রোহিঙ্গারা যত দ্রুত ফিরে যাবে ততই মঙ্গল

Posted on by 0 comment

জলবায়ু বিষয়ক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে ১১ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। তাদের আমরা মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়েছি। কিন্তু তাদের কারণে আমাদের ঐ অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে। ঐ এলাকায় আমাদের যত পাহাড়ি এলাকা বা জঙ্গল ছিল সেগুলো কেটে-ছেঁটে বসতি স্থাপন করা হচ্ছে। এর ফলে এলাকাটি অনেকটা অনিরাপদ এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এজন্য আমরা চাই দ্রুততম সময়ে তারা নিজ দেশে ফেরত যাক। তারা যত তাড়াতাড়ি নিজেদের দেশে ফিরে যাবে, ততই বাংলাদেশের জন্য মঙ্গল হবে। গত ১০ জুলাই সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় দুদিনব্যাপী জলবায়ু বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপটেশন’র (জিসিএ) ঢাকা বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ-কথা বলেন। মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের প্রেসিডেন্ট হিলদা সি. হেইন, গ্লোবাল কমিশন অন এডাপটেশন’র চেয়ারম্যান ও জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন এবং সম্মেলনের কো-চেয়ার এবং বিশ্বব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. ক্রিস্টালিনা জর্জিওভা সম্মেলনে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সামনের সারিতে থেকে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিস্তৃতি এবং এর প্রভাব প্রশমনে নিজেদের সক্রিয় উদ্যোগ সম্পর্কে আরও সচেতন হতে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমান বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-উদ্ভাবন ও অর্থায়নের যুগে জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় আমাদের অনেক সুযোগ রয়েছে, যা সকলে সহজে কাজে লাগাতে পারি। তথাপি আমি বলতে চাই, অভিযোজনের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সেজন্য সুষ্ঠু প্রশমন ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে অভিযোজন প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপটেশন’র সহযোগিতায় আমরা জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় সঠিক অভিযোজন কৌশলের পাশাপাশি সাশ্রয়ী পন্থা ও ঝুঁকি নিরসন ব্যবস্থার সুবিধা পেতে চাই। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করছি আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ মহাসচিবের আহ্বানে অনুষ্ঠেয় ক্লাইমেট চেঞ্জ সামিটের প্রতিবেদনের সুপারিশগুলোর জন্য। ঐ সম্মেলনে এলডিসিভুক্ত দেশসমূহ ও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আমাকে বক্তব্য দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। অভিযোজন প্রক্রিয়ায় অগ্রগামী দেশ হিসেবে বাংলাদেশে একটি আঞ্চলিক অভিযোজন কেন্দ্র স্থাপনের দাবি রাখে। বিষয়টি বিবেচনা করতে আপনাদের অনুরোধ জানাচ্ছি। তিনি এ ব্যাপারে সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়ায় বান কি মুনকে ধন্যবাদ জানান।
প্রধানমন্ত্রী গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপটেশন ঢাকা সম্মেলনের সার্বিক সাফল্য কামনা করে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব অনুমিত সময়ের আগেই আমাদের প্রত্যেকের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। সেজন্য, এর প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বকে বিনিয়োগে আরও বেশি অগ্রাধিকার দিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় হুমকি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে প্রাক-শিল্প স্তরের চেয়ে প্রায় ১ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড ওপরে পৌঁছেছে। জার্মান ওয়াচ-র ক্লাইমেট চেঞ্জ ভার্নাবিলিটি ইনডেক্স-২০১৮ অনুসারে, ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৬ সময়ে বাংলাদেশ বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে ছিল ষষ্ঠতম।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকারের অক্লান্ত পরিশ্রমে গত এক দশকে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক খাতে যে বিশাল উন্নতি হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকূল প্রভাবে আজ তা হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, গত এক দশক যাবত আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসমূহ অভিযোজনের মাধ্যমে নিরসনের জন্য বছরে প্রায় ১০০ কোটি ডলার ব্যয় করছি। এ-সময় তিনি জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড গঠন এবং বাংলাদেশের নিজস্ব তহবিল থেকে জলবায়ু অভিযোজন কর্মসূচির জন্য ৪২ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি এই ফান্ডে বরাদ্দের কথাও উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় নেদারল্যান্ডের সহযোগিতায় প্রণীত শতবর্ষ মেয়াদি ডেল্টা প্ল্যানের কথা উল্লেখ করেন। তিনি প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনের সাফল্য তুলে ধরে বলেন, অনেকের মতো আমরাও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ এবং বৈশ্বিকভাবে আমাদের এটি সমাধান করতে হবে। প্যারিস চুক্তি হচ্ছে এই বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত এবং কার্যকর বৈশ্বিক চুক্তি।
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়-ক্ষতি লাঘবে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবিলায় আমরা নিজস্ব কৌশল অবলম্বন করেছি। লবণাক্ততা, বন্যা ও ক্ষরা সহিষ্ণু ফসলের প্রজাতি উদ্ভাবন এবং চাষের মাধ্যমে এ বিষয়ে আমাদের সক্ষমতা গড়ে তুলেছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা ১৯৭২ সালে ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে সাইক্লোন প্রিপেয়ার্ডনেস প্রোগ্রাম (সিপিপি) গ্রহণ করেন, উপকূলীয় অঞ্চলে নির্মাণ করেন ১৭২টি মুজিব কেল্লা (সাইক্লোন শেল্টার)। সিপিপি’র বর্তমানে ৪৯ হাজার ৩৬৫ জন প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক রয়েছে। বর্তমান সরকার জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় ৩৭৮টি মুজিব কেল্লা নির্মাণ করছে। এছাড়া দেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলে ৩ হাজার ৮৬৮টি বহুমুখী সাইক্লোন সেল্টার নির্মাণ করা হয়েছে। আরও ১ হাজার ৬৫০টি সাইক্লোন সেল্টার নির্মাণ করা হবে। তিনি বলেন, আমরা ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। আগামী পাঁচ বছরে দেশের ২২ থেকে ২৪ ভাগ অঞ্চল গাছপালায় আচ্ছাদিত হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে এক্ষেত্রে ব্যাপক গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী।

Category:

Leave a Reply