ষড়যন্ত্র তত্ত্ব (Conspiracy Theory)

‘ষড়যন্ত্র’ শব্দটি আমাদের দেশে বহুল প্রচারিত ও উচ্চারিত। বিশ্ব রাজনীতিতেও এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত। সূত্রাবদ্ধভাবে এই প্রপঞ্চটির প্রচলন খুব বেশি দিনের না। বিশ শতকের ষাটের দশকে ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্বটি’ সূত্রাকারে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানে লিপিবদ্ধ করা হয়। অক্সফোর্ড অভিধানে ষড়যন্ত্র তত্ত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে, “কোনো গ্রুপ বা মহল বিশেষের বে-আইনি ও ক্ষতিকর গোপন পরিকল্পনা যা অসৎ উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়। তা-ই ষড়যন্ত্র। যেমন গোপনে চক্রান্তের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল, সরকার উৎখাত, একাধিক গ্রুপ বা মহলের অপ্রকাশ্য আঁতাত; যার লক্ষ্য অবৈধ কোনো উদ্দেশ্য সাধন, হত্যা, বিশৃঙ্খলা বা অরাজকতা সৃষ্টি ইত্যাদিও ষড়যন্ত্রের অংশ।”
অক্সফোর্ড অভিধানে প্রথম এই শব্দটির ব্যবহারকারী হিসেবে দি আমেরিকান হিস্ট্রিক্যাল রিভিয়্যু-এর ১৯০৯ সালের একটি নিবন্ধের কথা উদ্ধৃত করা হয়।
সূত্রাকারে ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কথা চালু হওয়ার অনেক আগে থেকেই ষড়যন্ত্র ধারণাটি বিশ্বের দেশে দেশে প্রচলিত ছিল। বলা হয়ে থাকে, ১৮৭০ সাল পর্যন্ত এই শব্দটিকে একটি নেতিবাচক ধারণা হিসেবে গণ্য করা হতো। শুরুতে ‘ষড়যন্ত্র’ কথাটি নিরপেক্ষ অর্থে ব্যবহৃত হলেও এটি একটি নিন্দাসূচক ধারণা বা প্রত্যয় হিসেবে সংজ্ঞায়িত শুরু হয় ১৯৬০ সালের দিকে। কনস্পেরেসি থিওরি ষাটের দশকে প্রথম প্রচলন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির হত্যাকা-কে ঘিরে অন্যান্য তত্ত্বকে বরবাদ করে এই কনস্পেরেসি তত্ত্ব চালু করে সিআইএ। পরবর্তীকালে দেশে দেশে এই তত্ত্বের প্রয়োগ করেছে সিআইএ। হত্যা, অবৈধ পন্থায় রাষ্ট্রক্ষমতা দখল, হস্তক্ষেপ এবং এমনকি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পেছনেও ষড়যন্ত্র ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব কার্যকর ছিল।
ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে খুব সহজভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। বৈধ-অবৈধ, নৈতিক বা অনৈতিক যে কোনো পন্থায় এক বা একাধিক ব্যক্তিগোষ্ঠী গোপনে সংঘবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল অথবা রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে প্রতিপক্ষকে নির্মূল করে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করা এবং অসাংবিধানিক ও আইনবহির্ভূত উপায়ে সকলের অজ্ঞাতে নিজেদের গোপন রাজনৈতিক অভিলাষ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত কর্মকা-কেই আমরা ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করতে পারি। যেমন সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখল। ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি বা কৃত্রিম রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাম্প্রদায়িক বা ধর্মীয় সংকট সৃষ্টি করা প্রভৃতিকে ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতা বলে চিহ্নিত করা যেতে পারে। রাজনৈতিক হত্যাকা-Ñ প্রকাশ্য যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, গোপন চক্রান্তের ফল স্বরূপ ক্ষমতাশীল বা ক্ষমতাবহির্ভূত প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিকে হত্যা করার পরিকল্পিত কর্মকা-Ñ ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রায়োগিক প্রমাণ। সিরাজ-উদ-দৌলাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য মীরজাফর ও রবার্ট ক্লাইভের গোপন আঁতাত এবং তদুনাসারে সিরাজকে পরাজিত ও হত্যা করা যেমন ষড়যন্ত্রের অংশ, তেমনি বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যা করার পেছনে কতিপয় ব্যক্তি গোষ্ঠীর তৎপরতা ষড়যন্ত্রেরই বহিঃপ্রকাশ। জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের বৈধ শান্তি সমাবেশে গ্রেনেড হামলা এবং ২২ জন নেতাকর্মীকে হত্যার পেছনেও ছিল গভীর ষড়যন্ত্র। মধ্যযুগে রাজাকে বিষ প্রয়োগে হত্যার ঘটনা ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকায় প্রচুর ঘটেছে। সাধারণভাবে এসব কারণে ষড়যন্ত্রকে একটি নেতিবাচক বা অপরাধমূলক তৎপরতা হিসেবে দেখা হয়।
কিন্তু ইতিবাচক লক্ষ্য অর্জনের জন্যও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের প্রয়োগ ইতিহাসে কম নয়। দাসপ্রথার কঠোর নিগড় ভাঙার জন্য স্পার্তাকাশ যখন গোপনে কৃতদাসদের বিদ্রোহের জন্য সংগঠিত করেন, তাকে কী বলব? ইতিহাসের বিচারে এটি ছিল ইতিবাচক ঘটনা। ঔপনিবেশিক যুগে স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে বহু দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামী বিপ্লবীরা গোপনে সংগঠিত হয়েছে,  প্রতিরোধ বাহিনী গড়ে তুলেছে, যুদ্ধ করেছে এবং রাষ্ট্রের প্রচলিত আইন এবং ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে, ঔপনিবেশিক শাসকদের ভাষায় এসবগুলোই হলো তথাকথিত ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতা। স্বাধীনতা প্রত্যাশী মানুষের কাছে যা ছিল বিপ্লবী, দেশপ্রেমিক কর্মকা-, শাসকগোষ্ঠীর ভাষায় তা-ই ছিল রাষ্ট্রবিরোধী, সংবিধান বা আইনবিরোধী ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকা-।
রুশ বিপ্লবের নেতা ভøাদিমির ইলিচ লেনিন রুশ বিপ্লবের জন্য ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে ইতিবাচক এবং ন্যায্য উপায় হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা অর্জনের লক্ষ্যে ‘অনুশীলন’, ‘যুগান্তর’ ও ‘গদর’ পার্টির গোপন সশস্ত্র তৎপরতা এবং ব্যক্তি-হত্যাকে ‘ভুল’ পথ হিসেবে দেখা হলেও সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীদের কিন্তু পরম দেশপ্রেমিক হিসেবে জনচিত্তে ঠাঁই দেওয়া হয়েছে।
ষড়যন্ত্র কেবল রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ নয়। ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও এটি প্রসারিত। পারিবারিক জীবনে, যে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কর্মকা-ে স্বার্থের দ্বন্দ্বের কারণে প্রতিপক্ষকে জব্দ করার জন্য ‘ষড়যন্ত্র’ অনুঘটক বা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানেও অংশীদার অথবা প্রতিপক্ষ কোম্পানির প্রতিযোগিতা অবস্থানের কারণে ষড়যন্ত্র হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। পরিবারের মধ্যেও স্বামী বা স্ত্রী পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষপ্রসূত হয়ে একে অপরকে কোনো অপরাধমূলক ভিত্তিহীন অভিযোগে ফাঁসানোর জন্য চক্রান্তের আশ্রয় নেয়। এমনকি গোপন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য যে হত্যা পরিকল্পনা করে থাকে, তা-ও ষড়যন্ত্রমূলক।
তবে শেষ কথা হচ্ছে, ষড়যন্ত্র শব্দটি আখেরে কোনো মহৎ কাজ হিসেবে গণ্য হয় না। ষড়যন্ত্র শব্দটি কার্যত একটি অগ্রহণযোগ্য, অবৈধ, নিন্দনীয়, অনৈতিক বা নেতিবাচক কাজেরই সমার্থক হয়ে উঠেছে। রাজনীতিতেই এই শব্দটির বা এই প্রত্যয়টির সর্বাধিক ব্যবহার হয়ে থাকে।

নূহ-উল-আলম লেনিন

Category:

Leave a Reply