Blog Archives

যুদ্ধের খেলা

Posted on by 0 comment

3-4-2018 8-12-42 PMইমরুল ইউসুফঃ স্যার, আমাদের স্কুল কবে খুলবে? আমার এই কথা শুনে স্যার চোখ থেকে চশমাটা খুললেন। তারপর লম্বা একটা শ্বাস ছাড়লেন। বললেন, সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এই অবস্থায় স্কুল চালানো যায় না। কবে স্কুল খুলবে তাও জানি না। কারণ এখন পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার সময়। যার কাছে যা আছে তাই নিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার সময়। যুদ্ধ কী স্যার? বলল, মনি। যুদ্ধ মানে সংগ্রাম, লড়াই। শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই। এ লড়াইয়ে জেতা মোটেও সহজ নয়। এটা একটা খেলা। বুদ্ধি করে যে ভালো খেলবে সেই জিতবে। শোনো, এ সময় তোমরা খুব সাবধানে থাকবে। দরকার ছাড়া বাইরে যাবে না। এই কথা বলে স্যার বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করলেন।
স্যার চলে যাওয়ার পর আমি সুরুজ ও মনি স্কুলের মাঠে এসে বসলাম। ভাবতে লাগলাম কী করা যায়। এমন সময় সুুরুজ বলল, আমরাও তো যুদ্ধে যেতে পারি।
মনি বলল, না ভাই আমার মা কিছুতেই যেতে দেবে না। আর আমরা তো বন্দুক চালাতে জানি না। বোমা ছুড়তে জানি না। কীভাবে শত্রুর মোকাবিলা করতে হয় তাও জানি না। আমরা কীভবে যুদ্ধ করব?
মনির এই কথা শুনে আমার হেড স্যারের কথা মনে পড়ল। বললাম, স্যারের কথা শুনিস নি। যুদ্ধ একটা খেলা। বুদ্ধি করে এই খেলা খেলতে হয়। এই খেলা যে ভালো খেলবে সে-ই জিতবে। সুরুজ, মনি শোন। কোনো অস্ত্র ছাড়াই আমরা যুদ্ধ করব। স্কুল খোলার জন্য যুদ্ধ করব। যুদ্ধ করব রাস্তাঘাটে শান্তিতে চলার জন্য। দেশ বাঁচানোর জন্য।
সুরুজের বড় ভাই মারা গেছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গুলিতে সুমন শহিদ হয়েছে। অনেক কষ্ট করেও মুক্তিযোদ্ধারা তাকে বাঁচাতে পারেনি। খবরটা এলো এই মাত্র। খবর শুনে সুরুজ কাঁদতে লাগল। আমরা তাকে কাঁদতে নিষেধ করলাম। বললাম, সুরুজ বাড়ি চল।
আগুন আগুন। মনিদের বাড়িতে আগুন লেগেছে। এমন চিৎকার শুনে কাটাখালী গ্রামের মানুষ জেগে উঠল। অন্ধকার গ্রাম আগুনের শিখায় আলোকিত হয়ে উঠল। আগুন দেখে বাইরে বের হতে চাইলাম। কিন্তু মা বের হতে দিলেন না।
বললেন, খবরদার বাইরে বের হবি না। এমন সময় আমার বাবা ঘরে ঢুকলেন। বললেন, খান সেনারা মনিদের বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। মনির বাবাকে ধরে নিয়ে গেছে। ওদের এখন খুব বিপদ।
মনিদের বিপদ। কথাটা শুনেই আমার বুক কেঁপে উঠল। বন্ধুকে সাহায্য করার জন্য ছটফট করতে লাগল। কিন্তু কথাটা বাবকে বলতে সাহস হলো না। অবশেষে বাবাই কথাটা বললেন। ‘এই রাতে ওরা কোথায় যাবে। যাই ওদের আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসি।’
কথাটা শুনে আমার খুব ভালো লাগল। কিছু সময়ের মধ্যে মনি ও তার স্বজনরা আমাদের বাড়িতে এলো। কিন্তু তাদের ভয় কাটল না। গ্রামে পাকহানাদার বাহিনী ঢুকে পড়েছে। এই খবর মুহূর্তেই আশপাশের গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ে। ভয়ে অনেকে গ্রাম ছেড়ে পালাতে থাকে। কিন্তু মুক্তিসেনারা পালায় না। আমরা পালাই না। কীভাবে খান সেনাদের ঘায়েল করা যায় সে কথাই ভাবতে থাকি।
হঠাৎ আমার মাথায় একটি বুদ্ধি আসে। মনিকে সুরুজদের বাড়িতে পাঠাই। সুরুজকে স্কুলের মাঠে আসতে বলি। আমরা তিনজন যখন এক জায়গায় হই তখন দুপুর। রাস্তায় একজনও মানুষ নেই। স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের হই-চই নেই। স্কুলটি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। বড় বড় গাছগুলো চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।
আর চুপ করে না থেকে আমরা কথা বলা শুরু করলাম। পাকসেনাদের দেখা মাত্রই আমরা কী করব তা আলোচনা করে ঠিক করলাম। এজন্য দরকারি জিনিস কীভাবে জোগাড় করব সেও ঠিক করে ফেললাম। সিদ্ধান্ত নিলাম দরকারি জিনিসগুলো সবসময় আমাদের কাছে থাকবে। কারণ যে কোনো সময় পাকসেনারা আমাদের গ্রামেও ঢুকতে পারে।
একদিন হাঁটতে হাঁটতে আমরা বাড়িতে ফিরছি। এমন সময় আমরা দুজন পাকসেনা দেখতে পেলাম। তাদের যে এত তাড়াতাড়ি পেয়ে যাব, আমরা ভাবতেই পারিনি। দেখলাম তারা আমাদের দিকে গট গট করে এগিয়ে আসছে। পায়ে বুট জুতা। গায়ে খাকি রঙের পোশাক। হাতে বন্দুক। মুখে মোটা গোঁফ। চোখ দুটি গোলগোল। মাথায় হেলমেট। এর ঠিক পেছনেই একজন রাজাকার। গায়ে লম্বা জামা। মাথায় টুপি। মুখে দাড়ি। মায়ের বলা গল্পের সঙ্গে তাদের চেহারার হুবহু মিল।
‘হাঁ করে কী দেখছিস? ওরা তো এসে গেল’। মনি বলল। আমি বললাম, মনি সুরুজ তোরা ঝোপের মধ্যে ঢুকে পড়। সময়মতো সব কাজ করবি। দেখিস ভুল হয় না যেন।
দুই পাকসেনা আমার কাছাকাছি আসতেই আমি উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লাম মাটিতে। মুখ দিয়ে গোঙানির মতো শব্দ করতে লাগলাম। আমার খুব পেট ব্যথা করছে, এমন ভান করতে লাগলাম। ‘আমার পেটের নিচে কিছু দিন। আমার পেটের নিচে কিছু দিন।’ এই কথা বলতে লাগলাম।
আমার ছটফটানি দেখে পাকসেনারা দৌড়ে আমার কাছে এলো। মুখ নিচু করে আমাকে দেখতে লাগল।
‘এ লেড়কা তুমকো কেয়া হুয়া’ একজন সেনা বলল। আমি এই কথা শুনে আরও জোরে গোঙাতে লাগলাম। আমি এমন ভাব করতে লাগলাম যে, আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। আমার কষ্ট দেখে ওদের একটু মায়া হলো। আমার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। হঠাৎ ঝোপের আড়াল থেকে মনি ও সুরুজ বের হয়ে এলো। পকেট থেকে তামাক পোড়ার গুঁড়া বের করল। তারপর দুই পাকসেনার চোখে মুখে ছুঁড়ে মারল। তামাকের গন্ধে দুই পাকসেনা কাশতে লাগল। হাঁচি দিতে লাগল। এমন সময় মনি ও সুরুজ আবার তামাক পোড়া ছুড়ল। তামাকের গন্ধে তারা দুজন ঝটপট করে উঠে দাঁড়াল। এ কয়ো হো গেয়া, এ কয়ো হো গেয়া। বদমাস ছোকড়াকা এ মুঝছে কেয়া কর দিয়া।’ এই কথা বলতে বলতে তারা আরও বেশি হাঁচি দিতে লাগল। তামাকের গন্ধে ছটফট করতে করতে তারা তাদের কাঁধ থেকে রাইফেল ফেলে দিল। তারপর চোখ মুখ ডলতে ডলতে পুকুরে ঝাঁপ দিল।
তাদের এমন কা- দেখে আশপাশ থেকে লোকজন ছুটে এলো। পুকুর পাড়ে দুই পাকসেনাকে ঘিরে ধরল। দুই শয়তানকে আজ আমরা কিছুতেই ছাড়ব না। এ কথা বলতে লাগল। কেউ কেউ আবার আনন্দ করতে লাগল মনি, সুরুজ ও আমাকে নিয়ে।
এমন সময় আমাদের স্কুলের হেড স্যার এলেন। রাইফেল দুটি হাতে তুলে নিলেন। আমাদের তিনজনকে কাছে ডাকলেন। ‘তো কি এমন করেছিস যে ওরা রাইফেল ফেলে পানিতে গিয়ে পড়ল?’ বললেন স্যার।
‘চোখে মুখে তামাক পোড়ার গুঁড়া দিয়েছি স্যার’ মনি বলল। ‘এত তামাক পোড়া তোরা কোথায় পেলি?’ স্যার বললেন। আমি বললাম, চুরি করেছি। আমরা সুরুজের দাদা-দাদির আর মনির নানার পান খাওয়ার তামাক চুরি করেছি। তারপর ওই তামাক শয়তান দুটির মুখে ছুঁড়ে মেরছি। আজ আমরা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা করেছি স্যার। এ যুদ্ধে আমরা জিতেছি স্যার।
এই কথা শুনে স্যার আমার মাথায় হাত রাখলেন। বললেন, তোরা আজ যে কাজ করেছিস তাতে দেশ শত্রুমুক্ত হবেই।

লেখক : সহ-পরিচালক, বাংলা একাডেমি

Category:

বঙ্গবন্ধুর কারাগারের রোজনামচা

Posted on by 0 comment

3-4-2018 8-11-00 PMমুনতাসীর মামুনঃ ‘আমি যে পথ বেছে নিয়েছি তা কষ্টের পথ’, লিখেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জুলাই ১৯৬৬ সালে। এর এক বিন্দু মিথ্যা নয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে, পাকিস্তান ঔপনিবেশিক আমলে স্বদেশী বিপ্লবীরা এবং কমিউনিস্ট পার্টির নেতা-কর্মীরা ছাড়া, সজ্ঞানে রাজনীতি বা আদর্শের এত কষ্টের পথ আর কেউ বেছে নেননি, ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু ৯ বার বিভিন্ন মেয়াদে গ্রেফতার হয়েছেন। এই কষ্ট, ক্ষোভ আর স্বপ্ন এবং আশাবাদের কথা লিখে গেছেন তিনি। আজ ৫০ বছর পর তার অজানা সেসব ভাষ্য প্রকাশিত হলো গ্রন্থাকারে, নাম ‘কারাগারের রোজনামচা’। এর আগে প্রকাশিত হয়েছিল ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’। সেই আত্মজীবনীর পরিপূরক ‘কারাগারের রোজনামচা’। তিনি যদি বেঁচে থাকতেন এবং সময় পেতেন তাহলে সুস্থির হয়ে হয়তো এসব মিলিয়ে লিখতেন এবং তা এক অনবদ্য গ্রন্থে পরিণত হতো এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো কারণ নেই।
কীভাবে বঙ্গবন্ধুর পা-ুলিপিগুলো পাওয়া যাচ্ছে তার বিবরণ দিয়েছেন তার কন্যা শেখ হাসিনা বইটির ভূমিকায়।
বঙ্গবন্ধু যখন কারাগারে গেছেন তখন লিখেছেন এবং তার স্ত্রী ফজিলাতুননেসা লেখার ব্যাপারে তাকে প্রণোদনা জুগিয়েছেন। পা-ুলিপিগুলো তিনিই আগলে রাখতেন। ১৯৭১ সালে যখন পুত্র-কন্যাসহ বেগম মুজিব বন্দী তখন শেখ হাসিনার একবার ৩২ নম্বরে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। পাকিস্তানি সৈন্যরাই নিয়ে গিয়েছিল, যাতে প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র নিতে পারেন। হাসিনাকে তার মা বললেন, ‘একবার যেতে পারলে আর কিছু না হোক তোর আব্বার লেখা খাতাগুলো যেভাবে পারিস নিয়ে আসিস।’ খাতাগুলো মায়ের ঘরে কোথায় রাখা আছে তাও বললেন। খাতাগুলো শেখ হাসিনা নিয়ে আসতে পেরেছিলেন। তারপর যেভাবেই হোক তিনি তা পাঠিয়েছিলেন তার ফুফাতো বোনের কাছে। ‘আমার ফুফাতো বোন’ লিখেছেন শেখ হাসিনা, ‘পলিথিন ও ছালার চট দিয়ে খাতাগুলো বেঁধে তার মুরগির ঘরের ভেতরে চালের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বেঁধে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন।’
তারপর ১৯৭৫। সেই সময়ও খাতাগুলো হারিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু রক্ষা পেয়েছিল। সেইসব পা-ুলিপিই এখন প্রকাশিত হচ্ছে।
বর্তমান গ্রন্থে তিনটি পা-ুলিপি স্থান পেয়েছে। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬০ পর্যন্ত যখন বঙ্গবন্ধু জেলে, তখন জেল জীবন নিয়ে লিখেছিলেন। দুটি খাতায় লেখা ছিল যা গোয়েন্দা দফতর নিয়ে নেয়। ২০১৪ সালে গোয়েন্দা দফতর থেকে একটি খাতা খুঁজে পাওয়া যায়। বঙ্গবন্ধু নিজে এর নাম দিয়েছিলেনÑ ‘থালা বাটি কম্বল/জেলখানার সম্বল’। বর্তমান গ্রন্থে এই নামেই তা গ্রন্থিত হয়েছে। শেখ হাসিনা লিখেছেনÑ ‘এই লেখার মধ্যদিয়ে কারাগারের রোজনামচা পড়ার সময় জেলখানা সম্পর্কে পাঠকের একটা ধারণা হবে। তার এই লেখা থেকে জেলের জীবনযাপন এবং কয়েদিদের অনেক অজানা কথা, অপরাধীদের কথা, কেন তারা এই অপরাধ জগতে পা দিয়েছিল সেসব কথা জানা যাবে।’
প্রথম পা-ুলিপিতে বিভিন্ন জেলে জীবনযাপন, অভিজ্ঞতা, কিছু কিছু বিষয়ে পর্যবেক্ষণও স্থান পেয়েছে, বিশেষ করে জেল জীবনের নিঃসঙ্গতা। এই নিঃসঙ্গতার বিষয়টিই পরবর্তীকালে যখন (১৯৬৬) জেলে বসে রোজনামচা লিখেছেন তখনও বারবার এসেছে। এর একটি কারণ বোধহয় এই যে, ছেলেবেলা থেকে বঙ্গবন্ধু মানুষের ভিড়ে জীবন কাটিয়েছেন। নেতা হওয়ার পরও তৃণমূল পর্যায়ে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তাই জেলে মিলিটারি কনফাইনমেন্টে থাকলে হঠাৎ খুব নিঃসঙ্গ মনে হয়। আর তার মন ছিল সংবেদনশীল। তাই জেল কর্মচারীদের আচরণ তার নিষ্ঠুর মনে হতো। ১৯৬৬ সালের রোজনামচায়ও বারবার জেলের কর্মচারীদের নিষ্ঠুরতার কথা এসেছে। আবার এও লিখেছেনÑ এরা হুকুমের চাকর। কিন্তু মনে প্রশ্ন জেগেছে, হুকুমের চাকর হলেও কি নিষ্ঠুরতা দেখাতে হবে?
জেলে, আধঘণ্টা বা তারও কম সময়ের জন্য দেখা করতে দেয়া হয় বাইরের লোকজনের সঙ্গে। ১৯৬৬ সালে যে অবস্থা ছিল এখনো সেই অবস্থা এবং সামনে আইবির একজন লোক বসে থাকে। আধুনিক ব্যবস্থায় কিন্তু এটা নেই। বঙ্গবন্ধু এই কম সময় ও আইবির উপস্থিতি নিয়ে সুন্দর পর্যবেক্ষণ করেছেনÑ ‘মাত্র ২০ মিনিট সময় দেয়া হয়। এর মধ্যে যাবতীয় আলাপ করতে হবে। কথা আরম্ভ করতেই ২০ মিনিট কেটে যায়। নিষ্ঠুর কর্মচারীরা বোঝে না যে স্ত্রীর সঙ্গে দেখা হলে আর কিছু না হোক একটু চুমু দিতে অনেকেরই ইচ্ছা হয়। কিন্তু উপায় কি? আমার তো পশ্চিমা সভ্যতায় মানুষ হই নাই। তারা তো চুমুটাকে দোষণীয় মনে করে না। স্ত্রীর সঙ্গে স্বামীর অনেক কথা থাকে কিন্তু বলার উপায় নেই। আমার মাঝে মাঝে মনে হতো স্ত্রীকে নিষেধ করে দেই যাতে আর না আসে। (পৃ. ৪০)
আরেকটি পর্যবেক্ষণের কথা উল্লেখ করতে চাই। সেটি হলো ধর্ম ও ধর্ম ব্যবসায়ীদের নিয়ে। এই ছোট পা-ুলিপিতেও ধর্ম ব্যবসায়ীদের কথা এসেছে। ১৯৬৬ সালের রোজনামচায়ও তা এসেছে এবং এক্ষেত্রে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল খুবই স্বচ্ছ।
তিনি যখন ফরিদপুর জেলে তখন এক মওলানাকে জেলে নিয়ে আসা হলো। তিনি মসজিদে ১২-১৩ বছরের ছাত্রীকে ধর্ষণ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার দেখা। এরপর বঙ্গবন্ধুর বয়ানেÑ ‘জিজ্ঞাসা করলাম, এমন কাজটা করলেন ছাত্রীর সঙ্গে, তাও আল্লাহর ঘর মসজিদের ভেতর। তিনি বললেন, মিথ্যা মামলা। এ কাজ আমি কোনোদিন করতে পারি? তবে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে বেশি কথা বলে ধরা পড়ে গিয়েছিলেন আমাদের কাছে। অনেক মওলানা সাহেব মুরিদানদের বাড়িতে বেশি মুরগির গোশত খান। তাই শক্তিও বেশি। এ জন্য এক বিবাহতে হয় না। তিনটা চারটা বিবাহ করেন। এটা এদের অনেকের পক্ষে স্বাভাবিক। কারণ, কাজকর্ম করতে হয় না, ভিক্ষার টাকাতেই সংসার করেন, তাই তাকত বেশি। আবার অনেক মওলানা মৌলভি সাহেবরা আছেন যারা কাজ করেন, পরের জন্য দেয়া অর্থকড়ি নেন না। আর বিবাহও একটা করেন। কারণ তাদের মন পবিত্র।’
এই পর্যবেক্ষণের আপাত ক্রোধ বা ক্ষোভ প্রকাশিত হয়নি। সাধারণ একটি পর্যবেক্ষণ। কিন্তু শেষের বাক্যটি পড়–নÑ ‘কারণ তাদের মন পবিত্র’। এই একটি বাক্যই বলে দিয়েছে মওলানা হলেই সৎ হয় না। এদের মধ্যে আছে প্রচুর দুর্বৃত্ত ও ভ-। এই স্বচ্ছতার কারণে, পরবর্তীকালে ধর্ম ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে তিনি ব্যবস্থা নিতে পেরেছিলেন যেটি তার উত্তরসূরিরা বা পরবর্তীকালের রাজনীতিবিদরা পারেন নি।
দ্বিতীয় খাতাটি ৩২ নম্বরেই ছিল যেটি শেখ হাসিনা পেয়েছিলেন ভাগ্য বশে। বোঝা যায়, খাতায় তারিখ বসিয়ে তিনি রোজনামচা লিখে গেছেন। ২ জুন ১৯৬৬ সাল থেকে লেখা শুরু। তিনি ধরা পড়েছিলেন ৮ মে। মে মাসে কি তাহলে তিনি কিছু লেখেন নি? এর উত্তর পাওয়া যাবে না। এই খাতার (পা-ুলিপি) শেষ অন্তর্ভুক্তি ২২ জুন ১৯৬৭। বর্ণাঢ্য এক বছরের বৃত্তান্ত আছে এখানে।
এর পরের খাতাটিতে তিনি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিবরণ দিয়েছেন। এই মামলা শুরু হলে তাকে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। বেগম মুজিব তখন তাকে ৩২০ পৃষ্ঠার একটি খাতা পাঠিয়েছিলেন। এর ৫২ পাতা তিনি লিখেছেন এবং ওইটুকুই তিনি বেগম মুজিবকে হস্তান্তর করেন। সে অর্থে ‘এটা তার লেখা শেষ খাতা।’
এই তিনটি পা-ুলিপি নিয়ে বাংলা একাডেমি প্রকাশ করল ‘কারাগারের রোজনামচা’। বাংলা একাডেমি থেকে এত সুমুদ্রিত গ্রন্থ খুব কমই প্রকাশিত হয়েছে। প্রচ্ছদ ও গ্রন্থ নকশা : তারিক সুজাত। রয়েল সাইজের ৩৩২ পৃষ্ঠার বইয়ের দাম মাত্র ৪০০ টাকা। পা-ুলিপি সম্পাদনায় অনেকেই শেখ হাসিনাকে সহায়তা করেছেন। তারা হলেনÑ এনায়েতুর রহমান, সালাহউদ্দিন আহমেদ, শামসুল হুদা হারুন, বেবী মওদুদ ও শামসুজ্জামান খান। এখন বেঁচে আছেন শুধু শামসুজ্জামান খান। দীর্ঘদিন ধরে এই প্রকল্প চলছে। এত দিনক্ষেপণ না করলেই আমরা লাভবান হতাম। এই তিনটি পা-ুলিপি একত্রে প্রকাশিত হলো ‘কারাগারের রোজনামচা’ নামে। এ নামকরণ শেখ রেহানার।
‘কারাগারের রোজনামচা’র দ্বিতীয় ভাগ বা দ্বিতীয় খ-ের আলাদা কোনো শিরোনাম সম্পাদক দেননি। প্রথম ভাগের সম্প্রসারণ হিসেবেই পা-ুলিপি গ্রন্থিত হয়েছে। এখানে ১৯৬৬ সালে কারাবাসের বিবরণ আছে। এখানে প্রায় প্রতিদিন কারাগারের জীবন, তার বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন। যদিও কোথাও তিনি উল্লেখ করেন নি, রোজনামচাটি তিনি নিয়মিত লিখছেন। এ বিবরণে আছে, তার নিঃসঙ্গতার কথা, তার বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তানের প্রতি আকুলতা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে চলমান ঘটনাবলি সম্পর্কে মন্তব্য এবং আশ্চর্য যে, শেষোক্ত ক্ষেত্রে তার পর্যবেক্ষণ, পরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। এতে স্পষ্ট যে, শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্পর্কেও তার সম্যক ধারণা ছিল। এবং শুধু তত্ত্বেও নয়, তত্ত্বের সঙ্গে বাস্তবতাকেও তিনি গণনার মধ্যে নিয়েছিলেন।
ধরা যাক, ন্যাপ ও তার নেতাদের সম্পর্কে। সম্প্রতি কাজী জাফরের আত্মজীবনীও প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে তিনি ন্যাপ গঠন ও নেতাদের সম্পর্কে যা লিখেছেন তাতে আওয়ামী লীগকে হেয়করণের বিষয়টি যেমন আছে, তেমনি আছে ন্যাপ নেতাদের প্রশংসা। সেটি স্বাভাবিক। অনেকে বলতে পারেন, বঙ্গবন্ধু যখন লিখছেন ন্যাপ ও ন্যাপ নেতাদের সম্পর্কে সেটিও তো একই রকম। না, পার্থক্য আছে। তিনি যাদের সম্পর্কে লিখেছেন, তাদের পরবর্তী [১৯৬৬-এর পর] জীবন দেখুন, কাজী জাফরের পরিণতিও দেখুন, তাহলে আমার মন্তব্যের যথার্থতা পাওয়া যাবে।
২ জুন ১৯৯৬ সালে মশিয়ুর রহমানের বক্তব্য ও ছবি ছাপা হয়েছে। ছয়দফা [এ কারণেই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল] সম্পর্কে মশিয়ুর বলেছিলেন, ছয়দফা কার্যকর হলে ‘সমস্ত দেশে এক বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাব জাগাইয়া তুলিবে।’ মুজিব মন্তব্য করেছেন, ‘এদের এই ধরনের কাজেই তথাকথিত প্রগতিবাদীরা ধরা পড়ে গেছে জনগণের কাছে। জনগণ জানে এই দলটির কিছু সংখ্যক নেতা কিভাবে কৌশলে আইয়ুব সরকারের অপকর্মকে সমর্থন করেছে। আবার নিজেদের বিরোধী দল হিসেবে দাবি করে এবং জনগণকে ধোঁকা দিতে চেষ্টা করছে। এরা নিজেদের চীনপন্থী বলেও থাকেন। একজন এক দেশের নাগরিক কেমন করে অন্য দেশপন্থী, প্রগতিবাদী হয়ে?… এর পূর্বে মওলানা ভাসানী সাহেবও ছয়দফার বিরুদ্ধে বলেছেন। কারণ, দুই পাকিস্তান নাকি আলাদা হয়ে যাবে।’
এই প্রশ্নটি জরুরি যেটি কখনো কারো মনে হয় না। যেমনÑ এখন বিএনপি সম্পর্কে আমরা বলি। তারা পাকিস্তানের ব্রিফ মহন করেন। তারা এর বিরুদ্ধে কোনো যুক্তিও উপস্থাপন করতে পারেন না। উদাহরণ হিসেবে বলি, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সংসদ ২৫ মার্চকে জাতীয় গণহত্যা দিবস বলে ঘোষণা করেছে। এটি অভিনন্দনযোগ্য। আমরা সবাই তাকে ও সংসদকে অভিনন্দন জানিয়েছি এবং আমরা খুশিও। বিএনপি এখন পর্যন্ত সে বিষয়ে উচ্চবাচ্য করেনি, বরং খালেদা জিয়া গণহত্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। পাকিস্তানের আইএসআইও ১৯৭২ সাল থেকে একই প্রশ্ন তুলছে।
মওলানা ভাসানীর সম্পর্কে শেখ মুজিব দুঃখ করে অনেক অপ্রিয় মন্তব্য করেছেন। কিন্তু প্রকাশ্যে তিনি কখনো মওলানা ভাসানীর প্রতি অশ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেন নি। ১৯৭২ সাল থেকে দুজনের পথ একেবারে পৃথক হয়ে গেছে। মওলানা শেখ মুজিবের তুমুল বিরোধিতা করেছেন। ভারতের দালাল বলেছেন। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেন নি। একই সঙ্গে মওলানা ভাসানী বিভিন্ন প্রয়োজন জানিয়েছেন শেখ মুজিবকে। তিনিও নির্দ্বিধায় তা মিটিয়েছেন। ভাসানীও স্নেহ করতেন মুজিবকে। রাজনীতি এরকম সম্পর্ক খুব কম।
মওলানা ভাসানী সম্পর্কে ওই একই দিন ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি লিখেছেনÑ ‘মওলানা সাহেবকে আমি জানি, কারণ তিনিই আমার কাছে অনেকবার অনেক প্রস্তাব করেছেন। এমনকি ন্যাপ দলে যোগদান করেও। সেসব আমি বলতে চাই না। তবে ‘সংবাদ’র সম্পাদক জহুর হোসেন চৌধুরী সাহেব জানেন। এসব কথা বলতে জহুর ভাই তাকে নিষেধও করেছিলেন। মওলানা সাহেব পশ্চিম পাকিস্তানে যেয়ে এক কথা বলেন, আর পূর্ব বাংলায় এসে অন্য কথা বলেন। যে লোকের যে মতবাদ সেই লোকের কাছে সেইভাবেই কথা বলেন। আমার চেয়ে কেউ তাঁকে বেশি জানে না। তবে রাজনীতি করতে হলে নীতি থাকতে হয়। সত্য কথা বলার সাহস থাকতে হয়। বুকে আর মুকে আলাদা না হওয়াই উচিত। [পৃ. ৫৭-৫৮]
এই বাক্যগুলো গুরুত্বপূর্ণ। শেখ মুজিব জাতির জনকে রূপান্তরিত হলেন। অন্যরা বিস্মৃতির অতলে চলে গেলেন। তার একটি কারণÑ ‘বুকে আর মুখে’ তারা এক ছিলেন না এবং মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে সত্য বলার সাহসও ছিল না। আবার এই ন্যাপ সম্পর্কেই তিন দিন পর তিনি মন্তব্য করছেনÑ ‘আজ আবার ন্যাপের জনসভা। সভাটি হওয়া প্রয়োজন। বহুদিন পর এরা মিটিং করছে। মওলানা ভাসানী সাহেবের ভুল নীতির জন্য এই দলটি জনসমর্র্থন যা কিছু ছিল তাও হারাইয়া ফেলেছে দিন দিন।’ [পৃ. ৬৫] গণতন্ত্রে প্রতিপক্ষ থাকবে। কিন্তু প্রতিপক্ষের জন্য এ ধরনের সহানুভূতি বিরল।
৪ঠা জুনের ভুক্তিতে দুটি মন্তব্য উল্লেখযোগ্য। একটি অভ্যন্তরীণ, অন্যটি বৈদেশিক।
১৯৬৬ সালে পাকিস্তান সরকার যে ধরনের নিবর্তনমূলক শাসন চালাচ্ছিল তাতে মুজিব আশঙ্কা করছিলেন পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদী রাজনীতির গোড়াপত্তন হবে। তিনি লিখেছিলেনÑ ‘আমরা ভয় হচ্ছে এরা পাকিস্তানকে সন্ত্রাসবাদী রাজনীতির দিকে নিয়ে যেতেছে। আমরা এ পথে বিশ্বাস করি না। আর এ পথে দেশে মুক্তিও আসতে পারে না। কিন্তু, সরকারের এই নিবর্তনমূলক পন্থার জন্য এ দেশের রাজনীতি ‘মাটির তলে’ চলে যাবে। আমরা যারা গণতন্ত্রের পথে দেশের মঙ্গল করতে চাই, আমাদের পথ বন্ধ হতে চলেছে। এর ফলে যে দেশের পক্ষে কি অশুভ হবে তা ভাবলেও শিহরিয়া উঠতে হয়। কথায় আছে, ‘অন্যের জন্য গর্ত করলে, নিজেই সেই গর্তে পড়ে মরতে হয়’। [পৃ. ৬২]
১৯৬৬ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার কী করেছে তা এ দেশের বিশেষ করে আমাদের জেনারেশনের জানা। এ জন্য যত তত্ত্বই দেয়া হোক তা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। পাকিস্তানের কী হয়েছে তাও আমাদের জানা। অন্যদিকে বিএনপি-জামায়াতের বর্তমান রাজনীতি পর্যালোচনা করুন। গত এক দশক তারা সেই পাকিস্তানি তত্ত্বই গ্রহণ করেছিল ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় এবং ক্ষমতাচ্যুত হয়েও। পাকিস্তান আমলে অন্তত সরকারি বাহিনী পরিকল্পিতভাবে গ্রেনেড ছুড়ে [প্রাক-১৯৭১] কাউকে হত্যা করতে চায়নি। বিএনপি-জামায়াত সে পদ্ধতিই গ্রহণ করেছিল। এ পথ থেকে সরে না এলে কী পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে তা বিএনপি-জামাত কর্মীদের একবার বিবেচনা করা উচিত।
ইন্দোনেশিয়া সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেনÑ ‘ইন্দোনেশিয়া দুনিয়াকে বেশ খেলা দেখাল। সে দেশের সমস্ত রাজনৈতিক দলকে রেজিস্ট্রি করার হুকুম দেয়া হয়েছে। প্রায়ই পাকিস্তানের আপন মার পেটের ভাই।’ ইন্দোনেশিয়ায় এরপর সুকর্নোকেই বিদায় নিতে হয় এবং সুহার্তো গণহত্যা চালিয়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিলেন।
ছয়দফা পেশের আগে এ নিয়ে বিতর্ক হয়েছে, পেশের পরও হয়েছে। আওয়ামী লীগের অনেকেই এতে বিশ্বাস রাখতে পারেন নি। স্বায়ত্তশাসনের কথা আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হওয়ার সময়ই যে ছিল তা অনেকের হয়তো মনে ছিল না। তবে সেই স্বায়ত্তশাসন আর ছয়দফার স্বায়ত্তশাসনে পার্থক্য ছিল। বঙ্গবন্ধু কিন্তু ১৯৭১ পর্যন্ত ছয়দফায়ই বিশ্বাস হারান নি। ১৯৭০ সালে ম্যান্ডেটও নিয়েছিলেন ছয়দফার ওপর। ৮ জুন তিনি লিখছেনÑ “ছয়দফা যে পূর্ববাংলার জনগণের প্রাণের দাবিÑ পশ্চিমা উপনিবেশবাদী ও সাম্রাজ্যবাদীদের দালাল পশ্চিম পাকিস্তানের শোষক শ্রেণি যে আর পূর্ববাংলার নির্যাতিত গরিব জনসাধারণকে শোষণ বেশিদিন করতে পারবে না, সে কথা আমি এবার জেলে এসেই বুঝতে পেরেছি। বিশেষ করে ৭ জুনের যে প্রতিবাদে বাংলার গ্রামেগঞ্জে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফেটে পড়েছে, কোনো শাসকের চক্ষু রাঙানি তাদের দমাতে পারবে না।
পাকিস্তানের মঙ্গলের জন্য শাসক শ্রেণির ছয়দফা মেনে নিয়ে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করা উচিত।” [পৃ. ৭৩]
তবে, পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি গভর্নর, বাঙালিদের কিছু রাজনৈতিক দল, বাঙালি আমলারা জুলুম করছে বাঙালিদের ওপর। এই নিষ্ঠুরতায় তিনি বিচলিত। মনেপ্রাণে তিনি তা গ্রহণ করতে পারছেন না। ক্ষোভে-দুঃখে লিখেছেন বাঙালি পরশ্রীকাতর। “পরশ্রীকাতরতা দুনিয়ার কোনো ভাষায় খুঁজিয়া পাওয়া যাবে না, একমাত্র বাংলা ভাষা ছাড়া। এটি আমাদের চরিত্রের সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে।… তবে যারা ত্যাগ করতে পেরেছেÑ ত্যাগ করে যাক, দুঃখ ও আফসোস করার কোনো দরকার নেই।” [পৃ. ৮৯]
১৯৭৩-৭৪ সালেও ক্ষোভে-দুঃখে তিনি একই কথা বলেছিলেন। আবার এও বলেছিলেন বাঙালিরা তাকে ভালোবাসে, তাকে তারা হত্যা করতে পারে না। এই একটি ভবিষ্যদ্বাণী তার মিথ্যা হয়েছে। ১৯৬৬ সালের মন্তব্যই ঠিক হয়েছে। তিনি সেই সত্তর দশকের মতো আবার বাঙালিদের ওপর বিশ্বাসও হারান নি। লিখেছেনÑ “সাংবাদিক জধষিব কহড়ী একটি সত্য কথা লিখেছেন” [ডেইলি টেলিগ্রাফ, ৭.৬.১৯৬৬]
এসব মন্তব্যের পর আবার লিখেছেনÑ ‘তবে বেশিদিন আর নেই।’ স্বপ্ন তার হারিয়ে যায়নি। স্বপ্নই তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
ছয়দফা দাবির কারণে, দলে দলে নেতা-কর্মীদের জেলে ঢোকানো হচ্ছে। এ খবর তিনি পাচ্ছেন। এদের অনেককে চেনেন, অনেককে চেনেন না। সারাদিন উদ্বিগ্ন থাকেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য। কিন্তু, তা আর হয় না। নির্জন সেলে তাকে রাখা হয়েছে। পারিবারিক বিষয়গুলোও তার মন খারাপের কারণ হয়ে উঠেছে। শরীর খারাপ। বাবা-মার কথা বারবার মনে পড়ে। কাতর তিনি। স্মৃতি বর্ণনা করেছেনÑ ১৯৫২ সালে যখন জেল থেকে মুক্তি পেলেন তখন তার সরল সাধাসিধে মা জিজ্ঞেস করছিলেনÑ ‘বাবা তুই তো পাকিস্তান পাকিস্তান করে চিৎকার করেছিস, কত টাকা নিয়ে খরচ করেছিসÑ এ দেশের মানুষ তো তোর কাছ থেকেই পাকিস্তানের নাম শুনেছিল, আজ তোকেই সেই পাকিস্তানের জেলে কেন নেয়।’
এই সময় তার বয়স ৪৪। ভরা যৌবন। স্ত্রী-পুত্র নিয়ে সংসার উপভোগ করার কথা। কিন্তু যৌবন তো জেলে জেলে বিলিয়ে দিলেন। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে আসে বিশেষ করে ছোট ছেলেকে [রাসেল]। এর একটি মর্মস্পর্শী বর্ণনা আছে। ১৫ জুন তাঁর স্ত্রী ছেলেমেয়েদের নিয়ে এসেছে। তাকে খবর দেয়া হলো দেখা করার জন্যÑ “তাড়াতাড়ি রওয়ানা করলাম। দূর থেকে দেখি রাসেল, রেহানা ও হাসিনা চেয়ে আছে আমার রাস্তার দিকে। ১৮ মাসের রাসেল জেল অফিসে এসে একটুও হাসে নাÑ যে পর্যন্ত আমাকে না দেখে। দেখলাম দূর থেকে পূর্বের মতোই। ‘আব্বা আব্বা’, বলে চিৎকার করছে। জেলগেট দিয়ে একটা মাল বোঝাই ট্রাক ঢুকেছিল। আমি তাই জানালায় দাঁড়াইয়া ওকে আদর করলাম। একটু পরেই ভেতরে যেতেই রাসেল আমার গলা ধরে হেসে দিল। ওরা বলল আমি না আসা পর্যন্ত শুধু জানালার দিকে চেয়ে থাকে, বলে ‘আব্বার বাড়ি’। এখন ওর ধারণা হয়েছে এটা ওর আব্বার বাড়ি। যাবার সময় হলে ওকে ফাঁকি দিতে হয়। ছোট মেয়েটার [রেহানা] শুধু একটা আবদার। সে আমার কাছে থাকবে। আর কেমন করে কোথায় থাকি তা দেখবে। সে বলে থেকে রাজি আছি।” [পৃ. ৯৩]
এ প্রসঙ্গে [তুলনার জন্য নয়] ব্যক্তিগত প্রসঙ্গের কথা মনে পড়ছে। খালেদা জিয়া-নিজামী সরকার আমাকে ও শাহরিয়ারকে জেলে নিয়েছে, ঢাকা জেলে। কয়েকদিন পর আমাদের দুজনকে অন্য কারাগারে পাঠালো। শাহরিয়ারকে কাশিমপুর, আমাকে দিনাজপুর। রাগটা বোধহয় আমার ওপর বেশি ছিল। ছোট এক ঘরে সলিটারি কনফাইনমেন্ট। আমার অসুস্থ প্রৌঢ় চাচা বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, আমার প্রয়াত চাচী [তার স্ত্রী]’ আমার স্ত্রী, ছোট ভাই ও মেয়ে সারারাত প্রবল ঠা-ায় কুয়াশার ভেতর গাড়ি করে ঢাকা থেকে দিনাজপুর এসেছে। আমাকে নেয়া হলো দেখা করার জন্য। আমার স্ত্রী আর চাচা-চাচীকে ঢুকতে দিয়েছে। আইবির দুজন দুপাশে দাঁড়িয়ে। আমি আঙুলে ভর করে উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে দেখলাম বাইরে আমার ছোট ভাই ও মেয়ে দাঁড়িয়ে। তাদের ঢুকতে দেয়া হয়নি। সাক্ষাৎকার ছিল ১৫ মিনিটের।
তিনি লিখেছেনÑ “কে বুঝবে আমাদের মতো রাজনৈতিক বন্দিদের বুকের ব্যথা। আমার ছেলেমেয়েদের তো থাকা খাওয়ার চিন্তা করতে হবে না। এমন অনেক লোক আছে যাদের স্ত্রীদের ভিক্ষা করে, পরের বাড়ি খেটে, এমনকি ইজ্জত দিয়েও সংসার চালাতে হয়েছে। জীবনে অনেক রাজবন্দির স্ত্রী বা ছেলেমেয়েদের চিঠি পড়ার সুযোগ আমার হয়েছে। সে করুণ কাহিনী কল্পনা করতেও ভয় হয়।” [পৃ. ৯৫]
[চলবে]

Category:

দেশের উন্নয়নে নারী উদ্যোক্তারা

Posted on by 0 comment

3-4-2018 8-08-34 PMড. ইঞ্জিনিয়ার মাসুদা সিদ্দিক রোজীঃ একটি দেশের সার্বিক উন্নয়নে নারী-পুরুষ সবার সম-অংশগ্রহণ অপরিহার্য। চিরন্তন এ বাক্যটির কার্যকারিতার সুফল পৃথিবীর উন্নত দেশগুলো বহু আগে থেকে উপলব্ধি করলেও বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো এতদিন এ সত্যটি এবং সুফল থেকে বঞ্চিত ছিল। এর একটিই কারণ আমাদের সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীর মূল্যায়নে ছিল অনীহা। নারীকে আমরা দেখে এসেছি শুধুই ঘর সংসার সাজানো এবং পারিবারিক আটপৌরে জীবনের সহযোগী হিসেবে। শিক্ষকতার মতো কিছু কিছু পেশায় নারীদের পদচারণা বেশ আগে থেকে শুরু হলেও কারিগরি পেশায় নারীর অগ্রযাত্রা অতি সাম্প্রতিক ঘটনা।
আমি নিজে একজন নারী সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গ্রাজুয়েশন করেছি, মাস্টার্স করেছি এনভায়রনমেন্টাল সাইন্সে এবং সর্বশেষ লো কস্ট হাউজিংয়ের ওপর দেশের বাইরে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছি। আমি যখন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর পড়তে চাইলাম তখন আমার টিচাররা বলেছিলেন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চাইলে আর্কিটেকচারে পড়া ভালো। সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং মাঠে কাজ করতে হবে, ছাদের ওপর উঠতে হবে। তুমি পারবে না। আমি নাছোড়বান্দা সিভিলেই পড়ব। অবশেষে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়লাম।
আমার কর্মজীবনের শুরুটা ছিল কনসালট্যান্সির মাধ্যমে। আমার এলাকার অধিকাংশ বাড়ির ডিজাইন আমি নিজেই করেছি, তাদের বাড়িগুলো কীভাবে হচ্ছে, ফাউন্ডেশনের কাজের মান, কনস্ট্রাকশনের মেটারিয়েলসের গুণাগুণ আমি নিজ দায়িত্বে দেখতাম, কোনো টাকা-পয়সার বিনিময়ে না, ফ্রি ফ্রি দেখতাম, নিজের কনফিডেন্স বাড়াতাম, টিচারদের সাথে আলাপ করে সমস্যার সমাধান করতাম। তবে সবার ওপরে কাজের মানটাই গুরুত্ব দিয়েছি।
অবশেষে যারা আমাকে দিয়ে ডিজাইন করাতেন তারাই তাদের বাড়ির কাজ ডেভেলপার হিসেবে করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করতে থাকলে তাদের অনুরোধে ডেভেলপার হিসেবে লিমিটেড কোম্পানি খুললাম। কনস্ট্রাকশন শুরু করলাম। একে একে মানুষের বাড়ি সুন্দর সঠিক সময়ে গুণগত মান ঠিক রেখে সময়মতো বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হলাম। এর মধ্যে আমি আইইবি (ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ)-এ বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের প্যানেল থেকে নির্বাচন করলাম, পরপর তিনবার নির্বাচিত হলাম। রিহ্যাব (রিয়েল এস্টেট হাউজিং এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ)-এর মেম্বারশিপ নিলাম এবং পরবর্তীতে রিহ্যাবের ডিরেক্টর হিসেবে আওয়ামী লীগ প্যানেল থেকে নির্বাচিত হলাম এবং পরপর তিনবার নির্বাচিত আছি এবং রিহ্যাব ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বে পালন করছি। সুনামের সাথে আমি আমার নিজস্ব ব্যবসা পরিচালনা করছি। পাশাপাশি আমি আমার সংসারকেও ঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারছি। আমি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত রুটিনমাফিক কাজ করি। আমি আমার কোম্পানিকে গ্রুপ অব কোম্পানিতে রূপান্তরিত করতে যাচ্ছি, অনেকে আমার এই কোম্পানিতে কাজ করছে। আমার এক ছেলে এক মেয়ে দুজনই স্কালারশিপ নিয়ে দেশের বাইরে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। স্বামী গভ. অফিসার। বর্তমানে পিডিবি’র চিফ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সুনামের সাথেই চাকরি করে যাচ্ছেন।
আমি মনে করি, আমার শৃঙ্খলা, সততা, পরিশ্রম, দক্ষতা, মেধা সব জায়গা থেকে কিছু রিয়েলাইজেশন আছে, কিছু শিক্ষা আছে যা কাজ করতে করতে শিখেছি। আমার আজকের উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমার সেই রিয়েলাইজেশন এবং শিক্ষাগুলোকে সহজ করে বলা।
আমি মনে করি, মেয়ে বা মহিলা হিসেবে একজন নারীর সবচেয়ে বড় বোঝাপড়া হচ্ছে নিজের কাছে সে কে? তার পরিচয় কী? সে কী কী পরিচয়ে এই জীবনকে অতিবাহিত করতে চায়? ধরুন, আপনি একজন সামাজিক উদ্যোক্তা একজন টেকনোলজি উদ্যোক্তা এগুলো শুধু কাজের জায়গায় নয়। এগুলো পারসোনালিটি বহন করে। আপনি আপনার নিজের শখ নিজের স্বপ্ন নিজের পরিচয় কীভাবে পূরণ করবেনÑ এটা সম্পূর্ণ আপনার বোঝাপড়ার জায়গা। আপনার পরিবারের সাথে বোঝাপড়া করে আপনার আশপাশের যে সামাজিক অবস্থান আছে সেইগুলো বুঝে যদি আপনি খুঁজে নিতে পারেন, এই পথে আমি আগাতে চাই। অর্থাৎ, আপনি কী ব্যবসা করতে চান, আপনি কি টিচার হতে চান, আপনি মা হবেন, আপনি কারও স্ত্রী হবেন? আপনার সন্তানকে বড় করার সাথে সাথে পরিবারের জন্য অর্থ উপার্জন করবেনÑ সবকিছুই আপনার চয়েজ। আমার পয়েন্ট হচ্ছে, আপনি যা হবেন সেটি যেন আপনার চয়েজে হয়। যাতে দিনশেষে অর্থাৎ, মৃত্যুর আগে আপনি বলতে পারেন আমি আমার জীবনটাকে যথেষ্ট ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পেরেছি। একেকটা কাজের একেক ধরনের যুদ্ধ থাকে, ওখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারলেই মনে হবে আমি তো কিছু আগাতে পেরেছি। আমার মায়ের থেকে আমি কিছু আগাতে পেরেছি। পয়েন্ট ইজ আপনি কীভাবে আপনার স্বপ্নটাকে বা ইচ্ছেটাকে বাস্তবে রূপ দিয়ে সেই স্বপ্নটাকে মর্যদা দেবেনÑ এটা সম্পূর্ণ আপনাকেই পথ বের করতে হবে। নিজের চেষ্টায়, সাধনায়। আশপাশের মানুষকে অনেক সুখী দেখে কষ্ট পাওয়ার কিছু নেই যে আপনি কিছু করতে পারছেন না। নিজেকে সুন্দর ভাবা, নিজের যে মেধা আছে, সেটিকে চিহ্নিত করা অন্ততপক্ষে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণ মানুষের অসাধারণ হয়ে ওঠার একটা গল্প থাকে। সেই স্বপ্নকে ছুয়ে দেখার তীব্র চাওয়াটাকে সাফল্যে পরিণত করার গল্পগুলোই তুলে ধরা হলোÑ

১. ফারজানা চৌধুরী
ইন্সুরেন্স কোম্পানির প্রধান কর্ণধার
নিজস্ব স্বপ্নকে ছুঁয়ে দেখতে নানান পথে হেঁটেছেন ফারজানা চৌধুরী। তবে তার মেধার সবটুকু তিনি জয় করেছেন। ছোটবেলা থেকেই মেধাবী এই মানুষটিকে কোনো ধরাবাঁধা নিয়মে আটকে রাখা যায়নি। তাই তো আজ তিনি দেশের সুনামধন্য ইন্সুরেন্স কোম্পানির কর্মকর্তা।
ঘুম থেকে উঠেই শুরু হয় তার কাজের ব্যস্ততা। কাজের ফাঁকে ফাঁকে পরিবারের লোকদেরও সময় দেন। অফিসের উদ্দেশ্যে গাড়িতে চড়ার পরপরই শুরু হয় অফিসের কাজ। প্রথমে উঠেই নামাজ পড়েন। নামাজের পর সকালের নাস্তা খেয়ে স্বামীর সঙ্গে বের হয়ে যান। অফিসে যাওয়ার পথে মাকে সালাম করে যান। গাড়িতে উঠে মেইল চেক করে বাজার এবং বাড়ির খোঁজখবর নিয়ে সব কাজের নির্দেশনা দিয়ে অফিসের কাজে মনোনিবেশ করেন। প্রায় প্রতিটা মুহূর্তই ব্যস্ত থাকেন। তার মা ঘর সামলিয়েছেন সারাজীবন এবং বাবা দেশের ইন্সুরেন্স কোম্পানির প্রতিকৃতি। স্বামী নাসির উদ্দিন চৌধুরী একজন প্রকৌশলী ব্যবসায়ী। তিনি পরিশ্রমী এবং অত্যন্ত জেদি প্রকৃতির লোক। অঙ্কে ভালো ছাত্র না হলেও তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কমার্সে ভর্তি হন। সেখানে অনেক স্ট্রাগল ছিল যেহেতু সাইন্স থেকে কমার্সে ভর্তি হয়েছেন। তারপর মাস্টার্স করে প্রথমে টিচার হিসেবে যোগদান করেন এবং পরবর্তীতে নিজেকে এক্সপ্লোর করার জন্য দেশে বাইরে থেকে ডিগ্রি নিয়ে নিজের ব্যবসা শুরু করেন। উত্তরাধিকার সূত্রে ব্যবসা শুরু করেন নি। নিজেই নিজের ব্যবসার সফলতা অর্জন করেন। এ দেশের মেয়েদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ এখনও সহজ নয়, তাই তাদের জন্য আলাদা করে সময় বের করে নেন। তাদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে তিনি সহযোগিতা করেন। আর এ জন্যই তিনি বিডাব্লিউসিসিআই-র ওয়ান অব দ্যা ডাইরেক্টর নিযুক্ত হন। মেয়েদের সব ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। তা হলেই সাফলতা আসবে।

২. সেলিমা আহাম্মেদ
নিটল নিলয় গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ ওম্যান চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট
আঁকতে না জানলেও স্বপ্ন ছিল আর্টিস্ট হবেন, তা না হলেও জার্নালিস্ট। কোনোটাই হতে পারেন নি। তাতে কী, জীবনের রংতুলিতে এঁকেছেন নতুন এক স্বপ্ন। রচনা করেছেন সফলতার অন্য এক গল্প। নিজের মেধা, শ্রম ও সততা দিয়ে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন নারী সব পারে। যদিও শুরুতে খুব একটা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি অন্যরা। নারী গাড়ি বিক্রয় করছে গ্যারেজে বসে। এটা একদমই মানুষের ভাবনার মধ্যে ছিল না। প্রথমে যখন শুরু করেন তখন মানুষ ঘরের ভেতর থেকে এসে বেরিয়ে যেত। অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে যায় সেলিমা আহাম্মেদের। তাই বলে তিনি থেমে যান নি। স্বামী-সংসার পরিবারের সবকিছু দেখভাল করেও পড়াশোনা চালিয়ে যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবস্থাপনা বিভাগ থেকে অনার্স মাস্টার্স করেছেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে তাল মেলাতেই ছুটে গেছেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। পড়া শেষে বন্ধুদের নিয়ে একটা কনসালট্যান্সি অফিস খুলেছিলেন। দুই বছর চালিয়েও ছিলেন। বন্ধুরা ব্যাংকে চলে যায়। তিনি প্রথমে রি-কন্ডিশন গাড়ি বিক্রি দিয়ে ব্যবসায় শুরু করেন। পরবর্তীতে স্বামী-স্ত্রী দুজনে মিলে নিটল নিলয় গ্রুপের ব্যবসা শুরু করেন। তারপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি বিশ্বাস করেন জীবনের এবং সময়ের তাগিদে স্বপ্ন পাল্টাতে হয়। সেই নীতিতে ভর করেই একজন সফল ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা।

৩. ফরিদা বেগম, ঘোগড়া হাট
স্বামীর একার আয়ে সংসার চলত না। পরিবারের আয় বাড়ানোর জন্য তিনি উপায় খুঁজছিলেন। পিডিবিএফ তাকে আয়ের সন্ধান দেয়। রংপুরে এক কারখানায় তিনি মাদুর ও পাপোশ তৈরি করতেন। ধীরে ধীরে ব্যবসা বড় করেন। প্রথমে ৪টি তাঁত দিয়ে শুরু করে পরে আস্তে আস্তে ১৩টিতে প্রায় ২০ জন মহিলা কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় এই মাদুর ও পাপোশ বিক্রি হচ্ছে। ফরিদা বেগম একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে সবার কাছে পরিচিত। মাসে তার এক থেকে দেড় লাখ টাকা বিক্রি হয়। ৫-৬ বিঘা জমি থেকে এখন তার ১৫-১৬ বিঘা জমি।

৪. লতিফা সরকার রুপা, যশোর
শ্রম-মেধায় সাফল্যের শিখরে যশোরের নারী উদ্যোক্তা লতিফা সরকার রুপা মায়ের দেওয়া ১ হাজার ৫০০ টাকার ব্যবসা শুরু করেন। চলার পথে অনেক বাধা এলেও কিছুতেই দমাতে পারেনি রুপাকে। নিজ গুণেই শুধু এগিয়ে চলেছেন। বর্তমানে মাসে আয় ৫ লাখ টাকা। আর কর্মসংস্থানের সুযোগ করছেন ১ হাজার ৫০০ মানুষের। বাবার অবসরের ২ লাখ টাকা, সাথে নিলেন নিজে প্রশিক্ষণ। পার্লারের অনেক অসহায় নারীদের নিয়ে তৈরি করলেন নকশি কাঁথা, থ্রি-পিচ, ফতুয়াসহ বিভিন্ন হস্তশিল্প। নিজের বাড়ির একটা ঘরকে শোরুম করলেন। বর্তমানে দেশের গ-ি ছেড়ে বিদেশে যাচ্ছে এসব পণ্য, আবার অনলাইনেও বিক্রি করছেন। গড়ে তুলেছেন বুটিক হাউস, দোলা নকশি ঘর, দোলা বিউটি পার্লার, দোলা ট্রেনিং সেন্টার, দোলা মা ও শিশু উন্নয়ন সংস্থা। স্বামী যখন বসতবাড়ি বিক্রির জন্য খরিদদারের কাছ থেকে আগাম বায়না করেন তখন ঘটনা জানতে পেরে স্বামীর কাছ থেকে বাড়িটি কিনে নেন। যশোর শহরে পাঁচতলা বাড়ি করে স্বামী-সংসারসহ বসবাস করছেন।

৫. আয়শা আক্তার
কথায় আছে যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে। অঙ্গন নামে একটি প্রতিষ্ঠান আয়েশা আক্তারের। সাধারণ পরিবারের সহজ-সরল এবং কঠোর পরিশ্রমী আয়েশার নবম শ্রেণিতে থাকা অসস্থায় বিয়ে হয়। স্বামী সরকারি চাকরি করেন। সংসারে অভাব লেগেই থাকত। এসব শুধুই অতীত। বর্তমান পরিচয়টা তিনি একজন সফল নারী উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। যুব উন্নয়ন থেকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিয়ে বিভিন্ন ব্যবসা (টেইলারিং, কাটিং-সহ) শুরু করলেও সামাজিক বাধার সামনে ব্যবসা বদলাতে হয়েছে বহুবার। ভবিষ্যতে গার্মেন্ট সেক্টরেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার ইচ্ছে আছে। সততা, ধৈর্য, পরিশ্রম ৩টা জিনিস যদি থাকে, তাহলে সফলতা একদিন আসবেই। একজন পুরুষের পাশাপাশি আয়েশার মতো নারীরাও দেশের কল্যাণে কাজ করে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পরে বহুদূর।
আমি ব্যক্তিগতভাবে চাই নারীরা শুধু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী না বড় বড় উদ্যোক্তা হিসেবেও আসতে হবে। বিকেন্দ্রীকরণে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নারীদের নিয়ে কাজ করতে চাই।

Category:

বাংলাদেশ বন্ধু আসমা জাহাঙ্গীর পরলোকে

Posted on by 0 comment

3-4-2018 8-06-51 PMউত্তরণ ডেস্কঃ বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ও পাকিস্তানের বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী আসমা জাহাঙ্গীর পরলোক গমন করেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর। গত ১১ ফেব্রুয়ারি হৃদরোগে আক্রান্ত হলে পাকিস্তানের একটি হাসপাতালে নেওয়ার পর সেখানে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি … রাজিউন)। তার বাবা মালিক গোলাম জিলানী ১৯৭১ সালে তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ছিলেন। মরহুমার পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ডন নিউজ এ খবর জানিয়েছে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে নিজের জীবনকে হুমকির মধ্যে ঠেলে দিয়ে যেসব পাকিস্তানি নির্যাতিত বাঙালির পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন আসমার বাবা তাদের একজন। ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের পর তার মুক্তি দাবিতে জেনারেল ইয়াহিয়াকে খোলা চিঠি লিখেছিলেন মালিক গোলাম জিলানী। এ জন্য তাকে কারাবরণ করতে হয়।
২০১৩ সালে বাংলাদেশ সরকার একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষে দাঁড়ানো ৬৯ বিদেশি বন্ধুকে সম্মাননা দেয়। তাদের মধ্যে যে ১৩ পাকিস্তানি ছিলেন, তাদের একজন আসমার বাবা মালিক গোলাম জিলানী। ওই সময় বাবার সম্মাননা সনদ নিতে ঢাকায় এসেছিলেন আসমা জাহাঙ্গীর।

Category:

মাছে পরিপূর্ণ বাংলাদেশ

Posted on by 0 comment

3-4-2018 8-05-13 PMরাজিয়া সুলতানাঃ বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। রয়েছে প্রায় ৩১০টি বা কারও মতে ২৩০টি নদী, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে প্রায় ৬০০টি বাঁওড়, সিলেট বিভাগে রয়েছে অসংখ্য হাওড়। তাছাড়া আরও রয়েছে খাল-বিল, নালা, হ্রদ, পুকুর ইত্যাদি। এই বিশাল স্বাদু পানির এলাকাগুলো মৎস্য সম্পদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্থান। তা ছাড়া রয়েছে বিশাল সমুদ্র ভা-ার। তাই আমরা আমাদের দেখতে পাই ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ সত্ত্বায়। মাছ নিয়ে এখন আর বাংলাদেশে হাহাকার নেই। মাছে পরিপূর্ণ সুজলা-সুফলা বাংলাদেশ। এখন আর খাদ্য তালিকায় বিদেশি পণ্য হিসেবে মাছকে রাখা হয় না। বরং মাছ উৎপাদনে স্বয়ং সম্পন্ন বাংলাদেশে থেকে বিপুল পরিমাণ মাছ রপ্তানি করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত রূপকল্প ২০২১-এ উল্লিখিত লক্ষ্যমাত্রা (৪৫ লাখ মেট্রিক টন মাছ) অর্জনের জন্য মৎস্য অধিদফতরের আওতায় এবং ব্যক্তি উদ্যোক্তারা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ফলে মৎস্য ভা-ারে অর্জিত হচ্ছে দৃশ্যমান সাফল্য। স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর বাংলাদেশ আজ মৎস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পন্ন। মৎস্য খাত বর্তমানে দেশের মোট জিডিপির ৩ দশমিক ৬১ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপির ২৪ দশমিক ৪১ শতাংশের জোগান দিচ্ছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪০ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন, যা ছাড়িয়ে উৎপাদন হয়েছে ৪১ লাখ ৩৪ হাজার মেট্রিক টন। বলা বাহুল্য মাংস উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা (৭১ লাখ ৩৫ হাজার মেট্রিক টন) ছাড়িয়েও উৎপাদন হয়েছে ৭১ লাখ ৫৪ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ চাহিদা অনুযায়ী মাছ ও মাংস উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী মাছ রপ্তানি করে সরকারের বছরে আয় করেছে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা।
দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবদেহের পুষ্টির চাহিদা পূরণে মৎস্য সম্পদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মানুষের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় আমিষের ৬০ শতাংশই আসে মাছ থেকে। তাই শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাতে পর মৎস্য খাতকে গুরুত্ব দিয়ে বর্তমান সরকার নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে এবং করছে। যেমন আধুনিক পদ্ধতিতে মৎস্য চাষ ব্যবস্থাপনা, অপ্রচলিত মৎস্য পণ্য উৎপাদন, বিল নার্সারি কার্যক্রম বাস্তবায়ন, ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন, প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্রের উন্নয়ন ও সংরক্ষণ, জাটকা সংরক্ষণ, ডিমওয়ালা ইলিশ রক্ষা, অভয় আশ্রম, মৎস্য সংরক্ষণ আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, দরিদ্র জেলেদের আপদকালীন খাদ্য সহায়তা প্রদান ও বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিসহ সকল কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের ফলে মৎস্য উৎপাদনে প্রবৃদ্ধি বেড়ে চলছে। এসব কাজের ফলে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মূল্যায়নে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ স্থান এবং বদ্ধ জলাশয়ে মৎস্য উৎপাদানে পঞ্চম স্থান অধিকার করেছে। তাছাড়া সামুদ্রিক মাছ আহরণের দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ২৫তম। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রজয়ের পর বঙ্গোপসাগর থেকে বাংলাদেশের মৎস্য আহরণ কয়েক গুণ বাড়বে। আগামী ২০২২ সাল নাগাদ বিশ্বে যে ৪টি দেশ মাছ চাষে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করবে, তার শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। এরপরই আছে থাইল্যান্ড, ভারত ও চীনের নাম। মাছ উৎপাদনে শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় মিয়ানমারও এগিয়ে আসছে। শুধু দেশ নয়, বিদেশের চাহিদা মেটাতে এখন মাছ রপ্তানি করছে বাংলাদেশ।
আমাদের এ সাফল্যে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে নোনা ও মিষ্টি পানির ইলিশ ও চিংড়ি, অভয়াশ্রমের চিতল, ফলি, বামোস, কালিবাউস, আইড়, টেংরা, মেনি, রানি, সরপুটি, মধু পাবদা, রিটা ও গজার, চাষকৃত মাছের মধ্যে তেলাপিয়া, পাঙ্গাশ, কমনকার্প, বিগহেড কার্প, থাইপুটি, মিররকার্প, চোষক মাছ, ব্লাক কার্প, থাই পাঙ্গাস, আফ্রিকান মাগুর, মিল্কফিশ, সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প, ভিয়েতনামের কই, থাই কই, আফ্রিকান মাগুর, রুই ও কাতল ইত্যাদি। তবে উৎপাদিত মাছের প্রায় ২০ শতাংশ আসে রুই-কাতলা থেকে। এছাড়া ১৬ শতাংশ পাঙাশ, ১০ দশমিক ১৮ শতাংশ ইলিশ, প্রায় ১০ শতাংশ তেলাপিয়া থেকে। বিশেষ করে ময়মনসিংহ, গাজীপুর, বগুড়া ও কুমিল্লা জেলায় পুকুরে এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে ঘেরে মাছ চাষের ফলে এই অবস্থানে এসেছে বাংলাদেশের মৎস্য খাত। বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার ঘোষণার প্রধান লক্ষ্য হলো দারিদ্র্য নিরসন। দরিদ্রতা হ্রাসের অন্যতম উপায় হচ্ছে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। মৎস্য খাত এ কর্মসংস্থান সৃষ্টি বিশাল ভূমিকা রাখছে। প্রতিবছর এ খাতে প্রায় ৬ লাখ লোকের নতুন কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হচ্ছে। গত ১০ বছরে প্রায় পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে দেশের ১১ শতাংশের অধিক বা প্রায় ১৭১ লাখ লোক তাদের জীবন-জীবিকার জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য উপ-খাতের ওপর নির্ভরশীল। মৎস্য সেক্টরে সংশ্লিষ্ট এ জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ নারী, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ। এ ছাড়াও বিগত পাঁচ বছরে এই সেক্টরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অতিরিক্ত বার্ষিক ৬ লক্ষাধিক দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায়, বর্তমানে মৎস্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলোতে নিয়োজিত শ্রমিকের ৮০ শতাংশের অধিক নারী।
কর্মসংস্থান, দারিদ্র্যবিমোচন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ইত্যাদির সাথে সাথে মৎস্য সম্পদের যে দিকটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো এর পুষ্টিগুণ। মাছ মানুষের দেহের বিভিন্ন ভিটামিনের অভাব বিশেষত ভিটামিন-এ এবং ভিটামিন-ই মাছ থেকেই পূরণসহ অত্যাবশ্যকীয় খনিজ লবণের জোগান দেয়। দেশীয় ছোট মাছ শিশুদের অন্ধত্ব, রক্ত শূন্যতা, গলগ- প্রভৃতি রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। শুধু তাই নয়, সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা মাছকে সবচেয়ে নিরাপদ আমিষের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এতে অত্যাবশ্যকীয় অ্যামাইনো এসিডের সবগুলোই উপস্থিত। রয়েছে শরীরের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় উপাদান ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড। যা রক্ত চাপকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি কমায়। তাছাড়া রিউম্যাটয়েড, বাত রোগ বা অর্থাইটিস রোগ প্রতিরোধ করে। মাছের অপর নাম মস্তিস্ক খাদ্য। তাছাড়া শিশুদের হাঁপানি, মহিলাদের স্তন ও পুরুষের প্রোস্টেট ক্যানসার প্রতিরোধে সাহায্য করে মাছ। শরীরের বাড়তি ওজন কমাতে ও মেনপোজাল বা পঞ্চাশোর্ধ্ব মহিলাদের দেহ-মন ভালো রাখতে সাহায্যও করে মাছ। শিশুদের মস্তিস্কের বিকাশ ও চোখের উপকারীতার জন্য অসবৎরপধহ ঐবধৎঃ অংংড়পরধঃরড়হ সপ্তাহে কমপক্ষে দুবার মাছ খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। মাছের ভিটামিন-এ চোখ ও ত্বকের জন্য উপকারী এবং রোগ ও বার্ধক্য প্রতিরোধক। তাহলে বলতে হয় আগামী পৃথিবী হওয়া উচিত সম্পূর্ণ মৎস্য সম্পদের অধীনে এবং মাছ হবে প্রধান খাদ্য। আর এ ধ্রুব সত্যকে উপলব্ধি করেই আমাদের মৎস্যপ্রেমী সরকার মৎস্য সম্পদ উন্নয়নের জন্য সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীকে আধুনিক তথ্য সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি ও উদ্বুদ্ধকরণের নিমিত্তে উন্নত কলাকৌশল ও আধুনিক প্রযুক্তিবিষয়ক তথ্যাবলী বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাহায্যে সরবরাহ ও সেবা প্রদান নিশ্চিত করছে। সমৃদ্ধ ও আলোকিত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়কে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে নিচ্ছে। তবে ফারাক্কা জাতীয় বাঁধের কারণে নদীর নাব্য, তৎসংলগ্ন হাওর-বাঁওড়-বিল ভরাট হয়ে যাওয়া, কল-কারখানার বর্জ্যরে কারণে নদীর পানির দূষণ সৃষ্টি হচ্ছে। যা আমাদের মৎস্য সম্পদের জন্য ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

Category:

খালেদা জিয়ার দুর্নীতির মামলা ও রাজনীতিকরণ

Posted on by 0 comment

3-4-2018 8-03-03 PMএবিএম রিয়াজুল কবীর কাওছারঃ সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা দুর্নীতি দমন কমিশন দায়ের করে (মামলা নং-০৮), ৩ জুলাই ২০০৮, মোট ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাতের মামলা, এই মামলা মোট ২৬১ কার্যদিবসে সম্পন্ন হয়। এই মামলায় মূলত টাকা এসেছিল এতিমদের জন্য; কিন্তু কোনো এতিমখানাও প্রতিষ্ঠা করা হয়নি ও এতিমদের জন্য একটি টাকাও ব্যয় করা হয়নি। উপরন্তু ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে টাকা স্থানান্তর করা হয়। এই মামলা করেছে দুদক ও পুরো সময়টাতে পরিচালনাও করেছে দুদক।
এই মামলা চলাকালীন সময়ে বেগম খালেদা জিয়া বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন আদেশের বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ চেয়ে হাইকোর্ট বিভাগ ও আপিল বিভাগে প্রায় ৮০ বার আবেদন করেন এবং আবেদনগুলো প্রত্যাহৃত হয়েছে। এই মামলা চলাকালে তিনবার অনাস্থার কারণে আদালত বদল হয়েছে। খালেদা জিয়া সময় চেয়েছেন ১০৯ কার্যদিবস, ১০ বছর মামলা চলাকালীন সময়ে খালেদা জিয়া সশরীরে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ৪৩ দিন।
গত ৮ ফেব্রুয়ারি এই মামলার রায় প্রকাশিত হয় ঢাকার ৫নং বিশেষ জজ আদালতÑ ড. মো. আক্তারুজ্জামান জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদ- দেন। তারেক রহমানসহ মামলার অন্য পাঁচ আসামিকে দোষী সাব্যস্ত করে ১০ বছরের সশ্রম কারাদ- দেন। রায়ে খালেদা জিয়াসহ অন্য আসামিদের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা ৮০ পয়সা জরিমানাও করেন।
৬২৭ পৃষ্ঠব্যাপী এই রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, এই মামলার আসামিগণ পরস্পর যোগসাজশে সরকারি এতিম তহবিলের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা ৮০ পয়সা আত্মসাৎ করেছে। পরিমাণের দিক থেকে এই টাকা বর্তমান বাজার মূল্যে অধিক না হলেও প্রকৃত ঘটনার সময় এই টাকার বাজার মূল্য অনেক বেশি ছিল। আসামিগণের মধ্যে বেগম খালেদা জিয়া ওই সময় দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, আসামি কাজী সলিমুল হক ওরফে কাজী কামাল সংসদ সদস্য ছিলেন, আসামি ড. কামাল সিদ্দিকী সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। আসামি বেগম খালেদা জিয়াকে সরকারি এতিম তহবিলের ব্যাংক হিসাব খুলতে সহায়তা করা ও পরবর্তীতে ওই হিসাব থেকে দুটি প্রাইভেট ট্রাস্টের অনুকূলে সরকারি অর্থের চেক বে-আইনিভাবে প্রদান করায় বর্ণিত দুজন আসামিকে অপরাধ করতে সহায়তা করার শামিল। আসামি তারেক রহমান, মোমিনুর রহমান, শরফুদ্দিন আহমেদ কৌশল অবলম্বন করে সরকারি এতিম তহবিলের টাকা একে অপরের সহযোগিতায় আত্মসাৎ করতে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন। এর মাধ্যমে এই মামলার ছয়জন আসামি প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে লাভবান হয়েছেন বলে আদালত মনে করেন। আদালত মনে করেন তারা রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক অপরাধী হিসেবে গণ্য হবেন। অর্থনৈতিক দুর্নীতি রাষ্ট্রের অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করে এবং এর বাজে প্রভাব সমাজের প্রতিটি স্তরে সংক্রমিত হয়। রায়ে আদালত বলেন, আসামিগণের মধ্যে একজন ব্যতীত বাকি সবাই সরকারি কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও অপরাধমূলক বিশ্বাস ভঙ্গ করে সরকারি এতিম তহবিলের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা ৮০ পয়সা আত্মসাৎ করে। দ-বিধির ৪০৯ ধারা মতে, সংঘটিত অপরাধের জন্য বিভিন্ন মেয়াদে সাজা, যেমন, যাবজ্জীবন বা যে কোনো মেয়াদে কারাদ-, যা ১০ বছর পরেও হতে পারে, এবং অর্থদ- দ-নীয় হওয়ার বিধান রয়েছে। আদালত বলেন, প্রসিকিউটরের উপস্থিত সাক্ষ্য-প্রমাণের দ্বারা আসামিদের বিরুদ্ধে দ-বিধির ৪০৯, ১০৯ এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারার অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় আসামি বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমান, মোমিনুর রহমান, কাজী সলিমুল হক কামাল, শরফুদ্দিন আহমেদ ও ড. কামালউদ্দিন উভয়ে সচেষ্ট শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদ- বা যে কোনো মেয়াদে কারাদ-, যার মেয়াদ ১০ বছর পর্যন্ত হতে পারেÑ এই মর্মে উল্লেখ করা হয়।
আসামিগণ একে অপরের সহযোগিতায় অর্থনৈতিক অপরাধ করেছেন। সে কারণে তাদের সর্বোচ্চ সাজার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা প্রয়োজন। তবে আসামিদের বয়স, সামাজিক অবস্থান এবং আত্মসাৎকৃত টাকার পরিমাণ বিবেচনা করে তাদের যাবজ্জীবন কারাদ- প্রদান করা সমীচীন হবে নাÑ মনে করেন। এই আসামি তারেক রহমান, কামালউদ্দিন সিদ্দিকী, কাজী সলিমুল হক, শরফুদ্দিন আহমেদ ও মোমিনুর রহমানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রসিকিউশন পক্ষ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হওয়ায় তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে দ-বিধির ৪০৯, ১০৯ ধারার বিধান মোতাবেক ১০ বছরের সশ্রম কারাদ- এবং বর্ণিত সকল আসামিকে ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা অর্থদ-ে দ-িত করেন, আদালত বলে “এই অর্থদ-ের টাকা সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিগণ কর্তৃক প্রত্যেককে সম-অঙ্কে প্রদান করতে হবে। আরোপিত অর্থদ-ের টাকা রাষ্ট্রের অনুকূলে আদায় করার নির্দেশ দেওয়া গেল।” আদেশে আদালত বলে “বর্ণিত আসামিদের মধ্যে বেগম খালেদা জিয়া এ দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা ছিলেন, এছাড়া তিনি একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান, তিনি একজন বয়স্ক মহিলা, তার সার্বিক অবস্থা বয়স ও সামাজিক অবস্থা বিবেচনাপূর্বক দ-বিধির ৪০৯ এবং ১০৯ ধারায় পাঁচ বছর সশ্রম কারাদ- প্রদান করা হলো।”
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ ছয় আসামিকে অর্থদ-ের ২ কোটি ১০ লাখ টাকা ৬০ দিনের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। (৬৩২ পৃষ্ঠা-১১৭৪ পৃষ্ঠা) (১১৬২)
রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ইউনাইটেড সৌদি কর্মাশিয়াল ব্যাংকের মাধ্যমে ১২ লাখ ৫৫ হাজার ডলারের ডিডি খালেদা জিয়ার সোনালী ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট নং-৫৪১৬ হিসাবে রাখা হয়। এবং ওই টাকা স্থায়ী আমানত করে রাখার ফলে টাকার ওপর খালেদা জিয়ার স্বত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ওই টাকা যখন দুই ভাগ করা হয়, তখন তার সচিব কামাল উদ্দিন সিদ্দিকীর মাধ্যমে বেসরকারি দুটি ট্রাস্টের অনুকূলে দেওয়া হয়, এর মাধ্যমে তিনি ফৌজদারি অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। কেননা, সরকারি এতিম তহবিলের টাকা দেশে প্রতিষ্ঠিত এতিমখানায় বিধিমোতাবেক ব্যয় করা উচিত ছিল; কিন্তু তিনি তা না করে সেই অর্থ নামসর্বস্ব জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের অনুকূলে স্থানান্তর করেন। আজ অবধি ওই নামে কোনো ট্রাস্টের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ট্রাস্টের ঠিকানা ৬ শহীদ মইনুল রোড, ঢাকা সেনানিবাস কিংবা বগুড়ার গাবতলী উপজেলার দাড়াইল মৌজার ট্রাস্টের কোনো অস্তিত্ব নেই। ১৯৯৩ সালে ১৭ দলিলের মাধ্যমে কেনা ২ একর ৭৯ শতাংশ জমি আজ অবধি ধানী জমি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এতে আইন লঙ্ঘিত হয়েছে, সে কারণে বেগম খালেদা জিয়া দ-বিধির ৪০৯ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।
ব্যয়ের পর্যালোচনায় আগে বলা হয়, আসামি পক্ষ দাবি করেছে যে, ট্রাস্টের সঞ্চিত অর্থ সুদে আসলে বেড়ে ৬ কোটি টাকার বেশি রয়েছে, কোনো টাকা খরচ হয়নি। ফলে সম্পদের অপব্যবহারও হয়নি; কিন্তু সরকারি অর্থ অনির্ধারিত সময় ধরে ব্যয় না করে আটক রাখা দ-বিধির ৪০৯ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, তারেক রহমান ও মমিনুর রহমান সোনালী ব্যাংকের গুলশান নিউ নর্থ সার্কেল শাখার এসটিডি ৭নং হিসাব থেকে টাকা উত্তোলন করে প্রাইম ব্যাংকের গুলশান শাখায় রাখেন। পরে প্রাইম ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী সলিমুল হক ক্ষমতার অপব্যবহার করে ওই টাকা নিউ ইস্কাটন শাখায় স্থানান্তর করেন এবং বিভিন্ন কৌশলে ওই টাকা আসামি শরফুদ্দিন আহমেদের ব্যক্তিগত হিসাবে জমা করেন। প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলে এই টাকা আসে ১৯৯১ সালে আর ট্রাস্ট গঠিত হয় ১৯৯৩ সালে, এতিম তহবিলের জিম্মাদার ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদ জিয়া, এর ফলে ওই অর্থেই তিনি ছিলেন কাস্টডিয়ান; কিন্তু তিনি সরকারি বিধিবিধান অনুযায়ী সেই টাকা ব্যয় করেন নি।
ব্যয়ের পর্যালোচনায় আরও বলা হয়, খালেদা জিয়া আত্মপক্ষ সমর্থনমূলক বক্তব্য প্রদানের সময় নিজ জবানীতে স্বীকার করেছেন, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। ফলে দ-বিধির ৪০৯ ধারা ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় তাকে শাস্তি দিতে কোনো বাধা নেই। কারণ তিনি উক্ত এতিম তহবিলের জিম্মাদার ছিলেন, ওই অর্থের ওপর তার আধিপত্য ছিল। তিনি ওই সম্পত্তির কাস্টডিয়ান ছিলেন। তবে আসামিদের বিরুদ্ধে ৫(২) ধারার অপরাধ প্রমাণিত হলেও জেনারেল ক্লজেস অ্যাক্টের ২৬ ধারার বিধান বিবেচনায় নিয়ে ৪০৯ ধারায় দ-িত করা হলো।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি দুর্নীতির মামলার বিচারকার্যও চলমান।
১) জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা, তেজগাঁও থানা মামলা নং-১৫, তারিখ-০৮.০৮.২০১১; টাকার পরিমাণ ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা।
২) নাইকো দুর্নীতি মামলা, তেজগাঁও থানা মামলা নং-১০, তারিখ-০৯.১২.২০০৭; রাষ্ট্রের ক্ষতি ১০ হাজার কোটি টাকা।
৩) বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতি মামলা, শাহবাগ থানা মামলা নং-৫৩, তারিখ-২৬.০২.২০০৮।
৪) গ্যাটকো দুর্নীতি মামলা, তেজগাঁও থানা মামলা নং-০৫, তারিখ-০২.০৯.২০০৭; দুর্নীতি ও প্রতারণার মাধ্যমে সরকারের মূল্যবান সম্পদ তথা আর্থিক ক্ষতি সাধনের অভিযোগ।
৫) সম্পদ বিবরণী দাখিলের মামলা, দুদুক তারিখ ১৭.০৭.২০০৭; ৩৪ লাখ টাকা জরিমানা দিয়ে কোটি টাকা সাদা করেছেন। খালেদা জিয়া ও তার পরিবারের সকল সদস্য কালো টাকা সাদা করেছেন।
গত ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় দ-াদেশ দেওয়ার পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের পুরনো ভবনে অস্থায়ী জেলখানায় রাখা হয়। কিন্তু আমরা লক্ষ করে দেখলাম, এই রায়ের পর বিচার বিভাগ ও জেল কর্তৃপক্ষ নিয়ে নানাবিধ অপ্রাসঙ্গিক ও আইন বহির্ভূত বক্তব্য প্রদান করা হচ্ছে। বর্তমানে বিচার বিভাগ একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান এবং জেল কর্তৃপক্ষকে জেল কোড অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। যেখানে আইনগতভাবে অন্য কারও হস্তক্ষেপ করার কোনো সুযোগ নেই।

Category:

প্রয়াতজন : শোক ও শ্রদ্ধাঞ্জলি

Posted on by 0 comment

3-4-2018 7-59-47 PMউত্তরণ প্রতিবেদনঃ ওবায়দুল কাদেরের মাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপির মা বেগম ফজিলাতুন্নেসা গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে মৃত্যুবরণ করেন (ইন্নালিল্লাহি … রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৯৬ বছর। তিনি চার পুত্র, ছয় কন্যাসহ বহু গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। ওবায়দুল কাদেরের মায়ের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। মৃত্যু সংবাদ শুনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টেলিফোনে ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে কথা বলে তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান।
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি বিকেল সোয়া ৩টায় নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের সরকারি মুজিব কলেজ মাঠে জানাজা শেষে তার লাশ বসুরহাট পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডে পারিবারিক কবরস্থানে স্বামীর কবরের পাশে দাফন করা হয়েছে।
জানাজা শেষে মরহুমার কফিনে কেন্দ্রীয় ও জেলা আওয়ামী লীগ ছাড়াও সহযোগী সংগঠন এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

বীর মুক্তিযোদ্ধা শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু
রংপুর সিটি কর্পোরেশনের (রসিক) সাবেক মেয়র ও সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা শরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু ২৫ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে ৩টায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি … রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৬ বছর।
সাবেক মেয়র ঝন্টু স্ত্রী, এক ছেলেসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০১২ সালে রংপুর পৌরসভা সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হওয়ার পর প্রথম মেয়র নির্বাচিত ঝন্টু।

রাঙ্গুনিয়ার সাবেক এমপি মোহাম্মদ ইউসুফ
জীবন সায়াহ্নে গুরুতর অসুস্থ থাকা চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার সেই নিঃস্ব সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং এক সময়ের তুখোড় বাম রাজনীতিক মোহাম্মদ ইউসুফ পরলোক গমন করেছেন। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা ২০ মিনিটে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্নালিল্লাহি … রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর। অকৃতদার এই ত্যাগী নেতা দুই ভাই, দুই বোন এবং অনেক আত্মীয়-স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মোহাম্মদ ইউসুফের মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বিকেলে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় অংশ নেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য এবং সংসদ সদস্যগণ। ১৯ ফেব্রুয়ারি বাদ জোহর রাঙ্গুনিয়া হাই স্কুল মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাকে পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
এই মুক্তিযোদ্ধার কর্মজীবন শুরু হয় ১৯৭৩ সালে কর্ণফুলী পাটকলে চাকরিতে যোগ দেওয়ার মধ্যে দিয়ে। ওই সময় থেকেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৭০ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত একটানা ২০ বছর শ্রমিক নেতা হিসেবে কাজ করে গেছেন জনকল্যাণে। এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর শুধুই কাজ করেছেন রাঙ্গুনিয়ার মানুষের কল্যাণে। নিজের আর্থিক ভিত্তি গড়ার চেষ্টা করেন নি। রাঙ্গুনিয়ার উন্নয়ন আর শ্রমজীবী মানুষের রাজনীতিতে নিবেদিতপ্রাণ ইউসুফের নিজের সংসারও করা হয়ে ওঠেনি। ২০০১ সালে পক্ষাঘাতে আক্রান্তের পর থেকে তিনি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন।

প্রবীণ আইনজীবী আদুর রব চৌধুরী
লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সুপ্রিমকোর্টের প্রবীণ আইনজীবী সিএসপি আবদুর রব চৌধুরী (৮৪) গত ১৮ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টায় ঢাকার গুলশানে নিজ বাসায় তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়েসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে যান।
রব চৌধুরীর পারিবারিক সূত্র জানায়, ১৮ ফেব্রুয়ারি সকালে হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব করেন তিনি। কিছুক্ষণ পরে বাসাতেই তার মৃত্যু হয়। রব চৌধুরী ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে বিএনপি থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন না পেয়ে বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করেন। ওই সময় তিনি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাম-লীর সদস্যের দায়িত্ব পালন করেন। বেলা ২টায় সুপ্রিমকোর্ট ভবন এবং বিকেল ৪টায় গুলশান এলাকায় জানাজা শেষে বনানী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

Category:

শীতল যুদ্ধ, শান্তি আন্দোলন ও পিস অফেনসিভ

Posted on by 0 comment

3-4-2018 7-16-48 PMপিস অফেনসিভ শব্দটি গভীর ব্যঞ্জনাধর্মী। এই শব্দটির উদ্গাতা সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি। অস্ত্র প্রতিযোগিতা, যুদ্ধের পাঁয়তারা এবং শীতল যুদ্ধের বিরুদ্ধে বিশ্বের শান্তিকামী মানুষকে সংগঠিত করা এবং জনমতের চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে যুদ্ধংদেহী তৎপরতা বন্ধ বা হ্রাস করার লক্ষ্য বিশ্বব্যাপী শান্তি আন্দোলন গড়ে তোলা হয়। পিস অফেনসিভ কথাটার অর্থ হয়ে দাঁড়ায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে শান্তি, সমরাস্ত্র শিল্পের বিকাশের বিরোধিতা, অস্ত্র প্রতিযোগিতার বিরুদ্ধে শান্তি, স্থানীয় বা আঞ্চলিক যুদ্ধ প্রতিহত করতে শান্তি এবং জাতিসমূহের স্বাধীনতা রক্ষায় শান্তি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। বিশ্বযুদ্ধের আগে সামরিক শক্তি এবং বিশ্বব্যাপী ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য গড়ে তোলা বা ধরে রাখা এবং সর্বত্র মোড়লিপণা যারা করত তাদের মধ্যে যুক্তরাজ্য অর্থাৎ ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি প্রভৃতি দেশ ছিল প্রধান। পর্তুগাল ও স্পেনেরও অনেক উপনিবেশ ছিল। ইতালি ও জার্মানি মূলত দুনিয়াকে নতুন করে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেওয়ার জন্য পুরাতন শক্তিধর বৃহৎ ঔপনিবেশিক শক্তি ইংল্যান্ড, ফরাসি ও রাশিয়াকে টার্গেট করে নিজেদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে এবং দু-দুটি বিশ্বযুদ্ধ বাধিয়ে মানবেতিহাসের নজিরবিহীন গণহত্যা ও জীবনহানি, সম্পদহানি এবং ধ্বংস সাধন করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর শক্তির ভারসাম্য বদলে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তি অর্থাৎ ‘জার্মানি-ইতালি-জাপানের’ পরাজয় নিশ্চিত করতে নিয়ামক ভূমিকা পালন করে। ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপে যুদ্ধ পরিসমাপ্তির পরও মূলত নিজের পারমাণবিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের উদ্দেশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। জনবহুল ঐ দুটো শহর মুহূর্তে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং পরমাণু বোমা সোভিয়েত ইউনিয়নকে শঙ্কিত করে তোলে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ইউরোপে জামার্নির পরাজয়ের নির্ধারক শক্তি ছিল সোভিয়েত বাহিনী। বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিনীদের মোকাবিলা করার মতো সামরিক শক্তির অধিকারী ছিল একমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়ন। ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দের ২৯ আগস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন তার প্রথম পারমাণবিক বোমার পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটায়। ফলে পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্রের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্যের সমাপ্তি ঘটে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে এই দুই পরাশক্তির মধ্যে শুরু হয় সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন ও বিশ্বব্যাপী প্রভাব বলয় সৃষ্টির অশুভ প্রতিযোগিতা। ১৯৪৭ সাল থেকেই কোল্ড ওয়ার বা ঠা-া যুদ্ধের যুগের শুরু।
শীতল যুদ্ধ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে রাজনৈতিক, ভাবাদর্শগত ও অর্থনৈতিক সংগ্রাম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশেষত ট্রুম্যান স্তালিন ও সোভিয়েত ইউনিয়নকে সহ্য করতে পারতেন না। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব ছিল সমাজতান্ত্রিক ও কমিউনিজমের ঘোর বিরোধী। তারা সমাজতন্ত্র ও সোভিয়েতের ধ্বংস কামনা করত। পক্ষান্তরে সোভিয়েত ইউনিয়নও বিপ্লব ও সমাজতন্ত্রের নামে পুঁজিবাদ উৎখাত, পশ্চিমা বিশ্বের মোড়লিপণাকে খর্ব করা এবং সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের চেষ্টা করত। আর এসবই ছিল ঠা-া যুদ্ধের প্রধান কারণ।
সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী তৎপরতার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জনমত সৃষ্টি এবং পরাধীন জাতিসমূহের স্বাধীনতা সংগ্রাম তথা জাতীয় মুক্তি আন্দোলনকে বেগবান করার উদ্দেশ্যে সাম্রাজ্যবাদী প্রভাব বলয়ের বাইরে ১৯৪৮ সালে পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশতে ‘ওয়ার্ল্ড কংগ্রেস অব ইন্টেলেকচুয়াল ফর পিস’ নামে একটি সম্মেলন অনুষ্ঠান করে। এই সমাবেশ থেকে একটি স্থায়ী সংগঠন গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইন্টারন্যাশনাল লিজিয়ন কমিটি অব ইন্টেলেকচুয়াল ফর পিস নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। ১৯৪৯ সালে এই কমিটির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ৭৫টি দেশের ২ হাজার প্রতিনিধি যোগদান করে। কমিটির বা সংগঠনের নাম হয় ওয়ার্ল্ড কমিটি অব পার্টিজান্স ফর পিস।
১৯৫০ সালে হেলসিংকিতে অনুষ্ঠিত হয় এই সংগঠনের দ্বিতীয় কংগ্রেস। সম্মেলনে সংগঠনের নতুন নামকরণ করা হয়, বিশ্বশান্তি পরিষদ। বিশ্বশান্তি পরিষদের প্রথম সভাপতি ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী ও ফ্রান্সের নোবেলজয়ী ফ্রেডারিক জুলিও কুরি। প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত ছিলেন ইলিয়া এরেনবুর্গ, আলেকজান্ডার ফাদায়েভ, ডিমিট্রি সেস্তোভিচ, ডব্লিউ বইস, পল রবসন, পাবলো পিকাসো, হাওয়ার্ড ফাস্ট, লুঁই আরাগঁ, জর্জ অ্যামাদো, পাবলো নেরুদা, গিয়র্গি লুকাস, বেনাটো গুটোস, জন পল সার্ত্রে, লেরি, দিয়াগো রিভেরা ও মোহাম্মদ আল আসমার প্রমুখ মনীষীসহ বিশ্বের বহু নোবেলজয়ী ও খ্যাতিমান বিজ্ঞানী, লেখক, শিল্পী, কবি, সাহিত্যিক, সংগীতশিল্পী।
বস্তুত, ১৯৪৭ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত বিশ্বশান্তি পরিষদ একটি কার্যকর সামাজিক ও সিভিল সোসাইটি আন্দোলন হিসেবে প্রভূত মর্যাদা অর্জন করে। ‘শান্তি পরিষদ’ বিশ্বশান্তি, স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সমাজ প্রগতির সংগ্রামে বিশেষ অবদানের জন্য ‘জুলিও কুরি’ শান্তি পুরস্কার প্রবর্তন করে। বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জুলিও কুরি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। বিশ্বে শান্তি ও মুক্তির বাতাবরণ সৃষ্টি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবাজ শাসকগোষ্ঠীর কর্তৃত্ববাদী তৎপরতার বিরুদ্ধে শান্তি পরিষদ ছাড়াও অনেকগুলো আন্তর্জাতিক সংগঠন গড়ে ওঠে। এর মধ্যে রয়েছেÑ
১. খ্রিস্টান পিস কনফারেন্স ২. প্রতিরোধ সংগ্রামীদের আন্তর্জাতিক ফেডারেশন ৩. ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পিস ৪. আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক আইনজীবী সংগঠন ৫. আন্তর্জাতিক অরগানাইজেশন অব জার্নালিস্ট ৬. ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব স্টুডেন্টস ৭. ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব ডেমোক্রেটিক ইয়ুথ ৮. ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব সাইন্টিফিক ওয়ার্কার্স ৯. ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন অব ট্রেড ইউনিয়নস ১০. উইমেনস ইন্টারন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফেডারেশন ১১. ওয়ার্ল্ড পিস এসপারেন্টো মুভমেন্ট ইত্যাদি।
বস্তুত, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপীয় সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর আর্থিক সহায়তায় বিশ্বশান্তি পরিষদসহ উল্লিখিত সংগঠনগুলো পরিচালিত হতো। ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকিতে বিশ্বশান্তি পরিষদের হেডকোয়ার্টার ছিল। মানব বিধ্বংসী নতুন নতুন পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা এবং পরমাণু অস্ত্রের বিস্তারের বিরুদ্ধে, নিরস্ত্রীকরণ, মানব বিধ্বংসী অস্ত্রের পুনরুৎপাদনশীল ক্ষমতা বৃদ্ধির বিরুদ্ধে এবং সত্তরের দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধ, দেশে দেশে মার্কিন আগ্রাসন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রভৃতি ইস্যুতে বিশ্বশান্তি পরিষদ পশ্চিমা বিশ্বসহ সর্বত্র সুশীল সমাজের সংগঠিত আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে।
বিশ্বশান্তি পরিষদ (ডব্লিউপিসি) দেশে দেশে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা, জাতিসমূহের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সমুন্নত রাখা, অস্ত্র প্রতিযোগিতা হ্রাস, সকল প্রকার পরমাণু অস্ত্র উৎপাদন বন্ধ তথা নিরস্ত্রীকরণের পক্ষে প্রচারাভিযান ও জনমত গঠনে নিয়োজিত ছিল। বাংলাদেশেও বিশ্বশান্তি পরিষদের শাখা রয়েছে। ১৯৭১-এর পরেও দীর্ঘদিন বিশ্বশান্তি পরিষদের সভাপতি ছিলেন ভারতের রমেশচন্দ্র। বাংলাদেশ শান্তি পরিষদের সভাপতি ছিলেন প্রয়াত কবি সুফিয়া কামাল প্রমুখ।
সোভিয়েত তাত্ত্বিকদের মতে, এভাবেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের যুদ্ধবাজ নীতি প্রতিরোধের জন্য ‘শান্তি আন্দোলনকে’ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করাকেই চবধপব ঙভভবহংরাব হিসেবে আখ্যায়িত করা হতো।
সম্প্রতি মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নৃ-গোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করা এবং লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের শান্তির নীতিকে অনেকেই ‘পিস অফেনসিভ’ হিসেবে বিবেচনা করেন। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার জাতিসংঘে প্রদত্ত ভাষণ ও ৫-দফা সমাধান সূত্র, রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দান ও মানবিক সাহায্য প্রদানের অঙ্গীকার ঘোষণা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে মিয়ানমার শাসকগোষ্ঠীর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলার এবং কূটনৈতিক তৎপরতার যে অবস্থান তিনি নিয়েছেন, এক কথায় তাকে ‘পিস অফেনসিভ’ বলা যেতে পারে। তার এই শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের ফলে মিয়ানমার অস্বীকৃতির অবস্থান থেকে সরে এসে রোহিঙ্গা সমস্যার বাস্তবতা মেনে নিতে এবং তাদের সে দেশে ফিরিয়ে নিতে আনুষ্ঠানিক চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছে।
সোভিয়েত আমলের ‘পিস অফেনসিভ’ কথাটি বর্তমানে একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতায় নতুন ব্যঞ্জনা লাভ করেছে।

Category:

বিএনপি এখন দ-প্রাপ্ত পলাতক আসামির পকেটে

Posted on by 0 comment

প্রকৃত বিচারে এমনটা না হলে তারেক জিয়া যোগ্য মায়ের যোগ্য সন্তান হয় কীভাবে! দ-িত মা ও ছেলেÑ দুজনই যে কতটা যোগ্য এর প্রমাণ পাওয়া যায় তাদের বায়োডাটার দিকে তাকালে। 

স্বখাত সলিলে খালেদা জিয়া

স্বখাত সলিলে খালেদা জিয়া

শেখর দত্ত: ‘যুক্তরাষ্ট্র বিশ^াস করে তারেক জিয়া গুরুতর রাজনৈতিক দুর্নীতির জন্য দোষী, মার্কিন জাতীয় স্বার্থের ওপর একটি বিরূপ প্রভাব ফেলছে।’ ২০০৮ সালের ৩ নভেম্বর সুবিখ্যাত ওয়েবসাইট উইকিলিক্স যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের গোপন বার্তার এই তথ্যটি প্রকাশ করে। প্রকাশিত ওই গোপন বার্তায় ছেলে তারেক জিয়ার নাম থাকলেও মা খালেদা জিয়ার নাম ছিল না। নামটি উল্লিখিত বার্তায় না থাকলেও তখন দেশবাসী ২০০১-০৬ সালের বিএনপি-জামাত জোট আমলের অভিজ্ঞতা থেকে জানত খালেদা জিয়া নানা ধরনের দুর্নীতির সাথে যুক্ত এবং কতক মামলায় অভিযুক্ত। সুদীর্ঘ বছর আদালতে মামলা চলার পর এখন দেখা যাচ্ছে রসুনের গোড়া একই জায়গায়। মা ও ছেলে দুজনই দুর্নীতির দায়ে অপরাধী। তেমনটা হওয়াই স্বাভাবিক। কেননা মা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আশ্রয়-প্রশ্রয়-উৎসাহ না পেলে তো আর ছেলে তারেক জিয়া তখন ‘হাওয়া ভবন’ বা ‘খোয়াব’-এর মতো দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের কেন্দ্র বানাতে পারত না! পারত না গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের মতো ব্যবসায়িক পার্টনার কিংবা লুৎফুজ্জামান বাবরের মতো সন্ত্রাসী পার্টনার যথাস্থানে বসাতে!
মা ও ছেলে। খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়া। বিএনপি-জামাত জোট ও বিএনপি দলের এক নম্বর ও দুই নম্বর নেতা। দুজনই জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় আদালতের রায়ে দ-িত। লেখাটা যখন লিখছি, তখন বৃদ্ধা মা খালেদা জিয়া রয়েছেন ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডের পুরনো কারাগারে। জামিনের আবেদন করা হয়েছে হাইকোর্টে। জামিন পেয়ে তিনি বের হয়ে আসতে পারবেন কি না তা আদালতই বলতে পারবে। তবে মা যখন জেলে তখন পুত্র তারেক জিয়া রয়েছে বহাল তবিয়তে স্ত্রী-কন্যা নিয়ে প্রবাসে, লন্ডনে। দেশে থাকলে আইন অনুযায়ী তাকে ২০০৭ সালে গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে জেলেই থাকতে হতো। ছেলের সৌভাগ্য মা তখন গ্রেফতার থাকা অবস্থায়ও পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে মৌখিক মুচলেকা দিয়ে ছেলেকে জেল থেকে বের করে প্রবাসে পাঠাতে সক্ষম হন। ছেলে এখন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন হয়েছেন বটে; কিন্তু দেশে এসে মায়ের জন্য কিছুই করার সাহস ও হিম্মত তার নেই। যৌথ কৃতকর্মের ফল ভোগ করছেন কেবল একা মা। এই বিচারে ছেলে বটে তারেক জিয়া!
প্রকৃত বিচারে এমনটা না হলে তারেক জিয়া যোগ্য মায়ের যোগ্য সন্তান হয় কীভাবে! দ-িত মা ও ছেলেÑ দুজনই যে কতটা যোগ্য এর প্রমাণ পাওয়া যায় তাদের বায়োডাটার দিকে তাকালে। প্রসঙ্গত শিক্ষা যেমন জাতির মেরুদ-, তেমনি যে কোনো ব্যক্তিকে যদি নৈতিকতা বজায় রেখে মানসম্মান নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে হয়, তবে শিক্ষা জরুরি। অল্প বিদ্যা আসলেই ভয়ঙ্কর। এর মধ্যে ক্ষমতা যুক্ত হলে হয় অতি ভয়ঙ্কর। মা খালেদা জিয়া পড়েছিলেন দশম শ্রেণি পর্যন্ত। একাধিকবার এসএসসি পরীক্ষায় ফেল করেছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম দিনাজপুর গার্লস হাই স্কুল। এসব দেশবাসী সবারই জানা।
কিন্তু পুত্র তারেকের শিক্ষার দিকটা রহস্যময়। রয়েছে দুই ধরনের তথ্য। প্রথম তথ্যমতে তারেক জিয়া ঢাকা রেসিডেন্টসিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে মাধ্যমিক এবং নটর ডেম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। মতান্তরে বিএফ শাহীন স্কুলে লেখাপড়া করলেও পরীক্ষা দেন ঢাকা গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুল থেকে। ১৯৮৪ সালে প্রথমে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে আইন ও পরে লোক প্রশাসন বিভাগে ভর্তি হন। কিন্তু পরে স্বভাবজনিত কারণে পড়াশোনা আর অগ্রসর করতে পারে নি।
আসলেই ছাত্র বা পড়াশোনার মধ্যে থাকা তারেক জিয়ার জন্য খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল। প্রথম থেকেই বড়দের কথা শোনা ও মান্য করা ছিল তার অনীহা। ফলে লেখাপড়া ভালোভাবে হয়ে ওঠে নি। যতদূর জানা যায়, সেন্ট জোসেফ স্কুলের ছাত্র ছিল প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বড় পুত্র তারেক রহমান। কিন্তু পরপর দুবার ফেল করার কারণে ট্রান্সফার সাটিফিকেট নিয়ে ওই স্কুল ছাড়তে হয়। ধারণা করা যায়, তারেক জিয়া কখনও না কখনও ঢাকা রেসিডেন্টসিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ছাত্র ছিল এবং সেখানে পড়ার সময়েই সেই স্কুলের ছাত্র খোয়াব খ্যাত গিয়াস আল মামুনের সাথে সখ্য গড়ে ওঠে। রাষ্ট্রপতি পিতার ছেলে স্কুল থেকে টিসি পায়, কোথায় কতটুকু পড়েছে জানা যায় না, বিএ পর্যন্ত পাস করতে পারে না; এমনটা কি আসলে চিন্তা করা যায়! এখন বলা হচ্ছে, তারেক জিয়া না-কি লন্ডনে আইন পড়ছে। এখানেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম গোপন থাকছে। সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় হলো শিক্ষা নিয়ে মতান্তরের এই জটটা কখনও ভাঙতে যায়নি তারেক জিয়া।
ঠিক যেমন নিজের জন্ম তারিখের জটও কখনও পরিষ্কার করেন নি খালেদা জিয়া। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় হঠাৎই জাতীয় শোক দিবস ১৫ আগস্টে জন্মদিন পালন শুরু করেন খালেদা জিয়া। ক্ষমতার মদমত্তে পাগল হয়ে জাতির কোন স্পর্শকাতর ও মর্যাদার জায়গাটায় জন্মদিন পালনের ভেতর দিয়ে আঘাত করতে চাওয়া হয়, তা কারোই না বোঝার কথা নয়। জাতির পিতা ও অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম নিয়ে দল করা যাবে না মর্মে সামরিক ফরমান জারি করেছিলেন প্রেসিডেন্ট জিয়া। দেশের রাজনীতি থেকে এই মহান নেতার নাম উৎপাটন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পারেন নি। সেই পথ অনুসরণ করেই খালেদা জিয়া-তারেক জিয়া আমলে বঙ্গবন্ধুকে হেয় বা খাটো করা, কটাক্ষ বা তুচ্ছ-তচ্ছিল্য করার উদ্দেশ্যেই এমন শোকাবহ একটি তারিখে জন্মদিন পালন করা হতে থাকে। আসলে অন্তত ৪-৫টি জন্মদিন পাওয়া যায় খালেদা জিয়ার। ভাই সাইদ ইস্কান্দর বলেন ৫ সেপ্টেম্বর, মা তৈয়বা খাতুন বলেন মার্চ মাস, বিয়ের কাবিননামায় ৫ আগস্ট আর নির্বাচন ফরমে ১৯ আগস্ট। ছেলের পড়াশোনার মতোই মায়ের জন্মদিন ঘিরে রয়েছে এমন সব রহস্যের জট।
প্রসঙ্গত, ট্রান্সপারেন্ট থাকাটা রাজনীতিকদের বড় গুণ। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা হচ্ছে গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রধান কথা। কিন্তু জিয়া পরিবারের আদ্যোপান্ত সবকিছুই কেমন যেন রহস্যঘেরা। মেজর জিয়া কী জন্য মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিনগুলোতে চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন, তা কখনও যেমন সুস্পষ্ট করা হয় নি; তেমনি ওই দিনগুলোতে খালেদা জিয়া কীভাবে হানাদার বাহিনীর ক্যান্টনমেন্টে গেলেন আর থাকলেন তাও স্পষ্ট করা হয় নি। ‘মুক্তি’ হওয়ার কারণে অগণিত মুক্তিযোদ্ধার বাড়িঘর পোড়ানো এবং নিরীহ মা-বাবাসহ আত্মীয়-স্বজনকে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু দুই শিশুপুত্রকে নিয়ে বহাল তবিয়তে খালেদা জিয়া সেখানে থাকলেন কীভাবে তা ভাবলে বিস্মিত হতে হয়।
তবে জিয়া পরিবারের রহস্যের সব জট আসলে লুক্কায়িত রয়েছে ‘ছেঁড়া সার্ট’ ও ‘ভাঙা সুটকেস’-এর মধ্যে। এসব দেখিয়ে সহানুভূতির ঢেউ তুলে তৎকালীন বিএনপি সরকার রাষ্ট্র থেকে ভরণপোষণ ও থাকার জায়গাসহ সব বিষয়ে সব ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা করা হয়েছিল নাবালক দুই পুত্র ও বিধবা স্ত্রীকে। আর এখন! ওই পরিবারের দেশে-বিদেশে কোথায় কোন সম্পদ কীভাবে রয়েছে তার সব হিসাব বোধকরি কেউ দিতেও পারবেন না। জরিমানা দিয়ে কালো টাকা সাদা করেছিলেন খালেদা জিয়া। কোকো জীবিত থাকতে দুই পুত্রের অর্থ সম্পদ নিয়ে ঝগড়ার কথা কম-বেশি সবারই জানা। আর সৌদি আরবে সুটকেস নিয়ে যাওয়ার সবটা তো এখন গল্পকথার মতো। অর্থপাচার মামলায় এফবিআই কর্মকর্তা ডেবরা লাপ্রেভেটি সাক্ষ্য প্রদানের কথাও দেশবাসীর অজানা নয়। সাধে সাধে তো আর তারেক জিয়া মানি লন্ডারিং মামলায় সাজাপ্রাপ্ত কিংবা ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেফতারি পরওয়ানা জারি হয় নি! প্রসঙ্গত, খালেদা জিয়ার রয়েছে ৩৩টি মামলা আর তারেক জিয়ার ১৩টি। এর মধ্যে পুত্রের দুটি ও মায়ের একটি মামলায় সাজা হলো। আরও কতটি মামলায় কী প্রমাণিত হবে এবং আদালত কী রায় দেবে কে জানে!
বিএনপি দলটি আসলে দেশবাসীকে বোকা বা অন্ধ ভাবে। নতুবা যা ইচ্ছে তাই করে চলতে পারে কীভাবে! রাজনৈতিক দলে এমন নিয়ম চালু আছে, প্রধান নেতা বিদেশে বা জেলে গেলে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে কাউকে দায়িত্ব দিয়ে যেতে হয়। বিএনপির ক্ষেত্রে দেখা গেল এই নিয়ম কার্যকর থাকছে না। কিছুদিন আগে খালেদা জিয়া যখন বহুদিন লন্ডন থাকলেন, তখন কাউকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের দায়িত্ব দেওয়া হয় নি। এবারে তিনি গ্রেফতার হলে দায়িত্ব দেওয়া হলো ফৌজদারি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হাওয়া ভবন খ্যাত প্রবাসী তারেক রহমানকে। প্রবীণরা দেশে সক্রিয় থাকতে কোনো বৈঠক ছাড়া দ্বিতীয় পর্যায়ের নেতা রিজভীর ঘোষণায় শূন্য পদে তারেককে বসিয়ে দেওয়া প্রবীণ নেতাদের অপমান করারই নামান্তর। আর কেবল পারিবারিক বিবেচনায় ওপর থেকে বসিয়ে দেওয়া এই নেতা যে অতি বিতর্কিত তা কারোরই অজানা নয়। কেবল দুর্নীতির কারণেই নয় সন্ত্রাসী ও উগ্রজঙ্গিদের পৃষ্ঠপোষকতার জন্যও মানুষের মধ্যে, কূটনৈতিক মহলে তারেক জিয়ার ইমেজ খুবই খারাপ। খালেদা জিয়া গ্রেফতারের পর বৈঠক ছাড়া এক ঘোষণায় এই নিয়োগ দেওয়ায় ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে অদ্ভুত ও অভূতপূর্ব। সার্বিক বিচারে কার্যকরি চেয়ারপারসন হিসেবে তারেক জিয়া এখন বিএনপির গলার ফাঁস।
তবে, এই নিয়োগের চাইতেও দেশের রাজনৈতিক দলের ইতিহাসে সবচেয়ে অদ্ভুত ও অভাবিত কাজটি করেছে বিএনপি দলটি। দলটি হঠাৎ করেই দলীয় গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করেছে। গঠনতন্ত্রের ৭ ধারায় ‘কমিটির সদস্যপদের অযোগ্যতা’ শিরোনামে বলা হয়েছে যে, “নিম্নোক্ত ব্যক্তিগণ জাতীয় কাউন্সিল, জাতীয় নির্বাহী কমিটি, জাতীয় স্থায়ী কমিটি বা যে কোনো পর্যায়ের যে কোনো নির্বাহী কমিটির সদস্যপদের কিংবা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থীপদের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। তারা হলেনÑ ক. ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশ বলে দ-িত ব্যক্তি, খ. দেউলিয়া, গ. উন্মাদ বলে প্রমাণিত ব্যক্তি, ঘ. সমাজে দুর্নীতিপরায়ণ বা কুখ্যাত বলে পরিচিত ব্যক্তি।” এই বিচারে খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়া কোনো পদে যেমন থাকতে পারেন না, তেমনি নির্বাচনেও অনুপযুক্ত বলে বিবেচিত হবেন।
প্রসঙ্গত, বিএনপি দলটির সম্মেলন হয়েছে ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। দুই বছর হয়ে গেলেও দলটি গঠনতন্ত্র প্রকাশ করেনি এবং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী সংশোধিত গঠনতন্ত্র নির্বাচন কমিশনে এতদিন জমা দেয় নি। তাই প্রশ্ন হচ্ছে দুটো। প্রথমত; তাড়াহুড়া করে পরিবর্তন করা হলো কেন? দ্বিতীয়ত; সম্মেলন ছাড়া এভাবে গঠনতন্ত্র পরিবর্তন কি করা যেতে পারে? বিএনপি যেহেতু ওই সম্মেলনের পর গঠনতন্ত্র ছাপায় নি, তাই বলার উপায় নেই, সম্মেলনে ছাড়া এমন তড়িঘড়ি করে গঠনতন্ত্রের মতো দলের পবিত্র আমানত দলটি পরিবর্তন করতে পারে কি না? তবে দুর্নীতির মামলায় দ-িত খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়াকে দলের নেতৃত্বপদে রাখা এবং তারেক জিয়াকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন করা তথা পরিবারতন্ত্র টিকিয়ে রাখার জন্য যে পরিবর্তন করা হয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
তবে প্রশ্ন হলো বিএনপি গঠনতন্ত্রের পুরো ৭ ধারা বাতিল করল কেন? বিএনপি পাগল ও দেউলিয়াদেরও কি দলীয় পদে রাখতে চায়! সর্বোপরি, ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশ বলে যারা দ-িত হয়েছে এরা কারা? মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীরা নয় কি? কোন জায়গায় ছাড় দিচ্ছে বিএনপি তা সুস্পষ্ট। এই পরিবর্তন করে বিএনপি দলের মধ্যে স্থায়ীভাবে যে বিষবৃক্ষ রোপণ করল তার ফল দলটিকে আজন্ম ভোগ করে যেতে হবে। ধরে নেওয়া যাক, খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়া দুর্নীতির মামলাগুলো থেকে খালাস পেল। তখন কি বিএনপি আবার এই ধারা যুক্ত করতে পারবে? তখন দুর্নীতিবাজ বলে চিহ্নিতরা তা হতে দেবে না। আসলে দুর্নীতিবাজদের নিশ্চিন্তে রাজনৈতিক নেতা হিসেবে থাকার একটা সুন্দর জায়গা করে দিল বিএনপি। প্রকৃত বিচারে এই সংশোধনের ভেতর দিয়ে বিএনপি দুর্নীতিতে নিমজ্জিত জিয়া বংশকেই কেবল ছাড় দিল না, ছাড় দিয়ে দিল দুর্নীতিবাজদেরও। এই ছাড় দেওয়া দেশের সংবিধান এবং এমনকি বিএনপি দলটির ঘোষিত নীতি ও কর্মসূচির সাথেও সাংঘর্ষিক। এই পরিবর্তনের পর ১৯৭৬ সালে দলটি প্রতিষ্ঠার সময় জিয়া ঘোষিত ১০-দফা তথা দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জেহাদের’ ঘোষণা কিংবা ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়া কর্তৃক দেশবাসীকে সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ‘উপহার’ দেওয়ার ঘোষণা নিঃসন্দেহে পরিহাসের মতো শোনাবে। আর দুর্নীতির অপরাধে দ-িত খালেদা জিয়ার জেলে যাওয়া ও তারেকের প্রবাসে থাকা বিয়োগান্তক এক প্রহসন নাটকের মঞ্চায়ন বলেই মনে হবে।
খালেদা জিয়া ও তারেক জিয়ার বিয়োগান্তক এই প্রহসনের নাটকে খলনায়কের চরিত্রে আছে আসলে জামাত। ২০১৪ সালে যখন যুদ্ধাপরাধী জামাত নেতাদের মামলায় শাস্তি হচ্ছিল, তখন জামাতের বিপদে বিএনপি দাঁড়িয়েছিল পাশে। জামাতের জন্য কি না করেছে বিএনপি! ক্ষমতায় গিয়ে জাতীয় পতাকা উড়াতে দিয়েছিল। আর বিরোধী দলে থাকতে জামাতের সাক্ষাৎ মুরব্বি পাকিস্তানের কথা শুনে যুদ্ধংদেহী আগুন সন্ত্রাস পর্যন্ত চালিয়েছিল। কিন্তু এখন বিএনপির বিপদের দিনে জামাত নামছে না রাস্তায়। যদি না নামে তবে কি হবে জোটের অবস্থা! এটা কার না জানা যে, সংকট তীব্র হলে দল ও জোটে ভাঙন হয়। সংকটে তো পড়ছে বিএনপি। কে জানে কি কপালে আছে বিএনপি ও বিএনপি-জামাত জোটের!
বিএনপির জন্য আরও দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে, আন্তর্জাতিক মহল বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার শাস্তি ও গ্রেফতারে নীরব। কোনো দেশই খালেদা জিয়ার গ্রেফতারের প্রতিবাদ কিংবা মুক্তি দাবি করেনি। জামাত নেতাদের বিচারে শাস্তি হলে পাকিস্তান পার্লামেন্ট বিবৃতি দিয়েছিল। কিন্তু খালেদা ও তারেক প্রশ্নে পাকিস্তানও নীরব। বলাই বাহুল্য, বহু সমালোচিত ও দ-িত তারেক জিয়া কার্যকরী চেয়ারপারসন হওয়ার ফলে আন্তর্জাতিক মহলের কোনো সাপোর্ট পাওয়া এখন দিল্লি দুরস্তের মতো ব্যাপার-স্যাপার হবে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিএনপির বিচ্ছিন্নতা চরমে উঠবে।
সব মিলিয়ে বিএনপি এখন দাঁড়িয়ে আছে ক্রস রোডে। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় বিএনপি এটা প্রমাণ করেছে এবং সর্বমহলেই স্বীকৃত যে, গণসম্পৃক্ত আন্দোলনের দল নয় বিএনপি। সুবিধাবাদী, সুযোগসন্ধানী, দলছুটদের নিয়ে ক্ষমতায় থেকে ক্যান্টনমেন্টে প্রতিষ্ঠা পাওয়া দল হচ্ছে বিএনপি। যদি আন্দোলনের দল নয় কথাটাকে মিথ্যা প্রমাণিত করতে পারে বিএনপি, তবে দলটির ভবিষ্যৎ আছে। আর যদি না পারে তবে দুর্ভোগ দুর্দশা ভাঙন বিচ্ছিন্নতা যে ভাগ্যে জুটবে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। প্রভাবশালী সাময়িকী ইকোনমিস্ট ঠিকই লিখেছে যে, ‘খালেদার সাজায় খোড়া হয়ে গেল বিএনপি’। ওই পত্রিকাটি আরও লিখেছে যে, ‘জেল থেকে বের হয়ে আসার সুযোগ থাকলেও খালেদার ভাগ্য প্রায় নির্ধারিতই হয়ে গেছে বলা যায়। এই রায়ের ফলে জিয়া বংশের পতনের পথ প্রশস্ত হলো।’ অবস্থাদৃষ্টে সেটাই তো মনে হচ্ছে।

Category:

বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদদের মুক্তিযুদ্ধ

Posted on by 0 comment

আরিফ সোহেলঃ পাকিস্তানিদের অনাহূত বাড়াবাড়ি মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ অনিবার্য­­ হয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের দামামায় এই অঞ্চলের মানুষ ক্ষোভের অনলে জ্বলতে থাকে। তার প্রতিফলন দেখা যায় খেলার মাঠেও। একাত্তর সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকা স্টেডিয়ামে চার দিনের ম্যাচ চলছিল পাকিস্তান এবং কমনওয়েলথ একাদশের মধ্যে। ১ মার্চ ম্যাচের শেষ দিন দর্শকরা খেলা উপভোগ করছিল। ঠিক সেই সময়ে বেতারে দুপুর ১টার খবরে বলা হয়, ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে দিয়েছে। জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের ওই অধিবেশনে সরকার গঠন করার কথা ছিল। অধিবেশন স্থগিত করায় বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে সাধারণ মানুষ। স্বাধিকারের চেতনায় অনুপ্রাণিত ঢাকা স্টেডিয়ামের দর্শকরা মুহূর্তেই প্রতিবাদ হিসেবে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা পুড়িয়ে দেয়।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র যেমন সাংস্কৃতিক কর্মকা- করে প্রতিদিন একটু একটু করে এগিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশকে; তেমনি স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলও বাংলাদেশের বিজয়ে অনুঘটক হিসেবে ভাগিদার ও দাবিদার। ফুটবলারদের সঙ্গে ক্রীড়াবিদরা তাল মিলিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন। মিছিলে, মিটিংয়ে, আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার পাশাপাশি অনেক ক্রীড়াবিদ খেলার মাঠ থেকে সরাসরি সশস্ত্রযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। লড়াই করেছেন জীবন বাজি রেখে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেনÑ ক্রিকেটার ও সংগঠক শেখ কামাল, ফুটবলার মেজর (অব.) হাফিজ, নূরুন্নবী, মাসুদ ওমর, হকির হাবিবুল, বাস্কেটবলের কাজী কামাল, কুস্তিগীর খসরু, ভলিবলের কবীর, সাঁতারু এরশাদন্নবী প্রমুখ। খেলার মাঠের মতো যুদ্ধের মাঠেও তারা দেখিয়েছেন অসম সাহসিকতা।
স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন লড়াকু মুক্তিযোদ্ধা ক্রিকেটার জুয়েল, ফুটবলার মজিবর, সারোয়ার, কুটু মনি, বাবুল, সোহরাওয়ার্দী, বাবুল, মিজান, অ্যাথলেট মিরাজ, তপন চৌধুরী, শাহেদ আলী, দাবার ক্বাসেদ, সাদিক, হকির মীরু প্রমুখ। প্রাণ দিয়েছেন দৈনিক অবজারভার পত্রিকার ক্রীড়া সম্পাদক ও ক্রীড়া সংগঠক আবদুল মান্নান লাড়–, আজাদ বয়েজ ক্লাবের নিবেদিতপ্রাণ ক্রিকেট সংগঠক মুশতাক, নোয়াখালীর ক্রীড়া সংগঠক ভুলু প্রমুখ।
বিশ্ব ঐতিহ্যের প্রামাণ্য দলিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রমানের ৭ মার্চের ভাষণের পর বিপ্লবী বাঙালিরা আর বসে থাকেন নি। পরিস্থিতি অনুধাবণ করেই জাতির পিতা গর্জে ওঠেনÑ “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” পিতার এই আহ্বানের পর সর্বস্তরের মানুষ মাঠে নেমে পড়ে। ৯ মাসের আন্দোলন-সংগ্রাম, সর্বোপরি রক্ত আর মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশ। মহান মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কত কতজনের আত্মত্যাগ। প্রিয়তম সম্পদ জীবনকে মরণের পথে নিয়ে যাওয়া; কিংবা ফিরে আসা সব নাম তো আর আলোচনায় উঠে আসে না। বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে ক্রীড়াঙ্গনের জানা-অজানা অনেক সাহসী যোদ্ধাই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। কেউবা একাকী বেছে নেন জীবনবাজি রেখে বন্ধুর পথ। আবার কেউবা লড়াইয়ে ময়দান কাঁপিয়েছেন সম্মিলিত উদ্যোগ নিয়েÑ স্বাধীন বাংলা ফুটবল তেমন একটি। খেলোয়াড়ি জীবনে প্যাটেল ফুটবলার হলেও হকি ক্রিকেটে নাম লিখিয়েছেন।
এই স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন সাইদুর রহমান প্যাটেল। তার সাহস, তার বিচক্ষণতা, তার দূরদর্শিতা আলোকিত করেছে বাংলাদেশকে। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনকে। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি যে ভূমিকা রেখেছেন, তা ইতিহাস হয়ে আছে। যে কারণে ক্রীড়াঙ্গন ও রাজনীতির অঙ্গনে তিনি আলাদা একটি অবস্থান গড়ে নিয়েছেন।
ঢাকার সন্তান সাইদুর রহমান প্যাটেল শৈশব থেকেই ছিলেন দুরন্ত স্বভাবের। গলিতে বন্ধু-বান্ধবরা মিলে ফুটবল খেলার পাশাপাশি সাঁতার, হাইজাম্প, দাড়িয়াবান্ধা, এক্কাদোক্কা, ক্যারমÑ সব ধরনের খেলাতেই মন ছিল প্যাটেলের। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের অন্যতম সংগঠক প্যাটেল নিজে খেলেছেন। আবার এই খেলাকে সংগঠিত করার কারিগর হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে বাঙালির মুক্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে অনেক ঝুঁকি নিতে হয়েছে। সেই স্মৃতি আজও অম্লান।
ক্রীড়ার সঙ্গে নাড়ির সম্পর্ক থাকলেও প্যাটেল রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন অল্প বয়সেই। ইস্পাতদৃঢ় মনের অধিকারী। রাজনীতির সূত্রেই জাতির পিতার জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামালের সঙ্গেও পরিচয় হয়। এই পরিচয়ের রেশ ধরে পরবর্তীকালে কামালের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। যা আজও তিনি সগৌরবে বলে বেড়ান। ১৯৬৯ সালের মার্চে ঢাকা স্টেডিয়ামে পাকিস্তান এবং ইংল্যান্ডের মধ্যে টেস্ট ম্যাচ চলাকালে গ্যালারিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিসহ অন্যান্য স্লোগান দেওয়ার কারণে স্টেডিয়াম থেকে বের হওয়ার সময় খেলোয়াড় শিরু ও প্যাটেলকে গ্রেফতার করে রমনা থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জনসভায় সবচেয়ে বড় মিছিল নিয়ে যোগ দেন প্যাটেলরা। মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার প্রেরণা সেখান থেকেই। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতে পাড়ি দিয়েছেন ৩১ মার্চ রাতে। আর ভারত যাওয়া পরপরই খেলাধুলার মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্য আর্থিক খাত খুঁজে বের করার স্বপ্ন দেখেন; স্বপ্ন দেখেন একটি ফুটবল দল গঠনের। সেই চিন্তা থেকে ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে মুজিবনগর সরকারের দফতরে যান। সেখানে কামরুজ্জামান, ইউসুফ আলী ও শামসুল হক অবস্থান করছিলেন। কামরুজ্জামানসহ তাদের সঙ্গে আলোচনার পর ফুটবল দল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
দেশের জন্য কিছু একটা করার সুযোগ তিনি কাজে লাগিয়েছেন। খেলোয়াড় সংগ্রহ করার জন্য মঈন সিনহাকে ঢাকা পাঠানো হয়। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল সংক্রান্ত নিউজ প্রচারের জন্য স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে গিয়ে দেখা পান অভিনেতা হাসান ইমাম ও আলী যাকেরের সঙ্গে। তারা তা প্রচারের আশ্বাস দেন। একে একে যুক্ত হন ফুটবলার আশরাফ, আলী ঈমাম, প্রতাপ শঙ্কর হাজরা, নূরুন্নবী, মোহাম্মদ মহসীন, মুজিবর রহমান, শাহজাহান, লালু আইনুল, কায়কোবাদ, অমলেশ, সালাউদ্দিন, এনায়েত, লুৎফরের মতো ফুটবলার। তাদের নিয়ে পূর্ণাঙ্গ একটি দল গড়ে ওঠে। পৃথিবীর ইতিহাসে স্বাধীন বাংলা ফুটবল এক অনন্য অসাধারণ মর্যাদার আসনে বসেছে। এই দলটি ভারতে ১৬টি ম্যাচ খেলেছে। সরকারের কোষাগারে ৫ লাখ টাকাও জমা দিয়েছে। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সবাই এক একটা ইতিহাস এবং কীর্তিগাঁথা; এটা আমাদের অজানা নয়।
মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে প্যাটেল শর্ট ট্রেনিং নিয়েছেন ভারতে। চতুর্থ বেঙ্গলের সিলেটবাসী সুবেদার শামসু, সুবেদার মোহাম্মদ আলী, সুবেদার মান্নান আমাদের ট্রেনিং দিয়েছেন। প্রথম অপারেশন ছিল বেশ উৎসাহব্যঞ্জক। পাকিস্তানি আর্মির বেইজ কনস্তালা ক্যাম্প। কিছুটা দূরে সম্ভবত সূর্যনগর গ্রামে ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর একটি ক্যাম্প। আক্রমণের ফলে ওখানে একজন অফিসারসহ ১১ জন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়।
এই স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের বাইরে নামিদামি খেলোয়াড়রা ছাড়া বাংলাদেশের অসংখ্য ক্রীড়াবিদ মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অস্ত্র হাতে লড়াই করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম জাতির পিতার বড় ছেলে শেখ কামালের বন্ধু তানভির মাজাহার তান্না। তিনি ছিলেন একজন নামকরা ক্রিকেটারও। তাকে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের ম্যানেজার করা হয়।
শুধু সাঁতারু বললে অবশ্য কম বলা হয়, অরুণ নন্দী ছিলেন সাঁতারু মুক্তিযোদ্ধা। না, রণাঙ্গনে সশস্ত্র যুদ্ধ তিনি করেননি। একাত্তরে নেমেছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার লড়াইয়ে। কলকাতার এক সুইমিং পুলকেই বেছে নিয়েছিলেন যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে। যুদ্ধে নেমে গড়েছিলেন দূরপাল্লার সাঁতারে নতুন বিশ্বরেকর্ড। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন জনমত গঠনের জন্য কলকাতার কলেজ স্কয়ার ট্যাঙ্কে ৯০ ঘণ্টা ৫ মিনিট সাঁতার কেটে বিশ্ব রেকর্ড করেন অরুণ নন্দী। হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষের উপস্থিতিতে তিনি ভেঙে দেন যুক্তরাষ্ট্রের বিসি মুরের রেকর্ড।
দেশ মাতৃকার প্রয়োজনে হকি স্টিক তুলে রেখে ঢাকাইয়া মোহাম্মদ হাফিজ উল্লাহ ভারতে ট্রেনিং নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন মুক্তিযুদ্ধে। ইয়ুথ পাকিস্তান দলের এই হকি খেলোয়াড় যুদ্ধকালীন সময়ে সেকেন্ড ওয়ার ফোর্সের মাধ্যমে সেনাবাহিনীতে নাম লিখিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা মুহম্মদ মুজিবর রহমান হকি এবং ফুটবল ছেড়ে যোগ দিয়েছিলেন মুক্তিযুদ্ধে। ভাষা আন্দোলন নিজ চোখে দেখা মুজিবর এখন সামাজিক উন্নয়ন সঙ্গে সম্পৃক্ত। ঝাকড়া চুলের মোহাম্মদ সোহবার আহমেদ ফুটবলের মাঠের দাপুটে খেলোয়াড়ি জীবন ছেড়ে অস্ত্র হাতে যোগ দিয়েছেন মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে। কুমিল্লার সোহবার ছিলেন জাতির পিতার মেঝো ছেলে শেখ জামালের বন্ধু। তিনি তার সময়ের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার হিসেবে জায়গা করে নিয়েছিলেন। খেলেছেন আবাহনীতেও। কানাডা প্রবাসী এই ফুটবলারের চোখেমুখে এখনও মুক্তিযুদ্ধে ইতিহাস জ্বলজ্বল করে ভাসে। মজিদুল ইসলাম মনিকে একাধারে ফুটবলার, ক্রিকেটার, হকি এবং অ্যাথলেট বিবেচনা করা যায়। দশম শ্রেণির ছাত্র থাকাকালেই পাবনার মনি দেশকে শত্রুমুক্ত করার সংগ্রামে যোগ দিয়েছেন। ভারতে ট্রেনিং শেষে তিনি পাবনাসহ আশপাশের একার মুক্তিযুদ্ধে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছেন। সাঁতারু পরিচয়েই এখনও মোহাম্মদ সোলায়মান ক্রীড়াঙ্গনে পরিচিত। মুন্সিগঞ্জের এই সাঁতারু সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের অগ্রসেনানী হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন। সত্তর-আশির দশকে সোলায়মান বাংলাদেশের গর্ব হিসেবেই বিবেচিত হতেন। সাঁতারে পাকিস্তান আমলে তিনি কয়েকটি ইভেন্টে স্বর্ণ জিতেছেন। পিরোজপুরের ভা-ারিয়ার মুজিবুর রহমান এখনও ক্রীড়াঙ্গনের গ-ি ছাড়িয়ে যেতে পারেন নি। ভারোত্তোলন ফেডারেশনের নির্বাহী কমিটির সদস্য মুজিবুর রহমান একজন স্বনামধন্য কোচ হিসেবে সমাদৃত। মুক্তিযুদ্ধে তার যোগদান ছিল সময়ের দাবি। ২৬ মার্চ কালরাত্রির দিন তিনি ঢাকার কয়েকটি রাস্তায় গাছ ফেলে বন্ধ রাখার চেষ্টা করেন। ট্রেনিং শেষে তিনি পিরোজপুরে বিভিন্ন অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া ক্রিকেটার শওকুতর রহমান চিনু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্লু এবং বঙ্গবন্ধু নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনকারী ক্রীড়াবিদ মহিউদ্দিন আহমেদ সাঁতার, অ্যাথলেট, বক্সার হিসেবে তার সময়ের অন্যতম সেরা ক্রীড়াবিদ। মুন্সিগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক মহিউদ্দিন জাতির পিতার বিশ্বস্ত এবং অনুগত ছিলেন। তিনি ঐতিহ্যবাহী বিক্রমপুর এবং ফরিদপুরের কয়েকটি অঞ্চলে সরাসরি যুদ্ধ করেছেন। জুডোর হাসান উজ জামান মনি, বঙ্গবন্ধু ঘনিষ্ঠ সহচর ক্রিকেট পিচের বাংলাদেশের প্রথম অফ-কাটার মেজর (অব.) শাফায়ত জামিল, ফুটবলার তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, সামরিক কর্মকতা এবং ফুটবলার খোন্দকার মো. নূরুন্নবী, মাঝারি এবং দূরপাল্লার অপ্রতিরোধ্য দৌড়বিদ সিলেটের মোস্তাক আহমেদ, ফুটবল মাঠের চিরচেনা রেফারি আবদুল আজিজ, হকি দুর্দান্ত স্টোর ফরোয়ার্ড পুরান ঢাকার ইলিয়াস তালুকদার নাঈম, মানিকগঞ্জ থেকে ওঠে আসা পোলভোল্টের একেএম মিরাজউদ্দিন, টাঙ্গাইলের চৌকস ফুটবলার মাহমুদ পারভেজ জুয়েল, যশোর থেকে আলোতে আসা কুস্তির টাইগার আবদুল জলিল, বঙ্গবন্ধু সচিব ও ফুটবলার নুরুল ইসলাম অনু, ব্ল্যাকবেল্ট জুডোকার ঢাকাইয়া আওলাদ হোসেনসহ বাংলাদেশের অনেক জানা অজানা ক্রীড়াবিদ স্বাধীন বাংলাদেশে লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন।
আমাদের রক্তে রঞ্জিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শুধু এ দেশেরই গৌরব নয়, এটা বিলীয়মান বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা একটি ঘটনা এবং একুশ শতকের হাতে তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে তথা নবপ্রজন্মের জন্য সময়ের দুঃসাহসী চিত্র, যা বিশ্বের সব শ্রেণির সংগ্রামী মানুষের জন্য হয়ে থাকবে আগামীর প্রেরণা। আর তার অংশীদার হয়ে আছেন বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ ক্রীড়াবিদরা।

Category: