বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে মুজাহিদের ফাঁসি বহাল

Posted on by 0 comment

আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়

29উত্তরণ প্রতিবেদনঃ একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে মৃত্যুদ-াদেশপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসি (মৃত্যুদ-) বহাল রেখে আপিল নিষ্পত্তি করেছেন সুপ্রিমকোর্ট। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ গত ১৬ জুন ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংক্ষিপ্ত এ চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করতে বুদ্ধিজীবী নিধনের পরিকল্পনা ও সহযোগিতার দায়ে মুজাহিদকে দোষী সাব্যস্ত করে সর্বোচ্চ আদালতের চূড়ান্ত রায়ে এই প্রথম কোনো সাবেক মন্ত্রীকে মৃত্যুদ- দেওয়া হলো। এর ফলে বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে কুখ্যাত আলবদর বাহিনীর প্রধান মুজাহিদকে ফাঁসির মঞ্চে যেতেই হচ্ছে।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ দলে প্রভাবশালী নেতাদের মধ্যে অন্যতম। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে সরকারের সমাজ কল্যাণমন্ত্রী ছিলেন তিনি। ২০০৭ সালের ২৫ অক্টোবর নির্বাচন কমিশনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে সংলাপে মুজাহিদ বলেছিলেন, বাংলাদেশে কোনো যুদ্ধাপরাধী নেই। অতীতেও কোনো যুদ্ধাপরাধী ছিল না। দম্ভোক্তি করা সেই নেতাকে যুদ্ধাপরাধের অপরাধেই দোষী সাব্যস্ত করেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। বিশ্লেষকরা মনে করেন, স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর বুদ্ধিজীবী হত্যার চূড়ান্ত বিচারে জাতির কলঙ্কমোচন হলো। এতে ইতিহাসের পথচলা আরেক ধাপ এগিয়ে গেল। মুজাহিদের সাজা বহাল রাখার প্রতিবাদে ও তার মুক্তির দাবিতে ১৭ জুন সারাদেশে হরতাল আহ্বান করেছে জামাতে ইসলামী। এই দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে।
মুজাহিদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা ৭টি অভিযোগের মধ্যে ৫টি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয়। ৪৪ বছর আগে স্বাধীনতার ঊষালগ্নে বুদ্ধিজীবী এবং ফরিদপুরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর বর্বর নির্যাতন ও গণহত্যার দায়ে ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মুজাহিদকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকর করার নির্দেশ দেন। এর বিরুদ্ধে আসামিপক্ষ আপিল করে। আদালত মুজাহিদের আপিল আংশিক মঞ্জুর করে ১৬ জুন রায় দেন।
৭ নম্বর অভিযোগে ফরিদপুরের বকচর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর বর্বর নির্যাতন ও গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদ- দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। আপিল বিভাগ রায়ে মুজাহিদের আপিল মঞ্জুর করে সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন দেন। পঞ্চম অভিযোগে সুরকার আলতাফ মাহমুদসহ কয়েকজনকে ঢাকার নাখালপাড়ায় পুরনো এমপি হোস্টেলে আটক রেখে নির্যাতন এবং হত্যার ঘটনায় মুজাহিদকে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়েছিল। আপিল বিভাগ সেই সাজা বহাল রেখেছেন।
যে অভিযোগে ফাঁসি : আপিল বিভাগে প্রমাণিত ৬ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ২৭ মার্চের পর ঢাকার মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে ক্যাম্প স্থাপন করে রাজাকার ও আলবদর বাহিনী সেখানে প্রশিক্ষণ গ্রহণসহ স্বাধীনতাবিরোধী নানা অপরাধের পরামর্শ, ষড়যন্ত্র ও অপরাধমূলক কার্যক্রম চালায়। এ ধরনের ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আসামি আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ১০ ডিসেম্বর থেকে বুদ্ধিজীবী নিধন, সারাদেশে গণহত্যাসহ বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন।

হাসান আলীর মৃত্যুদ- কার্যকর হবে
ফাঁসি অথবা গুলিতে
30মুক্তিযুদ্ধকালে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে কিশোরগঞ্জের তাড়াইলের রাজাকার কমান্ডার সৈয়দ মো. হাসান আলীকে মৃত্যুদ-াদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। পলাতক এই আসামিকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে অথবা গুলি করে মৃত্যুদ- কার্যকরের আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।
বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১ গত ৯ জুন এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। এ ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক। এ নিয়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৯টি মামলার রায় ঘোষণা করা হলো। এর মধ্যে ৯টি মামলার রায় ঘোষণা করলেন ট্রাইব্যুনাল-১। বাকি ১০টি মামলার রায় দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল-২।
৯ জুন হাসান আলীর বিরুদ্ধে মামলার রায়ে ট্রাইব্যুনাল-১ বলেন, আসামির বিরুদ্ধে গঠন করা ৬টি অভিযোগের মধ্যে ৫টি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তৃতীয় ও চতুর্থ অভিযোগ গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাঁকে মৃত্যুদ-াদেশ দেওয়া হয়। দ্বিতীয়, পঞ্চম ও ষষ্ঠ অভিযোগে তাকে আমৃত্যু কারাদ-াদেশ দেওয়া হয়। প্রমাণিত না হওয়ায় প্রথম অভিযোগ থেকে খালাস পান।
সাজা ঘোষণার সময় ট্রাইব্যুনাল বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনে মৃত্যুদ- কীভাবে কার্যকর করা হবে, এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু বলা নেই। ফৌজদারি কার্যবিধিতে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকরের কথা আছে। আর ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে বলা হয়েছে, ওই আইনের অধীনে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে অথবা গুলি করে মৃত্যুদ- কার্যকর করা যাবে। এ জন্য ট্রাইব্যুনাল মনে করেন, ফাঁসিতে ঝুলিয়ে বা গুলি করেÑ সরকার যেভাবে চাইবে, সেভাবে মৃত্যুদ- কার্যকর করতে পারবে।
মানবতাবিরোধী অপরাধ তদন্ত সংস্থার সমন্বয়ক আবদুল হান্নান খান বলেন, এর আগে শুধু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলায় বিচারিক আদালত আসামিদের ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদ- কার্যকরের রায় দিয়েছিলেন। তবে উচ্চ আদালত ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ- কার্যকরের আদেশ দেন।
গণহত্যার দায়ে মৃত্যুদ- : তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর হাসান আলী, রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনারা তাড়াইল থানার শিমুলহাটি গ্রামের পালপাড়ার অক্রুর পালসহ ১২ জনকে হত্যা করে ঘরবাড়িতে আগুন দেন। চতুর্থ অভিযোগ অনুসারে, ২৭ সেপ্টেম্বর বড়গাঁও গ্রামের মরকান বিলে বেলংকা রোডে সতীশ ঘোষসহ আটজনকে হত্যা করে হাসান আলী ও সহযোগী রাজাকাররা। এ দুটি অভিযোগে হাসান আলীর বিরুদ্ধে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন ও সহযোগিতার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদ- দেন।
তিন অভিযোগে আমৃত্যু কারাদ- : দ্বিতীয়, পঞ্চম ও ষষ্ঠ অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে হাসান আলীকে আমৃত্যু কারাদ- দেওয়া হয়। দ্বিতীয় অভিযোগ অনুসারে, একাত্তরের ২৩ আগস্ট হাসান আলী, রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনারা কোনাভাওয়াল গ্রামের তফাজ্জল হোসেন ভূঁইয়াকে হত্যা করে দুটি ঘর লুট ও দুজনকে অপহরণ করে। পঞ্চম অভিযোগ, ৮ অক্টোবর হাসান আলী, রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনারা আড়াইউড়া গ্রামের কামিনী কুমার ঘোষ ও জীবন ঠাকুরকে হত্যা করে ঘরবাড়ি লুট করে। ষষ্ঠ অভিযোগ, ১১ ডিসেম্বর হাসান আলী ৩০-৪০ রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনাদের সাথে নিয়ে সাচাইল গ্রামের শতাধিক ঘরে অগ্নিসংযোগ করে এবং গ্রামের আবদুর রশিদকে হত্যা করে।

Category:

Leave a Reply