‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেন’

51উত্তরণ ডেস্ক: ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথের মূল প্রতিপাদ্য ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’। ২০১৩ সালের ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা শপথ নেওয়ার সময় মূল প্রতিপাদ্য ছিলÑ ফেইথ ইন আমেরিকা’স ফিউচার।
এর আগে এফডি রুজভেল্ট, বারাক হোসেন ওবামা, জর্জ ওয়াকার বুশ (জর্জ বুশ জুনিয়র), উইলিয়াম জেফারসন ক্লিনটন (বিল ক্লিনটন), রোনাল্ড উইলসন রিগ্যান ও কয়েকজন নেতা একের অধিক মেয়াদে প্রেসিডেন্ট থাকায় ব্যক্তি হিসেবে ট্রাম্প হচ্ছেন ৪৫তম প্রেসিডেন্ট। আর ট্রাম্পের সরকার হয়েছে দেশের ৫৮তম সরকার।
বিশ্বের গতিধারা নির্ধারণের অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্যে শপথ নিলেন ডোনাল্ড জন ট্রাম্প। শুরু হলো ট্রাম্প যুগ। এর মাধ্যমে দেশটির একমাত্র কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট বারাক হোসেন ওবামার আট বছরের শাসনামলের অবসান ঘটল। গত ২০ জানুয়ারি ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাপিটল হিলে স্থানীয় সময় দুপুর ১২টায় তাকে শপথ পড়ান দেশটির প্রধান বিচারপ্রতি জন রবার্টস। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের স্মৃতিধন্য বাইবেল হাতে নিয়ে শপথ পাঠ করেন ট্রাম্প। ১৮৬১ সালের ৪ মার্চ এই বাইবেল ছুঁয়েই শপথ নেন ষোড়শ মার্কিন প্রেসিডেন্ট অ্যাব্রাহাম লিঙ্কন। শপথে তিনি দেশের সংবিধানকে সমুন্নত রাখার অঙ্গীকার করেন। এ সময় ট্রাম্পের পাশে ছিলেন স্ত্রী ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প।
শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরে তিক্ততা ভুলে সম্প্রীতির বাঁধনে জড়ালেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। শপথ গ্রহণের দিনে বিশ্বজুড়ে শুভেচ্ছা বার্তা পাঠানো হয়েছে ট্রাম্পের উদ্দেশে। পোপ ফ্রান্সিসও শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুভেচ্ছা বার্তা, অভিনন্দন পাঠিয়েছেন। আপনার সাথে কাজ করার ইচ্ছে রইল।
ট্রাম্প টুইটে বলেছেন, আমাদের কর্মসংস্থান ফিরিয়ে আনব, সীমানা ফিরিয়ে আনব, সম্পদ ফিরিয়ে আনব, আমাদের স্বপ্ন ফিরিয়ে আনব।
ঘড়ির কাঁটায় তখন ওয়াশিংটনে শুক্রবার (২০ জানুয়ারি) ঠিক দুপুর ১২টা। ইংরেজিতে মাত্র ৩৫ শব্দের শপথ বাক্যের শপথ। এক মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে তা উচ্চারণ সম্পন্ন করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বললেনI do solemnly swear (or affirm) that I will faithfully execute the Office of President of the United States, and will to the best of my ability, preserve, protect and defend the Constitution of the United States.
(আমি গভীর শ্রদ্ধার সাথে শপথ করছি যে, আমি বিশ্বস্ততার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দফতর পরিচালনা করব এবং সাধ্যের সবটুকু দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান রক্ষা, সংরক্ষণ ও প্রতিপালনে সচেষ্ট থাকব।)
আর এই শপথ বাক্য পাঠের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্টের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে বারাক ওবামার পদে স্থলাভিষিক্ত হলেন তিনি। ট্রাম্পই প্রথম ৭০ বছর বয়সে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ওভাল অফিসে পা রাখলেন। আর এর পরপরই ডোনাল্ড ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।
অভিষেক বক্তৃতায় ডোনাল্ড ট্রাম্প
উপস্থিত জনতার উদ্দেশে হাত নেড়ে অভিবাদন গ্রহণ করেন নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। এরপর বক্তৃতা শুরু করেন।
যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও সেরা রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, আমেরিকা আবার জিততে শুরু করবে। এমনভাবে জিতবে, এর আগে কখনও এভাবে জেতেনি।
২০ জানুয়ারি বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে ওয়াশিংটনের কংগ্রেস ভবন ক্যাপিটল হিলে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট পদে শপথ নেওয়ার পর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প এ কথা বলেন।
আমরা আমেরিকার জনগণরা দেশকে পুনর্গঠনে এক মহান জাতীয় প্রচেষ্টায় যোগ দিয়েছি। এই প্রচেষ্টায় আমরা আমেরিকা ও বিশ্বের দীর্ঘস্থায়ী পথচলা নির্ধারণ করব। আমরা হয়তো বাধার সম্মুখীন হব, বন্ধুর পথে পড়তে হবে; কিন্তু আমরা লক্ষ্যে পৌঁছাবই।
এ সময় শান্তিপূর্ণভাবে দায়িত্ব হস্তান্তরে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ট্রাম্প। বলেন, তাদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। তারা দায়িত্ব হস্তান্তরে নিজেদের মহত্বের পরিচয় দিয়েছেন।
ট্রাম্প জনগণের উদ্দেশে বলেন, আজকের এ অনুষ্ঠানের বিশেষ মাহাত্ম্য আছে। আমরা আজ ক্ষমতা কেবল এক প্রশাসন থেকে আরেক প্রশাসনে বদল করছি না, বদল করছি না এক দল থেকে আরেক দলের হাতে। আমরা আজ ওয়াশিংটন ডিসির হাতে থাকা ক্ষমতা আপনাদের, আমেরিকার জনগণের হাতে হস্তান্তর করছি।
রাজধানীতে দায়িত্ব পেয়ে কিছু মানুষ সুবিধা আদায় করেছে বলেও অভিযোগ তোলেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, এই গোষ্ঠী নিজেদের দেখেছে কেবল, জনগণকে নয়। তাদের জয় ছিল তাদের, জনগণের নয়, তোমাদের নয়। আজ এই মুহূর্ত, এই উৎসব তোমাদের। এই আমেরিকা তোমাদের এবং এই দেশও তোমাদের।
ধনকুবের থেকে প্রেসিডেন্ট বনে যাওয়া ট্রাম্প বলেন, কোন দল সরকার পরিচালনা করছে সেটা সত্যিই বিষয় নয়; বরং এটাই বিষয় যে জনগণের হাতে সরকার পরিচালিত হচ্ছে। ২০১৭ সালের ২০ জানুয়ারি এই কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকবে যে, জনগণ এই দিন থেকে আবার শাসনভার পেয়েছে। আমাদের দেশ গঠনে অবদান রাখা নর-নারীরা আর ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাবেন না।
এ সময় দেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, চাকরি বাজার নিয়েও কিছু কথা বলেন ট্রাম্প। প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এসব ক্ষেত্রে বৈষম্য নিরসনেরও।
তিনি মাদক অপরাধ ও খুন-খারাপির বিরুদ্ধে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, এই অপরাধ এখানেই থেমে যাবে এবং এখনই থামবে। আমরা এক জাতি। তাদের (বৈষম্য বা নিপীড়নের শিকার ব্যক্তি) ব্যথা আমাদের ব্যথা। তাদের স্বপ্ন আমাদের স্বপ্ন। তাদের সফলতা আমাদের সফলতা। ট্রাম্প আমেরিকানদের আনুগত্যের শপথ নিয়েছেন উল্লেখ করে বলেন, বহু শতক ধরে আমেরিকান শিল্পের খরচে বিদেশি শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছি আমরা। আমাদের সামরিক বাহিনীর বদলে বিদেশি সামরিক বাহিনীর জন্য অর্থ জোগান দিয়েছি। নিজেদের সীমান্ত অরক্ষিত রেখে অন্য দেশের সীমান্ত রক্ষা করেছি। আমেরিকার ভেতরে অবকাঠামো ভেঙে পড়লেও আমরা বিদেশে শত কোটি ডলার খরচ করেছি। এ কারণে অন্য দেশ সমৃদ্ধ হয়েছে, হারিয়ে গেছে আমাদের সম্পদ, সামর্থ্য ও আত্মবিশ্বাস।
এ সময় কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া, মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়াসহ অব্যবস্থাপনায় সৃষ্ট নানা সমস্যা-জটিলতার কথা তুলে ধরেন ট্রাম্প। এই সমস্যাকে ভুলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়ে ট্রাম্প বলেন, সেসব এখন অতীত, এখন আমরা সামনের দিকে এগোচ্ছি।
ট্রাম্প জনগণের উদ্দেশে বলেন, আজ থেকে আমাদের এই ভূখ- নতুন লক্ষ্যে এগিয়ে যাবে। এই মুহূর্ত থেকে আমেরিকা আবার প্রথম হতে শুরু করবে। বাণিজ্য, কর, অভিবাসন, বৈদেশিক সম্পর্ক সবক্ষেত্রে আমরা এখন আমেরিকার কর্মী ও আমেরিকার জনগণের লাভ হিসাব করে সিদ্ধান্ত নেব।
তিনি বলেন, অন্য দেশের অপরাধ যেন আমাদের পণ্য নষ্ট না করে দেয়, আমাদের কোম্পানিগুলোকে হাতিয়ে না নেয়, আমাদের চাকরির বাজার ধ্বংস করে না দেয়, সেজন্য সীমান্ত রক্ষা করতে হবে। নিরাপত্তাই সমৃদ্ধি ও পরাক্রমশীলতার দিকে এগিয়ে দেবে।
প্রেসিডেন্ট তার দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চটি দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, আমার শরীরের শেষ শ্বাসটা থাকা পর্যন্ত আমি তোমাদের জন্য লড়ব এবং কখনোই তোমাদের মাথা নিচু হতে দেব না। আজ থেকে আমেরিকা আবার জিততে শুরু করবে, এমনভাবে জিতবে, আগে এভাবে জেতেনি। আমরা আমাদের চাকরি ফিরিয়ে আনব, আমাদের সীমান্ত ফিরিয়ে আনব, আমাদের সম্পদ ফিরিয়ে আনব এবং আমাদের স্বপ্ন ফিরিয়ে আনব।
এ সময় অবকাঠামো উন্নয়নে নানা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন ট্রাম্প।  তিনি আমেরিকানদের উন্নয়নে দুই নীতিতে এগোনোর কথা বলেন, ‘আমেরিকান কেনো, আমেরিকান ভাড়া করো।’
বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্কোন্নয়নে সে দেশগুলোর স্বার্থের দিকে তাকানোর কথাও বলেন ট্রাম্প। নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বলেন, আমরা আমাদের জীবনযাত্রা কারও ওপর চাপিয়ে দেব না।
তিনি সন্ত্রাসবাদের বিরূদ্ধে হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, আমরা আমাদের পুরনো জোটকে পুনরুজ্জীবিত করব এবং নতুন আরেকটি জোট গঠন করব। গোঁড়া ইসলামি সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সভ্য বিশ্বকে এক করে এটাকে দুনিয়া থেকে সমূলে উৎপাটন করব।
ট্রাম্প দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, আমেরিকা যখন ঐক্যবদ্ধ, তখন একে আর কেউ রুখতে পারবে না। এখানে কোনো ভয় থাকবে না। আমরা সুরক্ষিত এবং আমরা সবসময়ই এমন সুরক্ষিত থাকব। আমাদের যেমন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনী আছে, তেমনি ঈশ্বরও আমাদের সুরক্ষিত রেখেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের উদ্দেশে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বলেন, কাছে থাকো, দূরে থাকো, শহরে থাকো, বন্দরে থাকো, পাহাড়ে থাকো, পর্বতে থাকো, সাগরে থাকো, মহাসাগরে থাকো, তোমরা শোনো, তোমরা কখনোই অবজ্ঞার শিকার হবে না। তোমাদের স্বর, তোমাদের প্রত্যাশা, তোমাদের স্বপ্ন আমাদের আমেরিকানদের লক্ষ্য নির্ধারণ করবে।
বক্তৃতার শেষ অংশে দৃঢ়তার সাথে ট্রাম্প বলেন, আমরা একসাথে আমেরিকাকে আবারও পরাক্রমশালী করে গড়ে তুলব। আমরা আমেরিকাকে আবারও সম্পদশালী করে গড়ে তুলব। আমরা আমেরিকাকে আবারও গর্বিত করব, আমরা আমেরিকাকে আবারও নিরাপদ বানাব এবং অবশ্যই, আমরা আমেরিকাকে আবারও ‘সেরা’ হিসেবে গড়ে তুলব। ঈশ্বর তোমাদের মঙ্গল করুন, ঈশ্বর আমেরিকার মঙ্গল করুন।
Ñসাইদ আহমেদ বাবু

Category:

Leave a Reply