শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক অবদান

Posted on by 0 comment

41রায়হান কবির : ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পূর্ব বাংলার লাঞ্ছিত নিপীড়িত বঞ্চিত-অবহেলিত গরিব-দুঃখী-মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের দৃঢ় সংকল্পে বাঙালি জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল আদর্শের আনুসারী নেতা-কর্মীদের সমন্বয়ে গঠিত হয় আওয়ামী লীগ। জন্মলগ্ন থেকেই আওয়ামী লীগ এ দেশের শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে নিবেদিত। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ে আওয়ামী লীগের প্রাণপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অসংখ্য নেতাকর্মীকে দীর্ঘ জেল-জুলুম-অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে।
আওয়ামী লীগের ভিত্তিমূলে শ্রম অধিকার
১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন অনুষ্ঠিত কর্মী সম্মেলনে গৃহীত নবগঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের খসড়া মেনিফেস্টোতে ‘শ্রম অধিকার’কে মৌলিক অধিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে বলা হয়Ñ
‘প্রত্যেক অধিবাসীরই কাজ করার অধিকার অর্থাৎ, সুযোগ ও যোগ্যতা অনুযায়ী নিযুক্ত হওয়ার এবং কাজের গুণ ও পরিমাণ-অনুযায়ী রাষ্ট্র নির্দ্ধারিত উপযুক্ত বেতন পাওয়ার পূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত করিতে হইবে। সরকারী কর্ম্মচারী, শ্রমিক ও মজুরের সর্ব্বাধিক দৈনিক কার্য্যকাল ও নি¤œতম মজুরী রাষ্ট্র আইনতভাবে নির্দ্দিষ্ট করিবে। সর্ব্বাধিক কার্য্যকাল দিনে ৬ ঘণ্টা ও সপ্তাহে ৩৬ ঘণ্টার অধিক হওয়া উচিত নয়। বার্ষিক ও সাময়িক ছুটির ব্যবস্থা রাখিতে হইবে।’
১৯৫৩ সালের ৩, ৪ ও ৫ জুলাই অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে চরম বঞ্চনার শিকার তাঁতশিল্পে কর্মরত তাঁত শ্রমিকদের প্রতি তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকারের অবহেলা ও বাণিজ্যনীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন ঘোষণা করা হয়। এই কাউন্সিলে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করে কৃষি খাতে নিয়োজিত শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের কর্মসূচি ঘোষণা করে আওয়ামী লীগ। এ কাউন্সিল অধিবেশন থেকে তৎকালীন মুসলিম লীগ সরকারের জমিদার কর্তৃক প্রজা, মালিক কর্তৃক শ্রমিক শোষণের নীতি পরিত্যাগ করার দাবি জানানো হয়। সে সময় মুসলিম লীগ সরকারের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের লক্ষাধিক কর্মী ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এই কাউন্সিল অধিবেশনে। এরই ধারাবাহিকতায় যৌক্তিক বেতন কাঠামো প্রতিষ্ঠায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর যুক্তফ্রন্ট ঘোষিত ঐতিহাসিক ২১-দফা দাবির ১৬নং দফায় বলা হয়Ñ
‘প্রশাসন ব্যবস্থার ব্যয় হ্রাস করতে হবে, উচ্চ ও নি¤œবেতনভুক সরকারী কর্মচারীদের বেতনের হার যৌক্তিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হবে। মন্ত্রীরা তাদের মাসিক বেতন এক হাজার টাকার বেশি গ্রহণ করবেন না।’
গরিব, দুঃখী, মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়কে বাংলার আপামর মানুষের দাবিতে পরিণত করতে ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রে শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য পারিশ্রমিক ও উপযুক্ত মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গঠনতন্ত্রের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অনুচ্ছেদে বলা হয়Ñ
‘জনসাধারণের অবস্থার ও জীবন ধারণের মানের উন্নতি করা ও পরিশ্রমের উপযুক্ত মর্য্যাদা ও ন্যায্যমূল্য প্রদানের ব্যবস্থা করা।’
প্রদেশে প্রথম আওয়ামী লীগ সরকার আমল (১৯৫৬-৫৮)
১৯৫৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পেলে শ্রম অধিকার প্রতিষ্ঠায় বহুমাত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ সরকার। আওয়ামী লীগের এ সরকারের সময় প্রথম লেবার রেজিস্ট্রেশন আইন প্রণীত হয়। ফলে সাংবিধানিকভাবে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়। একই সাথে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের পাশাপাশি বেকারত্ব দূরীকরণে প্রতিষ্ঠা করা হয় অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। সৃষ্টি হয় নতুন নতুন কর্মসংস্থান।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েই এফডিসি, জুট মার্কেটিং কর্পোরেশন, ওয়াপদা গঠন, ফেঞ্চুগঞ্জে প্রথম সার কারখানা নির্মাণ, সাভার ডেইরি ফার্মের সূচনা, স্থায়ী শিল্প ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং সরকারি, আধা-সরকারি বেশ কিছু স্বায়ত্তশাসিত/আধা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। এ সময় আওয়ামী লীগ সরকারের উদ্যোগে একটি স্থায়ী আমদানি-রপ্তানি কন্ট্রোলারের অফিস স্থাপিত হয়। গঠিত হয় রাজধানী ঢাকা ও বন্দরনগরী চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য যথাক্রমে ঢাকা ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্ট, চিটাগাং ডেভলপমেন্ট অথরিটি ও কেডিএ। এছাড়া জুট মার্কেটিং কর্পোরেশন এবং ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট অথরিটিও আওয়ামী লীগ সরকারের কৃতিত্ব। কেন্দ্রের বিমাতাসুলভ আচরণ সত্ত্বেও প্রদেশে আওয়ামী লীগ সরকার ভৌত-অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পের প্রসার এবং কৃষি ও সমবায়সহ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে দেশের মানুষের আস্থা ও ভালোবাসা অর্জন করে।
