শনির দশা থেকে মুক্তি পাবে কি বিএনপি?

Posted on by 0 comment

বিগত নির্বাচনের আগে আন্দোলনের লক্ষ্যে জামাতের ওপর প্রত্যক্ষভাবে ভর করেছিল বিএনপি; কিন্তু লক্ষ্য অর্জনে বিফল হয়েছে। এবারে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, জামাতকে সাথে রেখে এবারে বিএনপি অতিবামকে সুকৌশলে ব্যবহার করতে চাইবে।

35রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়ছে। ইতোমধ্যে মাস গণনা শুরু হয়ে গেছে। স্বাভাবিক নিয়মে অচিরেই দিনক্ষণ নিয়ে হিসাব শুরু হয়ে যাবে। ইতোমধ্যে সব রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের ভেতর দিয়ে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে এবং কমিশনের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণের ভেতরে দিয়ে স্থানীয় নির্বাচন হচ্ছে। নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তৎপরতা শুরু হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীকে নৌকায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এমপিসহ নেতৃবৃন্দ সংগঠনকে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে নির্বাচনমুখী করতে তৎপর হয়েছেন। প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে নতুন জোট গঠনের প্রচেষ্টা চালানোর কথা ঘোষণা করেছে। এই অবস্থায় বিএনপি দলটির নেতৃবৃন্দ নির্বাচন অংশগ্রহণ করা না করা নিয়ে পরস্পর-বিরোধী কথা বলে চলেছেন। আর প্রধান নেত্রী খালেদা জিয়া রয়েছেন মূলত বিদেশি কূটনীতিকদের সাথে আলোচনায় ব্যস্ত। আর দুই নম্বর নেতা, অতিকথনপ্রিয় তারেক রহমান আশ্চর্যজনকভাবে রয়েছেন চুপটি করে। কথাবার্তা ও কর্মকা- সবই ধূ¤্রজাল সৃষ্টির প্রয়াস। এ অবস্থায় বিএনপির কোনটা মুখ আর কোনটা মুখোশ তা বুঝে উঠতে পারা কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
মুখ থাকতে মুখোশ পরা হয় কেন, তা সকলেরই জানা। রাজনীতিতে পর্দার অন্তরালে গণবিরোধী কাজ করার জন্যই পরা হয় মুখোশ। ক্ষণে ক্ষণে রূপ পাল্টায় মুখোশধারীরা। নিজেদের মনে করে অতি চালাক। মুখ ও মুখোশ নিয়ে যে দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তি চলতে চায়, তারা সব সময়েই মনে করেন, জনগণ বোকা নতুবা অন্ধ। জনগণ কিছুই জানে না, বুঝে না, দেখেও না। কিন্তু জনগণের রয়েছে হাজার লক্ষ চোখ ও কান। তাই আপাত বিভ্রান্তিতে পড়লেও বিন্দুমাত্র কিছুও জনগণের কাছ থেকে লুকানো যায় না। শেষ বিচারে জনগণকে এড়িয়ে যাওয়ার সাধ্য আসলে কারও নেই। এ জন্যই প্রবাদ বলে, অতি চালাকির গলায় দড়ি। শেষ পর্যন্ত সব চালাকিই ধরা পড়ে যায়।
অবস্থাদৃষ্টে এমনটাই মনে হচ্ছে যে, শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে বিএনপি। তাই মুখোশ সব একে একে খসে পড়ছে। বিএনপি মুক্তিযোদ্ধার দল, এটা এখন আর কেউ বলেন না। মুক্তিযোদ্ধার মুখোশ পরে ক্ষমতায় থেকে ক্যান্টনমেন্টে বসে দল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। পরে রাজাকার-আলবদরদের দল জামাতকে দল করতে দিয়ে, স্বাধীনতা-বিরোধীদের দলে নিয়ে পদ ও মন্ত্রিত্ব দিয়ে এবং জাতির পিতা ও জাতীয় চার নেতার হত্যাকারীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে মুখোশ যখন অনেকটাই উন্মোচিত হতে বসেছিল, তখন ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ শব্দটি সামনে আনা হয়। এখন পাকিস্তানি ভূত জামাতকে যখন ঘাড়ে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে নেওয়া হয়েছে, তখন মুক্তিযোদ্ধা মুখোশটা গেছে উন্মোচিত হয়ে। ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ কথাটিও এখন আর বলা হয় না বা বললেও মৃদু স্বরে আনা হয় সামনে। ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক’ বলে জোর গলায় প্রচার চালাত বিএনপি। এখন দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে বিএনপিকে বলা হয় অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারীর দল। আর ভুয়া জন্মদিন পালন প্রকাশ্য থেকে ঘরের ভেতরে গিয়ে অবগুণ্ঠনের পুরোটাই প্রায় গেছে খসে।
এমন আরও বহু উদাহরণ টেনে বলা যায়, মুখোশের অতি ব্যবহারে বিএনপির মুখটা এখন এমন হয়ে গেছে যে, ওই মুখে আর মুখোশ রাখা সম্ভব হচ্ছে না। তবে শেষ চেষ্টা করে সবাই। তাই বর্তমান দিনগুলোতে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা না করা নিয়ে মুখ ও মুখোশের খেলা খেলতে তৎপর থাকছে। নির্বাচনে কোনো দল বা জোট অংশগ্রহণ করুক বা না করুক সংবিধান অনুযায়ী একাদশ সংসদ নির্বাচন যথাসময়েই হবে। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা নস্যাৎ করার সাধ্য এখন কারও নেই। সামরিক কর্তাদের ক্ষমতা দখল ও কুক্ষিগত-দীর্ঘস্থায়ী করার বাসনা চরিতার্থ করার দিন আর নেই। গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রার পথে এটুকু অর্জন অন্তত দেশবাসী কায়েমি স্বার্থবাদী পরাজিত শত্রুদের কাছে থেকে ছিনিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।
বিগত দিনগুলোর অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগ পর্যন্ত অনেকটাই মিথের মতো এমন এক বিশ্বাস দানা বেঁধে উঠেছিল যে, দুই বড় দলের কোনো এক দল যদি নির্বাচন বয়কট করে, তবে অন্য দলের পক্ষে ক্ষমতায় টিকে থাকা অসম্ভব। বিদেশিরা কেউ স্বীকৃতি দেবে না এবং গণ-আন্দোলন সরকার পতন অবিশ্যম্ভাবী করে তুলবে। যেমনটা হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপির একদলীয় নির্বাচনের পর। কিন্তু ওই মিথ বর্তমান সময়ে এসে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে দেশে অবৈধ সরকার আনার জন্য কোনো দল যদি নির্বাচন বয়কট করে অনাসৃষ্টি করতে চায়, তবে সেই দলেরই বাজবে বারোটা। উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারার মধ্যে থাকা দেশবাসী এখন অরাজকতা নৈরাজ্য অনাসৃষ্টি প্রভৃতির সর্বৈব বিরুদ্ধে।
এই বাস্তবতায় বিএনপি আবারও নির্বাচন বয়কটে যাবে এমনটা সাধারণ বিবেচনায় মনে হয় না। একবার নির্বাচন বয়কট আর দুবার অনাসৃষ্টি করতে গিয়ে গেছে গাড়ি-বাড়ির জাতীয় পতাকা। প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা বিএনপির নেই। সোনার চামুচ মুখে নিয়ে যে দলের জন্ম ও বিকাশ, যে দল নির্বাচন করলে অন্তত প্রধান বিরোধী দল হবেই, সেই দলের ওপরে-নিচের নেতাকর্মীরা ক্ষমতার ন্যূনতম স্বাদও নিতে পারবে না, এমনটা কি নেতাকর্মীরা আদৌ সহ্য করতে পারে! হাবভাবে তো মনে হচ্ছে, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াও এটা সহ্য করতে পারছেন না। এই না পারাটা বিএনপিকে নির্বাচনের দিকে ঠেলে দেবে।
