মধুমতীর চাঁদ

Posted on by 0 comment

28রেজা ঘটক : সীমান্তপুর গ্রামে ইজ্জৎ আলী চেয়ারম্যানের উঠোনে বিচার দেখতে আসা উৎসুক জনতার মতো, গোধূলি না যেতেই উঁকি দিল শুক্লপক্ষের ত্রয়োদশী চাঁদ। পল্লী বিদ্যুৎ না পৌঁছালেও অমন ধবধবে জ্যোৎ¯œায়, খোলা আকাশের তলায় মাটির বিছানায়, আসন নিতে কারও কোনও অসুবিধা হলো না। দু’একজনের সঙ্গে থাকা হ্যারিকেনের ঢিবঢিবানি আলোগুলোও যে যার সুবিধামতো নিভিয়ে ফেললেন। মৃদু শোরগোলের মধ্যে একমাত্র হাতল ভাঙা চেয়ারটাতে সীমান্তপুরের টানা ৩৫ বছরের নির্বাচিত চেয়ারম্যান ইজ্জৎ আলীও নিজের আসনে বসলেন। মুহূর্তে পাশের চারপায়া নড়বড়ে বেঞ্চিটাও গায়েগায়ে ভরে গেল।
চাঁন্দুর বাপ কই? ইজ্জৎ আলীর স্বভাবসুলভ গলা। শোরগোলটা একটু থেমে আবার যেন বাড়ল। একেবারে পেছনের সারি থেকে টুপি মাথায় গামছা গায়ে বকের মতো কুজো বয়স্ক যে লোকটা বিলি কেটে কয়েক ধাপ সামনে গিয়ে বসতে উদ্যত, সেই কি চাঁন্দুর বাপ? উপস্থিত সবাই যে লোকটিকে অনেকদিন থেকে গভীরভাবে চেনেন, নতুন করে আবার সবাই সেই লোকটিকে সার্কাসের সঙের মতো এক নজর দেখলেন। যেন ভীন গ্রহের কোনও রহস্যমানব শশীতলে পদার্পণ করতে গিয়ে ভুলবশত এইমাত্র স্বয়ং পৃথিবীপৃষ্ঠেই অবতরণ করলেন। কেউ কেউ বললেনÑ আরও সামনে যান। বেঞ্চিতে বসা টর্চলাইট হাতে গোঁফওয়ালা লোকটি সেই ফাঁকে চেয়ারম্যান সাহেবের কানে কানে জরুরি কথাগুলো ফিসফিস করে কানিমুখী করলেন। ৭৫ বছর বয়সেও ইজ্জৎ আলী চেয়ারম্যানের ধৈর্যশক্তিটা মাশাল্লা ভালোই। কথা শেষ করে গোঁফ বাঁকিয়ে হাতের টর্চলাইটটা বাম কাঁধে ঝুলিয়ে লোকটা আবার আগের মতো পেছনের বেঞ্চিতে গাদাগাদি করে বসলেন। চেয়ারম্যান সাহেব এবার কিছুটা ধমকের সুরে প্রশ্ন করলেনÑ চাঁন্দুরে ডাকো? ওপাশ থেকে ক্ষীণকণ্ঠে জবাব এলোÑ হেয় তো বাড়িত নাইকা। ভাইগ্যা গ্যাছে। এই ফাঁকে কেউ কেউ উপচেপড়া ভিড়ের মধ্যে দরকারি কাঁশি কাঁশল, কেউ গলা থেকে কফ খসাল, কেউ আবার আরামছে বিচি চুলকাতে গিয়ে কি খুব গোপনে একটা আকামও করল? ওপাশের অনেকের মধ্যে জায়গা ছেড়ে উঠে যাওয়ার লক্ষণ কি সেই গন্ধময় গোপন বায়ুকর্ম?
জনতার শোরগোল থেকে জবাব শুনে সিংহের মতো গর্জন করে উঠলেন ইজ্জৎ আলী চেয়ারম্যান। কোথায় গ্যাছে? সবাই একদম চুপ। একটু আগের ঝিরঝির গুঞ্জনটাও যেন ভাষা হারিয়ে ক্ষণিকের জন্য নির্বাক হয়ে গেল। চেয়ারম্যান সাহেবের কলেজ পড়–য়া নাতনি লাইলীরে নিয়ে দিনদুপুরে চাঁন্দু যে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে সীমান্তপুর থেকে ওভাবে পালাতে পারে তা কে জানত? তা ছাড়া ভালো ছাত্র হিসেবে চাঁন্দুর চারদিকে যেরকম নাম-ডাক, সেই ছেলের বইয়ের চেয়েও অন্য কিছুর প্রতি অমন আসক্তি থাকতে পারে, তা আগে থেকে কেউ জানলে তো? বরং তিন মাস আগে নানা বাড়িতে বেড়াতে এসে নানা-নানীর অতি উৎসাহে, নানার প্রতিষ্ঠিত কলেজে লাইলীর ওভাবে ভর্তি হওয়াতে কলেজের মাস্টাররা পর্যন্ত চমকে গিয়েছিলেন। শান্ত লক্ষ্মী মেয়ে লাইলী। অনেকটা অপরিচিত চাঁন্দুর সাথে এত অল্প সময়ে কী করে তেপান্তর হওয়ার মতো ভাব হতে পারে, সেটাই সবার কাছে একটা বিশাল রহস্য।
নীরবতা ভাঙল ঠকঠক করে হেঁটে আসা একজোড়া খড়ম। খড়মের উৎস যে সীমান্তপুর গ্রামের গত ২৫ বছরের মেহবান, রোগ-ব্যাধির দুর্যোগকালে বিনা ফি’তে রোগী দেখা, সারাক্ষণ নির্লিপ্ত থাকা জানু কবিরাজ, সে বিষয়ে কারোরই কোনো সন্দেহ নেই। অমন খড়ম দশ গাঁয়ে আর কারও থাকলে তো? একেবারে চাঁন্দুর বাপ যেখানটায় বসা, ঠিক তার পেছনে গিয়ে কবিরাজ নীরবে দাঁড়ান। কেউ একজন একটা টুল এনে দেয় তাকে বসতে। বসার সুযোগ পেয়েই সবচেয়ে কম কথা বলায় অভ্যস্ত এতদিনের পরিচিত জানু কবিরাজের মুখে কোথা থেকে এলো আজ টগবগে খৈয়ের মতো এত গরম গরম শব্দ? বাক্যের পর বাক্য? নির্মেদ সত্য সব বুলি, যেন ঢেউয়ের পর ঢেউ তুলে বাক্যের বন্যা বইছে। বিচার চাই, চেয়ারম্যান ছাব। আমার নিরুদ্দেশ বেটির সন্ধান চাই। কেউ কেউ এই সুযোগে ফিসফিস করে উঠল। কিসের মধ্যে কি পান্তা ভাতে ঘি। একটা অজানা রহস্যময় বাক্যালাপ উপস্থিত সকলকে যেন সেই মুহূর্তে কিছুটা হলেও ব্যস্ত করে তুলল।
জানু কবিরাজ চিরকুমার। যাযাবর। সুন্দরবনের কাছাকাছি এখন যেখানে মংলা বন্দর। তার ওপারে বাজুয়া বাজারের কাছে জানু কবিরাজের পূর্ব পুরুষদের বসবাস। এমনটিই শুনেছে সবাই। গ্রাম-শহর-নগর-বন্দরে ছিন্নমূল মানুষের মতো ঘুরে ঘুরে কবিরাজি বিদ্যায় হাত পাকিয়ে বাকেরগঞ্জ থেকে কলকাতা পর্যন্ত সুনাম যার, সেই জানু কবিরাজের একটা কন্যা আছে, যে কিনা আবার নিরুদ্দেশ, কী কারণে নিরুদ্দেশ, কাদের বিচার চায়-কবিরাজ? জানু কবিরাজকে অমন ক্ষুব্ধ আর উত্তেজিত হতে আগে কেউ কখনও দেখেছেন?
ইজ্জৎ আলী চেয়ারম্যান জানু কবিরাজকে বন্ধুর মতো ভালোবাসেন। নিজেই উদ্যোগী হয়ে পুরান বাড়ির কাচারি ঘরে জানু কবিরাজকে স্থায়ীভাবে থাকার বন্দোবস্ত করে দিয়েছেন। কোনও বিষয়ে কখনও কোনও পরামর্শ লাগলে কবিরাজই বলতে গেলে গত দুই যুগ ধরে চেয়ারম্যানের একমাত্র ভরসা। সেই কবিরাজ আজ কেন অমন রুদ্রভাবে ফুঁসে উঠলেন? এমন একটা ভাবনা কিছুক্ষণের জন্য বুঝিবা ইজ্জৎ আলী চেয়ারম্যানকেও পেয়ে বসে। তবে কি জানু করিরাজ হিমাদ্রী বাবুর হারিয়ে যাওয়া সেই মেয়ের কথাই বলছেন? সে গল্প তো কবিরাজ হাজারবার শুনিয়েছেন। যুদ্ধের সময়কার সেই রাতের গল্প। সেই গল্পের সাথে চাঁন্দু-লাইলীর উধাও হওয়ার সঙ্গে সম্পর্ক কোথায়? ইজ্জৎ আলী চেয়ারম্যান চিন্তা করেও কবিরাজের বিচার চাওয়ার প্রসঙ্গে কূলকিনারা পায় না।
তা ছাড়া কবিরাজের মুখে হিমাদ্রী শেখর মাস্টারের মেয়ে হারানোর গল্পটা যতবারই তিনি শুনেছেন, ততবারই ঘটনার সঙ্গে মাত্র একজন লোকেরই নাম বলেছেন কবিরাজ। অম্বরেশ বাবু। সেই রাতে অম্বরেশ বাবুর দোকানে তারা দু’জন, কবিরাজ আর তপু জলপানের সঙ্গে কিছু নাস্তাও খেয়েছিলেন। তারপর তারা পায়ে হেঁটে খেয়াঘাট পর্যন্ত গিয়েছিল। মধুমতীর ওপারেই সাঁচিয়া বাজারের কাছে হিমাদ্রী বাবুর শ্বশুরবাড়ি। তপু কবিরাজকে নিয়ে মামা বাড়িতে রাতটুকু থেকে পরদিনই বাবা হিমাদ্রী শেখরের চিতা দর্শনে যাবে। কলকাতায় বিয়ে হওয়ার পর ওই রাতে প্রথম সে কবিরাজের সঙ্গেই জন্মস্থানে ফিরছিল। উদ্দেশ্যটি পরিষ্কারÑ বাবার চিতা দর্শন। আর ওরকম মহৎ একটা কাজে জানু কবিরাজই যে তপুকে সন্তান ¯েœহের মতো যোগ্য সঙ্গ দিতে পারেন, তা তো যে কেউই বিশ্বাস করবেন। কিন্তু সেই রাতে তপুর অমন অলৌকিকভাবে মধুমতীতে নিরুদ্দেশ হওয়ার ঘটনায় কবিরাজ তো আজকের মতো আগে কখনোই এমন উত্তেজিত হয় নি? রহস্যটা কোথায়? জ্যোৎ¯œার কোমল আলোতেও ইজ্জৎ আলী চেয়ারম্যানের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম চিকচিক করে ওঠে।
জানু কবিরাজ উত্থাপিত ঘটনার আকস্মিকতায় চাঁন্দু-লাইলীর পালিয়ে যাওয়া ঘটনার প্রেক্ষিতে আয়োজিত বিচারে উপস্থিত সবার মুখে যেন খিল লাগে। জানু কবিরাজ দুই যুগ আগে ঘটে যাওয়া একটা দুর্ঘটনার, আজ কেন চেয়ারম্যান সাহেবের কাছে বিচার চাইছেন? সেই জিজ্ঞাসাও জাগে উপস্থিত অনেকের মনে। নাকি জানু কবিরাজ পাগল হয়ে গেল! পাগলামো কইরো না, কবিরাজ। আইজ আমার দুঃখের শ্যাষ নাই। আমার লাইলী কিনা চাঁন্দুর মতো পোলার হাত ধইরা পালাইছে। তুমি ভাবতে পারো কবিরাজ? অহন দশ গ্যারামের সক্কলে জানে, আমি ক্যামুন কেলেঙ্কারিতে পরছি। এইসবের মইধ্যে তুমি মাস্টারের মাইয়ার কথা তুলতে পারলা, কবিরাজ? ইজ্জৎ চেয়ারম্যানের গলায় বিনয়ের সুর।
পাগলামো কে করতাছে চেয়ারম্যান? আমি? না তুমি? নাকি তোমরা? আগের ঘটনার আগে বিচার হইরো? নাকি পরের ঘটনার আগে? কোনটার আগে বিচার হওয়া উচিত চেয়ারম্যান? জানু কবিরাজ প্রশ্নের লহোরা ছুটায়ে দেয়। কালিদাশকে আমি কী জবাব দেব? কোথায় তার সোনাচাঁন বউ? কৃষ্ণরে আমি কীভাবে বুঝাব? কোথায় তার প্রাণের মা? মাস্টারকে আমি ক্যামনে কমু? কোথায় তার প্রাণের বেটি তপু? আজ যেন জানু কবিরাজ প্রশ্নের গোলা ছুটিয়ে দিয়েছেন। বাঁধ ভাঙা জোয়ারের মতো তা উপস্থিত জনতার মনেও যেন চাঁন্দু-লাইলির ঘটনার চেয়ে বেশি কৌতূহল তৈরি করেছে। কবিরাজকে শান্ত করতে ইজ্জৎ আলী চেয়ারম্যান ধীরে ধীরে সেয়ানা উকিলদের মতো কিছু তাজ্জব প্রশ্ন করেন কবিরাজকে। এক অম্বরেশ ছাড়া আর কোনও সাক্ষী আছে তোমার?
সাক্ষী। কীসের সাক্ষী? চাঁন-সুরুজ সাক্ষী। মধুমতী সাক্ষী। কাদের মাঝি সাক্ষী। সাক্ষী রামগোপাল। সাক্ষী কালিদাশ। তপুর শিশুছেলে কৃষ্ণ সাক্ষী। আর কত সাক্ষী লাগবে তোমার, চেয়ারম্যান? কলকাতা থেকে বনগাঁ পর্যন্ত সেই পথে, বাসে যারা আমাদের সঙ্গে ছিল। তারা সাক্ষী। রামগোপালের পেছন পেছন বেনাপোল বর্ডার পার হওয়ার সময়কার সেই ভোরের কুয়াশা সাক্ষী। সাক্ষী মেঠো সেই পথ। বেনাপোল থেকে বাগেরহাট পর্যন্ত কয়েক দফায় কত লোক, যারা সেই দিন আমাদের সাথে গাড়িতে ছিল, তারা সাক্ষী। বাগেরহাট থেকে খাসেরহাট পর্যন্ত কাদের মাঝির নৌকায় আসার পথে যারা আমাদের দেখেছে, তারা সবাই সাক্ষী। সেই রাতে অম্বরেশের দোকানে যারা হাজির ছিল। তারা সবাই সাক্ষী। মধুমতীর কূল সাক্ষী। আর ওই যে চাঁদ, সেই দিনও সে ছিল আজকের মতো নীরব সাক্ষী। আর কত সাক্ষী লাগবে তোমার, চেয়ারম্যান? কালবোশেখী মেঘের গর্জনের মতো ইজ্জৎ আলী চেয়ারম্যানের ওপর খেঁকিয়ে ওঠেন জানু কবিরাজ।
খেয়ার কাউরে কি তুমি চিনতে পারছিলা? পাল্টা প্রশ্ন করেন ইজ্জৎ আলী চেয়ারম্যান।
Ñ আমরা খেয়ায় উইঠা বসি। জোয়ারের উজান থাকায় কিছুদূর ওরা কূল বরাবর খেয়া চালায়। তারপর হঠাৎ কী হইল? ওরা আমাকে চ্যাংদোলা কইরা ছুইরা মারে মধুমতীতে। আমি জলের ওপর ভাইসা উঠতেই সেকি বৈঠার মার। তারপর আমি কখন কীভাবে কূলে আসলাম, কীভাবে আমার জ্ঞান ফিরল, কীভাবে বা আমি বাঁচলাম, সব ওপরওয়ালা জানেন। ফুটো কলসিতে জল রাখলে যেমন ঝরঝর করে তা পড়তে থাকে, তেমনি কবিরাজের চোখ থেকে ঝরতে থাকে ফোঁটায় ফোঁটায় বাঁধ ভাঙা জল। চাঁদের আলোয় সে আঁসুর প্রভাবে উপস্থিত অনেকের চোখও তখন ছলছল করে ওঠে।
শান্ত হও কবিরাজ। ইজ্জৎ আলী চেয়ারম্যান বিনীত অনুরোধ করেন। কিন্তু কবিরাজ থামেন না। মাস্টারের স্কুল আছে। ঘরে বউ আছে। কিন্তু একটা বাচ্চা নাই। এক রাইতে মাস্টার আমার হাত ধইরা কইলÑ ‘কবিরাজ, আমার সব আছে, শুধু সংসারে সুখ নাই। সবিতারে আমি একটা বাচ্চা দিতে পারলাম না। এই দুঃখ আমি কারে কই?’ তারপর আমি কবিরাজিতে নামলাম। বছর ঘুরতেই তপু হইল। আমার তপু বড় দুঃখিনী মেয়ে। জন্মের তিন বছরের মধ্যে মা হারাইল। স্কুল আর ঘর লইয়া বড় হইল তপু। মাস্টার আবারও আমারে ডাকলÑ “এবার কন্যারে সৎপাত্রে দান কর, কবিরাজ। তুমি দেশ-দেশান্তরে ঘোরো, তপুমা’র জন্য ভালো পাত্র তুমিই পাইবা কবিরাজ।” বাকেরগঞ্জ থেকে কলকাতা পর্যন্ত তখন জানু কবিরাজের রোগী দেখার সে কী ব্যস্ততা? কবিরাজি ব্যস্ততার মধ্যেও ছেলে খুঁজে বের করলেন জানু কবিরাজ।
সাতচল্লিশে দেশভাগের সময় বাঁইশারীতে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গায় কলিদাশের বাবা কালিকান্ত সিংহ খুন হওয়ার পর, দুই মেয়ে কবিতা, নমিতা আর শিশু কালিদাশকে নিয়ে হতভাগী বিধবা সাধনা রানি কলকাতা চলে যায়। কলকাতার বাঘাযোতিনে বড় বোন প্রার্থনার সংসারে গিয়ে আশ্রয় নেয় তারা। আশ্রয় পাওয়া মাসীর সংসারে বড় হতে গিয়ে খুব অল্প বয়সেই পাক্কা ব্যবসায়ী বনে যায় কালিদাশ। হেমন্ত মেসোর পাটের গুদামে দিনরাত কত অমানুষিক পরিশ্রম তার। ওখানেই হেমন্ত মেসোর পরিচিত এক পাইকারি ব্যবসায়ীর সঙ্গে কালিদাশের খাতির হয়। তারপর গোটা বাঘাযোতিন, গড়েরমাঠ, পাক সার্কাস, ধর্মতলা, শিয়ালদাহ, উল্টোডাঙ্গায় দোকানে দোকানে ধূপকাঠী জোগান দেওয়ার কাজ জোটে কাশিদাশের। হেমন্ত মেসোর পাটের গুদামে ফাই ফরমায়েসের পরেও ধূপকাঠী জোগান দেওয়ার ওই কাজটা অল্প সময়ের মধ্যেই কালিদাশ বেশ দক্ষতার সাথেই রপ্ত করল। তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। বড় দুই বোন কবিতা আর নমিতাকে বিয়ে দিয়েছে গড়িহাটা আর লেকসার্কাসে। বাঁইশারীর কালিকান্ত সিংহ আর কলকাতার বাঘাযোতিনের হেমন্ত কড়াতিÑ উভয় পরিবারের সঙ্গেই জানু কবিরাজের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। সেই সূত্রে কালিদাশের বিয়ের কথা উঠলে দুই বোন সাধনা আর প্রার্থনা জানু কবিরাজকে বাগে পেয়ে তাকেই কালিদাশের জন্য একটা যোগ্য কন্যার সন্ধান দেওয়ার অনুরোধ করেন। হিমাদ্রী শেখর মাস্টারের মা-হারা মেয়ে তপুর বিয়ের জন্য কালিদাশের চেয়েও যোগ্য পাত্র আর কোথায় পাবেন জানু কবিরাজ? ফিরতি পথে তাই হিমাদ্রী মাস্টারকে কালিদাশের কথা শোনান জানু কবিরাজ। হিমাদ্রী মাস্টারও বাঁইশারীর কালিকান্ত সিংহকে চিনতেন। তার ছেলের সঙ্গে তপুর বিয়েÑ কবিরাজের প্রস্তাবে একবাক্যে রাজি হয়ে যান মাস্টার বাবু।
কালিদাশের সঙ্গে তপুর বিয়ের পর একমাত্র জানু কবিরাজই উভয় পরিবারের তখন যোগাযোগের অনুঘটক। বাকেরগঞ্জ থেকে কলকাতা কত হাজার হাজার রোগী জানু কবিরাজের। কত শত শত মানুষের সঙ্গে যে জানু কবিরাজের বন্ধুত্ব। যখন যে বাংলায় জানু কবিরাজ, তখন সেই বাংলায় তিনি যেন সেরা কবিরাজ। কঠিন কঠিন রোগ-বালাইয়ের কবিরাজি ছাড়াও উভয় বাংলার কত ধরনের খবরাখবর আনা-নেওয়া যে জানু কবিরাজকে করতে হয়। সেই কবিরাজ, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের পরেই হঠাৎ করেই কেন কবিরাজি ছেড়ে দিলেন? কথাবার্তা কমিয়ে দিলেন। যুদ্ধের ভেতরে সেই রাতে মধুমতীতে খেয়ানায়ে জানু কবিরাজের ভাগ্যে কী ঘটেছিল? যে মেয়ে তপুর তিনি কোনো হদিস পেলেন না? কারা সেদিন খেয়ানাও থেকে তপুকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন? আর পরবর্তীতে যার কারণে জানু কবিরাজ ওভাবে পাল্টে গেলেন?
কালিদাশের সাথে তপুর বিয়ের ব্যবস্থা, সব ঘটনা তো তোমার জানা, চেয়ারম্যান। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন জানু কবিরাজ। তপু আমার বড়ই দুর্ভাগা মেয়ে। কলকাতায় ঘরে নিজের সন্তান এলো। আর এপার বঙ্গে বাপটা গেল চিতায়। খবরটা পর্যন্ত পাইল তিন মাস পর আমার থাইকা। কালিদাশ ওরে খুব কইরা বুঝাইলÑ ‘কৃষ্ণ একটু বড় হোউক, তারপর যেও। তা ছাড়া বাবার চিতা দেরিতে দেখেও কি কষ্ট ভুলতে পারবা?’ আমিও তপুরে অনেক বোঝালাম। আবার আসলে আমিই তোরে নিয়া যামু। ততদিনে যুদ্ধ লাইগা গ্যাছে। আমি যুদ্ধে যাওয়ার পরিকল্পনা করলাম। মেদিনীপুর ট্রেনিং করলাম টানা এক মাস। যুদ্ধ করতে দেশে ঢুকুম। মনে বড় ইচ্ছা জাগল, মা তপুরে একবার দেইখা যাই। সেই যাওয়ায় তপু আমার সঙ্গ নিল। এপার থাইকা সবাই যখন ভিটেমাটি ছাইড়া ওপার যাচ্ছে, তপু তখন নিজের সন্তানরে স্বামীর কাছে রাইখা বাবার চিতা দেখতে আমার সঙ্গী হইল। উল্টামুখী যাত্রা। রামগোপাল দিন শুরু হওয়ার আগেই আমাদের বর্ডার পার কইরা দিল। তারপর একটা যুদ্ধের মধ্যে বেনাপোল থাইকা অম্বরেশের দোকান পর্যন্ত কত যে সতর্কতা, চেয়ারম্যান। আর তারপর মধুমতীতে আইসাই কিনা সব শ্যাষ। আমি কি এই দেখতে চাইছিলাম? তুমি কও, চেয়ারম্যান?
ইজ্জৎ আলী চেয়ারম্যান এ পর্যায়ে উঠে গিয়ে আবারও জানু কবিরাজকে শান্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু জানু কবিরাজের চোখে তখন যে ক্ষোভাশ্রু, তা নিবারণ করবে কে? আইজ আমারে কইতে দাও, চেয়ারম্যান। আইজ তুমি কিসের বিচার করবা? কার বিচার করবা? কার কার বিচার করবা? দ্যাশ স্বাধীন করলা। জনগণের প্রতিনিধি হইলা। নেতারে মাইরা ফেলাইলা। তার বিচার করতে পারছো তোমরা? আইজ কিসের বিচার করবা? কোন বিচারটা আগে করবা? ওই মধুমতীরে আমি আর দু’চক্ষে দেখতে পারি না। ওই চাঁন্দের দিকে আমি আর চাইতে পারি না। আমার বিচার কে করবে, চেয়ারম্যান? বলতে বলতে ইজ্জৎ আলী চেয়ারম্যানের হাতের ওপরেই মূর্ছা যায় জানু কবিরাজ। ততক্ষণে উঠান ভরতি জনতার শোরগোলটা আবারও উথলে ওঠে। চুপিচুপি ত্রয়োদশীর চাঁদ তখন নীরবে বলে ওঠেÑ দ্য নাইট ইজ সো ইয়াং, পিপল। সে কথা সেই হৈ-হট্টগোলের মধ্যে কেউ কি আর শুনতে পায়?

Category:

Leave a Reply