শিল্পে স্থানীয় বিনিয়োগ শক্তিশালী অবস্থানে

আশরাফ সিদ্দিকী বিটু: বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ছে। গত কয়েক বছর যাবতই ঘুরে-ফিরে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ বৃদ্ধি না পাওয়ায় বিষয়টি আমাদের উদ্বেগের বিষয় ছিল। সম্প্রতি সেই উদ্বেগের আবসান ঘটেছে। দৃশ্যপট বদলে যাচ্ছে; আমাদের অর্থনীতিতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে।
বিনিয়োগ বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী বিএনপি-জামাত জোট আমলের চেয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকারের প্রথম মেয়াদে ২০১৩ পর্যন্ত দেশে স্থানীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায় ১৪৪ শতাংশ। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের ক্ষমতার শেষ বছর ২০০৬ সালে বিনিয়োগ বোর্ডে নিবন্ধিত ১ হাজার ৯০৫টি প্রকল্পে স্থানীয় মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ২১ হাজার ৮৩৬ কোটি ১৩ লাখ টাকা। তখন সেই হিসাবে বছরটিতে প্রতিমাসে গড় বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৮১৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের শেষ বছর ২০১৩ সালের প্রথম পাঁচ মাসে ৬৪৯টি প্রকল্পে দেশে স্থানীয় বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়ায় ২২ হাজার ২৫৭ কোটি ৭২ লাখ টাকা। প্রতিমাসে গড় বিনিয়োগ হয়েছে ৪ হাজার ৪৫১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ, ২০০৬ সালের তুলনায় ২০১৩ সালে প্রতিমাসে গড় বিনিয়োগ বেড়েছে ২ হাজার ৬৩১ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। শতকরা হিসাবে বৃদ্ধির এই হার ১৪৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
বিনিয়োগ সংক্রান্ত তথ্য পর্যলোচনা করে দেখা যায়, চারদলীয় জোট সরকারের পর দায়িত্বে থাকা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুবছর বিনিয়োগে ভাটা পড়ে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথম বছর ২০০৭ সালে স্থানীয় বিনিয়োগ আগের বছরের তুলনায় ৮ হাজার ৫৩৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা কমে ১৩ হাজার ৩০১ কোটি ৮০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। বছরটিতে প্রতিমাসে গড় স্থানীয় বিনিয়োগ হয় ১ হাজার ১০৮ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। এ সময় মোট বিনিয়োগ প্রকল্প ছিল ১ হাজার ৪৮২টি। আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ বছর ২০০৮ সালে স্থানীয় বিনিয়োগ আগের বছরের তুলনায় বেড়ে দাঁড়ায় ২১ হাজার ৫৫৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকায়। বছরটিতে প্রতিমাসে গড় বিনিয়োগ ছিল ১ হাজার ৭৯৬ কোটি ২১ লাখ টাকা।
জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ায় সরকারের প্রথম বছর ২০০৯ সালে স্থানীয় বিনিয়োগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ বছরের তুলনায় ৩ হাজার ৪২২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা কমে ১৮ হাজার ১৩২ কোটি ১৭ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। আর প্রকল্পের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৯৫টি। এই অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় পরের বছর স্থানীয় বিনিয়োগে ব্যাপক অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায়। পরবর্তীতে ২০১০ সালে বিনিয়োগ প্রকল্পের সংখ্যা ২০০৯ সালের তুলনায় ২০৫টি বেড়ে ১ হাজার ৬০০টিতে উপনীত হয়। আর বিনিয়োগের পরিমাণ ২৫ হাজার ৬৩৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকা বেড়ে ৪৩ হাজার ৭৭১ কোটি ৭৬ লাখ টাকায় পৌঁছে। যেখানে প্রতিমাসে গড় স্থানীয় বিনিয়োগ হয় ৩ হাজার ৬৪৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। অব্যাহত স্থানীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধির ধারায় ২০১১ সালে স্থানীয় বিনিয়োগ বেড়ে দাঁড়ায় ৫৪ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা। আর বিনিয়োগ প্রকল্পের সংখ্যা ১৫৫টি বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৭৫৫টিতে। বছরটিতে প্রতিমাসে গড়ে বিনিয়োগ হয় ৪ হাজার ৫৫০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। ২০১২ সালে বিএনপি-জামাত দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ অস্থিতিশীল করে তুলতে স্থানীয় বিনিয়োগ কিছুটা কমে যায়। তারপর সে বছর স্থানীয় বিনিয়োগ ৫০ হাজার কোটি টাকার ওপরেই থাকে। এ বছর বিনিয়োগ প্রকল্পের সংখ্যা ১০০টি কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৬৫৫টিতে। আর মোট স্থানীয় বিনিয়োগ ৪ হাজার কোটি টাকার মতো কমে দাঁড়ায় ৫০ হাজার ৭৮ কোটি ৬ লাখ টাকায়। বছরটিতে প্রতিমাসে গড়ে বিনিয়োগ হয় ৪ হাজার ১৭৩ কোটি ১৭ লাখ টাকা।
