাগত সম্পর্কের বিস্তৃতি, গভীরতা, ঐক্য ও সংহতি। এবং একই সময়ে একই সঙ্গে
খ. ক্রমাগত সম্পর্কের টানাপড়েন সংগ্রাম, বিচ্ছেদ ও যুদ্ধ।
তাই এক কথায় বলা যায়, উত্থান-পতনের এবং শান্তি ও সংঘর্ষের এক দ্বান্দ্বিক গতির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে বিশ্বায়ন।

বিশ্বায়ন নেতিবাচক ও ইতিবাচক দিক
বিশ্বায়ন সম্পর্কে বর্তমানে তাই দুটো পরস্পরবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান। যারা বামপন্থি তাদের অধিকাংশের অভিমত হচ্ছেÑ বর্তমানে যে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া চালু আছে তার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বভার বিরাজ করছে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর হাতে, যার শীর্ষে রয়েছে ‘আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ’। আর প্রভাবশালী আমেরিকান তত্ত্ববিদদের মতে, পশ্চিমা সংস্কৃতি ও সভ্যতা হচ্ছে এক উন্নততর গণতান্ত্রিক সভ্যতার বাহন। তাই পূর্ব বা দক্ষিণের পশ্চাদপদ দেশগুলোকে এই সভ্যতাই গ্রহণ করতে হবে এবং সেই প্রক্রিয়ায় সেখানে যেসব দ্বন্দ্বের উদ্ভব হবে, তা আসলে হচ্ছে দুই ভিন্ন ভিন্ন সভ্যতার দ্বন্দ্ব, যার মধ্যে অগ্রণী প্রতিনিধি হচ্ছে পশ্চিম। সেজন্য পশ্চিমা শক্তিবিরোধী সকল ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগ করেই পশ্চিমকে জিততে হবে এবং সেখানে নীতি-নৈতিকতার কোনো বালাই না থাকলেও চলবে। এমনকি নিজেদের উন্নততর সভ্যতা বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠার জন্যই পশ্চিমকে দ্বৈতনীতি অবলম্বন করতে হবে। এই ধারার প্রধান প্রবক্তা স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন তার বিখ্যাত গ্রন্থ “The Clash of Civilization and the Remaking of World Order”-এ লিখেছেন-“Hypocrisy, double standards and ‘but nots’ are the price of universalist pretensions. Democracy is promoted, but not if it brings Islamic fundamentalists to power; non proliferation is preached for Iran and Iraq, but not for Israel; free trade is the elixir of economic growth, but not for agriculture, human rights are an issue for china, but not with Saudi Arabia; aggression against oil owning Kuwaits is massively repulsed, but not against non oil owning Bosnians. Double standards in practice are the unavoidable price of universal standards of principle.”
(“ভ-ামী, দ্বিচারিতা এবং ‘কিন্তু না’ হচ্ছে সর্বজনীনতার মুখোশের দাম। গণতন্ত্রকে উৎসাহিত করা হবে; কিন্তু যদি এতে ইসলামি মৌলবাদীরা ক্ষমতায় আসে তাহলে নয়, আণবিক বোমার বিচ্ছুরণ নিষিদ্ধ করা হবে ইরান এবং ইরাকের জন্য; কিন্তু ইসরায়েলের জন্য নয়, মুক্ত বাণিজ্যকে বলা হবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জীবনসুধা; কিন্তু কৃষির জন্য তা নয়, মানবাধিকার অবশ্যই চীনের জন্য একটি সমস্যা বটে; কিন্তু সৌদি আরবের জন্য তা ঠিক নয়, তেলের মালিক কুয়েতকে আক্রমণ করাটা প্রবলভাবে ঘৃণিত হবে; কিন্তু তেলের মালিক নয় এ-রকম রাষ্ট্র বসনিয়া আক্রান্ত হলে অত আপত্তির কোনো কারণ নেই। সুতরাং সর্বজনীন নীতির আদর্শ রক্ষার অনিবার্য মূল্য হচ্ছে বাস্তব অনুশীলনের ক্ষেত্রে দ্বিচারিতা করা।”)

এই উদ্ধৃতির পর সহজেই মনে হয় যে বিশ্বায়ন এবং পশ্চিমাদের আধিপত্য সমার্থক। চরম বামপন্থিরা এবং চরম রক্ষণশীল দক্ষিণপন্থিরা উভয়েই এই নেতিবাচক ‘প্রিজমেই’ বিশ্বায়নকে দেখে থাকেন।
এ ধরনের আগ্রাসী পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে এবং এর সূচনা ইউরোপের ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লব থেকে। ১৫০০ থেকে ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে পুঁজিবাদী বিশ্বের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে ইংল্যান্ড তার বিশ্ব সাম্রাজ্যটিকে বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়েছিল। ভারতবর্ষ, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা সব অঞ্চলই এই সময়কালে ইংল্যান্ডের আধিপত্যে চলে আসে। এই আধিপত্য ছিল পুঁজির আধিপত্য। এই বিশ্বায়ন ছিল পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন। ব্রিটেন ও অন্যান্য ইউরোপীয় উপনিবেশ বিস্তারকারী দেশগুলো ১৮০০ সালের মধ্যেই সারাবিশ্বের ৩৫ শতাংশ স্থলভাগে কর্তৃত্ব স্থাপনে সক্ষম হয়েছিল। আর পরবর্তী মাত্র ৩৫ বছরের মধ্যে ১৮৩৫ সালে তা ৬৭ শতাংশে পরিণত হয়। এরপর ১৯১৪ সালে তা সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশে পরিণত হয়। কিন্তু এর পরেই নেমে আসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ১৯১৭ সালে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। এরপর উপনিবেশগুলোর স্বাধীন হওয়ার পালা। সদ্য-স্বাধীন দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত হয় জোটনিরপেক্ষ তৃতীয় বিশ্ব। আর ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে যায় একটি দুই মেরুর বিশ্ব। সাম্রাজ্যবাদের একাধিপত্যের মধ্যে ফাটলের সূচনা হয়। ঠা-া যুদ্ধের পুরো আমলটাই ছিল সমাজতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা এবং পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার টানাপড়েন ও দ্বন্দ্বের যুগ। তাই বিশ্বায়ন প্রক্রিয়াগুলো সর্বদাই ছিল দ্বন্দ্বে ভরপুর। ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় প্রকার ঘটনায় আকীর্ণ। উত্তরের শিল্পায়িত সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বের মধ্যে ছিল দক্ষিণের মতো অসম বিকশিত প্রান্তিক জোটনিরপেক্ষ মিত্র। আবার দক্ষিণের নেতা সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক শিবিরের মধ্যেও ছিল নানা প্রান্তিক মিত্ররাষ্ট্র। এর মধ্যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধও অনুষ্ঠিত হয়ে যায়, যা সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের এই পার্থক্যকে আরও স্পষ্ট করে দেয়। চীন নতুন সমাজতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং ১৯৬০-এর পর থেকে নিজের জাতীয় স্বাতন্ত্র্য নিয়ে দাঁড়াতে শুরু করে। তাই বর্তমান বিশ্বকে একটি জটিল বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার ফলাফল হিসেবেই দেখতে হবে, যার মাইলফলকগুলো হচ্ছেÑ
ক. আদি যুগের ও মধ্যযুগের দাস ও সামন্ত সাম্রাজ্যসমূহ।
খ. আধুনিক যুগের পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব।
গ. বিংশ শতকে পুঁজিবাদী-সমাজতান্ত্রিক এই দ্বৈত মেরুতে বিভক্ত বিশ্ব।
ঘ. এবং বর্তমানে বহু মেরুতে বিভক্ত বিচিত্র বিশ্ব। এই বহু মেরুর মধ্যে রয়েছেÑ আমেরিকান জোট, ইউরোপিয়ান জোট, ল্যাটিন আমেরিকান জোট, চীন-রাশিয়া-ভারত জোট ইত্যাদি।
বিশ্বায়নের এই দীর্ঘকালব্যাপী ঐতিহাসিক পরিক্রমায় পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন পর্বটি সম্পর্কে বহু নেতিবাচক বিবরণ ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে। কিন্তু প্রধানত নেতিবাচক হলেও এর কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে, যা ভুললে আমাদের চলবে না। পুঁজিবাদের সর্বাধিক নির্মম সমালোচক কার্ল মার্কস, যিনি পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের বদলে সাম্যবাদী বিশ্বায়নের প্রবক্তা ছিলেন, তিনি নিজেই পুঁজিবাদের ইতিবাচক দিকগুলোর ভূয়সী প্রশংসা করে গেছেন এবং বলতে চেয়েছেন যে পুঁজিবাদের প্রতিষ্ঠিত সভ্যতা ও প্রাচুর্যকে ব্যবহার করেই গড়ে উঠবে নতুন বিশ্বায়নÑ যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তির স্বাধীনতা এবং সকল ব্যক্তির স্বাধীনতা পরস্পর পরিপূরক হিসেবে গড়ে উঠবে এবং ব্যক্তি যখন বিশ্বমানব তথা বিশ্বরাষ্ট্রের সুসভ্য নাগরিকের প্রতিনিধিতে পরিণত হবেন। মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বায়নের বিষয়গত ইতিবাচক দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলোÑ
ক. স্বয়ংসম্পূর্ণ, কুসংস্কার ও কূপম-ূকতার আড্ডাখানা মধ্যযুগীয় ছোট ছোট অঞ্চল ও গ্রামগুলোকে তা একত্রিত করেছে। বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটিয়েছে।
খ. বদ্ধতা, সংকীর্ণতা ও আঞ্চলিকতার বদলে তা তৈরি করেছে মুক্ত গতিশীলতা, বিস্তৃতি ও বিশাল সামষ্টিক জাতীয় বাজার।
গ. রেল বিপ্লব, বিদ্যুৎ বিপ্লব, কম্পিউটার বিপ্লব, ইত্যাদির মাধ্যমে তা সমগ্র পৃথিবীকে আরও যুক্ত ও আরও ছোট করে ফেলেছে। যা ছিল একশ বছরের ব্যাপার, তা এখন হচ্ছে এক মুহূর্তে।
ঘ. জ্ঞান ও প্রযুক্তির বিচ্ছুরণ ঘটিয়েছে। প্রত্যন্ত জঙ্গলেও বিদ্যুতের আলো, সোলার প্যানেলের আলো পৌঁছে যাচ্ছে।
ঙ. চরম দারিদ্র্য ও চরম অভাব দূর করেছে অনেক জায়গায়। দরিদ্র না থাকা এখন বিশ্বব্যাপী একটি মানবাধিকারে পরিণত হয়েছে। এটা আজ আর সুদূর কোনো স্বপ্ন নয়। যদিও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এখনও ক্ষুধার্ত লোকের অস্তিত্ব আছে।
চ. ভোগের প্রাচুর্য বৃদ্ধি করেছে, যদিও তা সবার জন্য সমান হয়নি।
ছ. মোট সম্পদের সৃষ্টি ও পরিবর্ধন ঘটিয়েছে। যদিও তা সর্বত্র ও সবার জন্য এক রকম হয়নি।
জ. পৃথিবীর সীমানা পেরিয়ে উপগ্রহ, রকেট ইত্যাদির মাধ্যমে বিশ্বব্রহ্মা-কে জয় করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। যদিও এসব করতে গিয়ে রুষ্ঠ প্রকৃতির রোষানল থেকে রেহাই পাওয়া যায়নি।
ঝ. শ্রম ও পুঁজির যে দ্বন্দ্ব তাকে যেমন এই পুঁজিবাদী বিশ্বায়ন উসকে দিয়েছে, তেমনি দুই যমজের মতো শ্রম ও পুঁজি উভয়ে উভয়কে আরও বড় আকারে আঁকড়ে ধরেছে। তৈরি করেছে বিশ্বব্যাপী বৃহৎ বহুজাতিক উৎপাদন ইউনিট। এসব প্রতিষ্ঠানের ভেতরে যত বৈষম্যই থাকুক না কেন, এর সামাজিক ও বৈশ্বিক যুক্ততা আজ অনস্বীকার্য।
ঞ. এ ধরনের পুঁজিবাদী বিশ্বায়নে বৈষম্য ও দ্বন্দ্বের বিষয়টা বণ্টনের ও অসম বিকাশের বৈষম্যের সঙ্গে জড়িত হলেও মোট বা সামগ্রিক উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে, মোট সম্পদ সৃজনের ক্ষেত্রে, মোট অগ্রগতির ক্ষেত্রে এর গতিশীলতা এখনও অনস্বীকার্য।
তাই সামগ্রিক বিচারে আমরা বলব ‘বিশ্বায়নের’ যেই স্তরে আমরা আজ এসে দাঁড়িয়েছি সেখানে আমরা বিপুল সম্ভাবনা যেমন দেখছি, তেমনি ঐ সম্ভাবনার বাস্তবায়নের ক্ষমতার ক্ষেত্রে রয়েছে বিপুল এক বৈষম্য। এই বৈষম্যের মূল কারণ হচ্ছে ঐতিহাসিকভাবে গড়ে ওঠা এক অসম কাঠামো এবং তার থেকে উদ্ভূত অসম বিকাশের প্রক্রিয়া। বিশ্বায়নের প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না; বরং ঐ অসম প্রক্রিয়া ও কাঠামোকে সংস্কার ও মৌলিক পরিবর্তনের মাধ্যমেই এর সমাধানকে খুঁজে বের করতে হবে। বিশ্বায়নকে পরিত্যাগ করে নয়, গণতান্ত্রিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করেই এর সংকট ও ঝুঁকিগুলো হ্রাস করতে হবে।

নারী প্রত্যয়ের বিবর্তন
বিশ্বায়নের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নারী প্রত্যয়ের অর্থ ও দ্যোতনারও পরিবর্তন হয়েছে। একদম আদিম সমাজে যখন গোষ্ঠীগুলো শ্রেণিহীন সমাজে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করত, তখন ‘নারী’ ছিল সমাজের স্বাভাবিক বংশ লতিকার বাহন। সমাজটা তখন নারীদের কেন্দ্র করেই গড়ে উঠত এবং সমাজটাকে তাই বলাও হতো মাতৃতান্ত্রিক সমাজ। গোত্রের প্রতীক হতো সেই ‘মহা-মাতা’, যার থেকে পুরো বংশের সূত্রপাত। কিন্তু সমাজে বহুগামী বিবাহের বদলে এক-গামিতা যখন চালু হলো, যখন পিতারা উত্তরাধিকারীকে চিনতে পারলেন এবং তার সঞ্চিত সম্পদ তাকে দিতে শুরু করলেন, যখন কন্যা-সন্তানরা শুধু পুরুষ-সন্তান জন্মদানের যন্ত্রে পরিণত হলো তখন থেকে সমাজে নারীদের ওপর পুরুষদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলো এবং মাতৃতান্ত্রিক সমাজ পিতৃতান্ত্রিক সমাজে পরিণত হলো। ইতিহাসে দেখা যায়, শিকারি সমাজে বিষয়টি দ্রুত ঘটেছে আর কৃষিভিত্তিক স্থিতিশীল সমাজে নারীদের ক্ষমতা দীর্ঘকাল অটুট থেকেছে। মধ্যযুগে ক্রমশ নারীকে গৃহের মধ্যে রান্না, সন্তান পালন ও স্বামীসেবার ভূমিকায় আটকে ফেলা হয়েছে। যুদ্ধ, কঠোর পরিশ্রম, শিকার, বাণিজ্য, দেশ-দেশান্তর গমন, এসব ঝুঁকি বহনের কাজ থেকে নারীদের বিরত রাখা, তাদের একটি কমনীয় কোমল সৌন্দর্যের আধার রূপে আদর্শায়িত করা, এসবই ছিল দাস ও সামন্ত-সমাজের সাধারণ মূল্যবোধ। তাই এ যুগটা ছিল নারীদের বিশ্বব্যাপী পরাজয়ের যুগে এবং এ যুগে যে বিশ্বধর্মগুলোর উদ্ভব হয়েছে (হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, খ্রিষ্ট ধর্ম ও ইসলাম ধর্ম) সেগুলোর সর্বত্র ঈশ্বরের প্রতিনিধি হচ্ছেন পুরুষ এবং সংসারের সর্বত্র নারীর মূল্য ও অবস্থান নির্ধারিত হয়েছে দ্বিতীয় হিসেবে।
কিন্তু পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে পুরুষ নিজেই বুঝতে পেরেছে যে মানব সমাজের অর্ধেককে জগৎ-বিচ্ছিন্ন করে, ঘরের মধ্যে বন্দী করে শুধু নিজের আনন্দ ও সম্ভোগের বিষয় (Object) পরিণত করলে জগতের বিকাশই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। যাকে সে পশ্চাতে রাখবে সেই তাকে পশ্চাতে টেনে রাখবে। নিজের প্রয়োজনেই তাই পুরুষকে নারীর জন্য শিক্ষা ও একটু একটু স্বাধীনতা দিতে হয়েছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা শুরু হয় শিল্প বিপ্লবের পর এবং মুদ্রা অর্থনীতি চালু হওয়ার পর। পুঁজিপতিরা তখন দুটো বিষয় বিবেচনা করতে শুরু করে। প্রথমত; ম্যানুফেকচারিং প্রযুক্তি এমন যে একই ছাদের তলে অনেক শ্রমিককে জড়ো করতে হয়। আর সেই শ্রমিক বাহিনীর মধ্যে এমন কতকগুলো কাজ রয়েছে, যা নারীদের পক্ষে অনায়াসেই করা সম্ভব। দ্বিতীয়ত; তারা এটাও খেয়াল করেন যে নারী ও শিশুরা অবিচ্ছেদ্য এবং এদের উভয়কেই শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ করলে তাদের জন্য মজুরি দিতে হবে পুরুষদের তুলনায় অনেক কম। অতএব, অধিক মুনাফার জন্যই পুঁজিবাদ অসচেতনভাবে নারীর কর্মের পরিসর গৃহ থেকে বাইরে নিয়ে এসেছে। নারীর এই বহিরাগমন ও নববিদ্যা ও দক্ষতা অর্জনই নারীমুক্তির প্রথম সোপান হিসেবে কাজ করেছে। নারী এখন আর সন্তান উৎপাদনের জন্য স্বামীর ওপর নির্ভরশীল স্বত্বা নয়, নয় সে সন্তানদের জননী বড়-মাতা, সে এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবিকা ও সম্পদ আহরণকারী একজন পেশাজীবী। তার একটি পৃথক সামাজিক আত্মপরিচয় এখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- এরপর কী? গৃহমুক্ত নারী কি এরপর তার পুরুষ সঙ্গীদের সঙ্গে সমসুযোগ নিয়ে, সমনিরাপত্তা নিয়ে, সম-অধিকার নিয়ে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে পারছে? পারছে কি এই প্রতিয়োগিতায় জয়লাভ করে শীর্ষস্থানে আরোহন করতে? নিঃসন্দেহে