আওয়ামী লীগ শাসনামলেই ১৯৫৬ সালে প্রথম আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে শ্রমিক সংগঠন এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মে দিবস পালিত হয়। ১৯৫৬ সালে মে দিবস সরকারি ছুটি ঘোষিত হয়। এরপর ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারির পর আইয়ুব খান মে দিবসকে ধর্মীয় লেবাস লাগাতে তৎপর হয়ে ওঠে। থমকে দাঁড়ায় শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার অগ্রযাত্রা।
১৯৬৪ সালে পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগের পদক্ষেপ
১৯৫৮ সালের সামরিক শাসনের পর ১৯৬৪ সালে পুনরুজ্জীবিত আওয়ামী লীগ ১১-দফা খসড়া মেনিফেস্টো ঘোষণা করে। ১১-দফা খসড়া মেনিফেস্টোতেও শ্রমিক অধিকার তথা শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি ঘোষিত হয়। এই মেনিফেস্টোর ৭নং দফায় বলা হয়Ñ
‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক-সংস্থার (ওখঙ) গৃহীত সুপারিশ ও কনভেনশনের ভিত্তিতে শ্রমিকদের সকল প্রকার অধিকার ও সুযোগ-সুবিধামূলক আইন প্রণয়ন করিয়া প্রত্যেক শ্রমিকের সুষ্ঠু জীবন-যাপনের ব্যবস্থা করিতে হইবে। প্রত্যেক শ্রমিকের উপযুক্ত বেতন ও ভাতার ব্যবস্থা করিতে হইবে।’
১৯৬৯ সালে প্রকাশিত আওয়ামী লীগের সংশোধিত ‘নীতি ও কর্মসূচীর ঘোষণা (মেনিফেস্টো)’-তে শ্রমিকের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, পীড়িত থাকাকালীন পূর্ণ বেতনে ছুটির ব্যবস্থা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, বাসস্থানের ব্যবস্থা, শ্রমিকের সন্তানদের মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষার দাবি উত্থাপন করা হয়।
১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের অধিকার আদায়ে গঠন করেন ‘শ্রমিক লীগ’। ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানের সময় সামরিক আইন জারি করে মে দিবস প্রকাশ্যে পালন করতে দেয়নি পাকিস্তানি সামরিক জান্তা। ১৯৭০ সালের মে দিবস জাতীয় শ্রমিক লীগ অন্যান্য শ্রমিক সংগঠনকে সাথে নিয়ে পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্তির সংগ্রামের অংশ হিসেবে পল্টনে জনসভা ও মিছিলের ভেতর দিয়ে পালন করে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পূর্বে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জোরালো দাবি উত্থাপিত হয়। ইশতেহারে বলা হয়Ñ
‘শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার খর্বকারী সকল শ্রম আইন বাতিল করতে হবে। শিল্প-কারখানায় শ্রমিকদের ন্যায্য হিস্যা দানের মাধ্যমেই তাদের কাছ থেকে শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি আশা করা যায়।’
শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু সরকার (১৯৭২-৭৫)
স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজীবন শোষিত, বঞ্চিত, নিপীড়িত, মেহনতি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছেন। জাতির পিতা যেমন ছিলেন বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার, তেমনি তিনি ‘দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর’ জন্য ছিলেন দৃঢ় প্রতীজ্ঞ। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে বঙ্গবন্ধু শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
বঙ্গবন্ধু সরকার আমলের শুরুতেই সুদসহ কৃষকদের সব বকেয়া খাজনা ও ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির কর চিরদিনের জন্য বিলোপ করা হয়। নির্যাতনমূলক ইজারাদারি প্রথা বিলুপ্ত করা হয়। কৃষকের কল্যাণে ৭০ কোটি টাকা বকেয়া সুদ-খাজনা ও কর মওকুফ করা হয়। বঙ্গবন্ধুর সরকার প্রায় ১৬ কোটি টাকার টেস্ট রিলিফ জনসাধারণের মধ্যে বিতরণ করে। দরিদ্র্য চাষিদের ১০ কোটি টাকার ঋণ, ১ লাখ ৯০ হাজার টন সার, ২ লাখ মণ বীজধান দেওয়া হয়। সমবায়ের মাধ্যমে ৪ কোটি টাকা বিতরণের প্রকল্প চালু করা হয়। ফলে কৃষি খাতে নিয়োজিত শ্রমজীবী মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের পথ সম্প্রসারিত হয়।
১৯৭২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত রাষ্ট্রপতির ১৬নং আদেশ (চঙ-১৬)-এর আওতায় অবাঙালি তথা পাকিস্তানি মালিকানার প্রায় ৮৫ শতাংশ শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয় এবং রাষ্ট্র সেগুলোর মালিকানা গ্রহণ করে। এই ‘পরিত্যক্ত সম্পত্তিগুলো’ জাতীয়করণ আইনের মাধ্যমে ‘রাষ্ট্রায়ত্ত খাত’ হিসেবে অভিহিত হয়। বঙ্গবন্ধুর সরকার স্বাধীনতার প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে (২৬.০৩.১৯৭২-এ) পাট, বস্ত্র, চিনিকল, ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠানসমূহ জাতীয়করণের আইন পাস করে। জাতীয়করণ আইনের আওতায় ৬৭টি পাটকল, ৬৪টি বস্ত্রকল এবং ১৫টি চিনিকল জাতীয়করণ করা হয়। জাতীয় বিমান সংস্থা ও জাতীয় শিপিং সংস্থাÑ যা পূর্বেও সরকারি মালিকানায় ছিলÑ আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের অধীনে আনা হয়। এভাবে ১৫ কোটি টাকা মূল্যের স্থায়ী সম্পদ বিশিষ্ট পরিত্যক্ত ও অনুপস্থিত মালিকদের শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও বৈদেশিক বাণিজ্য জাতীয়করণ করা হয়। যার ফলশ্রুতিতে এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়।
জাতীয়করণ কর্মসূচি বঙ্গবন্ধুর সরকার হঠাৎ করেই গ্রহণ করেন নি। এটি ছিল ’৭০-এর নির্বাচনের সময় ঘোষিত আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। তা ছাড়া ছাত্রদের ১১-দফা দাবিতেও দেশের পাট, বস্ত্র, চিনিকল ও ব্যাংক-বীমা প্রতিষ্ঠানসমূহ জাতীয়করণের (৫নং দাবি) দাবি অন্তর্ভুক্ত ছিল। এমনকি ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের দেওয়া ঐতিহাসিক ২১-দফা কর্মসূচিতেও পাট শিল্প জাতীয়করণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
