রোহিঙ্গা নির্যাতন বন্ধ করুন, শরণার্থীদের ফিরিয়ে নিন

4

মিয়ানমারকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

উত্তরণ ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১২ সেপ্টেম্বর রাখাইনের জাতিগত সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগণের ওপর অমানবিক আচরণ এবং অন্যায়-অত্যাচার বন্ধ করে প্রতিবেশী মিয়ানমারের প্রতি শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশ নেপিডো’র সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায় তবে কোনো অন্যায়-অবিচার সহ্য করবে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে শান্তি এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চাই। আমরা কোনো ধরনের অন্যায়-অত্যাচার গ্রহণ বা মেনে নিতে পারি না এবং এই ব্যাপারে আমাদের প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে।
১২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজার জেলার উখিয়া কুতুপালং শরণার্থী শিবিরে মিয়ানমার থেকে আশ্রয়ের জন্য আসা জনগণের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণকালে এ কথা বলেন।
মিয়ানমারের যে সংকট, যে জ্বালাও-পোড়াও এবং যে অমানবিক আচরণ তা থেকে শুরু করে বাংলাদেশে এদের অবস্থানের জন্য যা যা করণীয় তার নিশ্চয়তা, ভবিষ্যতে কীভাবে কূটনৈতিকভাবে এই পুরো বিষয়টি বাংলাদেশ মোকাবেলা করবে তারই একটি পরিকল্পনা এবং দিক-নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী আধা ঘণ্টা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বারবার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এবং প্রত্যেকের কাছে তার সান্ত¦নার বাণী পৌঁছে দেন। তার বোন এবং বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন।
শরণার্থীদের জন্য সব ধরনের সহযোগিতা প্রদানের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী রাখাইন সম্প্রদায়ের জনগণের প্রতি অত্যাচার বন্ধ এবং বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারের শরণার্থীদের দেশে ফেরত নিয়ে যাবার জন্য মিয়ানমারের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ অব্যাহত রাখার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা মিয়ারমারের শরণার্থীদের পাশে রয়েছি এবং তাদের সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে যাব, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা তাদের দেশে ফিরছে আমরা পাশে রয়েছি।
মিয়ানমারের শরণার্থীদের দুরাবস্থা দেখার পর অন্তরের অন্তস্থলে গভীর দুঃখ অনুভব করছেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারাও মানুষ এবং মানুষ হিসেবেই তাদের বাঁচার অধিকার রয়েছে। তারা কেন এত দুঃখ কষ্ট ভোগ করবে?
তিনি বলেন, এই নিরীহ রাখাইন সম্প্রদায়ের ওপরে অত্যাচার-নির্যাতন বন্ধে এবং বাংলাদেশ থেকে তাদের নিজের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ প্রয়োগ করা উচিত।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই রাখাইন সম্প্রদায়কে তাদের নাগরিক হিসেবে অস্বীকার করার মিয়ারমারের কোনো অধিকার নেই। তাদের মিয়ানমার সরকারের নিরাপত্তা দিতে হবে। যাতে নিজেদের দেশে তারা নিরাপদে বসবাস করতে পারে।
এই বিষয়ে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ মিয়ানমারকে সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কিন্তু আগে তাদের এই রাখাইন জনগণের প্রতি অন্যায়-অত্যাচার বন্ধ করতে হবে। তার সরকার প্রয়োজনীয় খাদ্য এবং জরুরি সেবা শরণার্থীদের জন্য অব্যাহত রাখবে, তাতে কোনো সমস্যা হবে নাÑ যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৬ কোটি মানুষের এই দেশে যদি সকলের মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা সরকার বিধান করতে পারে সেক্ষেত্রে মিয়ানমারের শরণার্থীদেরও কোনো সমস্যা হবে না।
এই বার্তাও প্রধানমন্ত্রী আগত রোহিঙ্গাদের উদ্দেশ্যে দেনÑ এইখানে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল যদি ফায়দা লোটার চেষ্টা করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সুতরাং বিচ্ছিন্নভাবে হলেও কেউ যেন এ ধরনের কোনো অপচেষ্টার সাথে লিপ্ত না হন। সে ব্যাপারেও প্রধানমন্ত্রী সকলকে সতর্ক করে দেন।
এলাকাবাসীর প্রতি তিনি আহ্বান জানিয়ে বলেন, এইসব আশ্রিত জনগণের সঙ্গে কোনো অস্থির বা অমানবিক আচরণ করা যাবে না। সহনশীলতার সঙ্গে এবং মানবতার সঙ্গে যেন তারা এইসব মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা বিবেচনা করেন।
অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীরবিক্রম এমপি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী এমপি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ এমপি, ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী এমপি, হুইপ ইকবালুর রহিম এমপি, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ এমপি, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবু বেলাল মুহম্মদ শফিউল হক এবং শেখ রেহানার পুত্রবধূ এবং সিনিয়র আইএমও কর্মকর্তা পেপী সিদ্দিকসহ স্থানীয় সাংসদ এবং জনপ্রতিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন।
এক দেশের নাগরিকদের অন্যদেশে আশ্রয় গ্রহণ সেই দেশের জন্যই অসম্মানজনক আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে অবিলম্বে মিয়ানমারের নাগরিকদের তাদের দেশে ফেরত নেয়ার জন্য মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানান। এ প্রসঙ্গে তিনি আমাদের দেশের একদা সৃষ্ট পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে যে রিফিউজি সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল, তারও উল্লেখ করেন। তৃতীয় কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপ ছাড়া শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য সমস্যার সমাধান এবং ভারত থেকে ৬৪ হাজার শরণার্থীকে দেশে ফিরিয়ে আনারও উদাহরণ দেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমারে সৃষ্ট সংঘাত প্রসঙ্গে বলেন, বার বার আমরা দেখতে পাচ্ছি কিছু মানুষ কোনো কোনো জায়গায় এক একটা ঘটনা ঘটায়। তারা তো ঘটনা ঘটিয়েই চলে যায়। আর ভুক্তভোগী হতে হয় ছোট্ট শিশু, নারী আর সাধারণ মানুষজনদের। তিনি বলেন, মিয়ানমার সরকারকে আমি বলব, তারা যেন এই নিরীহ মানুষগুলোর ওপর কোনোরকম নির্যাতন না করে। এগুলো যেন তারা বন্ধ করে প্রকৃত দোষী যারা তাদের খুঁজে বের করে। আর এটি করার জন্য আমরা প্রতিবেশী দেশ হিসেবে যা যা সাহায্যের দরকার, আমরা তা করব।
প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রশ্নে তার সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির পুনরোল্লেখ করে বলেন, আমাদের একটা সিদ্ধান্ত যে কোনোরকমের সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ-কোনো কিছুই আমরা কখনও মেনে নেব না। বা আমাদের মাটি ব্যবহার করে কেউ সন্ত্রাস বা জঙ্গিবাদী কাজ করবে তাও আমরা কখনও বরদাশত করব না।
সরকারপ্রধান বলেন, আজকে হাজার হাজার, লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়া হয়ে চলে এসেছে। সেখানে (মিয়ানমারে) এখনও আগুন জ্বলছে। সেখানে এখনও অনেকে আপনজনের হদিস পাচ্ছে না। নাফ নদীতে ছোট্ট শিশুর লাশ ভেসে বেড়াচ্ছে। মানুষের লাশ ভাসছেÑ এটা সম্পূর্ণ মানবতাবিরোধী কাজ। সাধারণ শিশু, নারী, পুরুষ সাধারণ মানুষেরা কি অপরাধ করেছে যে, তাদের ওপর এই জুলুম-অত্যাচার। এই ধরনের কর্মকা- আমরা কখনই সমর্থন করতে পারি না।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা মিয়ানমার সরকারকে বারবার বলেছিÑ আমাদের তরফ থেকে একটা কথা বলেছি যে, সেই ’৭৮ সাল থেকে মিয়ানমারে একটার পর একটা ঘটনা ঘটছে আর মানুষ এখানে এসে আশ্রয় নিচ্ছে। এদের ভোটের অধিকার, নাগরিক অধিকারÑ সব কেড়ে নেওয়া হয়েছে। কেন এই অত্যাচার। এরা তো মিয়ানমারেরই লোক। মিয়ানমারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী তো নিজেই ঘোষণা দিয়েছিলেনÑ এই রোহিঙ্গারা তাদেরই নাগরিক। তা হলে এখন তারা এই সমস্যা সৃষ্টি করছে কেন?
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এটুকুই বলব এ ধরনের ঘটনা, বিশেষ করে এটি একটি অমানবিক ঘটনা, এটি মানবাধিকারের লঙ্ঘন। প্রতিবেশী দেশ আমরা। সেখানে কোনো ঘটনা ঘটলে আমাদের ওপর চাপ পড়ে। তিনি বলেন, এই যে মানুষ আজকে এখানে এসেছেÑ আমরা মানবিক দিক বিবেচনা করে তাদের এখানে আশ্রয় দিয়েছি। কারণ স্বজন হারাবার বেদনাটা যে কি সেটা আমরা জানি।
প্রধানমন্ত্রী তার এবং শেখ রেহানার কথা উল্লেখ করে বলেন, আমরা দুটি বোন ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট মা, বাবা, ভাই সব হারিয়ে আমাদেরও রিফিউজি হিসেবে বিদেশে থাকতে হয়েছে। আমার মনে পড়ে, ১৯৭১ সালে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন করেছিল তখন আমাদের দেশের মানুষ ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। এভাবেই ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল হানাদার বাহিনীরা। আমাদের নিজের ঘর, আমার দাদার বাড়ি, নানার বাড়ি এবং আমাদের আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িঘর, আমাদের গ্রাম পুরো জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করা হয়েছিল। আজকের যারা নতুন প্রজন্ম তারা পাকিস্তানি বাহিনীর সেই বর্বর অত্যাচার-নির্যাতন দেখেনি। কিন্তু আমরা যারা দেখেছি তারা স্মরণ করতে পারি কী ভয়াবহ তা ছিল। তাই এই শরণার্থীদের প্রতি আমি সকলকে সদয় হতে বলব। মানবতার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানাব।
আন্তর্জাতিক অনেক সংস্থাই আজ মিয়ানমারের শরণার্থীদের সহায়তার জন্য এগিয়ে এসেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা একটি রিলিফ কমিটি গঠন করে তার মাধ্যমে ত্রাণ সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছি। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, স্থানীয় প্রশাসন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিজিবি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সহযোগিতার হাতকে প্রসারিত করেছেন।
সরকার বায়োমেট্রিক রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে রিলিফ তৎপরতা চালিয়ে যাবার উদ্যোগ নিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা শরণার্থীদের নাম, ঠিকানা, পরিচয় লিপিবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। যাতে তাদের কোনো সমস্যা হলে আমরা দেখভাল করতে পারি এবং তাদের দেখভাল করাটা আমাদের দায়িত্ব। যাতে সবকিছু সুন্দরভাবে করতে পারে সেজন্যই এই উদ্যোগ বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।
পরে প্রধানমন্ত্রী শরণার্থীদের হাতে নিজে ত্রাণসামগ্রী তুলে দেন। এ সময় শরণার্থীরা তাদের মাঝে প্রধানমন্ত্রীকে পেয়ে মিয়ানমারে তাদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতনের বর্ণনা তুলে ধরেন। প্রধানমন্ত্রী দুর্গত নারী ও শিশুকে কাছে টেনে নেন। সেখানে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।

Category:

Leave a Reply