Blog Archives

একুশে পদক পলেনে যারা

Posted on by 0 comment

3-4-2018 7-16-48 PMউত্তরণ ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ২১ বিশিষ্ট নাগরিকের হাতে এ বছরের একুশে পদক তুলে দিয়েছেন। আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ও মহান একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এ অনুষ্ঠানের অয়োজন করে।
একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট ব্যক্তিরা হচ্ছেনÑ ভাষা আন্দোলনে ভাষাবিদ ড. মো. শহীদুল্লাহর পুত্র মরহুম ভাষাসৈনিক আ জ ম তকীয়ুল্লাহ (মরণোত্তর) ও শৈল্য চিকিৎসক অধ্যাপক ভাষাসৈনিক মির্জা মাজহারুল ইসলাম, সংগীতে উপমহাদেশের দিকপাল সংগীতজ্ঞ ওস্তাত আয়াত আলী খানের পুত্র বহুগুণে গুণান্বিত শিল্পী ও সংগীত পরিচালক শেখ সাদী খান, শুদ্ধ সংগীত সাধক ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী ও সুরকার সুজেয় শ্যাম, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সুরকার গীতিকার ও শিল্পী ইন্দ্র মোহন রাজবংশী, খ্যাতনামা সংগীত শিল্পী মো. খুরশীদ আলম ও বিশিষ্ট সেতারবাদক ওস্তাদ মতিউল হক খান, নৃত্যে প্রথম শ্রেণির নৃত্যশিল্পী ও কোরিওগ্রাফার মুক্তিযোদ্ধা বেগম মীনু হক (মীনু বিল্লাহ), অভিনয়ে বিশিষ্ট অভিনেতা মরহুম হুমায়ুন ফরীদি (হুমায়ুন কামরুল ইসলাম) (মরণোত্তর), নাটকে নাট্যকার ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক নিখিল সেন (নিখিল কুমার সেনগুপ্ত), চারুকলায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রশিল্পী কালিদাস কর্মকার, আলোকচিত্রে গোলাম মুস্তাফা, সাংবাদিকতায় প্রবীণ রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, লেখক ও ভাষাসৈনিক রণেশ মৈত্র, গবেষণায় ভাষাসৈনিক মরহুমা অধ্যাপক জুলেখা হক (মরণোত্তর), অর্থনীতিতে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম, সমাজসেবায় নিসচা’র (নিরাপদ সড়ক চাই) কর্ণধার চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন, ভাষা ও সাহিত্যে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম খান (কবি হায়াৎ সাইফ), স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক সুব্রত বড়–য়া, রবিউল হুসাইন ও মরহুম খালেকদাদ চৌধুরী (মরণোত্তর)।
পদক বিজয়ীরা প্রধানমন্ত্রীর নিকট থেকে নিজ নিজ পদক গ্রহণ করেন এবং মরণোত্তর একুশে পদক বিজয়ীদের পক্ষে তাদের পুত্র ও কন্যাগণ এ পদক গ্রহণ করেন।

Category:

মালদ্বীপ জলের তলে আগুন

Posted on by 0 comment

3-4-2018 7-54-33 PMসাইদ আহমেদ বাবুঃ মালদ্বীপ ভারত মহাসাগরের স্বর্গ হিসেবে খ্যাত একটি ক্ষুদ্র দ্বীপ রাষ্ট্র। এর রাজধানীর নাম মালে। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক জোট সার্ক-এর সদস্য। অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি এ দেশ বিশ্বের সবচেয়ে নিচু দেশ। পর্যটনের জন্য বিখ্যাত এ দেশের সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে সর্বোচ্চ উচ্চতা মাত্র ২ দশমিক ৩ মিটার এবং গড় উচ্চতা মাত্র ১ দশমিক ৫ মিটার। ১ হাজার ২০০-এরও বেশি ছোট ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত মালদ্বীপ।
মালদ্বীপ নামটি সম্ভবত ‘মালে দিভেহী রাজ্য’ হতে উদ্ভূত, যার অর্থ হলো মালে অধিকৃত দ্বীপরাষ্ট্র। মালদ্বীপের মূল আকর্ষণ হলো এর সরল, শান্ত ও মনোরম পরিবেশ, আদিম সমুদ্র সৈকত ও ক্রান্তীয় প্রবাল প্রাচীর। এখানকার সমুদ্রের রং অতি পরিষ্কার, পানির রং নীল, বালির রং সাদা।
মালদ্বীপের ইতিহাস ও ঐতিহ্য খুবই প্রাচীন। দ্বাদশ শতক থেকেই মালদ্বীপে মুসলিম শাসন। ১১৮৩ খ্রিস্টাব্দে ইবনে বতুতা মালদ্বীপ ভ্রমণ করেছিলেন। ১১৫৩-১৯৫৩ অবধি (৮০০ বছর) ৯২ জন সুলতান নিরবচ্ছিন্নভাবে শাসন করেন দ্বীপটি। বিভিন্ন সময়ে পর্তুগিজ ও ব্রিটিশরা পর্যটক হিসেবে, কখনও কখনও বাণিজ্য কুঠি স্থাপন, কখনও ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের জন্য এখানে আসে। ১৯৬৫ সালের ২৬ জুলাই মালদ্বীপ ব্রিটিশদের কাছ থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে এবং ১৯৬৮ সালে সালতানাতে মালদ্বীপ থেকে রিপাবলিক মালদ্বীপে পরিণত হয়।
মাত্র ২৯৮ বর্গকিলোমিটারের মালদ্বীপের জনসংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার। বিদেশিসহ এখানে প্রায় ৫ লাখ লোক বসবাস করেন।
ইসলাম মালদ্বীপের রাষ্ট্রীয় ধর্ম। ২০০৮ সালের সংবিধানের ৯ ধারার ডি অনুচ্ছেদের একটি সংশোধনীতে বলা হয়, কোনো অমুসলিম মালদ্বীপের নাগরিকত্ব পাবে না। ১২তম শতাব্দীতে এই দ্বীপটি বৌদ্ধ ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত হয়। সম্পূর্ণ ইসলাম ধর্মে প্রবেশ করে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী কার্যকরভাবে সবাই মুসলমান। মরক্কোর পরিব্রাজক ইবনে বতুতার মতে, মালদ্বীপে ইসলাম এসেছে এক মুসলিম পরিব্রাজকের দ্বারা, যিনি মরক্কো থেকে এসেছিলেন।
সময়কাল তখন ১১৪০ সাল। রাষ্ট্রের সকলেই ছিল মূর্তিপূজক। কোনো মুসলমান ছিল না। দেশটিতে ১১৯০টি ক্ষুদ্র প্রবাল দ্বীপ রয়েছে। শান্ত, সুন্দর, নৈসর্গিক প্রকৃতির মালদ্বীপের রাজনৈতিক প্রকৃতি অনেক দিন ধরে অশান্ত। সম্প্রতি উত্তপ্ত পরিস্থিতির এমন বিস্ফোরণ ঘটেছে যে, কোনো কোনো ভাষ্যকার রূপকার্থে বলেছেন, ‘মালদ্বীপের চারদিকে পানি, পানির মধ্যে আগুন।’
মালদ্বীপেও বাংলাদেশের মতো ২০০৮ সালে জাতীয় নির্বাচন হয়, যাতে ‘ব্যালট বিপ্লবে’ মালদ্বীপের ইতিহাসের সর্বপ্রথম বহুদলীয় নির্বাচনে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে জয়ী হন রাষ্ট্রপতি পদে মোহাম্মদ নাশিদ। সে দেশে প্রেসিডেন্ট যুগপৎ রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, অর্থাৎ অনেক ক্ষমতাবান। তিনি হারিয়েছিলেন মামুন আবদুল গাইয়ুমের মতো প্রবীণ নেতাকে, যিনি একটানা ৩০ বছর প্রতাপের সাথে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। নাশিদকে মনে করা হতো ‘পরিবর্তনের দিশারি,’ যিনি এই দ্বীপপুঞ্জে গণতন্ত্রের পূর্ণতা প্রদান করবেন। নাশিদ পরিবর্তনের প্রবক্তা হিসেবে বিশেষ ইমেজের অধিকারী ছিলেন। জনগণের সংগত প্রত্যাশা ছিল, তিনি গণতন্ত্রকে বিকশিত এবং সুশাসন কায়েম করবেন। বাস্তবে ব্যর্থতা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, দমনপীড়ন, সংবিধান লঙ্ঘন প্রভৃতি কারণে জনগণ শুধু হতাশ নয়, প্রচ- ক্ষুব্ধ। নাশিদ আধুনিক ও প্রগতিশীল মালদ্বীপ গড়তে গিয়ে ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ হয়ে জনগণের বিশ্বাস ও মূল্যবোধে আঘাত হেনেছেন। একটার পর একটা কারণ যোগ হয়ে মানুষের হতাশা ও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ফলে বৃদ্ধি পেয়েছে রাজনৈতিক উত্তাব-উত্তেজনা। এক্ষেত্রে ধর্ম একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মালদ্বীপের শত ভাগ মানুষ মুসলিম। সম্প্রতি জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনপ্রধান নাভি পিল্লই সফরে এসে অহেতুক এর সমালোচনা করলেন। ফলে জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয় এবং নাশিদবিরোধী আন্দোলন আরও তুঙ্গে ওঠে। মালদ্বীপের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম তো বটেই, যে কটি দেশের জাতীয় পতাকা ইসলামের প্রতীক নতুন চাঁদ শোভিত, মালদ্বীপ তাদের এর ধাক্কায় নাশিদের পতন ঘটেছে ক্ষমতার মসনদ থেকে। ক্রমবর্ধমান গণবিক্ষোভে বহু প্রত্যাশার প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছেন। দেশটিতে সংকট অব্যাহত থাকায় জাতীয় জীবনে অনিশ্চয়তার কালো ছায়া পড়েছে।
মালদ্বীপের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুবই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রেসিডেন্ট নাশিদের বিরুদ্ধে শুধু বিরোধী দলগুলোর নয়, জনগণের বিরাট অংশেরও অভিযোগ ছিল দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, সংবিধান লঙ্ঘন, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, প্রশাসনিক অনিয়ম ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার। দেশের অবস্থা চরম অস্থিতিশীল হয়ে দাঁড়ায় মালদ্বীপের অপরাধ আদালতের প্রধান বিচারপতি আবদুল্লাহ মোহাম্মদের অন্যায় গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে।
২০১১ সালে এক বিতর্কিত নির্বাচনে নাশিদের বিরুদ্ধে ৫৮ বছর বয়সী ইয়ামিন জয়লাভ করেন। এরপর তার মেয়াদে মালদ্বীপ রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, গোলযোগ ও দুর্নীতিতে ডুবে যায়। পর্যটন স্বর্গ হিসেবে পরিচিত দ্বীপ রাষ্ট্রটিতে চরম রাজনৈতিক সংকটের শুরু হয় ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথমে।
দেশটির বিরোধী জোট দুঃশাসন, অধিকার হরণ ও নজিরবিহীন দুর্নীতির অভিযোগে প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ ইয়ামিনকে অপসারণ চেয়ে রিট করলে ১ ফেব্রুয়ারি মালদ্বীপের সুপ্রিমকোর্ট এ নির্দেশ দিয়েছেন। সর্বোচ্চ বিরোধী জোটের প্রেসিডেন্টকে অপসারণের অনুরোধে সাড়া না দিয়ে সন্ত্রাসবাদে জড়িত থাকার অভিযোগে কারাদ-াদেশ পাওয়া বিরোধী ৯ জন রাজনৈতিক নেতাকে মুক্তি দেওয়ার আদেশ দেন। তাদের মধ্যে বিদেশে স্বেচ্ছানির্বাসনে থাকা দেশটিতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদও রয়েছেন। প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন এক বিচারককে গ্রেফতারির নির্দেশ দেওয়ায় ২০১৫ সালে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন নাশিদ। এরপর তার ১৩ বছরের কারাদ- হয়, যা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিযোগ রয়েছে। ওই একই দিন সর্বোচ্চ আদালত প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের দল থেকে বহিষ্কৃত ১২ আইনপ্রণেতাকেও স্বপদে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেন। এই ১২ আইনপ্রণেতার ওপর থেকে বহিষ্কারাদেশ ফিরিয়ে নেওয়া হলে মালদ্বীপের ৮৫ সদস্যের আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাবে সরকারি দল। তবে সম্প্রতি বিরোধী ১২ আইনপ্রণেতার ওপর থেকে বহিষ্কারাদেশ ফিরিয়ে নেওয়ার আদেশ প্রত্যাহার করে নেন সুপ্রিমকোর্ট।
সুপ্রিমকোর্টের ওই আদেশের পর থেকেই দেশটিতে আদালতের এই আদেশের জেরে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে ৫ ফেব্রুয়ারি মালদ্বীপের সরকার-আদালত দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসে। এর জেরে ৬ ফেব্রুয়ারি ১৫ দিনের জরুরি অবস্থা জারি করেন প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ­ইয়ামিন। জরুরি অবস্থার মেয়াদও শেষ হয়েছে সম্প্রতি। কিন্তু প্রেসিডেন্টের চাওয়ায় জরুরি অবস্থার মেয়াদ আরও এক মাস বাড়িয়েছে পার্লামেন্ট।
মালদ্বীপে চলমান সংকট মোকাবেলায় ভারত সেখানে সেনাবাহিনী পাঠালে, দেশটির পরিস্থিতি আরও ভয়ঙ্কর হবে বলে হুমকি দিয়েছে চীন। ভারতের কাছে সামরিক হস্থক্ষেপ চেয়েছিলেন মালদ্বীপের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাসিদ। তবে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, কানাডাসহ জাতিসংঘ প্রেসিডেন্ট ইয়ামিনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জরুরি অবস্থা তুলে নিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে।
কূটনৈতিক এবং ভূরাজনীতির ক্ষেত্রে গুরুত্বের কারণে ভারত, আমিরিকা ও চীন তারা মালদ্বীপে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন নিজ নিজ স্বার্থেই। মালদ্বীপ ঐতিহ্যগতভাবে ভারতের প্রভাব বলয়ে অবস্থিত। ১৯৮৮ সালে একদল ভাড়াটে সৈন্য মালদ্বীপে ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করলে ভারত হস্তক্ষেপ করে ও সরকার রক্ষা পায়। ভারতের সমর্থন সাবেক শক্তমানব মামুন আবদুল কাইয়ুমকে তিন দশকেরও বেশি ক্ষমতায় থাকতে সাহায্য করে। পরবর্তী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদও ভারতের সমর্থন লাভ করেন।
ইয়ামিন নাশিদের অনেক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থ বাতিল করেন। তিনি বিরোধী সকল গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিককে জেলে বা নির্বাসনে পাঠিয়েছেন। তার সরকার মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও সমাবেশের অধিকার খর্ব করে। সরকারবিরোধী খবর প্রকাশের জন্য সাংবাদিক ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের বিপুল জরিমানার বিধান করেছে।
রাজনৈতিক সংকটে পড়া মালদ্বীপে চলছে জরুরি অবস্থা। এর মাঝে পূর্ব ভারত মহাসাগরে প্রবেশ করেছে চীনের ১১টি যুদ্ধজাহাজ। সব মিলিয়ে দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপের অবস্থা এখন আরও সংকটে। এদিকে মালদ্বীপে জরুরি অবস্থা দীর্ঘায়িত না করার আহ্বান জানিয়েছে ভারত।
রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না মালদ্বীপে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগের পর সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা চেয়েছেন। এদিকে, দ্বিবার্ষিক নৌমহড়ায় অংশ নেওয়ার জন্য ভারতের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছে মালদ্বীপ।
রাজনৈতিক মতভেদ ও বিতর্ক থাকবে; বিভিন্ন দলের মাঝে দ্বন্দ্ব ও প্রতিযোগিতা থাকবে। তবে জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে মালদ্বীপকে। ভ্রাতৃপ্রতিম মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের মানুষ চায়, মালদ্বীপে শান্তি-সম্প্রীতি বিরাজ করুক।

 

Category:

দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধা দূর, অগ্রগতি অর্জনই মূল লক্ষ্য

Posted on by 0 comment

3-4-2018 7-16-48 PMরাজীব পারভেজ: আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (ইফাদ) প্রেসিডেন্ট গিলবার্ট ফাউসন হোউংবোর আমন্ত্রণে রোমে সংস্থাটির ৪১তম গভর্নিং কাউন্সিলে যোগ দিতে এবং পোপ ফ্রান্সিসের আমন্ত্রণে ভ্যাটিকান সিটি সফরে গত ১১ ফেব্রুয়ারি ইতালির রাজধানী রোম সফর করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইফাদের ৪১তম গভর্নিং কাউন্সিলের উদ্বোধনী সেশনে অংশ নিয়ে মূল বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। সফরে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের মধ্যে ৯২.৪ ডলারের ঋণ চুক্তি সই হয়। এ চুক্তির আওতায় দেশের উত্তর-পূর্বের ছয় জেলার গ্রামীণ পিছিয়ে পড়া মানুষের অবকাঠামো ও বাজার উন্নয়ন করা হবে। রোমে ইতালি আওয়ামী লীগ আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে তিনি দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তার সরকারের কঠোর অবস্থান তুলে ধরেন।

ইফাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী
ইফাদ সদর দফতরে সভার উদ্বোধনী অধিবেশনে মূল বক্তব্যে দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দূর করতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগের জন্য উন্নয়ন-সহযোগীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, আমরা বিশ্বাস করি, স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ একটি প্রধান বিবেচ্য বিষয় এবং বিশ্বব্যাপী অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা ছাড়া এটি অর্জন করা যাবে না। অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘ফ্র্যাজিলিটি টু লং টার্ম রেজিলিয়েন্স : ইনভেস্ট ইন সাসটেইনেবল রুরাল ইকোনমি’। বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেন, দারিদ্র্য ও ক্ষুধা দূরীকরণে উন্নয়ন-সহযোগীদের আরও একটু উদার হতে হবে। বাংলাদেশ ও উন্নয়ন-সহযোগীদের মধ্যে সহায়তা অব্যাহত থাকার ব্যাপারে আশা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, অগ্রগতির এই ধারা অব্যাহত রাখতে ইফাদ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আমাদের প্রত্যাশা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা স্থাপন ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অর্জন করা যাবে না। গ্রামীণ সামাজিক ও জলবায়ুগত স্থিতিশীলতার উন্নয়নে ব্যাপকভিত্তিক টেকসই গ্রামীণ অর্থনীতি প্রয়োজন। তিনি টেকসই গ্রামীণ অর্থনীতি তৈরিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদিভাবে স্থিতিশীলতা আনার আহ্বান জানান।
শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের জনসংখ্যা ৯ বিলিয়ন (৯০০ কোটি) ছাড়িয়ে যাবে এবং এর অর্ধেক হবে মধ্যবিত্ত। এর ফলে বিশ্বের আবাদি জমি, বনভূমি ও পানির ওপর প্রচ- চাপ পড়বে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে অনেক দেশের আবাদি জমি ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে আমরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হব। শেখ হাসিনা বলেন, ২০৫০ সালে বিশ্বের খাদ্য চাহিদা ২০০৬ সালের অবস্থান থেকে অন্তত ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে এবং খাদ্যমূল্য বেড়ে ৮৪ শতাংশ দাঁড়াতে পারে। তিনি আরও বলেন, আমরা কীভাবে এ ধরনের বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলা করব? আমি আপনাদের আমার দেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে কৃষি প্রবৃদ্ধির কথা তুলে ধরব, যা বৈশ্বিক পর্যায়ে মানব উন্নয়নে অন্যান্য দেশ গ্রহণ করতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রথমে আমি আপনাদের বলব, প্রতিবছর জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবের কারণে দেশে খাদ্য সংকট ও খাদ্য উৎপাদন হ্রাসের যে কোনো সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশি জনগণ স্বাভাবিকভাবে সক্ষম। সংকটের মোকাবিলায় বাংলাদেশিরা আস্থার সঙ্গে শক্তভাবে লড়াই করে সমস্যার সমাধান ও সংকট কাটিয়ে উঠতে বিকল্প উপায় গ্রহণের মাধ্যমে সফলতা অর্জন করে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ প্রায় এক দশক ধরে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং চলতি বছর অসময়ে বারবার বন্যায় অপ্রত্যাশিতভাবে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিয়েছিল। এ ঘাটতি মোকাবিলায় গ্রাহকদের কাছে পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে সঙ্গে সঙ্গেই খাদ্য আমদানি নীতি গ্রহণ করা হয়।
শেখ হাসিনা বলেন, গ্রামাঞ্চলে কাউকে পেছনে ফেলে রাখা যাবে নাÑ এই চ্যালেঞ্জই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের জনসংখ্যার প্রায় ৭২ শতাংশ গ্রামাঞ্চলে বসবাস করে এবং ৪৩ শতাংশ কৃষি খাতে শ্রমজীবী হিসেবে কাজ করে; যারা দেশের জিডিপিতে ১৫ শতাংশ অবদান রাখছে। গ্রামীণ অকৃষি খাতের কর্মীর সংখ্যা ৪০ শতাংশ, যারা গ্রামীণ আয়ের ৫০ শতাংশের বেশি আয় করে। কাজেই অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই গ্রামীণ রূপান্তরই দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধা দূর করা ও কাউকে পেছনে ফেলে না রাখার লক্ষ্য অর্জনের মূল শক্তি।’

বাংলাদেশ-ইফাদ ঋণচুক্তি
দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ৬টি জেলার দুস্থ মানুষের অবকাঠামো ও বাজার উন্নয়নে ইফাদের সঙ্গে ৯ কোটির বেশি মার্কিন ডলারের ঋণচুক্তি করেছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে ইফাদ সদর দফতরে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৬টি জেলার দুস্থ জনগণের অবকাঠামোগত দক্ষতা উন্নয়ন এবং তথ্যসংক্রান্ত একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। জেলাগুলো হচ্ছে পঞ্চগড়, দিনাজপুর, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা ও জামালপুর। ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এতে এই জেলাগুলোর ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ উপকৃত হবে। প্রকল্পের মূল ব্যয়ের ৬ কোটি ৩২ লাখ ৫০ হাজার ডলার ঋণ এবং ১২ লাখ ৫০ হাজার ডলার অনুদান হিসেবে দেবে ইফাদ। বাকি ২ কোটি ৭৯ লাখ ডলার বাংলাদেশ সরকার দেবে।

Category:

  দিনপঞ্জি : ফেব্রুয়ারি ২০১৮

Posted on by 0 comment

3-4-2018 7-51-11 PM১ ফেব্রুয়ারি
* বাংলা ভাষা সাহিত্যের চর্চা, বিকাশ, বাঙালি সংস্কৃতির বহমান উদার অসাম্প্রদায়িক ধারায় অনন্য সংযোজন গ্রন্থমেলা উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মাসব্যাপী মেলা উদ্বোধনের পর বইয়ের বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন তিনি।

২ ফেব্রুয়ারি
* আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বলেছেন, আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার জন্য বিএনপি নানা ধরনের টালবাহানা করছে। সকালে রাজধানীর শনিরআখড়ায় দুটি ফুটওভারব্রিজ উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের তিনি আরও বলেন, বিএনপির সাম্প্রতিক কাজকর্ম দেখে, তাদের কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছে, তারা নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার টালবাহানা করছে।

৬ ফেব্রুয়ারি
* বিদ্যমান আইনকানুন মেনে চলতে দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভিসিদের নির্দেশ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। পাশাপাশি যেসব বিশ্ববিদ্যালয় আইন মেনে চলছে না, সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ও সার্বিক কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকি করতে ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। বিকেলে বঙ্গভবনে সাক্ষাৎ করতে যান বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরা। এ সময় উল্লিখিত নির্দেশনা দিয়েছেন।
* বিশ্বজুড়ে হালাল পণ্য ও সেবার বাজার সম্প্রসারণের বিপুল সম্ভাবনার কথা তুলে ধরে এ বিষয়ে ওআইসিভুক্ত দেশগুলোর সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) পর্যটনমন্ত্রীদের দশম সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ইসলামিক সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। শেখ হাসিনা বলেন, ইসলামিক পণ্য ও সেবার বিশ্বব্যাপী সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা এবং বিশাল ভোক্তা থাকায় বিশ্বাসভিত্তিক পণ্য ও সেবার সম্প্রসারণের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।

৭ ফেব্রুয়ারি
* রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পাঠদান কেন্দ্র নয়; বরং তা জ্ঞান সৃষ্টি ও চর্চার এক অনন্য পাদপীঠ। মুক্তচিন্তা, সমকালীন ভাবনা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের নবতর অভিযাত্রাসহ সংস্কৃতি চর্চা, সৃজনশীল কর্মকা- শিক্ষার্থীদের জানার পরিধিকে বিস্তৃত করে। এগুলো তাদের পরিণত করে বিশ্ব নাগরিকে। এসবের অনুপস্থিতিতে আজ কূপম-ূকতা, উগ্রবাদসহ নানামুখী অসহিষ্ণুতা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মুক্ত চিন্তার পরিবেশ বাধাগ্রস্ত করছে। এ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বিকেলে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তিনি এসব মন্তব্য করেন।

৯ ফেব্রুয়ারি
* রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দ্রুত শুরু করার পক্ষে যুক্তরাজ্য। সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে এ কথা বলেছেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করতে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি’কে উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে। গত ৭ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে কিছু উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তির হামলার বিষয়টিও প্রধানমন্ত্রী ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নজরে আনেন।

১১ ফেব্রুয়ারি
* মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে ব্রতী হওয়ার জন্য দেশের গবেষক ও বিজ্ঞানীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। তিনি বলেন, আমরা ইতোমধ্যে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছি এবং ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হব। সম্ভাবনার উজ্জ্বল এক সময় অতিক্রম করছে বাংলাদেশ। দেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে নন্দিত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তরুণদের সুশিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরিত করার গুরুদায়িত্ব পালন করতে হবে। বিকেলে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।

১৩ ফেব্রুয়ারি
* রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা বিনির্মাণে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউবিটি) তৃতীয় সমাবর্তনে নতুন গ্র্যাজুয়েটদের উদ্দেশে ভাষণে এ কথা বলেন। বসুন্ধরা আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সমাবর্তনের আয়োজন করা হয়।
* ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূর করতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগের জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। সকালে ইতালির রোমে আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিলের (ইফাদ) ৪১তম পরিচালনা পরিষদের সভার উদ্বোধনী অধিবেশনে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।

১৪ ফেব্রুয়ারি
* রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ দেশের কৃষিবিদ এবং গবেষকদের তাদের গবেষণালব্ধ জ্ঞান কাজে লাগিয়ে টেকসই ও দুর্যোগ সহিষ্ণুশস্য জাত উদ্ভাবনের আহ্বান জানিয়েছেন। ফার্মগেট কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) অডিটোরিয়ামে কৃষি পদক প্রদান অনুষ্ঠানে ভাষণে রাষ্ট্রপতি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে বিশ্বব্যাপী জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে এবং যদি পরিবেশ দূষণ বন্ধ করা না যায় তাহলে এই পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে। এ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে কৃষিবিদ ও গবেষকদের উপায় খুঁজে বের করতে হবে।

১৫ ফেব্রুয়ারি
* কৃষি খাতে ব্যাপক উন্নয়নের কথা উল্লেখ করে এই ধারা অব্যাহত রাখতে কৃষকদের পণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। তিনি বলেন, কৃষিতে উন্নয়নের এ ধারা অব্যাহত রাখতে হলে কৃষক পর্যায়ে কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া পচনশীল কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও বহুমুখীকরণেও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পাশাপাশি দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেই এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে। বিকেলে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।

১৮ ফেব্রুয়ারি
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চায়ের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি এর বহুমুখী ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, ফ্লেভারযুক্ত চা ছাড়াও চা থেকে বিভিন্ন প্রসাধন সামগ্রী, টি সোপ, টি শ্যাম্পু, টি টুথপেস্ট প্রভৃতি এবং খাদ্য সামগ্রী যেমনÑ টি কোলা, চা-এর আচার প্রভৃতি উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। এ সুযোগ আমাদের কাজে লাগাতে হবে। তিনি বলেন, সরকার চায় বাংলাদেশের চা গুণগত মানে উন্নত হয়ে সারাবিশ্বে নিজের স্থান করে নেবে। সকালে বসুন্ধরা আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টারে বাংলাদেশ চা প্রদর্শনী ২০১৮-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, আমরা চাই আমাদের চা সারাবিশ্বে নিজের স্থান করে নিক।

১৯ ফেব্রুয়ারি
* রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সাধারণ জনগণের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব এবং অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করার জন্য চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, চিকিৎসা প্রদানের সময় জনগণের সক্ষমতা বিবেচনায় রাখতে হবে, যাতে কোনো রোগী অর্থাভাবে যেন চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত না হয়। রাষ্ট্রপতি বিকেলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন।

২১ ফেব্রুয়ারি
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমরা রক্ত দিয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করেছি এবং এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছি। এটা আমাদের জন্য বিরাট গৌরবের বিষয়। তাই এ ভাষার চর্চা ভুলে যাওয়া উচিত নয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস-২০১৮ উপলক্ষে বিকেলে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের (আইএমএলআই) চার দিনের কর্মসূচি উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।

২৪ ফেব্রুয়ারি
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলার মাটিতে বসবাস করে যাদের অন্তরে ‘পেয়ারে পাকিস্তান’Ñ তাদের হাত থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হবে। এদেশ আবার যেন অন্ধকার যুগে ফেরত না যায়, সে জন্য সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। আর যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়ে তাদের হাতে যারা লাখো শহীদের রক্তখচিত জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছিল, তাদের জাতি কোনোদিন ক্ষমা করতে পারে না। দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শিক্ষার উন্নয়নে আমরা দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছি। সেখানে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পড়ানোর ব্যবস্থা অবশ্যই থাকতে হবে। রাজধানীর খামারবাড়ি কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। দেশ নিম্নমধ্যবিত্ত থেকে মধ্যবিত্ত দেশে পরিণত হচ্ছে। আগামী মার্চে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পৌঁছবে।

২৫ ফেব্রুয়ারি
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে স্বল্প আয়ের দেশকে যে পর্যায়ে রেখে যান, সেখান থেকে এখন বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে গ্রাজুয়েশন লাভ করতে যাচ্ছে। আগামী মার্চ মাসেই বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে মর্যাদা পাবে ইনশাল্লাহ। এখন আর কেউ আগের মতো আমাদের তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতে পারবে না। কারণ আমরা সেই জায়গাটায় পদার্পণের সক্ষমতা অর্জন করেছি। সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা হলে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন প্রদত্ত ‘প্রধানমন্ত্রী স্বর্ণপদক-২০১৫ ও ২০১৬’ প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আগামী মার্চ-এপ্রিল মাসেই আমাদের নিজস্ব স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু উপগ্রহ-১ মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হবে।
* সৌদি আরবের সামরিক বাহিনীর শীর্ষপর্যায়ে ব্যাপক রদবদল আনা হয়েছে। এক রাতের মধ্যে সামরিক বাহিনীর ‘চিফ অব স্টাফ’সহ বহিষ্কার করা হয়েছে সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর প্রধানকে। রদবদল ঘটেছে মন্ত্রিসভায়ও। ‘শ্রম ও সামাজিক উন্নয়ন’ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে উপমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এক নারীকে। রাতে সৌদি বাদশাহ সালমান পৃথক ডিক্রি জারির (রাজ ফরমান) মাধ্যমে এসব রদবদলের নির্দেশ দিলেও তাতে কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি। তবে ইয়েমেনে সৌদি আরব যুদ্ধে জড়ানোর তিন বছর পূর্তি হওয়ার আগ মুহূর্তে এ পরিবর্তন আনা হলো।

২৭ ফেব্রুয়ারি
* সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ইচ্ছা থাকলে একটি সরকার দেশের উন্নয়ন করতে পারে আমরা তা প্রমাণ করেছি। বাংলাদেশ আজ সব দিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবেই। আমরা প্রমাণ করেছি ও বারবার অগ্নিপরীক্ষা দিয়েছি যে দুর্নীতি করতে নয়, জনগণের ভাগ্য গড়তেই আমরা রাজনীতি করি। দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। রাতে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর সমাপনী আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, আগামী মার্চে বাংলাদেশ আরও এক ধাপ এগিয়ে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। বাঙালি জাতি বীরের জাতি, আমরা যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছি। তাই আমরা নিম্ন বা মধ্যম নয়, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলবই।’ স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশনে রাষ্ট্রপতিকে ধন্যবাদ জানিয়ে আনীত প্রস্তাবের ওপর সরকার ও বিরোধী দলের মোট ২৩৬ জন সংসদ সদস্য সর্বমোট ৬৪ ঘণ্টা আলোচনা করেছেন।

২৮ ফেব্রুয়ারি
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কৃষকের দোরগোড়ায় সব ধরনের ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দেবে তার সরকার, যাতে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষি উৎপাদন বাড়ে। দেশব্যাপী ই-কৃষি সেবা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ডিজিটাল প্লাটফর্ম ‘কৃষি বাতায়ন’ এবং ‘কৃষক বন্ধু সেবা’র উদ্বোধনকালে তিনি এ কথা বলেন। দুপুরে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এ দুটি সেবার উদ্বোধন করা হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল সেবা তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষকরা যেন তাদের উৎপাদন বাড়াতে পারেন। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে ইন্টারনেট সার্ভিস আছে। উপজেলা পর্যায়ে ডিজিটাল সেন্টার খোলা হয়েছে। প্রযুক্তি শিক্ষার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের গড়ে তুলতে চাই। যারা মাটিতে সোনা ফলায়, ফসল ফলায় সেই কৃষকদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। উল্লেখ্য, ‘কৃষি বাতায়ন’ ব্যবহারের মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মীর সঙ্গে কৃষকের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ, কৃষি গবেষণার সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের সংযোগ সাধন, কৃষি তথ্যভিত্তিক জ্ঞানভা-ার গড়ে তোলা এবং মাঠ পর্যায় থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত বিবিধ রিপোর্ট আদান-প্রদান সহজ হবে।

গ্রন্থনা : আশরাফ সিদ্দিকী বিটু

Category:

Posted on by 0 comment

32.Kobita_Layout-1

Category:

রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের মধ্যে সমন্বয়ের চেষ্টা করে যাব : প্রধান বিচারপতি

Posted on by 0 comment

উত্তরণ ডেস্ক: প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন বলেছেন, বিচার বিভাগের অগ্রসরতার জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন আমি তার সব করার চেষ্টা করব। রাষ্ট্রের প্রধান তিন অঙ্গÑ বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের মধ্যে সহযোগিতা ও সমন্বয়ের চেষ্টা তিনি করে যাবেন। আমার জীবনের স্মরণীয় এ মুহূর্তে আমি স্মরণ করছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। স্মরণ করছি ভাষা আন্দোলনের শহীদদের, আমার পিতা-মাতার অমূল্য অবদানকে স্মরণ করছি। একাত্তরের ৩০ লাখ শহীদের তাজা প্রাণের রক্ত নহর আর ২ লাখ মা বোনের সম্ভ্রমের মূল্যে অর্জিত হয়েছে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ লাভ করে আমি আজ ধন্য ও গর্বিত। প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর ৪ ফেব্রুয়ারি ওই দায়িত্বের প্রথম দিনে সুপ্রিমকোর্টের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিচারপতি মাহমুদ হোসেন এ কথা বলেন।
ঐদিন সকাল ১০টা ৩৫ মিনিটে এজলাসে আসেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। এ সময় তার সঙ্গে আপিল এবং হাইকোর্ট বিভাগের সব বিচারপতিরাও এজলাসে অংশ নেন। ১০টা ৪০ মিনিট থেকে ১১টা ৫ মিনিট পর্যন্ত বক্তব্য দেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। তারপর ১১টা ৫ থেকে ১১টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত বক্তব্য দেন সুপ্রিমকোর্ট বারের সভাপতি জয়নুল আবেদীন। আর তারপর বক্তব্য দেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। রেওয়াজ অনুযায়ী আপিল বিভাগের ১ নম্বর বিচারকক্ষে নতুন প্রধান বিচারপতিকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। উভয় বিভাগের বিচারপতি ছাড়াও সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক ও বর্তমান নেতৃবৃন্দ এবং জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এরপর দুপুরে ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানান তিনি। এরপর বিকেলে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে গিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তিনি। এ সময় প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আপিল বিভাগের বিচারপতিরাও ছিলেন।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিচারকদের উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, আমাদের এমন ভাবমূর্তি গড়ে তুলতে হবে যেন, আদালত প্রাঙ্গণে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে শক্তিমান-দুর্বল, ধনী-গরিব সকলের মধ্যে এই বিশ্বাস জন্মে যে, তারা সকলেই সমান এবং আদালতের কাছ থেকে শুধু আইন অনুযায়ী ন্যায্য বিচার পাবেন। এতে আদালতের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ও আস্থা দৃঢ় হবে। বিচারকদের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে সততা। তার জবাবদিহিতার জায়গা হচ্ছে বিবেক। সংবিধান ও দেশের আইন তার একমাত্র অনুসরণীয়।

