Blog Archives

‘মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে’

Posted on by 0 comment

উত্তরণ ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশ হবে একটি শান্তির দেশ এবং আমরা কখনোই জঙ্গিবাদকে প্রশ্রয় দেব না। কারণ সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদের কোনো জাতি ধর্ম নেই। এই ভুল পথে যাতে ছেলেমেয়েরা না যায় সেজন্য অভিভাবক, শিক্ষকসহ সকলকে নিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য তিনি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি মাদকের ভয়াল ছোবল থেকে ছেলে-মেয়েদের রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রেখে উন্নয়নের ধারা বজায় রাখার পাশাপাশি দেশব্যাপী মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে যেতে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) সদস্যদের প্রতি নির্দেশ দেন।
গত ৩ মে কুর্মিটোলা সদর দফতরে র‌্যাবের ১৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘আমি র‌্যাবকে অনুরোধ করব, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যেমন আমরা অভিযান চালিয়ে সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি তেমনি এখন মাদকের বিরুদ্ধেও এই অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মাদক যারা তৈরি করে, যারা বিক্রি করে, যারা পরিবহন করে এবং যারা সেবন করে সকলেই সমানভাবে দোষী। এটাই মাথায় রাখতে হবে এবং সেভাবেই যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। মাদকবিরোধী অভিযানে র‌্যাব ইতিমধ্যেই যথেষ্ট সাফল্য অর্জন করেছে। তিনি বলেন, আমাদের ছেলেমেয়েরা যাতে এর ছোবল থেকে দূরে থাকতে পারে তার ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে নিতে হবে।’ এ ব্যাপারে বিশেষভাবে ভূমিকা পালনের জন্য তিনি সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে বড় বড় অভিযানে র‌্যাবের সাফল্যের জন্য র‌্যাবের সদস্যদের ধন্যবাদ জানান এবং এই অভিযান অব্যাহত রাখারও নির্দেশ দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমন, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও মাদক উদ্ধার, চরমপন্থি দমন এবং ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনাসহ সকল ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে র‌্যাব অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। র‌্যাব অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সকলের আস্থা ও শ্রদ্ধা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি বলেন, পবিত্র ইসলাম ধর্মের মূলধারা কোরআন ও হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা থেকে বিচ্যুতির কারণে উগ্র জঙ্গিবাদের উদ্ভব হয়েছে। এই জঙ্গিবাদীরা সাম্প্রদায়িকতা, সহিংসতা, অরাজকতা ও নাশকতামূলক কর্মকা-ের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার অপচেষ্টা চালিয়ে আসছে। কিন্তু র‌্যাব জঙ্গি দমনে অভাবনীয় সাফল্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে, যা সর্বমহলে সমাদৃত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইসলাম শান্তির ধর্ম। কিন্তু আমরা দেখেছি এই ধর্মের নাম করে কিছু মানুষকে বিভ্রান্তির পথে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল। এমনকি আমাদের ভালো ঘরের উচ্চশিক্ষিত কোমলমতি ছেলেরাও এই বিভ্রান্তির বেড়াজালে পড়ে যায়। তিনি বলেন, মানুষ মারলে বেহেশতে যাওয়া যাবে এই বিভ্রান্তিতে পড়ে তারা দেশে যে অস্থিতিশীলতা এবং অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল তার বিরুদ্ধে আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী, বর্ডার গার্ড, গোয়েন্দা সংস্থা এবং র‌্যাব বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। এ অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখতে হবে।

Category:

বাংলাদেশ ছাত্রলীগ : ৭০ বছরের অপ্রতিরোধ্য অভিযাত্রা

Posted on by 0 comment

5-7-2018 7-06-57 PMমুহম্মদ শফিকুর রহমান: তারুণ্যই পারে মানুষের লড়াইর নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্বজয় করতে। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ সেই তারুণ্যেরই প্রতীক। সত্য সুন্দরের অভিযাত্রী। অপ্রতিরোধ্য। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলতেন “ছাত্রলীগের ইতিহাস বাংলাদেশের ইতিহাস, বাংলাদেশের ইতিহাস ছাত্রলীগের ইতিহাস।” এ ইতিহাস রচিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে, ৭০ বছর লড়াই করে। অকুতোভয় আত্মবলিদানের মাধ্যমে।
বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া ছাত্রলীগ আজ এক বিশাল সংগঠন। বাংলার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত এর বিস্তার। বিরাট কর্মযজ্ঞ। ১৯৪৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করার পর বঙ্গবন্ধু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হয়ে ঢাকায় ফিরে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এলএলবি প্রথম পর্বে ভর্তি হন। ঢাকায় ফিরে আসার প্রধান কারণ ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ্বাস করতেন নেতাজীÑ শেরে বাংলাদের সাইডলাইনে পাঠিয়ে মুহম্মদ আলী জিন্নাহ, জওহরলাল নেহেরু, মহাত্মা গান্ধী, লর্ড মাউন্ট ব্যাটনরা যেভাবে ভারতবর্ষ ভাগ করে পাকিস্তান নামে যে অবাস্তব রাষ্ট্র বানিয়ে দিল তা বাঙালির জন্যে নয়। ১২০০ মাইলের ব্যবধানে দুই ভিন্ন ভাষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতির দুই দেশ, এক অবাস্তব রাষ্ট্র। এটি টিকে থাকতে পারে না। তিনি তার বন্ধুদেরও বলেছিলেন, যে পাকিস্তানের জন্ম হলো তা আমাদের জন্য নয়, আমাদের আবার লড়াই করে আপন জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তাই ঢাকায় ফিরে যাচ্ছি।
তারুণ্যের শক্তি অজেয় অপ্রতিরোধ্য। তাদের পিছুটান নেই। বঙ্গবন্ধু নিজেও তখন তরুণ, কাজেই তরুণদের সংগঠন দরকার। তিনি তরুণদের সংগঠিত করতে থাকলেন এবং ঢাকায় ফিরে আসার ছয় মাসের মাথায় ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম দিকে অবশ্য মুসলিম শব্দটি ছিল। পরে তা বাদ দেওয়া হয়। সকল জাতি-ধর্ম তথা সর্ব বর্ণবাদবিহীন তরুণদের সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে স্যাকুলার সংগঠনে রূপ দেন।
এর আগে প্রতিষ্ঠার মাত্র কয়েক মাস পরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজীবনের জন্যে বহিষ্কার করা হয়। কারণ তিনি বিশ্ববিদ্যালয় চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, যে জন্য তাকে গ্রেফতারও করা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে বলা হয়েছিল, বঙ্গবন্ধু মুচলেকা এবং ১৫ টাকা জরিমানা দিলে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যহৃত করা হবে এবং ছাত্রত্ব বজায় থাকবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু ভিন্ন রকম মাটি দিয়ে গড়া ছিলেন। মুচলেকা-জরিমানা দূরের কথা, নিজের রাজনীতি, লক্ষ্য, আদর্শ থেকে এক চুলও বিচ্যুত হননি জীবনে। ফলে তাকে জেলে নেওয়া হলো এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করার হলো। তারপরও ফিরে তাকান নি কারও দিকে, এগিয়ে গেছেন আপন শক্তিতে সংগঠনের নেতৃত্বে, বস্তুত এই ছাত্রলীগের সবকিছুই ছিলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতের পর ছাত্রলীগের হাল ধরেন কন্যা স্টার অব দ্য ইস্ট, মাদার অব হিউম্যানিটি শেখ হাসিনা। সামনে ছাত্রলীগের দ্বি-বার্ষিক সম্মেলন। ২০১৮-এর ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে এই দ্বি-বার্ষিক সম্মেলন সমধিক গুরুত্ব বহন করে। নতুন নেতৃত্ব আসবে এবং তারা ছাত্রলীগকে তার অতীত ঐতিহ্য অনুযায়ী সাজাবে।
আগেও বলেছি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি। সময়টা দেশ বিভাগের মাত্র ছয় মাস পর। বঙ্গবন্ধুর বয়স ছিল তখন ২৮ বছর এবং তিনিই হতে পারতেন এর সভাপতি। কিন্তু না, তিনি হন নি। তিনি প্রথম আহ্বায়ক নির্বাচিত করেন নাঈমুদ্দিন আহমদ, এরপর যখন ছাত্রলীগ রাজপথে কার্যক্রম শুরু করে তখন সভাপতি মনোনীত করা হয় দবিরুল ইসলামকে। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয় খালেক নেওয়াজ খানকে।
১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের অ্যাসেম্বলিতে তখনকার একঝাঁক সাহসী তরুণ নিয়ে প্রথমে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগ গঠন করা হয়। অল্পদিনেই তারা উপলব্ধি করেন যে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা হলো এর কাঠামোর মধ্যে বাঙালি জাতির অবস্থান অসম্ভব। আর তখন ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ নামকরণ করা হলো। এর আরেকটি লক্ষ্য ছিল ছাত্রলীগ প্রথম দিন থেকেই একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যার মধ্যে কোনো বিশেষ ধর্মের পরিচয় থাকতে পারে না। তাছাড়া এটি মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, পাহাড়ি, আদিবাসীসহ সকল ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর অসাম্প্রদায়িক মিলনমেলা হবে ছাত্রলীগ। হলোও তাই। প্রতিষ্ঠার পরই নামতে হলো বাঙালির প্রাণের ভাষা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে। এই পুরো প্রক্রিয়ার পেছনে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ছাত্রলীগ গঠন করে তিনি এবার গঠন করলেন আওয়ামী লীগ ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন। গঠন প্রক্রিয়ায় প্রথম বৈঠক হয় খান সাহেব ওসমান আলীর নারায়ণগঞ্জের বাসভবনে। সেখানে ব্রিটিশবিরোধী বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতারা একত্রিত হন এবং তারা উপলব্ধি করেন যে যেহেতু দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হলো সেহেতু বাঙালি জাতি হিসেবে স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকবে এমনিটি আশা করা যায় না। অতএব দেশপ্রেমিক অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল সংগঠন দরকার। এরই কিছুকাল পরে ঢাকার রোজ গার্ডেনে এবং আরও বেশি জাতীয়তাবাদী নেতার সমাবেশ ঘটে এবং এখানেই ব্যাপক আলোচনার মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের আত্মপ্রকাশ ঘটে এবং এর প্রথম সভাপতি হন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক হন টাঙ্গাইলের শামসুল হক। বঙ্গবন্ধু হন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। এভাবে বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া দুটি সংগঠন বড় ভাই (আওয়ামী লীগ) ছোট ভাই (ছাত্রলীগ) হিসেবে বাঙালি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের আন্দোলন শুরু করে। অবশ্য ১৯৫৭ সালে কাগমারি সম্মেলনের মাধ্যমে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেন।
এই গেল প্রথম অধ্যায়। দ্বিতীয় অধ্যায় হলো ছাত্রলীগ মুসলিম শব্দ ঝেড়ে ফেলে স্বতন্ত্র সংগঠন হিসেবে প্রথমে রাষ্ট্রভাষা বাংলা আন্দোলন ও পরে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলন শুরু করে। এই ৭০ বছরের পথ পরিক্রমায় ছাত্রলীগ অনেক নেতার জন্ম দিয়েছে। আবার অনেক নেতা বিভ্রান্ত হয়ে অথবা লোভে পড়ে ছাত্রলীগ ত্যাগ করেছে। যারা সোনার হরিণ ধরার জন্য ছাত্রলীগ ত্যাগ করেছে তারা কালো বিড়ালও ধরতে পারেনি। নাম বলতে চাই না। তাদের কেউ কেউ অন্য দলে গিয়ে আজও পেছন পেছন তল্পিবাহকের দায়িত্ব পালন করছে।
ছাত্রলীগের সবচে গৌরবের দিন ’৫২-র রাষ্ট্রভাষা বাংলার আন্দোলন, ঊনসত্তরের ছাত্র গণ-অভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়। এ ছাড়াও রয়েছে ’৫৪-র যুক্তফ্রন্ট আন্দোলন; ’৬২-র আইয়ুবের মার্শাল ল’-বিরোধী আন্দোলন; ’৬৪-র শিক্ষা আন্দোলন; ’৬৬-র ৬-দফা আন্দোলন; ঊনসত্তরের ১১-দফা আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মার্চ মাসের দুনিয়া কাঁপানো অসহযোগ আন্দোলন।
একটি সংগঠন বড় হয় শক্তিশালী হয় আন্দোলনের মাধ্যমে। বাংলাদেশ তো বটেই, এই উপমহাদেশেও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ বা বাংলাদেশ ছাত্রলীগই একমাত্র সংগঠন যে আন্দোলন করে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করে আজ এ অঞ্চলের সর্ববৃহৎ সংগঠনে পরিণত হয়েছে। বঙ্গবন্ধু তার প্রকাশ্য রাজনীতির সাথে গোপন সংগঠন ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’ গঠন করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু জানতেন দেশ স্বাধীন করতে এ ধরনের সংগঠনও লাগবে। তখন দায়িত্ব দিয়েছিলেন সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক, কাজী আরেফ আহমেদকে। পরে আরও অনেকে যোগ দেন। এই সংগঠনই ’৭১-এর যুদ্ধে বিএলএফ বা মুজিব বাহিনী গঠন করে দেশাভ্যন্তরে যুদ্ধ করে। দেশ স্বাধীন করে।
আজকের দিকেই যদি তাকাই তাহলে দেখব ছাত্রলীগ নেতা শেখ হাসিনা আজ কেবল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীই নন, এই অঞ্চল তথা বিশ্বের অন্যতম সাহসী, সফল, ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনেতা, যিনি একাধারে চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ, মাদার অব হিউম্যানিটি, স্টার অব দ্য ইস্ট, বিশ্বের ১০০ জন শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতার মধ্যে ২৩তম, পাঁচজন সৎ রাষ্ট্রনেতার মধ্যে তৃতীয়, এমনি অসংখ্য পুরস্কার এনে আমাদের জাতিকে সম্মানিত করেছেন। এছাড়া যার নাম করতে হয় তিনি ওবায়দুল কাদেরÑ একাধারে সড়ক যোগাযোগ ও সেতুমন্ত্রী এবং সর্বোপরি দলের শক্তিধর সাধারণ সম্পাদক, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাবলী তিনি যেমন অক্ষরে অক্ষলে পালন করেন, তেমনি রাজপথে হেঁটে লঞ্চে করে নদীতে ঘুরে ঘুরে কাজ দেখছেন।
সবচে’ বড় কথা হলো এ পর্যন্ত যত স্বৈরাচার স্বাধীনতার পূর্বাপর এসেছে সব ক’টির পতন হয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগসহ দলের সহযোগী সংগঠনের আন্দোলনে। এক্ষেত্রেও সবচে’ মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে ছাত্রলীগ। সেই স্বৈরাচার আইয়ুব, ইয়াহিয়া, জিয়া (যদিও সেনা অভ্যুত্থানে নিহত তবুও ততদিনে জনপ্রিয়তা শূন্যের কোঠায় পৌঁছেছিল); এরশাদ, খালেদা সবার পতন হয়েছিল প্রধানত ছাত্রলীগের আন্দোলনে। একাত্তর সালে তো অগণিত ছাত্রলীগ নেতাকর্মী পাকিস্তানি হায়েনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে অকাতরে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে। শহীদ হয়েছে। তবু হার মানেনি, বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। বাঙালি হাজার বছরের স্বপ্নসাধ আপন জাতি-রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম আজ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এগিয়ে চলেছে।
জানতে পেরেছি আগামী ১১ মে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের দ্বি-বার্ষিক সাধারণ সভা। সভাটি যে জাঁকজমক হবে। প্রত্যেকবারই আগের রেকর্ড ভেঙে ছাত্র সমাবেশ ঘটে। এবারও ঘটবে সন্দেহ নেই। ছাত্রলীগের বিদায়ী প্রেসিডেন্ট-সেক্রেটারি কি বলবেন জানি না। তবে দলের সাধারণ সম্পাদক ছাত্রলীগের এককালের সভাপতি এবং Ok Commission-এর চেয়ারম্যান (Commission-এ আমি সদস্য ছিলাম) এবং দুই মন্ত্রণালয়ের পরিশ্রমী ও সফল মন্ত্রী যা বলার এরই মধ্যে বলে দিয়েছেন : কোনো সিন্ডিকেট দ্বারা ছাত্রলীগ চলবে না। কারও পকেটের কমিটি দিয়ে ছাত্রলীগের নেতৃত্ব হবে না। ছাত্রলীগ চলবে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে, শেখ হাসিনার নির্দেশনায়। এর বাইরে কোনো ভাবনাচিন্তা করার অবকাশ নেই। ছাত্রলীগকে রাজনৈতিক আদর্শের মহাসড়কে আসতে হবে। সুনামের ধারায় ফিরে আসতে হবে। ছাত্রলীগকে অতীতের ধারায় ফিরে আসতে হবে। ছাত্রলীগে যেন আর কোনো অনুপ্রবেশকারী ঢুকতে না পারে, সেদিকে সজাগ থাকার পরামর্শ দেন তিনি। ছাত্রনেতাদের উদ্দেশ্যে ওবায়দুল কাদের বলেন, টাকা-পয়সার কর্মীরা থাকবে না, আদর্শের কর্মীরা থাকবে। জবরদস্তি করে অযোগ্যকে নেতা বানাবেন, দুৎসময় এলে হাজার পাওয়ারের বাতি দিয়ে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সাহসী, মেধাবী ও চরিত্রবান নেতা বানান সর্বস্তরে। তিনি বলেন, অনুপ্রবেশকারী পরগাছা যেন পার্টির নেতৃত্বে আর না আসতে পারে। পরগাছাদের জন্য ছাত্রলীগ কোনো সুযোগ দেবে না। মাননীয় মন্ত্রী বাজারে জোর গুজব, গত এক দশকে ছাত্রলীগে শিবিরের ব্যাপক অনুপ্রবেশ ঘটেছে। কেউ অর্থে বা কেউ শক্তি বৃদ্ধিতে। অস্বীকার করব না বিগত কোটাবিরোধী আন্দোলনে তার আলামত লক্ষণীয়। যে ছেলেটি আমি রাজাকার লিখে দাঁড়িয়েছে বা যারা বুকে বঙ্গবন্ধুর ছবি নিয়ে ভিসির বাড়ি অ্যাটাক করেছে তাদের কি চিহ্নিত করা যায় না? ওবায়দুল কাদের বলেছেন : ছাত্রলীগে কোনো পকেট কমিটি হবে নাÑ  I want devoted and qualified leadership. It will run as per Bangabandhus idealogy and Sheikh Hasina’s instruction.
মাননীয় মন্ত্রী মহোদয় আপনার ঐ কথাগুলো আমরা সর্বান্তকরণে সমর্থন করি। কিন্তু বেশ কিছুকাল ধরে আমরা এর ব্যতিক্রম লক্ষ্য করছি। আপনি কি জানেন, চাঁদপুর জেলায় ফরিদগঞ্জ বলে একটা থানা আছে এবং এক থানা এক কনস্টিটুয়েন্সি। সেখানে ২০০৫ সাল থেকে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ সবই পকেট কমিটি। কোনো নির্বাচিত কমিটি নেই। ২০১০ সালে একটি স্বাভাবকি দ্বি-বার্ষিক সাধারণ সভা ও গোপন ব্যালটের মাধ্যমে ছাত্রলীগের একটি নির্বাচিত কমিটি হয়। অল্প ক’দিনেই জেলা আওয়ামী লীগের বিতর্কিত সভাপতির কোপানলে পড়ে, কারণ কোনো অসৎ দুর্নীতি পরায়ণ লোককে তারা সমর্থন করেনি। ২০১২ সালে তাদের কমিটি অকার্যকর করে দেয় এবং ২০১৪ সালে পুরোপুরি ভেঙে অছাত্র, মাদকাসক্তদের দিয়ে কমিটি করা হয়। আমি তখনকার ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে প্রেসক্লাবে ডেকে অনুরোধ করেছিলাম একটা সাধারণ সভা ও নির্বাচন দিয়ে ওদের সম্মানজনক বিদায় দিতে। নেতৃদ্বয় আমাকে কথাও দিয়েছিলেন। কিন্তু দেখা গেল কয়েকদিন পর না কাউন্সিল না নির্বাচন বরং অশিক্ষিত অছাত্র দিয়ে কমিটি ঘোষণা করে দিলেন কেন্দ্রীয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকÑ এটা কোন পকেট?
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, জাতীয় প্রেসক্লাব
balisshafiq@gmail.com

Category:

‘সবার জন্য গড়ব অভিন্ন ভবিষ্যৎ’

Posted on by 0 comment
33

কমনওয়েলথ সম্মেলনে শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ ভূমিকা

রাজিব পারভেজ: ‘টুওয়ার্ডস এ কমন ফিউচার’ প্রতিপাদ্য নিয়ে শুরু হওয়া কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকে যোগ দিতে গত ১৬ এপ্রিল লন্ডন পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীসহ ৫৩টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান অংশ নেন এ সম্মেলনে। এবারে সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘সবার জন্য গড়ব একই ভবিষ্যৎ’। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নিয়ে গঠিত রাজনৈতিক সহযোগিতার অন্যতম পুরনো সংস্থা কমনওয়েলথ। প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনো না কোনো সময়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শাসনে থাকা দেশগুলোই এই সংস্থার সদস্য। ১৯৩১ সালে ওয়েস্টমিনস্টার সংবিধি বলে গ্রেট ব্রিটেন, আইরিশ ফ্রি স্টেট (বর্তমানে আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্র), কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার সমন্বয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কমনওয়েলথ গঠিত হয়। বর্তমানে বিশ্বের ৫৪টি স্বাধীন রাষ্ট্র কমনওয়েলথের অন্তর্ভুক্ত।
এবারের কমনওয়েলথ সম্মেলনে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সফলতা রোহিঙ্গা ইস্যুতে জোটভুক্ত রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের ঐকমতে নিয়ে আসা। যুক্তরাজ্য সফরে প্রধানমন্ত্রী কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগদান ছাড়াও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন। পাশাপাশি ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে-সহ বিশ্বনেতাদের সঙ্গে সাক্ষাতে মিলিত হন। গত জাতিসংঘ সম্মেলনের মতো কমনওয়েলথ সম্মেলনেও নিপীড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরব ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। ফলাফল হিসেবে কমনওয়েলথের লন্ডন ঘোষণায় গুরুত্ব পায় রোহিঙ্গা সংকট। ঘোষণার ৫০ অনুচ্ছেদে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহারে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী অপরাধীদের স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করারও তাগিদ দেয় কমনওয়েলথ।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে পাশে থাকার ঘোষণা
রোহিঙ্গা শরণার্থী ইস্যুতে বাংলাদেশের প্রশংসা করে এ ইস্যুতে পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছে কমনওয়েলথ সদস্যভুক্ত দেশগুলো। ২৪০ কোটি জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী কমনওয়েলথভুক্ত ৫৩ দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের এ সম্মেলনে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহারে মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী অপরাধীদের স্বাধীন তদন্ত প্রক্রিয়ায় বিচারের ব্যাপারে বাংলাদেশ থেকে উত্থাপিত একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও সম্মানের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমিতে টেকসই প্রত্যাবর্তনের পরিবেশ তৈরির জন্য মিয়ানমার সরকারের প্রতি জোরাল দাবিও উঠেছে।

এশিয়ার প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত চান প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কমনওয়েলথ সচিবালয় পরিচালনা পর্যালোচনায় উচ্চ পর্যায়ের গ্রুপে এশিয়ার দেশসমূহ থেকে প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের সদস্য রাষ্ট্র অন্তর্ভুক্ত করে এই গ্রুপটিকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল করার পরামর্শ দিয়েছেন। শেখ হাসিনা বলেন, কমনওয়েলথের কর্মকা- এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সচিবালয়ের জ্ঞান ও বিশেষজ্ঞ দক্ষতাকে আমরা মূল্য দেই। আমরা মনে করি, সঠিক প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রসমূহের মতামতও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্যই গ্রুপে কমনওয়েলথের বিভিন্ন অঞ্চলের সদস্য রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে এই রাষ্ট্রসংঘকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল করতে হবে। শেখ হাসিনা উইন্ডসর ক্যাসেলে সিএইচওজিএম রিট্রিটে কমনওয়েলথ নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন পারস্পরিক আন্তর্জাতিক ইস্যু নিয়ে মতবিনিময়কালে এ কথা বলেন। রিট্রিটে উচ্চ পর্যায়ের গ্রুপের সম্প্রসারণ, অর্থায়ন ও কমনওয়েলথ সচিবালয় গভর্ন্যান্স এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়।

সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান
সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন কমনওয়েলথ নেতারা। লন্ডনে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের শীর্ষ সম্মেলনের (সিএইচওজিএম) ঘোষণায় জোটের ৫৩ নেতা সাইবার অপরাধ বন্ধে একসঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছেন। এ ঘোষণা সাইবার নিরাপত্তা সহযোগিতা বিষয়ে বিশ্বের সর্ববৃহৎ এবং ভৌগোলিক দিক থেকে আন্তঃসরকারের একটি বলিষ্ঠ প্রতিশ্রুতি। কমনওয়েলথ সেক্রেটারি জেনারেল প্যাট্রিসিয়া স্কটল্যান্ড বলেন, সাইবার স্পেস আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। কমনওয়েলথ সদস্য রাষ্ট্রসমূহ জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তায় যে কোনো সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে পৃথক কিংবা সম্মিলিতভাবে পদক্ষেপ নিতে পারবে।

শেখ হাসিনা-তেরেসা মে আলোচনা
কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের সম্মেলনের ফাঁকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে কথা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে। লন্ডনের কনফারেন্স মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত শেষ সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান। রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছেন কমনওয়েলথের নেতারা।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসায় জাস্টিন ট্রুডো
রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলায় দৃঢ়তার সঙ্গে নেতৃত্ব দেওয়ায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। ২৫তম কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনের প্রথম নির্বাহী অধিবেশনে বক্তৃতাকালে এই প্রশংসা করেন। জাস্টিন ট্রুডো বলেন, ‘রোহিঙ্গা শরণার্থী সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দক্ষ নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন। কমনওয়েলথ নেতৃবৃন্দকে অবশ্যই তাকে সমর্থন দিতে হবে।’ কমনওয়েলথ মহাসচিবের রিপোর্ট উপস্থাপনের পর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে আলোচনার জন্য ফ্লোর উন্মুক্ত করে দেন। এ সময় ফ্লোর নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করেন জাস্টিন ট্রুডো।

শেখ হাসিনা-মোদি বৈঠক
যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ২৫তম কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের শীর্ষ সম্মেলনের (সিএইচওজিএম) সাইডলাইনে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে দুই নেতা দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্নিষ্ট নানা বিষয়ে কথা বলেন।  সর্বশেষ গত বছরের এপ্রিলে ভারত সফরে মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন শেখ হাসিনা। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে আবারও তার ভারত সফরের কথা রয়েছে।

বাণিজ্য প্রসারে প্রধানমন্ত্রীর ৭-দফা প্রস্তাব
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তঃকমনওয়েলথ ব্যবসা, বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনা উন্নয়নের জন্য ৭-দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন। তিনি বাণিজ্য প্রশাসন আরও উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ করে তুলতে কমনওয়েলথ দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানান। ‘বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনের প্রসারে কমনওয়েলথের ভূমিকা’ শীর্ষক এক বৈঠকে তিনি ওই প্রস্তাব উত্থাপন করে এ আহ্বান জানান। শেখ হাসিনা বলেন, আমরা অবশ্যই বাণিজ্য প্রশাসন উন্মুক্ত, আইনভিত্তিক, স্বচ্ছ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ন্যায্যতা নিশ্চিত করব। তিনি বলেন, আন্তঃকমনওয়েলথ বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং উদ্ভাবনার লক্ষ্যে দেশগুলোকে অবশ্যই অভিন্ন সুযোগ-সুবিধা জোরদার করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী এ লক্ষ্যে ৭-দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এগুলো হলোÑ
১. সদস্য রাষ্ট্রগুলোর শিল্প-সম্ভাবনা ও উৎপাদনশীলতার খাতভিত্তিক সমীক্ষা, ২. ছড়িয়ে থাকা বিনিয়োগ সম্ভাবনাসহ অভিন্ন বিনিয়োগ নীতি, নির্দেশনা ও কৌশল গ্রহণ, ৩. বাণিজ্য সহায়ক সুযোগ-সুবিধার উন্নয়ন এবং পিটিএ ও এফটিএ’র অশুল্ক বাধা কমিয়ে আনা, ৪. সেবা বাণিজ্যের জন্য উদার শাসন এবং স্বতন্ত্র পেশার সেবা সুবিধার জন্য খোলাবাজার চালু, ৫. প্রকৃত ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ যাতায়াত এবং সরকারি ও বেসরকারি ক্যাটাগরিতে নির্দিষ্ট লোকদের জন্য ভিসা সহজীকরণ, ৬. অবকাঠামো এবং যোগাযোগ প্রকল্প গ্রহণ ও ৭. এসএমই এবং ব্লু ইকোনমি খাতসহ উৎকৃষ্ট কেন্দ্র এবং প্রতিষ্ঠানের সহায়তা এবং উন্নয়ন, আরএন্ডডি, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য তহবিল গঠন।

কমনওয়েলথে সংস্কারের প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর
ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে স্বাধীন হওয়া দেশগুলোর সংস্থা কমনওয়েলথের সচিবালয়সহ এর বিভিন্ন কার্যক্রম ও ভূমিকার আমূল সংস্কারের প্রস্তাব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সদস্য দেশগুলোর ক্রমবর্ধমান চাহিদা ও প্রত্যাশা পূরণে এই সংস্কার অপরিহার্য বলে মনে করেন তিনি। লন্ডনে ল্যানক্যাস্টার হাউসে কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের শীর্ষ সম্মেলনে এই প্রস্তাব দেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা কমনওয়েলথের ব্যাপক সংস্কারের জন্য বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে একটি গ্রুপ (ইপিজি) গঠনের সুপারিশ করছি। কমনওয়েলথ সরকার প্রধানদের সম্মেলনে নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য সংস্থার সচিবালয়ের সংস্কার প্রয়োজন।

আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ঐকমত্য
যুক্তরাজ্যের বাকিংহাম প্রাসাদে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর সরকার প্রধানদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উপস্থিত অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরা এ সময় তারা বিগত দিনের সাফল্য ও আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং বৈশ্বিক ও কমনওয়েলথের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ঐকমত্য পোষণ করেছেন। এখানেই পরবর্তী কমনওয়েলথ প্রধান হিসেবে প্রিন্স চার্লসের বিষয়ে সম্মতি দিয়েছেন কমনওয়েলথ নেতারা। এর মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটেছে সংস্থাটির এবারের শীর্ষ সম্মেলনের। সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে রানি এলিজাবেথ কমনওয়েলথের প্রধানের পদ ছেড়ে দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করার পর ব্রিটিশ সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকার প্রিন্স চার্লসকে এ পদে বসানো হচ্ছে।

Category:

বাংলাদেশের শ্রমজীবী নারী

Posted on by 0 comment

5-7-2018 7-06-57 PMড. ইঞ্জিনিয়ার মাসুদা সিদ্দিক রোজী: পহেলা মে দিনটি পৃথিবীর অনেক দেশে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালিত হয়, যা মে দিবস নামেও পরিচিত। বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই এ দিনটিতে সরকারি ছুটি থাকে। ১৮৮৬ সালের মে মাসে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের ঐতিহাসিক আন্দোলন ও আত্মাহুতির এই দিন শ্রদ্ধার সাথে বিশ্বের প্রায় সব দেশে পালিত হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় দিবসটি পালন করা হয় না। আজকের এই লেখায় ১৮৮৬ সালে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন নিয়ে বলব। উনিশ শতকে কারখানা শ্রমিকরা সপ্তাহের ছয় দিনের প্রতিদিনই গড়ে প্রায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টার অমানবিক পরিশ্রমই করত; কিন্তু তার বিপরীতে মিলত নগণ্য মজুরি। অনিরাপদ পরিবেশে রোগ-ব্যাধির আঘাতে মৃত্যুই ছিল নির্মম সাথী। তাদের পক্ষ হয়ে বলার মতো কেউ ছিল না তখন। ১৮০৭ সালে শ্রমিকরাই মজুরি না কেটে দৈনিক ৮ ঘণ্টা শ্রম নির্ধারণের প্রথম দাবি জানায়; কিন্তু কোনো শ্রমিক সংগঠন ছিল না বলে এই দাবি জোরাল করা যায় নি। এ সময় সমাজতন্ত্রের ধারণা শ্রমজীবী মানুষের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করতে থাকে। শ্রমিকরা বুঝতে পারেন। বণিক ও মালিক শ্রেণির এই রক্ত শোষণ নীতির বিরুদ্ধে তাদের সংগঠিত হতে হবে। ১৮৮০-৮১ সালের দিকে শ্রমিকরা প্রতিষ্ঠিত করেন Federation of Organized Trades and Laber Unions of the United States and Canada. ট্রেডস অ্যান্ড লেবার ইউনিয়ন’স এই সংঘের মাধ্যমে শ্রমিকরা সংগঠিত হয়ে শক্তি অর্জন করতে থাকে। ১৮৮৪ সালে সংঘটি ৮ ঘণ্টা দৈনিক মজুরি নির্ধারণের প্রস্তাব পাস করে এবং মালিক ও বণিক আওতাধীন সফল শ্রমিক সংগঠনকে এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের জন্য আহ্বান জানানো হয়। প্রথম দিকে অনেকেই একে অবাস্তব অভিলাষ, অতিসংস্কারে উচ্চাকাক্সক্ষা বলে আশঙ্কা প্রকাশ করে; কিন্তু বণিক মালিক-শ্রেণির কোনো ধরনের সাড়া না পেয়ে শ্রমিকরা ধীরে ধীরে প্রতিবাদী ও প্রস্তাব বাস্তবায়নের দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হতে থাকে। এ সময় এলার্ম নামক একটি পত্রিকার কলামে একজন লিখেন, শ্রমিক ৮ ঘণ্টা কাজ করুক কিংবা ১৩ ঘণ্টাই করুক সে দাসই, যেন জ্বলন্ত আগুনে ঘি ঢালে। শ্রমিক সংগঠনের সাথে বিভিন্ন সমাজতন্ত্রপন্থি দলও একাত্মতা জানায়। ১ মে’কে ঘিরে প্রতিবাদে-প্রতিরোধের আয়োজন চলতে থাকে। আর শিকাগো হয়ে ওঠে এই প্রতিবাদ-প্রতিরোধের কেন্দ্রস্থল।
১ মে এগিয়ে এলে মালিক বণিক-শ্রেণি অবধারিতভাবে ঐ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করল। ১৮৭৭ সালে শ্রমিকরা একবার রেলপথ অবরোধ করলে পুলিশ ও ইউনাইটেড স্টেটস আর্মি তাদের ওপর বর্বর আক্রমণ চালায়। ঠিক একইভাবে ১ মে মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রস্তুতি নিতে পুলিশ ও জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা শিকাগো সরকারকে অস্ত্র সংগ্রহে অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করে। ধর্মঘট আহ্বায়নকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য শিকাগো বাণিজ্যিক ক্লাব ইলিনয় প্রতিরক্ষা বাহিনীকে ২০০ ডলারের মেশিন গান কিনে দেয়। ১ মে সারা যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩ লাখ শ্রমিক তাদের কাজ ফেলে এদিন রাস্তায় নেমে আসে। শিকাগোতে শ্রমিক ধর্মঘট আহ্বান করা হয়। প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক কাজ ফেলে শহরের কেন্দ্রেস্থলে সমবেত হয়। অগ্নিগর্ভ বক্তৃতা, মিছিল-মিটিং, ধর্মঘট বিপ্লবী আন্দোলনের হুমকি সবকিছু মিলে ১ মে উত্তাল হয়ে ওঠে। পার্সন্স, জোয়ান মোসট, আগস্ট, স্পিজ লই লিং-সহ আরও অনেকেই শ্রমিকদের মাঝে পথিকৃত হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে আরও শ্রমিক কাজ ফেলে আন্দোলনে যোগ দেয়। আন্দোলকারী শ্রমিকদের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ লাখ। আন্দোলন চলতে থাকে। ৩ মে ১৮৮৬ সালে সন্ধ্যাবেলা হালকা বৃষ্টির মধ্যে শিকাগোর হে মার্কেট বাণিজ্যিক এলাকায় শ্রমিকগণ মিছিলের উদ্দেশে জড়ো হন। আগস্ট স্পিজ জড়ো হওয়া শ্রমিকদের উদ্দেশে কিছু কথা বলেছিলেন। হঠাৎ দূরে দাঁড়ানো পুলিশ দলের কাছে এক বোমার বিস্ফোরণ ঘটে, এতে এক পুলিশ নিহত হন এবং ১১ জন আহত হন। পরে আরও ছয়জন মারা যান। পুলিশ বাহিনীও শ্রমিকদের ওপর অতর্কিত হামলা শুরু করে, যা সাথে সাথেই রায়টের রূপ নেয়। রায়টে ১১ জন শ্রমিক শহিদ হন। পুলিশ হত্যা মামলা আগস্ট স্পিজ-সহ আটজনকে অভিযুক্ত করা হয়। এক প্রহসনমূলক বিচারের পর ১৮৮৭ সালের ১১ নভেম্বর উন্মুক্ত স্থানে ছয়জনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। লুই লিং আগেই কারা অভ্যন্তরে আত্মহত্যা করেন, অন্য একজনের ১৫ বছরের কারাদ- হয়। ফাঁসির মঞ্চে আরোহণের আগে আগস্ট স্পিজ বলেছিলেন, আজ আমাদের এই নিঃশব্দতা তোমাদের আওয়াজ অপেক্ষা অধিক শক্তিশালী হবে। ২৬ জুন ১৮৯৩ ইলিনয়ের গভর্নর অভিযুক্ত আটজনকে নিরপরাধ বলে ঘোষণা দেন এবং রায়টের হুকুম প্রদানকারী পুলিশের কর্মকা-কে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়। আর অজ্ঞাত সেই বোমা বিস্ফোরণকারীর পরিচয় কখনই প্রকাশ পায়নি।
শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজ করার দাবি অফিসিয়াল স্বীকৃতি পায়। আর পহেলা মে বা মে দিবস প্রতিষ্ঠা পায় শ্রমিকদের দাবি আদায়ের দিন হিসেবে। পৃথিবীব্যাপী আজও তা পালিত হয়।
বাংলাদেশে প্রায় ৫ হাজারের মতো তৈরি পোশাক কারখানা রয়েছে। তৈরি পোশাক খাতে নারী শ্রমিকের সংখ্যা কমছে। নারী-পুরুষের বেতন বৈষম্য কমেনি। পুরুষের চেয়ে কম বেতন পাওয়া নারী শ্রমিক সংখ্যা কমে যাচ্ছে। নারী শ্রমিক ২০০ টাকা কম পান পুরুষ শ্রমিক থেকে। পোশাক শ্রমিকদের নতুন কাঠামো তৈরির জন্য মজুরি বোর্ড গঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতিতে পোশাক শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ডিসেম্বরের আগেই শুরু হবে শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি। সকাল সাড়ে ৫টায় ঘুম থেকে উঠে কর্মক্ষেত্রে যায়। আসে রাতে ৯-১০টা সময়। ৭ হাজার টাকা বেতন হলে ৩-৪ হাজার টাকা বাড়ি ভাড়ায় চলে যায়। বাকি টাকায় অনেক কষ্টে মাস কাটে। এভাবেই চলে তাদের মানবেতর জীবন। ন্যূনতম মজুরি তারা ১৬ হাজার টাকা দাবি করেছে।
কুষ্টিয়ার খাজানগর জাঁতাকলে ১০ বছর ধরে কাজ করছেন কাঞ্চন বালা। তিনি জানেন না মে দিবস কী? শ্রম অধিকার কী? দেশের বৃহত্তম মোকামে কাজ করছেন ২০ হাজার শ্রমিক, বেশির ভাগই নারী শ্রমিক। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত হাড় ভাঙা খাটুনি খেটে যা মজুরি পান তা দিয়ে কোনোরকমে চলে সংসার। সাপ্তাহিত ছুটিতেও বিরাম নেই, দিনের কত ঘণ্টা কাজ করতে হয়, ন্যায্য মজুরি পাচ্ছেন কি নাÑ এসব প্রশ্ন অবান্তর। শ্রমিকদের জন্য আলাদা কোনো দিবস মানা তাদের কাছে বিলাসিতার মতো। তিনবেলা খাবার জুটানোই বড় কথা। কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদফতর কর্মকর্তারা চাতাল শ্রমিকদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার লক্ষ্যে সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছে।
সবাইকে নিয়ে সুখে থাকার আশায় পরিবারের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য শত শত নারী শ্রমিক পাড়ি জমান মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ সৌদি আরবে। তবে সেখানে যাওয়ার পর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ না পাওয়ার পাশাপাশি গৃহকর্তাদের নির্যাতনের মুখে অনেকে কাজ ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন। অনেকেই আবার বাংলাদেশ দূতাবাসে আশ্রয় নেন। সৌদি আরবের রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাস ও জেদ্দা কনসুলেটে গত ২২ এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ৩২ জন নারী শ্রমিক আশ্রয় নিয়েছেন। তবে প্রতিদিন বাড়ছে এ সংখ্যা। এর আগে গত ২৯ মার্চ থেকে এক মাসে দূতাবাসে আশ্রয় নেওয়া ৫০২ জন নারী শ্রমিককে দেশে পাঠানো হয়েছে বলে জানান সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের শ্রম কাউন্সিলর সরোয়ার আলম। নতুন করে আশ্রয় নেওয়া ২০৯ নারীর মধ্যে জেদ্দায় বাংলাদেশ কনসুলেটে রয়েছে ৭৮ জন, বাকি ২৫০ জন রয়েছেন রিয়াদ দূতাবাসে। এসব নারী শ্রমিকদের অভিযোগ, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় বৈধভাবে শ্রমিক হিসেবে বাংলাদেশের দালালরা যে কাজের কথা বলে তাদের সৌদি আরবে এনেছে, সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাদের কাজ দেওয়া হয়নি। রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসে আশ্রয় নেওয়া কয়েকজন নারী বলেছে, তাদের কাউকে এসে হাসপাতালে নার্সের সহযোগিতা ও পিয়নের কথা বলা হলেও সেখানে যাওয়ার পর দেওয়া হয়েছে ক্লিনারের কাজ। আশ্রয় নেওয়া অধিকাংশই মূলত গৃহকর্মী, ঠিকমতো বেতন পেতেন না।
সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশে নারী শ্রমিকের নিরাপত্তার নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। যার মাধ্যমে অভিবাসী নারীদের বাসায় না রেখে বিভিন্ন হোস্টেলে রাখা হবে। সেখান থেকে তারা কাজে যাতায়াত করবে, যার ফলে নারী অভিবাসীদের ওপর নির্যাতনের সম্ভাবনা কমে আসবে বলে মনে করছে বাংলাদেশের অভিবাসীদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থা রামবো। সরকারি হিসাব অনুযায়ী গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৯ লাখ ৬০ হাজার শ্রমিক বিভিন্ন দেশে গেছে। তবে বেসরকারি সংস্থাগুলো বলছে, এর বেশি গিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশে সৌদি আরবে। এর বড় একটি অংশ নারী শ্রমিক। দেশে এখন নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে ব্যাপকাকারে নারী ঠিকা শ্রমিকরা কাজ করছে। এখানেও রয়েছে মজুরি বৈষম্য। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী অধিকার ও মজুরি সাম্য প্রতিষ্ঠা এখনও চ্যালেঞ্জের বিষয়।

Category:

একাত্তরের সংগ্রামে অর্জিত দৃঢ়তা আপনার পদক্ষেপে প্রতিফলিত হয়েছে

Posted on by 0 comment

31উত্তরণ প্রতিবেদন: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে লেখা এক চিঠিতে তার ভূয়সী প্রশংসা করে বলেছেন, আপনার পদক্ষেপে বাংলাদেশের জনগণের চরিত্র ও দৃঢ়তা প্রতিফলিত হয়েছে, এটি তারা অর্জন করেছে ১৯৭১-এর কঠোর সংগ্রামের মাধ্যমে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিরাপদে ও স্বেচ্ছায় তাদের নিজ দেশে পাঠাতে তার দেশের চাপ অব্যাহত রাখার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ্বস্ত করেছেন। ট্রাম্প তার চিঠিতে শেখ হাসিনাকে বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিরাপদে ও স্বেচ্ছায় তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের প্রতি চাপ অব্যাহত রাখবে। ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্শিয়া ব্লুম বার্নিকাট গত ৩ মে বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার সরকারি বাসভবন গণভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চিঠি প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেন। খবর বাসসের।
বৈঠকের পরে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের জানান, চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেন, এ ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন নেই যে, এই সংকট সৃষ্টির জন্য দায়ী মিয়ানমারকে অবশ্যই জবাবদিহিতা করতে হবে। ডোনাল্ড ট্রাম্প রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মানবিক নেতৃত্বদানে অবদানের জন্য তার ভূয়সী প্রশংসা করেন উল্লেখ করে প্রেস সচিব জানান, ট্রাম্প বলেছেন, ‘রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে উদার মানবিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্র গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।’
নিজের লেখা চিঠিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বলেন, ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া একটি বিরাট বোঝা, তবে বিশ্ববাসী জানে বাংলাদেশের পদক্ষেপে হাজার হাজার জীবন রক্ষা পেয়েছে।
ট্রাম্প তার চিঠিতে নিজ দেশকে বিশ্বের বৃহত্তম মানবিক সহায়তাকারী দাতাদেশ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের সহযোগিতায় পাশে থাকবে।’
ট্রাম্প বলেন, আমি আশা করি বাংলাদেশ এই নেতৃত্ব অব্যাহত রাখবে, বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমের প্রাক্কালে ভূমিকা পালন করবেÑ যা গোটা বিশ্ব থেকে বাংলাদেশের জন্য সম্মান বয়ে আনবে।
প্রেস সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী তাকে পত্র দেওয়ার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য মিয়ানমার সরকারের ওপর প্রচ- চাপ অব্যাহত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি পুনরায় আহ্বান জানান। শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার ১ লাখ রোহিঙ্গার জন্য অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণে ভাষানচর নামের একটি দ্বীপ উন্নয়ন করছে। তিনি বলেন, কক্সবাজারে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা আশ্রয় নেওয়ায় স্থানীয় জনগণের জন্য দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে এবং সেখানকার পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, ইউএসএইড বিশ্বব্যাপী শরণার্থীদের সহায়তার জন্য কর্মসূচি নিয়ে থাকে। কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের সমস্যা লাঘবে ইউএন সিস্টেমের অধীনে ইউএসএইড কাজ করে যাচ্ছে।
বার্নিকাট বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীকে জানান, ইউএসএইড প্রেসিডেন্ট মার্ক গ্রিন এবং কার্টার সেন্টারের সিইও ও সাবেক রাষ্ট্রদূত ম্যারি এ্যান পিটার্স বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের অবস্থা দেখতে খুব শিগগির বাংলাদেশ সফর করবেন।
মার্কিন দূত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন এবং গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড পাওয়ায় তাকে অভিনন্দন জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং তাদের উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব মেজর জেনারেল মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসান অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

Category:

তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কর্মসংস্থানের অবারিত সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে : জয়