বিএনপির নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়ে আরও একটি বিষয় এখানে বিবেচনাযোগ্য। বিগত নির্বাচনের আগে বিএনপির ঘাড়ে চড়ে বসা জামাত মনে করেছিল, নির্বাচন আর সেই সাথে যুদ্ধাপরাধী নেতাদের বিচার ও শাস্তি প্রদানের প্রক্রিয়া নির্বাচন বয়কট ও অশান্তি সৃষ্টি করলে রুখে দেওয়া সম্ভব হবে। দেশি-বিদেশি বিশেষত পাকিস্তানি মদত পেয়ে বিএনপিও তেমনটা মনে করেছিল। কিন্তু এখন জামাত দেখছে, নিবন্ধন আর সেই সাথে মার্কা বাতিল ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। আগুন সন্ত্রাস দিয়ে অশান্তি সৃষ্টি করাও এখন অসম্ভব। এখন আন্দোলন নিয়ে কচলাকচলি করলে নির্ঘাত পটল তুলতে হবে। তাই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা জামাতের জন্য অবশ্য করণীয় হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে বিএনপি-জামাত জোটের জন্য নির্বাচনে অংশগ্রহণের বাধ্যবাধকতা দাঁড়াচ্ছে।
একটু খেয়াল করে বিএনপি এবং ২০-দলীয় জোটের কর্মকা- লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, ওই দল ও জোট এখন যেন আবার বিধ্বস্ত অবস্থা থেকে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াতে চাইছে। এই চাওয়াটার লক্ষ্য যে নির্বাচনে নামা, তা বুঝতে একটুও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। সংস্কারপন্থি নেতাদের দলে পুনরায় ভেড়ানোও নির্বাচনে অংশগ্রহণেরই পূর্ব লক্ষণ। বিগত দিনগুলোর অভিজ্ঞতা বিবেচনা নিলে এটা সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গনের রেওয়াজ হচ্ছে, বিরোধী দল বা জোট আন্দোলন আন্দোলন ভাব দেখিয়ে নির্বাচনে যেতে চায়। এটা নেতা-কর্মীদের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে চাঙা করে নির্বাচনে নামানোর জন্য করা হয়ে থাকে। বিএনপির একটা অংশ আসলে এখন সেটি করতে চাইছে।
প্রসঙ্গত, দেশবাসী যখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস মহান একুশে ফেব্রুয়ারি পালনে ব্যস্ত, তখন বিএনপি ব্যস্ত ছিল এবং এখনও আছে সংগঠন নিয়ে মহাব্যস্ত। বিগত ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০-দলীয় জোট সমর্থক একটি দৈনিকের বড় একটি হেডিং ছিল : ‘আন্দোলন-নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে খালেদা জিয়ার নির্দেশ/বিভিন্ন কমিটির নেতাদের সাথে সিরিজ বৈঠক।’ ওই নিউজে বৈঠকে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নেতাদের বরাত দিয়ে লিখা হয়েছেÑ ‘নির্বাচনে বিএনপির অংশ নেওয়া না নেওয়ার বিষয়টি এখনই ফোকাসে আনার’ কৌশল নিচ্ছে না বিএনপি। এখন ‘দলীয় ও জাতীয় ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনে’ থাকতে হবে। একই সাথে ‘সংগঠনকে শক্তিশালী’ করতে হবে। ‘শক্তিশালী সংগঠন ও অপ্রতিরোধ্য আন্দোলনÑ এই দুয়ের মিশ্রণে সুষ্ঠু নির্বাচন’ হচ্ছে বিএনপির কৌশল। অর্থাৎ জাতীয় পতাকাহারা বিএনপির এখন লক্ষ্য হচ্ছে নির্বাচন।
বলাই বাহুল্য, এমন কৌশল গ্রহণ রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে বিধ্বস্ত বিএনপির জন্য যথাযথ। বিগত সময়ে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন বয়কট ও সরকার পতনের ঘোষণা দিয়ে জনগণকে নিয়ে মাঠে নামতে চেয়েছিল। জনগণ তাতে সাড়া দেয় নি। কিন্তু ক্ষমতার অন্ধ মোহে পাগল হয়ে ওই লক্ষ্য অর্জনে বিএনপি-জামাত জোট অগ্নিসন্ত্রাসের মাধ্যমে গৃহযুদ্ধ বাধানোর তৎপরতা চালায়। তারপর নির্বাচন যখন হয়ে যায় এবং সরকার বহাল তবিয়তে ওয়াদা ও জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করতে থাকে, তখন আবারও টনক নড়ে এবং সরকারের বর্ষপূর্তিতে একই দাবিতে একই কায়দায় শুরু করে দেশকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাড়খার করার অপতৎপরতা।
তখনও হয় সর্বৈবভাবে বিফল। দল ও জোটের এমন হাস্যকর অবস্থা দাঁড়ায় যে, হরতাল ও অবরোধ তুলে নেওয়ার ঘোষণা পর্যন্ত দলটি দিতে পারে না। পরপর দুবার সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ায় ওপরে ও নিচে নেতাকর্মীরা হতাশ। খালেদা জিয়া বকা ও রাগ করেও নেতাদের রাস্তায় নামাতে পারছেন না। কেন্দ্রীয় বড় বড় পদ-পদবির নেতারা খালেদা জিয়ার ভাষ্যমতো ‘আঙ্গুল চোষা’ই রয়ে গেছেন। এমতাবস্থায় বাধ্য হয়েই পিছিয়ে যেতে হয় বিএনপিকে। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মুখোশ পাল্টিয়ে এখন পরা হয়েছে নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের মুখোশ। আর সরকার পতনের হম্বিতম্বি তো এখন শোনাই যায় না। এ অবস্থায় আন্দোলন নিয়ে কিছু নর্দনকুর্তন না করে কি বিএনপি যেতে পারে নির্বাচনে!
ইতোমধ্যে গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির ইস্যু সামনে নিয়ে নিষ্ক্রিয় ও বিধ্বস্ত বিএনপি মাঠে নামতে তৎপর থাকছে। কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে। প্রসঙ্গত, গ্যাসের মূল্য বাড়লে নি¤œ আয় ও গরিব মানুষের যে অসুবিধা হয়, এটা নিয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ নেই। জনকল্যাণকামী আওয়ামী লীগ সরকারের এটা বিবেচনার মধ্যে আছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, মাথাপিছু আয়, সামাজিক উন্নয়নসূচক আছে সঠিক পথে অগ্রগতির ধারায়। দ্রব্যমূল্য, ক্রয়ক্ষমতা, মুদ্রাস্ফীতি সবই আছে নিয়ন্ত্রণে। এ অবস্থায়ও বিএনপি-জামাত জোটের মতিগতি দেখে মনে হচ্ছে, যেন বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় থাকতে গ্যাসের দাম কখনও বাড়ায় নাই! হাওয়া ভবন আর খোয়াব ভবনের দৌরাত্ম্যে বিএনপি-জামাত আমলে অর্থনীতি ও জনগণের জীবনযাত্রার মান কত নিচে পৌঁছার পর তখন গ্যাসের দাম উপর্যুপরি বাড়ানো হয়েছিল, তা গ্যাস ইস্যু নিয়ে মাঠে নামার আগে বিএনপি-জামাত জোটের স্মরণে আনা প্রয়োজন।
মাঠে নামার জন্য অতি তৎপর বিএনপি এখন নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের রূপরেখা উত্থাপন করার জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। কেবল দেশবাসীর কাছে নয়, সরকারের কাছে প্রেরণ করা হবে বলেও ইতোমধ্যে প্রচার করা হয়েছে। কী রূপরেখা প্রদান করা হবে কে জানে! বিগত নির্বাচনের আগে একবার নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা দিয়ে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার যে লেজেগোবরে অবস্থা হয়েছিল এবং দেশবাসীর হাসির খোরাক জুগিয়েছিল, তা সবার জানা। এবারও সেই অবস্থা সৃষ্টি হবে কি-না কে জানে! তবে যদি রূপরেখা দেয়, তা দিয়ে গণসম্পৃক্ত আন্দোলন হবে, এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই। যে দল ও জোট ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ করে ক্ষমতা কুক্ষিগত ও দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য তথাকথিত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হিসেবে ‘টু ইন ওয়ান’ রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল, সেই দল ও জোটের ডাকে জনগণ নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবির পক্ষে আন্দোলনে নামবে, এমনটা আশা করা আর আকাশের চাঁদ ধরা সমান কথা।
মানুষ এখন আর অন্ধ সমর্থন ও বিভ্রান্তির মধ্যে নেই। অতীত কাজের মূল্যায়ন করে চায় জবাবদিহিতা। বিএনপি যতক্ষণ জামাতকে সাথে রাখবে এবং বিগত সময়ের দুঃশাসন ও দুষ্কর্মের জন্য ক্ষমা না চাইবে, ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষ বিএনপির দিকে মুখ ফিরেও তাকাবে না। তাই নিঃশর্ত নির্বাচনে যাওয়া ছাড়া বিএনপির এখন আর কোনো পথ খোলা নেই। প্রসঙ্গত, ১৯৯৬-এর ফেব্রুয়ারির একদলীয় নির্বাচন করার পর ক্ষমতায় গিয়ে আন্দোলনের চাপ সইতে না পারার অভিজ্ঞতা যেমন বিএনপির আছে, তেমনি বিগত ২০১৪ ও ২০১৫ সালের অভিজ্ঞতা থেকে এটা বুঝে গেছে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে নামাতে বাধ্য করতে হলে গণ-আন্দোলনের কতটা চাপ দিতে হবে। নিজেদের শক্তি-সামর্থ্য বিবেচনায় নিয়ে বিএনপি এটা বুঝে যে, সংবিধানের ভিত্তিতে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানো সম্ভব নয়।
তাই বিএনপির বর্তমান সময়ে আন্দোলনের জজবা তোলার মানে হচ্ছে, নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবিতে এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা, যাতে আন্দোলন আন্দোলন ভাব দেখিয়ে যাওয়া যায় নির্বাচনে। লাঠিও ভাঙবে না সাপও মরবে, এটাই হচ্ছে কৌশল। এক্ষেত্রে লাঠি হচ্ছে বড় দল হিসেবে বিএনপির মানমর্যাদা আর সাপ হচ্ছে বয়কট থেকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের লাইনে যাওয়া। এখন যে অবস্থায় আছে বিএনপি, তাতে সরাসারি নির্বাচনে যেতে পারে না। তাতে মুখ রক্ষা হয় না। দলীয়ভাবে চাঙা ভাব না নিয়ে বিএনপি নির্বাচনে যাবে না। তাই বিএনপি এখন থেকে নির্বাচনের আগ পর্যন্ত আন্দোলন আন্দোলন ভাব দেখাতে তৎপর থাকবে। তাই ছোট-বড় যা-ই হোক না কেন, ইস্যু খুঁজে নিতে সচেষ্ট থাকবে।
অবস্থাদৃষ্টে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, খুব সতর্কতার সাথে অগ্রসর হতে চাইছে জামাতকে সাথে নিয়ে বিএনপি। বিগত নির্বাচনের আগে আন্দোলনের লক্ষ্যে জামাতের ওপর প্রত্যক্ষভাবে ভর করেছিল বিএনপি; কিন্তু লক্ষ্য অর্জনে বিফল হয়েছে। এবারে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, জামাতকে সাথে রেখে এবারে বিএনপি অতিবামকে সুকৌশলে ব্যবহার করতে চাইবে। ‘আন্দোলনের দল নয় বিএনপি’ এটা যখন প্রমাণিত সত্য, তখন ভর বা ব্যবহার না করে উপায় কি?
