রোজার শেষে আসছে ঈদ

Posted on by 0 comment

22সরদার মাহামুদ হাসান রুবেল: রোজা মুসলিম জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ, আত্মসংযম, আত্মশোধনের ক্ষেত্রে এক বিশাল ভূমিকা পালন করে থাকে। মানুষ রোজার শেষে নিষ্পাপ, নির্দোষ, নির্ভেজাল স্বচ্ছ জীবন লাভ করে থাকে ঈদুল ফিতর উদযাপনের মধ্য দিয়ে। সারাবছরে তার দেহে ও প্রাণে জমে ওঠা নানা রোগ, শোক, কুস্বভাব, কৃপ্রবৃত্তি, কুদৃষ্টি ইত্যাদির নিয়ন্ত্রণ ও সংযম সাধনের মাধ্যমেই রোজা ও ঈদুল ফিতরের তাৎপর্য নিহিত। প্রকৃত প্রস্তাবে সুষ্ঠু ও ধর্মীয়ভাবে সিয়াম সাধনার মাধ্যমেই মুসলিম নর-নারী লাভ করে প্রকৃত সাফল্য। রোজা সামাজিক সাম্য, অর্থনৈতিক সমতা, ন্যায়ভিত্তিক মানবিক চেতনা, মানুষে মানুষে পারস্পরিক সহানুভূতি-সহমর্মিতা ও উদার ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টির মহত্তম প্রেরণা জোগায়। ইসলামের প্রতিটি বিধানই মানুষের কল্যাণ, সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা-সৌহার্দ্য সৃষ্টির পথ উন্মুক্ত করে। আরবি ‘রমজ’ শব্দ থেকে রোজা শব্দের উৎপত্তি। ‘রমজ’ অর্থ পোড়ানো বা জ্বালানো। আগুনে পুড়িয়ে কোনো ধাতুকে যেমন নিখাদ করা হয়, রোজাও তেমনি। রোজা মানুষের অসৎ প্রবৃত্তিকে নাশ করে সুপ্রবৃত্তির বিকাশ ঘটায়। রোজার উদ্দেশ্য মানুষকে প্রকৃত মানুষ (ইনসানে কামিল) করে তোলা, মানবিক মহৎ গুণাবলি অর্জনের মাধ্যমেই প্রকৃত মানুষ বা ইনসানে কামিল হওয়া সম্ভব। মানুষকে সে ধরনের উন্নত চরিত্র বিশিষ্ট মানবিক সত্তায় পরিণত করাই রোজার উদ্দেশ্য। সামাজিক পরিবেশ সুস্থ-স্বাভাবিক ও সর্বপ্রকার কলুষতামুক্ত করার জন্য রোজা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সমাজের মানুষ যদি নিষ্ঠার সাথে রোজাব্রত পালন করে তা হলে সমাজে অন্যায়-অশান্তি ও অপরাধমূলক কাজ সংঘটিত হতে পারে না। তাই সমাজ সংস্কার বা সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় রোজার বিধান অতি গুরুত্বপূর্ণ। এই মাসে যে কোনো মুসলিম সমাজে অসামাজিক ও অপরাধমূলক কাজ তুলনামূলকভাবে কম হয়। সমবেতভাবে ইফতার করার ফলে পারস্পরিক সম্প্রীতি-সৌহার্দ্য সামাজিক সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি করে। এ সাম্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টির উদ্দেশে রাসূলুল্লাহ (স.) রোজাদারদের ইফতার করানোর ব্যাপারে সকলকে উৎসাহিত করেছেন। রোজা ব্যক্তি মানুষের চিন্তা-বিশ্বাস, আমল-আখলাক, আচার-আচরণ, ব্যবহারিক ও আধ্যাত্মিক জীবনধারায় এক বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন নিয়ে আসে। মানুষকে তার পাশবিক প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করে তার মানবিক বোধ ও সত্তাকে জাগ্রত করে। রোজা ব্যক্তি জীবনে যে প্রভাব বিস্তার করে, সামাজিক-অর্থনৈতিক ও সামগ্রিক জীবন-ব্যবস্থায়ও তেমনি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে আসে। রোজা ব্যক্তি জীবনে যেরূপ বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন আনে সামাজিক জীবনধারায়ও তেমনি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে আসে।
রোজাদারের মনে সব সময় এক পবিত্র অনুভূতি জাগ্রত হয়, যা তাকে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালনে উদ্বুদ্ধ করে। এভাবে রমজানে মানুষের সামগ্রিক জীবন ধারায় ও সমাজ-পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটায়। রোজা যে পবিত্রতা ও সংযমের শিক্ষা দেয়, সে কারণে সামগ্রিকভাবে সমাজ-জীবনে এক ধরনের ভাব-গাম্ভীর্যপূর্ণ সুন্দর অনাবিল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। রমজানে প্রত্যেকটি ভালো কাজের জন্য ৭০ থেকে ৭০০ গুণ পর্যন্ত অধিক সওয়াব। তাই এ মাসে রোজাদারগণ রমজানের রাতগুলো যথাসম্ভব বেশি বেশি ইবাদতের মধ্যে মশগুল থাকেন। রমজান আমাদের দৈনন্দিন জীবনের রুটিন যেমন বদলে দেয়, তেমনি সামাজিক পরিবেশ পাল্টে দিয়ে এক অনবদ্য পবিত্র ভাবধারায় জীবনকে নতুনভাবে উজ্জীবিত ও সমাজ-পরিবেশকে সুন্দর করে তোলে। আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাস ও তার প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য প্রদর্শনের দ্বারা রোজাদাররা পুরো রমজান মাস কঠোর সংযম ও সাধনায় অতিবাহিত করার ফলে এ মাসে আমাদের দৈনন্দিন জীবনধারা ও সামগ্রিক সমাজ পরিবেশে আমূল পরিবর্তন ঘটে। রোজা আমাদের জীবন ও সমাজকে পবিত্রতার চাদরে আচ্ছাদিত করে দেয়। রোজা মানুষের জীবন ও পরিবেশ বদলে দেবার এক অসাধারণ শক্তি রাখে বলেই রোজার প্রভাব আমাদের জীবন ও সমাজে সুস্পষ্ট ও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। সমাজের অর্থনৈতিক অবস্থা পরিবর্তনেও রমজানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। রমজানে সদাকাতুল ফির্ত আদায় করা হয়। জাকাত-ফিতরা-সদকা ইত্যাদি কোনো দান বা করুণা নয়, এসবই ধনীর বিত্তে গরিবের ন্যায্য অধিকার। জাকাত, ফির্ত, সদকা দারিদ্র্য বিমোচনের নিশ্চিত গ্যারান্টি। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে যথাযথভাবে গরিব ও অভাবীদের মধ্যে এগুলো বিতরণের ব্যবস্থা করলে সারাদেশের দারিদ্র্য একপর্যায়ে অবশ্যই দূর হবে। সুসংগঠিতভাবে জাকাত আদায় ও বণ্টনের ব্যবস্থা করে স্ব-স্ব এলাকার দারিদ্র্য বিমোচনে যথার্থ ভূমিকা রাখলেও ইপ্সিত ফল পাওয়া সম্ভব। প্রকৃতপক্ষে, কোনো মুসলিম সমাজে দারিদ্র্য কোনো চিরস্থায়ী ব্যবস্থা হতে পারে না এবং ভিক্ষুকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে জীবিকা সংগ্রহের প্রয়োজন পড়ে না। ইসলাম ভিক্ষাবৃত্তিকে নিরুৎসাহিত করেছে। রমজানে এ বিধান পালন করে সমাজের দরিদ্র, অসহায় মানুষের সম্মানজনক, নিরাপদ ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের ব্যবস্থা করা সম্ভব।
ঈদ মানব সমাজের ধনী-গরিব ব্যবধান ভুলিয়ে দেওয়ার একটি দিন। ঈদের দিনে সবাই সমান। রোজার শেষে শাওয়াল মাসের প্রথম দিনে ঈদ উদযাপিত হয়। ঈদ রোজারই অংশ। রোজা পালনের ফলে মুমিন ব্যক্তি যে তাকওয়ার গুণ অর্জিত হয়, তার শুকরিয়া হিসেবে ঈদ উদযাপিত হয়। ঈদের আনন্দে নারী-পুরুষ, শিশু-যুবা-বৃদ্ধ, গরিব-দুঃখী, রাজা-প্রজা, মালিক-শ্রমিক সকল শ্রেণির মানুষ একত্রে শরিক হয়। একসঙ্গে সকলে ঈদের নামাজ আদায় করে। নামাজ শেষে সৃষ্টি হয় এক অসাধারণ সাম্য-সহমর্মিতা ও উদার ভ্রাতৃত্বপূর্ণ পরিবেশ। বস্তুগত জাগতিক প্রাচুর্য, ঐশ্বর্য ও ধন-সম্পদের মোহ থেকে যথাসম্ভব মুক্ত রেখে মানুষের অন্তরকে বিকশিত নির্মল উজ্জ্বল ও সুন্দর করে তোলাই সিয়াম সাধনার উদ্দেশ্য আর ঈদ-উৎসবের মাহাত্ম্য। ঈদ মানুষের মধ্যে ইসলামের সাম্য ও মৈত্রীর বন্ধন সৃষ্টি করে। ভেদাভেদহীন সমাজ তৈরির বিষয়টি পবিত্র ঈদ উৎসবের মধ্যে নিহিত রয়েছে। এভাবে যে সামাজিক সাম্য-সমতা-সহমর্মিতা ও উদার ভ্রাতৃত্বপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি হয়, তা কি শুধু ঈদের দিনের জন্যই? মূলত ইসলামে মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ নেই, মানবিক মর্যাদা ও অধিকারের ক্ষেত্রে সকল মানুষ এক ও অভিন্ন। সব মানুষ এক আদমের সন্তান। রোজা ও ঈদের শিক্ষার আলোকে বৈষম্যহীন, ভ্রাতৃত্বপূর্ণ, কল্যাণময়, ন্যায়ানুগ মানবিক উদার সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হওয়া মুসলিম মিল্লাতের কর্তব্য। আসন্ন রমজান ও ঈদের উৎসবকে আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত না করে আমরা রোজা ও ঈদের প্রকৃত শিক্ষার বাস্তব রূপদানে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হলে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে উঠবে। রমজানের কঠোর কৃচ্ছ্রসাধন ও ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পাবে ও তাৎপর্যম-িত হয়ে উঠবে এবং সেদিনই আমরা জাতীয় কবির অমর গাঁথাÑ ‘রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশীর ঈদ’ সকলে সমবেত কণ্ঠে প্রাণভরে গেয়ে আনন্দে মাতোয়ারা হয়ে উঠব, ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে পড়বে সকল প্রাণে, সমাজে, আকাশে-বাতাসে, বিশ্ব চরাচরে সর্বত্র।

Category:

Leave a Reply