রোহিঙ্গাদের নির্মূল করছে মিয়ানমার : জাতিসংঘ

6উত্তরণ ডেস্ক: মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে নির্মূল করছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। বিশ্ব সংস্থাটির মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান এই মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নির্মূলের এই অভিযান পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসের উদাহরণ হয়ে থাকবে। সুইজারল্যান্ডের রাজধানী জেনেভায় গত ১১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলে দেওয়া বক্তব্যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের বিরুদ্ধে নৃশংস সেনা অভিযানের তীব্র নিন্দা জানান তিনি।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিশনের প্রধান জেইদ রাদ আল-হুসেইন বলেছেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর যেভাবে পদ্ধতিগতভাবে হামলা চালানো হচ্ছে, সেটি ‘জাতিগতভাবে নির্মূল’ করার শামিল। জেইদ রাদ আল-হুসেইন অবিলম্বে মিয়ানমার সরকারকে সামরিক অভিযান বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, জাতিসংঘের তদন্তকারীদের রাখাইন রাজ্যে ঢুকতে না দেওয়ায় সেখানকার পরিস্থিতি পুরোপুরি নির্ণয় করা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা নিজেরা ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছে বলে মিয়ানমারের ভণিতা বন্ধ করা উচিত। তারা বাস্তবতাকে সম্পূর্ণ অস্বীকারের মাধ্যমে বিশ্বমহলে ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করছে।
গত মাসে মিয়ানমারের রাখাইন এলাকায় সামরিক অভিযান শুরুর পর ৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গা মুসলমান সেখান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। মিয়ানমারের সরকার বলছে, সন্ত্রাসীদের হামলার জবাবে এ সামরিক অভিযান চালানো হচ্ছে। এর আগে গত বছরের নভেম্বর মাসে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অভিযোগ করেছিলেন যে, মিয়ানমারের সরকার সে দেশের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন অভিযান চালাচ্ছে। তখন কক্সবাজারে ইউএনএইচসিআর অফিসের প্রধান কর্মকর্তা জন ম্যাককিসিক বলেছিলেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা পুরুষদের হত্যা করছে, শিশুদের জবাই করছে, নারীদের ধর্ষণ করছে, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাট চালাচ্ছে। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিয়ে ভয় যে কারণে : রোহিঙ্গা নিপীড়ন নিয়ে বিশ্বজুড়ে যখন নিন্দার ঝড় বইছে তখন মিয়ানমারের সরকার এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের চিন্তাধারা ঠিক বিপরীত। তাদের কাছে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি অনাকাক্সিক্ষত এবং অগ্রহণযোগ্য। মিয়ানমারে যে কোনো মানুষের সাথে কথা বললে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি তারা উচ্চারণই করবে না। অধিকাংশ মানুষ মনে করে রোহিঙ্গারা ‘বাঙালি’। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, তারা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে সে দেশের নাগরিক মনে করে না। মনে করা হয়, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে এসেছে। তাদের ভাষা এবং সংস্কৃতি ভিন্ন। বিশ্বজুড়ে রোহিঙ্গা সংকটকে মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং মানবিক পরিস্থিতি হিসেবে দেখা হলেও মিয়ানমারের ভেতরে বিষয়টিকে দেখা হচ্ছে সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন হিসেবে। রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযানের প্রতি ব্যাপক জনসমর্থন আছে মিয়ানমারের ভেতরে। মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যমও সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী কথা বলছে। মিয়ানমারের অধিকাংশ মানুষ মনে করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম একপেশে সংবাদ পরিবেশন করছে। মিয়ানমারের তথ্য মন্ত্রণালয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়ে দিয়েছে যে ‘সন্ত্রাসী’ শব্দটি ব্যবহার করতে হবে। অন্যথায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। মিয়ানমারের ১৩৫টি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে রোহিঙ্গাদের বিবেচনা করা হয় না। রোহিঙ্গারা যে ভাষায় কথা বলে সেটি রাখাইন অঞ্চলে অন্য জাতিগোষ্ঠীর ভাষার চেয়ে আলাদা।
মিয়ানমারের জাতীয়তাবাদীরা রোহিঙ্গাদের হুমকি মনে করে। তারা যে বিষয়টি প্রচারণা চালিয়েছে সেটি হচ্ছেÑ মুসলমান পুরুষরা চারজন স্ত্রী রাখতে পারে। ফলে তাদের অনেক সন্তান থাকে। অনেক রাখাইন মনে করে, যেভাবে মুসলমানদের জনসংখ্যা বাড়ছে, এর ফলে তারা একসময় রাখাইন অঞ্চল দখল করে নেবে। একজন ট্যাক্সি ড্রাইভার বলেন, ‘আমার মনে হয় বহু বাঙালি মুসলমান মারা গেছে। আমার মনে হয়, সরকারি সৈন্যরা তাদের অনেককে হত্যা করেছে। আমার মনে হয়, জাতিসংঘের এখানে জড়িত হওয়া উচিত’।

Category:

Leave a Reply