আমাদের বলতে হবে যে তা হচ্ছে না এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুঁজিবাদী বিশ্বায়ন নারীর ওপর দ্বৈত শোষণের (Double Exploitation) বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। বস্তুত, পুঁজিবাদী বিশ্বায়ন শুরুই হয়েছে নারীদের বৈষম্যমূলক মজুরি প্রদানের মাধ্যমে। তাই অতি উন্নত পুঁজিবাদী বিশ্বেও নারী-পুরুষ বৈষম্য টিকে আছে, যদিও দীর্ঘদিনের বিকাশ ও সংগ্রামের মাধ্যমে নারীরা এখন সেখানে শিক্ষার অধিকার, নিজের শরীরের ওপর নিজের অধিকার (অর্থাৎ মা হওয়া বা না হওয়ার অধিকার), ভোটের অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, মাতৃত্বকালীন বিশেষ ছুটির অধিকার, পথে-ঘাটে চলাচলের সময় নিরাপত্তার অধিকার, পছন্দমতো বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার, শ্রমবিভাজনের ক্ষেত্রে সর্বত্র গামিতার অধিকার (যেমন- পুলিশ, পাইলট বা মিলিটারি পেশায় যোগদানের অধিকার) ইত্যাদি অধিকারগুলো আংশিক বা বহুলাংশে অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এক্ষেত্রে নারী অধিকারের চাম্পিয়ন হিসেবে কোনো কোনো সমাজতান্ত্রিক এবং কল্যাণ পুঁজিবাদের অনুসারী স্ক্যান্ডিনভীয় দেশগুলো অধিকতর সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে বলেই ধারণা করা হয়। সাধারণভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সর্বত্রই নারীর মুক্তি ও অগ্রগতিও অর্জিত হতে থাকে, তবে কোনো কোনো দেশ নিজস্ব অঙ্গীকার, বিশেষ ইতিহাস ও নীতিমালার কারণে এক্ষেত্রে বিশেষ সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়। বিপরীতক্রমে কোথাও কোথাও বল প্রয়োগ করে নারীর স্বতঃস্ফূর্ত অগ্রগতিকে আটকে রাখা হয়।
ব্যতিক্রম বাদ দিলে বিশ্বায়ন তাই অবশেষে বিংশ শতকে মানব-মানবী, নারী-পুরুষ এই ধরনের পৃথকায়নের বদলে নতুন একক যে প্রত্যয়ের প্রবর্তন করেছে, তা হচ্ছে ‘মানুষ’ এবং ‘মানুষ’ প্রত্যয়কে কেন্দ্র করেই প্রণীত হয়েছে আধুনিক যুগের বিশ্বব্যাপী সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ। ‘Man’ or ‘Woman’ নয়, ‘‘Human being’’ এবং ‘Human Right paradigme’-ই বিশ্বায়নের বর্তমান পর্যায়ের সর্বজনীন দিগ্দর্শন। শ্রেণিহীন সাম্যবাদী সমাজের স্বপ্নের সঙ্গে এর কোনো বিরোধ নেই। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বিশ্বের মানুষকে আজ হতে হবে শিক্ষিত, স্বাস্থ্যবান, দীর্ঘজীবী, প্রাচুর্যশালী এবং সর্বত্রগামী। যদিও এই আদর্শের থেকে এখনও পর্যন্ত বহু দেশ বহুভাবে পিছিয়ে রয়েছে। নারী-পুরুষের বৈষম্যের পাশাপাশি ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যের সমস্যাটিরও কোনো পূর্ণ সমাধান এখন পর্যন্ত আমরা বর্তমান বিশ্বে করে উঠতে পারিনি।

বিশ্বে নারীদের অবস্থান : তুলনামূলক চিত্র (২০১৪)
২০১৪ সালের গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্টে আমরা দেখতে পাই, সেখানে বলা হয়েছে, “Through the golbal gender gap Report 2014, the world economic forum quantifies the magnitude of gender based dispairties and tracks their progress over time while no single measure can capture the complete situation, the global gender gap Index presented in this Report seeks to measure one important aspet of gender equality : the relative gaps betwen women and men across four key areas : health, education, economy and politics.” (World Economic Forum, 2014)
ভূমিকায় লিখিত উপরোক্ত বক্তব্যের পেছনে বিশ্ব অর্থনীতিবিদদের প্রধান উদ্দীপনাটি খুব সহজ এবং সাধারণ। তারা মনে করেন যে একসময় অর্থনীতির বিকাশের বা সম্পদ বৃদ্ধির চাবিকাঠি ছিল প্রাকৃতিক সম্পদ। যদি প্রাচুর্যশালী বন থাকত, যদি নদী তীরের উর্বর ভূমিসম্পদ থাকত, যদি লোহা বা ব্রোঞ্জ বা তামার আকরিক পাওয়া যেত তাহলে সেই জায়গায় সেই মানবগোষ্ঠী দ্রুত প্রাচুর্যশালী হয়ে উঠতেন। কিন্তু শীঘ্রই মানুষ প্রকৃতি বশে আনার জন্য প্রযুক্তি, কৃৎ কৌশল ইত্যাদি আবিষ্কার করা শুরু করল। তখন ‘উৎপাদিত উৎপাদনের উপায়ই’ হয়ে গেল অর্থনীতির বিকাশের প্রধান চালিকাশক্তি। পরে সেটাই পরিণত হলো পুঁজিতে এবং পুঁজির বিভিন্ন রূপবৈচিত্র্য তৈরি হলোÑ বাণিজ্যিক পুঁজি, শিল্প পুঁজি এবং সর্বশেষে ‘ফিন্যান্স’ বা আর্থিক পুঁজি। তখন থেকে প্রাচুর্যের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে গেল পুঁজি। পুঁজিবাদের চালিকাশক্তি এই পুঁজি বিশেষত ফিন্যান্স পুঁজি যখন অঢেল হয়ে গেল, তখন প্রশ্ন এলো ‘শ্রমের’ সঙ্গে পুঁজিকে আরও যুক্ত করা যায় কীভাবে? পুঁজি তখন দেশ-দেশান্তরে শ্রমের সন্ধানে পাড়ি জমালো। পণ্য রপ্তানির জায়গায় এই পুঁজি রপ্তানি বিশ্বায়নকে নতুন এক মাত্রায় নিয়ে গেল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে এই শ্রম শুধু পশ্চাৎপদ অদক্ষ শ্রমশক্তি হিসেবে