সুশীল সমাজ বা সিভিল সোসাইটি

Posted on by 0 comment

1-3-2018 8-08-59 PMস্কটিশ রেনেসাঁর নেতৃস্থানীয় তাত্ত্বিক অ্যাডাম ফার্গুসন সিভিল সোসাইটি প্রত্যয়টির প্রথম ব্যবহার করেন। সিভিল সোসাইটি প্রত্যয়টির কোনো যুতসই বা যথার্থ বাংলা প্রতিশব্দ নেই। গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে কেউ কেউ ‘সুশীল সমাজ’ শব্দ-বন্ধটি প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করেন। এই শব্দটি এখন বাংলা প্রতিশব্দ হিসেবে প্রায় গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু মর্মার্থের দিক থেকে তা সিভিল সমাজ প্রত্যয়ের খ-িত প্রতিশব্দ বলা যেতে পারেÑ পূর্ণাঙ্গ নয়।
‘সিভিল সমাজ’ ধারণাটি নিয়ে প-িতমহলে, রাজনৈতিক অঙ্গনে এবং সমাজবিজ্ঞানে বিস্তর তর্ক রয়েছে। কোনো একটি রাষ্ট্রের শিক্ষিত মধ্যবর্গীয় নাগরিকগণ একটি স্বতঃপ্রণোদিত সংঘÑ যা ভাবাদর্শগত নানা পথ-মত, পেশা ও বর্গের মানুষকে সমাজের সাধারণ স্বার্থে সম্মিলিত করে, সহজভাবে তাকেই সিভিল সমাজ বলা যেতে পারে। এখানে নাগরিক বলতে কেবল নগরবাসীকে নয়, সমগ্র রাষ্ট্রের জনসমষ্টিকেই বোঝানো হয়েছে।
আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ এবং সিভিল সমাজ বলতে যে মধ্যবর্গীয় জনগোষ্ঠীকে বুঝানো হয়েছে, তাদের যেমন বিবর্তন হয়েছে, তেমনি প্রত্যয়টিও বিবর্তিত হয়েছে। সিভিল সমাজ বা পুর-সমাজের ধারণাটির উৎস ধরা হয় খ্রিস্টপূর্ব চতুর্দশ শতকের গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্ততলের লেখা থেকে। তৎকালে রাষ্ট্র ও পুর-সমাজকেই সিভিল সমাজ হিসেবে গণ্য করা হতো। যেখানে সভ্যতার মাপকাঠি বিচারে সা¤্রাজ্য বিস্তারের পরিধি দিয়ে রাষ্ট্রকাঠামো বিকাশের স্তর বিবেচনা করা হতো। সা¤্রাজ্যবিস্তার ও রাষ্ট্রকাঠামোর আন্তঃসম্পর্কের মধ্যে নাগরিক সমাজের ভূমিকা দিয়ে সিভিল সমাজের অবস্থান বিবেচনা করা হতো। একটি ন্যায়ানুগ রাষ্ট্র ও সমাজ এবং ব্যক্তিসত্তার মুক্তির মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে অ্যারিস্ততলের ভাবশিষ্য সক্রেটিস, প্লেটো ও সিসেরো প্রমুখ ধ্রুপদী দার্শনিকবৃন্দও নানাভাবে চিন্তা-ভাবনা করেছেন।
অষ্টাদশ শতকে শিল্প বিপ্লব এবং পুঁজিবাদের উদ্ভবের যুগে মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সমাজতাত্ত্বিক এবং দার্শনিক চিন্তায় বিপুল পরিবর্তনের সূচনা হয়। স্কটিশ নবজাগরণ কেবল, স্কটল্যান্ডেই সীমাবদ্ধ থাকে না, তা ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। একটি বুদ্ধিবৃত্তিক, যুক্তিবাদী এবং নাগরিকজনের কল্যাণমুখী সামাজিক-রাজনৈতিক তৎপরতার বাহক হয়ে ওঠে সিভিল সমাজের অগ্রণী সংগঠকগণ। সিভিল সমাজের কর্মকা-ের ভেতর দিয়ে মানব জাতির শ্রেষ্ঠত্বের অভিপ্রকাশ এবং মানুষে মানুষে সখ্য ও সম্প্রীতির দৃঢ়বন্ধন গড়ে তোলা সুশীল সমাজের আইডিয়েল হয়ে দাঁড়ায়। খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ ও ডেভিড হিউম মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকা-ের বাইরে সামাজিক কর্মকা-কেও সিভিল সমাজের কর্তব্য-কর্ম বিবেচনা করতেন। উনিশ শতকে সিভিল সমাজের এই ধারণাকে পরিপুষ্ট করেন বিখ্যাত জার্মান দার্শনিক হেগেল। তার মতে, সিভিল সমাজ রাষ্ট্র ও পরিবারের মধ্যবর্তী বাজার ব্যবস্থার অনুঘটক। তিনি পুঁজিবাদী বিকাশ ও বাজার ব্যবস্থার সম্প্রসারণের পরিপ্রেক্ষিতে একটি নির্দিষ্ট দেশের বিভিন্ন সামাজিক বর্গ, শ্রেণি, গোষ্ঠী ও পেশাগত সংগঠনের স্বার্থের প্রতিনিধি হিসেবে সিভিল সমাজকে বিবেচনা করা হতো। কার্লমার্কস হেগেলের এই চিন্তাকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যান। তার কাছে সমাজ বিকাশের দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার সিভিল সমাজ কোনো শ্রেণি নিরপেক্ষ শক্তি নয়। শ্রেণি বিভক্ত সমাজের পরস্পরবিরোধী স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে সিভিল সমাজের ভূমিকারও পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে পড়ে। তার মতে, সর্বহারা শ্রেণির নেতৃত্বে সিভিল সমাজ রাষ্ট্রকে পুঁজির দাসত্ব থেকে মুক্ত করে জনকল্যাণমুখী সমাজ নির্মাণে অগ্রসর করে নেবে। ফ্যাসিস্ত ইতালির মার্কসবাদী প-িত আন্তোনিও গ্রামসি বলেছেন, পুঁজিবাদী নির্মমতার মধ্যেও সিভিল সমাজ স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বেচ্ছামূলকভাবে মিলিত হয়ে তার অধিকার রক্ষায় ব্রতী হতে পারে।
সাম্প্রতিককালে সিভিল সমাজকে ‘সামাজিক পুঁজি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তার বর্ধিত ভূমিকার কথা বলা হয়ে থাকে। পাটনাম বলেছেন, এই সামাজিক পুঁজি নাগরিক শক্তির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক অনুঘটক শক্তিতে পরিণত হতে পারে। নাগরিকজন তথা সিভিল সোসাইটি প্রতিটি রাজনৈতিক আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হয়ে উঠতে পারে।
আন্তোনিও গ্রামসি শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থরক্ষায় এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরে সিভিল সমাজকে সংগঠিত শক্তি হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। ঔপনিবেশিক দেশগুলোতে যেখানে রাজনৈতিক দলের বিকাশ নি¤œমাত্রায় ছিল, সেখানে কিন্তু সিভিল সমাজই গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেছে।
আমাদের দেশেও ভাষা আন্দোলন ছিল চরিত্রের দিক থেকে সিভিল সমাজের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রতিবাদী তৎপরতার স্বতঃস্ফূর্ত অভিপ্রকাশ। বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন, বাঙালির জাতিগত আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম এবং স্বাধীনতাত্তোর কালে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সিভিল সমাজ অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। এ জন্য সিভিল সমাজকে রাজনৈতিক নিগ্রহেরও শিকার হতে হয়েছে। কোনো কোনো সমাজবিজ্ঞানী ‘সিভিল সমাজকে’ একটি সমাজের সবচেয়ে সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করে অর্থাৎ তাদের মতো সিভিল সমাজের সবচেয়ে সংগঠিত রূপ হচ্ছে রাজনৈতিক দল। তবে রাজনৈতিক দলগুলো তা মনে করে না। মধ্যপ্রাচ্যের বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী অ্যাডওয়ার্ড সাঈদের মতে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে সিভিল সমাজ প্রায়শ রাজনৈতিকভাবে বিভাজিত হয়ে পড়ে। এর ফলে সমাজের স্বাধীন ভূমিকা ক্ষুণœ হয়। যেমনটি আমাদের দেশে ঘটছে।
কখনও কখনও রাজনৈতিক দল ও নেতাদের মধ্যে সিভিল সমাজ বা আমাদের দেশের বহুল উচ্চারিত ‘সুশীল সমাজকে’ প্রতিপক্ষ হিসেবে চিন্তা করা হয়। এর মধ্যে যেমন সিভিল সমাজের কোনো কোনো সংগঠনের বিতর্কিত ভূমিকা দায়ী, আবার রাজনৈতিক দলের অসহিষ্ণুতাও দায়ী। সিভিল সমাজের আন্দোলন রাজনৈতিক আন্দোলনের বিকল্প নয়, তেমনি সিভিল সংগঠন রাজনৈতিক দলের প্রতিপক্ষ হোক এটাও কাম্য নয়। সিভিল সোসাইটির নেতৃস্থানীয়দের কেউ কেউ যখন ‘সুশীল বাবু’ বলে ব্যঙ্গ করেন, তখন তিনি ভুলে যান সিভিল সমাজের সংজ্ঞা অনুযায়ী তিনি নিজেকেই ব্যঙ্গ করছেন। একটি সভ্যসমাজে সিভিল সমাজ তথা সুশীল সমাজ আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক রূপান্তরের অপরিহার্য সহায়ক শক্তি।

নূহ-উল-আলম লেনিন

Category:

Leave a Reply