‘যারা নিজেদের সভ্য ও উন্নত দেশ হিসেবে দাবি করে, তারাই ঘৃণ্য ঘাতকদের আশ্রয় দিয়েছে’

Posted on by 0 comment

জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

37উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফেরাতে তথ্য দিচ্ছে না পাকিস্তান। বঙ্গবন্ধুর পলাতক দুই খুনির খোঁজ পেতে পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
গত ২ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে ভাষণ দেন সংসদ নেতা শেখ হাসিনা। তিনি আওয়ামী লীগের উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের আশ্রয় দেওয়ায় কানাডা ও আমেরিকার সমালোচনা করে বলেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার হয়েছে। কয়েকজনের রায় কার্যকর হয়েছে। কয়েকজন বিভিন্ন দেশে পালিয়ে রয়েছে। অনেকবার সেসব দেশের সরকারের কাছে খুনিদের ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলেও তারা দেয়নি। ওই সব দেশের সরকারের কাছে সহযোগিতারও অনুরোধ করা হয়েছে। যে কারণেই হোক, তারা সহযোগিতা করছে না। এটিই হচ্ছে বাস্তবতা। এটিও দেশবাসীর জানা দরকার। তবে প্রচেষ্টা এখনও অব্যাহত রয়েছে। কূটনৈতিক ও আইনগতভাবে খুনিদের ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে। এ জন্য                      আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ইন্টারপোলের রেড   অ্যালার্ট জারি হয়েছে।
বিদেশে পলাতক খুনিদের ফিরিয়ে এনে বিচারের রায় কার্যকরের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যারা নিজেদের সভ্য ও উন্নত দেশ হিসেবে দাবি করে, তারাই ঘৃণ্য ঘাতকদের আশ্রয় দিয়েছে। এটি দুঃখজনক। কেন আমেরিকা ও কানাডার মতো দেশ এটা করছে, তা জানা নেই। তবে খুনি খুনিই। সে যেখানেই থাকুক। তাই বঙ্গবন্ধুর খুনিদের মধ্যে যারা বিদেশে পলাতক রয়েছে, তাদের ফিরিয়ে এনে ফাঁসির রায়                    কার্যকর করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও প্রাণনাশের চেষ্টা প্রসঙ্গে বলেন, যে দেশে খুনিদের পুরস্কৃত ও দায়মুক্তি দেওয়া হয়, সে দেশে পদে পদে বাধা ও আঘাত আসবেÑ সেটি তার জানা। কিন্তু তিনি মৃত্যুভয় ও ঘাতকদের পরোয়া করেন না। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য তিনি রাজনীতি করেন। তিনি তার জীবন এ দেশের মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছেন। আল্লাহ ছাড়া জীবনে কখনও কারও কাছে মাথা নত করেন নি, করবেনও না।
প্রধানমন্ত্রী জানান, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় দ-প্রাপ্ত খুনিদের মধ্যে দুজন আমেরিকায় ও একজন কানাডায় রয়েছে। দুজন লিবিয়ায় ছিল। পরে পাকিস্তানে গেছে। যদিও পাকিস্তান সরকার তা স্বীকার করে না। এ প্রসঙ্গে ওয়ান-ইলেভেনের সময় চ্যানেল আইয়ে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি কর্নেল রশিদের সাক্ষাৎকার প্রচারের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, চ্যানেল আইয়ের তৃতীয় মাত্রা যিনি চালান, সেই জিল্লুর রহমান বঙ্গবন্ধুর খুনি কর্নেল রশিদের ইন্টারভিউ করে নিয়ে এসেছিলেন। তার মানে তিনি জানেন, খুনি রশিদ কোথায়? তবে জানা গেছে, ওই সময় রশিদ লিবিয়ায় থাকলেও এখন পাকিস্তানে আছে। ডালিমও পাকিস্তানে। কিন্তু তাদের খোঁজ করার ব্যাপারে পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না।
সংরক্ষিত আসনের ফজিলাতুন নেসা বাপ্পির সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা তার প্রাণনাশের ষড়যন্ত্র প্রসঙ্গে বলেন, যত বাধা বা আঘাতই আসুক, তিনি ভয় পান না। আল্লাহ যতদিন বাঁচিয়ে রাখবেন, ততদিনই মানুষের কল্যাণে তিনি কাজ করে যাবেন। তার বিশ্বাস, সততা, দৃঢ়তা ও আদর্শ নিয়ে কাজ করলে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো যায়। তিনি সেই লক্ষ্য নিয়েই চাওয়া-পাওয়া সব কিছুর ঊর্ধ্বে থেকে নির্মোহভাবে দেশবাসীর জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। তাই কেন ভয় পেতে যাবেন? কেন ঘাতকদের পরোয়া করবেন?
স্বতন্ত্র সদস্য রুস্তম আলী ফরাজীর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর যারা উল্লসিত হয়েছিল, তারা স্বাধীনতার শত্রু। পরাজিত শক্তির পদলেহনকারী। বাঙালির বিজয় যারা মেনে নিতে পারেনি, তারাই সেদিন উল্লসিত হয়েছিল। আর পুরো বাঙালি জাতি বুঝতে পেরেছিল, বঙ্গবন্ধু হত্যার মাধ্যমে তাদের সবকিছু কেড়ে নেওয়া হয়েছে।
শেখ হাসিনা আরও বলেন, বঙ্গবন্ধু দেশের মানুষকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে আমৃত্যু ত্যাগ স্বীকার করে গেছেন। পৃথিবীর কোনো দেশের ইতিহাসে নেই যে, ইনডেমনিটি দিয়ে খুনিদের বিচার বন্ধ করা হয়। জিয়াউর রহমানরা তা-ই করেছিলেন।
ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য স্বল্পমূল্যে বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থটি সরবরাহের উদ্যোগের কথা জানিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশার যত ভাষণ, বক্তৃতা, স্বাধীনতা-পরবর্তী ভাষণ, কারাবন্দি থাকাবস্থায় লেখা ডায়রিগুলো সংগ্রহ করে বড় ধরনের ডকুমেন্টারি তৈরি এবং শিশুদের জন্যও কমিকস আকারে ছোট ছোট বই বের করে নতুন প্রজন্মের কাছে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার কাজ চলছে।
স্বতন্ত্র সদস্য হাজি মোহাম্মদ সেলিমের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী অতিরঞ্জিত নয়, বঙ্গবন্ধু ও স্বাধীনতা সম্পর্কে সঠিক তথ্যগুলো আগামী প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, পঁচাত্তর-পরবর্তী ২১ বছর বঙ্গবন্ধুর নাম অনেকটাই নিষিদ্ধ ছিল। স্বাধীনতার ইতিহাস বিকৃত করে কয়েকটি প্রজন্মকে ভুল ইতিহাস শেখানো হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ছবি টানানো এবং ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ বাজাতে গিয়ে আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মীকে জীবন দিতে হয়েছে। কিন্তু               সত্য ইতিহাসকে কখনও মিথ্যা দিয়ে ঢেকে রাখা যায় না। ঘাতকরা ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে পারলেও তার               আদর্শকে হত্যা করতে পারেনি। বাঙালির হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু চিরঞ্জীব, চির জাগরূক।
ফজিলাতুন নেসা বাপ্পির লিখিত প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকা–পরবর্তী সময়ে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে প্রবেশের পর ভয়াল ও বীভৎস দৃশ্যের আবেগঘন বর্ণনা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, খুনি মোশতাক ও তার দোসর জিয়াউর রহমান ১৫ আগস্টের হত্যাকা- ঘটায়। এরপরই দেশে হত্যা, ক্যু ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু।
শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৭৫ সালের ৩০ জুলাই আমি ও শেখ রেহানা জার্মানিতে রওনা হই। ১৫ দিনের মাথায় শুনি, আমরা দুই বোন এতিম হয়ে গেছি। নিঃস্ব ও রিক্ত হয়ে গেছি। আমি এখনও মাঝে মধ্যেই ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়িতে যাই। আমার সব ব্যথা-বেদনা সহ্য করার শক্তি আর বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলার জন্য কাজ করার প্রেরণা সঞ্চয় করার জায়গা এটি। এই বাড়ি থেকেই যেন শক্তি পাই। একদিকে সব হারানোর বেদনা, অন্যদিকে মানুষের সেবা করার প্রেরণাÑ সবই ধানমন্ডির এই বাড়িতে এলে পেয়ে থাকি।
এ সময় শেখ হাসিনা নিজের চোখের পানি সংবরণ করতে পারেননি। সংসদে উপস্থিত সংসদ সদস্যরাও আবেগাপ্লুত            হয়ে পড়েন।

Category:

Leave a Reply