ভাষা-আন্দোলনে শেখ মুজিব

Posted on by 0 comment

PfcMড. এম আবদুল আলীম: (গত সংখ্যার পর)
ভাষা-আন্দোলনের কর্মপন্থা নির্ধারণে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এবং অন্য সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কারাবন্দি অবস্থায় শেখ মুজিবুর রহমানের আলাপ-আলোচনা ও দিক-নির্দেশনা প্রদানের বিষয়টি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত রয়েছে। বদরুদ্দীন উমর, মোহাম্মদ তোয়াহা, আবদুল মতিন, আহমদ রফিকসহ অনেকেই এর বিপক্ষে মত ব্যক্ত করেছেন। অন্যদিকে মহিউদ্দিন আহমেদ, অলি আহাদ, গাজীউল হক, কামরুজ্জামান, আবদুস সামাদ আজাদ, এম আর আখতার মুকুল, শেখ আব্দুল আজিজ, জিল্লুর রহমান, কে. জি. মুস্তাফা, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী প্রমুখ ভাষাসংগ্রামী এবং মযহারুল ইসলাম, আনিসুজ্জামান, হারুন-অর-রশিদ, মুনতাসীর মামুন, আবু আল সাঈদ, নূহ-উল-আলম প্রমুখ গবেষক এর পক্ষে জোরালো অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
বদরুদ্দীন উমর পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি গ্রন্থের তৃতীয় খ-ে নিরাপত্তাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের ’৫২-র ভাষা-আন্দোলনে ভূমিকার কথা অলি আহাদের বক্তব্য-সূত্রে পরোক্ষভাবে স্বীকার করলেও; পরবর্তীকালে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত লেখায় তা সরাসরি নাকচ করে দেন। এ প্রসঙ্গে তার বক্তব্য হলো : “শেখ মুজিব ফরিদপুর জেল থেকে মুক্তি লাভ করে ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, যে সময়ে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকারীদেরকে বিপুল সংখ্যায় গ্রেফতার করা হচ্ছে এবং ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’র অনেক সদস্য আত্মগোপন করে আছেন। এই পরিস্থিতিতে জেল থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি লাভ থেকেই প্রমাণিত হয় যে তৎকালীন ভাষা আন্দোলনে তারও কোন ভূমিকা ছিল না এবং আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে মুক্তি দেওয়াটা সরকার নিজেদের জন্য অসুবিধাজনক বা বিপজ্জনক কিছুই মনে করেনি।” বদরুদ্দীন উমরের এ বক্তব্য খ-িত। কারাগারে ছাত্রনেতারা যে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করে ভাষা-আন্দোলনে দিকনির্দেশনা নিয়েছিলেন, সে প্রসঙ্গ তিনি এড়িয়ে গেছেন। বঙ্গবন্ধুর মুক্তিদান প্রসঙ্গে তিনি যা বলেছেন, ১৯৫২ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি পরবর্তী ভাষা-আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি ও বাস্তবতার সঙ্গে তার মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনে জেলখানা থেকে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ছাত্রলীগ নেতাদের নির্দেশনা প্রদানের বিষয়ে বদরুদ্দীন উমরের বক্তব্যকে যুক্তি দ্বারা খ-ন করেছেন একুশের গান রচয়িতা আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। ’৫২-র ভাষা-আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনা প্রদান সম্পর্কে তিনি লিখেছেন : ‘ফেব্রুয়ারির আন্দোলনের আগে থেকেই শেখ মুজিব জেলে ছিলেন। তিনি তার চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী জেল থেকে তার অনুগত সেপাইদের মাধ্যমে ছাত্রলীগের ও আওয়ামী লীগের তরুণ নেতাদের কাছে গোপনে চিঠিপত্র পাঠিয়ে আতাউর রহমান-শামসুল হক গ্রুপের আন্দোলন-বিমুখতা সম্পর্কে সতর্ক করতে শুরু করেন এবং ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখে সরকার যদি ১৪৪ ধারা জারি করে, তাহলে আওয়ামী লীগ কমান্ডের নির্দেশ যাই হোক, ছাত্রলীগ নেতা ও কর্মীরা যাতে সাধারণ ছাত্রদের আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেয়, সেই পরামর্শ দিতে থাকেন। সরকারি গোয়েন্দারা যখন টের পেল যে, শেখ মুজিব জেলে বসে সরকারবিরোধী আন্দোলনে তার দল ও অনুসারীদের উৎসাহিত করছেন, তখন আকস্মিকভাবে তাকে ১৫ অথবা ১৬ তারিখে ফরিদপুর জেলে স্থানান্তর করা হয়।… ফরিদপুর জেলে বসেও তিনি চিরকুট পাঠান, যেটি একুশ তারিখে একটু দেরিতে ছাত্রলীগ নেতাদের হাতে পৌঁছে।’
বদরুদ্দীন উমরের প্রত্যেকটি মত বিভিন্ন যুক্তি দ্বারা খ-ন করে একুশের গান রচয়িতা আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী আরও লিখেছেন : ‘উমরকে বাহবা না দিয়ে পারা যায় না। বায়ান্ন সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ধারেকাছেও তিনি ছিলেন না।… একটি আন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত না থাকলে পদে পদে যে ভুল হয়, ১৪৪ ধারা সম্পর্কে উমরের বালখিল্য উক্তিই তার প্রমাণ।’
আবদুল মতিন এবং আহমদ রফিক নিরাপত্তাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের ’৫২-র ভাষা-আন্দোলনে যুক্ত থাকা এবং ছাত্রনেতাদের নির্দেশনা প্রদানের বিষয়টিকে ‘ইতিহাসের কল্পকাহিনী’ বলে অভিহিত করে লিখেছেন : ‘একুশের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা ছিল না। অথচ দীর্ঘকাল পর বৃথাই একুশের আন্দোলনে তার ভূমিকা নিয়ে ‘মিথ’ তৈরির চেষ্টা চলছে, ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যসিদ্ধির জন্য ইতিহাস বিকৃত করা হচ্ছে, সে চেষ্টা এখনো চলছে এবং এজন্য দায়ী কয়েকজন স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি। এতে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক মর্যাদা ক্ষুণœ হচ্ছে।’ আহমদ রফিক তার ভাষা আন্দোলন : ইতিহাস ও উত্তরপ্রভাব (২০১৭) গ্রন্থে আগের বক্তব্যেরই পুনরাবৃত্তি করে লিখেছেন : ‘দীর্ঘকাল পর বাহান্নর ভাষা আন্দোলনে তাঁর (বঙ্গবন্ধুর) ভূমিকা সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা সঠিক তথ্য-নির্ভর ইতিহাস নয়। কেউ বলেছেন ‘১৪৪ ধারা ভঙ্গের নির্দেশ তিনিই দিয়েছিলেন’ কেউ বলেন পরিষদ ভবন ঘেরাওয়ের পরিকল্পনা তারই, আবার কেউ দাবি করেছেন ‘আন্দোলনের কর্মসূচি তাঁর কাছ থেকেই এসেছে’। দাবিগুলো এমন ব্যক্তিদের কাছ থেকে এসেছে যারা কমবেশি আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন।’
আহমদ রফিক ও আবদুল মতিনের বক্তব্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাতে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই, আছে ঢালাও মন্তব্য। তাঁরা বলতে চেয়েছেন যে, ১৯৫২ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান কারামুক্ত হয়ে কেন অসুস্থ অবস্থায়ই ভাষা-আন্দোলনে যুক্ত হলেন না? তাঁদের দাবি ভাষা-আন্দোলন ‘তখনও চলছে’। এবং ২ মাস পর ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে’র সভায় শেখ মুজিবুর রহমান যে বক্তব্য দেন, তার ফলে তাঁরা ’৫২-র ভাষা-আন্দোলনে তাঁর যুক্ত না থাকার ‘ঘটনা সঠিক’ বলে মনে করেছেন এবং মন্তব্য করেছেন। তাদের এ বক্তব্য খ-ন করার যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ রয়েছে।
প্রথমত, তারা বলেছেন, শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি পান ২৬শে ফেব্রুয়ারি। কিন্তু এ তথ্য ঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে শেখ মুজিবুর রহমান ফরিদপুর কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২। ঐ সময়কার ইত্তেফাক, ইনসাফ প্রভৃতি পত্রিকায় তার মুক্তির সংবাদ ছাপা হয়। ১৯৫২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইনসাফ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘নিরাপত্তা বন্দী জনাব মুজিবর রহমানের মুক্তিলাভ’ শিরোনামের সংবাদে বলা হয় : ‘রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্র হইতে ঘোষণা করা হইয়াছে যে, বিখ্যাত নিরাপত্তা বন্দী জনাব মুজিবর রহমান খানকে [ভুলবশত খান বলা হয়েছে] গতকাল মুক্তি দান করা হইয়াছে।’ অর্থাৎ, শেখ মুজিব কারামুক্ত হন ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২। প্রকৃতপক্ষে, ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তো ভাষা-আন্দোলন চলমানই ছিল না, তাতে শেখ মুজিবুর রহমান যোগ দেবেন কী করে? ২৫ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সভায় ‘২৬.২.৫২ তারিখ থেকে সাধারণ ধর্মঘট প্রত্যাহার’ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সে অনুযায়ী ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকা ‘শহরের সর্বত্র স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু’ হয়।
দ্বিতীয়ত, ফরিদপুর কারাগারে থাকা অবস্থায় এবং কারামুক্ত হয়ে তিনি ভাষা-আন্দোলন সম্পর্কে নীরব ছিলেন না। সমসাময়িক পত্র-পত্রিকা ও শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং আনিসুজ্জামানের স্মৃতিকথা থেকে এ তথ্য জানা যায়। ঢাকায় গুলিচালনা ও ধরপাকড়ের সংবাদ শুনে শেখ মুজিবুর রহমান অতিশয় মর্মাহত হন এবং শহিদদের শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজনদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করে বিবৃতি দেন। একই সঙ্গে তিনি দ্রুত ঢাকায় ফিরে আসার অভিপ্রায়ও ব্যক্ত করেন এবং কিছুটা সুস্থ হয়ে তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন। ঢাকায় এসে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে জোরালো বক্তব্য তুলে ধরেন এবং কারাবন্দিদের মুক্তির দাবি করেন। তিনি করাচিতে গিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের সঙ্গে দেখা করে বন্দিদের মুক্তির দাবি জানান। এছাড়া হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকে দিয়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে বিবৃতি প্রদান করান। তিনি সংবাদ সম্মেলন করে পশ্চিম পাকিস্তানের সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদদের ভাষা-আন্দোলন সম্পর্কে বিভ্রান্তি দূর করেন।
পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা অলি আহাদ (পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগে যোগ দেন) ভাষা-আন্দোলনের দুই পর্বেই প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ হতো এবং ভাষা-আন্দোলন নিয়ে কথা-বার্তা চলত। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন : ‘শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫০ সালের ১লা জানুয়ারী হইতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক ছিলেন। চিকিৎসার কারণে সরকার তাঁহাকে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করেন। প্রহরী পুলিশের ইচ্ছাকৃত নির্লিপ্ততার সুযোগ গ্রহণ করিয়া আমরা তাঁহার সহিত হাসপাতালেই কয়েক দফা দেখা করি। তিনি ও নিরাপত্তা বন্দী মহিউদ্দিন আহমেদ ১৬ই ফেব্রুয়ারী হইতে মুক্তির দাবীতে অনশন ধর্মঘট করিবেন, সেই কথা শেখ সাহেবই আমাদিগকে জানাইয়াছিলেন।… ১৫ই ফেব্রুয়ারী ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার হইতে শেখ মুজিবর রহমানকে ফরিদপুর জেলা কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয় এবং এই ১৫ই ফেব্রুয়ারী ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার হইতে ফরিদপুর যাওয়ার পথে নারায়ণগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে নারায়ণগঞ্জ নেতৃবৃন্দের সহিত শেখ মুজিবুর রহমানের সাক্ষাৎ ঘটে।’
শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেখা হয়েছিল তখনকার মেডিকেল কলেজের শেষবর্ষের ছাত্র মির্জা মাজহারুল ইসলামের। তিনি শেখ মুজিবের পূর্বপরিচিত ছিলেন তাই হাসপাতালে একাধিকবার তার চিকিৎসার খোঁজখবর নেন। ঐ সময়কার স্মৃতিচারণ করে তিনি লিখেছেন : ‘১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধু নিরাপত্তা বন্দী অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। আমি তখন এই কলেজের শেষ বর্ষের ছাত্র। দোতলায় ৮ নম্বর ওয়ার্ড-সংলগ্ন একটি কেবিনে তিনি থাকেন। আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে চেষ্টা করলাম। রাউন্ড দেয়ার সময় প্রফেসরদের সঙ্গে আমরা যেতাম কিন্তু আমাদেরকে কেবিনে প্রবেশ করতে দিত না। আমি কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না, তবে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পূর্ব সম্পর্ক ছিল। কলকাতায় আমাদের মাঝে প্রথম পরিচয় হয়, পরে ঢাকা এসেও বহু বার দেখা হয়েছে। একদিন বঙ্গবন্ধু ‘এই মির্জা’ বলে আমাকে ডেকে তাঁর কেবিনের জানালার কাছে নিয়ে যান এবং ভাষা আন্দোলনের খোঁজখবর নেন। তিনি আমাকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন।’
তখনকার গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন ভাষাসংগ্রামী ও গবেষকের সাক্ষাৎকার ও স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, ‘ছাত্রনেতারা গোপনে তাঁর (বঙ্গবন্ধুর) সাথে দেখা করতেন। তাঁর মুক্তির জন্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বিবৃতি দেন। নাইমউদ্দীন, খালেক নেওয়াজ, অলি আহাদ ও মোহাম্মদ তোয়াহা দেখা করেন এবং তাঁরা ভাষা আন্দোলন বিষয়ে তাঁর সাথে পরামর্শ করতেন। সরকার তাঁকে হাসপাতালে বসে রাজনীতি করার অপরাধে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে এবং তাদের সুপারিশে তাঁকে অনেকটা সুস্থ বলে ঘোষণা দিয়ে আবার কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে থাকাকালে তিনি ও মহিউদ্দিন আহমেদ চিঠি দিয়ে সরকারকে জানান, ১৫ই ফেব্রুয়ারি মুক্তি না দিলে ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে তাঁরা অনশন ধর্মঘট শুরু করবেন।’
এভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এক পক্ষ বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা পুরোপুরি খারিজ করে দিয়ে বাহ্বা নিতে চেয়েছেন; অন্য পক্ষ ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে সকল কৃতিত্ব তার কাঁধে তুলে দিতে চেয়েছেন। সম্প্রতি শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং তাঁর সম্পর্কে প্রণীত পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনসমূহ প্রকাশের পর ভাষা-আন্দোলনে তার ভূমিকা কী ছিল, তা দিবালোকের মতো সত্য বলে প্রতিভাত হয়েছে। বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময় কারাগারে বন্দি অবস্থায় ছাত্রনেতাদের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের যোগাযোগ হয়েছে, সরাসরি কথা হয়েছে এবং তিনি আন্দোলন সম্পর্কে দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। এবং সে নির্দেশনা দিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ও ফরিদপুর কারাগারে স্থানান্তরের পথেÑ নারায়ণগঞ্জে।
তাছাড়া কারাগার থেকে চিঠির মাধ্যমে, টেলিগ্রামের মাধ্যমে ফরিদপুর কারাগারে স্থানান্তরের পথে নারায়ণগঞ্জে এবং চিরকুট পাঠিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান ’৫২-র ভাষা-আন্দোলনে ছাত্রনেতাদের নির্দেশনা দিয়েছেন এটিও সত্য। ভাষা-আন্দোলনে তিনি ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন, এটা ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত তার রাজনৈতিক কর্মকা-, বক্তৃতা-বিবৃতি ও সমকালীন পত্র-পত্রিকার সংবাদ পর্যালোচনা করলেই প্রমাণিত হয়।
কারাগারে বসে তিনি এবং মহিউদ্দীন আহমদ ১৯৫২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে অনশন ধর্মঘট শুরু করলে ভাষা-আন্দোলনে কর্মসূচিতে আসে উৎসাহ ও প্রেরণা। তাদের মুক্তির দাবি যুক্ত হয়ে ভাষা-আন্দোলনের কর্মসূচি ভিন্নমাত্রা পায়। ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠনের সভায় যেসব প্রস্তাব গৃহীত হয় তাতে শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবি যুক্ত ছিল। ১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক ছাত্রসভা হয়। ঐদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ মুজিব ও মহিউদ্দিনসহ সকল রাজবন্দির মুক্তি দারি করে পোস্টারও দেওয়া হয়। ২০ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার এক গোপন প্রতিবেদনে বলা হয় : “উরফ ুড়হধষ ফঁঃু রহ ঃযব ঝঁঃৎধঢ়ঁৎ চ. ঝ. ধৎবধ রিঃয ড/ঈ গফ. ণধংঁভ ড়হ ১৯.২.১৯৫২ ধহফ ঃযরং সড়ৎহরহম (২০.২.৫২) ধ ইবহমধষর ষবধভষবঃ ঁহফবৎ যবধফরহম “ঐঁহমবৎ ঝঃৎরশব ড়ভ ঝযবরশয গঁলরনধৎ জধযসধহ” ধহফ গধযরঁফফরহ ধিং ভড়ঁহফ ঃড় নব ফরংঃৎরনঁঃবফ ধঃ ফবভভবৎবহঃ ঢ়ষধপবং ড়ভ উধপপধ ঈরঃু.” এছাড়া তাদের মুক্তির জন্য পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক সভায় আবেদন করা হয়।
সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় : ‘পাকিস্তান সংগ্রামের জঙ্গী কর্মী, ছাত্র-যুব আন্দোলনের অগ্রনায়ক ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের বিনা বিচারে দীর্ঘ কারাবাস ও বন্ধ দিনগুলির নিষ্ঠুর নিষ্পেষণে জীর্ণ স্বাস্থ্যের জন্য উৎকণ্ঠার ও ঐক্যবদ্ধ আওয়াজ তুলিয়া প্রদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই প্রদেশের সকল রাজনৈতিক কর্মীÑ বিশেষ করিয়া শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিনের আশু মুক্তির প্রশ্নে পূর্ববঙ্গ পরিষদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে এক আবেদনপত্র পেশ করিয়াছেন। স্বাক্ষরকারীগণ বলেনÑ সর্বশক্তি নিয়োজিত করিয়া আপনারা পাকিস্তানে আইন ও নীতির শাসন, সৌভ্রাতৃত্ব ও গণতন্ত্র কায়েম করুন।… আসুন আসুন, আপনারা পরিষদের ভিতরে আর আমরা বাহিরে পূর্ববঙ্গের রাজবন্দীদের বিশেষ করিয়া শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিনের মুক্তির দাবিতে আওয়াজ তুলি।’ কেবল রাজপথ এবং সভা-সমাবেশে নয়, বঙ্গীয় আইন পরিষদেও শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবি তোলা হয়। তার ‘অনশন পালন বিষয়ে আলোচনার জন্য পূর্ব পাকিস্তান এ্যাসেম্বিলিতে আনোয়ারা খাতুন এমএলএ মুলতবি প্রস্তাব পর্যন্ত উত্থাপন করেছিলেন।’
মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ‘মানবতার নামে’ শীর্ষক এক পৃথক বিবৃতিতে শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিন আহমদের মুক্তির দাবি জানান। রাজবন্দিদের অনশন ধর্মঘট সম্পর্কে ঐ বিবৃতিতে তিনি বলেন : ‘আমি জানিতে পারিয়াছি য়ে, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি হইতে নিরাপত্তা বন্দি শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিন আহমেদ আনশন ধর্মঘট শুরু করিয়াছেন। জনসাধারণ অবগত আছেন যে, শেখ মুজিবুর রহমান দীর্ঘদিন হইতে মারাত্মক রোগে ভুগিতে ছিলেন এবং কিছুদিন পূর্বে চিকিৎসার জন্য তাঁহাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও স্থানান্তরিত করা হইয়াছিল। কিন্তু তাঁহাকে রোগ মুক্তির পূর্বেই আবার জেলে প্রেরণ করা হয়। মহিউদ্দিনের স্বাস্থ্যও দ্রুত অবনতির দিকে যাইতেছে। এমতাবস্থায় আমরা সহজেই বুঝিতে পারিতেছি যে, এই অনশন ধর্মঘট তাঁহাদের ভগ্ন স্বাস্থ্যের পরিণতি ঘটাইবে। তাঁহাদিগকে আটক রাখার সম্বন্ধে কর্তৃপক্ষের অনমনীয় মনোভাব দেখিয়া আমি অত্যন্ত মর্মাহত হইয়াছি। আমি মানবতার নামে সরকারের নিকট এই আবেদন করিতেছি যে তাঁহারা মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিনকে মুক্তিদান করেন।’
২৭ ফেব্রুয়ারি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে অত্যন্ত অসুস্থ শরীরেও তিনি গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ থেকেই একুশে ফেব্রুয়ারির গুলিবর্ষণে প্রাণহানির ঘটনায় মর্মাহত হয়ে বিবৃতি পাঠান এবং শহিদদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। এরপর কিছুটা সুস্থ হয়ে ঢাকায় ফিরে এসে নিরাপত্তা-বন্দিদের মুক্তি দাবিতে বিবৃতি দেন। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়ে তিনি একটি সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেন এবং বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। এ প্রসঙ্গে অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন : “আমি সাধারণ সম্পাদক হয়েই একটা প্রেস কনফারেন্স করলাম। তাতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে হবে, রাজবন্দিদের মুক্তি দিতে হবে এবং যাঁরা ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ হয়েছেন তাঁদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দান এবং যারা অন্যায়ভাবে জুলুম করেছে তাদের শাস্তির দাবি করলাম। সরকার যে বলেছেন, বিদেশী কোন রাষ্ট্রের উস্কানিতে এই আন্দোলন হয়েছে, তার প্রমাণ চাইলাম। ‘হিন্দু ছাত্ররা’ কলকাতা থেকে এসে পায়জামা পরে আন্দোলন করেছে, একথা বলতেও কৃপণতা করে নাই মুসলিম লীগ নেতারা। তাদের কাছে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ছাত্রসহ পাঁচ ছয়জন লোক মারা গেল গুলি খেয়ে, তারা সকলেই মুসলমান কি না? যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের মধ্যে শতকরা নিরানব্বইজন মুসলমান কি না? এত ছাত্র কলকাতা থেকে এল, একজনকেও ধরতে পারল না যে সরকার, সে সরকারের গদিতে থাকার অধিকার নেই।”
১৯৫২ সালের ২৭ এপ্রিল ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর উদ্যোগে এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্য নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা করেন। ‘জনাব মুজিবুর রহমান তার বক্তৃতায় সরকারের স্বরূপ উদঘাটন করেন। তিনি বলেন জনসাধারণের ন্যায্য দাবী আন্দোলনকে সরকার রাষ্ট্রের ও এজেন্টদের বলে অভিহিত করেছেন। তিনি আরও চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেন : এরাও দুশমনের উপর গণআন্দোলন সৃষ্টি করেছেন। আমার বিশ্বাস শত শত মানুষ আমাদের অনুসরণ করিতেছেন। তার মতে রাষ্ট্রে এর চেয়ে আর কোন আইন থাকতে পারে না।’
১৯৫২ সালের জুন মাসে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়ে ভাষা-আন্দোলনের পক্ষে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সমর্থন আদায় করেন এবং বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তাকে দিয়ে একটি বিবৃতি প্রদান করান। বিবৃতিটি ১৯৫২ সালের ২৯শে জুন সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে শেখ মুজিব লিখেছেন : “একটা অনুরোধ করলাম, তাঁকে লিখে দিতে হবে যে, উর্দু ও বাংলা দুইটাকেই রাষ্ট্রভাষা হিসাবে তিনি সমর্থন করেন। কারণ অনেক ভুল বোঝাবুঝি হয়ে গেছে। মুসলিম লীগ এবং তথাকথিত প্রগতিবাদীরা প্রপাগা-া করছেন তাঁর বিরুদ্ধে। তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই লিখে দেব, এটা তো আমার নীতি ও বিশ্বাস।’ তিনি লিখে দিলেন।” করাচিতে গিয়ে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সাংবাদিক ও বিশিষ্টজনদের সঙ্গে দেখা করেন এবং সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে ভাষা-আন্দোলনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। ভাষা-আন্দোলন নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানিদের মধ্যে যে বিভ্রান্তি ছিল, শেখ মুজিবুর রহমানের সাংবাদিক সম্মেলনের পর তা দূর হয়। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি বলেছেন : ‘খাজা সাহেব ও লাহোরের শহীদ সাহেবের ভক্তরা প্রেস কনফারেন্সের আয়োজন করলেন।… প্রেস কনফারেন্সে সমস্ত দৈনিক কাগজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এমনকি এপি’র প্রতিনিধিও উপস্থিত ছিলেন। আমার বক্তব্য পেশ করার পরে আমাকে প্রশ্ন করতে শুরু করলেন, আমি তাঁদের প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পেরেছিলাম। আমরা যে উর্দু ও বাংলা দু’টাই রাষ্ট্রভাষা চাই, এ ধারণা তাঁদের ছিল না। তাঁদের বলা হয়েছে, শুধু বাংলাকেই রাষ্ট্রভাষা করার দাবি করছি আমরা।’
ঢাকায় ফিরে শেখ মুজিবুর রহমান আরেকটি সাংবাদিক সম্মেলন করে পাকিস্তান সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। এ প্রসঙ্গে সাপ্তাহিক সৈনিক পত্রিকার এক সংবাদে বলা হয় : ‘জনাব রহমান [শেখ মুজিবুর রহমান] প্রকাশ করেন যে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সম্পর্কে পশ্চিম পাকিস্তানে যথেষ্ট ভুল ধারণার সৃষ্টি করা হইয়াছিল, কিন্তু সমস্ত খুলিয়া বলিবার পর সে ভ্রান্তি তাহাদের দূর হইয়াছে। তিনি বলেন, পাশ্চিম পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীরা আজ আর বাংলার দাবীকে অন্যায় মনে করে না। তাহাদের অধিকাংশই আজ অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার দাবীকে সমর্থন করেন। জিন্না আওয়ামী লীগের মামদোতের খান, মানকীর পীর প্রভৃতি নেতৃবৃন্দ বাংলার দাবীর প্রতি কিরূপ মনোভাব পোষণ করেন তাহা জিজ্ঞাসা করা হইলে জনাব রহমান বলেন তাহা আমি বলিতে পারিনা।’
১৯৫২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শেখ মুজিবুর রহমান শান্তি সম্মেলনে যোগদানের জন্য চীন সফরে যান। সেখানে গিয়ে তিনি ‘মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করেছিলেন।’ এতে বাংলা ভাষার প্রতি তার গভীর ভালোবাসা যেমন প্রকাশিত হয়, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়। ঐ সম্মেলনে যারা যোগদান করেছিলেন তাদের অন্যতম ছিলেন ভারতের মনোজ বসু। চীনের শান্তি সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষায় বক্তৃতা প্রদান প্রসঙ্গ এবং বাংলা ভাষার জন্য বাঙালির আত্মত্যাগের মহিমা উচ্চে তুলে ধরে পরবর্তীকালে স্মৃতিচারণ করে তিনি লিখেছেন : ‘মুজিবুর রহমানের বক্তৃতা হলো মাঝে আরও কতকগুলো হয়ে যাবার পর।… ছিয়াশি জন বক্তার মধ্যে বাংলায় মোট দু’জনÑ পাকিস্তানের শেখ মুজিবুর রহমান আর ভারতের এই অধম।’ চীন সফরের সেই স্মৃতি স্মরণ করে অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন : “পূর্ব পাকিস্তান থেকে আতাউর রহমান খান ও আমি বক্তৃতা করলাম। আমি বাংলায় বক্তৃতা করলাম।… কেন বাংলায় বক্তৃতা করব না? ভারত থেকে মনোজ বসু বাংলায় বক্তৃতা করলেন। পূর্ব বাংলার ছাত্ররা জীবন দিয়েছে মাতৃভাষার জন্য। বাংলা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু লোকের ভাষা।… আমি ইংরেজিতে বক্তৃতা করতে পারি। তবু আমার মাতৃভাষায় বলা কর্তব্য। আমার বক্তৃতার পরে মনোজ বসু ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘ভাই মুজিব, আজ আমরা দুই দেশের লোক, কিন্তু আমাদের ভাষাকে ভাগ করতে কেউ পারে নাই। আর পারবেও না। তোমরা বাংলা ভাষাকে জাতীয় মর্যাদা দিতে যে ত্যাগ স্বীকার করেছে আমরা বাংলা ভাষাভাষী ভারতবর্ষের লোকেরাও তার জন্য গর্ব অনুভব করি।”