Posted on by 0 comment
বিপিও সামিট বাংলাদেশ-২০১৮

বিপিও সামিট বাংলাদেশ-২০১৮

সরদার মাহামুদ হাসান রুবেল: তৃতীয়বারের মতো ‘বিপিও সামিট বাংলাদেশ-২০১৮’ গত ১৫ ও ১৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হয়। বিপিও খাতে সবচেয়ে বড় আয়োজন এটি। রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠানটির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়। সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদফতর এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কলসেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিংয়ের (বাক্য) যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় এ আয়োজন।
উদ্বোধনকালে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কর্মসংস্থানের অবারিত সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশ থেকে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে সহায়তা চায়। সরকারি চাকরির অপেক্ষায় না থেকে তরুণরা যাতে নিজেরাই উদ্যোক্তা হয়ে উঠতে পারে সেজন্য তাদের তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জনের আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, চাকরির জন্য আর সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে না। সরকারের কর্মপরিকল্পনার কারণে ছেলে-মেয়েরা মফস্বল শহরে বসে আউট সোর্সিংয়ের মাধ্যমে হাজার হাজার ডলার আয় করছে। সরকার বিদ্যুতের নিশ্চয়তা ও উচ্চগতির ইন্টারনেট দিচ্ছে বলেই এটা সম্ভব হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, স্বাধীন মত প্রকাশ বন্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা (আইসিটি) আইন করা হয়নি; বরং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা রক্ষাসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানো এবং জঙ্গি তৎপরতা বন্ধ করতেই এই আইন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, স্বাধীন মত প্রকাশ করা একজন মানুষের নাগরিক অধিকার। তবে বিভ্রান্তিকর কোনো খবর বা গুজব দ্বারা যে কোনো ব্যক্তি বিশেষত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় আক্রান্ত হতে পারে। এ ধরনের বিভ্রান্তিকর খবর বা বক্তব্য আমরা প্রকাশ করতে পারি না। এটি স্বাধীন মত নয়, ঘৃণা ছড়াতেই করা হয়ে থাকে। এ ধরনের বিদ্বেষ ছড়ানো বন্ধ হওয়া উচিত। যারা এটি করছে তাদের অবশ্যই বিচারের আওতায় আনতে হবে।
এবারের আয়োজনে ৬০ জন স্থানীয় স্পিকার, ২০ জন আন্তর্জাতিক স্পিকার অংশগ্রহণ করেছেন। দুদিনের মূল সামিট সফল করার জন্য সারাদেশে ৩০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাক্টিবেশন কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়। বিপিও মানে বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও)। ‘বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং’ নামটা বিশ্বজুড়ে খুব পরিচিত। আউটসোর্সিং বলতে শুধু কলসেন্টার আউটসোর্সিং নয়। টেলিকমিউনিকেশন, ব্যাংক, বীমা, হাসপাতাল, হোটেলের ব্যাক অফিসের কাজ, এইচআর, আইটি, অ্যাকাউন্ট সবকিছুই এর অন্তর্ভুক্ত। এসব কাজ আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে করার বিষয়টি সাধারণভাবে ‘বিপিও’ বলে পরিচিত।
বিশ্বের সবচেয়ে ক্রমবর্ধমান ইন্ডাস্ট্রি হচ্ছে এই বিপিও খাত। আইসিটি-তে বর্তমানে বাংলাদেশে যে পরিবর্তনের গল্প, তার উল্লেখযোগ্য অবদান হচ্ছে বিপিও খাতের। বছরে প্রায় ১৮০ মিলিয়ন ডলার বিদেশি মুদ্রা আসে আইসিটি খাত থেকে। সরকার আইসিটি সেক্টর থেকে ২০২১ সাল নাগাদ ৫ বিলিয়ন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, আশা করা যায় তার সিংহভাগ অংশই আসবে বিপিও থেকে।
বিপিও সামিটের প্রথম দিন ৬টি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় দিনেও ৪টি সেমিনার ও একটি কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিটি সেমিনারে ছিল তারুণ্যের উচ্ছ্বাস। উদ্বোধনের পর দুপুর আড়াইটায় বলরুমে অনুষ্ঠিত হয় ‘বিপিও অ্যাজ এ ক্যারিয়ার ফর ইয়ুথ’। সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ব্যবসা বিকাশের স্বার্থে দেশের সব জায়গায় ইন্টারনেট সংযোগ পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে। আমরা এখন ইউনিয়নগুলোতে কানেকটিভিটি পৌঁছানোর কাজ করছি। কেবল ইউনিয়নে নয়, বাড়ি বাড়ি সেই কানেকটিভিটি পৌঁছাতে চাই। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে আউটসোর্সিংয়ের ক্ষেত্রে সরকার প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিচ্ছে জানিয়ে মোস্তাফা জব্বার বলেন, সারাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তরুণ-তরুণীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রযুক্তি ব্যবহার করে নতুন নতুন কাজের ক্ষেত্র তৈরি করতে পারবে। সরকার মূলত প্রশিক্ষণের জায়গাটা উন্মুক্ত করার চেষ্টা করছে। ৭টি জেলায় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করছি। আমরা ৬৪টি জেলায় করার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি। আইটি খাতে ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহীদের নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে কেবল সেটিতে লেগে থাকার পরামর্শ দেন মোস্তাফা জব্বার।
আইসিটি বিভাগের সচিব সুবীর কিশোর চৌধুরী বলেন, ১৪-১৫ লাখ সরকারি চাকরির বিপরীতে বেসরকারি খাতে অনেক চাকরি রয়েছে। সেজন্য দক্ষতা বাড়ানোটা গুরুত্বপূর্ণ। কেবল আইটি সেক্টরে ১০ লাখ লোক তৈরি করার লক্ষ্য নিয়ে আমরা কাজ করছি। বিপিও সেক্ষেত্রে একটি বড় ভূমিকা রাখবে। চাকরি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নানা দিকে না ঘুরে একদিকে নিবদ্ধ হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে। অনুষ্ঠানে প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইসিটি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মালিহা নার্গিস। সেমিনারে তিনি বলেন, প্রতিবেশী ভারত-শ্রীলংকা আউটসোর্সিং থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার আয় করছে, আমরা পারছি না। কারণ আমরা কিছু কাজ করছি; কিন্তু সেটি অর্গানাইজড না, এটাই আমাদের বড় সমস্যা। বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানির চাহিদাভিত্তিক লোক তৈরির জন্য সে অনুযায়ী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার করা দরকার বলে মন্তব্য করেন মালিহা। সেমিনারে উপস্থিত থেকে ন্যাবেট ইন্ডিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অর্জুন মিশ্র বলেন, কলসেন্টারে সব ধরনের মানুষ কাজ করতে পারে। আমরা কলসেন্টারে প্রতিবন্ধীদের দিয়ে এ সেক্টরে কাজ করানো যায় সেটি দেখিয়েছি। আমরা প্রতিবন্ধীদের নিয়ে চ্যারিটির মধ্যে থাকিনি, তাদের দক্ষতা তৈরি করে তাদের আয়ে তাদের চলার ব্যবস্থা করেছি। অনুষ্ঠানের মডারেটর হিসেবে ছিলেন আয়োজক প্রতিষ্ঠান বাক্য-এর সাধারণ সম্পাদক ও ফিফো টেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তৌহিদ হোসেন। তিনি জানান, ২০২১ সালের মধ্যে বিপিও খাতে ১ লাখ উদ্যোক্তা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে সরকার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। ৪০ হাজার ইতোমধ্যে তৈরি হওয়ায় এখনও দরকার ৬০ হাজারের মতো দক্ষ যুবশক্তি।
সেমিনারে আলোচক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন মধ্যে স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রকল্পের প্রধান সমন্বয়ক মাহতাবুল হক, মালয়েশিয়ার ইউরাস কর্পোরেশনের মহাব্যবস্থাপক কৃষ্ণা রাজকুমার রাজাশেখারান, স্টার কম্পিউটার্সের চিফ অপারেটিং অফিসার রেজওয়ানা খান, অগমেটিক্সের প্রশিক্ষক রুবাইয়া তানসিম, ফিফো টেকের কর্মী তামান্না সুলতানা।
এই সেশনের শেষে অনলাইনে বিপিও খাতে প্রশিক্ষণ কোর্স নিয়ে সরকারের এলআইসিটি প্রকল্প ও রেপটো আইটি লিমিটেডের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়। বিকেল ৫টায় ব্যালকনি হলে অনুষ্ঠিত হয় ‘গ্লোবাল অপরচুনিটিস ফর ক্রিয়েটিভ ইকোনোমি’ শিরোনামে দিনের সর্বশেষ সেমিনার। সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু এমপি। এ সময় তিনি প্রধান অতিথির বক্তব্যে বলেন, তরুণদের মধ্যে রয়েছে নানা আইডিয়া। তাদের এসব আইডিয়ার কথা জানাতে হবে আমাদের। তারা এগিয়ে এলে খুলে যাবে অনেক সম্ভাবনার দুয়ার। আইসিটি খাতে তরুণদের নানা প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ক্রিয়েটিভ ওয়ার্ল্ডের জন্য আমরা যখন ক্রিয়েটিভ ইকোনমির কথা বলছি, তখন তরুণরা তাদের ধারণাগুলো নিয়ে অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারে। আগে যেসব সমস্যার জন্য আমাদের কাগজপত্র খুঁজতে হতো, এখন এক সফটওয়্যারের মাধ্যমে আমরা সেসব সমস্যা সম্পর্কে জানতে পারি, খুব সহজেই সেসব সমস্যার সমাধান করতে পারি। নসরুল হামিদ বিপু বলেন, বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। নদীর অববাহিকায় আমরা যখন বিদ্যুৎকেন্দ্র বা শক্তি উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন স্থাপনা প্রতিষ্ঠা করতে যাচ্ছি, তখন সাশ্রয়ী কোনো ধারণা কিন্তু তরুণরা দিতে পারে। আমরা যখন বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ বিলের বিষয়ে কথা বলি, বিল কেন বেশি আসে; এমন প্রশ্ন খুঁজি, তখন আমরা তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্য নিতে পারি।
সার্ভিস সলিউশনসের সিইও তানভীর ইব্রাহীম, টেন মিনিট স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও আয়মান সাদিক, আইসিটি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব একেএম খায়রুল আলম, গিকি সোশ্যালের এম আসিফ রহমান, হিউম্যান এইড বাংলাদেশের শিক্ষা বিভাগের পরিচালক সুমাইয়া জাফরিন চৌধুরী, বেসিসের পরিচালক দিদারুল আলম, রেডিসন ডিজিটাল টেকনোলজিসের চেয়ারম্যান দেলওয়ার হোসেন ফারুক। বিকেল ৫টায় বিপিও সামিট বাংলাদেশ ২০১৮-এর প্রথম দিনে সুরমা হলে অনুষ্ঠিত হয় ‘এডুকেশন : এ কি ইনস্টুমেন্ট টু অ্যাচিভ এসডিজি’ শিরোনামে সেমিনার। সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইসিটি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সৈয়দা সারোয়ার জাহান। এ সময় তিনি বলেন, এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে স্কুল থেকে ঝরেপড়া শিক্ষার্থীদের শিক্ষার আওতায় আনা জরুরি। এক্ষেত্রে মায়েরা যদি শিক্ষিত হয়, তবে তারা তাদের সন্তানদের বেসিক শিক্ষাটা দিতে পারবে। ফলে তারা সততা, মূল্যবোধের শিক্ষা পাবে। তারা সহজেই ফরমাল এডুকেশনটা গ্রহণ করতে পারবে। এসডিজি অর্জনে আমাদের মূল লক্ষ্য শিক্ষা। শিক্ষার প্রসারে রাজনৈতিক নেতাদেরও চাপ প্রয়োগ করা যেতে পারে, বলেন সারোয়ার জাহান। সেমিনারটির মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক হাফিজ মো. হাসান। তিনি বলেন, মানসম্মত শিক্ষা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। এজন্য যোগ্য শিক্ষকও প্রয়োজন। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কলসেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিংয়ের (বাক্য) উপদেষ্টা ও ভিরগো কন্টাক্ট সেন্টার সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমাদুল হকের পরিচালনায় সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন ইউসেপের প্রধান নির্বাহী তাহসিনাহ আহমেদ, ড্যাফোডিল গ্রুপের সিইও মো. নুরুজ্জামান, এএসকে টেলিকম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়মা শওকত প্রমুখ। এছাড়া সামিটের ১৫ এপ্রিল প্রথম দিন দুপুর আড়াইটা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় ‘গর্ভমেন্ট প্রোসেস আউটসোর্সিং-স্কোপস্ অব গভর্নমেন্ট ইন বিপিও’, একই সময় সুরমা হলে ‘ক্রিয়েটিং দ্য নেক্সট জেনারেশন আউটসোসিং সার্ভিসেস ইন বাংলাদেশ’ এবং বিকেল ৫টায় মেঘনা হলে ‘অ্যাকাউন্টিং প্রোসেস আউটসোর্সিং : পজিশননিং বাংলাদেশ’ শিরোনামে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং বা বিপিও খাতের অবস্থানকে তুলে ধরার লক্ষ্যে দুদিনের এ আয়োজনের শেষ দিন ১৬ এপ্রিল সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় ‘আউসসোসিং ফর স্টার্ট-আপস : গ্রোয়িং টুগেদার’ শিরোনামে দিনের প্রথম সেমিনার। দুপুর আড়াইটায় ব্যালকনি হলে ‘ফোর্থ ইন্ডাস্ট্রিয়াল রেভুলেশন : চ্যালেঞ্জেস ইন বিপিও’, সুরমা হলে ‘কাস্টমার-সেনট্রিক হেলথকেয়ার ডেলিভারি সিস্টেম অ্যান্ড বিপিও’ এবং মেঘনা হলে ‘রাইস অব এআই অ্যান্ড দ্যা ইমপ্যাকট অন বিপিও’ শিরোনামে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় ৩টি সেমিনার। একই দিন সকাল সাড়ে ১০টায় মেঘনা হলে অনুষ্ঠিত হয় ‘ক্যাপাসিটি ব্লিডিং ফর কলসেন্টার এজেন্টস’ শিরোনামে একটি কর্মশালা।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, এবারের আয়োজনে আউটসোর্সিং সেবা, পরবর্তী প্রজন্মের ধারণাগুলো প্রদর্শন করা হবে। সময়ের আলোচিত সেবা বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। বিপিও খাতে ২০২১ সালের মধ্যে ১ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এ আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করেন আয়োজকরা।

Category:

বঙ্গবন্ধুর, কারাগারের রোজনামচা

Posted on by 0 comment

মুনতাসীর মামুন:

5-7-2018 7-06-57 PM(তৃতীয় অংশ)
দেশের মানুষের অদৃষ্টপরায়ণতা নিয়ে তিনি বারবার আক্ষেপ করেছেন এবং যেসব মৌলিক প্রশ্ন তুলেছেন যা এখনো তোলা হয়, তার উত্তর আহমদ শফিরা দিতে পারবেন না। এই অভিজ্ঞতা বঙ্গবন্ধুকে শিখিয়েছে আহমদ শফিদের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান শুধু নয় তা খারিজ করতে, আইন করে। অন্যদিকে, একই অভিজ্ঞতা তার কন্যার থাকা সত্ত্বেও তিনি মেনে নিয়েছেন আহমদ শফিদের তত্ত্ব ও কর্তৃত্ব, যা দেশের মানুষকে আবার অদৃষ্টপরায়ণতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অদৃষ্টপরায়ণতা ও উন্নয়ন পরস্পরের বিপরীত। এ সত্য যখন বর্তমান শাসকরা বুঝবেন তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে তারাই প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করছেন।
১৯৬৬ সালের জুনের বন্যায় সারাদেশ খুবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তিনি একদিকে ব্যথিত অন্যদিকে ক্ষুব্ধ অদৃষ্টনির্ভরতা দেখেÑ “এই দেশের হতভাগা লোকগুলি খোদাকে দোষ দিয়ে চুপ করে থাকে। ফসল নষ্ট হয়েছে, বলেÑ আল্লা দেয় নাই, না খেয়ে আছে, বলেÑ কিসমতে নাই। ছেলেমেয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা যায়, বলেÑ সময় হয়ে গেছে বাঁচবে কেমন করে! আল্লা মানুষকে এতো দিয়েও বদনাম নিয়ে চলেছে।” [পৃ. ১১০]
তিনি লিখেছেন, ক্রগ কমিশন বাঁধ দিতে বলেছে তা কার্যকর করলে সমস্যা চুকে যায়। অনেক দেশে তা করেছেও। এবং সেখানে বন্যা রোধ হয়েছে। ক্ষতির পরিমাণ কমে গেছে। “এ কথা কি করে এদের বোঝাব! ডাক্তারের অভাবে, ওষুধের অভাবে, মানুষ অকালে মরে যায়Ñ তবুও বলবে সময় হয়ে গেছে। আল্লা তো অল্প বয়সে মরবার জন্য জন্ম দেয় নাই। শোষক শ্রেণি এদের সমস্ত সম্পদ শোষণ করে নিয়ে এদের পথের ভিখারি করে, না খাওয়াইয়া মারিতেছে। না খেতে খেতে শুকায়ে মরছে, শেষ পর্যন্ত না খাওয়ার ফলে বা অখাদ্য খাওয়ার ফলে কোনো একটি ব্যারাম হয়ে মরছে, বলে কিনা আল্লা ডাক দিয়েছে আর রাখবে কে?” [পৃ. ১১০]
নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করেছেনÑ “কই গ্রেট বৃটেনে তো কেউ না খেয়ে মরতে পারে না। রাশিয়ায় তো বেকার নাই, সেখানে তো কেউ না খেয়ে থাকে না, বা জার্মানি, আমেরিকা, জাপান এই সব দেশে তো কেউ শোনে নাইÑ কলেরা হয়ে কেহ মারা গেছে? কলেরা তো এসব দেশে হয় না। আমার দেশে কলেরায় এত লোক মারা যায় কেন? ওসব দেশে তো মুসলমান নাই বললেই চলে। সেখানে আল্লার নাম লইবার লোক নাই একজনও; সেখানে আল্লার গজব পড়ে না। কলেরা বসন্ত কালা জ্বরও হয় না। আর আমরা রোজ আল্লার পথে আজান দিই, নামাজ পড়ি, আমাদের ওপর গজব আসে কেন? একটা লোক না খেয়ে থাকলে ওই সব দেশের সরকারকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়। আর আমার দেশের হাজার হাজার লাখ লাখ লোক দিনের পর দিন না খেয়ে পড়ে আছে, সরকারের কোনো কর্তব্য আছে বলে মনে হয় না। তাই আমাদের দেশের সরকার বন্যা এলেই বলে ‘আল্লার গজব’।”
এই যে হতভাগা দেশের মানুষÑ এ চিন্তা তাকে একদিকে পীড়িত, অন্যদিকেও উজ্জীবিত করেছে। পীড়িত এ কারণে যে, বাস্তব পৃথিবী সম্পর্কে এদের অজ্ঞতা। উজ্জীবিত এ কারণে যে, এসব মানুষকে মুক্তি দিতে হবে। এসব ভাবনা থেকেই অঙ্কুরিত হয়েছে ‘সোনার বাংলা’ প্রত্যয়টি এবং সাতই মার্চের বক্তৃতায় প্রথম এসেছে মুক্তির কথা, তারপর স্বাধীনতার কথা। ১৯৭২ সালে দেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন, মানুষ শোকাহত শুধু নয় ক্ষুধার্ত। তখন তিনি প্রথমে যে ‘কমিশন’ করলেন তা হলো শিক্ষা কমিশন। কারণ, শিক্ষা সংস্কৃতিই মানুষকে উন্নীত করতে পারে এবং সেটি একমাত্র শিক্ষা কমিশন, যা বলেছিল ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাই যথার্থ শিক্ষা।
আজ এত বছর পর মনে হয়, আমরা ভুলটা কোথায় করছি? ভুলটা হচ্ছে, নিয়তিবাদকে আমরা প্রশ্রয় দিয়েছি। শিক্ষা সংস্কৃতি ছাড়া যে আসলেই মানসিক উন্নয়ন হয় না তার প্রমাণ কয়েক বছর আছে, সাঈদীকে চাঁদে দেখা এবং দাঙ্গা লুটপাট শুরু করা।
বঙ্গবন্ধু বারবার আক্ষেপ করেছেন একদল বাঙালির সব সময় বিশ্বাসঘাতকতার জন্য। লিখেছেন তিনিÑ “বাংলাদেশ শুধু কিছু বেঈমান ও বিশ্বাসঘাতকদের জন্যই সারাজীবন দুঃখভোগ করল।… ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত এই মাটির ছেলেদের ধরিয়ে দিয়ে ফাঁসি দিয়েছে এ দেশের লোকেরাইÑ সামান্য টাকা বা প্রমোশনের জন্য।… জানি না বিশ্বাসঘাতকদের হাত থেকে এই সোনার দেশকে বাঁচানো যাবে কিনা!” [পৃ. ১১২]
না, যাবে না, যায়ওনি। ১৯৭১ সালে এই বাঙালিদের একাংশ যখন লড়ছে, তখন আরেক অংশ পাকিস্তানি সেনাদের নওল কিশোর হিসেবে থেকেছে ও মানুষ হত্যা করেছে। বঙ্গবন্ধু নিজেও বাঁচেন নি। সপরিবারে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এ দেশে এখনো প্রায় ৪০ ভাগ মানুষ পাকিস্তানে বিশ্বাস করে এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এ কারণে, আমার বারবার মনে হয়েছে, আমাদের নিশ্চয়ই জেনেটিক কোনো গ-গোল আছে। না হলে বাংলাদেশ কেন পৃথিবীর একমাত্র দেশ হবে যেখানে স্বাধীনতার পক্ষের এবং বিপক্ষের শক্তির রাজনীতি করার অবাধ অধিকার।
জেলে বসে কিন্তু বঙ্গবন্ধুর বারবার মনে হয়েছে জাতির এই পরস্পর বিরোধিতার কথা। হ্যাঁ, তিনি ক্ষুব্ধ, বারবার তাই এ ধরনের মন্তব্য ফিরে ফিরে এসেছেÑ “জেলের মধ্যে বসে এ কথা চিন্তা করে লাভ কি? যার সারাটা শরীরে ঘা, তার আবার ব্যথা কিসের! গোলামের জাত গোলামি কর। আমি কারাগারে আমার বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ‘আরামেই’ আছি। ভয় নাই। মাহমুদ আলি, জাকির হোসেন, মোনায়েম খান, আবদুস সবুর খান, মহম্মদ আলী এ রকম অনেকেই বাংলার মাটিতে পূর্বেই জন্মেছে, ভবিষ্যতেও জন্মাবে।” [পৃ. ১৬৪]
তাঁর এই ভবিষ্যদ্বাণী অবশ্য সত্য হয়েছে।
কারাগার ভরে উঠেছে ছয়দফার নেতাকর্মীদের নিয়ে। নেতাদের সবাই গ্রেপ্তার হয়েছেন আমেনা বেগম ছাড়া। স্বভাবতই নেতা শেখ মুজিব অস্থির। তিনি জেলারদের অনুরোধ করেন এসব বন্দিদের ন্যায্য সুবিধা দিতে। তারা আশ্বাস দেয়। কিছু করে না। তার অন্তর্দহন বাড়ছে। লিখছেনÑ “কারো সাথে আলাপ করার উপায় নাই। সান্ত¦না দেয়ারও কেউ নাই। কারাগারের ভিতর একাকী রাখার মতো নিষ্ঠুরতা আর কী হতে পারে? অন্যান্য রাজবন্দিরা বিভিন্ন জায়গায় এক সাথে যাবে, কিন্তু আমাকে কারো কাছে দেয়া চলবে না। সরকারের হুকুম।… আমাদের দলের আর যাদের গ্রেপ্তার করে এনেছে তাদের সবচেয়ে খারাপ সেলে রাখা হয়েছে। এদের খাবার কষ্টও দিচ্ছে। মাত্র দেড় টাকার মধ্যে খেতে হবে।” [পৃ. ৭৮]
“আমি বই নিয়ে বসে পড়লাম। মনে করবেন না বই নিয়ে বসলেই লেখাপড়া করি। মাঝে মাঝে বইয়ের দিকে চেয়ে নাকি সত্য, মনে হবে কত মনোযোগ সহকারে পড়ছি। বোধহয় সেই মুহূর্তে আমার মন কোথাও কোনো অজানা অচেনা দেশে চলে গিয়েছে। নতুবা কোনো আপনজনের কথা মনে পড়েছে। নতুবা যার সাথে মনের মিল আছে, একজন আর একজনকে পছন্দ করি, তবুও দূরে থাকতে হয়, তার কথাও চিন্তা করে চলেছি। হয়তোবা দেশের অবস্থা, রাজনীতির অবস্থা, সহকর্মীদের উপর নির্যাতনের কাহিনী নিয়ে ভাবতে ভাবতে চক্ষু দুটি আপনা আপনি বন্ধ হয়ে আসছে।” [পৃ. ১০৭]
যেমন চিত্তরঞ্জন সুতারের কথা ধরা যাক। বরিশাল জেলে ছিলেন, এখন ঢাকা জেলে। মিলিটারি কনফাইনমেন্ট। বঙ্গবন্ধু লিখছেনÑ “বরিশাল জেলে ছিলেন। মাসে অন্তত পক্ষে স্ত্রী ছেলের সাথে দেখা হতো। তা আর হবে না। কষ্ট দেও যত পার। আমাদের আপত্তি নাই। আমরা নীরবে সবই সহ্য করব ভবিষ্যৎ বংশধরদের আজাদীর জন্য। আমাদের যৌবনের উন্মাদনার দিনগুলি তো কারাগারেই কাটিয়ে দিলাম।” [পৃ. ১০৬]
ন্যাপ কর্মী আবদুল হালিমকে জেল হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। বিকেলে হাঁটছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাই হালিমকে দেখতে পেলেন। “আমি এগিয়ে যেয়ে ওর মাথায় হাত দিলাম, খুবই জ্বর। বললাম, “হালিম তুমি যে দলই কর পূর্ব পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তোমার দান আছে। ১৯৪৯ সালে তুমি আমার সাথে আওয়ামী লীগ করেছ, অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছ, তোমার যদি কোনো জিনিসের প্রয়োজন হয় খবর দিও। লজ্জা করো না। তোমার ত্যাগকে আমি শ্রদ্ধা করি।” [পৃ. ১৪৪]
রণেশ মৈত্রের সঙ্গে দেখা। তার কুশল জিজ্ঞেস করতে বললেন, “কি আর খবর না খেয়েই [সন্তান-স্ত্রী] বোধহয় মারা যাবে। স্ত্রী ম্যাট্রিক পাস। কাজকর্ম কিছু একটা পেলে বাঁচতে পারত; কিন্তু উপায় কি! একে তো হিন্দু হয়ে জন্মগ্রহণ করেছি, তারপর রাজবন্দি, কাজ কেউই দিবে না। একটা বাচ্চা আছে। বন্ধু-বান্ধব সাহায্য করে কিছু কিছু, তাতেই চালাইয়া নিতে হয়। গ্রামের বাড়িতে থাকার উপায় নাই। মৈত্র কথাগুলো হাসতে হাসতে বলছেন। মনে হলো তার মুখ দেখে এ হাসি বড় দুঃখের হাসি।” [পৃ. ১৫৭]
রণেশ মৈত্রের সঙ্গে আবার দেখা হয়েছিল সেদিনই তিনি বলেছিলেন, “পাবনা যাবেন বোধ হয়। বন্ধু মোশতাককে পাবনায় জেলে নেয়া হয়েছিল। বোধ হয় সেখানেই আছে, কেমন আছে জানি না। তাকে খবর দিতে বলবেন।” [ঐ]
আরো একজনকে বলেছিলেন, ‘বন্ধু’ মোশতাকের খবর নিতে। অনেক বিষয়ে যার এত স্বচ্ছ দৃষ্টি, মোশতাকের বেলায়ই তার দৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল অস্বচ্ছ যার দাম তাকে প্রাণ দিয়ে দিতে হয়েছে।
এত কিছুর পরও তিনি প্রকৃতি উপভোগ করেন। তার বর্ণনাও রাখেন। এ গদ্য মনে হবে কবিতাÑ “দুপুরের দিকে সূর্য মেঘের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারতে শুরু করেছে। রৌদ্র একটু উপরে উঠবে বলে মনে হয়। বৃষ্টি আর ভাল লাগছে না। একটা উপকার হয়েছে আমার দুর্বার বাগানটার। ছোট মাঠটা সবুজ হয়ে উঠছে। সবুজ ঘাসগুলো বাগানের তালে তালে নাচতে থাকে। চমৎকার লাগে, যেই আসে আমার বাগানের দিকে একবার না তাকিয়ে পারে না। বাজে গাছগুলো আমি নিজেই তুলে ফেলি। আগাছাগুলিকে আমার বড় ভয়, এগুলো না তুললে গাছগুলি ধ্বংস হয়ে যাবে। যেমন আমাদের দেশের পরগাছা রাজনীতিবিদ যারা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক তাদের ধ্বংস করে, এবং করতে চেষ্টা করে। তাই পরগাছাকে আমার বড় ভয়। আমি লেগেই থাকি। কুলাতে না পারলে আরো কয়েকজনকে ডেকে আনি।” [পৃ. ১১৭]
মোরগ-মুরগি আর মুরগির বাচ্চাগুলো খেলা করে। ছোট কবুতরের বাচ্চাটাও ওদের সঙ্গে থাকে। কাক এলে মোরগ কাককে ধাওয়া করে আর এসব দেখে তার মনে হয়Ñ “এক সাথে থাকতে থাকতে একটা মহব্বত হয়ে গেছে। কিন্তু মানুষ অনেক সময় বন্ধুদের সাথে বেঈমানী করে। পশু কখনো বেঈমানী করে না। তাই মাঝে মাঝে মনে হয় পশুরাও বোধহয় মানুষের চেয়ে একদিক থেকে শ্রেষ্ঠ।” [পৃ. ১১৮]
মীর্জা নুরুল হুদা মন্ত্রী। তিনি এক ভাষণে ছয়দফার বিরুদ্ধে বলেছেন। বঙ্গবন্ধুর মন্তব্য : “মন্ত্রিত্বের লোভে ভদ্রলোক এত নিচে নেমে গিয়েছেন যে একটা দলের বা লোকের দেশপ্রেমের উপর কটাক্ষবোধ করতেও দ্বিধা করলেন না।” [পৃ. ১২২]
যেসব আমলারা সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার করছে তাদের সম্পর্কে মন্তব্য, “আমাদের দেশের এই শিক্ষিত চাকরিজীবীদের মধ্যে কিছু সংখ্যক লোক আছে পদোন্নতির জন্য তারা কত যে সংসার ধ্বংস করেছে তার কি কোনো সীমা আছে?” [পৃ. ১২৭]
এ কথা যে এখনো কত সত্য তা কে না জানে।
বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন বারবার ঘুরে-ফিরে এসেছে আমলা এবং জেল কর্মচারীদের জুলুম, সরকারের নির্যাতন প্রভৃতি। তাঁর এই অভিজ্ঞতার নির্যাস ৭ মার্চের বক্তৃতায় খুঁজে পাওয়া যায়। ওই বক্তৃতার পটভূমি ছিল ২৫ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনের অভিজ্ঞতা।
বাঙালির প্রতি তিনি অনেক ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ১৯৭৫ সালেও করেছেন। আবার ক্ষণে ক্ষণে বাঙালির প্রতি মমত্ববোধেও আচ্ছন্ন হয়ে গেছেন। যে কারণে তিনি বলেছিলেন ১৯৭২ সালে, যেÑ আমার দুর্বলতা আমি বাঙালি ও দেশকে ভালোবাসি।
জেলের অত্যাচারে ত্যক্ত হয়ে লিখেছেনÑ “কি নিষ্ঠুর এই দুনিয়া! এরাই তো আমাদের ভাই, চাচা, প্রতিবেশী। পূর্ব পাকিস্তানের অধিকার আদায় হলে এদের বংশধররা সুযোগ-সুবিধা পাবে। এদেরকে বাদ দিয়ে তো কেউ অধিকার ভোগ করবে না। যারা মৃত্যুবরণ করল আর যারা পঙ্গু হয়ে কারাগারে এসেছে, জীবনভর কষ্ট করবে আমাদের সকলের জন্যই। কেন এই অত্যাচার? কেনইবা এই জুলুম।” [পৃ. ১৫২]
এ প্রশ্ন আমরা নিজেদেরও করি। ১৯৫২ সাল থেকে পর্যন্ত কতো মানুষ, গণতান্ত্রিক অধিকার ও বাংলাদেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন। নতুন সমাজ ব্যবস্থা নির্মাণের আশায় কতোজন বছরের পর বছর জেল খেটেছেন, পঙ্গু হয়ে গেছেন পুলিশি হামলায়। কতো সংসার ধ্বংস হয়ে গেছে। আমরা আমাদের ইতিহাসের বিবরণে এদের কথা তেমনভাবে তুলে ধরি না। যে কারণে ইতিহাসটা আর সাধারণ মানুষের থাকে না।
আমরা যখন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নে, মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারের জন্য দীর্ঘ আন্দোলন করেছি তখন এদের কথাই মনে রেখেছি এবং সাহস পেয়েছি। বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছিল গরিবরা। আর বঙ্গবন্ধু গরিবদের কথা সব সময় বলে এসেছেন। মনে রেখেছেন, ১৯৭৫ পর্যন্ত তাঁর বক্তৃতাগুলি পর্যালোচনা করুন, দেখবেন, সাধারণের অধিকারের কথাই বারবার এসেছে। এবং গরিবদের প্রতি অত্যাচার মাঝে মাঝে তাকে ক্রোধান্বিত করে তুলছে। ৮ জুলাই লিখেছেনÑ “মনকে শক্ত করতে আমার কিছু সময় লাগল। ভাবলাম সব সময় ক্ষমা করা উচিত না। ক্ষমা মহত্তের লক্ষণ, কিন্তু জালেমকে ক্ষমা করা দুর্বলতারই লক্ষণ।” [পৃ. ১৫২]
এ কথা তিনি বলছেন বটে। কিন্তু সারাজীবন ক্ষমাই করে এসেছেন। কেননা, তার আবার এও মনে হয়েছে, ক্ষমা মহত্তের লক্ষণ। ‘জালেম’দের প্রতি শৈথিল্য পরে অনেক সমস্যার সৃষ্টি করেছে। কিন্তু তার বুক এত বিশাল যে, দরদ ছাড়া অন্যকিছু ছিল গৌণ। তাঁর পরম শত্রুও স্বীকার করেছেন, তাঁর মতো উদার রাজনীতিবিদ বাংলাদেশে খুব কমই জন্মেছেন।
এরি মধ্যে ইন্দোনেশিয়ায় সুকর্নো ক্ষমতাহীন হয়েছেন। এর কিছুদিন পরই আবির্ভাব হবে সুহার্তোর। ইন্দোনেশিয়া তখন প্রায়ই খবরের বিষয়। এ কারণে, ইন্দোনেশিয়ার রাজনৈতিক ঘটনাবলি তার দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। লিখেছেন ৬ জুলাইÑ “ইন্দোনেশিয়ার পিপলস কংগ্রেস আজ সুকর্নোকে আজীবন প্রেসিডেন্টের পদ হইতে অপসারিত করিয়েছে। তবে তিনি আগামী সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই অন্যতম বিশাল রাষ্ট্রে আজ কমিউনিজম, লেনিনবাদ ও মার্ককবাদের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করিয়েছে। কমিউনিস্ট পার্টি ও চীনের বাড়াবাড়ির জন্যই আজ ইন্দোনেশিয়া এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হইয়াছে। বাড়াবাড়ি করে ক্ষমতা দখল করতে যেয়েই এই অঘটন ঘটল, লাখ লাখ কম্যুনিষ্ট কর্মীদের জীবন দিতে হলো।… দুনিয়ার ডিকটেটরদের চোখ খুলে যাওয়া উচিত।…” [পৃ. ১৪৯]
এরপর সুহার্তো ক্ষমতা দখল করে সিআইয়ের সাহায্যে ইন্দোনেশিয়ায় গণহত্যা চালায়। বঙ্গবন্ধুর তখন সুহার্তোও যে ডিকটেটর হয়ে উঠবেন তা মনে হয়নি। কারণ, সবকিছুই তিনি আইয়ুব খানের শাসনের পরিপ্রেক্ষিতে দেখেছেন। কিন্তু সুহার্তোর গণহত্যা পরবর্তীকালে নিশ্চয় তার মনে রেখাপাত করে এসেছে। হয়ত এ কারণেই তিনি বাংলাদেশে কম্যুনিষ্ট পার্টি ও ন্যাপের ঐক্য করে দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা আনতে চেয়েছিলেন।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আরও কিছু পর্যবেক্ষণ আছে। ১৩ জুলাই লিখেছেনÑ “একই সমাধান একই সমাধান, গুলি করা। ভারতবর্ষে বিক্ষোভকারীদের উপর গুলি চালাইয়া আটজনকে হত্যা করেছে। কয়েকশত লোক গ্রেপ্তার হয়েছে। জনসাধারণ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে বামপন্থী দলগুলির ডাকে প্রতিবাদ দিবস পালন করতে যেয়ে গুলি খেয়ে জীবন দিল। শত শত কর্মী গ্রেপ্তার হলো। কংগ্রেস নেতারা সারাজীবন জেল খেটেছিলেন। গুলির আঘাত নিজেরাও সহ্য করেছেন। আজ স্বাধীনতা পাওয়ার পরে তারা আবার জনগণের উপর গুলিবর্ষণ করতে একটুও কার্পণ্য করেন না। আমরা দুইটা রাষ্ট্র পাশাপাশি। অত্যাচার আর গুলি করতে কেহ কাহারাও চেয়ে কম নয়।” [পৃ. ১৫৯]
বঙ্গবন্ধু সরকারও কিন্তু একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন। ১৯৭২ সালে ছাত্র ইউনিয়ন ভিয়েতনামের পক্ষে মার্কিনবিরোধী এক মিছিল করেছিল। সেই শান্তিপূর্ণ মিছিলেও গুলি চলে। দুইজন তরুণ নিহত হন। কদম ফোয়ারায় তাদের উদ্দেশ্যে একটি স্মৃতিফলকও লাগানো হয়েছিল। আজ সেই স্মৃতিফলকও নেই। এটি এক ধরনের বৃত্ত। ক্ষমতায় না থাকার সময় অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে গুলি। আবার রাস্তায় থেকে ক্ষমতায় গেলে, তখনও অন্যায় নীতির কারণে মিছিল হলে তাতে গুলি। এদিক থেকে অবশ্য শেখ হাসিনার সরকার যথেষ্ট সংযম দেখিয়েছেন। জানি না এই বৃত্ত শেখ হাসিনার পক্ষে ভাঙা সম্ভব হবে কি না। যদি হয় তাহলে গণতন্ত্রের ভিত্তি দৃঢ় হবে এবং তিনিও স্মরিত হবেন। [চলবে]

Category:

কোটাবিরোধী আন্দোলন ও ছাত্রলীগ

Posted on by 0 comment

28স্বদেশ রায়: কোটাবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্বে যে শিবির ও ছাত্রদল ছিল আর তাদের পেছনে ছিল বিএনপি-জামাতÑ এ নিয়ে এখন আর কারও কোনো সন্দেহ নেই। এ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ছিল সাধারণ ছাত্রদের প্রতারণা করে সরকার উচ্ছেদের আন্দোলন করা, একটি সহিংসতার মধ্য দিয়ে আইন বহির্ভূতভাবে খালেদাকে জেল থেকে বের করাÑ আর এ নিয়েও এখন যদি কেউ প্রশ্ন তোলে তাহলে ধরে নিতে হবে তিনি জামাত-বিএনপির পক্ষ হয়ে কাজ করছেন। তবে আন্দোলনের ভেতর দিয়ে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের যে লাভটি হয়েছে তারা ক্ষমতায় আসার ৯ বছর পরে তাদের ছাত্র সংগঠনের প্রকৃত রূপটি চিনতে পেরেছে। এমন কি ইচ্ছে করলে বাসদ ও কমিউনিস্ট পার্টিও তাদের ছাত্র সংগঠনের প্রকৃতরূপ এই আন্দোলনের ভেতর দিয়ে চিনতে পারে। বাস্তবে এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে এসেছে, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্র ফ্রন্টের মধ্যে গত ৯ বছরে শিবিরের অনুপ্রবেশ ঘটেছে সীমাহীনভাবে। এখানে জামায়াতে ইসলামী নীতি অনুসরণ করেছে কমিউনিস্ট পার্টির। কমিউনিস্ট পার্টি যেমন অবিভক্ত ভারতে কংগ্রসের মধ্যে, মুসলিম লীগের মধ্যে ঢুকে তাদের কাজ করার নীতি অনুসরণ করত, জামায়াতে ইসলামী এখন ঠিক সেই কাজটি করছে। বাস্তবে নীতি বা উদ্দেশ্যের পার্থক্য থাকলেও কমিউনিস্ট পার্টি ও ধর্মীয় মৌলবাদীদের কর্মপন্থা একই রকম। তাই জামাত যত সহজ ও সুন্দরভাবে কমিউনিস্ট পার্টির নীতি ও কৌশল অনুসরণ করতে পারবে, এবং করে লাভবান হবে কোনো মাস পিপলের পার্টি অর্থাৎ আওয়ামী লীগ, কংগ্রেস এদের পক্ষে সেটা সম্ভব নয়।
যে কোনো পার্টির ভেতর অন্য একটি পার্টির আদর্শের বা লক্ষ্যের লোকজন উদ্দেশ্যমূলকভাবে ঢোকা সব সময়ই খারাপ। আওয়ামী লীগ সৃষ্টির পরপরই যখন কমিউনিস্ট পার্টির লোকজন খুব বেশি আওয়ামী লীগে প্রবেশ করতে থাকে, সে সময়ে বঙ্গবন্ধুর নেতা, আওয়ামী লীগের নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কিন্তু অত্যন্ত সচেতন ছিলেন এ বিষয়ে। এম আর আখতার মুকুল প্রায় বলতেন, ১৯৫৪-র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের সময় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী প্রায়ই বঙ্গবন্ধুকে (তৎকালীন তরুণ নেতা শেখ মুজিব) বলতেন, মুজিব দেখ বেশি লাল মিয়ারা যেন আমাদের দলের হয়ে মনোনয়ন না পায়। তাছাড়া তিনি দু-একজনকে চিহ্নিত করে, তাদের সঙ্গে রসিকতার ছলে বলতেন, তোমাদের মতো আর কত লাল মিয়া আমাদের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। সেদিন এই লাল মিয়ারা বেশি পরিমাণে আওয়ামী লীগে ঢুকে পড়ার কারণেই কিন্তু ১৯৫৭ সালে আওয়ামী লীগ ভাঙেÑ আর ন্যাশনাল আওয়ামী লীগ (ন্যাপ)-এর জন্ম হয়।
আজ অবশ্য ছাত্রলীগে বা আওয়ামী লীগে জামাত-শিবির অনুপ্রবেশ করে ১৯৫৭-এর মতো আওয়ামী লীগকে দ্বিখ-িত বা ১৯৭২-এর মতো ছাত্রলীগকে দ্বিখ-িত, ১৯৮৪-র মতো আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে গিয়ে বাকশাল করার মতো শক্তি তৈরি করার কোনো উপায় নেই। কারণ, এখন শেখ হাসিনার বলয় থেকে বেরিয়ে যে কোনো কিছু করা সম্ভব নয় এটা গোপন শত্রুরাও বোঝে। তাই এই ২০১৮-তে তাদের নীতি হলো আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগে প্রবেশ করে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের প্রাণশক্তিকে নষ্ট করে দেও। ছাত্রলীগের প্রাণশক্তি যে তারা অনেকখানি নষ্ট করতে পেরেছে তা বোঝা গেল এই কোটাবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রলীগের অসহায়ত্ত দেখে। তবে একদিক থেকে এটা ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশের আশা-ভরসার কেন্দ্রস্থল শেখ হাসিনার জন্য ভালো হয়েছে। কারণ, শেখ হাসিনা প্রকৃত সত্যটি জানতে পারলেন যে তার ছাত্রলীগের ভেতর কতটা ঘুণপোকা ধরেছে। তিনি এখন নিঃসন্দেহে এর থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে বের করতে পারবেন।
প্রথমত; এই কোটাবিরোধী আন্দোলনের পরে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, ছাত্রলীগ যাদের দ্বারা দেখভাল করা হয়েছে, ও ছাত্রলীগের যে নেতৃত্ব আছে তারা শতভাগ যোগ্য নন। কেন তারা যোগ্য নন, এ বিষয়টির কারণ খুঁজতে হবে ব্যর্থতার মধ্যে। এখানে ছাত্রলীগের এবং ছাত্রলীগকে দেখভাল করেছে তাদের সব থেকে বড় ব্যর্থতা, ভার্চুয়াল জগৎ দিয়ে বা সোশ্যাল মাধ্যমে যে এত গুজব ছড়ানো হচ্ছে আর সাধারণ ছাত্রদের প্রতারণা করে একত্রিত করা হচ্ছেÑ এর কাউন্টার কিছু ভার্চুয়াল জগৎ দিয়ে বা সোশ্যাল মাধ্যমে ছাত্রলীগ প্রতিরোধ করতে পারেনিÑ এই কোটাবিরোধী আন্দোলনের সময়। অন্যদিকে যারা ছাত্রলীগকে নিয়ন্ত্রণ করে তারাও এ কাজে ছাত্রলীগকে নিয়োজিত করতে পারেনি। উভয়কে এখানে অসহায় দেখা গেছে। তাছাড়া উভয়ই উপলব্ধি করতে পারেনি, সোশ্যাল ফোরাম কতটা শক্তিশালী। অথচ সহজে তাদের বোঝা উচিত ছিল এর আগে এই সোশ্যাল ফোরামের মাধ্যমে পজিটিভ আন্দোলন গণজাগরণ মঞ্চ হয়েছে আবার নেগেটিভ আন্দোলন মাহমুদুর রহমানের ও বিএনপি-জামাতের তত্ত্বাবধায়নে হেফাজতের আন্দোলন হয়েছে। এর থেকে বোঝা যায়, ইতিহাস থেকে যে শিক্ষা নিতে হয় সেটা ছাত্রলীগ নেতৃত্ব ও ছাত্রলীগকে যারা দেখভাল করে তারা কেউই নেয়নি। না হয় তারা এই ভার্চুয়াল জগতের শক্তি উপলব্ধি করতে অক্ষম। তাই এবারের কাউন্সিলের পরে আগামীতে যে ছাত্রলীগ হবে সেই ছাত্রলীগের নেতৃত্বকে অন্তত এতটুকু যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হবে, তারা যেন বর্তমানের এই সোশ্যাল মাধ্যমের ক্ষমতা বোঝে। তারা যেন খোঁজখবর রাখে, কীভাবে এই সোশ্যাল মাধ্যম ট্রাম্পের নির্বাচনে কাজ করেছে, ব্রেক্সিটে কাজ করেছে। আর ছাত্রলীগের যে অবশ্যই একটি সোশ্যাল মাধ্যম শক্তি বা ইউনিট সারাদেশে গড়ে তুলতে হবেÑ এটা যেন নেতৃত্বের মাথায় থাকে। অন্যদিকে ছাত্রলীগের দেখভালের দায়িত্ব এখন নতুন প্রজন্মের হাতে দিতে হবে, যারা বর্তমানের এই প্রযুক্তির বিশ্বের ক্ষমতা অ্যানালিসিস করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যোগ্যতা রাখেন। কারণ, ডিজিটাল বাংলাদেশ হওয়াতে এখন স্মার্ট ফোনের এক একটি জেনারেশনের সঙ্গে সঙ্গে তরুণদের এক একটি জেনারেশন বদলে যাচ্ছে। এই বদলকে ধরতে হবে। এ বদল ধরতে না পারলে সময়ের কাছে হেরে যাওয়া ছাড়া কোনো পথ খোলা নেই।
এরপরে যে কঠোরতা দরকার তা হলো ছাত্রলীগে অনুপ্রবেশকারী ঠেকানো। এই অনুপ্রবেশকারী ঠেকানোর প্রশ্ন আজ কেন আসছে? কেন অনুপ্রবেশ করার সুযোগ পেল? ২০০৯-এ ক্ষমতায় আসার পরেই শেখ হাসিনা দৃঢ়ভাবে বলেছিলেন, আমাদের যথেষ্ট লোক আছে, আমাদের অন্য দলের কাউকে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বাস্তবে আওয়ামী লীগের ছাত্রলীগের নেতৃত্ব বেছে বের করা এখন খুবই সহজ। কারণ, এখন চার প্রজন্মের, পাঁচ প্রজন্মের আওয়ামী লীগ পরিবার দেশে দাঁড়িয়ে গেছে, মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবার আছে। তাই ছাত্রলীগের নেতৃত্ব খোঁজার জন্য আওয়ামী লীগকে বাইরে যাবার কোনো দরকার নেই। এখন যেটা দরকার, একঝাঁক শিক্ষিত ও নিবেদিত নেতৃত্ব খুঁজে বের করা। এখানে কেউ যেন কারও কোটারি তৈরি না করে। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর থেকে দেখে এসেছি, ছাত্রলীগের সব থেকে বড় শত্রু আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতার কোটারি। ছাত্রলীগের মূল নেতা শেখ হাসিনা, তার বাইরে তাদের কোনো নেতা নেইÑ তার বাইরে আছে শুধু ছাত্রলীগ। যে সকল তরুণের বুকে দৃঢ়ভাবে আছে ছাত্রলীগ তাদেরই নেতৃত্বে আনার শিক্ষা এই কোটাবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ নিশ্চয়ই পেয়েছে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ হলো, তাদের ছাত্রলীগকে মিডিয়া সব সময়ই নেগেটিভভাবে চিহ্নিত করে। ছাত্রলীগের ছেলেদের সময়ই কম মেধাবী, গু-া এমনি ধরনের নানান অভিধায় চিহ্নিত করা হয়। ছাত্রদলের সভাপতি ছিল পিন্টু, চিহ্নিত গু-া, অশিক্ষিত। বাংলাদেশের মিডিয়ার তা নিয়ে কোনো রা ছিল না। শিবিরের কত নেতা কত ছেলের রগ কেটেছে তা নিয়ে আজও বাংলাদেশের কোনো মিডিয়ায় কোনো রিপোর্ট হয়নি। অথচ শিবির তাড়াতে গিয়ে, বিএনপির সন্ত্রাস ঠেকাতে গিয়ে যেসব মামলা হয়েছে ছাত্রলীগ নেতাদের নামে তাদের ওই সব মামলার হিসাব দিয়ে মিডিয়ায় চিহ্নিত করা হয়, এরা এতগুলো মামলার আসামি। ছাত্রলীগ নিয়ে সাগর পাড়ি দিতে আওয়ামী লীগকে কেন যে এই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময় সর্বদা পার হতে হয় এ এক বড় রহস্য। তবে এ রহস্যের মূল অত্যন্ত সোজা। এর কারণ, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর সামরিক শাসনের বেনিফিসিয়ারি, এমনকি যারা বিভিন্ন সময় আওয়ামী লীগ ভাঙার পরে ওই সব দলে গেছে তারাই মিডিয়ার নানান স্থানে। অন্যদিকে পাকিস্তান আমল থেকে তথাকথিত সুশীল সমাজ আওয়ামী-বিরোধী, এর একমাত্র কারণ এই সুশীল সমাজ মূলত রক্ষণশীল অর্থাৎ কট্টর মুসলিম লীগ ও সামরিক শাসনের দাস। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ মূলত সৃষ্টি হয় মুসলিম লীগের উদারনৈতিক অংশের সমন্বয়ে। যে কারণে আজ যেমন এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবী ছাত্রলীগকে গু-া হিসেবে চিহ্নিত করে, ছাত্রলীগার মানেই অশিক্ষিত, খারাপ ছাত্র হিসেবে চিহ্নিত করে। পাকিস্তান আমলে বদরুদ্দীন ওমরের মতো বহু তথাকথিত বাম ও ছদ্মবেশী ডানরা তৎকালীন আওয়ামী লীগকে গু-াদের পার্টি হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করত। মূলত অগণতান্ত্রিক শক্তির হাতকে শক্তিশালী করার জন্য। এমনকি তারা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর মেধা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। আজ বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’ বের হওয়ার পরে তাদের অনেক চেলা চামু-াদের মুখে বঙ্গবন্ধুর মেধার প্রশংসা শুনি। অথচ সেদিনও ভেবে দেখা হয়নি এই ভূখ-ে একমাত্র নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যিনি, সব সময়ে ভবিষ্যৎ ভেবে সিদ্ধান্ত নিতেন এবং তার সিদ্ধান্তে তিনি মৃত্যুকে স্বীকার করেও অটল থাকতেন। একমাত্র সর্বোচ্চ প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি ছাড়া এটা সম্ভব হয় না। তাই আজও অনেকের স্বীকার করতে দ্বিধা হয়, তবে ভবিষ্যতের ইতিহাস বলবে, এই ভূখ-ে বঙ্গবন্ধুর জীবদশ্মায় যত রাজনীতিক ছিলেন কেউই রাজনৈতিক ধীশক্তিতে তার ধারে কাছে ছিলেন না। অথচ এর বদলে তখন মিডিয়া বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগকে ভিন্নভাবে চিহ্নিত করত।
আগামীতে যারা ছাত্রলীগের নেতা হবে, তাদের মাথায় রাখতে হবে মিডিয়ার সহযোগিতা তারা খুব বেশি পাবে না। তাদের তাই বঙ্গবন্ধুর মতো লক্ষ্যে স্থির থেকে দৃঢ়চিত্ত নিয়ে কাজ করতে হবে। আর পাশাপাশি সোশ্যাল মাধ্যমের টিমকে সর্বোচ্চ শক্তিশালী করতে হবে। অন্য আরেকটি হীনমন্যতা থেকে তাদের বের হয়ে আসতে হবে। মিডিয়া ছাড়াও সারাক্ষণ নানানভাবে প্রচার করা হয় ছাত্রশিবিরের ছেলেমেয়েরা মেধাবী ও সৎ। মোটেই তা নয়। ছাত্রলীগের ছেলেমেয়েরা তাদের থেকে অনেক মেধাসম্পন্ন, কারণ তারা উদার চিন্তার ধারক-বাহক। শুধু তাদের দিন ও রাতের ভেতর একটা সময় বের করে পড়াশোনা করতে হবে। অন্যদিকে শিবিরকে সৎ ভাবার কোনো কারণ নেই, কারণ তারা রাজাকারের সন্তান। একজন খুনি ও ধর্ষকের ছেলে কখনও সৎ হতে পারে না। মূলত তাদের অপরাধকে ঢেকে দেওয়ার জন্য এক শ্রেণির লোক তাদের পক্ষ হয়ে এই প্রচার করে। শুধু তাই নয় তাদের চোখ-কান খোলা রেখে সবকিছু বুঝতে হবে। যেমন গণজাগরণ মঞ্চের সময় মতিউর রহমান নিজে উদ্যোগ নিয়ে হাসনাত আবদুল হাইকে দিয়ে লাকির চরিত্র হনন হয় এমন গল্প লিখিয়ে তার পত্রিকায় ছেপেছিলেন আর এ মুহূর্তে দুজন ছাত্রীকে রাত ১১টার পরে তাদের গার্জেনের কাছে দেওয়া হলে তার প্রতিবাদে চৈনিক কমিউনিস্ট সৈয়দ আবুল মুকসুদ বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে বলে এই প্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নারী নির্যাতন হয়েছে। তাই এসব ভ-দের চিনেই ছাত্রলীগকে ভবিষ্যতের রাজনীতি করতে হবে।

Category:

কমনওয়েলথ

Posted on by 0 comment

5-7-2018 7-06-57 PMএকদা বিশ্বের সর্ববৃহৎ ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের অধিকারী ছিল যুক্তরাজ্য। এক কথায় যাকে আমরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য হিসেবে আখ্যায়িত করি। পৃথিবীর সকল মহাদেশেই ব্রিটিশ উপনিবেশ ছড়িয়ে ছিল। বলা হতো ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে সূর্য অস্ত যায় না।’ তবে কালক্রমে সাম্রাজ্য সংকোচিত হতে থাকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে কয়েকটি উপনিবেশ ডোমিনিয়ন মর্যাদা লাভ করে। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং নিউজিল্যান্ড প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটেনের অধীনস্ত ডোমিনিয়ন হিসেবে ব্রিটেনের পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। ১৯২৬ সালের ১৮ নভেম্বর বেলফোর ঘোষণার মাধ্যমে ব্রিটিশ কমনওয়েলথ অব নেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন থেকেই এই দেশগুলো ব্রিটিশ কমনওয়েলথ নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৯৩১ সালে ওয়েস্ট মিনস্টার ‘সংবিধি’ দ্বারা এই ডোমিনিয়নগুলো স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের মর্যাদা লাভ করে।
কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাজ্যকে সমর্থন জানায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব পরিস্থিতি বদলে যায়। দ্রুতই ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। পরাধীন দেশগুলো একের পর এক স্বাধীনতা অর্জন করে। সর্ববৃহৎ ব্রিটিশ উপনিবেশ ভারত ১৯৪৭ সালে ভারত ও পাকিস্তান নামে স্বাধীনতা অর্জন করে। একে একে স্বাধীন দেশ হিসেবে আবির্ভূত হয় বার্মা (মিয়ানমার), শ্রীলংকা, মালয়, সিঙ্গাপুর, ফিজি, নামিবিয়া, গ্রানাডা, গায়েনা, নাইজেরিয়া প্রভৃতি দেশ। ১৯৪৯ সালের ২৮ এপ্রিল ‘ব্রিটিশ’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘কমনওয়েলথ অব নেশনস’ নামে আনুষ্ঠানিকভাবে বর্তমান কমনওয়েলথ জোট আত্মপ্রকাশ করে।
ইংল্যান্ডের রানি কমনওয়েলথের প্রধান হিসেবে সর্বজন মান্য। ৫৩ সদস্য বিশিষ্ট কমনওয়েলথের ১৬টি দেশ যুক্তরাজ্যের রানিকে তাদের দেশের সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে গ্রহণ করেছে।
বিশ্বের বর্তমান জনসংখ্যা ৭৪০ কোটি। আর কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর মোট জনসংখ্যা এর এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ২৪০ কোটি। অন্যদিকে বিশ্বের চার ভাগের এক ভাগ জায়গা কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর অন্তর্ভুক্ত। সাধারণভাবে সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশগুলোকে নিয়েই কমনওয়েলথ গঠিত। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মিয়ানমার এক সময়ের ব্রিটিশ উপনিবেশ হলেও তারা কমনওয়েলথের সদস্য নয়। পক্ষান্তরে ব্রিটিশ উপনিবেশ না হওয়া সত্ত্বেও ১৯৯৫ সালে মোজাম্বিক এবং ২০০৯ সালে রোয়ান্ডা, এ দুটি আফ্রিকান দেশ কমনওয়েলথের সদস্যপদ গ্রহণ করে।
কমনওয়েলথের ইতিহাসে অনেক দেশ একবার সদস্যপদ নিয়েছে, পরে বেরিয়ে গেছে বা সদস্যপদ বাতিল করা হয়েছে। কয়েক বছর পর আবার সদস্যপদে ফিরেও এসেছে। ১৯৭২ সালের ১৮ এপ্রিল বাংলাদেশ কমনওয়েলথের সদস্যপদ লাভ করায় পাকিস্তান কমনওয়েলথ ত্যাগ করে। পরে ফিরে আসে। পাকিস্তানে ১৯৯৯ সালে সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার কারণে কমনওয়েলথ তার সদস্যপদ খারিজ করে দেয়। পরে অবশ্য সদস্যপদ ফিরে পায়। ১৯৬১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসকগোষ্ঠীর নীতির কারণে কমনওয়েলথ থেকে বেরিয়ে যায়। তবে ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর তারা আবার কমনওয়েলথে ফিরে আসে। ২০০৩ সালে রবার্ট মুগাবের নির্বাচনী কারচুপির সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে কমনওয়েলথ থেকে বেরিয়ে যায়। সর্বশেষ কমনওয়েলথ ত্যাগ করে গাম্বিয়া।
১৯৬৫ সালে কমনওয়েলথের একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। কমনওয়েলথের সদর দফতর লন্ডনের মার্লবোরো হাউসে অবস্থিত। প্রতি দু-বছর অন্তর কমনওয়েলথের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। কমনওয়েলথ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, পরিবেশসহ পারস্পরিক সহযোগিতার ১০টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করেছে। কমনওয়েলথ সকল সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করা হয়। প্রতিবছর মার্চ মাসের দ্বিতীয় সোমবার কমনওয়েলথ দিবস পালিত হয়।
কমনওয়েলথের ৫৩টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে এশিয়ায় ৮টি, আফ্রিকায় ১৮টি, ইউরোপে ৩টি, উত্তর আমেরিকায় ১২টি, দক্ষিণ আমেরিকায় ১টি এবং ওশেনিয়ায় অস্ট্রেলিয়াসহ ১১টি সদস্য রাষ্ট্র রয়েছে। এর মধ্যে আয়তনের দিক থেকে সর্ববৃহৎ রাষ্ট্র কানাডা এবং সবচেয়ে ছোট দেশ নাউরু। জনসংখ্যার দিক থেকে ভারত সর্ববৃহৎ। একা ভারতের জনসংখ্যা কমনওয়েলথের অন্য সকল রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি। কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর কূটনৈতিক মিশনকে বলা হয় হাই কমিশন এবং রাষ্ট্রদূতকে হাই কমিশনার।

নূহ-উল-আলম লেনিন

Category:

কবিতা

Posted on by 0 comment

48.Kobita_Layout-1

Category: