রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন, মানবিক সমস্যা অমানবিক ষড়যন্ত্র

এ-কথা সর্বজন স্বীকৃত যে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যও একটি মানবিক সমস্যা। এই সমস্যার শান্তিপূর্ণ ন্যায়সংগত একমাত্র সমাধান হচ্ছে রোহিঙ্গারা যে দেশের নাগরিক, সেই মিয়ানমারে তাদের দ্রুত প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন। এই সমস্যাটি উপেক্ষা করা বা জিইয়ে রাখা কেবল বাংলাদেশের জন্যই সংকট ডেকে আনবে না, মিয়ানমার ও প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যও একটি বিস্ফোরক উপাদান হিসেবে সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। ইচ্ছে করলেও সংকটের উপায় থেকে বৃহৎ শক্তিধর দেশগুলোও রক্ষা পাবে না।
সম্প্রতি আমরা লক্ষ করছি, দেশের ভিতরে ও বাইরের কিছু অপশক্তি এই মানবিক সমস্যাটিকে নিয়ে অমানবিক নিষ্ঠুর ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। রোহিঙ্গাদেরও এই ষড়যন্ত্রের ফাঁদে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে। অতীতে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও তাদের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বাংলাদেশ ভূখ-ে আশ্রয়গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদের মধ্যে এবং আরাকান অঞ্চলের রোহিঙ্গাদের নিয়ে একাধিক সশস্ত্র গ্রুপ সংগঠিত করার কাজে যেমন মদত জুগিয়েছে, তেমনি বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার জন্যও নানারকম ফন্দিফিকির করেছে। আরাকান লিবারেশন আর্মি, আরাকান আর্মি (এএ), আরাকান লিবারেশন ফ্রন্ট (এএলপি), আরাকান লিবারেশন পার্টি, আরাকান মুজাহিদ পার্টি, আরাকান পিপলস আর্মি, আরাকান রোহিঙ্গা ফোর্স, আরাকান রোহিঙ্গা ইসলামিক ফ্রন্ট, আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (এআরএনও), ইউনাইটেড স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন অব আরাকান মুভমেন্ট, ডেমোক্রেটিক পার্টি অব আরাকা, মুসলিম লিবারেশন ফ্রন্ট অব বার্মা, রোহিঙ্গা ইন্ডিপেন্ডেস ফোর্স, রোহিঙ্গা ইন্ডিপেন্ডেস ফোর্স, রোহিঙ্গা ইসলামি ফ্রন্ট, রোহিঙ্গা প্যাট্রিয়টিক ফ্রন্ট, রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন, লিবারেশন মিয়ানমার ফোর্স প্রভৃতি নামে সশস্ত্র গ্রুপগুলো বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে চট্টগ্রামে হেড কোয়ার্টার করে অস্ত্র চোরাচালানি, ড্রাগ চোরাচালানিসহ নানারকম সমাজবিরোধী তৎপরতা চালিয়েছিল। ঐ সময়ের জোট সরকারের ছত্রছায়ায় এসব ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু ২০০৯ সরকার গঠনের পর জননেত্রী শেখ হাসিনার কঠোর হস্তে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সকল রকম বে-আইনি সশস্ত্র তৎপরতা বন্ধ করে দেয়। অস্ত্র চোরাচালানি, ড্রাগ চোরাচালানির মতো অপরাধকে জিরো টলারেন্স নিয়ে মোকাবিলা করা হয়। বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তকে শান্তির সীমান্ত হিসেবে স্থিতিশীল রাখার জন্য দ্বিপাক্ষিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। বাংলাদেশের ভেতরে মিয়ানমার-ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর কোনো ইসলামি গ্রুপ যাতে ঠাঁই না পায়, বাংলাদেশের ভূ-খ- ব্যবহার করার সুযোগ যাতে তারা না পায়, তা নিশ্চিত করা হয়।
বাংলাদেশের এই অবস্থানের ফলে যেমন ভারতের বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গ্রুপই দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তেমনি মিয়ানমারেরও কয়েকটি বামপন্থি বিদ্রোহী গ্রুপ, যেগুলো বাংলাদেশের (বান্দরবান) দুর্গম অরণ্য ও পাহাড়ি এলাকায় ঢুকে পড়ত, তা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
পরিতাপের বিষয় মিয়ানমার, না বাংলাদেশের প্রস্তাব, না কফি আনান কমিশনের প্রস্তাবÑ কারও প্রস্তাবই গ্রহণ করেনি। মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত মানুষগুলোকে সেদেশে পর্যায়ক্রমে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারেও দ্বিপাক্ষিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হচ্ছিল। কিন্তু সর্বশেষ গত ২২ আগস্ট একটি গ্রুপকে সেদেশে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা থাকলেও, দেশে ফিরে যেতে একজন রোহিঙ্গাও রাজি হয়নি। উপস্থিত জাতিসংঘ, বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কর্মকর্তারা শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করে ব্যর্থ মনোরথ হন।
রোহিঙ্গারা নিজ দেশে যাতে ফিরে যেতে পারে, সেজন্য সেদেশে যে পরিবেশ সৃষ্টি করা দরকার, এখনও সেই নিরাপত্তার পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। এজন্য মিয়ানমারই দায়ী। তাদেরই তাদের দেশের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে; নিরাপত্তা ও আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
বাংলাদেশ জোর করে কাউকে মিয়ানমারে ঠেলে দিতে পারে না। এই মানবিক সমস্যাটির সমাধানের জন্য আরও বহুমুখী ধৈর্যশীল প্রচেষ্টা যেমন চালাতে হবে, তেমনি অনির্দিষ্টকাল এজন্য অপেক্ষা করার মতো সময় আমাদের নেই।
দীর্ঘদিন শান্তিপূর্ণ থাকার পর হঠাৎ করেই ২০১৭ সালে মিয়ানমার তার দেশের জাতিগত সংখ্যালঘু লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেয়। প্রবল বন্যা স্রোতের মতো বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গারা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশের সীমান্ত অতিক্রম করে। সে-সময়ে বিএনপি ও দক্ষিণপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলো বাংলাদেশের সীমান্ত খুলে দেওয়ার জন্য মায়াকান্না জুড়ে দিয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওদের কথায় নয়, একান্ত মানবিক কারণে এ মানুষগুলোকে বাংলাদেশে আশ্রয় দিয়েছিলেন। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, “আমরা একবেলা খেয়ে হলেও বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করব।” একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে সমস্যাটিকে তুলে ধরেছেন। সমস্যাটির শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য দ্বিপাক্ষিক, বহুপাক্ষিক এবং আন্তর্জাতিকÑ সকল বিকল্পগুলো ব্যবহার করার নীতি গ্রহণ করেছিলেন। কোনো কোনো শক্তিধর দেশ, অযাচিতভাবে মিয়ানমার আক্রমণের জন্যও বাংলাদেশকে প্ররোচিত করেছে। প্রকাশ্যেই প্রধানমন্ত্রী এসব উদ্ভট তত্ত্ব ও উসকানিমূলক বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, ‘কোনো দেশের এক ইঞ্জি জমির প্রতি আমাদের লোভ নেই। আমরা শান্তিতে বিশ^াসী।’ সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে পাঁচ-দফা প্রস্তাবও দিয়েছিলেন। জাতিসংঘ ও জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানকে প্রধান করে একটি কমিশন করেছিল। কফি আনান কমিশনকে মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠী সেদেশে প্রবেশ করতে দেয়নি। তা সত্ত্বেও কফি আনান কমিশন যে সুপালিশ করে, বাংলাদেশ তার প্রতিও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে।
আমরা উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ করছি, বিএনপিসহ কোনো কোনো মহল এখন সমস্যা সমাধানে সরকারের ব্যর্থতার ধুয়া তুলে পানি ঘোলা করার চক্রান্ত করছে। অন্যদিকে সন্দেহভাজন কিছু দেশি-বিদেশি এনজিও’র তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অতি সম্প্রতি আকস্মিকভাবেই রোহিঙ্গাদের একটি বিশাল সমাবেশও নানা সন্দেহ-সংশয় এবং প্রশ্নের সৃষ্টি করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে এদের শক্তির উৎস কোথায়? এই দুঃসাহস তারা কোথা থেকে পায়। বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী রোহিঙ্গাদের থাকা, খাওয়া, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ নিরাপত্তার যে ব্যবস্থা সরকার করেছে, ব্যবস্থাপনায় যে অতিমানবিক সাফল্য শেখ হাসিনা দেখিয়েছেন, তা বিশ^ব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। তারপরও কেন এই ষড়যন্ত্র? কারা তারা? ইতোমধ্যে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে কর্মরত সন্দেহভাজন ৪১টি এনজিও-র তৎপরতা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সরকারকে এবং বাংলাদেশের জনগণকে তা দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা করতে হবে। সময় এসেছে কঠোর হওয়ার। সময় এসেছে সমস্যা সমাধানে নতুন ও বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করার।
বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলোর অখ-তা, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রতি যেমন শ্রদ্ধাশীল তেমনি নিজের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায়ও সর্বোচ্চ অগ্রধিকার দিয়ে থাকে। আমরা তাই আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করেই রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানে যা কিছু করণীয় করব। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি বাংলাদেশস্থ বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে আলোচনাকালে বাংলাদেশের এই নীতি অবস্থানের কথাই দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেন। এ ব্যাপারে চীনের মধ্যস্থতার প্রস্তাবকেও এই ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে ৫-দফা সমাধানসূত্রই বাংলাদেশের রোহিঙ্গা-নীতি-কৌশলের দিক-নির্দেশনা।

Category:

Leave a Reply