শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তারুণ্যনির্ভর মন্ত্রিসভার শপথ

1-15-2019 5-51-37 PMআনিস আহামেদঃ ‘সমৃদ্ধ অগ্রযাত্রার বাংলাদেশ’ গড়ার অঙ্গীকারে অবিস্মরণীয় বিজয়ের মহাযোদ্ধা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ৪৭ সদস্যের তারুণ্যনির্ভর চমকের মন্ত্রিসভা শপথ নিয়েছে। গত ৭ জানুয়ারি বিকেল সাড়ে ৩টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে প্রথমে দেশের ইতিহাসে নজির ও রেকর্ড সৃষ্টি করে চতুর্থবারের মতো এবং টানা তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা। পরে তিন দফায় ২৪ মন্ত্রী, ১৯ প্রতিমন্ত্রী এবং ৩ উপমন্ত্রী শপথগ্রহণ করেন। শপথবাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।
দেশের মানুষের চোখে এখন দিনবদল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন। তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে কীভাবে স্বপ্ন পূরণের পথে দৃপ্ত পায়ে এগিয়ে চলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা। ক্ষুধা-দারিদ্র্য, দুর্নীতি, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস, মাদকমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা গড়ার এক অন্যরকম চ্যালেঞ্জ নিয়েই টানা তৃতীয়বার সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের জন্য বঙ্গভবন বর্ণাঢ্য সাজে সাজানো হয়। দরবার হলে সহস্রাধিক আমন্ত্রিত অতিথির বসার ব্যবস্থা করা হয়। কোরআন তেলাওয়াতের পর সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ করান রাষ্ট্রপতি। পরে অতিথিদের চা-চক্রে আমন্ত্রণ জানানো হয়। শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম।
মন্ত্রিসভায় যারা শপথ নিলেন : আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সরকারে পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে যারা রাষ্ট্রপতির কাছে শপথবাক্য পাঠ করেন তারা হলেনÑ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আ ক ম মোজাম্মেল হক, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে ওবায়দুল কাদের, কৃষি মন্ত্রণালয়ে ড. মো. আবদুর রাজ্জাক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসাদুজ্জামান খান, তথ্য মন্ত্রণালয় ড. হাছান মাহমুদ, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আনিসুল হক, অর্থ মন্ত্রণালয়ে আ হ ম মুস্তফা কামাল, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে মো. তাজুল ইসলাম, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ডা. দীপু মনি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একে আবদুল মোমেন, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে এমএ মান্নান, শিল্প মন্ত্রণালয়ে নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে গোলাম দস্তগীর গাজী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে জাহিদ মালেক, খাদ্য মন্ত্রণালয়ে সাধন চন্দ্র মজুমদার, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে টিপু মুনশি, সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে নুরুজ্জামান আহমেদ, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে শ ম রেজাউল করিম, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে মো. শাহাব উদ্দিন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে বীর বাহাদুর উ শৈ সিং, ভূমি মন্ত্রণালয়ে সাইফুজ্জামান চৌধুরী, রেলপথ মন্ত্রণালয়ে মো. নুরুল ইসলাম সুজন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে স্থপতি ইয়াফেস ওসমান এবং ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে মোস্তাফা জব্বার।
আর ১৯ জন প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ে কামাল আহমেদ মজুমদার, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে ইমরান আহমেদ, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে জাহিদ আহসান রাসেল, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে নসরুল হামিদ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে মো. আশরাফ আলী খান খসরু, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে বেগম মুন্নুজান সুফিয়ান, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে মো. জাকির হোসেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে মো. শাহরিয়ার আলম, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগে জুনাইদ আহমেদ পলক, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ফরহাদ হোসেন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে স্বপন ভট্টাচার্য, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে জাহিদ ফারুক, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে মো. মুরাদ হাসান, সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে শরীফ আহমেদ, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে কেএম খালিদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে ডা. মো. এনামুর রহমান, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে মো. মাহবুব আলী এবং ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহকে শপথ পড়িয়েছেন রাষ্ট্রপতি।
এছাড়া পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে বেগম হাবিবুন নাহার, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে একেএম এনামুল হক শামীম এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরীকে উপমন্ত্রী হিসেবে শপথ বাক্য পড়ানো হয়।

নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণ
আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। ক্ষমতাকে কেউ নিজেদের সম্পদ মনে করবেন না এবং ব্যক্তি স্বার্থের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবেন না। সম্পদ অর্জনের হাতিয়ার বানাবেন না। জনগণের কাছে আমাদের যে ঋণ তা পরিশোধ করতে হবে। কে নৌকায় ভোট দিল কে দিল না সেটা বিবেচ্য নয়। আমরা সবার উন্নয়ন করব।
গত ৩ জানুয়ারি নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথগ্রহণ শেষে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। জাতীয় সংসদ ভবনের নবম তলায় সরকারি দলের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকের শুরুতে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাকে সর্বসম্মতিক্রমে চতুর্থবারের মতো সংসদ নেতা ও আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। এরপর তিনি আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন।
শেখ হাসিনা দলীয় সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে আরও বলেন, আপনাদের সুখে-দুঃখে জনগণের পাশে থাকতে হবে। কারণ জনগণ যদি সঙ্গে থাকে তাহলে কেউ আমাদের রুখতে পারবে না। জনগণের জন্য কাজ করুন। নিজেদের ভবিষ্যৎ জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে হবে। জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা বজায় রাখতে হবে। নির্বাচনের আগে যেভাবে জনগণের কাছে গেছেন, শপথ গ্রহণের পর একইভাবে জনগণের কাছে যাবেন। জনগণের সবাইকে সমানভাবে দেখতে হবে। জনগণের কাছে আমাদের যে ঋণ রয়েছে উন্নয়নের মাধ্যমেই তা পরিশোধ করা হবে। সংসদ সদস্য হওয়ার ক্ষমতাকে জনগণের উন্নয়নের কাজে ব্যবহার করবেন।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও মাদকের বিরুদ্ধে যে অভিযান চলছে সেটা অব্যাহত থাকবে। সদ্য অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্টের ভরাডুবি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি-ঐক্যফ্রন্ট জামাতের সঙ্গে ঐক্য করে যুদ্ধাপরাধীদের মনোনয়ন দেয়। তারা মনোনয়ন বাণিজ্য করেছে, নির্বাচন নয় যেন তাদের লক্ষ্যই ছিল মনোনয়ন বাণিজ্য করা। শেখ হাসিনা নির্বাচনে বিএনপির বিপর্যয়ের জন্য ‘মনোনয়ন বাণিজ্য’কে প্রধান কারণ উল্লেখ করে আরও বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিরোধী দলের আচরণ ছিল খুবই অদ্ভুত। তারা বিজয় হবে এমন প্রার্থীদের মনোনয়ন দেয়নি। তারা প্রতিটি আসনে টাকা নিয়ে তিন থেকে চারজন প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। তারা নির্বাচনকে বাণিজ্য হিসেবে নিয়েছে, প্রতিযোগিতায় জিততে চায়নি। এ কারণেই তারা ডুবেছে, জনগণ ভোটের মাধ্যমে তাদের সমুচিত জবাব দিয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, গত ১০ বছরে আমরা উন্নয়নের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করেছি। নির্বাচনের ফলাফলে তারই প্রতিফলন ঘটেছে। এই অর্জন ধরে রাখতে হবে। এদেশের মানুষ অতীতে বিএনপির দুর্নীতি ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে এবারের নির্বাচনে রায় দিয়েছে। উন্নয়নের গতি আরও বেগবান করা হবে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, উন্নয়নের যে অগ্রযাত্রা সূচিত হয়েছে সেটা অব্যাহত থাকবে। ২১০০ সালকে টার্গেট করে আমরা এ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার সব ধরনের চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু এ নির্বাচনে জয়ের মাধ্যমে আবারও প্রমাণ হয়েছেÑ আওয়ামী লীগ ধ্বংস হয়নি। বরং যারা যুদ্ধাপরাধী, স্বাধীনতাবিরোধী, জামাতের সঙ্গে ঐক্য করেছে, জনগণ তাদের সমুচিত জবাব দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২০ সালে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে মধ্যম আয়ের দেশ, ২০৪১ সালে উন্নত সমৃদ্ধ দেশ গড়ে তুলব। ২০৭১ সালে স্বাধীনতার শতবার্ষিকী পালিত হবে। তখন যারা থাকবেন তারা স্বাধীনতার শতবার্ষিকী পালন করবেন একটা উন্নত সমৃদ্ধ দেশে।

Category:

Leave a Reply