১৭ আগস্ট ২০০৫ : বিএনপি-জামাতের মদদে সিরিজ বোমা হামলা

Posted on by 0 comment

8-1-2017 9-25-07 PM সরদার মাহামুদ হাসান রুবেল: ১৭ আগস্ট ২০০৫, সকাল ১১টায় জামাত-বিএনপি জোট সরকারের সময় দেশের ৬৩ জেলায় (মুন্সিগঞ্জ বাদে) সিরিজ বোমা হামলা চালায় জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ-জেএমবির জঙ্গিরা। দেশের ৩০০টি স্থানে মাত্র আধাঘণ্টার ব্যবধানে একযোগে ৫০০ বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেদের শক্তিমত্তার জানান দিয়েছিল জেএমবি। এতে দুজন নিহত ও দুশতাধিক লোক আহত হয়। সিরিজ বোমা হামলার স্থান হিসেবে জঙ্গিরা হাইকোর্ট, সুপ্রিমকোর্ট, জেলা আদালত, বিমানবন্দর, বাংলাদেশে থাকা মার্কিন দূতাবাস, জেলা প্রশাসক, জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়, প্রেসক্লাব ও সরকারি-আধাসরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বেছে নেয়। হামলার স্থানসমূহে জেএমবির লিফলেট পাওয়া যায়। লিফলেটগুলোতে বাংলাদেশে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠাসহ বিচারকদের প্রতি হুমকি বার্তা পাঠানো হয়।
জেএমবি’র প্রথম নাশকতার শুরু ২০০১ সালে। ওই বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার রক্সি সিনেমা হল ও সার্কাস মাঠে বোমা হামলা চালায় তারা। এতে তিনজন নিহত ও প্রায় ১০০ জন আহত হন। এরপর ২০০২ সালের ১ মে নাটোরের গুরুদাসপুরে কিরণ সিনেমা হলে ও ৭ ডিসেম্বর ময়মনসিংহে ৪টি সিনেমা হলে বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্টের আগ পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনা ঘটালেও তৎকালীন বিএনপি-জামাত জোট সরকারের টনক নড়েনি।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, তারেক রহমান এবং চারদলীয় জোট সরকারের প্রভাবশালী কয়েক মন্ত্রী-এমপি-নেতার প্রত্যক্ষ মদদেই ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছিল কুখ্যাত জেএমবি নেতা সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলাভাই। স্বঘোষিত আঞ্চলিক শাসন জারি করে জেএমপি রাজশাহীর বাগমারা ও নওগাঁর আত্রাই-রাণীনগরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল। জিয়া পরিবারের সাথে বাংলাভাইয়ের সম্পর্কের গভীরতা এতটাই বেশি ছিল যে, প্রকাশ্যেই তারেক রহমানকে মোবাইল ফোনে সম্বোধন করত ‘মামা’ বলে। উইকিলিকসের ফাঁস করা বার্তায় দেখা যায়, ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের তখনকার চার্জ দ্য এ্যাফেয়ার্স জুডিথ চামাসকে এ কথা জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব কামাল সিদ্দিকী।
8-1-2017 9-25-44 PMএমনকি বাংলাভাই নিজে সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার দিয়ে তার কর্মকা- সম্পর্কে জানান দিলেও তখন সরকার জঙ্গি তৎপরতার উপস্থিতি পুরোপুরি অস্বীকার করে। বেগম খালেদা জিয়া নিজেই বলেছেন, ‘বাংলাভাই মিডিয়ার সৃষ্টি। বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্ব নেই।’ প্রতিবাদ করলেও অনেক গণমাধ্যম শেখ হাসিনার কথায় শুরুতে কান দেয় নি। জঙ্গিদের পেছনে তৎকালীন সরকারের শীর্ষ নেতাদের সমর্থন থাকায় একপর্যায়ে বাংলাভাইয়ের মিছিল করতে সরকারি ও বেসরকারি জিপ, কার, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেল পাঠানোর জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে ওঠে। পুলিশকে দিতে হয়েছে বাংলাভাইয়ের কর্মসূচিতে নিরাপত্তা। তবে বাংলাভাই মিডিয়ার সৃষ্টি বলে জঙ্গিদের আড়াল করার খালেদা জিয়ার চেষ্টার কিছুদিন পরই ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট দেশের ৬৪টি জেলায় একযোগে বোমা বিস্ফোরণের মাধ্যমে জেএমজেবি ও জেএমবি তাদের সরব উপস্থিতির জানান দেয়। এ ঘটনাটি জাতিকে স্তম্ভিত ও বিস্মিত করে।
সিরিজ বোমা হামলার পর আবার শুরু হয় ধারাবাহিক হামলা। তারই জের ধরে ওই বছরই ৩ অক্টোবর চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর ও চট্টগ্রামের জেলা আদালতে বিচার কাজ চলাকালে বেলা ১২টায় আবার একযোগে বোমা হামলা চালানো হয়। এজলাসে ঢুকে বিচারককে লক্ষ্য করে বোমা ছুড়ে মারা হয়। তিন জেলা আদালতে প্রতি জেলায় ৩টি করে মোট ৯টি বোমা ছোড়া হয়। এর মধ্যে ৫টি বোমা বিস্ফোরিত হয়। বাকিগুলো অবিস্ফোরিত থাকে। এর ১৫ দিন পর ১৯ অক্টোবর সিলেটের দ্রুত বিচার আদালতের বিচারক বিপ্লব গোস্বামীকে হত্যা করতে বোমা হামলা চালায় জঙ্গিরা। তিনি অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু বোমার আঘাতে মারাত্মক আহত হন। এর মাসখানেক পরেই ১৫ নভেম্বর বহুল আলোচিত ঝালকাঠি শহরের অফিসার পাড়ায় জাজেস কোয়ার্টারের সামনে বিচারকদের বহনকারী মাইক্রোবাসে শক্তিশালী বোমা দিয়ে হামলা চালানো হয়। বোমা বিস্ফোরণে ঝালকাঠি জজ আদালতের সিনিয়র সহকারী জজ সোহেল আহমেদ চৌধুরী ও জগন্নাথ পাঁড়ে নিহত হন। অল্পের জন্য রক্ষা পান আরেক বিচারক আবদুল আউয়াল। এ বছরই ৩০ নভেম্বর গাজীপুর ও চট্টগ্রাম আদালতে পৌনে এক ঘণ্টার ব্যবধানে আত্মঘাতী জঙ্গিরা গায়ে বোমা বেঁধে হামলা চালায়। এতে দুই জঙ্গিসহ ৯ জন নিহত ও শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়। ২ ডিসেম্বর গাজীপুর জেলা আদালতে আবারও চায়ের ফ্ল্যাক্সে করে বোমা হামলা চালানো হয়। এতে সাতজন নিহত ও অর্ধশত আহত হয়। জেএমবি সাড়ে চার বছরে (সেপ্টেম্বর ২০০১ থেকে ডিসেম্বর ২০০৫) দেশে ২৬টি হামলা চালায়। এসব ঘটনায় ৭৩ জন নিহত এবং প্রায় ৮০০ জন আহত হন। একই সময়কালে হরকাতুল জিহাদও (হুজি-বি) বেশ কয়েকটি নাশকতামূলক হামলা চালায়। সব মিলিয়ে তখন দেশে সৃষ্টি হয় এক ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি।
বর্তমান সময়ে ২০১৬ সালে ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি ও কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় জঙ্গিদের নারকীয় সন্ত্রাসী হামলায় দেশি-বিদেশি নিরপরাধ ২৬ জনসহ চার পুলিশ নিহত হয়েছেন। সিলেট, কুমিল্লা, ঢাকার মিরপুরে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দক্ষতার সাথে সকল ষড়যন্ত্রকে প্রতিহিত করেছে।
আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর জঙ্গি দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। জঙ্গি দমনে সারাবিশ্বে বাংলাদেশ আজ ‘রোল মডেল’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশে ধর্মান্ধতা ও জঙ্গিবাদের স্থান থাকতে পারে না। এ দেশের মানুষ সাংস্কৃতিকভাবে অসাম্প্রদায়িক এবং জঙ্গিবাদবিরোধী। মুষ্টিমেয় কতিপয় বিপথগামী ব্যক্তি আমাদের এই অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে নষ্ট করতে পারবে না। সকলের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ একটি নিরাপদ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মানজনক অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

Category:

Leave a Reply