Blog Archives

এতিমদের টাকাও গিলে খেয়েছে তারা

১৯৯৩ সালের ৪ ডিসেম্বর (চেক নম্বর ৪৮৮২৪০১) টাকা তুলে বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার দাড়াইল মৌজায় ১৭টি দলিল মূলে ২ দশমিক ৭৯ একর জমি ক্রয় দেখানো হয়। যে জমি খালেদা পুত্র তারেক ও কোকোর নামে ক্রয় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

খালেদা পরিবারের লুটপাটের কাহিনি-২

খালেদা পরিবারের লুটপাটের কাহিনি-২

রায়হান কবির: বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহল; শুধু রাজনৈতিক মহলই নয়, বাংলাদেশের মানুষের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দটি বোধহয় ‘দুর্নীতি’! একদিকে এতিমের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় ঘিরে ‘দুর্নীতি’ শব্দটি উচ্চারিত হচ্ছে মানুষের মুখে মুখে। অন্যদিকে একের পর এক আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় খালেদা জিয়া ও তার পুত্রদের বিভিন্ন দেশে অর্থপাচারের খবর প্রকাশিত হওয়ায় ‘দুর্নীতি’ শব্দটির সাথে খালেদা পরিবার ও বিএনপির একেবারে মাখামাখি অবস্থা। দুর্নীতির নতুন সমার্থক হয়ে উঠেছেÑ ‘বিএনপি, খালেদা, তারেক, কোকো’।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বিএনপি নেত্রী খালেদা, তার পুত্র তারেক রহমান ও পরিবারের অর্থপাচার কেলেঙ্কারি প্রকাশিত হয়েছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে খালেদা জিয়া ও তার পুত্রদের অর্থপাচারের খবর মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। খালেদা পরিবারের বেলজিয়ামে ৭৫০ মিলিয়ন ডলার, মালয়েশিয়ায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার, দুবাইয়ে কয়েক মিলিয়ন ডলার মূল্যের বাড়ি, সৌদি আরবে মার্কেটসহ বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির খবর মিডিয়ায় এসেছে। বিশ্বের শীর্ষ দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক পরিবারের তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে খালেদা জিয়া পরিবার। নির্বাসিত বা পলাতক রাজনীতিবিদদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবৈধ সম্পদের মালিক হলেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক জিয়া। বিএনপি নেত্রীর পুত্রদের দুর্নীতি আদালতে প্রমাণিতও হয়েছে। সিঙ্গাপুরের আদালতেও খালেদা জিয়ার পুত্রদের দুর্নীতি প্রমাণিত হয়েছে। সিঙ্গাপুরের আদালতের সহায়তায় তাদের দুর্নীতির অর্থ বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তারেক রহমান জিয়াউর রহমানের বহুল প্রচারিত ভাঙা সুটকেস ও ছেঁড়া গেঞ্জি কল্পকাহিনি ছাপিয়ে দৃশ্যমান আয়-উপার্জনের বাইরে অবস্থানরত দুস্থ ব্যক্তি ও পরিবার হিসেবে রাষ্ট্র কর্তৃক প্রদত্ত বিধবা ভাতা আর সন্তানদের শিক্ষা সহায়কী এবং আবাসনের সুবিধা নিয়ে যে পরিবারের যাত্রা শুরু হয়েছিল সেই পরিবারের প্রধান বেগম খালেদা জিয়া ও তার পুত্রদের বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ ধনী হয়ে উঠলেন কীভাবে?

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে এতিমদের অর্থ আত্মসাৎ
১৯৯১-৯৬ সময়কালে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালীন সময় প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে খালেদা জিয়ার পক্ষে সোনালী ব্যাংকের রমনা শাখায় ‘প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল’ নামে একটি সঞ্চয়ী হিসাব খোলা হয়। যার চলতি হিসাব নম্বর ৫৪১৬। ওই অ্যাকাউন্টে ১৯৯১ সালের ৯ জুন এক সৌদি দাতার পাঠানো ইউনাইটেড সৌদি কমার্শিয়াল ব্যাংকের ডিডি নম্বর ১৫৩৩৬৭৯৭০ মূলে ১২ লাখ ৫৫ হাজার ইউএস ডলার, যার মূল্য তৎকালীন বৈদেশিক মুদ্রাবিনিময়ে বাংলাদেশি টাকায় ৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার ২১৬ টাকা অনুদান হিসেবে জমা হয়। ১৯৯১ সালের ৯ জুন থেকে ১৯৯৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খালেদা জিয়া সোনালী ব্যাংকের ওই অ্যাকাউন্টে জমাকৃত এই অর্থ কোনো এতিমখানায় দান করেন নি। এ সময়ের মধ্যে তারেক রহমান তার ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকো ও জিয়াউর রহমানের ভাগ্নে মমিনুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট গঠন করেন।
১৯৯৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর গুলশান সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নাম নিবন্ধন করা হয়। যার ঠিকানা হিসেবে সেনানিবাসের ৩নং শহীদ মঈনুল রোডের বাড়ির ঠিকানা ব্যবহার করা হয়। ১৯৯৩ সালের ১৩ নভেম্বর খালেদা জিয়ার পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের সোনালী ব্যাংকের রমনা শাখার তৎকালীন হিসাব নম্বর ৫৪১৬-এ জমা থাকা অনুদানের মধ্যে ২ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের একই ব্যাংকের গুলশানের নিউনর্থ সার্কেল শাখার এসটিডি হিসাব নম্বর-৭ মূলে হিসাব নম্বর ৭১০৫৪১৬৪-এ ট্রান্সফার করা হয়। ‘প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল’-এর নামে আসা অর্থ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে ট্রান্সফার করাটা ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
১৯৯৩ সালের ৪ ডিসেম্বর (চেক নম্বর ৪৮৮২৪০১) টাকা তুলে বগুড়া জেলার গাবতলী উপজেলার দাড়াইল মৌজায় ১৭টি দলিল মূলে ২ দশমিক ৭৯ একর জমি ক্রয় দেখানো হয়। যে জমি খালেদা পুত্র তারেক ও কোকোর নামে ক্রয় করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতিমের নামে আসা অর্থ দিয়ে বগুড়ায় জমি ক্রয়, তারেক-কোকোর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা, ব্যক্তি নামে খোলা এফডিআর হিসাবে অর্থ ট্রান্সফারসহ অংসখ্য অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। এমন কী এতিমের নামে আসা অর্থ খালেদা জিয়ার দুই সন্তান ও ঘনিষ্ঠজনদের অ্যাকাউন্টে ঘোরাফেরা করলেও এবং সেই অর্থ দিয়ে তারেক-কোকোর নামে জমি ক্রয় করা হলেও আশ্চার্য বিষয় হলোÑ কোথাও জিয়া এতিমখানার অস্তিত্ব আজ অবদি পাওয়া যায়নি। কিংবা এতিম শিশুদের কল্যাণে একটি কানাকড়িও ব্যয় করা হয়নি।
যার ফলে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা দায়ের করে দুদক। এতিমদের সহায়তা করার উদ্দেশে একটি বিদেশি ব্যাংক থেকে আসা ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৭১ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ এনে এই মামলা দায়ের করা হয়।

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে খালেদা জিয়ার অবৈধ লেনদেন
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে অবৈধভাবে ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, ২০০৫ সালে কাকরাইলে সুরাইয়া খানমের কাছ থেকে ‘শহীদ জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট’-এর নামে ৪২ কাঠা জমি কেনা হয়। কিন্তু জমির দামের চেয়ে অতিরিক্ত ১ কোটি ২৪ লাখ ৯৩ হাজার টাকা জমির মালিককে দেওয়া হয়েছে বলে কাগজপত্রে দেখানো হয়, যার কোনো বৈধ উৎস ট্রাস্ট দেখাতে পারেনি। জমির মালিককে দেওয়া ওই অর্থ ছাড়াও ট্রাস্টের নামে মোট ৩ কোটি ১৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা অবৈধ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
২০১১ সালের ৮ আগস্ট রাজধানীর তেজগাঁও থানায় এই মামলাটি করে দুদক। ২০১২ সালের ১৬ জানুয়ারি খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। ওই মামলার অন্য আসামিরা হলেনÑ খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, হারিছের তখনকার সহকারী একান্ত সচিব ও বিআইডব্লিউটিএ’র নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জিয়াউল ইসলাম মুন্না এবং ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার একান্ত সচিব মনিরুল ইসলাম খান।

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতি
চীনা প্রতিষ্ঠান কনসোর্টিয়াম অব চায়না ন্যাশনাল মেশিনারিজ ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনের (সিএমসি) সঙ্গে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির উৎপাদন, ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি করার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের প্রায় ১৫৮ কোটি ৭১ লাখ টাকার ক্ষতি সাধন করেন বেগম খালেদার সরকার। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়া এবং তার মন্ত্রিসভার ১০ সদস্যসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি দুর্নীতি মামলা করা হয়। ওই বছরের ৫ অক্টোবর ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করে দুদক। মামলাটির কার্যক্রম দীর্ঘদিন উচ্চ আদালতে স্থগিত থাকলেও গত বছর ২৮ মার্চ স্থগিতাদেশ তুলে নেন উচ্চ আদালত। তবে এই মামলাটির অভিযোগ গঠন হয়নি এখনও। একাধিকবার পিছিয়েছে অভিযোগ গঠনের শুনানি।

গ্যাটকো দুর্নীতি
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর দুদকের উপ-পরিচালক গোলাম শাহরিয়ার চৌধুরী গ্যাটকো দুর্নীতি মামলাটি করেন। এতে খালেদা জিয়া, তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোসহ ১৩ জনকে মামলার এজাহারে আসামি করা হয়। মামলা হওয়ার পরদিনই খালেদা ও কোকোকে গ্রেফতার করা হয়। ১৮ সেপ্টেম্বর মামলাটি অন্তর্ভুক্ত করা হয় জরুরি ক্ষমতা আইনে। পরের বছর ১৩ মে খালেদা জিয়াসহ ২৪ জনের বিরুদ্ধে এই মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
এতে বলা হয়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গ্যাটকোকে ঢাকার কমলাপুর আইসিডি ও চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের কাজ পাইয়ে দিয়ে রাষ্ট্রের ১৪ কোটি ৫৬ লাখ ৩৭ হাজার ৬১৬ টাকার ক্ষতি করেছেন। উচ্চ আদালতে স্থগিত থাকার পর ২০১৭ সালের ২১ আগস্ট স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে বিচারিক আদালতে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। এই মামলায় আগামী ৪ মার্চ অভিযোগ গঠনের শুনানি আছে।

নাইকো দুর্নীতি
ক্ষমতার অপব্যবহার করে ৩টি গ্যাসক্ষেত্র পরিত্যক্ত দেখিয়ে কানাডীয় কোম্পানি নাইকোর হাতে তুলে দেওয়ার মাধ্যমে আসামিরা রাষ্ট্রের প্রায় ১৩ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকার ক্ষতি করেছেন বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি-জামাত জোট সরকার। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গ্রেফতার হওয়ার পর ২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর তেজগাঁও থানায় নাইকো দুর্নীতি মামলা করে দুদক। পরের বছর ৫ মে খালেদা জিয়া ও দলের নেতা মওদুদ আহমদসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। দীর্ঘ স্থগিতাদেশ শেষে ২০১৭ সালের ২৩ মার্চ মামলাটির বিচার শুরুর আদেশ দেন উচ্চ আদালত। গত ১৫ জানুয়ারি এই মামলা থেকে খালেদা জিয়ার অব্যাহতি চেয়ে আবেদন জানানো হয়। ৪ ফেব্রুয়ারি এই আবেদনের ওপর শুনানি হয়।
খালেদা পরিবার ও হাওয়া ভবনের দুর্নীতির কয়েকটি নমুনা-
হ প্রধানমন্ত্রীর পুত্রের ‘হাওয়া ভবন’কে রাষ্ট্রক্ষমতার প্যারালাল কেন্দ্রে এবং হাওয়া ভবনকে ঘুষ পার্সেন্টেজ দেওয়াকে অঘোষিত নিয়মে পরিণত করা।
হ খালেদা জিয়ার মালয়েশিয়ায় অর্থপাচার : বাগেরহাটের বিএনপি সাংসদ এমএ সেলিমের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মেসার্স সিলভার লাইনস-এর মালয়েশিয়ায় অবস্থানকারী বাঙালি এজেন্ট বাদলুর রহমানের মাধ্যমে তারেক জিয়া ২০০৪ সালের বিভিন্ন সময়ে মালয়েশিয়ায় বিপুল অর্থপাচার করে। তারেকের ব্যবসায়িক পার্টনার গিয়াসউদ্দিন আল মামুন তাকে সহায়তা করে। পরে ঐ অর্থ মালয়েশিয়া সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়। ওই অর্থ ছাড় করানোর লক্ষ্যে বাংলাদেশের তৎকালীন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আদিলুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ায় প্রেরণ করেন। আদিলুর রহমান কুয়ালালামপুরে আইনজীবী নিয়োগ করে মামলা পরিচালনা করেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও অবৈধভাবে প্রেরিত হওয়ার কারণে ওই অর্থ মালয়েশিয়ার আদালত ছাড় করার অনুমতি দেয়নি।
হ টিএন্ডটির মোবাইল ফোন প্রকল্পে প্রধানমন্ত্রীর কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমান এবং অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের পুত্রের দুর্নীতি : উক্ত প্রকল্পের জন্য ‘একনেক’ প্রথমে ৪৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ করে। কিন্তু বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই এই বরাদ্দ প্রস্তাব দ্বিগুণ করার প্রচেষ্টা করা হয়। বিষয়টি ক্রয় সংক্রান্ত ক্যাবিনেট কমিটিতে তিনবার উত্থাপিত হলেও একনেকের অনুমোদন না থাকায় এ পর্যায়ে ব্যয় বৃদ্ধি করা হয়নি। এর কিছুদিন পর খোদ প্রধানমন্ত্রী খালেদার নিজস্ব উদ্যোগে প্রকল্পটি পুনরায় একনেক সভায় উপস্থাপন করা হলে এক লাফে প্রকল্প ব্যয় ৪৩৫ কোটি থেকে ৭০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমান ‘সিমেন্স কোম্পানির’ পক্ষে ওকালতির কারণে ওই বে-আইনি বরাদ্দ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া অনুমোদন করেন। অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের পুত্র একই প্রকল্পে চীনা কোম্পানি ঐটডঊখ-এর পক্ষে তদ্বির করেছিলেন।
হ কন্টেইনার হ্যান্ডলিং : কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার হস্তক্ষেপে তার পুত্র আরাফাত রহমানকে চট্টগ্রাম বন্দর ও কমলাপুর আইসিডি’তে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব প্রদান করা হয়।
হ সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বোন খুরশীদ জাহান হক (চকলেট)-এর পুত্র তাহসিন আকতার হক ও খালেদা জিয়ার ভাই মেজর (অব.) সাঈদ ইস্কান্দারকে ঢাকা বিমান বন্দরের কাছে সরকারি জমিতে দুটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও পেট্রল পাম্প করতে দিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। ‘মামা-ভাগিনা’ পাম্প হিসেবে পরিচিত এ দুটি পাম্পের জমি অবৈধভাবে বরাদ্দের অভিযোগ রয়েছে।
হ বিএনপি-জামাত জোট আমলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সকল গাড়ির সার্ভিস করানো হতো খালেদা জিয়ার বোন খুরশীদ জাহান হকের ছেলের তাহসিন আকতার হকের অটোস্ক্যান সার্ভিস সেন্টার থেকে।
হ তারেক রহমান ও সাঈদ ইস্কান্দারের মালিকানাধীন ‘ড্যান্ডি ডাইং’ কোম্পানির মুনাফা লুটের স্বার্থে পুলিশের পোশাক ও ব্যাজ পরিবর্তন করার অভিযোগ রয়েছে।
হ খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানের মালিকানাধীন ‘কোকো লঞ্চ’ কোম্পানির আইনকানুন ও নিয়মনীতি বিরোধী স্বেচ্ছাচারী কর্মকা-ে নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা হুমকির সম্মুখীন হয়েছিল। ২০০৩ সালের ৮ জুলাই খামখেয়ালিপনার জন্য কোনো লঞ্চের ৮০০ যাত্রীকে প্রাণ দিতে হয়। কিন্তু এজন্য কোম্পানির বিরুদ্ধে তখন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
হ অলিখিত চুক্তির মাধ্যমে তারেক রহমানের ‘খাম্বা লিমিটেড’ পল্লী বিদ্যুৎ ও পিডিবির সকল কংক্রিটের খুঁটি সরবরাহের একচেটিয়া ব্যবসা হাতিয়ে নিতেন।
হ জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে ২৫০ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ লোপাটের অভিযোগও রয়েছে।

Category:

দু’বছরে প্রত্যাবাসন : মিয়ানমার ফেরত নেবে রোহিঙ্গাদের

উত্তরণ প্রতিবেদন: বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের আগামী দুই বছরের মধ্যে ফেরত নেবে মিয়ানমার। প্রতিদিন ৩০০ রোহিঙ্গা নাগরিককে ফেরত নেবে দেশটি। গত ১৬ জানুয়ারি নেপিডোয় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সম্পন্ন হওয়া ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট চুক্তিতে (মাঠ পর্যায়ের বাস্তব ব্যবস্থা) এসব বলা হয়েছে। মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক শেষে এ চুক্তি সই হয়।
বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক এবং মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থো নিজ নিজ দেশের পক্ষে চুক্তিতে সই করেন। এর আগে ১৫ জানুয়ারি সারাদিন যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের প্রথম সভায় ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট নিয়ে আলোচনা হয়।
১৬ জানুয়ারি মিয়ানমারে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট চুক্তি চূড়ান্ত করা হয়েছে। রোহিঙ্গারা যাতে আর বাংলাদেশে আসতে না পারে সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে মিয়ানমার সম্মত হয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশে ট্রানজিট ক্যাম্প হবে ৫টি এবং মিয়ানমারে অভ্যর্থনা ক্যাম্প হবে দুটি। বাংলাদেশ থেকে নিয়ে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের লা পো থং নামক একটি জায়গায় অস্থায়ীভাবে রাখা হবে। তারপর বাড়িঘর সংস্কার করে তাদের সেখানে পাঠানো হবে।
এতে আরও বলা হয়, সহিংসতায় যেসব শিশু অনাথ হয়েছে এবং বাংলাদেশে যাদের জন্ম হয়েছে তাদেরও এই অ্যারেঞ্জমেন্টের আওতায় ফেরত পাঠানো হবে। এজন্য দুটি টেকনিক্যাল ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হবে। একটি রোহিঙ্গাদের যাচাই-বাছাইয়ের জন্য এবং অন্যটি প্রত্যাবাসনের জন্য।
দুই দেশের মধ্যে ১৬ জানুয়ারি সই হওয়া চুক্তির বিষয়ে মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সুফিউর রহমান গণমাধ্যমকে বলেছেন, আমরা একটি ভালো চুক্তি করেছি, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। আমরা বলেছি যখন থেকে প্রত্যাবাসন শুরু হবে তার দুই বছরের মধ্যে প্রেফারেবলি শেষ হবে। এটি নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে এবং মিয়ানমার এ প্রস্তাবে রাজি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা প্রস্তাব করেছিলাম প্রতিসপ্তাহে ১৫ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফেরত পাঠাব। কিন্তু তারা ওই প্রস্তাবে রাজি হয়নি। তারা নিজেরা রোহিঙ্গাদের জন্য কিছু ব্যবস্থা করেছে। ফলে প্রাথমিক অবস্থায় প্রতিদিন ৩০০ করে রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে রাজি হয়েছে মিয়ানমার। পরবর্তী তিন মাসের মধ্যে পর্যালোচনা করে এই সংখ্যা বাড়ানো হবে।
রাষ্ট্রদূত জানান, এ ব্যবস্থার অধীনে একটি পরিবারকে একটি ইউনিট হিসেবে গণ্য করা হবে অর্থাৎ একটি ফরমে পুরো পরিবারের তথ্য থাকবে এবং মিয়ানমার এটি গ্রহণ করবে। ফলে প্রক্রিয়াটি সহজ হবে। এছাড়া জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থাকে বাংলাদেশ কাজে লাগাবে এবং মিয়ানমার তাদের সময়মতো আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে।
নেপিডোতে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক। আর মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন দেশটির পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থো। বৈঠকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়। ১৫ জানুয়ারি দিনভর আলোচনার মাধ্যমে উভয় পক্ষ কোনো সমাধানে আসতে পারেনি। তবে ১৬ জানুয়ারি সকালে আবারও উভয়পক্ষের মধ্যে বৈঠক শুরু হয়। বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের প্রতিনিধি দল ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট চুক্তি সই করে।
নেপিডোর বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া ১৪ সদস্যের প্রতিনিধি দল যোগ দেয়। এই প্রতিনিধি দলে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার আব্দুল মান্নান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আবু বকর ছিদ্দীক, কক্সবাজারের ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (শরণার্থী) মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মনিরুল ইসলাম আখন্দ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিভাগের মহাপরিচালক মনজুরুল করিম খান চৌধুরী প্রমুখ রয়েছেন। এছাড়া মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সুফিউর রহমানও যোগ দেন।
রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে গত ১৯ ডিসেম্বর যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠিত হয়। যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ দুই দেশের প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর লক্ষ্যে সব ধরনের উদ্যোগ নেবে। গত ২৩ নভেম্বর নেপিডোয় উভয় দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির আলোকে এই ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠিত হয়।
রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর লক্ষ্যে ঢাকায় এক বৈঠকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয়। এই যৌথ গ্রুপ রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন শুরু করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ নেবে। দুই দেশের পররাষ্ট্র সচিবের নেতৃত্বে ১৫ জন করে সদস্য নিয়ে মোট ৩০ সদস্যের এই গ্রুপ গঠন করা হয়।
রাখাইনে নতুন করে সেনা অভিযান শুরুর পর এ পর্যন্ত সাড়ে ৬ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। মিয়ানমারে নিপীড়নের মুখে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে আরও প্রায় ৪ লাখ রোহিঙ্গা। সেনাবাহিনী অভিযান এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে শরণার্থীদের ফেরত নিতে সম্মত হয় মিয়ানমার। রোহিঙ্গাদের ঘরে ফেরার পথ তৈরি করতে গত ২৩ নভেম্বর নেপিডোয় দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

Category:

অনুষ্ঠিত হলো প্রাণের জাতীয় কবিতা উৎসব

25আনিস মোহাম্মদ: জাতিগত নিপীড়ন, দাঙ্গা-সংঘাতে তৃতীয় বিশ্বের বিধ্বস্ত জনপদের চিত্রে আঁতকে ওঠেন কবিরা, সমুদ্রে শিশুর লাশ দেখে অশ্রুসিক্ত কবিরা লিখে চলেন প্রতিবাদের পঙ্ক্তিমালা; দেশহারা নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামে একাত্ম হয়ে লিখে চলেন কবিতা।
‘দেশহারা মানুষের সংগ্রামে কবিতা’ স্লোগানে বাংলাদেশসহ ৯টি দেশের কবিদের মানবিক-মর্মন্তুদ সেই কবিতা নিয়ে গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে দুদিনব্যাপী জাতীয় কবিতা উৎসব। এবারের আসরটি কবিতা উৎসবের ৩২তম আসর।
জাতীয় কবিতা পরিষদ আয়োজিত এবারের উৎসবের আহ্বায়ক ছিলেন কবি রবিউল হুসাইন, সভাপতি কবি মুহাম্মদ ও সাধারণ সম্পাদক কবি তারিক সুজাত।
এবারের কবিতা উৎসবে সুইডেন থেকে কবি আরনে জনসন, ক্রিস্টিয়ান কার্লসন, ভিভেকা জোরেন, ইংল্যান্ড থেকে এগনেস মেডাওস, ক্যামেরুনের কবি জয়সে আওসাতাতাং, মিসরের কবি ইব্রাহীম এলমাসরি, মেক্সিকোর ইউরি জামব্রানো, জাপানের টেন্ডু তেইজিন, তাইওয়ানের মিয়াও-ওয়াইতুম, কলম্বিয়ার মারিও মেথর অংশগ্রহণ করেন।
এছাড়া ভারত থেকে বিভিন্ন ভাষার কবিরা অংশগ্রহণ করেন।
সবমিলিয়ে ৪০০ কবি এবারের উৎসবে কবিতা পাঠ করেন। কবিতা পাঠ ছাড়াও কবিতা নিয়ে বিভিন্ন সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
এবারের জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কার লাভ করেন কবি হাবীবুল্লাহ্ সিরাজী।
স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে শৃঙ্খল মুক্তির ডাক দিয়ে ১৯৮৭ সালে জাতীয় কবিতা উৎসবের শুরু। স্বৈরাচার, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, গণতন্ত্র হনন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং বর্বরতার বিরুদ্ধে এই কবিতা উৎসবে প্রতিবাদ জানান বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা কবিরা। এবারের কবিতা উৎসবে মূল প্রতিপাদ্য মিয়ানমারের জাতিগত সন্ত্রাসের শিকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী।
জাতীয় কবিতা উৎসবে দেশ ও বিদেশের শুভবাদী কবিরা দেশহারা মানুষের সংগ্রামে কবিতার অমল শক্তি নিয়ে এগিয়ে আসেন। উগ্রবাদীদের পশ্চাৎপদ অন্ধ বিশ্বাসের কাছে পরাজিত না হবার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন কবিরা, প্রকাশ করেন অন্তরের দ্রোহ।

Category:

অকৃত্রিম বন্ধু প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফর

26ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি গত ১৬ জানুয়ারি পাঁচ দিনের সফরে ঢাকা আসেন। এই সফরে তিনি পেয়েছেন সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় প্রটোকল। সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে। আওয়ামী লীগ প্রণব মুখার্জির এই সফরকে ইতিবাচকভাবে দেখছে এবং মনে করছে এর ফলে সরকার ও আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ওপরও এই সফর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ভারতের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বাংলাদেশ সফর করেছিলেন প্রণব মুখার্জি। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন শেষেও তিনি প্রথম ঢাকায় আসেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে প্রতিটি রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ তিনি ওয়াকিবহাল। প্রণব মুখার্জি নিখিল ভারত বঙ্গ সম্মেলনের ১০ বছর ধরে সভাপতি ছিলেন। নিখিল ভারত বঙ্গ সম্মেলন ও ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ ১৫ থেকে ১৭ জানুয়ারি যৌথভাবে ঢাকায় আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনে আয়োজন করে। মূলত, এই সম্মেলনে সমাপনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে তিনি ঢাকায় আসেন। বাংলা একাডেমিতে আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্যও রাখেন তিনি। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে গিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এবারের সফরে তিনি বন্দরনগরী চট্টগ্রামে যান। মাস্টারদা সূর্য সেনের জন্মভিটা পরিদর্শন করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি-লিট ডিগ্রি গ্রহণ করেন ও বক্তব্য দেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতে বঙ্গবন্ধুকে সর্বকালের সংগ্রামী নেতা বলে অভিহিত করেন। বক্তব্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশের এগিয়ে চলার প্রশংসা করেন। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশকে বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে বর্ণনা করেন। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের অর্থনীতির সার্বিক চিত্র তুলে ধরেন তার সামনে। নিপীড়নের মুখে বাংলাদেশে চলে আসা মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের মানবিক কারণে বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ার কথাও প্রধানমন্ত্রী তাকে বলেন।
সফরের দ্বিতীয় দিন সকালে ধানমন্ডিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেন প্রণব। বঙ্গবন্ধু জাদুঘর পরিদর্শনে গিয়ে সেখানকার শোক বইয়ে প্রণব লিখেন, ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু জাদুঘরে আসার সুযোগ পেয়ে আমি খুবই আনন্দিত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, যিনি স্বাধীনতার সংগ্রামে বাংলাদেশের মানুষকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে এই বাড়িতেই তাকে হত্যা করা হয়। এখান থেকেই মার্চে একটি নতুন জাতি সৃষ্টির ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। আমি সর্বকালের এই সাহসী নেতার প্রতি সালাম জানাই, শ্রদ্ধা জানাই সব শহীদদের প্রতি। এর পরে বিকেলে বাংলা একাডেমিতে আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনের সমাপনী অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি।
সফরের তৃতীয় দিনে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে যোগ দেন। সেখানে তাকে দেওয়া হয় সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রি। অনুষ্ঠানে ডিগ্রি গ্রহণ করে তিনি বলেন, মানুষের অধিকার আদায়ের একমাত্র শাসনব্যবস্থা সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। এটা বিশ্বস্বীকৃত। এর মাধ্যমেই দেশের জনগণ ভোট প্রদান করে তাদের নেতৃত্ব নির্বাচন করে। এর থেকে জনপ্রিয় শাসনব্যবস্থা আর নেই। তারপরও বারবার এই শাসন ব্যবস্থা ব্যাহত করার চেষ্টা করেছে কেউ কেউ। কোনো রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে সৈন্যরা ব্যারাক থেকে বের হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিল?
উপমহাদেশের রাজনৈতিক হত্যাকা-ের ইতিহাস প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, স্বাধীনতার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে সপরিবারে নিহত হন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এটি বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটি বড় আঘাত। এ রকম আঘাত আমরা ভারতের স্বাধীনতা লাভের কয়েক মাসের মাথায় পেয়েছিলাম ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধীকে হারানোর মাধ্যমে। একটা নতুন দেশ সবে স্বাধীনতা পেয়েছে। অসংখ্য সমস্যা, দেশ গড়ার সমস্যা, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সমস্যা, দারিদ্র্য দূর করার সমস্যা, বেকারত্ব দূর করার সমস্যা। সেই সমস্যার সঙ্গে সঙ্গেই একটা জাতিকে তার জন্মলগ্নের মুহূর্তেই প্রায় সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হলো।
বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার বিষয়ে ভারতের সাবেক এই রাষ্ট্রপতি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রটি সবচেয়ে বড় মাইনের চাকরির জন্য না ছুটে, উপাচার্যকে এসে বলবে আমি গবেষণা করতে চাই। সরকারের দায়িত্ব একজন গবেষককে উপযুক্ত সম্মানি দেওয়া। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা এই পরিবেশটা তৈরি করতে পারব না, ততক্ষণ পর্যন্ত শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা যাবে না। শিক্ষার্থীদের মোটা মাইনের চাকরি দিয়ে পরিবার উপকৃত হতে পারে; কিন্তু সার্বিকভাবে দেশ কতটা উপকৃত হচ্ছে সেদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নজর দিতে হবে। তিনি বাংলা ভাষা ও মহান মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বলেন, পৃথিবীর একটি বৃহৎ জনসংখ্যা এই ভাষায় কথা বলে। পৃথিবীতে খুব বেশি দেশে এমন কোনো নজির নেই যে ভাষার জন্য বা সংস্কৃতির জন্য প্রাণ ত্যাগ করছেন। একটি স্বাধীন স্বত্বার মূল ভিত্তিগুলো হচ্ছে ভাষা, সংস্কৃতি, তার ইতিহাস, তার ঐতিহ্য। আর এই সামগ্রিক ও মানবিক পরিপ্রেক্ষিতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে একটি নতুন জাতি। তারা ৯ মাস সংগ্রাম করে বিশ্ব মানচিত্রে একটি স্থান দখল করে নিয়েছে।
বর্তমানে দেশের উন্নয়নের কথা উল্লেখ করে প্রণব মুখার্জি বলেন, ‘কয়েক সপ্তাহ আগে ইন্টারন্যাশনাল বোর্ড অব রিকনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইজউ) তাদের রিপোর্টে বাংলাদেশকে অন্যতম এগিয়ে যাওয়া দেশ বলেছে। যাদের জাতীয় আয় কয়েক বছরে ৭ শতাংশের বেশি বেড়েছে। সামাজিক খাতে অপুষ্টি দূরীকরণ, নারী শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, উচ্চ শিক্ষার সম্প্রসারণ সম্ভব হয়েছে। এই মাটিতে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করছি গণতন্ত্রের মাধ্যমে একটি দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়।
প্রণব মুখার্জি এর আগে ২০১৩ ও ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে ২০১৩ সালের ১৩ মার্চ ছিল বাংলাদেশে ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এই বাঙালি রাজনীতিক। মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাকে বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা দেওয়া হয়। সেই সফরের কথাও এবার স্মরণ করেন একসময়ের এই কংগ্রেস নেতা। তবে এবার প্রণব মুখার্জি রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঢাকা সফর না করলেও, তাকে সর্বোচ্চ সম্মান দেওয়া হয়েছে।
গত বছর এপ্রিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লি সফরকালে রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তারা সে সময় বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গৃহীত সিদ্ধান্ত ও পারস্পরিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। তখন শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সর্বান্তকরণে সমর্থনদানের জন্য প্রণব মুখার্জিকে ধন্যবাদ জানান। তারা দুজনেই ১৯৭৫ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর শেখ হাসিনার ভারতে নির্বাসিত জীবনে তাদের দুই পরিবারের স্মৃতিচারণ করেন। ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশকে এগিয়ে নেওয়া এবং দুদেশের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও দৃঢ় ভিত্তিদানের জন্য অব্যাহত উদ্যোগ গ্রহণে শেখ হাসিনার প্রশংসা করেন।
বাংলাদেশের প্রথম সরকারকে ভারতের সমর্থনদানের বিষয়ে ১৯৭১ সালের ১৫ জুন ভারতের রাজ্যসভায় প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন প্রণব মুখার্জি। ভারতের ত্রয়োদশ এবং প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি কংগ্রেস দলের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ভারতের অর্থ, পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।

ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো’র ঢাকা সফর
৩ দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে গত ২৭ জানুয়ারি ঢাকায় আসেন ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো। এই সফরে দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের দুর্দশা দেখতে যান উইদোদো। সেখানে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলার পর এই সংকট নিরসনে বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দেন তিনি। পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের জন্য সাহায্য চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণাও দেন উইদোদো। তিনি সফরকালে অংশ নেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের নৈশভোজে, বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে। সাভারে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এছাড়া জাতির জনকের স্মৃতিবিজড়িত বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরও পরিদর্শন করেন।
ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো ও শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বিষয়ক ৫টি চুক্তি এবং সমঝোতা স্বাক্ষর হয়েছে। চুক্তিতে বাংলাদেশের পরারাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী ও ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারসুদি ছাড়াও দুদেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা স্বাক্ষর করেন। দুদেশের মধ্যে অগ্রাধিকার বাণিজ্য সুবিধা সংক্রান্ত চুক্তি, দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে নিয়মিত বৈঠক আয়োজনে সমঝোতা, মৎস্যসম্পদ আহরণ সংক্রান্ত বিষয়ে যৌথ সম্মতিপত্র, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) টার্মিনালে অবকাঠামো উন্নয়ন ও এ সংক্রান্ত বিষয়ে দুটি সমঝোতা স্মারক সই হয়।
ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো বলেছেন, রোহিঙ্গাদের প্রতি ইন্দোনেশিয়ার সরকার ও জনগণের আন্তরিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শেষ না হওয়া পর্যন্ত ত্রাণ, চিকিৎসা, মানবিক সহায়তাসহ সার্বিক সহযোগিতা করা হবে। উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের থাইংখালী জামতলি রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প পরিদর্শনকালে তিনি এ কথা বলেন। মিয়ানমার সামরিক জান্তার নির্যাতনের শিকার হয়ে এ দেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় ও মানবিক সেবা প্রদানের জন্য তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূয়সি প্রশংসা করে বলেন, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে আন্তর্জাতিক বিশ্বে তিনি একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এ সময় ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট ক্যাম্পে আশ্রিত রোহিঙ্গা নারী-পুরুষের কাছ থেকে রাখাইনে সহিংসতার বিবরণ শুনে বিচলিত বোধ করেন। তিনি রোহিঙ্গাদের চিকিৎসাসেবার খোঁজখবর নেন। এর আগে জোকো উইদোদো ইন্দোনেশিয়া সরকারের অর্থায়নে স্থাপিত মেডিকেল ক্যাম্প, স্কুল, ত্রাণকেন্দ্র এবং বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা পরিদর্শন করেন। এর আগে লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় ও জরুরি সহায়তা দিয়ে যে ভূমিকা বাংলাদেশ রেখেছে, তার প্রতি সংহতি জানিয়ে গত সেপ্টেম্বরে ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেতনো মারসুদিকে বাংলাদেশে পাঠিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট উইদোদো।

Category:

আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন ২০১৮

29মাসুদ পথিক: বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন। আগামী ১৩ থেকে ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিন দিনব্যাপী বাংলা সাহিত্য অ্যাকাডেমির মিলনায়তনে চলে এই অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানের আয়োজক সংস্থাকে সহযোগিতা করে নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য পরিষদ ও ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ। ‘আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন-২০১৮’-এ ভারতসহ বিশ্বের তিন শতাধিক সাহিত্যিক অংশগ্রহণ করে।
১৩ জানুয়ারি বিকেল ৩টায় বাংলা অ্যাকাডেমির সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানের সমাপনীর দিন উপস্থিত ছিলেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি।
এই সম্মেলনের আহ্বায়ক ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনে বিশ্বের বাংলা সাহিত্যিকদের সম্মেলন ঘটে। ফলে মানুষের সঙ্গে তথ্যের আদান-প্রদানের সুযোগ তৈরি হয়। বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে তিন দিনের আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন শুরু হয় ১৩ জানুয়ারি। বিকেলে একাডেমির ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্মেলনে দুই বাংলার তিন শতাধিক সাহিত্যিক অংশ নেন। নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন ও ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশের সহযোগিতায় সম্মেলনের আয়োজন করেছে আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন পরিষদ। ১৫ জানুয়ারি সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। এবার সম্মেলনের প্রতিপাদ্যÑ ‘বিশ্ব মানব হবি যদি কায়মনে বাঙালি হ’।
সম্মেলন পরিষদের প্রধান সমন্বয়ক নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস রয়েছে, যা জীবন শিল্প-সাধনার কথা বলে, উচ্চারণ করে শান্তির বারতা। বাঙালির সেই ইতিহাস কথা বলে মানবিকতার। মানবিকতার সেই আহ্বান ছড়িয়ে দেওয়াই হবে সম্মেলনের প্রধান উদ্দেশ্য। সম্মেলনে বিষয়ভিত্তিক সেমিনারের সঙ্গে দুটি মঞ্চ নাটক ও সংগীত, গল্প ও কবিতাপাঠ, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও আবৃত্তি অনুষ্ঠান রয়েছে। বিভিন্ন ভাষায় প্রকাশিত বই ও লিটল ম্যাগাজিনের বিক্রয়, প্রদর্শনীর ব্যবস্থাও থাকছে।
১৩ জানুয়ারি বিকেল ৫টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলবে প্রথম দিনের আয়োজন। একাডেমির বহিরাঙ্গনে প্রদর্শিত হবে দুই চলচ্চিত্র ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’ ও ‘পদ্মা নদীর মাঝি’। আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে সন্ধ্যা ৭টায় মঞ্চস্থ হবে ম্যাড থেটারের নাটক ‘নদ্দিউ নতিম’। এ ছাড়া সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হবে বাংলাদেশ ও ভারতের কবি-সাহিত্যিকদের প্রীতি সম্মেলন। সন্ধ্যা ৬টায় কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে অনুষ্ঠিত হবে ‘বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলা সাহিত্যের সমকালীন ছোটগল্প’ শীর্ষক আলোচনা। এ বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেয় পশ্চিমবঙ্গের বিখ্যাত সাহিত্যিক সমরেশ মজুমদার।
দ্বিতীয় দিনে অনুষ্ঠিত হয় ‘বাংলা সাহিত্যে দেশ ভাগের অভিঘাত’, ‘সাহিত্য ও চলচ্চিত্র’, ‘বাংলা সংবাদ ও সাময়িকপত্রের ২০০ বছর’ ও ‘সাম্প্রতিক বাংলা উপন্যাসের গতি ও গন্তব্য’ শীর্ষক ৪টি সেমিনার। একই দিন বিকেলে রবীন্দ্র চত্বরে কবিতাপাঠের সঙ্গে আবহমান বাংলা গানের সুরে শ্রোতা-দর্শকদের হৃদয় রাঙায় দুই দেশের কবি-শিল্পীরা।
সম্মেলনের শেষ দিনে হয়েছে ৩টি সেমিনারÑ ‘ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতিসত্তা’, ‘অনুবাদের সাহিত্য, সাহিত্যের অনুবাদ’ ও ‘প্রযুক্তির বিশ্বে সাহিত্যের সংকট ও সম্ভাবনা’। ওই বিকেলে সমাপনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি থাকেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ও ভারতের বরেণ্য চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী। সভাপতিত্ব করবেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি।

Category:

বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী: ফোর্সেস গোল ২০৩০-এর লক্ষ্য পানে

30মুফরাত রাহিন: ‘মারো কেন? বাবুকে নালিশ দিবো কিন্তু!’Ñ কথাটি বাংলার নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়ার প্রখ্যাত ‘মতিচূর’ গ্রন্থ থেকে নেওয়া। কথাটি তাচ্ছিল্যের সাথে বলেছিলেন লেখিকা। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, এভাবে মার খাওয়া যদি প্রতিরোধ না করা হয় তবে মার খেয়েই যেতে হবে।
বাংলার বাঘ বলে খ্যাত শেরে বাংলা একে ফজলুল হক যখন ছোটবেলা নদীতে সাঁতার কাটতে যেতেন, তখন উনার মা চিন্তিত থাকতেন আর মানা করতেন নদীতে নামতে, তাতে কুমির আছে বলে। সে সময় ফজলুল হক বলতেন, ‘মা আমরা যদি নদীতে না নামি, তাহলে কুমির তাড়াবো কি করে?’ কুমির তাড়ানো বলতে সে সময়ের দখলদার ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ইতিহাস সাক্ষী, যুগে যুগে প্রত্যেক জাতি নিজেদের অধিকার, ন্যায্য দাবি আদায় এবং তা রক্ষার জন্য যুদ্ধ করে এসেছে। যুদ্ধ মানব সভ্যতার সাথেই জড়িত।
বাংলাদেশ। একটি স্বপ্নের নাম। কোটি কোটি বাঙালির স্বপ্নের দেশ। বিশ্বে বাঙালি জাতির একমাত্র স্বাধীন রাষ্ট্র। ১৯৭১ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বীর বাঙালি সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনে। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু উনার দূরদৃষ্টিতে বুঝতে পেরেছিলেন স্বাধীনতা অর্জনের চেয়ে তা রক্ষা করা কঠিন। শত্রুদের ষড়যন্ত্র থেমে নেই। তাই দেশ রক্ষায় গঠন করেন সশস্ত্র বাহিনী এবং এর উন্নয়নে যথেষ্ট গুরুত্ব দেন। মিসর থেকে নিয়ে আসেন ৪৪টি ট্যাংক, সংগ্রহ করেন যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ প্রভৃতি। বাহিনীর সদস্যদের জন্য ব্যবস্থা করেন উন্নত প্রশিক্ষণের।
কিন্তু ’৭৫-এর বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকা-ের পর থেমে যায় সশস্ত্র বাহিনীর অগ্রযাত্রা। পিছিয়ে পড়ে উন্নয়ন।
১৯৯৬ সালে সরকার গঠন করেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা, গণতন্ত্রের মানস কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বাবার মতোই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেত্রী। তিনিও গুরুত্ব দিলেন সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়নে। শুরু হলো বাহিনীর অগ্রযাত্রা। একে একে সংগ্রহ করে দিলেন ফ্রিগেট, মিগ-২৯ এর মতো অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জামাদি।
কিন্তু দেশ রক্ষার উন্নয়নের কারণে শত্রুদের ষড়যন্ত্রের শিকার হলেন তিনি। আবারও থেমে গেল সশস্ত্র বাহিনীর অগ্রযাত্রা ২০০১ থেকে। চুরির মহাউৎসবে মেতে উঠল ২০০১ সালের ষড়যন্ত্রের সরকার। দেশ রক্ষার তাগিদে জনগণের টাকায় কেনা মিগ-২৯ গোপনে বিক্রি করে নিজেদের পকেট ভরতে চাইল। শত্রুতাবশত নৌবাহিনীর ফ্রিগেট ডিকমিশিং করে বসিয়ে রাখল।
২০০৮ সালে জনগণের ভালোবাসা নিয়ে, সকল ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে ভূমিধস বিজয় নিয়ে ফিরে এলেন শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হয়ে। উনার শক্তিশালী সাহসী নেতৃত্বে আবার পুরোদমে শুরু হলো সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন। তিনি প্রণয়ন করলেন যুগোপযোগী পরিকল্পনা ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’।
‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর আলোকে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী হয়ে উঠছে দক্ষ, চৌকষ, আধুনিক শক্তিশালী মেধাবী সশস্ত্র বাহিনী।
নি¤েœ ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’-এর কিছু দিক তুলে ধরা হলোÑ
ফোর্সেস গোল ২০৩০ (ঋড়ৎপবং এড়ধষ ২০৩০) হলো বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নের জন্য বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এ পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সশস্ত্র বাহিনীর আকার বৃদ্ধি, আধুনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম সংগ্রহ ও সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রশিক্ষণ প্রদান। পরিকল্পনায় দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের ওপর জোর দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

ক্রয় তালিকা
ফোর্সেস গোল ২০৩০ অনুসারে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ২০১০ সাল থেকে ক্রয়কৃত সমরাস্ত্রের তালিকাÑ

সেনাবাহিনী
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ব্যবহার করে নোরা বি-৫২কে২ এসপিএইচ; ৪৪টি এমবিটি ২০০০ ট্যাংক; ১৮টি নোরা বি-৫২ স্বয়ংক্রিয় কামান; ৩৬টি ডব্লিউএস-২২ মাল্টিপল রকেট লঞ্চার সিস্টেম; ৬৩৫টি বিটিআর-৮০ এপিসি; ২২টি অটোকার কোবরা এলএভি; ২ রেজিমেন্ট এফএম-৯০ স্বল্পপাল্লার বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র; কিউডব্লিউ-২ কাঁধে বহনযোগ্য বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র; এফএন-৬ কাঁধে বহনযোগ্য বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৯কে১১৫-২ মেতিস-এম; মেতিস-এম ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র; পিফ-৯৮ ট্যাংক বিধ্বংসী রকেট; এসএলসি-২ ওয়েপন লোকেটিং রাডার; দুটি ইউরোকপ্টার এএস৩৬৫ ডাউফিন হেলিকপ্টার; ৬টি এমআই-১৭১এসএইচ হেলিকপ্টার; একটি সি-২৯৫ডব্লিউ পরিবহন বিমান; ৩৬টি ব্রামোর সি৪আই মনুষ্যবিহীন আকাশযান; ১০০টি ট্রাই শার্ক স্পিডবোট; একটি টাইপ সি কমান্ড ভেসেল।

নৌ-বাহিনী
দুটি টাইপ ০৩৫জি ডুবোজাহাজ; দুটি টাইপ ০৫৩এইচ২ ফ্রিগেট; দুটি হ্যামিল্টন ক্লাস ফ্রিগেট; ৪টি টাইপ ০৫৬ কর্ভেট; ৪টি দুর্জয় ক্লাস পেট্রোল ভেসেল; ৫টি পদ্মা ক্লাস পেট্রোল ভেসেল; একটি তেলবাহী ট্যাংকার; দুটি ডরনিয়ার ডিও-২২৮এনজি মেরিটাইম টহল বিমান; দুটি এডব্লিউ-১০৯ হেলিকপ্টার।

বিমান বাহিনী
১৬টি এফ-৭ যুদ্ধবিমান; ১৬টি ইয়াক-১৩০ প্রশিক্ষণ বিমান; ৯টি কে-৮ প্রশিক্ষণ বিমান; ১১টি পিটি-৬ প্রাথমিক প্রশিক্ষণ বিমান; ৩টি এল-৪১০ পরিবহন প্রশিক্ষণ বিমান; ১৬টি এমআই-১৭১এসএইচ হেলিকপ্টার; দুটি এডব্লিউ-১৩৯ হেলিকপ্টার; ৫ ব্যাটারি এফএম-৯০ স্বল্পপাল্লার বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র; জেএইচ-১৬ রাডার; জেওয়াই-১১বি রাডার; ওয়াইএলসি-২ রাডার; ওয়াইএলসি-৬ রাডার; সেলেক্স আরএটি-৩১ডি রাডার।
সাংগঠনিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন
সেনাবাহিনী : সিলেটে ১৭ পদাতিক ডিভিশন প্রতিষ্ঠা; কক্সবাজারে ১০ পদাতিক ডিভিশন প্রতিষ্ঠা; পদ্মাসেতুর পাশে ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেড প্রতিষ্ঠা; পদাতিক বাহিনীকে ব্যালাস্টিক হেলমেট, কেভলার বুলেট প্রুফ জ্যাকেট, নাইট ভিশন গগলস, আই প্রোটেক্টিভ গিয়ার, জিপিএস ডিভাইস, উন্নত যোগাযোগ যন্ত্র ও বিডি-০৮ অ্যাসল্ট রাইফেল দ্বারা সজ্জিত করা।
নৌ-বাহিনী : নৌবাহিনীর উড্ডয়ন শাখা প্রতিষ্ঠা; নৌবাহিনীর ডুবোজাহাজ শাখা প্রতিষ্ঠা; কক্সবাজারের পেকুয়ায় বানৌজা শেখ হাসিনা নামক ডুবোজাহাজ ঘাঁটি স্থাপন।
বিমান বাহিনী : ঢাকায় বঙ্গবন্ধু বিমান ঘাঁটি স্থাপন; কক্সবাজারে বিমান ঘাঁটি স্থাপন; বিমান বাহিনীতে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র শাখা প্রতিষ্ঠা।
দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প : বাংলাদেশ সমরাস্ত্র কারখানা; বিডি-০৮ অ্যাসল্ট রাইফেল প্রস্তুতকরণ; বিডি-০৮ লাইট মেশিন গান প্রস্তুতকরণ; গ্রেন-৮৪ বিডি গ্রেনেড তৈরি; কামান ও মর্টারের শেল তৈরি; ৬০ মিমি ও ৮২মিমি মর্টার; এফএন-১৬ ঈগল ম্যানপ্যাড।
বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি : অরুনিমা বলীয়ান ট্রাক সংযোজন; খুলনা শিপইয়ার্ড; পদ্মা ক্লাস পেট্রোল ভেসেল নির্মাণ; দুর্জয় ক্লাস পেট্রোল ভেসেল নির্মাণ; ল্যান্ডিং ক্রাফট ইউটিলিটি নির্মাণ; ল্যান্ডিং ক্রাফট ট্যাংক নির্মাণ; হাইড্রোগ্রাফিক জরিপ জাহাজ নির্মাণ।
নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ড : ল্যান্ডিং ক্রাফট ট্যাংক নির্মাণ; স্পিডবোট নির্মাণ; আনন্দ শিপইয়ার্ড; তেলবাহী জাহাজ নির্মাণ; বঙ্গবন্ধু অ্যারোনটিকাল সেন্টার সম্পাদনা; এফ-৭ যুদ্ধবিমানের ওভারহোলিং; এমআই-১৭ হেলিকপ্টার।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সেনাবাহিনী : সেনাবাহিনীকে উত্তর, দক্ষিণ ও কেন্দ্রীয় কোরে ভাগ করা; পটুয়াখালীর লেবুখালীতে পদাতিক ডিভিশন স্থাপন; কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে রিভারাইন ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেড স্থাপন; দুই রেজিমেন্ট ট্যাংক ক্রয়; দূরপাল্লার ট্যাংক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয়।
নৌ-বাহিনী : দুটি ফ্রিগেট ক্রয়; ৬টি টাইপ-০৫৬ কর্ভেট ক্রয়; ৪টি দুর্জয় ক্লাস পেট্রোল ভেসেল ক্রয়; পটুয়াখালীতে বানৌজা শেরে বাংলা নামক সর্ববৃহৎ নৌঘাঁটি স্থাপন; দুটি ডুবোজাহাজ বিধ্বংসী হেলিকপ্টার ক্রয়; দুটি সামুদ্রিক টহল বিমান ক্রয়।
বিমান বাহিনী : এক ব্যাটারি মধ্যম পাল্লার বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয়; মনুষ্যবিহীন আকাশযান ক্রয়; ৮টি মাল্টিরোল কম্ব্যাট এয়ারক্রাফট ক্রয়; এমআই-১৭১ এসএইচ হেলিকপ্টার ক্রয়; দুটি এডব্লিউ-১৩৯ হেলিকপ্টার ক্রয়; দুটি এডব্লিউ-১১৯ হেলিকপ্টার ক্রয়। [তথ্য সূত্র : ফোর্সেস গোল-২০৩০, উইকিপিডিয়া]
উল্লেখ্য হচ্ছে, ঐতিহ্য অনুযায়ী কোনো দেশের সশস্ত্র বাহিনীই তাদের পরিকল্পনার সব প্রকাশ করে না। মূল পরিকল্পনার ক্ষুদ্র অংশই প্রকাশ করে আর সিংহভাগ গোপন রাখে। অর্থাৎ বলা যায়, উপরে উল্লিখিত পরিকল্পনা থেকে আরও কয়েকগুণ বেশি শক্তিশালী, দক্ষ, চৌকষ, মেধাবী সশস্ত্র বাহিনী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে দুর্বার গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী। সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়ন ধারার এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার সব সময়ই প্রয়োজন।

Category:

কবিতা

32(C)

Category:

জলেরা কাঁদছে

33ঘাটে এসে নৌকা ভেড়েÑ অমাবস্যা। ঘুটঘুটে রাত। আকাশে মেঘের ভিড়। চারদিকে কুঁচুটে অন্ধকার। চর্টের আলো জ্বেলে, হ্যারিকেন হাতে নিয়ে অনেকে এসে ভিড় করে ঘাটে। এর-ওর হাত ধরে আলোয় পথ চিনে সাবধানে প্রথমে গলুইয়ের মুখে তারপর কাঠের পুরু তক্তার ওপর পা রাখে ডা. হাফিজ। চাল বেয়ে উঠোনে উঠতেই হাঁপ ধরে যায় ওর। বুক হাঁপরের মতো ওঠানামা করে। বিরক্তি ওর কণ্ঠে, আর পারি না! বলেই কোমরের দু-কাঁখে হাত রেখে খানিক ডানে হেলে দাঁড়িয়ে থাকে। চোখেমুখে বড্ড ক্লান্তি আর আকাশের মেঘ যেন ছায়া ফেলেছে সে মুখে। তখুনি উত্তুরে জঙ্গলে কী এক পাখি ডেকে ওঠে খরখরে গলায়। চারপাশ হিস্ হিস্ করে ওঠে সে কণ্ঠে। গায়ে কাঁটা দেয়, বুকের রক্ত হিম হয়ে আসে। ফাতেমা খানিক সময় স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে কেমন যেন আনমনা হয়ে যায়। মুখে রা সরে না। বুকে কেমন যেন কাঁপুনি ধরে। মুহূর্তে নানা চিন্তা এসে ভিড় করে। তোমার শরীর কি খুব খারাপ লাগছে?
ডা. হাফিজ মাথা নেড়ে না বললেও মুখ জুড়ে কেমন যেন যন্ত্রণার ছাপ। ফাতেমা আর দেরি না করে হাত ধরে স্বামীর, একটু একটু করে পা বাড়াও। কতক্ষণ এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে!
ঘাটের পাশে পুবের উঠোনজুড়ে এক থেকে আলো অনেকক্ষণ ধরে স্থির হয়ে আছে। সে আলো ঘিরে অনেক মানুষের জটলা। ডাক্তারকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভিড় ছেড়ে একে একে উঠে আসে সাদেক, মজনু, দলু এমনি আরও অনেকে। ওদের মনেও উৎকণ্ঠা কাজ করে। কাহা! শইলডা বালা? মুখটা কেমন ব্যাজার ব্যাজার লাগতাছে। খাড়ই থাকলে অইব! ঘরে যান। কোমবেলা থাইক্যা বার অইছেন? অহন রাইত কত! আমনে কাহা এহনও কেমনে যে টিইক্যা আছেন ভাবলে মাতাডা ঠাইট ঘুরনা মারে। সলুর কথা ওর কানে গেল কি না বোঝা গেল না। আনমনা ডা. হাফিজ ওদের কথার কোনো উত্তর না দিয়ে ফাতেমার হাত ধরে একটু একটু করে পা বাড়াতে বাড়াতে বলে, জয় বাংলার খবর কী?
Ñ কাহা! আর কইয়েন না। পাক-আর্মি বহরে বহরে মারা পড়তাছে। এইভাবে যুদি মুক্তিরা লড়তে পারে, তাইলে কাহা চিন্তা কইরেন না, খুব জলদি দেশ স্বাধীন অইব।
ডা. হাফিজ মুখে মৃদুহাসি ছড়িয়ে বলে, তর স্বাধীন হইতে হইতে আমি আর বাঁচুম?
Ñ কী যে কন কাহা। লাশে-গাছে আমাদের যে দেহডা এই দেহের ভিতরে ঘুণে ধরবো এইডা ভাবলেন কী কইর‌্যা? আমরা এমনের আডুর বয়সী। অহনি রোগে-জারে ভাইঙ্গ্যা পড়ছি। আমনার বয়েসে আমগো হাড্ডি-গুড্ডিরও খোঁজ থাকবো না কয়বরে। আমনে তো তালগাছের মতো কেমনু খাড়া অইয়া আছেন! আমগো মতো দুই-চাইরডারে অহনও ইডালডা দশ হাত দূরে নিয়া ফালাইতে পারবেন।
এ কথা শেষ না হতেই ভেতরের উঠোন থেকে অনেকগুলো মানুষের হাসির শব্দ কানে আসে ওদের। ডা. হাফিজ একটু বিচলিত হয়ে বলে, জয়বাংলা রেডিও শুইন্যা অমন হাসে ক্যা? রাজাকার শুনলে অহনি খবর দিবো মিলিটারিরে। রেডিও জুড়ে উঠোনে অনেকে বসে কান পেতে স্বাধীন বাংলা বেতারের অনুষ্ঠান শুনছে। সন্ধ্যার খবর শেষ হয়ে এখন চলছে চরমপত্র। একসময় ডা. হাফিজের ঘরেই সন্ধ্যার এই আসর বসতো। খুব আগ্রহ নিয়ে অনুষ্ঠানটি শুনতো ডাক্তার। উপুড় হয়ে গায়ে গা মিলিয়ে রেডিওর গায়ে কান লাগিয়ে পুরো অনুষ্ঠান গোগ্রাসে গিলতো। কিন্তু আজ কয়েক মাস হলো সে আয়োজনে ভাটা পড়েছে। ডাক্তারের বয়েস পড়তির দিকে হলেও চিন্তা-চেতনা মননে আর তারুণ্যে এখনও বিশ বছরের। পঁচিশে মার্চ রাতে যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লো লোকবল নিয়ে তা কেবল ওকেই মানায়। তারুণ্যে খলবলে মানুষটা আজ অমন নেতিয়ে পড়েছে কেন? রেডিওতে কান থাকলেও মনে অশান্তি ছুঁয়ে যায় অনেকেরই। কারও কারও মনোযোগে ছেদ পড়ে বারবার।
পঁচিশে মার্চ রাতে হঠাৎ খবর এলো ঢাকা ম্যাসাকার হয়ে গেছে। কোনো মানুষ বেঁচে আছে কি না সন্দেহ। শুধু আঘুন আর আগুন ঢাকা জুড়ে। জ্যান্ত কোনো মানুষ দেখা যায়নি পথে-ঘাটে। শুধু আর্মির কনভয় আর ট্যাংক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে শহরময়। এ খবর ওয়্যারলেসে থানায় আসতেই মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে থানা সদর ছাপিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামে। তখনই ডা. হাফিজ সবাইকে ডেকে দলেবলে ভারি হয়ে দৌড়োতে থাকে রেললাইনের দিকে। আয়রে তোরা আয়! সড়কের পাড়ে আয়! রেললাইন না তুলতে পারলে জানে কেউ বাঁচবি না। পাক আর্মি আইতাছে বগি ভইর‌্যা ভইর‌্যা।
কথা বলে আর দৌড়াতে থাকে হাফিজ। গলা যদ্দুর সম্ভব চড়িয়ে ডেকে যায় ও। ওর পেছন পেছন অসংখ্য মানুষ দা, শাবল, খুন্তি, কুড়–ল আরও যার যা আছে তাই নিয়ে রেললাইনের দিকে দৌড়াতে থাকে। একসময় হেইও হেইও করে রেললাইন উপড়ে ফেলতে থাকে তারা। সিøপারের কাঠে আগুন ধরিয়ে দেয়। লাইনগুলো কাঁধে বয়ে নিয়ে দূরের বিলে ছুড়ে ফেলতে থাকে আর জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু মুখে মুখে।
অসংখ্য কণ্ঠো মুখে দা-দুড়োলের শব্দের পাশাপাশি হেইও হেইও ধ্বনি আর জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু স্লোগান মুখে নিয়ে সবাই যেন জিকির করছে। এইক ধ্বনিতে রেললাইন ধরে মাইলের পর মাইল মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। মাঝে মাঝে ডা. হাফিজের কণ্ঠ অনুসরণ করে কেউ কেউ গলা চড়িয়ে বলে, বাঁচবি না-রে বাঁচবি না। হ¹লে আয়। পা চালাইয়া আয়। রেললাইন তুইল্যা কটকটি খাবি কেরে আয়। সময় নাইরে সময় নাই…। মিলিটারি আইলোরে মিলিটারি। পাকসেনারা আইলোরে পাকসেনারা। অফান্ডে মারা পড়বিরে মারা পড়বি। আয় রে… সময় নাই…।
সফলভাবে রেললাইন তোলার নেতৃত্ব দিয়েছিল সেদিন ডা. হাফিজ। ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ মাইলের পর মাইল তুলে ফেলেছিল ওরা। এরপরে আর কখনও তাকে সুস্থির দেখা যায়নি। কী করে পাক আর্মিদের নিধন থেকে এ এলাকার মানুষদের রক্ষা করা যায়, কী করে মুক্তিযুদ্ধে পাঠানোর মতো ছেলেদের উদ্বুদ্ধ করা যায়, এ নিয়ে সারাক্ষণ তার ছুটোছুটি। সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়ে গ্রামে চলে এসেছে ও। আজ বছর পাঁচ হবে। সেই থেকে এ-গ্রাম সে-গ্রাম, দূরের গ্রামে রোগী দেখে বেড়ায়। তাই চেনা-পরিচয়ের গ-ি ওর ছোট নয়, যতই দিন গেছে বরং এ গ-ি কেবলই বেড়েছে। দূর মূল্লকেও ওর শুভার্থী-শুভাকাক্সক্ষীর অভাব নেই।
যুদ্ধের এই সংকটকালে মানুষের আরও কাছাকাছি কী করে থাকা যায়, মানুষের মনে কী করে উদ্দীপনা জাগিয়ে রাখা যায় সে নিয়ে তার চিন্তা-উৎকণ্ঠা আর ব্যাকুলতার শেষ নেই। এমনি উচাটন মন নিয়ে যখন ও ছুটে বেড়াচ্ছে গ্রামে-গ্রামে, তখনই এক সন্ধ্যায় ফোরকান দফাদার এসে খবর দিল, ডাক্তার কাহা কই? থানা ক্যাম্পে যাওন লাগবো। আর্মি অফিসার সালাম দিচ্ছে। জরুরি কথা আছে। কাহার লগে। আমারে কইছে জরুরকে যাকে আর আয়েঙ্গে। বলিয়ে উসকো সাথ জরুর বাত হ্যায়! অহন ভাত না লুঠি, কি খাইব কেডা জানে! বলেই দফাদার চলে যেতেই থানার ওসি তার এক বিশ্বস্ত লোক পাঠায় খবর দিয়ে যে করেই হোক রাতের মধ্যে না-হয় খুব ভোরে বাড়ি ছেড়ে যেন চলে যায় ডা. হাফিজ। ওকে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান করবে বলে পাক অফিসার ঠিক করেছে।
ডা. হাফিজের জনপ্রিয়তাই বুঝি তার কাল হলো। অসংখ্য মানুষ তার প্রতি অনুগত, বিশ্বস্ত এ খবর পাক আর্মিদের কাছে চাপা থাকেনি। ঠিকই খবর পৌঁছে গেছে জায়গায় জায়গায়। জনপ্রিয় এই মানুষটিকে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান করার জন্যে উঠে-পড়ে লেগেছে ওরা। বাড়ির লোকজন ওসির পরামর্শমতো ভোরে আজানের আগেই ডাক্তারকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। এ-গ্রাম সে-গ্রাম পেরিয়ে সুদূর অজ এক গ্রামে ঝোপঝাড়ের ভিড়ে ওর আশ্রয় তৈরি করা হয়। ঝোপ না বলে জঙ্গল বলাই ভালো। তিন মাথা উঁচু অসংখ্য গাছের ভিড়ে ঝোপঝাড়ে মিলেমিশে আদিম এক পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে আছে। সে সঙ্গে আছে ইঁদুর-বেজি-বাগডাস-গুইসাপ ছাড়াও গা হিম করা আরও কতসব প্রাণীকুলের আবাস। তার পাশেই ঝাঁপানো অসম্ভব উঁচু এক বটগাছ। দৈর্ঘ্য-েপ্রস্থে এক-দেড় মাইল জায়গাজুড়ে বটের ঝুরি নেমেছে। মাটির বুকে মোটা মোটা সব শেকড় জেগে আছে অজগরের মতো। গাছের ওপারেই দিঘি। দিঘির চারপাশ এমনি ঝোপঝাড় আর জঙ্গলে পুরু হয়ে আছে। পুরু ছায়ায় ঘেরা দিঘির চারদিক। সে ছায়ায় দিঘির জলও কেমন কালচে দেখায়। তাকালে ভয় হয়। তেমনি নিঃসীম পোড়ো জায়গায় রেখে আসা হলো ডা. হাফিজকে। সন্ধ্যা অবধি সেখানেই শোয়া বসা খাওয়া সবই চলে ওর। সন্ধ্যায় একদল মানুষের ভিড় লুকিয়ে লুকিয়ে বাড়ি এসে পৌঁছে ডা. হাফিজ। কোনোরকম রাতটা পার করে অন্ধকার থাকতেই আবার পথে বেরিয়ে পড়ে। একসময় হারিয়ে যায় সেই ঝোপের ভিড়ে। এভাবে কয়েক মাস চলার পর যখন বানের জল এসে ডুবিয়ে দিচ্ছিল চারপাশ, পথ-ঘাট। তখন পাশের এক কবরস্থানে জায়গা হলো ওর। সেখানেও ঘন জঙ্গল আর অনেক দিনের পুরনো একটি মসজিদের পাশে গোটা কয়েক কবর। বাঁধানো। এর মধ্যে তিনটে কবর আছে অস্বাভাবিক লম্বা। দীর্ঘদেহী মানুষের কবর। একেবারে পাথরে ঢালাই করা। তারপর ধাপে ধাপে নিচে নেমে চওড়া হয়ে গেছে। অনেকগুলো পাথরের খড়ম আছে কবরের পাশে ছড়িয়ে। মসজিদ কবর আর খড়মগুলো গায়েবি ইশারায় মাটি ভেদ করে উঠেছে অনেক বছর হলো। দীর্ঘ কবরগুলো বাদে অন্য কবরের গায়ে পুরু শ্যাওলা জমে কেমন এক আদিম ও ভৌতিক আবহ গড়ে উঠেছে চারদিকে। সেখানেই একটি কবর ঘেঁষে লুকিয়ে থাকে ডা. হাফিজ। সন্ধ্যার পর ডিঙ্গি নৌকো করে নিয়ে আসে বাড়ির লোকজন। আবার একইভাবে ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ডিঙ্গি করে গোরস্তানে রেখে আসে তাকে। এ নিয়ে বিড়ম্বনার শেষ নেই। অনেক সময় দুপুরে যখন বাটি ভরে গামছায় বেঁধে ওর জন্যে খাবার পাঠানো হয়, প্রায়ই তা অনুসরণ করে অচেনা কজন লোক। একেক সময় একেক লোককে দেখেছে নৌকো করে ওদের বাড়ির আশপাশে নিচু এলাকায় ঘোরাঘুরি করতে। এমনি করে পুরো বর্ষায় ডিঙ্গি করে সকালে যায় ফিরে আসে রাতে ডা. হাফিজ। আজ সাত মাস একই রুটিন চলছে। ক্রমেই বিরক্তি আর বিতৃষ্ণা ওর জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। কেন যেন গত কদিন ধরে একমই যেতে ইচ্ছে করছিল না ওর। কেবল গাইগুঁই, কেবল এড়িয়ে চলার চেষ্টা। কিন্তু বাড়ির লোকজন ওর প্রাণের কথা চিন্তা করে জোর করে নিয়ে যায়, দিয়ে আসে নির্বাসনে।
রোজ চলছে এমনি ধকল, উৎকণ্ঠা আর আতঙ্ক। অনেকদিন বিশ্রাম পায়নি বুড়োটে এ শরীর। তাই আজ ডা. হাফিজের শরীরের অমন খয়াটে ভাব দেখে ফাতেমার বেশ দুশ্চিন্তা হয়। একটা মানুষ আজ এতটা মাস ধরে এমন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। কতদিন আর সয়! শরীর তো মানুষের। বয়সও তো একেবারে কম হয়নি। তাকে নিয়ে আর্মিদের কেন যে এত শখ তা বোঝে না ফাতেমা। ওর দুশ্চিন্তা দেখে ডা. হাফিজ বলে, মরে গেলে মরে যাব, আমি আর একদিনও যাব না ওই জঙ্গলে। কোনোদিন সাপের কামড়েও তো মরে যেতে পারি, তার আগে আর্মিদের হাতে মরলেও শহিদ হবো। অন্তত মানুষ জানবে যে ওদের প্রলোভন আর প্ররোচনায় পা না-দেয়ায় ডা. হাফিজকে হত্যা করেছে পাক আর্মিরা। এ মৃত্যু গৌরবের। হারাবার কিছু নেই।
সে রাতে শোবার আগে নামাজ পড়ে কেন যেন ভীষণ কান্নাকাটি করে ডা. হাফিজ। একাগ্র মনে অনেক ঘোরের মধ্যে ডুবে ছিল যেন। স্বাধীনতা দেখার জন্যে তীব্র ব্যাকুলতা ছিল তার কণ্ঠে। সে ব্যাকুলতা, সে প্রত্যাশা আর স্বপ্নেরা প্রার্থনায় ঝরে ঝরে পড়ে কথা হয়ে। বাংলার স্বাধীনতা না দেখে যেন তার মৃত্যু না হয়। ব্যাকুল হয়ে করুণ সুরে মন থেকে যতদূর সম্ভব নতজানু হয়ে এ প্রার্থনা আওড়ে ছিল বারবার। মানুষের এ কষ্ট, ধ্বংস, হত্যা আর রক্ত আর দেখতে পারছি না খোদা। নারীদের লাঞ্ছনা আর সহ্য করতে পারছি না খোদা। শেষ কথা ছিল জালেমদের হাত থেকে বাংলাকে মুক্ত কর খোদা নানাভাবে, নানা ভঙ্গিমায়, নানা আকুতি নিয়ে এ কথাটি বারবার বলেছিল ডা. হাফিজ। আর ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপত্তা। তাদের জীবন রক্ষার তাগিদ। এবং স্বাধীন বাংলাদেশ অর্জনে যেন ওরা বীরের মতো লড়ে যেতে পারে সে প্রার্থনা। প্রার্থনায় একে একে এমনি কথাগুলো তাওড়ে যাচ্ছিল ডা. হাফিজ। আর বুক তার ভেসে যাচ্ছিল চোখের ধারায়। কান্নার ঢেউ তার বুক নিংড়ে উঠে আসছিল অন্তরের গভীর থেকে। দীর্ঘ সময় ধরে এ প্রার্থনায় গভীরভাবে মগ্ন ছিল সে। প্রার্থনার প্রতিটি বাণী বারবার আওড়েও যেন তার তৃপ্তি আসছিল না মনে। প্রার্থনা শেষে উঠোনে পায়চারি করে জুলহাসকে ডাকলো একবার; আর কোনো খবর আছে জুলহাস!
জুলহাস শুয়ে পড়েছিল। তড়িঘড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। না কাহা, তাজা খবর ওই একগই। মাইন ফুইট্টা পাক সেনার ট্রাক উইড়া গেছে।
আর কোনো খবর পাস নাই তাইলে? এরপর বিড়বিড় করে কী যেন বলে ডা. হাফিজ। উঠানজুড়ে পায়চারি করে অনেক সময় ধরে। তখন কেন যেন বারবার আকাশ দেখছিল।
রাত তখন বেশ গভীর। ফাতেমার কেবলই মনে হচ্ছে জলে বৈঠার শব্দ। অনেকগুলো বৈঠা একের পর এক উঠছে-নামছে। আর হুপ হুপ শব্দ উঠছে ভরা বর্ষার জলে। সে শব্দে ফাতেমার বুক দুরু দুরু কেঁপে ওঠে। বিছানায় আর গা রাখতে পারছিল না এক মুহূর্তের জন্যে। একসময় পায়ে পায়ে উঠে আসে ও। ঘরের এক কোণে টিমটিম করে জ্বলছে হ্যারিকেন। মৃদু আলো হ্যারিকেনের আশপাশে। হ্যারিকেনের আলোয় ফাতেমার শরীরের দীর্ঘ ছায়া সারাঘরে ছড়িয়ে পড়ে। আচমকা সে ছায়া দেখে নিজের ভেতরেই কেমন যেন কুঁকড়ে যায় ফাতেমা। ভয় কাজ করে ওর। পুরো ঘরজুড়ে নিজেকে ছড়িয়ে দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় ফাতেমা। পাল্লা সামান্য ফাঁক করে বাইরে দেখার চেষ্টা করে। ঘুটঘুটে অন্ধকার যেন গিলে খেয়ে আছে সবকিছু। অন্ধকারের মধ্যে আরও গাঢ় আরও গভীর অন্ধকার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে গাছগুলো। কোনটুক জল আর কোনটুক মাটি, বোঝাই যায় না। অনেকটা সময় চোখ রেখে কোনো নৌকা দূরে থাক কারও বাড়ির একটি কোষা নাও কিংবা কোন্দাও দেখল না ফাতেমা। তবে বৈঠার ছপ ছপ শব্দ কিসের! কোত্থেকে আসে এ শব্দ। বুঝতে চেষ্টা করে। চোখ রেখে কান পেতে ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করে ব্যাপারটি। একসময় দরজার খিল এঁটে খাটের কাছে এসে দাঁড়ায় ফাতেমা। বাঁ হাতে হ্যারিকেনটা তুলে ধরে ওপরে। একে একে ঘুমন্ত মানুষগুলোর মুখ দেখে ও। যুদ্ধের সময় নাতিরা দেশে এসেছে। এসেছে ছেলেমেয়ে সবাই। কার মুখ থেকে লাল ঝরছে। কার গলা কে বেড় দিয়ে আঁকড়ে ধরেছে, কার পিসি চেপেছে, তা নড়চড় দেখলেই বোঝে ফাতেমা। এমনি করে ছোট-বড় সবাইকে দেখে স্বামীর পাশে এসে দাঁড়াতেই বুক ধক্ করে ওঠে ওর। দু-পায়েরই হাঁট ভাঁজ করা। তবে এক পা খাড়া। আরেক পা ইলয়ে আছে। দু-হাত বুকের ওপর সমান্তরাল রাখা। মুখ বেশ উজ্জ্বল। চোখ দুটো বুজে আছে। যেন পরম তৃপ্তির একটা ভাব। সারাটা দিনই বুকে না-কি ব্যথা হয়েছে। কিন্তু ওই জঙ্গল থেকে আর খবর পাঠায় কীভাবে। তাই ব্যথা সয়েই জঙ্গলবাস করে এসেছে। কিন্তু রাতে শোবার আগে ব্যথাটা না-কি ফের বেড়েছে। চারদিকে ধু-ধু জল। জল ছড়িয়ে নানা জায়গায় পাকসেনাদের পাহারা। যখন তখন স্পিডবোটে এসে হাজির হয় ওরা। সামান্য সন্দেহ হলেই গুলি চালিয়ে দেয়। ঝোপেঝাড়ে উঁচু সড়কে পাহারায় আছে রাজাকার। তখন কোত্থেকে ডাক্তার আনবে দূরের এই গ্রামে। ডাক্তার হাফিজ নিজের ডিসপেনসারির ইমার্জেন্সি ওষুধ থেকে কী একটা ওষুধ খেয়ে নিল। তারপরও চোখে-মুখে অসহ্য এক যন্ত্রণার ছাপ ছিল ওর। কিন্তু এখন যেন পরম শান্তি আর তৃপ্তি নিয়ে ঘুমোচ্ছে। কোনো যন্ত্রণা নেই বুঝি শরীরে। বুকের খুব গভীর থেকে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে ফাতেমার। কিন্তু পেট উঠছে নামছে কই? শ্বাস-প্রশ্বাসের কোনো নমুনা তো চোখে পড়ছে না। তবে কী ভুল দেখছে চোখ। এক লাফে খাটে উঠে বসে ও। ডা. হাফিজের পাশে বসে ও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। না, কোনো ওঠানামা তো চোখে পড়ছে না। বুকে হাত দেয়। কোনো ধুকপুক নেই। চোখের পাতা খোলার চেষ্টা করে, পারে না। পায়ে হাত দিতেই ঠা-া কিসের অস্তিত্ব ওর হাতে ঠেকে। সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার দিয়ে ডা. হাফিজের বুকের ওপর আছড়ে পড়ে ফাতেমা।
সে চিৎকার ঘর ছাড়িয়ে উঠোন, উঠোন ছাড়িয়ে পাশের ঘর আর উঠোন, তারপর এ-বাড়ি ও-বাড়ি, ছাড়া বাড়ি, পুব বাড়ি, পশ্চিম বাড়ি ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তে। এবার সত্যি সত্যি অগুনতি নৌকো ছপ ছপ বৈঠা ফেলে ডাক্তার বাড়ির দিকে ছুটে আসতে থাকে। সেসব নৌকা থেকে বেশ কটি নৌকা আবার চলে গেছে দূরের আত্মীয়-স্বজনদের খবর দিতে ভিন গাঁয়ে।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার বাড়ি ভিড় বাড়ে মানুষের। উপচেপড়া ভিড়। সে ভিড়ে একসময় এসে যুক্ত হয়Ñ হাশিম, নূর আলি, মাকসুদ আর লতিফ। ওরা এলাকায় রাজাকার সদস্য। হাশিম প্লাটুন কমান্ডার। হিংস্র কুকুরের চেয়ে ভয়াবহ তাদের আচরণ। ওদের নৃশংসতার খবর শুনে যে কারও বুক হিম হয়ে আসে। মানবতার ‘ম’ নেই ওদের আচরণে চিন্তায় কাজেকর্মে। নৃশংসতার দিক থেকে অনেক সময় ওদের ভূমিকা পাকহানাদারদের চেয়েও কম না। কোনো জনমে ওরা বাঙালি ছিল কি না সংশয় আছে মানুষের মনে। ওদের দেখে মানুষজন এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করতে থাকে। কেউ ভেতর বাড়ি কেউ আড়ালে চলে যেতে থাকে। মুহূর্তে সামনের উঠোনের ভিড় হালকা হয়ে আসে রাজাকারদের ভয়ে! প্রবীণদের কয়েকজন এগিয়ে যায় ওদের কাছে। বাঁ হাতে রাইফেলের পুরো শরীর আর ডান হাতের আঙুল ট্রিগারে আছে কমান্ডার :
Ñ এইহানে এত ভিড় ক্যা গো।
Ñ মানুষ মারা গেছে গো।
Ñ কেডায়?
Ñ ডাক্তারে!
Ñ মানে হাফিজ ডাক্তার!
Ñ হ্যারে খুঁজতে খুঁজতে আমগো চোখখু দুইডা আন্ধা হওনের যোগাড়। এই চুদির পুতে এফি আইলো কহন মরতে।
Ñ একটু ভাইভ্যা কথা কইয়েন পিসি সাব। উনি একজন সম্মানিত মানুষ ছিলেন। এখন মৃত। মরা মাইন্যেরে গাইল পাড়েন ক্যা। নিজেও তো মরবেন একদিন! হেই ভাওমত কতা কইয়েন!
সঙ্গে সঙ্গে দুই রাজাকার রাইফেল তাক করে ওদের দিকে। কথা বাড়ইলে গুলি মারুম। দেশবেচইন্যা পুংগির পুতেরা সব এইহানে জোট বানছে। জলদি জলদি বিদায় কর হগলরে, এত মানু এক ফাই থাওন যাইব না। যে যেমতে আইছে খালি বিদায় করেন। হাফিজ ডাক্তার, হেই মরলি তো মরলি, আমগো ঘুম হারাম কইরা তবে মরলি। মাইন্যের কাতারে তরে হিসাব করণও হারাম। জাহান্নামের আগুন।
একসময় অগুনতি নৌকা ছুটে চলে ডা. হাফিজের লাশ নিয়ে। চারদিকে উঁচু মাটি নেই কোথাও। সব ডুবে আছে জলে। তাই এতদিন পুরনো যে কবরস্থানে লুকিয়ে ছিল ও। সেখানেই কবর দেয়ার কথা ভেবে রেখেছে বাড়ির লোকজন! ওদিকেই মানুষ চলেছে নৌকা নিয়ে। অগুনতি নৌকা এসে দরগার মসজিদের ঘাটে ভিড় করে। রাজাকার বাহিনিও আসে ওদের সঙ্গে। আরও কজন রাজাকার মসজিদ লাগোয়া চা-স্টলে অপেক্ষা করছিল। ওরা তাড়া দেয়। চালাইয়া কাম সারেন। দেরি করণের কোনো ভাও নাই! কিন্তু গোর দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। কবলের জল যত সেঁচে ততই নতুন জল ওঠে। প্রায় হাঁটু অবধি জল কবরে। জায়গাটি বেশ উঁচু। পুরনো সব কবর চারদিকে। বাঁধানো কবরগুলোর দেয়াল শ্যাওলায় ঢেকে আছে। কোনোটার পলেস্তারা খসে গেছে অনেকদিন। ইটের ফাঁকে ফাঁকে লতানো গাছ বেরিয়ে আছে। কোনো কোনো কবরের গায়ে মৃতের নাম লেখা থাকলেও তা আজ বিলুপ্তির ঠিকানায়। এমনি এক প্রাচীন কবরেও জল আর জল। সেচে কুলোতে পারছে না তিন তিনজন মানুষ। এদিকে রাজাকররা বারবার তাগাদা দিচ্ছে দাফন সেরে ভিড় কমানোর জন্যে। ওদের বাস্তবতা বুঝিয়ে বললে বলে, এইডা কী মানুষ বড়! লেপতোষক জাজিম লাগবো। মরা লাশ আর মরা গরুর মাঝে ফারাক আছে কুনো। গরুরে যদি পানিতে ভাসান দেওয়া যায়। তয় মরা মানুরে আডা পানির মাঝে শোয়াইতে কী এমুন অসুবিধা। রাজাকার নূর আলি কথাগুলো বলে তাকায় আশপাশের মানুষের দিকে। দেখে কেউ কোনো প্রতিবাদ করছে কি না। কথার ঘায়ে ডাক্তারের শীতল শরীর ক্ষত-বিক্ষত করে যেতে পারলেই যেন যত সুখ। ডাক্তার অইলো দোজখের খড়ি। কই হেরে দিয়া আগুন জ্বালাইব খোদায় আর পাগল গুলান হেরে মাতায় রাখব না বুকে রাখব হুশ করতে পারে না। আল্লার ভাও বুঝলে তো জাহান্নামের খড়ি অইয়া মরে নাÑ নাওজুবিল্লা মিন…। আবারও তাকায় রাজাকারগুলো। না কেউ মুখ খুলছে না। আসলে ওদের মুখের সামনে কে মুখ খুলবে!
রাজাকারগুলো ফের তাড়া দেয়, চালাইয়া কাম সারেন গো চালাইয়া! পরে কিন্তু খান সাবরা আইলে গুল্লি করা ছাড়া উপায় থাকব না। আন্ধা-গুন্ধা যেমনে পারমু গুল্লি ছাড়–ম। আমাগো ভালা মানু পাইয়া হিসাবেই আনতাছ না গো। চোখটা পাল্ডি দিমু তহন বুঝবা কত ধানে কত চাইল। এমন ডা. হাফিজরে কুত্তা দিয়া খাওনের কতা। বেইমান পাক দেশের দুসমন হের লেইগ্যা আবার দাফন। আবার ঘণ্টায় ঘণ্টায় সময় দেওয়ন। কী মামাবাড়ির আবদার? অই নুরু, মকসু পারলে গিয়া ডাক্তারের লাশ এট্টু মুইত্যা দিয়ায়। মাইন্যের মুত দিয়াই হেরে গোসল দেওনের কাম। হেয় হেইডারই কাবিল! বলেই হাসু একটা ব্ল্যাঙ্ক ফায়ার করে! লোকজনের একটু ছুটোছুটি দেখে ভীষণ আনন্দ হয় ওর। অন্য রাজাকারদের চোখেমুখেও তৃপ্তির আভা!
একসময় দাফন শেষ হলে সবাইকে তাড়া করে ঘাটে নিয়ে দাঁড়া করায় রাজাকারগুলো। হুইসেলের পর হুইসেল বাজিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে ওরা। শোনেন, একেক নাও একেক ফাই যাইব। সব নাও এক ফাই যাইতো পারবো না। একটা নাও পুবে যাইবে তার দশ মিনিট বাদে আরেক নাও খাড়া পশ্চিমে। নাও বাইবা। আর দল পাকাইবা তা অইবো না! বলেই রাজাকারটা গুড়–ম গুড়–ম দু রাউন্ড ফাঁকা গুলি করে। মুহূর্তে ভয়ার্ত পরিবেশের সৃষ্টি হয় আশাপাশে। ঠিকই দশ মিনিটের আগে একটা নৌকাও যেতে দিচ্ছে না। সব মানুষ জড়ো হয়ে আছে ঘাটে। ঘাটের পাড়ে। ওরা নিরস্ত্র। রাজাকারদের হাতে অস্ত্র। যে কোনো সময় যে কারও বুকে গুলি চালিয়ে দিলেও কারও বলার কিছু নেই, ওরা সব পারে। ভেবে মানুষগুলোর মুখ শুকিযে আমচুর। চোখেমুখে হতাশা কখনও আতঙ্ক। শেষে লাশ গোর দিতে এসে ওরাই বুঝি লাশ হতে যাচ্ছে। একসময় ভিড় হালকা হয়ে এলে রাজাকারদের নৌকো তরতর করে এগিয়ে যায় থানা সদরের দিকে।
ডাক্তার হাফিজের গুণগ্রাহীর অভাব নেই। চিকিৎসা দিয়ে সেবা করবে বলে যে অবসরের পর ঢাকা শহর ছেড়ে গ্রামে চলে আসে, তার শুভাকাক্সক্ষীর তো অভাব হতে পারে না। যে রোগী ওষুধ কিনতে পারে না তাকে ওষুধ দেয় নিজের ডিসপেনসারি থেকে বিনে পয়সায়। তখন তার চল্লিশায় মানুষ তো হবেই। মানুষের ওপর মানুষ। চারদিকে থই থই জল। আর জল ছাপিয়ে আসছে মানুষ ডাক্তার বাড়িতে। থই থই মানুষ বাড়িজুড়েÑ যেন কোনো দ্বীপের হাটে মানুষের ভিড়। দ্বীপের চারপাশে জল আর জল। দুপুরের আগখানে সে ভিড় উপচে পড়বে যেন। নৌকোর সারি। তার সঙ্গে আছে কোষা, কোন্দা, ভেলা কতকী জলবাহন মানুষ আসছে। যেদিক তাকাও মানুষ। এমনিতে জল আর যুদ্ধ মানুষেকে ঘরবন্দি করে রেখেছে। সুযোগ নেই যখন তখন ঘরের বাইরে যাবার। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এ এক মোক্ষম সুযোগ যেন। মৃতের সৎকার অনুষ্ঠান। সেখানে কোনো ভয় নেই। তার সঙ্গে অনেকের ঘরে খাবার জুটছে না ঠিকমতো। বর্ষায় ফসল নেই। খাবার নেই। কাজও নেই, যুদ্ধ চলছে দেশে। সে সঙ্গে ডাক্তারের প্রতি ভালোবাসা। সব মিলিয়ে মানুষ আসছে। বেশুমার আসছে। আয়োজকদেরও এ নিয়ে ভাবনা নেই। ডা. হাফিজের চল্লিশায় মানুষ আসবে না তো কার ওখানে আসবে? এমনকি ধারণা সবার। সে পরিকল্পনা নিয়েই চুলো বেঁধেছে উঠোনজুড়ে। হাঁড়ি চড়িয়েছে এক দুই তিন… গুনে শেষ করা যায় না। নদীর ওপার থেকেও হাড়ি জোগাড় করা হয়েছে লোক পাঠিয়ে।
দুপুর যখন একটু হেলছে। ছায়ারা একটু একটু করে বড় হচ্ছে। প্রথম ব্যাচে লাইন ধরে মানুষ বসেছে উঠোনজুড়ে। কুকুর আর কাকের উৎসব চারদিকে। তখনই তিন তিনটে হেলিকপ্টার পত পত পত করে উড়ে এলো তিন দিক থেকে। একটা হেলিকপ্টার অনেক নিচে নেমে এলো। ওপর থেকে ইশারা দিল নোকজনকে সরে যেতে। উঠোন ছেড়ে মানুষ ছড়িয়ে পড়তেই হেলিকপ্টারটা নেমে আসে। ল্যান্ডিং করে উঠোনে। কপ্টারের পাখার প্রচ- ঘূর্ণিতে মানুষের শরীরে কাঁপন ধরে যাবার জোগাড়। গায়ের কাপড় উড়ে যাবে যেন। একসময় পাখা শান্ত হতেই সাত-আটজন পাকসেনা স্টেনগান, এলএমজি এমনি অত্যাধুনিক অস্ত্র তাক করে নেমে আসে লাইন ধরে। মেজর রুশদিকে ঘিরে অন্য সৈন্যরা দাঁড়িয়ে পড়ে। সবার চোখেমুখে বাঘের হিংস্রতা। চোখ ফেটে পড়বে যেন ক্রোধে। রক্ত জমাট বেঁধে আছে সবকটি চোখের মণিতে। মেজর রুশদি গর্জে ওঠে,
Ñ ইধার কায়া হো রাহা হ্যায়? ইত্না আদমি কিউ?
যাদের মুখে দাড়ি আছে পাঞ্জাবি পরনে মাথায় টুপি অর্থাৎ দেখতে মৌলভি গোছের। বোঝা যায় ওরা মুসলমান, এমনি পাঁচ-ছ’জন মরুব্বি এগিয়ে যায়। মুরুব্বিরাও দেখতে পাঞ্জাবিদের মতো। লম্বায় ছ-ফুট প্রত্যেকেই। এদের মধ্যে প্রথমে এগিয়ে গেল রফি হক, তার পেছনে রিয়াজ। এরপর করিম ব্যাপারি ও তার ছেলে জামাল। ফের কর্কশ কণ্ঠে কঁকিয়ে ওঠে মেজর রুশদি। কেয়া হুয়া? কোই বাত নেহি কারনে হো? আসলে সবাই দীর্ঘদেহী হলেও কারও মুখ থেকে কথা সরছে না। আতঙ্ক তো আছেই, তার ওপর ভাবছে ওরা উর্দুতে বললে হয়তো কোনো বিপদ হবে না। কিন্তু উর্দুতো আর ওরা তেমন জানে না। ছোটবেলায় মাদ্রাসায় এক-আধুটা পড়েছে। তার ওপর মিলিটারি সামনে। বন্দুক তাক করা, তাই মুখে কিছু উঠছেও না এখন।
Ñ কেয়া বাথ হ্যায়, খামোশ কিউ হু? ইধার ক্যোয় মুক্তি কা ট্রেনিং হো রাহা হ্যায়? ইয়ে কেয়া তুম লগোকা মুক্তিকা ট্রেনিং ক্যাম্প হ্যায়? শা…লা কো বাচ্ছে!
Ñ ইয়ে এক মসুলিম ক্যা ঘর হ্যায়। ইধার এক মুরদা কা চেহলাম হো রাহা হ্যায়।
Ñ কিয়া মুরদা?
Ñ এক আদমি ইন্তেকাল ফরমাইয়ে উসকো চেহলাম।
Ñ কসিকা চেহলাম হ্যায়!
Ñ এক ডক্টর! বহুত পরহেজগার অর সাচ্চা মুসলমান হো। লোগেকে বহুত কাম আতে হে। ডক্তারকা ইন্তেকাল হো গেয়া, উনকা চেহলাম।
Ñ কিসকা চেহলাম?
Ñ ডক্টর সাবকো!
Ñ ডক্টর সাব! নাম কিয়া থা?
Ñ ডক্তটর হাফিজ!
ডাক্তার হাফিজ! সাচ্চা মুসলমান থে? ইয়াকিন নেহি আতা! বলেই ঠাস করে এক চড় কষায় রফি হকের গালে। অপ্রস্তুত রফি। অত বড় শরীর সামলাতে পারে না। হেলে যায় শরীর। উয়ো সাচ্চা মুসলমান থা? উয়ো মালাউন থা, উতো মুক্তি লোগোকা সাথ বেতাথা; ইনকে চারপুস্ত মালাউন হ্যায়। উয়ো ইন্ডিয়ান সরকারকে এজেন্ট থা। অর তুম উনকো সাচ্চা মুসলমান কা নাম দে রেহে হো। তুম শালা নিমকহারাম। ঝুটে! বলেই হাঁটু বরাবার লাথি ঝাড়ে মেজর। এবার হুমড়ি খেয়ে পড়ে রফি। রিয়াজ দু-হাত করজোড়ে অসহায় হয়ে বলল, উনকো মারিয়া মাত, উয়ো চিটার হ্যায়, হেড টিচার! উ বহাত খানদানি আদমি হ্যায়!
Ñ কেয়া বোলা তম উ চিটার হ্যায়?
Ñ হ্যাঁ ইয়ে আদমি টিচার হ্যায় হেড টিচার।
Ñ নেহি, উ, টিচার নেহি, উ চিটার হ্যায়। তুম বাঙালি লোগো মে টিচার, ডাক্তার, জার্নালিস্ট সবকে সব বেইমান, নিমকহারাম, মুসলমান কে দুশমন হো!
তুম ভি শালা দালাল, উন লোগোকে বারে মে, বাত কারণে আয়ে হো। বলেই রফিকের নাক বরাবর এক ঘুষি মারে মেজর। মুহূর্তে কলকলিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে নাক গলিয়ে। তুমলোক সবকে সব ঝুটে হো। তুম লোগোকে সারছেগাও তাত্ ঝুট হি ঝুট, তোম লোক কা পাকিস্তান কে হারামকে অওলাদ হো।
ওদের তুলনায় জামানের বয়স কিছুটা কম। ওর হাত নিশপিস করে। বড় দুই মামার গায়ে এভাবে হাত তোলায় দারুণ যন্ত্রণায় পুড়ছে ও। বিবেকের কাছে ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে। একবার নিজের হাতের দিকে তাকায়। একবার আকাশের দিকে তাকায়। আকাশে একটা হেলিকপ্টার তখনও চক্কর দিচ্ছে। আরেকটা চলে গেছে কখন যেন। জামান তড়িঘড়ি জল নিয়ে রিয়াজের নাকে ছিটাতে থাকে।
Ñ ইয়ে পাহলোয়ান, তুমকে কিসমে বোলা পানি দেনে কে লিয়ে। তোমকা মুক্তি হো? গর্জে ওঠে মেজর রুশদি।
Ñ নেহি, ইয়ে আদমি গভ. অফিসার হ্যায়, ব্যাংক কে ম্যানেজার।
Ñ কেয়া বোলা তুম মে, ব্যাংক ম্যানেজার! শালা বেইমান কা বাচ্চা, খাতারনাক তুমলোক খ্যাতে হো পোহেনাতে হো পাকিস্তানক্যা, অর ইন্ডিয়াকো রুপিয়া ভেস্তে হো, শুয়োর কা বাচ্চা, তোমলোক সবকেসব ঝুঁটে মাক্কার। বলেই রফির পাছায় লাথি ঝাড়ে জোরসে। রক্তাক্ত মুখ নিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে ও উঠোনে।
এবার করিম ব্যাপারি এগিয়ে যায়। মেজর সাব, ইধার সব মুসলমান হ্যায়। আপ ভি তো মুসলিম হ্যায়! ইয়া এক মুসলমান আদমি কা চেহেলাম চালরাহা হ্যায়। আপকো কোই গলদ ফাহেমি হুয়া হ্যায়। ইধার কোই পাকিস্তান কো দুশমন নেহি হ্যায়। আপ খামোখা সবকো দারা রেহে হ্যায়। খোদা কো লিয়ে আপলোক সামঝিয়ে ইধার সব সাচ্চা মুসলমান হ্যায়। আপলোক জুলুম করনা বান্ধ কি জিএ।
Ñ কেয়া বোলা তুম মে, জুলুম!
Ñ কিসকো তুম জুলুম কারনা বলতে হো? তুম মুক্তিলোক হামলোগোকো তাংকাররোহে হো, আমলোগোকো ক্যাম্প জ্বালারেহে হো, হামলোগোকে গাড়ি জ্বালালেহে হো, এক কে বাদ এক ক্ষতিকাররেহে হো অর সাচ্চা মুসলমানলোগোকো তুম জানছে মাররেহে হো? এরপর চোখে ইঙ্গিত করে সিপাহীদের বলল, ইয়ে সাচ্চা মুসলমানলোগোকো থোরা খেল দিখা দো। ওর ইঙ্গিত পেয়ে আর্মিরা করিমকে ফুটবল বানিয়ে খেলতে থাকে। এক লাথিতে এদিকে ফেলে তো আরেক লাথিতে ওদিকে হুমড়ি খেয়ে পড়ে।
জামান এবার এগিয়ে যায়। ওকে কাছে আসতে দেখে মেজর চুকচুক করে ওঠে! পাহলোয়ান সাব তুম কিউ ইধার আ রেহে হো, কুচ বলনেকা হেয়?
Ñ ইয়ে আদমি মেরা আব্বু হ্যায়। আপলোক কিউ সব লোগোকে সামনে উনকো বেইজ্জত করর‌্যাহে হেয়। আব্বু এক সাচ্চা মুসলমান হ্যায়, পাচ ওয়াকত নামাজ কোরান পারতেহো।
Ñ পাহলোয়ান সাব ইধার আও। তুম কিয়া মুক্তি হো!
করিম ব্যাপারি ছ-ফুটের বেশি লম্বা। ফর্সা। চাপ দাড়ি নাভি ছাড়িয়ে পড়েছে। দিঘল চোখ। সে চেবাখে পবিত্র এক আলো। তারই অবিকল জামান। কেবল ওর মুখে দাড়ি নেই। ওকে ফের কাছে ডাকে ইধার আও পাহলোয়ান। তুম মুক্তি হ্যায়?
Ñ নেহি সাব! ম্যায় বিজনেস কারতে হ্যায়।
Ñ বিজনেস! কিসকে বিজনেস?
Ñ মেরা খুদকা পাট কা বিজনেস হ্যায়!
জুট! ঠোঁট কামড়ে মাটিতে জোরে একটা ঠেকা দিল বুট জুতো দিয়ে। ঠকাস করে শব্দ হতেই চমকে ওঠে অনেকেই।
Ñ ইধার তো সবলোক কো গাদ্দার হ্যায়। ইস সময় তুম পাকিস্তান ম্যা জুট না ভেস্কে তুম ইন্ডিয়ামে ভেসরেহে হো। মালাউন লোগো কে সাত দোস্তি বারারেহে হো!
Ñ নেহি সাহাব! যুদ্ধ কে লিয়ে সব কামকাজ বন্ধ হ্যায়।
Ñ কে বোলা তুমি মে যুদ্ধ! কাঁহা দেখা তুম মে যুদ্ধ!
Ñ যুদ্ধ ক্যা মতলব ওয়্যার? তোতলাতে থাকে জামান!
Ñ ওয়্যার! তুম কাঁহা দেখা? পুরা বাঙ্গাল মুল্লুক মে শান্তি হ্যায়। আর তুম লোক মালাউন কে সাত মিলকে যুদ্ধ যুদ্ধ বলকে, তামাম জাঁহা মে আগুয়া ফ্যায়লা রাহো হো। সাচ বাদ ইয়ে তো কি হ্যায় তুমলোক ইন্ডিয়াকা এজেন্ট হো। অর ইন্ডিয়াকে লিয়ে কাম কাররাহে হো। মুচকি হেসে তোমরা কাপড়া ওঠাও।
Ñ ম্যায় সাচ্চা মুসলমান মেরা খাতনা হুয়া হ্যায়। ক্ষোভে, ক্রোধে, ভয়ে রীতিমতো কাঁপতে থাকে জামান।
Ñ পাহেলে পাঞ্জাবি কা হতা গোটাও।
জামান পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে ওপরে তোলে। কনুইয়ের ভাঁজ হাত দিয়ে ঘষে ঘষে দেখে মেজর। এরপর ফের লুঙ্গি তুলতে বলে! জামান অবাক হয়ে তাকায়! ভাবে সত্যি সত্যি ওর লিঙ্গ দেখতে চাচ্ছে মেজর সাব! তাই বাধ সাধে ও, হাম সাচ্ বাদ বল রাহা হে, মেরা খাৎনা হুয়া হ্যা! মেজর একটু মুচকি হেসে বলে, না না, হাঁটুকা ওপার মে তোলো।
জামান হাঁটু অবধি লুঙ্গি তোলে। হাঁটুর ভাঁজে খসখসে পুরু চামড়া বারবার হাতে ঘষে দেখে মেজর। সামরিক প্রশিক্ষণ নিয়েছে কি না তার প্রমাণ খোঁজে হাঁটু-কুনুইয়ের ভাঁজে-ভাঁজে। এরপর পাঞ্জাবি খুলতে বললে তা-ও খুলে দেখায় জামান। ওঠো ঠিক হ্যায়।
বাড়িজুড়ে থই থই মানুষ, উপচে পড়া মানুষ হলেও সবাই মুখে কলুপ এঁটেছে। কারও মুখে কথা নেই। নীরব দর্শক সবাই। শুনশান নীরবতা চারদিকে। এত মানুষের ভিড়ে এমন নিঃসীম নীরবতা নেমে আসে কেমন করে। যেন ভুতুড়ে বাড়ি এটা। জনমানব শূন্য। এমনিতে উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিমে যতদূর জলাভূমি, নামাভূমি বিল আর হাওড় আছে, সবখানে লাশ আর লাশ। যুদ্ধের শুরু থেকে এ এক নিত্যকার চিত্র। লাশর ওপর লাশ। নদীতে ভেসে যাচ্ছে লাশ। নারী পুরুষ শিশুর লাশ আর লাশ। গরু ভেড়া ছাগল এমনি কত মড়া ভেসে যাচ্ছে গলিত অর্ধগলিত, উলঙ্গ, চোখহীন, অঙ্গহীন অসংখ্য লাশ ভাসছে। লাশ জমে আছে স্তূপ হয়ে অনেকগুলো আবার বাঁশের চালির মতো দড়ি দিয়ে পাশাপাশি বাঁধা। ওদের হাত বাঁধা। চোখ বাঁধা। লাশের সারি নদীর স্রোত ধরে নেমে যাচ্ছে ভাটির টানে। লাশ ঠুকরে ঠুকরে মাংস খেয়ে মাছেরাও এখন ক্লান্ত।
সেসব লাশের ওপর নজর পড়েছে চিল শকুন আর কাকের। দিনভর এরা উড়ে বেড়ায় চালায় নামার ভূমিতে জমে থাকা বর্ষার জলের ওপর। মাছের দিকেও ওদের দৃষ্টি। যখন তখন ছোঁ মেরে মাছ তুলে নিচ্ছে জলের গভীর থেকে। তাই দিনভর ডাক্তার বাড়ির সামনের খোলা প্রাঙ্গণে জলের ওপর কাকের ডাক, চিলের কান্না আর শুকনের কুঁই কুঁই ডাক। আজ ওদের ভিড় আরও বেড়েছে। ওদের ডাক আরও চড়া সুরে বাজছে খোলা চাতালজুড়ে। অনেকগুলো গরু কাটা হয়েছে। কাটা হয়েছে খাসি। মুরগিও ধড়ফড় করে নীরব হয়ে গেছে চিরতরে অসংখ্য। সুতরাং ভুঁড়ি ভোজের আয়োজন শুধু আজ ডাক্তারবাড়ি জুড়ে নয়, সে আনন্দ কাক ছিল, শকুন আর কুকুরদের প্রাণেও ছড়িয়েছে। ডাকাডাকি আর কলরব চারদিকে মুখর করে রেখেছে ওরা। কিন্তু পাকসেনারা আসার পর ডাক্তারবাড়ির শ্মশান নীরবতা ওদেরও যেন ছুঁয়ে গেছে পলে পলে। ছুঁয়ে যাচ্ছে সারাবাড়ির আতঙ্ক আর নিঃশব্দতাকেও। সবদার বাড়ির জঙ্গলে উঁচু বাঁশঝাড়ে কয়েকটা শকুন দিনভর কোঁকাচ্ছিল। কাঁদছিল যেন শিশুর মতো। সেই শকুনগুলো যেন হঠাৎ সব ডাক ভুলে গেছে। ভুলে গেছে ওড়াউড়ি। মাঝেমাঝে গলা উঁচিয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল। ফের স্থির। একই চিত্র নুরুদের তালগাছের মাথায় বসে থাকা শকুনগুলোর বেলায়ও। চিলেরা দু’ডানা ছড়িয়ে কেবল দিঘল ছায়ায় ঢেকে দিচ্ছে জল। কোনো ডাকাডাকি নেই। শিকারের পাঁয়তারা নেই। ওড়ার কোনো ছন্দ নেই। গতি নেই কেবল দু’ডানা ছড়িয়ে সমান্তরাল উড়ে চলেছে। অনেকদূর চলে গিয়ে ফের ফিরে আসছে। কেমন হাহাকার যেন ওদের আচরণে উড়ে যাওয়ার মাঝেÑ সবখানে। গোরু খাসির বর্জ্য পড়ে আছে পেছনে এক পরিত্যক্ত ঘাটে। কিন্তু সেখানে মুখ দেয়ার, খুঁটে দেখার কোনো আগ্রহ নেই চিল আর কাকেদের। বিশেষ করে কুকুরগুলো হঠাৎ হঠাৎ সমস্বরে কুঁই কুঁই করে ডেকে উঠছে প্রলম্বিত সুরে। তখন বেহাগের করুণ সুর যেন চারদিকের সকল অস্তিত্বকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে। অনেকগুলো নেড়ি কুকুর দূরে বসে লেজ নাড়ছে কেবল। চোখে পিটুটি না জল ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। এমনিতে ভরা বর্ষায় খাবার না পেয়ে দূরে কোথাও যেতে না পেরে কুকুরগুলোর ত্রাহী ত্রাহী অবস্থা। তারপরও খাবারের প্রতি আজ ওদের বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। বরং মনে হচ্ছে বর্জ্যগুলো পাহারা দিচ্ছে বিশ্বস্ততার সঙ্গে। সবখানে গাঢ় এক নীরবতা। সব উদ্দাম, উচ্ছলতা আর প্রগলভতা হারিয়ে ওরা যেন দিকশূন্য। কিংবা চরিত্র শূন্য হয়ে ওরা ভুলে গেছে কেন এসেছে এ পৃথিবীতে। কী তার কাজ। কি তার ভূমিকা। তার আচরণই বা কী। নীরব নিশ্চয়ল গতিহীন গতিহারা পথভুলো হয়ে যেন ওরা পাক খাচ্ছে এখানে-ওখানে। নিঃশব্দে। নিঃসীম নীরবে।
মেজরের ইশারায় পাকসেনাদের সবকটি মাথা কাছাকাছি হয়। কী যেন শলাপরামর্শ করে। তারপর সব লোকজনদের বলে লাইন করে দাঁড়াতে। তখন মনির খান তাদের আপ্যায়নের অনুরোধ জানায়।
তোমাদের জন্য সবাই না খেয়ে আছে। তোমরা আমাদের সঙ্গে খেলে আমরা খুশি হবো এটা মুসলমানের অনুষ্ঠান!
Ñ ফের তুম খুদ কো মুসলমান বোল বেহে হো। তুম কোই ভি মুসলমান নেহি হ্যায়। তুমলোক মালাউনকা বাচ্চা হো!
বলেই সবাইকে লাইন ধরতে বলে। তার আগে রফি, রিয়াজসহ প্রথম পাঁচজনকে আলাদা করে লাইন করে দাঁড় করায়। এরপর শয়ে শয়ে মানুষের লাইন। ওরা আটজন আর্মি দুদিকে গেটের মতো দাঁড়িয়েছে। ওদের মাঝখান দিয়ে একজন একজন করে পার হচ্ছে। খুব কাছ থেকে দেখছে সবাইকে। যাচাই করছে তীক্ষè চোখে। তারপর যাকে সন্দেহ হচ্ছে তাকে আলাদা করে লাইনে দাঁড় করাচ্ছে। এমনি করে বাছাই পর্ব শেষ হতে হতে সন্ধ্যা উৎরে যায়। এরই মধ্যে আরও একটা হেলিকপ্টার আসে। দুটো হলিকপ্টার থেকে সার্চলাইট ফেলা হয় উঠোনে। এমনি করে আগের পাঁচজনসহ আরও ষোলোজনকে এক লাইনে দাঁড় করায়। এবার একুশজনকে বলে, ইজি হয়ে দাঁড়াও। মার্চ করো। মার্চ করতে করতে পশ্চিম বাড়ির ঘাটে এনে দাঁড় করায় ওদের। ঘাটের ডান পাশে ঢিবি মতো উঁচু জায়গা। ওখানে এ বাড়ির মসজিদ আর মক্তব।
মসজিদ দেখিয়ে করিম ব্যাপারি বলে,
Ñ তোম লোগোকো ইয়েকিন নেহি আতা হ্যায় তো চালো মাসজিদ মে চলো। তোমলোক দোখমে উধার আমপারা হ্যায়, কোরান মজিদ হ্যায়। সব বাচ্ছে লোক ইধার আকে কোরান মজিদ পাড়তে হ্যায়। নামাজ পাড়তে হ্যায়।
Ñ রাখদো তোমারা কোরান! ওয়াক্ত আনেসে দেখ লেংগে।
এ ঘাটটি পশ্চিম উঠোনের পাড়ে বাঁধা হয়েছে। খেজুর গাছ, তালগাছ আর মোটা মোটা সব গাছের গুঁড়ি ফেলে ঘাটটি তৈরি। এমনি আরেকটি ঘাট আছে পুববাড়ির শেষে। বর্ষার জলে স্নান করা ধোয়া-মোছার সব কাজ চলে এ ঘাটে। সময়ে নৌকো কোষা ডিঙ্গি এসে ভেড়ে।
ওদের সঙ্গে সঙ্গে হেলিকপ্টার দুটোও চলে আসে ঘাটের কাছে। সার্চলাইট মাঝে মাঝে জ্বালছে আবার নিভিয়ে দিচ্ছে। হেলিকপ্টারের বাতাসে জলে তোলপাড়। বেশ বড় বড় ঢেউ উঠছে। ঢেউ এসে মাথা কুটছে ঘাটে। উঠোনের পাড়ে পাড়ে। কখনও লাইটের আলোয় অনেকদূর চোখে পড়ে। ধু-ধু জল চারদিকে। কপ্টারের বাতাস যদ্দুর যাচ্ছে কেবল ঢেউ আর ঢেউ। একুশজন মানুষ কেউ কারও দিকে তাকাচ্ছে না। নিশ্চয় মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। কী বলছে ওদের মন, পড়া যাচ্ছে না। পাকসেনাদের মতিগতিও বোঝা যাচ্ছে না। কেন এত মানুষ থেকে ওদেরকে বাছাই করল, কেন লাইন করে ওদের নিয়ে এলো। কেন দাঁড় করিয়ে রাখছে। কী করতে চায় কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। পিনপতন নীরবতা চারদিকে। ওদের পেছন পেছন আসা মানুষেরা কেউ কাছে যেতে পারছে না। আবার না বলা পর্যন্ত এ স্থান ছেড়ে যাওয়াও নিষেধ। তাই সবাই দূর থেকে দেখছে সব। ওদের কণ্ঠ শুকিয়ে কাঠ। চোখ পাথরের মতো খরখরে আর স্থির। চোখে-মুখে আতঙ্ক। শরীরে রক্ত নিশ্চল, জমে আছে যেন। ভেতর বাড়িতে কারা যেন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সে কান্না থামাতে কেউ কেউ আবার ফিসফিসিয়ে বোঝাচ্ছে। সব মিলিয়ে এক গুমোট আবহ। তখনই এক হুজুর কোষায় চড়ে ঘাটে এসে ওঠে। তাকে দেখামাত্র কাছে ডাকে মেজর।
Ñ তুম কিয়া চ্যাতে হো।
Ñ ম্যায় ইস মসজিদকা মোয়াজ্জেম হো। মাগরিবকা ওয়াকতা হুয়া হ্যায়। ম্যায় আজান দুংগা।
Ñ আজান! কাফের লোগোকা আজান দিয়া? তোমলোগোকা কিসকা নামাজ। তামাশা কাররেহে হো। গোলি মার দেঙ্গে শালা।
মোয়াজ্জিন আর কথা না বাড়িয়ে যন্ত্রের মতো স্থির হয়ে যায় মুহূর্তে।
Ñ ইধার আও, অর ইধার-ওধার মাত দেখো সিধে সামনে যাও!
মোয়াজ্জিন পড়িমরি করে ভেতর বাড়ির দিকে ছুট দেয়। এবার একে একে ঘাটের দিকে নামিয়ে আনে একুশজনকে। এক লাইনে জায়গা হয় না সবার।
দুসরা লাইন কোরো। দুসরা লাইন। এক সৈনিকের আদেশে ওরা তালগাছ, খেজুর গাছের গুঁড়িতে দু-লাইনে দাঁড়ায়। তখন হেলিকপ্টারের সার্চলাইট বেশ কবার জ্বলে-নেভে। হঠাৎ দূরের মানুষগুলোকে তাড়া দেয় পাকসেনারা। জমে থাকা মানুষেরা আরও দূরে সরে গেলে হঠাৎ মেজর বাদে বাকি সাত আর্মি মুহূর্তে ব্রাশফায়ারে কাঁপিয়ে তোলে পুরো তল্লাট। কিছু মানুষের তীব্র আর্তনাদ মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে যায়। কিছু মানুষ কোঁকাতে থাকে তীব্র যন্ত্রণায়। কার মুখ থেকে যেন পানির জন্যে আকুতি ফোটে। কিন্তু ঠিক বোঝা যায় না। বোঝা গেলেও কিছু করার নেই। সীমার বনে গেছে সবাই। পাথরের মতো কঠিন। এছাড়া আর কোনো পথ নেই! একুশটি মানুষের রক্তে একাকার হয়ে যায় ঘাটের জল। কালচে জলে এখন লালচে আভা। গভীর সংবেদনশীল এক রং এসে যেন মেশে সে জলে। পানি পানি বলে এতক্ষণ কোঁকাচ্ছিল, কাতর সে কণ্ঠও একসময় নীরব হয়ে আসে। তখনই দূর থেকে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি। তবে হেলিকপ্টারের তীব্র কর্কশ শব্দে সে ধ্বনি হারিয়ে যায়। শেষবারের মতো লাশগুলো ফের যাচাই করে দেখে পাকসেনারা। কোনো লাশের বুকে বুট দিয়ে চেপে ধরে। কোনোটার মাথায় কিক মারে জোরসে। কারও পেটের ওপর লাফাতে থাকে। শেষে এক হাবিলদার বলে, সব কে সব খতম হো যায়া স্যার। থ্যাঙ্কু, বলে তৃপ্তির হাসি হাসে মেজর। এবার একটু একটু করে দুটো কপ্টারই নেমে আসে নিচে। ল্যান্ডিং করে না। ওপর থেকে মই নামিয়ে দেয় নিচে। তরতর করে দুভাগে ভাগ হয়ে পাকসেনারা উঠে যায় ওপরে। কপ্টারের আলোয় যদ্দুর চোখ যায়, শুধু রক্ত আর রক্ত, ভরা বর্ষার জলে। লালচে জল ঢেউ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে, ঘাটে এসে আছড়ে পড়ে কী এক কষ্টে। কপ্টারের পাখার বাতাসে জলের বুকে মুধু তোলপাড়। জলে শুধু রক্তের কাঁপন! কাঁপা কাঁপা জল! কাঁপা কাঁপা ঢেউ এসে বারবার মাথা কুটছিল ঘাটে। ফের তলিয়ে পড়ছিল গড়িয়ে পড়ছিল কালচে রক্ত ধারা।
হঠাৎ যখন একঝাঁক গুলির শব্দে একুশটি প্রাণ ঝরে পড়ল অকালে। তখন সব নীরবতা ভেঙে রাতের অন্ধকার খান খান করে সব মগ্নতা ছাপিয়ে চিল-শকুনেরা সরব হয়। কিন্তু এ ডাক কান্নার চেয়ে ভয়ঙ্কর। এ ওড়া, ডানা ঝাপটানো কেমন ভৌতিক আর পৈশাচিক। দীঘল পাখার ছায়ায় অনেকদূর ঢেকে যায়। যেন বুকের খাঁজ ভেঙে ভেঙে ভেতরে সেধিয়ে যাচ্ছে সে কান্না। পাখিদের ভৌতিক ছায়া সারা শরীরে কাঁপন ধরিয়ে দেয়। কান্না ওদের থামে না। প্রহরের পর প্রহর কেটে যায়। ওরা কেঁদেই চলেছে রাতের নীরবতাকে ছাপিয়ে। সেসব কান্নার সঙ্গে মিলে যখন শকুনেরাও কান্না জুড়ে দেয়, তখন মনে হয় বর্ষার ধু-ধু জল, জলের গভীরে লুকিয়ে থাকা মাছ, শ্যাওলা, কচুরিপানা, গাছের পাতা, গাছের কা-, গাছের ছায়া স-ব সব কিছু এক গভীর শোকে একাকার হয়ে মিশে যাচ্ছে অন্ধকারে।
প্রকৃতির সঙ্গে মিশে থাকা, অস্তিত্বের সঙ্গে একাকার হয়ে যাওয়াÑ এসব অনুষঙ্গের এমনই যন্ত্রণা অনেকের মনে এত গভীর ছায়া ফেলে যে, মুখে কোনো কথা সরে না তাদের। সোলেমান নীরবে লাশগুলো দেখছিল তন্ময় হয়ে। চুলো খোঁড়া থেকে খড়ি চেলা করা, মাংস কাটা সর্বকাজের সঙ্গে গতকাল থেকে জড়িয়েছিল সোলেমান। রফির কথামতো সব করছিল ও অথচ সেই মানুষটা এখন নীরব। ওর তাজা রক্ত জলের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে একটু একটু করে। বিড়বিড় করে বলে, খবিশ, পাষ-! পশুপাখিরও দয়া মায়া আছে। কেমন তড়পাইতাছে বুক ফাটতাছে বুঝি। কে কয় পশুপাখি বেবুঝ, সব বুঝে হেরা। বেজন্মাগুলির তাও নাই। পশুর চাইতে অধম এরা। খাড়ার উপরে এককুড়ি একটা মানুষরে লাশ বানাইয়া দিল। এত মাডি কই, গোর দিব ক্যামনে! মহা দুঃশ্চিন্ত কাজ করে সোলেমানের মনে।
একুশটি শরীর এর ওর ওপর পড়ে আছে। কোনোটা অর্ধেক ডুবে আছে জলে। কোনোটা ভাসছে। ততক্ষণে অনেকগুলো হ্যারিকেন আর হ্যাজাক বাতির আলো এসে ভিড় করেছে ঘাটে। কিন্তু গভীর কষ্টের ভিড়ে সে আলো ম্লান হয়ে যায় মুহূর্তে। অনেক মানুষের ভিড় সেখানে। ওরাও জানে না কেন এসে দাঁড়িয়েছে এই অবেলায় ঘাটে। দূর থেকে, বহুদূর থেকে শুধু কেঁপে কেঁপে রক্তজল আসছে। কালচে লাল সে জলে ভাসছে একুশটি লাশ। জলগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে কী এক ভালোবাসায় যেন ভিজিয়ে দিচ্ছে একুশটি শরীর। ঢেউগুলো কেঁপে কেঁপে কী এক যন্ত্রণায় যেন ভেঙে পড়ছে বারবার!

Category:

‘পেয়ারে পাকিস্তান যাদের হৃদয়ে তারা দেশের উন্নয়ন চায়নি’

জাতির পিতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী

43উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দেশের চলমান উন্নয়ন-অগ্রগতির ধারা ত্বরান্বিত করতে দেশবাসীর ঐক্যবদ্ধ সমর্থন কামনা করে বলেছেন, মাত্র ৯ বছর ক্ষমতায় থেকে বর্তমান সরকার বাংলাদেশকে সবদিক থেকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, সারাবিশ্বের সামনে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোলমডেল। কিন্তু আমার প্রশ্ন, স্বাধীনতার ৪৭ বছরের মধ্যে দীর্ঘ ২৮ বছর যারা ক্ষমতায় ছিল তারা কেন দেশের উন্নয়ন করতে পারেনি? সারাবিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি কেন উন্নত করতে পারেনি? তার প্রধান কারণ হচ্ছেÑ এরা দেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী না। তারা দেশে থাকলেও তাদের হৃদয়ে পেয়ারে পাকিস্তান। পাকিস্তানের গোলামি করাই তাদের পছন্দ ছিল বলেই বাংলাদেশ উন্নত ও স্বাবলম্বী হোক তা কোনোদিনই তারা চায়নি। একমাত্র আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেই দেশ উন্নত হয়, এগিয়ে যায় আমরা তা প্রমাণ করেছি।
গত ১০ জানুয়ারি রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ঐতিহাসিক ১০ জানুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের সঙ্গে খন্দকার মোশতাক ও জেনারেল জিয়ার জড়িত থাকার কথা পুনরুল্লেখ করে বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর অনেকেই জেনারেল জিয়াকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা বলার চেষ্টা করেছিলেন। জেনারেল জিয়ার বহুদলীয় গণতন্ত্র মানে যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতাবিরোধীদের পুনর্বাসন, ক্ষমতায়ন, ভোটের ও রাজনীতির অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। কারাগারে বন্দী যুদ্ধাপরাধীদের মার্শাল ল’ অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে মুক্তি দিয়ে রাজনীতি করার অধিকারই ছিল জিয়ার বহুদলীয় গণতন্ত্রের নমুনা। তিনি বলেন, জনগণের গণতন্ত্র নয়, প্রতি রাতে কার্ফ্যু গণতন্ত্রের নামে স্বাধীনতাবিরোধীদের পুনর্বাসন জেনারেল জিয়া করেছিলেন বলেই দেশ এগিয়ে যেতে পারেনি, বরং অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছিল।
ঐতিহাসিক ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতার কাছে ওয়াদা দিয়ে বলেনÑ “বঙ্গবন্ধু তোমায় কথা দিলামÑ বাংলাদেশকে তাঁর স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ে তুলব। ’২১ সালের মধ্যে মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করব। আর ’৪১ সালের মধ্যে বিশ্বে বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তুলব।” এজন্য প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর ঐকান্তিক সমর্থন ও সহযোগিতাও কামনা করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে আলোচনায় অংশ নেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু এমপি, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এমপি, সভাপতিম-লীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী এমপি, শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপি, গৃহায়নমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি, ইতিহাসবিদ-কলামিস্ট অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, কেন্দ্রীয় নেতা মারুফা আকতার পপি, উপাধ্যক্ষ রেমন্ড আরেং, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান ও দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ। সভা পরিচালনা করেন কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এমপি ও উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন।
সভাপতির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে স্বাধীনতাবিরোধী, বঙ্গবন্ধুর খুনি ও যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে ক্ষমতা দখল করে খুনি মোশতাক ও জেনারেল জিয়ারা। অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে বঙ্গবন্ধুর নাম ও ইতিহাস মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ বাজানোও নিষিদ্ধ করা হয়। বাংলাদেশের মানুষকে পরিকল্পিতভাবে মিথ্যাচারের মাধ্যমে বিভ্রান্তির বেড়াজালে ফেলে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুই বলেছিলেনÑ বাংলাদেশের মাটি খুব উর্বর। উর্বর মাটিতে গাছপালার সঙ্গে কিছু আগাছাও জন্ম নেয়। তেমনি খুনি মোশতাকের মতো গাদ্দারের জন্ম হয়েছিল এ দেশের মাটিতে। পাকিস্তানি হানাদাররা এ দেশে গণহত্যা চালিয়েছিল, সারাদেশের গ্রামগঞ্জ জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল। আর তাদের সাহায্য করেছিল আমাদের দেশেরই কিছু কুলাঙ্গার আলবদর-রাজাকার-আলশামসরা।
বিএনপি-জামাত জোটের অগ্নিসন্ত্রাস ও মানুষকে পুড়িয়ে হত্যার ভয়াল চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জেনারেল জিয়ার পদাঙ্ক অনুসরণ করে খালেদা জিয়াও একাত্তরের স্বীকৃত গণহত্যাকারী-যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়ে তাদের হাতে তুলে দেন লাখো শহীদের রক্ত¯œাত জাতীয় পতাকা। স্বাধীনতাবিরোধী-যুদ্ধাপরাধীরাই যেন হয়ে যায় এ দেশের হর্তা-কর্তা-বিধাতা। ২১ আগস্ট ভয়াল গ্রেনেড হামলা, একসঙ্গে ৫০০ স্থানে বোমা হামলা, জঙ্গি-সন্ত্রাস, সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন, নারী নির্যাতন এমন কোনো শ্রেণি-পেশার মানুষ নেই যে বিএনপি-জামাত জোটের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়নি।
তিনি বলেন, একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদাররা যেভাবে গণহত্যা ও জ্বালাও-পোড়াও চালিয়েছিল, বিএনপি-জামাত জোট ঠিক একই কায়দায় আন্দোলনের নামে নির্বিচারে জীবন্ত মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করে। সরকার উৎখাত না করে ঘরে ফিরব না এ কথা বলে খালেদা জিয়া নির্বিচারে শ’ শ’ মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করে, সারাদেশে নাশকতা চালান। কিন্তু দেশের জনগণ ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় আসে তখনই দেশের মানুষ প্রথম উপলব্ধি করে যে, সরকার শাসক নয়, জনগণের সেবক। ’৯৬-২০০১ এই পাঁচ বছর ছিল বাংলাদেশের জন্য উন্নয়নের স্বর্ণযুগ। এরপর বিএনপি-জামাত জোট ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে দেশকে আবারও পিছিয়ে দিয়ে যায়। তিনি বলেন, ২০০৯ সালে জনগণের ভোটে পুনরায় ক্ষমতায় এসে আমরা ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতিকে আবারও মজবুত করি। বাংলাদেশ আজ সবদিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে। সারাবিশ্বে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। আমরা বঙ্গবন্ধুর খুনি ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে দেশকে কলঙ্কমুক্ত করেছি।
আবেগজড়িত কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ঐতিহাসিক সেই মুহূর্তের স্মৃতি স্মরণ করে বলেন, বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে বন্দী করার পর দীর্ঘ ৯ মাস আমরা জানতাম না তিনি বেঁচে আছেন কি না। কারণ বঙ্গবন্ধুর পাশাপাশি ধানমন্ডির ১৮ নম্বর বাড়িতে আমাদের পরিবারের সবাইকে বন্দী করে রাখা হয়। পাকিস্তান থেকে মুক্তি পেয়ে বঙ্গবন্ধু যখন প্রথম লন্ডনে যান, তখন জানতে পারি তিনি বেঁচে আছেন। বঙ্গবন্ধু লন্ডন থেকে যখন আমাদের কাছে ফোন করেছিলেন তখন আমাদের কথা বলার মতো কোনো অবস্থা ছিল না। শুধু আমাদের অপেক্ষা ছিল কখন ফিরে আসবেন আমাদের জাতির পিতা।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি দেশে প্রত্যাবর্তন করে আমাদের কাছে নয়, বিমানবন্দর থেকে সোজা চলে গিয়েছিলেন তার প্রিয় এ দেশের মানুষের কাছে। তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণে কীভাবে স্বাধীন দেশ গড়ে তোলা হবে, কোন নীতিতে এ দেশ চলবে ও গড়ে উঠবে সেই দিক-নির্দেশনা দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, মাত্র সাড়ে তিন বছরে বঙ্গবন্ধু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তুলেছিলেন। মাত্র ১০ মাসের মধ্যে বাঙালি জাতিকে শাসনতন্ত্র উপহার দিয়েছিলেন। যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ে তুলতে দেশকে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীর দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা চরম আঘাত হেনে বাঙালি জাতিকে অগ্রগতির মিছিল থেকে ফেলে দেয়। দেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।

বিরল প্রাণীর মতো বিলুপ্ত হয়ে যাবে বিএনপি : ওবায়দুল কাদের
দশম সংসদ নির্বাচনের চতুর্থ বর্ষপূর্তির দিন গত ৫ জানুয়ারি ব্যাপক শোডাউনের মাধ্যমে রাজপথসহ সারাদেশের মাঠ ছিল আওয়ামী লীগের দখলে। গণতন্ত্রের বিজয় দিবসের এ দিনটিতে দেশজুড়ে বিজয় শোভাযাত্রা ও সমাবেশ করেছে আওয়ামী লীগ।
45গত ৫ জানুয়ারি বিকেল ৩টায় একযোগে সারাদেশে অনুষ্ঠিত বর্ণাঢ্য এই শোভাযাত্রায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী অসংখ্য মানুষের ঢল নামে। শোভাযাত্রায় সন্ত্রাস-নাশকতা-জঙ্গিবাদ ও দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। এ ছাড়া রাজধানীর অলিগলিসহ দুশতাধিক স্থানে দিনভর সতর্ক অবস্থানে থেকে বিজয়োৎসব পালন করেছে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরাসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী অসংখ্য মানুষ।
রাজধানীর বনানী পূজা মাঠে এবং ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউ প্রাঙ্গণে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ও উত্তর শাখা আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আয়োজিত শোভাযাত্রা পরবর্তী সমাবেশে আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতারা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে এতিমের টাকা মেরে খাওয়া দুর্নীতিবাজ, জঙ্গির পৃষ্ঠপোষক ও পেট্রলবোমা নেত্রী হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, অতীত কৃতকর্মের কারণে বিএনপি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। দেশের জনগণ বিএনপিকে আর কখনও ক্ষমতায় আসতে দেবে না। দেশ ও জাতির উন্নয়নের স্বার্থে শেখ হাসিনাকে আবারও ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনবে দেশবাসী। নেতৃবৃন্দ বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে দেশে শুধু গণতন্ত্রই রক্ষা পায়নি, সাংবিধানিক শাসনও সুরক্ষিত হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শত ষড়যন্ত্র, আগুন সন্ত্রাস ও নাশকতা মোকাবিলা করেই রাষ্ট্রকে সুরক্ষিত করেছিলেন। সিনিয়র নেতারা আরও বলেন, বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মামলায় শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের ষড়যন্ত্র করছেন। জনগণের প্রতি তার কোনো আস্থা নেই, ষড়যন্ত্রে তার আস্থা আছে।
বনানী পূজা মাঠে শোভাযাত্রা পরবর্তী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বলেন, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণের দিন ৫ জানুয়ারি বিএনপি ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ হিসেবে পালন করলেও এটি মূলত দলটির জন্য ‘রাজনৈতিক আত্মহত্যা দিবস’।

নির্বাচন ঠেকানোর চেষ্টা হলে জনগণ প্রতিহত করবে
এদিকে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ের সামনে ‘গণতন্ত্রের বিজয় দিবস’ উপলক্ষে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আয়োজিত শোভাযাত্রা পরবর্তী সমাবেশে ওবায়দুল কাদের এমপি বলেন, নির্বাচনী ট্রেন বিএনপির স্টেশনে থামবে না। সময় ও স্রোতের মতো আগামী (একাদশ) সংসদ নির্বাচনও কারও জন্য অপেক্ষা করবে না। বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিলে তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাবে। বিরল প্রাণীর মতো বিলুপ্ত হয়ে যাবে বিএনপি। পৃথিবীতে অনেক রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তাদের অবস্থা মুসলিম লীগের চেয়েও খারাপ হয়ে যাবে। তিনি বলেন, নির্বাচন ঠেকানোর চেষ্টা করা হলে জনগণই তা প্রতিহত করবে।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের সমালোচনা করে ওবায়দুল কাদের বলেন, ড. কামাল হোসেন ও খালেদা জিয়া সরকার ও সংসদকে অবৈধ হিসেবে অভিহিত করেছেন। কিন্তু বিশ্বের দুটি বড় আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ) ও কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন (সিপিএ) বাংলাদেশের পার্লামেন্টকে স্বীকৃতি দিয়েছে। শুধু তাই নয়, এ দুটি সংস্থার প্রধানও করা হয়েছে সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী এমপি ও বাংলাদেশের সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে। তাহলে কীভাবে গণতন্ত্রের সংকট আছে? আপনারা নির্বাচনে অংশ নেন নি। গণতন্ত্র যদি না থাকত তাহলে কী তারা বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিত?

Category:

নতুন চার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী

47উত্তরণ প্রতিবেদন: বর্তমান মন্ত্রিসভায় নতুন করে যুক্ত হয়েছেন তিনজন মন্ত্রী ও একজন প্রতিমন্ত্রী। পূর্ণ মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ মোস্তফা জব্বার ও লক্ষ্মীপুরের সংসদ সদস্য একেএম শাহজাহান কামাল। আর রাজবাড়ীর এমপি কাজী কেরামত আলী প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। গত ২ জানুয়ারি সন্ধ্যায় এই চারজনকে শপথ পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। বঙ্গভবনের দরবার হলে আয়োজিত এই শপথ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন।
বিজয় বাংলা কি-বোর্ডের উদ্ভাবক মোস্তাফা জব্বার (৬৮) যেহেতু সংসদ সদস্য নন, তাকে শেখ হাসিনা নিজের মন্ত্রিসভায় নিলেন টেকনোক্র্যাট হিসেবে। শপথ নেওয়ার পর তিন মন্ত্রী ও এক প্রতিমন্ত্রী ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানান।
পরে মোস্তফা জব্বারকে ডাক ও টেলিযোগাযোগ এবং তথ্যযোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রী, নারায়ণ চন্দ্র চন্দ মৎস্য প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী, একেএম শাহজাহান কামালকে বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী এবং কাজী কেরামত আলীকে শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব প্রদান করা হয়।

Category: