৯ জনের ফাঁসি, ২৫ জনের যাবজ্জীবন

Posted on by 0 comment

উত্তরণ প্রতিবেদন: পাবনার ঈশ্বরদীতে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী ট্রেনে গুলিবর্ষণের বহুল আলোচিত মামলার রায়ে ৯ জনকে মৃত্যুদ-ের আদেশ দিয়েছেন আদালত। একইসঙ্গে এ মামলায় ২৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদ- ও ৩ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে প্রত্যেককে আরও দুই বছর সশ্রম কারাদ- এবং ১৩ জনকে ১০ বছর করে কারাদ- ও ১ লাখ টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছর করে সশ্রম কারাদ-াদেশ দেওয়া হয়েছে। গত ৩ জুলাই দুপুর ১২টার দিকে পাবনার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক রুস্তম আলী এ আদেশ দেন। এ সময় মোট ৫২ আসামির মধ্যে ৩৩ জন কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। পাঁচজন আসামি মারা গেছেন। বাকিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। ঘটনার প্রায় ২৫ বছর পর এ রায় দেওয়া হলো।
মৃত্যুদ-প্রাপ্তরা হলেন : জেলার ঈশ্বরদী পৌরসভার সাবেক মেয়র ও পৌর বিএনপির সভাপতি মোখলেছুর রহমান বাবলু, পাবনা জেলা বিএনপির মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক একেএম আকতারুজ্জামান, পৌর বিএনপির সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টু, পৌর যুবদলের সভাপতি মোস্তফা নুরে আলম শ্যামল, বিএনপি নেতা মাহবুবুর রহমান পলাশ, শামসুল আলম, শহিদুল ইসলাম অটল, রেজাউল করিম শাহীন ও আজিজুর রহমান শাহীন। এর মধ্যে আটজন কারাগারে আছেন। জাকারিয়া পিন্টু পলাতক।
যাবজ্জীবনপ্রাপ্তরা হলেন : আমিনুল ইসলাম (পলাতক), আজাদ হোসেন ওরফে খোকন, ইসমাইল হোসেন জুয়েল, আলাউদ্দিন বিশ্বাস, শামসুর রহমান শিমু, আনিসুর রহমান সেকম (পলাতক), আক্কেল আলী, মো. রবি (পলাতক), মো. এনাম, আবুল কাশেম হালট (পলাতক), কালা বাবু (পলাতক), মামুন (পলাতক), মামুন (পলাতক), সেলিম, কল্লোল, তুহিন, শাহ আলম লিটন, আব্দুল্লাহ আল মামুন রিপন, লাইজু (পলাতক), আব্দুল জব্বার, পলাশ, হাকিম উদ্দিন টেনু, আলমগীর, আবুল কালাম (পলাতক) ও একেএম ফিরোজুল ইসলাম পায়েল।
এছাড়া ১০ বছর করে সাজা প্রদান করা হয়েছে ঈশ্বরদী উপজেলার সাহাপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নেফাউর রহমান রাজু, ঈশ্বরদী পৌরসভার কাউন্সিলর আনোয়ার হোসেন জনি, বিএনপি নেতা রন রিয়াজী (পলাতক), আজমল হোসেন ডাবলু, মুক্তার হোসেন, হাফিজুর রহমান ওরফে মুকুল, হুমায়ুন কবির দুলাল, তুহিন বিন সিদ্দিকী, ফজলুর রহমান, চাঁদ আলী (পলাতক), এনামূল কবির, জামরুল (পলাতক) ও বরকতকে।
মামলার সরকার পক্ষের আইনজীবী (পিপি) আকতারুজ্জামান মুক্তা বলেন, ১৯৯৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা খুলনা থেকে সৈয়দপুর যাবার সময় ঈশ্বরদী স্টেশনে যাত্রাবিরতি করলে দুর্বৃত্তরা ট্রেনে তার কামরা লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করে। এ ঘটনায় ওই সময়ে জিআরপি পুলিশের ওসি নজরুল ইসলাম বাদী হয়ে সাতজনের নামে একটি মামলা করেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর মামলাটি পুনঃতদন্ত করে ঈশ্বরদীর শীর্ষস্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীসহ ৫২ জনকে এ মামলায় আসামি করা হয়। মামলাটি দায়ের হওয়ার পরের বছরে এ মামলায় পুলিশ কোনো সাক্ষী না পেয়ে আদালতে চূড়ান্ত রিপোর্ট দাখিল করেছিল। কিন্তু আদালত ঐ রিপোর্ট গ্রহণ না করে অধিকতর তদন্তের জন্য মামলাটি সিআইডিতে স্থানান্তর করে। পরে সিআইডি তদন্ত করে ১৯৯৭ সালের ৩ এপ্রিল আদালতে চার্জশিট দাখিল করে।
এ মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামিদের মধ্যে গত ৩০ জুন বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের ৩০ জন নেতাকর্মী আদালতে হাজির হলে বিচারক তাদের জামিন নামঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠান। গত ২ জুলাই এ মামলার আরও দুই আসামি ঈশ্বরদী পৌরসভার সাবেক মেয়র মোখলেছুর রহমান ওরফে বাবলু এবং বিএনপি নেতা আব্দুল হাকিম টেনু আদালতে আত্মসমর্পণ করে। অন্যদিকে পুলিশ ওইদিন রাতেই এ মামলার আরেক আসামিকে গ্রেফতার করে। এ মামলায় এ পর্যন্ত ৩৩ জন আসামি জেলহাজতে রয়েছেন। পলাতক রয়েছেন ১৪ জন এবং মারা গেছে পাঁচজন। এ মামলায় আদালতে ১ জুলাই রাষ্ট্রপক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন পাবনার পিপি অ্যাডভোকেট আক্তারুজ্জামান মুক্তা ও অ্যাডভোকেট গোলাম হাসনাইন। আসামি পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম গেদা ও অ্যাডভোকেট সনৎ কুমার সরকার। পলাতক আসামিদের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট একেএম শামসুল হুদা।
পিপি অ্যাডভোকেট আক্তারুজ্জামান মুক্তা বলেন, রায় ঘোষণার পর বিচারক আদালতে উপস্থিত আসামিদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন এবং যারা পলাতক রয়েছেন, তাদের গ্রেফতারের পর থেকে রায়ের কার্যকারিতা শুরু হবে বলে রায়ে উল্লেখ করেন। আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাসুদ খন্দকার বলেন, এ রায়ে সন্তুষ্ট নন তারা। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত রায় দেওয়া হয়েছে। উচ্চ আদালতে আপিল করার কথা জানান তিনি।
এ বিষয়ে পাবনা জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান তোতা বলেন, রায় নিয়ে আমাদের কোনো মন্তব্য নেই। কোনো কর্মসূচিও নেই। তবে আইনি প্রক্রিয়ায় মামলা মোকাবিলা করা হবে।
আনন্দ মিছিল : এদিকে রায় ঘোষণার খবরে স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ ঈশ্বরদী শহরে পৃথক দুটি আনন্দ মিছিল বের করে। চাঞ্চল্যকর এ মামলার অন্যতম সাক্ষী সাবেক ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ এমপি তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, দীর্ঘদিন পরে হলেও এ রায় প্রমাণ করে যে দেশে এখন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
ঈশ্বরদী পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র আবুল কালাম আজাদ মিন্টু রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, এ রায় যথার্থ। এতে সাধারণ মানুষের বিচার বিভাগের ওপর আস্থা ফিরে আসবে।

Category:

Leave a Reply