রাশিয়ার চেখভ স্টুডিও’র বাংলাদেশে নাট্যভ্রমণ

Posted on by 0 comment

56আবু সুফিয়ান আজাদ: নাটকে যে ঘটনাগুলো উপস্থাপন করা হয় তা মূলত সমাজেরই ঘটে যাওয়া কোনো না কোনো ঘটনার অংশ। ফ্যান্টাসিনির্ভর নাটকও আমাদের ভাবনার বা চেতনার বহিঃপ্রকাশ। অর্থাৎ নাটক আমাদের আচার-ব্যবহার, অভ্যাস, কৃষ্টি থেকে শুরু করে সমাজের মানুষগুলোর ভাবনা-চেতনাও তুলে ধরে। মঞ্চনাটক মানুষের বিনোদনের অতি প্রাচীন একটি মাধ্যম। নৃত্যকলার পাশাপাশি কাহিনিনির্ভর নৃত্য বা নাট্যকলার চর্চা এই বাংলায়ও অতি প্রাচীন। আজ থেকে প্রায় ১২০০ বছর আগে অষ্টম শতকের পাল শাসকের সময় বাংলায় যে সমাজ বা সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল সে সময়ও নাট্যকলার প্রচলন ছিল বলে অনেক গবেষক মনে করেন। বহু আগেই হয়েছে সংস্কৃতি আদান-প্রদানের সূচনা। বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন নাট্যগোষ্ঠী যেমন বিভিন্ন দেশে গিয়ে তুলে ধরে বাংলার সমাজ-সংস্কৃতি, তেমনি আবার ভিন্ন সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার আগ্রহ থেকে ভিনদেশি নাট্য সম্প্রদায়কে আমন্ত্রণ জানানো হয় আমাদের দেশে কিংবা ভিনদেশি নাট্য সম্প্রদায়ও আমাদের দেশে আসার আগ্রহ প্রকাশ করে।
গত ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি সম্পন্ন হলো সে ধরনের একটি আয়োজন। বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে রাশিয়ার প্রখ্যাত নাট্যদল ‘চেখভ স্টুডিও’ তাদের দুটো প্রয়োজনসহ নাট্যদক্ষ শিল্পী-শিক্ষক নিয়ে বাংলাদেশ ভ্রমণ করেন। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে মঞ্চস্থ হলো চেখভ ও গাংচিল এবং ভল্লুক শিরোনামের রাশিয়ার চেখভ স্টুডিওর দুটি নাটক।
নাটকটিতে অনেকগুলো ত্রিভূজ প্রেমের সম্পর্ক প্রকাশ পায়। স্কুলশিক্ষক মেদভেদেস্কো ভালোবাসে খামারবাড়ির তত্ত্বাবধায়কের মেয়ে মাশাকে। এদিকে মাশা ভালোবাসে কনস্তানতিনকে। আবার কনস্তানতিন ভালোবাসে নিনা জারেচনায়াকে। কিন্তু নিনা ভারোবাসে ত্রিগোরিনকে। পলিন যে ইলিয়া শামরায়েভের স্ত্রী, তার আবার ডাক্তার ডনের সাথে প্রেম। কনস্তানতিনের প্রতি মাশার ভালোবাসার কথা যখন সে ডর্নকে জানায়, তখন ডর্ন অসহায়ের মতো হ্রদটিকেই দোষারোপ করে প্রত্যেকের মনে প্রেম জাগিয়ে তোলার জন্য।
ভল্লুক নাটকটি নির্দেশনায় ছিলেন যৌথভাবে ভøাদিমির বাইচার ও তাতিয়ানা ফেদিয়ুশিনা। অভিনয়ে ছিলেন মারিনা সুভোরোভা, সেরগেই ফাতিয়ানভ, ইউরি গলিশেভ। ভল্লুক নাটকটির মাধ্যমে নির্মাতা একজন নারীর মনে নীতির প্রতি যে ভালোবাসা সেটা ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। নাটকের এলেনা আইভানভলা নারী চরিত্রটি স্বামী বিয়োগের পর তার স্বামীর আলোকচিত্রের দিক তাকিয়ে কাটিয়ে দেন অনেকগুলো দিন। মানসিক এই করুণ অবস্থার ভিতরেই শুরু হয় উটকো ঝামেলা। প্রতিবেশী ভূস্বামী গ্রিগরি আইভানোভিচ আসে স্বামীহারা এলেনা আইভানভার কাছে তার স্বামীর গ্রহণ করা ঋণের টাকা পরিশোধ করার প্রস্তাব নিয়ে। এ বিষয়কে কেন্দ্র করে দুজনের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়। ক্ষুব্ধ গ্রিগরি আইভানোভিচ অপমানের জ্বালা সইতে না পেরে পোপোভাকে ডুয়েল লড়তে আহ্বান জানায়। পোপোভাও আগ্রহের সাথে লড়তে রাজি হয়। কিন্তু সে জানে না কীভাবে বন্দুক চালাতে হয়, তাই ভদ্র মহিলা আগন্তুককে অনুরোধ করে সে যেন তাকে বন্দুক চালনা শিখিয়ে দেয়। সুন্দরী বিধবার সাহসের তারিফ করে গিগেরি তাকে দেখিয়ে দেয় কীভাবে বন্দুক চালিয়ে গুলি করতে হয়। এই শেখানোর সময়েই সে ভদ্র মহিলার কোমর ধরে গভীর আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয়। সবশেষে দেখা যায়, শিক্ষক ও ছাত্রী হাতে পিস্তল ধরে আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে প্রগাঢ় চুম্বন করছে। আর এই দৃশ্য দেখে বিশ্বস্ত চাকর লুকা যে তার বাড়িওয়ালীকে রক্ষা করতে এসেছিল সে হতভম্ব হয়ে একেবারে পাথর বনে যায়।
নাটক দুটির মাধ্যমে লেখক গভীর ভালোবাসার প্রকাশ ঘটানোর চেষ্টা করেছেন। বিশেষ করে ভল্লুক নাটকটিতে মারণাস্ত্র হাতে নিয়েও মানুষের যে প্রকৃত গুণ বা গুণ হওয়া উচিত, সে ভালোবাসার যে বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে তা সত্যি অসাধারণ। এই নাটকটির মাধ্যমে উপলব্ধি করা যায়Ñ অস্ত্র নয়, ভালোবাসাই সকল বিবাদ মীমাংসার মাধ্যম।
এ আয়োজনের পৃষ্ঠপোষকতায় ছিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরমেন্স স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. ইসরাফিল শাহীন, ৯ ফেব্রুয়ারির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপি, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকাস্থ রুশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার আইভানোভিচ ইগনাতভ।

Category:

Leave a Reply