মুক্তিযুদ্ধের গল্প : রক্তঋণ

Posted on by 0 comment

চারপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা ঘিরে ফসলের মাঠ। বেশিরভাগ ক্ষেতেই সোনালি ধান ও পাট। আগের যে কোনো মৌসুমে গ্রামবাসীদের মধ্যে এ সময় ধান কাটার ধুম লেগে যেত। কিন্তু এখন শূন্য মাঠ। কদাচিৎ লোকজন চোখে পড়ে। কেউই মাঠে যেতে সাহস করে না।

PfcMহারুন হাবীব: গারো পাহাড়ের পাদদেশের অঞ্চলটি অপূর্ব সৌন্দর্যম-িত। প্রকৃতি যেন নিখুঁত শৈলীতে অনিন্দধারার সৌন্দর্য এঁকে দিয়েছে নিজের শিল্প ভাবনায়। পুবদিকে ছোট-বড় অসংখ্য পাহাড়। বেশিরভাগই পড়েছে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমানায়। বাংলার ভাগ্যে যা জুটেছে তা কেবলই ছিটেফোঁটা। আর সেখান থেকেই সবুজ চা-বাগানের ঢেউ তোলা শরীরের মতো নিচের দিকে নেমে গেছে পেলব সমতল। এখানটায় দাঁড়ালে তফাৎটা স্পষ্ট বোঝা যায়। পাহাড় আর সমতলের দুই শরীর। পাহাড় থেকে চোখ ঘুরিয়ে নিচের দিকে তাকালে চোখে পড়ে বাংলার গ্রাম, তাল ও বটগাছ, বাঁশঝাড়, আঁকা-বাঁকা নদী, খাল-বিল।
এখন হেমন্তকাল। গেল বছরেও এ সময় বৃষ্টি হয়নি। কিন্তু সপ্তাহ খানেক আগে টানা বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির পর টানা রোদ। সে-রোদে ধান ও পাটক্ষেতের জমা পানি টানতে শুরু করেছে। পা ফেললে এখন আর কাদামাটি আটকে ধরে না। অপেক্ষাকৃত কাঁচা মাটিতে মানুষের দাগ বসে। পদচিহ্ন আঁকা হয়। রোদে সে-দাগ শক্ত হয়। চিহ্ন থেকে যায়।
পাশেই ধানুয়া গ্রাম। চারপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা ঘিরে ফসলের মাঠ। বেশিরভাগ ক্ষেতেই সোনালি ধান ও পাট। আগের যে কোনো মৌসুমে গ্রামবাসীদের মধ্যে এ সময় ধান কাটার ধুম লেগে যেত। কিন্তু এখন শূন্য মাঠ। কদাচিৎ লোকজন চোখে পড়ে। কেউই মাঠে যেতে সাহস করে না। যে কোনো সময় পাকিস্তানি ক্যাম্প থেকে ছুটে আসতে পারে মর্টারের গোলা কিংবা মেশিনগানের গুলিÑ যা শরীর ছিন্নভিন্ন করে দেবে। নবান্ন উৎসবের বদলে এখন শোনা যায় মর্টারের শেল ফাটার বীভৎস শব্দ, রাইফেল ও মেশিনগানের কানফাটা আওয়াজ। বিস্ময়ের ব্যাপার যে, আকস্মিক এই পরিবর্তনটিও যেন স্থানীয়দের গা সওয়া হয়ে গেছে! তবে এ পরিস্থিতিতেও ফসলের ক্ষেতগুলোতে সন্তর্পণে চলাচল করে মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা।
বিস্তীর্ণ সীমান্ত-ঘেঁষা অঞ্চলটিতে বাঁশ, ঝোপঝাড়, আম-কাঁঠাল আর কলাবাগানের কমতি নেই। কিন্তু ধান পাকার এই সময়টায় সব সৌন্দর্য উপচে দিয়েছে বাতাসে দোল খাওয়া সোনালি ধানক্ষেত। মাঝে মধ্যে বাবুই আর শালিকেরা ঝঁাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসে। এক ক্ষেত থেকে আরেক ক্ষেতে যায়। ওরা ধান সাবাড় করে। অন্য কোনো বছর হলে কৃষকের ছেলেমেয়ে কিংবা গৃহস্থ বউরা পাখিদের ঠোঁট থেকে শ্রম-ঘামের ফসল বাঁচাতে চেষ্টা করত। আজ তারা অসহায়। অতএব আনন্দের সীমা নেই পাখিদের।
সীমান্তের ওপারে ভারতীয় পাহাড়গুলোতে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে নাম লিখিয়েছে বেশিরভাগ যুবক। ভয়ার্ত নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা সীমান্ত বরাবর তৈরি রিফ্যুজি ক্যাম্পগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। পাকিস্তান ও ধর্ম রক্ষাকারী (!) সৈন্যদের নির্বিচার আক্রমণে গোটা দেশ জাহান্নামে পরিণত হয়েছে। অতি-বৃদ্ধ এবং কিছু কিছু বয়স্ক পুরুষ বেঁচে থাকার কৌশল হিসেবে মাথায় টুপি লাগিয়ে, সৈন্যদের লরি দেখলেই ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ সেøাগান দিয়ে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। এতে সৈন্যরা আশ্বস্ত হয়ে গুলি করা থেকে বিরত থাকছে। কারণ ওরা ‘খাঁটি মুসলমান’ চায়!
ওরা পাঁচজন। ধানুয়ার পাঁচ নম্বর বাংকার থেকে ওরা পাঁচজন বেরিয়ে আসে বিকেলের দিকে। জায়গাটা বিপদজ্জনক; মাথা তুলে দাঁড়ালেই মোকাবেলা হতে পারে মৃত্যুর সাথে। নিকটবর্তী পাকিস্তানি ক্যাম্প থেকে হয় ছুটে আসবে ঝাঁক ঝাঁক গুলি, নয় মর্টারের গোলা। মুক্তিবাহিনীর অনেকেই এ ভুলটা আগে করেছে। হতাহতও হয়েছে। এরপরও ওদের পাঁচজনের কাছে অন্য কোনো বিকল্প নেই। ডিউটি শেষে ক্যাম্পে ফিরতে হবে।
আধামাইলেরও কম দূরত্বে পাকিস্তানি সৈন্যদের একটি শক্ত ডিফেন্স পোস্ট। মুক্তিবাহিনীর প্রতিরক্ষা বাংকারগুলো দখল নিতে ওরা বারবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। প্রচ- গোলাগুলির পরও মুক্তিবাহিনী নিজেদের অবস্থান ছাড়েনি। গেল দুদিনেও বেশ কয়েকবার গুলিবিনিময় হয়েছে। একজন কৃষকসহ তিনটি গরু মারা গেছে।
মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা নিজেদের প্রতিরক্ষা বাংকারগুলোতে পালা করে ডিউটি দেয়। রাইফেল ও মেশিনগান তাক করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে। দু-দিন দু-রাত পাহারায় ছিল পাঁচজনের এই দলটি। আজ ডিউটির বদল হয়েছে। একটু আগেই নতুন দল এসে দায়িত্ব বুঝে নিয়েছে। অতএব ওরা পাঁচজন ক্যাম্পে ফিরবে। ধান, পাটক্ষেত ও জঙ্গলের মাঝ দিয়ে। দায়িত্ব পড়বে অন্য কোথাও। হলেও হতে পারে দিনখানেকের জন্য বিশ্রাম পাবে।
Ñ লিডার, চলেন ক্রল করে যাই। ব্যাটারা দেখলেই গুলি করবে। ওদিকে ওদের মেশিনগান পোস্ট আছে Ñ জানেন তো?
প্রথমেই দলনেতাকে সতর্ক করে মাহফুজ। বিশ কি বাইশ বছর বয়স। গায়ের শার্ট, লুঙ্গি এলোমেলো, দুমড়ানো। দু-দিন দু-রাত বাংকারে কাটিয়ে শরীর মাটিমাখা Ñ যেন মাটি ফুটে জন্মেছে মৃত্তিকা-পুরুষ। ঢাকার কাছে বিক্রমপুরে বাড়ি। যুদ্ধের ডামাডোলে ছিটকে পড়ে ঠাঁই নিয়েছে উত্তরাঞ্চলের এই সীমান্তে। এই জনযুদ্ধে কোথাকার মানুষ কোথায় গেছে কে তার খোঁজ রাখে!
Ñ ঠিকই বলেছ, সাবধানে যাওয়াই ভালো। চল, অন্যদিক দিয়ে যাই। প্লাটুন কমান্ডার রাজীব উত্তর দেয়।
কেবল বয়সেই বড় নয়, শিলং-এর পাহাড়ে গেরিলাযুদ্ধের ওপর উচ্চতর ট্রেনিং হয়েছে রাজীবের। প্রথম ব্যাচের মুক্তিযোদ্ধা। তবু মাহফুজের সতর্কবাণীকে সে উপেক্ষা করে না। সন্তর্পণে পশ্চিম দিকের ধান ও পাটক্ষেত লক্ষ্য করে সে হাঁটতে থাকে। প্রথমে রাজীব, এরপর মাহফুজ, বেলাল, এরপর হান্নান ও হেমেন্দ্র। এক বুক উঁচু ধান ও পাটক্ষেতের মাঝ দিয়ে এঁকেবেঁকে হেঁটে চলে ওরা। যতটা সম্ভব মাথা নিচু করে যাতে শত্রুপক্ষ না দেখে। ওদের হাঁটাপথে মাঠের কীটপতঙ্গ উড়তে থাকে। হঠাৎ কয়েকটা শালিক এদিক-ওদিক উড়ে যায়। ভারতের সীমান্তÑ বাঁধটা খানিকটা দূরেই। হয়তো মিনিট পনেরো সময় লাগবে পৌঁছতে। এরপর আর ভয় নেই। পাকিস্তানি সৈন্যরা সচরাচর এদিকে গোলাগুলি করে না। একেবারেই যে করে না তাও নয়। ব্রাহ্মণপাড়ায় ক’দিন আগে মর্টারের শেল পড়ে দুজন ভারতীয় নাগরিক মারা গেছে। পাল্টা গুলি চালিয়েছে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বিএসএফ।
একের পর এক ধান ও পাটক্ষেত। পশ্চিমের রোদ পড়ে গেরিলাদের মুখগুলো লালচে বরণ হয়েছে। সবুজ লকলকে পাট গাছ, এখনও কাটার সময় হয়নি। ধানের ক্ষেতগুলো নদীর ঢেউয়ের মতো। বেশিরভাগই সোনালি। কিছু কিছু গাছ এখনও সবুজ। ক্ষেতে নামলেই কোমর পর্যন্ত ঢেকে যায়। বাতাসে দোল খাওয়া শীষগুলো বারবার শরীর ছুঁইয়ে দেয়। ওদের শিহরণ ধরে।
হঠাৎ বেলাল ‘ধন ধান্য পুষ্পে ভরা আমাদেরই বসুন্ধরা’ বলে গান গেয়ে ওঠে। সাথে সাথেই মাহফুজ শাসিয়ে দেয়, ‘পাগল না-কি তুই, চুপ কর ব্যাটা!’
মেঘালয়ের পাহাড় থেকে চোখ ঘুরিয়ে সমতল ইজেলে আঁকা প্রকৃতির শিল্পকর্ম দেখে গেরিলারা। উঁচু থেকে নিচুর দিকে। এ যেন এক স্বপ্নের রাজ্য। দূর থেকে বহুদূর চোখ যায় বাংলার। কে কোথা থেকে কীভাবে যুদ্ধে যুক্ত হয়েছে কেউ জানবার প্রয়োজন বোধ করেনি। জননীÑজন্মভূমি আজ আক্রান্ত। মা-মাতৃভূমি হানাদারদের হাতে বন্দি। ধান পাটের পাতায় আলতো হাত বুলিয়ে হেমেন্দ্র আকস্মিকভাবে গেয়ে ওঠে, ‘মাগো তোমায় কথা দিলাম জীবন দিব বলে…।’ কে জানে কতদিন এ যুদ্ধ চলবে। কবে পাকিস্তানি আধিপত্য থেকে বঙ্গের মাটি মুক্ত হবে!
এসব ভাবতে ভাবতেই প্রথম ঘটনাটা ঘটল। পুবদিক থেকে মেশিনগানের কড়কড় শব্দ শোনা গেল। কয়েক ঝাঁক গুলি উড়ে গেল চারপাশ দিয়ে। শালিক ও বাবুই পাখির দলগুলো ক্ষেতের ওপর দিয়ে আতঙ্কে উড়তে থাকল। এ-রকম কোনো অঘটন ওরা আশা করেনি। পাকিস্তানি ক্যাম্পটা খুব দূরে নয় Ñ একেবারে কাছেও নয়। কিন্তু প্রশিক্ষিত সৈন্যরা এমন একটা জায়গায় মেশিনগান বসিয়েছে, যাতে দূর থেকেও প্রয়োজনে শত্রুপক্ষকে আঘাত করা যায়।
‘শুয়ে পড়, শুয়ে পড়’ Ñ নির্দেশ দিয়েই ধানগাছ মাড়িয়ে মাটির সাথে গা মিশিয়ে দেয় রাজীব। মাটিতে দ্রুত শুতে গিয়েও হান্নান বাঁ পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোতে থাকে। হাতের লাইট মেশিনগান তাক করে হেমেন্দ্র বলে Ñ ‘ওস্তাদ, ফায়ার অপেন করি? শালারা আবার গুলি চালাবে?’
রাজীব উত্তর দেয় না। সামনে এগুতে থাকে। হান্নান রাইফেলটা পাশে রেখে হাতের কাছে পাওয়া কিছু লতাপাতা ছিঁড়ে দাঁতে চিবিয়ে ক্ষতস্থানটা চেপে ধরে। তবু রক্ত পড়া বন্ধ হয় না। প্যান্ট ভিজে ওঠে। রাইফেলটা একটানে কাছে নিয়ে পজিশন নিয়ে ফেলে সে Ñ ‘ওস্তাদ, অর্ডার দাও। অর্ডার প্লিজ।’
প্লাটুন কমান্ডার নিঃশব্দ। তাকে ভেবেচিন্তে কাজ করতে হবে। হেমেন্দ্র এবার তাগাদা দেয়, ‘ফায়ার শুরু করতে হবে ওস্তাদ, অর্ডার দাও? নইলে ওরা আরও গুলি চালাবে।’
রাজীব হাত তুলে নিষেধ করে। না, এখন নয়। সে বুঝে ওঠতে পারে না শত্রুপক্ষ দূর না ধারে-কাছের কোথাও থেকে গুলি চালিয়েছে। প্রথম গুলিগুলো মেশিনগানের তা সে নিশ্চিত। দ্বিতীয়টি সম্ভবত অটোমেটিক রাইফেলের। যুদ্ধাস্ত্রের শব্দগুলো কয়েক মাসেই তাদের জানা হয়ে গেছে।
পরিস্থিতি বিবেচনা করে বেলাল নিজের এসএলআর ‘কক’ করে পজিশন নিয়ে ফেলে। বেশ কিছুটা সময় ধরে গুলি আসতে থাকে। দুদিন বাংকারে থেকে ওরা ক্লান্ত। ঠিক এ সময় মাহফুজের গলা শোনা যায় Ñ ‘কেউ দাঁড়াবি না, কেউ গুলি ছুড়বি না। ওরা যেন আমাদের ‘পজিশন’ বুঝে ফেলতে না পারে। বি কেয়ারফুল। ক্রল করে আরেকদিকে চল। হারি আপ।’
কমান্ডার রাজীব হাতের ঈশারায় সবাইকে চুপ থাকতে বলে। এরপরও থেকে থেকে গুলি আসতে থাকে। বেশ কিছু শালিক ও বাবুই ধপ করে মাটিতে পড়ে কাতরাতে থাকে। দৃশ্য দেখে বেলাল আর্তনাদ করে ওঠে, ইস্!
মিনিট দশেক পর গুলি বন্ধ হয়। চারদিকে অন্যরকম এক নিস্তবদ্ধতা। সন্তর্পণে মাথা তুলে দাঁড়ায় মাহফুজ। শত্রুপক্ষের আঘাত কোন্ দিক থেকে আসছে Ñ সে বুঝতে চেষ্টা করে।
এরই মধ্যে গামছা দিয়ে হান্নানের ক্ষতস্থানটি শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। রক্ত পড়া কিছুটা বন্ধ হয়েছে। এবার সন্তর্পণে সামনে এগুতে হবে। ওরা চারদিক তাকিয়ে দেখে Ñ না, কিছুই চোখে পড়ে না। পাকিস্তানি ক্যাম্পটাও দেখা যায় না। চারদিক নীরবতা। ধান ও পাট গাছগুলো বাতাসে দুলছে। শালিক ও বাবুই পাখিগুলো চরম উৎকণ্ঠায় দ্রুত উড়ে যাচ্ছে, যার যার নিরাপদ আশ্রয়ে।
সময় ক্ষেপণ না করে মাথা নিচু করেও ওরা দ্রুত সামনে এগুতে থাকে। এমন রসদ ও জনবল নেই যে পাল্টা আক্রমণে যেতে পারে। রক্তক্ষরণ সত্ত্বেও হান্নান সহযোদ্ধাদের সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটতে থাকে। কিছুক্ষণ পর ওরা আরেকটি ক্ষেতে প্রবেশ করে। যেহেতু শত্রুরা দেখে ফেলেছে, কাজেই দ্রুত সরে যেতে হবে তাদের। হান্নানের চিকিৎসা দরকার। একবারের জন্যও ওরা বুঝতে পারে না পিছু নেওয়া পাকিস্তানি দলটি ঝোপঝাড়ের আড়ালে মাথা গুঁজে তাদের অনুসরণ করছে।
ধান ও পাটক্ষেতে হাঁটা, পাকা ধানের শীষ আলিঙ্গন করার অভিজ্ঞতা এই দলের সকলেরই আছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলেও ওরা সবাই গ্রামে বড় হয়েছে। পড়াশোনার টেবিল থেকে, কবিতা লেখা ও সংগীতচর্চা থেকে ওদের মুক্তিযুদ্ধের মাঠে নামিয়েছে ১৯৭১। সেনাশাসক ও তাদের স্থানীয় দালালেরা ধর্মের নাম ভাঙিয়ে যে পাকিস্তান রক্ষা করতে চায়, সেই পাকিস্তান আর তাদের দেশ নয়। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। তাকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে গেছে সরকারি বাহিনী। পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ১০ এপ্রিল সরকার গঠন করেছে। ১৭ এপ্রিল সে সরকারের আনুষ্ঠানিক শপথ হয়েছে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার সাধারণ যুবতারুণ্য প্রশিক্ষিত পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছে। সৈন্যদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চলছে সশস্ত্রভাবে।
কিছুক্ষণ আগের গোলাগুলির ব্যাপারটা অবশ্য খুব বেশি অবাক করেনি গেরিলাদের। এসব হরহামেশাই ঘটে। অতএব ওরা স্বাভাবিক হতে থাকে। বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, ওরা যেন ভুলেই যায় একটু আগেই শত্রুপক্ষ থেকে যেভাবে গুলি আসছিল Ñ তাতে ওদের মৃত্যু হতে পারত!
ক্ষানিকক্ষণ সময় নিয়ে রাজীব ও বেলাল উঠে দাঁড়ায়। শত্রুপক্ষের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করে। মাহফুজ এগিয়ে গিয়ে হান্নানের ঘাড়ে হাত রেখে জিগ্যেস করে Ñ রক্ত বন্ধ হয়েছে, দোস্ত?
