সামাজিক মুক্তির পথযাত্রী

PM2

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। বাংলাদেশের বাম আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। শতাব্দী স্পর্শ করার আগেই গত ২৩ আগস্ট ৯৮ বছর বয়সে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন তিনি। প্রায় আট দশকের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ইতিহাসের ‘নায়ক’ হতে পারেন নি বটে, তবে গুরুত্বপূর্ণ পার্শ¦চরিত্রে অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছেন।
ভাষা সংগ্রাম থেকে মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি ও তার দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি অনন্য অবদান রেখেছেন।
অধ্যাপক মোজাফফরের জন্ম ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ এপ্রিল। কুমিল্লা জেলার দেবীদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামের ভূঁইয়া পরিবারের সন্তান তিনি। বাবা ছিলেন স্কুলশিক্ষক। মাত্র ১৫ বছর বয়সে রাজনীতিতে তার হাতেখড়ি। গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকে মোজাফফর আহমদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকে বিভিন্ন কলেজে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
দেশভাগের আগেই মোজাফফর আহমদ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র মোজাফফর আহমদ দেশভাগের আগে-পরের একঝাঁক মুসলমান তরুণদের অন্যতম হিসেবে কমিউনিস্ট পার্টির অনুসারী ছাত্র ফেডারেশন এবং গণতান্ত্রিক যুবলীগের তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকের প্রাতঃস্মরণীয় বামপন্থি ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী, সরদার ফজলুল করিম, শহীদুল্লাহ কায়সার, আখলাকুর রহমান, অজিত কুমার গুহ, রণেশ দাসগুপ্ত, অলি আহাদ প্রমুখ ছিলেন তার রাজনৈতিক সহযোদ্ধা। এছাড়া তাজউদ্দীন আহমদ, গাজীউল হক, আবদুল মতিন, মোহাম্মদ তোয়াহা এবং হাবিবুর রহমান শেলী (বিচারপতি হাবিবুর রহমান) প্রমুখÑ যারা ছিলেন ভাষা আন্দোলনের সম্মুখসারির নেতা, তাদের সঙ্গেও মোজাফফর আহমদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
ভাষা আন্দোলনে, চরম বৈরী পরিবেশে মূলধারার ছাত্র আন্দোলন, বিশেষত শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেরণায় পরিচালিত ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’-এর সঙ্গে বামপন্থি এসব ছাত্রনেতা ঐক্যবদ্ধ থেকেই ভাষা আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন।
মোজাফফর আহমদ ছিলেন অপ্রকাশ্য কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। পার্টির সিদ্ধান্তেই তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আত্মনিয়োগ করেন। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের পর ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। গোপনে কমিউনিস্ট কর্মী হলেও পার্টির সিদ্ধান্তেই তিনি প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগে কাজ শুরু করেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে দেবীদ্বার থেকে তৎকালীন মুসলিম লীগের শিক্ষামন্ত্রীকে পরাজিত করে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তরুণ পরিষদ সদস্য হিসেবে তিনি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ভাষা আন্দোলন ও আওয়ামী লীগ করার সুবাদে মওলানা ভাসানী, শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার ছিল একান্ত বন্ধুত্বের সম্পর্ক।
