স্বপ্ন পূরণের বাজেট

Posted on by 0 comment

2অবশেষে সর্বসম্মতিক্রমে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট পাস হয়েছে। এ যেন ঝড়ের পরের প্রশান্তি। বাজেট পেশের পর জাতীয় সংসদে, গণমাধ্যমে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এবং নানা সভা-সিম্পোজিয়াম, আলোচনা সভায় বাজেটের কতিপয় প্রস্তাবনা সম্পর্কে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। সবাই যে জেনে-বুঝে বাজেটের সমালোচনা করেছেন তা নয়। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থের ওপর আবগারি শুল্ক হার বৃদ্ধির প্রস্তাবটি ইতিবাচকভাবে উত্থাপন এবং ব্যাখ্যা না করায়, জনগণের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়। ২০১২ সালে সংসদে গৃহীত ভ্যাট আইন কার্যকর করার প্রস্তাবেও বিশেষত ব্যবসায়ী মহলে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। আর এ কারণে এই বাজেটে দেশের উন্নয়নে যেসব যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ ও পরিকল্পনার কথা বলা হয়, সে বিষয়গুলো আড়াল হয়ে যায়।
এ কথা স্বীকার্য যে জাতীয় সংসদ সার্বভৌম। এখানে জনপ্রতিনিধিগণ অবাধে তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু একই সঙ্গে এ কথাও তো সত্য যে, জাতীয় সংসদ তথ্যভিত্তিক বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা-সমালোচনার নজির স্থাপন করবে এবং গণতন্ত্র চর্চার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে জাতির আশা-ভরসার স্থান হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু আমরা দুঃখের সাথে লক্ষ করলাম জাতীয় পার্টির কতিপয় সদস্য অপ্রাসঙ্গিকভাবে কতগুলো বিষয়ের অবতারণা করেন এবং অসত্য তথ্যের ভিত্তিতে অর্থমন্ত্রীকে অসংগতভাবে ব্যক্তিগত আক্রমণ পর্যন্ত করেন। এসব উদ্দেশ্য প্রণোদিত অসংযত ও অসংগত সমালোচনা বা কুৎসাপূর্ণ ব্যক্তিগত আক্রমণ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি বিকাশের পরিপন্থী। মন্ত্রিসভায় গৃহীত বাজেটের বিরুদ্ধে বা যে কোনো প্রস্তাবের সমালোচনা দলমত নির্বিশেষে সংসদ সদস্যদের রয়েছে। তবে মন্ত্রিসভার সদস্যগণ তাদের কথা মন্ত্রিসভার বৈঠকেই বলবেন, এটাই গণতান্ত্রিক রীতি। এবারের বাজেট আলোচনায় তারও ব্যত্যয় ঘটেছে। ফলে সরকারদলীয় সদস্যই নয়, জনগণের কাছেও ভুল বার্তা চলে যায়।
বিরোধী দল, ব্যবসায়ী সমাজ এবং এক শ্রেণির বৈরী গণমাধ্যম এর সুযোগ গ্রহণ করে। তারা বুঝে, না বুঝেই সরকারের সাফল্যগুলোকে ম্লান করে দিয়ে এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়নের বিশাল কর্মযজ্ঞের প্রস্তাবনাগুলোকে সামনে না এনে কেবল জনতুষ্টিবাদী প্রচারণায় মেতে ওঠে। আমরা আশা করব, ভবিষ্যতে এ ব্যাপারে বিশেষভাবে মন্ত্রিসভার সদস্য ও সরকারদলীয় সদস্যগণ আরও সচেতন হবেন।
সমালোচনার এই প্রবণতাটুকুর কথা বাদ দিলে এবারের সংসদে প্রকৃতই বাজেট নিয়ে প্রাণবন্ত আলোচনা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনগণের আবেগ-অনুভূতি এবং তাদের প্রত্যাশার কথা বুঝতে পেরে কতিপয় সংশোধনী আনেন, যা অর্থমন্ত্রী মেনে নিয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধনীসহ বাজেট চূড়ান্ত অনুমোদনের আহ্বান জানান। আমাদের ধারণা, ব্যাংক আমানতের ওপর যে অতীত থেকেই আবগারি শুল্ক (২০ হাজার টাকার ওপরে) ধার্য ছিল সে কথাটি উল্লেখ করে ১ লাখ টাকা আমানতকারীদের যে আবগারি শুল্ক মওকুফ করেছেন অর্থাৎ, ১ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানতের ওপর শুল্ক বা কর থাকবে না, এ কথাটি জোরেসোরে ব্যাখ্যা করে বলতেন, তা হলে গণমাধ্যম এটাকে পিকআপ করে প্রচারণায় আনতে পারত। অর্থমন্ত্রী ১ লাখ টাকার ওপরে আমানতের ক্ষেত্রে আবগারি শুল্ক কিছুটা বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছিলেন। এ বিষয়টি পরিষ্কার থাকলে সমালোচকরা গয়রহ প্রচারের সুযোগ পেত না। অন্যদিকে ভ্যাট আইন কার্যকর করার জন্য প্রয়োজন ছিল আরও বেশি প্রচারণা এবং জনমত গড়ে তোলা।
অর্থনীতিতে জনতুষ্টিবাদী নিতে আশু কোনো লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হলেও দীর্ঘমেয়াদে তা কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না। এবার আমরা কিছুটা হলেও সেই জনতুষ্টিবাদের ফাঁদেই আটকে গেলাম। আমাদের অর্থনীতি ক্রমশ-ই শক্তিশালী হচ্ছে। জিডিপির হার ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ১২ থেকে ১৭ শতাংশে উঠে এসেছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে ১৮ শতাংশে। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় এক্ষেত্রে এখনও আমরা পিছিয়ে আছি। জিডিপির হার ২৫-৩০ শতাংশে উন্নীত করতে না পারলে দেশে যেমন কর্মসংস্থান বাড়বে না, সম্পদ বাড়বে না, তেমনি এসডিজির লক্ষ্যমাত্রাও অর্জিত হবে না। জিডিপির হার বাড়াতে হলে অনিবার্যভাবে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এবারের বাজেটে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্যই সরকারের আয় বাড়ানোর জন্য আবগারি শুল্ক হার বৃদ্ধি এবং ভ্যাট আইন কার্যকর করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। জনমতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সরকার আগামী দুই বছর আবগারি শুল্ক বৃদ্ধি না করা এবং ভ্যাটের হার পূর্বের ন্যায় সীমিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নির্বাচনী রাজনীতির জন্য এই সিদ্ধান্ত ইতিবাচক হলেও উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ হিসেবে থেকে যাবে। নিঃসন্দেহে জননেত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য নেতৃত্বে সরকার সাফল্যের সঙ্গে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম হবে।
২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেট বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বাজেট। উন্নয়ন বাজেটও অতীতের সকল সীমা অতিক্রম করেছে। বাজেটে প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭.৫ শতাংশ। এই লক্ষ্য অর্জিত হলে বাংলাদেশের চলমান উন্নয়নের গতি আরও বেগবান হবে। ভৌত-অবকাঠামো উন্নয়নের যেসব ম্যাগা প্রজেক্ট গ্রহণ করা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে বিদ্যমান বিনিয়োগ পরিস্থিতির গুণগত পরিবর্তন হবে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, ব্যাংকিং সেক্টরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন প্রতিরোধ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারলে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি বাস্তবায়নের সক্ষমতা অর্জন করবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের প্রেক্ষিত পরিকল্পনা, পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং আওয়ামী লীগের উন্নয়ন দর্শন, সর্বোপরি শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্ব দেশবাসীর স্বপ্ন পূরণের অনুঘটক হয়ে নব নব সাফল্যের দ্বারোদ্ঘাটন করবে। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।

Category:

Leave a Reply