Category:

একুশ শতকে সম্প্রসারিত গভীর সম্পর্ক

Posted on by 0 comment

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে ‘প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। আমরা দুদেশের বর্তমান সাদৃশ্যগুলোর দিকেও দৃষ্টি দিতে পারি, যেমন আমাদের উভয় দেশই আজ ভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানে থেকেও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবের শিকার। 

3-4-2018 7-16-48 PMআঁলা বেরসে, সুইস কনফেডারেশন: সুইজারল্যান্ড ও বাংলাদেশ কয়েক দশক ধরে সুসম্পর্ক বজায় রেখে আসছে। বহু বছর ধরে উন্নয়ন সহযোগিতা ছিল এই সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু। গুরুত্বপূর্ণ এই উন্নয়ন সহযোগিতার পাশাপাশি আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও সম্প্রসারিত করা এবং সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। দুই দেশের বাণিজ্য, সংস্কৃতি এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতার দিকে মনোযোগ ক্রমেই বাড়ছে।
আমি আশা করি, প্রথম সুইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাংলাদেশে আমার এই সফরে দুদেশের মধ্যে বিদ্যমান সহযোগিতা আরও ঘনিষ্ঠ হবে এবং এ বিষয়ে আমি রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময়ের জন্য আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করছি। সুইজারল্যান্ড এবং বাংলাদেশ তাদের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে পুনরুজ্জীবিত করছে। আমরা অতীতের দিকে ফিরে তাকালে দেখতে পাব, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভবিষ্যতের বাংলাদেশকে ‘প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। আমরা দুদেশের বর্তমান সাদৃশ্যগুলোর দিকেও দৃষ্টি দিতে পারি, যেমন আমাদের উভয় দেশই আজ ভিন্ন ভৌগোলিক অবস্থানে থেকেও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবের শিকার। এই পরিস্থিতিতে প্রয়োজন অভিন্ন অঙ্গীকার।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গাদের জন্য ত্রাণ সহায়তার বিষয়টি জরুরি। সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের জনগণ এবং সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকে সুইজারল্যান্ড বিশেষ সাধুবাদ জানাচ্ছে। সুইজারল্যান্ডও এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশে দ্রুত মানবিক সহায়তা কর্মকা- বৃদ্ধি করেছে এবং জরুরি সহায়তার বরাদ্দ বাড়িয়েছে, যা মিয়ানমার থেকে আগত শরণার্থীদের খাদ্য ও পানীয় জলের সংস্থানে, বাসস্থান নির্মাণে এবং পয়োনিষ্কাশন সেবা দিতে ব্যয় করা হচ্ছে। দুটি সরকারি হাসপাতালের অবকাঠামো এবং চিকিৎসা উপকরণ দিয়ে সুইজারল্যান্ড সহায়তা করছে এবং কক্সবাজার ও পার্শ্ববর্তী এলাকার স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। এই সফরে সেখানকার পরিস্থিতি আমি স্বচক্ষে দেখব বলে আশা করছি।
সুইজারল্যান্ডের এই মানবিক সহায়তার ভিত্তি হলো বহু দশক ধরে চলে আসা সুইস-বাংলাদেশ পারস্পরিক সহযোগিতার বন্ধন। স্থানীয় সরকারবিষয়ক সুইস সরকারের সহায়তাপুষ্ট প্রকল্পগুলো স্থানীয় জনগণের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করছে এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেবা প্রদানে স্থানীয় সরকারকে সহযোগিতা করছে। সুইস উন্নয়ন সহযোগিতার লক্ষ্যই হচ্ছে দরিদ্র ও দুস্থ জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে কাজ করা।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন
ধারাবাহিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য বিমোচনে প্রশংসনীয় পদক্ষেপের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাংক কর্তৃক সংজ্ঞায়িত মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে। চলমান সংকটের প্রেক্ষাপটে আমি বাংলাদেশকে অর্জিত সফলতার জন্য অভিনন্দন জানাই এবং আমাদের দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্কের উন্নয়ন প্রত্যাশা করি। সুইজারল্যান্ড এবং বাংলাদেশের মধ্যে বিদ্যমান অর্থনৈতিক সম্পর্ক দুদেশের জন্যই সুবিধাজনক, যেমন বিগত সাত বছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য দ্বিগুণ হয়েছে। বহুসংখ্যক সুইস কোম্পানি যারা বাংলাদেশে অর্থনৈতিক কর্মকা- পরিচালনা করছে, তাদের কল্যাণে সুইজারল্যান্ডের প্রযুক্তি জ্ঞান বাংলাদেশে প্রশংসিত হচ্ছে। দ্বিপক্ষীয় বিনিয়োগ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সুইস এবং বাংলাদেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বিদ্যমান শক্তিশালী সম্পর্কের সাক্ষ্য বহন করে।
সুইজারল্যান্ড আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ‘বেটার ওয়ার্ক বাংলাদেশ প্রোগ্রাম’-এ সহায়তার মাধ্যমে বাংলাদেশের শক্তিশালী বস্ত্র ও তৈরি পোশাক শিল্পের উন্নতিতে অবদান রাখছে। বাংলাদেশ থেকে সুইজারল্যান্ডে রপ্তানি বাণিজ্যের সিংহভাগ আসে এ দুটি শিল্প থেকে। এই কর্মসূচির বিভিন্ন প্রশিক্ষণ সেবা বস্ত্র ও তৈরি পোশাক শিল্পকে শক্তিশালী এবং অধিক প্রযুক্তি-সক্ষম করে তুলতে সাহায্য করেছে।
অন্যান্য অনেক বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্কের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির সুযোগ রয়েছে, যেমন সবুজ অর্থনীতি এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাত। এসব ক্ষেত্রে সুইজারল্যান্ডের বিশেষ প্রযুক্তি জ্ঞান রয়েছে। গণতন্ত্র অধিক শক্তিশালীকরণ এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের প্রচেষ্টাকে সুইজারল্যান্ড উপলব্ধি করে, যা দুদেশের গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই নীতিতে সুইজারল্যান্ড বাংলাদেশ সরকার, সুশীল সমাজ এবং বেসরকারি সংস্থাসমূহের সঙ্গে কাজ করে যাবে।

অনুমিত দূরত্ব হ্রাস
রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি তৃতীয় আরেকটি ক্ষেত্রে আমাদের সম্পর্ক ক্রমে বাড়ছে। তা হলো সাংস্কৃতিক বিনিময়। আমি খুবই আনন্দিত যে আমার সফর এমন একটি সময়ে হচ্ছে যখন সুইস প্রো হেলভেশিয়া ফাউন্ডেশনের সম্পৃক্ততায় ঢাকা আর্ট সামিটের মতো একটি বড়মাপের আয়োজন এখানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পারস্পরিক সম্পর্ক বৃদ্ধিতে সংস্কৃতি একটি অনন্য এবং আনন্দদায়ক মাধ্যম।
বিশ্বায়ন এবং যুগপৎ ডিজিটালাইজেশনের কল্যাণে এশিয়া এবং ইউরোপের মধ্যকার অনুমিত দূরত্ব দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। এটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, কারণ বর্তমান বিশ্বের সংকট শুধু যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমেই মোকাবিলা করা সম্ভব। এ জন্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের প্রতি আমি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি আমাকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। এই সফরের এবং দুই দেশের পরবর্তী সম্মিলিত পদক্ষেপ নিয়ে আমি আশাবাদ ব্যক্ত করছি।

আঁলা বেরসে, প্রেসিডেন্ট, সুইস কনফেডারেশন।
[প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার-এর জন্য ঢাকা সফরে আসা প্রেসিডেন্ট আঁলা বেরসের বিশেষ নিবন্ধ।]

Category:

যা কিছু অর্জন সংগ্রামের পথ বেয়ে এসেছে

Posted on by 0 comment

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

3-4-2018 7-36-23 PMউত্তরণ প্রতিবেদন: উপস্থিত নেতৃবৃন্দ, শ্রদ্ধেয় আলোচকবৃন্দ এবং আমাদের সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, কর্মী ভায়েরা,

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস এবং শহিদ দিবস হিসেবে ২১শে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে আয়োজিত আজকের এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই।
আমি আমার বক্তব্যের প্রথমেই, আমি শ্রদ্ধা জানাই মহান ভাষা আন্দোলনে সেই সকল শহিদ, যারা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে আমাদেরকে মা বলে ডাকার অধিকার দিয়ে গেছে। শহিদ সালাম, রফিক, বরকত, জব্বার, শফিকসহ আমাদের শহিদ, যাদের মহাত্যাগের বিনিময়ে আজকে বাংলা ভাষায় কথা বলার সুযোগ পাচ্ছি। আমি শ্রদ্ধা জানাই আমাদের মহান নেতা, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি। যিনি বাংলাকে মাতৃভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করবার আন্দোলন শুরু করেছিলেন এবং যার আন্দোলনের মধ্য দিয়েই আমরা স্বাধীন জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পেরেছি, স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ পেয়েছি। আমি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি, আমাদের জাতীয় চার নেতা এবং ৩০ লক্ষ শহিদ এবং ২ লক্ষ মা-বোনকে।
জাতির পিতা ১৯৭১ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত অর্থাৎ ২১ ফেব্রুয়ারি প্রথম প্রহর ১২.০১ মিনিটে শহিদ মিনারে ফুল দিয়ে তিনি তখন ঘোষণা দিয়েছিলেন, বলেছিলেন, আমি “১৯৫২ সালের আন্দোলন কেবলমাত্র ভাষা আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এ আন্দোলন ছিল সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন।” জাতির পিতার এই মহামূল্যবান বক্তব্য থেকে এসে যায়, যে আমাদের ভাষা আন্দোলন আমাদের পথ দেখিয়েছিল আমাদের জাতিসত্ত্বা প্রকাশের সংগ্রামের এবং যখন পাকিস্তান নামে রাষ্ট্রটা সৃষ্টি হয় এবং যখন ব্রিটিশরা ভারতে দুটি রাষ্ট্র তৈরি করে গেল, একটা পাকিস্তান, একটা ভারতবর্ষ। ঠিক সেই সময় নানা আলোচনা শুরু হয়। আর তখন থেকেই ভাষার বিষয়টা উঠে আসে।
আমাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকবৃন্দ এবং আলোচকবৃন্দের কাছে আপনারা শুনেছেন যে, কীভাবে কী করে এই ভাষার জন্য অনেকেই তার লেখনির মাধ্যমে বাংলাকে মর্যাদা দেবার কথা বলে গেছেন। কিন্তু যখন ’৪৭ সালের ডিসেম্বরে করাচিতে একটা সাহিত্য সম্মেলন হয়েছিল। সেই সাহিত্য সম্মেলনে ঘোষণা দেওয়া হলো, যে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত উর্দু। তখনি কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা, কয়েকজন ছাত্র মিলে মিছিল করে তখনকার মুখ্যমন্ত্রীর বাড়িতে তারা গিয়েছিল এটার প্রতিবাদ জানাতে। সেখানেও কিন্তু জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ছিলেন, তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র। এবং সেই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি একটি সভা ডাকলেন। তমুদ্দুন মজলিসসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল বা ছাত্র সংগঠন তারা মিলে সিদ্ধান্ত নিল ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের এবং ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের মধ্য দিয়ে ‘ভাষা দিবস’ হিসেবে ১১ই মার্চ ঘোষণা দেওয়া হলো। ১১ই মার্চ এই ঘোষণা দিয়ে, সেই দিন ধর্মঘট ডাকা হয়। এবং তারই পূর্বে ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি তিনি (বঙ্গবন্ধু) ছাত্রদের দিয়ে ছাত্রলীগ নামে একটি সংগঠনও গঠন করেছিলেন। এবং সেই ছাত্রলীগকে দিয়েই কিন্তু সংগঠন, মানে ভাষা আন্দোলনের যাত্রা শুরু এবং এই ১১ই মার্চ এ ধর্মঘট করতে গিয়ে আমাদের তখন অনেক নেতৃবৃন্দ গ্রেফতার হন, সেখানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুও ছিলেন। এমনকি আমাদের এখানে দীপু মনির বাবা ওদুদ সাহেবসহ আমাদের আওয়ামী লীগের অনেক নেতৃবৃন্দ প্রায় ৭০ জনের মতো তখন গ্রেফতার হয় অথবা পুলিশের লাঠির বাড়িতে আহত হয়।
এরপর নাজিমুদ্দিন সাহেব একটা যোগাযোগ করে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের সাথে আলোচনা হয় এবং তিনি ওয়াদা দিয়েছিলেন যে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিটা তিনি পার্লামেন্টে তুলবেন এবং মেনে নেবেন। এবং ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের দাবিগুলি মেনে নেওয়ার ফলে সকলে আবার ১৫ তারিখে সন্ধ্যায় মুক্তি পান।
১৬ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলা, এই আমতলা এখন আমাদের যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ তার যে আউটডোর এটাই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর সেখানেই ছিল আমতলা এবং সেখানে একটা সভা হয়। সেই সভায় সভাপতিত্ব করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এবং সেখানে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণ দেওয়া হয়।
আর এই সংগ্রাম করতে গিয়ে বারবার কিন্তু তিনি গ্রেফতার হয়েছেন, গ্রেফতার হয়েছেন মুক্তি পেয়েছেন। কারণ সংগ্রাম পরিষদ তখন সমগ্র দেশে ছড়িয়ে যায়। এই রাষ্ট্র ভাষা বাংলার দাবিতে যাতে জনমত সৃষ্টি করা এবং সংগ্রাম গড়ে তোলার জন্য এবং এরই একপর্যায়ে বঙ্গবন্ধু ফরিদপুরে যেয়েও গ্রেফতার হন, আবার মুক্তি পান। বারবার গ্রেফতার হয়েছেন, মুক্তি পেয়েছেন। পরবর্তীতে ঢাকায় তিনি ৪৯ সালের অক্টোবর মাসে ঢাকায় একটি ভুখা মিছিল হয়। তখন লিয়াকত আলী খান পূর্ববঙ্গে আসার কথা, সেই সময় এই আন্দোলনে গিয়ে গ্রেফতার হয়ে গেলেন। তারপর কিন্তু অনেকে মুক্তি পেয়েছে কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মুক্তি পাননি। কিন্তু কারাগারে থেকেও তিনি যখনি কোর্টে অথবা চিকিৎসার জন্যে ঢাকা মেডিকেল কলেজে আসতেন তখনি কিন্তু তিনি ছাত্রনেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করতেন। এই সাক্ষাতকারের একটা পর্যায়ে, তিনি ছাত্রলীগের তখন সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন নইমুদ্দীন সাহেব এবং খালেক নেওয়াজ, তাদের সঙ্গে গোপনে বৈঠক করে এবং ঐ বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, যে একুশে ফেব্রুয়ারি তখন প্রাদেশিক পরিষদের বাজেট সেশন বসবে, তখন পার্লামেন্ট বসত জগন্নাথ হলের যে হলটা ভেঙে পড়ে গিয়েছিল, আপনাদের মনে আছে অক্টোবর মাস ১৫ই অক্টোবর, ঐটাই ছিল মূলত তখন প্রাদেশিক পরিষদের মানে সংসদ ভবন, ওখানেই তখন বৈঠক হতো। যেহেতু ওখানে বৈঠক হবে, ছাত্রদের আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে সেই ধরনের নির্দেশনা দেন এবং সেই সাথে সাথেই একটা সংগ্রাম পরিষদ আবার গঠন করা হয় ’৫২ সালে এবং সেখানে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে যেন সংগ্রাম পরিষদ গঠন হয়, সে নির্দেশনাও তিনি দিয়েছিলেন।
কাজেই এভাবেই তিনি ঐ বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেন, তিনি তার দাবি আদায়ের জন্য অনশনে যাবেন এবং ১৫ই ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি অনশন করা শুরু করেন, তার সঙ্গে আমাদের ন্যাপে মহিউদ্দিন সাহেব (তিনিও পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের) অনশন করেন। অনশনরত অবস্থায় তাকে ফরিদপুর জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। যখন তাকে ফরিদপুর জেলে নিয়ে যায় ঐ সময় স্টিমার এখানে ওয়াইজ ঘাট থেকে স্টিমার ছাড়ত, নারায়ণগঞ্জে স্টিমার থামত, তিনি আগেই খবর দিয়েছিলেন যে নারায়ণগঞ্জের নেতৃবৃন্দ যেভাবে হোক ওনার সঙ্গে যেন দেখা করে। সেখানেও তিনি বসে তাদেরকে চিরকুট পাঠান এবং অনেকের সাথে সাক্ষাৎ হয়, সেখানেও নির্দেশ দিয়ে যান যে আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।
ভাষার আন্দোলন কিন্তু থেমে না থাকে, সেই নির্দেশনাও তিনি দিয়ে গিয়েছিলেন। কাজেই এইভাবেই তিনি এই আন্দোলনটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, কারাগারে বসেও তার কিন্তু এই আন্দোলন সম্পর্কে সব সময় সচেতন ছিলেন।
’৫২ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারি যখন মিছিল বের হয়, সেখানে গুলি চলে এবং আমাদের শহিদরা রক্ত দিয়ে এই ভাষা আন্দোলনকে একটা জায়গায় নিয়ে যান। অথচ সেই ’৪৮ সাল থেকে আন্দোলন শুরু ’৫২ সালে এসে বুকের রক্ত দিয়ে রক্তাক্ষরে ভাষার অধিকারের কথা আমাদের শহিদরা লিখে গিয়েছেন।
এরপর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন হয়। নির্বাচনে তখন যুক্তফ্রন্ট একে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা ভাসানী, তারা সকলে মিলে যুক্তফ্রন্ট করেন। সেই যুক্তফ্রন্ট জয়ী হলেও সেই সরকার বেশি দিন ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। কারণ পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় সরকার সেখানে নানারকম চক্রান্ত ষড়যন্ত্র করে এবং সেই সরকার বাতিল করিয়ে ৯২/ক ধারা দিয়ে সেখানে এমারজেন্সি ডিক্লেয়ার করে, আবার সবাইকে গ্রেফতার করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আবার গ্রেফতার হন।
এরপর ’৫৬ সালে এসে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে তখন সোহরাওয়ার্দী সাহেব, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। সেখানে অনেকগুলি শর্ত মেনেই তাকে হতে হয়েছিল। যাই হোক, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হয়ে পাকিস্তানের জন্য প্রথম সংবিধান রচনা করে। পাকিস্তান রাষ্ট্র হবার পর কিন্তু আর এর পূর্বে পাকিস্তানের সংবিধান রচিত হয়নি। এই সংবিধানে তখন উর্দুর সাথে বাংলাকে রাষ্ট্রাভাষা হিসেবে মর্যাদা দেয়া হয় এবং সেটা আপনারা শুনেছেন যে, শর্ত সাপেক্ষে। সেটা আমরা জানি। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ আসার পরেই কিন্তু যে শাসনতন্ত্র পাকিস্তানে রচিত হয়েছিল, সেখানেই বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পায়। আর সেই সরকার ২১শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে ঘোষণা দেয়, ছুটি ঘোষণা করা হয়, সরকারি ছুটি পালন করবার জন্য বাজেটে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে, প্রকল্প নিয়ে কাজও শুরু করে।
’৫৮ সালে আইয়ুব খান তখন মার্শাল ল’ জারি করে। আইয়ুব খান ছিল পাকিস্তানের সেনাপ্রধান, তিনি একাধারে সেনাপ্রধান আবার সেই সাথে নিজেকে রাষ্ট্রপতিও ঘোষণা দেয়, ক্ষমতা দখল করে। আবার আমাদের ভাগ্যে নেমে আসে সেই অমানিশার অন্ধকার এবং বাংলাকে আবারও মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। সে সময় আপনারা শুনেছেন, এর আগে আমি নিজেও বলেছি, যে বাংলা ভাষা চর্চা করা যাবে না, বাংলায় কথা বলা যাবে না। আবার কবিতাগুলিও, আপনারা কিছুক্ষণ আগেই শুনলেন যে, কবিতাগুলিকেও কি মুসলমানি ভাষা দিতে হবে; মানে ফযরে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি, সারাদিন আমি যেন ভাল হয়ে চলি। সেটাকে করা হয়েছিল, ফযরে উঠিয়া আমি দেলে দেলে বলি, সারাদিন আমি যেন আচ্ছা হয়ে চলি। এমনকি কবি নজরুলের সেই কবিতা, সজীব করিব মহা শশ্মান, এই মহাশশ্মান থাকতে পারবে না, সেখানে বসানো হল গোরস্তান। আর রবীন্দ্রনাথ পড়া যাবে না, রবীন্দ্রনাথ বন্ধ করে দেওয়া হলো। রবীন্দ্র সংগীত শোনা যাবে না, রবীন্দ্রনাথ পড়া যাবে না। আমার মনে আছে, আমাদের বাংলা ডিপার্টমেন্টের শিক্ষকরা, রফিক স্যার এখানে উপস্থিত আছেন, তখন কিন্তু সমস্ত শিক্ষকরা এর প্রতিবাদ করেছিলেন। সেই সময়, আমাদের বাংলা ডিপার্টমেন্টের যিনি হেড ছিলেন হাই স্যার, তাকে ডেকে নিয়ে মোনায়েম খান, মোনায়েম খান খুব বিরক্ত, কারণ এখানে আন্দোলন কেন চলবে? রবীন্দ্রনাথ তাকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তাতে কি আছে? রবীন্দ্রনাথ ছাড়া কি চলে না ভাষা? কাজেই সেই দিন থেকে নজরুলের কবিতাকে মুসলমানি শব্দ দেয়া হচ্ছে, আর রবীন্দ্রনাথ একেবারে বাতিল। এই হলো তাদের মানসিকতা। তো সেখানে দেখা গেল যে যখন হাই স্যারকে ডেকে মোনায়েম খান সাহেব বলল যে, কি মিয়ারা আপনারা বসে খালি রবীন্দ্র সংগীত, রবীন্দ্র সংগীত করেন ২/৪ খান রবীন্দ্র সংগীত নিজে লিখে ফেলতে পারেন না। উনি (হাই সাহেব) খুব ভদ্র লোক ছিলেন, খুবই নেহাইত ভদ্র মানুষ। আমি যখন ভর্তি হই, তখন উনি বাংলা বিভাগের প্রধান ছিলেন। উনি খুব বিনয়ের সাথে বলেছিলেন যে, স্যার, আমরা তো লিখতে পারি কিন্তু সেটা তো রবীন্দ্র সংগীত হবে না, আমি লিখলে ওটা তো হাই সংগীত হয়ে যাবে। এইভাবে আমাদের ভাষার ওপর বারবার আঘাত এসেছে।
এই আঘাতটা কিন্তু সেই আমাদের স্বাধীনতার আগ পর্যন্ত, বারবারই আমরা দেখেছি। কখনও রোমান হরফে বাংলা লিখতে হবে, কখনও আরবি হরফে বাংলা লিখতে হবে। এভাবে বারবার এক-একটা সমন জারি হয়েছে আর আমাদের দেশের মানুষ কিন্তু সবসময় আন্দোলন করেই গেছে এর বিরুদ্ধে। কারণ প্রত্যেকটা অর্জনই কিন্তু সংগ্রাম করে, আন্দোলন করে আমাদেরকে অর্জন করতে হয়েছে। প্রত্যেকটা অর্জনের পেছনে আমাদের কিন্তু অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা রয়েছে।
জাতির পিতা যে কথাটা বলেছিলেন, যে আমাদের ভাষা আন্দোলন এটা শুধুমাত্র যে ভাষার জন্যই তা নয়; এখানে আমাদের সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য এ আন্দোলন ছিল। এই ধারাবাহিকতায় কিন্তু জাতির পিতা একটা জাতিকে ধীরে ধীরে আন্দোলনের পথ বেয়ে স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। তিনি যে ৬-দফা দিয়েছিলেন, সেই ৬-দফা ছিল বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের আন্দোলনের সোপান। এটা পাকিস্তানিরা বুঝতে পেরেছিল, যে কারণে ৬-দফা দেবার সাথে সাথে তাকে গ্রেফতার করে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দিয়ে তাকে ফাঁসি দিয়ে হত্যার চেষ্টাও করা হয়েছিল। কিন্তু এখানে আমাদের ছাত্রসমাজ, দেশের জনগণ ব্যাপক আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে আইয়ুব খান সরকারের পতন ঘটিয়েছিল এবং বাধ্য করেছিল এই মামলা প্রত্যাহার করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে। মুক্তিটা তখন তিনি পেয়েছিলেন ’৬৯ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি।
আমি জানি না, উনার জীবনীটা পড়লে খুব অদ্ভুত লাগে। ’৫২ ভাষা আন্দোলনের যে সংগ্রাম তিনি ’৪৮ সাল থেকে শুরু করলেন এবং একের পর এক গ্রেফতার হলেন। এরপরে যখন ’৪৯ সালে তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন তারপর কিন্তু আর মুক্তি পান নাই। ’৪৯, ’৫০, ’৫১ এরপর ’৫২ সালে যেয়ে ২৭শে ফেব্রুয়ারি যখন তিনি অনশনরত অবস্থায় প্রায় মৃতপ্রায়, তখন তিনি ২৭শে ফেব্রুয়ারি মুক্তি পান।
আবার ’৬৯ সালে যখন তাকে গ্রেফতার করা হলো, তারপর তিনি মুক্তি পেলেন ২২ ফেব্রুয়ারি ’৬৯ সালে। ’৬৬ সালে গ্রেফতার করা হয়, ’৬৬ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে অনেকগুলি মামলা দেওয়া হলো এবং অনেক সাজাও দেওয়া হলো। তারপর ’৬৮ সালে ১৮ই জানুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো। ১৮ই জানুয়ারি যখন নিয়ে যাওয়া হয়, আমরা পরিবারের কেউ জানি না কোথায় নিয়ে গেছে, কেমন আছেন, বেঁচে আছেন কি না? কোনো খবরই আমরা পায় নি। যখন আগরতলা মামলা শুরু হয়, ঐ কোর্টে প্রথম দেখা। কাজেই, এভাবে বারবার যে আঘাত এসেছে, তারপরও তিনি কিন্তু একটা নীতি নিয়ে, আদর্শ নিয়ে, বাঙালি জাতির স্বাধিকার আদায়, স্বাধীনতা অর্জনের জন্য কিন্তু সংগ্রাম করে গেছেন। আর সেই সংগ্রামে পথ বেয়েই আজকে আমরা এই বাংলাদেশে, স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি।
তার যে ঐতিহাসিক ভাষণ ৭ই মার্চের, যে ভাষণ আজকে বিশ্ব ঐতিহ্য প্রামাণ্য দলিলে স্থান পেয়েছে, সেটা বাঙালি জাতি আজকে মর্যাদা পেয়েছে। বাঙালি জাতির জন্য এটা গৌরবের। কাজেই যা কিছু অর্জন আমাদের করতে হয়েছে, সংগ্রামের পথ বেয়েই করতে হয়েছে।
স্বাধীনতার ঘোষণা তিনি দিলেন সাথে সাথে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হলো। যা হোক, তারপর তিনি মুক্তি পেলেন, আমরা বিজয় অর্জন করলাম ’৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর। এরপরে জাতির পিতা মুক্তি পেলেন ৮ই জানুয়ারি ’৭২ সালে, ১০ই জানুয়ারি তিনি বাংলাদেশে ফিরে এলেন। তো ফিরে এসে যে কাজটি তিনি করেছেন যে, একটা প্রদেশ ছিল তাকে একটা রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা এবং স্বাধীনতার সুফল যেন বাংলাদেশের মানুষের ঘরে পৌঁছায় এবং একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ে তোলা, ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় তিনি হাতে নিলেন। মাত্র সাড়ে তিন বছর সময় পেলেন, এই সাড়ে তিন বছরের মধ্যেই একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তুলে অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনের পথে নিয়ে যাওয়া। এবং ক্ষমতাকে বিকেন্দ্রীকরণ করে একেবারে তৃণমূল পর্যায়ে, একদম মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা তিনি নিয়েছিলেন। যাতে অর্থনৈতিক উন্নতিটা দ্রুত হয় এবং বাঙালি জাতি যেন বিশ্বসভায় একটা মর্যাদার আসন পায়। ঠিক যখন এই অর্থনীতিক অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন, জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার আওতায় চলে এসেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি চলতে শুরু করেছে, দেশ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের, দেশের মানুষের ভিতরে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছে এবং ঐ যুদ্ধের ভয়াবহতা কাটিয়ে উঠে যখন অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। কারণ এটা খুব কঠিন একটা কাজ ছিল, সাড়ে ৭ কোটি মানুষের মধ্যে ১ কোটি মানুষ ছিল শরণার্থী। ৩ কোটি মানুষ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসর, আলবদর, রাজাকার, আলশামস ও যুদ্ধাপরাধী, যারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে ছিল, তারা পথ দেখিয়ে দেখিয়ে নিয়ে গেছে। এই বাংলাদেশে তারা পোড়ামাটি নীতি গ্রহণ করেছিল, তারা মানুষ চায়নি তারা খালি মাটি চেয়েছিল। এইভাবে তারা গণহত্যা চালিয়েছে, আগুন দিয়ে বাড়িঘর পুড়িয়েছে। ৩ কোটির ওপর মানুষ গৃহহারা ছিল, তার ওপর প্রতিটি শহিদ পরিবার, শহিদ মুক্তিযোদ্ধা, আহত মুক্তিযোদ্ধা এবং আমার লাঞ্ছিত মা-বোন; তাদের পুনর্বাসন, চিকিৎসা সব ব্যবস্থায় কিন্তু অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি (বঙ্গবন্ধু) করেছিলেন।
সব থেকে বড় কথা, মিত্রশক্তি ভারতের সেনাবাহিনী যারা আমাদের সাথে ছিল কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে, অনেক রক্ত ঝরেছে, কিন্তু সেই মিত্রশক্তিকেও ফেরত পাঠিয়েছিলেন। জাতির পিতার অনুরোধে ইন্দিরা গান্ধী তাদেরকে ফেরত নিয়ে যায়। আমরা দেখেছি যখন বাংলাদেশ একটু অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী তখন কিন্তু ’৭৫ সালে আমরা আমাদের প্রবৃদ্ধি ৭ ভাগ পর্যন্ত অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলাম। দুর্ভাগ্য, যে ঠিক তখনি আঘাতটা আসল, জাতির পিতাকে নির্মমভাবে হত্যা করে এবং গোটা পরিবারকে একই সাথে ৩টা বাড়ি আমার মেজো ফুপু, সেজো ফুপু, ছোট ফুপু প্রত্যেকের বাড়িতে আক্রমণ করল, প্রতিটি বাড়ির সদস্যকে হত্যা করল এবং এরপরে জেলখানায় জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করল। তারপর আপনারা ধীরে ধীরে নিজেরাই শুনেছেন, প্রত্যেকটা জিনিসের নাম পর্যন্ত পরিবর্তন হয়ে গেল। ঠিক পাকিস্তানি ভাবধারায় আবার এই নামগুলি পরিবর্তন করে এবং ’৭৫-এর ১৫ই আগস্টের পর প্রথম যে ঘোষণা, সেখানে কিন্তু বাংলাদেশকে ঐ ইসলামিক রাষ্ট্র হিসেবে একপর্যায়ে ঘোষণা দিয়েছিল। তারপর যখন বুঝল যে, এটা মানুষ গ্রহণ করবে না, তখন আর ও কথা দ্বিতীয়বার উচ্চারিত হয়নি। কিন্তু প্রথম ঘোষণাটা ওভাবে এসেছিল অর্থাৎ এটাকে যেন পাকিস্তানের একটা প্রদেশ বানাবারই একটা প্রচেষ্টা হয়েছিল।
এরপর ২১ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারেনি এবং যারা এসেছিল তারা তো অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারি। তারা ঐ আইয়ুব খানের পদাঙ্ক অনুসরণ করেই ক্ষমতায় এসেছে এবং দেশকে তারা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে না, বাংলাদেশ যে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, বাংলাদেশ যে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অর্জন করেছে, সেই বিজয়ী মনোভাবটাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া এবং পরাজিত যেই শক্তিকে আমরা পরাজিত বললাম, ঐ তাদেরই প্রতি খোষামোদি, তোষামোদি চাটুকারিতা আমরা দেখেছি। তাদের দেখলেই যেন বেঁহুশ হয়ে পড়ার মতোন অবস্থা ছিল, যারা ক্ষমতায় ছিল।
যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার জাতির পিতা শুরু করেছিলেন, সেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার মার্শাল অর্ডিন্যান্স দিয়ে বন্ধ করে তাদেরকে মুক্ত করে তাদের দল করার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল।
অনেকেই যখন বলেন যে, জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র দিয়েছিল। তাদের বহুদলীয় গণতন্ত্র মানেই তো ঐ যুদ্ধাপরাধীদের দল করার সুযোগ করে দেওয়া, যাদের সাজা হয়েছিল তাদের মুক্ত করা। কাউকে প্রধানমন্ত্রী, কাউকে মন্ত্রী, কাউকে উপদেষ্টা, তাদের হাতে আমার লাখো শহিদের রক্তে রঞ্জিত পতাকা তুলে দেওয়া। জাতির পিতার হত্যাকারী তাদেরকে বিচার না করে পুরস্কৃৃত করে বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দেওয়া। কি দুর্ভাগ্য যে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত বা দূতাবাসে কর্মরত তাদের পরিচয় কি? তাদের পরিচয় হচ্ছে, যার নেতৃত্বে এ স্বাধীনতা সেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের হত্যাকারী, খুনি। আমার মনে আছে, পোল্যান্ডে যখন পাঠানো হয় একজন খুনিকে, পোল্যান্ড সরকার তাকে গ্রহণ করে নাই। বলেছিল শেখ মুজিবের হত্যাকারীকে আমরা এখানে কোনো পদে আসতে দেব না। কাজেই, আমরা দেখেছি যে কীভাবে দেশের ভাবমূর্তি সারাবিশ্বে নস্যাৎ করে দেওয়া হয়েছিল।
২১ বছর পর আমরা সরকারে আসি। আমরা আসার পর আমরা প্রচেষ্টা চালিয়েছি দেশের উন্নয়নে এবং আজকে ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। সেই প্রস্তাবটা যখন করা হয়েছিল, আপনারা শুনেছেন যে, সালাম আর রফিক, তারাই আরও কয়েকটি দল-দেশের প্রতিনিধি মিলে ঐ যে ভালোবাসি মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠা করেন এবং তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী আমরা যখন রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রস্তাব নেই এবং সেখানে ১৭ই নভেম্বর ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কোতে ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করে। আজকে আমরা যখন ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছি, পৃথিবীর বহু দেশের বহু জাতির মাতৃভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। কাজেই সেই মাতৃভাষাগুলিকে সংরক্ষণ করা, সেই মাতৃভাষা গুলির চর্চা করা, মাতৃভাষা গুলির নমুনা রাখা এবং একটা ভাষা জাদুঘর, আমরা কিন্তু সেই জাদুঘর তৈরি করেছি। এই প্রতিষ্ঠানটা আমি ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে গেছিলাম, কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, বিএনপি ক্ষমতায় এসে আমার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট আর তারা তৈরি হতে দেয়নি, সেখানেই বন্ধ করে রেখেছিল। আমি ২০০৯ সালে সরকারে আসার পর আবার সেটা প্রতিষ্ঠা করি। কাজেই একদিক দিয়ে বোধহয় ভালো, কারণ আমি এসে আমার হাতে শুরু ছিল, আবার আমরা এসেই সেটাকেই প্রতিষ্ঠা করেছি। আজকে সেখানে পৃথিবীর বিভিন্ন মাতৃভাষা আমরা সংগ্রহ করছি, সেখানে গবেষণার সুযোগ আছে এবং হারিয়ে যাওয়া ভাষাগুলিকেও আমরা এখানে সংরক্ষণ করছি। ভাষা জাদুঘর একটা আমরা তৈরি করে দিয়েছি। মনে হয়, বাংলা সারা বিশ্বব্যাপী আজকে বাংলাদেশিরই আজকে দায়িত্ব পড়েছে মাতৃভাষাকে সংরক্ষণ করার।
মাতৃভাষায় শিক্ষা আমি আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের কাছে জানলাম যে, আমরা সাবসিডারি হিসেবে একটা মূল সাবজেক্ট আমরা নিই অথবা অনার্স আমরা নিতাম। কিন্তু সাথে সাথে দুটি বিষয় আমরা সাবসিডারি নিই। আমি বিষয়টি জানতাম না যে, বাংলাকে আমরা যখন অনার্স করতাম তখন বলত সাবসিডারি এখন বলে মেজর অর মাইনর। কিন্তু বাংলা ভাষা না-কি শেখা যায় না, নেওয়া যায় না। এটা আমি জানি না, আমার মনে হয়, এ বিষয়ে ইউজিসির সাথে, বা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে আলোচনা করতে হবে, যে এটা কেন? বাংলা ভাষার প্রতি এই অবহেলা কেন?
আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আমরা ব্যাপক হারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় দিয়েছি, কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা শিক্ষা হবে না, বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে কোনো শিক্ষার ব্যবস্থা থাকবে না, এটা তো হতে পারে না। এটা কেন হবে? আরেকটি বিষয় খুব সঠিকভাবে বলে যাই, মাত্র কিছুদিন আগে আমাকে একজন একটা বিয়ের কার্ড দিলেন, বিয়ের কার্ডটা পরে আমি খুব খুশি হলাম এবং তাকে ধন্যবাদও জানালাম। তিনি আমাদের সচিব ছিলেন। আমি ধন্যবাদ জানালাম এজন্য যে, তার বিয়ের কার্ডটা বাংলা ভাষায় রচনা করেছে এবং সেটা এনে দিয়েছে। নইলে এটা ঠিকই, আমাদের স্যার যে কথা বলেছেন বা সৈয়দ আনোয়ার হোসেন সাহেব যা বলেছেন এ কথা সত্যি, প্রত্যেকটা বিয়ের কার্ড হয় ইংরেজি ভাষায়। আমি ঠিক জানি না কেন হয়? অনেকে যখন নিয়ে আসত আমি জিজ্ঞেস করতাম যে, কেন ইংরেজি ভাষায় কেন? কিসের জন্য এই দাওয়াতের কার্ড বা বিয়ের কার্ড কেন ইংরেজি ভাষায় লিখতে হবে কেন? এটার সাথে আমি ঠিক জানি না, কোনো মর্যাদার কোনো বিষয় আছে কি না, সেটাও আমি বুঝি না! কিন্তু ইংরেজি ভাষায় লেখে। এটা কিন্তু ব্যাপকভাবে মনে হয় যেন এটা একটা ব্যাধির মতো ছড়িয়ে গেছে। হ্যাঁ, যদি কোনো ইংরেজি ভাষাভাষির জন্য যদি তৈরি করত তাহলে সেটা গ্রহণযোগ্য। কিন্তু আমরা বাংলা ভাষায় লিখব না কেন? দাওয়াতের কার্ডটা লিখতে পারি না কেন? এই দৈন্যটতা কেন দেখাতে হবে? এটা আমিও বুঝি না।
আজকে আমার শ্রদ্ধেয় স্যার রফিক সাহেব এবং শ্রদ্ধেয় আমাদের সৈয়দ আনোয়ার হোসেন সাহেব যে কথাগুলি বলেছেন, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলি তারা বলে গেছেন। আমরা চেষ্টা করব যে, এ কথাগুলো আমি নোট করে নিয়েছি, যে এগুলি কীভাবে সুরাহা করা যায়, তার কিছু কিছু আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেব, আমাদের নিতে হবে।
অন্য ভাষা শিখার বিপক্ষে কিন্তু আমরা না, ভাষা শিখতে হবে। আজকে সারাবিশ্বটা যেহেতু প্রযুক্তির প্রভাবে, আজকে বিশ্বটা কিন্তু এক হয়ে গেছে। সেই জন্য বিশ্বের সাথে যোগাযোগ রাখতে গেলে আমাকেও অন্য ভাষা শিখতেই হবে। কিন্তু অন্য ভাষা না শিখতে পারলে আমরা উন্নত হতে পারব না, এটা আমি বিশ্বাস করি না। কারণ জাপানিজরা কিন্তু জাপানিজ ভাষায় কথা বলে বলে তারা সারাবিশ্বে একসময় সব থেকে অর্থনৈতিকভাবে উন্নত জাতি হিসেবে নিজেদেরকে গড়ে তুলেছিল, তারা কিন্তু সব সময় নিজের ভাষায় কথা বলত। এখনও কিন্তু জাপানিজ ভাষাই তারা ব্যবহার করে। তবে ভাষা শিখার ব্যাপারে আমি একেবারে বিরুদ্ধে না, যে যত বেশি ভাষা শিখতে পারবে, অবশ্যই আমরা চাই। আমি এটাই চাইব, যে আমাদের দেশে যেমন ইংরেজি এখন একটা আন্তর্জাতিক ভাষার মাধ্যম হয়ে গেছে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ কিন্তু, এই ইংরেজি ভাষাটা এখন শিখছে, আগে যারা শিখত না তারাও শিখছে, তারাও কিন্তু এ ভাষার চর্চা করছে। এ ভাষায় কথা বলছে। হ্যাঁ, সেটা আমরা জানব। যখন আমাদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কথা বলতে হবে, আমরা বললাম। খুব ভালো কথা কিন্তু আমার নিজের দেশে ভাষার জন্য, আমাদের ভাষা শহিদদের রক্ত দিয়ে, রক্তের অক্ষরে মাতৃভাষার মর্যাদা দিয়ে গেছে, আমরা সেটা শিখব না কেন? আমরা সেটা বলব না কেন? বা আমরা সেটার চর্চা করব না কেন? সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন? সেটাই হচ্ছে মূল কথা? কাজেই, আমাদেরকে এ বিষয়টা দেখতে হবে, এই মর্যাদাটা আমাদের দিতে হবে, শুধু দিবসটা আসল পালন করলাম, তা না। ওনারা ঠিকই বলেছে, সাইনবোর্ডগুলি লেখা হয় আমরা ইংরেজি ভাষায়। বাংলা ভাষায় কিন্তু অনেক বিদেশি ভাষা আছে, অনেক শব্দ আছে আমরা কিন্তু শব্দগুলি গ্রহণ করে নিচ্ছি, আবার বাংলা ভাষার শব্দও কিন্তু আবার অন্য ভাষায় চলে গেছে, এটাও ঠিক। এটা যায়, এটা ভাষারই একটা নিয়ম, এই আদান-প্রদান এটা হয়। কিন্তু তারপরেও আমাদের দেশে অন্য ভাষায় কেউ দিতে চাইলে দিক, কিন্তু সেখানে মাতৃভাষা বড় করে লিখবে, অন্য ভাষাটা একটু ছোট করে আলাদাভাবে লিখুক, আমাদের আপত্তি নাই। মাতৃভাষার চর্চটা তো থাকতে হবে, এটা তো একান্তভাবে অপরিহার্য বলেই আমরা মনে করি। যেমন কথা হচ্ছে উচ্চ আদালতের রায়, হ্যাঁ, উচ্চ আদালতের যখন রায় হয় তখন ইংরেজিতে লেখা হয়। আমাদের চেয়ে অনেক সাধারণ মানুষ আছে হয়তো ইংরেজি ভালো জানে না, তার যে উকিল সাহেব থাকে ঐ রায় পরে উকিল সাহেব যেটা বোঝায়, সেটাই তাকে বুঝতে হয়, সেটুকুই তাকে জানতে হয়। এখন উকিল সাহেব ভালো করে বললেন না, বুঝলেন বা এমন কথা বলে দিলেন যে, হয়তো তার পকেট থেকে আরও বেশি কিছু টাকা খসলো। অবশ্য আমি আশা করি, উকিল সাহেবরা কিছু মনে করবেন না। এখানে অনেক আবার আমাদের আইনজীবী আছে, তারা যেন কিছু মনে না করে। কিন্তু এটা কিন্তু বাস্তবতা। যে রায়টা পেলেন, এ রায়টা পাওয়ার পর এই সাধারণ মানুষটা তিনি তো নিজে পড়ে দেখে বুঝতে পারছেন না। তিনি যার ওপর নির্ভর করছেন তিনি যেভাবে বলেছেন সেইটাই তাকে বলতে হচ্ছে। তাতে যদি তার কিছু পকেট খালি হয়, সেটাও হচ্ছে। কাজেই তাকে তো জানার আর বোঝার সুযোগটাও দিতে হবে, এদিকটাও তো বিবেচনা করতে হবে। তবে এখন যেমন নিম্ন আদালতে এখন ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে বাংলা ভাষায় রায়ের। এখন উচ্চ আদালতেও, আমরা আশা করি যে ভবিষ্যতে, যে দীর্ঘদিনের একটা চর্চা চট করে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, কিন্তু তাও, আমরা আশা করি, নিশ্চয়ই সেটা লিখবে, তা ঐ জিনিসটাই ভাষান্তর করা হোক, অনুবাদ করা হোক, অনুবাদের বিরুদ্ধে আমরা না। কিন্তু অন্ততপক্ষে বাংলা ভাষায় লিখলে পরে যারা অন্তত একটা ন্যায়বিচার চাচ্ছিল, তারা কি বিচার পেল, অন্তত সেটুকু তো তারা জানতে পারবে, সে সুযোগটা তো তারা পাবে। কাজেই এ চর্চাটা আমাদের থাকা উচিত বলে আমরা মনে করি। আরেকটা বিষয় হচ্ছে যে, বাংলা ভাষায় কথা বলি কিন্তু এই বাংলা ভাষা এখন অনেকটা এখন ইংরেজি মানে ইংরেজি টোনে বলা, এক ধরনের কেমন যেন একটু বিকৃত করে বলার কেমন একটা চর্চা শুরু হয়ে গেছে। সেটা কেন, আমি জানি না।
কারণ, হ্যাঁ, যেমন আমাদের একটা অসুবিধা ছিল আমরা ’৭৫-এর পর দেশে ফিরতে পারে নাই। ৬টা বছর আমাদের বিদেশের মাটিতে থাকতে হয়েছিল। ছেলেমেয়েগুলি বিদেশেই তারা লেখাপড়া শিখতে বাধ্য হয়েছিল যেখানে বাংলা শেখার এতটুকু সুযোগ ছিল না। কিন্তু আমি রেহানা, আমরা, কিন্তু সব সময় চেষ্টা করেছি আমাদের ছেলে-মেয়েদের ঐ সীমিত অবস্থায় এবং হোস্টেলে পড়াশোনা করেছে, প্রতি সপ্তাহে বাংলায় চিঠি লিখতাম; আর ছুটিতে আসলে বাংলা শেখাতে চেষ্টা করতাম। যাতে করে অন্তত কিছুটা মাতৃভাষাকে তারা জানুক, তারা সুযোগ পাক। তারা বিদেশে লেখাপড়া শিখেও অন্তত যতটুকু বাংলা বলতে পারে বা যতটুকু শুদ্ধভাবে বলতে পারে, আমরা তো দেখি যে, বাংলাদেশে থেকে হয়তো বেশ ভালো একটু ভালো ইউনিভার্সিটিতে পড়ে তারাও যেন বাংলা বলতেই চায় না, বলতেই পারে না; বলতে গেলেও একটু বিকৃত করে বলে। সেখানেই খুব দুঃখ লাগে। আমরা তো বাধ্যতামূলকভাবেই আমাদেরকে বিদেশে থাকতে হয়েছিল। কিন্তু যারা এখানেই মানুষ হচ্ছে, তাদের মধ্যেই এই বিকৃত থাকবে কেন? আমি আবারও বলছি আমি কিন্তু ভাষা শেখার পক্ষে, যতটুকু ভাষা শেখা যায়, আমরা নিশ্চয়ই সেটাকে স্বাগত জানাই; আমরা এটা চাই। আমি এটা মনে করি যে, আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েদেরকে একবারে শুরু থেকেই যে ইংরেজি ভাষা ইংরেজি ভাষা দ্বিতীয় ভাষা। পৃথিবীর সব দেশেই এটা আছে, একটি মাতৃভাষা শিক্ষা আর একটি দ্বিতীয় ভাষা শিক্ষা। এই দ্বিতীয় ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ এখন দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ। এখন আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ করে দিয়েছি। গ্রামে বসেই আমার ছেলে-মেয়েরা বিভিন্ন দেশের ভাষা শিখে কিন্তু তারা অনলাইনে অনেক অর্থ উপার্জন করছে। সেই সুযোগটা সৃষ্টি করতে হবে কিন্তু সাথে সাথে যে ভাষা আমার মায়ের ভাষা, যে ভাষায় আমরা কথা বলি, যে ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছি, সেই ভাষার চর্চাটা তো আমাদের থাকতে হবে। সে শিক্ষাটা পেতে হবে; সেটা পরিবার থেকে উৎসাহিত করতে হবে। কারণ পরিবার থেকে না করলে কিন্তু এটা কখনই শেখা যায় না। কাজেই সেটাও আমাদের করতে হবে। কাজেই সেটাই আমরা চাই।
আজকে বাংলাদেশের আমরা বলব যে, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত আমরা যে কাজগুলি করেছিলাম, মাঝখানে আবার পথ হারিয়ে যায় বাংলাদেশ অর্থাৎ ২০০১-২০০৮ পর্যন্ত। আমরা আবার সরকারে আসার পর, আজকে বাংলাদেশে আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সমুন্নত রাখা, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসগুলি আবার মানুষের সামনে তুলে ধরা, মুক্তিযুদ্ধের যে আত্মত্যাগের কাহিনি সেই কাহিনিগুলি বলা এমন একটা সময় দেখেছি যে, অনেকেই নিজে মুক্তিযোদ্ধা বলতে সাহস পেতেন না। একটি সরকারি চাকুরি পাওয়া জন্য তিনি যে মুক্তিযোদ্ধা, এ কথাটা লিখতে সাহস পেতেন না। কারণ তাহলে চাকরি পাবে না। কী দুর্ভাগ্য আমাদের! ’৭৫ সালের পর জাতির পিতাকে হারাবার পর এই অবস্থা বাংলাদেশে সৃষ্টি হয়েছিল, তখন ছিল রাজাকারদের দাপট। অন্তত আজকে, ২০০৮-এর নির্বাচনে আমরা জয়ী হয়েছি, এরপর ২০১৪-এর নির্বাচন ঠেকাতে যেয়ে অগ্নিসন্ত্রাস করেও ঠেকাতে পারেনি। আমরা সরকারে এসেছি এই দীর্ঘ সময় ৯ বছর সরকারে থাকার পরে অন্ততপক্ষে, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিতে আজকে মানুষ গর্ববোধ করে, এখন আর ভীতসন্ত্রস্ত হয় না। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসগুলি আবার সামনে এসেছে। মানুষ বলার সুযোগ পাচ্ছে, লেখার সুযোগ পাচ্ছে। অন্তত সেই আত্মবিশ্বাসটা ফিরে এসেছে। এই আত্মবিশ্বাসটা যেন হারিয়ে না যায়। এমন কোনো অন্ধকারে যেন আবার আমরা না পড়ি যে, আবার আমাদেরকে সেই অন্ধকারে চলে যেতে হবে, আবার মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে দ্বিধাগ্রস্ত হতে হবে, সেই পরিবেশ যেন ভবিষ্যতে আর কোনো দিন বাংলার মাটিতে না আসে, সে ব্যাপারে সবাইকে আমি বলব সচেতন থাকতে হবে। সবাইকে সচেতন থাকতে হবে, আবার যেন আমরা সেই ধরনের বিপদে না পড়ে যাই। কারণ যাদের হৃদয়ে পাকিস্তান, থাকে বাংলাদেশে, সবরকম আরাম-আয়েশ ফল ভোগ করবে এই দেশে, আর অন্তর আত্মাটা পড়ে থাকবে ঐ দেশে, আর তাদের জন্য আবার কাঁদে পাকিস্তান, পেয়ারে পাকিস্তান! কাজেই এই পেয়ারে পাকিস্তানওলাদের কাছ থেকে বাংলাদেশের মানুষকে রক্ষা করে চলতে হবে। এটাই আমার আবেদন থাকবে দেশবাসীর কাছে।
আমরা আমাদের ভাষা আন্দোলনের এই শহিদের রক্তের পথ বেয়েই কিন্তু লাখো শহিদের রক্তের বিনিময়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, ওই ১৫ আগস্টের খুনিদেরকেও পার্লামেন্টে ভোট চুরি করে বসানো হয়েছিল। আর স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী, যাদের যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচার হয়ে সাজাপ্রাপ্ত হয়েছে, সাজা কার্যকর হয়েছে, তাদেরকে যারা মন্ত্রী বানিয়েছিল, আমার লাখো শহিদের রক্তে রঞ্জিত পতাকা তাদের হাতে যারা তুলে দিয়েছিল, জাতি যেন কোনোদিন তাদেরকে ক্ষমা না করে। সেটাই আমার জাতির কাছে আবেদন। যারা আমার মা-বোনকে রেপ করেছে, যারা গণহত্যা চালিয়েছে, অগ্নিসংযোগ করেছে, লুটপাট করেছে সেই যুদ্ধাপরাধী আর যুদ্ধাপরাধী হিসেবে তাদেরকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে, তাদের বিচারের রায় আমরা কার্যকর করেছি। যারা এদেরকে মর্যাদা দিয়েছিল, যারা এদের হাতে পতাকা তুলে দিয়েছিল তাদের ব্যাপারে জাতিকে সচেতন থাকতে হবে। তাদেরকে কিন্তু জাতি কোনোদিন ক্ষমা করতে পারে না। ক্ষমা করবে না, জাতির কাছে আজকের দিনে আমার এটাই আবেদন থাকল।
আমি সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। আমি আশা করি যে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। আজকে জাতির পিতার নেতৃত্বেই এই বাংলাদেশ। আমরা নিম্নআয়ের দেশ হিসেবে একটা স্বীকৃতি পেয়েছিলাম, আজকে আমরা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছি অর্থাৎ, একধাপ বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়েছে। বাঙালি জাতি আজকে মর্যাদা পেয়েছে। এই অগ্রযাত্রা যেন অব্যাহত থাকে, শহিদদের প্রতি এটা আমাদের অঙ্গীকার যে, এই অগ্রযাত্রা আমরা অব্যাহত রাখব। সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য শেষ করছি।

Category:

সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না

Posted on by 0 comment

দুর্নীতি করলেই শাস্তি : জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী

উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, আমরা চাই দেশ এগিয়ে যাক, উন্নত হোক। আমরা চাই না দেশকে নিয়ে আর কেউ ছিনিমিনি খেলুক। কেউ দুর্নীতি করলে তাকে শাস্তি পেতেই হবে। অপরাধী যে-ই হোক, শাস্তি তাকে পেতেই হবে। অপরাধে যুক্ত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দুর্নীতি মামলার রায়কে সামনে রেখে বিএনপির গঠনতন্ত্র সংশোধনীর কঠোর সমালোচনা করে সংসদ নেতা বলেন, বিএনপি নেত্রী কারাগারে যাবেন এটি আগেই টের পেয়ে গেছে কি না জানি না। রায় হওয়ার আগেই রাতারাতি বিএনপি তাদের দলীয় গঠনতন্ত্রের ৭ ধারা পরিবর্তন করে নিয়েছে। এই ধারায় দুর্নীতিগ্রস্ত কিংবা সাজাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি নেতা হতে পারত না। রাতারাতি গঠনতন্ত্র সংশোধন করে বিএনপি দুর্নীতিকেই মেনে নিল, দুর্নীতিগ্রস্তকে নেতা হিসেবে মেনে নিল। যে দল দুর্নীতিকে নীতি হিসেবে গ্রহণ করে, অর্থাৎ দুর্নীতির দায়ে সাজাপ্রাপ্তকে নেতা হিসেবে মেনে নেয় সেই দল দেশকে কী দিতে পারে? স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে ২৮ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদ অধিবেশনে দশম জাতীয় সংসদের ১৯তম অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদ সমাপনী ভাষণে অংশ নেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর স্পিকার রাষ্ট্রপতির অধিবেশন সমাপ্তির আদেশটি পাঠ করার মাধ্যমে শীতকালীন অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
সমাপনী ভাষণের অংশ নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আদালতের রায় প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আদালত রায় দিয়েছেন, এখানে সরকারের তো কোনো হাত নেই। জজ সাহেব রায় দিলেন কেন সেজন্য অনেক বিএনপি নেতা হুমকিও দেন। তবে কী অপরাধীদের অভয়ারণ্য হবে বাংলাদেশ? এটা তো আমরা হতে দিতে পারে না। যেই হোক, অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হলে কাউকে ছাড় দেব না। জনগণের ভোটের অধিকার জনগণ ভোগ করবে। দুর্নীতিকে আমরা প্রশ্রয় দেই না। নিজেদের লোককেই কোনো ছাড় দেই না। এমনকি আমাদের মন্ত্রী-এমপিদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে যে কোনো সময় ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। আদালত থেকেও ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) স্বাধীনভাবে কাজ করছে। আমরা আইন মানি, কখনও নিজেদের দোষকেও ঢাকার চেষ্টা করি না।
তিনি বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিএনপি নেত্রীর বিরুদ্ধে যে মামলা (জিয়া অরফানেজ) দিয়েছে, সেই একই ধরনের মামলা আমার বিরুদ্ধেও ওই সময় দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সকল কাগজপত্র পরীক্ষা করেছে, এতটুকু ফাঁক পাওয়া যায় কি না। শত চেষ্টা করেও ট্রাস্টের এতটুকু অনিয়ম তারা পায়নি। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু ট্রাস্ট থেকে প্রতিমাসে ১৬ থেকে ১ হাজার ৭০০ শিক্ষার্থীকে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হয়। কিন্তু কোনো অনিয়ম না পেলেও ওই সময় ট্রাস্টের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে করে ওই সময় অনেক শিক্ষার্থীর জীবন ধ্বংস হয়ে গেছে, টাকার অভাবে গ্রেনেড হামলায় আহত অনেকেই পঙ্গু হয়ে গেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার বিরুদ্ধে বিএনপি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দায়েরকৃত কোনো মামলাই প্রত্যাহার করতে দেই নি। স্পষ্ট বলেছি প্রত্যেকটি মামলার তদন্ত হোক, কোথাও এতটুকু ত্রুটি ধরা পড়লে আমি বিচারের মুখোমুখি হব। কারণ আমরা রাজনীতি করি নিজের ভাগ্য গড়তে নয়, জনগণের ভাগ্য গড়তে। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও জীবনযাত্রা উন্নয়নের জন্য রাজনীতি করি।
সংসদ নেতা প্রশ্ন রেখে বলেন, এতিমদের জন্য টাকা এসেছিল ২৭ বছর আগে, কিন্তু সেই এতিম টাকা কোথায়? তখনকার দিনে ২ কোটি টাকার অনেক মূল্য ছিল। ওই সময় ২ কোটি টাকা দিয়ে ধানমন্ডিতে ৭-৮টি ফ্লাট কেনা যেত। সেই টাকার লোভ বিএনপি নেত্রী সামলাতে পারেন নি। এতিমের হাতে একটি টাকাও তুলে দেননি, পুরো টাকাই মেরে খেয়েছেন। অন্যদিকে আমাদের কিছুই নেই। তবুও আমরা দুই বোন আমাদের পৈত্রিক বাড়িটিও জনগণের জন্য দান করে দিয়েছি। অথচ বিএনপি নেত্রী এতিমের ২ কোটি টাকার লোভ সামলাতে পারলেন না। তিনি বলেন, মামলা করেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও দুর্নীতি দমন কমিশন। এখানে আমাদের সরকারের দোষ কোথায়? খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে ১০৯ বার সময় নেওয়া হয়েছে, ১০ বছর ধরে চলেছে এই মামলা। এরপর শাস্তি হয়েছে। শুরুতেই এতিমের টাকা দিয়ে দিলে তো এই মামলা চলত না। কিন্তু লোভ সামলাতে পারেনি বলেই আজ এ অবস্থা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু বিএনপি নেত্রীই নন, তার পুত্র তারেক রহমানের পাচারকৃত অর্থ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ধরা পড়েছে। সিঙ্গাপুরে তার আরেক পুত্রের কোকোর টাকা ধরা পড়ে। বিএনপির নেত্রীর পুত্রদের অর্থ পাচারের তথ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এফবিআই এসে সাক্ষ্য দিয়ে গেছে। আমরা ধরা পড়া সেসব টাকা দেশে ফেরত এনেছি।
বিএনপির গঠনতন্ত্র সংশোধন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়া কারাগারে যাবে এটা বিএনপি নেতারা আগেই বুঝতে পেরেছেন কি না জানি না। কিন্তু রায়ের আগেই রাতারাতি দলটির গঠনতন্ত্র সংশোধন করা হলো। গঠনতন্ত্র সংশোধন করে বিএনপি দুর্নীতিকেই গ্রহণ করল, দুর্নীতিবাজকেই গ্রহণ করল। তিনি বলেন, যে রাজনৈতিক দল দুর্নীতি ও দুর্নীতিবাজকে গ্রহণ করে, সেই দল কীভাবে জনগণের কল্যাণে কাজ করতে পারে? এরা হত্যা-দুর্নীতি-লুণ্ঠন-অর্থপাচার এসবই করতে পারে, জনগণের কল্যাণ করতে পারে না। তিনি বলেন, বিএনপি নেত্রী জেলে যাওয়ার পর যাকে দায়িত্ব দেওয়া হলো সেও দ-প্রাপ্ত পলাতক ফেরারি আসামি। বিএনপির নেতৃত্বে কী একজনও ছিল না যে তাকে দায়িত্ব দিতে পারত?

Category:

কালোত্তীর্ণ ভাষণ : প্রস্তুতি ও প্রভাব

Posted on by 0 comment

আবুল মোমেন:

3-4-2018 7-36-23 PMএক
ইতিহাসের উজান বেয়ে টিকে থাকে জাতির সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের নিদর্শন। শিল্প সাধারণত কালোত্তীর্ণ হলে তবেই টিকে থাকে। বেশিরভাগ সময় তা সংরক্ষণের মাধ্যমেÑ কখনও পুনরুদ্ধার কখনও পুনর্নির্মাণ বা প্রয়োজনীয় সংস্কারের ফলেÑ প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে টিকে থাকে। এ সূত্রে আমরা আমাদের দেশের প্রাচীন ও মধ্যযুগের সভ্যতার কালোত্তীর্ণ নিদর্শন হিসেবে পালযুগের তালপাতার পুথিচিত্র, পোড়ামাটির শিল্প, সোমপুর বিহারের স্থাপত্য, কষ্টিপাথরের মূর্তি, দারুশিল্প, সুলতানি মসজিদ ও স্থাপনার কথা বলতে পারি। এগুলো সাধারণত প্রতœ নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষিত হয়, জাদুঘরে প্রদর্শিত হয়, অ্যালবামে মুদ্রিত হয় বা গবেষণা গ্রন্থে উল্লিখিত হয়। ক্বচিৎ কোনো কোনোটি পাঠ্যবইয়ে স্থান পায় এবং তাতে ব্যাপক পরিচয় লাভের সুযোগ ঘটে, যেমনÑ ময়নামতি শালবন বিহার, পিসার হেলান মন্দির, চীনের মহাপ্রাচীর ইত্যাদি। এসবই পুরনোকালের মানুষের গৌরবময় অর্জনের সাক্ষী, সমকালীন জীবনে সরাসরি প্রাসঙ্গিক নয়। শিল্পের মধ্যে ভাষাবাহিত লিখিত সাহিত্য অনেক সময় কালের উজান বেয়ে সুদীর্ঘকাল ধরে সমঝদারের দ্বারা আদৃত হতে থাকে। এমনকি প্রাচীনকালের কথ্যসাহিত্যের যেসব লিখিত ভাষ্য পরবর্তীকালে তৈরি হয়েছে সেগুলোও এভাবে কদর পেতে থাকে, যেমনÑ ঈশপের গল্প, মহাভারতের কাহিনি, ইলিয়াডের কাব্য, জাতকের গল্প। আমরা জানি ধর্মগ্রন্থগুলোও এভাবে একসময় লিখিত রূপ পেয়ে চিরকালের সম্পদ হয়ে উঠেছে।
কিন্তু কোনো ভাষণ, যা তাৎক্ষণিকভাবে বক্তা মুখে মুখে বলে যান, যা সবচেয়ে অবস্তুগত (intangible) সাংস্কৃতিক সম্পদ, তা শিল্পের মতো কালের উজান বেয়ে টিকে থাকে, তেমনটা দেখা যায় না। অতীতে যখন শব্দ-ধারণ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা ছিল না তখনকার কথা আমরা বাদ দিতে পারি। কারণ সে রকম বক্তৃতার বিবরণী আমরা পেতে পারি; কিন্তু তা বক্তার স্বকণ্ঠে শোনার সুযোগ তো নেই। রোমান ঐতিহাসিক ও লেখক প্রেত্রার্কের লেখা থেকে আমরা জানতে পারি প্রাচীন রোমের সিনেটর সিসেরো ছিলেন অসাধারণ এক বাগ্মী। প্রথম শতাব্দীর এই রোমান দার্শনিক, রাজনৈতিক তাত্ত্বিক সম্পর্কে লিখে গেছেন পরবর্তীকালের গুণী কবি ও লেখক। আর সিসেরোর মতাদর্শের এই পুনরাবিষ্কার ইউরোপীয় রেনেসাঁ ও আলোকনে প্রভাব ফেলেছিল। পোলিশ ঐতিহাসিক তাদেউশ জিয়েলিনস্কি (Tadesz Zielinski) লিখেছেন, “Renaissance was above all things a revival of Cicero, and only after him and through him of the rest of classical antiquity.” সিসেরোর ভাগ্যের বা দুর্ভাগ্যের সাথে বঙ্গবন্ধুর জীবনেরও মিল আছে। জুলিয়াস সিজার যখন একনায়কতন্ত্র চালু করেছেন তখন থেকে সিসোরো প্রজাতন্ত্র তথা গণতান্ত্রিক শাসনের পক্ষে বক্তৃতা দিয়ে যাচ্ছিলেন। সিজারের মৃত্যুর পরে ক্ষমতা দখলকারী মার্ক অ্যান্টনির ভাড়াটে খুনিরা ৪৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গণতন্ত্রের এই মহান প্রবক্তাকে হত্যা করে।
পরবর্তীকালেও অনেকের লেখায় সেকালের বা লেখকের সমকালের অনেকেরই তুখোড় অসাধারণ বাগ্মিতার বিবরণী পাই। এ রকম দুটি ভিন্ন স্বাদের বিবরণী এখানে আমরা শুনে নিতে পারি।
১৯২৬ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে ঢাকায় এসেছিলেন। সে সময় তাকে ঢাকা মিউনিসিপ্যালটির উদ্যোগে করোনেশন পার্কে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সংবর্ধনার উত্তরে রবীন্দ্রনাথ উপস্থিত মতো যে ভাষণ দেন তার বর্ণনা আছে সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ আবুল ফজলের (১৯০৩-১৯৮৩) আত্মজীবনী ‘রেখাচিত্রে’। প্রাসঙ্গিক অংশ আমরা শুনতে পারিÑ “কবির জন্যে মঞ্চ তৈরি হয়েছিল পার্কের পূর্ব ধারেÑ কাজেই কবি যখন বক্তৃতা দিতে দাঁড়ালেন তখন তিনি সূর্যের মুখোমুখি। যখন ঋজু হয়ে দাঁড়িয়ে, যে সূর্যের তখনকার কিরণের সঙ্গে তাঁর গায়ের রঙ একাকার হয়ে মিশে গেছে, সে সূর্যের দিকে চেয়ে, তার অস্তগমনের সঙ্গে নিজের অন্তগমনোন্মুখ জীবনের তুলনা দিয়ে এক অতুলনীয় ভাষায় বক্তৃতা শুরু করলেন তখন বিপুল জনতা কবি-মুখনিঃসৃত ভাষার সৌন্দর্যে ও কণ্ঠের মাধুর্যে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। কোনো কথা কি ভাবের জন্যে তাঁকে ভাবতে দেখিনি। ঝরণার ধারার মতো তাঁর কণ্ঠ থেকে বাণীর স্রোত বয়ে চলেছে।” (পৃ. ১৪২)
আর বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের এক অপূর্ব স্মৃতিচারণ করেছেন নির্মলেন্দু গুণ তার এক অবিস্মরণীয় কবিতায়Ñ

শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে,
রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে
অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।
তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল,
হৃদয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার
সকল দুয়ার খোলা। কে রোধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী?
গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তাঁর অমর-কবিতাখানিÑ
‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম,
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’
সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।
[স্বাধীনতা, এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হল]

দুই
ইংরেজিতে যাকে বলে ড়ৎধঃড়ৎু তারই বাংলা বাগ্মিতা। oratory-র আভিধানিক অর্থ, অক্সফোর্ড অভিধানের মতে, Public speaking, especially when used skilfully to affect an audience. জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস তাঁর ‘বঙ্গভাষার অভিধানে’ বাগ্মী শব্দের অর্থ দিয়েছেন ‘যে পরিমিত সার বাক্য বলিবার কৌশল জানে।’ তাহলে তিনি জনগণ বা শ্রোতার উদ্দেশ্যে যা বলেন সেটাই বাগ্মিতা। সেদিক থেকে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ রাজনৈতিক বিষয়ে বাগ্মিতার শ্রেষ্ঠ এক নিদর্শন।
সাধারণত বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের আলোচনায় যেসব ভাষণের প্রসঙ্গ অনেকেই নিয়ে আসেন সেগুলো লিখিত পূর্বপ্রস্তুতকৃত ভাষণ, ঠিক বাগ্মিতার নিদর্শন নয়। আমরা এই সূত্রে আব্রাহাম লিংকনের গেটিসবার্গ ভাষণ (নভেম্বর ১৮৬৩), স্বামী বিবেকানন্দের শিকাগো ভাষণ (সেপ্টেম্বর ১৮৯৩) কিংবা মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের আই হ্যাভ এ ড্রিম (আগস্ট ১৯৬৩ ভাষণ)-এর কথা বলতে পারি। লিংকন যুক্তরাষ্ট্রের দাসপ্রথা উচ্ছেদের পটভূমিতে চলমান গৃহযুদ্ধের অবসান চেয়ে দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে এ ভাষণটি দিয়েছিলেন। সেদিন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব ছিল বৈরী শ্বেতাঙ্গ জনমতকে সরকারের এ সিদ্ধান্তটির অনুকূলে আনা। মার্কিন রাষ্ট্রপতির ভাষণটি ঐতিহ্যানুযায়ী লিখিতই ছিল এবং বক্তৃতার খসড়া নিয়ে লিংকন বরাবর খুঁতখুঁতে ছিলেন বলে এর ৫টি খসড়া পাওয়া যায়। তাছাড়া এ ভাষণের সার্ধশত বছর পরে আজ নিশ্চয় প্রশ্ন তোলা যায়Ñ দাসপ্রথা আইনগতভাবে রহিত হলো বটে কিন্তু তার সে লক্ষ্য কি আজও পূরণ হয়েছে? ১৯৬৩ সালে কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক অধিকার আন্দোলনের নেতা কিং জুনিয়র তার ভাষণে যখন কালো মানুষের মুক্তি ও সমানাধিকারের স্বপ্নের কথা বলেন তখন তো স্পষ্ট হয়ে যায় লিংকনের বাণী শতবর্ষ পরেও উপেক্ষিত থেকে গেছে, নয়তো সে দেশের কৃষ্ণাঙ্গরা নাগরিক অধিকার আন্দোলন কেনই বা করবে আর তার একজন নেতা কেন শতবর্ষ পরেও মুক্তি ও সমানাধিকারের স্বপ্ন দেখবেন? এদিকে রিপাবলিকান রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণার মাধ্যমে বুঝিয়ে দিচ্ছেন আরও অর্ধশত বর্ষ পরেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। গেটিসবার্গ ভাষণ অমর হয়ে আছে তাতে উচ্চারিত গণতন্ত্রের শাশ্বত সংজ্ঞাটির জন্য। জনগণের মুক্তির আকাক্সক্ষা তাতে ব্যক্ত হয়, যেমনটা হয়েছে কিং জুনিয়রের ভাষণে; কিন্তু তা বাস্তবায়নের পথনির্দেশ কোথাও ছিল না। স্বামী বিবেকানন্দের ভাষণ মূলত মানুষের আধ্যাত্মিক মুক্তির বিষয়ে। আজকের ভোগবাদী বিশ্বে মানুষের মনোজাগতিক সংকট যখন তীব্রতর হচ্ছে তখন এ ভাষণে ব্যক্ত আহ্বানের প্রাসঙ্গিকতা, বিশেষত এতে ক্ষুদ্র ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে উদার মানবতার যে বাণী ধ্বনিত হয়েছে তার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। তবে এর আবেদন মানুষের আধ্যাত্মিক চেতনার কাছে, যা প্রত্যেক মানুষকে ব্যক্তি হিসেবেই অর্জন করতে হয়Ñ কিন্তু জাগতিক ক্ষেত্রে সামষ্টিক মুক্তির যে সংগ্রাম তা ব্যাহত হলে সেটি অর্জন করা অধিকাংশের জীবনেই অপূর্ণ থেকে যাবে।
বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ সেদিন কী ভূমিকা পালন করেছিল?
এ প্রশ্নের উত্তরটি দেওয়ার আগে এই ভাষণের যিনি নির্মাতা অর্থাৎ নায়ক তাকে জানতে হবে। নয়তো এটিকে কোনো বাগ্মীর আকস্মিক পারঙ্গমতার দৈব সার্থকতা ভাবার ত্রুটি ঘটতে পারে। বঙ্গবন্ধু এবং ৭ই মার্চের ভাষণ ইতিহাসের এ দুই অভিন্ন পাত্রকে ইতিহাসেরই প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে। তবেই এ ভাষণের তাৎপর্য যথাযথভাবে বোঝা যাবে।

তিন
এই বাংলার গ্রামের সাধারণ গৃহস্থ পরিবারের ডানপিটে কিন্তু আদরের ছেলে খোকা ছোটবেলা থেকেই কয়েকটি বিশেষ গুণের পরিচয় দিয়েছিল। বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয়ের সুবোধ বালক গোপাল-টাইপ নয়, ছেলেটি ছিল দুষ্টু বালক রাখালের মতো, যার প্রতি পক্ষপাত গোপন করেন নি খোদ রবীন্দ্রনাথ।
গোপালদের জীবন যখন নিজের লেখাপড়া এবং পরিবারের গ-িতে বাবা-মায়ের নির্দেশিত বাঁধা পথে মসৃণ গতিতে চলে তখন রাখালদের চোখ যায় নিজের ক্ষুদ্র গ-ির বাইরে এদিক-সেদিক, মন নিছক পড়াশোনার কর্তব্য পালন করে আত্মোন্নয়নে আনন্দ পায় না, ছুটে যায় বাইরের দিকে। খোকা কল্পনার কবি হতে চায়নি, তার চোখে পড়েছে সাধারণ ছেলেদের দুঃখকষ্ট, মন গিয়েছে প্রতিবেশী ও সহপাঠী সমবয়সীদের বঞ্চনা-সমস্যার দিকে। না, রাখালদের পক্ষে আত্মমগ্ন থেকে স্বার্থবুদ্ধিতে চলা সম্ভব নয়। জ্বরের মধ্যেও এ তরুণ রাখাল রিলিফের কাজ করেছে। তার মুখেই শুনি, “জ্বর একটু ভাল হল। কলকাতা যাব, পরীক্ষাও নিকটবর্তী। লেখাপড়া তো মোটেই করি না, দিনরাত রিলিফের কাজ করে কুল পাই না। আব্বা এসময় আমাকে একটা কথা বলেছিলেন, ‘বাবা রাজনীতি কর আপত্তি করব না, পাকিস্তানের জন্য সংগ্রাম করছ এ তো সুখের কথা, তবে লেখাপড়া করতে ভুলিও না। লেখাপড়া না শিখলে মানুষ হতে পারবে না। আর একটা কথা মনে রেখ, Sincerity of purpose and honesty of purpose থাকলে জীবনে পরাজিত হবা না।’ এ কথা কোনোদিন আমি ভুলি নাই।” [অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ২১]
আমরা লক্ষ্য করি টুঙ্গিপাড়ার বালক খোকা পরিবারের চেয়ে প্রতিবেশীর কথা, নিজের চেয়ে সহপাঠীদের প্রয়োজন নিয়ে ভাবে বেশি। কী দ্রুত বালকের ক্ষেত্র প্রসারিত হতে থাকে। পরিবারের সন্তান খোকা পাড়ার ও সমাজের মুজিব হয়ে ওঠে। স্কুলের ছাত্র হয়েও ইতিহাসের সেই উত্তাল সন্ধিক্ষণে নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ ছেড়ে দ্বন্দ্বমুখর রাজনীতির জগতে পা রাখতে ভয় পায় নি। কেবল ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ পড়লেই আমরা দেখতে পাব কীভাবে বাংলার সাধারণ পরিবারের এক সন্তান গ্রামীণ মধ্যবিত্ত গৃহস্থের মাপা জীবনের ছকে বাঁধা আকাক্সক্ষার ছোট ছোট গ-িগুলো অতিক্রম করে উত্তরোত্তর বড় জীবনের দিকে এগিয়ে চলেছে। বর্তমান কালের সন্ত্রাস ও চরমপন্থার সংকট নিয়ে আলোচনায় নোবেলজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন দেখিয়েছেন একজন মানুষের যুগপৎ অনেক পরিচয় থাকে এবং সেইসব পরিচয় বিকশিত হলে মানুষটির পক্ষে উদার মানবিক হওয়া সহজ। সেভাবে আমরা বালক মুজিবের তৎকালীন পরিচয়গুলোর সংক্ষিপ্ত তালিকা করতে পারি।
গ্রামের ছেলে, গৃহস্থ সচ্ছল কৃষক পরিবারের ছেলে, মুসলিম ছেলে, স্কুলছাত্র, খেলাধুলায় পারদর্শী এবং তার নিজের ভাষায় একটু মাথা গরমÑ ‘আমার নিজেরও একটা দোষ ছিল, আমি হঠাৎ রাগ করে ফেলতাম।’ (পৃ. ৮০) যদি সেকালে যেসব গুণের প্রকাশ ঘটেছিল তার তালিকা করি তাহলেও নানামুখী বৈশিষ্ট্য ধরা পড়বেÑ উদ্যমী, উৎসাহী, সেবাপরায়ণ, বন্ধুবৎসল, অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ইত্যাদি। এর সাথে যে কটি মানবিক গুণ যোগ না করলে পরবর্তীকালের উত্তরণ বোঝা যাবে না তাহলোÑ বালকের সাহসিকতা, মনোবল, দায়িত্ববোধ, পরোপচীকির্ষ, দেশপ্রেম, মানবপ্রেম। প্রথম তালিকার গুণাবলি তাকে উন্নত মানুষ হতে সাহায্য করেছে আর পরবর্তী তালিকার গুণাবলি তাকে বৃহত্তর পরিম-লে দায়িত্ব পালন ও নেতৃত্ব দানের যোগ্য করে তুলেছে। অন্তর থেকে এমন প্রণোদনা না থাকলে পিতা-মাতা, স্ত্রী, পুত্র-কন্যাকে উপেক্ষা করে দিনের পর দিন থানা, হাজত, জেল আর মামলা-হুলিয়া মাথায় নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কঠিন জীবনযাপন সম্ভব হতো না। স্ত্রী বলেছেন, ‘ভুলে যেও না, তুমি হার্টের অসুখে ভুগছিলে এবং চক্ষু অপারেশন হয়েছিল।’ আবার তিনি লিখছেন, কন্যা ‘হাচু আমাকে মোটেই ছাড়তে চায় না। আজকাল বিদায় নেওয়ার সময় কাঁদতে শুরু করে। কামালও আমার কাছে এখন আসে।’ (পৃ. ১৮৫) সেই স্নেহমায়াবন্ধন কাটানো বড় সহজ কাজ নয়। অন্যত্র তিনি লিখেছেন, ‘ছেলেমেয়েদের জন্যে যেন একটু বেশি মায়া হয়ে উঠেছিল। ওদের ছেড়ে যেতে মন চায় না, তবুও তো যেতে হবে। দেশ সেবায় নেমেছি, দয়া মায়া করে লাভ কি? দেশকে ও দেশের মানুষকে ভালবাসলে ত্যাগ তো করতেই হবে এবং সে ত্যাগ চরম ত্যাগও হতে পারে।’ (পৃ. ১৬৪)

চার
এবার তার সময়ের ইতিহাসের যাত্রাপথে রেখে যদি এই মানুষটির জীবন পাঠ করি তাহলে আমরা দেখব বালক তার সুপ্ত সম্ভাবনাগুলোর যথার্থ বিকাশ ঘটাতে সফল হয়েছেন। নিশ্চয় কখনও দ্বিধাদ্বন্দ্ব এসেছে, পিছুটান তাড়িয়ে ফিরেছে, কখনও হতাশায় ভুগেছেন, কখনও বা আক্ষেপ হয়েছে কিন্তু এসবের কাছে তিনি হারেন নি, হাল ছাড়েন নি, এসবকে বাস্তবের স্বাভাবিক কিন্তু সাময়িক অনুষঙ্গের বেশি মূল্য দেন নি। এর পেছনে আরও দুটি বড় গুণ কাজ করেছে, যা বৃহত্তর জীবনে বড় কাজে জড়িয়ে বাধাবিপত্তি সামলাতে গিয়ে তার আয়ত্ত হয়েছে। এই দুই গুণ হলো আত্মবিশ্বাস এবং সময়োচিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা। তারই লেখা থেকে কয়েকটি সাক্ষ্য হাজির করি। ৯২(ক) ধারা জারি করে যুক্তফ্রন্টের মন্ত্রিসভা ভেঙে দেওয়ার পরে নেতাদের মধ্যে যে নীতিহীনতা ও দোলাচল দেখেছেন তাতে ক্ষুব্ধ শেখ মুজিবের উপলব্ধিÑ ‘এই দিন থেকেই বাঙালিদের দুঃখের দিন শুরু হল। অযোগ্য নেতৃত্ব, নীতিহীন নেতা এবং কাপুরুষ রাজনীতিবিদদের সাথে কোনোদিন একসাথে হয়ে দেশের কোনো কাজে নামতে নেই। তাতে দেশসেবার চেয়ে দেশের ও জনগণের সর্বনাশই বেশি হয়।’ (পৃ. ২৭৩) হকসাহেবকে নেতা মেনেও তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত শেখসাহেবকেই নিতে হয়েছিল। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ শেষ হয়েছে এ ঘটনাটি উল্লেখ করে। এভাবেই একের পর এক সময়োচিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে পাকিস্তান আন্দোলনের একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী মুসলিম লীগ ছাড়লেন, আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করলেন, যথার্থ গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে উত্তরণের জন্যে দলের নাম থেকে ধর্মীয় সম্প্রদায়ের পরিচয় মুছে দিলেন, তার নেতা শহীদ সাহেবের ভ্রান্তি ধরিয়ে দিলেন, দূরে সরলেন তার কাছ থেকে, একসময় কম্যুনিস্ট না হয়েও সমাজতন্ত্রের রাজনীতি সমর্থন করলেন। তিনি লিখেছেন, ‘আমি নিজে কম্যুনিস্ট নই। তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না। একে আমি শোষণের যন্ত্র হিসেবে মনে করি।’ (পৃ. ২৩৪)
বাঙালি পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান, বিশেষত যদি কন্যা হয় তবে পিতার কেবল মুগ্ধ অনুসারী হয় না, এক সময় সতর্ক অভিভাবকও হয়ে ওঠে। আর এক্ষেত্রে সেই কন্যাকে একসময় একদিকে দেশবাসী আর দশজনের মতো পিতাকে ইতিহাসের মহানায়ক হিসেবে অভিভূত হয়ে দেখার সাক্ষী হতে হয় আর অন্যদিকে ইতিহাসের ফেরে নির্মম বিয়োগান্তক ঘটনার শিকার হয়ে সেই পিতার আরব্ধ কাজ শেষ করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়। এমন মানুষটির পর্যবেক্ষণ এই ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে বোঝার জন্যে কাজে আসবে।
বঙ্গবন্ধুর ঘটনাবহুল রাজনৈতিক জীবনে জনসভা, গোপন বৈঠক, জেলা সফর, বারবার জেলে যাওয়া যেন স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। কিন্তু শত ব্যস্ততার মধ্যেও দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ানোয় কখনও দ্বিধা বা দেরি করেন নি বঙ্গবন্ধু। ১৯৭০-এর ঘূর্ণিঝড়ের প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা লেখেন, ‘১৯৭০-এর সেই দিনগুলো ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির এক ক্রান্তিকাল। তা সত্ত্বেও সকল রাজনৈতিক কর্মসূচিকে ফেলে দিয়ে ছুটে চলে গিয়েছিলেন তিনি।’ [শেখ মুজিব আমার পিতা, পৃ. ১০৬] বিজয় বা ক্ষমতা নিয়ে তিনি ভাবেন নি, সময় নষ্ট করেন নি, ছুটে গেছেন দুর্গত অঞ্চলে বিপন্ন মানুষের কাছে।

পাঁচ
তরুণ শেখ মুজিব তার সমকালের ইতিহাসের সহযাত্রী হয়েই পাকিস্তান আন্দোলনের কর্মী হয়েছিলেন। তার ইতিহাস চেতনায় বরাবর ব্যক্তিকে ছাপিয়ে জনগণই মুখ্য ভূমিকায় ছিল। এটি তার নিজের একক যাত্রাপথ নয়, তিনি একটি জাতির সহযাত্রী হয়েছিলেন, একসময় অগ্রণী যাত্রী হিসেবে সেই জাতির মধ্যে মুক্তি ও একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন বুনেছিলেন।
পাকিস্তানের স্রষ্টা জিন্নাহর পূর্ব বাংলায় প্রথম সফর এবং প্রথম ভাষণ আরও অনেকের মতো তারও স্বপ্নভঙ্গের কারণ হয়েছিল, তার বিশ্বাসের ভিত টলিয়ে দিয়েছিল। আরও অনেকের সাথে সদ্য স্বাধীন সাধের পাকিস্তানে তার ঠাঁই হলো কারাগারে। কারাগার তাকে থামাতেও পারে নি, দমাতেও নয়, বরং এ সময় পড়ালেখা ও আলোচনার মাধ্যমে তার ভাবনার জগৎ সমৃদ্ধ হতে থাকল, রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনায় স্বজনদের কল্যাণে বিকল্প পথের বিষয়ে অনুসন্ধানী হয়ে উঠল।
পরবর্তী সব বড় রাজনৈতিক বাঁকবদলে শেখ মুজিব সক্রিয় ভূমিকা নিলেনÑ যুক্তফ্রন্ট গঠন, চুয়ান্নর নির্বাচনী প্রচারণা-বিজয় ও সরকার গঠন, আওয়ামী লীগের পুনর্গঠন ও অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তার রাজনীতি প্রচলন ইত্যাদিতে দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ক্রমেই শেখ মুজিবই মূল সক্রিয় সংগঠক হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠছেন। ১৯৬৪ সালে আইয়ুব যখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দিলেন এবং তাতে সম্মিলিত বিরোধী দল ফাতেমা জিন্নাহকে প্রার্থী করে মাঠে নেমে এই বাংলায় আলোড়ন তুলেছে, তখনও তরুণ নেতা মুজিব সবাইকে ছাপিয়ে জনগণের এমন নেতা হয়ে উঠেছেন যার ওপর মানুষ ভরসা করতে চাইছে অর্থাৎ তার কাছেই মানুষের প্রত্যাশা বাড়ছিল। দ্বিতীয় বিষয়টি এর সাথেই সম্পর্কিত, পাকিস্তান সরকার অন্য বাঙালি নেতাদের চেয়ে তার স্বাতন্ত্র্য সহজেই বুঝতে পারছিল। যখন তিনি ৬-দফা নিয়ে মাঠে নামলেন তখন জনগণ এ দাবি লুফে নিল, তার পিছনে শামিল হলো এবং তার নেতৃত্বে আস্থা রাখল। এই শুরু হলো শেখ মুজিবের প্রকাশ্যে বাংলাদেশ অভিযাত্রা। সেই পঞ্চাশের দশক থেকে এই বাংলার জনপদে-জনপদে কত জনসভা তিনি করেছেন, কত ভাষণ দিয়েছেন। পাকিস্তান সরকারের কারাগার, ষড়যন্ত্র, মামলা-মোকদ্দমা কিছুই তার পথের বাধা হতে পারে নি, কারণ দিনে দিনে জনচিত্তে তার আসন কেবল পোক্ত হয়েছে, বিস্তৃতি লাভ করেছে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা নেতা-জনতার এই ঐক্যে ফাটল ধরাতে পারে নি, কারণ নেতার ওপর জনতার বিশ্বাসের ভিত্তি ততদিনে অনেক দৃঢ় হয়ে গিয়েছে। ছাত্র-জনতা শুধু দুঃশাসক পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে প্রত্যাঘাত হানার জন্যে উপযুক্ত সময় ও সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। ছাত্ররা ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সেই সুযোগটি তৈরি করেছে এবং তা কাজেও লাগিয়েছে।
মুক্ত মুজিবকে আর কেবল ক্ষমতার রাজনীতির গ-িতে বিচার করা যাবে না, কারণ ৬-দফা, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, গণ-অভ্যুত্থান এবং সাংস্কৃতিক স্বাধিকারের আন্দোলন মিলে ততদিনে রাজনীতি ছাপিয়ে স্বাধিকার ও স্বাধীনতার স্বপ্ন-আকাক্সক্ষা রূপ নিয়েছে গণমানুষের দাবিতে। তাদের সবার নেতা তো শেখ মুজিব। তাই এখন তিনি কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নন, এক জাগ্রত স্বাধীনতাকামী জাতির, সমগ্র জাতির নেতা, বঙ্গবন্ধু; ইতিহাসের পাত্র নন, নির্মাতা, দেশের একজন নেতামাত্র নন, বাঙালি রাষ্ট্রের রূপকার।
আজ পেছনে ফিরে তাকালে বুঝি তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জনÑ ক্ষুদ্র স্বার্থে-কোন্দলে অভ্যস্ত বিভক্ত জাতির আস্থা অর্জন। আর অবদান? সবচেয়ে বড় অবদান সম্ভবত চিরকালের পদানত বাঙালিকে তিনি ঐক্যবদ্ধ করেছেন। স্বপ্ন দেখিয়েছেন মর্যাদাপূর্ণ স্বাধীন জীবনের এবং ত্যাগের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করে ঘরকুনো অলস বাগাড়ম্বরপ্রিয় জনগোষ্ঠীকে রূপান্তরিত করেছিলেন বীরের জাতিতে। সেই ঐক্য ত্যাগ ও বীরত্বের প্রথম প্রতিফলন ঘটল সত্তরের সাধারণ নির্বাচনেÑ তখন আওয়ামী লীগ কেবল একটি রাজনৈতিক দল নয়, ঐক্যবদ্ধ বাঙালির স্বপ্ন বাস্তবায়নের সোনারতরী। আর এর ফসল ফলল একাত্তরেÑ মুক্তিযুদ্ধের সাফল্যে ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে।

ছয়
১৯৭১-এ যখন নির্বাচনোত্তর ষড়যন্ত্রের মোকাবিলা করছে দেশ তখন এই রূপান্তরিত জাতি তার সকল স্বপ্ন পূরণের প্রতীক নেতার কাছে কী প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে ছিল, তাদের ভেতরে উত্তেজনার পারদ কোন পর্যায়ে তা আমরা বুঝতে পারি।
৭ মার্চের পটভূমি আমাদের কাছে পরিষ্কার। এই অসামান্য ভাষণটি নিয়ে আমার ২০১১ সালের নগণ্য ভাষণে এটিকে কালোত্তীর্ণ শিল্পকর্ম বলেছিলাম। শিল্পকর্ম কারণ এতে একটি জাতির সংগ্রাম ও স্বপ্নকে এমনভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে, তার বহুমাত্রিক ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের অবকাশ রয়েছে। ফলে একটি শিল্পকর্মের মতোই এটি হয়ে উঠেছে অমর, অনিঃশেষ, এর স্বাদ বারবার নেওয়া যায়, নতুনতর বাস্তবতায় এর নতুন নতুন ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণেরও সুযোগ তৈরি হয়। আজ তাই এ ভাষণটি কেবল শিল্পকর্ম নয়, কালোত্তীর্ণ শিল্পকর্ম। আমার আজকের বক্তব্যে প্রথম পর্বে অন্য যেসব ভাষণের কথা বলেছি সেগুলো বেশিরভাগ ইতিহাসের অংশ, গবেষকের প্রয়োজন মেটায় এবং প্রায় সবই পূর্ব-প্রস্তুতকৃত লিখিত ভাষণ। কিন্তু দলমত-ধর্মবর্ণনির্বিশেষে অনুপ্রেরণার জন্যে যেমন আমরা শহীদ মিনার বা স্মৃতিসৌধে যাই, বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি যেন জাতির জীবনে তেমনই সার্বজনীন একটি প্রতীক। এই ভাষণের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য চুম্বকে তুলে ধরতে চাইÑ
ক. শুরুতে ‘ভাইয়েরা আমার’ সম্বোধনেই বঙ্গবন্ধু বুঝিয়ে দিয়েছেন যে তিনি তাদেরই একজন অর্থাৎ তিনি মানুষের মানুষ।
খ. তারপরে ব্যক্ত করলেন মানুষের প্রতি তার অঙ্গীকার।
গ. তাই জনগণকে সঙ্গে নিয়েই তিনি প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হলেন।
ঘ. তিনি জানেন জনগণের আকাক্সক্ষা আর পাকিস্তান সরকারের শোষণ-বঞ্চনার ইতিহাস।
ঙ. বিশেষভাবে ইয়াহিয়া খানের প্রচারণা ও ষড়যন্ত্র তার কাছে পরিষ্কার, সে কথা জনগণকেও জানিয়ে রাখলেন।
চ. একজন গণতান্ত্রিক রাজনীতিবিদ হিসেবে, তদুপরি মানবতাবাদী নেতা হিসেবে তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়েও ন্যায্য কথা হলে তা মানার ঔদার্য দেখালেন।
ছ. ভুট্টোর খল-চরিত্র বুঝতেও বাকি থাকে নি, তা ফাঁস করে দিলেন তার অনুসারীদের কাছে।
জ. পরিস্থিতির জন্যে ইয়াহিয়া-ভুট্টো যে বাংলার মানুষকে, এমনকি সরাসরি তাকে, দোষারোপ করছে সে বিচারের ভার জনগণের হাতে দিলেন।
ঝ. এই বঞ্চনা প্রতারণা, এই উপেক্ষা দোষারোপের ষড়যন্ত্র তিনি জনগণের কাছে আরেকটু বিস্তারিতভাবে তুলে ধরলেন।
ঞ. তারপর? এবার তিনি জননায়কের ভূমিকায় সরাসরি পাক সরকারের দরবারে জনগণের হয়ে স্পষ্ট ভাষায় দাবি পেশ করলেন।
ট. সঙ্গে সঙ্গে প্রবঞ্চক পাক সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তার দেশবাসীকে এ পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা দিলেন। বঙ্গবন্ধু এবার বাঙালির মুক্তির মহানায়ক।
ঠ. ডাক দিলেন মুক্তিযুদ্ধেরÑ প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলতে বললেন এবং প্রতিপক্ষকে শত্রু আখ্যায়িত করলেন।
ড. স্পষ্ট জানিয়ে দিলেনÑ সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। কেননা, ‘আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবাতে পারবা না।’
ঢ. আর পিছু হটার সুযোগ নেই, নিজের হাতেই তুলে নিলেন শাসনভারÑ সকল সরকারি কর্মচারী, ব্যাংক কর্মী সবাইকে নির্দেশ দিলেন করণীয় সম্পর্কে।
ণ. শাসক হিসেবে সুবিচার ও ন্যায়বোধকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরলেনÑ ‘এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-নন বাঙালি যারা আছে তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের ওপর, আমাদের যেন বদনাম না হয়।’
ত. তারপর তো যুদ্ধযাত্রায় এগিয়ে যাবে জাতি, তাই মহান আল্লাহর ওপর নির্ভরতা ব্যক্ত করে অনুসারী জাতিকে মুক্তির পথে এগিয়ে দিলেনÑ ‘মনে রাখবা : রক্ত যখন দিতে শিখেছি, রক্ত আরও দেবÑ এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাহল্লাহ।’
থ. শেষ কথা মুক্তি, স্বাধীনতাÑ ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রামÑ এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
সাত
আজও কেন আমরা এ ভাষণটি শুনি? এ ভাষণ শুনলে আজও কেন অনুপ্রাণিত বোধ করি? এবং, কেন মনে হয়, যিনি বাঙালিÑ তার দেশ ধর্ম যাই হোকÑ এ ভাষণ একবার অন্তত না শুনলে তার চেতনায় ঘাটতি থেকে যাবে?
বাংলার লোকগান না শুনলে বা তাতে রস না পেলে যেমন ঠিক বাঙালি হওয়া যায় না তেমনি এ ভাষণ না শুনলে, এটি শুনে অনুপ্রাণিত বোধ না করলে, সেও বোধহয় খাঁটি বাঙালি হয় না। জঙ্গি হয়, মৌলবাদী হয় কিংবা দিশেহারা মানুষ হয়ে যায়। এটি কেবল বাঙালির নয়, এদেশে বসবাসরত সকল মানুষের, রাজনৈতিক দিগদর্শনের আলেখ্য।
শহীদ মিনার যেমন আমাদের চেতনার প্রতীক, সারাদেশে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এটি ছড়িয়ে পড়েছে, তেমনি বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ বাঙালিমাত্রের অন্তরে ঠাঁই করে নিয়েছে। এ ভাষণের সূত্রে এর পেছনের মানুষটি, যিনি এর শিল্পী, তার জীবনের আলেখ্যও সকলকে আবেগের অনুপ্রেরণায় উদ্দীপ্ত করে। বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঙালি-জীবনের প্রতীক, আর তাই তার চেতনায় আবেগ ও উদ্দীপনার নতুন সঞ্জীবনী সঞ্চার করে। হয়তো তাই এ দেশের ইতিহাসের বড় বড় সংগ্রামী কিংবদন্তির নেতা, যেমনÑ তিতুমীর, নেতাজী, মাস্টারদা’কে ছাপিয়ে বঙ্গবন্ধুই হয়ে যান সৃজনশীল মানুষের চেতনার অফুরন্ত খোরাক। সমকালের বয়োজ্যেষ্ঠ নেতা, যাদের তিনি একসময় গুরু মেনেছেন, শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী, ভাসানীকেও ছাপিয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধুÑ তাদের স্মৃতি ঝাপসা করে দিয়ে, ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ করে তিনি হয়ে ওঠেন এ দেশের সাধারণ মানুষের প্রাণের নেতা, এখনও প্রাসঙ্গিক, এখনও প্রেরণার জীবন্ত উৎস।
তাই বঙ্গবন্ধুকে নিয়েই যুগ যুগ ধরে রচিত হচ্ছে অমর জনপ্রিয় সব গান, কবিতা, ছড়া। মানুষ তাদের নেতাকে স্মরণ করতে চায়, চায় স্মরণীয় করে রাখতে। আমরা এমন কিছু নমুনা শুনে রাখব।
প্রথমে পশ্চিম বাংলার প্রবীণ মনীষী প্রয়াত অন্নদাশংকর রায়ের বহুশ্রুত মন্ত্রোপম অনবদ্য কবিতাটি, যেটি তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১-এ লিখেছেন যখন বঙ্গবন্ধু শত্রুর দেশে কারাবন্দি, যে কোনো সময় মৃত্যুর প্রতীক্ষায়Ñ

যতদিন রবে পদ্মা মেঘনা
গৌরী যমুনা বহমান
ততোদিন রবে কীর্তি তোমার
শেখ মুজিবর রহমান।
দিকে দিকে আজ অশ্রুগঙ্গা
রক্তগঙ্গা বহমান
নাই নাই ভয় হবে হবে জয়
জয় মুজিবর রহমান।

যখন দেশ দখল করে নিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী খলশক্তি তখন আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী লিখেছেনÑ

বঙ্গবন্ধু! তোমার বন্ধু আজ বাংলার জনগণ
টুঙ্গিপাড়ার কবরে শুয়ে কি শোনো না তাদের ক্রন্দন?
আর একবার তুমি ডাক দাও।
এই দেশ হতে কুকুর তাড়াও।
তুমি ডাক দিলে আবার দাঁড়াবে শির খাড়া করে জনতা।
জয় বাংলার বজ্রধ্বনিতে প্রাণ পাবে মরা স্বাধীনতা।
[অংশ]

তাকে নিয়ে গান বেঁধেছেন কবি ও গীতিকাররাÑ অজস্র গান। গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার লিখেছেনÑ

শোনো একটি মুজিবরের থেকে
লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি, প্রতিধ্বনি
আকাশে বাতাসে ওঠে রণি
বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ।

মহিয়সী সুফিয়া কামাল কবিতায় বলেছেনÑ

এই বাংলার আকাশ বাতাস, সাগর, গিরি ও নদী
ডাকিছে তোমারে বঙ্গবন্ধু, ফিরিয়া আসিতে যদি
হেরিতে এখন মানবহৃদয়ে তোমার আসন পাতা
এখনও মানুষ স্মরিছে তোমারে, মাতা, পিতা, বোন-ভ্রাতা।

শুধু প্রতিষ্ঠিত কবি-সাহিত্যিকরা নন, গ্রাম-বাংলার বাউল-ফকির মেঠোপথের কবিগানের শিল্পী, নিরক্ষর কৃষক সকলের মুখেই ফিরেছে তাদের অন্তরের আকুলতাÑ বঙ্গবন্ধু, নেতা মুজিব, প্রাণপ্রিয় মানুষটির জন্যে। বঙ্গবন্ধু যে সকল স্তরের মানুষের অন্তরে জায়গা পেয়েছেন, তিনি যে মানুষের সৃজনশীল সত্তাকে নাড়া দিয়ে চলেছেন তাতে বোঝা যায় তার সাথে এ জাতির তৈরি হয়েছে এক মহৎ অকৃত্রিম হার্দিক বন্ধন। বঙ্গবন্ধু নিজেই এভাবে হয়ে ওঠেন বাঙালির এক অমূল্য সাংস্কৃতিক সম্পদ, ঐতিহ্যের অংশ। তাই তিনি বাস্তবের মহানায়ক যেমন তেমনি এক কিংবদন্তি ব্যক্তিত্বও বটে।

আট
রাজনীতি থেকে ইতিহাসে এবং ইতিহাস থেকে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হয়ে উঠে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন চিরকালের, যে কোনো সংকীর্ণ বিবেচনার ঊর্ধ্বে, স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। ৭ই মাচের্র ভাষণ সেই অমর ব্যক্তির কালোত্তীর্ণ শিল্পকর্মÑ এটির স্রষ্টা তিনি, আর এর সমঝদার সেদিন থেকেই সকল বাঙালি, অনাগত দিনের নবপ্রজন্মও। আমরা লক্ষ্য করি নতুন প্রজন্মের জন্যে এ ভাষণ প্রথম শোনা সত্যিই কেবল নতুন নয় বিশেষ এক অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে। তাকে ঝাঁকুনি দেয়, তার চেতনার তন্ত্রীতে ঘা দিয়ে দেশের ডাক তার অন্তরে পৌঁছে দেয়।
কী সে ডাক?
মানুষের মুক্তির ডাক, সকল অন্যায় ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে জনমানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ডাক।
সাহসের সাথে অন্যায় পাশব শক্তির বিরুদ্ধের প্রতিবাদ ও প্রতিশোধের ডাক।
অন্যায় দুঃশাসনের কাছে মাথা নত না করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের ন্যায্য দাবি তুলে ধরার ডাক, ঠা-া মাথায় পরিকল্পিত কর্মসূচির মাধ্যমে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার ডাক।
ভয়ভীতি উপেক্ষা করে সর্বোচ্চ ত্যাগের মনোবল নিয়ে বীরের মতো লড়বার ডাক, অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের ডাক, মুক্তি ও স্বাধীনতার সংগ্রামের ডাক।
বঙ্গবন্ধুর এসব স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে কত বাধা কত ষড়যন্ত্র এবং কত হীন অপরাধ এ দেশে ঘটে গেছে আমরা জানি। রাজনীতিকে নানাভাবে কলুষিত করে ক্ষুদ্র স্বার্থের গ-িতে খাটানো হলো। মানুষকে উচ্চ আদর্শের নৈতিকতা থেকে বিচ্যুত করা হলো। বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে বিচ্যুত করে তার স্বপ্নের পথ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো। রাষ্ট্রীয় সকল প্রতিষ্ঠান ও প্রভাব খাঁটিয়ে এই কাজ করা হলোÑ টানা দুই দশক তা চলল। এ সময় যেসব তরুণ পরিণত বয়সে পৌঁছেছে, যে শিশু তারুণ্য অর্জন করেছে তারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও স্বপ্নের কথা ঠিকমতো শোনে নি। শোনে নি এই প্রাণস্পর্শী ভাষণটি। জানে নি কীভাবে এ দেশ একদিন জেগে উঠেছিল, সব বাধা প্রতিরোধ ভেঙে স্বাধীনতা অর্জনের জন্যে আকুল হয়ে উঠেছিল, সকল ক্ষুদ্রতা বিভেদ ভুলে ঐক্যে ও বীরত্বে মহৎ হয়ে উঠেছিল।
এখন কন্যাই নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন পিতার পথে জাতিকে ফেরানোর দীর্ঘ কঠিন সংগ্রামে। নিশ্চয় তার দলের এবং এ দেশের দেশপ্রেমিক সচেতন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও জনগণ অনেক সংগ্রাম ও ত্যাগ করেছেন। এ লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্যে যে অনুপ্রেরণার প্রয়োজন হয় তার এক অফুরন্ত ভা-ার জাদুকরি এই ভাষণ। এও যেন শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধের মতো প্রেরণার অনন্য উৎস।
বঙ্গবন্ধু ছিলেন এ দেশের খেটে খাওয়া জনমানুষের নেতা। তাই দেশ নিয়ে তার স্বপ্নে বৈষম্য-বঞ্চনা মুক্ত, সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মীয় সংকীর্ণতা মুক্ত, ধনী-দরিদ্র সবার নাগরিক অধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে সমতাভিত্তিক মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠা গুরুত্ব পেয়েছে। আজকের পরিবর্তিত বিশ্বে এ কাজে নিশ্চয় নতুনতর মাত্রা যুক্ত হয়েছে, কাজটা হয়ে পড়েছে কঠিন, জটিল। আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদ, ধর্মীয় চরমপন্থা, ধনবাদী বিশ্বের অস্ত্র ব্যবসানির্ভর অর্থনীতি, মুক্তবাজার-সৃষ্ট ভোগবাদ এবং পশ্চিমের আধিপত্যবাদ উন্নয়নশীল দেশের সমাজ ও রাষ্ট্রের সামনে কঠিন সব চ্যালেঞ্জ হাজির করে চলেছে। আশার কথা এর সঙ্গে পাল্লা দিয়েও আমরা এগিয়ে চলেছি। সামনে আরও বাধা পেরুনো এবং পথ পাড়ি দেওয়া বাকি আছে। বিশেষভাবে যে অগ্রগতি হচ্ছে তা ধরে রাখা, তাকে টেকসই করে তোলা ভীষণ জরুরি। তার জন্যে মানুষের অন্তরে গণতন্ত্র, দেশপ্রেম, মানবহিতৈষী চেতনার বীজ সঞ্চার ও পরিপুষ্ট করতে হবে। বস্তুগত উন্নয়নের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক রূপান্তরের কাজেও পরিকল্পিতভাবে হাত লাগাতে হবে। কীভাবে একটি রাজনৈতিক ভাষণ একটি জাতির সাংস্কৃতিক চেতনাকে সমৃদ্ধ করে নতুন পথে এগিয়ে চলার প্রেরণা দেয়, তারই তো সাক্ষী আমরা। তাই এক্ষেত্রেও আমাদের পথ হারানোর কথা হয়।
সত্যিই এ ভাষণটি আমাদের রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারে পরিণত হওয়ার ফলে এই বিশ্বাস আমরা পাই যে, কোনো অপশক্তিই আমাদের কখনও দীর্ঘকাল দাবায়ে রাখতে পারবে না। এ ভাষণ আমাদের মুক্তির মন্ত্র, সংগ্রামের চেতনা, আত্মত্যাগের প্রেরণা।

Category: