রাজনৈতিক দলসমূহের সাথে নির্বাচন কমিশনের সংলাপ

12অ্যাড. এবিএম রিয়াজুল কবীর কাওছার: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মহামান্য রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ১১৮(১) অনুচ্ছেদ মতে সকল রাজনৈতিক দলের সাথে সংলাপ করে সার্চ কমিটির মাধ্যমে নবগঠিত বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে জনগণ ও ভোটারদের প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রতিটি রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, আইনের সঠিক প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন, আইনি কাঠামোর হালনাগাদকরণ, নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ, নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়ন, ভোটকেন্দ্র স্থাপনসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের নির্বাচনী কাজে দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেও জনগণের প্রত্যাশার দিকে লক্ষ্য রেখে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষে নি¤েœাক্ত ৭-দফা রোডম্যাপ ঘোষণা করেÑ
১. আইনি কাঠামো পর্যালোচনা ও সংস্কার;
২. নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সহজীকরণ ও যুগোপযোগী করার লক্ষে সংশ্লিষ্ট সবার পরামর্শ গ্রহণ;
৩. সংসদীয় এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ;
৪. নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও সরবরাহ;
৫. বিধিবিধান অনুসরণপূর্বক ভোটবাক্স স্থাপন;
৬. নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন ও নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের নিরীক্ষা এবং
৭. সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সবার সক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যক্রম গ্রহণ।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা, নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার, মো. রফিকুল ইসলাম, বেগম কবিতা খানম ও বিগ্রে. জেনারেল (অব.) শাহাদত হোসেন চৌধুরী সমন্বয়ে গঠিত নির্বাচন কমিশন গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ দায়িত্ব গ্রহণের পর বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন উপরোক্ত রোডম্যাপের অংশ হিসেবে গত ৩০ জুলাই ২০১৭ থেকে ২৪ অক্টোবর ২০১৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত ৪০টি রাজনৈতিক দল, সাংবাদিক, সিভিল সোসাইটি ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের সাথে সংলাপের মধ্য দিয়ে মতবিনিময় করে। কমিশন প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের কাছে তাদের কর্মপরিকল্পনার বিষয় হিসেবে নি¤েœাক্ত বিষয়ে মতামত আহ্বান করেন।
ক্স বিদ্যমান ইংরেজি ভাষায় আইনি কাঠামো বিশেষ করে The Representation a People Order 1972, এবং  The Delimitation of Constitution Ordinance, 1976 যুগোপযোগী করে বাংলা ভাষায় প্রণয়ন;
ক্স বিগত নির্বাচনসমূহের অভিজ্ঞতায় অবৈধ অর্থ এবং পেশিশক্তির ব্যবহার রোধকল্পে আইনি কাঠামো সংস্কার প্রস্তাবনা;
ক্স সংসদীয় এলাকার সীমানা নির্ধারণ কল্পে জনসংখ্যার পাশাপাশি ভোটার সংখ্যা, সংসদীয় এলাকার আয়তন, প্রশাসনিক অখ-তা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিয়ে ডিজিটাল টেকনোলজি ব্যবহারের মাধ্যমে সীমানা নির্ধারণ;
ক্স নির্বাচনী প্রক্রিয়া যুগোপযোগী ও সহজীকরণের বিষয়ে আইনি কাঠামো ও প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন প্রবাসী ভোটারদের ভোটদান নিশ্চিত করার বিষয়ে একটি আইনি কাঠামোসহ প্রক্রিয়া প্রণয়নের জন্য প্রস্তাবনা;
ক্স কর্ম পরিকল্পনায় বর্ণিত অন্যান্য আইনি কাঠামোকে যুগোপযোগী করার জন্য প্রস্তাবনা;
ক্স নির্ভুল ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও বিতরণ নিশ্চিত করার জন্য পরামর্শ;
ক্স ভোটকেন্দ্র স্থাপন সংক্রান্ত কার্যক্রম যুগোপযোগী করার জন্য পরামর্শ;
ক্স নতুন রাজনৈতিক দল নিবন্ধন এবং নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নিরীক্ষা সংক্রান্ত প্রস্তাবনা;
ক্স সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য কর্মপরিকল্পনার অতিরিক্ত কোনো প্রস্তাবনা।

আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা বাংলাদেশে ৬৪ জেলায় ৪৯১টি উপজেলা-থানায় ৩০০টি নির্বাচনী আসনে প্রায় ১০ কোটি ২০ লাখ ভোটার ৪৬ হাজার ভোটকেন্দ্রের ৩ লক্ষাধিক ভোটকক্ষে ভোট প্রদান করবেন। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সারাদেশে প্রায় ৪৯১টি উপজেলায় ভোটকেন্দ্র, ভোটকক্ষ স্থাপন, ব্যালট পেপার মুদ্রণ, নির্বাচনে ভোট প্রদানে সিল, কালিসহ আনুষাঙ্গিক বিষয়াদি প্রস্তুত করার উদ্যোগ বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনকে এখনই গ্রহণ করতে হবে।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন উপরোক্ত বিষয়ে মতবিনিময়ের জন্য গত ১৬ জুলাই সাংবাদিক, ৩১ জুলাই সিভিল সোসাইটি, ২৪ আগস্ট বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ) ও বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোট (মুক্তিজোট), ২৮ আগস্ট বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমএল ও খেলাফত মজলিস, ৩০ আগস্ট বাংলাদেশ বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপা, ১০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, ১২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ১৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি ও ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ, ১৭ সেপ্টেম্বর ঐক্যবদ্ধ নাগরিক আন্দোলন ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি, ১৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-বাংলাদেশ ন্যাপ ও প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল (পিডিপি), ২০ সেপ্টেম্বর গণফ্রন্ট ও গণফোরাম, ২১ সেপ্টেম্বর জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ও ন্যাশনাল পিপলস্ পার্টি (এনপিপি), ২ অক্টোবর বাংলাদেশ মুসলিম লীগ ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ৪ অক্টোবর বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ ও জাকের পার্টি, ৮ অক্টোবর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ, ৯ অক্টোবর জাতীয় পার্টি, ১০ অক্টোবর বিকল্পধারা ও বাংলাদেশ ইসলামী ঐক্যজোট, ১১ অক্টোবর বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, ১২ অক্টোবর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি ও গণতন্ত্রী পার্টি, ১৫ অক্টোবর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি, ১৬ অক্টোবর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ও বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল (এমএল), ১৭ অক্টোবর বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি-বিএনএফ ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি, ১৮ অক্টোবর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং ১৯ অক্টোবর জাতীয় পার্টি-জেপি ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি। এরপর ২২ অক্টোবর পর্যবেক্ষক সংস্থা, ২৩ অক্টোবর নারী নেত্রী এবং ২৪ অক্টোবর নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের সাথে সংলাপের মাধ্যমে মতবিনিময় করেন।
আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অধিকতর সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সর্বজনগ্রাহ্য করার অভিপ্রায়ে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনে গত ১৪ অক্টোবর ২০১৭ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রস্তাবসমূহ নি¤œরূপÑ
১. ইংরেজি ভাষায় প্রণীত  The Representation of the People Order, 1972″ ও “The Delimitation of Constituencies Ordinance, 1976” -এর বাংলা সংস্করণ প্রণয়নের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। এতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সমর্থন থাকবে   (জচঙ-এর অনুচ্ছেদ ৯৪/এ অনুসরণ যোগ্য)।
২. নির্বাচনে অবৈধ অর্থ এবং পেশিশক্তির ব্যবহার রোধকল্পে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে বর্ণিত নির্বাচন সংক্রান্ত নির্দেশনা এবং বিদ্যমান নির্বাচনী আইন ও বিবিধমালা নিরপেক্ষ ও কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা।
৩. প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত এবং নির্বাচনী দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি বা সংস্থার অপেশাদার ও দায়িত্বহীন আচরণের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ।
৪. নির্বাচন পরিচালনায় কেবলমাত্র প্রজাতন্ত্রের দায়িত্বশীল কর্মচারীদের মধ্য থেকে যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার পদে নিয়োগ করা।
৫. তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণে আগ্রহী প্রার্থীদের বাছাই করে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী চূড়ান্ত করা।
৬. নির্বাচন পর্যাবেক্ষণের ক্ষেত্রে দেশি ও বিদেশি পর্যবেক্ষক নিয়োগে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও সতর্কতা অবলম্বন করা। কোনোভাবেই কোনো বিশেষ দল বা ব্যক্তির প্রতি আনুগত্যশীল হিসেবে পরিচিত বা চিহ্নিত ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা সংস্থাকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে দায়িত্ব প্রদান না করা।
৭. নির্বাচনের দিন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াসহ সকল গণমাধ্যম কর্মীদের বিধি-বিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে দায়িত্ব পালনের জন্য কার্যকর নির্দেশনা প্রদান। গণমাধ্যম কর্র্মীদের উপযুক্ত পরিচয়পত্র প্রদান ও তাদের দায়িত্ব কর্ম এলাকা নির্ধারণ করা।
৮. নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীসহ স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিয়োজিত পোলিং এজেন্টদের তালিকা ছবি ও  NID-সহ  (কেন্দ্রভিত্তিক) নির্বাচন অনুষ্ঠানের কমপক্ষে তিন দিন পূর্বে রিটার্নিং ও সহকারী অফিসারের নিকট প্রদান নিশ্চিত করা এবং প্রিজাইডিং অফিসার কর্তৃক তাদের পরিচয় নিশ্চিত হয়ে ভোটকক্ষে প্রবেশ ও নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত অবস্থানের অনুমতি প্রদানের বিষয়টি নিশ্চিত করা।
৯. সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য বর্তমানে বিরাজমান সকল বিধিবিধানের সাথে জনমানুষের ভোটাধিকার সুনিশ্চিত করার স্বার্থে আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহের ন্যায় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘ইভিএম’-এর মাধ্যমে ভোটদান প্রবর্তন করা।
১০. নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর হতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিন এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত নির্বাচন পরবর্তী সময়ের জন্য প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ন্যস্ত থাকবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে কোন পরিস্থিতিতে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের নিয়োগ করা যাবে ১৮৯৮ সালে প্রণীত ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৯-১৩১ ধারায় এবং সেনা বিধিমালায় in aid to civil power শিরোনামে সুস্পষ্টভাবে তার উল্লেখ রয়েছে।
১১. Delimitation বিষয়টি জনসংখ্যা বিশেষ করে আদমশুমারীর সাথে সম্পর্কিত। সর্বশেষ ২০১১ সালে আদমশুমারীর ওপর ভিত্তি করে (যা ২০১৩ সালে প্রকাশিত) ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে Delimitation করা হয়েছে। নতুন আদমশুমারী ব্যতীত পুনরায় Delimitation কার্যক্রম গ্রহণ করা হলে বিভিন্ন আইনগত জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। বিজ্ঞ কমিশন নিশ্চয়ই অবগত রয়েছেন, ২০১৮ সালের শেষ দিকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এমতাবস্থায় ৩০০ আসনের Delimitation-এর মতো একটি জটিল কার্যক্রম সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে যেসব আইনানুগ পদক্ষেপ গৃহীত হয়ে থাকে; তথা খসড়া থেকে আপিল নিষ্পত্তি পর্যন্ত যে মহাকর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করতে হয়, তা সময় স্বল্পতার কারণে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে কি না সে বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া অত্যাবশ্যক। কমিশনের সামনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছাড়াও স্থানীয় সরকারের অনেকগুলো নির্বাচন রয়েছে। সবদিক ভেবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনুরোধ জানান।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের সাথে সংলাপে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশনের নিকট অনলাইনের মনোনয়নপত্র জমার বিধান করা, সামরিক বাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতায় ভোটকেন্দ্রে প্রেরণ, পর্যবেক্ষক নিয়োগে সতর্ক থাকা, প্রবাসীদের ভোটার করা, সবার প্রার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা, প্রশাসন ঢেলে সাজানো, স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় নির্বাচনকালীন সময়ে কমিশনের অধীনে রাখা, নির্বাচনে ধর্মের ব্যবহার বন্ধ করা, যুদ্ধাপরাধীদের দলের নিবন্ধন না দেওয়া, সব প্রার্থীর প্রতিনিধির উপস্থিতিতে ভোট গণনা ও কেন্দ্রে ফলাফল ঘোষণা, ইসির কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে রিটানিং কর্মকর্তা নিয়োগ, ভোটকেন্দ্রে ও ভোটকক্ষে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, ১ শতাংশ সমর্থকদের স্বাক্ষরে বাধ্যবাধকতা বাতিল, হলফনামা বাতিল, সংসদের আসন বৃদ্ধি জামানতের টাকার পরিমাণ কমানো, নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া, নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার গঠন ইত্যাদি প্রস্তাব উপস্থাপন করেন।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭২ সালে নির্বাচন কমিশন গঠনসহ নির্বাচনী আইন ও বিধিমালাসহ The Presentation of People Order (RPO) প্রণয়ন করেন। যার অধীনে ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। গণতন্ত্র, সুশাসন ও উন্নয়নের সফল প্রতিষ্ঠান সুসংগঠিত হতে থাকে। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকা-ের মধ্য দিয়ে হত্যা, ক্যু ও ষড়যন্ত্রের হোতা মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান ও সেনা আইন লঙ্ঘন করে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে নিজেকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা দেন ও বাংলাদেশের সংবিধান ও সফল প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ধ্বংস করেন ও স্বৈশাসনের মধ্য দিয়ে অবৈধ ক্ষমতা দখলের বৈধতা দেওয়ার জন্য ১৯৭৭ সালের ৩০ মে হ্যাঁ/না ভোটের নির্বাচন করেন। এই ধারাবাহিকতায় ১৯৮১ সাল পর্যন্তও চলে। ১৯৮২ সালে এরশাদও একই কায়দায় বিভিন্ন নির্বাচন অনুষ্ঠিত করেন। যেখানে সাধারণ মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি, হোন্ডা-গু-ার মাধ্যমে নির্বাচন কেন্দ্র দখল করে নেওয়া হতো। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
২০০১ সালের ১ অক্টোবরে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে পরাজিত করার জন্য পরিকল্পিত উপায়ে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থাকে ব্যবহার করে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের পক্ষে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়। এ সময় নির্বিচারে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে এমন সকল ভোটার বিশেষত ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর এক নারকীয় তা-ব চালানো হয়। বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় তাদের নির্বাচনী এলাকা থেকে বিতাড়িত করা হয়। অনেক নেতাকর্মীকে পঙ্গু এবং মারাত্মকভাবে জখম ও হত্যা করা হয়।
নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে কেবলমাত্র ‘নৌকা’ প্রতীকে ভোট দেওয়ার অপরাধে, ক্ষেত্রবিশেষে শুধুমাত্র সন্দেহের বশবর্তী হয়ে বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় গিয়ে সিরাজগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী এবং সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, যশোর, খুলনাসহ দেশের প্রায় সকল জেলায় ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যসহ আওয়ামী নেতা-কর্মীদের ওপর এক বিভীষিকাময় সন্ত্রাসী কর্মকা- পরিচালনা করে।
এ সময় শিশু পূর্ণিমা, রাজুফা, ফাতেমা, মাহিমাসহ অগণিত নারী ও শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’-এর নামে সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে এমন জনমানুষের ওপর নির্বিচারে অত্যাচার ও অনেককে বিনাবিচারে হত্যা করা হয়।
২০০১ সালের ১ অক্টোবরে অনুষ্ঠিত নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিএনপি-জামাতের চারদলীয় জোটের সন্ত্রাসী দ্বারা ৪৩ জেলায় ৬২টি স্থানে ৩৪২ শিশুকে ধর্ষণ, নির্বিচারে গণধর্ষণ, লুণ্ঠন, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, হামলার মতো ভয়াবহ ঘটনা ঘটে। ধর্মীয় সংখ্যালঘু ছাড়াও সম্ভ্রান্ত ও নিরীহ সকল স্তরের মানুষের ওপর বর্বরতা চালানো হয়। অধিকাংশ জায়গায় নারী ও শিশুকন্যাদের টার্গেট করে হামলা চালানো হয় এবং জমি, বসতবাড়ি ও দোকানসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল করে নেওয়া হয়। বাগেরহাটের ফকিরহাটে বাবা-মা’র সামনে ১৩ বছরের একটি মেয়েকে ২২ জন ধর্ষণ করে হত্যা করে। কত বীভৎস ও পাশবিক হতে পারে তাদের নির্মমতা, তা এই একটি ঘটনার মধ্য দিয়েই ফুটে ওঠে। কার্যত প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা না থাকায় তৎকালীন নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে জনমানুষকে এই নির্যাতন থেকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়।
২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামাত জোটের শাসনকালে একদিকে যেমন সারাদেশে ‘বাংলাভাই’-এর নেতৃত্বে জঙ্গিবাদ ও উগ্র সাম্প্রদায়িকতা তার স্বরূপে আবির্ভূত হয়, অন্যদিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে তারেক জিয়ার নেতৃত্বাধীন ‘হাওয়া ভবন’কেন্দ্রিক দুর্নীতি ও দুঃশাসনের কালো ছায়ায় বাংলাদেশ প্রায় একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ২০০১ সালের ন্যায় কারচুপির মাধ্যমে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসার জন্য প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ ভুয়া ভোটার দিয়ে বিএনপি-জামাত জোট যে ভোটার তালিকা তৈরি করে তা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নিকৃষ্ট প্রহসন। এমনকি মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে এবং ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের চিহ্নিত ব্যক্তিদের বিশেষ উদ্দেশ্যে জেলা ও উপজেলা নির্বাচন অফিসার হিসেবে নিয়োগ প্রদানসহ রাষ্ট্রযন্ত্রের চরম অপব্যবহার করে বাংলাদেশের সামগ্রিক নির্বাচন ব্যবস্থাকেই বিনষ্ট করে দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২৩-দফার ওপর ভিত্তি করেই ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সের প্রচলন নির্বাচনে পেশিশক্তি ও অর্থের ব্যবহার বন্ধ; নির্বাচনে অংশগ্রহণেচ্ছুক প্রার্থীর সম্পদের বিবরণী প্রকাশ, চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পরপরই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের পথ বন্ধ করা, তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের মাধ্যমে সম্ভাব্য জনপ্রতিনিধির তালিকা প্রণয়ন এবং সেখান থেকে মনোনয়ন প্রদান, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের মধ্য থেকে নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসার নিয়োগসহ যে যে প্রক্রিয়ায় একটি নির্বাচন কলুষিত হতে পারে তার বিভিন্ন সংস্কার সাধন করা হয়। বিএনপি-জামাত জোটের নির্দেশনায় প্রণীত ভৌতিক ভোটার তালিকা থেকে ১ কোটি ২৩ লাখ ভুয়া ভোটার বাদ দেওয়া হয়।
১৯৭২ সালের The Representation of the People OrderSelection (নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া ও ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি হিসেবে পরিগণিত) প্রণীত হওয়ার পর দীর্ঘ সময়ে নির্বাচন সংক্রান্ত ২-৩টি অধ্যাদেশ/আইন প্রণয়ন করা হলেও প্রয়োজনীয় সকল আইন বা অধ্যাদেশই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯-১৬ এই সময়ের মধ্যেই সম্পাদিত হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন সংক্রান্ত প্রায় ৩২টি অধ্যাদেশ/আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। আর এসব কিছুরই একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা; অর্থাৎ সংবিধান অনুযায়ী মানুষের ভোটাধিকার সুনিশ্চিত করা। ২০১৪ সালে নির্বাচনে সকল দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং ঐ সময়ের বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নির্বাচন ও নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানান, এমনকি তাদের পছন্দনীয় নির্বাহী বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব অর্পণেরও প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু বিএনপি-জামাত জোট নেত্রী গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান ও দেশের বিরাজমান সকল আইন-কানুনের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পদত্যাগ দাবি করেন।
বিএনপি-জামাত জোট এবং তাদের পূর্বসূরি স্বৈরশাসকদের শাসনকাল পর্যালোচনা করলে একটি বিষয়ে সহজেই পরিস্ফুট হয়ে ওঠে, এই অপশক্তি কখনোই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসী নয়। বিএনপি ও জামাতের সমর্থন ও প্ররোচনায় ২০১৩ সালে হেফাজতিদের তা-ব, নির্বাচিত সরকার পতনের নীলনকশা; ২০১৪ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ভ-ুল করে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা রুদ্ধ করার অপচেষ্টা এবং ২০১৫ সালের পেট্রল বোমা মেরে মানুষ পুড়িয়ে ও অর্থ-সম্পদ ধ্বংস করে বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে থামিয়ে দেওয়া, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকাজকে ভ-ুল করা, গণতন্ত্র ধ্বংস এবং জনগণের ম্যান্ডেটের পরিবর্তে অন্য কোনো অবৈধ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে জনগণের সহায়-সম্পদ লুণ্ঠন করাই এই জোটের প্রধান লক্ষ্য।
বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বেগম খালেদা জিয়া ও তার পূর্বসূরি স্বৈরশাসক এরশাদ ও জিয়াউর রহমানের শাসনকালে নানাভাবে সমগ্র নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বারবার কলুষিত করা হয়েছে। এমনকি অবৈধভাবে ক্যান্টনমেন্টে জন্ম নেওয়া বিএনপি, জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বঘোষিত খুনিদের দিয়ে রাজনৈতিক দল সৃষ্টি করে সেই রাজনৈতিক দলকে নিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে তাকে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের আসনে বসায়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াত-ই-ইসলামী এবং বঙ্গবন্ধুর স্বঘোষিত খুনিদের রাজনৈতিক দল ফ্রিডম পার্টির হাতে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তুলে দিয়ে, শুধু যে নির্বাচন ব্যবস্থারই ধ্বংস সাধন করা হয়েছিল তা নয়, এই অপশক্তি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকেই নস্যাৎ করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল।
সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রযন্ত্রের কার্যকর ভূমিকার পাশাপাশি নির্বাচন প্রত্যাশী সম্ভাব্য জনপ্রতিনিধি নির্বাচন (Selection) করার ক্ষেত্রেও নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলসমূহের গণতান্ত্রিক ও দায়িত্বশীল আচরণও খুবই জরুরি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দৃষ্টান্ত অনুসরণযোগ্য। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগই সর্বপ্রথম ২০০৮-এর নির্বাচনে তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের ভোটের মাধ্যমে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণে আগ্রহী প্রার্থীদের বাছাই করে পরবর্তীতে নির্বাচন পরিচালনার জন্য সংগঠনের দায়িত্বপ্রাপ্ত জাতীয় নির্বাচনী বোর্ডের মাধ্যমে প্রার্থী চূড়ান্ত করে। প্রায় ১০ লাখ নেতাকর্মী এই প্রক্রিয়ায় শামিল হয়ে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এবং বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও প্রার্থী বাছাইয়ের এই ধারা অব্যাহত থাকে। নির্বাচন প্রক্রিয়ার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল কর্তৃক নিয়োজিত পোলিং এজেন্টদের ভূমিকা। নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়ে পোলিং এজেন্টদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ থাকলে এবং সংশ্লিষ্ট নির্বাচন কেন্দ্রের ভোটারদের মধ্য থেকে পোলিং এজেন্ট নিয়োগ করা হলে নির্বাচনে জাল ভোট প্রয়োগের প্রবণতা প্রায় বন্ধ করা সম্ভব। বিভিন্ন সময়ে লক্ষ্য করা গিয়েছে প্রধান দু-একটি রাজনৈতিক দল ব্যতীত অন্যান্য রাজনৈতিক দলের পোলিং এজেন্টগণ হয় নির্বাচন কেন্দ্রে যান না অথবা নির্বাচন শুরু হওয়ার দু-এক ঘণ্টার মধ্যেই নির্বাচন কেন্দ্রের বাইরে এসে মনগড়া বিভিন্ন গুজব ছড়াতে থাকে। এ লক্ষ্যে যদিও নির্বাচন আচরণ বিধিমালা প্রণীত হয়েছে, তথাপি সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দল কর্তৃক নিয়োজিত পোলিং এজেন্ট নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বাধিক সর্তক হওয়া আবশ্যক।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর হতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দিন এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত নির্বাচন-পরবর্তী সময়ের জন্য প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।
উপরন্তু বর্তমানে পুলিশ, র‌্যাব, আনসার, বিজিবি ও কোস্টগার্ডসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জনবল ও সক্ষমতা পূর্ববর্তী যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সংস্থাগুলো একই মন্ত্রণালয়ের অর্থাৎ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত। অন্যদিকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রতিরক্ষা বাহিনীসমূহ ন্যস্তÑ যা কোনোমতেই আর একটি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত হতে পারে না। রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে কেবলমাত্র সরকারকে সহযোগিতা করতে পারে।
ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা প্রণয়ন, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স ও ইভিএম-এর প্রবর্তন, নির্বাচনে অর্থ ও পেশিশক্তির ব্যবহার রোধে নানাবিধ আইন ও বিধি প্রণয়ন, নির্বাচনী আচরণ বিধিমালা তৈরি, তৃণমূলের ভোটের মাধ্যমে প্রার্থী বাছাই, দেয়াল লিখন ও রঙিন পোস্টারের পরিবর্তে সাদা-কালো পোস্টারের প্রবর্তন, নির্বাচন কমিশন সচিবালয় স্থাপন এবং নির্বাচন কমিশনকেই তাদের নিজস্ব জনবল নিয়োগের ক্ষমতা অর্পণ, প্রয়োজনীয় আর্থিক তহবিল প্রদান, সাধারণ প্রশাসনের ওপর নির্বাচনকালীন সময়ে নির্বাচন কমিশনের তত্ত্বাবধান, নির্বাচনী অপরাধ প্রতিরোধে এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট ও জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পর্যাপ্ত সংখ্যক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা এবং যানবাহনের নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সামগ্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যে দৃশ্যমান উন্নতি সাধিত হয়েছে তার সকল কিছুর মূলে রয়েছে আওয়ামী লীগ কর্তৃক উপস্থাপিত ২৩-দফা। এমনকি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সাংবিধানিক পদের অধিকারীদের সমন্বয়ে সার্চ কমিটির মাধ্যমে ইলেকশন কমিশনের প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ‘বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন’ পূর্বের যে কোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে সর্বাধিক সক্ষমতা ও দক্ষতার সাথে তাদের দায়িত্ব পালনে সক্ষম হচ্ছে। নির্বাচনে জনমানুষের ভোটাধিকার নিশ্চিতকল্পে দেশরতœ জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
সুষ্ঠু অবাধ ও সর্বজনগ্রাহ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সর্বাধিক গুরুত্বপর্ণ হচ্ছে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয় সংস্কার ও নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও সক্ষমতা। এগুলোর পরিপূর্ণতা দেওয়ার জন্যই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভাপতি ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই নানাবিধ পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে চলেছেন। যার সুফল আজকের নির্বাচন কমিশন আমরা মনে করি, বর্তমান প্রচলিত সীমানা নির্ধারিত আসনের সাথে নতুন সৃষ্ট প্রশাসনিক এলাকা (উপজেলা, থানা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড) ও বিলুপ্ত ছিটমহলগুলো মূল ধারার সাথে অন্তর্ভুক্ত করে পুনর্নির্ধারিত নির্বাচনী আসনে সক্ষমতা নিয়ে সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্তমান সংবিধান ও গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও)-এর মাধ্যমেই সুষ্ঠু অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে।

লেখক : সদস্য, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

Category:

Leave a Reply