স্বাধীনতার পর জাতির পিতা মে দিবসে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর শাসনভার গ্রহণের সময় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যে অর্থ ছিল তা দিয়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেওয়া সম্ভব ছিল না। তবুও সদ্য স্বাধীন দেশের মানুষের আকাক্সক্ষার পরিপূরক হিসেবে বঙ্গবন্ধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কমিশন গঠন করে ১০ স্তর বিশিষ্ট নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়ন করেন। বঙ্গবন্ধু শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে মজুরি কমিশন গঠন করেন। তিনি শ্রমিকদের জন্যও নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা করেন। ১৯৭২ সালের মে দিবসে শ্রমিকদের মজুরির হার বৃদ্ধি এবং যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ও দুর্দশাগ্রস্ত শ্রমিকদের এডহক সাহায্য প্রদানের ঘোষণা দেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর ঘোষণাটি ছিলÑ
‘যে সকল শ্রমিক সরকারি মালিকানাধীন কর্পোরেশন, সংস্থা ও কর্তৃপক্ষ, রাষ্ট্রায়ত্ত ও সরকারি তত্ত্বাবধানের অধীনে ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইত্যাদিতে নিযুক্ত আছেন ও মাসিক ৩৩৫ টাকা পর্যন্ত পাচ্ছেন, তাদের সাময়িক ভিত্তিতে এই হারে সাহায্য মঞ্জুর করা হয়েছে :
১. মাসিক মজুরি ১২৫ টাকা পর্যন্তÑ মাসিক ১২৫ টাকা। মাসিক মজুরি ১২৬ টাকা থেকে ২২৫ টাকা পর্যন্তÑ মাসিক ২০ টাকা। এই শ্রেণীভুক্ত শ্রমিকরা সর্বনি¤œ মাসিক ১৫০ টাকা পাবেন।
২. মাসিক মজুরি ২২৬ টাকা থেকে ৩৩৫ টাকা পর্যন্তÑ মাসিক ১৫ টাকা :
ক. এই শ্রেণিভুক্ত ব্যক্তিরা সর্বনি¤œ ২৪৫ টাকা পাবেন। খ. যে সকল ব্যক্তি মাসিক ৩৪৯ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান তাঁদের জন্য মার্জিনাল এডজাস্টমেন্ট করা হবে। এই সুবিধা স্থায়ী, অস্থায়ী, বদলী ও ওয়ার্কচার্জড শ্রমিকরাও পাবেন। সরকারের মালিকানাধীন বা তত্ত্বাবধানাধীন চা বাগানের শ্রমিকরা এই হারে এসব সাময়িক সুবিধা ভোগ করবেন : ক. দুই সদস্যবিশিষ্ট অদক্ষ শ্রমিক পরিবার মাসিক অতিরিক্ত ২০ টাকা পাবেন।
খ. দ্ইু সদস্যবিশিষ্ট অদক্ষ শ্রমিক পরিবার মাসিক অতিরিক্ত ১০ টাকা পাবেন।
১৯৭২ সালের মে দিবসের শ্রমিক সমাবেশে বঙ্গবন্ধু দীপ্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করেন “বিশ্ব আজ দু’ভাগে বিভক্ত। একদিকে শোষক, অন্যদিকে শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।” সংবিধানে জাতীয় চার নীতির অন্যতম নীতি হিসেবে ‘সমাজতন্ত্র’ যুক্ত করা হয়। যার মর্মার্থ হলোÑ শোষণবিহীন সমাজ। জাতির পিতা সংবিধানে মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন।
বাংলাদেশ সংবিধান : অনুচ্ছেদ ১৪ রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হবে মেহনতী মানুষকে-কৃষক ও শ্রমিকের-এবং জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তি দান করা।
বাংলাদেশ সংবিধান : অনুচ্ছেদ ১৫ কর্মের অধিকার অর্থাৎ কর্মের গুণ ও পরিমাণ বিবেচনা করে যুক্তিসংগত মজুরীর বিনিময়ে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার অধিকার; যুক্তিসংগত বিশ্রাম, বিনোদন ও অবকাশের অধিকার।
বাংলাদেশ সংবিধান : অনুচ্ছেদ ৩৪ সকল প্রকার জবরদস্তি-শ্রম নিষিদ্ধ; এবং এই বিধান কোনভাবে লংঘিত হইলে তাহা আইনত: দ-নীয় অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে।
বঙ্গবন্ধুর সরকারের আমলে শ্রম অধিদফতরকে ঢেলে সাজান হয়। এসময় শ্রম ও সমাজ কল্যাণবিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করা হয়। বঙ্গবন্ধু শিশু আইন প্রণয়ন করেন। মজুরি পরিশোধ, শিশুশ্রম রোধ, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, শ্রমজীবীদের ক্ষতিপূরণ ও স্বার্থ সংরক্ষণবিষয়ক আইনগুলোর বাস্তবায়ন শুরু করেন। দেশের শ্রমজীবী মানুষ যাতে করে জাতীয় উৎপাদন প্রক্রিয়ার সাথে নিজেকে অংশীদার বলে ভাবতে পারে তার জন্য রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প-কারখানার পরিচালকদের মধ্যে শ্রমজীবী মানুষের প্রতিনিধিত্ব সংবলিত আইন প্রণয়নের নির্দেশ জারি করা হয়। জেলেদের মাঝে মাছ ধরার আধুনিক সরঞ্জাম, ন্যায্যমূল্যে জাল বোনার সুতা ও নৌকা নির্মাণের জন্য উপকরণ বিতরণ করা হয়। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু তাঁত শিল্পকে গুরুত্ব দিয়ে তাঁতিদের জন্য রং, সুতা থেকে শুরু করে তাঁতের জন্য যা যা প্রয়োজনীয় সব উপকরণ সহজলভ্য করেন।
১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট-পরবর্তী সময় (১৯৭৫-৯৬)
১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার পর সামরিক শাসকগোষ্ঠী শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণে আওয়ামী লীগ গৃহীত পদক্ষেপগুলো একে একে বাতিল করলে কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি মানুষের জীবনে নেমে আসে অত্যাচার-নির্যাতনের খড়গ। বঙ্গবন্ধুর সরকার যেখানে ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা, বকেয়া ঋণ ও কর মওকুফ করে দিয়েছিলেন সেখানে ১৫ আগস্ট-পরবর্তীতে খুনিচক্র ক্ষমতায় বসে সেই খাজনা এবং বকেয়া ঋণ ও কর চক্রবৃদ্ধি সুদসহ আদায় করে। নিত্যনতুন করারোপ করে গরিব কৃষক-শ্রমিককে শোষণ করা মোশতাক-জিয়া খুনি সরকারের একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। রেল ভাড়া, লবণ কর, কীটনাশক ঔষধের মূল্য, কৃষির সরঞ্জাম, পাওয়ার পাম্প ও তেলের দাম মাত্রাতিরিক্ত হারে বৃদ্ধি করা হয়। বৈদেশিক ঋণের দাসত্বের নিগঢ়ে বেঁধে ফেলা হয় গোটা জাতিকে।