থেকে গেলে চলবে না, তাকে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা দিয়ে উপযুক্ত মাত্রায় বিকশিত করে না তুলতে পারলে তাকে দিয়ে আধুনিক কৃৎকৌশলভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা স্বার্থকভাবে চালু রাখা সম্ভব হবে না। তাই আজকের যুগে বিশ্বায়নকে সচল রাখতে হলে পুঁজির নিজের জন্যই দরকার হয়ে পড়েছে বিশাল সুশিক্ষিত আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন ‘মানবসম্পদের’। আর মানবসম্পদের অর্ধেককে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখার অর্থই হচ্ছে প্রয়োজনীয় বিশাল এই মানবসম্পদ বিকাশের সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে রাখা। তার ফলে পুঁজির সম্ভাব্য ফলপ্রসূতাও বাস্তবে সংকুচিত হয়ে অর্ধেক হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের একটি সহজ পরিসংখ্যান থেকেই এই সত্য ফুটে ওঠে। বিশ্বব্যাংক তার ২০১৩ সালের রিপোর্টে উল্লেখ করেছে যে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উচ্চতর প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য নিরসনের প্রধান চালিকাশক্তি হচ্ছে নারীদের শ্রমবাজার বর্ধিত হারে অংশগ্রহণ। যদিও পুরুষদের তুলনায় তা এখনও অনেক কম। যে জায়গায় কর্মক্ষম পুরুষরা প্রায় শতভাগ অর্থনৈতিক কাজে অংশগ্রহণ করছে সে জায়গায় বাংলাদেশের নারীদের মাত্র ৩০ শতাংশ এখন অর্থনৈতিক কাজে নিয়োজিত। যদি এটাকে ৮৭ শতাংশে উন্নীত করা যেত, তা হলে বাংলাদেশের বর্তমান প্রবৃদ্ধির হার এমনিতেই ৬ থেকে ৮ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হতো বলে বিশ্বব্যাংক হিসাব করে দেখিয়ে দিয়েছে। এই ছোট একটি তথ্য প্রমাণ করে gender gap কীভাবে পুঁজিবাদী উন্নয়নকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে? এই Report-G gender gap score নির্ণয় করা হয়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নারীরা পুরুষদের তুলনায় কতখানি কম বা কত শতাংশ পিছিয়ে আছে, সেটা দিয়ে।
ধরা যাক, কোনো দেশে শিক্ষিত নারীর অনুপাত ৩০ শতাংশ; কিন্তু পুরুষদের অনুপাত ৬০ শতাংশ, তাহলে সেদেশে gender gap ratio হবে  PM2    = ৬০% অর্থাৎ শিক্ষার ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষদের তুলনায় সেদেশে ৪০ শতাংশ গ্যাপে আছে বা পিছিয়ে আছে। এভাবে ৪টি মাত্রায় অনুপাতগুলো বের করে একটি সম্মিলিত সামগ্রিক gender gap ratio নির্ণয় করা হয়েছে বিভিন্ন অঞ্চলের দেশের জন্য। সেটি থেকে আমরা এই বিশ্বে নারীদের তুলনামূলক পশ্চাৎপদতার একটি পরিসংখ্যান চিত্র পেতে পারি। এক্ষেত্রে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে অনুপাতটি যখন ১০০ শতাংশ হবে তখন নারী-পুরুষে বৈষম্য নেই বলে ধরে নিতে হবে, আর যদি তা ১০০-র বেশি হয় তাহলে নারীদের তুলনায় পুরুষ পিছিয়ে আছে বলে ধরতে হবে। তবে ২০১৪ সালের এই জবঢ়ড়ৎঃ-এ দেখা যায় এই মধঢ়-টি সর্বনিম্ন হচ্ছে আইসল্যান্ডে (অর্থাৎ পূরণকৃত গ্যাপের মাত্রা হচ্ছে ৮৬ শতাংশ) এবং সর্বোচ্চ হচ্ছে পাকিস্তানে (অর্থাৎ পূরণকৃত গ্যাপের মাত্রা হচ্ছে মাত্র ৫৬ শতাংশ)। অর্থাৎ সবচেয়ে ভালো অবস্থাতেও পুরুষদের তুলনায় নারীরা ১৪ শতাংশ পিছনে রয়ে যায়। আর সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পিছিয়ে থাকার অনুপাত ৪৪ শতাংশ। আমরা উদাহরণ হিসেবে আরও কয়েকটি দেশের ২০১৪ সালের gender gap ratio নিচের তালিকায় তুলে ধরছি।
এই তালিকা থেকে আমাদের কতকগুলো অনুসিদ্ধান্ত প্রাথমিকভাবে বেরিয়ে আসে।
ক. প্রথমত সারাবিশ্বে এখনও পর্যন্ত নারীরা সর্বত্রই পুরুষদের তুলনায় পিছিয়ে আছেন। পৃথিবীর কোথাও এখন পর্যন্ত নারী-পুরুষ সমতা স্থাপিত হয়নি (অন্তত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও রাজনীতিÑ এ ৪টি ক্ষেত্রের জন্যই এ-কথা সত্য)।
খ. তবে নারী-পুরুষ বৈষম্য সবচেয়ে কম দেখা যাচ্ছে কল্যাণ ধনতন্ত্রের অনুসারী নরডিক দেশসমূহে।
গ. ইউরোপ ও আমেরিকায় নারী-পুরুষ বৈষম্য এখনও রয়েছে। তাদের গ্যাপ পূরণ স্কোর এক্ষেত্রে .৭৩৮ থেকে .৭৭৮-এর মধ্যে বিরাজমান। অর্থাৎ তুলনামূলক গ্যাপের পরিমাণ মোটামুটি ২৫ শতাংশ।
ঘ. অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক দেশে এই গ্যাপ সবচেয়ে কম কিউবায় এবং সবচেয়ে বেশি চীনে। এখানে প্রায় ৩০ শতাংশ গ্যাপ বিরাজমান।
ঙ. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সবচেয়ে ভালো অবস্থান দখল করে আছে বাংলাদেশ। এখানে প্রায় ৩১ শতাংশ গ্যাপ বিরাজ করছে। তবে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা পাকিস্তানে। এখানে গ্যাপের হার প্রায় ৪৫ শতাংশ।
চ. মধ্যপ্রাচ্যে সাধারণভাবে নারীদের অবস্থান ভালো না। এখানে সৌদি আরবে নারীদের মধ্যে গ্যাপের হার প্রায় ৪০ শতাংশ। তবে ইরানে তা আরও বেশি প্রায় ৪২ শতাংশ এবং ইয়ামেনে তা সর্বাধিক অর্থাৎ ৪৯ শতাংশ, এমনকি পাকিস্তানের চেয়েও বেশি।
