সুশাসন

Posted on by 0 comment

6সুশাসন একটি বহুমাত্রিক প্রত্যয় বা ধারণা। ‘সু’ মানে ভালো। ‘সু’ প্রত্যয়যুক্ত বেশ কিছু বাংলা শব্দ, প্রায় সর্বক্ষেত্রে ভালো বা ইতিবাচকতা বোঝায়। সুস্বাস্থ্য, সুমতি, সুনিবিড়, সুশৃঙ্খল, সুনীতি, সুবিচার, সুচিন্তিত, সুলভ্য, সদূর এবং সুশাসনÑ প্রভৃতি শব্দ একদিকে গুণবাচক, পরিমাণগত এবং মান (ঝঃধহফধৎফ) বাচকতাসহ বহু অর্থবোধক ও বহুমাত্রিক।
‘সুশাসন’-এর সহজ সরল অর্থ হচ্ছে রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণের বাধাহীন সুযোগ, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সর্বক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা। তবে সুশাসনের ধারণাটি এখানেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্বব্যাংক এবং বিশিষ্ট রাষ্ট্র ও সমাজবিজ্ঞানীগণ এই ধারণাকে পরিব্যাপ্ত করেছেন, জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে।
সুশাসনের ক্লাসিক্যাল বা চিরায়ত ধারণা যেমন প্লেটোর রিপাবলিক গ্রন্থে পাওয়া যায়। তেমনি ম্যাকিয়াভেলি এবং ইউরোপে বুর্জোয়া গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের তত্ত্ব ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কিত বিকাশমান ধারণার (ঈড়হপবঢ়ঃ) মধ্যেও ‘সুশাসন’ শব্দবন্ধটির অর্থ খুঁজে পাওয়া যাবে। প্রাচীন ভারতের কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র গ্রন্থে রাজ্যশাসনে সুশাসন বা সুনীতির কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু বর্তমানে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত ‘সুশাসন’ শব্দটি প্রচলন করে বিশ্বব্যাংক। সত্তর ও আশির দশকে লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকায় বিশ্বব্যাংকের অর্থলগ্নীকরণ ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হওয়ার পর, বিশ্বব্যাংক ১৯৮৯ সালে ‘সুশাসন’ ধারণাটির উদ্ভাবন করে। বস্তুত, সুশাসন হচ্ছে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রেসক্রিপশন। তারা খাতক রাষ্ট্র বা বিশ্বব্যাংকের ‘সাহায্য’ প্রাপ্ত দেশগুলোর উন্নয়নে, রাষ্ট্র পরিচালনায় এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ‘সুশাসন’ প্রতিষ্ঠাকে সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে। লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকায় বিশ্বব্যাংকের অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে গিয়ে তারা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার অভাব, দুর্নীতি এবং কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রব্যবস্থা তথা অদক্ষ, দুর্নীতি পরায়ণ আমলাতন্ত্রকে দায়ী মনে করে।
‘সুশাসন’ ধারণাটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির মাত্রা ও বৈশিষ্ট্য নিরূপণে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা এই ধারণার ভিত্তিতে ১৯৯৫ সালে এ ডি বি এবং ১৯৯৮ সালে আই ডি এ দেশে দেশে সুশাসনের ওপর প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
সুশাসন কেবল একটি রাজনৈতিক ধারণা (চড়ষরঃরপধষ ঈড়হপবঢ়ঃ) হিসেবেই নয়, আধুনিক বিশ্বে এই প্রত্যয়টি সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি, প্রতিষ্ঠান, পরিবার ও ব্যক্তি পর্যায়ে সম্প্রসারিত হয়েছে।
সুশাসনের ক্লাসিক্যাল ধারণায় (প্লেটো, কৌটিল্য এবং ম্যাকিয়াভেলি) রাষ্ট্রের শাসক ও শাসিতের সম্পর্কের নিরিখকে বিবেচনা করা হয়েছে। যেখানে শাসককুল ও প্রজাসাধারণের মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশীদারিত্বের সম্পর্ক বিদ্যমান, শাসক ও প্রজাসাধারণের মধ্যে সুসম্পর্ক রয়েছে এবং নাগরিকগণ তাদের অধিকার ভোগ করতে পেরে সন্তুষ্ট, সেখানেই ‘সুশাসন’ রয়েছে বলে মনে করা হয়।
আধুনিককালে সুশাসনের বহুমাত্রিক ধারণার বিকাশ ও প্রয়োগ হচ্ছে। জাতিসংঘের মতে, ‘সুশাসনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হলো মৌলিক স্বাধীনতার উন্নয়ন।’ ইউএনডিপি-র মতে, ‘সুশাসন সকলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে অর্থপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করে।’ ম্যাককরনির মতে, ‘সুশাসন বলতে রাষ্ট্রের সাথে সুশীল সমাজের, সরকারের সাথে জনগণের, শাসকের সাথে শাসিতের সম্পর্ককে বোঝায়।’ জাতিসংঘের এককালীন সেক্রেটারি জেনারেল কফি আনানের মন্তব্য এ প্রসঙ্গে প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, ‘এড়ড়ফ মড়াবৎহবহপব রং ঢ়বৎযধঢ়ং ঃযব ংরহমষব সড়ংঃ রসঢ়ড়ৎঃধহঃ ভধপঃড়ৎ রহ বৎধফরপধঃরহম ঢ়ড়াবৎঃু ধহফ ঢ়ৎড়সড়ঃরহম ফবাবষড়ঢ়সবহঃ.’
বস্তুত, সুশাসন একটি আপেক্ষিক প্রত্যয়। এটির কোনো সর্বজনীন সংজ্ঞা নেই। ফলে সুশাসনকে এক এক সংস্থা, এক এক ব্যক্তি বা রাষ্ট্র এক একভাবে সংজ্ঞায়িত করে থাকে। তবে সাধারণভাবে কতকগুলো মানদ-কে সর্বজনীন ধরে নেওয়া হয়। যেমনÑ টঘঐঈজ সুশাসন বলতে ৫টি উপাদান চিহ্নিত করেছে। এগুলো হলোÑ ১. ঞৎধহংঢ়ধৎবহপু ২. জবংঢ়ড়হংরনরষরঃু ৩. অপপড়ঁহঃধনরষরঃু ৪. চধৎঃরপরঢ়ধঃরড়হ এবং ৫. জবংঢ়ড়হংরাবহবংং। পক্ষান্তরে জাতিসংঘ স্থির করেছে ৮টি উপাদানÑ ১. দায়বদ্ধতা ২. কার্যকর ও দক্ষ প্রশাসন ৩. স্বচ্ছতা ৪. ন্যায়বিচার ৫. জবাবদিহিতা ৬. আইনের শাসন ৭. অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং ৮. জনগণের মতামতের ওপর নির্ভরশীলতা।
ঘুরেফিরে নানা তত্ত্বের কথা বলা হলেও, সুশাসনের প্রাণ হচ্ছে নিরঙ্কুশ গণতন্ত্র, যার অর্থ হচ্ছে নির্বাচিত সরকার ব্যবস্থা, সর্বজনীন মানবাধিকার, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা, প্রশাসনের বিকেন্দ্রায়ন, সর্বস্তরে জনগণের অংশগ্রহণ, নারী-পুরুষের সমান অধিকার, শিক্ষা ও সংস্কৃতির মুক্তধারা, দুর্নীতি থেকে মুক্তি, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক কল্যাণরাষ্ট্র। বলা বাহুল্য সুশাসন হচ্ছে দারিদ্র্য দূরীকরণ ও উন্নয়নের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উপায়।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। সংবিধানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, দুর্নীতি প্রতিরোধ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন তথা সুশাসন প্রতিষ্ঠার সকল সুযোগ রাখা হয়েছে।
নূহ-উল-আলম লেনিন

Category:

Leave a Reply