বঙ্গবন্ধু কর্তৃক গৃহীত জাতীয়করণ নীতি বানচাল করার জন্য মুনাফা অর্জনকারী শিল্প-কারখানা ব্যক্তি মালিকানায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়। জাতীয়করণকৃত শিল্প-কারখানার সাবেক পাকিস্তানি মালিকদের ক্ষতিপূরণ দান, পুঁজি বিনিয়োগের সিলিং শিথিলকরণ এবং তার সাথে সাথে আন্তর্জাতিক বহু জাতিভিত্তিক সংস্থাসমূহের স্বার্থসংরক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা থাকে না, নির্বিবাদে শ্রমিক ছাঁটাই শুরু হয়। ফলে এসব শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের জীবনে আসে দুর্বিষহ অত্যাচার-নির্যাতন। তারা আবারও মালিক পক্ষের শোষণ-নিপীড়নের শিকারে পরিণত হয়।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে, বাংলাদেশের শতকরা ৮৫ জন মানুষ তখন দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যায়। শতকরা ৫৭ জন কৃষক  ভূমিহীনে পরিণত হয়, বঙ্গবন্ধুর সরকারের সময় যা ছিল মাত্র ৩৭ শতাংশ। প্রায় ১ কোটি কর্মক্ষম যুবক বেকার জীবনে বাধ্য হয়। অন্যদিকে পাঁচ বছরে (১৯৭৫-৮০) বাংলাদেশে কোটিপতির সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যায়। গরিব আরও গরিব হতে থাকে, গরিবের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং ধনী আরও ধনী হতে থাকে। এ সময় স্বৈরাচার সরকারের ভ্রান্তনীতির ফলে শত শত কল-কারখানা বন্ধ হয়ে পড়ায় অগণিত শ্রমিক-কর্মচারী বেকারত্বের দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে দিনাতিপাত করতে বাধ্য হয়। এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে ১৯ শ্রমিককে প্রাণ হারাতে হয়।
১৯৭৭ সালের চরম রাজনৈতিক বৈরিতা, জেল-জলুম, অত্যাচার-নির্যাতনের মধ্যে ১ মে দেশব্যাপী মহান মে দিবস পালন করে আওয়ামী লীগ। এই মে দিবসে শ্রমিক-শ্রেণি তথা মেহনতি মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারের দমননীতির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ। শ্রমজীবী মানুষের লক্ষ কোটি কণ্ঠে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়।
১৯৮১ সালে ১৩, ১৪ ও ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে গৃহীত গঠনতন্ত্রে কৃষক-শ্রমিকসহ সকল মেহনতি ও অনগ্রসর জনগণের ওপর শোষণ অবসানের জন্য পূর্ণ অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শোষণমুক্ত ও সুষম সাম্যভিত্তিক এক সমাজ প্রতিষ্ঠার  কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এ সম্মেলনে সর্বসম্মতিক্রমে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। দীর্ঘ ছয় বছর নির্বাসিত জীবন শেষে ১৯৮১ সালের ১৭ মে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করে মানিক মিয়া এভিনিউয়ে আয়োজিত গণসংবর্ধনায় কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি জনতার অধিকার প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। তিনি বলেনÑ
‘বঙ্গবন্ধু ঘোষিত দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে জীবন উৎসর্গ করে দিতে চাই।… … … আমি চাই বাংলার মানুষের মুক্তি। শোষণের মুক্তি। বাংলার মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য বঙ্গবন্ধু সংগ্রাম করেছিলেন। আজ যদি বাংলার মানুষের মুক্তি না আসে, তবে আমার কাছে মৃত্যুই শ্রেয়। আমি আপনাদের পাশে থেকে সংগ্রাম করে মরতে চাই।’
১৯৮২ সালের ১ মে শ্রমিক লীগসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনকে নিয়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান মে দিবস পালন করে আওয়ামী লীগ। এ সময় বিভিন্ন শ্রমিক ও পেশাজীবী সংগঠনসমূহকে ঐক্যবদ্ধ করে স্বৈর-সামরিক শাসনবিরোধী দুর্বার আন্দোলন শুরু করে আওয়ামী লীগ। ’৮৩-র স্বৈরাচার-বিরোধী মুক্তির লড়াইয়ে একাত্ম হয়ে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্যপরিষদ। ১৫ দল, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আর শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গড়ে তোলে দুর্বার গণ-আন্দোলন। এ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ঘোষিত ৫-দফা দাবিতে বলা হয়Ñ ‘শ্রমিক, কর্মচারী, কৃষক, ক্ষেতমজুরসহ সকলের দাবী প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’
১৯৮৪ সালের ১৪ অক্টোবর ১৫ দল ও ৭ দল আহূত জাতীয় মহাসমাবেশ হতে গণমানুষের অধিকার ও দাবি প্রতিষ্ঠার ২১-দফা কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়। ২১-দফা কর্মসূচিতে কৃষক, শ্রমিক, পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র, শিক্ষকসহ সমাজের সকল স্তরের মানুষের মৌলিক দাবিসমূহ স্থান পায়।
১৯৮৬ সালের ১৬ এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগসহ ঐক্যজোট নেতৃবৃন্দ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন, শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদসহ বিভিন্ন স্তরের মানুষের সাথে মহাসমাবেশের সফল প্রস্তুতির লক্ষ্যে আলোচনায় মিলিত হয় এবং যুগপৎ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ২৪ ফেব্রুয়ারি সারাদেশ হতে অধিকারবঞ্চিত সংগ্রামী জনতা দলে দলে ছুটে এসে মিলিত হয় শেরেবাংলা নগরের ঐতিহাসিক জাতীয় মহাসমাবেশে। মহাসমাবেশ থেকে শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, জনতা স্বৈরাচার ও সামরিক শাসনবিরোধী সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার শপথ গ্রহণ করে।
১৯৯১ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষণা করা হয়Ñ
‘সরকারী ও বেসরকারী উভয় খাতে শ্রমিকদের শ্রম সংগঠন প্রতিষ্ঠার অধিকার সংরক্ষিত হবে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও বেসরকারী খাতে শ্রমিকদের বেতন কাঠামো ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধাকল্পে মালিক, শ্রমিক ও অন্যান্য প্রতিনিধি সমন্বয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিবেচনার মাধ্যমে মজুরী নির্ধারণের ব্যবস্থা করা হবে।’
