Blog Archives

শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও ৩৭ বছরের বাংলাদেশ

Posted on by 0 comment

25ড. হারুন-অর-রশিদ: ১৭ মে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকা–পরবর্তী ছয় বছর বিদেশে নির্বাসিত থাকতে বাধ্য হয়ে অতঃপর ৩৭ বছর পূর্বে ১৯৮১ সালের ১৭ মে তিনি তার স্বদেশের মাটিতে পা রাখেন। সে সময়ে দেশে চলছিল জেনারেল জিয়াউর রহমানের বেসামরিক লেবাসে সেনা-গোয়েন্দা নিয়ন্ত্রিত শাসন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে একদল সেনা সদস্যের হাতে জেনারেল জিয়া নিহত হওয়ার এক বছরেরও কম সময়ের ব্যবধানে জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণ করেন (২৫ মার্চ ১৯৮২)। শুরু হয় জেনারেল এরশাদের দীর্ঘ ৯ বছর সেনাশাসন।
’৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ক্ষমতাসীন মোশতাক, জিয়া সরকার বাংলাদেশকে একটি মিনি পাকিস্তানে পরিণত করেছিল। ১৯৭৫-১৯৭৯ পর্যন্ত একটানা সামরিক শাসন চলে। জনগণের সর্বপ্রকার মৌলিক অধিকার হরণ করা হয়। বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় ও পুরস্কৃত করা হয়। তাদের যাতে ভবিষ্যতে বিচার না হতে পারে সে জন্য জারি করা হয় কুখ্যাত ‘ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স’ (সেপ্টেম্বর ১৯৭৫)। মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, শোষণ-বৈষম্যহীন সমাজ-রাষ্ট্র গঠনের চেতনাকে ভূলুণ্ঠিত করা হয়। মুক্তিযোদ্ধা ও স্বাধীনতার পক্ষের বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের ওপর নেমে আসে সরকারি চরম নির্যাতন-নিপীড়ন। রাতের আঁধারে গোপন স্থানে শত শত মুক্তিযোদ্ধাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। অন্যদিকে, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে পাওয়া সংবিধানকে কেটে-ছেটে বিকৃত করা হয়। ’৭১-এ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহযোগী ও গণহত্যায় জড়িত নিষিদ্ধ থাকা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক দল-গোষ্ঠীসমূহকে রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশের সুযোগ দেওয়া হয়। ধর্ষণ-হত্যা-অগ্নিসংযোগ, অন্য কথায়, যুদ্ধাপরাধের দায়ে গ্রেফতারকৃতদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এমনি এক শ্বাসরুদ্ধকর, বিভীষিকাময় রাজনৈতিক পটভূমিতে শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন।
স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পূর্বে বিদেশে অবস্থানরত অবস্থায় তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত হন। ১৪-১৬ ফেব্রুয়ারি মতিঝিলের ইডেন হোটেলে তিন দিনব্যাপী আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। ঐ কাউন্সিল অধিবেশনকে সামনে রেখে দলের মধ্যে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব চরমরূপ লাভ করে। দল নিশ্চিত ভাঙনের দোরগোড়ায় পৌঁছে। এমনি এক অবস্থায় বলতে গেলে নাটকীয়ভাবে সর্বপক্ষের সর্বসম্মতিক্রমে কাউন্সিলে শেখ হাসিনা দলের সভানেত্রী নির্বাচিত হন। দল নিশ্চিত ভাঙনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা পায়। তখন তার বয়স মাত্র ৩৩ বছর। সভানেত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-এর প্রতিনিধির সঙ্গে ২৪ ফেব্রুয়ারি একটি সাক্ষাৎকার দেন, যা পরের দিন আজাদ পত্রিকায় ‘আওয়ামী লীগ সভানেত্রী হওয়াতে উল্লসিত হওয়ার কারণ দেখি না’ শিরোনামে ছাপা হয়। সাক্ষাৎকারটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতে তার মানস ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা বা দূরদৃষ্টির পরিচয় পাওয়া যায় (দ্রষ্টব্য হারুন-অর-রশিদ, ‘মূলধারার রাজনীতি : বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল ১৯৪৯-২০১৬’, বাংলা একাডেমি ২০১৬, পৃ. ৪৬২-৪৬৩; আওয়ামী লীগ কাউন্সিলের জন্য, ঐ, পৃ. ২০১-২১৮)।
বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাকে প্রাণঢালা অভ্যর্থনা জানাতে সেদিন কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে লাখো জনতার সমাবেশ ঘটে। বিমানবন্দর থেকে ৩২ নম্বর ধানমন্ডি পর্যন্ত রাস্তার দু-পাশে সারিবদ্ধ মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষাÑ এক নজর তাকে দেখা। রাজধানী ঢাকা শহর সেদিন পরিণত হয়েছিল মিছিলের নগরীতে। কালবৈশাখী ঝড় ও প্রবল বৃষ্টি কিছুই মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উৎসাহ-উদ্দীপনাকে এতটুকু বিঘিœত করতে পারেনি। শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমান বাংলাদেশের মাটি স্পর্শ করলে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন মুহূর্ত। আনন্দ আর বিষাদের অশ্রু দিয়ে দলের নেতা-কর্মী ও সাধারণ জনতা তাকে বরণ করে নেয়। মুষল বৃষ্টিপাতের মাধ্যমে প্রকৃতিও যেন তাতে যোগ দেয়। প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে বৃষ্টিতে ভিজে লাখো জনতা মিছিল সহযোগে তাদের প্রিয় নেত্রীকে নিয়ে আসে বাঙালির জাতীয় মুক্তির সূতিকাগার, জাতির জনকের স্মৃতিঘেরা ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়ির সম্মুখে, যেখানে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সংঘটিত হয় গ্রিক ট্র্যাজেডির চেয়েও করুন ও মর্মান্তিক এক বিয়োগান্তক ঘটনাÑ জাতির জনকসহ পরিবারের উপস্থিত সকল সদস্যের রক্তাক্ত, নিষ্ঠুর, পৈশাচিক হত্যাকা-। কিন্তু বাড়ির ভেতর প্রবেশ করার সুযোগ পেলেন না শেখ হাসিনা। তখনও শাসক গোষ্ঠী কর্তৃক সেটি ছিল অযত্ম-অবহেলায় সিল করা অবস্থায় ফেলে রাখা।
বাংলার মাটিতে পা রেখে এই মাটি ছুঁয়ে শেখ হাসিনা সেদিন জাতির জনক ও একাত্তরের শহীদদের রক্তের নামে ১৫ আগস্টের হত্যাকারীদের বিচার, সেনা শাসকদের কবল থেকে জনগণের ভোট ও ভাতের অধিকার উদ্ধার এবং মুক্তিযুদ্ধের ধারায় দেশকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার শপথ নিয়েছিলেন। শুরু হয় তার জীবনের নিরন্তর, নিরবচ্ছিন্ন এক কঠিন সংগ্রাম, যা আজ ৩৭ বছর ধরে বিস্তৃত।
এ পর্যায়ে জাতির রাজনৈতিক নেতৃত্বভার গ্রহণের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার পূর্ব রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে খানিকটা আলোকপাত করা যাক। রাজনৈতিক পরিবারে তার জন্ম (২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ সাল)। রাজনৈতিক পরিবেশের মধ্যেই তিনি বেড়ে উঠেছেন। জাতির জনকের জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে অনেক কিছু তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন। কখনও কখনও সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৫৪ ও ১৯৫৬-৫৭ সালে পিতার স্বল্পকালীন মন্ত্রিত্বের সময় মিন্টু রোডের বাসায় থেকেছেন। আবার পাকিস্তানের ২৪ বছরের মধ্যে ১২ বছর বঙ্গবন্ধুর কারাজীবনকালীন নানা দুরবস্থা ও তিক্ত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে প্রথমে আজিমপুর গার্লস স্কুল, এরপর ইডেন গার্লস কলেজ, পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থাকাকালীন শেখ হাসিনা সক্রিয় ছাত্র রাজনীতিতে নিজেকে যুক্ত করেন। তিনি ছিলেন ইডেন কলেজ ছাত্রী সংসদের নির্বাচিত ভিপি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হল শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। ’৬৬-র ৬-দফা আন্দোলন, ’৬৮-র আগরতলা মামলাবিরোধী ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে তিনি রাজপথের মিছিলে শামিল হয়েছেন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক বিজয়, বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে আলোচনার নামে পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল ইয়াহিয়ার কালক্ষেপণ ও ষড়যন্ত্রের আশ্রয় গ্রহণ, বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ২ থেকে ২৫ মার্চ (১৯৭১) পূর্ব বাংলায় সর্বাত্মক অসহযোগ পালন ও বাঙালি জাতির উত্থান, ২৬ মার্চ পাকহানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে বঙ্গবন্ধুর সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা, এবং পরিশেষে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে কীভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে, এসবই তিনি (শেখ হাসিনা) অতি কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন। যেমন ’৫২-র ভাষা আন্দোলন শিশু বয়সে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী (তখন বয়স মাত্র পাঁচ বছর) শেখ হাসিনার ওপর যে প্রভাব ফেলেছিল, বঙ্গবন্ধুর লেখায় তা এভাবে ফুটে ওঠে :

পাঁচ দিন পর বাড়ি পৌঁছালাম … হাচু আমার গলা ধরে প্রথমেই বলল, ‘আব্বা, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, রাজবন্দিদের মুক্তি চাই’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ইউপিএল, ঢাকা-২০১২,  পৃ. ২০৭)। এরপর বঙ্গবন্ধুর মন্তব্য, ‘২১শে ফেব্রুয়ারি ওরা ঢাকায় ছিল, যা শুনেছে তাই বলে চলেছে’ (ঐ, পৃ. ২০৭)।

১৯৭৫ সালে স্বামী পরমাণুবিজ্ঞানী ড. এমএ ওয়াজেদ মিঞার সঙ্গে বিদেশে থাকায় শেখ হাসিনা ও আপন বলতে একমাত্র ছোট বোন শেখ রেহানা প্রাণে বেঁচে যান। অন্যথায়, মা-বাবা-ভাই, ১০ বছরের শিশু রাসেলসহ বঙ্গবন্ধু পরিবারের অন্য সবার মতো খুনিদের হাতে নিশ্চিতভাবে এ দুই বোনকেও ১৫ই আগস্টের নিষ্ঠুর ভাগ্যবরণ করতে হতো। এরপর তাকে দীর্ঘ ছয় বছর দেশের বাইরে নির্বাসিত জীবনযাপন করতে হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু হত্যার ২১ বছর পর তার সুযোগ্য নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়লাভ করে ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনে সক্ষম হয়। ২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের বিপুল সমর্থন ও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে শেখ হাসিনার দ্বিতীয়বারের সরকার গঠন। নানা অজুহাতে দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও এর রাজনৈতিক সহযোগী, যুদ্ধাপরাধী জামাতে ইসলামীর নির্বাচনের পথ পরিহার করে ভিন্ন পন্থায় ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিয়ে দেশে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারা অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে তিনি এককভাবে যে দৃঢ়তা, দূরদর্শিতা ও সাহসী নেতৃত্বের পরিচয় দিয়েছেন, তা রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য শিক্ষণীয়।
শেখ হাসিনার নেতৃত্ব আজ বাংলাদেশ ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বে সমাদৃত। এখানে পৌঁছাতে তাকে অনেক চ্যালেঞ্জ আর বন্ধুর পথ অতিক্রম করতে হয়েছে। তার বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র হয়েছে। একাধিকবার গ্রেফতার হয়েছেন, কারাগারে থেকেছেন। ২০০৭-০৮ সালে সেনা সমর্থিত তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রায় বছরকাল সাবজেলে তার নিঃসঙ্গ বন্দিজীবন কেটেছে। একের পর এক হয়রানিমূলক মামলা হয়েছে। প্রহসনমূলক বিচারের আয়োজন হয়েছে। রাজনীতি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর কিংবা দেশের বাইরে নির্বাসনে পাঠানোর অপচেষ্টাও হয়েছে। বিগত সময়ে ২৩-২৪ বার প্রাণনাশের চেষ্টা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলা, যাতে নারী নেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান এবং কয়েকশ লোক আহত হন। বলার অপেক্ষা রাখে না, ঘাতকদের মূল টার্গেট ছিল শেখ হাসিনা। অলৌকিকভাবে তিনি প্রাণে বেঁচে যান।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রধান দিক হচ্ছে, তিনি জাতির জনকের কন্যা। বঙ্গবন্ধুর রক্ত তার ধমনিতে প্রবাহমান। বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন, সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। ‘দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো’ই ছিল তার রাজনীতি। পিতার অনেক আদর্শই শেখ হাসিনা জেনেটিক্যালি পেয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর কন্যা হিসেবে বঙ্গবন্ধু ভক্ত এ দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়জুড়ে তিনি রয়েছেন। তাদের স্নেহ ও ভালোবাসায় তার জীবন সিক্ত। দ্বিতীয়ত, তার রয়েছে আওয়ামী লীগের মতো এমনই একটি অভিজ্ঞ, ঐতিহ্যবাহী, সুদৃঢ় সংগঠন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত যার রয়েছে অসংখ্য কর্মী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী; যে দল দেশের বৃহত্তম; যে দল কালোত্তীর্ণ (প্রতিষ্ঠা ১৯৪৯) এবং নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান; যার রয়েছে এ দেশের স্বাধীনতাসহ যা কিছু শ্রেষ্ঠ ও কল্যাণকর তার সিংহভাগ অর্জনের মূল কৃতিত্ব। তৃতীয়ত, তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের রাজনীতিতে সৎ, সাহসী, দুর্নীতিমুক্ত, জনগণের জন্য নিবেদিতপ্রাণ, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, আত্মপ্রত্যয়ী রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড়ই অভাব। সেক্ষেত্রে, শেখ হাসিনা ব্যতিক্রম এবং তিনি নেতৃত্বের এসব গুণের অধিকারী। চতুর্থত, শেখ হাসিনা ব্যক্তিজীবনে যেমন খুবই ধর্মপ্রাণ, তেমনি একই সঙ্গে সেক্যুলার। প্রকৃত ধর্ম বিশ্বাসের সঙ্গে সেক্যুলারিজমের কোনো বিরোধ নেই। বাংলাদেশের মানুষও একই সঙ্গে ধর্মপ্রাণ ও অসাম্প্রদায়িক। এটি হচ্ছে আমাদের দীর্ঘ সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। আমাদের দেশের রাজনীতিতে তাই শেখ হাসিনা হচ্ছেন এই ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সার্থক প্রতিনিধি। পঞ্চমত, শেখ হাসিনা মনে-প্রাণে একজন আধুনিক মানুষ। ১৯৮১ সালে দেশে প্রত্যাবর্তনের অনেক পূর্বে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসের তার অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলা ভাষায় রয়েছে প্রভূত দখল। তিনি একাধিক গ্রন্থেরও প্রণেতা। ষষ্ঠত, অতীত সম্বন্ধে তিনি যেমন সচেতন, তেমনি একই সঙ্গে ভবিষ্যৎমুখীও। তার ‘ভিশন-২০২১’ এরই সার্থক প্রমাণ। শেষত, বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা হচ্ছেন সেক্যুলার-ডিমোক্রেটিক ধারার প্রধান প্রতিনিধি এবং স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ঐক্যের প্রতীক।
বাংলাদেশের রাজনীতি তথা সার্বিক উন্নয়নে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের উজ্জ্বলতম অর্জনসমূহ হচ্ছেÑ সকল প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতার মধ্যে আওয়ামী লীগকে সুসংগঠিত করা, সেনা শাসনের হাত থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও শক্তিশালীকরণ, পাবর্ত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি সম্পাদন করে (১৯৯৭) ঐ অঞ্চলের প্রায় দু-দশক ধরে চলমান সশস্ত্র সংঘাতের অবসান, নারীর ক্ষমতায়ন, সর্বজনীন জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন (২০১০), নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণের উদ্যোগ ও লক্ষণীয় অগ্রগতি সাধন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণ, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী (৩ জুলাই ২০১১)-এর মাধ্যমে ’৭২-এর সংবিধানের ৪ রাষ্ট্রীয় মূলনীতি প্রতিস্থাপন, সাধারণ দারিদ্র্যের হার ২৪ শতাংশ ও অতিদারিদ্র্য ১২ শতাংশে নামিয়ে আনা, প্রবৃদ্ধির হার ৭.৬৫ শতাংশ এবং শিক্ষার হার ৭১ শতাংশে উন্নীত করা, ১৬ হাজারের অধিক কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপন, ১৮ হাজর মেগাওয়াটের অধিক বিদ্যুৎ উৎপাদন, খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, দুস্থ, অসহায়, অবহেলিত মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা, সন্ত্রাসবাদ ও ধর্মীয় জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান রোধ, দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করা, বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যবস্থা ও রায় কার্যকর করা, ভারত ও মিয়ানমারের সাথে সমুদ্রসীমা-বিরোধ নিষ্পত্তি, ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ছিটমহল সমস্যার সমাধান ও দুই দেশের মধ্যে ছিটমহল বিনিময়, প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারের নারী-পুরুষ শিশু বৃদ্ধ নির্বিশেষে ১০ লক্ষাধিক জীবন বিপন্ন রোহিঙ্গাকে শরণার্থী হিসেবে বাংলাদেশে আশ্রয় দান, বিশ^ ঐতিহ্য সম্পদ হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের ইউনেস্কো-স্বীকৃতি, রাষ্ট্র ও রাজনীতির সর্বজনীন রূপায়ন এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন ভিশন-২০২১, স্বল্পোন্নত দেশের অবস্থান থেকে বাংলাদেশের উন্নয়নশীল দেশের তালিকাভুক্তির জাতিসংঘের স্বীকৃতি অর্জন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
একটি দেশ বা জনগোষ্ঠীর ভাগ্যোন্নয়নে রাজনৈতিক নেতৃত্ব কীরূপ ভূমিকা পালন করে, তা দ্বারা নেতৃত্বের স্থান নির্ধারিত হয়। মুস্তফা কামাল পাশাকে বলা হয় আধুনিক তুরস্কের জনক বা আতাতুর্ক। মাহাথির মোহাম্মদ হচ্ছেন মালয়েশিয়ার বর্তমান উন্নতি-অগ্রগতির স্থপতি। জওহরলাল নেহেরুকে মনে করা হয় আধুনিক ভারতের পথিকৃত। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হচ্ছেন বাঙালির জাতীয় মুক্তি ও স্বাধীনতার মহানায়ক। আবার, বিভিন্ন দেশে এমন অনেক রাজনৈতিক নেতৃত্ব রয়েছে, ইতিহাসে যাদের অবস্থান অতি সাধারণ এবং জনমনে থাকেন বিস্মৃত। বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের মূল্যায়ন কী হবে? গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, জনগণের ভোট ও ভাতের অধিকার অর্জন, মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বহির্বিশে^ বাংলাদেশের সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধি, এক কথায়, দেশের ও জনগণের সার্বিক উন্নয়ন ও কল্যাণে বিগত ৩৭ বছর ধরে তিনি যে ভূমিকা পালন করে আসছেন, সেসব বিবেচনায় আমাদের জাতীয় জীবনে বঙ্গবন্ধুর পর তার স্থান সর্বশীর্ষে। সামগ্রিকভাবে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্ব ও আদর্শিক ছায়াতলে বেড়ে ওঠে শেখ হাসিনা নিজগুণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতৃত্বের বিশেষ একটি স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি জাতিকে অনেক দিয়েছেন। এরপরও তার কাছে জাতির প্রত্যাশা আরও অনেক, কেননা তিনি শুধু রাজনীতিক বা প্রধানমন্ত্রী নন, ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’, তিনি জাতির পিতার কন্যা।
লেখক : ভাইস চ্যান্সেলর, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

Category:

মিয়ানমারকেই রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে হবে

Posted on by 0 comment
23

কক্সবাজারে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ প্রতিনিধি দল

উত্তরণ প্রতিবেদন: জাতিসংঘের ক্ষমতাধর নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিরা বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট সৃষ্টির উৎস মিয়ানমারে। তাই মিয়ানমারকেই এ সংকটের দীর্ঘস্থায়ী ও সম্মানজনক সমাধান দিতে হবে। এজন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে মিয়ানমার সরকারকে কাজ করতে হবে। গত ২৯ এপ্রিল কক্সবাজারে বিশ্বের সর্ববৃহৎ উদ্বাস্তু শিবির উখিয়ার কুতুপালং-বালুখালী পরিদর্শন শেষে নিরাপত্তা পরিষদের সফররত প্রতিনিধি দলের সদস্যরা এ কথা বলেছেন। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের অবস্থা সরেজমিনে দেখে প্রতিনিধি দল উদ্বেগ প্রকাশ করেন। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে সেখানে প্রাকৃতিক বিপর্যয়েরও আশঙ্কা করছেন তারা।
কুতুপালং ২নং ক্যাম্পের ডি-৫ ব্লকের একটি কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ের শুরুতে বক্তব্য রাখেন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের চলতি এপ্রিল সেশনের জন্য নির্বাচিত সভাপতি পেরুর স্থায়ী রাষ্ট্রদূত গুস্তাভো মেজা কুয়াদ্রা। তিনি বলেন, আমরা নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের উপায় বের করতে একমত হয়েছি। এ সমস্যা সমাধানে রোহিঙ্গাদের মানবিক আশ্রয় দানকারী বাংলাদেশ ও রোহিঙ্গা সমস্যা সৃষ্টিকারী মিয়ানমার সফরে এসেছি। এত বড় মানবিক সংকটে বাংলাদেশের নানা সমস্যা সত্ত্বেও বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে যে মানবিক উদারতা দেখিয়েছে তার জন্য বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের প্রশংসা করেন তিনি। রোহিঙ্গাদের দুর্দশার ব্যাপারে তিনি বলেন, আমরা এই শরণার্থী সংকট দেখে খুব উদ্বিগ্ন। আমরা এই পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশের পাশে থাকবে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সফরের অন্যতম আয়োজক জাতিসংঘে যুক্তরাজ্যের স্থায়ী প্রতিনিধি কারেন পিয়ার্স বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপারে আমরা কারও সাথে আপস করব না। নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা রোহিঙ্গা সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের ব্যাপারে অনেকটা কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সমস্যা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া গেছে। আমরা এখান থেকে মিয়ানমারে যাব। সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে কীভাবে তারা যুক্ত হতে পারে তা জানতে চাইব। রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আমরা নিরাপত্তা পরিষদে সমর্থন দেওয়ার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করব ও রোহিঙ্গাদের উপকারে আসে এমন সিদ্ধান্ত নেব।
কুয়েতের স্থায়ী প্রতিনিধি মানসুর আল ওতাইবি বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার মূল উৎস মিয়ানমারে। তাই এর সমাধান মিয়ানমারকে করতে হবে। তবে তা যাদুকরিভাবে রাতারাতি সম্ভব হবে না। এ ব্যাপারে সময় লাগবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের কাছে সমস্যা সম্পর্কে অবগত হওয়া গেছে, এরপর মিয়ানমার সফরে আরও বেশি ভালো কিছু আশা করছি।
অন্যদিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের চীন ও রাশিয়া প্রতিনিধিরা বলেন, বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকট নিরসন করতে হবে এবং তারাও এ সমস্যার দ্রুত সমাধান চায়। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সেখানে উপস্থিত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি বলেন, বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা সংকটের পক্ষ না হয়েও মানবিক কারণে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে ভুগতে হচ্ছে। এ সমস্যার দ্রুত স্থায়ী সমাধান চায় বাংলাদেশ।
২৯ এপ্রিল দুপুর ১টায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধি দল কুতুপালংয়ে পূর্ব নির্ধারিত প্রেস ব্রিফিং করার পূর্বে চার দলে বিভক্ত হয়ে ৪টি পৃথক স্থানে মিয়ানমার থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলেন। সকাল সাড়ে ৯টায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তের তুমব্রু কোনারপাড়া জিরো পয়েন্টে অবস্থান নেওয়া রোহিঙ্গাদের আশ্রয়স্থল পরিদর্শন করেন। সেখানে অবস্থান নেওয়া প্রায় ৬ হাজার রোহিঙ্গাদের নানা ধরনের সমস্যার কথা শোনেন।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ৫টি স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন ও ফ্রান্সসহ অস্থায়ী ১০টি দেশের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি প্রায় ৩০ জনের মতো সদস্য অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এ সময় প্রতিনিধি দলের সাথে ছিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি, ভারপ্রাপ্ত পররাষ্ট্র সচিব খোরশেদ আলম, অতিরিক্ত সচিব ও শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালাম, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নান, চট্টগ্রাম পুলিশের রেঞ্জ ডিআইজি মনিরুজ্জামান মনি, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি’র কক্সবাজার রিজিওনাল কমান্ডার কর্নেল রকিবুল হক প্রমুখ।

Category:

দলছুট

Posted on by 0 comment

5-7-2018 7-06-57 PMফরিদুর রহমান : অনেক দূরে এলএমজি’র একটানা ঠা-ঠাÑ শব্দে ঘুম ভেঙে যায় মুনতাসিরের। একটা ঘোরের মধ্যে থেকে জেগে উঠে ভাবতে চেষ্টা করে সে কি আসলেই ঘুমিয়ে পড়েছিল, না-কি তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল! অন্ধকারের মধ্যে ডাইনে-বাঁয়ে হাত বাড়িয়ে বুঝতে চেষ্টা করে সে এখন কোথায়। বন তুলশি বা কানসিসার মতো নরম গাছপালা ছাড়াও ডান দিকে আকন্দ আটিশ্বরের হালকা ঝোপ-জঙ্গল হাতে ঠেকে। বাঁ হাতে ধরা এসএমজিটা কাছেই ভেজা মাটিতে ঘাসের মধ্যে পড়ে আছে। দু-পায়ের তলায় বালিমাটি আর ঠা-া জল-কাদার আভাস পায়। মুনতাসির বুঝতে পারে মুখটা নরম কাদামাটির মধ্যে গুঁজে রেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিল সে। বাঁ হাতের তলায় একটা কাঁটা গাছের খোঁচা থেকে বাঁচবার জন্যে পাশ ফিরে শোবার চেষ্টা করতেই পাঁজরের ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে সব মনে পড়ে যায় তার।
রাত সাড়ে আটটার দিকে নারায়ণপুর ক্যাম্পে হাঁসের ডিম দিয়ে ভাত খেয়ে আটজনের ছোট্ট দলটি দশটা থেকে সাড়ে দশটার মধ্যে দিয়ালা সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছিল। আগেভাগে বর্ডারে পৌঁছে যাওয়ায় দিয়ালার শরণার্থী শিবিরের কাছে টং দোকানে টিমটিমে হেরিক্যানের আলোয় বসে চা খেয়েছিল ওদের কয়েকজন। তখনই জানতে পারে গত এক সপ্তাহে দুবার সীমান্তের খুব কাছাকাছি চলে এসেছিল পাকিস্তানি বাহিনী। প্রথমবারে কোনো ঘটনা ঘটেনি। দ্বিতীয়বার দূর থেকে শরণার্থী শিবিরে গুলি চালিয়েছে। দিনের বেলায় তেমন লোকজন না থাকলেও গুলিতে দুবলহাটি কুমারপাড়ার বৃদ্ধ বৃন্দাবন পাল শিবিরের মধ্যেই মারা গেছেন। এছাড়া তাহমিনা নামে দশ-বারো বছর বয়সের এক কিশোরীর পায়ে গুলি লেগেছিল, তাকে বালুরঘাটে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
মুনতাসিরের বুকের মধ্যে হঠাৎই ছ্যাঁত করে ওঠে। জানতে চায়, ‘মেয়েটার কী হয়েছে শেষ পর্যন্ত? বাঁচবে তো?’
‘কুনু খারাপ খবোর তো পাওয়া যায়নিÑ আল্লাহ বাঁচালে মোনে কয় ব্যাঁচে যাবে।’
বাঁশের অস্থায়ী মাচায় অন্ধকারের মধ্যে বসে থাকা বয়স্ক একজন জানান। আবুল কালাম কোলের ওপর স্টেনগান রেখে এক কোণায় বসেছিল। সে পরামর্শ দেয়। ‘তোমরাই বর্ডারের কাছে না থ্যাকে আরও ভিতরে সরে গেলেই তো পারিন।’
‘চেষ্টা করে দেখিছিÑ সরকারি জায়গা জুমি, ইস্কুল ঘর, পকর পাড় সব আগেই দখোল হ্যয়ে গেছে। সতীশ সরকারের একটা পুরানা চাতাল আর চক্রবত্তিঘেরে আমের বাগান পড়েই আছেÑ কিন্তুক দিবার চায় না।’
‘ইন্ডিয়ানরাও একোন বিরক্তরে বাÑ আর কতো ম্যানষেক জায়গা দিবে!’ অনেকক্ষণ চুপ থাকার পরে শ্বেতশুভ্র চুলদাঁড়িওয়ালা একজন নিজে থেকেই ভারতীয়দের মনোভাব ব্যক্ত করেন।
ছয় গ্লাস চায়ের দাম হয়েছিল ষাট নয়া। মন্টুভাই চায়ের দাম দিতে গেলে দোকানি নিতে চায় না, ‘তোমাঘেরে পয়সা দ্যাওয়া ল্যাগবে না। তাড়াতাড়ি দ্যাশ স্বাধীন করিন, বাড়িত ফিরে যাবার প্যাল্লেই হামরা বাঁচি।’
‘হামাকেরে তো চেষ্টার কুনু ত্রুটি নাই চাচাÑ দোয়া ক্যরেন।’ দলনেতা সিরাজ ভাই উঠে পড়লে দলের সকলেই একে একে উঠে পড়ে।
বৃদ্ধ লোকটি দোয়া পড়ে সবার উদ্দেশে বাতাসে ফুঁ দিয়ে বলে, ‘ফি আমানিল্লাহÑ জয় বাংলা।’
সীমানা পিলার পার হবার খানিক পরেই সীতহার গ্রামের অনাবাদী জমি জঙ্গল পেরিয়ে দু-তিনজন পাশাপাশি হাঁটতে পারে এমন পায়ে চলা পথের নিশানা পাওয়া যায়। ওরা আটজন আলপথের ডাইনে বাঁশে দুপাশে চারজন চারজন করে ভাগ হয়ে একটু আগেপিছে চলতে শুরু করে। গেরিলা দলের কখনোই এক লাইনে অথবা পাশাপাশি হাঁটার নিয়ম নেই। ট্রেনিং-ক্যাম্পের শিক্ষাগুলো যুদ্ধের মাঠে ঠিকঠাক মেনে না চলার কারণে বেশ কয়েকটা বড় দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। সিরাজ ভাই এসব ব্যাপারে ভীষণ কড়া। রাতের অন্ধকারেও সীতহারের আদিবাসী ছেলে মহিম মুরমু এখানকার পথঘাট ঠিক ঠাহর করতে পারে। তারপরেও কেমন করে যে এ্যাম্বুশে পড়ে গেল ওরা মুনতাসিরের মাথায় ঢোকে না।
রাইকালিপুর হাট থেকে দলটা তখনও আধা মাইল উত্তরে। মূল রাস্তা ধরে না এগিয়ে ওরা সড়কের পশ্চিম দিকে খাঁড়ির ঢালু পাড় ধরে ঝোপঝাড় পেরিয়ে খুব সাবধানে এগোতে থাকে। মাঝে মাঝে ঝিঁঝিঁ পোকার ঠিরিরি শব্দ আর দূরে কোনো পরিত্যক্ত বাড়ির উঠানে বেওয়ারিশ কুকুরের কান্না ছাড়া চারিদিকে শুনশান নীরবতা। আবছা আলো-আঁধারির মধ্যেই সিরাজ ভাইয়ের ইশারা পেয়ে পাড় ধরে ওরা তিন কিংবা চারজন হামাগুঁড়ি দিয়ে রাস্তায় উঠে আসে। সঙ্গে সঙ্গেই সারারাতের নৈঃশব্দ ভেঙে দিয়ে ঠা-ঠাÑ ঠা-ঠাÑ করে একসাথে অনন্ত গোটা দুই-তিনেক এলএমজি থেকে শুরু হয়ে এক নাগাড়ে গুলিবর্ষণ। মুনতাসির সম্ভবত উঠে দাঁড়াতে গিয়েছিল। গুলির শব্দের সঙ্গেই সে মাটিতে শুয়ে পড়ে তারপর দ্রুত গড়িয়ে খাড়ির দিকে নেমে যায়। বাঁ পাঁজরের নিচে চিনচিনে ব্যথার জায়গাটায় হাত দিতেই খানিকটা গরম তরল পদার্থ হাতে লাগে। হঠাৎ ওদের অবস্থান থেকে বিশ-পঁচিশ গজ সামনে আলোর ঝলকানির সাথে প্রচ- বিস্ফোরণের শব্দ। দলের কেউ কি এগিয়ে গিয়ে গ্রেনেড চার্জ করেছিল! এরপর আর কিছু মনে করতে পারে না মুনতাসির।
বাড়ি থেকে একরকম পালিয়েই আসতে হয়েছিল তাকে। বাবা সরকারি কর্মকর্তা। চাকুরি ক্ষেত্রে নানাভাবে বঞ্চিত অপমানিত মানুষটি মনেপ্রাণে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। কিন্তু ক্ষণেক্ষণেই মুক্তিযোদ্ধাদের শক্তি সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে ওঠেন।
‘কি জানি বাপু! কবে কোন দিন দেশ স্বাধীন হবে সেই ভরসায় না থেকে চাকরিতে যোগ দেওয়ায় বোধহয় ঠিক হবেÑ তোর কি মনে হয়?’
যাকে প্রশ্ন করা সেই মুনতাসির কোনো উত্তর দেয় না, সে মনে মনেই পালাবার পরিকল্পনা করে। বুঝতে পারে সারাজীবন দশটা-পাঁচটা অফিস করে অভ্যস্ত বাবা একমাসেই হাঁপিয়ে উঠেছেন। মা চান ছেলেরা যুদ্ধে যাক, কিন্তু নিজের একমাত্র ছেলেকে যুদ্ধের মতো ভয়ঙ্কর বিপদের মধ্যে ঠেলে দিতে বুক কেঁপে ওঠে। অগত্যা ছোট বোনের সাথে কথা বলে মুনতাসির। ইনিয়ে-বিনিয়ে অনেক কথা বলার পরে বলে, ‘মনে কর আমি যদি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে আর ফিরে না আসি তাহলে তুই কি করবি?’
গত অক্টোবরে দশ পেরিয়ে এগারোতে পড়েছে তাহসিনা। ভাইয়ের মুখের দিকে কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে তারপরে বলে, ‘তুমি কি বলো ভাইজান। তুমি না আসলে আমি তো কাইন্দা জারেজার হয়ে যাব!’ এবারে বিস্মিত হবার পালা মুনতাসিরের। ‘এই কথা তুই কোথায় পেলি?’
‘কোন কথা ভাইজান?’
‘এই যে কাইন্দা জারেজার…?’
ক্যান সেই দিন তুমি শোননি, দাদি পুঁথি পড়ে শোনাচ্ছিল…।’ এরপর সে নিজেই সুর করে বড় ভাইকে কয়েক লাইন শুনিয়ে দেয়।
‘লাখে লাখে মানুষ মরে, পলায় বেশুমারÑ পয়মাল হইল বসতভিটা আগুনে ছারখার
চারিদিকে শোকের মাতম দুনিয়া আন্ধারÑ ভাইয়ের শোকে বোনে হইল কাইন্দা জারেজার।’
মুনতাসিরের বুক ঠেলে কান্না এসে গলার কাছে দলা পাকিয়ে যায়। তার মনে হয় চিৎকার করে কাঁদতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু একজন প্রশিক্ষিত গেরিলা হিসেবে সে জানে এ সময় সামান্যতম শব্দ করাও বিপজ্জনক। শত্রুরা কাছাকাছি কোথাও ওতপেতে আছে কি না কে জানে! সে যে দলছুট হয়ে পড়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মাথাটা ঝিমঝিম করছে, পিপাসায় গলা শুকিয়ে কাঠ। একটু পানি খেতে পারলে ভালো হতো। গড়িয়ে খাড়ির দিকে নেমে গেলে হয়তো পানি পাওয়া যাবে। কিন্তু নড়াচড়া করতে মোটেও ইচ্ছে করছে না। একই জায়গায় চিৎ হয়ে শুয়ে আকাশে তাকিয়ে উত্তর দক্ষিণ আন্দাজ করতে চেষ্টা করে। আশ্বিনের মাস শেষ হতে যাচ্ছে। কোথাও কোনো মেঘ নেই; কিন্তু ধ্রুবতারাটাও চোখে পড়ে না। একটা দিকচিহ্ন পেলে যত কষ্টই হোক ধীরে ধীরে উত্তরে সীমান্তের দিকে সরে যাওয়া যেত।
এলাকার মানুষ হলেও এ দিকের রাস্তাঘাট, খালবিল, এমনি হাট বাজারের সাথেও মুনতাসিরের তেমন পরিচয় নেই। ঢাকায় ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবার আগে পর্যন্ত বাবার সরকারি চাকরির সূত্রে সারাদেশে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে। ছুটিছাটায় বাড়িতে এসেছে পাঁচ-সাত দিনের জন্য। এবারে যুদ্ধ শুরু হবার পরে গ্রামে মাস খানেক কাটিয়ে একদিন বর্ডার পার হয়ে সোজা রিক্রুটমেন্ট ক্যাম্পে। দেশের ভূগোল ভালো করে বুঝে ওঠার আগেই শুরু হয়ে গেছে সেই ভৌগোলিক ভূখ- রক্ষার লড়াই। সীতাহার, তারুলিয়া আর রাইকালিপুর হাটের নাম জানা ছিল। সাদা কাগজে পেন্সিল দিয়ে আঁকা ম্যাপ দেখে পুরো টার্গেট এলাকা সম্পর্কে একটা ধারণা পাবার চেষ্টাও করেছে। কিন্তু এখন এই অন্ধকার রাতে গুলিবিদ্ধ আহত শরীরটাকে টেনে কোন পথে এগোবে সে!
দিয়ালা সীমান্ত থেকে যে পথটুকু তারা পাড়ি দিয়েছিল সেই পথ এবং হাঁটর গতি হিসাব করলে খাঁড়ির এই জায়গাটা রাইকালিপুর হাট থেকে আধ মাইল উত্তরে তারুলিয়া গ্রামের মাঝামাঝি। গ্রামটা বেশ বড়, কয়েক ঘর সম্পন্ন কৃষকের বসত ছিল এখানে। এখন না-কি বাড়ি বলতে কিছু মাটির দেয়াল, চাল কিংবা খুঁটির পোড়া বাঁশ, পরিত্যক্ত ঢেঁকি, লাঙ্গল আর মাটির ভাঙাচোরা হাড়ি কলসি। দরজা কপাট টিনের চাল লুটপাট হয়ে গেছে অনেক আগেই। তারুলিয়ার উত্তরে সীতাহার গ্রামে ঢুকতেই খ্রিস্টান মিশনারিদের গির্জা। সীতাহার গির্জার চূড়ায় বিশাল ক্রুশচিহ্ন অনেক দূর থেকে দেখা যায়। গ্রামের আদিবাসি খ্রিস্টানদের বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিলেও কেন যে বিধর্মী নাসারাদের এই উপাসনালয় এখন পর্যন্ত টিকিয়ে রেখেছে তা পাকিস্তানিরাই ভালো বলতে পারবে। ক্রুশটা চোখে পড়লে খাড়ির পাড় ধরে ক্রলিং করে গির্জা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলে বাঁকি পথটুকু হেঁটেও যাওয়া যেতে পারে। সীমান্তের গা ঘেঁষে ছড়িয়ে থাকা পরিত্যক্ত গ্রামগুলোতে টহল দিতে সাহস পায় না পাকিস্তানিরা।
পাঁজরের নিচে যেখানে গুলি লেগেছে কোমর থেকে গামছা খুলে সেখানে পেঁচিয়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলে মুনতাসির। এমনিতেই যথেষ্ট রক্তক্ষরণ হয়েছে। শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছে। এ সময় মনোবল হারিয়ে ফেললে হয় এখানেই ঝোপঝাড়ের মধ্যে মরে পড়ে থাকতে হবে আর না হলে ধরা পড়তে হবে শত্রুর হাতে। ডান দিকে কাত হয়ে গুটিশুটি মেরে শুয়ে মুনতাসির একটা লম্বা নিঃশ্বাস ছাড়ে। ওরা সবাই কি এতক্ষণে ক্যাম্পে ফিরে গেছে! দলছুট ছেলেটার কথা কেউ মনে করেনি, মরে পড়ে থাকলে লাশটাও তো খুঁজে দেখার চেষ্টা করতে পারত। যুদ্ধ বড় নিষ্ঠুর খেলা। এখানে কেউ কারও বন্ধু নয়Ñ আর মুনতাসির তো এখানে এমনিতেই দলছুট। তাকে বাদ দিলে আর সবার ছাত্রজীবন শেষ। সবচেয়ে বেশি লেখাপড়া জানা মানুষ সিরাজ ভাই ইন্টারমিডিয়েট পাস করে আক্কেলপুর বাজারে ছিট কাপড়ের দোকান দিয়েছিলেন। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহেই সব পুড়ে ছাই। দুই নিজামের একজন কালা নিজাম সাইকেল মেকার, অন্যজন ধলা নিজাম ম্যাট্রিক পাস করে মঙ্গলবাড়ি হাটের একটি ধানভাঙা কলের ম্যানেজার। এসএসসি পাস দ্বিতীয়জন কামরুল, খবরের কাগজের এজেন্সি চালায়। নিজে মালিক, নিজেই হকার। মাঝ মাঝে ঘুমের মধ্যেও হাঁক দেয়, ‘দৈনিক আজাদ, ইত্তেফাক, সংবাদ, অবজারভার, দৈনিক পাকিস্তান…’ দেশ দুনিয়ার খবর সামান্য যেটুকু সেই রাখে। দলে প্রায় সবাই কৃষক পরিবার থেকে এলেও আবুল কালাম, মন্টু ভাই এবং মহিম মুরমু সরাসারি মাঠেই কাজ করত। তবে এদের কারোরই রাজনীতি নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। সবার একমাত্র ভাবনা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করতে হবে।
ক্যাম্পে মুনতাসিরের সংক্ষিপ্ত নাম ছিল মুন। কামরুল খুব সমীহ করে ডাকতো ‘চাঁদভাই’। সেই কামরুলও কি একবার তার খোঁজ করবে না! রাতটা কি শুক্লপক্ষ না কৃষ্ণপক্ষ! যা-ই হোক আকাশের চাঁদ তারা সবাই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। এখন কোনোভাবেই পথ খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।
রাত বোধহয় ধীরে ধীরে ফরসা হয়ে আসছে। বেশ দূরে, সম্ভবত দক্ষিণ-পূর্ব দিকে গ্রামের আভাস দেখা যায়। আশপাশের ঝোপঝাড়গুলোও এখন অনেকটাই স্পষ্ট। হাতের কাছে পড়ে থাকা এসএমজিতে পরম যতেœ হাত বোলায় মুনতাসির। এইখানে মরে পড়ে থাকলে অস্ত্রটাও খোয়া যাবে। দলে সবচেয়ে ভারী অস্ত্র বলতে তো দুটি সাব-মেশিনগান। একটা সিরাজ ভাই আর একটা মুনতাসিরের কাছে। বাকি ছয়জনের হাতে দুটি স্টেনগান আর চারটি থ্রি-নট-থ্রি। এ ছাড়া প্রত্যেকের কোমরে গোঁজা দুটি করে হ্যান্ডগ্রেনেড। পাকিস্তানি আর্মির টহলদল কিংবা সেতু কালভার্ট পাহারা দেওয়া রাজাকার ক্যাম্পে হামলা চালাবার জন্য এসব যথেষ্ট। কিন্তু এভাবে ফুটফাট গুলি চালিয়ে আর কতদিন! স্টেনগানগুলোকে খেলনা মনে হয় মুনতাসিরের। সাব মেশিনগানের রেঞ্জও এমন কিছু বেশি নয়। পঞ্চাশ গজের বাইর হলে টার্গেট তো মিস করেই, তাছাড়া পাকিস্তানি শয়তানগুলা যে হেলমেট মাথায় দেয় সেই হেলমেটে লাগলেও গুলি না-কি ছিটকে বেরিয়ে যায়। তার চেয়ে বরং থ্রি-নট-থ্রি ভালো। টার্গেটে হিট করতে পারলে জান নিয়ে পালাবার উপায় নেই।
খাড়ির উপরের রাস্তা পেরিয়ে গাছপালার ফাঁকে আকাশ ক্রমেই লাল হয়ে উঠছে। তাহলে এই দিকটাই তো পূর্ব দিক। বাঁ দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে আবছা আলোয় কুয়াশার আবরণ ভেদ করে চোখে পড়ে সীতাহার গির্জার মাথায় সাদা পাথরের ক্রশ। মাত্র আধা মাইল দূরে গির্জা চত্বরে ক্রুশেবিদ্ধ যিশু যেনো তার জন্যেই অপেক্ষা করছেন। নতুন করে সাহসী হয়ে ওঠে মুনতাসির। এবারে ক্রলিং-এর প্রস্তুতি হিসাবে নিজের দিকে একবার ফিরে তাকায় সে। সবুজ ঘাসের উপরে লেগে থাকা চাপ চাপ রক্ত দেখে তার কোনো ভাবান্তর হয় না। নিজেই নিজেকে বলে ‘বুকের রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করা’ বোধহয় একেই বলে। বাঁ পাঁজরের রক্তভেজা জায়গাটা আরেকটু শক্ত করে বেঁধে নেয়। তারপর অতি সাবধানে নিঃশব্দে উঠে বসে। নাÑ ঘন ঝোপঝাড়ের আড়ালে রাস্তার ওপার থেকে দেখার কোনো উপায় নেই।
হঠাৎ সে খেয়াল করে একদল পিঁপড়া সারিবদ্ধভাবে তার বাঁ পায়ের ওপর দিয়ে কোথায় যেনো চলে যাচ্ছে। মানুষটা যে এখনও বেঁচে আছে সে ব্যাপারে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। পিঁপড়াদের ঝেড়ে ফেলতে একটা হাত তুলেই ফেলেছিল, পরক্ষণেই সে ভাবে, আহা থাকÑ আমার দেশের পিঁপড়া! সামনেই শীত আসছে হয়তো তাই খাবারের খোঁজে দল বেঁধে বেরিয়েছে। ওদের মেরে কি লাভ!
দূরে পরিত্যক্ত পোড়া বাড়িঘর আর কয়েকটা শিমুল শিরিষ গাছের ফাঁকে বিশাল একটা সূর্য আকাশজুড়ে আলোর আভাস ছড়িয়ে ক্রমেই আরও উপরে উঠে আসে। অপলক তাকিয়ে থাকে মুনতাসির। স্বাধীন বাংলাদেশে এমন একটি অসাধারণ সূর্যোদয় দেখবার জন্যে তাকে বাঁচতেই হবে! বুকের কাছে দুহাতে এসএমজিটা আঁকড়ে ধরে শ্বেতশুভ্র ক্রশ বরাবর ক্রলিং শুরু করে মুনতাসির।

Category:

খুলনা ও গাজীপুরে নৌকার জোয়ার

Posted on by 0 comment

21রায়হান কবির: বৃষ্টিস্নাত নির্মল কোমল হাওয়া আর গণতন্ত্রের প্রাঞ্জল উদ্দীপনায় মেতে উঠেছে খুলনা ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। উৎসবমুখর পরিবেশে প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ততম সময় পার করছেন প্রার্থীরা। নগরীর অলিগলি, বাজার, রাস্তার পাশ ছেঁয়ে গেছে নির্বাচনী পোস্টারে। এলাকায় এলাকায় মাইকিং, হ্যান্ডবিল দিয়ে প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছে সমর্থক ও কর্মীরা। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নির্মাণ করা হচ্ছে নির্বাচনী ক্যাম্প। আগামী ১৫ মে অনুষ্ঠিতব্য গাজীপুর ও খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করতে এলাকায় ঘরে ঘরে ঘুরে ভোটারদের কাছে ভোট চাইছেন, দোয়া চাইছেন প্রার্থীরা।
খুলনায় মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক এবং গাজীপুরে মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম নৌকা প্রতীকে মেয়র পদে নির্বাচন করছেন। গাজীপুর ও খুলনা সিটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের সমর্থন জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ১৪-দলীয় জোট। ইতোমধ্যে উভয় সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনেই আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের বিজয়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। তালুকদার আবদুল খালেক বাগেরহাট-৩ আসন থেকে চারবারের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিসভারও সদস্য ছিলেন খালেক। আওয়ামী লীগের উন্নয়ন এবং সিটি কর্পোরেশনে গত পাঁচ বছরে বিএনপি সমর্থিত মেয়রদের চরম ব্যর্থতা বিবেচনায় নিয়ে নৌকা প্রতীকের পক্ষে যাচ্ছে ভোটারদের সমর্থন। এমনটিই মনে করছেন দুই সিটি কর্পোরেশনের সুধী সমাজ।
এদিকে পরাজয়ের ভয়ে ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলাচ্ছে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থীরা। বিএনপি প্রার্থীরা একদিকে যেমন নির্বিঘœ পরিবেশে প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছে আবার অন্যদিকে একই সাথে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালিয়ে চাচ্ছে। খুলনায় বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুর নির্বাচন থেকে সরে যাওয়া আবার পরক্ষণেই ফিরে আসার নাটক ভোটের রাজনীতিতে বিএনপির দুর্বলতাকে আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে।
এমন কী বিএনপির মেয়রের ব্যর্থতার প্রশ্নটি এড়িয়ে যেতে খুলনা সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে ভোটারদের প্রশ্নে প্রার্থীদের সরাসরি জবাব ও জনগণের প্রত্যাশা জানতে ‘বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি’ আয়োজিত ‘জনগণের মুখোমুখি’ অনুষ্ঠানেও হাজির হননি মঞ্জু।
অন্যদিকে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী উদ্দিন সরকার প্রতিদিন নির্বিঘœ পরিবেশে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু গণমাধ্যমে নানা ধরনের শঙ্কার কথা বলে নির্বাচনকে প্রভাবিত করা এবং জনগণের সহানুভূতি অর্জনে বিএনপির প্রচলিত অপকৌশল অব্যাহত রেখেছেন। এক কথায় জিতলে আছি, হারলে নাইÑ অবস্থা বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের। পরাজয়ের শঙ্কায় ভোট বর্জনের হুমকিও দিচ্ছে আবার জনতার সহানুভূতি আদায় করে যদি জেতা যায় সে অপচেষ্টাও চালাচ্ছেন তারা।

খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন
খুলনায় মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র তালুকদার আবদুল খালেক নৌকা প্রতীকে মেয়র পদে নির্বাচন করছেন। এছাড়া বাগেরহাট-৩ আসন থেকে চারবারের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রিসভারও সদস্য ছিলেন আবদুল খালেক। ২০০৮ সালে মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর খুলনা নগরীর ব্যাপক উন্নয়ন করেন। পরিকল্পিত ও উন্নত নগর গড়ে তুলতে বহুমাত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তিনি। কিন্তু ২০১৩ সালে মেয়র নির্বাচিত হতে না পারায় মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের কাজ বাধাগ্রস্ত হয়। গত পাঁচ বছর বিএনপি দলীয় মেয়রের চরম ব্যর্থতার কারণে নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে খুলনা নগরী। যার ফলে খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোটারদের পছন্দ তালুকদার আবদুল খালেক।
ইতোপূর্বে পাঁচ বছর মেয়র হিসেবে দায়িত্বকালে সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতা ও অনিয়ম-দুর্নীতি রোধ করতে তার গৃহীত পদক্ষেপও প্রশংসিত হয়েছিল। মেয়র পদে দায়িত্ব পালনকালে খালেক খুলনার উন্নয়নে এ যাবৎকালের সর্বাধিক এক হাজার কোটি টাকারও বেশি বরাদ্দ আনতে পেরেছিলেন। তার সময়ের মধ্যে ৩০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছিল। পুনরায় মেয়র নির্বাচিত হলে আগের অসমাপ্ত কাজ শেষ করার পাশাপাশি নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া অঙ্গীকার অগ্রাধিকারভিত্তিতে বাস্তবায়ন করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
‘সিটি গভর্নমেন্ট ব্যবস্থা চালু, নগরীর সৌন্দর্যবর্ধন, দুর্নীতিমুক্ত সিটি কর্পোরেশন ও ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়নসহ ৩১-দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছেন খুলনায় আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেক।
ইশতেহারে রয়েছেÑ পরিকল্পনা গ্রহণে পরামর্শক কমিটি, কেসিসি-কে দুর্নীতিমুক্ত করা, কেসিসি-তে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, ‘খুলনা ওয়াসা’কে সহযোগিতা করা, পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন, হোল্ডিং ট্যাক্স না বাড়িয়ে সেবার মান বৃদ্ধি, মাদকমুক্ত নগর, সিটি সেন্টার, নতুন আয়ের উৎস সৃষ্টি, পূর্ণাঙ্গ ‘আইটি ভিলেজ’ গড়ে তোলা, বিনামূল্যে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি, পার্ক-উদ্যান নির্মাণ ও বনায়ন সৃষ্টি, ক্রীড়াক্ষেত্রে উন্নয়ন, সোলার পার্ক আধুনিকায়ন, সড়ক উন্নয়ন, খালিশপুর ও রূপসা শিল্পাঞ্চলের উন্নয়ন, বধ্যভূমিগুলোর স্মৃতি সংরক্ষণ, টাউন সার্ভিস ও ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, নারী উন্নয়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা প্রদান, সুইমিংপুল স্থাপন, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের সহায়তা প্রদান, কবরস্থান ও শ্মশান ঘাটের উন্নয়ন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা গ্রহণ, নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনে আরও উদ্যোগ গ্রহণ, আধুনিক কসাইখানা নির্মাণ ও খুলনা মহানগরীর সম্প্রসারণে উদ্যোগ গ্রহণ।
২১-দফা দাবি উত্থাপন ও সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে তালুকদার আবদুল খালেককে সমর্থন জানিয়েছে খুলনা মহানগর নাগরিক অধিকার বাস্তবায়ন পরিষদ।
উল্লেখ্য, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে খুলনায় মেয়র পদে পাঁচ প্রার্থী ও কাউন্সিলর পদে ১৮৬ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ৩১টি নিয়ে গঠিত খুলনা সিটি কর্পোরেশনের ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৯৩ হাজার ৪৫৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৪৮ হাজার ৯৭৮ জন এবং নারী ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৪৪ হাজার ৪৭৬ জন। ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ২২৮।

গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন
রাজধানী ঢাকার খুব কাছে ও দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সিটি কর্পোরেশন গাজীপুর। আগামী ১৫ মে আসন্ন গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে ৭ জন, সাধারণ আসনের কাউন্সিলর পদে ২৫৬ ও সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর পদে ৮৪ জনসহ মোট ৩৪৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম নৌকা প্রতীকে মেয়র পদে নির্বাচন করছেন। দানবীর হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীর আলম ২০০৯ সালে গাজীপুর সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। সে সময় টঙ্গী এবং জয়দেবপুর থানার পুরো এলাকাবাসীর সঙ্গে সামাজিক-সাংস্কৃতিক-পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সুখে-দুঃখে তিনি তাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সময়ের সাথে সাথে তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে থাকে। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন গঠনের পর মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। শিল্প কল-কারখানার বৃদ্ধির সাথে সাথে শিল্পায়নের ব্যাপক বিকাশের ফলে এ এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি হলে তিনি এলাকার অসংখ্য বেকার যুবকদেরও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন। সরকারি অর্থ বরাদ্দ পেতে সহযোগিতার পাশাপাশি তিনি নিজের অর্থ দান করেছেন মসজিদ, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে। কেউ তার কাছ থেকে খালি হাতে ফেরেন নি। ফলে অল্প সময়ে তিনি এলাকাবাসীর মন জয় করতে সমর্থ হয়েছেন। তাই সাধারণ ভোটাররা তাকেই মেয়র হিসেবে দেখতে চান।
মেয়র নির্বাচিত হলে গাজীপুরকে একটি আধুনিক উন্নত বাসযোগ্য সুন্দর নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে বহুমাত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণের অঙ্গীকার করেছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত মেয়র প্রার্থী অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম।
যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ গাজীপুর সিটিকে একটি আধুনিক গ্রিন সিটিতে পরিণত করা, সুন্দর, পরিচ্ছন্ন এবং পরিকল্পিত নগর গড়ে তোলা, গাজীপুরের ৫৭টি ওয়ার্ডকে ৮টি অর্থনৈতিক জোনে বিভক্ত করে উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেওয়া, সকল নাগরিকের জন্য সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু, নগরবাসীর জান-মালের নিরাপত্তার স্বার্থে সড়কের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা স্থাপন, স্থানীয় গণমাধ্যম ব্যক্তিদের সমন্বয়ে ওয়ার্ডভিত্তিক উন্নয়ন কমিটি গঠন করা, মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা, সৌন্দর্য বৃদ্ধি ও সবুজায়ন করার লক্ষ্যে খালি জায়গায় বৃক্ষরোপণ, নগরীর যানজট ও জলাবদ্ধতা প্রধান সমস্যা সমাধানে ফুটপাতসহ সুষ্ঠু ড্রেনেজ নির্মাণ করে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন করা, শিক্ষা ও সায়েন্স সিটি গড়ে তোলা, ওয়ার্ডভিত্তিক গ্রন্থাগার স্থাপন, শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের মাধ্যমে দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তা প্রদান, স্থানীয় সাংবাদিকদের জন্য স্বল্প মূল্যে আবাসন ও তাদের ছেলে-মেয়েদের শিক্ষা সহায়তা, কমিউনিটি ক্লিনিক সেবা আরও প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প ও স্বাস্থ্য বীমার সুবিধা, অর্থনৈতিক জোন ও শিল্প পার্ক স্থাপনের মধ্য দিয়ে ব্যাপক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।
উল্লেখ্য, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের আয়তন ৩২৯ দশমিক ৫৩ বর্গকিলোমিটার। ৫৭টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ১১,৬৪,৪২৫। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৫ লাখ ৯১ হাজার ১০৭ জন এবং নারী ভোটার ৫ লাখ ৭৩ হাজার ৩১৮ জন। মোট ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ৩৯২। বিকাশমান শিল্প-কারখানাসমৃদ্ধ গাজীপুর মহানগর পূর্বের গাজীপুর ও টঙ্গী পৌরসভা এবং পূবাইল, বাসন, গাছা, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, কাউলতিয়ার ৫৭টি ওয়ার্ড নিয়ে যাত্রা শুরু করে ২০১৩ সালের ১৬ জানুয়ারি।

Category:

হালদা : দেশের বৃহৎ প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র

Posted on by 0 comment

5-7-2018 7-06-57 PMরাজিয়া সুলতানা : নদীমাতৃক বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে নদ-নদীর সংখ্যা প্রায় ৮০০। এর মধ্যে চট্টগ্রামের ছোট্ট একটি নদীর নাম হালদা। ৯৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এই নয়নাভিরাম নদীটি এশিয়ার বৃহৎ এবং একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র। যা প্রকৃতির এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। বিশ্বের একমাত্র জোয়ার-ভাটার নদী। যেখান থেকে সরাসরি কার্প জাতীয় মাছের নিষিক্ত ডিম সংগ্রহ করা হয়। জাতীয় অর্থনীতিতে হালদার অবদান প্রায় বছরে ৮০০ কোটি টাকা, যা দেশের মোট মৎস্য উৎপাদনের প্রায় ৬ শতাংশ। চলতি বছর কার্প জাতীয় মাছের রেকর্ড পরিমাণ ডিম পাওয়া গেছে হালদা নদীতে। যা গত ১০ বছরের রেকর্ড অতিক্রম করেছে। প্রশাসনের এবং স্থানীয়দের সচেতন উদ্যোগের ফলে হালদা দীর্ঘ ‘ডিম খরা’ কাটিয়ে পুরনো রূপে ফিরেছে।
হালদা খালের উৎপত্তিস্থল চট্টগ্রামের মানিকছড়ি উপজেলার বাটনাতলী ইউনিয়নের পাহাড়ি গ্রাম সালদা। সালদার পাহাড়ি ঝরনা থেকে নেমে আসা ছড়া সালদা থেকে নামকরণ হয় হালদা। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার রামগড় পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে মানিকছড়ি, চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ি, হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলার ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বুড়িশ্চরের নিকট কর্ণফুলী নদীতে পতিত হয়েছে। পানির উৎস মানিকছড়ি, ধুরং, বারমাসিয়া, মন্দাকিনী, লেলাং, বোয়ালিয়া, চানখালী, সর্ত্তা, কাগতিয়া, সোনাইখাল, পারাখালী, খাটাখালীসহ বেশ কিছু ছোট ছড়া। নদীটির গভীরতা স্থান বিশেষ ২৫ থেকে ৫০ ফুট। কর্ণফুলী নদীর মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে মিশেছে। তবে দেশের উজান থেকে নামা অন্য কোনো বড় নদীর সঙ্গে এই নদীর কোনো মিল নেই। প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে এখনও এখানে টিকে আছে রুইসহ বিভিন্ন প্রজাতির কার্প জাতীয় মাছ।
সাধারণত বর্ষা মৌসুমের শুরুতে পূর্ণিমা-অমাবস্যা তিথিতে পাহাড়ি ঢলের পানির সঙ্গে বজ্রসহ প্রবল বর্ষণ হলে এবং নদীর পানির তাপমাত্রা অনুকূলে থাকলেই মা মাছ ডিম দেয়। ডিম ছাড়ার এই বিশেষ পরিবেশকে স্থানীয়রা ‘জো’ বলে। জো’র বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অমাবস্যা বা পূর্ণিমা হতে হবে এবং সেই সঙ্গে প্রচ- বজ্রপাতসহ বৃষ্টি। আবার বৃষ্টিপাত শুধু স্থানীয়ভাবে হলে হবে না, তা নদীর উজানেও হতে হবে। এসব শর্তে নদীতে পাহাড়ি ঢলের সৃষ্টি হয়। এতে পানি অত্যন্ত ঘোলা ও খরস্রোতা হয়ে ফেনাকারে প্রবাহিত হয়। জো-এর সর্বশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, নদীতে জোয়ার-ভাটা সৃষ্টি হওয়া। পূর্ণ জোয়ারের শেষে অথবা পূর্ণ ভাটার শেষে পানি যখন স্থির হয় তখনই কেবল মা মাছ ডিম ছাড়ে। আরও অবাক করা ব্যাপার হচ্ছে, মা মাছেরা ডিম ছাড়ার আগে পরীক্ষামূলকভাবে অল্প পরিমাণ ডিম ছাড়ে। যাকে বলা হয় নমুনা ডিম। নমুনা ডিম ছাড়ার পর মা মাছ যদি মনে করে নদীতে ডিম ছাড়ার অনুকূল পরিবেশ বিদ্যমান তবেই ডিম ছাড়ে। নচেৎ ডিম নিজের দেহের মধ্যে নষ্ট করে দেয়। এ কারণে ‘জো’ মা মাছ ও মাছের ডিম সংগ্রাহক উভয়পক্ষের জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
হালদা নদী এবং নদীর পানির কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যা মা মাছকে ডিম ছাড়তে পরিবেশ সৃষ্টি করে। এই বৈশিষ্ট্যগুলো ভৌতিক, রাসায়নিক ও জৈবিক। ভৌতিক কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে নদীর বাঁক এবং অনেকগুলো নিপাতিত পাহাড়ি ঝরনা বা ছড়া। প্রতিটি পতিত ছড়ার উজানে এক বা একাধিক বিল, নদীর গভীরতা, কম তাপমাত্রা, তীব্র খরস্রোত এবং অতি ঘোলাটে। রাসায়নিক কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে কম কন্ডাক্টিভিটি, সহনশীল দ্রবীভূত অক্সিজেন ইত্যাদি। জৈবিক কারণগুলো হচ্ছে বর্ষার সময় প্রথম বর্ষণের পর বিল থাকার কারণে এবং দু-কূলের বিস্তীর্ণ অঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় নদীর পানিতে প্রচুর পরিমাণে জৈব উপাদান মিশ্রিত হয়। ফলে নদীর পানিতে পর্যাপ্ত খাদ্যের প্রাচুর্য থাকে। যা প্রজনন পূর্ব গোনাডের পরিপক্বতায় সাহায্য করে। এছাড়া অনেকগুলো পাহাড়ি ঝরনা বিধৌত হওয়ায় পানিতে প্রচুর ম্যাক্রো ও মাইক্রো পুষ্টি উপাদান থাকে। ফলে নদীতে পর্যাপ্ত খাদ্যাণুর সৃষ্টি হয়। এসব বৈশিষ্ট্যের কারণেই হালদা নদী বাংলাদেশের অন্যান্য নদী থেকে আলাদা। হালদা নদীর বাঁকগুলোকে ‘অক্সবো’ বাঁক বলে। এদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো পানির প্রচ- ঘূর্ণন। যার ফলে গভীর স্থানের সৃষ্টি হয়। স্থানীয়ভাবে গভীর স্থানগুলোকে ‘কুম’ বা ‘কুয়া’ বলা হয়। উজান হতে আসা বিভিন্ন পুষ্টি ও অন্যান্য পদার্থ কুমের মধ্যে এসে জমা হয়। ফলে পানি অতি ঘোলা হয়। মা মাছেরা কুমের মধ্যে আশ্রয় নেয় এবং ডিম ছাড়ে। প্রচ- পানির ঘূর্ণনে মা মাছ ডিম ছাড়ে আর বাবা মাছ ডিমের ওপর শুক্রাণু ছড়িয়ে দেয়। নদীর বাঁকে বাঁকে পানির উলট-পালটের কারণে ডিম এবং শুক্রাণু মিশ্রিত হয়, আমরা পাই নিষিক্ত ডিম।
মানুষও যেমন সব সময় নিয়ম মেনে কাজ করতে পারে নাÑ তেমনি এবার হালদায় পারেনি মাছও। এবার না ছিল পূর্ণিমা, না ছিল অমাবশ্যা। তারপরেও নানা কারণে দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র ‘রুপালি সম্পদের’ খনি বলে খ্যাত হালদা নদীতে ‘জো’ সৃষ্টি হয়েছে। মা মাছ পেয়েছে ডিম ছাড়ার অনুকূল পরিবেশ। ‘জো’ সৃষ্টির কারণ অবশ্য সাগরে ঘনিয়ে ওঠা ঝড়। যার ফলে প্রবল বর্ষণ, বজ্রপাতসহ পাহাড়ি ঢল আর জোয়ার-ভাটায় নদীর পানি ঘোলা হওয়া। ২০ এপ্রিল দুপুরে মা মাছ ‘নমুনা ডিম’ ছাড়ে। হালদা পাড়ে অপেক্ষা করতে থাকে জেলেরা। রাত দেড়টায় বজ্রসহ ভারী বর্ষণ শুরু হলে কার্প (কাতল, রুই, মৃগেল এবং কালিবাউশ) জাতীয় মা মাছ ডিম ছাড়া শুরু করে। রাত আড়াইটা থেকে ডিম সংগ্রহ শুরু করে জেলেরা। হালদার আংকুরিঘোনা, আজিমেরঘাট, গড়দুয়ারা, মার্দাশা, খলিফাঘোনা, নাপিতেরঘোনা, রামদাশ মুন্সিরহাট, বাড়িঘোনা এলাকা থেকে বেশি পরিমাণ ডিম সংগ্রহ করা হয়। এবার ৫ শতাধিক নৌকা দিয়ে ১ হাজারের অধিক জেলে ডিম সংগ্রহ করেছে। সরকারি হিসাবমতে, হালদা থেকে এ বছর ২২ হাজার ৬৮০ কেজি ডিম সংগ্রহ করা হয়েছে। যা থেকে ৩৭৮ কেজির মতো রেণু তৈরি হবে। এবং প্রতিকেজি রেণু থেকে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ পোনা হবে। প্রতিকেজি পোনার মূল্য আনুমানিক ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা। ফলে এই খাত থেকে এবার অর্থনীতিতে যুক্ত হবে কয়েক হাজার কোটি টাকা। এর আগে ২০১৭ সালে ১ হাজার ৬৮০ কেজি, ২০১৬ সালে ৭২০ কেজি, ২০১৫ সালে ২ হাজার ৮০০ কেজি, ২০১৪ সালে ১৬ হাজার ৫০০ কেজি, ২০১৩ সালে ৪ হাজার ২০০ কেজি, ২০১২ সালে ২১ হাজার ২৪০ কেজি, ২০১১ সালে ১২ হাজার ৬০০ কেজি এবং ২০১০ সালে ৯ হাজার কেজি ডিম সংগ্রহ করা হয়েছিল। তবে হালদা থেকে ২০০৭ সালে ডিম সংগ্রহ হয়েছিল ২২ হাজার ৩১৪ কেজি। এছাড়া ২০০৯ সালে ডিম সংগ্রহ হয় ১৩ হাজার ২০০ কেজি। অবাক করার বিষয় ১৯৪৫ সালে হালদা থেকে সংগৃহীত ডিমের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৫০০ কেজিÑ যা থেকে ৫ হাজার কেজি রেণু সংগ্রহ করা হয়েছিল। যা এখনও মাইলফলক হয়ে রয়েছে।
হালদা থেকে সংগ্রহ করা মাছের ডিমগুলো সনাতন পদ্ধতির। পাশাপাশি সরকারি বিভিন্ন হ্যাচারিতে বিশেষ প্রক্রিয়ায় রেণুকে পরিণত করা হয়। রূপান্তরিত রেণু স্থানীয়ভাবে তৈরি করা কূপে ছেড়ে দেওয়া হয়। সব ডিম থেকে রেণু উৎপন্ন হয় না। অনেক ডিম নষ্ট হয়ে যায়। রেণুগুলো ছোট ছোট পুকুরে ছেড়ে দিয়ে পোনায় পরিণত করা হয়। পরে এই পোনা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করা হয়। অন্যান্য পোনার তুলনায় হালদার পোনার চাহিদা অনেকটা বেশি। কারণ হালদার এই পোনাগুলো দ্রুত বর্ধনশীল। প্রতিটি পোনার মাছ কয়েক সপ্তাহে এক কেজির ওপর ওজন হয়। তবে দাম কৃত্রিম পোনার চেয়ে অনেক বেশি। রেণুু পোনা থেকে উৎপাদিত হয় সুস্বাদু মাছ। দেশের মৎস্য খাতে হালদা চার ধাপে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখে। হালদায় বর্তমানে মাছ যে পরিমাণে ডিম ছাড়ে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে ডিম ছাড়ে কাতলা মাছ। ১৮ থেকে ২০ কেজি ওজনের একটি কাতলা মাছ ডিম দেয় প্রায় ৪০ লাখ। প্রথম ধাপে ডিম থেকে রেণু বিক্রি করে, দ্বিতীয় ধাপে ধানী পোনা বিক্রি করে, তৃতীয় ধাপে আঙ্গুলী পোনা বিক্রি করে, চতুর্থ ধাপে এক বছর বয়সে মাছ হিসেবে বাজারজাত করে। প্রতিটি ধাপে প্রায় ৪০ শতাংশ পোনার মৃত্যু হয়। তারপরও একটি মাছ থেকে প্রতিবছর কয়েক কোটি টাকার মাছ উৎপাদন সম্ভব। এ কারণেই হালদার প্রতিটি মা মাছ একেকটি প্রাকৃতিক ‘উৎসের স্মারক’। তথ্য বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, হালদায় একসময় প্রায় ৭২ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। কালক্রমে পাঙ্গাশ, ঘনি চাপিলা, কই, পুঁটি, বানী কোকসা, ঘর পুঁইয়া, গুইজ্জা, আইর, বুদ, বাইলাসহ অন্তত ১৫টি প্রজাতির মৎস্য প্রায় বিলুপ্তর পথে। একসময় হালদায় ২০-২৫ কেজি ওজনের কাতলা, ১২-১৫ কেজি ওজনের রুই এবং ৮-১০ কেজি ওজনের মৃগেল পাওয়া যেত, যা এখন কালেভদ্রে পাওয়া যায়।
এবার হালদা রক্ষায় দৃষ্টি দিয়েছে পরিবেশবান্ধব সরকার। এ উদ্যোগে প্রশাসন ও স্থানীয়রা সচেতন হয়েছেন। আর তাই স্বরূপে ফিরেছে হালদা। প্রশাসন অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি তৎপর ছিল। ফলে মা মাছ যেমন নিধন হয়নি, তেমনি ড্রেজার ও বালু উত্তোলন বন্ধ ছিল। মা মাছের জন্য ক্ষতিকর কোনো কর্মকা- হয়নি হালদায়। ২০১০ সাল হতে হালদা নদীর নাজিরহাট অংশ থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত ৪০ কিলোমিটার এলাকায় মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। ডিম ছাড়ার অনুকূল সব পরিবেশ পেয়েছে মা মাছ। তাই এবার রেকর্ড ডিম ছেড়েছে মা মাছ। ডিম ছাড়ার পর মা মাছ দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সুযোগে অতীতের মতো যাতে কেউ মা মাছ শিকার করতে না পারেÑ সেজন্য হাটহাজারী ও রাউজান উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার নেতৃত্বে হালদা নদীতে টহল দেওয়া হয়েছে।
হালদা নদী কেবল প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ঐতিহ্যই নয়, যোগাযোগ, কৃষি ও পানি সম্পদেরও একটি বড় উৎস। যুগে যুগে হালদা নদী অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অর্থনৈতিক অবদান বিবেচনায় বেশ কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের জন্য হালদা নদী বাংলাদেশের জাতীয় মৎস্য প্রজনন ঐতিহ্যের দাবিদার। এছাড়া এটি ইউনেস্কোর শর্ত অনুযায়ী, বিশ্ব প্রাকৃতিক ঐতিহ্যেরও যোগ্যতা রাখে। কারণ তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, নদী থেকে পোনা আহরণের নজির থাকলেও হালদা ছাড়া বিশ্বের আর কোনো নদীতে এত বিপুল পরিমাণ ডিম আহরণের ইতিহাস নেই।
বর্তমান বিশ্বে মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান চর্তুথ। সুতরাং মাছ রপ্তানির একটি বড় খাত হতে পারে ছোট একটি নাম হালদা। কারণ চিংড়ি ও ইলিশ রপ্তানি হয়। পর্যায়ক্রমে রুই, কাতল, মৃগেল জাতীয় মাছও ব্যাপকহারে রপ্তানি করার উদ্যোগ নিচ্ছে আওয়ামী সরকার। অর্থাৎ মৎস্য সম্পদে দেশের স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথে হালদা নদীর ভূমিকা অনস্বীকার্য।

লেখক : পিএইচডি গবেষক, কৃষিবিদ, শিক্ষক এবং দেশকর্মী

Category:

উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের মর্যাদা রক্ষায় নৌকায় ভোট চাই

Posted on by 0 comment
19

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এই অর্জনকে আরও এগিয়ে নিতে পারব, যদি ডিসেম্বরের নির্বাচনে জনগণ নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করে। দেশের জনগণের ওপরই আমরা সবকিছু ছেড়ে দিয়েছি।

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা দেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে আগামী নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট দেয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের এই অর্জনটা ধরে রাখতে পারব যদি দেশের জনগণ নির্বাচন কমিশন ঘোষিত ডিসেম্বরের নির্বাচনে নৌকায় মার্কায় ভোট দিয়ে আমাদের জয়যুক্ত করে। যদি ক্ষমতার পরিবর্তন হয়, বিএনপি-জামাত জোট বা অন্য কেউ ক্ষমতায় আসলে উন্নয়নের এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারবে না। পারবে একমাত্র আওয়ামী লীগ, এটা আমরা প্রমাণ করেছি।
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে গত ১২ এপ্রিল দশম জাতীয় সংসদের ২০তম অধিবেশনের সমাপনী ভাষণ দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী দেশের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে সরকারের ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে বলেন, আগামী নির্বাচনে আমরা যদি সরকার গঠন করে দেশ সেবার সুযোগ পাই আর এই অর্জনটা যদি ধরে রাখতে পারি তাহলে আগামী ছয় বছরে উন্নয়নশীল দেশ অবশ্যই অর্জন করবই। তিনি বলেন, স্বল্পোন্নত দেশকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত করতে আমাদের পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে হয়েছে। যে তিন শর্ত পূরণ করলে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়া যায়, আমরা সেই ৩টি শর্তই পূরণ করেছি। শুধু শর্ত পূরণ নয়, আমরা অনেক দূর এগিয়ে গেছি। আর যতটুকু এগিয়ে আছি তাতে আগামী ছয় বছরে যতটুকু অর্জন করতে হবে সেটা আমরা এর মধ্যেই পূরণ করে ফেলেছি। কাজেই আগামী ছয় বছরেও কখনও হিসাব-নিকাশে আমাদের পেছনে ফেলতে পারবে না। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি, এগিয়ে যাবই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে এবং স্বাধীনতার সুফল জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। সবসময়ই আমাদের একটাই লক্ষ্য ছিল দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণ করা। যখনই সরকার গঠন করেছি তখনই জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করেছি। নিজে কী পেলাম কখনও সেই হিসাব করিনি, করিও না। হিসাব করি মানুষ কতটুকু পেল, সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে বিবেচ্য বিষয়। বাংলাদেশ আজ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পেয়েছে। এ অর্জনের জন্য আমাদের অনেক পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। এ অর্জনের জন্য আমাদের পরিকল্পিতভাবে কাজ করতে হয়েছে। আমরা ৩টি শর্তই পূরণ করেছি এবং অনেক এগিয়ে আছি। আগামী ছয় বছরে যে অর্জন করতে হবে, সেই অর্জনও আমরা করে ফেলেছি। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি, এগিয়ে যাব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা এই অর্জনকে আরও এগিয়ে নিতে পারব, যদি ডিসেম্বরের নির্বাচনে জনগণ নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করে। দেশের জনগণের ওপরই আমরা সবকিছু ছেড়ে দিয়েছি। জনগণ যদি ভোট দেন তাহলে আমরা ক্ষমতায় আসব। আর এটাও বলতে চাই আমরা উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে শর্তগুলো পূরণে এমন পর্যায়ে করে দিয়েছি যদি আমরা না আসি, অন্য কেউ ক্ষমতায় আসে তারা এটাকে ধ্বংস করতে না চান বা এই উন্নয়নের ধারাটাও অব্যাহত রাখতে পারে তাহলে কিন্তু আমাদের কেউ পেছনে হঠাতে পারবে না। তবে এখানে আমাদের সন্দেহ আছে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলের কথা উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় এসে আমাদের সকল গৃহীত বেশিরভাগ উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ একে একে বন্ধ করে দিয়েছিল। আমরা দেশকে খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা করে রেখে এসেছিলাম। কিন্তু বিএনপি-জামাত জোট ক্ষমতায় আসার পর আবারও দেশ খাদ্য ঘাটতির দেশে পরিণত হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সাক্ষরতার হার কমিয়েছে। যদি ক্ষমতার পরিবর্তন হয়, বিএনপি-জামাত জোট বা অন্য কেউ আসলে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারবে না, পারবে একমাত্র আওয়ামী লীগ। আমরা তা প্রমাণ করেছি।
সংসদ নেতা বলেন, অতীতে সংসদে যে নোংরামি হতো, সেটি অবস্থা আজ নেই। বিরোধী দল এখন সংসদে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখছে। সত্যিকারের পার্লামেন্ট প্রাকটিস এখনই হচ্ছে। যারা ক্ষমতাকে ভোগবিলাস ও নিজেদের ভাগ্য গড়ার কাজে লাগায় তারা কোনোদিন দেশকে কিছু দিতে পারেনি, দিতেও পারবে না। একমাত্র আওয়ামী লীগই দেশকে উন্নয়ন-অগ্রগতি দিতে পারে আমরা তা প্রমাণ করেছি। দেশের একটি মানুষও গৃহহারা থাকবে না, প্রত্যেক মানুষের মৌলিক অধিকার আমরা পূরণ করব। বর্তমান সরকারের সময় প্রায় দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থান করেছি, ১০ লাখ জনশক্তি আমরা রপ্তানি করেছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করছি, যার ফল দেশের মানুষ পাচ্ছে। দেশে রপ্তানি ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি করেছি। দেশের প্রত্যেক মানুষ এখন বলছে আমরা ভালো আছি। বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে কাজ করে যাচ্ছি। আজ উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পেয়েছি। তিনি বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ থাকলে ঋণ পেতে অনেক শর্ত দেয়া হতো। উন্নয়নশীল দেশ হওয়ায় আমাদের কেউ শর্তের বেড়াজালে বাঁধতে পারবে না, কারণ আমাদের সেই মর্যাদা আমরা অর্জন করেছি। বাজেটের ৯০ ভাগ আমরা নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করছি। কারোর কাছে আমাদের হাত পেতে হয় না। আমরা অন্তর দিয়ে মানুষের জন্য কাজ করি, মানুষ ভালো আছে কি না সেটাই আমার মূল লক্ষ্য। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আশীর্বাদ দেশের মানুষের প্রতি আছে বলেই আমরা এ অর্জন করতে পেরেছি।
তিনি বলেন, আমার ধন্যবাদ পাওয়ার কিছু নেই। এটা ছিল আমার কর্তব্য। মানুষের কল্যাণ, ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারব, সেটাই আমার লক্ষ্য। বরং দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানাই, কারণ ভোট দিয়ে আমাদের দেশ সেবার সুযোগ দিয়েছে বলেই বাংলাদেশকে আমরা উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত করতে পেরেছি। আমাদের এ অর্জন জনগণের প্রতি উৎসর্গ করেছি। কারণ তারা আমাদের প্রতি আস্থা-বিশ্বাস রেখেছে। ১৬ কোটি জনগণকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারে না, আমরা তা প্রমাণ করেছি। অনেক ষড়যন্ত্র, বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়েই আমরা এ অর্জন আনতে পেরেছি। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে বিশ্বের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে আমরা বাংলাদেশকে গড়ে তুলতে পারব ইনশাল্লাহ। যে আকাক্সক্ষা নিয়ে জাতির পিতা আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন, কোনো শক্তিই এই স্বাধীনতাকে নস্যাৎ করতে পারবে না। বাঙালি জাতিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না।

‘শেখ হাসিনার নেতৃত্বের বিকল্প নেই’
জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি (সিডিপি) বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের অগ্রযাত্রায় যুক্ত করার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও দেশের জনগণকে ধন্যবাদ জানিয়েছে জাতীয় সংসদে। ১২ এপ্রিল এ সংক্রান্ত ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর দীর্ঘ আলোচনা শেষে সরকার ও বিরোধী দলের সর্বসম্মত কণ্ঠভোটে তা গৃহীত হয়।
ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দক্ষ, সাহসী ও প্রজ্ঞাবান নেতৃত্বের কারণেই বাংলাদেশ আজ সবদিক থেকে উন্নয়নের মহাসড়ক দিয়ে ধাবমান। একমাত্র তার যোগ্য নেতৃত্বের কারণেই বাংলাদেশ আজ বিশ্বের সামনে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের আর কোনো বিকল্প নেই। উন্নয়ন, অগ্রগতি ও আলোকিত এই ধারা অব্যাহত রাখতে হলে শেখ হাসিনা সরকারের কোনো বিকল্প নেই। তাই দেশবাসীকে আগামী নির্বাচনেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বিজয়ী করতে হবে। কেননা শেখ হাসিনা বাংলাদেশের জনগণের জন্য আল্লাহর নিয়ামত। অগ্নিসন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজ, অর্থপাচারকারী ও স্বাধীনতাবিরোধীরা ক্ষমতায় আসলে দেশ আবারও অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।
প্রথমে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং পরে ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বি মিয়ার সভাপতিত্বে ১২ এপ্রিল জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ধন্যবাদ প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন স্বতন্ত্র দলীয় সংসদ সদস্য ডা. রুস্তম আলী ফরাজী। প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নেন বিরোধী দলের নেতা বেগম রওশন এরশাদ, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী শেখ ফজলুল হক সেলিম এমপি, জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এমপি, আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক এমপি, আবদুল মতিন খসরু এমপি, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এমপি, আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এমপি, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ এমপি, সরকারি দলের ডা. দীপু মনি এমপি, আবদুর রহমান, অধ্যাপক আলী আশরাফ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এমপি, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, ড. হাছান মাহমুদ এমপি, মৃণাল কান্তি দাস এমপি, মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, মনিরুল ইসলাম, সানজিদা খানম, ফজিলাতুন নেসা বাপ্পি, নাভানা আক্তার, সাবিনা আক্তার তুহিন, বজলুল হক হারুন, আমাতুল কিবরিয়া কেয়া চৌধুরী, তরিকত ফেডারেশনের নজিবুল বশর মাইজভা-ারী, বিএনএফের এসএম আবুল কালাম আজাদ ও জাসদের শিরীন আখতার। দীর্ঘ আলোচনা শেষে স্পিকার প্রস্তাবটি ভোটে দিলে সরকার ও বিরোধী দলের সর্বসম্মত কণ্ঠভোটে তা সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়।

Category:

দেশে এলো এলএনজি গ্যাস

Posted on by 0 comment

5-7-2018 7-06-57 PMউত্তরণ প্রতিবেদন: বহুল প্রত্যাশার অবসান ঘটিয়ে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) এসে গেছে। গত ২৪ এপ্রিল কক্সবাজারের মাতারবাড়ি উপকূলে নবনির্মিত জেটিতে ভিড়েছে মধ্যপ্রাচ্যের কাতার থেকে আসা এলএনজি বোঝাই বেলজিয়ামের পতাকাবাহী জাহাজ ‘এক্সিলেন্স’। এতে রয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ঘনমিটার তরল গ্যাস। ৭৭ হাজার ৩৪৮ টন ক্ষমতাসম্পন্ন (বিডব্লিউটি-অর্থাৎ ডেড ওয়েট টন) বিশেষায়িত এই জাহাজটি ব্যবহৃত হবে ভাসমান টার্মিনাল হিসেবে। চুক্তি অনুযায়ী ১৫ বছর মেয়াদে ভাসমান টার্মিনাল হিসেবে ব্যবহৃত হবে বিশেষায়িত জাহাজ। এরপর তা বাংলাদেশের মালিকানায় চলে আসবে।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী খায়েজ আহমেদ মজুমদার জানান, জাহাজ এলেও তরলীকৃত এই গ্যাস স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আনতে কিছু ট্রায়ালের প্রয়োজন হবে। এই কাজটি জাহাজেই সম্পন্ন হবে। এরপর তা সমুদ্রের তলদেশের পাইপ দিয়ে চলে আসবে আনোয়ারায় নির্মিত সাবস্টেশনে। তিনি জানান, ইতোমধ্যেই কর্ণফুলী গ্যাস কর্তৃপক্ষ নিজেদের গ্যাস দিয়ে পাইপলাইন কমিশনিং করে রেখেছে। এখন শুধু জাহাজ থেকে গ্যাস এসে পৌঁছার অপেক্ষা। আগামী ১৫ মে’র মধ্যে পাইপলাইনে এলএনজি সরবরাহ সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন কোম্পানির এই শীর্ষ কর্মকর্তা।
এলএনজি সরবরাহের জন্য কক্সবাজারের মহেশখালী থেকে চট্টগ্রামের আনোয়ারা পর্যন্ত ৯১ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইনের কাজ আগেই সম্পন্ন হয়েছে। এই পাইপলাইনের ব্যাস ৩০ ইঞ্চি। আনোয়ারা থেকে সীতাকু- পর্যন্ত আরও ৩০ কিলোমিটার পাইপলাইনের কাজ চলছে, যার ব্যাস ৪২ ইঞ্চি। পরবর্তীতে মীরসরাই ইকনোমিক জোনেও গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে। সে লক্ষ্যেও প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে।
চট্টগ্রামের সীতাকু- পর্যন্ত পাইপলাইন স্থাপন সম্পন্ন না হওয়ায় প্রথম দিকে গ্যাস সরবরাহ করা হবে চট্টগ্রাম নগরীতে। এক্ষেত্রে গুরুত্ব পাবে ক্যাপটিভ পাওয়ার ইউনিটগুলো। নিকট ভবিষ্যতে চট্টগ্রামের চাহিদা মিটিয়ে এই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে। কেননা, যে পরিমাণ গ্যাস আমদানি হচ্ছে তা চট্টগ্রামের চাহিদার চেয়ে বেশি।
মহেশখালীতে এলএনজির প্রথম চালান আসার আগে চট্টগ্রামে এসে পৌঁছেছিল আরও ৫টি টাগ। ডাইডকে এগুলো অবস্থান করছে। এই টাগগুলো ব্যবহৃত হবে বাঙ্কারিং এবং ক্রুদের আনা নেওয়ার কাজে। প্রসঙ্গত, এলএনজি নিয়ে আসা বিশেষায়িত প্রথম জাহাজে রয়েছেন ক্যাপ্টেনসহ ৩০ জন ক্রু ও নাবিক।
দেশে দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র গ্যাস সংকট থাকায় ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে এলএনজি আমদানির দাবি ছিল অনেক দিন ধরে। শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বর্তমান সরকার যুগান্তকারী এই পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় ১৫৬ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ১২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। দৈনিক ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হবে পাইপলাইনে। এই লক্ষ্যে পেট্রোবাংলা এবং এক্সিলারেট এনার্জি বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

Category:

