Blog Archives

সব গ্রামে নগরতুল্য উন্নয়ন করা হবে

Posted on by 0 comment
PM7

পাবনার স্মরণকালের বৃহত্তম সভায় প্রধানমন্ত্রী

উত্তরণ প্রতিবেদন: পাবনায় স্মরণকালের বৃহৎ জনসমাবেশে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় নৌকায় ভোট দেওয়ার জন্য দেশবাসীর কাছে উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এই নৌকায় ভোট দিয়েছেন বলেই দেশের উন্নয়ন হয়েছে। কারণ নৌকা দেয়। আগামী ডিসেম্বরে নির্বাচন হবে। এই নির্বাচনে আপনারা যদি নৌকা মার্কায় ভোট দেন, আওয়ামী লীগ যদি ক্ষমতায় আসে তাহলে প্রতিটি গ্রামকে নগরের মতো উন্নয়ন করে দেব। শহরে উন্নীত করব। প্রত্যেক গ্রামে প্রতিটি জনগোষ্ঠী নগরের সুবিধা পাবে, সুন্দরভাবে বাঁচবে। আপনাদের যে ওয়াদা দিয়েছি নিশ্চয়ই তা পূরণ করব। নিশ্চয়ই এদেশ উন্নত-সমৃদ্ধ হবে।
গত ১৪ জুলাই পাবনা জেলার সরকারি পুলিশ লাইনস মাঠে জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসমুদ্রে প্রধানমন্ত্রী বিএনপি-জামাত জোটের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, এরা দেশকে ধ্বংস করতে জানে, দেশকে কিছু দিতে জানে না। এরা এতিমের টাকা মেরে খায়। আপনারা জানেন এতিমের টাকা মেরে খাওয়ার বিষয়ে পবিত্র কোরআন শরিফেও নিষেধ আছে। পবিত্র ধর্মে বলা আছে, এতিমের টাকা এতিমদের মাঝে যথাযথভাবে বণ্টন করে দাও। কিন্তু খালেদা জিয়ারা এতিমের জন্য আনা টাকা এতিমদের দেয়নি। নিজেরা আত্মসাৎ করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। খালেদা জিয়া এতিমের টাকা আত্মসাৎ করে দ-প্রাপ্ত হয়ে জেলে আছেন। আমরা তাকে রাজনৈতিক কারণে গ্রেফতারও করিনি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মানুষকে দিতে জানে। আর ওরা জানে খুন, হত্যা, ধর্ষণ, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ। পাবনায় আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী বিএনপি জোট সরকার ক্ষমতায় থাকার সময়ে নিহত হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ক্ষমতায় এসে তাদের বিরুদ্ধে তো প্রতিশোধ নিতে যাইনি। আমরা প্রতিটা সময় কাজে লাগিয়েছি মানুষের উন্নয়নের জন্য। মানুষের কল্যাণের জন্য।
পাবনাবাসীকে ৪৯টি প্রকল্প উপহার দিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতি বলেন, আমাদের কাছে চাইতে হবে না, আওয়ামী লীগ জানে মানুষের কীভাবে উন্নয়ন হবে। নৌকায় ভোট চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। আজকে আমি সব হারিয়েছি, শুধু আপনাদের জন্য কাজ করে যাচ্ছি, মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আমার বাবা চাইতেন এই বাংলার মানুষ ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সুখী-সমৃদ্ধ হবে। সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। তিনি বলেন, নৌকায় ভোট দিয়েছিলেন, আপনাদের জন্য কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। আগামী নির্বাচনে আপনারা যদি আবারও নৌকায় ভোট দেন তাহলে ক্ষমতায় আসব। আপনাদের সেবা করার সুযোগ পাব। এ সময় প্রধানমন্ত্রী উত্তাল জনসভায় উপস্থিত মানুষের নৌকায় ভোট দিয়ে আপনাদের সেবা করার সুযোগ দেবেন কি না হাত তুলে দেখাতে বললে পাবনাবাসী দুই হাত তুলে শেখ হাসিনার প্রতি তাদের সমর্থন জানান।
জনগণের এই স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন পেয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, যে ওয়াদা আপনাদের কাছে করেছি, সে ওয়াদা আমরা নিশ্চয়ই পূরণ করব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এখন উন্নয়নশীল দেশ, কারও কাছে ভিক্ষা করে চলব না। জাতির পিতা বলেছিলেন, সাড়ে ৭ কোটি মানুষকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি, এগিয়ে যাব। বাংলাদেশকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারে নাই, দাবিয়ে রাখতে পারবে না। জাতির পিতার স্বপ্ন আমরা পূরণ করবই। তিনি বলেন, আমাদের যুবসমাজের সকলেই তো আর চাকরি পাবে না। কর্মসংস্থান লাগবে। তার জন্য কর্মসংস্থান ব্যাংক করে দিয়েছি। বিনা জামানতে ৩ লাখ টাকা তারা ঋণ নিতে পারবে। এজন্য কারও দাবি করতে হয়নি। আওয়ামী লীগ দিতে জানে। জাতির পিতা এদেশ স্বাধীন করে দিয়েছেন। আর আওয়ামী লীগ এখন দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
দেশের যুবসমাজ যাতে বিপথে না যায় সেজন্য অভিভাবক-শিক্ষক-আলেম-ওলামা ও সমাজের সচেতন মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ-মাদকের বিরুদ্ধে আমরা অভিযান করে যাচ্ছি। আপনাদের কাছে সহযোগিতা চাই। সকলের কাছে এজন্য আমার আবেদন থাকবে। মাদক একটা পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ শুধু পরিবার নয়, একটা দেশকে ধ্বংস করে দেয়। আপনারা লক্ষ্য রাখবেন আপনার ছেলেমেয়ে কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে। কেউ যেন এই জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসের দিকে না যায় সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দেয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। আপনাদের সহযোগিতা চাই। আমাদের কাজ আমরা করব।
৪৯টি প্রকল্প উদ্বোধন করার পর সমাবেশে পাবনাবাসীর উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, আমি আপনাদের জন্য এত উপহার নিয়ে হাজির হয়েছি। আপনারা নৌকায় ভোট দিয়েছেন, আমরা আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ। এই নৌকায় ভোট দিয়েছেন বলেই উন্নয়ন হয়েছে। কারণ নৌকা দেয়। নৌকায় ভোট দিয়ে আমরা মাতৃভাষার অধিকার পেয়েছি, নৌকায় ভোট দিয়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। আবারও নৌকায় ভোট দিন, প্রতিটি গ্রামে আমরা নাগরিক সুবিধা এনে দেব।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের উদ্বোধনীর কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রকল্পটি চালু হলে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন যেমন হবে, তেমনি কর্মসংস্থানের বিরাট ভূমিকা রাখবে। আমরা বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে মহাকাশ জয় করেছি। ৪০ লাখ বিধবাকে ভাতা দিচ্ছি। ১০ লাখ প্রতিবন্ধীকে ভাতা, ১ কোটি ৪০ লাখ শিশুর বৃত্তির টাকা দেয়া হচ্ছে, তাদের মাকেও এ বৃত্তির টাকা দেয়া হচ্ছে, বিনা পয়সায় ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করতে পারছে, বিনামূল্যে বইও বিতরণ করা হচ্ছে, কমিউনিটি ক্লিনিকে গ্রামে বসে ফ্রি চিকিৎসা ও ওষুধ দেয়া হচ্ছে, যাদের ঘর নেই, বাড়ি নেই, জমি নেই তাদের খাস জমি দেয়া হচ্ছে। যাদের জমি আছে তাদের ঘর তৈরি করে দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে আমরা ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলও ঘোষণা করেছি। তাই আমরা মানুষের কল্যাণে সর্বকালের সর্ববৃহৎ বাজেট ঘোষণা করেছি। আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। গবেষণার মাধ্যমে সব মৌসুমেই তরকারি ফল উৎপাদন করা হচ্ছে। মিঠা পানির মাছ উৎপাদনেও আমরা সফলতা পেয়েছি। আমরা সবদিক থেকে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, আরও এগিয়ে নিয়ে যাব। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা হিসেবে দেশকে গড়ে তুলব।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরিফ ডিলু এমপির সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী এমপি, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপি, রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক এমপি, সভাপতিম-লীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক এমপি, কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক এমপি, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপি, সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন এমপি, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক এমপি, সাবেক প্রতিমন্ত্রী শাসসুল হক টুকু এমপি, কেন্দ্রীয় নেতা এসএম কামাল হোসেন, অধ্যক্ষ মেরিনা জামান, স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি পঙ্কজ দেবনাথ এমপি, যুব মহিলা লীগ সভানেত্রী নাজমা আক্তার, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুক প্রিন্স এমপি, মকবুল হোসেন এমপি, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রেজাউল রহিম লাল প্রমুখ।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
দ্বিতীয় কংক্রিট ঢালাইয়ের কাজ উদ্বোধন
রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র সুরক্ষায় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে।
গত ১৪ জুলাই পাবনার রূপপুরে দেশের প্রথম পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণে কংক্রিট ঢালাই কাজ উদ্বোধন করে দেশবাসীকে তিনি আশ্বাসের কথা শোনান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র এমনভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে যাতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে না পারে। আমরা নিরাপত্তার দিকটায় বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছি। যে কোনো দুর্যোগে এটি ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেটা বিবেচনায় নিয়েই এই প্লান্টের ডিজাইন করা হয়েছে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে রাশিয়া ও ভারত বাংলাদেশের জনবলকে প্রশিক্ষিত করছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে রাশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী ইউরি ইভানোভিচ বরিশভ, আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা আইএইএ পরিচালক দোহি হ্যান, রোসাটমের উপ-মহাপরিচালক আলেকজান্দার রাস্কিনও বক্তব্য রাখেন।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংবলিত সর্বাধুনিক থার্ড জেনারেশন প্রযুক্তি দিয়ে এই প্লান্ট নির্মাণ করা হচ্ছে। ব্যবহৃত তেজষ্ক্রিয় জ্বালানি সরিয়ে নিতে রাশিয়া বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। ৬৮ মাসের এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল স্থাপনা নির্মাণ করবে রাশিয়ার কোম্পানি এ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট। বাংলাদেশের উন্নয়নে বাঙালি জাতিকে আর কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের মতো প্রকল্প যে করা সম্ভব তার ধারণা কারও মাথায় ছিল না। দেশ স্বাধীন না হলে এ ধরনের প্রকল্প করারও সুযোগ হতো না। দেশ স্বাধীন হবার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নতুন করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
আমরা দেশের সকল মানুষের কাছে এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক সেক্টরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করছি। ২০০৯ সালে সরকার গঠনের সময় আমরা বিদ্যুৎ পেয়েছিলাম মাত্র ৩২০০ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় তখন ভয়াবহ লোডশেডিং হতো। জনগণকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ দেয়ার জন্য রূপপুর প্রকল্পের কাজ শুরু করি। নির্মাণকাজ শেষ হলে এ প্রকল্প থেকে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, যা জাতীয় গ্রিডে যোগ করা সম্ভব হবে। ইতোমধ্যে আমরা নানাভাবে দেশে ১৯০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ৯৩ ভাগ বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছি। যেখানে যেটা করা সম্ভব আমরা সেখানে সেটাই করছি।

Category:

হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলা মামলার চার্জশিট

Posted on by 0 comment

উত্তরণ ডেস্ক: দীর্ঘ দুই বছর ২২ দিনের (৭৫২ দিন) তদন্ত শেষে দেশ-বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টিকারী বহুল আলোচিত গুলশান হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দিয়েছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট (সিটিটিসি)। আদালতে দাখিল করা চার্জশিটে ২১ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাওয়ার কথা উল্লেখ করে জীবিত আটজনের নামে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দেওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথবাহিনীর থান্ডার বোল্ট অপারেশনে জঙ্গি হামলার সময়ে ঘটনাস্থলেই পাঁচজন নিহত এবং মামলা তদন্তনাধীনকালে বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে আটজনসহ নিহত ১৩ জনকে চার্জশিট থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। যে আটজনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে ছয়জন আটক দুজন পলাতক রয়েছে। চার্জশিটে ৭৫ আলামতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা আদালতে পাঠানো হয়েছে। চার্জশিটে মোট সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে ২১১ জনের। এর মধ্যে ১৪৯ জন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। এর বাইরে বিভিন্ন সংস্থার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন অফিসার, ফরেনসিক টেস্ট যারা করেছেন, তাদের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এই মামলায় গ্রেফতার হওয়া নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হাসনাত করিমের সম্পৃক্ততা পায়নি উল্লেখ করে চার্জশিট থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে তাকে।
২৩ জুলাই ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ইউনিটপ্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, জঙ্গি হামলাকারীরা ছয় মাস আগে থেকে বিভিন্ন জায়গায় রেকি করে হলি আর্টিজান জঙ্গি হামলার পরিকল্পনা করে। তদন্ত প্রতিবেদনে চিহ্নিত ২১ জনের মধ্যে পাঁচজন সরাসরি হামলায় অংশ নেন। বাকিরা হামলার পরিকল্পনা, সমন্বয়, প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র-বোমা সংগ্রহসহ বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত ছিলেন। হামলার মূল পরিকল্পনাকারী (মাস্টারমাইন্ড) তামিম চৌধুরী, মূল প্রশিক্ষক (মাস্টার ট্রেনার) মেজর জাহিদ কিংবা তানভির কাদেরী, নুরুল ইসলাম মারজান ছিলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসামি। গুলশান হামলার জন্য বগুড়ার দুই জঙ্গিকে নিয়োগ করেন রাজীব আর বসুন্ধরায় বাসা ভাড়া ও জঙ্গিদের উদ্বুদ্ধও করেন তিনি। হাদিসুর রহমান সাগর সীমান্তের ওপার থকে আসা অস্ত্র ঢাকায় মারজানের কাছে পৌঁছায়। বাশারুজ্জামান মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশ থেকে দুই দফা হুন্ডির মাধ্যমে আসা ২০ লাখ টাকা গ্রহণ করেন এবং সেই টাকা হামলায় ব্যবহৃত হয়। হলি আর্টিজানে প্রচুর বিদেশি নাগরিক খাওয়া-দাওয়া করতে আসতেন। এখানে নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রায় ছিলই না। তাই এই রেস্টুরেন্টকে তারা বেছে নেয়। এখান থেকে পালিয়ে যাওয়া যায় সহজে। এছাড়া সেদিন ছিল শুক্রবার, ২৭ রমজান, বেশি সওয়াব পেতে তারা ঐদিন হামলা চালায়। তিনি বলেন, মামলার তদন্ত ও সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে এ ঘটনায় হাসনাত করিম, সাইফুল চৌকিদার ও শাওনের জড়িত থাকার সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। যারা পালিয়ে আছেন, তাদের গ্রেফতারের বিষয়ে আদালতে ওয়ারেন্ট ইস্যু করার দাবি জানানো হয়েছে। হলি আর্টিজানে হামলার সময়ে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে অপারেশন থান্ডারবোল্টে নিহত হন পাঁচজন। এরা রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, মীর সামেহ মোবাশ্বের, নিবরাস ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল। দীর্ঘ দুই বছরাধিকালের তদন্তের বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে আটজন। তারা হলেনÑ তামীম আহমেদ চৌধুরী, নুরুল ইসলাম মারজান, তানভীর কাদেরী, মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলাম ওরফে মুরাদ, রায়হান কবির তারেক, সারোয়ান জাহান মানিক, বাশারুজ্জামান ওরফে চকোলেট ও মিজানুর রহমান ওরফে ছোট মিজান। জীবিত আটজনের মধ্যে ছয়জন কারাগারে আটক। তারা হলেনÑ রাজীব গান্ধী, মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, হাতকাটা সোহেল মাহফুজ, হাদিসুর রহমান সাগর, রাশেদ ইসলাম ওরফে আবু জাররা। এ মামলায় পলাতক দুই আসামি হচ্ছেÑ শরিফুল ইসলাম ওরফে খালেদ ও মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন। তিনি বলেন, তদন্তে দেখা গেছে, আসামিরা পাঁচ মাস আগে থেকেই হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল দেশকে অস্থিতিশীল করা, বাংলাদেশকে একটি জঙ্গি রাষ্ট্র বানানো, সরকারকে চাপের মুখে ফেলা। ২৩ জুলাই সকালে মিন্টো রোডে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে মনিরুল ইসলাম বলেন, সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে তারা ওই অভিযোগপত্র আদালতে পাঠিয়েছেন।
২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে হলি আর্টিজানে জঙ্গিরা হামলা চালায়। তারা অস্ত্রের মুখে দেশি-বিদেশি অতিথিদের জিম্মি করে। ওই রাতে অভিযান চালাতে গিয়ে পুলিশের দুই কর্মকর্তা নিহত হন। পরদিন সকালে সেনা কমান্ডোদের অভিযানে পাঁচ জঙ্গিসহ ছয়জন নিহত হয়। পরে পুলিশ ১৮ বিদেশিসহ ২০ জনের মরদেহ উদ্ধার করে।

Category:

জাতিসংঘ মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর

Posted on by 0 comment

জিম ইয়ং কিম বলেন, আমি সংকটের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেছি। আমি নারী ও পুরুষদের সঙ্গে কথা বলেছি, যাদের কঠিন পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে এবং নিজেদের গ্রামে ফিরে যাওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় এখনও দৃঢ় রয়েছে।

PM6মো. রাজীব পারভেজ: দুদিনের সফরে জুলাই মাসের শুরুতে বাংলাদেশে এসেছিলেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম। জাতিসংঘের মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপির সঙ্গে বৈঠকে তারা দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিয়ে কথা বলেন। তাদের এই সফরে সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়েছে রোহিঙ্গা সংকট। তারা দুজনই কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থীশিবির ঘুরে দেখেন। রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে তাদের জীবন বাঁচানোর জন্য জাতিসংঘের মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা এবং ধন্যবাদ জানান।
সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে পালিয়ে গত বছরের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইন থেকে ৭ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে। তারা শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিয়েছে। এর আগে আসা ৪ লাখের মতো রোহিঙ্গা গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে রয়েছে। এখন ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে শরণার্থী। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর রাখাইনে রোহিঙ্গা নিধন অভিযানকে জাতিসংঘ ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ বলে আসছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই রোহিঙ্গা সংকটকে এশিয়ার এ অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় শরণার্থী সমস্যা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দুই প্রধানের বৈঠক
বাংলাদেশ সফরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম। রোহিঙ্গা সংকট প্রশ্নে বাংলাদেশকে জাতিসংঘ এবং বিশ্বব্যাংকের সমর্থন অব্যাহত রাখার প্রতি জোর দিয়েছে বৈঠকে বলেছেন গুতেরেস ও কিম। রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে মিয়ানমারের ওপর আরও চাপ দেওয়ার কথা বলেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেন, আমরা মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছি। আমাদের এই চাপ আরও বাড়াতে হবে, যাতে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে কী করা উচিত তা মিয়ানমার বুঝতে পারে। রোহিঙ্গা সমস্যা শুধু বাংলাদেশ নয় বিশ্ব-সমস্যা। মিয়ানমারের আরাকান থেকে ১৯৭৭ সালে প্রথম রোহিঙ্গাদের পালিয়ে বাংলাদেশে আসার কথা এবং পরে ১৯৮২ ও ১৯৯১ সালের বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে তাদের প্রবেশের কথা বৈঠকে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সরকার যে চুক্তি করেছে, তা বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না।
জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কয়েক মাস থেকে বলে আসছেÑ বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে থাকা শরণার্থীরা যাতে স্বেচ্ছায়, নিরাপদে এবং সম্মানের সঙ্গে নিজেদের দেশে ফিরে যেতে পারে এবং এই প্রত্যাবাসন যাতে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসরণ করে হয়, তা নিশ্চিত করার পরিবেশ তৈরি করতে হবে মিয়ানমারকে। এরই মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সহযোগিতা দিতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সঙ্গে আলাদা চুক্তি করেছে ইউএনএইচসিআর। কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য স্বাস্থ্যসহ সকল সেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে; সেগুলো বৈঠকে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, টেকনাফে এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ায় স্থানীয় জনগণের অসুবিধা হচ্ছে। উন্নত বাসস্থান সুবিধা দিতে প্রায় ১ লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ায় শেখ হাসিনা সরকারের প্রশংসা করেন গুতেরেস। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা যেন উগ্রপন্থায় জড়িয়ে না পড়ে; এটাই তাদের মূল উদ্বেগের বিষয়। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে জাতিসংঘের সহায়তা অব্যাহত রাখায় আন্তোনিও গুতেরেসের প্রশংসা করেন শেখ হাসিনা।
আন্তোনিও গুতেরেস জাতিসংঘ মহাসচিব পদে দায়িত্ব নেওয়ার বেশ আগে থেকেই রোহিঙ্গা সংকট সম্পর্কে জানতেন। তিনি ২০০৫ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) হিসেবে রোহিঙ্গাসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে শরণার্থী সংকট নিয়ে কাজ করেছেন। গত বছরের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নতুন করে নিধনযজ্ঞ শুরুর পর পরিস্থিতি তুলে ধরে ২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে নজিরবিহীন এক চিঠি লেখেন।
বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম উন্নয়ন ও মানবিক ইস্যুতে একসাথে কাজ করার কথা বলেছেন। কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তায় বিশ্বব্যাংক ইতোমধ্যে বাংলাদেশকে ৪৮ কোটি ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বাংলাদেশ এবার বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অঙ্কের ঋণ পাচ্ছে জানিয়ে জিম ইয়ং কিম বলেন, এতেই প্রমাণ হয় যে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি তাদের আস্থা রয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট সাক্ষাৎকালে বলেছেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পরও বিশ্বব্যাংকের বোর্ডে তিনি বাংলাদেশকে কনসেশন রেটে ঋণ দেওয়ার কথা বলবেন। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বাংলাদেশের বর্তমান উন্নতি দেখে খুবই অভিভূত। তিনি বলেন, বাংলাদেশ অল্প সময়ে বেশ উন্নতি করেছে। দেশ বর্তমানে অন্যান্য দেশের অনুকরণীয়। প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, দেশের উন্নয়নে সব সময়ে পাশে থাকবে বিশ্বব্যাংক। এ বছর বাংলাদেশকে ৩ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২৪ হাজার কোটি টাকা) ঋণ দেবে বিশ্বব্যাংক। রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং দেশের জনগণের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে আস্তোনিও গুতেরেস ও জিম ইয়ং কিম দুজনই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশংসা করেন। জঙ্গি নির্মূলে বাংলাদেশের কার্যক্রমেরও প্রশংসা করেন জাতিসংঘের মহাসচিব।
মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেও বাংলাদেশের পক্ষে তাদের ভরণপোষণ ও যতদিন এখানে অবস্থান করবেন ততদিন সুস্থ জীবন নিশ্চিত করা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে রোহিঙ্গাদের সহায়তায় তাদের পাশে এসে দাঁড়ানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বনেতাদের আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে এরই মধ্যে বিভিন্ন দেশ ও দাতা সংস্থা এগিয়ে এসেছে। দুই বিশিষ্ট ব্যক্তির সফরে মিয়ানমারকে যারা সমর্থন করে আসছেন তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে এবং দ্রুত রোহিঙ্গা সংকট নিরসন হবে বলে আশা করা যায়।

শরণার্থী ক্যাম্পে গুতেরেস এবং কিম
বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের বাস্তবচিত্র দেখতে কক্সবাজারের উখিয়ায় শরণার্থী ক্যাম্পে আসেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম। গত ২ জুলাই সকালে উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্পে পৌঁছে তারা প্রথমেই ক্যাম্পের ট্রানজিট পয়েন্ট পরিদর্শন করেন। তারপর কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং নারীদের আলাদা আশ্রয়স্থল পরিদর্শন করেন। জাতিসংঘের মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট পরে রোহিঙ্গাদের কয়েকটি ক্যাম্প ঘুরে দেখেন। এর আগে জাতিসংঘের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা রোহিঙ্গা ক্যাম্প সফর করে গেলেও সংস্থাটির মহাসচিব এই প্রথম তাদের দেখতে গেলেন। পরিদর্শন শেষে কুতুপালং এক্সটেনশন ক্যাম্পে সংবাদ সম্মেলন করে তাদের দৃষ্টিতে দেখা সার্বিক চিত্র তুলে ধরেন সফররত জাতিসংঘের মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংক-প্রধান। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দুঃখ-দুর্দশা নিজের চোখে দেখা ও নিজের কানে শোনার পর জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, তারা বিচার চায়। নিরাপদে ঘরে ফিরে যেতে চায়। কক্সবাজারের কুতুপালং শরণার্থীশিবির ঘুরে দেখেছেন তিনি। এ-সময় তিনি রোহিঙ্গাদের মুখ থেকে শুনেছেন তাদের পালিয়ে আসার কাহিনি।
আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, রোহিঙ্গাদের যে দুঃখ কষ্ট তিনি দেখেছেন তাতে তার হৃদয় ভেঙে গেছে। ছোট ছোট রোহিঙ্গা শিশুদের দেখে আমার নাতি-নাতনিদের কথা মনে পড়ে গেছে। তাদের অবস্থাও যদি এমন হতো তা হলে কী রকম হতো, বলেন গুতেরেস। জাতিসংঘ মহাসচিব জানান, রোহিঙ্গারা যাতে দেশে ফিরে যেতে পারেন সেজন্য তারা কাজ করছেন। তবে তিনি বলেছেন, তাদের ফিরে যাওয়া শুধু সেখানে অবকাঠামো তৈরির বিষয় নয়। তারা যাতে সম্মানের সাথে ফিরে যেতে পারে সেটা নিশ্চিত করতে হবে। মিয়ানমারে পরিকল্পিতভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে উল্লেখ করে বলেন, এ অবস্থা এভাবে চলতে পারে না। এর একটা সমাধান করতে হবে।
জিম ইয়ং কিম বলেন, আমি সংকটের ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেছি। আমি নারী ও পুরুষদের সঙ্গে কথা বলেছি, যাদের কঠিন পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে এবং নিজেদের গ্রামে ফিরে যাওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় এখনও দৃঢ় রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার তার সীমান্ত উন্মুক্ত রেখে এবং শরণার্থীদের সহায়তা দিয়ে মহান কাজ করেছে। তবে আরও অনেক কিছুই করা দরকার। বর্ষাকালের অব্যাহত বৃষ্টিপাত ও আসন্ন ঘূর্ণিঝড়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এ অবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসা প্রয়োজন।
দেশে ফিরে এক বিবৃতিতে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের মহানুভবতার প্রশংসা করে শরণার্থী ও তাদের আশ্রয় প্রদানকারী স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সহায়তায় বিশ্বব্যাংকের প্রতিশ্রুতির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, ব্যাপক শরণার্থী আগমনের মাধ্যমে সৃষ্ট ভয়াবহ পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশকে তার চমকপ্রদ উন্নয়ন অগ্রগতি ধরে রাখতে সহায়তা করবে বিশ্বব্যাংক। আমরা ৪৮ কোটি ডলার অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যা এই সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হবে।
রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত একটি ঘটনা। জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিমের বাংলাদেশ সফর ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্ব পাবে। আমরা আশা করছি, তাদের এই সফর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে ভূমিকা রাখবে।

Category:

বিদায়ী অর্থবছরের এডিপি বাস্তবায়নে রেকর্ড

Posted on by 0 comment

উত্তরণ ডেস্ক: সদ্য সমাপ্ত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭০৩ কোটি টাকার। একক অর্থবছরের হিসাবে টাকার অঙ্কে এটি এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ বাস্তবায়ন। এর আগের ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১ লাখ ৭ হাজার ৮৫ কোটি টাকার এডিপি বাস্তবায়িত হয়েছিল। ওই অর্থবছরে এডিপিতে প্রথমবারের মতো ১ লাখ কোটি টাকার বেশি খরচ হয়েছিল। সেই রেকর্ড বাস্তবায়নকে ছাড়িয়ে এবারের প্রাথমিক হিসাবে সৃষ্টি হয়েছে দেড় লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি খরচের নতুন রেকর্ড।
সদ্য শেষ হওয়া অর্থবছরের মূল এডিপির আকার ছিল ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮৪ কোটি টাকা, যা পরবর্তীতে কিছুটা কমিয়ে সংশোধিত এডিপিতে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা করা হয়। শতাংশের হিসাবে সংশোধিত এডিপির প্রায় ৯৪ শতাংশ (৯৩.৭১ শতাংশ) বাস্তবায়ন হয়েছে, যা গতবারের চেয়ে বেশি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের এই হার ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ (৮৯.৭১ শতাংশ)। বছর শেষে এডিপির জন্য বরাদ্দ অর্থ যতটা খরচ করা যায়, সেটাই এডিপির প্রকৃত বাস্তবায়ন।
বাস্তবায়নে শীর্ষে বিদ্যুৎ বিভাগ : ৫৮টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বিপরীতে এবার আরএডিপি’তে বরাদ্দের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৭ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা। আইএমইডি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদায়ী অর্থবছরে প্রকল্প বাস্তবায়নে এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে অর্থ খরচের দিক থেকে শীর্ষে ছিল বিদ্যুৎ বিভাগ। এডিপিতে থাকা ১১৩ প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ ছিল ২৬ হাজার ২৯২ কোটি টাকার। বরাদ্দকৃত সমস্ত অর্থই বিদ্যুৎ বিভাগ খরচ করতে পেরেছে। এর বাইরে থেকে বরাদ্দ থেকে আরও প্রায় ৯৩৫ কোটি টাকা খরচ করেছে সংস্থাটি। সবমিলিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগের বাস্তবায়ন হার দাঁড়িয়েছে ১০৩ দশমিক ৫৬ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন হার ১০৩ দশমিক ১১ শতাংশ (থোক বরাদ্দসহ)। তৃতীয় স্থানে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের বাস্তবায়ন হার ১০১ দশমিক ৮০ শতাংশ। পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ ১০০ দশমিক ৪৬ শতাংশ। বিদ্যুৎসহ ৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এবার বরাদ্দের বিপরীতে শতভাগ বাস্তবায়ন করতে পেরেছে। শীর্ষ দশের মধ্যে থাকা অন্য মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো হলোÑ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় (৯৯ দশমিক ৮১ শতাংশ), কৃষি মন্ত্রণালয় (৯৯ দশমিক ৭৯ শতাংশ), প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় (৯৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ), স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ (৯৯ দশমিক ৫৬ শতাংশ, নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয় (৯৯ দশমিক ০৬ শতাংশ) এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ (৯৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ)। এছাড়াও আরও ১৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এডিপি’তে ভালো পারফর্মেন্স দেখিয়েছে। প্রকল্পের বিপরীতের এদের অর্থ খরচের বাস্তবায়ন হার ৯০ থেকে ৯৯ শতাংশের মধ্যে।

Category:

সব গ্রামে নগরতুল্য উন্নয়ন করা হবে

Posted on by 0 comment
8-6-2018 8-07-15 PM

পাবনার স্মরণকালের বৃহত্তম সভায় প্রধানমন্ত্রী

উত্তরণ প্রতিবেদন: পাবনায় স্মরণকালের বৃহৎ জনসমাবেশে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় নৌকায় ভোট দেওয়ার জন্য দেশবাসীর কাছে উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এই নৌকায় ভোট দিয়েছেন বলেই দেশের উন্নয়ন হয়েছে। কারণ নৌকা দেয়। আগামী ডিসেম্বরে নির্বাচন হবে। এই নির্বাচনে আপনারা যদি নৌকা মার্কায় ভোট দেন, আওয়ামী লীগ যদি ক্ষমতায় আসে তাহলে প্রতিটি গ্রামকে নগরের মতো উন্নয়ন করে দেব। শহরে উন্নীত করব। প্রত্যেক গ্রামে প্রতিটি জনগোষ্ঠী নগরের সুবিধা পাবে, সুন্দরভাবে বাঁচবে। আপনাদের যে ওয়াদা দিয়েছি নিশ্চয়ই তা পূরণ করব। নিশ্চয়ই এদেশ উন্নত-সমৃদ্ধ হবে।
গত ১৪ জুলাই পাবনা জেলার সরকারি পুলিশ লাইনস মাঠে জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসমুদ্রে প্রধানমন্ত্রী বিএনপি-জামাত জোটের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, এরা দেশকে ধ্বংস করতে জানে, দেশকে কিছু দিতে জানে না। এরা এতিমের টাকা মেরে খায়। আপনারা জানেন এতিমের টাকা মেরে খাওয়ার বিষয়ে পবিত্র কোরআন শরিফেও নিষেধ আছে। পবিত্র ধর্মে বলা আছে, এতিমের টাকা এতিমদের মাঝে যথাযথভাবে বণ্টন করে দাও। কিন্তু খালেদা জিয়ারা এতিমের জন্য আনা টাকা এতিমদের দেয়নি। নিজেরা আত্মসাৎ করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। খালেদা জিয়া এতিমের টাকা আত্মসাৎ করে দ-প্রাপ্ত হয়ে জেলে আছেন। আমরা তাকে রাজনৈতিক কারণে গ্রেফতারও করিনি। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মানুষকে দিতে জানে। আর ওরা জানে খুন, হত্যা, ধর্ষণ, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ। পাবনায় আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী বিএনপি জোট সরকার ক্ষমতায় থাকার সময়ে নিহত হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ক্ষমতায় এসে তাদের বিরুদ্ধে তো প্রতিশোধ নিতে যাইনি। আমরা প্রতিটা সময় কাজে লাগিয়েছি মানুষের উন্নয়নের জন্য। মানুষের কল্যাণের জন্য।
পাবনাবাসীকে ৪৯টি প্রকল্প উপহার দিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতি বলেন, আমাদের কাছে চাইতে হবে না, আওয়ামী লীগ জানে মানুষের কীভাবে উন্নয়ন হবে। নৌকায় ভোট চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। আজকে আমি সব হারিয়েছি, শুধু আপনাদের জন্য কাজ করে যাচ্ছি, মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আমার বাবা চাইতেন এই বাংলার মানুষ ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সুখী-সমৃদ্ধ হবে। সেই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। তিনি বলেন, নৌকায় ভোট দিয়েছিলেন, আপনাদের জন্য কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলাম। আগামী নির্বাচনে আপনারা যদি আবারও নৌকায় ভোট দেন তাহলে ক্ষমতায় আসব। আপনাদের সেবা করার সুযোগ পাব। এ সময় প্রধানমন্ত্রী উত্তাল জনসভায় উপস্থিত মানুষের নৌকায় ভোট দিয়ে আপনাদের সেবা করার সুযোগ দেবেন কি না হাত তুলে দেখাতে বললে পাবনাবাসী দুই হাত তুলে শেখ হাসিনার প্রতি তাদের সমর্থন জানান।
জনগণের এই স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন পেয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, যে ওয়াদা আপনাদের কাছে করেছি, সে ওয়াদা আমরা নিশ্চয়ই পূরণ করব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এখন উন্নয়নশীল দেশ, কারও কাছে ভিক্ষা করে চলব না। জাতির পিতা বলেছিলেন, সাড়ে ৭ কোটি মানুষকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি, এগিয়ে যাব। বাংলাদেশকে কেউ দাবিয়ে রাখতে পারে নাই, দাবিয়ে রাখতে পারবে না। জাতির পিতার স্বপ্ন আমরা পূরণ করবই। তিনি বলেন, আমাদের যুবসমাজের সকলেই তো আর চাকরি পাবে না। কর্মসংস্থান লাগবে। তার জন্য কর্মসংস্থান ব্যাংক করে দিয়েছি। বিনা জামানতে ৩ লাখ টাকা তারা ঋণ নিতে পারবে। এজন্য কারও দাবি করতে হয়নি। আওয়ামী লীগ দিতে জানে। জাতির পিতা এদেশ স্বাধীন করে দিয়েছেন। আর আওয়ামী লীগ এখন দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
দেশের যুবসমাজ যাতে বিপথে না যায় সেজন্য অভিভাবক-শিক্ষক-আলেম-ওলামা ও সমাজের সচেতন মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ-মাদকের বিরুদ্ধে আমরা অভিযান করে যাচ্ছি। আপনাদের কাছে সহযোগিতা চাই। সকলের কাছে এজন্য আমার আবেদন থাকবে। মাদক একটা পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়। সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ শুধু পরিবার নয়, একটা দেশকে ধ্বংস করে দেয়। আপনারা লক্ষ্য রাখবেন আপনার ছেলেমেয়ে কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে। কেউ যেন এই জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসের দিকে না যায় সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দেয়ার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি। আপনাদের সহযোগিতা চাই। আমাদের কাজ আমরা করব।
৪৯টি প্রকল্প উদ্বোধন করার পর সমাবেশে পাবনাবাসীর উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, আমি আপনাদের জন্য এত উপহার নিয়ে হাজির হয়েছি। আপনারা নৌকায় ভোট দিয়েছেন, আমরা আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ। এই নৌকায় ভোট দিয়েছেন বলেই উন্নয়ন হয়েছে। কারণ নৌকা দেয়। নৌকায় ভোট দিয়ে আমরা মাতৃভাষার অধিকার পেয়েছি, নৌকায় ভোট দিয়ে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। আবারও নৌকায় ভোট দিন, প্রতিটি গ্রামে আমরা নাগরিক সুবিধা এনে দেব।
পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের উদ্বোধনীর কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রকল্পটি চালু হলে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন যেমন হবে, তেমনি কর্মসংস্থানের বিরাট ভূমিকা রাখবে। আমরা বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে মহাকাশ জয় করেছি। ৪০ লাখ বিধবাকে ভাতা দিচ্ছি। ১০ লাখ প্রতিবন্ধীকে ভাতা, ১ কোটি ৪০ লাখ শিশুর বৃত্তির টাকা দেয়া হচ্ছে, তাদের মাকেও এ বৃত্তির টাকা দেয়া হচ্ছে, বিনা পয়সায় ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করতে পারছে, বিনামূল্যে বইও বিতরণ করা হচ্ছে, কমিউনিটি ক্লিনিকে গ্রামে বসে ফ্রি চিকিৎসা ও ওষুধ দেয়া হচ্ছে, যাদের ঘর নেই, বাড়ি নেই, জমি নেই তাদের খাস জমি দেয়া হচ্ছে। যাদের জমি আছে তাদের ঘর তৈরি করে দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে আমরা ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলও ঘোষণা করেছি। তাই আমরা মানুষের কল্যাণে সর্বকালের সর্ববৃহৎ বাজেট ঘোষণা করেছি। আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছি। গবেষণার মাধ্যমে সব মৌসুমেই তরকারি ফল উৎপাদন করা হচ্ছে। মিঠা পানির মাছ উৎপাদনেও আমরা সফলতা পেয়েছি। আমরা সবদিক থেকে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, আরও এগিয়ে নিয়ে যাব। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা হিসেবে দেশকে গড়ে তুলব।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরিফ ডিলু এমপির সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী এমপি, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপি, রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক এমপি, সভাপতিম-লীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক এমপি, কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক এমপি, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপি, সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন এমপি, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক এমপি, সাবেক প্রতিমন্ত্রী শাসসুল হক টুকু এমপি, কেন্দ্রীয় নেতা এসএম কামাল হোসেন, অধ্যক্ষ মেরিনা জামান, স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি পঙ্কজ দেবনাথ এমপি, যুব মহিলা লীগ সভানেত্রী নাজমা আক্তার, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম ফারুক প্রিন্স এমপি, মকবুল হোসেন এমপি, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রেজাউল রহিম লাল প্রমুখ।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র
দ্বিতীয় কংক্রিট ঢালাইয়ের কাজ উদ্বোধন
রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র সুরক্ষায় সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে উদ্বেগের কিছু নেই জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে।
গত ১৪ জুলাই পাবনার রূপপুরে দেশের প্রথম পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণে কংক্রিট ঢালাই কাজ উদ্বোধন করে দেশবাসীকে তিনি আশ্বাসের কথা শোনান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র এমনভাবে নির্মাণ করা হচ্ছে যাতে কোনো দুর্ঘটনা ঘটতে না পারে। আমরা নিরাপত্তার দিকটায় বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছি। যে কোনো দুর্যোগে এটি ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেটা বিবেচনায় নিয়েই এই প্লান্টের ডিজাইন করা হয়েছে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে রাশিয়া ও ভারত বাংলাদেশের জনবলকে প্রশিক্ষিত করছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে রাশিয়ার উপ-প্রধানমন্ত্রী ইউরি ইভানোভিচ বরিশভ, আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা আইএইএ পরিচালক দোহি হ্যান, রোসাটমের উপ-মহাপরিচালক আলেকজান্দার রাস্কিনও বক্তব্য রাখেন।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পাঁচ স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সংবলিত সর্বাধুনিক থার্ড জেনারেশন প্রযুক্তি দিয়ে এই প্লান্ট নির্মাণ করা হচ্ছে। ব্যবহৃত তেজষ্ক্রিয় জ্বালানি সরিয়ে নিতে রাশিয়া বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। ৬৮ মাসের এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল স্থাপনা নির্মাণ করবে রাশিয়ার কোম্পানি এ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট। বাংলাদেশের উন্নয়নে বাঙালি জাতিকে আর কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের মতো প্রকল্প যে করা সম্ভব তার ধারণা কারও মাথায় ছিল না। দেশ স্বাধীন না হলে এ ধরনের প্রকল্প করারও সুযোগ হতো না। দেশ স্বাধীন হবার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নতুন করে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
আমরা দেশের সকল মানুষের কাছে এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক সেক্টরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করছি। ২০০৯ সালে সরকার গঠনের সময় আমরা বিদ্যুৎ পেয়েছিলাম মাত্র ৩২০০ মেগাওয়াট। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় তখন ভয়াবহ লোডশেডিং হতো। জনগণকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ দেয়ার জন্য রূপপুর প্রকল্পের কাজ শুরু করি। নির্মাণকাজ শেষ হলে এ প্রকল্প থেকে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, যা জাতীয় গ্রিডে যোগ করা সম্ভব হবে। ইতোমধ্যে আমরা নানাভাবে দেশে ১৯০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে ৯৩ ভাগ বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছি। যেখানে যেটা করা সম্ভব আমরা সেখানে সেটাই করছি।

Category:

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ

Posted on by 0 comment
সজীব ওয়াজেদ ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

সজীব ওয়াজেদ ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃঢ় আস্থা প্রকাশ করে বলেছেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট দেশের সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আমরা সমগ্র বিশ্ব সম্পর্কে জানতে পারছি এবং আমাদের সন্তানরা মহাকাশ বিজ্ঞান, পরমাণু প্রযুক্তি, সমুদ্রবিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের অন্যান্য ক্ষেত্র, সংস্কৃতি ও প্রকৃতি সম্পর্কে জানতে পারবেÑ যা দেশের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন। শেখ হাসিনা গত ৩১ জুলাই সকালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সজীব ওয়াজেদ জয়ের নামে দুটি ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রের উদ্বোধনকালে এ কথা বলেন। খবর বাসস’র।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর সেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে প্রধানমন্ত্রীর পুত্র এবং তার তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের নামে গাজীপুর ও বেতবুনিয়াতে দুটি ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রের (স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন) উদ্বোধন করেছেন। গ্রাউন্ড স্টেশন দুটির নামকরণ করা হয়েছে সজীব ওয়াজেদ ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র গাজীপুর এবং সজীব ওয়াজেদ ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র বেতবুনিয়া।
উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালের ১৪ জুন এই বেতবুনিয়াতে ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র উদ্বোধন করেন এবং সেখান থেকেই আমাদের যাত্রা শুরু হয় ও তারই পদাঙ্ক অনুসরণ করে আমরা এখন মহাকাশ জয় করেছি।
তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আমাদের বেতবুনিয়াতে এই উপগ্রহ ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্রটি দিয়ে গেছেন। আর সজীব ওয়াজেদ জয় তার পরামর্শ এবং উদ্যোগে আমরা মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ করতে সক্ষম হয়েছি। কাজেই সেই মুজিব থেকে সজীব- সেখানেই আমরা পৌঁছেছি।
গত ১২ মে বাংলাদেশ সময় ভোর ২টা ১৪ মিনিটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা থেকে সফলভাবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মহাকাশে উৎক্ষেপণের মধ্য দিয়ে বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট এবং পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে পরমাণু ক্লাবের ৩৪তম সদস্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ইতোমধ্যেই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ তার কার্যক্রম শুরু করেছে। এই দুটি ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে স্যাটেলাইট সেবা আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহীতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ শুরু হলো।
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর গাজীপুরের তেলীপাড়ার ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র প্রাইমারি গ্রাউন্ড স্টেশন এবং রাঙ্গামাটির বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র ব্যাকআপ গ্রাউন্ড স্টেশন হিসেবে যুগপৎ ব্যবহৃত হবে। শেখ হাসিনা বলেন, আপনাদের কাছে দোয়া চাই। দোয়া করবেন যাতে দেশ ও জাতির সেবার আমরা সবসময় নিয়োজিত থাকতে পারি।
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জনগণের সেবায় কাজ করে। জনগণের সেবায় কাজ করে যাবে। জনগণের কল্যাণই আমাদের একমাত্র চিন্তা। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এমপি, আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক এমপি এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব শ্যাম সুন্দর সিকদার বক্তব্য রাখেন। বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট লিমিটেডের চেয়ারম্যান শাহজাহান মাহমুদ অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন।
অনুষ্ঠানে স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন দুটির নাম সজীব ওয়াজেদ জয়ের নামে নামকরণ করার প্রস্তাব করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। পরে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর অন্যতম রূপকার বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের নামে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রাউন্ড স্টেশন দুটির আনুষ্ঠানিক নামকরণ করা হয়।
অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্যবৃন্দ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাবৃন্দ, নৌ ও বিমানবাহিনী প্রধানগণ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, সরকারের পদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাবৃন্দ, বিদেশি রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিকবৃন্দ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ এবং আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এ থাকছে ৪০টি ট্রান্সপন্ডার সক্ষমতা। প্রতিটি ট্রান্সপন্ডার প্রায় ৩৬ মেগাহার্টজ বেতার তরঙ্গের সমপরিমাণ। অর্থাৎ ৪০টি ট্রান্সপন্ডার থেকে পাওয়া যাবে প্রায় ১ হাজার ৪৪০ মেগাহার্টজ পরিমাণ বেতার তরঙ্গ। এর মধ্যে ২০টি ট্রান্সপন্ডার বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ প্রয়োজনে ব্যবহার করবে। আর ২০টি ট্রান্সপন্ডার বিদেশি রাষ্ট্রের কাছে ভাড়া দেওয়ার জন্য রাখা হবে।
৪০টি ট্রান্সপন্ডারের মধ্যে ২৬টি হচ্ছে কেইউ ব্যান্ডের এবং ১৪টি সি ব্যান্ডের। গাজীপুর ও চট্টগ্রামের বেতবুনিয়ায় স্থাপিত দুটি ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র থেকে নিয়ন্ত্রিত হবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১। উৎক্ষেপণের পর নির্দিষ্ট দূরত্বে দ্রাঘিমাংশে (প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার দূরে ১১৯ দশমিক ১ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে) স্যাটেলাইটটি অবস্থান করছে। ইতিপূর্বে যুক্তরাষ্ট্র-ফ্রান্স-ইতালি থেকে স্যাটেলাইটটি সম্পূর্ণভাবে কন্ট্রোল করা হলেও বর্তমানে গাজীপুর গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে ট্র্যাকিং এবং কন্ট্রোলিং করা হচ্ছে।
প্রকৌশলীরা এখান থেকে স্যাটেলাইটে সিগন্যাল পাঠিয়ে আবার তা রিসিভ করছে। প্রয়োজন হলে সিগন্যাল পাঠিয়ে স্যাটেলাইটটিকে (১১৯ দশমিক ১ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশ পজিশনে) নির্দিষ্ট অবস্থানে ধরে রাখার জন্য যা যা করা দরকার তা করছে। নিয়মিত ট্র্যাকিং ও কন্ট্রোলিং করা হচ্ছে।

Category:

রক্ত পালক

Posted on by 0 comment

8-6-2018 7-49-20 PMআনিস রহমান: ট্যামা ম-লের বুক ধড়াস ধড়াস করে উঠছে আর নামছে। যেন শাটার মিস্ত্রির হাঁতুড়ি। একবার উঠছে। একবার নামছে ধড়াম করে। কখনও মনে হয় বুকটা হাঁপরের মতো ফুলে উঠছে। আবার চিমসে যাচ্ছে মুহূর্তে। আসলে ঠিক কী হচ্ছে ওর বুকের ভেতরে তা ও কেন ওর বাবাও যদি এসে ভেতরে সেঁধিয়ে যায় তাহলেও কিছু বুঝতে পারবে কি না সন্দেহ। তবে একথা ঠিক, ট্যামা যে কিছু বুঝতে পারছে না। কাউকে বোঝাতে পারছে না। বলতেও পারছে না কিছু। যাকে বলা যায়।
ট্যামা ম-ল মানে ত্রিমোহিনী ম-ল। বুঝ হতেই দেখে ওর মাথায় ঢাউস এক বোঝা। বয়েস যত বেড়েছে। বোঝার আকারও তত বেড়েছে। একসময় ও ছিল বাবার পেছন পেছন। একসময় বলা নেই কওয়া নেই বাবা সামনে থেকে সটকে পড়ল। সটকে পড়ল মানে টসকে পড়ল জীবন থেকে। হঠাৎ বড্ড একা হয়ে পড়ল ট্যামা। নিঃসঙ্গতা এত ভারী, এত ক্লান্তিকর আর আতঙ্কময় হতে পারে তা আগে কখনও উপলব্ধি করতে পারেনি। সে উপলব্ধি আজ যেন ওকে নতুন করে চেপে ধরেছে। কিন্তু যে আতঙ্ক কিংবা নিঃসঙ্গতার স্বরূপ কেমন তা সবটুকু অবয়ব নিয়ে তাকে ধরা দিচ্ছে না। বিমূর্ত এক অবয়ব কিংবা কিছু আঁচড় না হয় কোনো এক অজানা স্কেচের অবয়বে সে যন্ত্রণা ওকে পোড়াচ্ছে। আঁচড়াচ্ছে ক্ষত-বিক্ষত করছে।
তখন ওরা থাকতো ধোলাইখালের ঢালে। ছোট্ট ডেরা মতো ঘর। ঝুপড়ি যাকে বলে। পাশাপাশি দুটো ঘর। শরীর কুঁজো করে ঢুকতে হয়। তেমনি কুঁজো হয়ে বেরোতে হয় ঢেরা থেকে। একটিতে মা-বাবা। অন্যটিতে ছিল ওদের চার ভাই-বোনের আবাস। বাবার এমনি পালিয়ে যাওয়া কিংবা পলায়নপর মনোবৃত্তি মায়েরও বুঝি পছন্দ হয়নি। তাই বছর দু না পেরোতেই বাবার পথে মা-ও পা বাড়ালো। ভাই-বোনদের দেখভালের সবটুকু দায়িত্ব কেমন করে যেন ওর ঘাড়ে চেপে বসল। বাড়তি আরেক বোঝা নিয়ে ওর কেবলই মনে হয় বাবার কাঁধের বোঝাটা ওর কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে তবে বাবা চোখ বুজেছে। কখনও মনে হয় কোনো এক মামদো ভূত ওর ঘাড়ে চেপে বসেছে আজীবনের জন্যে। বিশেষ করে ওর দুচোখ যখন মেটে চুলোর ধোঁয়ায় লালচে হয়ে উঠতো রান্নার সময়, কিংবা কখনও জল ঝরতো অঝোর ধারায়, তারপরও আগুনের পাত্তা মিলতো না চুলোর গাড্ডায়Ñ তখন মনে হতো খালের ওপারে বসে বসে বাবা-মা দুজনে তামাসা দেখছে আর মিটিমিটি হাসছে। ছেলেকে নাস্তানাবুদ হতে দেখে। আর ভাবছে ছেলে ওদের লায়েক হবে কবে!
খালপাড়ে ট্যামার আবাস থাকলেও ওদের রোজকার পথ ছিল শ্যামবাজার থেকে ঠাঁটারীবাজার। পাইকারিপাড়া থেকে সবজির বোঝা নিয়ে ঠাঁটারীবাজারের বিভিন্ন মোকামে পৌঁছে দিত। মুটেগিরিতেই জীবন পার হয়ে গেল তার। একসময় বোঝার ভার এতটাই বাড়িয়ে নিল যে ঘাড় কাৎ হয়ে যেত। পা তুলতে পারতো না বোঝার ভাড়ে। কেবল রাবারের চপ্পল জড়ানো পা দুটি রাস্তার সিমেন্টের সঙ্গে ঘষ্টাতে ঘষ্টাতে পথ কাটতো। খস্। খস্। খস্।
জায়গায় জায়গায় ড্রেনের মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বুড়িগঙ্গার মুখে চড়া পড়ায় একসময় ধোলাইখালের জলে বেশ টান দেখা দিল। তখন জলের রংও পাল্টে যেতে লাগলো দিনকে দিন। উৎকট গন্ধ সে জলে। অগত্যা ডেরা গুটিয়ে গে-ারিয়ায় চলে এলো। নতুন আবাস গড়ল রেললাইনের ধারে। কিন্তু এখানে যে এত গুমোট রাজনীতি জট পাকিয়েছিল, তা আগে জানা ছিল না ট্যামা ম-লের। রাজনীতির ঘুঁটির চালে হেরে এবং জটিল জালে জড়িয়ে খুব অল্পদিনেই উচ্ছেদ হলো ট্যামার সংসার। ট্যামার রোজগার থেকে ওদের যদি খাঁই মেটাতে যায় তাহলে সংসার চলে না। আর সংসার চালাতে গেলে ওদের মানে দখলদারদের খাঁই মেটাতে পারে না। উপায়ন্তর না পেয়ে একসময় স্টেশনের প্লাটফরমেই রাতে বিছানা পেতে শোওয়ার বন্দোবস্ত করে নেয় ওরা। তিন ভাইবোনকে ট্রেনে জল বিক্রির কাজ ধরিয়ে দিল। সে কাজের নাটাইয়ের টানে কে যে কখন কোন মাঠে ছিটকে পড়লো তার সন্ধান আর ট্যামাকে করতে হয়নি।
জেলা মিলনায়তনের গা ঘেঁষে যে জলের ট্যাংক দাঁড়িয়ে আছে। তা অনেক পুরনো। আবলুশ কালো স্টিলের তৈরি। সে ট্যাঙ্কের ছায়ায় টুকরির ওপর বীড়া, আর বীড়ার ওপর ওর মাথা এলিয়ে দিয়ে এক দুপুরে ঘুমিয়ে পড়ল ট্যামা। যখন ওর ঘুম ভাঙলো তখন ভরসন্ধ্যা। অসংখ্য বানর আর টিয়ে পাখির কিচিরমিচির ট্যাঙ্কির তল্লাটে। বেশ কয়েকটি বানর ওকে ঘিরে আছে চারদিক থেকে। যদিও নিরাপদ দূরত্বে ওরা বসে। চোখে বিস্ময়। বিস্ময়ভরা চোখে দেখছে আগুন্তককে। বারবার দুহাতে চোখ কচলাচ্ছে। কচলানো হলে ফের বড়বড় চোখে ট্যামাকে যেন যাচাই করছে ওরা। তবে বানরগুলোর কেউই হামলা কিংবা কোনোরকম ঝামেলা পাকাতে আসেনি। আসেনি বলেই ভরসা পেল। নিশ্চিত হলো অন্তত ওরা কোনো ক্ষতি ওর করবে না। সেদিন ওর একা শরীরটা টেনেহিঁচড়ে দূরে কোথাও নিয়ে যেতেও কেন যেন আর মন থেকে সাড়া পেল না। পাইপের পাশে গজিয়ে ওঠা আধমরা দুব্বাঘাসের ওপর থেকে শরীরটা কোনোরকম সরিয়ে নিয়ে পাম্প হাউসের বারান্দায় নিয়ে ঠেকালো। একটি মাত্র শরীর। একটি মাত্র জীবন। তার জন্যে আর কত ভুঁই প্রয়োজন। কোনোরকম শরীরটা কাৎ করতে পারলেই হলো। ভাবে ট্যামা। ভাবনা-মতো শরীর ওর ঠিকই জায়গা করে নিল বারান্দায়। এক সন্ধ্যায় কবির ডেকে বলল, আমি তো একা মানুষ। যদি থাকতো চাও থাকতে পার। তার জন্যে তেমন একটা বেগ পেতে হয়নি। ভেতরটায় আলো আঁধারিময়। তবে রাতে গাঢ় অন্ধকার ছড়িয়ে পড়ে নিবিড়ভাবে। অবশ্য এখানে বাতাস খেলে সবসময়। নদী থেকে উঠে আসা টাটকা বাতাস। ভেজা ভেজা আবেশও ছড়িয়ে সে বাতাসে। সে বাতাস ট্যাঙ্কির ছায়ার সান্নিধ্যে এসে আরও নির্মল আরও শীতল এবং হিমেল একটা ভাব নিয়ে খেলে বেড়ায় ট্যাঙ্কির তলায় ও চারপাশে। কিন্তু মনে একটুও স্বস্তি নেই ট্যামার। জমাট এক কষ্ট বুকজুড়ে। মন শুধু আনচান করে ভাইবোনগুলোর জন্যে। পথ চলতে চোখ রেখেছে অনেকদিন। খোঁজ পায়নি। অনেককে জিজ্ঞেস করেছে। খোঁজ মেলেনি। এখন আপাত নিঃসঙ্গ শরীরটা এলিয়ে দিলেও ভাইবোনগুলো ঠিকই ওর অন্তরের ভেতর থেকে ঘাঁই মারতে থাকে সদলবলে। সেই ঘাঁইয়ের আঘাত সইতে সইতে কখন যে ওর নিঃসঙ্গ শরীর ঘুমের কোলে ঢলে পড়ে তা কখনোই আঁচ করতে পারে না ট্যামা ম-ল। কেবল বানরের কিচকিচ আর পাখির ট্যাঁও ট্যাঁও ডাকে ঘুম ভাঙে ওর। ঘুম ভাঙতেই ভাইবোনগুলো যেন কোথায় চলে যায় পাখির দলবলের সঙ্গে। তখন শূন্য বুকে যেমনি ধড়াম ধড়াম শব্দ ওঠে আজও তেমনি এক শূন্যতা নির্দয়ভাবে কামড়ে ধরেছে ওকে। কী এক অজানা আশঙ্কায় জিভ ওর শুকিয়ে যাচ্ছে বারবার। বুকের ভেতর পীড়ন হচ্ছে ভীষণরকম। ভাইবোনরা চলে যাওয়ার পর শূন্য বুকের হাহাকারের সঙ্গে এ হাহাকারের অদ্ভুত এক মিল রয়েছে। মা-বাবা মরে যাওয়ার পর বুকটি যেমনি শ্মশান শ্মশান মনে হতো ওর। কেবল ছাই কেবল পোড়া গন্ধ ওকে অস্থির করে তুলতো। আজও সেই শ্মশান যেন ওর বুকের ভেতর। চিতা জ্বলছে দাউ দাউ করে। ওর শ্মশান বুকের পোড়া গন্ধের জন্যে কিনা সামনের … ?
রাস্তা আজ বড্ড শুনশান। নিশ্চুপ। তেমনি নিশ্চুপ জলের ট্যাংকের বানরগুলো, পাখিগুলো। আজ বেলা হলেও ওরা কেন যেন চুপ মেরে আছে ঠিক বুঝতে পারে না ট্যামা। অথচ ওরা সব দিব্যি জেগে আছে। যেমনি জেগে থাকে অন্যদিন। কিন্তু পার্থক্য শুধু নীরবতা। বেজায়রকম নীরব। কোনো উচ্ছলতা নেই। দৌড়ঝাপ নেই। ছিটেফোটা দুষ্টুমিও নেই। কেবল মাঝেমাঝে বানরগুলো কান চুলকোচ্ছে। পা চুলকোচ্ছে আনমনে। কখনো পা সোজা করে শরীর সটান খাড়া করে দাঁড়িয়ে পড়ছে। তখন লেজও ওদের খাড়া হয়ে যায়। এছাড়া বাড়তি কোনো চাঞ্চল্য নেই। কেমন যেন হাই তুলে ফের চুপ মেরে যায়। পাখিগুলো মাঝে মাঝে জায়গায় বসেই পাখসাট করছে। কখনো ছোট ছোট লাফ দিয়ে এদিক-ওদিক যাচ্ছে। কিন্তু মুখে কোনো রা নেই। শরীরে নেই কোনো চাঞ্চল্য। ওদের আচরণের এমনি পরিবর্তন চোখে পড়ে ঠিকই, তবে বুঝে উঠতে পারে না এর নেপথ্য কারণ। যেমনি বুঝতে পারে না ওর বুকের ভেতর কেন বইছে ঝড়ো হাওয়া। কেন শ্মশানের অত দহন।
এ যন্ত্রণার ভার ও বইছে গতকাল সন্ধ্যা থেকেই। পাহাড় থেকে নেমে আসা পেল্লায় এক পাথর বুঝি ওর বুকে চেপে বসেছে। পাথরে খাঁজ কাটা। একটু ঘষা পেলেই জ্বলে ওঠে বুক অসহ্য এক যন্ত্রণায়। তখন সবেমাত্র জলের ট্যাংকের পশ্চিমের মোটা পাইপটার ওপর এসে বসেছে। তার আগে শেষ বোঝা নামিয়ে দিয়ে ফিরেছে কেবল। ক্লান্তি ওর সারাশরীরে। ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে আছে গাঁয়ের ছেড়া গ্যাঞ্জিটা। তখন ওর চোখ যায় পশ্চিমাকাশে।
সূর্য ডুবে গেছে অনেকক্ষণ। কিন্তু টকটকে লাল রক্তে যেন ভেসে যাচ্ছে পশ্চিমাকাশ। তাজা রক্তের ধারা যেন ছড়িয়ে পড়েছে সারা আকাশজুড়ে। রক্তের ধারা টুপটাপ টুপটাপ করে একটু পরেই বুঝি ঝরে পড়বে আকাশ থেকে। অমন রক্তাক্ত আকাশ দেখে ভীষণ রকম চমকে ওঠে ট্যামা। কোনো ভাগাড় থেকে উড়ে আসা শুকুন এই মাত্তর ওর বুক খামচে ধরেছে। নির্বাক হয়ে অনেকটা সময় ধরে তাকিয়ে থাকে ট্যামা। একাত্তরের আকাশ না? বিড়বিড় করে ওঠে ট্যামার ঠোঁট। পঁচিশে মার্চের সন্ধ্যায় এমনি রক্তভেজা আকাশ দেখেছিল ট্যামা। সে রাতেই পাকিস্তানি সেনারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ঢাকার পথে-ঘাটে। অলিতে-গলিতে। দালানে-বস্তিতে। টার্গেট শুধু বাঙালি। যেখানেই পেয়েছে সেখানেই হত্যা করে। হাজারে হাজারে মানুষ নিশ্চিহ্ন করে দিল কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। কত বস্তি ওর চোখের সামনে পুড়েছে। ছাই হয়ে গেছে মানুষশুদ্ধ। তার চাক্ষুষ সাক্ষী সে তো নিজেই। এরপর ৯ মাস ধরে ওরা কেবল হত্যা করেছে আর রক্ত ঝরিয়েছে। দেশজুড়ে। যেখানেই বাঙালি পেয়েছে সেখানেই ওদের অস্ত্র রক্ত ঝরিয়েছে। ওর মত মুটে-মজুররাও রক্ষা পায়নি। ট্যামা যে এখনও বেঁচে আছে তা আজও ওর কাছে এক বিস্ময়। সে রক্তের ধারা যেন ফের আকাশ ছাড়িয়ে উঠেছে। এ সূর্যের আলো না। এ রক্তের নদী। এ নদীকে চেনে ট্যামা। এ রক্ত দেখে এক বুক হিম করা ভয় নিয়ে গতরাতে ছেঁড়া কাঁথায় পা এলিয়ে দিয়েছিল ও। কিন্তু সে রক্ত ওর পিছু ছাড়েনি। খানিক আগে মনে হয় গত সন্ধ্যায় যে রক্ত গড়াতে গড়াতে ওর পিঠের নিচে এসে জমা হয়েছে। সে ধারার সঙ্গে মিলেমিশে আরও নতুন নতুন ধারায় রক্ত আসছে। সে রক্তের ভেজা আভাস ওর ঘুম কেড়ে নিল এক ঝটকায়। এবং সবকিছু কেন যেন অদ্ভুত রকম বদলে যাচ্ছে। যে বদলে যাওয়ায় কোনো আনন্দ নেই। কেবল ভয়। কেবল আতঙ্ক। কেবল নিঃসঙ্গতা, কেবল রহস্য শুধু হাঁসফাঁস করছে মোটা গুঁই সাপের মতো।
ট্যামার আশ্রয় এ ট্যাংকের তলায় আলো বাতাসের খেলা থাকলেও ট্যাঙ্কির গায়ের রং তো কালো।  নিকষ কালো বলতে যা বোঝায় ঠিক তাই। এমনিতেই স্টিলের তৈরি। তার ওপর অনেক কালের পুরনো। বিকট আকারে দেখতে। তাকালেই গা শিউরে ওঠে। কেবল বানরের লাফ-ঝাঁপ আর টিয়ে পাখির ট্যাঁ ট্যাঁ শব্দ আছে বলে জায়গাটা ভৌতিক কিংবা আতঙ্কময় কিছু মনে হয় না। প্রাণের এক কোলাহল সারাক্ষণ মাতিয়ে রাখে জল ট্যাঙ্কের ছায়া তার চারপাশ। ওদিকে পাঁচিল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে অগুনতি নারকেল গাছ। বাতাস খেলে পাতার গায়ে গায়ে। বাতাস দোলে পাতার ভাঁজে ভাঁজে। বাতাস পেয়ে পাতারা আনন্দে খেলা করে। যে আনন্দ ট্যামাকেও ছুঁয়ে যায়। আনন্দ চোখে আশপাশে তাকায় ও আনন্দের যেন শেষ নেই। সকালে ঘুম ভাঙে ওদের ডাকাডাকি, চ্যাঁচামেচিতে। ভাটি সন্ধ্যায় যখন ট্যাংকের আশ্রয়ে ফেরে তখনও ওদের কিচিরমিচির। যেন ট্যামাকে দেখেই ওদের সবটুকু আনন্দ ঝরে পড়ছে। অথচ আজ সকালটায় সব উল্টো। সে আনন্দের কোনো রেশ নেই। খাঁখাঁ চারদিক বিরান সবকিছু। ঝরাপাতার মর্মর। শুকনো পাতার খসখসে শব্দে পথ ভা-ার করুণ সুর। সব তাতেই কী ভীষণ শূন্যতা। মাঝেমধ্যে একটা-দুটো টিয়ের পাখসাঁটের শব্দ কানে আসে। কিন্তু কোনো ডাকাডাকি নেই। বানরগুলোও দু-একবার কিচকিচ করে উঠলেও। কণ্ঠে বিষণœতার সুর। হয়তো বেসুরো কোনো কান্না আর সবদিনের মতো সকালের সেই উল্লাস যেন কোথাও মাটিচাপা পড়েছে।
ট্যাঙ্কির পাশ ধরে বেশ চওড়া একটা রাস্তা চলে গেছে। এখানে এসে রাস্তটি অর্ধচন্দ্রাকৃতির মতো বাঁক নিয়েছে। রাস্তার ওপারেই নদী। নদী এখানে বাঁক নিয়েছে। সে বাঁক ধরেই রাস্তা চলে গেছে দূরে। রাস্তার ওপারেই বালুর গদি, ইটের মোকাম। এবং ঢালজুড়ে পাজা করে ইট সাজিয়ে রাখা হয়েছে। থাকথাক ইট। তারপরেই নদী, নদীজুড়ে অসংখ্য নৌকো। মহাজনী নৌকো। গয়না নৌকো ছাড়াও খেয়াঘাটে পারাপারের লোকজনের ভিড় লেগে থাকে কাকভোর থেকে রাত অবধি। জলের ট্যাংক বাঁয়ে রেখে খানিক এগোলেই খেয়াঘাটের চারদিকে প্রাণচাঞ্চল্যের উদোম হাওয়া। সে হাওয়ায় মন ছুটে যায় নদী ছাড়িয়ে ওপারে। ঢেউ ছুঁয়ে ছুঁয়ে অনেক দূরে। নৌকোর গায়ে নৌকো লেগে আছে। গলুইয়ের গায়ে গলুই খেয়া তরী ভরে যাচ্ছে মুহূর্তে। চড়াৎ চড়াৎ করে বৈঠা পড়ছে। আর নৌকো এগোচ্ছে মাঝ নদী বরাবর। শূন্য স্থানে নতুন নৌকো এসে ভিড়ছে। ফের যাত্রী বোঝাই হয়ে সরে যাচ্ছে সে নৌকো। মানুষের নানা কর্মের যজ্ঞ চলে এ ঘাটে। অথচ সেখানে আজ কেমন এক গুমোট নিস্তব্ধতা।
আর্মেনিয়ান গির্জা আছে কাছে। সেখানেও আজ ভোরে ঘণ্টা পড়েছে কি না ঠিক ঠিক মনে করতে পারছে না ট্যামা ম-ল। পাদ্রীদের আনাগোনাও চোখে পড়ছে না একেবারে।
দীর্ঘদিন ধরে মুটেগিরি করতে করতে ট্যামার ঘাড় বসে গেছে ভেতর দিকে। বাঁ দিকে বাঁকা হয়ে থাকে ঘাড়। সোজা করে রাখা বড্ড কষ্টকর। আজ সে ঘাড় সোজা করে বারবার রাস্তার দিকে তাকাতে চেষ্টা করে ট্যামা। সমস্ত নীরবতা ভেঙেচুরে হঠাৎ একটা নেড়ি কুকুর লম্বা কুঁই দিয়ে ডেকে ওঠে। যেন কী এক কষ্টে কুকুরের বুক ভেঙে আসছেÑ ‘মরার কুত্তা আর ডাক দেওয়ার সময় পাইলি না। ট্যাংকির তলায় আইসেই তোকে মরতি হবে… যা… যা। হুস হুস…’ এমনি নানা শব্দে কুকুরটিকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে ট্যামা। যদিও কুকুরটি আর একটিবারও ডাকেনি কিংবা ডাকার চেষ্টা করেনি। তারপরও কী এক আতঙ্কে ও কুকুরটাকে তাড়িয়ে নিশ্চিন্ত হতে চায়। দুদ- নির্ভাবনায় কাটাতে চায়। কিন্তু কুকুরটির সেদিকে কোনো ভ্রƒক্ষেপ নেই। কেবল পিটপিট করে তাকাচ্ছে আর লেজ নাড়ছে। ওর চোখে মুখে গভীর মেঘের ছায়া। না-কি চোখের কোণে জল!
ত্রিমোহিনী ম-ল নামটি একটু বড়সড় এবং ডাকার জন্যে একটু খটোমটো বটে। তাই বাবা ওকে ডাকতো ত্রিমো-ত্রিমো বলে। মুখে মুখে সে নাম তিমো হয়ে গেল। পরে ওর শরীর কুঁজো হয়ে ঘাড়টা এক পাশে কাঁৎ হয়ে বসে গেলে এবং শেষে কেমন করে ঝড়ে উপড়ানো গাছের গুঁড়ির মতো বেঁকে গেল। তখন তিমো কখন যেন ট্যামা হয়ে গেল। সেই ট্যামা ম-লের বুকে আজ যেন শূন্যতার হাহাকার। ট্যাসে যাওয়া ঘাড়টাকে কখনও উঁচিয়ে, কখনও ঘুরিয়ে বারবার রাস্তার দিকে তাকানোর চেষ্টা করে। আজ বুঝি ট্যামা ওর বসে যাওয়া ঘাড়টিকে ঠিকই টেনে তুলবে। মাঝে মাঝে ঘাড়টাকে চাড়ি দিয়ে চোখ-মুখ ওপর দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তখন মনে হয় নির্ঘাৎ আজ ট্যামা ম-ল ওর বেসাইজ ঘাড়টাকে সাইজে নিয়ে আসবে। ও যেন আজ মরীয়া ওর ট্যামা নামটা ছেঁটে ফেলতে। আসলে কে বুঝবে ওর যন্ত্রণা। একটা আগুনের গোল্লা যেন ওর বুকের ভেতর গড়াগড়ি খাচ্ছে সেই কাকভোর থেকে। এ যন্ত্রণাটাই ওকে আর ঘুমোতে দিল না।
পাম্প হাউসের বারান্দার এক কোণে ওর ছোটমতো এক বাক্স রাখা আছে। কেরোসিন কাঠের বাক্স। বাক্সের কোণায় কাগজে মোড়ানো গুলের কৌটো থেকে বড় করে তিন আঙুলের চিমটিতে এক দলা গুল নিয়ে নিচের ঠোঁট ফাঁক করে সেখানে পরম যতেœ বসিয়ে দিচ্ছিল। আর দুটো চোখের মণি নব্বুই ডিগ্রি কোণায় রেখে বাইরে কী যেন দেখছিল। সামনে বড় একটা গেট। আশপাশ সব পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। তখনই খেয়াল করল দু-তিনটে আর্মি পিকআপ সাঁই সাঁই করে চলে গেল। মেশিনগান তাক করা কাছে। খানিক পরেই একটা কনভয় এসে থামল ট্যাংকির গেটে। নেমেই গেটের তালা ধরে ঝনঝন করে আওয়াজ করতে থাকে এক আর্মি। তর সইছিল না একটুও।
“গেট খোল। গেট খোল।” বলে ঝন ঝন করে ফের আওয়াজ। মাঝে মাঝে বুট দিয়ে শেকলে বাঁধা গেটের দুপাল্লার মাঝখানে লাথি মারছে। কবির তখনও ঘুমোচ্ছে। পাম্পম্যানের দায়িত্বে ও। কিন্তু ওর কোনো সাড়া নেই। ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে দুজন আর্মি গেটের চৌকো খোপে পা রেখে গেট টপকাতে যাচ্ছিল। তখনই ট্যামাকে দেখে এক জোরসে ধমক লাগাল আর্মিÑ এই ব্যাটা কি দেখছ। চোখ তো চোখ। চোখের খোল বার কইরা ফালামু। গেট খোল গেট খোল। ট্যামা কোনোরকম ঠোঁট চেপে দৌড়ে আসে গেটের সামনে।
এই শালা কানে শুনছ না। কখন থেইকা হল্লা করতাছি। গেট খুলস না কেন। মতলব তো ভালো ঠেকতাছে না। এই ন্যাটা কাছে আয়। তোর কানপট্টি বরাবর একটা থাপ্পড় পড়লেই তখন ঠিকই শুনবি। বয়রা সাজো? সব বয়রামি কবুতরের লাহান পতপত করে উইড়া পালাবে। ট্যামা ওদের ধমকে গেটের আরও কাছে আসে।
উফঃ শালায় তো নেশা করছে। সারাশরীরে মুখে গাঞ্জার গন্ধ। গেট খোল। গেট খোল। তামাশা দেখো খাড়াইয়া খাড়াইয়া। আইজ তোর নেশার দাঁত তুইলা ফালামু।
ট্যামার পুরো শরীর স্প্রিংয়ের মতো কাঁপছে। আ-মা-র কাছে চা-বি নাই। আমি নেশাও করি নাই।
Ñ নেশার খবর পরে লবো আগে বল্ তালা মারছে কে?
Ñ পাম্পের মানুষ।
Ñ তুই তবে কেডা।
Ñ আমি পোজা বাই। এইহানে রাইত এট্টু আশ্রয় পাই।
Ñ তার মানে তুই ওয়াসার কেউ না।
Ñ না স্যার। এট্টুহানি মাথা গুঁইজা থাকি। ঘরবাড়ি নাই।
Ñ তুই সরকারের লোক না হয়ে সরকারি জায়গায় থাকস? শেখ তার ঘরবাড়ি দেয় নাই! তোর আইজকা খবর আছে বলেই টপাটপ গেট পেরিয়ে ভেতরে লাফিয়ে পড়ল ওরা। নেমেই কে একজন হাত ঘুরিয়ে এক চড় কষালো ট্যামার গালে। এমনিতেই ছোটখাটো শরীর। সেভাবে খাওয়াও জোটে না আজকাল। তখন চড়ের ধকল আর সামলাতে না পেরে পাঁচ-সাত হাত দূরে গিয়ে ছিটকে পড়ে ও। এমনিতেই গুলের রস জমেছিল মুখে। সে রস বিজলের মতো ওর সারামুখে ছড়িয়ে পড়ে। এবার ওর কোমর বরাবর লাথি দেয়ার জন্যে যেই পা তুলেছে এক আর্মি, তখনই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসতে দেখে একজন লোককে। বয়েস পঁয়ত্রিশ। গায়ে সান্ডোগেঞ্জি। শত চেষ্টায়ও লুঙ্গির গিঁট খুলে যাচ্ছে বারবার। পায়ে রাবারের চপ্পল। ওকে আসতে দেখে পা নামিয়ে নেয় আর্মি। কাছে আসতেইÑ
তুই কে?
আমি কবির, পাম্পম্যান। কান্না আর ফোঁসফোঁস শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দে অদ্ভুত এক শব্দ হচ্ছিল কবিরের নাক ও মুখ গলে।
বলতে না বলতেই ওর কান বরাবর এক থাপ্পড় এসে পড়ে। দুই মণ ওজনের থাপ্পড় যাকে বলে। হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে কবির। দাঁত বসে যায় ওর জিভে। কলকল করে রক্ত বেরুতে থাকে ওর মুখ গলে।
এতক্ষণ গেট খুললি না ক্যান। কোন মাগীর সঙ্গে ফস্টিনস্টি করছিলি?
স্যার আমি অনেক রাতে শুই। এত বড় ট্যাঙ্কি ভরা হইলে তবে শুইতে যাই। অনেক ভোরে পানি ছাড়তে হয়।
আজকে পানি ছাড়ছত?
অহনও টাইম অয় নাই। পনর মিনিট লেট আছে।
লেটের খেতাপুরি। এহনি পানি ছাড়। শেখের যুগ শেষ। মনে রাখবি কেউ যেন পানির জন্য কষ্ট না পায়। যদি শুনি কেউ পানি পায় নাই তবে তর খবর আছে। বলেই বন্দুকের নল ওর বুকে তাক করে। ভয়ে আতঙ্কে ছড়ছড় করে পেশাব করে দেয় কবির।
এ দেখে আর্মিগুলো হো হো করে হেসে ওঠে। প্রাণ খোলা সে হাসি। যেন পাকআর্মিদের প্রেতাত্মা ওদের বুকে বসে আছে।
যা এবার গেট খোল। বলে ঘাড় ধরে গেটের দিকে ঠেলে দেয় কবিরকে। কবিরের কোমরে বাধা কায়তনের সঙ্গে ইয়াবড় এক চাবির ঝোপা। চেনা চাবিটা খুঁজে পেতে আজ যেন ও কেনো বারবার খেই হারিয়ে ফেলছে। একটার পর একটা চাবি ধরে। হাতে নেয়। তালা খোলার চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না।
এটা-না
ওটা-না
তৃতীয়টা-না
পরেরটা-না
তার পরেরটা-না
আরও একটা-না।
না, চাবি কোনোটাই ফিট করছে না। তালাও খুলছে না। এক আর্মি এবার দাঁত কিড়মিড় করে পেছন থেকে এক লাথি কষায় কবিরের পাছায়। আচমকা লাথিতে ওর মুখ গেটের লোহায় থেতলে যায়। মুহূর্তে কপাল ট্যামা হয়ে ওঠে। এবার নাক দিয়েও রক্ত ঝরতে থাকে। নিজেকে ধাতস্ত করে বড্ড করুণ দৃষ্টিতে একবার তাকায় কবির। এবার ঠিকই মিলে যায় চাবি। “শালার হারামখোর। এগুলারে কেমনে শায়েস্তা করতে অয় দেখলেন? অহন ঠিকই চাবি বার হয়। আসলেই মাইরের উপরে অসুধ নাই।” বলেই সহকর্মীদের দিকে তাকিয়ে বিদঘুটে এক হাসিতে ওর ঠোঁট ভরে ওঠে। সে হাসি দেখে তখন ট্যামার মনে হয় মানুষকে ভয় দেখানোর জন্যে এমন হাসি শেখাতে বুঝি ওদের ট্রেনিং দেয়া হয়। কী হাসি রে বাপ, আত্মা খাঁচা ছাইড়া যাওনের জোগাড়!
গেট খুলতেই আর্মিগুলো কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে ফের ফিরে আসে। কাছে ডাকে ট্যামাকে। তারপর পাছায় হালকামত এক লাথি ঝেড়ে কান ধরে বাইরে নিয়ে যায় ওকে। দূর থেকেই কবিরকে উদ্দেশ্য করে বলে, এই নাটা যেন আর ভিতরে না ঢুকে। যদি ঢুকছে তোর খবর আছে। মনে রাখিস এইডা সরকারি জায়গা। আবোল তাবোল কাউরে ঢুকাবি তো জানে মাইরা ফালামু। আর মনে রাখবি মানুষের যাতে পানির জন্য কোনো কষ্ট না হয়। যদি খবর পাই মানুষ পানির জন্য কষ্ট পাইতাছে, তাহলে বুঝুম তুই মুজিবের দালাল। তখন মুজিবের যে পরিণতি সেই একই পরিণতি হইবে তোরও।
গেটের বাইরে গিয়ে রাস্তায় কুকুরের মতো দাবড়াতে দাবড়াতে অনেক দূর তাড়িয়ে দিয়ে আসে ট্যামাকে। রাস্তায় মানুষজন নেই বললেই চলে। আরো কয়েকটা আর্মির জিপ সামনে পেছনে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে। তবে জিপগুলো শূন্য। আর্মিরা নেই। কোথাও গিয়েছে হয়তো।
সুড়কির টিলার ওপর একটা ছাতা তখনও মেলে আছে। জরিনা ও সখিনা দুবোনে মিলে এখানে ইট ভেঙে খোয়া বানায়। রোদকে আড়াল করার জন্য খোয়ার মাঝখানে এক বাঁশের লগি পুতে তার সঙ্গে ছাতি বেঁধে রাখে। কিন্তু গত রাতে ওরা কেন যেন ছাতিটা নিতে ভুলে গেছে। ছাতির ছায়ায় গিয়ে বসে থাকে ট্যামা। থাপ্পড় খেয়ে তখনও ওর মাথা হেলদোল করছে। তৃষ্ণায় বুক ফেটে যাচ্ছে। তবু কোথাও একটু জলের দেখা নেই।
অনেকটা সময় ঝিম মেরে থাকে ট্যামা। একে একে সে খানিক আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো মনে করছে। তখনও সবকিছু স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে ওর। মুজিবের যুগ শেষ! ‘কী কয় হালার পুতেরা।’
কাউকে যে জিজ্ঞেস করবে কিছু এমন কাউকে চোখে পড়ছে না। আলু, পেঁয়াজ, আদা, কুমড়োর বড় বড় মোকামগুলো সব বন্ধ। এমনকি চান মিয়ার হোটেলটাও আজ খোলেনি। তবে হোটেলটার পেছনে কারিগররা সব থাকে ম্যাস ভাড়া করে। ওদিকে যাবে কী একবার! কিন্তু আশপাশে তাকাতেই ওর চোখ ছোট হয়ে আসে। বুক শুকিয়ে তেজপাতা। তখনও একটি কনভয়, একটা জিপ দাঁড়িয়ে। হঠাৎ ভেতর দিকের বিভিন্ন বাসাবাড়ি থেকে বেশকিছু লোকজন ধরে নিয়ে আসে ওরা। বয়েস সবার বিশ থেকে পঁয়ত্রিশের মধ্যে। কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখে ওদের কনভয়ের সামনে। এরপর আরও কয়েকজনকে ধরে এনে সবাইকে সারবেঁধে কনভয়ে তোলে। তোলা শেষ হলে ঝুমঝুম শব্দ করে কনভয় চলে যায় বাঁকের আড়ালে কোথাও।
‘একাত্তরে পাকসেনারা গেলগা তয় এরা কারা? পাকসেনাগো মতোই তো হম্বিতম্বি করলো। নাকি পাকসেনাগো ভূত আইল?’ বিড়বিড় করে স্বগোক্তি করে ট্যামা ম-ল। কী কইল হালারা, শেখের বেটার যুগ না-কি শেষ। মাত্থা খারাপ। নেশা করছে না তো! ঢাকা ভার্সিটির ময়দানে না আজ শেখ বেটার ভাষণ দেওনের কতা। রাতের শেষ বোঝাটা নামিয়ে ফেরার সময় ঠাটারি বাজারে পার্টি অফিসের সামনে দেখেছে অনেক লোকের হল্লা। তাদের অনেকের মুখে শুনেছে। আরও শুনছে ‘দুইডা বোমা নাকি ফুটছে গুলিস্তানে না কোনহানে। কানে ঠাডা পড়ার মতো শব্দ। তব্দা লাইগা গেছে কান।’
কখন যেন আর্মির গাড়ির দুটো চলে গেছে। এখন আর্মির কোনো গাড়ি আর দেখা যাচ্ছে কোথাও। এ ফাঁকে ইটখোলা থেকে রাস্তায় উঠে আসে ট্যামা ম-ল। তখনই দেখে গেটের ওপারে বেশ খানিকটা দূরে কবির দাঁড়িয়ে। ঠোঁটমুখ ফুলে আলু। ট্যামাকে দেখেই ও একবার আকাশের দিকে হাত তোলে আবার দুহাত নেড়ে কী যেন বোঝাতে চেষ্টা করছে। একবার দুহাত ওর বুকে ঠেকায়। আবার সে হাত ঝাড়তে থাকে। ভেজা হাতের জল যেভাবে ঝেড়ে ফেলে, ঠিক সেভাবেই।
ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায় ট্যামার। ‘অর্ধেক তো মইরেই গেছি। আর অর্ধেক মরতে কতক্ষণ, না হয় মইরেই যাব।’ বলেই এক দৌড়ে জলের ট্যাঙ্কের গেটের সামনে এসে দাঁড়ায় ট্যামা। তখনও বেশ কিছুটা দূরে কবির দাঁড়িয়ে। ও চোরা দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক একবার তাকিয়ে একরকম কুঁজো হয়ে গেটের কাছে চলে আসে। কপালে ওর পুরু বলিরেখা। চোখের মণি দুটোয় বড় অস্থিরতা। ও কাছে এসে ফিসফিস করে বলে, বঙ্গবন্ধু নাই! কণ্ঠ কেঁপে ওঠে, কেঁদে ওঠে ওর।
‘পাগলের কতা নাকি!’ ট্যামার কণ্ঠে বিস্ময়। ‘বঙ্গবন্ধুর গাঁয়ে টোকা দিবার ক্ষমতা আছে এমন বাপের পুতের জন্ম অহনও বাংলাদেশে অয় নাই।’ ট্যামার গলায় অদ্ভুত এক ঝাঁজ ফুটে ওঠে। ‘তুই অহনও স্বপ্নে আছত ট্যামাÑ বঙ্গবন্ধু নাই। মাইরা ফালাইছে।’
কেডায় কইল তরে?
রেডিও তে?
রেডিও তে? কী কইল!
শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। আরও কত কী? বারবার কইতাছে। ডালিম নামে এক মেজর এট্টু পরপরই কইতাছে। ট্যামার তখন ইচ্ছে হলো কবিরের ঘরে গিয়ে শোনে খবরটা। কিন্তু গেটে আরও কয়েকটা পেল্লায় সাইজের তালা ঝুলতে দেখে চুপ মেরে যায় ট্যামা। ওর বুক তখন হাঁপরের মতো উঠছে নামছে। ওর খেয়াল হয় পাশের ইশকুলের গেটেও তালা। অন্যদিন এ সময়ে মেয়েদের হৈচৈয়ে রাস্তায় কানপাতা দায়। সেসঙ্গে রিকশা, ঠেলা, ঘোড়াগাড়ির জ্যাম। বেলের টুংটাং। ঘোড়ার চিঁহি চিঁহি ডাক। সহিশের অশ্লীল খিস্তি। সবকিছু মিলিয়ে এ জায়গাটায় জগাখিচুড়ি পাকিয়ে থাকে সেই সকাল থেকে।
না আজ কোনো ভিড় নেই। কোনো রিকশা নেই। গেট খোলা নেই ইশকুলের। দারোয়ানটাকেও দেখছে না কোথাও। সবকিছু কেমন উল্টোপাল্টা লাগছে। তবে কী…। ট্যামা আর দেরি করে না। চাঁন মিয়ার হোটেলের পাশের গলি ধরে ভেতরে চলে যায়। সেখানে গিয়ে দেখে ম্যাসের সবাই রেডিও ঘিরে কান পেতে কী যেন শুনছে। “আমি মেজর ডালিম বলছি। স্বৈরচারী সরকার শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে…” ট্যামা চুপ করে বসে পড়ে মেঝেতে। দু-হাঁটুর ফাঁকে মাথা গুঁজে গুমরে গুমরে কাঁদতে থাকে। ওর কান্নায় গভীর এক বিষণœতা ঘরের সবাইকে যেন চেপে ধরে।
বিকেলে নদী পাড়ে এসে বসে ট্যামা। একমনে ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। চুক! চুক! চুক! চুক! শব্দে ঢেউয়ের পরে ঢেউ চলে যেতে থাকে ভাটির দিকে। ঢৈউয়ের এ শব্দ ভীষণ চেনা ওর। কেমন একটা ছন্দ খুঁজে পায় ও। কখনও মনে হয় ঢেউগুলো কী যেন কথা কয়ে কয়ে যাচ্ছে। অথচ আজ সে শব্দে কী এক কান্নার সুর বাজে। অনেকক্ষণ খেয়াল করেছে ট্যামা। করুণ রাগিণী বাজছে নদীর জলে। একমনে সে ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ মনে হয় ট্যামার, জলের রং লাল। শুধু লাল নয়। রক্ত লাল! একটু আগেও জল ছিল ঘোলা। পরে এখন ফিকে রং ছিল একসময়। গভীর লাল আবির যেন ছড়িয়ে পড়েছে সে জলে। রক্ত না তো! বারবার চোখ কচলায় ট্যামা। ফের জলের দিকে চোখ রাখে। নাহ লাল। উৎকট লাল রং জলের। চোখ ভুল দেখছে না তো। হঠাৎ কী মনে করে আকাশের দিকে তাকায় ও। পশ্চিমাকাশে সূর্য এখনও বেশ উপরে। নামতে আরও বেশ খানিকটা সময় নেবে। খেয়াল করে আজকের আকাশ এখনও সেভাবে রক্তিম হয়নি। যেমনটি হয়েছিল গত সন্ধ্যায়। তাহলে আজ জল এত রাঙা কেন? ট্যামা আজলা ভরে জল হাতে নেয়। কিন্তু সে জলে কোনো রক্তের ছোঁয়া নেই। ফের নদীর জলে তাকায়। কী অসহনীয় রক্তিম সে জল। বড্ড পবিত্র,  নির্মোহ আর নিরাশক্ত মনে হয় সে রক্ত ধারা। রক্তের মধ্যে কোনো অভিমানের ছায়া নেই। এমনটিই ঘটবে। এভাবেই বুঝি পুরস্কৃত করবে দুখিনি বাংলার দুখি বাঙালিরা, তাই কোনো বিস্ময় নেই সে রক্তের ধারায়। এ রক্তের প্রবহমানতা চলবে অনন্তকাল ধরে।
পুরো শরীরে বড় রকমের এক ঝাঁকুনি খায় ট্যামা। কী মনে করে চারদিকে খুব বড় বড় চোখ করে তাকায় ও। না কোথাও একটিও নৌকো নেই। কার্গোগুলো স্থবির হয়ে একে অন্যকে জড়িয়ে ধরেছে কী এক অজানা আশঙ্কায়। একটি লঞ্চেরও ভেঁপু বাজেনি আজ সারাদিন। বুকের মধ্যে ভয়ানক এক শূন্যতা অনুভব করে ট্যামা। উঁইয়ের ঢিবির মতো খসখসে কী যেন ওর অন্তরের গভীরে মাথা তুলছে একটু একটু করে। ওই ঢিবির আড়ালে চাপা পড়ে ওর শ্বাস-প্রশ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছে।
এক ঝটকায় দাঁড়িয়ে যায় ট্যামা। একছুটে জলের ট্যাঙ্কের গেটের সামনে চলে আসে কী মনে করে। কত দিনের পুরনো ঠাঁই। ছিন্ন করা কী এত সহজ। মা গেল। বাবা গেল। ভাইবোনগুলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেল একসময়। সেই থেকে একা মানুষটির সঙ্গে এই জলের ট্যাংকের গাঁটছড়া। তা তো আজকের কথা নয়। বিয়ে থা করেনি বলে জীবন থেমে আছে ওর মধ্যেই। তা না হলে বউ ছেলে-মেয়ে নিয়ে সংসার এক চাতাল সমান বড় হয়ে যেত। একটি মাত্র জীবন। তাই তেমন আর নাড়াচাড়ার প্রয়োজন পড়েনি। বিশেষ করে ট্যাংকের এ আশ্রয়, এ জল এর ছায়া এবং এর বানর আর টিয়ে পাখির সঙ্গে ওর দীর্ঘদিনের যে সখ্যতা তা ওই মিলিটারির বেটাদের এক ধমকেই শেষ হয়ে যাবে? ট্যামা ট্যাংকের ভেতরের দিকের পাঁচিল কালো কালো মোটা সব পাইপ, সবই তো আগের মতোই আছে। কিন্তু কোনো চাঞ্চল্য নেই। নিথর, নীরব, বিমর্ষ ওরা। যেন ওদের রক্তেমাংসে গড়া কোনো শরীর নয়। মাটির গড়া প্রতীমা সব বসে আছে থাকে থাকে। টিয়েগুলোরও একই দশা। কিংকর্তব্যবিমূঢ় ওরা। কিংবা ভেতরে প্রাণ নেই। উড়তে বোধহয় ভুলে গেছে জনমের মতো।
গেটের শিক ধরে অনেক সময় অপলকে তাকিয়ে থাকে জলের ট্যাঙ্কের দিকে। একসময় ফিস ফিস করে বলে, বান্দর, ক-তো, শেখের বেটা বাইচে আছে না মইরে গেছে। বানরগুলোর কোনো সাড়া নেই। একেবারে মৌন। চুপচাপ।
ও-টিয়া, ক-তো, শেখের বেটা বাইচে আছে না মইরে গেছে। টিয়ারাও নিঃশব্দ। কোনো সাড়া মেলে না ওদের কাছ থেকে।
‘শেখের বেটারে মারি ফেলবে এমন বুকের পাটা কার? শেখের বুক হচ্ছি গে পাহাড়ের লাহান। ও বুকে বুলেট ঢোকে না। ফিরে আসবি সমান গতিতে। ওর বুকে কেউ বুলেট ঢোকানোর চেষ্টা কইরলে সে বুলেট উল্টো তার বুকে এইসে বিঁধবে। এ কথা জানে। হ¹লে জানে। সারা দেশজোড়া মানুষ জানে। তারপরও কার বেটার সাহস হবে শেখের বুকে গুলি করে। পাকসেনারা সাহস করেনি যারে গুলি কইরতে। আইউব পারে নাই। ইয়াহিয়াও পারে নাই। কব্বর খুঁইড়াও পারে নাই তারে গুল্লি করতে। সেই শেখের বেটারে অহন গুল্লি করবো কোন খানকির পুত। সেই বেজন্মার পুতের জন্ম অয় নাই অহনও বাংলাদেশে। কি টিয়া হাছা কইলাম না মিছা? কতা ঠিক কি না টিয়া? এবারও টিয়ারা নীরব।
কি বান্দর? আমার কথায় কি বিশ্বাস অয় না। অয় না বিশ্বাস? বানরগুলোও নীরব। একইরকম মৌনতার ধ্যানে ওরা মগ্ন।
বানরের কাছ থেকে, টিয়ার কাছ থেকে কোনোরকম সাড়া না পেয়ে, জেদ ধরে যায় ওর মনে, ওরে পুঙ্গির পুতেরা, কতা কস্ না ক্যান্! তবে কী আমি মিছে কথা বইলছি। তখনই সাঁই করে একটা মিলিটারি জিপ চলে গেল উত্তরে। কেমন খ্যাপাটে গাড়িটার চালচলন। যেন পাগল হয়ে ছুটছে। দ্বিগবিদিক জ্ঞানহারা হয়ে ছুটছে। সে শব্দে পেছন ফিরে তাকাতেই ওর চোখ থমকে যায়। বুক কেঁপে ওঠে অজানা কোনো আশঙ্কায়।
রক্তাক্ত আকাশ। পশ্চিমে তাকালে শুধু রক্তের ঢেউ চোখে পড়ে। প্রতিদিনই সূর্য ডোবে। কিন্তু ডুবন্ত সূর্য কখনও এভাবে রক্ত ছড়ায় না। গতকাল আর আজ যা ঘটল তার সঙ্গে একাত্তরের ২৫ মার্চ সন্ধ্যার সূর্য ডোবার এক অদ্ভুত মিল খুঁজে পায় ট্যামা। একাত্তুরের সন্ধ্যায় যেমনি রক্তগঙ্গার ছবি মিছে হয়নি। ঠিকই রাতে রক্ত ঝরেছে হাজার হাজার মানুষের। আজও কেন যেন মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি রক্ত ঝরার আলামত এটা। তবে কী শেখের বেটা ঠিকই মাটি নিয়েছে। চোখে বইজে ফেলেছে? কোনোভাবেই বিশ্বাস হয় না। এ সময়ে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু লোককে পথ চলতে দেখা যায়। কেউ কেউ পায়চারি করছে উদাসভবে। দু-একজন জটলা পাকালেও গাড়ির শব্দ পেলেই এদিক-ওদিক ছড়িয়ে যাচ্ছে। কেউ হারিয়ে যাচ্ছে এঁদো গলির কোনো অন্ধকারে। তখনই কবির এসে এক ফাঁকে জানিয়ে যায়, আসলেই বঙ্গবন্ধু নাই।
কেমতে বুঝলি।
আকাশবানি থেইকাও কইছে।
আকাশবানিডা আবার কী?
ভারতের রেডিও স্টেশনের নাম। সরকারি রেডিও। অগো কথা মিছা না। না জাইনা তারা খবর দেয় নাই।
ট্যামা ট্যাংকের পাঁচিলের গায়ে ঠেস দিয়ে বসে পড়ে। দুহাতে কপাল চেপে ধরে বসে থাকে অনেকক্ষণ। অস্ফুটে বলতে থাকে, ‘এতক্ষণ ভাবছিলাম সব যেন মিছা হয়। ডালিম মিছা অয়। মিলিটারির জিপ মিছা অয়। রেডিওর কথা মিছা অয়। অহন আর কোনো ভরসায় কমু শেখের বেটা মরে নাই। কবির কইল, আকাশবাণী মিছা কথা কয় না।’
ওর চোখ গলে জল ঝরেছে অনেকটা সময় ধরে। ট্যামা একটুর জন্যেও ওর কান্নার কণ্ঠ চেপে ধরার চেষ্টা করেনি। সব বাঁধন আলগা করে দিয়ে দলা দলা কান্নাদের জল হয়ে বেরিয়ে যাবার পথ তৈরি করে রেখেছে ট্যামা। সে ধারায় বুকের পাষাণ অনেকটা যেন নেমে গেছে। বেশ হাল্কা বোধ হচ্ছে এখন নিজেকে। ওর দুচোখের তলায় জলের ধারা শুকিয়ে খসখসে কেমন এক দাগ পড়েছে। পথের ওপারে অপলকে তাকিয়ে থাকে ট্যামা। গভীর এক ধ্যানে ডুবে আছে ও। হঠাৎ মনে হয় মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে নদীর পাড়ে। কখনও আবার মনে হয় মানুষটা পায়চারি করছে। মুখে পাইপ। গভীর চিন্তায় মগ্ন। ট্যামা বারকয়েক চোখ কচলায়। ভুল দেখছে না তো! কিন্তু না তেমনই দাঁড়িয়ে আছে লোকটা। শাদা পাঞ্জাবি পরা।
ট্যামার ভেতর থেকে সব অর্গল যেন খসে পড়ে। কথার খেই হারিয়ে ফেলে। ‘শেখের বেটা শেখ। আপনে কই যাইবেন আমাগ রাইখা। আপনি কি খালি দেশের নেতা! আপনে আমাগও নেতা। আপনে এই এলাকার এমপি। আমাগ ভোটে নির্বাচিত হইছেন। আমরা আপনারে ভোট দিয়া এমপি বানাইছি। আপনে আর যাবেন কই। এই নদী এই বালু মহাল, এই ইটের ভাটা, পাজা পাজা ইট সবই তো আপনার। অগো মালিকেরা সবাই আপনেরে ভোট দিছে। পাস করাইছে। আপনি এই এলাকার এমপি। ভুইলা গেলে তো চইলবে না।’
এ জীবনে তিন-তিনবার শেখের বেটার ভাষণ একেবারে কাছ থেকে শোনার সৌভাগ্য হয়েছিল ট্যামার। একবার ৭ মার্চ, রেসকোর্স ময়দানে। একবার ’৭০ সালের নির্বাচনের সময় ধুপখোলার মাঠে। আরেকবার ’৭৪ সালে বানের সময়। দেশের বাড়িতে। ত্রাণ দিতে গিয়েছিল ওদের গ্রামে। আর একটা ভাষণ শুনেছে রেডিওতে। সত্তুরের নির্বাচনের আগে। জাতির উদ্দেশে নির্বাচনের আগে শেষ ভাষণ। সেসব স্মৃতি মনে করে ট্যামা বলে, ‘বাঘের বাচ্চাডারে মাইরা ফালাইল! বাঙালি হইয়া বাঙালির সিংহডারে মাইরে ফালাইল! অই হারামখোরের পুতেরা, তোদের বুকটা একটুও কাঁপে নাই! নির্ঘাৎ অজ্ঞান কইরে তারপর গুলি করিছে শুয়রের ঘরের শুয়ররা। সিংহ, বাঘ, চিতা, নেকড়ে সবটারে এক কইরলে যে শক্তি অইবে, এক শেখে তার চেয়ে বেশি শক্তি রাখে। এ কথা কাজী মতিন কইছে। বাস্তুহারা লীগের নেতা কাজী মতিন। বঙ্গবন্ধু ওরে রেডিও বিবিসি কইয়ে ডাকতো! হেই বাগডার বুকের সামনে খাড়াইয়া ওর গায়ে গুলি করা অত সহজ কাম না!’
হঠাৎ তার এ কথার প্রতিধ্বনি শুনতে পায় ট্যামা ম-ল। সিংহের মতো গর্জন করে কে যেন বলছে, ‘কঠিন কাজটাই খুব সহজেই করতে পেরেছে ওরা। তুমি বিশ্বাস করবে কি না জানি না। ওরা আমার বুক বরাবরই গুলি করেছে। আমার বুক ঝাঁঝরা হয়ে গেছে বাঙালির বুলেটের আঘাতে। ওরা পেরেছে। খুব সহজেই ওরা আমার বুকে গুলি চালাতে পেরেছে ট্যামা।’ হঠাৎ ও সম্বিৎ ফিরে পায়।
একরকম কুঁজো হয়ে ছুটতে ছুটতে রাস্তার ওপারে যায়। না কেউ নেই। কোথাও কেউ নেই। এমনি সিংহ কণ্ঠে দেয়া শেখের বেটার ভাষণের কথা ছেঁড়া ছেঁড়া হয়ে কানে ভাসে ট্যামার। “কৃষকদের প্রভুরা সকল সহায় সম্পত্তি আর সম্পদের মালিক। সব সুবিধা তারা ভোগ কইত্তেছে। অগো সহায় সম্পত্তি শুধুই বাইত্তেছে। আর অসহায় দরিদ্র কৃষক দিনদিন আরও দরিদ্র হইত্তেছে। বাঁচার তাগিদে তারা অহন গ্রাম ছাইড়ে শহরে চলি আইসতেছে।” মিছা তো কয়নাই। একটা কথাও তো মিছা কয় নাই শেখের পুত। বাংলার মীর জাফরদের তো শেখের বেটা তো ঠিকই চিনতে পাইরেছিল। তাইলে এতবড় ষড়যন্ত্রের ডিনামাইট কারা পুঁইতেছিল তা কেন ধইরতে পারলে না মুজিবর। আমাগ এমপি তুমি। তোমার কণ্ঠের সে কী তেজ। মাটি কাঁইপে ওঠে। কান ফাইটে ওঠে। তুমিই তো বইলেছিলে রেডিওর ভাষণে, বাংলার মীরজাফরদের কথা। তুমিই তো বইলেছিলে মীরজাফরদের কারণে আইজ আমাদের গায়ে কাপড় নাই। থালায় ভাত নাই। মাথার ওপর আশ্রয় নাই। তাই তো খালের ধারে রেলের ধারে থেইকা উচ্ছেদ হইলাম। অহন পানির ট্যাংক থেইকা, সরকারি জায়গা থেইকাও উচ্ছেদ হইলাম। আশ্রয় তো আর পাইলাম না শেখের বেটা। এখন তুই যে চইলে গেলি, তাইলে আশ্রয়ডা আর কেডায় দিবে। কার দিকে আর পথ চাইয়ে থাকব। তুই তো ভরসা ছিলি। তুই তো ঠিকই কইলি বাংলার ইতিহাস মানে সিরাজদ্দৌলা বনাম মীরজাফরের ইতিহাস। বাংলার ইতিহাস দুখিমানুষ বনাম মোনেমখাঁদের ইতিহাস। রেডিওতে কইছিলি। মনে আছে তোর? শুনছি তুই কারওরে ভুলস না। একবার দেখলে তার নাম। বদনখানি ঠিকই চিনতে পারস। আমরাও তোর ভাষণের কতা ভুলি নাই। ভুলি ক্যামনে। আমাগ প্রাণের কতা ভুলা যায়!
তাহলে তুই কেনে এমন ভুল করলি শেখের বেটা। শত্রু চিনাও তারে পুষলি। দুধ-কলা দি পুষলি। অহন তো ছোবল মারল ঠিকই। আশ্রয় ছিল না বইলে আমার তো কোনো দুঃখ ছিল না কখনও। কোনো অভিযোগ তো ছিল না! একা মানুষ। ট্যাংকির ছায়ায় খারাপ তো আছিলাম না। টিয়া, বান্দর এরা আমার সন্তানের মতো। আমারে ওরা দেইখা রাখতো। চোখে চোখে রাখতো সবসময়। আমিও অগো মায়া করি। অগো হৃদয়ডা অনেক বড়। অনেক অনেক বড় তোমার মীরজাফর আর মোনেমখাঁদের মতো বাঙালিদের চেইয়ে। ওরা অই ট্যাঙ্কির ওপরে থাকে না। অগো আত্মার লগে আমার আত্মার বাধি ফালাইছে, ওরা আমার আত্মীয়। সন্ধ্যা হলি পরে ওরা আমার জন্য পথ চাইয়ে থাহে। আমি ঠিকই বুঝতে পারি। ট্যাংকির ভেতরে পা রাখতেই আমি বুঝি ওদের মনের কথা। ওরা খুশিতে মুহূর্তে চিঁচি ট্যাঁ ট্যাঁ করে এতবড় ট্যাংকি ডারে মাথায় তুইলে ছাড়ে। প্রেম! গভীর এক প্রেম আমার সঙ্গে ওদের। কিন্তু বাঙালির প্রেমে যে অনেক বিষ ছিল তা আমরা না জানলেও তুমি তো ঠিকই জেইনেছিলে মুজিব। তারপরও…।
বলে দু-হাতে বুক চাপড়াতে থাকে ট্যামা। বাঁধনছেঁড়া কষ্ট। বুক যেন ভেঙে পড়বে এক্ষুণি। অনেকে ওকে জাপটে ধরে। অনেকে আশ্বস্ত করে মাথায় হাত বুলিয়ে। কেউ বলে মিলিটারি আসতেছে। গুলি করবে ট্যামা। তোর বুক বরাবর গুলি করবে। এ কথায় আরও বুক চিতিয়ে দাঁড়ায় ও। এবার দুহাত প্রসারিত করে বুক উঁচিয়ে দাঁড়ায় ট্যামা। ঘাড়টা কাৎ হয়ে থাকে। সে ঘাড়টাকে সোজা করার চেষ্টা করে বারবার। আর কেমন এক খিঁচানি দিয়ে বলে, ডাকো তোমার মিলিটারি। দেখি কয়ডা গুলি কইরতে পারে। গুলিতেও শান্তি কিন্তু মীরজাফরদের এই বিজয়, মোনেমখাঁদের এই উল্লাস আমি সহ্য কইরতে পাইতেছি না। কোনোভাবেই পাইতেছি না। মৃত্যু চাই। মৃত্যু পরোয়ানা হাতে ওরে তোরা কেউ আয় না আমার কাছে। দেরি কচ্ছিস কেন। মৃত্যু বড় সহজ। এই দেশে মৃত্যু বড় সহজ। যুদ্ধে মানুষ মরেছে। আন্দোলনে মরেছে। এখন মরেছে শেখের বেটা নিজেই। তফাৎ কেবল একটাই। ওরা মইরেছে পাকসেনাদের হাতে। শেখ মইরেছে বাংলা সেনাদের হাতে। ওর দুঃখী বাংলার পোলাপানের হাতেই।
ও মুরুব্বিরা, ও দাদারা মীরজাফরের এই দেশে, মোনেমখানের এই দেশে আমার আত্মা কেন যেন আর শান্তি পাচ্ছে না। আমি শান্তির দেশে যাব। আমার নেতার কাছে যাব। আমার এমপির কাছে যাব। নির্বাচনের কালে গলা ফাটাইয়া কত ক্যানভাস কইরেছি। মিছিল কইরেছি আমর নেতার জন্য ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’। বলেই দুহাত তুলে নাচাতে নাচাতে মাথাটা হঠাৎ ঢলে পড়ে ওর। এ খবর ওর প্রিয় টিয়ে পাখিরা, ওর প্রিয় বানরেরা জানে কি না কে জানে। তবে ওদের জীবনযাপনে যে বধিরতা, মৌনতা আর শূন্যতা নেমে এসেছে তা বোধহয় অনেক অনেক দিন বিমর্ষ করে রাখবে এই জলের ট্যাংকের তল্লাট। এর ছায়া এর আশপাশ। লঞ্চের ভেঁপুতে ওদের চিত্তে কোনো চাঞ্চল্য আর জাগবে কি না কে জানে। যদিও জাগে সে অনেক অনেক দিন পরে। যেদিন মানুষ বলবে একদেশে আছিল এক শেখের বেটা। শেখ মুজিব ওর নাম। পাহাড়ের লাহান। দুখি বাংলার জন্য জীবন দিয়েছিল। পঞ্চান্ন বছরের জীবনে ৪ হাজার ৬৮২ দিন জেল খেটেছিল। তবু আপস করে নাই মীরজাফরদের সঙ্গে। কবির শোনে ট্যামা যেন বলছে :
লোকে আরও বলবে মৃত্যুর পরও ওর আত্মা যায় নাই। সাত আসমান উপরে যায় নাই। সাত আসমান কী, এক আসমানেও উঠে নাই। মাটিতেই আছে। ট্যাকের ঝোপে, খালে-বিলে, মাটিতে। পাহাড়ের পাথরের খাঁজে খাঁজে, ঝোপঝাড়ে, চরের বালুতে, আলু গাছের লতা-পাতায়, গাঙশালিকের গর্তে কোথায় সে নাই?  এত বছর পরও ওর আত্মা ঘোরে ধানের সবুজ বিচালি ছুঁয়ে। নদীর জলে সাঁতার কাটে। নৌকা বায়। লাঙল চষে। আর দুখি মানুষদের দেখে চোখের জল ফেলে। মুজিব যাবে কোণে। বাংলার মাটি ওরে ছাইড়বে না। কোনোদিনই ছাইড়বে না কবির। চোখ বুজলি ওরে দেখতি পাবি। চোখ খুললি পরে ওরে দেখতি পাবি। তবে যে সে চোখে দেখলি পরে তারে দেখা যাবে না। প্রেমের চোখে দেখতি হবে। ভালোবাসার চোখে দেখতি হবে। তোরা তো জানস না, প্রেম আর ভালোবাসা দিয়াই শেখের শরীর, ওর রক্ত গইড়েছে খোদায়। গুল্লি মাইরা শরীর মারা যায়, দেহ ফেলা যায়। কিন্তু প্রেম-ভালোবাসারে তুমি গুল্লি করবা কেমনে। নিরাকার ভালোবাসার কোন অঙ্গে অদেখা প্রেমের কোন শরীরে গুল্লি করবা! বুকে প্রেম শরীরে ভালোবাসা জড়াইয়া শেখ ঠিকই এই বাংলার জলে, মাটিতে, আকাশে, পাখির নীড়ে, পাখির নরম ডানার ভিড়ে।

Category:

ওদের বুদ্ধিজীবীরা জয়কেও হত্যার চেষ্টা করেছে

Posted on by 0 comment
স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শেখ হাসিনা

স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে শেখ হাসিনা

উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এতিমের টাকা আত্মসাৎ করে খালেদা জিয়া জেলে আছেন। যারা এতিমের অর্থের লোভ সামলাতে পারে না তারা কীভাবে দেশ চালাবে? বিএনপি-জামাত ষড়যন্ত্রের রাজনীতি করে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের অত্যাচার-নির্যাতন থেকে এদেশের কেউ রক্ষা পায়নি। এমনকি ওদের বুদ্ধিজীবীরা জয়কেও হত্যার চেষ্টা করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যক্তিস্বার্থের রাজনীতি দেশকে কিছু দিতে পারে না। জনকল্যাণে রাজনীতি করলে দেশকে কিছু দেওয়া যায়, আর আওয়ামী লীগ তা করে দেখিয়েছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আবার মানুষের মনে আস্থা-বিশ্বাস ফিরে এসেছে।
গত ২৭ জুলাই স্বেচ্ছাসেবক লীগের ২৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সংগঠনের নেতারা গণভবনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা জানাতে গেলে তিনি আরও বলেন, ব্যক্তিস্বার্থে যারা রাজনীতি করে, ইতিহাস তাদের ক্ষমা করে না। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের আশ্রয়দাতা বিএনপির দুর্নীতি ও দুঃশাসনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, এই দলটির প্রতি জনগণের কোনো আস্থা নেই। যারা অতীতে লুটপাট করেছে, ভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসলে আবারও তারা লুটেপুটেই খাবে এবং শুধু নিজেদের ভাগ্য গড়বে। স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাদের তৃণমূলে সংগঠন শক্তিশালী করার পাশাপাশি আগামী নির্বাচনে নৌকার জন্য ভোট চাওয়ার নির্দেশনা দেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগ জনগণের কল্যাণে গত ৯ বছরে যেসব উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়ন করেছে তা তৃণমূলের মানুষের কাছে তুলে ধরার আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জামাত ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করলেও তারা কোরআন শরিফ পুড়িয়েছে। ছোট্ট শিশু থেকে শুরু করে কলেজছাত্রী কেউ রক্ষা পায়নি তাদের আগুন-সন্ত্রাসের হাত থেকে। তাই বিএনপি-জামাতের ওপর দেশের মানুষের আস্থা নেই। এটা এখন প্রমাণিত হয়েছে। খালেদা জিয়াকে ‘মিথ্যা মামলায়’ কারাগারে আটকে রাখার যে অভিযোগ বিএনপি করে আসছে, তার জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, আজকে খালেদা জিয়া জেলখানায়। আমরা তো পলিটিক্যালি অ্যারেস্ট করি নাই। তাহলে তো ২০১৫, ২০১৪ বা ২০১৩ সালে করতাম। বিএনপির দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সে (খালেদা জিয়া) এতিমের টাকা মেরে খেয়ে গ্রেফতার হয়ে জেলে গেছেন। কোর্টের ব্যাপার কোর্টেই সমাধান হবে।
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক লক্ষ্য তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, আমার লক্ষ্য একটাই, বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য গড়া, নিজেদের না। আমরা নিজেদের ভাগ্য গড়তে রাজনীতি করি না। আমরা এটুকুই চাই, বাংলাদেশের ভাগ্যের পরিবর্তন হোক।
পরে সজীব ওয়াজেদ জয়ের জন্মদিন উপলক্ষে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে কেক কাটেন শেখ হাসিনা। ১৯৭১ সালের ২৭ জুলাই ধানমন্ডির একটি বাড়িতে পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে সপরিবারে বন্দী থাকার সময় জয় জন্মগ্রহণ করেন উল্লেখ করে সেদিনের কথা অনুষ্ঠানে স্মরণ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ২৭ জুলাই দিনটি আমার জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। কারণ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে যখন বন্দী ছিলাম তখনই আমার প্রথম সন্তান জয় জন্মগ্রহণ করে। আজকে স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সঙ্গে জয়ের জন্মদিন এক হয়ে গেছে। এজন্য আমার দোয়া ও আশীর্বাদ সকলের জন্য।
আমেরিকায় তার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণের পর হত্যার ষড়যন্ত্র করার জন্যও প্রধানমন্ত্রী বিএনপি নেতৃবৃন্দকে অভিযুক্ত করেন। তিনি বলেন, বিএনপির যে নেতা এই কাজ করেছিল সে ধরা পড়ার পর তার বিচার হলো এবং সেখানে সেই নেতার শাস্তি হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, সেই মামলার রায়ে বেরিয়েছেÑ খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা মাহমুদুর রহমান এবং তথাকথিত বুদ্ধিজীবী শফিক রেহমান অর্থ-পরামর্শ দিয়ে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত, এই বিষয়ে এই দুজনের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে।
দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি এবং স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট মোল্লা আবু কাওসারও অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক পংকজ দেবনাথ এমপি অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। নানা আয়োজনে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করেছে স্বেচ্ছাসেবক লীগ। এ উপলক্ষে সকাল সাড়ে ৮টায় ধানমন্ডি বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন সংগঠনের নেতারা।

Category:

‘মানুষের কাছে বারবার নৌকায় ভোট চাইতে হবে’

Posted on by 0 comment

PM3উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের দ্বন্দ্ব-কোন্দল দ্রুত নিরসন করে একতাবদ্ধভাবে এখন থেকেই জনগণের দ্বারে দ্বারে গিয়ে নৌকা মার্কায় ভোট চাওয়ার জন্য দলের তৃণমূল নেতাদের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। একইসঙ্গে দেশবাসী ও দলের নেতা-কর্মীদের সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আগামী নির্বাচনে নৌকাকে জয়ী করতে হবে। আগামীতে আওয়ামী লীগ যদি ক্ষমতায় না আসে তাহলে আমরা যুদ্ধাপরাধীদের যে বিচার শুরু করেছি তা বন্ধ হয়ে যাবে, আবারও আক্রমণ হবে। বাংলাদেশকে তারা আদর্শচ্যুত করবে, দারিদ্র্যের হার বেড়ে যাবে, উন্নয়ন কাজ বন্ধ হয়ে যাবে। তাই মনে রাখতে হবেÑ নৌকা যেন না হারে, একটি সিটও যেন না হারে।
দলকে ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী করে গড়ে তোলার জন্য মন্ত্রী-এমপি-নেতাদের নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, গ্রামে গ্রামে গিয়ে মানুষের কাছে বারবার নৌকায় ভোট চাইতে হবে। বারবার উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরতে হবে। মানুষ কিন্তু ভুলে যায় এজন্য আমাদের উন্নয়ন-সফলতাগুলো দেশের মানুষের কাছে বারবার তুলে ধরতে হবে, তাদের বোঝাতে হবে, তাদের কাছে বারবার যেতে হবে; যাতে তারা অতীতের মতো আবার আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়। তিনি বিএনপি-জামাতের অগ্নিসন্ত্রাস, নাশকতা, মানুষ পুড়িয়ে হত্যার কথা তুলে ধরে বলেন, এ ধরনের অরাজকতা যেন না হয়, সেটাই চাই। যারা আবারও এসব করার চেষ্টা করবে তাদের বিরুদ্ধেই যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
গত ৭ জুলাই গণভবনে আওয়ামী লীগের তৃতীয় পর্যায়ের বিশেষ বর্ধিত সভায় সূচনা ও সমাপনী বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ হচ্ছে গণমানুষের দল। একমাত্র আওয়ামী লীগ হচ্ছে রাজনৈতিক দল যারা দেশের মানুষের কথা চিন্তা করে, তাদের কল্যাণের জন্য কাজ করে। আওয়ামী লীগ ছাড়া দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন আর কেউই করতে পারেনি, করতে পারবে না। কারণ, বিএনপি-জামাত স্বাধীনতাবিরোধী, দেশের স্বাধীনতায় তারা বিশ্বাস করে না। তারা কখনও মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করবে না। রাজনৈতিক জোট অটুট রাখার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, আমরা জোট করেছিলাম, অবশ্যই আমাদের জোট বজায় রাখতে হবে। যেন সবাই আমাদের বিরুদ্ধে চলে না যায় সেজন্য।
গণভবনে আওয়ামী লীগের তৃতীয় পর্যায়ের বিশেষ বর্ধিত সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি। শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন কেন্দ্রীয় দফতর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ। প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এমপি ও উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যবৃন্দ ছাড়াও তৃতীয় পর্যায়ের এই বর্ধিত সভায় ঢাকা, খুলনা, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগের সকল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, কাউন্সিলর, ওয়ার্ড পর্যায়ের দলের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকগণ, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও কাউন্সিলররা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর চার বিভাগ থেকে চারজন তৃণমূল নেতা বক্তব্য রাখেন। তারা হলেনÑ কুষ্টিয়া সদর উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের দবির উদ্দিন আহমেদ, লালমনিরহাট জেলার তিনবিঘা করিডরের ধরগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন, নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার গ-া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সনজু মিয়া, বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট উপজেলার বেতাগা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান স্বপন দাশ ও শরিয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান মানিক সরদার।
উদ্বোধনী বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেই দেশের মানুষের উন্নতি হয়। গ্রামের অর্থনীতি আজ উন্নত হয়েছে এবং জনগণের আয় বাড়ায় তারা সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারছে, ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল ভোগ করতে পারছে : কথাগুলো সবাইকে বলতে হবে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ব্যতীত কোনো রাজনৈতিক দলই দেশের দরিদ্র মেহনতি জনগণের জন্য কিছু করেনি। দেশের মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবাকে নিয়ে যাওয়ায় তার সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের একটা মানুষও আর ক্ষুধায় কষ্ট পাবে না, একটা মানুষও আর গৃহহীন থাকবে না, সকলেই প্রয়োজনীয় শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা পাবে।
দল এবং সহযোগী সংগঠনের অভ্যন্তরীণ মতভেদ এবং দ্বন্দ্ব এখনই মিটিয়ে ফেলার আহ্বান জানিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, আপনাদের মনে রাখতে হবে আগামীর নির্বাচন অতীতের যে কোনো সময়ের চাইতে কঠিন হবে। তাই কোনো আসন নিয়ে অমনোযোগী হবার সুযোগ নেই, কোনো আসন নিয়ে অমনোযোগী হবার মানেই হবে সে আসনে পরাজয়; যার কারণে আমাদের সরকার গঠনের সুযোগ ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে।
দেশে আওয়ামী লীগের সব ইউনিটের দ্বন্দ্ব-কোন্দল দ্রুত নিরসন করে একতাবদ্ধ হয়ে আগামী নির্বাচনে দলের জন্য কাজ করতে তৃণমূল নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সব দ্বন্দ্ব নিরসন করে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। মনোনয়ন দেয়ার ক্ষেত্রে তৃণমূলের মতামত নেয়া হবে। তারপরও যাকে নৌকা প্রতীক দেয়া হবে, তার পক্ষে সবাইকে কাজ করতে হবে। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে একটা ভাব হয়ে যায়, সব সিটে তো আমরা জিতব। ওই একটা সিটে না জিতলে কী হবে? মনে রাখতে হবেÑ একটা সিট হারালে আমরা সরকার গঠন করতে পারব না। এই কথা মনে রেখে সকলকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ করা মানে নিজের উন্নয়ন করা নয়, দেশ ও দশের জন্য কাজ করাই এই দলের মূল উদ্দেশ্য। বঙ্গবন্ধু দলকে সুসংগঠিত করার জন্য মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দিয়ে দলের হাল ধরেছিলেন। এই দলের জন্য কাজ করতে হলে মানুষের জন্য কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের একটি মানুষও অশিক্ষিত থাকবে না। না খেয়ে থাকবে না। মানুষ নৌকায় ভোট দিয়েছে, সুফল পেয়েছে। আগামীতেও নৌকায় ভোট পেতে জনগণের দোরগোড়ায় যেতে হবে।
আগামী নির্বাচন সামনে রেখে নৌকা মার্কাকে বিজয়ী করতে সরকারের উন্নয়ন-সফলতাগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরার জন্য তৃণমূল নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষকে বারবার না বললে মানুষ তা মনে রাখে না। তাই উন্নয়নের তথ্যগুলো জনগণের কাছে বারবার তুলে ধরতে হবে। বিএনপি-জামাত স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, তাই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে ক্ষমতায় রাখতে হলে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনতে হবে। তিনি বলেন, ক্ষমতা হচ্ছে জনগণের সেবা করা। ক্ষমতা হচ্ছে জনগণের সেবা করার জন্য। মানুষের কল্যাণে, মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের কাজ করার জন্য। আমাদের লক্ষ্য মানুষের কল্যাণ। আমরা সে লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আওয়ামী লীগ প্রাচীন সংগঠন। জাতির পিতার আদর্শ নিয়ে আমাদের রাজনীতি করতে হবে। তিনি (বঙ্গবন্ধু) যত আন্দোলন করেছেন, সবসময় তার ভেতরে একটা লক্ষ্য ছিল দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা। তাই এদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনই আওয়ামী লীগের প্রধান উদ্দেশ্য। বর্তমান সরকার সাড়ে ৯ বছর ধরে ক্ষমতায় আছে বলেই বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বিশ্বে সম্মান পাচ্ছে। বাংলাদেশ আজ সবদিক থেকে এগিয়ে যাচ্ছে।
বিএনপি আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজ দল : স্বাগত বক্তব্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এমপি দুর্নীতিবাজদের দলে রাখতে রাতের অন্ধকারে বিএনপির গঠনতন্ত্র সংশোধনের কথা তুলে ধরে বলেন, বিএনপির গঠনতন্ত্রের ৭ ধারায় ছিল কেউ দুর্নীতিবাজ হলে কিংবা আদালতের মাধ্যমে সাজা পেলে, তিনি দলের নেতা হতে পারবেন না। কিন্তু তারা সেটা বাতিল করে একজন দ-প্রাপ্ত দুর্নীতিবাজকে দলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান করেছেন। এর অর্থ হলো দুর্নীতিবাজ, চোর, সামাজিকভাবে অপরাধী, দেউলিয়া ও উম্মাদ হলেও বিএনপির নেতা হওয়া যাবে! এতেই স্পষ্ট হয় যে, বিএনপি আত্মস্বীকৃত দুর্নীতিবাজ, দেউলিয়া, অপরাধীদের দল।

Category:

আরও ৩৮ বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়

Posted on by 0 comment

PM2উত্তরণ ডেস্ক: মুক্তিযুদ্ধে হানাদার বাহিনী ও রাজাকার আলবদর আলশামসের হাতে নির্যাতিত আরও ৩৮ জন বীরাঙ্গনার নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে সরকার। এখন থেকে বীরাঙ্গনা তালিকাভুক্তরা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সরকারের দেওয়া সকল সুবিধা ভোগ করবেন। এ পর্যন্ত মোট ২৩১ জন বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেলেন। মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাওয়া বীরাঙ্গনারা প্রতিমাসে ভাতাসহ মুক্তিযোদ্ধাদের মতো অন্যান্য সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাবেন। জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের ৫৪তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়ে সম্প্রতি গেজেট জারি করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপি এর আগে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ বীরাঙ্গনার তালিকা নিয়ে আমরা কাজ করছি, যাচাই-বাছাই শেষে পর্যায়ক্রমে সবাইকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়া হবে। এরই অংশ হিসেবে এই তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বীরাঙ্গনারা হলেনÑ নীলফামারীর জলঢাকার মোছা. শাহেলা বেগম, ঠাকুরগাঁও সদরের মোছা. আমেনা বেওয়া এবং লালমনিরহাট সদরের শেফালী রানী, মোছা. রেজিয়া, মোছা. মোসলেহা বেগম এবং শ্রীমতি জ্ঞানো বালা। চট্টগ্রামের পটিয়ার আছিয়া বেগম, ফেনীর ছাগলনাইয়ার রহিমা বেগম এবং কুমিল্লা চৌদ্দগ্রামের আফিয়া খাতুন খঞ্জনী, জয়পুরহাট সদরের মোছা. জাহানারা বেগম, নওগাঁ সাপাহারের মৃত পান বিলাসী, নাটোর বড়াইগ্রামের মোছা. হনুফা এবং সিরাজগঞ্জের তাড়াশের অর্চনা সিংহ ও মৃত পচি বেওয়া মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়েছেন। এছাড়া চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গার মোছা. ওজিফা খাতুন, দয়ারানী পরামানিক ও মোছা. রাবেয়া খাতুন, কুষ্টিয়ার কুমারখালীর মাছুদা খাতুন, মোছা. মোমেনা খাতুন ও মোছা. এলেজান নেছা, কুষ্টিয়া সদরের মৃত রাজিয়া বেগম এবং বাগেরহাটের রামপালের মোছা. ফরিদা বেগম। শেরপুরের নালিতাবাড়ীর মোছা. মহিরন বেওয়া, মোছা. আকিরন নেছা, মোছা. জতিরন বেওয়া, মোছা. হোসনে আরা, মোছা. হাজেরা বেগম (পিতা-মৃত উমেদ আলী) ও হাজেরা বেগম (পিতা-মৃত হাসেন আলী) এবং শেরপুরের ঝিনাইগাতীর মৃত ফিরোজা খাতুন। শরীয়তপুর সদরের জুগল বালা পোদ্দার, যোগমায়া ও সুমিত্রা মালো, গোপালগঞ্জ সদরের হেলেনা বেগম ও ফরিদা বেগম এবং গাজীপুরের কালীগঞ্জের মোসা. আনোয়ারা বেগম। এছাড়া ঝালকাঠি সদরের সীমা বেগম ও মোসা. আলেয়া বেগম এবং হবিগঞ্জের মাধবপুরের সন্ধ্যা ঘোষকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

Category: