Blog Archives

সোনার বাংলায় এককণ্ঠ সারাদেশ

Posted on by 0 comment

উত্তরণ ডেস্ক: স্বাধীনতা দিবসে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে একসঙ্গে শুদ্ধসুরে জাতীয় সংগীত গাইল পুরো জাতি। শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও একযোগে একই সময়ে শুদ্ধসুরে জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়। স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে এই প্রথম এমন ব্যতিক্রমী কর্মসূচি পালন করা হয়। গত ২৬ মার্চ সকাল ৮টায় বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে জাতীয় শিশু-কিশোর সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় পতাকা উত্তোলনের পর শুদ্ধসুরে জাতীয় সংগীত গেয়ে পুরস্কৃত শতাধিক শিশু-কিশোর জাতীয় সংগীত পরিবেশন শুরু করে। তাদের সঙ্গে জাতীয় সংগীতে কণ্ঠ মেলান প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে উপস্থিত মন্ত্রিসভার সদস্যরা, মাঠে থাকা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও সংগঠনের সদস্যরা এবং গ্যালারিতে থাকা হাজার হাজার দর্শক ও অভিভাবক।
জাতীয় সংগীতের পর সমাবেশে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা জাতীয় পতাকার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে। প্রধানমন্ত্রী বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে সমাবেশের উদ্বোধন করেন এবং কুচকাওয়াজে অভিবাদন গ্রহণ করেন। পরে শুদ্ধসুরে জাতীয় সংগীত গাওয়া প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন তিনি।
দেশব্যাপী শুদ্ধসুরে জাতীয় সংগীত গাওয়া এবং সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধিকতর কার্যকর করার জন্য চলতি বছরেই প্রথমবারের মতো মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের উদ্যোগে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এর আওতায় স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসা পর্যায়ে দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আন্তঃশ্রেণি প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শুরু করে ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা, বিভাগ এবং জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা হয়।
সারাদেশের দেড় কোটি শিশু গত ১৫ জানুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ দলগত এ প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে ১১টি দলের ১১০ শিক্ষার্থী চূড়ান্তভাবে বিজয়ী হয়। প্রথম স্থান অর্জনকারী দলের প্রত্যেক সদস্যকে একটি করে স্বর্ণপদক, দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারী দলের প্রত্যেক সদস্যকে একটি করে রৌপ্য পদক এবং তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দলের প্রত্যেককে ব্রোঞ্জ পদক দেওয়া হয় অনুষ্ঠানে। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রথম হয় ঢাকার মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুল ও কলেজ, দ্বিতীয় হয় খুলনা বিভাগের সরকারি করনেশন বালিকা বিদ্যালয় এবং যুগ্মভাবে তৃতীয় হয় চট্টগ্রাম বিভাগের বান্দরবান সদরের মেঘলা প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ময়মনসিংহ বিভাগের ময়মনসিংহ জেলা স্কুল।
এছাড়া দেশের প্রতিটি বিভাগ, জেলা, উপজেলাতেও স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে ঠিক সকাল ৮টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে শুদ্ধসুরে জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও জাতীয় পতাকা উত্তোলনে অংশ নেয় পুরো জাতি।

Category:

নববর্ষ ও বাঙালি-জীবন

Posted on by 0 comment

aড. এম আবদুল আলীম: ০১
বাঙালির সবচেয়ে বড় সার্বজনীন ও অসাম্প্রদায়িক উৎসব বাংলা নববর্ষ। এই উৎসবের মাধ্যমে বাঙালি তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে মেলবন্ধন স্থাপন করে এবং জাতিসত্তার পরিচয়কে নতুন তাৎপর্যে উপলব্ধি করে। মূলত, বাংলা নববর্ষ বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনাকে শানিত করে স্বাধিকার সংগ্রাম বেগবান করেছে এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ অর্জনে শক্তি-সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছে। নববর্ষ কেবল বাহ্যিক অনুষ্ঠানাদির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর মাধ্যমে বাঙালি তার জাতীয়তাবাদী চেতনায় শক্তি সঞ্চিত করে এবং নিজেদের আত্মপরিচয় ও শেকড়ের সন্ধানে ব্রতী হয়। শুধু তাই নয়, এর মাধ্যমে বাঙালির আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জীবনেও আসে প্রবল গতিবেগ।
নববর্ষ পুরনো বছরের ‘গ্লানি’ মুছে দিয়ে বাঙালি-জীবনে ওড়ায় ‘নূতনের কেতন’, চেতনায় বাজায় মহামিলনের সুর। ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী এবং সম্প্রদায়গত ভেদাভেদ দূর করে সকল বাঙালিকে মিলিত করে এক সম্প্রীতির মোহনায়। নববর্ষ এলে উৎসবের আমেজ আর নতুনের আবাহনে পুরো জাতি জেগে ওঠে। কী পল্লি, কী শহর সর্বত্রই প্রবাহিত হয় আনন্দের ফল্গুধারা। গ্রামে-গঞ্জে-নগরে বসে বৈশাখী মেলা; চলে উন্মুক্ত কনসার্ট, পানাহার, লাঠিখেলা, সার্কাস, পুতুলনাচ, হালখাতা; বসে পুঁথিপাঠ, বাউল-জারি-সারি-মুর্শিদী এবং কবিগানের আসর। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র রমনার বটমূলে ছায়ানটের হাজারো শিল্পী নেচে-গেয়ে বরণ করে নতুন বছরকে। প্রচার-মাধ্যমগুলো প্রচার করে বিচিত্র অনুষ্ঠান। জাতীয় দৈনিকগুলো প্রকাশ করে ক্রোড়পত্র। অশুভ শক্তির বিনাশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও চারুকলার ছাত্র-ছাত্রীরা বের করে মঙ্গল শোভাযাত্রা। নানা সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করে বিস্তারিত কর্মসূচি। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর লোকেরা নিজেদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য তুলে ধরে নব-উদ্দীপনায়। রাস্তাঘাট এবং বাড়ির আঙিনা সাজানো হয় আলপনার বর্ণিল রঙে। নতুন পোশাকে আর বিচিত্র সাজে রাস্তায় নেমে আসে অজস্র নর-নারী, যুবা-কিশোর-শিশু। পান্তা-ইলিশ, মুড়ি-মুড়কির ভোজে এবং বাউলের একতারার সুরে সৃষ্টি হয় মন মাতানো পরিবেশ।

০২
বাংলা নববর্ষ কীভাবে প্রবর্তিত হলো? এ সম্পর্কে জানতে হলে আমাদের চোখ মেলতে হয় ইতিহাসের ঝরোকায়। ভারত-তত্ত্ববিদ আলবেরুনি ‘কিতাব উল হিন্দ’-এ (রচনাকাল আনুমানিক ১০৩০ খ্রিস্টাব্দ) ভারতবর্ষে প্রচলিত যেসব অব্দের (শ্রীহর্ষাব্দ, বিক্রমাব্দ, শকাব্দ, বলভাব্দ ও গুপ্তাব্দ) নাম উল্লেখ করেছেন, তাতে বঙ্গাব্দ নেই। বঙ্গাব্দ চালু হয় অনেক পরে, ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে, সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে। ‘আইন-ই-আকবরী’তে আছে : “আকবর বেশ কিছুদিন ধরে হিন্দুস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে দিন গণনার সমস্যাকে সহজ করে তোলার জন্য একটি নতুন বৎসর ও মাস গণনা পদ্ধতি প্রবর্তন করতে ইচ্ছা প্রকাশ করে আসছিলেন।… আমীর ফতই উল্লাহ শিরাজির প্রচেষ্টায় এই নতুন অব্দের প্রচলন হলো।… সিংহাসনে আরোহণের ২৫ দিন গত হলে, অর্থাৎ বুধবার, ২৮শে রবি-উস-সানি (১১ই মার্চ ১৫৫৬) তারিখে ভুবন আলোককারী ‘নতুন বর্ষের’ শুরু হয়েছিলো। এদিনটি ছিলো পারসিক বছরের নওরোজÑ ১লা ফরওরদিন, বিশ্বাস অনুযায়ী ঐদিন (অর্থাৎ ১১ই মার্চ) সূর্য মেষ রাশিতে প্রবেশ করতো।”
সম্রাট আকবর হিজরি সন অনুযায়ী খাজনা তুলতে গিয়ে দেখেন ফসল তোলার সময়ের সঙ্গে মিল রাখা কষ্টকর হচ্ছে। এজন্য তিনি হিজরি সনকে ভিত্তিমূল ধরে সৌরনিয়মে বছর গণনা শুরু করেন, প্রবর্তন করেন বাংলা সনের। চন্দ্রমাসগুলোকে পরিণত করেন সৌরমাসে। আকবর প্রবর্তিত এই সনের (তারিখ-ই-ইলাহি) আদর্শে বাংলা বিহার, উড়িষ্যা, দাক্ষিণাত্য ও বোম্বাই প্রদেশে আমলি, বিলায়তি ও বিভিন্ন ফসলি সন প্রচলিত হয়েছিল। অনেকে শশাঙ্ক ও হোসেন শাহের আমলে বঙ্গাব্দ প্রচলনের কথা বললেও, অধিকাংশ ঐতিহাসিক এবং গবেষক এ কৃতিত্বের মুকুট সম্রাট আকবরের শিরেই পরিয়েছেন।
সময়ের বিবর্তনে বাংলা সন-তারিখের হিসাবে কিছু সমস্যা দেখা দেয়। ১৯৫২ সালে জ্যোতিপদার্থবিদ ড. মেঘনাদ সাহা আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তিতে বাংলাসহ বিভিন্ন বর্ষপঞ্জির আমূল সংস্কারের প্রস্তাব দেন। তার সুপারিশকে মূলভিত্তি ধরে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ১৯৬৪ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র নেতৃত্বে বাংলা বর্ষপঞ্জি সংস্কারের ব্যবস্থা করে। স্বাধীনতার পর প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বাংলায় নোট লেখা এবং বাংলা স্বাক্ষর ও তারিখ প্রদান প্রথা প্রচলন করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এই রীতি অব্যাহত রাখেন। ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ সরকার শহীদুল্লাহ্ কমিটির সুপারিশের আলোকে সকল কাজকর্মে ইংরেজি সন-তারিখের পাশাপাশি বাংলা সন-তারিখ লেখার নির্দেশ দেন। পরে লিপইয়ারসহ কিছু জটিলতা দূরীকরণে বাংলা একাডেমি ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে কিছু সংস্কার সাধিত হয়। এই কমিটি ১৯৯৫ সালের ১৯ আগস্ট সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, প্রতিবছর ১ বৈশাখ হবে ১৪ এপ্রিল আর তারিখ পরিবর্তনের সময় হবে আন্তর্জাতিক রীতি অনুসারে রাত ১২.০০টায়। ১৪ এপ্রিল তথা ১ বৈশাখ এলেই বাঙালির প্রাণ বর্ষবরণের আনন্দে আপনা-আপনি নেচে ওঠে।

০৩
বাংলা নববর্ষ প্রসঙ্গে বলতে গেলে আসে দেশে দেশে কীভাবে নববর্ষ পালিত হয় সে-প্রসঙ্গ। ইতিহাস-পাঠে দেখা যায়, বহু প্রাচীনকাল থেকেই নববর্ষ বিভিন্ন জাতির সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে আছে। সর্বপ্রথম নববর্ষ পালিত হয় মেসোপটোমিয়ায়, খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দে; তখন মার্চ, সেপ্টেম্বর কিংবা ডিসেম্বর মাস থেকে নববর্ষ গণনা করা হতো। খ্রিস্টীয় নববর্ষ চালু হয় ৪৬ খ্রিস্টপূর্ব অব্দে, জুলিয়াস সিজার যখন বাৎসরিক ক্যালেন্ডার পরিবর্তন করেন এবং জানুয়ারি মাসকেই প্রথম মাস হিসেবে ধার্য করেন। রাশিয়া, চীন, স্পেন ও ইরানে ঘটা করে নববর্ষ পালিত হতো। ইরানের নওরোজ মুসলিম শাসকদের হাত ধরে চলে আসে ভারতবর্ষে।
সম্রাট আকবর বাংলা সন প্রবর্তন করেন প্রজাদের কাছ থেকে বছর শেষে নির্দিষ্ট সময়ে খাজনা আদায় করার জন্য। ফসল তুলে আনন্দের সাথে খাজনা দেওয়ার রীতির সঙ্গে কালে কালে যুক্ত হয় নানা ঐহিক, দৈহিক এবং পারলৌকিক বিষয়। আগেকার দিনে চৈত্র মাসের শেষ দিন পর্যন্ত জমিদার-তালুকদারগণ ভূ-স্বামীর খাজনা শোধ করতেন। বছরের প্রথম দিন ভূ-স্বামীরা তাদের মিষ্টিমুখ করাতেন এবং আয়োজন করতেন নানা অনুষ্ঠানের। পরে এসব অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয় ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক নানা আচার-বিশ্বাস, রীতি-নীতি ও আনন্দ-বিনোদনের উপাদান। কালক্রমে দিনটি হয়ে ওঠে শুভচিন্তা ও অনুভূতির পরিপূরক। লোকমেলা, পুণ্যাহ, হালখাতা, গাজনের গান, লাঠিখেলা, ঘোড়দৌড়, গানের আসর এসব যুক্ত হতে হতে নববর্ষ আজ বাঙালির অস্তিত্বের শক্তিদায়িনী উৎসবে পরিণত হয়েছে। নববর্ষ কেবল বাঙালির জীবনেই নয়, বাংলার প্রকৃতিতেও আনে নবসাজ। মৈমনসিংহ-গীতিকার কবি নববর্ষের প্রকৃতির নবরূপ দেখে উচ্চারণ করেছিলেন : ‘আইল নতুন বছর লইয়া নবসাজ,/কুঞ্জে ডাকে কোকিল-কেকা বনে গন্ধরাজ।’
বাংলা নববর্ষ বাঙালির সার্বজনীন জাতীয় সাংস্কৃতিক উৎসব হলেও এর সঙ্গে অর্থনীতির গভীর যোগসূত্র রয়েছে। কৃষিভিত্তিক সমাজে খাজনা প্রদানের সুবিধার্থে এর প্রচলন ঘটলেও, ধীরে ধীরে ব্যবসায়-বাণিজ্যের প্রসারের ফলে এতে যুক্ত হয় নতুন নতুন রীতি। পুরনো বছরের বকেয়া আদায় করতে গিয়ে হালখাতার প্রচলন হয়। হালখাতার বাইরে সামাজিক উৎসব হিসেবে নবববর্ষ পালনের শুরু উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে শেষ পর্যন্ত এখানে সুখ-দুঃখের ভাগাভাগিটা বড় হয়ে দেখা দেয়। পুণ্যাহ এবং লোকমেলার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। নিত্যব্যবহার্য পণ্যের পসার সাজাতে গিয়ে মেলায় যুক্ত হয়েছে পুতুলনাচ, জারি-সারি-বাউল গান, সার্কাস প্রভৃতি। বর্তমানে নববর্ষকে কেন্দ্র করে রাজধানীর শপিংমল এবং মফঃস্বল শহরের বিপণি-বিতানগুলোতে কেনাকাটার ধুম লেগে যায়। অর্থনীতির যোগসূত্রটা মুখ্য হলেও নববর্ষের সাংস্কৃতিক আবেদন সুদূরপ্রসারী, যা একসময় বাঙালি জাতিকে মুক্তির মোহনায় পৌঁছে দেয়। ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নিজেদের শাসন পাকাপোক্ত করার হীনস্বার্থ চরিতার্থ করতে যতই বাঙালির ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির টুটি চেপে ধরেছে ততই নববর্ষ এসেছে শক্তি-সাহস ও উদ্দীপনার মূলমন্ত্র হয়ে।

০৪
বর্তমানে যতটা জাঁকজমপূর্ণ ও ব্যাপক পরিসরে নববর্ষ পালন করা হয় পঞ্চাশের দশকে সেটা তেমন ছিল না। তখন লেখক-শিল্পী মজলিস ও পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ নববর্ষ উপলক্ষ্যে আবৃত্তি, সংগীতানুষ্ঠান ও সাহিত্যসভা আয়োজন করত। সে আয়োজন ছিল ঘরোয়া পরিবেশে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ দিয়ে সকালে নবববর্ষ আবাহন প্রথম শুরু হয় ছায়ানটের উদ্যোগে; এবং তার শুরুটা হয়েছিল রমনার অশ্বত্থ তলায়। সন্জীদা খাতুন লিখেছেন : ‘ইংরেজি পঁয়ষট্টি সালের এপ্রিল অর্থাৎ তেরোশ’ বাহাত্তরের পয়লা বৈশাখে রমনার অশ্বত্থ গাছটির তলায় প্রথম খোলামেলা হলো বাংলা নবববর্ষের উৎসব।’ এরপর বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার পালে যতই হাওয়া লাগে ততই উৎসবমুখর হয় নববর্ষের আয়োজন। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে যে চেতনার উন্মেষ, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ ও বাঙালির চিরায়ত সাহিত্য-সংস্কৃতির ওপর বিধিনিষেধ আরোপের ফলে তা ক্রমশ বেগবান হয়। আমাদের স্বাধীনতা অর্জনে জাতির মর্মমূলে শক্তি জুগিয়েছে বাংলা নববর্ষ। দেশ স্বাধীন হলে নববর্ষ উদযাপন আরও ব্যাপক পরিসরে শুরু হয়। ১৯৭২ সালে ‘পহেলা বৈশাখ’ জাতীয় পার্বণ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। পরবর্তীকালে রমনার ছায়ানটের অনুষ্ঠান ছাড়াও রাজধানীতে ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, বাংলা একাডেমি, চারুকলা ইনস্টিটিউট, নজরুল ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বুলবুল ললিতকলা একাডেমি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন নববর্ষকে পরিণত করেছে মহাউৎসবে। পল্লির নিভৃত কুটির থেকে গ্রাম-গঞ্জ, জেলা শহর, বিভাগীয় শহর ছাপিয়ে রাজধানীর সর্বত্র উপচে পড়ে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আনন্দ। বর্তমান সরকার নববর্ষ ভাতা চালু করে এ উৎসবে আরও প্রাণসঞ্চার করেছেন।
নববর্ষের উৎসব বেগবান হয়ে জাতীয় উৎসবে পরিণত দেখে সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী গোষ্ঠী এর ওপর আঘাত হেনেছে বারবার। পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্রযন্ত্র নানা ফন্দি-ফিকির করে নববর্ষ পালনে বাধা সৃষ্টি করলেও একুশ শতকের শুরুতে এসে মৌলবাদী শক্তি ছদ্মবেশে আঘাত হেনেছে। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা চালিয়ে ১০ জনকে হত্যা করা হয়, আহত হয় অগণিত মানুষ। কিন্তু তাতেও থামেনি বাঙালির প্রাণের উৎসব নববর্ষ পালন। বরং তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। এখন গ্রাম থেকে শহর, শহর থেকে প্রবাস, যেখানেই বাঙালি আছে, সেখানেই সাড়ম্বরে পালিত হয় বাংলা নবববর্ষ। তবে এটাও বাস্তব যে, পহেলা বৈশাখের পর বাকি ৩৬৪ দিন আমরা বাংলা সন-তারিখ খুব একটা স্মরণে রাখি না।
কিন্তু তাতে কী? নববর্ষের সুদূরপ্রসারী আবেদন তো অস্বীকার করা যাবে না। আমাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনে বাংলা নববর্ষ আনে নব-উদ্দীপনা। উৎসবে-আনন্দে নববর্ষ বাঙালি-জীবনে যে অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করেছে, তাতে বাঙালির জাতীয়তাবোধ ও সাংস্কৃতিক-সৌধের ভিত মজবুত হয়েছে। নববর্ষ আবারও এসেছে আমাদের মাঝে। নববর্ষের উষার আলো ও মঙ্গলবার্তায় জাতির ভাগ্যাকাশের সকল অন্ধকার দূরীভূত হবে। মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদী শক্তির চিরবিনাশ ঘটবে। উন্নত ও সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে আমরা বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াব।
লেখক : গবেষক-প্রাবন্ধিক; সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

Category:

সোনালি আঁশ পাটের বহুমাত্রিক অভিষেক

Posted on by 0 comment

aরাজিয়া সুলতানা: বাঙালির ইতিহাস ও অর্থনীতির সঙ্গে মিশে আছে পাট। সেই পুরনো কথাÑ পাট বাংলাদেশের সোনালি আঁশ। একসময় এ দেশের ৮০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রাই অর্জন হয়েছে পাট থেকে। শস্য-শ্যামলা এই দেশের অর্থনীতি ও সমৃদ্ধির সাথে পাটের নিবিড় সম্পর্ক। পুরনো সেই পাটের সুদিন ফিরে আসছে বাংলাদেশের। ২০১০ সালে দেশি পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন, তা কাজে লাগিয়ে ৪টি নতুন জাতের পাট উদ্ভাবন করেছে। উৎপাদিত সেই পাটের আঁশ দিয়ে তৈরি হচ্ছে সুতা। পাটের গুণগত মান বৃদ্ধির ফলে বহুমুখী উৎপাদনে ব্যবহার করা হচ্ছে। প্যান্ট, শার্ট, জামদানি, স্যান্ডেল, পলিব্যাগ, ঘর সাজানোর আসবাবের সঙ্গে মার্সিডিজ গাড়িতে পাটের ব্যবহারসহ প্রায় দুশতাধিক পাটজাত পণ্যের বাণিজ্যিক উৎপাদন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
১৮৫০ সালে এই অঞ্চলে মাত্র ১৭ হাজার হেক্টর জমিতে পাট চাষ হতো। মাত্র ৫০ বছরেই এ চিত্র পাল্টে গেছে। ১৯০০ সালে পাটের জমির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৫০ হাজার হেক্টর। বিশ্ববাজারে ব্রিটেনসহ ইউরোপিয়ান কোম্পানিগুলোর দানাদার খাদ্যশস্য চিনি, কফি, চা-সহ নানা পণ্যের বিক্রি বৃদ্ধি পায়। আর ওইসব পণ্যের মোড়ক হিসেবে বেড়েছিল পাটের চাহিদা। কিন্তু এ ধারা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৯১ সালে বিএনপি-জামাতের হাত ধরে সরকার গঠন করে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সঙ্গে একটি কালো চুক্তি করে। গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে দেশের লাখো লাখো শ্রমিককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। তাতে ১৯৯৩ সাল থেকে পাটকলগুলো একে একে বন্ধ করে দেয়। ফলে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বে যে আড়াই লাখ বেল পাট রপ্তানি হতো তা বন্ধ হয়ে যাবে। আর ঠিক তখনই ভারতের সঙ্গে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের চুক্তি হলো। চুক্তি অনুযায়ী ভারত তাদের সীমান্তে পাটকল তৈরি করবে আর ওই আড়াই লাখ বেল পাট রপ্তানি করার সুযোগ পাবে। বাংলাদেশের পাটকল বন্ধ করার জন্য টাকা নিয়েছিল বিএনপি সরকারÑ আর ভারতকে পাটকল করার সুযোগ করে দিল ওয়ার্ল্ড ব্যাংক। পাটের বিশ্ববাজারে এমন অগ্রযাত্রা দেশের সরকারি পাটকলগুলো মুখ থুবড়ে পড়েছিল বিএনপি-জামাতের নীল নকশায়।
আওয়ামী লীগ-জোট সরকার গঠনের পরপরই পাল্টে যায় দৃশ্যপট। স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কৃষিমুখীন অর্থনীতির মূলস্রোতে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত ‘সোনালি আঁশ’ উৎপাদন ও বিপণনের বাঁকে বাঁকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে পাট শিল্প। সূচিত হয়েছে পাটের নববিপ্লব। তাতে অবশ্য পাটও আমাদের সাহায্য করেছে, কারণ বাংলাদেশের জলবায়ু পাট উৎপাদনের জন্য খুবই উপযোগী। তাই বাংলাদেশের পাট বিশ্বের সেরা। বর্তমানে বাংলাদেশে ৮ লাখ ১৭ হাজার ৩৮৩ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হচ্ছে। দখল করে নিয়েছে পাট উৎপাদনে বিশ্বের দ্বিতীয় স্থান। সরকার নিয়েছে পাট বহুমুখীকরণের উদ্যোগ। অভিষেক হচ্ছে নিত্যনতুন পাট পণ্যের। এক টন পাট বিক্রি করলে যে লাভ হয়, তা দিয়ে পাটপণ্য বানিয়ে বিক্রি করলে লাভ হয় তার থেকে অনেক বেশি। পাট থেকে তৈরি হচ্ছে পোশাকÑ বিশেষ করে শীতের জন্য নানা ধরনের জ্যাকেট, শাড়ি, জামা, জুতা, স্যান্ডেল, ঘরের পর্দা, কুশন কাভার, টেবিল ম্যাট, টিস্যু বক্স, পলিথিন, সাইকেল, কার্পেট, চট, পাটের ব্যাগ, বস্তা, ঝুড়ি, বিভিন্ন ধরনের কাপড়, সুতা, তুলা, পর্দা, টেবিল ক্লথ, রানার, প্লেসমেট, কুশন কাভার, সোফার কাভার, কিচেন ওয়্যার, লন্ড্রি বাস্কেট, ফ্রুট বাস্কেট, স্টোরেজ প্রোডাক্ট, হ্যাঙ্গার, ক্রিসমাস ডেকোরেশন সামগ্রী, গার্ডেনিং প্রোডাক্ট, ফ্লোর কাভারিং প্রোডাক্ট, শপিং ও ফ্যাশনেবল প্রোডাক্ট, ঘর সাজানোর দ্রব্য, বিলাসসামগ্রীসহ বিভিন্ন পাটজাত পণ্য। পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৫টি দেশ ছাড়াও দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি, ব্রাজিলসহ পৃথিবীর ১৮৮টি দেশে। বাংলাদেশের পাট এবং পাটজাত পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) পাট এবং পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছে ৬৬ কোটি ১৮ লাখ মার্কিন ডলার; যা এই সময়ের কৌশলগত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ১০ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ বেশি।
ইউরোপের বাজারে নিষিদ্ধ হচ্ছে সিনথেটিক পণ্য। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ঘোষণা দিয়েছে, ২০১৯ সালের মধ্যে তাদের সদস্যভুক্ত সব দেশ পণ্যের মোড়ক ও বহনের জন্য প্লাস্টিক এবং কৃত্রিম আঁশজাত পণ্যের ব্যবহার বন্ধ করবে। যার ফলে বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাবে। আশা করা যাচ্ছে, বিশ্ববাজারের চাহিদা অনুযায়ী পরিকল্পনামাফিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরে পাটের রপ্তানি কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে।
পরিবেশবান্ধব ও নান্দনিকতার কারণে দেশের অভ্যন্তরেও চাল, গম-সহ বেশ কিছু পণ্য প্যাকেজিংয়ের ক্ষেত্রে পাটের বস্তা ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দেশেই তৈরি হয়েছে ২০ লাখ কাঁচা পাটের অভ্যন্তরীণ বাজার। তা ছাড়া সরকার চীনের প্রযুক্তি সহায়তা নিয়ে সরকারি পাটকলগুলোর মানোন্নয়ন করে দেশি পাট থেকে সুতার প্রধান কাঁচামাল ‘ভিসকস’ তৈরি করার পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে, যা পোশাক শিল্পকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে। অন্যদিকে দেশে তৈরি ডেনিম কাপড়ে ৫০ শতাংশই রয়েছে পাট এবং বাকি ৫০ শতাংশ কটন। গুণগত মানের দিক দিয়ে বর্তমানে বাজারে যে ধরনের ডেনিম কাপড় রয়েছে সেগুলোর চেয়ে এই কাপড়ের মান কোনো অংশে কম নয়। পরিবেশবান্ধবের দিক দিয়ে এগুলো অনেক ভালো। পাটের এখন জয়জয়কার অবস্থা, কারণ পাট এমনই একটি পণ্য যে বিশ্বের দামি মার্সিডিজ গাড়ি তৈরি করতেও ব্যবহৃত হচ্ছে। তা ছাড়া তিন-চার বছর ধরে পাটের শোলা বা কাঠি আন্তর্জাতিক বাজারে নতুন পাটপণ্য হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পাটকাঠি থেকে জ্বালানি হিসেবে চারকোল ও এর গুঁড়া থেকে ফটোকপি মেশিনের কালি তৈরি হচ্ছে। পাটখড়ির কার্বন মোবাইলের ব্যাটারি, প্রসাধনী, দাঁত পরিষ্কারের ওষুধ, কার্বন পেপার, কম্পিউটার ও ফটোকপিয়ারের কালি, আঁতশবাজি, ফেসওয়াশের উপকরণ, প্রসাধন পণ্যসহ বিভিন্ন জিনিস তৈরির উপকরণ হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। আরও তৈরি হচ্ছে জুটজিও টেক্সটাইল, যা ব্যবহার করা হয় রাস্তাঘাট নির্মাণে, বাঁধ নির্মাণে। আগে ব্যবহার করা হতো সিনথেটিক টেক্সটাইল, বিদেশ থেকে আমদানি করা হতো, যা পরিবেশের জন্য খুবই খারাপ। পাটের ব্যবহার বাড়ানো গেলে এগুলো আর আমদানি করা লাগবে না। তাছাড়া পাট থেকে আমরা কম্পোজিট তৈরির কাজ হচ্ছে।
পাট থেকে পলিথিন তৈরি করেছে পরমাণু গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা। পরিবেশবান্ধব এই পলিথিন মাটিতে পচতে সময় নেবে দুই থেকে তিন মাস। বাংলাদেশে ২০০২ সালে আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে পলিথিনের ব্যবহার। বন ও পরিবেশ দফতরের হিসাবে, প্রতি মাসে ঢাকায় পলিথিনের ব্যবহার হয় ৪১ কোটি টাকার। আর বছরে গোটা পৃথিবীতে ব্যবহৃত ১ ট্রিলিয়ন পলিথিনের কারণে প্রায় ১১ লাখ প্রাণী হুমকির মুখে পড়ে। তাই প্রাণী রক্ষায় এই পরিবেশবান্ধব পলিথিন যে বড় কাজে আসবে তা বলাই যায়।
বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিতে পাট থেকে ডেনিম কাপড় তৈরিরও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রথমে পাট ও তুলার মিশ্রণে সুতা তৈরি হচ্ছে। সেই সুতা থেকে বানানো হচ্ছে ডেনিম কাপড়। উৎপাদিত কাপড় থেকে প্যান্ট, জ্যাকেট, শার্টের মতো পোশাক বানিয়ে রপ্তানি করা হবে। পাশাপাশি দেশের বেসরকারি খাতে কাপড় সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশন (বিজেএমসি) ইতোমধ্যে পাট থেকে ডেনিম কাপড় উৎপাদন করেছে।
নতুন সংযোজন পাট পাতার চা। এই চায়ে রয়েছে প্রচুর পরিমাণ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা মানবদেহের দুর্বল কোষে ফ্রি রেডিক্যালের ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলতে দেয় না। এতে ক্যানসারের সম্ভাবনা কমে যায়। এছাড়া রাসায়নিক বিষক্রিয়ার কারণে লিভার ড্যামেজ ও জন্ডিস প্রতিরোধে সক্ষম এই চা। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রেখে বার্ধক্যজনিত রোগ প্রতিরোধ করতে বয়োবৃদ্ধদের সাহায্য করে। এছাড়া আলসার ও ত্বকের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধিতেও কার্যকর পাটের চা।
এই যে পাটের বহুমুখীকরণ তার মূলে রয়েছে পাটের গুণগত মান বৃদ্ধি। এই মান বৃদ্ধির জন্য মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন সর্বজন স্বীকৃত শ্রদ্ধেয় যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলম। তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের একদল বিজ্ঞানী ২০১০ সালে তোষা পাট, ২০১২ সালে ছত্রাক এবং ২০১৩ সালে দেশি পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করেন। পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট পাটের এই জীবনরহস্যকে (জিনোম সিকোয়েন্সিং) কাজে লাগিয়ে ৪টি নতুন জাত তৈরি করেছেন। রবি-১, রবি-২ এবং শশী-১, শশী-২। পাটের আঁশের মধ্যে সাধারণত ১২ থেকে ১৪ শতাংশ লিগনিন থাকে। প্রাথমিকভাবে নতুন জাতে লিগনিনের পরিমাণ কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এতে আঁশ নরম হচ্ছে। ফলে পাট দিয়ে জামদানি, শার্ট, প্যান্ট বা সমজাতীয় পোশাক প্রস্তুতের সুতা তৈরি হচ্ছে। নতুন জাতের পাটের আঁশ বৃদ্ধি ও লম্বার জন্য দায়ী দুটি জিনও শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা। এসব জিন কাজে লাগিয়ে ভালো ও বেশি আঁশযুক্ত পাটের জাতও উদ্ভাবন করা যাবে।
দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে মোট ২২টি পাটকল চালু রয়েছে এবং বেসরকারি খাতে প্রায় ২০০ পাটকল আছে। দেশের প্রায় ৪ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাট খাতের ওপর নির্ভরশীল। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উদ্যোগ এবং নিরন্তর চেষ্টায় পাট ও পাটজাত পণ্যের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ক্রম বৃদ্ধি পাচ্ছে, বাড়ছে রপ্তানিরও পরিমাণ। কৃষকরা অন্য ফসলের তুলনায় পাট চাষে যাতে লাভবান হতে পারেÑ সেজন্য দেশের অভ্যন্তরে পাটের উৎপাদন বাড়াতে মানসম্মত বীজ সংগ্রহ করা হচ্ছে সরকারিভাবে। পাটপণ্য বৈচিত্র্যকরণে সরকারি পাটকলগুলোতে আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হচ্ছে।
পাট চাষিদের অক্লান্ত পরিশ্রম, প্রকৃতির অকৃপণ কৃপা, বিজ্ঞানীদের ঘাম ঝরানো প্রচেষ্টা ও আন্তর্জাতিক বাজারের বিপুল চাহিদার কল্যাণে পাটের সুদিন ফিরে আসছে অচিরেই। সোনালি আঁশের সোনালি দিন আবার ফিরেছে। এবারের জাতীয় পাট দিবসেÑ ‘সোনালি আঁশের সোনার দেশ, পাট পণ্যের বাংলাদেশ’ এই সেøাগান আরও বেশি প্রাণোদ্বীপ্ত হয়েছে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাটের জামদানি, হাতে পাটের ব্যাগ, পাটের তৈরি স্যান্ডেলে পাটময় উপস্থিতিতে। দেশ যদি ঠিক এভাবেই এগিয়ে যায়, তাহলে সেদিন আর বেশি দূরে নেইÑ যেদিন পাট ও পাটজাত পণ্যই হবে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস।

লেখক : পিএইচডি গবেষক, শিক্ষক, কৃষিবিদ এবং সমাজকর্মী

Category:

২৫ মার্চ : আলো নিভিয়ে গণহত্যা দিবস পালন

Posted on by 0 comment

12একাত্তরের ২৫ মার্চ কালরাতে গণহত্যা স্মরণে দেশব্যাপী এক মিনিট নীরবতা কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। কেপিআই ও জরুরি স্থাপনা ছাড়া সারাদেশের মানুষ গত ২৫ মার্চ রাত ৯টা থেকে ৯টা ১ মিনিট পর্যন্ত দাঁড়িয়ে সব আলো নিভিয়ে একসঙ্গে নীরবতা পালন করেন। নতুন এই কর্মসূচির নাম ছিল ‘ব্ল্যাক-আউট’।
এছাড়া একাত্তরের সেই ভয়াল ২৫ মার্চ কালরাতে শহীদদের স্মরণে সারাদেশের বধ্যভূমিসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মশাল প্রজ্বলন, আলোর মিছিল, স্মরণ সভা, সাংস্কৃতিক আয়োজন ও বিভীষিকাময় সেই কালরাতের স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে জাতীয় গণহত্যা দিবস পালিত হয়েছে। প্রতিটি কর্মসূচিতে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। দিবসটি পালনে আয়োজিত সকল অনুষ্ঠানে ২৫ মার্চকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি ছিল প্রচ-। জাতীয়ভাবে গণহত্যা দিবস পালনের উদ্যোগের অংশ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ২৫ মার্চ সকাল ১০টায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘রক্তাক্ত ২৫ মার্চ গণহত্যার ইতিহাস’ শীর্ষক শিরোনামে আলোকচিত্র প্রদর্শনী ও আলোচনা সভার আয়োজন করে। এছাড়া সারাদেশে সভা, সমাবেশ, শোভাযাত্রা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির যৌথ উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতি চিরন্তন চত্বরে আয়োজন করা হয় নানা অনুষ্ঠানের। অনুষ্ঠানমালার মধ্যে ছিল সন্ধ্যা ৭টায় স্মৃতি চিরন্তন-এ মোমবাতি প্রজ্বলন, ডকুমেন্টারি প্রদর্শন, আলোচনা সভা। এছাড়া বাদ জোহর মসজিদুল জামিয়ায় ২৫ মার্চের রাতে নিহতদের স্মরণে বিশেষ মোনাজাত এবং বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রার্থনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।
মিরপুর বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য, কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র এবং স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপির নেতৃত্বে ১৪ দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। দিবসটি উপলক্ষে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি শহীদ স্মৃতি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন করেছে। মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদের স্মরণে তারা বিভিন্ন স্থানে ৩০ লাখ গাছ লাগান। বিকেলে বঙ্গভবনের মাঠে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ২৫ মার্চের কালরাতের স্মরণে ২৫টি বৃক্ষ রোপণের মাধ্যমে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন।
স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস এবং একুশে ফেব্রুয়ারির মতোই ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ঘটানো গণহত্যাকা-ের দিনটি জাতীয়ভাবে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০১৭ সালের ১১ মার্চ জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে এই প্রস্তাব পাস হয়। দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে পালনের জন্য জাতিসংঘে প্রস্তাবও পাঠানো হয়েছে। একইসঙ্গে বিভিন্ন দেশের সমর্থন আদায়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
গণহত্যা দিবস পালনে জাতীয় পার্টি (জেপি) বিস্তারিত কর্মসূচি পালন করে। কর্মসূচির মধ্যে ছিল সকাল ৬টায় জেপি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ সকল কার্যালয়ে কালো পতকা উত্তোলন। দুপুর ২টায় সকল উপাসনালয়ে ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে শহীদদের স্মরণে বিশেষ প্রার্থনা, রাত ৯টায় নিষ্প্রদীপ মহড়ায় অংশগ্রহণ। এদিকে যথাযোগ্য মর্যদা এবং ভাব-গাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের বিভিন্ন হাইকমিশন ও দূতাবাসে ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস পালিত হয়েছে।

Category:

৭, ১৭, ২৬ মার্চ উদযাপিত

Posted on by 0 comment

11সরদার মাহামুদ হাসান রুবেল: বাঙালির জীবনে নানা কারণে মার্চ মাস অন্তর্নিহিত শক্তির উৎস। এ মাসেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতির পর এবারের মার্চ মাসে বিভিন্ন অনুষ্ঠান পালনে যোগ হবে নতুন মাত্রা। আবার এই মাসেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন উপলক্ষে সারাদেশে ব্যাপক ও আনন্দমুখর কর্মসূচিতে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। সর্বত্র নানা আয়োজনে নেমেছিল মানুষের ঢল। অন্যদিকে এ মাসেই জাতি এবার পালন করবে মহান স্বাধীনতার ৪৭ বছর। এ উপলক্ষে মাসের প্রথম দিন থেকেই শুরু হবে সভা-সমাবেশ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নানা আয়োজনে মুখরিত ছিল গোটা দেশ। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী ভাষণ গত ৭ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদন, স্মৃতিচারণ, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল, কনসার্ট, শোভাযাত্রা, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, আলোচনা সভা এবং আগামী নির্বাচন সামনে রেখে সব ধরনের ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়ার অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধুর কালজয়ী ভাষণের ৪৭তম বর্ষপূর্তি পালিত হলো। গত ৩০ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়ায় এবার ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হয়। বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় গৌরবের অনন্য দিন ঐতিহাসিক ৭ মার্চ দিবসটি উপলক্ষে ঐদিন ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে সর্বস্তরের জনতার ঢল নামে। বঙ্গবন্ধুর সেই জগৎখ্যাত ভাষণকে স্মরণ করে ধানমন্ডিতে অবস্থিত তার প্রতিকৃতি ফুলে ফুলে ভরে যায়। আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন, স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী এবং সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। ঐতিহাসিক ৭ মার্চ উপলক্ষে দিনের প্রথম প্রহর থেকে সারাদেশে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের কার্যালয়ে মাইকে বাজানো হয় বঙ্গবন্ধুর সেই অবিনাশী ভাষণ “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” সকাল সাড়ে ৬টায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু ভবন ও সারাদেশে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। দেশের সব ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, পৌরসভা, থানা, উপজেলা, মহানগর ও জেলাসমূহের প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ একযোগে প্রচার এবং দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ৭ মার্চ উপলক্ষে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক জনসভার আয়োজন করে আওয়ামী লীগ। সভায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সভাপতিত্ব করেন এবং ভাষণ দেন। এদিকে ‘বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ’ উদযাপন উপলক্ষে রাজধানীর সার্কিট হাউস রোডে অবস্থিত চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের (ডিএফপি) উদ্যোগে ডিএফপি চত্বরে এক আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এছাড়া জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য ঐহিত্য হিসেবে ইউনেস্কোর ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্টার’ অন্তর্ভুক্তি উপলক্ষে শিল্পকলা একাডেমিতে ‘বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক উৎসব’র আয়োজন করা হয়। ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন গত ১৭ মার্চ কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করল বাংলাদেশ নামক ভূখ-ের স্বাপ্নিক স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমানকে। দেশবিরোধী সব ষড়যন্ত্র রুখে দিয়ে সন্ত্রাস-নাশকতা-জঙ্গিবাদ ও ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণের দৃপ্ত শপথে বাঙালি জাতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে বঙ্গবন্ধুকে। একই সঙ্গে জাতি দিনটিকে ‘জাতীয় শিশু দিবস’ হিসেবেও উদযাপন করেছে। এ উপলক্ষে সারাদেশে ব্যাপক ও আনন্দমুখর কর্মসূচিতে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল। সর্বত্র নানা আয়োজনে নেমেছিল মানুষের ঢল। সারাদেশের সব সরকারি-বেসরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত অফিস-আদালতেও জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। সকাল ১০টায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন। এ সময় সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করে। পরে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ও ১৫ আগস্টের শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে অনুষ্ঠিত মোনাজাতে অংশ নেন। দেশজুড়ে দিনব্যাপী কর্মসূচিতে আরও ছিল জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ, জন্মদিনের কেক কাটা, র‌্যালি, দোয়া ও মিলাদ মাহফিল, মোনাজাত, প্রার্থনা, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বইমেলা, স্বেচ্ছায় রক্তদান, বিনামূল্যে চিকিৎসা, পুরস্কার বিতরণ, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন, বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ প্রচারসহ নানা কার্যক্রম। জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণেও মানুষের ঢল নেমেছিল। সকাল ৭টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখানে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এ সময় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতির সামনে কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন প্রধানমন্ত্রী। সেনাবাহিনীর একটি সুসজ্জিত দল অভিবাদন জানায়। পরে আওয়ামী লীগ সভাপতি হিসেবে দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে যান। বেশ কিছু সময় সেখানে অবস্থান করেন তিনি। জাতীয় শিশু দিবসের মূল অনুষ্ঠানটি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতার সমাধি কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠিত হয়। বর্ণাঢ্য শিশু সমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগে তিনি জাতির পিতার সমাধিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন। বিকেল ৩টায় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আলোচনা সভা করে আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সভায় জাতীয় নেতারা বক্তব্য রাখেন। দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেতারসহ বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার এবং সংবাদপত্রগুলোতে বিশেষ ক্রোড়পত্র ও নিবন্ধ প্রকাশ করে। বঙ্গবন্ধু রুহের মাগফিরাত কামনা করে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে কোরআনখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করে। সারাদেশের মসজিদ, মাদ্রাসা ও মক্তবে অনুরূপ কোরআনখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনা সভায় জাতির পিতার আত্মার শান্তি ও সদ্গতি কামনা করা হয়। বিভিন্ন মন্দির, গির্জা, প্যাগোডাসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়েও বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়। সারাদেশের সব সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিশেষ স্বাস্থ্য সেবাদান কর্মসূচির পাশাপাশি রোগীদের উন্নতমানের খাবার পরিবেশন এবং সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালায় ছিল জন্মদিনের কেক কাটা, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা, শিশু চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, সংগীতানুষ্ঠান প্রভৃতি। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদসহ আবাসিক হল, হোস্টেল, মসজিদ ও উপাসনালয়ে দোয়া ও প্রার্থনা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি মিলনায়তনে ‘বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন : রং ছড়ানো আলো, লাল-সবুজের বাংলাদেশে থাকবে শিশু ভালো’ শিরোনামের আলোচনা আয়োজন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে টিএসসি ক্যাফেটোরিয়ায় চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস গত ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে এক অন্যরকম স্বস্তি, আনন্দ ও শপথে জেগে উঠেছিল বাঙালি। বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের স্বীকৃতি সারাদেশেই অভূতপূর্ব গণজাগরণ এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তস্নাত লাল-সবুজের পতাকা হাতে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শিশু থেকে বৃদ্ধ সকলের কণ্ঠেই ধ্বনিত হয়েছে জঙ্গিবাদমুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রত্যাশার কথা। কালরাতের আঁধার পেরিয়ে আত্মপরিচয় অর্জন ও পরাধীনতার শিকল ভাঙার দিনটি বাঙালি জাতি হৃদয়ের গভীরতা থেকে শ্রদ্ধার সঙ্গেই উদযাপন করেছে নানা অনুষ্ঠানমালায়। দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয়ে স্বাধীনতা দিবসে জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের। পাড়া-মহল্লায়, গ্রাম থেকে গ্রামে, দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে লেগেছিল লাল-সবুজের উৎসব। সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধের দেশের সকল স্বাধীনতা স্তম্ভের বেদি ভরে ওঠে ফুলে ফুলে। ভোরে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তাদের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর জাতীয় স্মৃতিসৌধে জাতির সূর্যসন্তান বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনে ঢল নামে সর্বস্তরের মানুষের। সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধ থেকে ফিরে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষও বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। সকালে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে শিশু-কিশোর সমাবেশে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে জাতীয় সংগীত গেয়েছে কোটি কণ্ঠ। ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’Ñ প্রাণের এই সুরে এককণ্ঠ হয়েছে সারাদেশ। এর আগে ভোরে মিরপুর সেনানিবাসে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে স্বাধীনতা দিবসের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরের প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপ সুসজ্জিত করা হয় জাতীয় পতাকায়। সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে উত্তোলন করা হয় জাতীয় পতাকা। জেলা-উপজেলা পর্যায়ে এবং বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনেও স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে আলোচনা সভা ও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন আলোকচিত্র প্রদর্শনী, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, সড়কে অলঙ্করণ, আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি পালন করে উৎসবমুখর পরিবেশে। বিকেলে বঙ্গভবনে বিশেষ সম্বর্ধনার আয়োজন করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। এতে অংশ নেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানা। শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, চিকিৎসকসহ আমন্ত্রিত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে উৎসবমুখর মিলন মেলায় পরিণত হয় এই সম্বর্ধনার আয়োজন। এছাড়া সকালে প্রধানমন্ত্রী প্রতিবছরের মতো এবারও স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে মোহাম্মদপুরে শহীদ পরিবার ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের জন্য ফুল, ফল ও মিষ্টি পাঠিয়েছেন। বিকেলে গণভবনে একটি স্মারক ডাকটিকিট, একটি উদ্বোধনী খাম ও একটি ডাটা কার্ড অবমুক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী। আনন্দ, বেদনা ও বিনম্র শ্রদ্ধায় মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণ এবং সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদমুক্ত অসাম্প্রদায়িক স্বনির্ভর সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার দৃঢ় অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে এদিন বাঙালি জাতি অন্যরকম স্বস্তি ও উৎসবের আমেজে পালন করল মহান স্বাধীনতার ৪৭ বছর পূর্তি ও জাতীয় দিবস।

Category:

বিশ্ব নারী দিবস : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

Posted on by 0 comment

aড. ইঞ্জি. মাসুদা সিদ্দিক রোজী: গত ৮ মার্চ ছিল বিশ্ব নারী দিবস। বিশ্ব নারী দিবসটি পালনের পিছনে রয়েছে এক অনন্য ইতিহাস। ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ আমেরিকার নিউইয়র্ক শহরে একটি সুচ কারখানার মহিলা শ্রমিকরা কর্মক্ষেত্রে মানবেতর জীবন ও ১২ ঘণ্টা কর্মদিবসের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। তাদের ওপর নেমে আসে পুলিশি নির্যাতন। ১৮৬০ সালে ঐ কারখানায় মহিলা শ্রমিকরা মহিলা শ্রমিক ইউনিয়ন গঠন করে সাংগঠনিকভাবে আলোচনা চালিয়ে যেতে থাকে। ১৯০৮ সালে কর্মঘণ্টা, ভালো বেতন ও ভোট দেওয়ার দাবি নিয়ে নিউইয়র্ক সিটিতে মিছিল করে তারা। তারপর ১৯১০ সালের ৮ মার্চ কোপেনহেগেন শহরে অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক মহিলা সম্মেলনে জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ক্লারা জেটকিন মে প্রতিবছর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের প্রস্তাব দেন। ১৯১১ সালে বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালিত হতে শুরু হয়। এই সম্মেলনে ১৭টি দেশের ১০০ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন। সূচনায় দিবসটিকে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস’ হিসেবে পালন করা হতো। ১৯১৪ সালের পর থেকে দেশে দেশে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ হিসেবে এই দিনটি উদযাপিত হয়। জাতিসংঘে ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে সারাবিশ্বের রাষ্ট্রসমূহকে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালনের আহ্বান জানায়। বাংলাদেশে ১৯৯১ সালে প্রথম বছরের মতো এই দিবসটি পালন করা হয়।
ইসলাম ধর্মে নারীর ক্ষমতার গৌরবের ইতিহাস রয়েছে। বিবি খাদিজা যখন প্রথম ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন তিনি কিন্তু ব্যবসা-বাণিজ্য করতেন, দেশ-বিদেশও ঘুরতেন। ইসলাম ধর্মের জন্য যে জেহাদ ঘোষণা করেছেন, তিনি একজন নারী, সুমাইয়া। নবী করিম (সা.)-এর সাথে বিবি আয়েশা রণক্ষেত্রে যেতে তার পাশে পাশে থাকতেন, অনুপ্রেরণা দিতেন। ইসলাম ধর্ম পুরুষের পাশাপাশি নারীদের সমাজে সমান সুযোগ দিয়েছে, তাই ধর্মের নামে নারীদের পিছনে ফেলে রাখার সুযোগ নেই।
কারও মুখাপেক্ষী না হয়ে নারীদের কাজের মধ্য দিয়ে জায়গা করে নিতে হবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হতে পারতেন না যদি তার পাশে সেই মহীয়সী নারী বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব প্রতি মুহূর্তে না থাকতেন। এমনকি যিনি মৃত্যুতেও তার সঙ্গী হয়েছেন। সেই মহিয়সী নারীর প্রতি আমরা গভীর শ্রদ্ধা জানাই। জাতির পিতা একটা কথা বলতেন, ‘একজন মহিলা যদি নিজে উপার্জন করে তার আঁচলে যদি ১০ টাকাও নিয়ে ঘরে ফেরে তাহলে সেই পরিবারে তার একটা মূল্য হয়।’ ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ওপর পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসর রাজাকারের যে অত্যাচার হয় সেই নির্যাতিতাদের যুদ্ধ-পরবর্তীতে পুনর্বাসন ও যথাযথ সম্মান দেন জাতির পিতা।
আর যে নারীর জন্য আজকে বাংলাদেশের নারীদের অগ্রযাত্রা এত দ্রুতগতিতে এগুচ্ছে আজকের বাংলাদেশের যে ক’জন মর্যাদাসম্পন্ন নারী আছেন। সেই নারীরা যার কাছে ঋণী, তিনি বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। মেয়েদের জন্য অবৈতনিক শিক্ষা, চাকরিতে কোটা পদ্ধতিসহ নারী উন্নয়নে শেখ হাসিনার পদক্ষেপ। জননেত্রী এ কথাগুলো সব সময় বলেন, ‘আমাদের কারও দিকে মুখাপেক্ষী হলে চলবে না। নিজেদের ভাগ্য নিজেদের গড়তে হবে। আত্মবিশ্বাস নিয়ে চলতে হবে, তবেই মর্যাদা পাওয়া যাবে। কেঁদে কেঁদে ফিরলে মর্যাদা কেউ হাতে তুলে দেবে না; বরং করুণা করে। আর করুণা ভিক্ষা নিয়ে মেয়েরা বাঁচতে পারে না। কাজেই নিজের মর্যাদা নিজেই অর্জন করতে হবে। নিজের কর্মের মধ্য দিয়ে, আত্মবিশ্বাসের মধ্য দিয়ে চলতে হবে।’
সেজন্যই এবারের নারী দিবসের স্লোগান ছিলÑ ‘অধিকার মর্যাদায় নারী পুরুষ সমানে সমান’। আমাদের প্রধানমন্ত্রী নারীদের জন্য গাড়ির ড্রাইভার থেকে কম্পিউটারÑ সব ধরনের ট্রেনিংয়ের সুবিধা করেছেন। ইতোমধ্যে ৪টি বিভাগে মহিলা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট করে দিয়েছেন। ৪৬৭টি বেসরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, যেখানে মেয়েদের পড়াশোনার সুযোগ আছে। কারণ সব জায়গায় অ্যাডুকেশনের ব্যবস্থা আছে। ৪৯টি সরকারি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট। এখানে ৩টা শুধু বিশেষভাবে মহিলাদের জন্য, বাকি জায়গায় ছেলেমেয়েরা উভয়ে পড়তে পারে। ৬৪টি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার আছে সেখান থেকে মেয়েরা ভাতা পাচ্ছে। প্রতিটি উপজেলায় একটি করে স্কুল ও কলেজ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। ইতোমধ্যে ১০০টার কাজ চালু হয়ে গেছে। ৭০টি সরকারি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার। অর্থাৎ টিটিসি চালু আছে, এখানে ছেলেমেয়ে উভয়ে সুযোগ আছে। মেয়েদের জন্য বিশেষভাবে আলাদা ব্যবস্থা আছে। ঢাকা National Forensic DNA Profiling Labratory
এবং ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বিভাগীয় DNA Screening Labratory স্থাপন করা হয়েছে। জেলা স্বাস্থ্য ঈড়সঢ়ষবী-এ মোট ৬০টি One Stop Crisis Cell স্থাপন করা হয়েছে। তাছাড়া নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেল প্রতিটি বিভাগীয় শহরে ৯টি One Stop Crisis Center স্থাপিত হয়েছে। স্বল্পব্যয় কর্মজীবীদের জন্য ঢাকাসহ অন্যান্য জেলা শহরে ৮টি হোস্টেল স্থাপন করা হয়েছে। কর্মজীবী মহিলাদের (গার্মেন্ট শ্রমিকদের) ১২ তলা বিশিষ্ট হোস্টেল স্থাপিত হয়েছে। শহীদ শেখ ফজিলাতুননেছা মুজিব একাডেমিসহ আরও ৬টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। জাতীয় সংসদে মহিলা আসন ৫০ এবং সরাসরি নির্বাচিত আরও ২২ জন করা হয়েছে। জাতীয় সংসদে মাননীয় স্পিকার, সংসদ নেতা, বিরোধীয় নেতা উপনেতা ৪টি উচ্চপদে মহিলা আছেন। নারীদের সুরক্ষার জন্য আইন প্রণয়ন, মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে এসিড সন্ত্রাস, ইভটিজিং বন্ধের ব্যবস্থা নিয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধের বিশেষ আইন ২০০০-এ সরকার প্রথমবার এসেই প্রণয়ন করেছেন শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০৩ সংগঠিত হয়েছে। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ প্রণয়ন করা হয়েছে। পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন ২০১০ তৈরি করেছে। ডিএনএ আইন ২০১৪ প্রণয়ন হয়েছে, যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮ ও শিশু দিবাযতœ কেন্দ্র আইন ২০১৮ প্রণয়ন চূড়ান্ত পর্যায়ে। এখন বেশ কয়েকজন মহিলা Ambassador নিয়োগ আছে। খেলাধুলা, ব্যবসা সবক্ষেত্রে মহিলারা যেন স্থান পায় সেই ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। লেখাপড়ার জন্য মেয়েদের দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিনা বেতন, উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করে দিয়েছে। প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষক ৬০ শতাংশ মেয়ে এবং ৪০ শতাংশ ছেলেÑ এভাবে মেয়েদের কর্মব্যবস্থা করা হয়েছে। বাবা-মা যখন দেখবে মেয়ে লেখাপড়া শিখে অর্থ উপার্জন করছে, তখন আর বিয়ে দেওয়ার জন্য তাড়াহুড়া করবে না।
১৯৯৬ সাল থেকে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা ও দুস্থ নারী ভাতা, মাতৃত্ব ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা ও প্রতিবন্ধী ভাতাসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি চালু হয়েছে। হিজড়া ও বেদে সম্প্রদায়ের জন্য ৬০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হচ্ছে, চা-শ্রমিকদের অধিকাংশ নারী তাদের জন্য অনুদান ১০ কোটি থেকে বৃদ্ধি করে ১৫ কোটি টাকা করা হয়েছে।
একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের অধীনে ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। মেয়েরা এখন এয়ারফোর্সের যুদ্ধবিমান চালায়। বিমান, হেলিকপ্টার, রেলগাড়িÑ সবক্ষেত্রে মেয়েরা জায়গা করে নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এটিসি দায়িত্বে একজন মেয়েকেও স্থান দিয়েছে। মেয়েরা এখন আর পিছিয়ে নেই। যে দায়িত্ব দেওয়া যায় সেখানেই দক্ষতা দেখাতে পারছে। খেলাধুলায় ১৯৯৬ সালে প্রমিলা ফুটবল দল ভালো করেছিল। এখন বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টে ভালো খেলছে। ফুটবল, টেনিস, দাবা সবক্ষেত্রে খেলাধুলা একটা ভালো পরিবেশে এনে দিয়েছে তাদের। কোনো সমস্যাই নেই জাতীয় নারী ক্রিকেট দল ২০২০ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ক্রিকেটে খেলবে। মহিলা ফুটবল দল অনূর্ধ্ব-১৫, তারা ১৫ নারী চ্যাম্পিয়ানশিপে ভারতকে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকার বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে সমৃদ্ধ বাংলদেশ হিসেবে গড়ে তোলা এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা। সেই লক্ষে নারী-পুরুষ সকলে মিলে কাজ করতে পারলেই এ দেশ এগিয়ে যাবে। কাজেই সময় এখন নারীর উন্নয়নে, বদলে যাবে গ্রাম-শহর কর্মজীবন ধারা।

Category:

নিরাশার দোলাচলে বিএনপি : দলে অবিশ্বাস আর দুর্নীতিবাজদের প্রাধান্য

Posted on by 0 comment
10

কে এই আইনজীবী? তিনি বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। জামাত নেতা মীর কাসেম আলীসহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যে সোচ্চার সেই লর্ড কারলাইলকে খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে বিএনপি।

আশরাফ সিদ্দিকী বিটু: জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ে বেগম জিয়ার পাঁচ বছরের জেল হয়েছে। তারেক রহমানসহ অন্য পাঁচ আসামির ১০ বছর সাজা হয়েছে এবং প্রত্যেককে ২ কোটি টাকার বেশি অর্থদ-ও দেওয়া হয়েছে। বেগম জিয়া এখন কারাগারে। নিয়মমাফিকভাবে কারাগারে। বিএনপি নেত্রীর শারীরিক অবস্থা ও সামাজিক মর্যাদা বিবেচনা করে তাকে এই দ-ে দ-িত করা হয়েছে। বিএনপি এ নিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া শুধু দেখায় নি; বরং বিএনপি নেত্রী আদালতে যাবার সময় পথে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়েছে, ১০ জন পুলিশকে আহত করেছে, পুলিশ বক্সে আগুন দিয়েছে। রায়ের পরও দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিবাদের নামে হামলা-ভাঙচুর চালিয়েছে। খালেদার বিচারের পর প্রতিবাদের নামে সহিংসতা করেছে। ৮ ও ৯ ফেব্রুয়ারি দুদিনে ৮০টি যানবাহন ভাঙচুর করেছে এবং ৪০ জন পুলিশসহ সাতজন সাংবাদিককে আহত করেছেন। লন্ডনে বাংলাদেশ দূতাবাসেও হামলা করেছে। এসব অপকর্মের হেতু কি? যদিও পরে নতুন পথে প্রতিবাদ করছে, যার কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। বিএনপি এই রায় প্রত্যাখ্যান করেছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার প্রলেপ লাগিয়ে নেতা-কর্মীদের প্রবোধ দেওয়ার অপচেষ্টা করছে, সিনিয়র নেতৃবৃন্দ কান্নাকাটি করে জনগণের সমবেদনা নেওয়ার চেষ্টা করছে। বিএনপির চরিত্রই এমন, তা হলো সত্যকে অস্বীকার না করা, মিথ্যার বেসাতি করা।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এহেন কোনো কাজ নেই বিএনপি-জামাত করেনি। বেগম জিয়া সরাসরি যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তি দিতে বলেছেন। বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা যুদ্ধাপরাধীদের জন্য আইনি লড়াই করেছেন। বিচার ঠেকাতে বিদেশে লবিস্ট নিয়োগ করে সরকারকে বিব্রত করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ঠেকাতে মানুষ হত্যা করেছে; কিন্তু সত্যের জয় হয়েছে, বিচার হয়েছে, রায়ও কার্যকর করা হয়েছে। বাকি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কার্যক্রমও চলমান আছে।
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার আদ্যোপান্ত সারা জাতি জানে, কী করে টাকা এসেছে, কীভাবে টাকা অন্য ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করা হয়েছে। এখানে আর বিস্তারিত বলার প্রয়োজন নেই, পত্র-পত্রিকা-টিভি দেখে সবাই বিস্তারিত জেনেছে; কিন্তু এতকিছুর পরও বিএনপি মানতে নারাজ। আইনি প্রক্রিয়ার সব ধরনের পথেই বিএনপি চেষ্টা করেছে এই মামলাকে উইথড্র বা বন্ধ করতে; কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। অপরাধ অপরাধই, বিএনপি নেত্রী বলে অপরাধ থেকে পার পাবেন সেই চিন্তা করা ঠিক নয়। বিএনপি ভেবেছে সরকারকে ভয়ভীতি দেখালে, বিচার বিভাগকে চাপে রাখলে বেগম জিয়ার অপরাধের শাস্তি হবে না। এমন ভাবনাই তাদের ছিল; কিন্তু সরকার বিচার বিভাগকে প্রভাবিত করেনি, বিচার বিভাগও ন্যায়ের পথে থেকেই আইনের শাসনের বিধানকে সমুন্নত রেখে রায় প্রদান করেছে। সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
বিএনপি বিচার ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এই রায়ের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির নামে সহিংসতা করেছে। বিএনপি আইনের শাসনে বিশ্বাসী নয়। বেগম জিয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারপারসন বলেই কি তার অপরাধের শাস্তি হবে না? বিএনপি কি ভাবে তারা আইনের ঊর্ধ্বে? ভুলে গেলে চলবে না, আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়, এমনকি বিএনপি নেত্রীও নয়। বিশ্বের কয়েকজন সাবেক সরকারপ্রধান দুর্নীতি এবং অপকর্মের জন্য বিচারের সম্মুখীন হয়েছেন, শাস্তি পেয়েছেন। ইমপিচ হয়ে পদও হারিয়েছেন।
বিএনপি খালেদা জিয়ার অপরাধকে আড়াল করে সরকারকে দোষারোপের চেষ্টা করছে, অথচ এই মামলা আওয়ামী লীগ সরকার করেনি। ২০০৮ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করার দীর্ঘ ১০ বছর পর এই মামলার রায় প্রদান করেছেন আদালত। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী এ ধরনের মামলা ৩৬০ দিবসের মধ্যে সমাপ্ত করার কথা রয়েছে। অথচ বেগম খালেদা জিয়া আদালতে অনুপস্থিত থেকেছেন এবং অপ্রাসঙ্গিক বিভিন্ন ইস্যুতে উচ্চ আদালতে গিয়ে প্রায় সাড়ে চার বছর ধরে মামলার কার্যক্রম স্থগিত করে রাখেন। দেশের সর্বোচ্চ আদালত সাক্ষ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে এই মামলা পরিচালনার জন্য নিম্ন আদালতের নির্দেশ প্রদান করেন। ১৫০ বারের বেশি সময়ে নিয়েছেন, কোর্টে অনুপস্থিত থেকেছেন, আইনও পাল্টেছেন, বিচারক পাল্টাতে বলেছেন, এমনকি কোর্ট পাল্টাতেও সচেষ্ট হয়েছেন। ৩২ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন এবং আসামিরা ২৮ দিন ধরে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য আদালতে বক্তব্য প্রদান করেছেন। দেশের সংবিধান, ফৌজদারি কার্যবিধি ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী আত্মপক্ষ সমর্থনের সব সুযোগ-সুবিধা খালেদা জিয়াসহ অন্য আসামিরা পেয়েছেন। অথচ বর্তমান সরকারকে দোষারোপ করে রাজনৈতিকভাবে মানুষকে বিভ্রান্ত করার হীন চেষ্টা বিএনপি করেছে। এমনকি রায়ের পরও মিথ্যাচার করছে, আবার জামিনের চেষ্টা করবে বলেও তাদের আইনজীবীরা বলছেন। এটা কোনো রাজনৈতিক বা দলীয় মামলা নয়। এই সরকারের সাথে এই মামলার কোনো সম্পর্ক নেই। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে এবং চলবে। এই রায় প্রত্যাখ্যান করার মধ্য দিয়ে বিএনপি আবারও প্রমাণ করল দেশের আইন, আদালতের প্রতি তাদের কোনো শ্রদ্ধা নেই। বিচার বিভাগের প্রতি তাদের কোনো শ্রদ্ধা নেই। আর থাকবেই বা কি করে, বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে জাল সার্টিফিকেটধারীকে বিচারপতি বানিয়েছিল, বিএনপির আইনজীবী প্রধান বিচারপতির উদ্দেশ্যে প্রিন্টারের অংশ ছুড়ে মেরেছিল। দেশের কোনো কিছুর প্রতি তাদের শ্রদ্ধা নেই। কারণ মিথ্যাচারই তাদের রাজনীতি।
বিএনপি নেতৃবৃন্দ মুখে যা-ই বলুন, রায় মানুক না মানুক, এই রায়ের আগে তড়িঘড়ি করে তাদের গঠনতন্ত্রের সংশোধন এনে তা নির্বাচন কমিশনে জমাদানের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে, যে দুর্নীতিবাজদের দল বিএনপি। এবং রায়ের পর দ-প্রাপ্ত আসামি তারেক রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন বানিয়ে আবারও প্রমাণ করেছে, গঠনতন্ত্র বিএনপি সংশোধন করছে যেন দুর্নীতিবাজরা দলে থাকতে পারে, দলের রাজনীতি করতে পারে। একটি দল যখন দুর্নীতিবাজদের রাজনীতি করার সুযোগ দেয় তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে সেই দলের কোনো নৈতিক আদর্শ নেই। দলের গঠনতন্ত্র সংশোধন করে দ-প্রাপ্ত ও দুর্নীতিবাজদের সংগঠন করার অধিকার দিয়ে বিএনপি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুর্নীতিবাজ রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে পরিণত হয়েছে। তাদের মুখে তাই নীতিকথা আর মানায় না।
উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, গঠনতন্ত্রের সপ্তম ধারাটি বিলুপ্ত করে এই ধারায় আগের ৮ নম্বর ধারাটি রাখা হয়েছে। আগের গঠনতন্ত্রের সপ্তম ধারায় ‘কমিটির সদস্যপদের অযোগ্যতা’ শিরোনামে বলা ছিলÑ ‘নিম্নোক্ত ব্যক্তিগণ জাতীয় কাউন্সিল, জাতীয় নির্বাহী কমিটি, জাতীয় স্থায়ী কমিটি বা যে কোনো পর্যায়ের যে কোনো নির্বাহী কমিটির সদস্যপদের কিংবা জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের প্রার্থী পদের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।’ তারা হলেনÑ ক. ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতি আদেশ নং ৮-এর বলে দ-িত ব্যক্তি; খ. দেউলিয়া; গ. উন্মাদ বলে প্রমাণিত ব্যক্তি; ঘ. সমাজে দুর্নীতিপরায়ণ বা কুখ্যাত বলে পরিচিত ব্যক্তি। অবশ্য সংশোধিত গঠনতন্ত্রের ৫-এর ‘ক’-এ ‘সদস্যপদ লাভের যোগ্যতা’ ও ‘খ’-এ ‘সদস্যপদ লাভের অযোগ্যতা’ উপধারা দুটি বলবৎ আছে। ‘খ’-এ বলা আছে, ‘বাংলাদেশের আইনানুগ নাগরিক নন এমন কোনো ব্যক্তি জাতীয়তাবাদী দলের সদস্য হতে পারবেন না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, অখ-তার বিরোধী; গোপন কিংবা সশস্ত্র রাজনীতিতে বিশ্বাসী ও সক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি বা সমাজবিরোধী ও গণবিরোধী কোনো ব্যক্তিকে সদস্যপদ দেয়া হবে না।’
বিএনপি নেত্রীর সাজা হওয়ার পর বিএনপির কর্মকা- আরও বেশি বিতর্কিত হচ্ছে। বিদেশি মিডিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করে মিথ্যাচার করে তারা কি বোঝাতে চাইছে, রায় হয়েছে কিন্তু বিদেশে যেন প্রচার না হয়? না-কি সরকার বা বিচারব্যবস্থা ঠিক নেই? এসব অসত্য ও অপচেষ্টা করে লাভবান হওয়ার সুযোগ আর নেই বিএনপির! বিএনপি নিয়মিতভাবে প্রতিবাদ করে যাচ্ছে, নানা কর্মসূচি দিয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ বিএনপি যেন বিচার বিভাগকে বিএনপির মুখোমুখি করতে চাচ্ছে, যা দেশের আইনের শাসনের জন্য হুমকিস্বরূপ।
বিএনপির আইনজীবীরা উচ্চ আদালতে আপিল করেছে, তার মানে আইনিভাবে বেগম জিয়ার রায়ের বিষয়ে মোকাবিলা করবে। প্রতিদিন রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে অযথা বির্তক সৃষ্টির কোনো সুযোগ নেই। মানুষ এখন ভুল বা অসত্যকে মানতে রাজি নয়।
বিএনপির এক নেতা বললেন, খালেদা জিয়া জেলে থাকলে না-কি প্রতিদিন তাদের ১০ লাখ ভোট বাড়ে। তবে কি বিএনপি নেতৃবৃন্দ চান তাদের নেত্রী জেলে থাকুক। পাঁচ বছর জেলে থাকলে দেশের জনসংখ্যার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ভোট বিএনপির বাড়বে। তারা মনে হয় এটা হিসাব করেই সুখবোধ করছেন!
বিদেশে পালিয়ে থাকা, দ-প্রাপ্ত ফেরারি আসামি তারেক রহমানকে দলের ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্ব দিয়ে এটাও প্রমাণ হলোÑ এই গঠনতন্ত্র পরিবর্তন খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে দলে রাখা বা দ-প্রাপ্ত হয়েও যেন রাজনীতি করতে পারেন, দলের প্রধান থাকতে পারেন সেজন্যই করা হয়েছে। অবশ্য বিএনপির চরিত্রই হলো দুর্নীতিবাজদের প্রমোট করা। এ নিয়ে বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ তার বইতে আরও সত্য প্রকাশ করেছেনÑ “বিএনপির সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল এই দলের জন্ম কোনো স্বাভাবিক সামাজিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে হয়নি।… একদিকে ছিল সুযোগ সন্ধানী, সুবিধাবাদী, গণবিরোধী, স্বার্থপর এবং রাজনৈতিকভাবে সমাজে ধিকৃত ব্যক্তিরা। বিএনপির জন্ম হয়েছিল ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে।” [চলমান ইতিহাস : জীবনের কিছু সময় কিছু কথা; ১৯৮৩-১৯৯০, পৃষ্ঠা : ১৫৯-১৬০]
এখানে বিশেষভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন, তারেক রহমানের অপকর্মের কথা সারা জাতি অবগত। হাওয়া ভবন ছিল সমান্তরাল সরকার। বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশ টানা পাঁচবার দুর্নীতিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশ হয়েছিল দুর্নীতিবাজ দেশ, হত্যা সন্ত্রাসের দেশ, অধিকার হরণের দেশ। তারেক রহমান ও তার আরেক ভাই আরাফাত রহমান কোকো বিদেশে কোটি কোটি টাকা পাচার করেছে। আওয়ামী লীগ সরকার সেই টাকা ফেরত এনেছে। বিশ্বের সেরা অর্থপাচারকারীর তালিকায় নাম উঠেছিল কোকোর। আমেরিকা ও সিঙ্গাপুরের কোর্টে বিচার হয়েছে। চুরির টাকা সিঙ্গাপুরের আদালত বাজেয়াপ্ত করে দেশে পাঠিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস তারেক রহমানের ১২ কোটি টাকা আটক করেছিল। এই সরকার ২০১২ সালে সেই টাকা দেশে ফেরত আনে। বাংলাদেশের কোর্টের রায়ের প্রেক্ষিতে ২০১৩ সালে সিঙ্গাপুর ৮ কোটি টাকা ফেরত দেয়। তারেক ও তার ব্যবসায়িক পার্টনার গিয়াসউদ্দিন আল মামুন সিঙ্গাপুরে সিটিএনএ ব্যাংকে ২১ কোটি টাকা পাচার করে। আমেরিকার এফবিআই এ ব্যাপারে তদন্ত করেছে। ২০১২ সালে এফবিআই-র উবনৎধ খধঢ়ৎবাড়ঃঃব ঢাকায় বিশেষ আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন। এই মামলায় হাইকোর্টে তারেক রহমানের সাত বছরের সাজা এবং ২১ কোটি টাকা জরিমানা হয়। একইভাবে লন্ডনের ঘধঃ ডবংঃ ব্যাংকে প্রায় ৬ কোটি টাকা পাওয়া গেছে। সেই টাকা জব্দ করা হয়েছে। মামলা চলছে টাকা ফেরত আনার জন্য। এছাড়া বিশ্বের আরও অনেক জায়গায় খালেদা জিয়ার ছেলেদের টাকা ও সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। বেলজিয়ামে ৭৫০ মিলিয়ন ডলার, মালয়েশিয়ায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার, দুবাইতে কয়েক মিলিয়ন ডলার মূল্যের বাড়ি (ঠিকানা : স্প্রিং ১৪, ভিলা : ১২, এমির‌্যাটস হিলস, দুবাই)। সৌদি আরবে মার্কেটসহ অন্যান্য সম্পত্তি। এমন দুর্নীতিবাজরা কী করে দেশ ও জাতির জন্য কাজ করবে? অথচ জিয়াউর রহমান না-কি ভাঙা সুটকেস আর ছেঁড়া গেঞ্জি ছাড়া কিছুই রেখে যায় নি। এত সম্পত্তির উৎস হলো দুর্নীতি, যা বিএনপি নেত্রী ও তার ছেলেরা এবং পরিবারের সদস্যরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অপব্যবহার করেই অর্জন এবং বিদেশে অবৈধভাবে বিনিয়োগ ও পাচার করেছে। যারা বিদেশে টাকা পাচার করে তারাই যদি কোনো দলের প্রধান হয়, তবে বুঝতে হবে সেই দলের কোনো নীতি-আদর্শ আর অবশিষ্ট নেই।
শুধু তাই নয়, ইতোমধ্যে বিএনপি আন্তর্জাতিকমহলে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০১৭-এর মে মাসে কানাডার ফেডারেল আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, বিএনপি একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। এ বছরের ২৫ জানুয়ারি কানাডার আরেক বিচারক বিএনপিকে সন্ত্রাসী সংগঠন বলে আখ্যা দিয়েছে। পরপর টানা দুবার সন্ত্রাসী দল হিসেবে স্বীকৃতি পায় বিএনপি। এদের দ্বারা দেশের মঙ্গল সম্ভব নয়।
বিএনপি নেত্রীর জামিন চেয়ে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা আদালতে গিয়েছেন, এখনও জামিন পান নি। এটা বিচারিক বিষয়, আদালতের সিদ্ধান্ত। আগামী মে মাসে আবার এ নিয়ে আদালত শুনানি করবে। এরই মধ্যে বিএনপি একজন ব্রিটিশ আইনজীবীকে নিয়োগ করেছে খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের পরমার্শক হিসেবে ও আইনি সহায়তা প্রদান করতে।
কে এই আইনজীবী? তিনি বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। জামাত নেতা মীর কাসেম আলীসহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যে সোচ্চার সেই লর্ড কারলাইলকে খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে বিএনপি।
পোল্যান্ড থেকে যুক্তরাজ্যে অভিবাসিত ইহুদি আইনজীবী লর্ড কারলাইল বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের কঠোর সমালোচক। তিনি এই বিচারের বিরুদ্ধে যুক্তরাজ্যে নানা সভা, সেমিনার এবং ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে দূতিয়ালি করেছেন। বাংলাদেশের সুপ্রিমকোর্ট ২০১৬ সালের ৮ মার্চ জামাত নেতা যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মৃত্যুদ-ের রায় বহাল রাখার পর লর্ড কারলাইল বাংলাদেশ সরকারের কাছে একটি চিঠিও লিখেছিলেন। এতে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন এবং ঐ আদালতের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার সুপারিশ করেন। আলবদর নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর না করার দাবিতে যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশ হাইকমিশনারের কাছে চিঠিও লিখেছিলেন ব্রিটিশ এই আইনজীবী। ২০১৫ সালে বিএনপি-জামাত জোটের আন্দোলন চলাকালে বাংলাদেশে ‘গ্রহণযোগ্য’ সরকার গঠনে উদ্যোগ নিতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাকে অনুরোধ করেছিলেন লর্ড কারলাইল। এমন ব্যক্তিকে আইনি পরামর্শক নিয়োগ দিয়ে বিএনপি প্রমাণ করল, দেশের স্বাধীনতা বিরোধের সাথেই তাদের উঠাবসা, সখ্যতা এবং পাকিস্তানি মানসিকতার মধ্যেই তারা আবদ্ধ।
আজকে বিএনপি নেত্রীর এই সাজা তার ও তার দলের নিয়মিতভাবে চলে আসা অসততা, অপকর্ম ও দুষ্টাচারের নির্মম শাস্তি। শাক দিয়ে যে মাছ ঢাকা যায় না তা প্রমাণ হলো। কিন্তু বিএনপি নেতৃবৃন্দের কর্মকা- হচ্ছে এমন যে, বিচার মানি কিন্তু তালগাছ আমারÑ প্রাচীন এই প্রবাদের মতোই। রায়ের পর বিএনপির ভেতরে যে হতাশা, অবসাদ তা থেকে নেতা-কর্মীদের মুক্তি দিতে সরকার বা বিচার বিভাগকে দোষারোপ করে এলেও নিজেদের সাথে আত্মপ্রবঞ্চনা করছে বিএনপি। পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরোধিতাকারী আইনজীবীকে পরামর্শক বানিয়ে বিএনপি প্রমাণ করলÑ দেশের স্বাধীনতার প্রতি তারা শ্রদ্ধাশীল নয় এবং খালেদা জিয়ার জামিনের চেয়ে বিতর্ক সৃষ্টিই তাদের মূল উদ্দেশ্য। এখন প্রশ্ন ওঠে, আসলেই কি বিএনপির নেতৃবৃন্দ খালেদা জিয়ার জামিন চান, না-কি তাদের নেত্রীকে জেলে রেখেই দলের সিনিয়ররা রাজনৈতিক সুবিধা চানÑ এমন প্রশ্ন কিন্তু বিএনপির ভেতরেই!

Category:

‘স্বাধীনতাবিরোধীরা যেন কোনোদিন ক্ষমতায় আসতে না পারে’

Posted on by 0 comment

a উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা দেশের স্বাধীনতাকে যারা ব্যর্থ করে দিতে চায় তারা যেন কোনোদিন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসতে না পারে সেজন্য দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, দেশের স্বাধীনতা যেন ব্যর্থ হয়ে না যায়। আর যারা স্বাধীনতাকে ব্যর্থ করতে চায় তারা যেন কোনোদিন এ দেশে ক্ষমতায় আসতে না পারে। বাংলাদেশে কোনোদিন জঙ্গি-সন্ত্রাসী-যুদ্ধাপরাধী-স্বাধীনতাবিরোধীদের স্থান হবে না, বাংলাদেশ অবশ্যই হবে মুক্তিযোদ্ধাদের, মুুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাংলাদেশ। স্বাধীনতার সুফল আমরা দেশের প্রতিটি মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবই।
গত ২৭ মার্চ রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে মহান স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারান্তরীণের কথা তুলে ধরে বলেন, ক্ষমতায় থাকতে বিএনপি নেত্রী ভোগবিলাসে ব্যস্ত ছিলেন, দেশকে পাঁচবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন করেছেন। বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করেছেন। এমনকি এতিমের টাকা পর্যন্ত আত্মসাৎ করেছেন। এতিমের টাকা আত্মসাতের কারণে মামলা হলে বিচারে আদালতের মাধ্যমে শাস্তি পেয়েছেন।
ওয়ান ইলেভেনের কথা তুলে ধরতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি-জামাত জোটের কারণেই এ দেশে ওয়ান ইলেভেনের সৃষ্টি হয়। তখন আমি বিরোধী দলের নেতা হওয়ার পরও আমাকে আগে গ্রেফতার করা হয়। এর সঙ্গে কে কে জড়িত আজ আমরা তা জানি, এর হিসাবটা আমরা পরে নেব। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দীর্ঘ ২১ বছর জিয়া-এরশাদ-খালেদা জিয়া যারাই ক্ষমতায় থেকেছেন তারা সবাই নিজেদের ভোগবিলাস ও অর্থ সম্পদের মালিক হতে ব্যস্ত থেকেছে। দেশের মানুষের দিকে তাদের তাকানোর কোনো সময় ছিল না। এ কারণে বাংলাদেশ ওই সময়টায় আর এগোতে পারেনি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু এমপি, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এমপি, সভাপতিম-লীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপি, জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এমপি, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক অনুষদের ডিন ও সাবেক তথ্য কমিশনার অধ্যাপিকা সাদেকা হালিম, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক একেএম এনামুল হক শামীম, মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস এমপি প্রমুখ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতার ঘোষণা তো বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ৭ মার্চেই দিয়ে গেছেন। জনগণের bভোটে ম্যান্ডেট নিয়েই স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়ার অধিকার বঙ্গবন্ধু অর্জন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘোষণার মেসেজও আগেই তৈরি ছিল। হানাদারদের হামলার সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর মেসেজ ইপিআরের ওয়্যারলেসের মাধ্যমে সব জায়গায় পৌঁছে দেয়া হয়। আর বাংলাদেশের পতাকার ডিজাইনও বঙ্গবন্ধু করে দিয়েছিলেন। জাতীয় সংগীত কী হবে সেটাও বঙ্গবন্ধু ঠিক করে দিয়ে যান। ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশ বিজয়ী হয়।
তিনি বলেন, মাত্র সাড়ে তিন বছরে বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে গড়ে তুলে স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা দিয়ে গেছেন বঙ্গবন্ধু। একটি প্রদেশকে রাষ্ট্রে পরিণত করে এ মর্যাদা অর্জন কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। পৃথিবীর কোনো দেশের কোনো নেতা এটা করতে পারেনি। তিনি বলেন, বাংলাদেশ পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র দেশ যেখানে মিত্রবাহিনী ফেরত গেছে। পৃথিবীর কোনো দেশ থেকে মিত্রবাহিনী ফেরত যায়নি। বাংলাদেশ একমাত্র ব্যতিক্রম। স্বাধীনচেতা নেতা ছিলেন বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।

গণহত্যা দিবস : পাকিপ্রেমীদের উপযুক্ত জবাব দিতে হবে
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা একাত্তরের গণহত্যাকারী ও তাদের দোসর-মদদদাতাদের প্রতি চরম ঘৃণা প্রকাশ করে বলেছেন, একাত্তরের গণহত্যাকারী, যুদ্ধাপরাধীদের যারা (বিএনপি) প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রী-উপদেষ্টা বানিয়ে পুরস্কৃত করেছে, মদদ দিয়েছে তারাও সমান অপরাধী। উভয়েই সমান দোষে দোষী। যুদ্ধাপরাধীদের মতো তাদেরও সমানভাবে বিচার হওয়া উচিত। আর পাকিপ্রেমে যারা হাবুডুবু খাচ্ছে, একাত্তরের গণহত্যাকারীর মদদদাতাদেরও উপযুক্ত জবাব বাংলার মানুষকে দিতে হবে। তাদেরকেও শাস্তি দিতে হবে। তাদের পাকিপ্রেম ভুলিয়ে দিতে হবে। বাঙালি যদি এটা না পারে, তাহলে নিজেদের অস্তিত্ব থাকবে না। ব্যর্থ নয়, বাংলাদেশকে উন্নত-সমৃদ্ধিশালী দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারলেই আমরা পাকিপ্রেমীদের উপযুক্ত শিক্ষা দিতে পারব। দেশকে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণের মাধ্যমেই আমরা একাত্তরের গণহত্যার প্রতিশোধ নেব।
রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপনকারী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কঠোর সমালোচনা করে বলেন, তার পক্ষে এমন কথা বলাই স্বাভাবিক। কারণ তারা দেশের স্বাধীনতাতেই বিশ্বাস করেন না। তার স্বামীও (জিয়াউর রহমান) মানুষ খুন করেছে, আর বিএনপি নেত্রীও পুড়িয়ে পুড়িয়ে মানুষ খুন করিয়েছেন। মানুষের জীবনের কোনো মূল্যে নেই তাদের কাছে। এরা দুজনই (জিয়া-খালেদা জিয়া) একাত্তরের গণহত্যাকারী, যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়ে তাদের হাতে লাখো শহীদের রক্তস্নাত জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছিলেন। একাত্তরের গণহত্যাকারী, বুদ্ধিজীবী হত্যাকারীরাই তাদের কাছে পেয়ারে বান্দা। কারণ তাদের হৃদয়ে রয়েছে পেয়ারে পাকিস্তান। বাঙালি জাতিকে তাদের পাকিপ্রেম ভুলিয়ে দিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আর তাদের দোসর আলবদর, আলশামস, রাজাকারদের অপকর্মের কথা যেন জাতি ভুলে না যায়। আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম যেন মনে রাখে এই দেশে গণহত্যা ঘটিয়েছিল কারা, কেন এবং তাদের বিচার যেন এই মাটিতে চলতেই থাকে। তাদের কোনো ক্ষমা নেই। তিনি বলেন, পঁচাত্তরের পর পুরো ইতিহাসই বদলে গিয়েছিল। এমনকি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী; এটাও বলা যাবে না। পাকিস্তান যে হানাদার ছিল সেটাও ভুলিয়ে দেয়ার জন্য শুধু হানাদার বাহিনী বলা হতো। পাকিপ্রেম এমন পর্যায়ে ছিল।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু এমপি, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এমপি, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী এমপি, শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপি, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি, মুক্তিযুদ্ধের গবেষক কর্নেল (অব.) সাজ্জাদ জহির বীরপ্রতীক, কেন্দ্রীয় নেতা নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের উত্তরের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান ও দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ। সভা পরিচালনা করেন কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এমপি ও উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন।

বিএনপি-জামাত দেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নিজেদের সবকিছু ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশকে আরও উন্নত করে গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেছেন, উন্নয়নশীল দেশের পথ ধরে বাংলাদেশ আগামীতে আরও দ্রুত উন্নত-সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাবে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দীর্ঘ ২১ বছর যারা ক্ষমতায় ছিল তারা দেশকে এক কদম সামনের দিকে এগোতে দেয়নি। কারণ একাত্তরের গণহত্যাকারী ও পঁচাত্তরের খুনিরা একই বৃন্তের ফুল। এদের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। এরাই ক্ষমতায় থেকে দেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। যারা বাংলাদেশকে করুণার চোখে দেখত, বটম লেস বাস্কেট (তলাবিহীন ঝুড়ি) বলত, তাদের আমরা দেখিয়ে দিয়েছি বাংলাদেশ এখন আর তলাবিহীন ঝুড়ি নয়, উন্নয়নশীল দেশ।
স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনে উৎফুল্ল প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে জাতিসংঘের এ স্বীকৃতি জাতির জন্য এক বিরাট অর্জন ও গৌরবের। স্বাধীনতার ৩৭ বছর পর বাংলাদেশ এ স্বীকৃতি পেল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুই স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তুলে ১৯৭৫ সালে প্রথম বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের স্বীকৃতি এনে দিয়েছিলেন। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বঙ্গবন্ধু যদি বেঁচে থাকতেন তবে পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশ এবং ১০ বছরের মধ্যে বিশ্বের মধ্যে উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারতেন। আগামী ২৬ মার্চ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমরা স্বাধীনতা দিবস পালন করব। বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে আমাদের একটাই প্রতিজ্ঞা, এ দেশকে নিজেদের সবকিছু ত্যাগের বিনিময়ে হলেও উন্নত সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলব।
গত ১৮ মার্চ বিকেলে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৮তম জন্মবার্ষিকী ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, কোনো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ, আশা-আকাক্সক্ষা কিংবা পদের জন্য নয়, দেশের জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন করাই আমার একমাত্র লক্ষ্য। আর এটাকে আমি কর্তব্য বলেও মনে করি। সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা দেশকে গড়ে তুলছি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় অংশ নেন জাতীয় সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী এমপি, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু এমপি, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এমপি, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী এমপি, জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম এমপি, কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, প্রখ্যাত শিল্পী হাশেম খান, আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য cঅ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু এমপি, অ্যাডভোকেট আবদুল মান্নান খান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ এমপি, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তরের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান ও দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ। আলোচনা সভা পরিচালনা করেন কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এমপি।
প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর যারা দীর্ঘ ২১টি বছর ক্ষমতায় ছিল তারা এ অর্জন আনতে পারল না কেন? কারণ তারা স্বাধীনতাবিরোধী, রাজাকার-আলবদর, একাত্তরের গণহত্যাকারী ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের হাত থেকে মুক্তি দিয়ে রাজনীতিতে পুনর্বাসন করেছে। তাদের প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রী বানিয়ে তাদের হাতে লাখো শহীদের রক্তস্নাত জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছে। এরা তো দেশের স্বাধীনতাই চায়নি। এরা কোনোদিনই চাইবে না বাংলাদেশের মানুষ দু’বেলা খেয়ে ভালো থাকুক, দেশের উন্নত হোক, অর্থনৈতিকভাবে দেশ স্বাবলম্বী হোক। ক্ষমতায় থেকে তারা নিজেদের ভাগ্য গড়েছে আর বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করতে যা যা করার তার সবই করেছে। এই দীর্ঘ সময় তারা দেশকে একদমও সামনের দিকে এগোতে না পারে সেই চেষ্টাই করেছে। কিন্তু ৩৭ বছর পর হলেও বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আরও একধাপ এগিয়ে গিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২০ সালে আমরা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করব। ওই সময়ের মধ্যে আমরা দেশকে একটি পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বিশ্বের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে আমরা বাংলাদেশকে গড়ে তুলব। সেই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর দেশের স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরে তারই কন্যা শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুর জন্ম হয়েছিল বলেই বাঙালি জাতি স্বাধীনতা, স্বাধীন রাষ্ট্র ও বিশ্বের বুকে স্বাধীন জাতির মর্যাদা পেয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে এসব হতো কি না সেটাই আজ বড় প্রশ্ন। তিনি বলেন, বাঙালি জাতির সমস্ত অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রাম বঙ্গবন্ধুই শুরু করেছিলেন। তখনও অনেক নেতা ছিলেন যারা পাকিস্তানের একটু ডাক পেলেই ছুটে যেতেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির স্বাধীনতার প্রশ্নে কখনও মাথানত করেন নি, বঙ্গবন্ধুকে কোনো লোভ দেখিয়ে কেউ কিনতে পারেনি, তার অভীষ্ট লক্ষ্য থেকে একচুলও নড়াতে পারেনি।

Category:

উন্নয়নের জন্য সরকারের ধারাবাহিকতা চাই

Posted on by 0 comment
9

৭ মার্চের বিশাল জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

৪৭ বছর আগে যেখানে দাঁড়িয়ে তার বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু এ দেশের মানুষের জন্য স্বাধীনতার সংগ্রামের ডাক দিয়েছিলেন, ঠিক সেখানেই লাখো মানুষের জনসমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে এ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সরকারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার আহ্বান জানালেন তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পিতা বঙ্গবন্ধু দেশের মানুষকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন, তার অপর স্বপ্ন মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা বিনির্মাণের অঙ্গীকারের কথাও প্রতিক্ষণে উচ্চারিত হয়েছে আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর দীপ্ত কণ্ঠে।
ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, যারা এতিমের টাকা চুরি করে, যারা আগুন দিয়ে মানুষ পোড়ায়, যারা দেশের টাকা বিদেশে পাচার করে তারা (বিএনপি-জামাত) যেন আর কোনোদিন ক্ষমতায় আসতে না পারে, তারা যেন দেশকে আর ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে না পারেÑ সেজন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। যুদ্ধাপরাধী, খুনি ও জঙ্গিবাদীরা যেন আর কখনও বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসতে না পারে সেজন্য সজাগ ও সতর্ক থাকুন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী এবং দেশের সর্বস্তরের জনতার প্রতি বলব, এই যুদ্ধাপরাধী, স্বাধীনতাবিরোধী, আগুনে পুড়িয়ে যারা মানুষ খুন করে, এতিমের টাকা চুরি করে, দেশের টাকা পাচার করে, এ দেশের স্বাধীনতায় যারা বিশ্বাস করে না, তারা যেন আর ক্ষমতায় আসতে না পারে। যারা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করেন, দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতিতে বিশ্বাস করেন, জনগণের ভাগ্যোন্নয়নে বিশ্বাস করেন, তাদের এ ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে। তারা যেন আর ক্ষমতায় এসে দেশকে ধ্বংস করতে না পারে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যেন বাংলাদেশ এগিয়ে যায়, বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে তার জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্য আহ্বান জানাই।
ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্যের অমূল্য দলিল ঐতিহাসিক ৭ মার্চ ভাষণ দিবস উপলক্ষে গত ৭ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আওয়ামী লীগ আয়োজিত বিশাল জনসমুদ্রে সভাপতির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর প্রতি এ আহ্বান জানান।
বর্তমান সরকারের উন্নয়ন-অগ্রগতির সঙ্গে বিগত সরকারগুলোর কর্মকা-ের তুলনামূলক বিচার করার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশবাসী আপনারাই একটু বিবেচনা করে দেখুনÑ একমাত্র আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলেই দেশের উন্নয়ন হয়, দেশ সবদিক থেকে এগিয়ে যায়। আমার প্রশ্নÑ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে দেশের উন্নয়ন হয় কিন্তু তার পূর্বে যারা ক্ষমতায় ছিল সেই জেনারেল জিয়া-এরশাদ-খালেদা জিয়া সরকার তো দেশের উন্নতি করতে পারেনি। কেন তারা পারেনি? তার মূল কারণ একটাই। তারা তো দেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসই করত না। তারা এ দেশের উন্নয়নে বিশ্বাস করত না। তারা যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে কাজ করতেই ব্যস্ত ছিল।
তিনি বলেন, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাই বিশ^াস করে না, ক্ষমতায় থেকে তারা এ দেশের উন্নতি করবে কেমনে? তারা জানে শুধু নিজেদের উন্নতি করতে। জেনারেল জিয়ার রেখে যাওয়া ভাঙা সুটকেস ছেঁড়া গেঞ্জি তো যাদুর বাক্স হয়ে গেছে। যার ভিতর দিয়ে ফ্রেঞ্চ শিফন বের হয়। কিন্তু দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন তারা করে নাই। তবে আমাদের একটাই লক্ষ্য দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা। আজকে বাংলাদেশের মানুষ স্বাধীনতার সুফল ভোগ করছে। আমাদের যা উন্নয়ন দরকার তা করছি। আমরা অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে বিশাল এ জনসভার শুরুতেই স্বাগত বক্তব্য রাখেন দলটির সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি। আরও বক্তব্য রাখেন জাতীয় সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী এমপি, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু এমপি, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এমপি, সভাপতিম-লীর সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী এমপি, শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপি, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম এমপি, অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুন এমপি, লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান এমপি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক এমপি, সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী এমপি, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম এমপি, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মুহাম্মদ সাঈদ খোকন, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি একেএম রহমতুল্লাহ, দক্ষিণের সভাপতি হাজী আবুল হাসনাত, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস এমপি, যুবলীগের হারুনুর রশীদ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের মোল্লা মোহাম্মদ আবু কাউসার, যুব মহিলা লীগের নাজমা আখতার, শ্রমিক লীগের শুক্কুর মাহমুদ, মহিলা আওয়ামী লীগের সুফিয়া খাতুন ও ছাত্রলীগের সাইফুর রহমান সোহাগ। ঐতিহাসিক ৭ মার্চ নিয়ে নিজের লেখা অমর কবিতা ‘স্বাধীনতা শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’ আবৃত্তি করেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। সমাবেশ পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এমপি ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল।
বিশাল জনসমুদ্রে ভাষণে প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ ও মাদকের বিরুদ্ধে তার সরকারের জিরো টলারেন্স নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, বাংলাদেশের মাটিতে কোনো জঙ্গি-সন্ত্রাসী ও মাদকের স্থান হবে না। দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এ সভায় যারা আছেন অথবা গোটা বাংলাদেশের সকলের কাছে আমার আহ্বান থাকবেÑ এ বাংলাদেশ জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস এবং মাদকÑ এইগুলো যেন কোনোভাবেই আমাদের যুবসমাজকে নষ্ট করতে না পারে। তার জন্য আপনারা সজাগ থাকবেন। শিক্ষক, মসজিদের ইমাম, বিভিন্ন ধর্মগুরু ও অভিভাবকদেরও সজাগ থাকতে হবে কেউ যাতে এই জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস বা মাদকে জড়িয়ে পড়তে না পারে।
বর্তমান সরকারের উন্নয়ন ও অগ্রগতির পুরো চিত্র সারাদেশের প্রতিটি মানুষের ঘরে ঘরে, পাড়া-মহল্লা, গ্রামে-গঞ্জে তুলে ধরার জন্য আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্রাম-গঞ্জের মানুষের কাছে উন্নয়নের কথা জানাতে হবে। আমাদের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর বাংলাদেশকে একটা নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। আজকের বাংলাদেশ জাতির পিতার সেই লক্ষ্য সামনে নিয়ে তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে বাংলাদেশ ধাপে ধাপে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা আজকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে সারাবিশে^ সম্মান পেতে যাচ্ছি অতি শীঘ্রই। আমরা এই সম্মান পাব। আমরা আজ কারও কাছে মাথা নত করে চলব না। আমরা বিশ্বসভায় মর্যাদার সঙ্গে চলব। জাতির পিতা আমাদেরকে সেই শিক্ষা দিয়ে গেছেন।
মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা শুধু দেশের ১৬ কোটি জনগণকে খাদ্য দিচ্ছি না। মিয়ানমারের প্রায় ১০ লাখেরও উপরে মানুষের উপর অত্যাচার হয়েছে। তারা বাংলাদেশের কাছে আশ্রয় চেয়েছে। মানবিক কারণে আমরা তাদের আশ্রয় দিয়েছি। তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা আমরা করে দিয়েছি। আমরা মানবতার পরিচয় দিয়েছি। তিনি বলেন, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কারণে ভারতের মাটিতে আমাদের ১ কোটি মানুষকে আশ্রয় নিতে হয়েছিল। সেই কারণে আমরা তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছি। রোহিঙ্গা ইস্যুতে আজকে সারাবিশ^ বাংলাদেশের পক্ষে আছে। সারাবিশ^ বাংলাদেশকে আজকে তারা সম্মান জানাচ্ছে। সাধুবাদ জানাচ্ছে।
সরকারপ্রধান বলেন, আমরা মানবতার জন্য কাজ করি। আর যারা মানবতাবিরোধী কাজ করেছে। যারা এ দেশের মানুষকে গণহত্যা করেছে, লুটপাট করেছে, অগ্নিসংযোগ করেছে। মা-বোনের ইজ্জত লুটেছে, হানাদার বাহিনীর হাতে তুলে দিয়েছে। দেশবাসীর প্রতি আমার আহ্বানÑ এই যুদ্ধাপরাধী ও খুনিরা যেন কোনোদিন আর ক্ষমতায় আসতে না পারে। এর জন্য সমস্ত দেশের মানুষ, স্বাধীনতায় বিশ^াসী সকল মানুষ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় যারা বিশ^াস করেন অত্যন্ত তারা এ ব্যাপারে সজাগ থাকবেন।
এ সময় মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার, পদ্মাসেতুসহ সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন পদক্ষেপগুলো তুলে ধরে শেখ হাসিনা আরও বলেন, আমরা প্রত্যেকটি জায়গায় মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। প্রত্যেকটি মানুষ যেন কিছু জীবন-জীবিকার ব্যবস্থা করতে পারে। এগুলো লক্ষ্য রেখে সমস্ত বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব। আমাদের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা যেন বজায় থাকে। সরকারের এই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। ইনশাআল্লাহ ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ ক্ষুধামুক্ত দারিদ্র্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারব। এই বাংলাদেশ হবে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ। সেই হিসেবেই আমরা দেশকে গড়ে তুলব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৭ মার্চের ভাষণ এই ভাষণের আবেদন কখনও শেষ হবে না। এই ভাষণে জাতির পিতা একদিকে স্বাধীনতার কথা বলেছেন। অপরদিকে অর্থনৈতিক মুক্তির কথা তিনি বলে গেছেন। তিনি রাজনৈতিক স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন, কিন্তু অর্থনৈতিক মুক্তির পথে যখন পা বাড়িয়ে ছিলেন তখনই তাকে আমাদের মাঝ থেকে কেড়ে নিয়ে গেছে। তাই আজকে আমাদের দায়িত্ব বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে অর্থনৈতিক মুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে ক্ষুধামুক্ত দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ হিসেবে বিশ^সভায় মাথা উঁচু করে চলতে পারি। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ী জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে বাঙালি চলবে, মাথা উঁচু করে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে। এটাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য।

Category:

ত্রিপুরার উন্নয়নে কাজ করবে বিজেপির তরুণ তুর্কী বিপ্লব দেব

Posted on by 0 comment

4-5-2018 7-25-46 PMসাইদ আহমেদ বাবু:১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীনতা অর্জন করলে, কংগ্রেস দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে জাতীয় কংগ্রেস নেতৃত্ব দান করেছিল। বর্তমানে কংগ্রেস দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল দুটির একটি, অন্য দলটি হলো ভারতীয় জনতা পার্টি। এটি বিশ্বের বৃহত্তম ও অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক সংগঠন। ২০১৪ সালের হিসাব অনুসারে, ভারতের সংসদ ও রাজ্য বিধানসভাগুলোর প্রতিনিধি সংখ্যার দিক থেকে বিজেপি এখন ভারতের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। প্রাথমিক সদস্যপদের দিক থেকে এটি বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। বিজেপি একটি দক্ষিণপন্থি রাজনৈতিক দল। বিজেপির জন্ম হিন্দু মহাসভার গর্ভে, প্রথমে দলটির নাম ছিল জনসংঘ, এখন হয়েছে বিজেপি। শ্যামা প্রসাদ মুখার্জী এর প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থার পর জনসংঘ একাধিক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে মিশে জনতা পার্টি গঠন করে। ভারতীয় জনসংঘ থেকে ভারতীয় জনতা পার্টি তথা বিজেপি তৈরি করেন, যা বর্তমানে ভারতের কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় রয়েছে।
বিজেপি-কে বলা হয় সংঘ পরিবার পরিচালিত দল। ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদ ও মৌলবাদের শক্তিশালী রেজিমেন্টেড সংগঠনের নাম হচ্ছে ‘রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘ’ বা আরএসএস। বিজেপির নেতৃত্ব এবং নীতি-নির্ধারণ করে আরএসএস। কংগ্রেস ভারতের স্বাধীনতা চেয়েছিল বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে সবাইকে নিয়ে। কিন্তু আরএসএস বলতে থাকে, ভারতীয় সংস্কৃতি ও হিন্দু সংস্কৃতি সমার্থক। ভারতীয় জাতীয়তাকে হিন্দু জাতীয়তা হতে হবে। বিজেপি দক্ষিণ ভারত আর পূর্ব ভারতে দুর্বল ছিল। এখন দেখা যাচ্ছে সেখানেও তাদের বিজয় নিশান।
বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাজ্য ভারতের ত্রিপুরায় ২৫ বছরের বাম দুর্গের পতন ঘটিয়ে বিধানসভা নির্বাচনে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি। এ রাজ্যে মোট আসন ৬০টি। এর মধ্যে ৫৯টিতে নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনে ৪৩টি আসনে জয় পেয়েছে বিজেপি। বামফ্রন্ট পেয়েছে ১৬টি আসন। পশ্চিমবঙ্গে পতন ঘটার পরও ত্রিপুরায় লাল পতাকা উড্ডীন রেখেছিলেন মানিক সরকার; এবার বিজেপির কাছে সেই দুর্গ হাতছাড়া হলো বামদের। রাজ্যটিতে আগের নির্বাচনেও বিজেপি দলের কোনো অবস্থান ছিল না।
মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার নিজের আসন ধরে রাখতে পারলেও তার মন্ত্রিসভার বেশিরভাগ সদস্যেরই ভরাডুবি হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দুর্নীতি রোধে ব্যর্থতা এবং আসামে বিজেপির উত্থানই মানিক সরকারের ভরাডুবির কারণ।
সৎ, নির্লোভ ভাবমূর্তির মানিক সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতায় যেতে অর্থ ও গ্ল্যামারের তুমুল প্রদর্শনী ছিল বিজেপির পদ্মফুল মার্কাধারীদের। সেই হিসাবে এবার তাদের এই উত্থান উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজনীতিতে বড়সড় প্রভাব পড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সীমান্ত-লাগোয়া ও বাংলা ভাষাভাষি অধ্যুষিত এই রাজ্যের দখল নেওয়ার জন্য কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার যে উত্তেজনার পারদ ছড়িয়েছিল তাতে আজ সুফল মিলেছে। ত্রিপুরা রাজ্যের মানুষ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে।
রাজ্যের মাত্র দুটিতে দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিল বামপন্থিরা। বিজেপির কোয়ালিশন জোটের মারপ্যাঁচে হেরেছে বামরা। তা নিয়ে বাম রাজনীতিতে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ, ভারতের ত্রিপুরায় নিজেদের এমন ভরাডুবির কোনো কারণই খুঁজে পাচ্ছে না বামপন্থিরা।
এদিকে দলের পরাজয়ে কোনোভাবেই মানিক লালকে দোষতে পারছেন না দলের নেতাকর্মীরা। মানিক লাল ভারতের ইতিহাসে অন্যতম সৎ ব্যক্তিত্ব। শুধু তাই নয়, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিএম নেতা মানিক সরকার পরপর চারবার মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন কেবল তার সততা আর মানবপ্রেমের জোরে। বামফ্রন্টের ২৫ বছরের শাসনক্ষমতার ২০ বছরই ত্রিপুরা শাসিত হয়েছে তার নেতৃত্বে। তার সততা নিয়ে বিরোধীদের মনেও কোনো প্রশ্ন নেই। ত্রিপুরায় বিদ্রোহীদের তৎপরতা নিরসন আর শিক্ষার হার বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এসেছে তার হাত ধরে। তবুও কেন ক্ষমতা ছাড়তে হলো বামফ্রন্টকে?
১. বামপন্থিদের পরাজয়ের কারণ হিসেবে দলটির দুর্বলতা নয়; বরং বিজেপির অ্যাডভান্স নির্বাচনী প্রচারণাকেই দায়ী করছে ভারতীয় গণমাধ্যমগুলো। বিশেষ করে নির্বাচনী প্রচারণাকালে বিজেপি হিন্দুদের ভোট টানার পাশাপাশি খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদেরও মনোযোগের কেন্দ্রে চলে আসে।
২. মানিক সরকারের অন্যতম শক্তি ছিল রাজ্যের সংখ্যাগুরু বাঙালি ভাষাভাষির ভোটার। তবে বিজেপি বাঙালিদের সরকারি চাকরির সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি সপ্তম পে-কমিশন বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়। মানিকের বাম সরকার কর্মচারীদের জন্য চতুর্থ পে-কমিশনে বেতন দিয়ে আসছে।
৩. ত্রিপুরার এই নির্বাচনে কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি আঞ্চলিক দল আদিবাসী পিপলস ফ্রন্ট অব ত্রিপুরার (আইপিটিএফ) সঙ্গে নির্বাচনী জোট বাঁধে। ত্রিপুরার সংগঠনটি আদিবাসীদের জন্য পৃথক রাজ্যের দাবি করে থাকে। ত্রিপুরার আদিবাসীদের এই গোষ্ঠীটি-ই মূলত বামদের হারিয়ে দিয়েছে। জানা যায়, ত্রিপুরায় আদিবাসী জনসংখ্যা ৩১ শতাংশ। আর বিধানসভা নির্বাচনে আদিবাসীদের জন্য ২০টি আসন সংরক্ষিত রয়েছে। বিজেপির এই জোট একটি সফল নির্বাচনী কৌশল হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।
৪. এসব নির্বাচনে বিজেপি উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ব্যাপক অবকাঠামো উন্নয়নের পুরস্কার তুলে নিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে রেলপথ ও সড়কপথ উন্নয়নে ব্যাপক প্রকল্প গ্রহণ করেছে বিজেপি। এর পাশাপাশি বিজেপির মতাদর্শিক অভিভাবক আরএসএস তাদের ‘ব্যাপক জনসংযোগ’ উদ্যোগের মাধ্যমে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জনতাকে বিজেপির বিষয়ে সচেতন করে তুলতে সক্ষম হয়েছে।
৫. বিজেপি তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশের ভোট পেয়েছে এবার। এদের শিক্ষা-দীক্ষা রয়েছে; কিন্তু হাতে কোনো কাজ নেই। শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা এ রাজ্যে প্রায় ৫ লাখ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ত্রিপুরায় প্রচারে গিয়ে, স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন তরুণদের হাতে কাজ দেওয়ার। বিজেপির পক্ষে এবং বামফ্রন্টের বিপক্ষে এটা একটা বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
ত্রিপুরা বিজয়ের পর নিজের ভাষণের তারুণ্যের জয়গান করেছিলেন নরেন্দ্র মোদি। গর্ব করে বলেছেন, ত্রিপুরায় বিজেপির বেশিরভাগ বিধায়কই তরুণ। তরুণদের নিয়ে যখন একের পর এক শৃঙ্গ জয় করছে গেরুয়া শিবির, তখন বার্ধক্যের ভারে জরাজীর্ণ রাজ্যের সিপিআইএম। দলের তরুণ নেতাদের দায়িত্ব না নিলে আগামী প্রজন্ম উঠে আসবে কীভাবে? সে প্রশ্নও উঠছে।

ত্রিপুরায় বিজিপির জয়ের নেপথ্যে কে এই বিপ্লব দেব
ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবের বয়স ৪৮। বিপ্লবের আদি বাড়ি বাংলাদেশের চাঁদপুর কচুয়ায়। উপজেলার মেঘদাইর গ্রামের হিরুধন দেব ও মিনা রানী দেবের একমাত্র ছেলে তিনি। ১৯৭১ সালে বাবা-মা’র সঙ্গে ত্রিপুরায় চলে যান। এরপর সেখানেই স্থায়ী বাসিন্দা হন। তবে বিপ্লবের অনেক আত্মীয়স্বজন এখনও কচুয়ায় বসবাস করেন। তার আপন চাচা প্রাণধন দেব এখন কচুয়া উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ত্রিপুরার নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব শপথ নেওয়ার কিছুক্ষণ আগে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করেছেন। এ সময় তিনি বাংলাদেশের সহযোগিতা চান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তাকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ত্রিপুরার জনগণের নানা ধরনের সহযোগিতার কথা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন।
শপথের পর ত্রিপুরার জনগণকে উন্নয়নের নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিপ্লব। তিনি বলেন, ত্রিপুরাবাসীকে আমি ভালোবাসি। কমিউনিস্ট ও মানিক সরকারকেও ভালোবাসি। কিন্তু আমি হতাশ হয়েছি যে, তারা (সিপিআই-এম) অনেক সময় পেলেও রাজ্যের উন্নয়নে সম্পদের সদ্ব্যবহার করেনি। আমি ত্রিপুরাবাসীর উন্নয়নের জন্য রাজনীতি করব।

Category: