মে দিবসের চেতনা, আমাদের সংবিধান ও উন্নয়ন

Posted on by 0 comment

uttaran May Coverস্বাধীনতার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি তথা মে দিবসকে ‘ছুটি’ হিসেবে ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর এই ঘোষণা শ্রমজীবী মানুষের ন্যায়সংগত সংগ্রাম, অধিকার এবং শোষণ-বঞ্চনা থেকে তাদের মুক্তির অঙ্গীকারের প্রতি সংহতির নজির।
কেবল মে দিবসে রাষ্ট্রীয় ছুটি ঘোষণাই নয়, বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের সংবিধানে শ্রমিক-কৃষক-শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট নিশ্চয়তার কথা সংযোজিত করেন।
আমাদের সংবিধানের ১৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে মেহনতি মানুষকে-কৃষক শ্রমিককে-জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তি দান করা।” এরপর ১৫ অনুচ্ছেদে বলা হয়, “রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন, যাহাতে নাগরিকদের জন্য নিম্নলিখিত বিষয়সমূহ অর্জন নিশ্চিত করা যায় :
ক. অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা;
খ. কর্মের অধিকার, অর্থাৎ কর্মের গুণ ও পরিমাণ বিবেচনা করিয়া যুক্তিসংগত মজুরির বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার;
গ. যুক্তিসংগত বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকার; এবং
ঘ. সামাজিক নিরাপত্তার অধিকার…।
সংবিধানের উল্লিখিত দুটি অনুচ্ছেদ এবং দুই শতাব্দীব্যাপী শ্রমিক-শ্রেণি ও মেহনতি মানুষের সংগ্রামের দাবি, আকাক্সক্ষা এবং স্বপ্নের কোনো পার্থক্য নেই। বাংলাদেশের সংবিধানের মতো এমন সুস্পষ্ট ভাষায় তৃতীয় বিশ্বের অন্য কোনো দেশের সংবিধানে এসব অধিকার, অঙ্গীকার ও লক্ষ্যের কথা ঘোষণা করা হয়েছে কি না, আমাদের জানা নেই।
সংবিধান হচ্ছে একটি দেশের মৌলিক দলিল। এ কথা সত্য, সংবিধানে ঘোষিত অঙ্গীকার ও লক্ষ্যগুলি রাতারাতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। ১৫ অনুচ্ছেদে যে, ‘পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের’ কথা বলা হয়েছে, সেই বিকাশ, ‘বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতিসাধন’ করতে না পারলে, ১৫ অনুচ্ছেদের ক, খ, গ ও ঘ ধারাগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়, এ কথা নিঃসন্দেহে সকলেরই বোধগম্য।
আমাদের দেশের স্বাধীনতার ৪৭ বছর এবং সংবিধান প্রণয়নের ৪৬ বছর ইতোমধ্যে অতিক্রান্ত হয়েছে। এই ৪৬ বছরে সংবিধানে বর্ণিত অঙ্গীকারসমূহ ও লক্ষ্য কতটা অর্জিত হয়েছে, স্বাভাবিকভাবেই এই জিজ্ঞাসা আমরা নিজেদেরই করতে পারি।
বাংলাদেশ এখন অনুন্নত বা পশ্চাৎপদ দরিদ্র দেশের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে এসেছে। আমাদের দেশ এখন ‘উন্নয়নশীল’ দেশের পঙ্ক্তিভুক্ত। আমাদের প্রবৃদ্ধির হার ভারতকে ছাড়িয়ে গেছে। আমাদের মাথাপ্রতি আয় ১৬৬০ ডলারে উন্নীত। আমরা এখন মধ্যম আয়ের দেশের সোপানে পা রেখেছি। আমাদের দেশ খাদ্যে আত্মনির্ভরশীল। আমাদের গড় আয়ুষ্কাল উপমহাদেশে সবচেয়ে বেশি, ৭২ বছর। আমরা কৃষিনির্ভরতা থেকে শিক্ষা ও সেবানির্ভর অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছি। নারীর ক্ষমতায়নে আমরা গ্লোবাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছি। আমাদের রয়েছে নির্ভরযোগ্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। আমরা নিজস্ব আয় দিয়ে পদ্মাসেতু নির্মাণ করছি। আমরা দারিদ্র্য ২২ শতাংশে কমিয়ে এনেছি। সবাই আমাদের বলে বিস্ময় অর্থনীতি বা মিরাক্যাল ইকোনমি।
এই যদি হয় উন্নতির, পরিকল্পিত বিকাশের ছবি, তাহলে স্বাভাবিকভাবে প্রত্যাশা করা যায় সংবিধানের ১৪ ও ১৫ অনুচ্ছেদে যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নের সময় এসে গেছে।
আমাদের স্বীকার করতেই হবে ১৪ ও ১৫ অনুচ্ছেদের প্রতিটি অঙ্গীকার না হলেও অনেকগুলোই ইতোমধ্যে আংশিক বা ক্ষেত্রবিশেষে বহুলাংশে বাস্তবায়িত হয়েছে।
কিন্তু মনে রাখতে হবে, উন্নতির ফসল যতটা গরিব, খেটে খাওয়া শ্রমজীবী মানুষের ঘরে যাওয়ার কথা ছিল, ততটা কিন্তু যায় নি। সমাজের যেমন সম্পদ বেড়েছে, তেমনি সম্পদের মালিকানা নিয়ে বৈষম্যও বেড়েছে। দারিদ্র্যের হার কমানো, নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য। কিন্তু সংবিধানে যা রয়েছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু যে কথা বলেছেন, সেই শোষণহীন, বৈষম্যমুক্ত সমাজ কিন্তু এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। উল্টো ধনী-দরিদ্রের পার্থক্য বেড়েছে। ধন বৈষম্য এখন আকাশচুম্বী। সমাজতন্ত্রের স্বপ্নের কথা বাদ দিলাম, একটি ‘কল্যাণরাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও কিন্তু আমরা কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারিনি।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে (২০১৪) বলা হয়েছে, ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে। জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আসন্ন নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জয়লাভ করলে, দেশের উন্নয়নের ও বিকাশের গতিমুখ নিশ্চিতভাবে সেদিকেই যাবে। কিন্তু সাথে সাথে মানুষে মানুষে, শ্রেণিতে শ্রেণিতে ভেদ-বৈষম্য ও শোষণ-বঞ্চনা কমাতে না পারলে উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য যেমন মুখ থুবড়ে পড়বে, তেমনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মে দিবসের চেতনা বাস্তবায়নও স্বপ্নই থেকে যাবে। আওয়ামী লীগ প্রমাণ করেছে, তারা যা বলে তা তারা বাস্তবায়িত করতেও সক্ষম। এজন্য অপেক্ষার পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষকে আরও সুসংগঠিত হতে হবে। শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে হবে। মে দিবসে দেশের শ্রমজীবী ভাই-বোনদের শুভেচ্ছাÑ অভিনন্দন।

Category:

Leave a Reply