২০১৮ : ক্রিকেটময় একটি বছর

38 2PMআরিফ সোহেল: বাংলাদেশ নতুন স্বপ্ন-সম্ভাবনার রথে চড়ে যাত্রা শুরু করেছে নতুন বছরের। এগিয়ে যাচ্ছে সমৃদ্ধ বাংলাদেশÑ সমানতালে এগিয়ে যাবে এদেশের ক্রীড়াঙ্গনও। ক্রীড়াঙ্গনে ২০১৮ সালে সাফল্য রয়েছে, রয়েছে তেমনি ব্যর্থতাও। সর্বোচ্চ প্রাপ্তি ক্রিকেটে। প্রাপ্তি মেহেদি মিরাজ। তার তিন ফরম্যাটেই প্রাণবন্ত উপস্থিতি ক্রিকেটে নতুন আলোর বার্তা এনে দিয়েছে। তরুণ টেস্টে স্পিনার নাঈম হাসান সর্বকনিষ্ঠ বোলার হিসেবে ৫ উইকেট নিয়ে বিশ্ব রেকর্ড গড়েছেন। ক্রিকেট পাগল বাঙালিরা ২০১৮ বছরটিকে গভীরভাবেই মনে রাখবে অনেক দিন। সঙ্গে মেয়েদের ফুটবল, আর শুটিংয়ের অর্জন ছিল উল্লেখ করার মতো ক্রীড়াঙ্গনের ঘটনা।
পেছন ফিরে তাকালেই ভিড় করে একঝাঁক স্মৃতির মরীচিকা। পাওয়া না পাওয়ার যোগ-বিয়োগ। আর স্মৃতির অ্যালবামে শুধু বেদনাই থাকে না, থাকে আনন্দেরও উপলক্ষ। তাই যুগপৎভাবে ফিরে ফিরে আসে আনন্দ-বেদনার কাব্যকথা। আর এই আনন্দ-বেদনার হলাহল পান করেই এগিয়ে যেতে হয় অনিশ্চিত আগামীর পথে। ক্রিকেট এবং ফুটবলে নতুন প্রজন্ম আলোর মশাল হাতে তুলে নেওয়ার নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছে।
সব মিলিয়ে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ৪৪টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচ খেলেছে। তিন ফরম্যাটে জিতেছে ২১টি ম্যাচ। বড় প্রাপ্তি খেলেছে এশিয়া কাপের ফাইনালে। ওয়ানডেতে ২০টি ম্যাচে খেলে ১৩টিতেই জয় পেয়েছে মাশরাফি বাহিনী। ব্যর্থতা ছিল টি-২০ ও টেস্ট ম্যাচে। ৮টি টেস্টের জয় এসেছে মাত্র ৩টিতে, ড্র একটি। ১৬টি টি-২০তে বাংলাদেশ জিতেছে মাত্র ৪টিতে। সর্বাধিক ওয়ানডে খেলেছে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৫টি। জিতেছে সবকটিই। এবারও সিরিজ জিতেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে গিয়ে।
শ্রীলংকার বিপক্ষেও চার ম্যাচের দুটিতে জয় পেয়েছে লাল-সবুজের বাংলাদেশ। আফগানিস্তান আর ভারতের বিপক্ষে দুটি করে ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। আফগানদের একটি ম্যাচে জিতলেও এশিয়া কাপের ফাইনাল এবং গ্রুপ পর্বে ভারতের কাছে দুটি ম্যাচই হেরেছে। পাকিস্তানের বিপক্ষে একটি ম্যাচ খেলে জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ।
২০১৮ সালে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ ৪টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। শ্রীলংকা ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে খেলেছে দুটি করে। ক্যারিবীয়ানদের বিপক্ষে দুটিতে জিতলেও দুটি হেরেছে বাংলাদেশ। শ্রীলংকার বিপক্ষে একটিতে পরাজয় আর অপরটিতে ড্র করে সাকিবরা। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দুটি ম্যাচ টেস্ট সিরিজের একটি ম্যাচে হারলেও অন্যটি জিতেছে বাংলাদেশ।
২০১৮ সালে টাইগাররা মোট ১৬টি টি-২০ খেলেছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৬টি ম্যাচ খেলেছে সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। এর মধ্যে ৩টিতে জয়, ৩টিতে হার ছিল বাংলাদেশের। শ্রীলংকার বিপক্ষে চার ম্যাচের দুটিতে জিতেছিল বাংলাদেশ। আফগানদের বিপক্ষে তিন ম্যাচের সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হয়েছিল বাংলাদেশ। যা ছিল খুবই দুঃখজনক। আর ভারতের বিপক্ষেও এশিয়ার কাপ ক্রিকেটের ফাইনালসহ ৩টি ম্যাচের সবকটিই হেরেছে বাংলাদেশ।
টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-২০ মিলিয়ে ২০১৮ সালে বাংলাদেশের হয়ে অভিষেক হয়েছে মোট ১৪ ক্রিকেটারের। তারা হলেনÑ সানজামুল ইসলাম, আবু জায়েদ রাহী, আরিফুল হক, নাজমুল ইসলাম অপু, মোহাম্মদ মিঠুন, খালেদ আহমেদ, নাঈম হাসান, সাদমান ইসলাম অনিক, আবু হায়দার রনি, নাজমুল হোসেন শান্ত, ফজলে মাহমুদ রাব্বি, আফিফ হোসেন, জাকির হাসান ও মেহেদি হাসান মিরাজ।
ক্রিকেটে নাঈমের বিশ্বরেকর্ডটি ছিল বছরের শেষ বড় প্রাপ্তি। ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম টেস্টে অভিষেকেই ৫ উইকেট নিয়েছেন বাংলাদেশের তরুণ স্পিনার নাঈম হাসান। ১৭ বছর বয়সে এই মাইলফলক অর্জন করে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে এই কীর্তি গড়ার রেকর্ড গড়েছেন তিনি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বছরের শেষ টি-২০ সিরিজে বাংলাদেশ খুঁজে পেয়েছে ‘জয়’ পাওয়ার ক্লু। যা স্বপ্নের পাথেয় হয়ে স্পট লাইটে চলে আসতে পারে।
অন্যদিকে নারী ক্রিকেট দলের এই বছর সাফল্য মাত্র একটি। জুনে মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত ছয় জাতির এশিয়া কাপে ছয়বারের চ্যাম্পিয়ন ভারতকে ফাইনালে ৩ উইকেটে হারিয়ে নতুন রেকর্ড গড়েছিল রুমানা-জাহানারারা। তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজে অনুষ্ঠিত আইসিসি টি-২০ নারী বিশ্বকাপের ক্যাম্পেইনটা ভালো কাটেনি বাংলাদেশের। এ বছর ২৪টি টি-২০ খেলে ১২টিতে জয় পেয়েছে নারী ক্রিকেট দল।
২০১৮ সালে পুরুষ ফুটবল দল আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছে ৮টি। জিতেছে ৩টি, হেরেছে ৪টি, ড্র করেছে একটি। বছরের শুরুতে ফিফা র‌্যাংকিং ছিল ১৯৭, আর শেষ করে ১৯২-এ অবস্থান করে। বছরের শেষ দিকে বাংলাদেশ জাতীয় দল অংশ দেয় সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ও বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ। প্রমীলা ফুটবল দল বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতায় স্থান পোক্ত করে নিয়েছে। তবে সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ চ্যাম্পিয়নশিপে ফাইনালে ভারতের কাছে ১-০ গোলে হেরে শিরোপা হাতছাড়া হয়েছে বাংলাদেশের। সেপ্টেম্বরে ঢাকায় অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপের বাছাইয়ে বাংলাদেশ অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়। অক্টোবরে ভুটানেও সাফল্য আসে, সাফ অনূর্ধ্ব-১৮ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের মেয়েরা ফাইনালে ১-০ গোলে হারায় নেপালকে। বছরের শেষ দিকে মেয়েরা অংশ নেয় মিয়ানমারে অনুষ্ঠিত টোকিও অলিম্পিক গেমস বাছাইপর্বে। তবে প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। চার দলের গ্রুপে তাদের সংগ্রহ মাত্র ১ পয়েন্ট।
এশিয়ান গেমস ফুটবলে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দল প্রথম ম্যাচে হেরে বসেছিল উজবেকিস্তানের বিপক্ষে। পরের ম্যাচে শক্তিশালী থাইল্যান্ডকে রুখে দেয় ১-১ গোলে। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে বিশ্বকাপের আয়োজক কাতারকে হারিয়ে দেয় ১-০ গোলে। যা বাংলাদেশের ফুটবলে এ বছরের অন্যতম এক প্রাপ্তি। শেষ ষোলোয় বিশ্বকাপ খেলা শক্তিশালী উত্তর কোরিয়ার জালে ম্যাচ হারলেও দিয়েছিল ১ গোল।
গত বছর হকিতে সব থেকে বড় সাফল্য পায় বাংলাদেশ। এশিয়ান গেমসের গেল আসরে ষষ্ঠ স্থান অধিকার করে জিমি-চয়নরা। আগামী এশিয়ান গেমস হকিতে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছে বাংলাদেশ। তবে নারী হকিতে নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছে ২০১৮ সালে। নতুন করে যাত্রা শুরু হয় বাংলাদেশ নারী হকি দলের। ফেলে আসা বছরে আন্তর্জাতিক সিরিজে অংশগ্রহণ করে কলকাতা অ্যাথলেটিক ওয়ারিওর্সের বিপক্ষে তিন ম্যাচের দুটিতে জয় পায় বাংলাদেশের প্রমীলা হকি দল।
এ বছর সব থেকে বড় ব্যর্থতা এশিয়ান গেমসে। ১৪ ডিসিপ্লিনে ১১৭ ক্রীড়াবিদ অংশ নিলেও পদকশূন্য থেকেই ইন্দোনেশিয়া থেকে দেশের ফিরে বাংলাদেশ। দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েও গত বছর খুব একটা সাফল্যের ছাপ রাখতে পারেনি বাংলাদেশ। পুরুষ ক্রিকেট দল, বাংলাদেশের বয়সভিত্তিক নারী ফুটবল দলের সাফল্য ছাড়া উল্লেখযোগ অর্জন শুধু শুটিংয়েই।
এছাড়াও বাংলাদেশে সরকার অনুমোদিত যেসব খেলা হয়, তার মধ্যেÑ ভারোত্তোলন, হ্যান্ডবল, কারাতে, তায়কোয়ান্দো, ভলিবল, কুস্তি, ব্যাডমিন্টন, টেনিস, টেবিল টেনিস, বাস্কেটবল, জিমন্যাস্টিকস, খো খো, শরীর গঠন, ক্যারম, স্কোয়াশ, বিলিয়ার্ড অ্যান্ড স্নুকার, মার্শাল আর্ট, সাইক্লিং, ব্রিজ, রোলার স্কেটিং। এসব খেলার মধ্যে কোনো কোনো খেলা দীর্ঘদিন চর্চা হলেও আন্তর্জাতিক সাফল্য নেই। আবার কোনো খেলা থেকে সাফ গেমসে ছিটেফোঁটা পদক পাওয়া গেছে।
শুটিংয়ে এশিয়ান গেমসে কিছু দিতে পারেনি। তবে গোল্ড কোস্ট কমনওয়েলথ গেমসে দুটি রুপা এনে দিয়েছে শুটিং। দুটিতেই অবদান ছিল আবদুল্লাহ হেল বাকির। ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে ব্যক্তিগত ইভেন্টে অল্পের জন্য স্বর্ণ হাতছাড়া হয়েছে দেশসেরা এই শুটারের। দলগত ইভেন্টেও শাকিল আহমেদের সঙ্গে রৌপ্য জিতেছেন বাকি।
ক্রীড়াবান্ধব আওয়ামী লীগ সরকার যখনই ক্ষমতায়, তখনই এ দেশের ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়ন-অগ্রগতি-সমৃদ্ধি রচিত হয়েছে। অর্জিত হয়েছে সাড়া জাগানিয়া সাফল্য। ক্রিকেট-ফুটবল-হকি-শুটিং-ভারোত্তোলন-আরচারি-সাঁতার-ভলিবলের আন্তর্জাতিক আসর থেকে লেগেছে বাঙালি জাতির মাথায় গৌরবের পালক। জাতির পিতার মতো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও খেলা-পাগল। সময়-সুযোগ পেলেই ছুটে যান স্টেডিয়ামে। অনুপ্রাণিত করেন খেলোয়াড়দের। শেখ হাসিনা দেশ গঠনের রূপকল্প-২০২১ ও রূপকল্প-২০৪১-এ ক্রীড়াঙ্গনকে আলাদা মর্যাদার জায়গায় রেখেছেন।
সাফল্য ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে ক্রীড়াঙ্গনের একটি বছর শেষ হয়েছে বাংলাদেশের। যেখানে সহজ-সরল প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির হিসাব মেলাতে গেলেও অঙ্কের হিসাব মিলতে চায় না। থাকে একটা আশা-নিরাশার দোলাচল। শুরু হওয়া নতুন বছর তার ব্যতিক্রম হবে তা ভাবার অবকাশ নেই। তবে ২০১৯ সাল সাফল্যের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠুক ক্রীড়াঙ্গনÑ আসুন সেই স্বপ্নে বুক বাঁধি।

Category:

Leave a Reply