১৯৯২ সালের ১৯ ও ২০ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে ঢালাওভাবে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের বিরোধিতা করা হয়। কাউন্সিলে আদমজী মিল বন্ধ করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সরকারকে হুঁশিয়ার করা হয়। ১৯৯৪ সালের ৬ থেকে ৮ সেপ্টেম্বর ‘কৃষক বাঁচাও Ñ দেশ বাঁচাও’ কর্মসূচিকে সামনে নিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ জেলা ও থানা পর্যায়ে গণসংযোগ ও সভা-সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন এবং কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের অংশগ্রহণে ৮ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসক ও থানা নির্বাহী অফিসারের কাছে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা স্বাক্ষরিত কৃষকদের সমস্যা সমাধানে ১১-দফা দাবিনামা পেশ করা হয়। ন্যায্যমূল্যে সারের দাবি জানাতে গিয়ে বিএনপি সরকারের পুলিশের গুলিতে নিহত ১৮ জন নিরীহ কৃষকের রক্তে বাংলার শ্যামল প্রান্তর রঞ্জিত হলে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে আওয়ামী লীগ।
বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রথম মেয়াদে শ্রম অধিকার (১৯৯৬-২০০১)
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের এ আমলে শ্রম ও জনশক্তি খাতে কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং উন্নয়নের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হয়। এ সরকারের আমলে স্থাপিত হয় ১ লক্ষ ৬ হাজার ৭৭৭টি ছোট-বড় শিল্প-কারখানা। এতে লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়।
তাঁতবস্ত্র উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বেনারসি পল্লী এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের তাঁতিদের জন্য সমন্বিত উন্নয়ন ও পুনর্বাসন শীর্ষক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়। প্রান্তিক তাঁতিদের চলতি মূলধন সরবরাহের লক্ষ্যে ৫০ কোটি টাকা ব্যয় সংবলিত ক্ষুদ্র কর্মসূচি শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এ সময় সর্বপ্রথম তাঁতিদের আমরা ঋণ দেওয়া শুরু করা হয়। অতীতে তাঁতিদের ঋণ দেওয়া হতো না।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হওয়ায় ভারতে আশ্রয় গ্রহণকারী ৬৫ হাজার শ্রমজীবী ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী শরণার্থী দেশে ফিরে আসে। ১৯৯৮ সাল থেকে শুরু করা হয় বর্গাচাষিদের কৃষিব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ প্রদান করা। বাংলাদেশের কৃষক, বর্গাচাষিরা কোনো দিন ব্যাংকের ঋণ পেত না।
শ্রমিক-কর্মচারীদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য জাতীয় মজুরি ও উৎপাদনশীলতা কমিশন কর্তৃক প্রণীত শ্রমিকদের নি¤œতম মজুরির সুপারিশ বাস্তবায়িত করা হয়। গার্মেন্ট শিল্পে শিশুশ্রম সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়। নির্বাচনী ওয়াদা অনুযায়ী একটি গণতান্ত্রিক ‘শ্রমনীতি’ প্রণয়ন করা হয়। নিশ্চিত করা হয় শ্রমিক-কর্মচারীদের ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার। ১১টি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প-কারখানার মালিকানা ও পরিচালনার দায়িত্বভার সংশ্লিষ্ট শিল্পের শ্রমিক-কর্মচারীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। এতে শ্রমজীবী মানুষের অধিকারের সীমা যেমন বাড়ে, তেমনি বাড়ে তাদের দায়িত্বও। ফলে পাঁচ বছরে শিল্প প্রবৃদ্ধির সর্বোচ্চ হার অর্জিত হয় ১৯৯৭-৯৮ সালে ৮.৫ শতাংশ।
এ সময় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প প্রসারের লক্ষ্যে ৫৭টি শিল্পনগরী স্থাপন করা হয় এবং ১৩টি শিল্পনগরী স্থাপনের কাজ শুরু করা হয়। ১৯৯৫-৯৬ থেকে ২০০০-০১ অর্থবছর পর্যন্ত বিসিক-এর অধীনস্ত নিবন্ধনকৃত শিল্প ইউনিটের আওতায় ৬৪ হাজার ২৪ থেকে ৭২ হাজার ৫৯৫ জনের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়। বেসরকারি খাতকে শক্তিশালী ও গতিশীল করার জন্য প্রাইভেটাইজেশন বোর্ডকে পুনর্গঠিত করা হয়। ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২২টি শিল্প ইউনিট বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কাছে বিতরণ করা হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের এই আমলে পল্লী সমাজকর্মের পরিধি সম্প্রসারিত করতে দেশের ৬৪টি জেলা ও ৩১১টি উপজেলায় কার্যালয় স্থাপনের মাধ্যমে পল্লীর দারিদ্র্যসীমার নিচে অবস্থানরত ভূমিহীন কৃষক, বেকার যুবক, দুস্থ মহিলা, বিদ্যালয়-বহির্ভূত কিশোর ও পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের কারিগরি দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নসহ তাদের স্ব-কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে এই প্রকল্পের আওতায় ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণ করা হয়। দেশের বেকার যুবকদের জন্য লাভজনক ও উৎপাদনমুখী কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার  প্রতিষ্ঠা করে কর্মসংস্থান ব্যাংক। ১৯৯৬ সালে বেতনসহ চার মাস পর্যন্ত মাতৃত্বকালীন ছুটি ঘোষণা করা হয়।
জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বের দ্বিতীয় ও তৃতীয় মেয়াদ (২০০৯-১৭)