১৯৫৭ সালে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে বামপন্থিরা আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেন। গড়ে ওঠে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, সংক্ষেপে ন্যাপ। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ কেন্দ্রীয় ন্যাপের অন্যতম নেতা নির্বাচিত হন। ন্যাপ আত্মপ্রকাশের বছর না পেরুতেই পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি হয়। জেনারেল ইস্কান্দার মির্জাকে সরিয়ে ‘ফিল্ড মার্শাল’ আইউব খাঁ প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ক্ষমতা দখল করেন। আইউব এক দশক পাকিস্তানের ক্ষমতায় ছিলেন।
১৯৫৮ সালে শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা ভাসানীসহ বহুসংখ্যক রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। অ্যাবডো আইন জারি সোহরাওয়ার্দী-সহ বিশিষ্ট রাজনীতিবিদদের অনেকই রাজনৈতিক কর্মকা- ও নির্বাচনে অংশগ্রহণে ‘অযোগ্য’ ঘোষিত হন। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ-সহ অনেক বিশিষ্ট রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়। তারা গ্রেফতার এড়াতে আত্মগোপনে চলে যান। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ প্রায় আট বছর হুলিয়ার কারণে আত্মগোপনে ছিলেন। ১৯৬৬ সালে আইউব খাঁ-র সঙ্গে মওলানা ভাসানীর গোপন সমঝোতার ফলে মোহাম্মদ তোয়াহা, অধ্যাপক আসহাবউদ্দিন এবং আবদুল হকের সাথে মোজাফফর আহমদের হুলিয়াও প্রত্যাহার করা হয়। মওলানা ভাসানী মোজাফফর আহমদকে তার অনুসারী মনে করে তার ওপর থেকে হুলিয়া প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছিলেন। পরে প্রমাণিত হয় অধ্যাপক PM3মোজফফর আহমদ তৎকালীন রুশ-চীন মতাদর্শগত বিরোধ ও আইউবের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে মওলানা ভাসানী এবং চীনাপন্থিদের বিরুদ্ধে ছিলেন। তিনি আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের মস্কোপন্থি ধারার সঙ্গে একাত্ম ছিলেন।
রাজনৈতিক ও ভাবাদর্শগত কারণে নিষিদ্ধ ঘোষিত গোপন কমিউনিস্ট পার্টি যেমন ভেঙে যায়, তেমনি কমিউনিস্ট প্রভাবিত ন্যাপও ভেঙে যায়। ১৯৬৭ সালে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ মস্কোপন্থি পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি নির্বাচিত হন। মোজাফফর ন্যাপ হিসেবে পরিচিত প্রগতিশীল দলটি বিকাশমান বাঙালি মধ্যবিত্তের র‌্যাডিক্যাল অংশের মধ্যে নতুন আশাবাদ সৃষ্টি করে। প্রতিশ্রুতিশীল বিপুল সংখ্যক তরুণ ছাত্র-আন্দোলন থেকে ন্যাপে যোগদান করে।
মুক্তিযুদ্ধে মূলধারার বামপন্থিরাÑ ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের সমবায়ে গড়ে তোলেন বিশেষ গেরিলা বাহিনী। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ জাতীয় নেতা হিসেবে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যই হননি, তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরাম ও দেশ সফর করেছেন।
স্বাধীনতাত্তোর ন্যাপ বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। একটা শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। তবে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বে ন্যাপ এই সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেখে। ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচনে ন্যাপ ‘বিকল্প সরকারের’ ধ্বনি তোলে। নির্বাচনে যে দু-চারটে আসন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ন্যাপ প্রত্যাশিত ভোট লাভে ব্যর্থ হয়। দেশে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষাবস্থা, জাসদ-গণবাহিনীর হঠকারী কর্মকা-, পিকিংপন্থি সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র তৎপরতা এবং বঙ্গবন্ধুর সরকারকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্তের পটভূমিতে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির সমন্বয়ে ‘ত্রিদলীয় ঐক্যজোট’ গড়ে ওঠে। কিন্তু ঐক্যজোট কার্যকর হয়নি। বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দেন। জাতীয় ঐক্যের প্লাটফরম হিসেবে বাকশাল গড়ে তোলেন।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে যায়। শুরু হয় উল্টোরথের যাত্রা। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা- এবং নভেম্বরে চার জাতীয় নেতার নিষ্ঠুর হত্যাকা-ের ফলে বাংলাদেশে এক অদ্ভুত আঁধার নেমে আসে। পাকিস্তানি, আইউব মডেলের সামরিক শাসন চেপে বসে। অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাজনীতি প্রচ- চাপের মধ্যে পড়ে। দেশে সৃষ্টি হয় নেতৃত্বের শূন্যতা।
জেনারেল জিয়াউর রহমান এই নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণের সুযোগ নেন রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে। সামরিক শাসনের পরিপূরক বেসামরিক রাজনৈতিক নেতা হিসেবেও তিনি পাকিস্তানি-মার্কা নতুন ভাবাদর্শ নিয়ে আবির্ভূত হন। জিয়া ভয়ের সংস্কৃতির পাশাপাশি ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের’ আড়ালে খালকাটা এবং স্বনির্ভরতার ধ্বনি তুলে বামপন্থিদের একাংশ এবং সিভিল সোসাইটিকে বিভ্রান্ত করতে সমর্থ হন। অধ্যাপক আবুল ফজল, প্রফেসর ডা. ইব্রাহিম, অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ প্রমুখের মতো সর্বজন শ্রদ্ধেয় বিশিষ্টজনকে তার সামরিক সরকারের ‘উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য’ (মন্ত্রী) করায় বামপন্থিরাও হিসাবে-নিকাশে ভুল করে বসেন।
বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতা নিহত হওয়ার ফলে সৃষ্ট শূন্যতা পূরণের সুযোগ হয়েছিল ঐতিহ্যশালী রাজনৈতিক দল ও নেতাদের। কিন্তু জনগণের কাছে পরিচিত বয়োজ্যেষ্ঠ ‘সংগ্রামী জননেতা’ মওলানা ভাসানী গ্রহণ করেন উল্টো পথ। তিনি ও তার দল এবং সাধারণভাবে চীনাপন্থি বাম দলগুলো জিয়াউর রহমানের সমর্থক হয়ে দাঁড়ান।
প্রফেসর মোজাফফর আহমদের কাছেও এই শূন্যতা পূরণের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু তিনি সে ভূমিকা নেননি; বরং জিয়াউর রহমানের ১৯-দফা ছাপিয়ে বিতরণ করে বিতর্কের সৃষ্টি করেন। বিভ্রান্ত কমিউনিস্ট পার্টিও হয়েছিল।
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ১৯৭৯ এবং ১৯৮৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। অন্যান্য রাজনৈতিক নেতার মতো স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। একাধিকবার গ্রেফতারবরণ করেন। আশির দশকে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়।
গত শতাব্দীর শেষ দশকে আকস্মিকভাবে সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব-ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে ঘটে ক্ষমতার পালাবদল। ঐ দেশগুলোতে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতাচ্যুত হয়। অবসান ঘটে বিদ্যমান সমাজতন্ত্রের। বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক-ব্যবস্থার এই পতন প্রচ- আলোড়ন সৃষ্টি করে। দেশে দেশে প্রগতিশীল বাম ঘরানার দলগুলো তীব্র ভাবাদর্শগত সংকটে পড়ে। শ্রমজীবী মানুষ এবং সামাজিক মুক্তির প্রত্যাশী রাজনৈতিক নেতা, কর্মী, বুদ্ধিজীবী ও তরুণরা চরম হতাশার শিকার হন। তারা দিক-দিশাহীন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে বাম রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে, বিশেষত মূলধারার কমিউনিস্ট আন্দোলন তথা সিপিবি ভেঙে যায়। নানা উপদলে বিভক্ত হয় ঐতিহ্যবাহী ন্যাপ।
কিন্তু সমাজতন্ত্রের অভ্রান্ততার প্রশ্নে, ভাবাদর্শগত প্রশ্নে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ তার চিরাচরিত অবস্থানে অবিচল থাকেন।
অনেকের মতে, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ যতটা না রাজনৈতিক নেতা, তার চেয়েও বেশি ‘সমাজচিন্তক’। তিনি একজন মার্কসবাদী প-িত। স্বাধীনতার পর ন্যাপের কাছে প্রত্যাশিত ভূমিকা ছিল কমিউনিস্ট পার্টি ও আওয়ামী লীগের মধ্যবর্তী একটি সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির। দলটির বৈশিষ্ট্য হওয়ার কথা ছিল ‘মাল্টি ক্লাস’ পার্টির এবং সংবিধানে বিধৃত জাতীয় চারনীতির নীতিনিষ্ঠ অগ্রবাহিনীর। কিন্তু দৃশ্যত ন্যাপ মাল্টি ক্লাস মনে হলেও, এই দলটি এবং এর মূল নেতা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গির কাঠামো এবং মার্কসবাদী ভাবাদর্শগত অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন নি। দল পরিচালিত হয়েছে দ্বৈত কেন্দ্র থেকে। একদিকে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের প্রকাশ্য ও অফিসিয়াল নেতৃত্ব, অন্যদিকে গোপনে কমিউনিস্ট পার্টির খবরদারি। স্বাধীনতার পরও তিনি কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। দলের মধ্যে এই দুই কেন্দ্রের কারও অবস্থানই নিরঙ্কুশ ছিল না। এক পর্যায়ে কমিউনিস্ট পার্টি কার্যত নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার অবস্থান থেকে সরে আসে। কিন্তু এর ফলে দ্বি-কেন্দ্র থেকে ন্যাপে বহু কেন্দ্রের সৃষ্টি হয়। দলের ভেতর গণতন্ত্র চর্চা ব্যাহত হওয়ায় দলটি একাধিক দল, উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ একজন নীতিনিষ্ঠ সৎ ও ত্যাগী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে জাতীয়ভাবে স্বীকৃত। রাজনৈতিক পরিস্থিতির মূল্যায়ন এবং কৌশল নির্ধারণে ভুল-ভ্রান্তি থাকলেও, কোনো সুবিধাবাদ, আপসকামিতা, ক্ষমতার মোহ এবং দুর্নীতির মালিন্য তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। ব্যক্তিগত জীবনে বিলাসিতাবর্জিত সহজ-সরল জীবনযাপনের একটা অনুসরণীয় মানদ- তিনি দাঁড় করিয়েছিলেন। মুসলমানপ্রধান এবং ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রভাবে আচ্ছন্ন একটা দেশে ‘সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম যে কতটা দুরূহ, আমরা সবাই তা জানি। এদেশে ‘সমাজতন্ত্র’কে ধর্মহীনতার নামান্তর হিসেবেই বিপুল জনগণের মনস্তত্ত্বে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। এমনকি ধর্মনিরপেক্ষতাকেও এদেশে ধর্মহীনতার নামান্তর হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা অব্যাহত আছে। আর এই বাস্তবতার কারণেই, অধ্যাপক মোজাফফর তত্ত্ব দেন ‘ধর্ম-কর্ম-সমাজতন্ত্র’। অর্থাৎ তিনি দেশবাসীর মনে এই আস্থা জাগাতে চেয়েছেন যে, সমাজতন্ত্র কোনো ধর্মবিরোধী মতাদর্শ বা ব্যবস্থা নয়।
তার এই চিন্তাধারা বামপন্থি মহলে সর্বজনীন সমর্থন পায়নি। তবে এ-কথা স্বীকার করতেই হবে যে, সমাজবদলের একজন নিষ্ঠাবান সংগ্রামী পথিকৃৎ হিসেবে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ভাবাদর্শগত বিশুদ্ধতা রক্ষা করেও জনগণের কাছে তাকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য নানান সৃজনশীল পন্থার কথা ভেবেছেন।
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক। তিনি দেশপ্রেম, সততা, আত্মত্যাগ এবং একটি ভেদ-বৈষম্যহীন সাম্যের সমাজ নির্মাণের সংগ্রামে চিরদিন আমাদের বাতিঘর হিসেবে নতুন নতুন প্রজন্মকে প্রেরণা জোগাবেন। তিনি আমাদের সামাজিক মুক্তি সংগ্রামের অন্তবিহীন পথযাত্রী। তার স্মৃতির প্রতি সশ্রদ্ধ অভিবাদন।

নূহ-উল-আলম লেনিন

Category:

Leave a Reply