সেতু, আন্ডারপাস ও ফ্লাইওভার উদ্বোধন: দেশকে আরও এগিয়ে নেব

Posted on by 0 comment

PddMউত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, আরও এগিয়ে নেব। দেশের উন্নয়ন কাজ অব্যাহত থাকবে। দেশবাসী আমাদের ওপর আস্থা-বিশ্বাস রেখে ভোট দিয়েছে। যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম সারাদেশে উন্নয়নের মাধ্যমে তা রক্ষা করছি। সড়ক, নৌ, রেল ও বিমান মিলে সব দিক থেকে সারাদেশে যোগাযোগ নেটওয়ার্ক সহজ করাই আমাদের লক্ষ্য। যাতে প্রতিটি অঞ্চলের মানুষ কম সময়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে পারেন।
গত ২৫ মে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেশবাসীর ঈদ উপহার হিসেবে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত দ্বিতীয় মেঘনা সেতু এবং দ্বিতীয় গোমতী সেতুর উদ্বোধনকালে তিনি এ-কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে একই সঙ্গে ঈদযাত্রায় স্বস্তি দিতে কোনাবাড়ী ও চন্দ্রা ফ্লাইওভার, কালিয়াকৈর, দেওহাটা, মির্জাপুর ও ঘারিন্দা আন্ডারপাস এবং কড্ডা-১, সাসেক সংযোগ সড়ক প্রকল্পের আওতায় জয়দেবপুর-চন্দ্রা-টাঙ্গাইল-এলেঙ্গা মহাসড়কে বিমাইল সেতু উদ্বোধন করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বাঁশি বাজিয়ে ও সবুজ পতাকা উড়িয়ে ঢাকা-পঞ্চগড় রুটে ‘পঞ্চগড় এক্সপ্রেস’ নামে স্বল্প বিরতির আন্তঃনগর ট্রেনের উদ্বোধন করেন।
এসব বিশাল কর্মযজ্ঞের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখনও ডিজেলচালিত ট্রেন চালিয়ে যাচ্ছে। ঢাকায় মেট্রোরেলের মাধ্যমে দেশের প্রথম বিদ্যুৎচালিত ট্রেনের ব্যবহার শুরু হবে। এরপর দূরপাল্লায়ও বিদ্যুৎচালিত ট্রেন চালু করা হবে। ঢাকায় যানজটে জনগণ কষ্ট পাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভালো কিছু পেতে হলে একটু কষ্ট স্বীকার করতে হবে। মেট্রোরেলের কারণে যে জনদুর্ভোগ তার জন্য একটু কষ্ট হবেই। কিন্তু এর সুফল পরে পাওয়া যাবে। এখানে ১৬টি স্টেশন থাকবে। এর মাধ্যমে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ চলাচল করতে পারবে। মেট্রোরেল নির্মাণকাজ শেষ হলে ঢাকায় যানজট কমে যাবে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের লক্ষ্য কাজের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষের উন্নতি করা। এ লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি। জাতির জনকের দেখানো সেই নীতি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’, ওই পথেই আমরা হাঁটছি। তিনি বলেন, আজ যে সেতুগুলো উদ্বোধন করা হয়েছে, এগুলো দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নসহ আঞ্চলিক সহযোগিতায় বিরাট অবদান রাখবে। যার কাছ থেকে আমরা উন্নয়ন সহযোগিতা পাচ্ছি তার কাছ থেকে আমরা তা গ্রহণ করছি। এর মাধ্যমে সাউথ এশিয়ান ও সাউথ ইস্ট দেশগুলোর সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করতে পারছি। এখন যেসব সেতুর উন্নয়ন করছি, আশা করি ভবিষ্যতে আরও উন্নতি করতে পারব। আমরা সুষ্ঠু পরিকল্পনা নিয়েছি।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মহাসড়কগুলোতে চালকের বিশ্রামাগারের ব্যবস্থা নেই। আমরা অদূর ভবিষ্যতে চালকদের বিশ্রামের জন্য মহাসড়কের পাশে আলাদা ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। খাওয়া-দাওয়াসহ যে কোনো গাড়িচালক যাতে করে একটা নির্দিষ্ট সময় পর বিশ্রাম নিতে পারে। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই ট্রাফিক আইন সম্পর্কে আমাদের ছেলেমেয়েদের ধারণা দিতে হবে। স্কুলের সামনে যেসব জেব্রাক্রসিং থাকে সেগুলো সম্পর্কে ধারণা নেওয়ার জন্য তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের প্রতি আহ্বান জানান।
সড়কে চলাচল বিষয়ে সবার মাঝে গণসচেতনতা সৃষ্টিতে স্কুল-জীবন থেকেই ট্রাফিক আইন প্রশিক্ষণে গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার মনে হয় ট্রাফিক রুলের ওপর স্কুল-জীবন থেকেই প্রশিক্ষণ দেওয়া দরকার। তাহলে সবার মাঝে সচেতনতাটা গড়ে উঠবে।’ তিনি এ-সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছুটির সময় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিধানে সচেষ্ট হওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কলেজ বা বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান, যাতে কোনো কোমলমতি শিক্ষার্থী দুর্ঘটনার শিকার না হয়। অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি সুস্থ হয়ে দেশে ফেরায় তাকে দোয়া করার জন্য দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান প্রধানমন্ত্রী।
তিনি এ-সময় তার দল আওয়ামী লীগকে একটি পরিবার বলে উল্লেখ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘রাজনৈতিক দল হিসেবে শুধু রাজনীতিই নয়, আমরা একটা পরিবার। ছোটবেলা থেকে দেখেছিÑ আমার মা-বাবা এবং রাজনৈতিক নেতাদের আমরা একটা পরিবারের মতোই বড় হয়েছি। যখনই কোনো সমস্যা হয় সুখ-দুঃখে আমরা সবসময় সাথী হয়েই চলি। এভাবেই এই সংগঠনটা যেন এগিয়ে যেতে পারে, সে-বিষয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে একসময় দেশে হাহাকার ছিল। আজকে প্রায় ৯৩ ভাগ মানুষকে বিদ্যুৎ দিতে পারছি। যেসব মেগা প্রকল্প এবং যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হচ্ছে, তাতে আমাদের বিদ্যুতের কোনো অভাব থাকবে না। রেলের প্রতি মানুষের আস্থা বৃদ্ধির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, যত দিন যাচ্ছে রেল আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। মানুষ এখন রেলে বেশি চড়তে চায়। চাহিদা মেটানোর জন্য আমাদের আরও বেশি যাত্রীবাহী কোচ দরকার। কাজেই আরও বেশি কোচ আমাদের কিনতে হবে।
শেখ হাসিনা তার নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় গত সাড়ে ১০ বছরের রেলের উন্নয়নের বিভিন্ন চিত্র তুলে ধরে বলেন, আমরা রেলের উন্নয়নে ব্যাপক কাজ করে যাচ্ছি। আর যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে একটা দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নতি সম্ভব। আর সেদিকে লক্ষ্য রেখেই রেল, সড়ক, আকাশ, নৌপথ সবদিকেই আমরা দৃষ্টি দিয়েছি এবং উন্নয়ন করে যাচ্ছি। তিনি বলেন, সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক, লাভজনক নয় বলে বিএনপি সরকারের আমলে পুরো রেল যোগাযোগটাই বন্ধ করে দিতে চেয়েছিল। অনেক ট্রেন ও লাইনগুলো বন্ধ করে দেয়। রেলটাকে সম্পূর্ণভাবে তারা ধ্বংস করতে চেয়েছিল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার পর আলাদা মন্ত্রণালয় গড়ে তুলে সার্বিকভাবে রেলকে যোগাযোগ ব্যবস্থার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর বাংলাদেশ ও ভারতের ভারতের মধ্যে যেসব রেল সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, পর্যায়ক্রমে সেগুলো চালু করা হচ্ছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ের সঙ্গেও বাংলাদেশ যেন সংযুক্ত হয় সে-ব্যবস্থাটাও আমরা নিয়েছি। রেলের ডিজিটাইজেশন, দক্ষিণবঙ্গে পায়রাবন্দর পর্যন্ত রেল সংযোগ স্থাপন, ঢাকা থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ট্যুরিস্ট ট্রেন চালু করা, বঙ্গবন্ধু সেতুর পাশে যমুনার ওপর একটি রেলসেতু নির্মাণের উদোগসহ নানা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে ঈদের আগাম শুভেচ্ছা জানিয়ে উল্লিখিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর উদ্বোধন ঘোষণা করেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তৃতায় আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের উদ্বোধন হওয়া এসব প্রকল্পকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সৃষ্টিশীল নেতৃত্বের সফল ফসল হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, এতে এবার ঈদযাত্রায় কিছুটা হলেও স্বস্তি এনে দেবে। নিজের অসুস্থতার কথা তুলে ধরে ওবায়দুল কাদের বলেন, আমি যখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল, তখন অনেকে আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন। আমি বেঁচে থাকব এটা অনেকে আশাই করতে পারেননি। আমাকে সুস্থ করে তুলতে মমতাময়ী মায়ের মতো সেই সময় ভূমিকা পালন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এতে তার কাছে ঋণের বোঝা বেড়ে গেল। এর আগে কাঁচপুর, দ্বিতীয় মেঘনা, গোমতী সেতু নির্মাণ প্রকল্প পরিচালক আবু সালেহ মো. নুরুজ্জামান জানান, নবনির্মিত কাঁচপুর ব্রিজ ইতোমধ্যেই যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। নতুন দুটি সেতু চালু হলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বিশেষ করে ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা কিছুটা হলেও আরামদায়ক হবে।
প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কুমিল্লা, গাজীপুর, মুন্সিগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের উপকারভোগীদের সঙ্গে কথা বলেন। শুরুতেই শুভেচ্ছা বক্তব্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত হিরোইয়াসু ইজুমি বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক আরও অনেকদূর এগিয়ে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

Category:

Leave a Reply