সপরিবারে কেন হত্যা করা হলো বঙ্গবন্ধুকে

Posted on by 0 comment

PMমুনতাসীর মামুন: ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পেছনে রহস্য নেই’Ñ লিখেছিলেন শ্রদ্ধেয় আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী; কিন্তু ‘চক্রান্ত ছিল’। এই মন্তব্যের সত্যতা নিয়ে আজ আর দ্বিমত নেই। পরবর্তীকালের ঘটনাসমূহ এর উদাহরণ। বিশেষ করে লে. জেনারেল জিয়াউর রহমান ও বিএনপির উত্থান তা প্রমাণ করে। বঙ্গবন্ধু হত্যায় ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে লাভবান হয়েছেন কে? জেনারেল জিয়া। প্রতিষ্ঠানিকভাবে, বেসামরিক-সামরিক আমলাতন্ত্র, পাকিস্তানপন্থি দলসমূহ। আন্তর্জাতিকভাবে সৌদি-পাকিস্তানি চক্র, আমেরিকা-চীন চক্র। জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট হয়েছেন, যা তিনি স্বপ্নেও ভাবেন নি। পাকিস্তানের নির্দেশে ১৯৭১ সালে খুনিদের দলগুলোকে নিয়ে বিএনপির ভিত্তি তৈরি করেছিলেন যাতে আরও যোগ দেন দেশবিরোধী রেনিগেড কিছু রাজনীতিবিদ। জাসদের হঠাৎ উত্থান বিশেষ করে কর্নেল তাহের ও মেজর জলিলের পার্টির তাত্ত্বিক ও প্রধান হওয়াকে অনেকে মনে করেন এসব ষড়যন্ত্রের দ্বিতীয় ফ্রন্ট। আরেকটু পেছনের ইতিহাস দেখলে দেখব, ১৯৭১ সালেই মুক্তিযুদ্ধের সময় তরুণ নেতাদের অনেকের প্রকাশ্যে তাজউদ্দীন আহমদের বিরোধিতা, খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একাংশ ও আমলাতন্ত্রের ষড়যন্ত্র। অথচ, বঙ্গবন্ধু তো ২৫ মার্চের আগে চার ছাত্রনেতা ও অন্য নেতাদের সব জানিয়ে গিয়েছিলেন। প্রয়াত নেতা কাজী আরেফ শাহরিয়ার কবিরকে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেনÑ
“১৮ জানুয়ারি শেখ মুজিব সিরাজুল আলম খান এবং আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। এক পর্যায়ে শেখ মনি ও তোফায়েলকে ডেকে নেন। আন্দোলন পূর্বাপর পর্যালোচনা করে সম্ভাব্য পাকিস্তানি সামরিক শক্তির মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত হতে বলেন। জঙ্গি কর্মীবাহিনী তৈরি করে লড়াইয়ের উপযুক্ত ছাত্র-যুব শক্তি গড়ার কথা বলেন। এভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয় বিএলএফ বা বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সেস কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বা চার যুবনেতা বা মুজিব বাহিনীর চার প্রধান।”
এরপর ২১ তারিখেও একটি বৈঠক করেন এবং সেখানে তাজউদ্দীন আহমদকে উপস্থিত থাকতে বলেন। শেখ মুজিব যুবনেতাদের বলেন, “আমি না থাকলেও তাজউদ্দীনকে নিয়ে তোমরা সব ব্যবস্থা করো। তোমাদের জন্য অস্ত্র ও ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে।”
কাজী আরেফ আরও লিখেছেন, বঙ্গবন্ধু কলকাতার একটি ঠিকানা দিয়ে তাদের বললেন, “এই ঠিকানায় গেলেই তোমরা প্রবাসী সরকার, সশস্ত্র বাহিনী গঠন, ট্রেনিং ও অস্ত্রশস্ত্রে সহযোগিতা পাবে। নেতাকে বলেন, তোমরা চারজন সশস্ত্র যুবশক্তিকে পরিচালনা করবে। আর তাজউদ্দীন প্রবাসী সরকারের দায়িত্ব নেবে। তিনি বিপ্লবী কাউন্সিল গঠনের কথা বারবার করে বলেন, বিপ্লবী কাউন্সিল প্রয়োজনে স্বাধীনতার পরও পাঁচ বছর থাকবে। তিনি কামারুজ্জামান ও সৈয়দ নজরুল ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকেও এই কথাগুলো জানিয়ে রাখেন।”
২২ মার্চ তিনি আবারও চার নেতাকে ডেকে পাঠিয়ে বলেছিলেন, “কোন দুর্ঘটনা ঘটলে তোমরা ঐ হায়েনাদের সাত দিন ঠেকিয়ে রাখতে পারবে তো? চার নেতা তাঁকে কথা দিয়েছিল?”