Ñ না, আরও কিছু পড়–ক না দোস্ত, মায়ের চরণে সন্তানের রক্তদান কয়জনের ভাগ্যে ঘটে? এই যে দেখ… বলেই রক্তাক্ত বাঁ পা’টা মেলে ধরে আব্দুল হান্নান।
Ñ পাগলামো করবি না দোস্ত Ñ রক্ত পড়া বন্ধ করতে হবে Ñ ক্যাম্পে ফিরতে আরও সময় লাগবে। বলেই মাহফুজ কোমরের গামছাটা ছিড়ে হান্নানের ক্ষতস্থানটা আরও শক্ত করে বেঁধে দেয়। অল্পক্ষণের মধ্যেই বাঁধনটা আবারও রক্তে ভিজে ওঠে।
এরপর আবার হাঁটা শুরু হয় ওদের। হাঁটতে হাঁটতে সীমান্ত বাঁধটার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। সামনেই কয়েকটা বড় পাটক্ষেত। এরপর ফাঁকা একটি জায়গা। তারপর দুই দেশের সীমানা চিহ্নিত করা বাঁধ। বাঁধটা পেরুলেই আশ্রয়দাতা দেশ। কাজেই ভয়ের বিশেষ কিছু নেই।
কিন্তু শেষ ক্ষেতটি পেরোবার আগেই আকস্মিকভাবে আরেক দফা অস্ত্র তাক করে পাকিস্তানি সৈন্যরা। গুলি আসতে থাকে ঝাঁকে ঝাঁকে। পরপর কয়েকটা মর্টারের শেল ফাটে আশপাশে। শত্রুদের এবারের চেষ্টা বিফলে যায় না। চোখের পলকে গুলিবিদ্ধ হয় মাহফুজ ও হেমেন্দ্র। পরিস্থিতি বোঝে ওঠার আগেই রাজীবের চোখের সামনে ছিটকে পড়ে হেমেন্দ্র। ‘জয় বাংলা’ বলে কয়েকটা অস্ফূট শব্দ করে ধানক্ষেতের ওপর গা এলিয়ে দেয় মাহফুজ। বৃষ্টির মতো গুলি আসতে থাকে। কেউ মাথা তুলতে পারে না। মাহফুজকে শক্ত করে চেপে ধরে রাজীব। হেমেন্দ্রের রক্তাক্ত শরীরটাকে কাছে টেনে বেলাল পরিস্থিতি সামলাবার চেষ্টা করে। এলএমজি-টা ছোঁ মেরে হাতে নিয়ে হান্নান ট্রিগারে আঙ্গুল রাখতেই রাজীব চিৎকার দিয়ে ওঠে, ‘সাবধান, শত্রু ধারে-কাছেই। গুলি চালালেই আমাদের পজিশন বুঝে ফেলবে।’
কিন্তু হান্নানকে থামানো যায় না। লাইট মেশিনগানটাকে দু-হাতে তুলে ধরে পাগলের মতো সে গুলি চালাতে থাকে। যেদিকে থেকে গুলি আসছিল সেদিকে নল উঁচিয়ে উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার দিতে থাকে Ñ ‘জয় বাংলা’।
মাঠের পাখিগুলো আবারও প্রবল আতঙ্কে উড়তে শুরু করে। মেশিনগানের ট্যা ট্যা শব্দে গোটা এলাকা দুমড়ে-মুচড়ে যায়। পশ্চিম আকাশে সূর্যের রং বিষণœœ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। যে পাকিস্তানি দলটি ওদের পিছু নিয়েছিল তারা মাটিতে শুয়ে আত্মরক্ষা করার চেষ্টা করে। ওরাও নিজেদের অবস্থান জানান দিতে রাজি নয়।
মাহফুজ আর হেমেন্দ্রের শরীর বেয়ে তখন অবিরল ধারায় রক্ত পড়ছে। মর্টারের শেল লেগে এরই মধ্যে হান্নানের মাথাটা উড়ে গেছে। ধানগাছ, পাটগাছের শরীর বেয়ে টপ টপ করে এঁকেবেঁকে নেমে যাচ্ছে রক্তের ঢল। উপরে হেমন্তের আকাশ। সাদা মেঘ উড়ে যাচ্ছে একের পর এক। পাখিরা উড়তে গিয়ে ভয়ার্ত চোখে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখছে। মুক্তিযোদ্ধাদের শরীর থেকে রক্ত পড়ছে মাটিতে। মাটি শুষে নিচ্ছে সে রক্ত।
সন্ধ্যা হতে তখনও খানিকটা বাকি। শেষ সূর্যের রক্তাভ রশ্মি জনযোদ্ধাদের শরীরকে রাঙিয়ে দিচ্ছে। তিন সহযোদ্ধাকে জাপটে ধরে মাটির সাথে শরীর লাগিয়ে যতটা সম্ভব দ্রুত এগিয়ে চলেছে রাজীব ও বেলাল। দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছতে হবে। এভাবে রক্ত যেতে থাকলে বন্ধুদের বাঁচানো যাবে না।
এরই মধ্যে মাহফুজ হঠাৎ মাথা সোজা করে তাকায়। প্রচুর রক্তক্ষরণে ওর শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। এরপরও মুখে হাসি টেনে বলে, ‘আমাদের রক্তের রং কী লাল, দেখ, কী অপূর্ব রং Ñ তাই না বন্ধুরা!’ বলতে বলতেই ওর মাথাটা ঢলে পড়ে। রাজীব ও বেলাল যন্ত্রণায় চোখ ঘুরিয়ে নেয়। চোখ মেলে হেমেন্দ্র একবার মাহফুজের দিকে তাকায়। আরেকবার তাকায় খানিকটা দূরে পড়ে থাকা হান্নানের গুলিবিদ্ধ মাথাটার দিকে। অস্পষ্ট হলেও বোঝা যায় সহযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে সে শেষবারের মতো বলছে, ‘হয়তো আর কোনোদিন একসাথে “অপারেশন”-এ যাওয়া হবে না দোস্ত।’
প্লাটুন কমান্ডার রাজীব কান্নাভেজা কণ্ঠে চিৎকার করে ওঠে, ‘চুপ কর হেমেন্দ্র, চুপ কর। আমরা দু-জন এখনও বেঁচে আছি।’
হেমেন্দ্রের পরিত্যক্ত এলএমজিটা হাতে তুলে নেয় কমান্ডার রাজীব। পাকিস্তানি দলটির অবস্থান সে নির্ণয় করে ফেলেছে। বন্ধুদের রক্তাক্ত শরীর ছুঁয়ে রাজীব ও বেলাল ক্রল করে এগুতে থাকে। আক্রমণে প্রাথমিক সাফল্যে পাকিস্তানি সৈন্যরা দাঁড়িয়ে অবস্থান নির্ণয় করার চেষ্টা করছে। রাজীব ও বেলাল সুযোগের অপেক্ষা করতে থাকে। কিছুক্ষণ পর সে সুযোগ আসে।
পিছু নেওয়া সৈন্যদের ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ কানে আসতেই রাজীবের এলএমজি এবং বেলালের এসএলআর একযোগে গর্জে ওঠে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনজন পাকিস্তানি সৈন্য মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। বাকিরা শুয়ে কিংবা ক্রল করে পালাতে থাকে। ট্রিগারে আঙ্গুল লাগিয়ে গেরিলারা শত্রুপক্ষের দিকে অগ্রসর হয়। যত্রতত্র রক্তের দাগ, গুলির খোসা। শরীর ভেঙে যাচ্ছে; এরপরও মৃত পাকিস্তানি সৈন্যদের দেহগুলোকে টেনে আনে ওরা শহিদ বন্ধুদের কাছে। ওদের চোখে জল নেই, আছে রুদ্র। বলে, ‘কমরেড, দেখ, আমরা ঘাতকদের ক্ষমা করিনি।’
এরপর অবাধ্য পানি গড়াতে থাকে দুই মুক্তিযোদ্ধার চোখ থেকে। গেরিলাদের নতুন একটি প্লাটুন এগিয়ে আসে এরই মধ্যে। আহত সহযোদ্ধাদের বাঁচবার কোনো সুযোগ আছে কি না তারা পরখ করে দেখে। না, হয়তো সব শেষ।

Category:

Leave a Reply