ভাষা-আন্দোলনে শেখ মুজিব

Posted on by 0 comment

PddMড. এম আবদুল আলীম: বাঙালির হাজার বছরের রাজনীতির আকাশে সবচেয়ে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ‘তিনি তো শুধু একটি ব্যক্তি ছিলেন না, ছিলেন সারা বাংলাদেশের সংগ্রামী চেতনার প্রতীক।’ চিরকালের উপেক্ষিত বাঙালি তাঁর নেতৃত্বেই ইস্পাতকঠিন ঐক্যে সংঘবদ্ধ হয়েছে এবং লাভ করেছে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম মানচিত্র ও গৌরবদীপ্ত পতাকা। এজন্য অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁকে ‘নেতাজী সুভাষবসুর পর বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ বীর’ বলে অভিহিত করেছেন।
বাঙালি, বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু এক অবিচ্ছিন্ন সত্তা। বাঙালির আবাসভূমি খ্রিষ্টপূর্বকালে বঙ্গাঃ, পু-াঃ, গৌড়াঃ; ঐতরেয় আরণ্যক-এ বঙ্গাঃ; রামায়ণ-মহাভারত-এ বঙ্গ; চর্যাপদ-এ বঙ্গাল দেশ; শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের আমলে ‘বাঙ্গালা’ কিংবা ইংরেজ শাসনে ‘বেঙ্গল’ নামে পরিচিতি হলেও, কোনোকালেই স্বতন্ত্র স্বাধীন ভূখ- ছিল না। দীর্ঘকালের ইতিহাস-পরিক্রমায় বাংলার মাটিতে জন্মগ্রহণ করেছেন অনেক স্বাধিকার-প্রমত্ত তেজোদীপ্ত মানুষ। তাদের বীরত্ব-বিদ্রোহ বাঙালির চেতনায় স্বাজাত্যবোধ ও স্বাধিকার-চেতনা অগ্নিমশাল প্রজ্বালিত করলেও, তা শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছার পথ খুঁজে পায়নি।
কালে কালে অধিকারের প্রশ্নে বাঙালি জেগে উঠলেও, সূর্যের তেজে চির-অমøান স্বাধীনতার বীজ এই জাতির চেতনায় প্রথম উপ্ত হয়েছিল ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর; এবং সেটা হয়েছিল ভাষা-আন্দোলনের মাধ্যমে, যার অন্যতম প্রধান নেতা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তখন এদেশের ছাত্রসমাজকে তিনি সংগ্রামী চেতনায় উজ্জীবিত করেছিলেন; ‘প্রকৃতপক্ষে বাংলার ছাত্র আন্দোলনের তিনিই প্রতিষ্ঠাতা।’ ভাষা-আন্দোলনের চেতনার তরুণ সমাজের অস্তিত্বের মর্মমূলে প্রোথিত করে তার লালন, বিকাশ ও মহীরুহ-রূপদানের ক্ষেত্রে তিনি পালন করেন অগ্রসেনানীর ভূমিকা। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর অবদানের কথা স্বীকার করেও বলা যায়, শেখ মুজিবই স্বাঙালির স্বাধিকার-সংগ্রামের মূল নেতা এবং স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মহানায়ক। পাকিস্তান আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী হিসেবে বাংলার জনগণের কাছে পরিচিতি লাভ করলেও, সাতচল্লিশের দেশভাগের পর বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগ্রত হওয়ার প্রথম সোপান, অর্থাৎ ভাষা-আন্দোলন থেকেই পূর্ববাংলার রাজধানী ঢাকায় তার বর্ণাঢ্য ও সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনের গোড়াপত্তন ঘটে।
ভাষা-সংস্কৃতির গৌরবে বলীয়ান, দীর্ঘকালের ঐতিহ্য-সমৃদ্ধ বাঙালি জাতি আপন অস্তিত্বের অহঙ্কারে তীব্র আক্রোশ আর বীরত্বের হুঙ্কারে প্রথম জেগে উঠেছিল ভাষা-আন্দোলনের মাধ্যমে। বাঙালির এই জাগরণের মূলে ছিল মাতৃভাষার প্রতি গভীর দরদ ও ভালোবাসা। দুর্যোগ-দুঃশাসন কবলিত বাঙালির বাঙালিত্বের অহমিকা এমন বজ্রকঠিনরূপে আর কখনও প্রকাশ পায়নি। ভাষা-আন্দোলনের শুরু থেকেই সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ ও অন্যতম শীর্ষ নেতৃত্বের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন বাংলা মায়ের তেজোদীপ্ত সন্তান শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর ’৫৪-র নির্বাচন, আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ’৬৬-র ৬-দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন এবং সর্বোপরি ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদান করে তিনি হয়ে ওঠেন এ ভূখ-ের মুক্তিকামী মানুষের অবিসংবাদিত নেতা। শুধু তাই নয়, বাঙালির স্বাধিকার সংগ্রামের মূল নায়ক ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী প্রধান নেতা হিসেবে তিনি ইতিহাসে লাভ করেছেন গৌরবোজ্জ্বল স্থান। নিজের সংগ্রামী জীবনের শ্রেষ্ঠ ফসল স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলার কোটি কোটি মানুষের কাছে লাভ করেছেন ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি এবং জাতির জনকের মর্যাদা।

ভাষা-আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহ
প্রায় দু-শো বছরের ইংরেজ শাসনের অবসানের পর ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান সৃষ্টি হলে স্বাধীনতার গৌরবে গৌরবান্বিত পূর্ববাংলার মানুষ আশায় বুক বাঁধে এবং নতুন দিনের স্বপ্নে বিভোর হয়। তারা ভেবেছিল এবার শোষণ-বঞ্চনা মুক্ত একটি সুন্দর জীবন পাবে, পাবে স্বাধীনতার সুফল। কিন্তু বিধি বাম! তাদের সে আশা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়। ‘স্বাধীনতা লাভের পর মুসলিম লীগ পাকিস্তানের জনগণের আশা আকাক্ষার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে।’ এর ফলে বাঙালির স্বপ্নেরও ঘটে অপমৃত্যু। কুচক্রী পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শুরু থেকেই সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকÑ সকল দিক থেকেই পূর্ববাংলার মানুষের টুটি চেপে ধরে। বাঙালির আত্মজাগরণ ও স্বকীয় সত্তাকে চিরতরে স্বব্ধ করে দেওয়ার জন্য পাকিস্তান সৃষ্টির শুরু থেকেই পরিকল্পিতভাবে আঘাত হানে বাঙালির অস্তিত্ব তথা তাদের ভাষা, সাহিত্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ওপর। পাকিস্তান সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই সরকার সুকৌশলে দাপ্তরিক কাজে বাংলা ভাষা বর্জন শুরু করে। এ কাজে জনমত গঠন করতে মাঠে নামায় কিছু তল্পিবাহক বুদ্বিজীবী ও রাজনৈতিক নেতাকে। এরই প্রতিবাদে শুরু হয় ভাষা-আন্দোলন।
বাংলা ভাষার প্রতি পাকিস্তান সরকারের প্রথম প্রত্যক্ষ অবজ্ঞা ও আক্রোশের বহিঃপ্রকাশ ঘটে ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি; এবং সেটা হয় পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত কর্তৃক উত্থাপিত বাংলা ভাষা বিষয়ক প্রস্তাব নাকচের ফলে। এর প্রতিক্রিয়ায় পূর্ববাংলার ছাত্রসমাজ বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। মাতৃভাষা বাংলাকে অবহেলার প্রতিবাদে তারা রাজপথে নেমে আসে। বাংলা ভাষাকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করার প্রশ্নে সর্বপ্রথম দাবি তোলে গণ-আজাদী লীগ নামক একটি প্রগতিশীল রাজনৈতিক সংগঠন। এরপর ‘তমদ্দুন মজলিস’ নামের আরেকটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের মাধ্যমে বাংলা ভাষাকে অফিস-আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভাষা করার দাবি তোলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও কিছু সংস্কৃতি-কর্মী। বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবিকে জোরদার করতে গড়ে তোলা হয় ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’।
১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ববাংলার ছাত্র, তরুণ ও যুবসমাজের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতীক হিসেবে জন্মলাভ করে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। এর ফলে ভাষা-আন্দোলনে আসে নতুন গতিবেগ। এতদিন যে আন্দোলন প্রধানত বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তা ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর ছাত্রসমাজের মধ্যে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে তমদ্দুন মজলিস ও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ যৌথভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নে দেশব্যাপী কাজ শুরু করে। ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠনের সম্মিলিত সভায় শামসুল আলমকে আহ্বায়ক করে পুনর্গঠন করা হয় ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১১ মার্চ দেশব্যাপী ধর্মঘট পালিত হয়। ঐদিন পুলিশি নির্যাতন ও গ্রেফতারের শিকার হন অনেক ছাত্র ও যুবনেতা। কারাবন্দি করা হয় অনেককে। এরপর আন্দোলনকে স্তিমিত করতে মুসলিম লীগ সরকার সুকৌশলে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ৮-দফা চুক্তি করে এবং কারাবন্দিদের মুক্তি দেয়। ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে এবং ২৪ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন। এর প্রতিবাদে ছাত্ররা তার সামনেই ‘নো-নো’ বলে চিৎকার করে ওঠে। জিন্নাহর সফরের পর ১৯৪৮ সালের ভাষা-আন্দোলন ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে যায়।
ভাষা-আন্দোলনের প্রবল রূপ লক্ষ করা যায় ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। এর আগে ১৯৫১ সালের ১১ মার্চ আবদুল মতিনকে আহ্বায়ক করে গঠন করা হয় ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’। নানা কারণে পূর্ববাংলার মানুষের মনে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়, যার বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের নবনিযুক্ত প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের পল্টন ময়দানের জনসভায় উর্দুকে হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণার পর। তার এই ঘোষণায় ফুঁসে ওঠে পূর্ববঙ্গের ছাত্রসমাজ তথা সর্বস্তরের মানুষ। ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকার বার লাইব্রেরিতে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের উদ্যোগে আহ্বান করা হয় এক সর্বদলীয় সভা। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ঐ সভায় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি কাজী গোলাম মাহবুবকে আহ্বায়ক করে গঠন করা হয় চল্লিশ সদস্যের ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’।
‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর উদ্যোগে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী হরতাল ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে সরকার ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকা শহরে সকল প্রকার মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে এবং ১৪৪ ধারা জারি করে। সার্বিক পরিস্থিতি আলোচনা এবং ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি যথাযথভাবে পালনের লক্ষ্যে ২০ ফেব্রুয়ারি আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ অফিসে ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর এক সভা আহ্বান করা হয়। সভায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ব্যাপারে পক্ষে-বিপক্ষে চলে চুলচেরা বিশ্লেষণ। অবশেষে আসে ইতিহাসের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় হাজার হাজার ছাত্র ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে হয় বিশাল সভা। গাজীউল হকের সভাপতিত্বে আয়োজিত ঐ সভা থেকে ১৪৪ ধারা ভেঙে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ দাবিতে রাজপথে নেমে আসে বাংলার দামাল সন্তানেরা। এরপর পুলিশের সঙ্গে চলে দফায় দফায় সংঘর্ষ। বেলা তিনটার পর ঘটে মর্মান্তি ট্র্যাজেডি। কোনো রকম পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই পুলিশ মিছিলের ওপর গুলিবর্ষণ করে। এতে রফিক-বরকতসহ অনেকে শহিদ হন, আহত ও গ্রেফতার হন অগণিত মানুষ। প্রতিবাদে ফুঁসে ঢাকাসহ সারাদেশ। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে শহিদদের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। দেশজুড়ে চলে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ। ঢাকা শহরে এদিন শহিদ হন সালাম-শফিউরসহ অনেকে। আন্দোলন যতই দানা বেঁধে ওঠে, সরকারি নির্যাতনও ততই বৃদ্ধি পায়। এর মধ্যেই গড়ে তোলা হয় ভাষাশহিদদের স্মৃতিঅমøান করে রাখার শহিদ মিনার। এরপর সরকারি দমন-পীড়নে ধীরে ধীরে আন্দোলনের গতি থেমে আসে। আন্দোলন থামলেও নির্বাপিত হয় না চেতনার বহ্নিশিখা। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ভাষা-আন্দোলনের চেতনায় জাগরুক বাঙালি ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে পতন ঘটায় মুসলিম লীগ সরকারের। নানা কাঠখড় পোড়ানোর পর অবশেষে ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা ভাষাকে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করা হয়।
ভাষা-আন্দোলন ছিল পাকিস্তান সরকারের নানাবিধ শোষণের বিরুদ্ধে পূর্ববাংলার মানুষের ক্ষোভের স্বতঃস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ। এই আন্দোলন গড়ে তুলতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল ও ছাত্র সংগঠন পালন করে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ভূমিকা। এর মধ্যে গণ-আজাদী লীগ, তমদ্দুন মজলিস, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, গণতান্ত্রিক যুবলীগ, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ, পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ, পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ফেডারেশন, লেবার ফেডারেশন, ইসলামি ভাতৃসংঘ প্রভৃতি সংগঠনের ভূমিকা অতি উজ্জ্বল। সার্বিকভাবে বলা যায়, ভাষা-আন্দোলনে মূল নেতৃত্ব দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীরা। পরে এতে যুক্ত হয় পূর্ববাংলার সর্বস্তরের মানুষ।
ভাষা-আন্দোলনের কথা বলতে গেলে অসংখ্য নাম সামনে চলে আসে। সকলের নাম স্বল্পপরিসরে তুলে ধরা কঠিন, তবুও যাদের নাম সর্বাগ্রে উচ্চারণ করতে হয়, তারা হলেনÑ কামরুদ্দীন আহমদ, অধ্যাপক আবুল কাসেম, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, আতাউর রহমান খান, আবুল হাশিম, শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, শওকত আলী, কাজী গোলাম মাহবুব, আবদুল গফুর, নূরুল হক ভূঁইয়া, শামসুল আলম, নাইমউদ্দীন আহমদ, অলি আহাদ, গাজীউল হক, খালেক নেওয়াজ খান, এমএ ওয়াদুদ, মোহাম্মদ সুলতান, মোহাম্মদ তোয়াহা, আবদুল মতিন, আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, খয়রাত হোসেন, আনোয়ারা খাতুন, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, শহীদুল্লাহ কায়সার, গোলাম মাওলা, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ইমাদুল্লাহ, মুহম্মদ হাবিবুর রহমান, আবদুস সামাদ আজাদ, কামরুজ্জামান, শামসুল হক চৌধুরী, এম নূরুল আলম, বদরুল আলম, মুজিবুল হক, জিল্লুর রহমান, এম আর আখতার মুকুল, আহমদ রফিক প্রমুখ। রাজনৈতিক অঙ্গনের পুরোধা ব্যক্তিদের পাশাপাশি বুদ্ধিজীবীসমাজও এই আন্দোলনে রেখেছেন অনন্য অবদান। মূলত, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বাংলা ভাষাবিরোধী অপতৎপরতার বিরুদ্ধে প্রথম লেখনী ধারণ করেছিলেন এবং সোচ্চার হয়েছিলেন পূর্ববাংলার প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীগণ। এদের মধ্যে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, আবদুল হক, ড. এনামুল হক, কাজী মোতাহার হোসেন, আই এইচ জুবেরী, মাহবুব জামাল জাহেদী, হাসান হাফিজুর রহমান, আনিসুজ্জামান, মুস্তাফা নূরউল ইসলাম, রফিকুল ইসলাম প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

আটচল্লিশের ভাষা-আন্দোলনে শেখ মুজিবের ভূমিকা
পূর্ববঙ্গের ফরিদপুর জেলার টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণকারী শেখ মুজিবুর রহমান অতি অল্প বয়সে রাজনৈতিক কর্মকা-ে যুক্ত হন। শৈশবেই তার মধ্যে জাগ্রত হয় অন্ন-বস্ত্রহীন মানুষের প্রতি দরদ ও গভীর মমত্ববোধ। স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি নিজেদের অধিকারের ব্যাপারে সচেতন হয়ে ওঠেন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা শেখেন। ধীরে ধীরে বয়স যতই বাড়তে থাকে ততই রাজনৈতিক অঙ্গনে বৃদ্ধি পায় তার বিচরণ। কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে অধ্যয়নকালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সান্নিধ্যে তার মধ্যে জাগ্রত হয় স্বাধিকারবোধ, জাতীয়তাবাদী চেতনা ও নেতৃত্বদানের গুণাবলি। জাতির মুক্তি আকাক্সক্ষা আর পরাধীনতার জটাজাল ছিন্ন করতে তিনি যুক্ত হন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে। কলকাতায় অবস্থানকালে নেতাজী সুভাষ বসু হয়ে ওঠেন তার রাজনীতির প্রেরণাপুরুষ। যুক্ত হন হলওয়েল মনুমেন্ট বিরোধী আন্দোলন এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধসহ নানা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে। মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি পালন করেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে ফরিদপুর তথা পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিম লীগ প্রার্থীদের বিজয়লাভে রাখেন বিশেষ অবদান। এভাবে ব্রিটিশশাসিত বঙ্গদেশে যৌবনকালেই তিনি রাজনৈতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর শেখ মুজিবুর রহমান স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসেন এবং ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। একজন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে সঙ্গীদের নিয়ে ‘কর্মীশিবির’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নবপ্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে নতুন ধারার কল্যাণধর্মী রাজনীতি গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন। তিনি সে প্রচেষ্টা বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় প্রগতিশীল ও উদার রাজনৈতিক বলয়ের বন্ধু-বান্ধব ও সহযোদ্ধাদের নিয়ে গড়ে তোলেন গণতান্ত্রিক যুবলীগ, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রভৃতি সংগঠন। ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গণতান্ত্রিক যুবলীগ ও ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি এসব সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে কার্যনির্বাহী কমিটিতে যুক্ত হন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র শুরু করলে তিনি প্রথম থেকেই প্রতিবাদী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে সরকারি নানা অপতৎপরতার বিরুদ্ধে সভা-সমাবেশে অংশগ্রহণের পাশাপাশি লিফলেট ছেপে তা জনসাধারারণের মাঝে বিতরণ করেন। ভাষা-আন্দোলন বেগবান করার লক্ষ্যে ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে আয়োজিত সর্বদলীয় সভায় ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ পুনর্গঠিত হলে তিনি তার সদস্য মনোনীত হন। ঐ সভায় বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে ১১ মার্চ ধর্মঘট ও ‘দাবি দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। একই সঙ্গে এই কর্মসূচি সফল করার জন্য জেলায় জেলায় চলে সাংগঠনিক সফর।
১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের ধর্মঘটের পক্ষে জনমত গঠনের লক্ষ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ফরিদপুর, যশোর, দৌলতপুর, খুলনা ও বরিশালে ছাত্রসভা করেন। এরপর ঢাকায় ফিরে ১০ মার্চ রাতে ফজলুল হক হলে এক সভায় ১১ মার্চের কর্মসূচিতে কে, কোথায়, কী দায়িত্ব পালন করবেÑ তা নির্ধারণ করেন। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে : `Secret information was received on 12.3.48 that the subject (Bangabandhu) along with others took part in the discussions held at Fazlul Haq Hall on 10.3.48 and gave opinion in favour of violating section 144 cr.p.c. on 11.3.48. On this decision, small batches of Hindu and Muslim students were sent out on 11.3.48 to picket the G.P.O., the secretariat and other important Govt. officers. The subject (Bangabandhu) was arrested on 11.3.48 for violating the orders…. He took very active part in the agitation for adopting Bengali as the State language of Pakistan, and made propoganda at Dacca for general strike on 11.3.48. on this issue. On 11.3.48 the subject was arrested fo violating orders under section 144 Cr. P.C.` ১১ মার্চ সকালে কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি জেনারেল পোস্ট অফিস ও ইডেন বিল্ডিংয়ের সামনে পিকেটিং করেন। পিকেটিং করার সময় পুলিশি হামলার শিকার ও গ্রেফতার হন। শেখ মুজিবসহ অনেককে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। সেদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি অসাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন : ‘১১ই মার্চ ভোরবেলা শত শত ছাত্রকর্মী ইডেন বিল্ডিং, জেনারেল পোস্ট অফিস ও অন্যান্য জায়গায় পিকেটিং শুরু করলো।… সকাল নয়টায় ইডেন বিল্ডিংয়ের সামনের দরজায় লাঠিচার্জ হল। খালেক নেওয়াজ খান, বখতিয়ার, শহর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এম. এ. ওয়াদুদ গুরুতররূপে আহত হল।… আমাদের উপর কিছু উত্তম মধ্যম পড়ল এবং ধরে নিয়ে জিপে তুলল।… আমাদের প্রায় সত্তর-পঁচাত্তরজনকে বেঁধে নিয়ে জেলে পাঠিয়ে দিল সন্ধ্যার সময়।’ কারাগারের রোজনামচায় তিনি এ বিষয়ে লিখেছেন : ‘প্রথম ভাষা আন্দোলন শুরু হয় ১১ই মার্চ ১৯৪৮ সালে। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ (এখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ) ও তমদ্দুন মজলিসের নেতৃত্বে। ঐদিন ১০টায় আমি, জনাব শামসুল হক সাহেবসহ প্রায় ৭৫ জন ছাত্র গ্রেফতার হই এবং আবদুল ওয়াদুদ-সহ অনেকেই ভীষণভাবে আহত হয়ে গ্রেফতার হয়।’
তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরিসহ বিভিন্নজনের স্মৃতিচারণেও স্থান পেয়েছে ১১ মার্চের ধর্মঘট পালনের বিবরণ। তাজউদ্দীন আহমদ তার ডায়েরিতে লিখেছেন : ‘১১ মার্চ ’৪৮, বৃহস্পতিবার : … সকাল ৭টায় সাধারণ ধর্মঘটের পক্ষে কাজ করতে বেরিয়ে প্রথমে এফএইসএম হলে গেলাম। তোয়াহা সাহেব এবং আমি একসঙ্গে কাজ করছি। রমনা পোস্ট অফিসের কাছে তোয়াহা সাহেব ও অন্য কয়েকজন পুলিশ কর্তৃক আটক হলেন। আমি গ্রেফতার এড়াতে সক্ষম হলাম। একটু পরে তোয়াহা সাহেবকে পুলিশ ছেড়ে দিল। ১২টায় পিকেটিং বন্ধ হলে ১টায় নাইমউদ্দীন সাহেবের সভাপতিত্বে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সভা হলো। বেলা ২টায় সচিবালয় অভিমুখে মিছিল শুরু হলে পুলিশ হাইকোর্ট গেটের কাছে বাধা দিল। আমরা উত্তর গেটের দিকে রওয়ানা হলাম। তখনই পুলিশ লাঠিচার্জ করল। তোয়াহা সাহেবকে মারাত্মক মারধর করল, অন্যরাও মার খেল। কোথাও যেতে পারলাম না। সাড়ে ৩টায় সভার পর সবাই চলে গেল। মুজিব, শামসুল হক, মাহবুব, অলি আহাদ, শওকত, আনসার ও অন্যান্য ৬৯ জনকে আটক করে জেল হাজতে রাখা হয়েছে। ১৪ জন আহত হয়ে হাসপাতালে। সেন্ট্রাল জেল, কোতয়ালি ও সূত্রাপুর থানা এবং হাসপাতালে তাদের সঙ্গে দেখা করলাম।… বি. দ্র. পুলিশের নির্যাতন ও ভাড়াটে গু-াদের গু-ামি সত্ত্বেও আজকের ধর্মঘট চমৎকার সফল হলো।’
১১ মার্চের ধর্মঘটে পুলিশের লাঠিচার্জ ও নির্বিচারে গ্রেফতারের প্রতিবাদে আন্দোলন আরও প্রবল রূপ ধারণ করে। এই আন্দোলন প্রশমন এবং পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর পূর্ববঙ্গ সফর শান্তিপূর্ণভাবে করার লক্ষ্যে সরকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ৮-দফা সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির শর্তগুলো যথাযথ হয়েছে কি না তা কারাগার থেকেই দেখে দেন শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্য নেতৃবৃন্দ। এদিকে ‘শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেফতারের প্রতিবাদে ১৬-৩-৪৮-এ গোপালগঞ্জে সর্বাত্মক হরতাল ডাকা হয়। বিকেলে এস এন একাডেমি এবং এম এন ইনষ্টিটিউটের ৪০০ ছাত্র শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করে “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”, “নাজিমুদ্দীন নিপাত যাক”, “মুজিবকে মুক্তি দাও”, “অন্য গ্রেফতারকারীদের মুক্তি দাও” ইত্যাদি সেøাগান দেয়।’ তবে তার আগেই ১৫ মার্চ, ১৯৪৮ তিনি মুক্তি লাভ করেন।
১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় এক ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন শেখ মুজিবুর রহমান। এ প্রসঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদ লিখেছেন : ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বেলা দেড়টায় সভা শুরু হলো। মুজিবুর রহমান সভাপতিত্ব করলেন। সংশোধনীগুলি গৃহীত হলো এবং অলি আহাদের মাধ্যমে তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হলো।’ সেদিনের ঘটনা সম্পর্কে কারাগারের রোজনামচায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন : “১৬ই মার্চ আবার বিশ্ববিদ্যালয় আমতলায় সভা হয়, আমি সেই সভায় সভাপতিত্ব করি। আবার বিকালে আইনসভার সামনে লাঠিচার্জ হয় ও কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়া হয়। প্রতিবাদের বিষয় ছিল, ‘নাজিমুদ্দীন সাহেবের তদন্ত চাই না, জুডিশিয়াল তদন্ত করতে হবে।’ ২১শে মার্চ বা দুই একদিন পরে কায়েদে আজম প্রথম ঢাকায় আসবেন। সেই জন্য আন্দোলন বন্ধ করা হলো। আমরা অভ্যর্থনা দেওয়ার বন্দোবস্ত করলাম।” ১৬ মার্চের সভায় শেখ মুজিবুর রহমানের সভাপতিত্ব করা প্রসঙ্গে শওকত আলী লিখেছেন : ‘১৬ তারিখ সকাল থেকে আমরা সভার ব্যাপারে কাজকর্ম করতে থাকলাম এবং বেলা দেড়টা দুটোয় সভা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শুরু হলো। সভায় সভাপতিত্ব করলো শেখ মুজিবর রহমান। সেই বক্তৃতা করলো এবং একটি মিছিল নিয়ে আমরা Assembly House-এর দিকে গেলাম।’
১৭ই মার্চ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘটের পালিত হয়। ঐদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নাইমউদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে এক ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ প্রমুখ বক্তৃতা করেন। সন্ধ্যার পর ফজলুল হক হলে ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে’র সভা অনুষ্ঠিত হয়, এই সভায় শেখ মুজিবুর রহমান যোগদান করেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন : ‘সন্ধ্যার পরে খবর এল ফজলুল হক হলে সংগ্রাম পরিষদের সভা হবে। ছাত্ররাও উপস্থিত থাকবে। আমার যেতে একটু দেরি হয়েছিল। তখন একজন বক্তৃতা করছে আমাকে আক্রমণ করে। আমি দাঁড়িয়ে শুনলাম এবং সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম। তার বক্তৃতা শেষ হলে আমার বক্তব্য বললাম। আমি যে আমতলার ছাত্রসভায় বলেছিলাম, কাগজ দিয়েই চলে আসতে এবং এ্যাসেম্বলি হাউসের সামনে দাঁড়িয়ে সকলকে চলে যেতে অনুরোধ করেছিলাম এবং বক্তৃতাও করেছিলাম, একথা কেউ জানেন কি না? যা হোক, এখানেই শেষ হয়ে গেল, আর বেশি আলোচনা হল না এবং সিদ্ধান্ত হল আপাতত অমাদের আন্দোলন বন্ধ রাখা হল। কারণ, কয়েকদিনের মধ্যে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রথম ঢাকায় আসবেন পাকিস্তান হওয়ার পরে। তাঁকে সম্বর্ধনা জানাতে হবে।’
