Blog Archives

কবিতা

32(C) copy33(C) copy

Category:

পদ্মাসেতুতে দ্বিতীয় স্প্যান

0 PMউত্তরণ ডেস্ক: দৃশ্যমান হলো স্বপ্নের পদ্মাসেতুর দ্বিতীয় স্প্যান। স্প্যান ৭বি (সুপার স্ট্রাকচার) ৩৮ ও ৩৯নং পিলারের ওপর বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত ২৮ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ৮টায় স্প্যানটি খুঁটির ওপর বসিয়ে দেওয়া হয়। এরই মধ্য দিয়ে পদ্মাসেতু নির্মাণের আরেক ধাপ এগিয়ে গেল। শীতের সোনালি রোদ উঁকি দিতেই পদ্মায় আলোর ঝিলিক ছড়িয়ে পড়ে ঢেউয়ে ঢেউয়ে। নতুন আরেক বড় ঝিলিক ছড়িয়ে যায় এই স্প্যান স্থাপনের মধ্য দিয়ে।
দ্রুততর সময়ের মধ্যেই স্প্যান বসতে থাকবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এদিকে দ্বিতীয় স্প্যান স্থাপনের খবরে আনন্দে উদ্বেল পদ্মা তীরের মানুষসহ গোটা বাংলাদেশ। বিভিন্ন স্থান থেকে ফোনে ও গণমাধ্যম থেকে এই স্প্যান তোলার খবর নিশ্চিত হয় দেশবাসী।
এরই মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় স্প্যান বসানো নিয়ে অপেক্ষারও অবসান ঘটল। প্রথম স্প্যানটি বসেছিল গত ৩০ সেপ্টেম্বর। তার প্রায় চার মাস পর দ্বিতীয় স্প্যান বসল। তবে এখন থেকে প্রতিমাসেই একাধিক স্প্যান বসানো সম্ভব হবে বলে দায়িত্বশীলরা মনে করছেন।

Category:

প্রধান বিচারপতি নিয়োগকে স্বাগত

00মহামান্য রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদের ৩নং দফা এবং ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গত ১ ফেব্রুয়ারি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করেছেন। বিচারপতি এসকে সিনহার পদত্যাগের ফলে দীর্ঘদিন প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য ছিল। প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য থাকায়, এ নিয়ে বিএনপিসহ বিভিন্ন মহল তীব্র সমালোচনার ঝড় তুলেছিল। তারা দেশবাসীকে এই বলে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে যে, প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হলে ‘অবিলম্বে শূন্যপদে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকে প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ দান করতে হবে।’
এখানে দুটি অসত্য তথ্য পরিবেশন করে দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। প্রথমত; প্রধান বিচারপতির পদ কোনো কারণে শূন্য হলে উক্ত শূন্যপদে জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব অর্পণের কথা থাকলেও, নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগের কোনো সময় নির্ধারণ করে দেয়নি সংবিধান। সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদে শূন্যপদে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ব্যাপারে রাষ্ট্রপতিকে কোনো সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। পুরো বিষয়টি মহামান্য রাষ্ট্রপতির সন্তুষ্টি ও স্বাধীন ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। একজন ভারপ্রাপ্ত বিচারপতি কতদিন ‘ভারপ্রাপ্ত’ থাকবেন তারও কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি। তবে বলা হয়েছে, নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগের পূর্ব পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত বিচারপতি তার দায়িত্ব পালন করবেন। অতএব, এখানে সময়সীমা কোনো সমস্যা নয়। দ্বিতীয়ত; সংবিধানের কোথাও লেখা নেই যে, জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকেই প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে। অথচ বিএনপি, একশ্রেণির আইনজীবী, বুদ্ধিজীবী ও সংবাদপত্র ‘জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন’ করে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ঢালাও অভিযোগ করে রাষ্ট্রপতির মর্যাদাকেই ক্ষুণœ করেন নি, সরকারের ওপর অহেতুক দোষারোপ করে চলেছেন।
আমরা সংবিধানের আলোকে বিষয়টি পরিষ্কার করে বলতে চাই। আমাদের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মূলত নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধান; কিন্তু দুটি বিষয়ে রাষ্ট্রপতির রয়েছে একচ্ছত্র ক্ষমতা। রাষ্ট্রপতি কারও সাথে পরামর্শ না করে যেমন নির্ধারিত মানদ- অনুযায়ী দেশের প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করতে পারেন, তেমনি প্রধান বিচারপতি নিয়োগেও তিনি স্বাধীন এবং একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী। সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদে এ কথা লেখা নেই যে, আপিল বিভাগের বিচারপতিদের মধ্য থেকেই প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে। সংবিধানে আছে ন্যূনতম ১০ বছর সুপ্রিমকোর্টে অ্যাডভোকেট হিসেবে কাজের অভিজ্ঞতা আছে, অথবা বিচার বিভাগে ন্যূনতম ১০ বছর কাজ করেছেন, এমন যে কোনো ব্যক্তিকেই রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে পারেন। এর নিরগলিতার্থ দাঁড়ায় হয়, বিচার বিভাগে (সেটি হাইকোর্ট, সুপ্রিমকোর্ট নাও হতে পারে) ১০ বছর কাজ করেছেন অথবা সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী হিসেবে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন যে কোনো ব্যক্তিকেই রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করার অধিকার রাখেন। এ ব্যাপারে যেমন কোনো প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই, তেমনি রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে কোনো আদালতের শরণাপন্ন হওয়ারও সুযোগ নেই।
আর একটি বিষয়ে সকলের পরিষ্কার ধারণা থাকা বাঞ্ছনীয়। আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি হোক বা অন্য কোনো বিচারপতিই হোন, প্রধান বিচারপতি পদে কারও নিয়োগই ‘পদোন্নতি’ বলা অসাংবিধানিক। কারণ হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের যখন আপিল বিভাগে নিয়োগ করা হয়, সেটি কার্যত এক ধরনের পদোন্নতি।
কিন্তু প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ কোনো পদোন্নতি নয়। যদি পদোন্নতিই হতো তা হলে জ্যেষ্ঠতম বাধ্যতামূলক হতো। অথবা সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে লেখা থাকত আপিল বিভাগের বিচারপতিদের পদোন্নতি সংক্রান্ত বিধান। সংবিধানে বিচারপতিদের পদোন্নতির কোনো বিধান নেই।
যেহেতু সংবিধানে এ ব্যাপারে কোনো বিধান নেই এবং জ্যেষ্ঠতার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, সে কারণে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের বিষয়টিকে পদোন্নতি ধরা যাবে না। বস্তুত, রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি অ্যাপয়েন্ট করেন। বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকেও পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। তাকে ফ্রেস অ্যাপয়েন্টমেন্ট বা নতুন নিয়োগ দান করা হয়েছে। আমরা অবশ্য এটা লক্ষ করেছি অতীতের মতো রাষ্ট্রপতি আপিল বিভাগ থেকেই প্রধান বিচারপতি নিয়োগের যে কনভেনশন বা ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে, সেটিই অনুসরণ করেছেন।
আমরা মহামান্য রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। আশা করি, নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগের পর বিএনপি ও স্বার্থান্বেষী মহল আর এটা নিয়ে পানি ঘোলা করার চেষ্টা করবেন না। সংবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে সকল বিতর্কের অবসান ঘটাবেন।
আমরা নবনিযুক্ত প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে স্বাগত ও অভিনন্দন জানাই। আমরা আশা করি, তিনি সংবিধান, ন্যায়নীতি ও বিচার বিভাগকে সমুন্নত রেখে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে সফল হবেন।

Category:

বাঙালির ভাষা শিল্প সংস্কৃতি সারাবিশ্বে ছড়িয়ে দিন

অমর একুশে গ্রন্থমেলা উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

03উত্তরণ প্রতিবেদন: বাংলা ভাষা সাহিত্যের চর্চা, বিকাশ, বাঙালি সংস্কৃতির বহমান উদার অসাম্প্রদায়িক ধারায় অনন্য সংযোজন বইমেলা গত ১ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মাসব্যাপী মেলা উদ্বোধনের পর বইয়ের বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন তিনি।
বাংলা একাডেমিতে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এমপি। বাংলা একাডেমির আমন্ত্রণে যোগ দেন যুক্তরাজ্যের কবি এগনিস মিডোস, ক্যামেরুনের ড. জয়েস এ্যাসউনটেনটেঙ, মিসরের ইব্রাহিম এলমাসরি ও সুইডেনের অরনে। একাডেমির সভাপতি ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতি সচিব মো. ইব্রাহীম হোসেন খান। স্বাগত বক্তব্য রাখেন একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান। প্রকাশক প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য রাখেন মো. আরিফ হোসেন। অনুষ্ঠানে বাংলা ভাষা সাহিত্য শিল্প সংস্কৃতির চর্চা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা নিজেদের ভাষা শিল্প সংস্কৃতিকে মর্যাদা দিতে না পারি আর তার উৎকর্ষ সাধন করতে না পারি, বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না। বাঙালির ভাষা শিল্প সংস্কৃতি শুধু বাংলাদেশের সীমানায় নয়, সমগ্র বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত করতে হবে। অমর একুশে গ্রন্থমেলা জ্ঞানচর্চার দ্বার উন্মুক্ত করবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ভাষা আন্দোলনের গৌরবকে ধারণ করে আছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা। সে ইতিহাস তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তান নামে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দুটি ভূখ-। উভয় অংশের মধ্যে প্রায় ১২০০ মাইল দূরত্ব। ভাষা সংস্কৃতি সবকিছুই ভিন্ন। জনসংখ্যার দিক থেকে আমরা ছিলাম বেশি। এরপরও পাকিস্তানিদের দ্বারা আমরা শোষিত হচ্ছিলাম। আমাদের রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে উর্দু চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল তারা। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ তা মেনে নেয়নি।
ভাষা আন্দোলনে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকার কথা এখনও অনেকের অজানা। খুব একটা উচ্চারিত হয় না। প্রধানমন্ত্রী সে জায়গাটিতে আলো ফেলার চেষ্টা করেন। বলেন, বাঙালির মহান নেতা তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ তিনি গঠন করেছিলেন। এবং তারই প্রস্তাবে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে ওঠে। এর পরপরই ধর্মঘট ডাকা হয়। তখন পিকেটিং করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুসহ অনেকেই গ্রেফতার হন। এভাবেই দাবির আন্দোলন শুরু। বঙ্গবন্ধু বন্দিখানায় থেকেও, যখনই হাসপাতালে এসেছেন, ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। রাষ্ট্রভাষার সংগ্রামকে এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ থেকে উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, সেখানে বঙ্গবন্ধু লিখেছেনÑ ‘পরের দিন রাতে এক এক করে অনেকেই আসল। সেখানেই ঠিক হলো আগামী ২১শে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হবে। এবং সভা করে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হবে। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কনভেনার নিয়োগ করতে হবে।’ পরবর্তী জীবনেও সে সংগ্রাম তিনি চালিয়ে গিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ’৫৬ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। এবং বাংলাদেশের শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করা হয়। সেই শাসনতন্ত্রে কিন্তু বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারই ২১শে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। সরকারি ছুটি দেওয়া হয়। শহীদ মিনার তৈরির কাজও শুরু করেছিল। ভাষা আন্দোলন, ৬-দফা, এর ভিত্তিতে স্বাধীনতা সংগ্রাম। দেশ পাওয়া। জাতির জনক মাত্র সাড়ে তিন বছর সময়ের মধ্যে একটি প্রদেশকে রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলেন। শিল্প সংস্কৃতি চর্চার সব রকম ব্যবস্থা করে যান তিনি।
ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চা এগিয়ে নিতে নিজের গ্রহণ করা পদক্ষেপগুলোর কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করে। তখন আমরা জানতে পারি, কানাডা প্রবাসী দুই মাতৃভাষাপ্রেমিক বাঙালি, তাদের নামও সালাম এবং রফিক, একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন। সংগঠনের মাধ্যমে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন তারা। কিন্তু এজন্য ইউনেস্কোর কাছে আবেদন করতে হয় এবং এই আবেদন কোনো সংগঠনের পক্ষে করা যায় না। রাষ্ট্রের পক্ষে করতে হয়। বিষয়টি জানা মাত্রই আমাদের সরকার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এর প্রেক্ষিতে আজ ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সারাবিশ্বে স্বীকৃতি পেয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা বিশ্ববাসীর স্বীকৃতি পেয়েছি। এই ধারাবাহিকতা আমাদের বজায় রাখতে হবে। আমরা স্বাধীনতার চেতনা নিয়ে এমন দেশ গড়তে চাই, যে বাংলাদেশ হবে অসাম্প্রদায়িক। যে বাংলাদেশ হবে শান্তিপূর্ণ। এখানে সবাই নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করবে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী যারা, তারাও তাদের নিজেদের মতো করে ভাষা সংস্কৃতির চর্চা করতে পারবে। এভাবেই দেশকে এগিয়ে নিতে চাই। আমরা মাথা উঁচু করে চলতে শিখেছি। ইনশাআল্লাহ মাথা উঁচু করে চলব।
এবারও প্রধানমন্ত্রী নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি চর্চার পাশাপাশি সারাবিশ্বে তা ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, এখন বাংলা ভাষার লেখাগুলো অনুবাদ হচ্ছে। বিদেশি লেখকরা আসছেন আমাদের দেশে। তারা আমাদের সম্পর্কে জানছেন। এই আদান-প্রদানের প্রয়োজন আছে। এ প্রসঙ্গে জাতির জনকের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশ হওয়ার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, এভাবে নিজের দেশের ইতিহাস সংস্কৃতিকে ছড়িয়ে দিতে হবে। আমরা যখনই সরকার গঠন করেছি, চেষ্টা করেছি ঐতিহ্যগুলো ধরে রাখার জন্য।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায় একাধিকবার আসে সামরিক সরকার প্রসঙ্গ। দেশের অগ্রগতি ও শিল্প সংস্কৃতি চর্চার বিপরীতে এই সরকারগুলো ‘আঘাত’ হয়ে আসে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বলেন, আমাদের দুর্ভাগ্য যে, সব সময়ই আমাদের ওপর আঘাত এসেছে। সামরিক শাসকেরা যখন আসে তখন বাঙালি জাতির সংস্কৃতি, বাঙালি জাতির সাহিত্য চর্চা, বাঙালি জাতির মাথা তুলে দাঁড়ানোর অধিকারগুলোর দিকে মনোযোগ দেয় না। তারা ক্ষমতাকে কীভাবে নিষ্কণ্টক করবে তা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কিছু লোককে খুশি করে। কিন্তু সার্বিকভাবে কীভাবে দেশ এগিয়ে যাবে, ভাবে না। পদক্ষেপ নেয় না। এরা না সংস্কৃতি চর্চা করতে জানে, না ভাষা চর্চা করতে জানে। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারীরা আসলে মানসিকতা একটু ভিন্ন বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
পৃথিবীর সব দেশের সব মাতৃভাষার প্রতি নিজের অনুরাগের কথা জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা একটি মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেছি। যেসব ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে, বিলুপ্তির পথে, সেসব ভাষা নিয়ে চর্চা সংরক্ষণ ও গবেষণার কাজ হচ্ছে এখানে। এ ধরনের কাজ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ‘আলোকচিত্রে বাংলা একাডেমির ইতিহাস’ এবং ‘বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ : বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ’ গ্রন্থ দুটি তুলে দেওয়া হয়।
একই অনুষ্ঠানে প্রদান করা হয় বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০১৭। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০১৭ পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেন : কবিতাÑ মোহাম্মদ সাদিক ও মারুফুল ইসলাম। কথাসাহিত্যÑ মামুন হুসাইন। প্রবন্ধÑ মাহবুবুল হক। গবেষণাÑ রফিকউল্লাহ খান। অনুবাদÑ আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যÑ কামরুল হাসান ভূঁইয়া ও সুরমা জাহিদ। ভ্রমণকাহিনিÑ শাকুর মজিদ। নাটকÑ মলয় ভৌমিক। বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিÑ মোশতাক আহমেদ। শিশুসাহিত্যÑ ঝর্ণা দাশ পুরকায়স্থ। অনুষ্ঠানে পুরস্কারপ্রাপ্ত লেখকদের হাতে ১ লাখ টাকার চেক, ক্রেস্ট ও সম্মাননাপত্র তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
পরে তিনি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, মেধাবিকাশ ও সুস্থ বিনোদনের জন্য তৈরি অনলাইনভিত্তিক প্লাটফর্ম কিশোর বাতায়ন কানেক্ট এবং প্রতিবন্ধীবান্ধব একসেসিবেল ডিকশনারির উদ্বোধন করেন। এটুআই-প্রোগ্রামের ডিজিটাল তথ্যকেন্দ্র থেকে অনলাইন প্লাটফর্মেরও উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এবারও মেলার বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন এবং বই সংগ্রহ করেন বেশ কিছু বইয়ের লেখক শেখ হাসিনা।

Category:

মো. আবদুল হামিদ আওয়ামী লীগের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মনোনীত

05গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ২১তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। গত ৩১ জানুয়ারি রাতে গণভবনে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ডের এক সভায় সর্বসম্মতিক্রমে তাকে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
গত ২ ফেব্রুয়ারি সকালে মো. আবদুল হামিদের পক্ষে সংসদের চিপ হুইপ আ স ম ফিরোজ নির্বাচন কমিশন ভবন থেকে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন। এ সময় তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের পাঁচ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এ সময় প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
পরে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধি দল রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থী হিসেবে নির্বাচন কমিশন থেকে সংগৃহীত মনোনয়নপত্র বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের কাছে হস্তান্তর করেন।
নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি দেশের ২১তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। প্রসঙ্গত, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২০তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. আবদুল হামিদ।

Category:

বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন প্রধান বিচারপতি নিয়োজিত

05aদেশের ২২তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। গত ৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ নতুন প্রধান বিচারপতিকে শপথ পড়ান। বঙ্গভবনের দরবার হলে এই শপথ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্যবৃন্দ, সাবেক প্রধান বিচারপতিগণ, সুপ্রিমকোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিগণ, সিনিয়র আইনজীবীসহ সরকারের পদস্থ বেসামরিক-সামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন।
সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের এই বিচারপতিকে গত ২ ফেব্রুয়ারি প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। ওই দিন প্রধান বিচারপতি নিয়োগ সংক্রান্ত পত্রে স্বাক্ষর করেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ। এরপর এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়। ৩ ফেব্রুয়ারি শপথ নেন বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। শপথ শেষে শপথনামায় সই করেন নতুন প্রধান বিচারপতি ও রাষ্ট্রপতি।

Category:

দশম জাতীয় সংসদের ৪ বছর পূর্তি

06সরদার মাহামুদ হাসান রুবেল: ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত বর্তমান দশম সংসদ সবার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে প্রাণবন্তভাবে ৪ বছর পূর্ণ হয়েছে গত ২৯ জানুয়ারি। এই সংসদের মেয়াদ শেষ হবে ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারি। বিএনপি-জামাত জোট নির্বাচন বর্জন করলেও গত চার বছরে অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে দশম জাতীয় সংসদে সক্রিয় ছিল ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল। অধিবেশনগুলোতে স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতির পাশাপাশি নানা ইস্যুতে সরব হতে দেখা গেছে উভয় দলের সংসদ সদস্যদের। চার বছরে সংসদ বর্জনের সংস্কৃতির অবসান হয়েছে। দেশে প্রথমবারের মতো প্রধান বিরোধী দলও (জাপা) সরকারের মন্ত্রিসভায়Ñ এই বিবেচনায় চলতি দশম জাতীয় সংসদ ‘ব্যতিক্রমী’। দেশের সংসদীয় ইতিহাসে এবারই প্রথম একজন নারী স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।
দশম সংসদের চার বছরে বড় ধরনের কূটনৈতিক সফলতা অর্জনের বিষয়টি সর্বত্র প্রশংসিত হয়েছে। জাতীয় সংসদের উদ্যোগে ঢাকায় সংসদীয় গণতান্ত্রিক দেশগুলোর বৃহত্তর দুটি সংগঠন কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন (সিপিএ) ও ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) সম্মেলন হয়েছে। এই সংসদে গত চার বছরে জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুতে আলোচনায় নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে।
আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া শেষে বিলটি পাসের জন্য যখন সংসদে আসে, তখনও বিরোধী দল থেকে অনেক সংশোধনী আনা হয়, সেটার ওপর আলোচনাও হয়। অনেক ক্ষেত্রে মাননীয় মন্ত্রীরা সেসব সংশোধনী গ্রহণও করেছেন এগুলো জনগণের কাছে ছিল খুব ইতিবাচক। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং সংসদীয় গণতন্ত্রকে সুসংহত করার ক্ষেত্রে সকল দলের সদস্যদের মধ্যে এই যে আলোচনা এবং তার মধ্য থেকে একটা আইনকে চূড়ান্ত করাÑ সেই বিষয়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে, ঠিক যখন বিলটা উত্থাপনের জন্য সংসদে আসে, সেই উত্থাপনের সময়ও বিরোধী দল অনেক সময় আপত্তি জানায় এবং মন্ত্রী সেটার উত্তর দেন, তারপর সংসদে ভোট পেয়ে সেটা সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে যাচ্ছে। সংসদীয় গণতন্ত্র চর্চার জন্য এ বিষয়গুলো খুব সহায়ক প্রক্রিয়া।
তারপর বিরোধী দল গঠনমূলক সমালোচনার জায়গাটিকে অনেক বেশি শক্তিশালী করছে। সবকিছুতেই তারা যে একমত তাও নয়; কিন্তু যে দ্বিমতটা তারা প্রকাশ করছেনÑ সেটা খুব সুন্দরভাবে তারা সংসদে উপস্থাপন করছেন। সরকার যেন সরকারের কাজগুলো আরও গঠনমূলকভাবে এগিয়ে নিতে পারে, সেক্ষেত্রে বিরোধী দল সহযোগিতা করছে। আবার বিরোধিতা বা যেখানে দ্বিমত আছে, সেখানে তারা সেটা সংসদে নির্বিঘেœ প্রকাশ করছেন। এই সংসদে অনির্ধারিত আলোচনায়ও অনেক বিষয় উঠে এসেছে। বিরোধী দলের সদস্যরা যথেষ্ট ক্রিটিক্যালি সেগুলো সংসদে উপস্থাপন করেন। এসব ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র সদস্যদেরও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ রয়েছে; তারাও প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের প্রশ্ন করেন, জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নোটিসের ওপর আলোচনা করছেন, কখনও কখনও তাদের মতামত গ্রহণও করা হয়। এগুলোর মধ্য দিয়েই সংসদ এগিয়ে যাচ্ছে।
বিরোধী দল হিসেবে জাপা বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রতিবাদে ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর প্রথমবারের মতো ওয়াকআউট করেছিল। সম্প্রতি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিবারের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি সংক্রান্ত বিলের প্রতিবাদে দলটি ওয়াকআউট করে। এছাড়াও তারা বিভিন্ন কারণে হাতেগোনা কয়েকবার ওয়াকআউট করেছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণকে ইউনেস্কো স্বীকৃতি দেওয়ায় সংসদের সবাই একই সুরে প্রশংসা করেছে। সংসদে সর্বসম্মত ধন্যবাদ প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। এই সংসদ একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধ স্বোচ্চার ছিল। ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাবও এই সংসদে গৃহীত হয়েছে। সেভাবেই ২৫ মার্চকে দেশের ভিতরে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এমনিভাবে প্যালেস্টাইনের জনগণ যখন নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, তখনও তীব্র নিন্দা জানিয়ে সংসদে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। এই সংসদ ‘বর্জন সংস্কৃতি’ অবসানকারী সংসদ বলে মনে করে সরকার ও বিরোধী দল।
গত চার বছরের ১৯ অধিবেশনে বৈঠক হয়েছে ৩২৮ দিন। এর মধ্যে সবচেয়ে লম্বা অধিবেশন ছিল প্রথমটি। ৩৬ কার্যদিবসের এই অধিবেশন শেষ হয় ১০ এপ্রিল। আর সব থেকে ছোট অধিবেশন ছিল মাত্র ৫ কার্যদিবসের ১৫ ও ১৭তম অধিবেশন।
গত ৭ জানুয়ারি ১৯তম অধিবেশন শুরু হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের ভাষণের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই অধিবেশনেই দেশের নতুন ২১তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হওয়ার কথা হয়। এই সংসদে এ পর্যন্ত ১২৮টি আইন পাস হয়েছে। বিল পাস, প্রশ্নোত্তরসহ অন্যান্য ইস্যুতেও সক্রিয় ছিলেন সংসদ সদস্যরা। সর্বশেষ ৪ লাখ কোটি টাকার ওপরে বাজেট পাস করে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে এই সংসদ।
বিগত বছরগুলোতে জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরকারকে চাপে রাখতে একাধিকবার সংসদ বর্জন (ওয়াকআউট) করেছিল বিরোধী দল। সর্বশেষ চলতি অধিবেশনে ব্যাংক কোম্পানি আইন পাসের প্রতিবাদে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন তারা। জাতীয় নির্বাচনের এ বছরের শুরু থেকেই অবশ্য সরকারের বিরুদ্ধে সংসদে উত্তাপ ছড়াচ্ছে বিরোধী দল। প্রতিটি বিল উত্থাপন ও পাসের সময় তাদের রুটিন বিরোধিতাও অব্যাহত রয়েছে। বিরোধী দলের পাশাপাশি সরকারি দলের সদস্যরাই মাঝে মাঝে সরকারের নেওয়া জনবিরোধী সিদ্ধান্তগুলো কঠোর বিরোধিতা করে সংসদকে প্রাণবন্ত রাখেন। বিভিন্ন ইস্যুতে দলীয় এমপিদের এই সংসদীয় আক্রমণে রীতিমতো বিব্রত হয়েছেন একাধিক মন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর মহানুভবতায় নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বিশ্ববাসীর প্রশংসা অর্জন নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়েছে।
এ বিষয়ে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, বর্তমান জাতীয় সংসদ অতীতের যে কোনো সময়ের থেকে বেশ কার্যকর। এই সংসদের রেকর্ড সংখ্যক আইন পাসের পাশাপাশি জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে আলোচনা হয়েছে। এক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের পাশাপাশি বিরোধী দলও ভূমিকা রাখছে। তাদের সহযোগিতায় দেশে দুটি বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা সম্ভব হয়েছে। এর মাধ্যমে বিশ্ববাসী স্বচক্ষে বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিসহ অন্যান্য বিষয় দেখার সুযোগ পেয়েছে। এটা বাংলাদেশের জন্য বয়ে এনেছে অনন্য সম্মান। তিনি আরও বলেন, সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী বিদেশি অতিথিরা বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। এর মাধ্যমে বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। যা আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রায় বড় ভূমিকা রাখবে।
মাননীয় বিরোধী দলের নেতাও বাজেট আলোচনা, অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্য এবং রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপরসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন। এমনকি প্রধামন্ত্রীর প্রশ্নোত্তরকালে এবং মন্ত্রীদের প্রশ্নোত্তর পর্বেও তিনি সরাসরি প্রশ্ন করেছেন। জনগণের অনেক সমস্যা তিনি সংসদে তুলে ধরেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যিনি এই দশম জাতীয় সংসদের সংসদ নেতা, তিনিই কিন্তু প্রতি বুধবার ৩০ মিনিট প্রধানমন্ত্রীর এই প্রশ্নোত্তর প্রক্রিয়ার প্রচলন করেন। তারই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী নিয়মিত প্রশ্নোত্তরে অংশ নিচ্ছেন। সময়ে তুলনামূলকভাবে বিরোধী দলের সদস্যদেরই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বেশি প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়ার চেষ্টা করে দিয়েছে স্পিকার। কাজেই প্রশ্নকালগুলো ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত। এবং অনেক সময় অনেক বিষয়ে তিনি দীর্ঘসময় বিস্তারিত উত্তর দেন। সংসদে প্রধানমন্ত্রীর নিয়মিত এবং প্রায় সার্বক্ষণিক উপস্থিতিও আমরা সংসদে দেখতে পাই। কাজেই এগুলো খুব ইতিবাচক। প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে অনেক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ‘প্ল্যানেট ফিফটি ফিফটি’, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অবদানের জন্য ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ’ ইত্যাদি। সেই বিষয়গুলোকে অভিনন্দন জানিয়ে সংসদে প্রস্তাব পাস হয়েছে।
জাতীয় সংসদ সবিচালয়ের কর্মকর্তাদের জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সংসদ সদস্যরাও অনেক ধরনের কর্মশালায় অংশ নিয়েছেন। যেমন অটিজমের ওপর প্রশিক্ষণে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল বক্তব্য রেখেছেন। ‘সামাজিক নিরাপত্তা’ কার্যক্রমের ওপর কর্মশালা হয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজি-কে কীভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় সে বিষয়ে কর্মশালা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগের ঝুঁকি মোকাবিলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংসদ সদস্যরা কাজ করছেন। বিশেষ করে সংসদ সদস্যরা তাদের নির্বাচনী এলাকাগুলোতে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং মাতৃ-শিশু মৃত্যুরোধে জনসচেতনতা গড়ে তোলার জন্য কাজ করছেন। ‘এসপিসিপিডি’ প্রকল্পের মাধ্যমে এগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
চার বছরে ৫০টি সংসদীয় কমিটির সহস্রাধিক বৈঠক হয়েছে। সবচেয়ে বেশি বৈঠক করেছে সরকারি হিসাব সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। সবচেয়ে কম বৈঠক করেছে পিটিশন কমিটি। প্রথম দুই বছর কার্যপ্রণালি বিধি-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির কোনো বৈঠক না হলেও গত দুই বছরে কয়েকটি বৈঠক করেছে।

Category:

ফের নৌকায় ভোট দিন

সিলেটে বিশাল জনসভায়: আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা

09উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রান্তিক জেলা সিলেটে জোয়ার উঠেছে। নৌকার নির্বাচনী জোয়ার। এই জোয়ার সারাদেশকে ভাসিয়ে নেবে। উপস্থিত জনতার এমন ধারণায় পরিবেষ্টিত গত ৩০ জানুয়ারি সিলেটের আলিয়া মাদ্রাসা ময়দানের জনসমুদ্রে প্রধান অতিথির ভাষণে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করার জন্য উপস্থিত জনতাকে হাত তুলে সমর্থন জানানোর আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রীর এমন আহ্বানে উপস্থিত সকলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাত তুলে সাড়া দিয়ে নৌকাকে বিজয়ী করার পক্ষে সমর্থন ব্যক্ত করেন। ৩০ জানুয়ারি আলিয়া মাদ্রাসা ময়দান ছিল কানায় কানায় ভর্তি। মাঠ উপচে মানুষের ঢল ছিল বহু দূর পর্যন্ত। নির্বাচনী আমেজে ফুরফুরে মেজাজে শীতের বিকেলে মাদ্রাসা ময়দানে উপস্থিত মানুষের মধ্যে ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্বাচনী প্রচারণা আহ্বানের অপেক্ষা। সিলেটে হযরত শাহজালাল (র.), হযরত শাহপরাণ (র.) ও সিলেটের প্রথম মুসলিম গাজী বুরহান উদ্দিনের মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে শেখ হাসিনা ২০১৮ সালের নির্বাচনের প্রথম প্রচার অভিযান শুরু করেন। সভা শুরুর পূর্বে ১৯টি প্রকল্পের উদ্বোধন ও ১৬টি প্রকল্পের ভিত্তিফলক উন্মোচন করেন। প্রধান অতিথির বক্তৃতায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, দেশের উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে সরকার গঠনের সুযোগ দিন। আওয়ামী লীগ সরকারে এলেই দেশের উন্নয়ন হয়। দেশে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আগামী নির্বাচনেও নৌকা মার্কাকে নির্বাচিত করতে হবে। নৌকাকে নির্বাচিত করলে দেশ এগিয়ে যায়। কিন্তু বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় আসলে দেশে লুটপাট হয়, দেশ দুর্নীতিতে বারবার চ্যাম্পিয়ন হয়। তাই দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হলে আগামীতেও আওয়ামী লীগকে নির্বাচিত করতে হবে। তাই আপনারা হাত তুলে ওয়াদা করেন আগামীতেও নৌকা মার্কায় ভোট দেবেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে বিশ্ব দরবারে দেশ সম্মানের সাথে এগিয়ে যাবে। ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় নির্বাচন। সেই নির্বাচনে আবারও আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করুন। জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ আয়োজিত মাদ্রাসা মাঠের সভার মঞ্চটি তৈরি করা হয় নৌকার আদলে। এই মঞ্চে বক্তব্যের মাধ্যমে সিলেট থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন শেখ হাসিনা। নৌকার আদলে সভা মঞ্চ তৈরির ব্যাপারে সংশ্লিষ্টরা বলেন ‘নৌকা’ আওয়ামী লীগের প্রতীক, উন্নয়নের প্রতীক। তাই, নৌকার আদলে এ মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমরা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে জয়লাভ করে চার বছর পূর্ণ করে পাঁচ বছরে পদার্পণ করেছি। সামনে নির্বাচন হবে। সেই নির্বাচনকে সামনে নিয়ে আমরা নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছি। এবং সেটা শুরু করছি আমরা পুণ্যভূমি সিলেট থেকে। বিগত নির্বাচনে নৌকায় সবাই ভোট দিয়েছিলেন। তাই আজ বাংলার সর্বত্র উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমানের সভাপতিত্বে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদের যৌথ পরিচালনায় জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের পর ধ্বংসস্তূপ বাংলাদেশকে গড়ার কাজ শুরু করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, জাতির জনককে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট নির্মমভবে হত্যা করা হয়। ১৯৭৫-এর পর বাংলার মানুষের উন্নয়নের চাকা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। সংবিধান লঙ্ঘন করা শুরু হয়েছিল। ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দেশে উন্নয়ন শুরু হয়। শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি সিলেটসহ সারাদেশে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। ২০০৪ সালে হযরত শাহজালালের মাজারে গ্রেনেড হামলা হয়। পরপর দুবার গ্রেনেড হামলায় ৯ জন মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। ৭ আগস্ট আমাদের সাবেক মেয়র কামরানের ওপর আক্রমণ হয়। সে আক্রমণে আওয়ামী লীগ নেতা ইব্রাহিম আলী মৃত্যুবরণ করেন। একাধিকবার কামরানের ওপর হামলা হয়েছে। মহিলা আওয়ামী লীগের সভা চলাকালীন সেখানে বোমা হামলা হয়েছে। তিনি বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির হত্যাযজ্ঞ চলে সারাদেশে। তাদের হাত থেকে মা-বোনেরা রেহাই পায়নি। সারাদেশে অপারেশন ক্লিনহার্টের নামে আমাদের নেতা-কর্মীদের হত্যা করা হয়, গ্রেফতার করে নির্যাতন চালানো হয়, বহু নেতাকে গুম করা হয়। দীর্ঘ ৪০ মিনিটের বক্তৃতায় তিনি বলেন, বিগত ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি-জামাত সে নির্বাচন ঠেকানোর নামে সন্ত্রাস-নাশকতা চালায়। সিলেটে শহীদ মিনারে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। ২০১৩, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে বিএনপি দেশে ধ্বংসাত্মক কর্মকা- চালায়। আমরা গাছ লাগাই, তারা গাছ কাটে; আমরা রাস্তা বানাই, তারা রাস্তা কাটে। আমরা কঠোর হস্তে সেসব সন্ত্রাসী কর্মকা- প্রতিহত করি। বিএনপির সময় বাংলাভাই, আবদুর রহমান তৈরি হয়, সারাদেশে একযোগে বোমা হামলা হয়। বিএনপি ঢাকায় ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালায়। এতে আমাদের নেত্রী আইভি রহমানসহ ২২ জন নিহত হন। তারা ২৯টি রেলগাড়িতে আগুন দিয়েছে, ৯টি লঞ্চে আগুন দিয়েছে, ২৫২টি গাড়িতে আগুন দিয়েছে, প্রায় ১ হাজার ৪০০ সরকারি অফিস তারা জ্বালিয়ে দিয়েছে। জ্বালাও-পোড়াও আর অগ্নিসংযোগ হচ্ছে তাদের আন্দোলন। শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি ধ্বংস করতে জানে, সৃষ্টি করতে জানে না। মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করতে জানে। বিএনপি পেট্রলবোমায় মানুষ মেরেছে। তাদের আগুন, পেট্রলবোমায় বহু মানুষ জীবন দিয়েছে। তারা প্রায় ৫০০ মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে। প্রায় ৩ হাজার মানুষ তাদের আগুন সন্ত্রাসের শিকার হয়ে এখন ধুঁকছেন। তাদের অগ্নিসন্ত্রাসের কারণে ৩ হাজার ৩৬ জন অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন। তারা হাজার হাজার গাড়ি, সরকারি অফিস জ্বালিয়ে দিয়েছে। এ রকম ধ্বংসাত্মক আন্দোলন আমরা দেখিনি। তিনি বলেন, আন্দোলন হবে মানুষের জন্য। কিন্তু বিএনপি-জামাতের আন্দোলন ধ্বংস করার জন্য। তারা পারে দেশকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন করতে। বিপরীতে আওয়ামী লীগ উন্নয়ন করে, উন্নয়নে বিশ্বাস করে, জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন করে। আজ সিলেট থেকেই নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি সিলেট এসেছি আপনাদের উপকার করতে। আজ অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন করেছি। সামনে আরও কিছু উন্নয়ন প্রকল্প হবে, সেগুলোর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। সিলেট-ঢাকা মহাসড়ককে চার-লেনে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশে বিদ্যুতের জন্য হাহাকার ছিল। ২০০৯ সালে আমরা ক্ষমতায় এসে পেয়েছিলাম মাত্র ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। আজ আমরা দেশে ১৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ দিচ্ছি। আমরা কম্পিউটারের ওপর থেকে ট্যাক্স প্রত্যাহার করে তা সহজলভ্য করেছি। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আমরা শিক্ষার হার ৬৫.৫ ভাগে উন্নীত করেছিলাম। বিএনপি ক্ষমতায় এসে সাক্ষরতার হার কমিয়ে ৪৫ ভাগে নিয়ে আসেন। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে আমরা এ হারকে ৭২ ভাগের উপরে নিয়ে গেছি। আমরা প্রতিটি এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় করে দিচ্ছি। বিভিন্ন বহুমুখী বিশ্ববিদ্যালয় করছি, টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করে শিক্ষাকে বহুমুখী করে দিচ্ছি। আমরা বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দিয়েছি। আমরা চলতি জানুয়ারি মাসে ৩৫ কোটি ৪২ লাখ ৯০ হাজার ১৬২টি বই বিতরণ করেছি। যাতে আমাদের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করতে পারে। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কম্পিউটার ল্যাব তৈরি করে দিয়েছি। আমরা বেসরকারি অনেক কলেজকে সরকারি করে দিয়েছি। জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করে দিচ্ছি। যাতে শিক্ষার্থীরা ঘরে বসে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে। প্রাইমারি লেভেলে ২ কোটি ৩০ লাখ শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তি দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করেছি। যাতে তারা উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী হয়ে ওঠে। একটি দেশকে উন্নত করতে হলে একটি জাতিকে শিক্ষিত করে তুলতে হবে। প্রযুক্তি খাতে সরকারের উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের দেশে ১৪ কোটি সিম ব্যবহার করা হয়। অনেকে দুইটা-তিনটা করে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। দেশের ৮ কোটি মানুষ আজ ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। আমরা আজ সব জায়গায় ইন্টারনেট পৌঁছাতে পেরেছি। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিভিন্ন গবেষণা পদ্ধতি চালিয়ে যাচ্ছি। কৃষকদের ভর্তুকি প্রদান করছি। মাত্র ১০ টাকায় কৃষকদের জন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। যাতে কৃষকদের নিজ অ্যাকাউন্টে আমরা ভর্তুকির টাকা পৌঁছে দিতে পারি। ২ কোটির ওপর কৃষক এই সেবা পাচ্ছে। সিলেটের চা-শিল্পের উন্নয়নের কথা তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য, তাদের সন্তানের শিক্ষার উন্নয়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সিলেট থেকে যাতে চা’র নিলাম হতে পারে সেজন্য আমরা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। সিলেটে যেসব পণ্য উৎপাদন হয় যেমনÑ ভুট্টা, আগর, কমলালেবুসহ অন্যান্য উৎপাদনের জন্য এখানে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের সম্প্রসারণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। সে লক্ষ্যে প্রত্যেক অঞ্চলে আমরা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। সিলেটে আমরা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছি যেখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ হবে। আমাদের প্রবাসী বাঙালিরা সেখানে অগ্রাধিকার পাবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা বলেছিলাম ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলব। আমরা তা করতে পেরেছি। ৮ হাজার ৫৪৫টি রিসার্চ সেন্টার গড়ে তুলেছি। আমরা ঘরে বসে সেবা পাওয়ার লক্ষ্যে এগোচ্ছি। শেখ হাসিনা বলেন, আজ দেশে ১৪ কোটি সিমকার্ড ব্যবহৃত হয়। ৮ কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। আমরা বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করব। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করছি। মাত্র ১০ টাকায় কৃষক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে। কোটির ওপর কৃষক উপকরণ কার্ড পাচ্ছে। ১ কোটির ওপর কৃষক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে ভর্তুকির টাকা পাচ্ছে। যেখানে বন্যায় আক্রান্ত, সেখানে বীজ, সারসহ অনান্য উপকরণ আমরা দিচ্ছি। কৃষকের ঋণ আদায় যেন স্থগিত থাকে তার ব্যবস্থা করছি। সিলেটের চা উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ব্যবস্থা করছি। চা-শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন, তাদের সন্তানদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সিলেট থেকে যাতে চায়ের নিলাম হয়, তার জন্য নিলাম কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। দেশের প্রত্যেক এলাকায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল করছি। সিলেটে শ্রীহট্ট অর্থনৈতিক অঞ্চল করছি। ঘরে বসে প্রবাসে থাকা স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার প্রযুক্তিগত সুযোগ আমরা দিয়েছি। ৮ হাজার ৫০০ পোস্ট অফিসকে আমরা ডিজিটাল সেন্টারে রূপান্তর করেছি। ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে বিনা পয়সায় স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছি, ওষুধ দিচ্ছি। সিলেটে আমরা একটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় করে দিচ্ছি। তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য, গ্রামের জনগণের উন্নতি। সে লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন দেশের প্রতিটি মানুষ পেট ভরে খাবার খাবে। একটি মানুষও গৃহহারা থাকবে না। আমরা জাতির জনকের স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করছি। আজ আমরা বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভাতার ব্যবস্থা করেছি। যারা হতদরিদ্র, শ্রমিক শ্রেণি, সেসব মায়ের জন্য মাতৃত্বকালীন সময়ের জন্য ভাতা দিচ্ছি। ছেলেমেয়েরা যেন উচ্চশিক্ষা নিতে পারে, সেজন্য প্রাইমারি থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বৃত্তি দিচ্ছি। দেশকে উন্নত করতে হলে, জাতিকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে হলে জাতিকে শিক্ষিত করে তুলতে হবে। তিনি বলেন, প্রবাসীদের টাকায় আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পায়। প্রবাসীদের জন্য ৩টি ব্যাংক স্থাপনের অনুমতি হয়ে গেছে। আমরা চাই, দেশ এগিয়ে যাবে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে দেশের সুনাম হয়। দেশ পুরস্কার পায়। বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস হয়ে যায় তাদের মূল কাজ। এ দেশকে উন্নয়নের জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না আসলে দেশে এত উন্নয়ন হতো না। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে দেশের উন্নয়ন হয় না। নৌকায় ভোট দিয়ে মানুষ স্বাধীনতা পেয়েছে। নৌকায় ভোট দিয়ে দেশ বিশ্বে উন্নয়নের রোলমডেল হয়েছে। আমরা কথা দিয়েছিলাম, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করব। তা করেছি। জাতির জনকের খুনিদের বিচার করেছি। বাংলার মাটিতে জঙ্গিবাদের স্থান হবে না। প্রত্যেক মা, বোন, শিক্ষক, সচেতন নাগরিক, সকল অভিভাবক সবাইকে নিজেদের ছেলে-মেয়েদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। তারা কোথায় যায়, কার সাথে মিশে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী বেশিদিন অনুপস্থিত কি না, তা খেয়াল রাখতে হবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। ইসলাম জঙ্গিবাদ সমর্থন করে না। শেখ হাসিনা আরও বলেন, সিলেট আজ শান্তির নগরী। এই শান্তি যেন বজায় থাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে একসঙ্গে মিলে কাজ করতে হবে, যাতে সিলেটের সকল পাড়া-মহল্লায় শান্তি বজায় থাকে। আমরা বীরের জাতি, বিজয়ী জাতি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এ দেশকে আমরা উন্নত করে গড়ে তুলব। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে মধ্যম আয়ের দেশ। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত সমৃদ্ধ জাতিতে পরিণত করব। প্রধানমন্ত্রী বলেন, খাদ্যের জন্য বাংলাদেশকে কারও কাছে ভিক্ষা চাইতে হবে না। আমরা দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করেছি। আপনারা শুনলে অবাক হবেন, বিএনপির খালেদা জিয়া, তাদের অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান বলেছিলেন, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়া ভালো না। তাতে বিদেশি সাহায্য পাওয়া যাবে না। কিন্তু আমরা ভিক্ষা করতে চাই না। যারা নিজেদের ভিক্ষুক হিসেবে অন্যের কাছে পরিচিত করতে চায়, তারা কীভাবে দেশের উন্নয়ন করবে। বাংলাদেশের মানুষ বিশ্ব দরবারে সম্মানের সাথে এগিয়ে যাবে, এটাই আমাদের লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রী নিজের বক্তব্যে প্রয়াতমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদ, শাহ এএমএস কিবরিয়া, হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী, দেওয়ান ফরিদ গাজীসহ প্রয়াত জাতীয় নেতাদের স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। জনসভায় বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি, ডা. দীপু মনি এমপি, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সদস্য ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদর উদ্দিন আহমদ কামরান, আবদুর রহমান এমপি, যুবলীগ সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক আতিক প্রমুখ। জনসভায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচটি ইমাম, তৌফিক-ই-এলাহী, আওয়ামী লীগ সভাপতিম-লীর সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ এমপি, সংসদ সদস্য শেখ হেলাল এমপি, সংসদ সদস্য উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আহমেদ, বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, উপ-দফতর সম্পাদক বিপ্লব বড়–য়া, কেন্দ্রীয় সদস্য গোলাম কবির রব্বানী চিনু, আনোয়ার হোসেন, ইকবাল হোসেন অপু, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
সর্বশেষ ২০১৬ সালের ২১ জানুয়ারি সিলেটে জনসভায় বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তবে, একই বছরের ২৩ নভেম্বর তিনি সিলেটে সেনাবাহিনীর ১৭-পদাতিক ডিভিশনের পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। ঐ দিন জনসভায় বক্তব্য দেওয়ার কথা থাকলেও জেলা পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার কারণে তা স্থগিত করা হয়েছিল।

Category:

জাতির উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ

আসুন, দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধভাবে আগামী প্রজন্মের জন্য সুখী-সমৃদ্ধ উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তুলি

12উত্তরণ ডেস্ক:

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

প্রিয় দেশবাসী,
আসসালামু আলাইকুম।
২০১৪ সালে আপনাদের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আজকের এই দিনে আমি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছিলাম। আজ বছরপূর্তিতে আপনাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে হাজির হয়েছি। আমার ওপর যে বিশ্বাস ও আস্থা রেখেছিলেন, আমি প্রাণপণ চেষ্টা করেছি আপনাদের মর্যাদা রক্ষা করার। কতটুকু সফল বা ব্যর্থ হয়েছি সে বিচার আপনারাই করবেন।
আমি শুধু এটুকু বলতে চাই, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই দেশ স্বাধীন করেছেন একটি আদর্শ ও চেতনা ধারণ করে। বাংলাদেশের মানুষকে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অশিক্ষার হাত থেকে মুক্ত করে একটি সুন্দর জীবন নিশ্চিত করার প্রত্যয় নিয়ে স্বাধীনতার সংগ্রাম করেছিলেন। ২৪ বছরের সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ তিনি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন।
তার সেই আকাক্সক্ষা পূরণ করাই আমার একমাত্র ব্রত। “বাংলার মানুষ যেন অন্ন পায়, বস্ত্র পায়, উন্নত জীবনের অধিকারী হয়”Ñ জাতির পিতার এই উক্তি সর্বদা আমার হৃদয়ে অনুরণিত হয়। তাই সর্বদা আমার একটাই প্রচেষ্টাÑ কীভাবে বাংলাদেশের মানুষের জীবনকে অর্থবহ করব, স্বচ্ছল ও সুন্দর করে গড়ে তুলব।
আমি আজকের দিনে শ্রদ্ধা জানাই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি। শ্রদ্ধা জানাই জাতীয় চার নেতার প্রতি; ৩০ লাখ শহিদ ও দুই লাখ নির্যাতিত মা-বোনের প্রতি। মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সহযোগিতাকারীদের প্রতি জানাই আমার সালাম।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট বাঙালি জাতির জন্য একটি কলঙ্কময় দিন। মাত্র সাড়ে তিন বছর জাতির পিতা সময় পেয়েছিলেন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ে তোলার জন্য। একটা প্রদেশকে রাষ্ট্রে উন্নীত করে যুদ্ধবিধ্বস্ত-ধ্বংসপ্রাপ্ত দেশটিকে যখন গড়ে তুলছিলেন এবং আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিচ্ছিলেন, তখনই চরম আঘাত এলো।
ঘাতকের নির্মম বুলেটের আঘাতে আমি ও রেহানা হারালাম প্রাণপ্রিয় মা, বাবা, তিন ভাই, ভ্রাতৃবধূদের এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনসহ ১৮ জন সদস্যকে।
বিদেশের মাটিতে ছিলাম বলে দুই বোন বেঁচে যাই; কিন্তু দেশে ফিরতে পারিনি আমরা। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী শাসক আমাদের দেশে আসতে দেয়নি। সর্বহারা নিঃস্ব রিক্ত হয়ে স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে ৬টি বছর বিদেশে কাটাতে হয়েছিল।
১৯৮১ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যখন আমাকে দলের সভাপতি নির্বাচিত করে, তখন সকল বাধা অতিক্রম করে প্রিয় দেশবাসী আপনাদের সমর্থনে আমি দেশে ফিরতে সক্ষম হই। রিফিউজি হিসেবে আমাদের অমানবিক জীবনের অবসান ঘটে।
দেশে ফিরে একদিকে যেমন দলকে সংগঠিত করার কাজে মনোনিবেশ করি, অপরদিকে দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণের ক্ষমতা ক্যান্টনমেন্ট থেকে উদ্ধার করে জনগণের হাতে ফিরিয়ে দিতে চেষ্টা চালাই।
চারণের বেশে সমগ্র বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জে ঘুরে বেড়িয়েছি। আপনাদের জীবনমান উন্নয়নে কী কী কাজ করতে হবে তারও পরিকল্পনা তৈরি করি।
স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে যখন আপনাদের কাছে গিয়েছি, পেয়েছি অপার স্নেহ, ভালোবাসা, পেয়েছি আত্মবিশ্বাস। অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে, বন্ধুর পথ অতিক্রম করে ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আমরা সরকার গঠন করে দেশবাসীর সেবা করার সুযোগ পাই।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্টের পর এই প্রথম আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের সুযোগ পেল। বাংলাদেশের মানুষ সরকারি সেবা পেল। আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নসহ ব্যাপক উন্নতির পথে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ। অপার সম্ভাবনা দৃশ্যমান হতে থাকল। বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, প্রতিবন্ধীদের সেবাসহ বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন জনজীবনে আস্থা সৃষ্টি করেছিল।
কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনে গভীর চক্রান্ত করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আসতে দেওয়া হলো না। এরপর দেশবাসী দেখেছেন রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন; অর্থ লুটপাট, হাওয়া ভবনের দৌরাত্ম্য। জঙ্গিবাদ সৃষ্টি, বাংলাভাইয়ের উত্থান, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দুইজন সংসদ সদস্যসহ হাজার হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা, সংখ্যালঘুদের নির্যাতন ও হত্যা, জমি, ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল, চাঁদাবাজি, মানি লন্ডারিং, দুর্নীতি। ৬৩ জেলায় একসঙ্গে ৫০০ জায়গায় বোমা হামলা হয়।
২০০৪ সালে ২১শে আগস্ট আওয়ামী লীগের র‌্যালিতে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা করে ২২ নেতাকর্মী হত্যা, ব্রিটিশ হাইকমিশনারের ওপর গ্রেনেড হামলা, দেশব্যাপী নারীদের ওপর পাশবিক অত্যাচারÑ সমগ্র দেশ যেন জ্বলন্ত অগ্নিকু-ে পরিণত হয়েছিল। দেশবাসী প্রতিনিয়ত সে যন্ত্রণায় দাহ হচ্ছিলেন।
এমনি পরিস্থিতিতে জারি করা হলো জরুরি অবস্থা। সাত বছর দুঃসহ যাতনা ভোগ করার পর ২০০৮ সালের নির্বাচনে দেশবাসী আপনারা নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আপনাদের সেবা করার সুযোগ দিলেন। আমরা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি জনগণের সার্বিক উন্নয়নের জন্য।
২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপি-জামাত জোট সারাদেশে নির্মম সন্ত্রাসী কর্মকা- চালিয়েছিল। নির্বাচনের দিন ৫৮২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দেয়। হত্যা করে প্রিসাইডিং অফিসারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের।
২০১৩ থেকে ২০১৫Ñ এই তিন বছরে বিএনপি-জামাত সন্ত্রাসীদের হাতে প্রায় ৫০০ নিরীহ মানুষ নিহত এবং কয়েক হাজার মানুষ আহত হন। প্রায় সাড়ে ৩ হাজার গাড়ি, ২৯টি রেলগাড়ি ও ৯টি লঞ্চ পোড়ানো হয়। ৭০টি সরকারি অফিস ও স্থাপনা ভাঙচুর এবং ৬টি ভূমি অফিসে আগুন দেওয়া হয়। মসজিদে আগুন দিয়ে পোড়ানো হয় পবিত্র কোরআন শরিফ। তাদের জিঘাংসার হাত থেকে রেহাই পায়নি রাস্তার গাছ এবং নিরীহ গবাদিপশু।
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট থেকে ১৯৯৬ সালের ২৩শে জুন পর্যন্ত ২১ বছর এবং ২০০১ সালের ১লা অক্টোবর থেকে ২০০৯ সালের ৬ই জানুয়ারি পর্যন্ত সাত বছরÑ এই ২৮ বছর বাংলাদেশের জনগণ বঞ্চিত থেকেছে। যারা ক্ষমতা দখল করেছে তারা নিজেদের আখের গোছাতেই ব্যস্ত ছিল। জনগণের কল্যাণে তারা কোনো ভূমিকা রাখেনি। বরং আমরা জনকল্যাণে যেসব কাজ হাতে নিয়েছিলাম তারা তা বন্ধ করে দেয়।
২০০৯ সালে সরকার গঠন করে আশু করণীয়, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি, গ্রহণ করেছি দশ বছর মেয়াদি প্রেক্ষিত পরিকল্পনা।

প্রিয় দেশবাসী,
আমরা দিনবদলের সনদ ঘোষণা দিয়েছি। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলছি। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আপনাদের জীবনমান সহজ করা এবং উন্নত করার উদ্যোগ নিয়েছি। আপনারা আজ সেসব সেবা পাচ্ছেন।
দেশে ১৩ কোটি মোবাইল সিম ব্যবহৃত হচ্ছে। ইন্টারনেট সার্ভিস প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। ৮ কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করছেন। দ্বিতীয় সাবমেরিন কেবল স্থাপন করে ব্যান্ডওয়াইথ বৃদ্ধি করা হয়েছে। গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত ব্রডব্যান্ড সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
প্রতিটি ইউনিয়নে ডিজিটাল সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। সেখান থেকে জনগণ ২০০ ধরনের সেবা পাচ্ছেন। সকল ধরনের সরকারি ফরমস, জমির পর্চা, পাবলিক পরীক্ষার ফল, পাসপোর্ট-ভিসা সম্পর্কিত তথ্য, কৃষিতথ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আইনগত ও চাকরির তথ্য, নাগরিকত্ব সনদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির প্রক্রিয়া, ক্রয়-বিক্রয়সহ বিভিন্ন বিল প্রদানের সুবিধা জনগণ পাচ্ছেন। ঘরে বসে আউটসোর্সিং-এর কাজ করে অনেক তরুণ-তরুণী স্বাবলম্বী হয়েছে। বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে প্রবাসীরা আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন।

প্রিয় দেশবাসী,
২০১৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পেরেছি বলেই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পেরেছি। ৯ বছর একটানা জনসেবার সুযোগ পেয়েছি বলেই বাংলাদেশ উন্নত হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী মন্দা থাকা সত্ত্বেও আমাদের দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছি। জনগণ এর সুফল ভোগ করছেন।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে নি¤œ মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা পেয়েছে। মাথাপিছু আয় ২০০৫ সালের ৫৪৩ ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৬১০ ডলারে উন্নীত হয়েছে। দারিদ্র্যের হার ২০০৫-০৬ অর্থবছরে ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২২ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে।
২০০৫-০৬ অর্থবছরে জিডিপি’র আকার ছিল ৪ লাখ ৮২ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা ১৯ লাখ ৭৫ হাজার ৮১৭ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত জিডিপি প্রবৃদ্ধির গড় হার ছিল ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৭ দশমিক ২-৮ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
১৯৯১-৯৬ সময়ে বিএনপি আমলে মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ শতাংশ। ২০০১-এ আওয়ামী লীগ যখন দায়িত্ব ছাড়ে তখন মূল্যস্ফীতি ছিল মাত্র ১ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বিএনপির সময় মূল্যস্ফীতি আবার ৭ দশমিক ১-৬ শতাংশে পৌঁছে। ২০০৮-০৯ বছরে মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ১২ দশমিক ৩ শতাংশে। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৮-৪ শতাংশে নেমে আসে।
২০০৫-০৬ অর্থবছরে বৈদেশিক বিনিয়োগ ছিল শূন্য দশমিক ৭৪৪ বিলিয়ন ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বৈদেশিক বিনিয়োগ হয়েছে প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
২০০৫-০৬ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ৬১ হাজার ৫৭ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে বাজেটের আকার প্রায় ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা। সে সময় এডিপির আকার ছিল ১৯ হাজার কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এডিপির আকার ১ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকায় বৃদ্ধি পেয়েছে।
২০০৫-০৬ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিল ১০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা ৩৪ দশমিক ৮-৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ ছিল ৩ দশমিক ৪-৮ বিলিয়ন ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা ৩৩ দশমিক ৪-৪ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
২০০৫ সালে ২ লাখ ৭০ হাজার মানুষের বিদেশে কর্মসংস্থান হয়। ২০১৭ সালে বিদেশে কর্মসংস্থান হয়েছে ১০ লাখ ৮ হাজার ১৩০ জনের। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ২০০৫-০৬ বছরে ছিল ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছে ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বিগত ৯ বছরে ২৬ হাজার ১৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়েছে। ১ হাজার ৪৫৮টি গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছি আমরা। ৩৬৫টি কলেজ সরকারিকরণ করা হয়েছে। ৫০ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করেছি।
বছরের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে ৩৫ কোটি ৪২ লাখ ৯০ হাজার ১৬২টি বই বিতরণ করা হয়েছে। সাক্ষরতার হার ৭২ দশমিক ৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা গ্রাম পর্যায়ে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সারাদেশে সাড়ে ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করেছি।
৩০ প্রকার ঔষধ বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতাল থেকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা চালু করা হয়েছে।
১১৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১৬ হাজার ৩৫০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। শতকরা ৮৩ ভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধা পাচ্ছেন। ২০২১ সালের মধ্যে ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে শতভাগ মানুষকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনা হবে।
আমরা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছি। খাদ্য উৎপাদন ৪ কোটি মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে বিশ্বে আমাদের অবস্থান চতুর্থ। মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৭২ বছর।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও রায় কার্যকর করা হয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের বিচারের রায় কার্যকর হয়েছে। বিডিআর হত্যার বিচার হয়েছে। আমরা সফলতার সঙ্গে জঙ্গিবাদ দমন করেছি। জনসচেতনতা সৃষ্টি করে এ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছে। তাদের আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।
সরকারি কর্মচারিদের বেতনভাতা ১২৩ ভাগ পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছি। শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে। সারাদেশে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে কেউ বেকার এবং দরিদ্র থাকবে না।
বাংলাদেশকে আমরা উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। এজন্য আমরা বেশ কয়েকটি মেগা উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করে তা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। পদ্মাসেতুর কাজ অর্ধেকের বেশি সম্পন্ন হয়েছে। ঢাকায় মেট্টোরেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। সমগ্র বাংলাদেশকে রেল সংযোগের আওতায় আনা হচ্ছে।
চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ করা হচ্ছে। ঈশ্বরদীর রূপপুরে দেশের প্রথম পরমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ চলছে। খুব শিগগিরই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হবে। পটুয়াখালীতে পায়রা বন্দর নির্মাণ করা হচ্ছে। কক্সবাজারের মাতারবাড়ি এবং রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলছে।
গ্রিডবিহীন এলাকায় ৪৫ লাখ সোলার হোম সিস্টেম স্থাপন করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। সৌরবিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালনের কাজ শুরু হয়েছে।
গ্যাসের সমস্যা দূর করতে এলএনজি আমদানি শুরু হচ্ছে। রান্নার জন্য দেশে এলপিজি গ্যাস উৎপাদনের কাজ শুরু হয়েছে।
আমরা সারাদেশে সড়ক, মহাসড়ক, সেতু, কালভার্ট নির্মাণসহ যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেছি। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার-লেনে উন্নীত করা হয়েছে। চন্দ্রা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক চার-লেনে উন্নয়নের কাজ চলছে।
বিনিয়োগ বৃদ্ধির ফলে সারাদেশে ব্যাপকহারে ক্ষুদ্র, মাঝারি ও ভারী শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে। আমরা বেশ কয়েকটি বন্ধ কারখানা চালু করেছি। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্র বিরোধ নিষ্পত্তির ফলে সমুদ্রসম্পদ আহরণ, গবেষণা ও উন্নয়নে ব্লু ইকোনামি কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে।
সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা বহুমুখী কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। হতদরিদ্র ৩৫ লাখ মানুষকে বয়স্ক ভাতা দেওয়া হচ্ছে। বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা, দুস্থ নারী ভাতা উপকারভোগীর সংখ্যা ১২ লাখ ৬৫ হাজার। ৮ লাখ ২৫ হাজার জন প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। ৮০ হাজার প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী শিক্ষা ভাতা পাচ্ছে।
সারাদেশে ২ কোটি ২৮ লাখ ১৩ হাজার ৪৭৭ জন কৃষকের মধ্যে কৃষি উপকরণ কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। প্রায় ৯৮ লাখ কৃষক ১০ টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে ভর্ভুকির টাকা পাচ্ছেন। প্রাইমারি থেকে মাস্টারস ডিগ্রি ও পিএইচডি পর্যন্ত ২ কোটি ৩ লাখ শিক্ষার্থী বৃত্তি ও উপবৃত্তি পাচ্ছে। ১ কোটি ৩০ লাখ প্রাইমারি শিক্ষার্থীর মায়ের কাছে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বৃত্তির টাকা পৌঁছে যাচ্ছে। শিক্ষা খাতে মোট উপকারভোগীর সংখ্যা প্রায় ৪ কোটি ৩৭ লাখ ৭ হাজার।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আমরা বিভিন্ন কার্যক্রম ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে দেশকে রক্ষার জন্য বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। জাতির পিতার ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ বিশ্ব প্রামাণ্য দলিলে স্থান পাওয়ায় বাংলাদেশ সম্মানিত হয়েছে বিশ্বসভায়।
সারাবিশ্ব আজ বাংলাদেশকে সম্মানের চোখে দেখে। যে বাংলাদেশকে একসময় করুণার চোখে দেখত, সাহায্যের জন্য হাত বাড়ানোয় করুণার পাত্র মনে করত; আজ সে বাংলাদেশ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বিশ্বসভায় সম্মানিত।
আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রণীত প্রতিরক্ষা নীতিমালা ১৯৭৪-এর আলোকে ফোর্সেস গোল ২০৩০ প্রণয়ন করে বাস্তবায়ন করছি। পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, আনসার-ভিডিপি এবং ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স-এর উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রশংসা অর্জন করেছে। নারীর ক্ষমতায়ন ও লিঙ্গ বৈষম্য নিরসনে আমাদের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে। বাংলাদেশ জেন্ডার সংশ্লিষ্ট এমডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বিশ্বে পঞ্চম স্থান অর্জন করেছে।
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবে সাফল্য অর্জন করে চলেছে। অতি সম্প্রতি আমাদের মেয়েরা অনূর্ধ্ব-১৫ সাফ ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এর আগে আমাদের মেয়েরা এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ ফুটবলে আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। বিশ্বকাপ ক্রিকেটে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশ সফলতা দেখিয়ে যাচ্ছে। “সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়”Ñ জাতির পিতার এই আপ্তবাক্য আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল প্রতিপাদ্য। এই নীতি অনুসরণ করে আজ প্রতিবেশী দেশগুলিসহ সকলের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।
অত্যাচার এবং নির্যাতনের মুখে মিয়ানমার থেকে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে এসেছে। মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আমরা আশ্রয় দিয়েছি। তাদের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে রিলিফ বিতরণ করা হচ্ছে এবং চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে।

প্রিয় দেশবাসী,
সংবিধান অনুযায়ী ২০১৮ সালের শেষ দিকে একাদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কীভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে তা আমাদের সংবিধানে স্পষ্টভাবে বলা আছে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের আগে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে। সেই সরকার সর্বোতভাবে নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন পরিচালনায় সহায়তা দিয়ে যাবে।
মহামান্য রাষ্ট্রপতি অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করেছেন। এই কমিশন ইতোমধ্যে দুটি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনসহ স্থানীয় পর্যায়ের বেশ কিছু নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করেছে। আমি আশা করি, নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত সকল দল আগামী সাধারণ নির্বাচনে অংশ নিবেন এবং দেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে সমুন্নত রাখতে সহায়তা করবেন। কোনো কোনো মহল আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির অপচেষ্টা করতে পারে। আপনাদের এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। জনগণ অশান্তি চান না। নির্বাচন বয়কট করে আন্দোলনের নামে জনগণের জানমালের ক্ষতি করবেনÑ এটা আর এ দেশের জনগণ মেনে নিবেন না।

প্রিয় দেশবাসী,
আপনারাই সকল ক্ষমতার মালিক। কাজেই লক্ষ্য আপনাদেরই ঠিক করতে হবেÑ আপনারা কী চান! আপনারা কি দেশকে সামনে এগিয়ে যাওয়া দেখতে চান, না বাংলাদেশ আবার পিছনের দিকে চলুক তাই দেখতে চান। একবার ভাবুন তো মাত্র ১০ বছর আগে দেশের অবস্থানটা কোথায় ছিল?
আপনারা কি চান না আপনার সন্তান সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে স্বাবলম্বী হোক? আপনারা কি চান না প্রতিটি ঘরে বিদ্যুতের আলো পৌঁছে যাক! আপনারা কি চান না প্রতিটি গ্রামের রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হোক! মানুষ দুবেলা পেট পুরে খেতে পাক! শান্তিতে জীবনযাপন করুক!

প্রিয় দেশবাসী,
স্বাধীনতার ৪৭ বছর অতিক্রান্ত হতে চলেছে। আমরা আর দরিদ্র হিসেবে পরিচিত হতে চাই না। আমরা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে মর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বাঁচতে চাই। এসব যদি আপনাদের চাওয়া হয়, তাহলে আমরা সব সময়ই আপনাদের পাশে আছি।
কারণ, আমরাই লক্ষ্য স্থির করেছি যে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে প্রতিষ্ঠিত করব। শুধু লক্ষ্য স্থির করেই কিন্তু আমরা বসে নেই। সেই লক্ষ্য পূরণের জন্য আমরা প্রয়োজনীয় কর্মসূচি প্রণয়ন করে সেগুলো বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি।
আমরা অতীতকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চাই না; তবে অতীতকে ভুলেও যাব না। অতীতের সফলতা-ব্যর্থতার মূল্যায়ন করে, ভুল-ত্রুটি শুধরে নিয়ে আমরা সামনে এগিয়ে যাব।
আমরা উন্নয়নের যে মহাসড়কে যাত্রা শুরু করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি, সেখান থেকে আর পিছনে ফিরে তাকানোর সুযোগ নেই। বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সমৃদ্ধি ও প্রগতির পথে সকল বাধা দূর করার দায়িত্ব গ্রহণ করবে।
আসুন, দলমত নির্বিশেষে সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি উন্নত, সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলি।
বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। আগামী প্রজন্ম পাবে সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ। বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা যেন ব্যাহত না হয়, এ বিষয়ে সচেতন হয়ে দেশবাসীকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবার আহ্বান জানাচ্ছি।
আমরা বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে চলব। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলব। ইনশাআল্লাহ।
সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। মহান রাব্বুল আল-আমিন আমাদের সকলের সহায় হোন।

খোদা হাফেজ।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু
বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।
১২ জানুয়ারি ২০১৮

Category:

তাঁর বিকল্প তিনিই

মুহম্মদ শফিকুর রহমান:

17প্রাককথন
একটা প্রাককথন দিয়ে শুরু করলাম যদিও খুব সাধারণ। ধারণা আছে নির্বাচন হলেই সরকার পরিবর্তন হয়। হয় সত্যি, তবে সব সময় ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতাহীন বা ক্ষমতাহীনরা ক্ষমতাসীন হয় না। দেশরতœ শেখ হাসিনার পরিবর্তে এক্স-ওয়াই-জেড প্রধানমন্ত্রী হবেন বা ক্ষমতার টেবিলে অন্য কেউ বসবেন তা কিন্তু নয়। নির্বাচনে জিততে পারলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন জোটই আবার সরকার গঠন করবেন, নতুন করে শপথ নেবেন। কেউ কেউ মনে করেন আগামী নির্বাচনে শেখ হাসিনা আর প্রধানমন্ত্রী থাকছেন না, অন্য কেউ প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। যারা এটা ভাবেন ভাবতে পারেন। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিন্তু অন্যরকম। শেখ হাসিনাই প্রধানমন্ত্রী হবেন, নতুন করে শপথ নেবেন, তার মন্ত্রিসভা নতুন করে শপথ নেবে এটা সরকার পরিবর্তন। এ পরিবর্তনটাই হতে যাচ্ছে আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে। ‘বঙ্গবন্ধু-কন্যা’ চর্তুথবারের জন্য শপথ নিতে যাচ্ছেন এটাই হচ্ছে বাস্তবতা। পাবলিক পারসেপশন।

নির্বাচন ২০১৮
নির্বাচন হতেই হবে এটা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। এবং নির্বাচনটি হবে বর্তমান পার্লামেন্টের মেয়াদ শেষের আগের ৯০ দিনের মধ্যে। সেদিক থেকে নির্বাচনটি হবে ২০১৮-এর ডিসেম্বরে। সেই লক্ষ্য নিয়ে এরই মধ্যে প্রস্তুতিও চলছে দল এবং জোটগুলোর মধ্যে। নমিনেশন প্রত্যাশীরা স্ব-স্ব দলের কেন্দ্রীয় নমিনেশন বোর্ডের অনুগ্রহ অর্জন প্রচেষ্টায় তৎপর। বিশেষ করে দলীয় প্রধানের। এদিকে প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা এরই মধ্যে দলীয় নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছেন। অন্যান্যবারের মতো এবারও হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর পুণ্যভূমি সিলেট থেকে। খালেদা জিয়াও নামছেন। আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ মামলায় রায় হবে বলে আদালত ঘোষণা করেছেন। খালেদা জিয়া এবং তার দলবল সেই দুশ্চিন্তায় কাতর। কী হবে রায়? তার কি সাজা হবে? না-কি খালাস পাবেন! কোনটা? এখনও তিন দিন বাকি রায় হতে। তবে হ্যাঁ, কিছু সুশীল বাবু আছেন যাদের মনোজগতে এখনও চাঁদ-তারা পতাকা। তারা যা বলছেন তা হলো সরকার ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারির মতো খালেদা জিয়াকে নির্বাচন থেকে বাইরে রেখে খালি মাঠে গোল দিতে চাইছেন। ভাবখানা এমন ‘চোরকে চোর বলিও না, মনে কষ্ট পাইবে’। তিনি তিনবারের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তার একটা মান-মর্যাদা আছে না? অবশ্যই আছে। তবে ছেলে যখন হাওয়া ভবন বানিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে টাকার পাহাড় বানাচ্ছিলেন, বিদেশে পাচার করছিলেন, পাচার না করলে সিঙ্গাপুর থেকে ২০ কোটি টাকা ফেরত এলো কীভাবে? এমনি এমনি তো আর সিঙ্গাপুর টাকাটা বাংলাদেশকে দেয়নি, তখন মানসম্মান থাকে কোথায় ছিল। না-কি সেসব সম্পূর্ণ মিথ্যা? ২০ কোটি টাকাও কি মিথ্যে? ছোট ছেলে আরাফাত ইন্তেকাল করেছেন, দুঃখের কথা; কিন্তু পুত্রবধূ সন্তানদের নিয়ে কীভাবে মালয়েশিয়ার মতো দেশে বসবাস করছেন, সন্তানদের পড়ালেখার খরচই বা জোগান দেন কোন গৌরীসেন, এ প্রশ্ন বাজারে আছে। বাজারে একটা কথা চাউর আছে তারেক রহমান নিয়মিত ক্যাসিনোতে যান, জুয়া খেলেন এবং জুয়ার টাকা দিয়ে স্ত্রী-কন্যা নিয়ে লন্ডনের মতো শহরের পশ এলাকায় বসবাস করছেন, একাধিক দামি গাড়ি ব্যবহার করছেন। ছেলেটি কি তবে জুয়ার ভাগ্য নিয়ে জন্মেছেন যে একদিনও কি হারেন না? প্রত্যেক দিনই কি জেতেন। আমরা তো শুনেছি জুয়া খেলে কেউ আলটিমেট গেইন করতে পারে না। অন্তিমে দেখা যায় মূলে ঘাটতি। তাহলে ধরে নেওয়া যায় খালেদা জিয়ার সাজা হোক বা না হোক তারেক পরিবার লন্ডনে কিংবা কোকোর পরিবার কুয়ালালামপুরে আয়েশী জীবন কাটাতে কোনো বেগ পেতে হবে না। অতএব পিছুটান নেই। তবে যদি ওভারঅল ইনভেস্টিগেশনে নামে দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক, তাহলে দুশ্চিন্তার কারণ অবশ্যই আছে। তখন খালেদা জিয়ার নির্বাচন-ভাবনা যন্ত্রণায় রূপ নেবে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অংশ না নিয়ে যে ভুল করেছেন, পাঁচ বছর ধরে ভুলের খেসারত দিচ্ছেন, সেসবের পুনরাবৃত্তিও হতে পারে। সে সময় কত কিছুই তো দেখা গেছেÑ

বিএনপির নির্বাচন
নির্বাচন এলে বিএনপি অংশ নেয় না, গণতন্ত্রের কথা বলে/নির্বাচন প্রতিরোধ করতে আগুন সন্ত্রাসী রাজপথে নামায়/পেট্রলবোমা মেরে বাস-ট্রেনযাত্রী, রিকশা-ভ্যানযাত্রী হত্যা করে, কর্তব্যরত পুলিশ হত্যা করে, প্রিসাইডিং অফিসার হত্যা করে, নির্বাচন ঠেকানোর নামে শত শত প্রাথমিক বিদ্যালয় জ্বালিয়ে ছাই করে। পেট্রলবোমা মেরে গরু পুড়িয়ে ছাই করে/সংখ্যালঘুরা যাতে ভোট না দেয়, দেশতাগ করে, সে জন্য তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়/দেশ অচল করার টার্গেট নিয়ে গাছ কেটে রাস্তা কেটে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। মানুষ যাতে ভোটকেন্দ্রে না যায় ভোটদানে বিরত থাকে সে লক্ষ্যে ভয়ভীতি প্রচার প্রচারণা চালায়/শাপলা চত্বরে বিরাট সমাবেশ ঘটিয়ে গোটা মতিঝিল, বায়তুল মোকাররম, বিজয়নগর, জিরো পয়েন্ট, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাই করে। এমনকি বায়তুল মোকাররম বই মার্কেট বেশিরভাগই ধর্মীয় গ্রন্থাদি পুড়িয়ে দেওয়া হয়/স্বপ্ন ছিল বঙ্গভবন দখলের উদ্দেশ্যে রাতভর শাপলা চত্বরে রাত কাটিয়ে কাকডাকা ভোরে অভিযান শুরু করবে/‘একই মায়ের পেটের দুই সহোদর ছাত্রদল-ছাত্রশিবির’ নামিয়ে উল্লিখিত নাশকতা চালানো হয়। খালেদা জিয়া রাজপথে না নামলেও জঙ্গিগোষ্ঠী ছাত্রদল-শিবিরের ছদ্মবেশে নাশকতা চালায়/বিদেশি কূটনীতিকদের ডেকে এনেও কান্নাকাটি করে/মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জাতীয় প্রেসক্লাবে কাঁথা-বালিশ নিয়ে এসে সাধারণ সম্পাদকের (শিবির) কক্ষে আস্তানা গাড়ার চেষ্টা করে/প্রেসক্লাব চত্বরে গণতন্ত্র মঞ্চ স্থাপন করে সরকার উৎখাতের চক্রান্ত করে।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হবার পর থেকে ২০১২-১৩ এবং ২০১৪-এর ৫ জানুয়ারির নির্বাচন পরবর্তী ৯০ দিনের ঘটনাবলী, যাতে একজন প্রিসাইডিং অফিসার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ঘুমন্ত বাস-হেলপারসহ দেড় শতাধিক নাগরিককে হত্যা করা হয়। এর আগে ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে দেশরতœ শেখ হাসিনার সমাবেশে লাগাতার গ্রেনেড গুলি হামলা চালিয়ে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বকে নিশ্চিন্ন করার চক্রান্ত, যাতে শেখ হাসিনা আল্লাহর রহমতে বেঁচে গেলেও তার এক কানের শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কেন্দ্রীয় নেত্রী আইভি রহমানসহ ২৩ জন নেতাকর্মী ঘটনাস্থলে নিহত হন। কেন্দ্রীয় নেতা ঢাকার প্রথম সরাসরি নির্বাচিত মেয়র মুহম্মদ হানিফ, কেন্দ্রীয় নেতা আবদুর রাজ্জাক, শ্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত গ্রেনেডের স্পিøন্টার নিয়ে ইন্তেকাল করেন। সেদিন বঙ্গবন্ধু এভিনিউর আওয়ামী লীগ অফিস চত্বর ছিল রক্তের বন্যা। যাদের শরীর থেকে রক্ত ঝরেছিল এবং যারা এখনও বেঁচে আছেন, কী যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে আছেন সে কেবল তারাই জানেন। তখন ক্ষমতায় ছিল খালেদা জিয়া, বিচার করা তো দূরের কথা বরং পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বলেছেন, ‘শেখ হাসিনা ভ্যানিটি ব্যাগে করে গ্রেনেড নিয়ে বিস্ফোরণ ঘটনা (?) এটা হিংস্রতা।’

২০০১-এর নির্বাচন
২০০১-এর নির্বাচনে কারচুপি করে (১ কোটি ২৪ লাখ ভুয়া ভোট) নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে দেশব্যাপী অত্যাচার-নির্যাতন এমন মাত্রায় চালিয়েছিল যে, সংখ্যালঘুদের ওপর তো বটেই, নৌকায় ভোট দেওয়ায় আওয়ামী লীগ সমর্থকদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া, পুকুরের মাছ-গোয়ালের গরু-বনের গাছ-গাছালি লুট, নারী নির্যাতন, কী অত্যাচার না করেছিল। যা বর্ণনারও অতীত। চোখ তুলে ফেলা হয়েছে, হাতের কবজি কেটে ফেলা হয়েছে, কী ভয়ঙ্কর ছিল সেগুলো, যা পাকিস্তানি বর্বরতাকে মনে করিয়ে দেয়।

মানুষ রাজপথে নামে না
তারপরও বাংলার মানুষকে রাজপথে নামাতে পারেনি খালেদা জিয়া। বরং শেখ হাসিনার টার্গেট অনুযায়ী ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন হয়েছে এবং গত চার বছরের অধিককাল শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী তথা জাতি-রাষ্ট্রের নেতা হিসেবে এমন এক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা বিশ্বব্যাপী ঈষর্ণীয় রোল মডেলÑ সেদিন নির্বাচন হয়েছিল বলে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু হচ্ছে/এখন দিনের ২৪ ঘণ্টায় বড়জোর ২-৩ বারে কয়েক মিনিট লোডশেডিং হয়, সবদিন হয়ও না/দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ, রপ্তানিও হচ্ছে/মঙ্গা, দুর্ভিক্ষ, কাহাত, আকাল ইত্যাদি শব্দাবলী এখন ডিকশনারিতে উঠে গেছেÑ জীবনে নেই/জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার ৭-এর ওপরে/মাথাপিছু আয় ১৬১০ মার্কিন ডলার বা ১ লাখ ২৮ হাজার টাকা/বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার/শিক্ষার হার ৭২ শতাংশ/গড় আয়ু ৭১ বছর/মৎস্য উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ, এবার তৃতীয় হবে/আগামী মার্চ মাসে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণ। তারপরই মধ্যম আয়ের দেশ, তারপর উন্নত বাংলাদেশ/ভারতের সাথে সীমান্ত সংকট সমাধান/সমুদ্রসীমানা নির্ধারণ/রোহিঙ্গা সংকটের মানবিক ও কূটনৈতিক মোকাবিলা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত/শেখ হাসিনা এখন বিশ্বের পাঁচজন সৎ রাষ্ট্রনেতার মধ্যে তৃতীয়/শেখ হাসিনার মতো প্রধানমন্ত্রী যুগে যুগে জন্মায় না/শেখ হাসিনা বিশ্বের ১০ জন ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনেতার অন্যতম/শেখ হাসিনা বঙ্গমাতা শেখ ফজিলতুন্নিসা মুজিব, নারী শিক্ষার অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত কিংবা সর্বজন শ্রদ্ধেয় কবি বেগম সুফিয়া কামালের উত্তরসূরি হিসেবে এক এবং অদ্বিতীয়। কেবল যে মেধাবী তা নয়, এখনও রাত জেগে লেখাপড়া। আমি মাঝে মধ্যে শ্রীলংকার কলম্বো থেকে প্রকাশিত অনলাইন পত্রিকা অঝঅওঅঘ ঞজওইটঘঊ (এশিয়ান ট্রিবিউন)-এ লিখি। অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব ও লেখক গবেষক রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী আমাকে ঐ অনলাইনে লিখতে উদ্বুদ্ধ করেন। সম্ভবত, ২০০১ সালের নির্বাচনে পর বিএনপি-জামাত জোটের হত্যা, নির্যাতন, নারী ধর্ষণ, হিন্দুদের ওপর অত্যাচারের ওপর একটি কলাম লিখি এবং কলামের শিরোনাম ছিল ঐরহফঁং ধৎব ঃযব ংড়হং ড়ভ ইধহমষধফবংয ংড়রষ, এশিয়ান ট্রিবিউন এটিকে লিড আইটেম হিসেবে প্রকাশ করে। শেখ হাসিনা তখন বিরোধীদলীয় নেতা। সারাজীবন বাংলা সাংবাদিকতা (ইত্তেফাক) করেছি, এশিয়ান ট্রিবিউনে ইংরেজিতে কলাম লিখলাম, যার একটা প্রিন্ট আউট হাতে ছিল। নেত্রীর সাথে দেখা করলাম। তাকে লেখাটা দেখালাম, তিনি হেডিং দেখেই বলে দিলেন ‘ওটা তো পড়ে ফেলেছি’। শেখ হাসিনা কতখানি সিরিয়াস পাঠক! পোশাক-আশাকে কথাবার্তা আচার-আচরণে ধর্মাচারে একেবারেই বঙ্গনারী, ধার্মিক সেকুলার মুসলিম।

কে কার প্রতিপক্ষ
শেখ হাসিনা প্রতিপক্ষ দাঁড় করানোর প্রচেষ্টা বিএনপির অলীক কল্পনা ছাড়া কিছু নয়। লেখাপড়া ছাড়া ব্যবসা করা যায়, তাও আধুনিক ব্যবসা নয়। আধুনিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়তে হলে অবশ্যই আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত জ্ঞান থাকতে হবে। নইলে হাওয়া ভবন বানিয়ে লুটপাট করতে হয়। তিনিও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে অন্তত একটা হলেও মনে রাখার মতো উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারতেন। বস্তুত জ্ঞানের দীনতার কারণেই অনেক সময় অসংলগ্ন কথা বলে ফেলেন যেমন ২০০১-এর ইলেকশনের আগে বললেন : আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে বাংলাদেশ ভারত হয়ে যাবে/আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে মসজিদে আজান হবে না, উলুধ্বনি হবে/আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে মসজিদে তালা ঝুলবে/আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে টুপি মাথায় দেওয়া যাবে না।
যে কারণে তিনি বহুবার আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন, মানুষকে রাজপথে নামাতে পারেন নি, এবারও পারবেন না। হ্যাঁ, তবে একটা ব্যাপার ভালোই পারেন। এই তো ক’দিন আগে হাইকোর্টের পাশে প্রিজনভ্যান থেকে তিনজন আটক নেতাকর্মীকে ছিনিয়ে নিয়ে গেল তাদের জঙ্গি কর্মীরা। যেভাবে ২০১৩-১৪ সালে পুলিশের ওপর আক্রমণ করেছিল। এবারও দেখলাম একইভাবে ফ্লাইয়িং কিক মারতে। তবে কি তিনি জঙ্গিদের আবার মাঠে নামালেন? কিন্তু ২০১৩ আর ২০১৮ এক নয়। এ সময়ে জামাত-শিবির-জঙ্গি ও জঙ্গি সঙ্গীদের শক্তি যতখানি ক্ষয় হয়েছে, গত চার-পাঁচ বছরে প্রশাসন-আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষমতা অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
প্রশ্ন করেছিলাম, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী। তখন কি বাংলাদেশ ভারত হয়েছিল? তখন কি মসজিদে আজান হয়নি? তখন কি মসজিদে উলুধ্বনি হয়েছে? তারপরও এমন কথা বলা মুর্খ হিসেবে নিজিকে প্রতিষ্ঠিত করা নয় কি? পাকিস্তান আমলে অর্থাৎ, ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনের সময় মুসলিম লীগ ফতোয়া দিয়েছিল আওয়ামী লীগকে ভোট দিলে বিবি তালাক হয়ে যাবে। মুসলিম লীগ ভেবেছে এটি বললে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগবে এবং মুসলিম লীগ মেজরিটি পেয়ে যাবে এবং তরতর করে ক্ষমতায় চলে যাবে। কিন্তু হয়েছে উল্টোটাই, মুসলিম লীগের ভরাডুবি হয়েছে। এবার খালেদা জিয়া যা বললেন, তাতে পাগলেও হেসে কুটিকুটি হবে। বললেন Ñ জোড়াতালি দিয়ে পদ্মাসেতু নির্মাণ করা হচ্ছে, কেউ উঠবেন না, রিস্ক আছে।

সন্দেহ হয় না
তিনি জানেন না নির্মাণশৈলী হলো মেগা প্রজেক্টগুলো জোড়া দিয়েই হয়। একটা পার্টের সাথে আরেকটা পার্ট। কিন্তু তালি এলো কীভাবে? এটা হাস্যকর নয় কি? তবে পদ্মাসেতু দিয়ে চলাচল না করার তার আহ্বানের একটা পজিটিভ দিক আছে এবং তা হলো পদ্মাসেতু নির্মাণকাজ শেষ হতে হতে বিএনপি নামক দলটির মৃত্যু ঘটবে। তখন খালেদা জিয়া ‘নৌকা’য় চড়বেন এবং পদ্মা পার হবেন। সম্প্রতি তিনি আরেকটি কথা বলছেন, শেখ হাসিনা দেশের অর্থ খরচ করে দুটি সাবমেরিন কিনে এনেছেন। উদ্বোধনের পর দুটিই ডুবে গেছে। তিনি জানেনই না যে সাবমেরিন পানির নিচ দিয়ে চলে। তার ‘সন্দেহ’ হয় না। ইংরেজি পত্রিকার এক রিপোর্টারের রিপোর্ট এডিট করতে করতে নিউজ এডিটর সংশ্লিষ্ট রিপোর্টারকে বললেন, ‘তোমার যখন সন্দেহ হবে তখন ডিকশনারি কনসাল করবে।’ রিপোর্টার উত্তর দিলেন, ‘আমার সন্দেহ হয় না।’

তাঁর বিকল্প তিনিই
আগামী নির্বাচনে কে জিতবে, কে প্রধানমন্ত্রী হবেন প্রশ্ন করা হলে সুশীল সমাজের একটি অংশ যারা কখনও ক্ষমতার স্বাদ পায়নিÑ তারা বলবেন জিতবে বিএনপি, প্রধানমন্ত্রী হবেন খালেদা জিয়া। তারা দুটি রাজনৈতিক চালাকি সামনে নিয়ে এসেছেনÑ গণতন্ত্র ও সংলাপ। এ দুটিই বর্তমান বিএনপির কেন্দ্রীয় চরিত্র। বিএনপির কেউ কেউ বলেন, বর্তমান সরকার না-কি বেশি উন্নয়ন কম গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন। তারা বোঝেনই না। এতে নিজের পায়েই কুড়াল মারছেন। তারা ভাবেন বাংলার জনগণ উন্নয়নও বোঝেন না গণতন্ত্রও বোঝেন না। আজ গ্রাম, হাওরাঞ্চল বা পাহাড়Ñ একজন পশ্চাদপদ মানুষও গণতন্ত্রও বোঝেন, উন্নয়ন বোঝেন। সে যখন দেখে যাকে ভোট দিয়েছেন সে তার চাল-ডাল-তেল-লবণ-চিনির দাম স্থিতিশীল রাখছেন, সে যখন দেখে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ চলে গেছে, চাষের উপকরণ যথাসময়ে সহজে তার কাছে পৌঁছে যাচ্ছে; কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসক আছে, ওষুধের সংকট নেই, জটিল রোগ হলে পরামর্শ দেবার লোক আছেÑ তখন সে বোঝে তার গণতন্ত্র ও উন্নয়ন একটি আরেকটির পরিপূরক। আর যখন সে দেখে যারা বলেন সরকার-গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন না তখন সে তাদের মিথ্যুক বলে।
গণতন্ত্র ও সংলাপ নিয়ে যারা গলা ফাটান তাদের যদি জিজ্ঞেস করা হয় আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ কত আসন পেতে পারে? তারা বলবে বড়জোর ৩০ আসন। বিএনপি কত পাবে তা আর জানার দরকার পড়ে না। এরা কেউ সাংবাদিক কেউ শিক্ষক কেউ রিটায়ার্ড সরকারি কর্মকর্তা। বস্তুত, এদের মনোজগতে আজও ‘চাঁদ-তারা পতাকা’Ñ এই চারা গাছটি রোপণ করে গেছেন মিলিটারি জিয়া আর তাতে পানি ঢেলে বিষবৃক্ষে পরিণত করেছেন জিয়া পতœী খালেদা জিয়া। এই তথাকথিত সুশীল সমাজ বা টকশো’র বুদ্ধিজীবীরা যখন বলেন, আওয়ামী লীগ ৩০টির বেশি আসন পাবে না তখন তাদের বলার পেছনে কূটবুদ্ধি আছেÑ মানুষ যখন শুনবে আওয়ামী লীগ ৩০ আসন পারে, তখন সে ভাববে আওয়ামী লীগ তো ক্ষমতায় আসছেন না, অতএব এবার বিএনপির দিকে ঝুঁকে যাবেÑ পাগল আর কাকে বলে? বাংলাদেশের মানুষ কি দেখছে না, গত ৯ বছরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে কতখানি উচ্চতায় উঠে এসেছে এবং সম্মান-মর্যাদার দিক দিয়ে কতখানি অর্জন হয়েছে। জনগণকে বোকাভাবে বোকারাই। যিনি দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত মেধাহীন তাকে এক কাতারে দাঁড় করানো ঠিক নয়। এটাও মতলববাজি।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, জাতীয় প্রেসক্লাব

Category: