সোনালি আঁশ পাটের বহুমাত্রিক অভিষেক

Posted on by 0 comment

aরাজিয়া সুলতানা: বাঙালির ইতিহাস ও অর্থনীতির সঙ্গে মিশে আছে পাট। সেই পুরনো কথাÑ পাট বাংলাদেশের সোনালি আঁশ। একসময় এ দেশের ৮০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রাই অর্জন হয়েছে পাট থেকে। শস্য-শ্যামলা এই দেশের অর্থনীতি ও সমৃদ্ধির সাথে পাটের নিবিড় সম্পর্ক। পুরনো সেই পাটের সুদিন ফিরে আসছে বাংলাদেশের। ২০১০ সালে দেশি পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন, তা কাজে লাগিয়ে ৪টি নতুন জাতের পাট উদ্ভাবন করেছে। উৎপাদিত সেই পাটের আঁশ দিয়ে তৈরি হচ্ছে সুতা। পাটের গুণগত মান বৃদ্ধির ফলে বহুমুখী উৎপাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্যান্ট, শার্ট, জামদানি, স্যান্ডেল, পলিব্যাগ, ঘর সাজানোর আসবাবের সঙ্গে মার্সিডিজ গাড়িতে পাটের ব্যবহারসহ প্রায় দুশতাধিক পাটজাত পণ্যের বাণিজ্যিক উৎপাদন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
১৮৫০ সালে এই অঞ্চলে মাত্র ১৭ হাজার হেক্টর জমিতে পাট চাষ হতো। মাত্র ৫০ বছরেই এ চিত্র পাল্টে গেছে। ১৯০০ সালে পাটের জমির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৫০ হাজার হেক্টর। বিশ্ববাজারে ব্রিটেনসহ ইউরোপিয়ান কোম্পানিগুলোর দানাদার খাদ্যশস্য চিনি, কফি, চা-সহ নানা পণ্যের বিক্রি বৃদ্ধি পায়। আর ওইসব পণ্যের মোড়ক হিসেবে বেড়েছিল পাটের চাহিদা। কিন্তু এ ধারা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৯১ সালে বিএনপি-জামাতের হাত ধরে সরকার গঠন করে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সঙ্গে একটি কালো চুক্তি করে। গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে দেশের লাখো লাখো শ্রমিককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। তাতে ১৯৯৩ সাল থেকে পাটকলগুলো একে একে বন্ধ করে দেয়। ফলে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বে যে আড়াই লাখ বেল পাট রপ্তানি হতো তা বন্ধ হয়ে যাবে। আর ঠিক তখনই ভারতের সঙ্গে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের চুক্তি হলো। চুক্তি অনুযায়ী ভারত তাদের সীমান্তে পাটকল তৈরি করবে আর ওই আড়াই লাখ বেল পাট রপ্তানি করার সুযোগ পাবে। বাংলাদেশের পাটকল বন্ধ করার জন্য টাকা নিয়েছিল বিএনপি সরকারÑ আর ভারতকে পাটকল করার সুযোগ করে দিল ওয়ার্ল্ড ব্যাংক। পাটের বিশ্ববাজারে এমন অগ্রযাত্রা দেশের সরকারি পাটকলগুলো মুখ থুবড়ে পড়েছিল বিএনপি-জামাতের নীল নকশায়।
আওয়ামী লীগ-জোট সরকার গঠনের পরপরই পাল্টে যায় দৃশ্যপট। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কৃষিমুখীন অর্থনীতির মূলস্রোতে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত ‘সোনালি আঁশ’ উৎপাদন ও বিপণনের বাঁকে বাঁকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে পাট শিল্প। সূচিত হয়েছে পাটের নববিপ্লব। তাতে অবশ্য পাটও আমাদের সাহায্য করেছে, কারণ বাংলাদেশের জলবায়ু পাট উৎপাদনের জন্য খুবই উপযোগী। তাই বাংলাদেশের পাট বিশ্বের সেরা। বর্তমানে বাংলাদেশে ৮ লাখ ১৭ হাজার ৩৮৩ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হচ্ছে। দখল করে নিয়েছে পাট উৎপাদনে বিশ্বের দ্বিতীয় স্থান। সরকার নিয়েছে পাট বহুমুখীকরণের উদ্যোগ। অভিষেক হচ্ছে নিত্যনতুন পাট পণ্যের। এক টন পাট বিক্রি করলে যে লাভ হয়, তা দিয়ে পাটপণ্য বানিয়ে বিক্রি করলে লাভ হয় তার থেকে অনেক বেশি। পাট থেকে তৈরি হচ্ছে পোশাকÑ বিশেষ করে শীতের জন্য নানা ধরনের জ্যাকেট, শাড়ি, জামা, জুতা, স্যান্ডেল, ঘরের পর্দা, কুশন কাভার, টেবিল ম্যাট, টিস্যু বক্স, পলিথিন, সাইকেল, কার্পেট, চট, পাটের ব্যাগ, বস্তা, ঝুড়ি, বিভিন্ন ধরনের কাপড়, সুতা, তুলা, পর্দা, টেবিল ক্লথ, রানার, প্লেসমেট, কুশন কাভার, সোফার কাভার, কিচেন ওয়্যার, লন্ড্রি বাস্কেট, ফ্রুট বাস্কেট, স্টোরেজ প্রোডাক্ট, হ্যাঙ্গার, ক্রিসমাস ডেকোরেশন সামগ্রী, গার্ডেনিং প্রোডাক্ট, ফ্লোর কাভারিং প্রোডাক্ট, শপিং ও ফ্যাশনেবল প্রোডাক্ট, ঘর সাজানোর দ্রব্য, বিলাসসামগ্রীসহ বিভিন্ন পাটজাত পণ্য। পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৫টি দেশ ছাড়াও দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি, ব্রাজিলসহ পৃথিবীর ১৮৮টি দেশে। বাংলাদেশের পাট এবং পাটজাত পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) পাট এবং পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছে ৬৬ কোটি ১৮ লাখ মার্কিন ডলার; যা এই সময়ের কৌশলগত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১০ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ বেশি।
ইউরোপের বাজারে নিষিদ্ধ হচ্ছে সিনথেটিক পণ্য। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ঘোষণা দিয়েছে, ২০১৯ সালের মধ্যে তাদের সদস্যভুক্ত সব দেশ পণ্যের মোড়ক ও বহনের জন্য প্লাস্টিক এবং কৃত্রিম আঁশজাত পণ্যের ব্যবহার বন্ধ করবে। যার ফলে বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে। আশা করা যাচ্ছে, বিশ্ববাজারের চাহিদা অনুযায়ী পরিকল্পনামাফিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরে পাটের রপ্তানি কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে।
পরিবেশবান্ধব ও নান্দনিকতার কারণে দেশের অভ্যন্তরেও চাল, গম-সহ বেশ কিছু পণ্য প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দেশেই তৈরি হয়েছে ২০ লাখ কাঁচা পাটের অভ্যন্তরীণ বাজার। তা ছাড়া সরকার চীনের প্রযুক্তি সহায়তা নিয়ে সরকারি পাটকলগুলোর মানোন্নয়ন করে দেশি পাট থেকে সুতার প্রধান কাঁচামাল ‘ভিসকস’ তৈরি করার পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে, যা পোশাক শিল্পকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে। অন্যদিকে দেশে তৈরি ডেনিম কাপড়ে ৫০ শতাংশই রয়েছে পাট এবং বাকি ৫০ শতাংশ কটন। গুণগত মানের দিক দিয়ে বর্তমানে বাজারে যে ধরনের ডেনিম কাপড় রয়েছে সেগুলোর চেয়ে এই কাপড়ের মান কোনো অংশে কম নয়। পরিবেশবান্ধবের দিক দিয়ে এগুলো অনেক ভালো। পাটের এখন জয়জয়কার অবস্থা, কারণ পাট এমনই একটি পণ্য যে বিশ্বের দামি মার্সিডিজ গাড়ি তৈরি করতেও ব্যবহৃত হচ্ছে। তা ছাড়া তিন-চার বছর ধরে পাটের শোলা বা কাঠি আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন পাটপণ্য হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পাটকাঠি থেকে জ্বালানি হিসেবে চারকোল ও এর গুঁড়া থেকে ফটোকপি মেশিনের কালি তৈরি হচ্ছে। পাটখড়ির কার্বন মোবাইলের ব্যাটারি, প্রসাধনী, দাঁত পরিষ্কারের ওষুধ, কার্বন পেপার, কম্পিউটার ও ফটোকপিয়ারের কালি, আঁতশবাজি, ফেসওয়াশের উপকরণ, প্রসাধন পণ্যসহ বিভিন্ন জিনিস তৈরির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। আরও তৈরি হচ্ছে জুটজিও টেক্সটাইল, যা ব্যবহার করা হয় রাস্তাঘাট নির্মাণে, বাঁধ নির্মাণে। আগে ব্যবহার করা হতো সিনথেটিক টেক্সটাইল, বিদেশ থেকে আমদানি করা হতো, যা পরিবেশের জন্য খুবই খারাপ। পাটের ব্যবহার বাড়ানো গেলে এগুলো আর আমদানি করা লাগবে না। তাছাড়া পাট থেকে আমরা কম্পোজিট তৈরির কাজ হচ্ছে।
পাট থেকে পলিথিন তৈরি করেছে পরমাণু গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা। পরিবেশবান্ধব এই পলিথিন মাটিতে পচতে সময় নেবে দুই থেকে তিন মাস। বাংলাদেশে ২০০২ সালে আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে পলিথিনের ব্যবহার। বন ও পরিবেশ দফতরের হিসাবে, প্রতি মাসে ঢাকায় পলিথিনের ব্যবহার হয় ৪১ কোটি টাকার। আর বছরে গোটা পৃথিবীতে ব্যবহৃত ১ ট্রিলিয়ন পলিথিনের কারণে প্রায় ১১ লাখ প্রাণী হুমকির মুখে পড়ে। তাই প্রাণী রক্ষায় এই পরিবেশবান্ধব পলিথিন যে বড় কাজে আসবে তা বলাই যায়।
বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিতে পাট থেকে ডেনিম কাপড় তৈরিরও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রথমে পাট ও তুলার মিশ্রণে সুতা তৈরি হচ্ছে। সেই সুতা থেকে বানানো হচ্ছে ডেনিম কাপড়। উৎপাদিত কাপড় থেকে প্যান্ট, জ্যাকেট, শার্টের মতো পোশাক বানিয়ে রপ্তানি করা হবে। পাশাপাশি দেশের বেসরকারি খাতে কাপড় সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশন (বিজেএমসি) ইতোমধ্যে পাট থেকে ডেনিম কাপড় উৎপাদন করেছে।
নতুন সংযোজন পাট পাতার চা। এই চায়ে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা মানবদেহের দুর্বল কোষে ফ্রি রেডিক্যালের ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলতে দেয় না। এতে ক্যানসারের সম্ভাবনা কমে যায়। এছাড়া রাসায়নিক বিষক্রিয়ার কারণে লিভার ড্যামেজ ও জন্ডিস প্রতিরোধে সক্ষম এই চা। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রেখে বার্ধক্যজনিত রোগ প্রতিরোধ করতে বয়োবৃদ্ধদের সাহায্য করে। এছাড়া আলসার ও ত্বকের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধিতেও কার্যকর পাটের চা।
এই যে পাটের বহুমুখীকরণ তার মূলে রয়েছে পাটের গুণগত মান বৃদ্ধি। এই মান বৃদ্ধির জন্য মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন সর্বজন স্বীকৃত শ্রদ্ধেয় যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের একদল বিজ্ঞানী ২০১০ সালে তোষা পাট, ২০১২ সালে ছত্রাক এবং ২০১৩ সালে দেশি পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করেন। পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট পাটের এই জীবনরহস্যকে (জিনোম সিকোয়েন্সিং) কাজে লাগিয়ে ৪টি নতুন জাত তৈরি করেছেন। রবি-১, রবি-২ এবং শশী-১, শশী-২। পাটের আঁশের মধ্যে সাধারণত ১২ থেকে ১৪ শতাংশ লিগনিন থাকে। প্রাথমিকভাবে নতুন জাতে লিগনিনের পরিমাণ কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এতে আঁশ নরম হচ্ছে। ফলে পাট দিয়ে জামদানি, শার্ট, প্যান্ট বা সমজাতীয় পোশাক প্রস্তুতের সুতা তৈরি হচ্ছে। নতুন জাতের পাটের আঁশ বৃদ্ধি ও লম্বার জন্য দায়ী দুটি জিনও শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা। এসব জিন কাজে লাগিয়ে ভালো ও বেশি আঁশযুক্ত পাটের জাতও উদ্ভাবন করা যাবে।
দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে মোট ২২টি পাটকল চালু রয়েছে এবং বেসরকারি খাতে প্রায় ২০০ পাটকল আছে। দেশের প্রায় ৪ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাট খাতের ওপর নির্ভরশীল। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উদ্যোগ এবং নিরন্তর চেষ্টায় পাট ও পাটজাত পণ্যের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ক্রম বৃদ্ধি পাচ্ছে, বাড়ছে রপ্তানিরও পরিমাণ। কৃষকরা অন্য ফসলের তুলনায় পাট চাষে যাতে লাভবান হতে পারেÑ সেজন্য দেশের অভ্যন্তরে পাটের উৎপাদন বাড়াতে মানসম্মত বীজ সংগ্রহ করা হচ্ছে সরকারিভাবে। পাটপণ্য বৈচিত্র্যকরণে সরকারি পাটকলগুলোতে আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হচ্ছে।
পাট চাষিদের অক্লান্ত পরিশ্রম, প্রকৃতির অকৃপণ কৃপা, বিজ্ঞানীদের ঘাম ঝরানো প্রচেষ্টা ও আন্তর্জাতিক বাজারের বিপুল চাহিদার কল্যাণে পাটের সুদিন ফিরে আসছে অচিরেই। সোনালি আঁশের সোনালি দিন আবার ফিরেছে। এবারের জাতীয় পাট দিবসেÑ ‘সোনালি আঁশের সোনার দেশ, পাট পণ্যের বাংলাদেশ’ এই সেøাগান আরও বেশি প্রাণোদ্বীপ্ত হয়েছে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাটের জামদানি, হাতে পাটের ব্যাগ, পাটের তৈরি স্যান্ডেলে পাটময় উপস্থিতিতে। দেশ যদি ঠিক এভাবেই এগিয়ে যায়, তাহলে সেদিন আর বেশি দূরে নেইÑ যেদিন পাট ও পাটজাত পণ্যই হবে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস।

লেখক : পিএইচডি গবেষক, শিক্ষক, কৃষিবিদ এবং সমাজকর্মী

Category:

Leave a Reply