১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ববঙ্গ সফরে আসেন। ২১শে মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ঢাকার নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সংবর্ধনার জবাবে তিনি বিভিন্ন প্রসঙ্গে দীর্ঘ বক্তৃতা দেন এবং রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে বলেন : ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, অন্য কোন ভাষা নয়।’ তাঁর এ বক্তব্য সকলে নির্বিচারে গ্রহণ করেনি। তাই ‘সভার এক প্রান্তে প্রতিবাদের ধ্বনি উত্থিত হয় এবং যাঁরা এই ধ্বনি তুলেছিলেন তাঁদের নেতৃত্বদান করেন শেখ মুজিব, তাজউদ্দীন আহমদ এবং আবদুল মতিন। যদিও এই প্রতিবাদের সুর খুব প্রচ- ছিল না, তবু পাকিস্তানের জাতির জনক এই প্রথম প্রকাশ্য জনসভায় একটি অপ্রত্যাশিত ধাক্কা খেলেন।’ এ প্রসঙ্গে নূহ-উল-আলম লেনিন লিখেছেন : ‘জিন্নাহ তাঁর বক্তৃতায় উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করেন। নো নো বলে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ জানান শেখ মুজিবুর রহমানসহ কয়েকজন ছাত্র।’ অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন : “জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তানে এসে ঘোড় দৌড় মাঠে বিরাট সভায় ঘোষণা করলেন, “উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে।” আমরা প্রায় চার পাঁচ শত ছাত্র এক জায়গায় ছিলাম সেই সভায়। অনেকে হাত তুলে দাঁড়িয়ে জানিয়ে দিল, ‘মানি না।” তিনি কারাগারের রোজনামচায় লিখেছেন : “তিনি [জিন্নাহ] এসে ঘোষণা করলেন, ‘উর্দুই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে।’ ছাত্ররা তাঁর সামনেই প্রতিবাদ করল। রেসকোর্স ময়দানেও প্রতিবাদ উঠল। তিনি হঠাৎ চুপ করে গেলেন। যতদিন বেঁচে ছিলেন এরপরে কোনোদিন ভাষার ব্যাপারে কোনো কথা বলেন নাই।”
পূর্ববঙ্গ সফরে এসে ধুরন্ধর ব্যবহারজীবী ‘জিন্নাহ তাঁর চাতুর্য ও কূটবুদ্ধি প্রয়োগ করে আন্দোলনটির মূল খাত পাল্টে দিলেন, এর লক্ষ্যকে কক্ষচ্যুত করে দিলেন।’ এরপর ভাষা-আন্দোলন ধীরে ধীরে থেমে গেলেও ভাষার প্রশ্নে চলতে বিভিন্ন আলোচনা-পর্যালোচনা। ঐ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের সামনে অনুষ্ঠিত এক সভায় কতিপয় ছাত্রনেতা উর্দুপ্রীতিমূলক বক্তৃতা দিলে শেখ মুজিবুর রহমান এর প্রতিবাদ জানান। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন : “জিন্নাহ চলে যাওয়ার কয়েকদিন পরে ফজলুল হক হলের সামনে এক ছাত্রসভা হয়। তাতে একজন ছাত্র বক্তৃতা করছিল, তার নাম আমার মনে নাই। তবে সে বলেছিল “জিন্নাহ যা বলবেন, তাই আমাদের মানতে হবে। তিনি যখন উর্দুই রাষ্ট্রভাষা বলেছেন তখন উর্দুই হবে।” আমি তার প্রতিবাদ করে বক্তৃতা করেছিলাম, আজও আমার এই একটা কথা মনে আছে। আমি বলেছিলাম, “কোন নেতা যদি অন্যায় কাজ করতে বলেন, তা প্রতিবাদ করা এবং তাকে বুঝিয়ে বলার অধিকার জনগণের আছে। যেমন হযরত ওমরকে (রা.) সাধারণ নাগরিকরা প্রশ্ন করেছিলেন তিনি বড় জামা পরেছিলেন বলে। বাংলা ভাষা শতকরা ছাপ্পান্নজন লোকের মাতৃভাষা, পাকিস্তান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, সংখ্যাগুরুদের দাবি মানতেই হবে। রাষ্ট্রভাষা বাংলা না হওয়া পর্যন্ত আমরা সংগ্রাম চালিয়ে যাব। তাতে যাই হোক না কেন, আমরা প্রস্তুত আছি।” সাধারণ ছাত্ররা আমাকে সমর্থন করল। এরপর পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র ও যুবকরা ভাষার দাবি নিয়ে সভা ও শোভাযাত্রা করে চলল।”
১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু হলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন লিয়াকত আলী খান। প্রধানমন্ত্রী হয়েই তিনি পূর্ববঙ্গ সফরে আসেন। তার সফরকে কেন্দ্র করে ‘১৭ নভেম্বর সন্ধ্যা সাতটায় আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের একটি বৈঠক বসে। আজিজ আহমদ, আবুল কাসেম, শেখ মুজিবুর রহমান, কামরুদ্দীন আহমদ, আব্দুল মান্নান, আনসার এবং তাজউদ্দীন আহমদ এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।’ এতে ছাত্রলীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বাংলা ভাষার দাবির পক্ষে তার দৃঢ় অবস্থানের কথা জানান।
ভাষা-আন্দোলন ও বিভিন্ন ছাত্র-আন্দোলনের সময় ছাত্রদের ওপর জুলুম-নির্যাতনের প্রতিবাদে শেখ মুজিবুর রহমানকে আহ্বায়ক করে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের উদ্যোগে গঠন করা হয় ‘জুলুম প্রতিরোধ কমিটি’। ১৯৪৯ সালের ৮ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের ‘জুলুম প্রতিরোধ’ কমিটির উদ্যোগে হরতাল, মিছিল ও ছাত্র-সমাবেশ আয়োজন করা হয়। ‘ছাত্রসমাজের উপর দমননীতির ষ্টীমরোলার’ শিরোনামে একটি ইশতেহারও প্রকাশ করা হয়। এ কর্মসূচি উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্রলীগের আহ্বায়ক নাইমউদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে একটি সাধারণ ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় শেখ মুজিবুর রহমান বক্তৃতা করেন। ৮ জানুয়ারির সভা সম্পর্কে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার একটি গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে : `In connection with the observance of the Anti-repression Day at Dacca on 8.1. 49 the subject [Sheikh Mujibur Rahman] bitterly criticised the Government for it’s alleged repressive measures against the students and suggested Direct Action if the demands of the students were not met.`
সভায় ছাত্রদের দাবি-দাওয়া মেনে নেওয়ার জন্য সরকারকে এক মাসের সময় দেওয়া হয়। এ সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন : “ছাত্ররা আমাকে কনভেনর করে জুলুম প্রতিরোধ দিবস পালন করার জন্য একটি কমিটি করেছিল। একটা দিবসও ঘোষণা করা হয়েছিল। পূর্ব বাংলার সমস্ত জেলায় এই দিবসটি উদ্যাপন করা হয়।… এই প্রথম পাকিস্তানে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির আন্দোলন এবং জুলুমের প্রতিবাদ। এর পূর্বে আর কেউ সাহস পায় নাই। তখনকার দিনে আমরা কোনো সভা বা শোভাযাত্রা করতে গেলে এক দল গু-া ভাড়া করে মারপিট করা হতো এবং সভা ভাঙার চেষ্টা করা হতো। ‘জুলুম প্রতিরোধ দিবসে’ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়ও কিছু গু-া আমদানি করা হয়েছিল। আমি খবর পেয়ে রাতেই সভা করি এবং বলে দেই, গু-ামির প্রশ্রয় দেয়া হলে এবার বাধা দিতে হবে। আমাদের বিখ্যাত আমতলায় সভা করার কথা ছিল; কর্তৃপক্ষ বাধা দিলে আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের মাঠে মিটিং করলাম। একদল ভাল কর্মী প্রস্তুত করে বিশ্ববিদ্যালয় গেটে রেখেছিলাম, যদি গু-ারা আক্রমণ করে তারা বাধা দিবে এবং তিন দিক থেকে তাদের আক্রমণ করা হবে যাতে রমনা এলাকায় গু-ামি করতে না আসেÑ এই শিক্ষা দিতে হবে।”
১৯৪৯ সালের ১১ মার্চেও ‘প্রতিবাদ দিবস’ পালন করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এ কর্মসূচি পালনের প্রধান উদ্যোক্তা। আর সেজন্য তাকে কারাবরণ করতে হয়। ড. মযহারুল ইসলাম বলেছেন : ‘১৯৫০ সালের ১১ই মার্চ গণ-আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। দেশের পরিস্থিতি উপলব্ধি করে পূর্ব বাংলার তৎকালীন নূরুল আমীন সরকার দমননীতির মাধ্যমে আন্দোলনের কণ্ঠরোধের প্রচেষ্টা চালালেন। ১১ই মার্চের সংগ্রাম দিবসের কর্মসূচির প্রধান উদ্যোক্তা শেখ মুজিবকে পুনরায় কারারুদ্ধ করা হয়।’
ভাষা-আন্দোলনের প্রথম পর্বে শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা ছিল অতি উজ্জ্বল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র ও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা ও সাংগঠনিক কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে তিনি এই আন্দোলনে নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন। বস্তুত, ১৯৪৮ সালের ভাষা-আন্দোলনে নেতৃত্বদানের মাধ্যমে তিনি ঢাকার ছাত্র-আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হন এবং নিজের সাংগঠনিক দক্ষতায় নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের শক্ত ভিত নির্মাণ করেন।

বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনে শেখ মুজিবের অবদান
বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময় শেখ মুজিব কারাগারে বন্দি ছিলেন। ‘বঙ্গবন্ধু ১৯৫০ সালে গ্রেফতার হন। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে গুলি হয়। সালাম, বরকত, জব্বারসহ অনেক শহীদ রক্ত দেয়। বঙ্গবন্ধু তখনও বন্দি। বন্দি থাকা অবস্থায়ও ছাত্রদের সাথে সবসময় তাঁর যোগাযোগ ছিল। তিনি যোগাযোগ রক্ষা করতেন এবং আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য ছাত্রসমাজকে উদ্বুদ্ধ করতেন।’ বস্তুত, ‘জেল থেকেই তিনি তাঁর অনুসারী ছাত্র নেতাদের গোপনে দিক-নির্দেশনা দিতেন।’ শুধু তাই নয়, তিনি ‘জেল থেকেই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা দিতেন।’ মুস্তাফা নূরউল ইসলাম বলেছেন :
১৯৫২ সালের একুশের আন্দোলনে তিনি জেলে বন্দি ছিলেন। কারাগারে থেকে নানাভাবে তিনি আন্দোলনের ব্যাপারে নির্দেশনা দিতেন। ফেব্রুয়ারি মাসের ঐ সময়টায় তাঁর স্বাস্থ্য খুব ভেঙে পড়ে, তাই তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়। তখন মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় একই ভবনে অবস্থিত ছিল। বঙ্গবন্ধু সে সময় ছাত্রনেতাদের সঙ্গে গভীর রাতে রাজনৈতিক বিষয় ও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি নিয়ে আলোচনা করতেন।
পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৯৫১ সালের ৩০শে আগস্ট থেকে ১৯৫২ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমানকে বেশ কয়েকবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ঐ সময় আইনজীবী, রাজনীতিবিদ, ছাত্রনেতা, চিকিৎসক, গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন, আত্মীয়-স্বজন অনেকেই তাঁর সঙ্গে দেখা করেছেন। ১৯৫১ সালের ১৩ই নভেম্বরের গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ঐদিন সকাল ৯টায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হলে তাঁর কয়েকজন পুরনো বন্ধু, আনোয়ারা বেগম এমএনএ, খয়রাত হোসেন এমএনএ, তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, আহমদ হোসাইন এবং প্রায় ৩০ জন মেডিকেল ছাত্র তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই ৩০শে নভেম্বর ১৯৫১ তারিখে সকাল ৯.১৫টায় শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক খালেক নেওয়াজ খান ও জনৈক নজরুল ইসলাম। তাঁরা ৯.১৫টা থেকে ৯.৪৫টা পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় আব্দুস সালাম খান নামক এক গোয়েন্দা সদস্য একটু দূরে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকলেও, তাঁরা কি বিষয়ে আলাপ করেন, তা শুনতে পাননি বলে ৩০শে নভেম্বর, ১৯৫১ তারিখের গোপন গোয়েন্দা রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন।
১৯৫২ সালের ২৫শে জানুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কেবিনে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সহ-সভাপতি আতাউর রহমান খান, আজিজ আহমদ; পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক অলি আহাদ; পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শামসুল হক চৌধুরী ও সহ-সভাপতি কাজী গোলাম মাহবুুব। তারা সমসাময়িক রাজনৈতিক বিষয়ে নানা আলাপ করেন। এভাবে হাসপাতালের কেবিন থেকে নিরাপত্তা-বন্দি শেখ মুজিবুর রহমান ‘পুলিশের নজরকে ফাঁকি দিয়ে তার রাজনৈতিক সহকর্মীদের সঙ্গে দেশের সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি আলোচনা এবং ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গে পরামর্শ প্রদান’ করেন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কারাগার থেকে চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে, সেখানে বসেই তিনি রাজনৈতিক কর্মকা- চালাতে থাকেন।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন ঢাকা সফরে এসে ১৯৫২ সালে ২৭শে জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর উক্তি পুনর্ব্যক্ত করে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে পূর্ববঙ্গের ছাত্র-জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা-বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ছাত্রনেতাদের আলোচনা হয়। তারা সিদ্ধান্ত নেন ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন এবং একুশে ফেব্রুয়ারি ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ পালনের। কেবল তাই নয়, ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে’র আহ্বায়ক যাতে ছাত্রলীগ থেকেই করা হয়, সে বিষয়েও শেখ মুজিবুর রহমান নির্দেশনা দেন। এ প্রসঙ্গে অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা এবং বিভিন্ন ভাষণে তিনি বিস্তারিতভাবে বলেছেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন : ‘আমি হাসপাতালে আছি। সন্ধ্যায় মোহাম্মদ তোয়াহা ও অলি আহাদ দেখা করতে আসে। আমার কেবিনের একটা জানালা ছিল ওয়ার্ডের দিকে। আমি ওদের রাত একটার পরে আসতে বললাম। আরও বললাম, খালেক নেওয়াজ, কাজী গোলাম মাহবুব আরও কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকে খবর দিতে। দরজার বাইরে আইবিরা পাহারা দিত। রাতে অনেকে ঘুমিয়ে পড়েছে। তখন পিছনের বারান্দায় ওরা পাঁচ-সাতজন এসেছে।… বারান্দায় বসে আলাপ হল এবং আমি বললাম, সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে। আওয়ামী লীগ নেতাদেরও খবর দিয়েছি। ছাত্রলীগই তখন ছাত্রদের মধ্যে একমাত্র জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান। ছাত্রলীগ নেতারা রাজি হল। অলি আহাদ ও তোয়াহা বলল, যুবলীগও রাজি হবে।… সেখানেই ঠিক হল, আগামী একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হবে এবং সভা করে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে হবে। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকেই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কনভেনর করতে হবে। ফেব্রুয়ারি থেকেই জনমত গঠন করতে হবে।’
কারাগারের রোজনামচায় তিনি আরও স্পষ্ট করে লিখেছেন : ‘জানুয়ারি মাসে আমাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়।… আমি তখন বন্দি অবস্থায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। রাত্রের অন্ধকারে মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের সহায়তায় নেতৃবৃন্দের সাথে পরামর্শ করে ২১শে ফেব্রুয়ারি প্রতিবাদের দিন স্থির করা হয়। আমি ১৬ই ফেব্রুয়ারি থেকে অনশন শুরু করব মুক্তির জন্য। কাজী গোলাম মাহবুব, অলি আহাদ, মোল্লা জালালউদ্দিন, মোহাম্মদ তোয়াহা, নাঈমুদ্দীন, খালেক নেওয়াজ, আজিজ আহম্মদ, আবদুল ওয়াদুদ ও আরো অনেকে গোপনে গভীর রাতে আমার সঙ্গে দেখা করত।’ ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন এবং পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি কাজী গোলাম মাহবুবের আহ্বায়ক নির্বাচিত হওয়া, সভায় গৃহীত প্রস্তাবে শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির শর্ত যুক্ত করা প্রভৃতি বিষয় পর্যালোচনা করলে এ বিবরণের বস্তুনিষ্ঠতা খুঁজে পাওয়া যায়। তাছাড়া ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে’ ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রাধান্য থেকেও এটা অনুধাবন করা যায়। ১৯৭৪ সালের ১৮ জানুয়ারি এক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন : ‘অনেকে ইতিহাস ভুল করে থাকেন। ১৯৫২ সালের আন্দোলনের তথা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস আপনাদের জানা দরকার। আমি তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বন্দী অবস্থায় চিকিৎসাধীন। সেখানেই আমরা স্থির করি যে, রাষ্ট্রভাষার ওপর ও আমার দেশের ওপর যে আঘাত হয়েছে ২১শে ফেব্রুয়ারি তারিখে তার মোকাবেলা করতে হবে। সেখানেই গোপন বৈঠকে সব স্থির হয়।’
বস্তুত, ‘জেল থেকেই তিনি তাঁর অনুসারী ছাত্র নেতাদের গোপনে দিক-নির্দেশনা দিতেন।’ শুধু তাই নয়, তিনি ‘জেল থেকেই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা দিতেন।’ এ প্রসঙ্গে ড. মুস্তাফা নূরউল ইসলাম বলেছেন : ‘১৯৫২ সালের একুশের আন্দোলনে তিনি জেলে বন্দি ছিলেন। কারাগারে থেকে নানাভাবে তিনি আন্দোলনের ব্যাপারে নির্দেশনা দিতেন। ফেব্রুয়ারি মাসের ঐ সময়টায় তাঁর স্বাস্থ্য খুব ভেঙে পড়ে, তাই তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়। তখন মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় একই ভবনে অবস্থিত ছিল। বঙ্গবন্ধু সে সময় ছাত্রনেতাদের সঙ্গে গভীর রাতে রাজনৈতিক বিষয় ও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি নিয়ে আলোচনা করতেন।’
লেখক : গবেষক-প্রাবন্ধিক, সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
[আগামী সংখ্যায় সমাপ্ত]

Category:

Leave a Reply