আওয়ামী লীগ যখনই দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে তখনই শ্রমিকের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য কাজ করেছে। আওয়ামী লীগ বিশ্বাস করে, শ্রমিকরাই অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এ কারণে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পরপরই জাতীয় মজুরি ও উৎপাদনশীলতা কমিশন গঠন করা হয়। কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে রাষ্ট্রায়ত্ত কল-কারখানার শ্রমিকদের মজুরি ও ভাতা প্রায় ৭০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের অবসর গ্রহণের বয়সসীমা ৫৭ থেকে ৬০ বছরে উন্নীত করা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যেমন বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে, ঠিক তেমনি বেসরকারি খাতে নিয়োজিত শ্রমজীবীদেরও বেতন বৃদ্ধি পেয়েছে।
শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষে ১৬টি ধাপে সর্বনি¤œ ২ হাজার ৪৫০ থেকে ৪ হাজার ১৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার ৬০০ টাকায় মজুরি স্কেল ও ভাতা/প্রান্তিক সুবিধাদি নির্ধারণ করে পণ্য উৎপাদনশীল রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান শ্রমিক (চাকরির শর্তাবলী) আইন, ২০১২ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।
২০১০ সালে দেশের শ্রমঘন ও সর্বাধিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী গার্মেন্ট শিল্প সেক্টরের শ্রমিকদের নি¤œতম মজুরি ১ হাজার ৬৬২ থেকে ৮২ শতাংশ বৃদ্ধি করে ৩ হাজার টাকা পুনর্নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করা হয়। পরবর্তীতে পুনরায় ২০১৩ সালে গার্মেন্ট শ্রমিকদের নি¤œতম মজুরি ৩ হাজার টাকা থেকে ৭৭ শতাংশ বৃদ্ধি করে ৫ হাজার ৩০০ টাকা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। অন্যান্য সেক্টরেও নি¤œতম মজুরি ঘোষণা করা হয়েছে। গার্মেন্ট শ্রমিক থেকে শুরু সকল পর্যায়ের শ্রমজীবী মানুষ যাতে স্বচ্ছলভাবে চলতে পারে সে ব্যাপারে জাতীয় মজুরি কমিশন কাজ করছে।
আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে বেকার যুবকদের প্রশিক্ষণ ও ঋণ দেওয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৭০ হাজার বেকার নারী-পুরুষ প্রশিক্ষণ নিয়ে কর্মে নিয়োজিত হয়েছেন। চট্টগ্রাম ও ঢাকায় গার্মেন্ট নারী শ্রমিকদের আবাসন তৈরি করা হচ্ছে। কর্মজীবী নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। চাকরিজীবী মেয়েদের জন্য হোস্টেল নির্মাণ করা হচ্ছে। শ্রমিকদের জন্য এমনকী গার্মেন্ট শ্রমিকদের জন্য হোস্টেল নির্মাণ এবং ডরমেটারি নির্মাণ করে দেওয়া হচ্ছে। শ্রমজীবী মহিলাদের ছোট বাচ্চাদের যাতে বাড়িতে অনিশ্চয়তায় ফেলে রেখে আসতে না হয় তার জন্য ডে-কেয়ার সেন্টার নির্মাণ করা হচ্ছে। নারী শ্রমিক ও তাদের শিশুদের কল্যাণে ৩ হাজার ৯৪৬টি কারখানা ও প্রতিষ্ঠানে ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। কর্মজীবী মেয়েদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস পর্যন্ত করা হয়েছে।
সরকার বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন বিধিমালা, ২০১০ প্রণয়ন করেছে এবং এই আইনের বিধান স্পষ্টীকরণ ও বাস্তবায়নে বাধ্যবাধকতা আরোপ করে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন (সংশোধন) আইন ২০১৩ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার লক্ষে এবং জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার উদ্দেশে একটি আধুনিক শ্রমনীতি প্রণয়ন অপরিহার্য হয়ে পড়ায় বিদ্যমান বাস্তবতার আলোকে জাতীয় শ্রমনীতি ২০১২ প্রণয়ন করা হয়েছে। ২০১৩ সালে জুলাই মাসে মহান জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, ট্রেড ইউনিয়ন রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি সহজীকরণ, শ্রমিকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও কারখানার নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন-২০১৩) আইন, ২০০৬ অনুযায়ী ১৪ বছর বয়স পূর্ণ হয়নি এমন শিশুকে শ্রমে নিয়োগ এবং অনূর্ধ্ব ১৮ বছরের কিশোরকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ‘শিশুদের জন্য জাতীয় সিএসআর নীতি’ প্রণয়নের লক্ষে সেভ দ্য চিলড্রেন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই নীতি প্রণয়নে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে। জাতীয় শিল্প স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠন এবং জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি নীতিমালা, ২০১৩ প্রণয়ন করা হয়েছে। জাতীয় শিল্পনীতি-২০১৫, ট্রেডস মার্ক বিধিমালা-২০১৫ প্রণীত হয়েছে।
প্রতিবছর এই তহবিলে ৫০ থেকে ৬০ কোটি টাকা জমা হবে। এই অর্থ গার্মেন্ট শিল্পের শ্রমিক কল্যাণে ব্যয় করা হবে। শ্রমিক কল্যাণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষে গঠিত শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের এই তহবিলে বর্তমানে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি টাকা। এই তহবিল থেকে ডিসেম্বর ২০১৬ পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত সহ¯্রাধিক শ্রমিককে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা কল্যাণ, গোষ্ঠীবীমার প্রিমিয়াম ও শিক্ষা-বৃত্তি বাবদ প্রদান করা হয়েছে। ইপিজেডস্থ শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষা এবং কল্যাণের জন্য ‘বাংলাদেশ ইপিজেড শ্রম আইন, ২০১৪’ শিরোনামে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বতন্ত্র নতুন শ্রম আইন নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়েছে। ইপিজেডের ২২০টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে শ্রমিক কল্যাণ সমিতি গঠিত হয়েছে, যারা সিবিএ হিসেবে কাজ করছে।
চা-শিল্পের উন্নয়ন এবং শ্রমিকদের কল্যাণে চা আইন-২০১৫ এবং শ্রমিক কল্যাণ আইন-২০১৫ চূড়ান্ত করা হয়েছে। চা-শ্রমিকদের কল্যাণে জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ চা-শ্রমিক কল্যাণ তহবিল বিল ২০১৬ পাস হয়েছে। দায়িত্ব পালনকালে কোনো শ্রমিক শারীরিক বা মানসিকভাবে অক্ষম হওয়ার কারণে চাকরি থেকে অবসর, অপসারণ বা অব্যাহতি পেলে তাকে তহবিল থেকে এককালীন অনুদান দেওয়া হবে। কোনো শ্রমিক চাকরিরত অবস্থায় বা অবসর নেওয়ার পাঁচ বছরের মধ্যে মারা গেলে প্রাপ্য অনুদান তার পরিবার পাবে।
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ৪২৬টি তাঁতের বিপরীতে ১৪২ তাঁতিকে ৪৯ লাখ ২৬ হাজার টাকা ঋণ প্রদান করা হয়েছে এবং সেই সাথে তাঁতিদের প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। গার্মেন্ট শিল্প ও তাঁত শিল্পের মানোন্নয়নে টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় এবং ফ্যাশন ডিজাইন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তাছাড়া তাঁত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, নরসিংদীতে অবস্থিত প্রশিক্ষণ সেন্টারকে আরও উন্নত করা হয়েছে এবং ২০১১-১২ অর্থবছরে চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন টেক্সটাইল কোর্স সেখানে চালু করা হয়েছে। বর্তমানে এই কোর্সে ভর্তির ক্ষেত্রে তাঁতি পরিবারের সন্তানদের ১০ শতাংশ কোটা রাখা হয়েছে। এ ছাড়াও নতুন নতুন ডিজাইন উদ্ভাবনের লক্ষে ৪১ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে ফ্যাশন ডিজাইন ও ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এবং একটি বেসিক সেন্টার স্থাপনের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় নরসিংদীতে একটা ফ্যাশন ডিজাইন ও ট্রেনিং ইনস্টিটিউট নির্মাণের কাজ প্রায় ৯৫ শতাংশ সমাপ্ত হয়েছে। আর সিরাজগঞ্জ জেলার বেলকুচি, টাঙ্গাইল, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জে একটি করে মোট ৩টি প্রশিক্ষণ উপকেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে।
মাদারীপুর থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় তাঁত পল্লী গড়ে তোলা হচ্ছে। সেই সাথে বেনারসি প্রস্তুতের ক্ষেত্রেও বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। মাদারীপুরের শিবচর ও শরীয়তপুরের জাজিরায় ১২০ একর জমিতে তাঁত পল্লী স্থাপন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। কুটির শিল্পের সংস্থার মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জের তারাবোতে ক্ষুদ্র তাঁতিদের জন্য প্লট দেওয়া হচ্ছে। রংপুর এবং এর পার্শ্ববর্তী জেলায় তাঁতিদের উন্নয়নে ২০১১-তে রংপুরে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বেসিক সেন্টার ও প্রদর্শনী কাম বিক্রয় কেন্দ্র স্থাপনসহ ৫০০ তাঁতিকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। গত আট বছরে সারাদেশে তাঁত সংশ্লিষ্ট ১ হাজার ১৮৯ জনকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে।
সিলেটের মণিপুরী তাঁত শিল্পের উন্নয়নে প্রশিক্ষণ, নকশা উন্নয়ন, তাঁত বস্ত্র প্রদর্শনী ও বিক্রয় কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ফলে ৬০০ মণিপুরী তাঁতিকে প্রশিক্ষণ প্রদান করাসহ তাঁতিদের উৎপাদিত বস্ত্র বিপণনের সুবিধার্থে সিলেটের জিন্দা বাজারস্থ ওয়েস্টওলাল্ড শপিং সিটিতে একটি প্রদর্শনী কাম বিক্রয় কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। নারী ব্যবসায়ী যাতে গড়ে ওঠে, বিয়োগকারী গড়ে ওঠে সেজন্য সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। বিসিক শিল্পনগরীতে ১০ শতাংশ প্লট মেয়েদের জন্য সংরক্ষিত করা হয়েছে। এসএমই খাত থেকে যে ঋণ দেওয়া হচ্ছে সেখানেও মেয়েদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা এবং মেয়েদের জন্য স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। বাজেটে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ১০০ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
স্বতন্ত্র জামদানি পল্লী স্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) প্রায় ৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নারাণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলাধীন তারাবো ইউনিয়নের নোয়াপাড়াতে ২০ একর জমির ওপর ইতোমধ্যে জামদানি শিল্পনগরী ও গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এই শিল্পনগরীতে মোট ৪০৯টি শিল্প প্লট রয়েছে, ৩৯৯টি প্লট উদ্যোক্তাদের মাঝে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং এখানে ৩৬৩টি জামদানি শিল্প-কারখানা স্থাপিত হয়েছে। তাছাড়া সেখানে একটি হাটকর্নার স্থাপিত হয়েছে।
ইউনেস্কোর উদ্যোগে আজারবাইজানের বাকুতে ১০০টি দেশের ঐতিহ্যবাহী পণ্য নিয়ে অনুষ্ঠিত ইন্টারগভর্নমেন্ট কমিটির অষ্টম সম্মেলনে প্রদর্শিত পণ্যগুলোর মধ্য থেকে ইউনেস্কোর জুরিবোর্ড ৭টি ঐতিহ্যবাহী পণ্যকে ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজের তালিকাভুক্ত করে। যার মধ্যে বাংলাদেশের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য এবং পৃথিবী খ্যাত মসলিনের উত্তরাধিকার জামদানি অন্যতম। ইউনেস্কোর তালিকাভুক্তির পর সরকার জামদানিকে জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধনের উদ্যোগ নেয় সরকার। ২০১৫ সালে ‘ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য বিধিমালা’ করে বিসিকের মাধ্যমে আবেদন করে বাংলাদেশ। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের প্রথম নিবন্ধিত ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে সনদ পেয়েছে জামদানি। ফলে এখন এর স্বত্ব কেবলই বাংলাদেশের।
প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বিদেশে গমনেচ্ছুরা এই ব্যাংক থেকে কম সুদে ঋণ নিয়ে বিদেশে যেতে পারছেন। দেশে ফিরে বিনিয়োগের জন্য ঋণ নিতে পারছেন। একদিনেই দেশে রেমিট্যান্স পাঠাতে পারছেন। কর্মসংস্থান ব্যাংক থেকে বিনা জামানতে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হচ্ছে। প্রবাসী শ্রমিকদের কল্যাণে ২০১৩ সালে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন প্রণয়ন করা হয়। প্রবাসে মৃত্যু হলে বাংলাদেশি নাগরিকদের পরিবার দেশে ৩ লাখ টাকা এবং বিমান বন্দরে মৃত ব্যক্তির পরিবার লাশ পরিবহনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা করে পাচ্ছেন। এ ছাড়া অসুস্থ ও পঙ্গু ব্যক্তিদের জন্য ১ লাখ টাকা প্রদান করা হচ্ছে, বিদেশগামী সকল কর্মীকে বীমা করে দেশের বাইরে আসার বিষয়টিও নিশ্চিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। অভিবাসী কর্মীদের জীবনমান উন্নয়নে স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকারই ‘প্রবাসী কল্যাণ বোর্ড’ গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ জন্য ‘প্রবাসী কল্যাণ বোর্ড আইন, ২০১৭’-এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। প্রবাসী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের কল্যাণের জন্য বোর্ড গঠন করবে সরকার। প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মীদের বীমার আওতায় আনা হবে এবং তাদের ও তাদের পরিবারের সদস্যদের কল্যাণে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতাল স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নারী শ্রমিকরা প্রবাসে সম্মানের সাথে কাজ করছেন। প্রবাসী নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এজন্য ‘প্রবাসী নারীকর্মী অভিযোগ ব্যবস্থাপনা সেল’ গঠন করা হয়েছে।
সড়ক পরিবহনে ব্যক্তি মালিকানাধীন খাতে নিয়োজিত শ্রমিকদের কল্যাণ সাধনের উদ্দেশে ‘ব্যক্তি মালিকানাধীন বেসরকারি শ্রমিক কল্যাণ তহবিল বিধিমালা ২০১২’ প্রণয়ন করা হয়েছে। নির্মাণ ও মটরযান মেরামত সেক্টরে কর্মরত লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষের নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশন বিধিমালা-২০১০ অনুযায়ী বাংলাদেশ জীবনবীমা কর্পোরেশনের সহায়তায় পাঁচ বছর মেয়াদি দুটি আলাদা আলাদা গোষ্ঠী বীমা স্কিম চালু করা হয়েছে।
সরকার মৎস্য আহরণ করে বেঁচে থাকা শ্রমজীবী মানুষের তথা মৎস্যজীবীদের কল্যাণে ‘জাল যার জলা তার’ নীতি বাস্তবায়ন করছে। এজন্য জলমহাল বা উন্মুক্ত জলাশয় লিজ দেওয়ার সময় যেন প্রকৃত মৎস্যজীবীরা লিজ পান তা নিশ্চিত করতে প্রথমবারের মতো জেলেদের নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র প্রদান করা হয়েছে। ২০১৬ সাল পর্যন্ত সারাদেশের প্রায় ১৫ লাখ জেলেকে নিবন্ধন করা হয়েছে। ঝড়, সাইক্লোন, জলোচ্ছ্বাসে মৃত্যু, জলদস্যু এবং বাঘের আক্রমণে প্রাণহানি, কুমির ও সাপের কামড়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলে পরিবারকে অনুদান প্রদান করা হচ্ছে।
মৎস্য চাষি, মৎস্যজীবী ও উদ্যোক্তাদের প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে। প্রান্তিক পর্যায় থেকে শুরু করে সকল স্তরের মৎস্য চাষিদের এবং ভূমিহীন, বেকারদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। ইলিশ মাছের উৎপাদন যাতে বাড়ে তার জন্য ঠিক যে সময় ইলিশ মাছ ডিম দিতে আসে এবং জাটকা যাতে না ধরে তার জন্য জেলেদের ৪০ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছে। এসব জেলেদের বিকল্প ব্যবস্থা করে দেওয়া হচ্ছে, বিকল্পভাবে তারা যেমন খাঁচার মধ্যে মাচের চাষ বা অন্যান্যভাবে কিছু করে খেতে পারে সে ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছে সরকার। বর্তমানে মাত্র ১০ টাকা কেজি দরে চাল কিনতে পারছে ৫০ লাখ পরিবার। এই সুবিধা নেওয়া জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগই শ্রমজীবী মানুষ।
গৃহকর্মে নিযুক্ত বিপুল জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা ও কল্যাণে পূর্ণাঙ্গ আইন প্রণয়নের প্রাথমিক ধাপ হিসেবে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণনীতি, ২০১৫ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই নীতি গৃহকর্মে নিয়োজিত কর্মীদের কাজে নিরাপত্তা, শোভন কর্মপরিবেশ, মজুরি ও কল্যাণ নিশ্চিত করা, বিনিয়োগকারী ও গৃহকর্মীদের মধ্যে সুসম্পর্ক সমুন্নত রাখা এবং কোনো অসন্তোষ সৃষ্টি হলে তা নিরসনে কাজ কাজ করবে। অনিয়মিত কৃষি ফার্ম শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি এবং নিয়মিত কৃষি ফার্ম শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি বৃদ্ধি করা হয়েছে। অনিয়মিত কৃষি ফার্ম শ্রমিকদের বছরে একটি উৎসব ভাতা এবং নিয়মিত কৃষি ফার্ম শ্রমিকদের দুটি উৎসব ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচি অর্থাৎ কাজের বিনিময়ে খাদ্য (কাবিখা) ও কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা)-তেও খাদ্যশস্য ও নগদ টাকার পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
সার্বিকভাবে বাংলাদেশের শ্রমজীবী মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী ১৯৯১-৯২ সালে শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত মজুরি চালের মানদ-ে ছিল ৩.২৫ কেজি, যা ২০১০ অর্থবছরে ৮ কেজিতে উন্নীত হয়। আর বর্তমানে শ্রমজীবী মানুষের ক্রয়ক্ষমতা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
বর্তমান সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে ৫ কোটি মানুষ আজ নি¤œবিত্ত থেকে মধ্যবিত্তে উঠে এসেছে। যে দারিদ্র্যসীমা বিএনপির আমলে প্রায় ৪৭ ভাগের মতো ছিল, আজ তা ২২ ভাগে নেমে এসেছে। আর এই দারিদ্র্যসীমা থেকে মধ্যবিত্তের স্তরে উঠে আসা জনগোষ্ঠীর বিরাট একটি অংশ হলো এ দেশের শ্রমজীবী মানুষ।

Category:

Leave a Reply