বলার অপেক্ষা রাখে না, আন্দোলন ও নির্বাচনÑ এই দুই নৌকায় পা রাখার ফলে বিএনপির অভ্যন্তরে কট্টরপন্থি নরমপন্থি অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাত বর্তমান দিনগুলোতে নতুন মাত্রা পাবে। একপক্ষ নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকারের দাবি আদায় না হলে নির্বাচনে যাব না বলে গো ধরবে আর অন্যপক্ষ নির্বাচনে যাওয়ার জন্য সরকারের সাথে আলোচনার কথা বলবে। এই দুই মতের পক্ষে কখন, কোন নেতা, কীভাবে অবস্থান গ্রহণ করবেন এবং সোচ্চার হবেন, তা আগে থেকে বলা কঠিন। প্রবাদ বলে, লেবু বেশি কচলালে তিতা হয়। বেশি বেশি করে আন্দোলন ও নির্বাচন নিয়ে খেলতে গেলে আবারও মুরব্বিদের পরামর্শে নির্বাচন বয়কটের ফাঁদে পড়তে পারে বিএনপি। স্বেচ্ছানির্বাসনে লন্ডনে থাকা বিএনপির দু-নম্বর নেতা তারেক জিয়ার নীরবতা এমন ইঙ্গিতই দিয়ে যাচ্ছে।
অবস্থা পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, বিএনপি নেতা গয়েশ্বর রায় ‘যদি শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যেতে হয়, তা হলে পাঁচ বছর পরে কেন’ প্রশ্ন তুলে বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণের সম্ভাবনা নাকচ করে দেন। তখন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি যাবে কি-না, সেটা অনেক পরের ব্যাপার।’ তিনি আরও বলেন, নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনা চায় বিএনপি। বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্দোলন ‘ফোকাসে’ রাখতে চাইলে যে আলোচনার কথা বলা যায় না, এটা বোধকরি পরিস্থিতির চাপ সামলাতে না পেরে ভুলে গেছেন বিএনপির মহাসচিব। আর আওয়ামী লীগ এখন বিএনপি-জামাতের ২০-দলীয় জোটের কারও সাথে আলোচনায় যাবেইবা কেন? কোন পরিস্থিতি বা যুক্তিতে?
প্রসঙ্গত বলতেই হয়, নির্বাচন ইস্যু নিয়ে উল্লিখিত মতভেদ থাকার কারণে এখন সব ইস্যুতেই বিএনপির মধ্যে দুই মত পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়াবে। যেমন দাঁড়াচ্ছে খালেদা জিয়ার মামলা নিয়ে। ইতোমধ্যে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট ও জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা নিয়ে জনগণের মধ্যে উত্তাপ সৃষ্টি করতে তৎপর থাকছে বিএনপি। কল্পনায় বন্দী খালেদাকে মাঠে এনে এখন তৃণমূলের নেতাকর্মী ও সমর্থক জনগণকে চাঙা করতে চাইছে। মামলার রায় কখন হবে, কি হবে, তা জানেন আদালত। এতদসত্ত্বেও রায়ের আগেই কেউ বলছেন, খালেদা জিয়া বন্দী থাকলে নির্বাচন হবে না, বন্দী রেখে নির্বাচনে যাব না। আবার কেউ বলছেন, নি¤œ আদালতে শাস্তি হলেও খালেদা জিয়া নির্বাচন করতে পারবেন।
এমন মন্তব্য করতেও শোনা যাচ্ছে যে, খালেদা জিয়া এমন এক ‘ভোটকারেন্সি’ বা ‘ভোটের রাজনীতির পুঁজি’, যার মূল্য ‘মুক্ত খালেদার’ চাইতে ‘বন্দী খালেদার’ বেশি। কথা শুনে মনে হয়, নির্বাচনের মধ্যেই আছে বিএনপি। প্রশ্ন হলো, এমন এক কারেন্সি বা পুঁজি থাকা সত্ত্বেও বিএনপি বিগত নির্বাচনে অংশ নিল না কেন? দেশি-বিদেশি কোন মুরব্বির পরামর্শে এমনটা করা হয়েছিল, তা জনগণকে না বলুক বিএনপির হাইকমান্ড; কিন্তু নিজ দলের তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের জানানো প্রয়োজন। মাশুল তো দিচ্ছে তারা। আর যেখানে স্বাভাবিকভাবে বিএনপির মাঠে নামা উচিত এই বলে যে, খালেদা জিয়া দোষী নয়; সেখানে তা না করে বন্দী হবেন ধোঁয়া তুলে আগাম মাঠ গরম করার এসব প্রচার ‘ঠাকুর ঘরে কে রে আমি কলা খাই না’ প্রবাদটা মনে করিয়ে দেয়।
পত্র-পত্রিকায় প্রচার চলছিল, বিএনপি নাকি আলোচনা শুরু করে দিয়েছে, খালেদা জিয়ার সাজা হলে বিএনপির হাল কে ধরবেন। তবে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেছেন, ‘চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাজা হলে বিএনপির হাল কে ধরবেন, এ ধরনের বিষয় নিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীরা কোনো বৈঠক বা আলোচনা করেন নি। এসবই কাল্পনিক।’ তবে প্রশ্ন হলো কাল্পনিক যদি হয়, তবে এ নিয়ে মাঠ গরম করার জন্য এত কথা কেন? আন্দোলনের ইস্যু পাওয়ার জন্য নেত্রী খালেদাকে কি জেলে পাঠাতে চাইছে বিএনপি? কে জানে কি আছে ভেতরে ভেতরে মুখোশ পরা দলটির অভ্যন্তরে? অনেক সময়েই তো নিজের নাক কাটতে যাওয়া হয়, পরের যাত্রা ভঙ্গ করতে। তবে গত নির্বাচনের আগে দেশি-বিদেশি মুরব্বিদের পরামর্শে কেবল নিজের নাকই কেটেছে বিএনপি, আওয়ামী লীগের যাত্রা ভঙ্গ করতে পারেনি।
অবস্থাদৃষ্টে এটা নিশ্চিত যে, বিএনপি দলকে চাঙা করার জন্য এখন ক্রমেই আন্দোলনের ইস্যু খোঁজার জন্য হন্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু ইন্টারেস্টিং বিষয় হচ্ছে এই যে, নিজেরা ইস্যু খুঁজবে কি, নিজেরাই হয়ে যাচ্ছে ইস্যু। অন্তত দুটো ইস্যু এখন বিএনপিকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। প্রথম ইস্যু হচ্ছে, একুশের রাতে ফুল দিতে গিয়ে খালেদা জিয়া শহীদ বেদীতে পা দিয়েছেন। বিষয়টা ইচ্ছেকৃত হয়তো বলা যাবে না; কিন্তু কাকতালীয় বা কার্যকারণ আছে বলে মনে হতেই পারে। বিএনপি নেত্রীর ‘আত্মার আত্মীয়’ জামাত। এই দল শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোকে বিধর্মীয় কাজ বলে মনে করে। প্রথা অনুযায়ী ফুল দিতেও হয় আবার জোটের ভেতর থেকে বাধাও আছে, এত রাতে দোটানার মধ্যে পড়ে ভুল হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আর মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার বাহিনীর ক্যান্টনমেন্টে থাকা খালেদা জিয়া রাজনীতিতে আসার আগে কোনোদিন যান নাই শহীদ মিনারে, তিনি নিয়মকানুন জানবেনই বা কীভাবে? তবে বলার অপেক্ষা রাখে না, এই ইস্যু বিএনপি-জামাত নেত্রীকে আসছে দিনগুলোতে তেড়ে বেড়াবে।
আর দ্বিতীয় ইস্যু বিএনপির কৃতকর্মের ফল। কানাডার আদালত দলটিকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে অভিহিত করে রায়ে বলা হয়েছে, ‘বিএনপির ডাকা হরতাল বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। বিএনপি কর্মীদের হাতে মালামালের ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াও মৃত্যু ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে।… কিন্তু বিএনপির দাবি-দাওয়া সরকারকে মানতে বাধ্য করতে লাগাতার হরতালের কারণে সৃষ্ট সহিংসতা প্রমাণ করে এটি নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের বাইরে চলে গেছে।’ এভাবে বাইরে চলে যাওয়ার কারণে বিএনপির ললাটে এমন ছাপ পড়াটাই স্বাভাবিক।
তবে বিএনপি কিছুটা হলেও বেঁচে গেছে এ জন্য যে, কানাডার আদালত জামাত, জেএমজেবি ও মুফতি গংদের প্রসঙ্গ টেনে আনেনি। জামাত মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত করার কারণে দলটির নিবন্ধ বাতিল হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও সেই দলটিকে জোটে রাখা হয়েছে। তদুপরি ক্ষমতায় থাকতে বলা হয়েছিল ‘বাংলাভাই মিডিয়ার সৃষ্টি’। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা, ৭ ট্রাক অস্ত্র চোরাচালান প্রভৃতি সবই সন্ত্রাসী কর্মকা-ের আওতায় পড়ে। সরকারে থাকলে বিএনপি উগ্র সন্ত্রাসীদের লেলিয়ে দেয় গণতান্ত্রিক ও অসম্প্রদায়িক দল, শক্তি ও ব্যক্তি এবং এমনকি বন্ধু রাষ্ট্রের হাইকমিশনারের বিরুদ্ধে আর বিরোধী দলে থাকলে সন্ত্রাসী কর্মকা- নিয়ে থাকে নিশ্চুপ হয়ে। এভাবে চলতে থাকলে দেশে-বিদেশে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ লেভেলটা আরও বেশি করে লেপ্টে যাবে বিএনপির ললাটে। বলার অপেক্ষা রাখে না, বিএনপির বিরুদ্ধে এমন সব ইস্যু জনমনে জাগ্রত থাকা অবস্থায় বিএনপি আন্দোলনে জনগণকে সমবেত করা দূরে থাক, তৃণমূলের নেতাকর্মীদেরও চাঙা করতে পারবে না।
তাই এখনও সময় আছে দেশি-বিদেশি মুরব্বিদের ফাঁদে পড়ার আগে আন্দোলন ও নির্বাচনের দ্বিমুখী খেলা বন্ধ করে বিএনপি দলটির নির্বাচনের ধারায় ফিরে আসা। অতীত কর্মকা-ের জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়ে, জামাতকে বাদ দিয়ে, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি পরিত্যাগ করে বিএনপি যদি সংবিধানের ভিত্তিতে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক কৌশল নিয়ে নির্বাচনের ধারায় আসতে পারে, তবে দেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের ধারা আরও বেগবান হবে। দেশ পাবে প্রয়োজন অনুযায়ী শক্তিশালী একটি বিরোধী দল। তবে বিএনপির জন্ম ও বায়োডাটা পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, তেমনটা হওয়ার সম্ভাবনা বিএনপির নেই বললেই চলে। অঙ্গার শত বার ধুলেও যেমন তা থেকে ময়লা যায় না। তেমনি কলঙ্কিত জামাতের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে থাকা বিএনপির শনির দশা থেকে মুক্তি পাওয়ারও কোনো পথ নেই।

Category:

Leave a Reply