একইভাবে ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে উচ্চ আদালতে সাজাপ্রাপ্ত মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকার্য বন্ধে এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার সরকারের সফলতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে বিএনপি-জামাত অশুভ জোট অবরোধ, হরতাল, পেট্রল বোমা নিক্ষেপ ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠলে এ সময়কালে দেশে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ পরিবেশ বিনষ্ট হয়। ফলে এ সময় দেশে স্থানীয় বিনিয়োগ আশানুরূপ হারে বৃদ্ধি না পেলেও সরকারের সহায়তা ও প্রণোদনার ফলে বিনিয়োগ পরিস্থিতি পতনের হাত থেকে রক্ষা পায়। ২০১৩-১৪ সালে দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ছিল ২২ দশমিক ০৩ এবং ২০১৪-১৫ অর্থবছরে জিডিপির ২২ দশমিক ০৭ শতাংশ। শত প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম আরেকটি কারণ বিনিয়োগ নিরাপত্তা পরিস্থিতি ছিল সন্তোষজনক। বিএনপি আমলের হাওয়া ভবনের মতো কমিশন বাণিজ্য ও চাঁদাবাজি না থাকায় অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি একটি টেকসই ভিতের ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে।
বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য একটি শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রয়োজন। এজন্য সরকার বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১৬ জারি করেছে। এ আইনের বিধানমতে বিনিয়োগ বোর্ড ও প্রাইভেটাইজেশন কমিশনের কার্যক্রম একীভূত করে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (ইওউঅ) গঠন করা হয়েছে। দেশি-বিদেশি শিল্প স্থাপনের জন্য জমি প্রাপ্তি বাংলাদেশে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ উপলদ্ধি থেকে আমরা ২০১১ সালে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ পর্যন্ত ২২টি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়ন কাজের উদ্বোধন করেছেন। এছাড়া, ৫৯টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য স্থান নির্বাচন এবং ৭৬টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গভর্নিং বোর্ড কর্তৃক অনুমোদন করা হয়েছে।
সরকারের এসব যুগোপযোগী পদক্ষেপের ফলে দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। বিগত ২০১৬-১৭ অর্থবছর শেষে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ছিল ১০.৩ শতাংশ, যা বিগত সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশের মোট বিনিয়োগ ছিল জিডিপির ৩০.৩ শতাংশ। সেখানে সরকারি খাতের বিনিয়োগ ছিল ৭.৩ শতাংশ।
২০১৭-এর চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ বেড়েছে উদ্যোক্তাদের। সর্বশেষ প্রান্তিকে মোট ৫১০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবিত মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ৩৭ হাজার ২১৭ কোটি ৪৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। ২০১৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে নিবন্ধন নিয়েছিল মোট ৪৪৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। প্রস্তাবিত মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৩৩ হাজার ৬৭৩ কোটি ৬ লাখ ২৩ হাজার টাকা। আর গেল বছরের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে নিবন্ধিত মোট ৪৮৭টি শিল্প ইউনিটের প্রস্তাবিত বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ৬৮ হাজার ৭৬৭ কোটি ৬১ লাখ ২৮ হাজার টাকা।

Category:

Leave a Reply