১৯৫২ সালের ২০ নভেম্বর আরমানিটোলা ময়দানে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের উদ্যোগে বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে আয়োজিত ঐ জনসভায় বক্তৃতা করেন আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান, ছাত্রলীগ নেতা কামারুজ্জামান, দেওয়ান মাহবুব আলী, ইব্রাহিম ত্বাহা, সুলেমান খান, আশরাফ ফারুকী, মুহম্মদ এমাদুল্লাহ, গাজীউল হক প্রমুখ। ১৯৫৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বিকেলে আরমানিটোলা মাঠে আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে আরও একটি জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বন্দিদের মুক্তি ও বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে শেখ মুজিবুর রহমান বক্তৃতা করেন। দৈনিক আজাদ পত্রিকা থেকে জানা যায় : ‘গতকল্য (শুক্রবার) অপরাহ্ণে আরমানীটোলা ময়দানে পূর্ব্ব পাকিস্তান সর্ব্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্ম্মপরিষদের উদ্যোগে “বন্দীমুক্তি দিবস” উপলক্ষে এক বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতিত্ব করেন পূর্ব্ব পাকিস্তান আওয়ামী মোছলেম লীগের সহঃ সভাপতি জনাব আতাউর রহমান। সভায় বক্তৃতা প্রসঙ্গে প্রাদেশিক আওয়ামী মোছলেম লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, গত ভাষা আন্দোলনে যাহারা অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন সরকার তাঁহাদের সকলকে বিনা বিচারে জেলে আটক রাকিয়াছেন।… সর্ব্বশেষে সভায় গৃহীত একটি প্রস্তাবে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে এবং অন্যান্য কারণে বিনা বিচারে আটক সকল রাজনৈতিক বন্দীর অবিলম্বে বিনা শর্তে মুক্তি দাবী করা হয়। অপর একটি প্রস্তাবে বিনা বিচারে আটক মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং অন্যান্য রাজবন্দীর স্বাস্থ্য ভাঙ্গিয়া পড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ এবং সরকারের জেলনীতির তীব্র নিন্দা করা হয়। আর একটি প্রস্তাবে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবী জানান হয়।’
১৯৫৩ সালের শুরু থেকেই শেখ মুজিবুর রহমান বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তোলেন এবং উর্দুকে বয়কট করার ব্যাপারে সোচ্চার হন। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ১৯৫৩ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি ‘ঢাকার এক জনসভায় তিনি ঘোষণা করেন, এ দেশ জুড়ে উর্দু বয়কট করার জন্য আন্দোলন শুরু করা হবে।’ এ বছর ৫ ফেব্রুয়ারি বগুড়ার একটি জনসভায়ও তিনি একই সুরে কথা বলেন। এ প্রসঙ্গে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে : ‘বক্তৃতার সময় শেখ মুজিব বলেন, বাংলাকে পাকিস্তানের একটি রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। এখানকার স্কুল-কলেজে নূরুল আমীন সরকার উর্দু চালু করেছেন, কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তান তার স্কুল-কলেজে বাংলা চালু করেনি। তারা যদি বাংলাকে না মেনে নেয়, তাহলে কয়েকমাস পর আমরাও উর্দুকে বয়কট করব।’
ভাষা-আন্দোলনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ১৯৫৩ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারি ‘শহিদ দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য এবং আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানও ২১শে ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবস পালনের আহ্বান জানান। ঐদিন ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ঢাকার সর্বস্তরের মানুষ প্রভাতফেরি, শোভাযাত্রা, শহিদদের কবর জিয়ারত এবং আলোচনা-সভার আয়োজন করে। এতে নেতৃত্ব দেন আওয়ামী মুসলিম লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান, আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আতাউর রহমান খান, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি কাজী গোলাম মাহবুব এবং ছাত্রলীগ নেতা এম এ ওয়াদুদসহ অনেকে। ভাষা আন্দোলনের বর্ষপূর্তির সংবাদ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হয়। ঢাকা প্রকাশ-এ শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তৃতা প্রসঙ্গে বলা হয় : “আওয়ামী লীগের অস্থায়ী সেক্রেটারী জনাব মুজিবুর রহমান সভায় বক্তৃতা প্রসঙ্গে বলেন যে, গত বৎসর ঠিক এমন দিনে পূর্ব্ব পাকিস্তানের সাড়ে চার কোটি অধিবাসীর ভাষা বাংলাকে আজাদ পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করিবার দাবীতে ঢাকা শহরে ছাত্র ও জনসাধারণ নির্ভীকভাবে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়াছে। তাহারা সেই দিন যে নতুন ইতিহাস রচনা করিয়াছে, সমগ্র জাতি তাহা চিরদিন শ্রদ্ধার সহিত স্মরণ করিবে। ২১শে ফেব্রুয়ারীকে তিনি ‘জাতীয় কারবালা দিবস’ বলিয়া অভিহিত করেন। তিনি বলেন যে, আজ পাকিস্তান সরকারের সম্মুখে শুধুমাত্র দুইটি পথ খোলা রহিয়াছে। হয় তাঁহারা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বলিয়া মানিয়া লইবেন, নতুবা গদি ছাড়িবেন। তিনি সকল রাজবন্দীর আশু মুক্তি এবং নিরাপত্তা আইন প্রত্যাহার করিবার জন্যও দাবী জানান।” শেখ মুজিবুর রহমান তার বক্তৃতায় বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মর্যাদা দানের দাবি তোলেন। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তৃতা সম্পর্কে বলা হয় : “দায়ী ব্যক্তি (শেখ মুজিবুর রহমান) ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন’-এ বিশেষ নেতৃত্বের ভূমিকায় অংশগ্রহণ করেন। ২১.২.৫৩ তারিখে ঢাকার একটি জনসভায় তিনি ঘোষণা করেন যে, পূর্ববাংলার ‘উর্দু’ বয়কট করার জন্য প্রদেশব্যাপী দাবি বা আন্দোলন দিবস পালন করা হবে। ২১.২.৫৩ তারিখ ‘শহীদ দিবস’ উপলক্ষে তিনি ঢাকায় একটি মিছিলে নেতৃত্ব দেন।” ঐ দিনের বক্তৃতায় ‘যতদিন বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা না পাবে, ততদিন আন্দোলন চালিয়ে যাবার জন্য সবার প্রতি তিনি আহ্বান জানান।’
২১শে ফেব্রুয়ারির বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে গাজীউল হক গেয়েছিলেন তার গান : ‘ভুলব না, ভুলব নাÑ একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না!’ বঙ্গবন্ধুর অনুরোধেই তিনি গানটি ঐ অনুষ্ঠানে গেয়েছিলেন। এ সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করে গাজীউল হক লিখেছেন : ‘সভায় জনাব শেখ মুজিবুর রহমান-এর অনুরোধে ভাষা আন্দোলনের ওপর লেখা আমার গানটি আমাকে গেয়ে শোনাতে হয়। এখানে বলা প্রয়োজন, ১৯৫৩-৫৪-৫৫ সালে যে গানটি গেয়ে প্রভাতফেরি করা হতো সে গানটি লিখেছিলাম আমি। গানটির প্রথম লাইন ছিল, ‘ভুলব না, ভুলব নাÑ একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না!’ সময়ের প্রয়োজনে এ গানটি লিখেছিলাম।’
১৯৫৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদ পত্রিকায় রাজবন্দিদের মুক্তির দাবি-সম্বলিত শেখ মুজিবুর রহমানের একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়। ১১ মার্চ ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে’র উদ্যোগে ঢাকার বার লাইব্রেরি হলে যে আলোচনা-সভা অনুষ্ঠিত হয় তাতেও বক্তৃতা করেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১২ মার্চ দৈনিক আজাদ-এ ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা দাবী’ শীর্ষক সংবাদে বলা হয় : ‘গতকল্য (বুধবার) শহরের বিভিন্ন ছাত্রপ্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান কর্ত্তৃক রাষ্ট্রভাষা দিবস পালিত হয়। এই উপলক্ষে গতকল্য সর্ব্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্ম্মপরিষদের পক্ষ হইতে ছাত্র জনসাধারণের নিকট ব্যাজ বিক্রয় করা হয় এবং সন্ধ্যায় বার লাইব্রেরী হলে এক আলোচনা-সভা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জনাব আতাউর রহমান। সভায় অধ্যাপক আবুল কাসেম, পূর্ব্ব পাকিস্তান কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্য আবদুল মতিন, আওয়ামী লীগের জমিরুদ্দীন আহম্মদ, গণতন্ত্রী দলের মাহমুদ আলী, প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখ ব্যক্তি বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার দাবীতে বক্তৃতা করেন।’
এভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভাষা-আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান অসামান্য। মূলত, ভাষা-আন্দোলনের মাধ্যমেই ঢাকার রাজনীতিতে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রত্যক্ষ সংযোগ স্থাপিত হয়। এই আন্দোলনের মাধ্যমে জাগ্রত জাতীয়তাবাদী চেতনা লালন এবং বাস্তবায়নে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৮ থেকে শুরু করে স্বাধিকার ও মুক্তিসংগ্রামের দিনগুলোতে এবং স্বাধীন বাংলাদেশ ও জাতিসংঘে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু যে অবদান রেখেছেন, তার ফলে ইতিহাস তাঁকে স্মরণীয় করে রাখবে।

লেখক : গবেষক-প্রাবন্ধিক, সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

Category:

Leave a Reply