সুতরাং, অপরিণামদর্শী তিনি ছিলেন না। সবকিছুই ছকে নিয়েছিলেন এবং বিভিন্ন জনকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। পারতপক্ষে একজনকে আরেকজনের কথা জানান নাই। বিপ্লবী দলের পরিকল্পনা যেভাবে ছকা হয় সেভাবেই সব ছকে ছিলেন। কাজী আরেফের সঙ্গে চিত্তরঞ্জন সূতারের বক্তব্যের মিল আছে।
চিত্তরঞ্জন সুতারের সাক্ষাৎকারও নিয়েছিলেন শাহরিয়ার। সূতার তাকে জানিয়েছেন, ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ইন্দিরা গান্ধীর “সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ভারতের সাহায্যের বিষয়টি চূড়ান্ত করার জন্য যে আলোচনা করেছিলেন সেখানে বিএলএফ নেতাদের সম্ভাব্য গেরিলা প্রশিক্ষণের বিষয়টি বিশেষভাবে স্থান পেয়েছিল।”
১৯৭১ সালের ১৮ জানুয়ারি বিষয়টি জানানো হয়েছিল তাজউদ্দীন আহমদকে। ২৫ মার্চের আগে বঙ্গবন্ধু সূতারকে পাঠিয়েছিলেন কলকাতায় দুটি বাড়ি ভাড়া করার জন্য, যাতে সময় এলে আওয়ামী নেতৃবৃন্দ সেখানে জড়ো হয়ে সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। যাক সে প্রসঙ্গ। জিয়া ও বিএনপি প্রসঙ্গে আসি।
১৫ আগস্ট হত্যাকা-ের পর ঘাতকদের বিচার বন্ধ করতে ইনডেমনিটি জারি করেছিলেন খন্দকার মোশতাক। আর জিয়াউর রহমান সেই অধ্যাদেশটিকে পঞ্চম সংশোধনীর অন্তর্ভুক্ত করেন। ঘাতকদের বিদেশি দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেন। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের শেষ দিন পর্যন্ত সেই পুরস্কার ও এনাম দানের পালা অব্যাহত ছিল। আরও কৌতূহলের বিষয় যে, খন্দকার মোশতাক ৫ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে এক গেজেট নোটিফিকেশনে জেলহত্যা তদন্তের জন্য তিনজন বিচারকের সমন্বয়ে যে তদন্ত কমিটি গঠন করেন, জিয়াউর রহমান সেই তদন্ত কমিটি বাতিল করে দিয়েছিলেন। বিএনপি ও তার সহযোগীরা বরাবর ১৫ আগস্টকে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ ঘটনা বলেও চালিয়ে দিতে চেয়েছে। কিন্তু এটি যে সর্বৈব মিথ্যা, পরবর্তী ঘটনাবলিই তার সাক্ষী। সোহরাব হাসান যথার্থই লিখেছেন, বিরুদ্ধবাদীরা বলেন, আওয়ামী লীগই না-কি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান করেছিল। যদি সেটাই সত্য হয়ে থাকে জিয়াউর রহমানের দল কেন মুজিব হত্যার দায় কাঁধে নিচ্ছে? আওয়ামী লীগের যে অংশ ১৫ আগস্ট চক্রান্তে জড়িত ছিল তারা এখন কোথায়? খন্দকার মোশতাক মারা গেলেও তার সব সহযোগী মারা যান নি। তারা কি আওয়ামী লীগ করছেন না অন্য পার্টি করছেন? ১৫ আগস্টকে যারা ‘নাজাত দিবস’ হিসেবে পালন করত, তারাই বা কোন দলের? বিদেশে মুজিব হত্যাকারীদের পাসপোর্ট করে দিয়েছে কোন সরকার? (যুগান্তর, ১৫.০৮.২০০৫)।
১৫ আগস্ট সম্পর্কে মার্কিন সাংবাদিক লরেঞ্জ লিফসুলজ বলেছেন, কিসিঞ্জার ও সিআইএ এই হত্যাকা-ের উদ্যোক্তা। কিছুদিন আগে ব্রিটিশ সাংবাদিক ক্রিস্টোফার হিচিন্স একটি বই লিখেছেন, নাম ‘ট্রায়াল অন হেনরি কিসিঞ্জার’। হিচিন্স নথিপত্র দিয়ে প্রমাণ করেছেন, কিসিঞ্জার বাংলাদেশ সফরের সময় মার্কিন দূতাবাসে বসেই ১৫ আগস্টের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ‘গো এহেড’ সিগনাল দেন।
ভারতের প্রয়াত প্রখ্যাত সাংবাদিক নিখিল চক্রবর্তী বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার দু-মাস পরই লিখেছিলেন, বিশ্বের রাজনৈতিক চালচিত্র বদলে যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশে মার্কিন ক্লায়েন্ট সরকার স্থাপন করতে হবে। মাধ্যম হবে ঘুষ, ব্ল্যাকমেইল ও হত্যা।
কিসিঞ্জার যে বেইজিংয়ে মাওয়ের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন বা ঢাকাতে যে জঘন্য কা- ঘটেছে এটি সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরই হত্যাকারীরা যেভাবে সহজে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানে আশ্রয় পেল, তা প্রমাণ করে যুক্তরাষ্ট্র ছিল এই হত্যাকা-ের পেছনে।
ইন্দিরা গান্ধী তখন ক্ষমতায়। তার বিরুদ্ধে জয়প্রকাশ নারায়ণ, জর্জ ফার্নান্দেজ প্রমুখ আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। তারা একে আখ্যায়িত করেছেন ‘সম্পূর্ণ বিপ্লব’ বলে। ইন্দিরা গান্ধী সিপিআই নেতা ভুপেশ গুপ্তকে তখন বলেছিলেন, বিরোধীরা শুধু তার মৃত্যু নয়, তার সরকার অর্জিত সব সুফলকেও ধ্বংস করতে চায় এবং এর পেছনে অভ্যন্তরীণ প্ররোচনা ছাড়া বহিঃশক্তির ইন্ধনও আছে।
ইন্দিরা গান্ধীর সেই অনুমান ভুল বলি কীভাবে, যখন দেখি ‘বিপ্লবী’ ফার্নান্দেজ মহানন্দে চরম গণবিরোধী বিজেপি সরকারের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেন।
মোহিত সেন লিখেছেন, সে-সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দের একটি চিঠি নিয়ে কুৎসোবিন এলেন দিল্লি। কুৎসোবিন সোভিয়েত পার্টি হয়ে ভারতীয় ডেস্ক দেখতেন। তিনি সিপিআই নেতৃবৃন্দের কাছে সেই চিঠি ও কিছু দলিলপত্র হস্তান্তর করেন। চিঠির একটি কপিও করা হয়েছিল এবং বলা হয়েছিল পড়ার পর তা ধ্বংস করে ফেলতে। চিঠির মূল বক্তব্য ছিল, বাংলাদেশ স্থাপনে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা পালন করেছেন, তাদের হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। উপমহাদেশের তৎকালীন সেই তিনি নেতা হলেনÑ ইন্দিরা গান্ধী, শেখ মুজিবুর রহমান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো। মস্কো থেকে প্রেরিত সেই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছিল, প্রথম দুজন নেতাকে ইতোমধ্যে এ ষড়যন্ত্রের কথা জানানো হয়েছে। সিপিআই নেতৃবৃন্দকে অনুরোধ জানানো হয়েছিল, তারা যেন প্রভাব খাটিয়ে ইন্দিরা গান্ধীকে বোঝান ষড়যন্ত্রের বিষয়টি হালকাভাবে না নিতে। কুৎসোবিন আরও জানিয়েছিলেন, ভুট্টোকে বিষয়টি সরাসরি জানানো হয়নি। কারণ ভুট্টো কমিউনিস্টদের বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নকে মোটেই বিশ্বাস করতেন না। বলে রাখা ভালো, ভুট্টো বিশ্বাস করতেন মার্কিনীদের। কিছুদিন পর জানিয়েছেন, মোহিত সেন, কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষে ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সই করা একটি চিঠি এলো ভারতীয় কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দের কাছে। ক্যাস্ট্রো জানিয়েছিলেন, ভারতীয় উপমহাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করার এই আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র বা মার্কিন ষড়যন্ত্র চলছে। কেউই গুরুত্বসহকারে তা নেননি। মোহিত সেন অবশ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন নি যুক্তরাষ্ট্রই ছিল এর হোতা। তবে ইঙ্গিতটি স্পষ্ট সোভিয়েত এই ষড়যন্ত্র করেনি, করলে কুৎসোবিনকে দিল্লি পাঠানো হতো না। তাহলে বাকি থাকে আমেরিকা ও তার ক্লায়েন্ট স্টেট পাকিস্তান।
উপমহাদেশে সপরিবারে প্রথম নিহত হন বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা। এতে ভুট্টো সহায়তা করেছিলেন বলে অনুমান করা হয়। স্ট্যানলি ওলপোর্ট ভুট্টোর যে জীবনী লিখেছেন তাতে এর ইঙ্গিতও স্পষ্ট [প্রমাণসহ]। যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক বিশ্ব পরিকল্পনা নস্যাৎ করে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হলোÑ এটি নিক্সন-কিসিঞ্জার মানতে পারেন নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিল পাকিস্তানের জন্য চপেটাঘাত। এটি ভুট্টো ও পাকিস্তানের সামরিক এস্টাবলিশমেন্ট মেনে নিতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর পর ভুট্টোকেও যেতে হয়। মার্কিন তত্ত্ব অনুযায়ী বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সামরিক কর্তারা [দুই জিয়া] ক্ষমতায় আসে এবং মার্কিনী সাহায্যে এক দশক ক্ষমতা থাকে। এর আগে একই ঘটনা ঘটানো হয়েছিল চিলিতে। আলেন্দেকে হত্যা করে পিনোচেটকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু কী তাকে হত্যা ষড়যন্ত্র জানতেন না? জানতেন। ভারত ও সোভিয়েত সূত্র থেকে তাকে তা জানানো হয়েছিল। সেই আমলে বাংলাদেশে যারা গুরুত্বপূর্ণ আমলা ছিলেন (গোয়েন্দা বিভাগেও) তাদের কাছ থেকেও জেনেছি, তাকে হত্যার ষড়যন্ত্রের কথা জানানো হয়েছিল। তিনি বিশ্বাস করেন নি। তারা তখন তাকে ৩২ নম্বরের বাসভবন ছেড়ে গণভবনে এসে থাকার অনুরোধ করেছিলেন। তাতে তিনি খানিকটা সম্মতও হয়েছিলেন। কিন্তু বেগম মুজিব ৩২ নম্বর ছেড়ে যেতে না চাওয়ায় তিনি আর গণভবনে যেতে চাননি। তাছাড়া বিষয়টিকে তিনি হালকাভাবে নিয়েছিলেন। মুহূর্তের জন্যও তার মনে হয়নি কোনো বাঙালি তাকে খুন করতে পারে। কারণ তার ভাষায়, “আমি আমার দেশকে, দেশের মানুষকে ভালোবাসি, তারা আমায় ভালোবাসে।” রবীন্দ্রনাথের ভক্ত শেখ মুজিব রবীন্দ্রনাথের সেই কবিতাও বিশ্বাস করেন নিÑ “৭ কোটি মানুষকে বাঙালি করেছ… মানুষ করনি।”
বিএনপি আমলে এমন কী শেখ হাসিনার আমলেও সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিষয়ে বলা হতো এবং অনেক বিএনপি-জামাত অ্যাপলজিস্ট ও ‘নিরপেক্ষ’রা বলতেন এবং বলেন, একদল বিপথগামী সেনাসদস্য শেখ মুজিবকে হত্যা করেছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রায় দু-ডজন সেনা কর্মকর্তার আত্মস্মৃতি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছি সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ অনেক কর্মকর্তাই ফারুক-রশীদদের ষড়যন্ত্রের কথা জানতেন। এমন কী জিয়াউর রহমানও কিন্তু কেউ বঙ্গবন্ধুকে জানান নি। [বিস্তারিত আমার লেখা ‘বাংলাদেশি জেনারেলদের মন]।
৩৪ বছর পর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকাজ সম্পন্ন হয়ে রায় হয়েছে। এ বিচারের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার। গত ৩৪ বছর বিএনপি ও পাকিস্তানপন্থিরা যে প্রচারণা চালিয়েছিল, তার মূল কথা ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যা একটি তাৎক্ষণিক ও স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনা। তাদের এ প্রচারণার লক্ষ্য ছিল ঘাতকদের রক্ষা এবং সমাজের সর্বস্তরে পাকিস্তানি ধ্যান-ধারণা পুনঃপ্রতিষ্ঠা। ইতিহাসের একজন ছাত্র হিসেবে মামলায় যেসব নথিপত্র উত্থাপন করা হয়েছে তার আলোকে বলতে পারি, বঙ্গবন্ধু হত্যা, জাতীয় চার নেতা হত্যা ও সংবিধান পরিবর্তন এবং সিভিল সমাজের কর্তৃত্ব অপনোদনÑ সব এক সূত্রে গাঁথা। এসব ঘটনার পেছনে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ছিল, তা বলাই বাহুল্য। বঙ্গবন্ধু যে শুধু একজন ব্যক্তি ছিলেন তা তো নয়। তিনি ছিলেন একটি নতুন আদর্শেরও প্রতীক। ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছিলেন। স্বাধীনতাবিরোধী, তাদের পৃষ্ঠপোষক পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্য এটি পছন্দ করেনি। মার্কিন ডিকটেক্ট ও চীনাদের মার্কিন ও পাকিস্তান প্রীতিকে নস্যাৎ করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি দেশ স্বাধীন করেছিল এটি তাদের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব হয়নি। যে কারণে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালে সবচেয়ে বড় গণহত্যার বিষয়টি মার্কিন ও ইউরোপীয় বইপত্রে উপেক্ষা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর প্রধান কৃতিত্ব ছিল সশস্ত্রদের ওপর নিরস্ত্র বা সিভিল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা, যা সেই আমলের সেনা সদস্যদের পছন্দ হয়নি। তাদের ধারণা ছিল, বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্রে তাদের কর্তৃত্ব থাকবে। বেসামরিক আমলাতন্ত্রও বাকশাল হলে কর্তৃত্ব হারাত। এমনিতেও তাদের কর্তৃত্ব হ্রাস পাচ্ছিল। অতি বামরাও বঙ্গবন্ধুকে সরানোর জন্য ভুট্টোর সাহায্য চেয়েছিল এবং দেশেও ‘বিপ্লব’-এর নামে অরাজকতার সৃষ্টি করেছিল। এ সমস্ত মিলে তৈরি হয়েছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার পটভূমি। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার কারণ ছিল দুটিÑ এক. যেন তার পরিবারের কাউকে কেন্দ্র করে আবার সেই আদর্শ উজ্জীবিত না হয়, দুই. এমন আতঙ্ক সৃষ্টি যাতে কেউ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে দাঁড়াতে সাহস না পায়।
এ উদ্দেশ্য দুটির কোনোটিই সফল হয়নি। বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে, বঙ্গবন্ধু ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার হয়েছে, তাদের পৃষ্ঠপোষক বা দল বিএনপি-জামাত হীনবল হয়েছে। কিন্তু, তাতে কি সেই ষড়যন্ত্রের শেকড় উৎপাটিত হয়েছে? হয়নি। এবং সে কারণেই শেখ হাসিনাকে ২২ বার খুনের চেষ্টা করা হয়েছে। ভেবে দেখুন, পরাজিত পাকিস্তানপন্থিদের কাউকে একবারও হত্যার চেষ্টা হয়নি [এবং আমরা সমর্থনও করি না]। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু বা তার আদর্শের শত্রুদের ষড়যন্ত্র এখনও থেমে নেই।
বঙ্গবন্ধুর বিচার সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু কেন, কারা এবং কী কারণে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা হত্যা করল সে-সম্পর্কে এখনও আমাদের জ্ঞান সীমিত। এ কারণে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের ষড়যন্ত্র উদঘাটনে একটি কমিশন হওয়া উচিত, যাতে ষড়যন্ত্রকারীদের শেকড়ের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। কেনেডি হত্যার পর যুক্তরাষ্ট্রে ওয়ারেন কমিশন গঠিত হয়েছিল। সময় এখনও ফুরিয়ে যায়নি। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সম্পন্ন হয়েছে দেখেও আত্মতৃপ্তির কিছু নেই। ঐ রায়ের পরও দেশে-বিদেশে বাংলাদেশ-বিরোধী প্রচারণা ও ষড়যন্ত্র বিনাশ হবে বলে মনে করি না। এর সর্বশেষ উদাহরণ প্রিয়া সাহা। ষড়যন্ত্রকারীদের শেকড় অনেক গভীরে।

Category:

Leave a Reply