সাকিব-মোস্তাফিজে বাংলাদেশ রঙিন

Posted on by 0 comment

আরিফ সোহেল: বিশ্বকাপের বাংলাদেশ = সাকিব + মোস্তাফিজ। শুনতে কি খারাপ লাগছে। হিসাব-নিকাশ-সংখ্যাতত্ত্বে তাই তো প্রমাণ করে। সাকিবের সঙ্গে মোস্তাফিজের মেলবন্ধনে বিশ্বকাপে আলোকিত বাংলাদেশ।
পরিসংখ্যান বলছেÑ সাকিব বিশ্বকাপরে ৮ ম্যাচে ৮৬.৫৭ গড়ে ২ সেঞ্চুরি ৫ ফিফটিতে ৬০৬ রান করেছেন। নিয়েছেন ১১ উইকেট। এক কথায় অবিশ্বাস্য পারফরমেন্স। সেই খুশির দিগন্ত মেঘাচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে, যখন ভাবছেন বাংলাদেশ টুর্নামেন্ট শেষ করেছে পয়েন্ট তালিকার নিচের দিকে। বাংলাদেশ যদি সেমিফাইনালে যেত, সাকিবের রানটা নিশ্চিত আরও বাড়ত। হয়তো বাড়ত উইকেট সংখ্যা। কাটার মোস্তাফিজও আরও ভেলকি দেখানোর সুযোগ পেতেন। শুধু তাদের ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান আরও উজ্জ্বলই হতো না। করতে পারতেন আরও অনেক অনেক রেকর্ড।
সংখ্যাতত্ত্বে বৃত্তায়নে কাটার মাস্টার মোস্তাফিজ ৮ ম্যাচে পেয়েছেন ২০ উইকেট। এর মধ্যে শেষ দুই ম্যাচে ৫ উইকেট করে নিয়েছেন ১০ উইকেট। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের জন্য এই অর্জন বিরল ও গৌরবের। প্রথম খেলতে নেমেই লর্ডসের অনার্স বোর্ডে নাম লিখিয়েছেন। হতাশার বোলিংয়ে মোস্তাফিজ যা একটু খুশির উপলক্ষ এনে দিয়েছেন। মোস্তাফিজ লর্ডসের অনার্স বোর্ডে নাম ওঠালেন তৃতীয় বাংলাদেশি ক্রিকেটার হিসেবে।
এবারের বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ অর্জন সাকিব আল হাসানের উত্থান। টেস্ট ক্রিকেটের র‌্যাংকিংয়ে দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও ওডিআই বা একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের র‌্যাংকিংয়ে সাকিব শীর্ষ অলরাউন্ডারের আসনেই আসীন ছিলেন। থাকবেন সামনেও। সাকিবের আগে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের একই আসরে ৫০০ রান ও ১০ উইকেট কেউ কখনও নিতে পারেন নি। বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসে সাকিবই প্রথম এই বিরল কৃতীর অধিকারী হলেন। বিশ্বকাপটি হয়তো চার বছর পরপর হাতবদল হবে; কিন্তু সাকিব আল হাসানের রেকর্ড সহজে ভাঙবে বলে মনে হয় না। বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচেই দুর্দান্ত খেলেছেন। তবে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান বললেন, ‘ব্যক্তিগত পারফরমেন্সের কথা যদি বলেন, খুবই খুশি। যে ধরনের ইচ্ছা, মন-মানসিকতা নিয়ে এসেছিলাম, সেদিক দিয়ে আমি খুশি, তৃপ্ত। তবে দল সেমিফাইনালে গেলে আরও ভালো লাগত।’
সাকিব আল হাসান যথারীতি আপন আলোয় আলোকিত। শেষ ২ ম্যাচে ৫টি করে উইকেট নিয়ে মোস্তাফিজ সামনে এগিয়ে এসেছেন। নইলে বাংলাদেশের হয়ে বিশ্বকাপটা যেন একাই খেললেন সাকিব! প্রথম ২ ম্যাচে ফিফটি। পরের ২ ম্যাচে সেঞ্চুরি। সব মিলিয়ে ৬০৬ রানের সঙ্গে ১১ উইকেট। অবশ্য শ্রীলংকার বিপক্ষে বৃষ্টিভাসির গল্পটা সাকিব-মোস্তাফিজকে কিছুটা হতাশ করেছে। বাংলাদেশ সেমিফাইনালে গেলে ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট হওয়ার দাবিটা নিশ্চিতভাবেই আরও জোরালো হতো সাকিবের।
৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন সফরোত্তর সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্য প্রশ্নের মধ্যে সাবিক-মোস্তাফিজদের প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। প্রধানমন্ত্রী ক্রিকেট দলের পারফরমেন্সের প্রশংসা করে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ দল সেমিফাইনালে যেতে না পারলেও সামগ্রিক পারফরমেন্সে আমি খুশি।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্রিকেট ভালোবাসেন। ক্রিকেট দলের খোঁজ নিয়মিত রাখেন অভিভাবকের মতোই। শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমি কিন্তু খেলা দেখেছি। অনেক রাত পর্যন্ত। অফিসিয়াল কাজ যেমন করেছি, খেলাও দেখেছি। হয়তো একবার দেখতে পেরেছি, একবার পারিনি। যতটুকু সময় পেয়েছি, খেলা দেখেছি। আমি তো আমাদের ছেলেদের ধন্যবাদ জানাব, তারা যথেষ্ট সাহসের পরিচয় দিয়েছে। তাদের মধ্যে আলাদা আত্মবিশ্বাস কিন্তু এসেছে। ধীরে ধীরে আরও উন্নতি হবে।’
ক্রিকেটপ্রাণ প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, ‘সব মিলিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে ভালো করেছে, ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি দলীয় অর্জনও আছে। আমরা যে এতদূর যেতে পেরেছি, এটা অনেক বড় ব্যাপার। আমাদের কিছু খেলোয়াড়, সাকিব আল হাসান, মোস্তাফিজুর রহমানÑ এরা বিশ্বে একটা স্থান করে নিয়েছে। আমি দোষ দেব না। খেলা এমন একটা জিনিস, অনেক সময় কিন্তু ভাগ্যও লাগে। সব সময় যে সবকিছু ঠিকমতো হবে, একই রকম হবে, সেটা নয়। ক্রিকেটাররা সাহসী মনোভাব নিয়ে মোকাবিলা করতে পেরেছে, আমি এটার প্রশংসা করি।’ প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, ‘দীর্ঘদিন যারা খেলে খেলে অভ্যস্ত, তাদের সঙ্গে মোকাবিলা করে আমাদের ছেলেরা খেলতে পেরেছে। তাদের খেলায় আত্মবিশ্বাসের কোনো অভাব তো আমি দেখি না। ধীরে ধীরে বাংলাদেশ কিন্তু ভালো করছে। এগিয়ে যাচ্ছে।’
দেশে ফিরে মাশরাফি বিন মুর্তজা বিশ্বকাপে সাকিব-মোস্তাফিজ আলোয় আলোকিত বাংলাদেশ এর বাইরে যাননি। সামগ্রিকভাবে দলের ব্যর্থতার দায়ভার নিজের কাঁধে নিয়ে বলেছেন, ‘তারপরও দলের পারফরমন্সে ইতিবাচক অনেক দিকই আছে। বিশেষ করে সাকিব অসাধারণ পারফর্ম করেছেন। মোস্তাফিজও কম যায়নি। বিশ্বকাপে অনেক ব্যাটারদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছেন।’ তাদের সঙ্গে অধিনায়ক মুশফিক ও সাইফউদ্দিনের কথাও উল্লেখ করেছেন।
বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও আফগানিস্তানকে হারিয়ে অনেকের মুখেই তালা লাগিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। কারণ অনেক বোদ্ধা বাংলাদেশকে অবজ্ঞা করে বলেছিলেন, ‘সাকুল্যে বাংলাদেশ একটি ম্যাচে জিতবে।’ কিন্তু সাকিব-মোস্তাফিজ-মুশফিক-সাইফউদ্দিনে বিশ্বকাপে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের পারফরমেন্স দেখে শচীন-মিয়াদাদ-ভনরা বেজায় মুগ্ধ। তারা একবাক্যে স্বীকার করেছেনÑ বাংলাদেশ এখন ক্রিকেটের নতুন একটি অধ্যায়ের নাম। তারা জানে কীভাবে লড়াই করতে হয়।

Category:

Leave a Reply