সবুজেই থাকুন

দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর,
লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর
হে নবসভ্যতা! হে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী,
দাও সেই তপোবন পুণ্যচ্ছায়ারাশি…

59রাজিয়া সুলতানা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ১৩০২ সালের ১৯ চৈত্র লিখেছিলেন বিখ্যাত কবিতাটি। নগরায়ণ দেখে কবিপ্রাণ হাহাকার করে উঠেছিল। কবি হৃদয়ের আকুতি থেকে প্রকাশ পেয়েছিল ইট-পাথরের নগর ফিরিয়ে নিয়ে শান্ত সুনির্মল, সুশীতল, নিরিবিলি, পাখির কুজনে ভরা অরণ্য ফিরিয়ে দেওয়ার। কবি বুঝতে পেরেছিলেন, যে প্রাকৃতিক পরিবেশে মানুষ জন্ম নিয়েছে, স¯েœহে লালন-পালন হচ্ছে, সেই প্রকৃতিকে ধ্বংস করে মানুষ কখনই স্বপ্নের রাজপ্রাসাদে শান্তিতে বসবাস করতে পারে না, পারবেও না। কিন্তু রবিঠাকুরের এই মর্মআর্তির পরও থেমে থাকেনি বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা। প্রয়োজনে তা ক্রইে মহিরূহে পরিণত হয়েছে, হচ্ছেও। তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ভাস্বর ইট-পাথরের এই শহরের সবুজের সমারোহ নিয়েও চলছে ব্যাপক গবেষণা আয়োজন। চার দেয়ালের মধ্যে বসবাস করেও আমরা সবুজের সান্নিধ্য পেতে পারিÑ স্পর্শ পেতে পারি সবুজের। ক্রমেই তা প্রতিভাত হচ্ছে। ফলে কিছুটা হলেও অবসান হয়েছে কবির উৎকণ্ঠার। রাস্তা-পরিকল্পিত প্রকল্প ও বাড়িতে দেখা যায় এখন সবুজের উপস্থিতি। সেখানে বাড়ির আঙিনায়, বাগান, ছাদ-ব্যালকনিতে সবজির চাষাবাদ নতুন ধারণার সৃষ্টি করেছে। শীত মৌসুমে এই সবজি যেন অট্টালিকার শহরের এক নৈসর্গিক উপভোগ্য ঘটনা।
শহরের যাপিত জীবনে অনেকের পক্ষে আবাদ করা সম্ভব হয় না। তবে যারা সৌখিন এবং সবুজপ্রেমী তারা অল্প বিস্তর জায়গায়ই অনায়াসে আবাদ করতে পারেন। বিশেষ করে টব বা অন্য কোনো পাত্র ব্যবহার করে সেই জায়গায় আবাদ করতে পারেন টমেটো, বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাল বাঁধাকপি, দেশি শিম, ওলকপি, ব্রোকলি, লেটুস, শালগম, গাজর, লাউ, মরিচ, বাংলা ধনিয়া, বিলাতি ধনিয়া, স্কোয়াশ, লালশাক, পালংশাক, মুলাশাক, পুদিনাসহ নানা জাতের শীতকালীন সবজি।
কোথায় চাষ করবেনÑ ছাদ না বারান্দায়, তা ফ্রেম না-কি টবেÑ তার ওপর নির্ভর করে সবজির বাগানের প্রকারভেদ। এ ধরনের বাগান প্রধানত দুই প্রকার হয়ে থাকে। প্রথমটি হলোÑ কাঠ বা লোহার ফ্রেমে এঁটে বেড তৈরি করে আবাদ। অন্যটি হলোÑ টব, ড্রাম, পট, কনটেইনার এসব ব্যবহার করে আবাদ। প্রথম ক্ষেত্রে পুরো ছাদ বা ছাদের অংশবিশেষ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কার্নিশের পাশে বা আলাদা ফ্রেম করে সুন্দরভাবে ডিজাইন করে সেটিং করা সম্ভব। এক্ষেত্রে জল ছাদের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। জল ছাদ না থাকলে আলকাতরার প্রলেপ দিয়ে তার ওপর মোটা পলিথিন বিছিয়ে তার ওপর মাটি দিতে হবে। মনে রাখতে হবে মাটির পুরুত্ব যত বেশি হবে তত ভালো। অন্তত ২ ফুট পুরু মাটির স্তর থাকতে হবে। অতিরিক্ত পানি, সার পাবার সুষ্ঠু পথ রাখতে হবে। পরবর্তীতে প্রয়োজনীয় পরিমাণ রাসায়নিক সার ব্যবহার করতে হবে। ফ্রেম তৈরির ক্ষেত্রে কাঠ, লোহা, স্টিল, মোটা রাবার ইত্যাদি ব্যবহার করা যায়। তবে যা কিছু দিয়ে বা যেভাবেই বেড তৈরি হোক না কেন ৩-৪ বছর পর পুরো বেড ভেঙে নতুন করে তৈরি করতে হবে। এতে রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। ছাদে বাগানের জন্য শুরুতেই মাটিকে ফরমালডিহাইড দিয়ে প্রতিলিটার পানির সাথে (১০০ মিলিলিটার ফরমালডিহাইড) শোধন করে নিতে হবে। পরিশোধনের কৌশলটি হলো পরিমাণমতো মাটিতে বর্ণিত মাত্রার ফরমালডিহাইড মিশ্রিত পানি মাটিতে ছিটিয়ে দিয়ে পুরো মাটিকে মোটা পলিথিন দিয়ে ৩-৪ দিন ঢেকে রাখতে হবে। পরে পলিথিন উঠিয়ে সূর্যের আলোর তাপে খুলে রাখতে হবে পরবর্তী ৩-৪ দিন পর্যন্ত। ফরমালিনের গন্ধ শেষ হয়ে গেলেই মাটি ব্যবহারের উপযোগী হবে।
দ্বিতীয় পদ্ধতির মধ্যে রয়েছে ড্রাম, বালতি, টব, কনটেইনার ইত্যাদি। এসবের যে কোনো একটি বা দুটি নির্বাচন করার পর পাত্রের তলায় কিছু পরিমাণ খোয়া (ইট পাথরের কণা) দিতে হবে। ইটের খোয়া পানি নিষ্কাশন এবং অতিরিক্ত পানি বের করে দেওয়া এবং পাত্রের ভেতরে বাতাস চলাচলের সহায়তা করে। এক্ষেত্রেও অর্ধেক মাটি এবং অর্ধেক পচা জৈব সারের মিশ্রণ হতে হবে। মনে রাখতে হবে, শাক-সবজি, ফুলের জন্য ছোটখাটো টব বা পাত্র হলেও চলে।
উপরিউক্ত পদ্ধতি দুটি ছাড়াও আজকাল অনেকেই তৃতীয় আরেকটি পদ্ধতি অনুসরণ করে সুন্দরভাবে বাঁশ-পিলার, রড দিয়ে জাংলো বা মাচা বানিয়ে টব-প্লাস্টিকের পাত্রে ফুল, বাহারি গাছ-গাছালি, অর্কিডের আবাদ করে। এক্ষেত্রে ঝুলন্ত টব-পাত্র মাঝখানে না ঝুলিয়ে পাশে ডিজাইন করে সেটিং করলে জায়গার যেমন সদ্ব্যবহার হয় তেমনি দেখতেও সুন্দর লাগে।
টব বা ছাদে সবজি চাষ সীমিত আকারে এবং সীমিত জায়গা ব্যবহার করা হয়, তাই স্বার্থকভাবে চাষের জন্য অতিরিক্ত যতœ ও সেবা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন পরিচর্যায় সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বিশেষ করে সার প্রয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি। কেননা সার কম-বেশি হলে, গাছের সাথে লেগে গেলে গাছ মরে যাবে। তাছাড়া পরিমাণমতো না হলে অপুষ্টিতে ভুগবে।
টবের ক্ষেত্রে ছোট গাছ বড় হলে পট-টব বদল, ডিপটিং (পুরনো টবকে আলতো করে মাটিতে শুইয়ে গড়াগড়ি দিলে গাছটি টব থেকে বেরিয়ে আসবে। পরে অতিরিক্ত মূল কেটে মাটি বদলিয়ে সার প্রয়োগসহ নতুনভাবে গাছ বসানো) করতে হবে সময়মতো। বছরে অন্তত একবার পুরাতন মাটি বদলিয়ে নতুন মাটি জৈব সারসহ দিতে হবে। ইদানীং বাজারে টবের মাটি কিনতে পাওয়া যায়। মানসম্মত মাটি কিনে টবে-পটে-ড্রামে ভরতে হবে। খুব সাবধানতার সাথে সেখানে বীজ লাগাতে হবে। ঠিক মাঝখানে পরিমাণমতো মাটির নিচে রোপণ করতে হবে। চারা বা কলমের সাথে লাগানো মাটির বল যেন না ভাঙে সেদিকে নজর রাখতে হবে। চারা বা কলমের ক্ষেত্রে বীজতলা/নার্সারিতে যতটুকু নিচে বা মাটির সমানে ছিল ততটুকু সমানে ছাদে লাগাতে হবে। বীজতলার থেকে বেশি বা কম গভীরে লাগালে গাছের নানা সমস্যা হতে পারে। মাঠে ফলমূল সবজি চাষের চেয়ে ছাদে সবজি চাষের অনেক পার্থক্যের একটা গুরুত্বপূর্ণ হলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা। বাগানে প্রতিদিন পরিষ্কার কার্যক্রম অনুসরণ করলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। সেজন্য পুরাতন রোগাক্রান্ত, বয়স্ক ডালপালা, পাতা সাবধানতার সাথে কেটে নির্দিষ্ট স্থানে জমা করতে হবে। এতে গাছপালা রোগমুক্ত থাকবে, ফলনে সুবিধা হবে। এরপরও রোগ-বালাইয়ের আক্রমণ হলে সঠিক সময়ে উপযুক্ত বালাইনাশক ওষুধ ব্যবহার করতে হবে। ছাদে-টবে সেচ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কেননা মাটিতে পানি কমে গেলে গাছ সহজেই নেতিয়ে যায়, আবার অতি পানি বা মাটির আর্দ্রতার জন্যও গাছ নেতিয়ে পড়ে মরে যেতে পারে। তাই অবশ্যই ছাদের বাগানে প্রতিনিয়ত সেচের ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। ছাদের বাগানে সেচের জন্য ঝাঁঝরি দিয়ে সেচ দেওয়া ভালো। তাছাড়া প্লাস্টিকের চিকন পাইপ দিয়েও পানি দেওয়া যায়।
টবে সবজি চাষের বিশেষ কিছু সুবিধা রয়েছে। যেমনÑ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, প্রচ- গরম, অতিরিক্ত বৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, ঝড়-ঝঞ্ঝা ইত্যাদির কবল থেকে টবের সবজিকে রক্ষা করা যায় স্থানান্তর করে। পশু-পাখির উপদ্রব থেকে বাঁচানো যায় জাল দিয়ে ঘিরে রেখে। সংসারের অব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের পাত্র ও সরঞ্জামাদি ব্যবহার করে খরচ কমিয়ে আনা যায়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত বীজ, সার, কীটনাশক ইত্যাদি অপব্যয় হয় না। নিজেরা তৈরি করে জৈব সার ব্যবহার করা যায় সবজিতে। ঘরের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য এগুলো সাজিয়ে রাখা যায় ঘরের বিভিন্ন জায়গায়।
আলোচিত অংশে ছাদ বা ব্যালকনির কথা বলা হলেও স্থান-কাল-পাত্র অনুযায়ী ঘরের ভেতরে, সিঁড়ি, বারান্দা, কার্নিশেও অনায়াসে উপরিউক্ত পদ্ধতিতে সবজি চাষ করে একদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষা করা যায়, অন্যদিকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও অবদান রাখা যায়।
এতক্ষণ আমি বাগানে বা ছাদে সবজি চাষ নিয়ে কথা বললাম, কারণ সবজি মূলত আমাদের খাদ্য। আর খাদ্য গ্রহণের দুটি প্রধান উদ্দেশ্য রয়েছে। এক আমাদের ক্ষুধা নিবৃত্ত করা, দুই দেহের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির সরবরাহ নিশ্চিত করা। অর্থাৎ সুস্থ সবল দেহের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান গ্রহণের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পুষ্টির জোগান নিশ্চিত করা। খাদ্য হিসেবে সবজির ব্যবহার আমাদের ৬টি খাদ্য উপাদানের মধ্যে মূল্যবান দুটি উপাদান ভিটামিন ও খনিজ লবণ সরবরাহ করে থাকে। পরিমাণে কম লাগলেও দেহের নানা রকম জৈবিক কর্মকা- পরিচালনা, দেহের বৃদ্ধি ও বিকাশ এবং বুদ্ধি বিকাশে এ দুটি উপাদান অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। রঙিন শাক-সবজিতে রয়েছে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট, তাছাড়া সবজির খাদ্য আঁশও দেহের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাছাড়া রাসায়নিক পদার্থ ও ফরমালিনের ভিড়ে ছাদ বা টবের সবজি বাগান কিছুটা হলেও আমাদের বিষমুক্ত সবজির জোগান দিতে পারে।
প্রথমবারের মতো পালিত হলো জাতীয় সবজি মেলা-২০১৭। যার মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘সুস্থ সবল স্বাস্থ্য চান, বেশি করে সবজি খান’। বর্তমান সরকারের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ‘বাংলাদেশ সবজি উৎপাদনে বিশ্বের তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে। এটা আমাদের জন্য বড় সফলতা। কিন্তু আমাদের মাথাপিছু দৈনিক ২২০ গ্রাম সবজি খাওয়ার লক্ষ্যে এখনও পৌঁছাতে পারিনি। তাই আজ আমরা ‘যেখানেই থাকি সবুজের মধ্যে থাকব’ স্লোগানকে সামনে রেখেই ইতি টানছি।
লেখক : গবেষক ও সমাজকর্মী

Category:

Leave a Reply