বাকী ও শাকিল উড়াল লাল-সবুজের পতাকা

Posted on by 0 comment

5-7-2018 7-06-57 PMআরিফ সোহেল : ১. দলীয় ইভেন্টে নয়; বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারে একক ইভেন্টে। বারবার এই চিরায়ত সত্যটি উচ্চারিত হয়েছে।
২. অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড; নিদেনপক্ষে ভারতের মতো দেশ ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে যেভাবে চিন্তা করেÑ সেখানে ব্যক্তিগত ইভেন্টই হতে পারে বাংলাদেশের স্বীকৃতি অর্জনের উৎস্যমূল।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটা প্রমাণিত হচ্ছেÑ হয়েছে বারবার। সর্বশেষে কমনওয়েলথ গেমসেও এই সত্য প্রমাণিত করেছেন শুটার বাকী ও শাকিল। কিন্তু তারপরও একক ইভেন্টে টেকসই প্রয়োগ ও কার্যকরী উদ্যোগ নিয়ে কারোর মাথাব্যথা নেই। বরং ক্রিকেট ফুটবলের মতো দলীয় ইভেন্ট নিয়েই ক্রীড়া ফেডারেশনগুলো মাতম-উন্মাদনা চলছেÑ অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে চলবে। ঘুরেফিরে মনে হয়েছে একক নৈপুণ্যের ইভেন্টেই বাংলাদেশের সম্ভাবনার দুয়ার অবারিত। কেউÑ ওই ‘দল দল’ করে মরছেও না। বরং তারা দলের ভেতরে থাকা একক কারিশমাকে যতœসহকারে গুরুত্ব দিচ্ছেন। সাঁতারু মোশাররফ হোসেন, ব্রজেন দাশ, শুটার আতিক-নিনি, স্প্রিন্টার শাহ আলমের সঙ্গে হালের জুনিয়র দাবাড়– ফাহাদ, ভারোত্তোলনের সীমান্ত এবং বাকী-শাকিলরা একক নৈপুণ্যে বিশ্বকে বিস্মিত করার সুযোগ পেয়েছেনÑ পাচ্ছেন। অস্ট্রেলিয়ার গোল্ডকোস্টে বেজে উঠেছে একক কীর্তিগাথার সুললিত সুর। কমনওয়েথল গেমসে গাজীপুরের ছেলে ২৮ বছরের আবদুল্লাহ হেল বাকী এবং খুলনার শাকিল আহমেদ আবারও প্রমাণ করেছেনÑ ক্রিকেট-ফুটবল বাদে বাংলাদেশের অর্জন একক ইভেন্ট থেকেই বেশি। এই সাহসী শুটারদ্বয়ের একজন বাকী কমনওয়েলথ গেমসে ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে; অন্যজন শাকিল ৫০ মিটার পিস্তলে জিতেছেন রৌপ্যপদক। কমনওয়েলথে এটা বাকীর দ্বিতীয় রৌপ্যপদক অর্জনের মাইলফলক হলেও শাকিলের প্রথম। গ্লাসগোতে কমনওয়েলথ গেমসের ২০তম আসরে রৌপ্য জিতেছিলেন বাংলাদেশের সপ্রতিভ মেধাবী শুটার বাকী।
কমনওয়েলথে গল্পের শুরু বাকীকে দিয়ে। চলছে ৮ এপ্রিল ২০১৮ কমওয়েলথের ১০ মিটার রাইলের শিরোপা নির্ধারণী শেষ শটের প্রস্তুতি। উত্তেজনা পারদ তখন আকাশ ছুঁইছুঁই। টপ স্কোরার হওয়ার স্বপ্ন নয়Ñ বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের আবদুল্লাহ হেল বাকী। স্বর্ণ জিততে শেষ শটে প্রয়োজন ১০.১। আগের শটে ১০.২ স্কোর করা বাকী তখন ইনডোরে বাজির ঘোড়া। স্মিথ হাসিমাখা প্রাণোচ্ছ্বল মুখের বাকী তখন ছুটছিলেন দুর্দান্ত গতিতে। ধ্যান-জ্ঞানে নিমগ্ন বাকী ছুড়লেন গুলি। কিন্তু তাতে স্কোর ৯.৭। স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়ার ড্যান স্যাম্পনের কাছে অল্পের জন্য স্বর্ণ হাতছাড়া হয়েছে বাকীর। সবমিলিয়ে স্যাম্পসনের ২৪৫, আর বাকীর ২৪৪.৭। ২০০২ সালে ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টারে কথা ফ্রেমে ভেসে উঠছিল। এই ১০ মিটার এয়ার রাইফেল ইভেন্টেই স্বর্ণ জিতেছিলেন তরুণ আসিফ। দেশ পেয়েছিল স্বর্ণখচিত গৌরবময় সম্মাননা। স্মৃতির সুবিস্তীর্ণ আকাশে তখন ভেসে উঠছিল শুটার আতিকুর রহমান ও আবদুস সাত্তার নিনির মুখও। কারণ ১৯৯০ সালে কমনওয়েলথ গেমসে দেশের হয়ে প্রথম স্বর্ণ জয় করেছিলেন ওই শুটার জুটিই।
অলিম্পিকের পর কমনওয়েলথ গেমস বিশ্বের অন্যতম ঐহিত্যবাহী আসর। এবার ৭৭টি দেশ অংশ নিচ্ছে আসরে। সেখানে শুটার বাকীর কিংবা শাকিলের দ্বিতীয় হওয়া অহম করার মতো গৌরবের। গোল্ডকোস্ট কমনওয়েলথ গেমসের ২১তম আসরে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম পদকও এসেছে আবদুল্লাহ হেল বাকীর রাইফেলের গোলা থেকেই। আর এক পিস্তলে গুলিতে শাকিল উড়িয়েছে জাতীয় পতাকা।
১০ মিটার এয়ার রাইফেলের কোয়ালিফাইং রাউন্ডে ৬১৬.০ স্কোর করে বাকী ফাইনালে ওঠার পর থেকেই স্পট লাইটে ছিলেন। ২৪ রাউন্ডের খেলায় বেশ কয়েকবার শীর্ষে ছিলেন আবদুল্লাহ হেল বাকী। ১৬তম রাউন্ডে থেকেই শুরু হয় ত্রিমুখী লড়াই। সেখানে শামিল হয়েছেন কখনও অস্ট্রেলিয়ান স্যাম্পসন, কখনও ভারতের রাভি কুমার। শীর্ষ নিয়ে জটিল হাড্ডাাড্ডি হচ্ছিল বাকীর সঙ্গে তাদের। ২১তম রাউন্ড শেষে ২০৪.৬ পয়েন্ট নিয়ে ছিটকে পড়েছেন ভারতের রাভি কুমার। তারপর আরও লড়াই। কিন্তু শেষ লড়াইয়ে হেরে গেলেন বাকী। মিডিয়ার মুখোমুখি বাকী বলেছেনÑ ‘স্বর্ণের একদম কাছে থেকে ফিরে এসেছি, একটা দারুণ সুযোগ ছিল। কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিল না। তারপরও আমি সন্তুষ্ট।’ তিনি আরও বলেছেনÑ ‘শুরুতে আমি কোনো চাপে ছিলাম না। শেষ শটেও আমার লিড ছিল, ১০.১ করতে পারলেও হয়তো জিতে যেতাম। তবে যা হয়নি, তা নিয়ে আর ভাবছি না।’
২০০৮ সালে ইসলামাবাদ সাফ গেমসে দলগত ইভেন্টে প্রথম অংশ নিয়েই স্বর্ণপদক জিতে বাকী দৃষ্টি কেড়েছিলেন সংগঠকদের। পরের প্রায় ৯ বছর আন্তর্জাতিক আঙিনায় অর্জনের খড়ায় পুড়ে কাঠ হয়েছিলেন বাকী। এই দীর্ঘ সময়ে সৃষ্টি হয়েছিল বেজায় হতাশা। কিন্তু ভেঙে পড়েন নি। ভেতরের প্রবল ইচ্ছে; অধ্যবসায় ২০১৭ সালে ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে আবার জেগে ওঠেন। বাকী-দিশার সঙ্গে জুটিবদ্ধ হয়ে স্বর্ণ জিতে নিজেকে ফিরে পেয়েছেন। আজারবাইজানের বাকুতে অনুষ্ঠিত চতুর্থ ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে ১০ মিটার এয়ার রাইফেলের মিশ্র দলগত ইভেন্টে আবদুল্লাহ হেল বাকি ও সৈয়দা আতকিয়া হাসান দিশা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশকে স্বর্ণ এনে দিয়ে গৌরবান্বিত করেন।
কমনওয়েলথ গেমসে গোল্ডকোস্টের বেলমন্ট শুটিং সেন্টারে বাকীর পর ছেলেদের ৫০ মিটার পিস্তলে বাংলাদেশকে রুপা উপহার দিয়েছেন শুটার শাকিল আহমেদ। এর আগে ২০১৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে এই ইভেন্টে স্বর্ণ জিতেছিলেন তিনি। বাকীর হাত ধরে প্রথম স্বর্ণ জয়ের পর বড় মঞ্চে আরেকটি ইতিহাস গড়েছেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শুটার শাকিল।
বাংলাদেশকে দ্বিতীয় পদক তুলে দেওয়া খুলনার তরুণ শাকিল ফাইনালে ২২০.৫ স্কোর করে রুপা জিতেছেন। ২২৭.২ পয়েন্ট পেয়ে গেমস রেকর্ড গড়ে স্বর্ণ জয় করেছেন অস্ট্রেলিয়ার ড্যানিয়েল রেফাকোলি। আর এই ইভেন্টে ব্রোঞ্জ জিতেছেন ভারতের ওমপ্রকাশ মিথারওয়াল। ওমপ্রকাশের স্কোর ২০১.১। এর আগে ১০ মিটার এয়ার পিস্তলে অংশ নিয়েছিলেন শাকিল। কিন্তু সেখানে খুব বেশি ভালো করতে পারেন নি। ফাইনালে উঠলেও ষষ্ঠ হয়ে প্রতিযোগিতা শেষ করেন।
শাকিল বাছাইয়ে ৫৪৫ স্কোর গড়ে চতুর্থ হয়ে ফাইনালে ওঠেন। পঞ্চম শট পর্যন্ত ৪৫.৯ স্কোর নিয়ে পঞ্চম স্থানে ছিলেন। ১২ শট পর উঠে আসেন তৃতীয় স্থানে। ১৮ শট পরও ১৬৫.৮ স্কোর নিয়ে তৃতীয় স্থানেই ছিলেন। যদিও স্বর্ণজয়ী রেফাকোলি শাকিলের চেয়ে বরাবরই এগিয়ে ছিলেন। শেষ ২ শটে আগে রেফাকোলির স্কোর ছিল ২০৮.৭, সেখানে শাকিলের ছিল ২০২.২। শেষ শটে স্বর্ণজয়ী রেফাকোলি মেরেছেন ৯.২। আর শাকিল ৮.৭ পয়েন্ট নিয়ে জিতছেন রুপা।
শাকিলকে দিয়েই পিস্তলে নবযুগের সূচনা দেখেছে বাংলাদেশ। রাইফেলের চেয়ে পিস্তলের গুলি তুলনামূলক ব্যয়বহুল। এ জন্য অতীতে পিস্তলের অনুশীলন হতো কম। সাফল্যও সেভাবে ধরা দেয়নি। কিন্তু এবার ফেডারেশন ও সেনাবাহিনী অনুশীলনে কার্পণ্য করেনি। বাংলাদেশকে ১৯৯০ অকল্যান্ড কমনওয়েলথ গেমসে ১০ মিটার এয়ার পিস্তলে স্বর্ণ এনে দিয়েছিলেন আতিকুর রহমান ও আবদুস সাত্তার নিনি। এরপর থেকে পিস্তল ইভেন্ট কখনও আলোচনায় ছিল না। শাকিলের হাত ধরে পিস্তলে আন্তর্জাতিক সাফল্য নতুন স্বপ্নদুয়ার উন্মোচিত করছে। কারণ এসএ গেমসেও শাকিল জিতেছিলেন স্বর্ণ। এবার জিতেছেন কমনওয়েলথ গেমসে।
কমনওয়েলথ গেমসে এবারের আসরে বাংলাদেশের ৩০ জন অ্যাথলেট ১০টি ইভেন্টে অংশ নিয়েছে। তবে পদক জয়ের আশা প্রবল ছিল কেবল শুটিংয়েই। সেই শুটিং থেকেই কমনওয়েলথ গেমসের দুটি রৌপ্যপদক জিতেছেন আবদুল্লাহ হেল বাকী ও শাকিল আহমেদ। কমওনওয়েলথ গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মার্চপাস্টে জাতীয় পতাকাও ছিল এই রৌপ্যজয়ী আবদুল্লাহ হেল বাকীর হাতেই। তার পাশেই ছিলেন শুটার শাকিল। তাদের রাইফেল-পিস্তলে উড়েছে লাল-সবুজের পতাকা।
কমনওয়েলথ গেমস এবং এসএ গেমসে পদকজয়ী বাকী ও শাকিলের চোখ এখনও তাক করে আছে বড় কিছুর আশায়। এবার নিশ্চয় বাকীর রাইফেল আর শাকিলের পিস্তল অলিম্পিকেও লাল-সবুজের পতাকার মেলে ধরার বড় স্বপ্নে বিভোর।

Category:

বিশ্বে নারীর অধিকার আদায়ে শেখ হাসিনার ৪-দফা

Posted on by 0 comment
17

গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড গ্রহণ

উত্তরণ প্রতিবেদক: বিশ্বে নারীর অধিকার আদায় করে নিতে নতুন জোটবদ্ধ হওয়ার আহ্বান এসেছে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে। আর এই লক্ষ্য পূরণে অস্ট্রেলিয়ায় এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ৪-দফা আহ্বান তুলে ধরেছেন তিনি।
সিডনিতে ‘গ্লোবাল সামিট অন উইমেন’-এ গত ২৭ এপ্রিল জমকালো এক অনুষ্ঠানে নারী নেতৃত্বে সফলতার স্বীকৃতি হিসেবে ‘গ্লোবাল উইমেনস লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড’ তুলে দেওয়া হয় শেখ হাসিনার হাতে। সিডনির ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে সম্মেলনের সভাপতি আইরিন ন্যাটিভিডাডের হাত থেকে সম্মাননা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি এই পুরস্কার উৎসর্গ করছি বিশ্বের নারীদের; যারা পরিবর্তনের চেষ্টায় নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়ে চলেছে।’
মিলনায়তনে উপস্থিত নারী অধিকার কর্মী ও বিভিন্ন সংস্থা ও সংগঠনের প্রতিনিধিদের উদ্দেশে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নারীদের সহায়তায়, তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে আমাদের নতুন করে জোট বাঁধতে হবে। যার যার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর মূল্যবোধের জায়গায় থেকেই একসঙ্গে কাজ করতে হবে সেই নারীদের জন্য, যাদের সহায়তা দরকার।’
স্বাধীনতার পর থেকে নারীর ক্ষমতায়নে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যে অগ্রগতি হয়েছে, সেসব তথ্য তুলে ধরে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা বলেন, ‘নারীর ক্ষমতায়নের বাংলাদেশ এখন রোল মডেল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।’
২০১৭ সালের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিবেদন থেকে উদ্ধৃত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের ১৪৪টি দেশের মধ্যে এ দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৭তম এবং দক্ষিণ এশিয়ায় প্রথম। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে ১৫৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম।
এবার ২০০৯ থেকে পরপর দুই মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারে থাকায় সুষ্ঠু, অধিকারভিত্তিক, লিঙ্গ সংবেদনশীল এবং বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছে বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী।
বিশ্বের নারীর অধিকার আদায়ের লক্ষ্য পূরণে তিনি ৪টি প্রস্তাব এ সম্মেলনে তুলে ধরেন।
প্রথমত; নারীর সক্ষমতা নিয়ে প্রচলিত যে ধারণা সমাজে রয়েছে, তা ভাঙতে হবে।
দ্বিতীয়ত; প্রান্তিক অবস্থানে ঝুঁকির মুখে থাকা সেইসব নারীদের কাছে পৌঁছাতে হবে, যারা আজও কম খাবার পাচ্ছে, যাদের স্কুলে যাওয়া হচ্ছে না, যারা কম মজুরিতে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে এবং সহিংসতার শিকার হচ্ছে। কোনো নারী, কোনো মেয়ে যেন বাদ না পড়ে।
তৃতীয়ত; নারীদের উৎপাদন ক্ষমতা বাড়াতে তাদের সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে হবে।
চতুর্থত; জীবন ও জীবিকার সমস্ত ক্ষেত্রে নারীদের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশসহ এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নারী শিক্ষার উন্নয়ন এবং ব্যবসায়িক উদ্যোগে ভূমিকার জন্য শেখ হাসিনাকে এবার এই পুরস্কার দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংস্থা ‘গ্লোবাল সামিট অব উইমেন’।
শেখ হাসিনার হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার আগে নৈশভোজের পর তার জীবন ও কর্ম নিয়ে একটি ভিডিওচিত্র দেখানো হয় সম্মেলনে। ছোট বোন শেখ রেহানাও এ অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনার সঙ্গে ছিলেন। শেখ হাসিনা তার বক্তব্যের শুরুতেই বলেন, ‘গ্লোবাল উইমেন লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড পেয়ে আমি খুবই আনন্দিত এবং সম্মানিত বোধ করছি।’
অস্ট্রেলিয়া সফরের আমন্ত্রণ জানানোয় দেশটির প্রধানমন্ত্রী ম্যালকম টার্নবুলকেও ধন্যবাদ জানান বাংলাদেশের সরকারপ্রধান।

‘২০ বছর মেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা হচ্ছে’
বিএনপি-জামাত জোট দুর্নীতিবাজদের প্রশ্রয় দিয়ে দেশকে পিছিয়ে দিয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত ২৮ এপ্রিল বিকেল অস্ট্রেলিয়ার সোফিটেল হোটেলে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সম্বর্ধনায় এ মন্তব্য করেন তিনি। খবর ওয়েবসাইটের।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য আর ব্যবস্থাপনা ছিল বলেই দেশ আজ উন্নয়নের পথে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপচেষ্টা চালিয়েছিল বিএনপি।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতিহাস যতই বিকৃত করুক। ইতিহাস কিন্তু প্রতিশোধ নেয়। ইতিহাসকে মুছে ফেলা যায় না। বিকৃত ইতিহাস শিখানো হয়েছিল আমাদের প্রজন্মকে। কিন্তু আজকে সত্য উদ্ভাসিত। ৭ মার্চের ভাষণ বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আমি জানি না এখন তারা লজ্জা পায় কি না।
তিনি আরও বলেন, ২০০৫-০৬-তে বাজেট ছিল ৬১ হাজার কোটি টাকা। আজ আমরা এ বছর যে বাজেট দিয়েছি তা ৪ লাখ কোটি টাকা। আমাদের প্রত্যেক কর্মসূচি হচ্ছে গ্রামের মানুষের উন্নতির জন্য। ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি নিয়েছি আমরা। বিডিনিউজ জানায়, ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করতে ইতোমধ্যে ২০ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ শুরুর কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে ক্ষমতার ধারাবাহিকতা যেন থাকে সে প্রত্যাশাও জানান তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, ২০২১ সালের আগেই বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশ হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে উন্নত দেশ। নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনের স্বীকৃতি ইতোমধ্যেই পেয়েছে বাংলাদেশ। দেশের উন্নয়ন কর্মকা- পরিচালনায় তার সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার কথা মনে করিয়ে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা যে পরিকল্পনা নেই, পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা, বিএনপি কিন্তু পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নিত না, অ্যাডহক বেসিসে তাদের পরিকল্পনা ছিল। ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ পঞ্চম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ফের ক্ষমতায় আসার পর ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে আওয়ামী লীগ সরকার বর্তমানে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার কাজ চলছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি ও আশু বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়ার ফলে দেশটা এগিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নের এই ধারা ধরে রাখতে ক্ষমতার ধারাবাহিকতার ওপর গুরুত্বারোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, দেশকে যখন উন্নয়নের একটা ধারায় নিয়ে এসেছি, এটা যেন চলমান থাকে। ওই যুদ্ধাপরাধী, খুনি, জাতির পিতার হত্যাকারীদের পুরস্কৃত যারা করেছে, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না; স্বাধীন বাংলাদেশ মর্যাদা নিয়ে চলুক, ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ হোকÑ এটা যারা বিশ্বাস করে না, তারা যেন আর ক্ষমতায় আসতে না পারে। আমরা রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা এনেছি। লাখো শহীদের রক্তের মর্যাদা আমাদের দিতে হবে।
বাংলার মানুষের জন্য আমার বাবা সারাজীবন কাজ করেছে। আমরা সেভাবেই কাজ করব, সেটাই আমাদের লক্ষ্য। তিনি বলেন, বাংলার মানুষ যখন ভালো থাকে, একটা কিছু ভালো অর্জন হয় তখন সঙ্গে সঙ্গে রেহানাকে (শেখ রেহানা) ফোন করি, কথা বলিÑ আজকে আমরা এই অর্জনটা করতে পেরেছি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা হাসিনা বলেন, আজকে যদি আমার বাবা বেঁচে থাকতেন, বাংলাদেশ স্বাধীনতার ১০ বছরের মধ্যেই উন্নয়নশীল দেশ না, উন্নত দেশ হিসাবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াত। তাকে তো বাঁচতে দেয়া হলো না, তাকে তো কেড়ে নেয়া হলো। ঘণ্টাব্যাপী বক্তব্যে তার সরকারের এই ৯ বছরে বাংলাদেশের উন্নয়নের বিস্তারিত তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানের শুরুতে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়।

Category:

স্যাটেলাইট কথা

Posted on by 0 comment

5-7-2018 7-06-57 PMঅনিন্দ্য আরিফ :  সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে উৎক্ষেপণ করা হবে দেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ আগামী ৭ মে ২০১৮। আর এরই মাধ্যমে নিজস্ব স্যাটেলাইটের অধিকারী বিশ্বের ৫৭তম দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ ঘটবে। এই স্যাটেলাইট স্থাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশের যেমন নির্ভরতা কমবে অন্য দেশের ওপর; তেমনি দেশের অভ্যন্তরীণ টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে। বাঁচবে দেশের বিপুল পরিমাণ অর্থ।
১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর প্রথম স্পুটনিক-১ নামের কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণ দিয়ে মহাকাশ স্টেশনের সূচনা করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের। আর ১৯৫৮ সালের ৩১ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র এক্সপ্লোরার-১ মহাকাশে পাঠিয়ে আকাশ সংস্কৃতির যাত্রাপথকে মসৃণ করেছিল। এরপর সেখানে ধারাবাহিকভাবে ফ্রান্স, জাপান, চীন, যুক্তরাজ্য যুক্ত হয়েছে। যুক্ত হয়েছে ভারত-পাকিস্তানসহ পৃথিবীর ৫৬টি দেশ। ফলে বাংলাদেশও সেই স্বপ্ন বিভোর ছিল। এবার তা বাস্তবায়ন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
উপগ্রহ পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রথম প্রত্যাশিত পরিকল্পনা ছিল পৃথিবীকে নিরাপদ রাখা। আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্য নিশ্চিত হতে, প্রকৃতির নানা জটিলতার আগাম তথ্য পেতে, পৃথিবীর সম্প্রচার-তারহীন যোগাযোগ নির্বিঘœ করতে, বিমান চলাচলে আগাম বিপদবার্তা জানতে, দুর্গম অঞ্চল সম্পর্কে অজানা তথ্য জানতে, জিপিএস সংযোগসহ বিভিন্ন কাজে কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে পাঠানো হয়েছে। শুরু হয়েছে প্রতিযোগিতাও। ফলে মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহের জট সৃষ্টি হচ্ছে। আবার উপগ্রহে-উপগ্রহে ধাক্কাও লাগছে। ভবিষ্যতে এক্ষেত্রে মহাকাশে মহাবিপর্যয়ও দেখা যেতে পারে। তবে প্রযুক্তি নির্মাণ-উন্নয়ন-উৎকর্ষতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, যেসব উপগ্রহ পাঠানো হচ্ছেÑ তা থেকে কোনো বিপদ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আছে অনেক কিছু পাওয়ার। কি পাওয়ার, আর বুঝার আছে আসুন তা জেনে নিইÑ
কৃত্রিম উপগ্রহ মানে আর্টিফিসিয়াল স্যাটেলাইট হলো এমন একটি ভাসমান এবং চলমান বিশেষ কৃত্রিম বস্তু, যা তথ্য সংগ্রহের জন্য অথবা যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে পৃথিবী বা চাঁদ বা অন্য কোনো গ্রহের চারপাশে কক্ষপথে স্থাপন করা হয়েছে। মহাকাশ স্টেশনে মনুষ্যস্থাপিত উপগ্রহগুলো পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরছে। মহাবিশ্বে সূর্য এবং যে সকল মহাজাগতিক বস্তু সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে তা নিয়ে গঠিত হয়েছে সৌরজগৎ। আর বস্তু সূর্যকে ঘিরে প্রদক্ষিণ করছে তাদের বলা হয় গ্রহ (Planet)। আমাদের জানা রয়েছে পৃথিবী সূর্যের একটি গ্রহ। আবার কতকগুলো জ্যোতিষ্ক গ্রহগুলোকে প্রদক্ষিণ করছে এদের নাম Satellite বা উপগ্রহ। চাঁদ পৃথিবীর একটি উপগ্রহ। প্রায় ৩০ দিনে পৃথিবীকে একবার প্রদক্ষিণ করে চাঁদ। পৃথিবীর চারদিকে চাঁদের প্রদক্ষিণের ফলে একটা কেন্দ্রবিমুখী বলের (Centrifugal Force)  সৃষ্টি হয়। যা পৃথিবীর প্রযুক্ত কেন্দ্রমুখী বলের (Centripetal Force) সমান ও বিপরীত। চাঁদ সোজা না গিয়ে পৃথিবীর চারদিকে উপবৃত্তাকার বা ডিম্বাকার পথে ঘুরছে। এ তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই বিজ্ঞানীরা মহাশূন্যযান উপগ্রহ তৈরি করেছে। মহাকাশে উৎক্ষেপিত কৃত্রিম উপগ্রহগুলো ঠিক চাঁদের মতোই পৃথিবীর চতুর্দিকে অবিরাম ঘুরছে। এদের মধ্যে কোনোটি বিভিন্ন গ্রহের ছবি সংগ্রহ করে, কোনোটা আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়াসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের আভাস দিতেও সাহায্য করছে। কিছু স্যাটেলাইট অন্যান্য গ্রহ, সূর্য, কৃষ্ণবিবর বা দূরবর্তী ছায়াপথের ছবি নিতে কক্ষপথে ঘুরছে। এ ছাড়াও এমন কিছু উপগ্রহ রয়েছে যারা যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে মূলত ব্যবহার করা হয়; যেমনÑ টিভি সিগন্যাল, বিশ্বজুড়ে ফোনকলের সংযোগ স্থাপনসহ ইত্যাদি কাজে ব্যবহার করা হয়। ২০টিরও অধিক স্যাটেলাইট ব্যাবহার করা হয় জিপিএস সিস্টেমের কাজে। ফলে দিনে দিনে মানুষ এক অভিন্ন সংস্কৃতির বন্ধনে আবব্ধ হয়ে পড়েছে। যার নাম আকাশ সংস্কৃতি।
টিভি ও বেতার সংকেত প্রেরণ এবং আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকারী কৃত্রিম উপগ্রহগুলো সাধারণত পৃথিবী থেকে ৩৬ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। পৃথিবী থেকে বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করে তথ্য পাঠানো হয়, কৃত্রিম উপগ্রহ সেগুলো গ্রহণ করে এবং বিবর্ধিত করে পৃথিবীতে প্রেরণ করে। কৃত্রিম উপগ্রহ দুটি ভিন্ন কম্পাঙ্কের তরঙ্গ ব্যবহার করে সিগনাল (তথ্য) গ্রহণ এবং পাঠানোর জন্য। কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে পৃথিবীতে আসা সিগনাল অনেক দুর্বল বা কম শক্তিসম্পন্ন হয়ে থাকে, তাই প্রথমে ডিস এন্টেনা ব্যবহার করে সিগনালকে কেন্দ্রীভূত করা হয় এবং পরে রিসিভার দিয়ে গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করা হয়। কৃত্রিম উপগ্রহগুলোর উৎক্ষেপণের সময়ই পর্যাপ্ত জ্বালানি প্রয়োজন হয়। কারণ মহাকাশে রিফুয়েলিংয়ের কোনো সুযোগ নেই। তবে কিছু উপগ্রহে জ্বালানি হিসেবে সৌরশক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এদের গায়ে সৌরকোষ লাগানো থাকে, যা ব্যবহার করে উপগ্রহটি সূর্য থেকে তার প্রয়োজনীয় শক্তি গ্রহণ করে।
কৃত্রিম উপগ্রহগুলো বার্ড আই ভিউর। তাই উপগ্রহের মাধ্যমে ওপর থেকে পৃথিবীকে সরাসরি দেখা সম্ভব। এই কারণে উপগ্রহ থেকে ভূ-পৃষ্ঠে স্থাপিত যে কোনো যন্ত্রের চেয়ে অধিক দ্রুত এবং নিখুঁত তথ্য-ছবি সংগ্রহ করা সম্ভব। এমনকি কোনো বস্তু পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে উপগ্রহ ক্ষমতাসম্পন্ন টেলিস্কোপের চেয়ে অধিক কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। উপগ্রহ এত উপরে স্থাপন করা হয়েছে মেঘ, ধুলাবালি প্রতিবন্ধকতা এড়াতে। উপগ্রহ স্থাপনের আগে টিভি সিগন্যাল বেশি দূর যেত না। কারণ, টিভি সিগন্যাল সরলরেখা বরাবর কাজ করে। উপগ্রহ স্থাপনের পর টিভি সিগন্যাল, ফোনকল প্রথমে পৃথিবী থেকে উপগ্রহে পাঠানো হয়। উপগ্রহ সিগন্যালটি গ্রহণ করে তা পৃথিবীর প্রত্যাশিত স্থানে ফেরত পাঠায়।
কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গার খবর আমরা নিমিষেই পেয়ে যাই। উপগ্রহগুলোকে রকেট বা স্পেস শাটলের কার্গো বেগের মাধ্যমে কক্ষপথে পাঠানো হয়। পাঠানোর সময় রকেট নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহƒত হয় ইনার্শিয়াল গাইডেন্স সিস্টেম (আইজিএস) মেকানিজম। পৃথিবীর অভিকর্ষ পার হতে রকেটকে ঘণ্টায় ২৫ হাজার ৩৯ মাইল ত্বরণে ছুটতে হয়। উপগ্রহ স্থাপনের সময় কক্ষীয় গতি ও তার জড়তার ওপর পৃথিবীর অভিকর্ষের টান এড়াতে ১৫০ মাইল উচ্চতাবিশিষ্ট কক্ষপথে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১৭ হাজার মাইল গতিতে পরিভ্রমণ করানো হয়। গতিবেগ কত হবে, তা নির্ভর করে উপগ্রহটি পৃথিবী থেকে কত উচ্চতায় স্থাপন করতে হবে, তার ওপর। পৃথিবী থেকে ২২ হাজার ২২৩ মাইল উপরে স্থাপিত উপগ্রহ ঘণ্টায় ৭০০ মাইল বেগে পৃথিবীকে আবর্তন করে। পৃথিবীর সঙ্গে উপগ্রহগুলোও ২৪ ঘণ্টা ঘোরে। তবে  ভূ-স্থির বা জিওস্টেশনারি উপগ্রহগুলো এক জায়গাতেই স্থায়ী থাকে। এগুলো আবহাওয়া ও যোগাযোগ সংক্রান্ত কাজে ব্যবহƒত হয়। পৃথিবীর কক্ষপথে উপগ্রহগুলো উপবৃত্তাকার পথে ঘোরে। কাজের ধরন বিবেচনা করে বিভিন্ন উচ্চতার কক্ষপথে উপগ্রহ পাঠানো হচ্ছে। যেমন উদ্ভিদ ও প্রাণী নিয়ে গবেষণা, বণ্যপ্রাণীর চরে বেড়ানো পর্যক্ষেণ, অ্যাস্ট্রোনমি এবং পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা করার জন্য সায়েন্স স্যাটেলাইটকে বসানো হয় ৩০ হাজার থেকে ৬ হাজার মাইল উচ্চতায়। আবার গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) স্যাটেলাইট স্থাপন করা হয় ৬ থেকে ১২ হাজার মাইল উচ্চতায়।
দুই ধরনের উৎক্ষেপণ যন্ত্র রয়েছেÑ অপচয়যোগ্য রকেট এবং মহাশূন্য শাটল। অপচয়যোগ্য রকেটগুলো স্যাটেলাইট স্থাপন শেষে ধ্বংস হয়ে যায়। অন্যদিকে মহাশূন্য শাটলগুলো স্যাটেলাইট স্থাপনের কাজে বারবার ব্যবহার করা যায়। উৎক্ষেপণ যন্ত্রের গতিবেগ উচ্চতার ওপর অনেকটা নির্ভর করে। কম উচ্চতার কক্ষপথে (Low Earth Orbit = LEO)-এর বেগ ৭.৮ কিমি/সেকেন্ড, বেশি উচ্চতার কক্ষপথে (Geostationary Earth Orbit = GEO)-এর বেগ ৩.১ কিমি/সে। কক্ষপথের ভিত্তি করে স্যাটেলাইট সিস্টেমকে কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়। সাধারণত LEO (Low Earth Orbit) পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে ১৬০-২০০০ কিমি উপরে অবস্থিত। পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণকারী স্যাটেলাইটগুলো এই কক্ষপথে থাকে। পৃথিবী পৃষ্ঠের খুব কাছে থাকায় এই কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবীকে খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে। আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন এই কক্ষপথে অবস্থিত। গঊঙ MEO (Medium Earth Orbit) পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে ২০ হাজার কিমি উপরে অবস্থিত। সাধারণত জিপিএস স্যাটেলাইটগুলো এই কক্ষপথে থাকে। এই কক্ষপথের স্যাটেলাইটগুলোর গতিবেগ মন্থর। এই স্যাটেলাইটগুলো পাঠাতে অনেক শক্তির প্রয়োজন হয়। GEO (Geostationary Earth Orbit) পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে ৩৬ হাজার কিমি উপরে অবস্থিত। এই কক্ষপথে অ্যান্টেনার অবস্থান নির্দিষ্ট থাকে। সাধারণত রেডিও এবং টিভির ট্রান্সমিশনের কাজে ব্যবহার করা হয়।
স্যাটেলাইটের অন্যান্য ব্যবহার
১. কৃষিকাজ ডিজিটালাইজেশনে কৃত্রিম উপগ্রহ কাজ লাগানো হচ্ছে। কৃষি জমির মাটির গুণাগুণ, ফসলের ফলন সম্পর্কে আগাম বিস্তারিত ধারণা পাওয়া যায়;
২. সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে সড়কের খুঁতগুলো বের করতে সাহায্য করবে;
৩. নগরায়ণের কাজ সমৃদ্ধ এবং উন্নতি করতে উপগ্রহ ভূমিকা পালন করবে;
৪. এখন পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে নানাবিধ পণ্য আমদানি রপ্তানি হয়। ঘরে বসেই এদের অবস্থান ট্র্যাক করতে স্যাটেলাইট আমাদের সাহায্য করে;
৫. বাতাসের বেগ এবং বায়ুদূষণের পরিমাণ নির্ণয়ে উপগ্রহ সাহায্য করে;
৬. প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য করার কাজে উপগ্রহকে নানাভাবে কাজে লাগানো সম্ভব।
৭. মহাকাশ বা জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণায়;
৮. আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানতে;
৯. টিভি বা রেডিও চ্যানেল, ফোন, মোবাইল ও ইন্টারনেট যোগাযোগ প্রযুক্তিতে;
১০. নেভিগেশন বা জাহাজের ক্ষেত্রে দিক-নির্দেশনায়;
১১. পরিদর্শন পরিক্রমা নিশ্চিত করতে;
১২. দূর সংবেদনশীলতায়;
১৩. মাটি বা পানির নিচে অনুসন্ধান ও উদ্ধার কাজে;
১৪. মহাশূন্য এক্সপ্লোরেশনে;
১৫. সরকারের বিশেষ ছবি তোলার কাজে;
১৬. আজকাল সন্ত্রাসীরা অনেক রিমোট এরিয়ায় স্যাটেলাইট ফোন ব্যবহার করছে, তাদের অবস্থান জানতে;
১৭. গ্লোবাল পজিশনিং বা জিপিএস জানতে;
১৮. গামা রে বারস্ট ডিটেকশন করতে;
১৯. পারমাণবিক বিস্ফোরণ এবং আসন্ন হামলা ছাড়াও স্থল সেনাবাহিনী এবং অন্যান্য ইন্টিলিজেন্স সম্পর্কে আগাম সতর্কবার্তা পেতে;
২০. তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও বিভিন্ন খনি শনাক্তকরণে এবং
২১. ডিজিটাল ম্যাপ তৈরিকরণে

২০১৭ সালের ৪ জুন মাসে ‘ব্র্যাক অন্বেষা’ নামে একটি উপগ্রহ আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছিল। জাপানের কিউশু ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে অধ্যয়নরত পাঁচ দেশের শিক্ষার্থী এই ন্যানো স্যাটেলাইটটি তৈরি করেছেন। যেখানে বাংলাদেশের ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন প্রকৌশল বিষয়ক শিক্ষার্থী রায়হানা শামস ইসলাম অপ্সরা, আবদুল্লাহ হিল কাফি ও মাইসুন ইবনে মানোয়ার যুক্ত ছিলেন। এক কেজি ওজনের এই কৃত্রিম উপগ্রহের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা ছিল ১০ সেন্টিমিটার করে। নতুন এই উপগ্রহে ১২টি কেইউ-ব্যান্ড ট্রান্সপন্ডার রয়েছে। প্রতিটি দেশই অন্তত এর একটি করে ট্রান্সপন্ডার ব্যবহার করছে। ওই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের ফলে সহজ হয়েছে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের কাজটি। যার অপেক্ষায় রয়েছে সমগ্র বাঙালি জাতি।
লেখক : বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ ও নিবন্ধকার

Category: