যুদ্ধাপরাধী সুবহানের ফাঁসির রায়

Posted on by 0 comment

22উত্তরণ ডেস্ক : মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামাতের নায়েবে আমির আবদুস সুবহানকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদ-াদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাবনা জেলায় যুদ্ধাপরাধের হোতা সুবহানের বিরুদ্ধে আনা ৯টি মানবতাবিরোধী অভিযোগের মধ্যে গণহত্যা, হত্যা, অপহরণ, আটক, নির্যাতন, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও ষড়যন্ত্রের ৬টিই প্রমাণিত হওয়ায় তাকে সর্বোচ্চ এ দ-াদেশ দেওয়া হয়েছে।
গণহত্যা, হত্যা, অপহরণ, আটক, নির্যাতন, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও ষড়যন্ত্রসহ ৮ ধরনের ৯টি মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত হন পাবনা জেলা জামাতের প্রতিষ্ঠাতা আমির ও কেন্দ্রীয় সূরা সদস্য, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শান্তি কমিটির সম্পাদক ও পরবর্তীতে ভাইস চেয়ারম্যান, রাজাকার-আলবদর-আলশামস-মুজাহিদ বাহিনীর নেতা আবদুস সুবহান। পাবনায় যাবতীয় মানবতাবিরোধী অপরাধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, শান্তি কমিটি, রাজাকার-আলবদর বাহিনীর নেতৃত্ব দানকারী হিসেবে তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটিতেও। তার হাতে নির্যাতিত-ক্ষতিগ্রস্তদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণও দাবি করেছিলেন প্রসিকিউশন। তার বিরুদ্ধে প্রমাণিত ১, ২, ৩, ৪, ৬ ও ৭ নম্বরে ৬টি অভিযোগের মধ্যে ১, ৪ ও ৬ নম্বর অর্থাৎ ৩টি অভিযোগে মৃত্যুদ-াদেশ, ২ ও ৭ নম্বর অর্থাৎ দুটি অভিযোগে আমৃত্যু কারাদ- এবং ৩ নম্বর অভিযোগে আরও পাঁচ বছরের কারাদ-াদেশ দেওয়া হয় তাকে। অন্যদিকে ৫, ৮ ও ৯ নম্বরে ৩টি অভিযোগ প্রসিকিউশন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারেননি বলে উল্লেখ করে এসব অভিযোগ থেকে সুবহানকে খালাস দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি  দুপুরে এ রায় ঘোষণা করেন চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, বিচারক প্যানেলের সদস্য বিচারপতি মো. মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি শাহীনুর ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল। বেলা ১১টা ১৫ মিনিটে সুবহানের মামলার রায় ঘোষণা শুরু হয়ে বেলা ১১টা ৫ মিনিটে শেষ হয়। সংক্ষিপ্ত ভূমিকা শেষে ১৬৫ পৃষ্ঠার রায়ের সার-সংক্ষেপ পড়ে শোনান ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। এর আগে সকাল সাড়ে ১০টার পরে ট্রাইব্যুনালে এসে বেলা ১১টা ৩ মিনিটে এজলাসকক্ষে আসন নেন বিচারপতিরা। বেলা ১০টা ৫৮ মিনিটে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানা থেকে আসামির কাঠগড়ায় তোলা হয় সুবহানকে। সকাল ৮টা ৫৬ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে একটি মাইক্রোবাসে এনে সুবহানকে রাখা হয় হাজতখানায়। সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে কারাগার থেকে বের করে তাকে নিয়ে ট্রাইব্যুনালের উদ্দেশে রওনা হয় মাইক্রোবাসটি। তার পরনে ছিল সাদা রঙের পায়জামা-পাঞ্জাবি ও হাফহাতা সোয়েটার। তাকে চিন্তাযুক্ত দেখাচ্ছিল। পাবনা শহরের পাথরতলা মহল্লার মৃত নঈমুদ্দিনের ছেলে আবুল বসর মোহাম্মদ আবদুস সুবহান মিয়া এলাকায় পরিচিত ‘মাওলানা সুবহান’ নামে। পাবনার সুজানগর উপজেলার মানিকহাটি ইউনিয়নের তৈলকু-ি  গ্রামে জন্ম নেওয়া সুবহান পাকিস্তান আমলে পাবনা জেলা জামাতের প্রতিষ্ঠাতা আমির এবং দলটির কেন্দ্রীয় সূরা সদস্য ছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু হলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সাথে নিয়ে পাবনা জেলায় হত্যা, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট শুরু করেন আবদুস সুবহান। পরে তিনি পাবনা জেলা শান্তি কমিটির সম্পাদক এবং পরবর্তীতে ভাইস চেয়ারম্যান হন। তার নেতৃত্বে পাবনা জেলার বিভিন্ন শান্তি কমিটি, রাজাকার আলবদর, আলশামস ও মুজাহিদ বাহিনী গঠিত হয়।

23(1)কামারুজ্জামানের ফাঁসির চূড়ান্ত রায় প্রকাশ
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামাতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বে চার বিচারপতির বেঞ্চ কামারুজ্জামানের আপিল মামলার পূর্ণাঙ্গ এ রায় দিয়েছেন। বেঞ্চের অন্য তিন সদস্য হচ্ছেন বিচারপতি আবদুল ওহাব মিয়া, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১টা ৫৫ মিনিটে আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে ৫৭৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশ করা হয়। এর আগে বেলা সাড়ে ১২টায় চার বিচারপতি রায়ে স্বাক্ষর দেওয়া শেষ করেন। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের দিন থেকে রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করার জন্য ১৫ দিনের সময় পান আসামিপক্ষ। অভিযোগগুলোর মধ্যে সোহাগপুর গণহত্যার (৩ নম্বর) অভিযোগটিতে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ফাঁসির আদেশ বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের (৩:১) ভিত্তিতে ওই রায় বহাল রাখেন বিচারপতিরা। তাদের মধ্যে বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মৃত্যুদ-ের রায় বহাল রাখলেও বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহাব মিঞা যাবজ্জীবন কারাদ-াদেশ দেন। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফাকে হত্যার (৪ নম্বর অভিযোগ) দায়ে সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদ- দিয়েছেন আপিল বিভাগ। এ অভিযোগে কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদ- দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। অধ্যক্ষ আবদুল হান্নানকে নির্যাতন (২ নম্বর অভিযোগ) ও দারাসহ ছয় হত্যার (৭ নম্বর অভিযোগ) দায়ে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া যথাক্রমে ১০ বছর ও যাবজ্জীবন কারাদ-াদেশ বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। তবে মুক্তিযোদ্ধা বদিউজ্জামান হত্যার (১ নম্বর অভিযোগ) দায় থেকে আপিল বিভাগ তাকে খালাস দেন। এ অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল থেকে যাবজ্জীবন কারাদ- পেয়েছিলেন কামারুজ্জামান। এ ছাড়া, ৫ নম্বর (১০ জনকে হত্যা) ও ৬ নম্বর অভিযোগে (টুনু হত্যা ও জাহাঙ্গীরকে নির্যাতন) আপিল মামলার রায়েও খালাস পেয়েছেন কামারুজ্জামান। ট্রাইব্যুনাল থেকেও এ দুই অভিযোগে খালাস দেওয়া হয়েছিল তাকে। চূড়ান্ত রায়ে ৩ নম্বর অভিযোগে সোহাগপুরে গণহত্যার দায়ে ফাঁসির দ-াদেশ পেয়েছেন কামারুজ্জামান। প্রমাণিত এ অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরের ২৫ জুলাই আলবদর ও রাজাকাররা পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে শেরপুরের সোহাগপুর গ্রামে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং নারীদের ধর্ষণ করে। এটি কামারুজ্জামানের পরামর্শে পরিকল্পিতভাবে করা হয়। সেদিন ওই গ্রামে নাম জানা ৪৪ জনসহ ১৬৪ পুরুষকে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনার দিন থেকে সোহাগপুর গ্রাম ‘বিধবাপল্লী’ নামে পরিচিত। এই অভিযোগেই ফাঁসির আদেশ বহাল রাখেন আপিল বিভাগ।

23(2)জব্বারের আমৃত্যু কারাদ-
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় পার্টির সাবেক সংসদ সদস্য পিরোজপুরের পলাতক ইঞ্জিনিয়ার আবদুল জব্বারকে বয়স বিবেচনায় আমৃত্যু কারাদ- দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তার বিরুদ্ধে আনীত ৫টি অভিযোগের সব কটিই প্রমাণিত হয়েছে। সে অনুসারে ৮০ বছর বয়সী জব্বারের ফাঁসি হওয়ার কথা ছিল। তবে তার বয়স বিবেচনায় নিয়ে ১, ২, ৩ ও ৫নং অভিযোগে তাকে আমৃত্যু কারাদ-াদেশ দেওয়া হয়েছে। ৪নং অভিযোগে তাকে ২০ বছরের কারাদ- অনাদায়ে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১২টায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বে তিন সদস্যর বেঞ্চ এ আদেশ দেন। বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য হলেনÑ বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক। মোট ১৪১ পৃষ্ঠার রায়ের প্রথমাংশ আদালতে পাঠ করেন বিচারপতি আনোয়ারুল হক, দ্বিতীয় অংশ বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন এবং রায়ের মূল অংশ চেয়ারম্যান বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম পাঠ করে শোনান। এটি ট্রাইব্যুনাল-১ এর অষ্টম রায়। ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধ মামলায় পলাতক অবস্থায় চতুর্থ রায় এটি। এর আগে পলাতক থাকা অবস্থায় আবুল কালাম আজাদ, চৌধুরী মঈনুদ্দিন-আশরাফুজ্জামান, খোকন রাজাকারের বিরুদ্ধে রায় দেওয়া হয়েছে। রায়ে এদের প্রত্যেককেই ফাঁসির দ- দেওয়া হয়। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু, প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম, মোহাম্মদ আলী, তুরিন আফরোজ, জাহিদ ইমাম, রেজিয়া সুলতানা চমন উপস্থিত ছিলেন। জব্বারের পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবুল হাসান উপস্থিত ছিলেন। গত বছরের ৩ ডিসেম্বর উভয়পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়। এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে প্রসিকিউটর জাহিদ ইমাম যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেন। জব্বারের পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী আবুল হাসান যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। রাষ্ট্রপক্ষে শেষ ও ২৪তম সাক্ষী মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) হেলাল উদ্দিনকে আসামিপক্ষের জেরা শেষ করার মধ্য দিয়ে গত ১৭ নভেম্বর এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। জব্বারের বিরুদ্ধে গত ১৪ আগস্ট অভিযোগ গঠন করা হয়। ৭ সেপ্টেম্বর সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন শেষে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। এর আগে ৮ জুলাই ট্রাইব্যুনালের এক আদেশে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জব্বারকে গ্রেফতার করতে পারেনি। পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরও হাজির হননি জব্বার। এ জন্য তাকে পলাতক ঘোষণা করা হলো। এরপর আইনজীবী আবুল হাসানকে জব্বারের পক্ষে আইনি লড়াইয়ের জন্য রাষ্ট্রনিযুক্ত (স্ট্যাট ডিফেন্স) আইনজীবী নিয়োগ করা হয়। গত বছরের ১২ মে জব্বারের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনীত ৫টি অভিযোগ আমলে নিয়ে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল।

Category:

Leave a Reply