বিশ্বব্যাপী নারী অগ্রগতির এই অসম বিকাশের পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে নারীবান্ধব আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক নীতি ও নীতিপ্রণেতার অভাব। কোনো দেশগুলো তুলনামূলকভাবে এগিয়ে গেছে, আর কোনো দেশগুলো তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে, তা যদি ঘনিষ্ঠভাবে আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলেই আমাদের উপরোক্ত বক্তব্যের যথার্থতা সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।

জেন্ডার গ্যাপ অনুপাত-২০১৪
Untitled-1 copy

বিশ্বব্যাপী ‘জেন্ডার’ বৈষম্য সূচকের গতিপ্রবণতা ও নীতিগত তাৎপর্য
‘Gender Gap Report’ প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালে। এরপর থেকে ২০১৪ পর্যন্ত আরও ৮টি বার্ষিক রিপোর্ট আমাদের হাতে রয়েছে। এসব রিপোর্ট থেকে আমরা বিশ্বব্যাপী ‘এবহফবৎ এধঢ়’-এর সূচকের গতিশীলতার একটি চিত্র পাই। সামগ্রিকভাবে বিশ্বে এটা কমছে না বাড়ছে? কমলে কোন ক্ষেত্রে কমছে? কোন ক্ষেত্রে বাড়ছে? কোন ক্ষেত্রে বর্তমানে বৈষম্য সর্বোচ্চ? কোন ক্ষেত্রে বৈষম্য অপেক্ষাকৃত নিম্ন?, ইত্যাদি প্রশ্নগুলোর উত্তর খুবই জরুরি। কারণ এখান থেকেই আমরা সন্ধান পেতে পারি নারীদের বৈষম্য হ্রাসের সংগ্রামের রণনীতি ও রণকৌশল কি হওয়া উচিত তার। তাছাড়া এসব ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত সফল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের সারাবিশ্বের ‘Best Practise’-গুলোর উদাহরণ শেখাতে পারে এবং সেগুলো আমরা আমাদের দেশ বাংলাদেশেও প্রয়োগ করতে পারি কি না, তা ভেবে দেখতে পারি। এ জন্য ব্যবহৃত চিত্রটি মূল রিপোর্টটি থেকে নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো।

চিত্র-১
PM3চিত্র-১ এ gender gap ratio-এর ৪টি ক্ষেত্রে ২০০৬ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত বৈষম্যের মাত্রাগুলোর সূচকের বিশ্ব পরিমাপের গতি প্রবণতা তুলে ধরা হয়েছে। এই চিত্র থেকে আমরা আমাদের উল্লিখিত প্রশ্নগুলোর নিম্নরূপ উত্তরগুলো পেয়ে যাচ্ছি। প্রথমত; দেখা যাচ্ছে geneder gap-এর মাত্রা সবচেয়ে বেশি হচ্ছে ‘রাজনৈতিক ক্ষমতার’ সূচকের ক্ষেত্রে। ১নং চিত্রে দেখা যাচ্ছে ২০০৬ সালে এক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের তুলনায় প্রায় ৮৬ শতাংশ পিছিয়ে ছিলেন।১  ২০১৪-তে এসেও তারা এখনও এক্ষেত্রে ৭৯ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছেন। অন্যদিকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বঞ্চনার ক্ষেত্রে মাত্রাটি সাধারণভাবে অপেক্ষাকৃত কম। কিন্তু শিক্ষার ক্ষেত্রে তা কম হলেও তার উন্নতি খুবই শ্লথগতিতে হচ্ছে। ২০০৬ সালে এই বঞ্চনার অনুপাতটি ছিল ৮ শতাংশ, ২০১৪-তে তা কমে হয়েছে ৬ শতাংশ। সাধারণভাবে তাই বলা যায়, বিশ্বে শিক্ষার ক্ষেত্রে নারীদের তুলনামূলক ফারাক অনেক কম এবং ক্রমশ তা ধীরগতিতে কমছে। পক্ষান্তরে স্বাস্থ্য ও আয়ুর ক্ষেত্রে ফারাকের সূচকটি শ্লথ গতিতে বৃদ্ধিই পাচ্ছে। ২০০৬ সালে তা ছিল ৩ শতাংশ, ২০১৪-তে এসে তা হয়েছে ৪ শতাংশ। তবে সাধারণভাবে এখানেও পূর্ণতার সূচকটির মাত্রা বেশিই রয়েছে বলতে হবে। কিন্তু অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগের অপূর্ণতার সূচকটি এই দুই পরিমাপের তুলনায় অনেক বেশি। ২০০৬ সালে গ্যাপের এই সূচকটি ছিল ৪৪ শতাংশ। ২০১৪-তে এসে তা সামান্য হ্রাস পেয়ে ৪০ শতাংশে অবস্থান করছে।
এই সামগ্রিক চিত্র থেকে আমরা gender gap ratio এর প্রণেতাদের পক্ষ থেকে যে নীতি-নির্দেশনার পরামর্শ পাই, তা হচ্ছে-
১. শিক্ষার সুযোগ নারীদের ক্ষেত্রে এখন যে বিশ্বব্যাপী দিতে হবে এবং দেওয়া যে শুরু হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই শিক্ষা লাভ তাদের পরবর্তীতে অর্থনৈতিক মুক্তি প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে পারছে না। পুরুষরা যেমন তাদের শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতিতে ও রাজনীতিতে দ্রুত ক্ষমতাবান হয়ে উঠতে পারছেন, নারী ঠিক তেমনটা পারছেন না। এ জন্য নারী শিক্ষার গুণগত মানকে আমাদের বৃদ্ধি করার দিকে বেশি নজর দিতে হবে। শিক্ষাকে আরও বেশি প্রয়োগমুখী ও কর্মমুখী হতে হবে এবং একই সঙ্গে অতি উচ্চমানের শিক্ষাগুলোকেও নারীদের আয়ত্ত করে সমাজের উচ্চতর পেশাগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ অবাধ ও নিশ্চিত করতে হবে।
২. স্বাস্থ্যক্ষেত্রে নারীদের জন্য বিশেষ ইতিবাচক নীতি গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে বর্তমান অবনতির প্রবণতা রোধ করা যাবে না। নারীদের তুলনায় এখনও পুরুষরা স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে এগিয়ে আছে এই অমানবিক বাস্তবতাটি স্বীকার করে নিয়ে এক্ষেত্রে নারী স্বাস্থ্য সুবিধা তুলনামূলকভাবে অধিকতর হারে বাড়াতে হবে।
৩. অর্থনীতি ও বিভিন্ন পেশায় নারীদের অভিগম্যতা এখনও নারীমুক্তির প্রধান সমস্যা হিসেবে সারাবিশ্বে বিরাজ করছে। এখানে শুধু নারীদের যোগ্যতার অভাব এবং পুঁজিবাদী আধুনিক শিল্পায়নের ঘাটতিই প্রধান বাধা নয়, বাধা হিসেবে বিরাজ করছে নারীদের নিজেদের মধ্যে ও সমাজের ভেতরে নানা সংস্কার ও দ্বিধা। তাছাড়া এই অংশগ্রহণের সুযোগের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সর্বদাই একটি বৈষম্য ও দ্বিচারিতা (Double Standard) বিদ্যমান। নারীরা অংশগ্রহণ করলেও সেক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণের শর্তগুলো পুরুষের তুলনায় অধিকতর প্রতিকূল হয়ে থাকে, তাই এখানেও ইতিবাচক নীতির স্বীকৃতি থাকতে হবে।

নারীবান্ধব নীতিমালা ও বাংলাদেশ
বিশ্বব্যাপী নারী-পুরুষ বৈষম্য যে এখনও বহাল তবিয়তে বিরাজমান তা আমরা পূর্ববর্তী অধ্যায়ের ‘Gender Gap Report’-এর পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্টই দেখতে পাই। এই বৈষম্যের ৪টি মাত্রাও পরিদৃশ্যমান- সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাত্রাটি হচ্ছে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণের বৈষম্য, যাকে প্রধানত সুযোগের, অধিকারের ও প্রাপ্তির বৈষম্য বলা হচ্ছে, আরেকটি মাত্রা হচ্ছে- শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের বৈষম্য, যার ফলাফল দুদিক থেকে পরিদৃশ্যমান, প্রথমত; দরিদ্র শ্রেণিগুলোর স্বাভাবিক বঞ্চনা তো রয়েছেই, তদুপরি দরিদ্র শ্রেণির পরিবারগুলোর মধ্যে নারীদের প্রতি আবার বিশেষ ধরনের অবহেলা ও বঞ্চনা রয়েছে। তৃতীয় সবচেয়ে ব্যাপকও গভীর বৈষম্য মাত্রাটি রাজনৈতিক। উচ্চক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পদগুলো থেকে নারীদের বিরত রাখার বঞ্চনা এবং সর্বশেষে আমরা এসবের পরে যোগ করতে পারি এই ৩টি বঞ্চনার সম্মিলিত ফলাফল হিসাবে সামগ্রিকভাবে নারীদের যুগ-যুগব্যাপী সঞ্চিত হতাশা ও মানসিক হীনমন্যতা বোধের বাস্তবতা। কেউ কেউ এটাকে ‘মনোভঙ্গির’ (Mindset) সমস্যা হিসেবেও চিত্রিত করেছেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে সাধারণভাবে আজ এ-কথাও স্পষ্ট হয়ে গেছে যে মুক্তবাজার দর্শন তথা নিওলিবারেলিজমের মাধ্যমে নারীমুক্তির সার্বিক অগ্রগতি সম্ভব নয়। এ জন্যই নারী বৈষম্য সূচক কমানোর ক্ষেত্রে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর মধ্যেও সর্বোচ্চ সাফল্য আমেরিকা বা ইউরোপের নয়া উদারনীতিবাদী রাষ্ট্রগুলো দেখাতে পারেনি। এই সাফল্য বরং সবচেয়ে বেশি অর্জিত হয়েছে নরডিক দেশগুলোতে। এরা সবকিছু বাজারের হাতে ছেড়ে দেয়নি। গ্রহণ করেছে নিয়ন্ত্রিত বাজারের নীতি। বিশেষত; শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুযোগকে তারা সকলের জন্য বিস্তৃত করেছে। একে ব্যক্তি খাতে ও বাজারের হাতে ছেড়ে দেয়নি। তদুপরি নারী, প্রতিবন্ধী, শিশু, পশ্চাৎপদ গোষ্ঠী ও শ্রেণিগুলোর জন্য এরা গ্রহণ করেছেন বিশেষ ইতিবাচক নীতিমালা (Special Affirmative Policies)। বাংলাদেশকেও তাই আজ এসব ভালো অভিজ্ঞতা থেকেই শিক্ষা নিতে হবে। তথাকথিত ‘মুক্তবাজার’ ও ‘নয়া উদারনীতিবাদ’ থেকে পুরোপুরি সরে আসতে হবে।
২০০৬-এর পর থেকে এ যাবৎ বাংলাদেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের এগিয়ে নিয়ে যেতে যথেষ্ট পারদর্শিতা দেখাতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৩ সালে বিশ্বের ১৩৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের সার্বিক সূচকে অবস্থান ছিল বিশ্বে ৭৫তম। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২০১৪ সালেই এ অবস্থানের উন্নতি ঘটে হয়েছে ৬৮তম (আরও বেশি সংখ্যক তথা ১৪২টি দেশের মধ্যে!)। এই একই সময়ে অর্থাৎ ২০১৪ সালে আমাদের পাশের দেশ ভারতের দিকে তাকালে দেখা যাবে যে, এক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান ছিল আমাদের চেয়ে অনেক নিচে। ১৪২টি দেশের মধ্যে ১১৪তম। বাংলাদেশের এই তুলনামূলক বিশেষ সাফল্যের স্বীকৃতি মেলে নোবেল বিজয়ী নারীবান্ধব অধ্যাপক অমর্ত্য সেনের সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থে। তিনি তার সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থ ‘‘An Uncertain Glory : India and its Contradictions’এ বলেছেন-
“To point to just one contrast, even though India has significantly caught up with China in terms of GDP growth, its progress has been very much slower than China’s in indicators such as longevity, literacy, child undernourishment and maternal mortality. In South asia itself, the much poorer economy of Bangladesh has caught up with and overtaken India in terms of many social indicators (including life expectancy, immunization of children, infant mortality, child undernourishment and girls’ schooling).”
[Jean Dreze and Amartya Sen, 2013]

কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের স্বীকার করতে হবে যে এরপরেও আমাদের আত্মসন্তুষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশের সামনে এখনও প্রধান প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছেÑ
ক. উন্নত বিশ্বে উৎপাদনশীল উচ্চতর পেশাগুলোতে নারীরা যে হারে অংশগ্রহণ করেন তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সমতা বিধান করতে হবে। সকল পদেই নারীদের সম-উপস্থিতি দৃষ্টিগ্রাহ্য হতে হবে।
খ. এ উদ্দেশ্যে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রগুলো উচ্চতর গুণের ও মানের হতে হবে এবং সেখানে ইতিবাচক কোটা ব্যবস্থার প্রবর্তন করতে হবে। যাতে পুরুষের সঙ্গে নারীর যোগ্যতা ও সক্ষমতার ফারাক কমে আসে।
গ. সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন সম্পদ। তাই সম্পদের ওপর নারী ও পুরুষের সম-অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
ঘ. অগ্রগতির জন্য চাই সচলতা। তাই পথে-ঘাটে চলাফেরায় নারীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে।
ঙ. অল্প বয়সেই নারীর মা হওয়া তার স্বাস্থ্য ও আয়ুর জন্য ক্ষতিকর। তাই বাল্যবিবাহ থামাতে হবে।
চ. ফতোয়া ও ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতাগুলো অপসারণ করতে হবে। নারী-পুরুষ উভয়ের মনোভঙ্গি (গরহফংবঃ) বদলাতে হবে।
অমর্ত্য সেনের পর্যালোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে এক্ষেত্রে ‘বিশ্বায়ন’ আমাদের বন্ধু হতে পারে, তবে কতখানি বন্ধু হবে তা অনেকখানি নির্ভর করবে আমাদের নিজস্ব সক্ষমতা ও সুযোগের সদ্ব্যবহারের মাত্রার ওপর। অমর্ত্য সেন বিশ্বায়ন সম্পর্কে তার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইজঅঈ আয়োজিত ঢাকাস্থ এক সেমিনারে বলেছিলেনÑ
‘ও ধস ধহঃর ধহঃর-মষড়নধষরুধঃরড়হ.’  অর্থাৎ
‘আমি বিশ্বায়ন বিরোধীদের বিরোধী।’
এই জটিল অবস্থানের বা দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন যে পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের নানা সমালোচনা ও সীমাবদ্ধতা তিনি স্বীকার করেন; কিন্তু এর অর্থ বিশ্বায়নকে চরম খারাপ অভিহিত করে তাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে বদ্ধ অর্থনীতি বা স্বয়ংসম্পূর্ণ কোনো সমাজ বা সংস্কৃতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়া নয়। নয়া চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের অতীত অমøমধুর অভিজ্ঞতা সে সত্য প্রমাণ করেছে। সুতরাং বিশ্বায়ন ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ সেটি মূল প্রশ্ন নয়। মূল প্রশ্ন হচ্ছেÑ কোন ধরনের বিশ্বায়ন আমরা চাইব এবং কীভাবে সেটাকে আমাদের জাতীয় স্বার্থে আমরা ব্যবহার করব।
নারীমুক্তি অর্জনের সংগ্রামেও আমাদের একই ধরনের একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন রয়েছে। সেনের ‘‘Cooperative Conflict’-এর ধারণাটি এক্ষেত্রে আমরা গ্রহণ করতে পারি। নারীমুক্তি হোক কিন্তু পুরুষকে বাদ দিয়ে নয়। এ ধারণা অনুসারে পরিবারের অন্তর্ভুক্ত নারী ও পুরুষের মধ্যে যেমন সহযোগিতার ক্ষেত্র আছে, তেমনি আবার ‘বিরোধেরও’ ক্ষেত্র আছে। দুটোকেই কাজে লাগাতে হবে। ‘বিরোধ’ সর্বদা এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যাবে না যখন পরিবারের নারী-পুরুষ বিচ্ছেদ হয়ে পরস্পর শত্রুতে পরিণত হয়ে গেল। আবার সহযোগিতা, ভালোবাসা, যতেœর নাম করে নারীকে চিরকাল একতরফা প্রেমের শিকলে আটকে রাখলেও নারীমুক্তি অগ্রসর হবে না। এক্ষেত্রে তাই আমাদের আধুনিক বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ যেমন পরিবারকে উন্মুক্ত করতে হবে এবং সেজন্য নারীকে পুরুষদের সহযাত্রী যেমন হতে হবে তেমনি সেখানে নারীদের ন্যায্য হিস্যাটুকুও পুরুষদের নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারের ভেতরেও ন্যায্য শ্রম বিভাজন মেনে নিতে হবে। পারলে নারীদের জন্য প্রথম দিকে সুষম প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার স্বার্থে কিছুটা ইতিবাচক স্বীকৃতির (An Uncertain Glory : India and its Contradictions’ বিধান বা বাড়তি সুবিধা প্রদানের নীতি অনুসরণ করতে হবে। বিশ্বায়ন হোক; কিন্তু তা হোক অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক (Inclusive and Democratic)।

গ্রন্থপঞ্জি
১. রেহ্মান সোবহান ও নাসরীন খন্দকার (২০০১) ‘গ্লোবালাইজেশান এন্ড জেন্ডার : চেঞ্জিং প্যাটার্নস অফ উমেনস এমপাওয়ারমেন্ট ইন বাংলাদেশ’, ইউপিএল এবং সিপিডি, ঢাকা, বাংলাদেশ।
২. বিনা আগারওয়াল, জেন হামফ্রিস এবং ইনগ্রিড রবিনস (২০০৬), ‘কেপেবিলিটিজ, ফ্রীডম এন্ড ইকুয়ালিটি : অমত্য সেনস ওয়ার্ক ফ্রম এ জেন্ডার পারস্পেকটিভ’ অক্সফের্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, দিল্লী, ভারত।
৩. এন্থনী গীডেনস্ (২০০৩), ‘রানওয়ে ওয়ার্লড’, রুটলেজ পাবলিশার্স, নিউইয়র্ক।
৪. জ্যাঁ দ্রেজে এবং অমর্ত্য সেন (২০১৩), ‘এ্যন আনসার্টেইন গ্লোরী-ইন্ডিয়া এন্ড কনট্রাডিকশানস্’, পেঙ্গুইন বুকস্, লন্ডন, ইউকে।
৫. ওয়ার্লড ইকনমিক ফোরাম, (২০১৪), ‘দ্য গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট-২০১৪’, জেনেভা, সুইজারল্যান্ড।
৬. বিশ্বব্যাংক (২০১৩), ‘বাংলাদেশ পভার্টি এসেসমেন্ট : এসেসিং এ ডিকেড অফ প্রোগ্রেস ইন রিডিউসিং পভার্টি-২০০০-২০১০’, ঢাকা।

লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Category:

Leave a Reply