Blog Archives

নাটেশ্বর দেউল বিশ্বের শ্রেষ্ঠ প্রত্ন আবিষ্কারের একটি

সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি বলেন, ওয়ারী বটেশ্বরের ইতিহাস প্রকৃতপক্ষে ষষ্ঠ শতাব্দীতে শুরু হয়েছে। সেই ওয়ারী বটেশ্বরের পরই বিক্রমপুরের নাটেশ্বর। তিনি বলেন, হাজার বছর আগের পুরনো শহর নাটেশ্বরকে কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, তার ব্যবস্থা নিতে হবে। 

41উত্তরণ প্রতিবেদন: মুন্সিগঞ্জের টঙ্গিবাড়ীর নাটেশ্বর দেউল পৃথিবীর সেরা প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কারগুলোর একটি। বাকি খনন কাজ শেষ হলে শতাব্দী প্রাচীন এই বৌদ্ধ নগরী ‘বিশ্বঐতিহ্যে’র তালিকাভুক্ত হবে। এ ছাড়া বৌদ্ধ প-িত অতীশ দীপঙ্করের জন্মভূমি বিক্রমপুর দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধ সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবেও জায়গা করে নেবে। গত ৬ জানুয়ারি বিকেলে নাটেশ্বর গ্রামে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান বিক্রমপুর অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও গবেষণা প্রকল্পের পরিচালক নূহ-উল-আলম লেনিন ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি। সম্মানিত অতিথি ছিলেন মুন্সিগঞ্জ-২ আসনের এমপি সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি, চীনের হুনান প্রাদেশিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও প্রত্নতত্ত্ব ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক জিন জুং, পরিচালক গু ওয়াইমিন ও হুনান প্রাদেশিক সাংস্কৃতিক ব্যুরোর চিফ চি ইউবিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশীদ, মুন্সিগঞ্জের জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানা, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম, টঙ্গিবাড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার কাজী ওয়াহিদ ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাসিনা আক্তার। সংবাদ সম্মেলনের আগে অতিথিরা প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা ঘুরে দেখেন।
সংবাদ সম্মেলনে অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের সভাপতি নূহ-উল-আলম লেনিন বলেন, বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ পিরামিড আকৃতির নান্দনিক স্তূপটির পূর্ব বাহুর দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৪ মিটার। এর মধ্যে ৪২ মিটার দৈর্ঘ্যরে উত্তর ও দক্ষিণ বাহুর অংশবিশেষ উন্মোচিত হয়েছে। অবশিষ্ট ম-পসহ অষ্টকোণাকৃতির ৩টি স্তূপের খনন বাকি আছে।
সুফি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ২৫ দশমিক ২ মিটার আয়তনের কেন্দ্রীয় স্তূপ (প্রতি বাহুর দৈর্ঘ্য ৯ দশমিক ২ মিটার, কোণাকুণি বাহুর দৈর্ঘ্য ৮ দশমিক ৬ মিটার), বাংলাদেশের বজ্রমান বৌদ্ধ মতবাদের ক্রুশাকৃতির কেন্দ্রীয় মন্দির হিসেবে পরিচিত। ৮ সংখ্যার প্রাধান্য থাকায় অসাধারণ তাৎপর্যপূর্ণ আবিষ্কারটি অষ্টমার্গ স্তূপ। কারণ বৌদ্ধধর্মে অষ্টমার্গ যেমনÑ চিন্তা, সৎ কর্ম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও জানান, প্রতœতত্ত্ব খনন কাজে অন্যান্য আবিষ্কার হলোÑ পূর্ব দিকে প্রবেশ পথসহ ১১ মিটার/১১ মিটার আয়তনের একটি কক্ষ, উত্তর দিকে প্রবেশ পথসহ ৭টি মিটার/৭ মিটার আয়তনের একটি কক্ষ, তদসংলগ্ন ইট বিছানো মেঝেসহ ৪ দশমিক ৮ মিটার এবং ২ দশমিক ৪ মিটার আয়তনের একটি কক্ষ। দক্ষিণ দিকে প্রবেশপথসহ আরও একটি কক্ষ সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে। এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত প্রতœবস্তুর ভিত্তিতে বলা যায় যে, স্তূপ কমপ্লেক্সের মূল প্রবেশ পথটি ছিল উত্তর দিকে। এর আগে আবিষ্কৃত কারুকার্যময় মন্দির ও সীমানা প্রাচীরটিও উল্লেখযোগ্য।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০১৩-১৮ উৎখননে ৫ হাজার বর্গমিটারের বেশি এলাকা উন্মোচিত হয়েছে এবং তাৎপর্যপূর্ণ প্রতœবস্তু আবিষ্কৃত হয়েছে। আমেরিকার বেটা পরীক্ষাগারে ২৬টি কার্বন-১৪ পরীক্ষা করা হয়েছে। এই পরীক্ষার মাধ্যমে নাটেশ্বর বৌদ্ধ বসতির দুটি সময়কাল পাওয়া গেছে। এর মধ্যে প্রথম পিরিয়ড ৭৮০-৯৫০ খ্রিস্টাব্দ, যা শুরু হয়েছিল দেব রাজবংশের সময় (৭৫০-৮০০ খ্রিস্টাব্দ) এবং টিকে ছিল চন্দ্র রাজবংশ (৯০০-১০৫০) পর্যন্ত। নাটেশ্বর বৌদ্ধ বসতির দ্বিতীয় পিরিয়ড হলো ৯৫০-১২২৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত, যা চন্দ্র, বর্ম (১০৮০-১১৫০ খ্রিস্টাব্দ) এবং সেনদের (১১০০-১২২৩ খ্রিস্টাব্দ) শাসন পর্যন্ত টিকে ছিল। তাম্রশাসন অনুসারে চন্দ্র, বর্ম ও সেনদের রাজধানী ছিল বিক্রমপুর। প-িত অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের জন্মস্থান বিক্রমপুরের নাম পাওয়া যায় তিব্বতের ঐতিহাসিক সূত্রে।
সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি বলেন, ওয়ারী বটেশ্বরের ইতিহাস প্রকৃতপক্ষে ষষ্ঠ শতাব্দীতে শুরু হয়েছে। সেই ওয়ারী বটেশ্বরের পরই বিক্রমপুরের নাটেশ্বর। তিনি বলেন, হাজার বছর আগের পুরনো শহর নাটেশ্বরকে কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, তার ব্যবস্থা নিতে হবে। সে সঙ্গে এই প্রতœতাত্ত্বিক খনন কাজের পাশাপাশি গবেষণার মাধ্যমে শিক্ষা অর্জন করতে হবে।

নাটেশ্বর সংরক্ষণে আগামী বাজেটে বরাদ্দ থাকছে : অর্থমন্ত্রী
অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ২০১০ সাল থেকে ঐতিহ্য অন্বেষণ (প্রতœতাত্ত্বিক গবেষণা কেন্দ্র) বিক্রমপুর অঞ্চলে প্রতœতাত্ত্বিক খনন ও গবেষণা কাজ শুরু করে। রামপাল ইউনিয়নের রঘুরামপুর গ্রামে (প্রাচীন বজ্রযোগিনী) বিক্রমপুরী বৌদ্ধ বিহারের ৬টি ভিক্ষু কক্ষ, একটি ম-প ও পঞ্চস্তূপ আবিষ্কৃত হয়। ২০১৩ সাল থেকে টঙ্গিবাড়ি উপজেলার নাটেশ্বর দেউলে প্রতœতাত্ত্বিক খনন চলমান। প্রায় ১০ একর ঢিবিতে উৎখনন কাজের বিশালতা ও সংরক্ষণের কথা চিন্তা করে অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন চীনের হুনান প্রাদেশিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও প্রতœতত্ত্ব ইনস্টিটিউটকে আমন্ত্রণ জানায়। ২০১৩-১৮ যৌথভাবে উৎখননে ৫ হাজার বর্গমিটারের বেশি এলাকায় উৎখনন হয়েছে এবং ইতিহাস পুনর্গঠনের তাৎপর্যপূর্ণ প্রতœবস্তু আবিষ্কৃত হয়েছে। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ পিরামিড আকৃতির নান্দনিক স্তূপ, ৩টি অষ্টকোণাকৃতির স্তূপ; ইট-নির্মিত অতি সুন্দর ৪টি রাস্তা, চারদিকে ৪টি স্তূপ হলঘর পরিবেষ্টিত বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ অষ্টকোণাকৃতির কেন্দ্রীয় স্তূপ। এছাড়া বিভিন্ন পরিমাপের ৪টি কক্ষ এবং অন্যান্য স্থাপত্যিক নিদর্শন উন্মোচিত হয়েছে।
‘সদ্য আবিষ্কৃত প্রাচীন বৌদ্ধ নগরীর নানা নিদর্শন আবিষ্কার বিক্রমপুরের ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করবে।’ গত ৬ জানুয়ারি নাটেশ্বর গ্রামে প্রতœতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও খননে আবিষ্কৃত প্রতœবস্তু নিয়ে প্রেস কনফারেন্সে এই ঘোষণা দেন বিক্রমপুর অঞ্চলে প্রতœতাত্মিক খনন ও গবেষণা প্রকল্প ও অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের সভাপতি নূহ-উল-আলম লেনিন। এতে প্রধান অতিথির ভাষণ দেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি। বিশেষ অতিথি ছিলেন অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি এমপি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. হারুন-অর-রশিদ, জেলা প্রশাসক সায়লা ফারজানা, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জায়েদুল আলম পিপিএম, অধ্যাপক ড. সুফি মুস্তাফিজুর রহমান, চীনা গবেষক অধ্যাপক চাই এবং গেস্ট অব অর্নার হিসেবে অংশ নেন মি. জিনসহ চীনা একটি গবেষক দল।
অতিথিবৃন্দ আবিষ্কৃত পুরাকীর্তি ঘুরে দেখেন। অতিথিরা নাটেশ্বরে আবিষ্কৃত প্রতœতাত্ত্বিক নিদের্শনা দেখে অভিভূত হন। আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি প্রতœতাত্ত্বিক এই কাজে তার সহযোগিতার আশ্বাসের কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এমপি বলেছেন, মহেঞ্জোদারো’র আদলে নাটেশ্বর বৌদ্ধ নগরীকে সংরক্ষণের জন্য আগামী বাজেটে বরাদ্দ থাকবে। সেই লক্ষ্যে একটি প্রকল্প করে নাটেশ্বরের সাথে খনন কাজে সম্পৃক্ত একটি টিম মহেঞ্জোদারোতে পাঠানো হবে। তারা যাতে প্রশিক্ষিত হয়ে আসতে পারে। অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রতœতত্ত্ব ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করে। প্রতœতত্ত্ব ইতিহাসের যে ভুল-ত্রুটি আছে সেগুলো দেখিয়ে দেয় এবং আমরাও চেষ্টা করছি এখানে এই প্রতœতাত্ত্বিক আবিষ্কার তার মাধ্যমে আমাদের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করার।
আমরা নাটেশ্বর এসে দেখতে পাই যে আমাদের পূর্বপুরুষেরা কতটা উন্নত জীবনযাপন করতেন। এখনও আমরা দেখতে পেলাম দেড়শ ফুট রাস্তার। মানে তখনকার সময়ের রাজপথ। তখন তো রাস্তা ছিল ছোট, গাড়িও ছিল ছোট ছোট, রাজপথও ছোট। এটাকে আমাদের সংরক্ষণ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আমার যতটুকু মেয়াদ রয়েছে এর মধ্য এখান থেকে কয়েকজন পর্যবেক্ষণ দলকে প্রশিক্ষণ ও সমৃদ্ধিশালী করতে মহেঞ্জোদারোতে পাঠানো হবে সেই ব্যবস্থাটা আমি করে যেতে চাই। যাতে প্রশিক্ষণ শেষে বিক্রমপুরের এই নাটেশ্বরে কিছু করতে পারি। আমাদের দেশে অনেক কম আছে এই রকম পুরাকীর্তি।
তিনি বলেন, আমরা বিক্রমপুরে ইতোমধ্যে জাদুঘর তৈরি করেছি। এখন নাটেশ্বরের প্রাচীন শহরটাকে তৈরি করব। পুরনো শহর যেটা নাটেশ্বর, এটাকে কীভাবে সংরক্ষণ করা যায়, সেটা আমাদের শিখতে হবে, করতে হবে, এইটাই আমাদের আগামীর দায়িত্ব। এটা যাতে পালন করা যায়, তার জন্য আমার মেয়াদকালে আমি কয়েকজনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে যেতে চাই।

Category:

বঙ্গবন্ধুর সততা ও সাহস অনুকরণীয়

33উত্তরণ প্রতিবেদন: আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বলেছেন, রাজনীতিতে সততা আর সাহসের বিরল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার সততা, সাহস ও আদর্শ রাজনীতিবিদদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। রাজনীতিবিদদের এখান থেকে অনেক শিক্ষা নিতে হবে। ‘কারাগারের রোজনামচা’ ও ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থ দুটি পাঠ করলে সহজ-সরল জীবনযাপন করা এক নির্লোভ রাজনীতিবিদের মুখ হৃদয়পটে ভেসে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর মতো একই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে চলেছেন তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
গত ২৫ নভেম্বর রাজধানীর বিএমএ মিলনায়তনে আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা উপ-কমিটি আয়োজিত ‘৭ই মার্চ : আলোকের ঝরনাধারা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
উপ-কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমান খানের সভাপতিত্বে সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার। আলোচনায় অংশ নেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কবি ড. মুহাম্মদ সামাদ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ, ইউনেস্কোর কান্ট্রি ডিরেক্টর বিয়েট্রিস কালদুন এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা বুলবুল মহলানবীশ। আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক আফজাল হোসেন অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন।
ওবায়দুল কাদের বলেন, যারা রাজনীতি করি, তাদের মধ্যে কয়জন বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন আমি সৎ। আমি শতভাগ সৎ মানুষ, কয়জন বলতে পারবেন? এখানেই সমস্যা। আমরা রাজনীতিকরা যদি দুর্নীতিমুক্ত থাকি, তবে দেশের দুর্নীতি অটোমেটিক্যালি অর্ধেক কমে যাবে। তিনি আরও বলেন, বঙ্গবন্ধু শিখিয়েছেন সততার আদর্শ বড় সম্পদ। একজন রাজনীতিকের জীবনে মানুষের ভালোবাসার চেয়ে বড় আর কিছু নেই। মানুষের ভালোবাসা পেতে হলে সৎ হতে হবে, মানুষকে ভালোবাসতে হবে। এই শিক্ষা বঙ্গবন্ধু দিয়ে গেছেন।
সেতুমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে সততা আর সাহসের রোল মডেল বঙ্গবন্ধু পরিবার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বস্বীকৃত সৎ রাজনীতিবিদ। পরিশ্রমী ও কর্মঠ হিসেবেও তিনি সারাবিশ্বে পঞ্চম। এই সততার মূল্য বাংলাদেশের জনগণের কাছে অবশ্যই রয়েছে। এ পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো অর্থ পাচার বা দুর্নীতির অভিযোগ নেই। কোনো হাওয়া ভবনের আশীর্বাদ নেই। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যরা চাকরি করে খান, ভাড়া বাসায় থাকেন।
ওবায়দুল কাদের বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ভুলে গিয়ে তার নাম নিয়ে অপকর্ম করেন কেউ কেউ। ভূমি দখল, নদী দখল, বন দখলসহ বঙ্গবন্ধুর নামে যারা চাঁদাবাজি করে, তাদের ঘৃণা করি, তিরস্কার করি। এ ধরনের সংগঠন আমাদের দরকার নেই।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মতো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হবে রংপুরেও। সরকার কোনো হস্তক্ষেপ করবে না।
এর আগে মূল প্রবন্ধে সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার বলেন, স্বাধীনতা অর্জনের চূড়ান্ত সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে ধীরে ধীরে প্রস্তুত করেছেন। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়াÑ সমগ্র বাংলাদেশ ঘুরে ঘুরে চারণ রাজনীতিকের ন্যায় তিনি সভা-সমাবেশ করেছেন। পাকিস্তানি শোষকচক্র কীভাবে বঞ্চনা করছে তা তুলে ধরেছেন। ৭ মার্চের ভাষণ ছিল বাঙালিদের স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত হওয়ার আহ্বান ও ইয়াহিয়া খানদের বিরুদ্ধে কড়া সতর্কবার্তা। প্রবন্ধে বলা হয়, সর্বাধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত পৃথিবীর হিং¯্রতম সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে নিরস্ত্র বাঙালিকে ‘যার যা কিছু আছে, তাই নিয়ে’ প্রস্তুত থাকার অমোঘ নির্দেশ যেন সব মারণাস্ত্রের চেয়েও শক্তিশালী। সমকাল সম্পাদক বলেন, বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে যে মুক্তির ডাক দিয়েছিলেন স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও তা পুরোপুরি অর্জিত হয়নি।
সভাপতির ভাষণে অধ্যাপক ড. সাইদুর রহমান খান বলেন, আজ খুশি হতাম যদি বিরোধী দলগুলোও ৭ মার্চের ভাষণের এই বিশ্ব স্বীকৃতিতে উৎসব করত।
ড. খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ৭ মার্চের ভাষণে একটি প্রত্যয় ঘোষণা করা হয়েছে, ‘বাঙালি জাতিকে দাবায়ে রাখতে পারবা না।’ এ প্রত্যয় সবার বুকের ভেতরে থাকতে হবে এবং তা পূরণের জন্য কাজ করতে হবে।
কবি মুহাম্মদ সামাদ বলেন, বঙ্গবন্ধু ছিলেন স্বাধীনতার কবি। তিনি ভাষণ শুরু করেছিলেন ‘ভাইয়েরা আমার’ শব্দ দিয়ে। এ ভাষণে তার মধ্যে সম্ভ্রমবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি বলেছিলেন, ‘তিনি রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা..।’ আজ রাজনীতিতে সম্ভ্রমবোধের বড়ই অভাব।
ইউনেস্কোর কান্ট্রি ডিরেক্টর বিয়েট্রিস কালদুন বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি ঐতিহাসিক নথি ও প্রামাণ্য দলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। ভাষণটির ওপর অনেক পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অপরিসীম। একটি ভাষণের মাধ্যমে একটি জাতিকে একত্রিত করার ইতিহাসের দলিল এটি। ভাষণটি ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়ায় বাংলাদেশ এবং এ দেশের জনগণকে অভিনন্দন জানান তিনি।
সেমিনারে শিল্পী বুলবুল মহলানবিশ বলেন, বঙ্গবন্ধুর এ ভাষণ ৭ মার্চ বেতারে প্রচার করতে দেওয়া হয়নি। প্রতিবাদে বেতারের বাঙালি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ওইদিন কাজ করেন নি। পরদিন ৮ মার্চ তা প্রচার করা হয়।
সেমিনারে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা, সুধীজনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন।
‘শিক্ষাক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকারের অর্জন’ শীর্ষক সেমিনার
গত ১৬ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক উপ-কমিটির উদ্যোগে ‘শিক্ষাক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকারের অর্জন’ শীর্ষক এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক উপ-কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আবদুল খালেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান, উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. নাসরীন আহমদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. এ কে আজাদ চৌধুরী, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান। অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল কাসেম। স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য-সচিব শামসুন নাহার চাপা। বক্তারা বাংলাদেশের শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নয়ন, সম্প্রসারণ এবং অগ্রযাত্রায় আওয়ামী লীগ সরকারের অপরিসীম অর্জন অব্যাহতসহ শিক্ষার উন্নয়নে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির ওপর বিস্তারিত আলোকপাত করেন। সকলেই চমৎকার একটি তথ্যবহুল প্রবন্ধ উপস্থাপনের জন্য অধ্যাপক ড. আবুল কাসেমকে ধন্যবাদ জানান।

দেশের সব অর্জন আওয়ামী লীগের
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু এমপি বলেছেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে। শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করতে হবে। আন্তর্জাতিক পরিম-লে বাংলাদেশের যা কিছু অর্জন তার সবকিছুর মূলে রয়েছে আওয়ামী লীগ, বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার নেতৃত্ব। অন্য কোনো দলের অবদান ছিল না। আগামী নির্বাচনেও আওয়ামী লীগকে জয়ী করার জন্য দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি।
গত ৭ নভেম্বর দুপুরে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা উপ-কমিটি আয়োজিত ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ-বিশ্ব ইতিহাসের অনন্য দলিল’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রাখতে গিয়ে তিনি এ আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও উপ-কমিটির চেয়ারম্যান এইচ টি ইমামের সভাপতিত্বে সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুনুর রশীদ। সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এমপি। এছাড়া সেমিনারে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ইতিহাসবিদ সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম, দৈনিক সমকালের সম্পাদক গোলাম সারওয়ার, দৈনিক এশিয়ানএজের সহ-সম্পাদক বদরুল এহসান, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের আবাসিক প্রতিনিধি কেটি কোল, দিল্লি বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক দিলীপ চক্রবর্তী প্রমুখ। সঞ্চালনা করেন আওয়ামী লীগের উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন।
আমির হোসেন আমু এমপি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ ছিল তার রাজনৈতিক সাধনার বহিঃপ্রকাশ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কোনোদিন পাকিস্তানভিত্তিক রাজনীতি করেন নি। তিনি বাংলাদেশভিত্তিক রাজনীতি করেছেন। তার প্রত্যেকটি পদক্ষেপ পাকিস্তানবিরোধী ও স্বাধীনতার পক্ষে ছিল। তিনি বলেন, ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণটি ছিল তার সারাজীবনের লালিত স্বপ্ন। তিনি সারাজীবন যে চিন্তা করেছেন তা ৭ মার্চের ভাষণে বলেছেন। বঙ্গবন্ধু কোনোদিন পাকিস্তানে বিশ্বাস করেন নি। তিনিই প্রথম পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ গঠন করেন। তিনি ছাত্রলীগকে দিয়ে পাকিস্তানব্যাপী কার্যক্রম পরিচালনা করেন নি। তিনি ছাত্রলীগকে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। তার রাজনৈতিক সাধনার প্রকাশ ঘটেছিল ৭ মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে।
শিল্পমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু এ দেশের জনগণকে যেভাবে আত্মিকভাবে গ্রহণ করেছিলেন আর জনগণ কীভাবে বঙ্গবন্ধুকে গ্রহণ করেছিল তা এই ভাষণের মধ্যে ফুটে উঠেছে। আর তা ছিল অকল্পনীয়। বঙ্গবন্ধুর মাঝে বাঙালি জাতি আস্থা খুঁজে পেয়েছিল। তিনি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যা যা দরকার সব তৈরি করেছেন। প্রতিটি জিনিস বঙ্গবন্ধু করে রেখেছিলেন। হঠাৎ করে উনি কোনো বক্তব্য দেননি। হঠাৎ করে গেলাম আর ভারত আমাদের ১ কোটি জনগণকে আশ্রয় দিল? অস্ত্র দিয়ে দিল? সব কিছু বঙ্গবন্ধু আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলেন।
সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি আমাদের স্বাধীনতার গ্রীন সিগন্যাল ছিল। এ ভাষণটি একটি কার্যকরী ভাষণ ছিল। এখনও অনেকে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ নিয়ে তির্যক মন্তব্য করে বলেন, এটি স্বাধীনতার ঘোষণা নয়। আমি দুটো তথ্য দিতে চাই। ৭ মার্চের ভাষণের পর পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা একটি প্রতিবেদনে বলেছে, চতুর শেখ মুজিব কৌশলে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে গেছেন। আর দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সাপ্তাহিক বিচিত্রায় জিয়াউর রহমান একটি নিবন্ধে লিখেছেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে আমরা দিকনির্দেশনা পেয়েছিলাম।
মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ কেবল সাধারণ মানুষের জন্য নয়, সামরিক বাহিনীর সদস্যদের প্রতিও দিক-নির্দেশনা ছিল। এই ভাষণের সঙ্গে বাঙালি জাতির গভীর আবেগের পাশাপাশি তাদের স্বাধীনতার দিক-নির্দেশনা ছিল। এত সুনির্দিষ্ট ভাষায় স্বাধীনতার বক্তব্য আর কোনোদিন কেউ দিতে পেরেছেন কি না, জানা নেই। এই ভাষণ ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়ায় বাঙালি জাতি আনন্দিত, গৌরবান্বিত।
মূল প্রবন্ধে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক হারুনুর রশিদ বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ একটি জাতি-জনগোষ্ঠীর মুক্তির কালজয়ী সৃষ্টি, এক মহাকাব্য। বহুমাত্রিকতায় তা বৈশিষ্ট্যম-িত। শুধু বাঙালির জন্যই নয়, বিশ্ব মানবতার জন্যও অবিস্মরণীয়, অনুকরণীয় এক মহামূল্যবান দলিল বা সম্পদ। ইউনেস্কোর সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে এটিই স্বীকৃত। তিনি বলেন, গণতন্ত্র, উচ্চ মানবিকতা, ত্যাগ ও দেশপ্রেমের উজ্জ্বল আদর্শ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের সংগ্রাম, জাতিভেদ-বৈষম্য ও জাতি-নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিশ্বমানবতার মুক্তির সংগ্রামে যুগে যুগে এ ভাষণ অনুপ্রেরণা জোগাবে। সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে নবীন প্রজন্ম, রাজনৈতিক নেতৃত্ব রাষ্ট্রনায়ক, সমরকুশলী সবার জন্যই এ ভাষণে রয়েছে অনেক কিছু শিক্ষণীয়।
সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ার বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণে সশস্ত্র অপশক্তির বিরুদ্ধে নিরস্ত্র বাঙালিকে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তার নাতিদীর্ঘ ভাষণের পর বাঙালি যেভাবে লড়াই করেছে এই রকম ইতিহাস পৃথিবীর অন্য কোথাও আছে বলে আমার মনে হয় না। তিনি ৭ মার্চের ভাষণটিকে দু’ভাগে বিভক্ত করেন। যার প্রথমটি ছিল স্বাধীনতা, দ্বিতীয়টি পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে কড়া সতর্কবার্তা।
সভাপতির বক্তব্যে এইচ টি ইমাম বলেন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের ¯্রষ্টা ও মহান স্থপতি। এটিই তার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন। আর তার ৭ মার্চের ভাষণ পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ। বিশে^র অতুলনীয় এক সম্পদ। এটি এক মহাকাব্যিক ভাষণও, যেখানে বাঙালির কথা, দেশের কথা ও মনের কথাই ফুটে উঠেছে।

Category:

সমঝোতা ও সংশয় দুই-ই আছে

36রাজীব পারভেজ: রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার যে প্র্যাগমেটিক পদক্ষেপ নিয়েছেন, তা একদিকে যেমন বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত, তেমনি স্বার্থান্বেষী মহল, বিশেষ করে বিএনপি নানা অপপ্রচারে লিপ্ত হয়েছে। সরকার বলেছে, এটা সূচনামাত্র। তবে আত্মপ্রসাদ লাভ করার কিছু নেই। মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠীর ওপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত রেখেই আমাদের এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথে ধৈর্যের সাথে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে যেতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপরোক্ত বক্তব্যের পর এ নিয়ে আর কোনো বিতর্কের অবকাশ থাকার কথা নয়। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে যেটুকু অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, এই প্রতিবেদনে আমরা এর কিছু বিস্তারিত তথ্য পাঠকের কাছে তুলে ধরতে চেয়েছি।
রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে নেপিডোতে সম্প্রতি যে দলিল স্বাক্ষরিত হয়েছে সেটি এ সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে কতটা ভূমিকা রাখবে তা নিয়ে নানা বিশ্লেষণ চলছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ দলিল স্বাক্ষরের মাধ্যমে অন্তত একটি কাজ হয়েছে। সেটি হচ্ছে, রোহিঙ্গা ফেরত নেবার প্রক্রিয়া কাগজপত্রে চালু করা। সেটি ইতিবাচক। কিন্তু এ কাজ যে বেশ কঠিন হবে সেটি ইঙ্গিত এরই মধ্যে পাওয়া গেছে বলে করা হচ্ছে। ১৯৯২ সালে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে যে চুক্তি ছিল সেটিকে ভিত্তি করে কিছু হোক সেটি বাংলাদেশ চায়নি। বাংলাদেশ চেয়েছিল রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়া কবে নাগাদ শেষ হবে সেটির উল্লেখ থাকুক নতুন স্বাক্ষরিত ইন্সট্রুমেন্টে। কিন্তু সে বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণও চেয়েছিল বাংলাদেশ। রোহিঙ্গাদের সবাইকে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোই বাংলাদেশের মূল লক্ষ্য। নতুন স্বাক্ষরিত দলিল অনুযায়ী সেটা কতটা সম্ভব হবে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
বাংলাদেশের বিরামহীন চেষ্টা ও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে নিতে রাজি হয়েছে মিয়ানমার। রাখাইনে সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে সমঝোতা স্মারকে সই করেছে দুই দেশ। আগামী দুই মাসের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবেÑ এমন আশাবাদের মধ্যে মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে দেশ দুটির মধ্যে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত চুক্তিটি হলো। বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ও মিয়ানমারের পক্ষে স্টেট কাউন্সিলর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সু চি’র দফতরের মন্ত্রী কিয়া তিন্ত সোয়ে এতে সই করেন।
এ ছাড়া আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে ‘জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠন ও এজন্য যত দ্রুত সম্ভব একটি সুনির্দিষ্ট চুক্তি স্বাক্ষরের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে সম্মতিপত্রে। তবে কতদিনের মধ্যে রোহিঙ্গাদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শেষ হবে সে বিষয়ে এতে কোনো সময়সীমার উল্লেখ নেই। তারপরও আশা করা হচ্ছে, এ চুক্তির ফলে নির্যাতিত-নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের নিজ ভূমিতে ফেরার পথ কিছুটা সুগম হবে। সমঝোতা স্মারক সইয়ের আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি’র কার্যালয়ে তার সাথে বৈঠক করেন। মিয়ানমারের শ্রম, অভিবাসন ও জনসংখ্যা বিষয়ক দফতরের পার্মানেন্ট সেক্রেটারি মিন্ট চিং জানান যে, বাংলাদেশ নিবন্ধন ফরম পূরণ করে মিয়ানমারকে ফেরত পাঠালে যত দ্রুত সম্ভব তাদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে। এ চুক্তির ফলে খুশি কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা। তবে দেশে ফেরার ক্ষেত্রে মিয়ানমার সরকার তাদের কতটুকু নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ দেবে তা নিয়ে তারা সন্দিহান।
মিয়ানমার সরকারের বক্তব্য হলো বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ঘটবে তাদের পরিচয় যথাযথভাবে যাচাই করার পর। ১৯৯২ সালে দুদেশের মধ্যে যে যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয় তার মধ্যে এ বিষয়ে দিক-নির্দেশনা ও নীতিমালা ছিল। মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দুই দেশের মধ্যে সর্বশেষ সমঝোতাকে ‘উইন-উইন সিচুয়েশন’ বা দুপক্ষের জন্য বিজয় বলে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রত্যাবাসন নিয়ে দুই দেশের মধ্যে এটি তৃতীয় উদ্যোগ। এর আগে ১৯৭৮ সালে দুই দেশ চুক্তি করে। যার অধীনে ২ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা ৬ মাসের মধ্যে ফেরত যায়। পরে ১৯৯২ সালে দুদেশের মধ্যে আরেকটি সমঝোতা হয়, যার অধীনে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ২ লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফেরত যায়। এ ছাড়া আগে থেকেই ৫ লাখের বেশি রোহিঙ্গা কক্সবাজারে অবস্থান করছে। এতে মোট রোহিঙ্গা সংখ্যা সাড়ে ১১ লাখ ছাড়িয়েছে। রাখাইনে শত শত বছর ধরে বসবাস করে এলেও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিজেদের নাগরিক মনে করে না মিয়ানমার। মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি তার ভাষণে বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা ফেরত নেওয়া প্রসঙ্গে ১৯৯২ সালে দুদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির কথা উল্লেখ করেছেন। তবে মিয়ানমার নিজেই এ চুক্তি ভঙ্গ করেছে। ১৯৯২ সালের ওই চুক্তির একটি ধারায় বলা ছিল, ‘মিয়ানমারে বসবাসকারীরা যেন বাংলাদেশে পালিয়ে না আসে তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার বিষয়ে মিয়ানমার সরকার সম্মত হয়েছে।’ তবে মিয়ানমার বারবার এর লঙ্ঘন করে যাচ্ছে। ১৯৯২ সালের চুক্তি অনুযায়ী ২০১৪ সালে দুদেশের যাচাইকৃত ২ হাজারের বেশি রোহিঙ্গাকে ফেরত নিতে বললে মিয়ানমার সরকার সম্মত হয়। কিন্তু গত তিন বছরেও এই রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফেরত যেতে পারেনি।
উল্লেখ্য, ১৯৬২ সালে নে উইন সরকার মিয়ানমারে ক্ষমতায় এলে রোহিঙ্গা-বিরোধী অভিযান শুরু হয়। ১৯৭৮ সালে প্রথম রোহিঙ্গারা দলে দলে বাংলাদেশে আসা শুরু করে। এরপর ১৯৯১-৯২ সালে তারা আবার দলে দলে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে শুরু করলে দুদেশের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে ওই রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। ২০০৫ সালে রোহিঙ্গা ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া মিয়ানমার এককভাবে বন্ধ করে দেয়। ২০১২ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অজুহাতে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন শুরু করলে তারা আবার আসা শুরু করে। ২০১৬ সালে ৩টি পুলিশ চৌকিতে আক্রমণের অজুহাতে রোহিঙ্গাদের ওপর ফের নতুন করে নির্যাতন শুরু করে মিয়ানমারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রায় এক বছর পরে গত ২৪ আগস্ট আবার ২৪ থেকে ৩০টি পুলিশ চৌকিতে হামলার অজুহাতে নতুন মাত্রায় রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন শুরু হয়।
মিয়ানমারের সাথে ভারত-চীন উভয়েরই সীমান্ত রয়েছে। ভারতের নাগাল্যান্ড, মিজোরাম ও মনিপুর রাজ্যের বেশ লম্বা সীমান্ত রয়েছে মিয়ানমারের সাথে। এই সীমান্তে বিদ্রোহী সংকটের অস্তিত্বের কথাও শোনা যায়। ফলে মিয়ানমারকে কিছুটা সমীহ করে চলতেই হয় ভারতের। অন্যদিকে রাখাইন রাজ্য ও বঙ্গোপসাগরীয় উপকূল ঘিরে চীনের যে বিশাল বাণিজ্যিক কর্ম পরিকল্পনা সেটিও আমলের বাইরে রাখার সুযোগ নেই ভারতের। ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে মিয়ানমার এ মুহূর্তে ভারতের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অতএব, বাংলাদেশের খুব কাছের বন্ধু হলেও ভারতকে রোহিঙ্গা সংকটে খুব হিসাব করে পা ফেলতে হচ্ছে, সন্দেহ নেই।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে দেওয়া বিবৃতিতে ভারত বেশ স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছে, রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত সমাধান করতে হবে এবং তা কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই। ঢাকায় এসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ দৃঢ়তার সাথেই বলেছেন, রাখাইন থেকে বল প্রয়োগে পালিয়ে আসা নাগরিকদের মিয়ানমারকে ফেরত নিতেই হবে। অনেকে মনে করেন, জাতিসংঘ রাখাইনে নির্যাতন বন্ধের আহ্বানে যতটা সোচ্চার, রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে ততটা উচ্চকণ্ঠ এখন পর্যন্ত নয়।
অন্যদিকে চীন সবাইকে হটিয়ে মিয়ানমারে তার একক আধিপত্য অনেকটাই বিস্তার করে রেখেছে। প্রকৃত অর্থে বলতে গেলে চীনই মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ক্ষমতা দখল ও দীর্ঘদীন ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার নেপথ্যের শক্তি। মিয়ানমারে বিলাস, ব্যাসন ও বাণিজ্যে সুবিধাজনক অবস্থানে আছে চীন। ফলে বিপুল সম্পদের অধিকারী হয়েও মিয়ানমার অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে অনেক পিছেয়ে। রাখাইনে আজকের যে সংকট তার পেছনেও করুণ এবং দুর্বল আর্থ-সামাজিক অবস্থা অনেকটাই দায়ী। সে যাই হোক, চীন যদি ইতিবাচক হয় তাহলে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রেক্ষাপট রাতারাতিই বদলে যাবে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন বলেছেন, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে চলমান সহিংসতার প্রাপ্ত তথ্য সতর্ক ও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণের পর এটা স্পষ্ট যে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন অভিযান চালানো হয়েছে। সেখানে যে ধরনের ভয়াবহ নৃশংসতা সংগঠিত হয়েছে তা কোনো উসকানির অজুহাত দিয়ে আড়াল করা যাবে না। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনযজ্ঞ চালানোর জন্য সেনাবাহিনী ও স্থানীয় উগ্র পাহারাদার গোষ্ঠীকে দায়ী করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। মার্কিন আইন প্রণেতারা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো আগে থেকেই ট্রাম্প প্রশাসনকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতাকে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ ঘোষণা করতে আহ্বান জানিয়ে আসছিল। মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের সাম্প্রতিক সুপারিশ অনুযায়ী টিলারসন সেই ঘোষণা দিয়েছেন। এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণার পর মিয়ানমারের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে ট্রাম্প প্রশাসন ও কংগ্রেসের ওপর চাপ বাড়ছে। মিয়ানমারে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের পর সম্প্রতি কয়েক বছরে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের জন্য আরও ৪৭ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দেবে যুক্তরাষ্ট্র। আগস্ট ২০১৭ থেকে শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার পরিমাণ দাঁড়াল মোট ৮৩ মিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা বাংলাদেশের মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম পরিচালনায় নিয়োজিত আন্তর্জাতিক অংশীদার সংস্থাগুলোর কাছে পৌঁছায়। যার মধ্যে রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল অরগানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (আইওএম), ইউএন হাইকমিশনার ফর রিফিউজিস (ইউএনএইচসিআর), ইউএন চিলড্রেনস ফান্ড (ইউনিসেফ) এবং ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রাম (ডব্লিউএফপি)। এসব সংস্থা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে উচ্ছেদ হওয়া ৬ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার সুরক্ষা, জরুরি আশ্রয়, খাদ্য এবং পুষ্টি সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং মানবিক ও সামাজিক সহায়তা দিচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ ও তাদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের নেত্রী ও স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি’র ওপর চাপ প্রয়োগ করেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। কানাডার প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়া এবং জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে আন্তরিক ইচ্ছের কথাও সু চি’র কাছে ব্যক্ত করেছেন। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবর্তনে বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন কানাডার আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী ম্যারি ক্লদ বিবেয়্যু। ঢাকা সফরকালে তিনি মিয়ানমার কর্তৃক বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ মানবতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেÑ যা বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। রোহিঙ্গাদের শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রদত্ত ৫-দফা বাস্তবায়নে কানাডা বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে জানানো হয়। বঞ্চিত রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের সার্বিক উন্নয়নে ইতোমধ্যে কানাডা সরকার ২৫ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছে।
এছাড়া রোহিঙ্গা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে কক্সবাজারে গিয়েছিলেন জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারো কোনো, জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিগমার গ্যাব্রিয়েল ও সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মারগট ওয়ালস্টার। তাদের সাথে ছিলেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রধান ফেদেরিকো মঘেরিনি।
কমনওয়েলথ দেশগুলোর পার্লামেন্ট সদস্যরা সর্বসম্মতিক্রমে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত নৃশংসতার, যা গণহত্যার শামিল, নিন্দা জানাচ্ছে এবং অবিলম্বে মিয়ানমারকে তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি জানায়। সিপিএ’র ৬৩তম সম্মেলনের সাধারণ অধিবেশনে এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। নিরাপত্তা ও মর্যাদার সাথে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে পুনর্বাসন এবং এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য কফি আনান কমিশনের সুপারিশের আলোকে তাদের নাগরিকত্ব দিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানানো হয় ওই প্রস্তাবে।
মিয়ানমারে জাতিগত নিধনের শিকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য আরও ১ কোটি ২০ লাখ ব্রিটিশ পাউন্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় যার মূল্য ১৩৫ কোটি ৬০ লাখ টাকা) সহায়তা পাঠাতে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য। এর মধ্য দিয়ে গত আগস্ট থেকে রোহিঙ্গাদের জন্য যুক্তরাজ্যের দেওয়া সহায়তার পরিমাণ দাঁড়াবে ৫৯ মিলিয়ন পাউন্ডে; বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৬৬৬ কোটি ৮২ লাখ টাকা। নতুন করে পাঠাতে যাওয়া সহায়তাগুলো বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য, পয়ঃনিষ্কাশন, আশ্রয়, সাবান, রান্না, বাসন-কোসন ও পানির পাত্র বাবদ ব্যয় করা হবে। যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিভাগ বলছে, যদি দেশগুলো দীর্ঘমেয়াদে সহায়তা নিয়ে এগিয়ে না আসে তবে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় গঠিত তহবিলটি আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি নাগাদ শূন্য হয়ে পড়বে। যুক্তরাজ্য সরকারের আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী পেনি মরডন্ট সম্প্রতি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে নতুন করে রোহিঙ্গাদের জন্য অর্থ সহায়তা পাঠানোর ঘোষণা দেন। যুক্তরাজ্য এখনকার মতো ভবিষ্যতেও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে আশ্বাস দেন মরডন্ট। অন্যান্য দেশের সাথে যুক্তরাজ্যও মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে, যাতে তারা রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসন করে। বাংলাদেশ সফরকালে যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক মন্ত্রী পেনি মর্ডান্ট এমপি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে সাক্ষাৎকালে জানান, যুক্তরাজ্যে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থাপিত ৫-দফা প্রস্তাবকে পুরোপুরি সমর্থন করে। লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ যে মানবিকতার পরিচয় দিয়েছে তিনি তার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গাদের জন্য মিয়ানমারের ঠিকানাসহ পরিচয়পত্র ইস্যু করার বিষয়টি তুলে ধরেন।
রাখাইনে সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ঘরে ফেরার পথ তৈরি করতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে একটি সম্মতিপত্র স্বাক্ষরিত হওয়ার পরও ইউএনএইচসিআর মনে করে ফেরার মতো পরিস্থিতি এখনও হয়নি। তাদের ফেরার পথ তৈরি করতে নেপিদোতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এমপি এবং মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলরের দফতরের মন্ত্রী কিয়া তিন্ত সোয়ে একটি সম্মতিপত্রে (অ্যারেঞ্জমেন্ট) সই করেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তিন সপ্তাহের মধ্যে একটি ‘জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠন করে দুই মাসের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করা এবং এজন্য যত দ্রুত সম্ভব একটি সুনির্দিষ্ট চুক্তি স্বাক্ষরের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে সম্মতিপত্রে। ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র আদ্রিয়ান এডওয়ার্ড ওই সম্মতিপত্রে কী আছেÑ তা এখনও তারা দেখেন নি বলে জানান। তবে সহিংসতার শিকার হওয়া মিয়ানমারের ওই জনগোষ্ঠীর রাখাইনে ফেরার বিষয়টি যেন স্বেচ্ছায় এবং নিরাপদে হয়, তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয় এ সংস্থা। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা এবং এ বিষয়ে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত ইউএনএইচসিআর ।
এডিবির দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক মহাপরিচালক হুম কিম বলেছেন বাংলাদেশ সরকার চাইলে দেশটিতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের সহায়তা করতে প্রস্তুত আছে এডিবি। কিন্তু এডিবি যেহেতু ব্যাংক, তাই এডিবি সরাসরি অনুদান দিতে পারে না। তবে একটি পন্থা বের করে রোহিঙ্গাদের অনুদানই দেওয়া হবে। আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ৮ বিলিয়ন ডলার বা ৮০০ কোটি ডলার ঋণ সহায়তা দেবে এডিবি।
রোহিঙ্গা নিপীড়ন বন্ধে রাখাইনে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিচারের দাবি জানিয়ে এক বাংলাদেশি-আমেরিকানের পাঠানো আবেদন ও তথ্য-উপাত্তের প্রাপ্তি স্বীকার করেছে হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে কার্যক্রম চালানো মানবাধিকার সংস্থা ‘সেইফ রাইজ ফাউন্ডেশনের’ প্রেসিডেন্ট ও চিফ কাউন্সিলর তারিকের কাছে ওই আবেদনের প্রাপ্তি স্বীকার করে একটি চিঠি পাঠিয়েছে ওই আদালতের প্রসিকিউটর কার্যালয়ের তথ্য-উপাত্ত ইউনিট। গত ৬৫ বছরে মিয়ানমার বাহিনীর বর্বরতায় ১ কোটি রোহিঙ্গা নিহত এবং প্রায় ৩ কোটি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৫ আগস্ট থেকে শুরু নৃশংসতার কারণে আরও ৬ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন। যারা এখনও বসতভিটা আঁকড়ে রয়েছে, তাদের ওপর চলছে মিয়ানমার বাহিনীর পাশবিকতা। এসব তথ্য ও সাম্প্রতিক নৃশংতার কিছু তথ্য-উপাত্ত পাঠিয়ে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর বিচারের দাবি জানানো হয় আবেদনে।
জেনেভায় অনুষ্ঠিত রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মোট ৩৪ কোটি ৪০ লাখ ডলারের তহবিল উত্থাপনে ইইউ এবং এর সদস্য রাষ্ট্রগুলো ৫ শতাংশ প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেয়। ইউরোপীয় কমিশনের মানবিক সাহায্য ও সমস্যা সমাধান বিষয়ক কমিশনার ক্রিস্টোস স্টাইলিয়ানিডেস বাংলাদেশ সফরে আসার পর জানান, রোহিঙ্গাদের সহায়তার বিষয়টি ইইউ জোরদার করছে। ইইউ বাংলাদেশ সরকারের রোহিঙ্গাদের প্রতি উদার মনোভাবের প্রশংসার পাশাপাশি সরকারের মানবিক উদ্যোগকেও সমর্থন করে বলে জানান।
মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধিতে জাপান কাজ করে যাচ্ছে বলে জানায় দেশটির রাষ্ট্রদূত হিরোয়াসিও ইজুমি। বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করে জাপান। প্রধানমন্ত্রীর রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানের সিদ্ধান্ত মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বলে জানানো হয় জাপানের পক্ষ থেকে। রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় জাপান বাংলাদেশের পাশে থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়।
রোহিঙ্গাদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা করতে সরকার ২ হাজার ৩১২ কোটি টাকার প্রকল্প পাস হয়েছে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার ঐশ্বরচর ইউনিয়নের ‘ভাসানচর’ দ্বীপে তাদের পুনর্বাসন করা হবে। এ অর্থ পুরোটাই সরকারের তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে। এর আগে বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। পরবর্তীতে তারা এ প্রকল্পে যোগ দেবে। কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ায় স্থানীয় অধিবাসী রয়েছে ৫ লাখ ৭০ হাজার। কিন্তু মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা নতুন ও পুরান সব মিলে বর্তমানে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন। ফলে সামাজিক ও পরিবেশগত নানাবিধ সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। তাই প্রাথমিকভাবে অসহায় ১ লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে পুনর্বাসন করা হবে। চলতি মাস নভেম্বর থেকে আগামী ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ চলবে; যা বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। বসবাসের জন্য প্রথমে ১২টি গুচ্ছগ্রাম করা হবে। যেখানে ১ হাজার ৪৪০টি ব্র্যাক হাউস ও আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে।
রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশে নিযুক্ত বাংলাদেশের কূটনীতিকদের সক্রিয় থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এছাড়া কূটনৈতিক কাজকে নিছক চাকরি হিসেবে না দেখে দেশ ও জাতির স্বার্থ রক্ষার এক মহান দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বিশ্বের ৫৮ দেশে নিয়োজিত বাংলাদেশ মিশনপ্রধানদের নিয়ে প্রথমবারের মতো ঢাকায় দূত সম্মেলনে রোহিঙ্গা সমস্যা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে সঠিক ধারণা দিতে রাষ্ট্রদূতদের বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হবে। বিশ্বে বাংলাদেশের সাফল্য তুলে ধরুন। তবে বর্তমানে আমরা একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। নির্যাতনের মুখে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা নাগরিক বাংলাদেশে অবস্থান নিয়েছে। আমরা যাতে দ্রুত মিয়ানমারের নাগরিক রোহিঙ্গাদের ফেরাতে পারি সেজন্য সক্রিয় ভূমিকা রাখবেন। রোহিঙ্গা বিষয়ে মিয়ানমারের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োজন আছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এরপরও প্রতিবেশী দেশ হওয়ায় মিয়ানমারের সাথে সদ্ভাব বজায় রেখে আমরা এই সমস্যার সমাধান করতে চাই। ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’Ñ আমাদের এই নীতিতে সবার সাথে সুসম্পর্ক রাখতে হবে। রোহিঙ্গাদের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত শীতবস্ত্রের ব্যবস্থা করা হবে। মিয়ানমার থেকে যারা এসেছে এবং দেশের সাধারণ নাগরিকদের প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে শীতবস্ত্র পাঠানো হবে। ৩৩টি বাণিজ্যিক ব্যাংক প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে প্রায় ১৮ লাখ পিস কম্বল প্রদান করে। প্রধানমন্ত্রী এসব কম্বল দেশের উত্তর জনপদের শীতার্ত জনগণ, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী এবং কক্সবাজার জেলার দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ প্রদান করেন।
সম্প্রতি রোহিঙ্গাদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। বাংলাদেশের জন্য রোহিঙ্গারা একটা বার্ডেন বলে অভিমত ব্যক্ত করেন রাষ্ট্রপতি। কিন্তু মানবিক দিক বিবেচনায় বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিয়ে সাধ্যমতো রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। এখন চুক্তি হয়েছে। কেবল বাংলাদেশ না, সারা বিশ্ব রোহিঙ্গাদের পাশে আছে। রোহিঙ্গারা যাতে সম্মানের সাথে মিয়ানমারে ফেরত যেতে পারে এবং নিরাপত্তার সাথে নিজ দেশে বসবাস করতে পারে, তা নিশ্চিত করে ফেরত পাঠানো হবে বলে আশা পোষণ করেন তিনি।
মিয়ানমার থেকে নির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা নাগরিকদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন ৬ লাখ ছাড়িয়েছে। ৭টি মিয়ানমার ন্যাশনালস বায়োমেট্রিক ক্যাম্পে নিবন্ধনের কাজ চলছে। ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদফতরের তত্ত্বাবধানে রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয় গত ১১ সেপ্টেম্বর থেকে। রোহিঙ্গারা যেন সারাদেশে ছড়িয়ে না পড়ে সেই লক্ষ্যে এই ডাটাবেজ তৈরির উদ্যোগ নেয় সরকার। সেনাবাহিনীর সদস্যরা এ কার্যক্রমে সার্বিক সহযোগিতা করছেন। চলতি মাসের মধ্যে নিবন্ধন কার্যক্রম শেষ হতে পারে। ছবিযুক্ত এই কার্ডের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের সঠিক পরিসংখ্যান রাখা যেমন সম্ভব, তেমনি বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও পাসপোর্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ শনাক্তকরণ কার্ড তৈরিতে রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করা যাবে খুব সহজেই। এখনও প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা নিবন্ধিত হচ্ছে।

Category:

জিয়ার দুঃশাসন : বাংলাদেশের কলঙ্ক

41রায়হান কবির: ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৮১ সময়কাল ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের কালো অধ্যায়। ঘোর অমানিশার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের আমল। জিয়ার শাসনামলকে কেবল বাঙালির ইতিহাসের লজ্জা ও কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবেই অভিহিত করা যায়। জিয়া শাসনামলে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে সামরিক কার্ফু মাথায় নিয়ে দিনাতিপাত করতে হতো। জিয়ার শাসনামল বিশ্লেষণ করলে ভেসে ওঠেÑ একজন সামরিক অফিসারের বন্দুকের নলে ক্ষমতা দখল, নিজেকে সেনাপ্রধান ঘোষণা, অবৈধ উপায়ে একই সাথে সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি থাকা, হ্যাঁ-না ভোট, সামরিক শাসন নিয়ন্ত্রিত ঘরোয়া রাজনীতি, যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী রাজনীতি, উগ্র সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিষবৃক্ষ রোপণ, মদ, জুয়া ও পতিতাবৃত্তির লাইসেন্স দেওয়ার মাধ্যমে সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, ইচ্ছামতো ফরমান আদেশ অধ্যাদেশ জারি, তথাকথিত ক্যু’র অভিযোগে শত শত সৈনিক হত্যা, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মধ্য দিয়ে ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকা-ের বিচারের পথ রুদ্ধ করে রাখা ও জেলহত্যা বিচারের উদ্যোগ না নেওয়া, খুনিদের সুরক্ষা ও হত্যাকারীদের বিদেশে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করার মতো কলঙ্কিত ইতিহাস। স্পষ্ট হয়ে ওঠে আজকের বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী রাজনীতি, প্রতিহিংসার রাজনীতি, মিথ্যাচার ও অপপ্রচারের রাজনীতি, দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের জন্মসূত্র। সহজেই বোঝা যায়, জিয়া প্রতিষ্ঠিত ‘বিএনপি নামক কলুষিত কুহেলিকায়’ নষ্ট হয়ে চলেছে প্রজন্মের বিভ্রান্ত অংশ।

খুনি মোশতাক-জিয়াচক্রের দুঃশাসন ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি
২৪ আগস্ট ১৯৭৫ মেজর জেনারেল কেএম শফিউল্লাহকে সরিয়ে দিয়ে খুনি মোশতাক তার বিশ্বস্ত দোসর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সেনাবাহিনীর ‘চিফ অব আর্মি স্টাফ’ নিয়োগ করে। ১৯৭৫ সালের ৩০ আগস্ট খুনি মোশতাক-জিয়া চক্র এক অর্ডিন্যান্স জারি করে রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ করে। রাজনৈতিক দল গঠন, সংগঠন প্রতিষ্ঠা বা আয়োজন অথবা রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়া অথবা অন্যভাবে রাজনৈতিক তৎপরতায় শরিক হওয়া অথবা কোনোভাবে রাজনৈতিক কাজে সংশ্লিষ্ট থাকার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। যা লঙ্ঘন করলে সাত বছর সশ্রম কারাদ- অথবা জরিমানা অথবা উভয় দ- দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়।
২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭৫, খুনি মোশতাক-জিয়া চক্র বন্দুকের জোরে কুখ্যাত ‘ইনডিমনিটি অর্ডিন্যান্স’ জারি করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ১৫ আগস্টের খুনিদের সুরক্ষা প্রদান করে। কারণ মোশতাক ও জিয়া উভয়ই বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ে জড়িত ছিলেন।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর খুনি চক্র ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সকল নিয়মনীতি ভঙ্গ করে কারাভ্যন্তরে প্রবেশ করে জাতীয় চার নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, এএইচএম কামারুজ্জামানকে ব্রাশফায়ারে নির্মমভাবে হত্যা করে। এদিন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ জেনারেল জিয়ার নিজস্ব বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৪৬ ব্রিগেডের কিছু তরুণ অফিসারকে দিয়ে জিয়াকে গৃহবন্দি করেন এবং জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর প্রধান পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ৪ নভেম্বর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফ ‘চিফ অব আর্মি স্টাফ’ পদে নিয়োগ পান। এদিকে ৪ নভেম্বর বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে ছাত্রসমাজের উদ্যোগে প্রতিবাদী নীরব শোক মিছিল ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাসায় গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। এ মিছিল কলাবাগান এলাকায় পৌঁছলে খালেদ মোশাররফের বৃদ্ধা মাতা ও তার ভাই আওয়ামী লীগ নেতা রাশেদ মোশাররফ অংশগ্রহণ করে। বিষয়টি সকল ষড়যন্ত্রকারীর মাথা ব্যথা ও ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ষড়যন্ত্রকারীরা সর্বত্র প্রচার করতে থাকে ভারতের সহযোগিতায় খালেদ মোশাররফ ক্ষমতা দখল করেছে। মিজানুর রহমান চৌধুরী তার ‘রাজনীতির তিনকাল’ গ্রন্থে লিখেছেনÑ ‘পরদিন এই মিছিলের ছবি খবরের কাগজে ছাপা হলে মুহূর্তে খালেদ মোশাররফ আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যান। এ রকম একটা অবস্থার সুযোগ নেয় জাসদ এবং তাদের গোপন সংগঠন বিপ্লবী গণবাহিনী। কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে এই সংগঠনটির তৎপরতা আগে থেকেই সেনবাহিনীর অভ্যন্তরে ছিল।’ ‘… ৪ নভেম্বর সন্ধ্যা থেকে ক্যান্টনমেন্টে থেমে থেমে মাইকে ঘোষণা করা হতে থাকে ‘ভারতীয় সৈন্যরা বাংলাদেশ দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং তাদের সহযোগিতাকারী খালেদ মোশাররফকে হটাতে হবে।’
এরই মধ্যে জাতীয় চার নেতার দাফন সম্পন্ন হয়। খালেদ মোশাররফের দাবি অনুযায়ী ৫ নভেম্বর খন্দকার মোশতাক বিচারপতি আবু সাদত মোহাম্মদ সায়েমের কাছে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার অর্পণ করেন। ৬ নভেম্বর জাতীয় সংসদ বাতিল করা হয়। বিচারপতি সায়েম আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। এদিকে কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বে আরেকটি অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। ৬ নভেম্বর রাতেই তারা রেডিও স্টেশন দখল করে নেয়। বিদ্রোহী সেনাদের গুলিতে মহান মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণা সৃষ্টিকারী সাহসী সেনাপতি মেজর খালেদ মোশাররফ, মেজর হুদা ও মেজর হায়দার নিহত এবং কর্নেল শাফায়াত জামিলসহ কয়েকজন আহত হন। কর্নেল তাহের মুক্ত করেন জিয়াউর রহমানকে।

বেইমান জিয়া ও কর্নেল তাহেরের ফাঁসি
৭ নভেম্বর ১৯৭৫ সকালে ঢাকার রাজপথ আবার সেনা ট্যাংকে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। জিয়াউর রহমান মুক্তি পেয়ে বেতার ভাষণের মাধ্যমে কোনোরকম নিয়মনীতিকে তোয়াক্কা না করে নিজেই নিজেকে সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা করেন। মুক্তি পেয়ে জিয়াউর রহমান প্রথমেই তার মুক্তিদাতা কর্নেল তাহেরের সাথে বেইমানি (ষড়যন্ত্রের ভিতর ষড়যন্ত্র) করেন। প্রকৃতপক্ষে ৭ নভেম্বরকে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্ধকার দিন অথবা মুক্তিযোদ্ধা হত্যা দিবস বা বেইমানি দিবসও বলা যেতে পারে। যদিও জিয়াউর রহমানের অনুসারী ও তার দল বিএনপি তারই মতো গায়ের জোরে দিনটিকে ‘সিপাহী জনতার বিপ্লব দিবস’ বলে থাকে। যা জিয়াউর রহমানের নিজেকে বন্দুকের নলের মুখে সেনাপ্রধান, আইন প্রশাসক ও রাষ্ট্রপতি ঘোষণার নির্লজ্জ অনুসরণ ব্যতীত কিছুই নয়।
১৯৭৫ সালের ৮ নভেম্বর সামরিক অধ্যাদেশ জারি করে সশস্ত্র বাহিনীর তিন প্রধানকে উপ-সামরিক আইন প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। ১০ নভেম্বর উপ-প্রধান সামরিক প্রশাসকদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়। কিন্তু ১১ নভেম্বর সামরিক আইন প্রশাসকের পরিবর্তে উপ-সামরিক আইন প্রশাসক জিয়াউর রহমান রেডিও ও টেলিভিশনে ভাষণ দেন। ২০ নভেম্বর জিয়াউর রহমান মেজর জেনারেল এরশাদকে সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ নিয়োগ করেন। ৫ ডিসেম্বর সাতজন আঞ্চলিক সামরিক আইন প্রশাসক নিয়োগ করেন জিয়াউর রহমান।
জিয়াউর রহমান কর্নেল তাহেরসহ জাসদ নেতাদের সাথে বেইমানি (ষড়যন্ত্রের ভিতরে ষড়যন্ত্র) করে ২৩ ও ২৪ নভেম্বর এমএ জলিল, হাসানুল হক ইনুসহ সাজদ ও গণবাহিনীর অধিকাংশ নেতাকে আটক করে। ২৪ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লা হলের এক হাউস টিউটরের বাসা থেকে কর্নেল তাহেরকে গ্রেফতার করা হয়। জাসদের সাথে জিয়াউর রহমানের বেইমানির পরিমাণ এতটাই কঠিন ছিল যে ১৯৭৬ সালের ১৭ জুলাই এক বিশেষ সামরিক আদালতে ‘সরকার উৎখাত ও সেনাবাহিনীকে বিনাশ করার চেষ্টা চালানোর’ অভিযোগে জাসদ নেতা কর্নেল তাহেরকে মৃত্যুদ- এবং এমএ জলিল, আ স ম আবদুর রব, শাহজাহান সিরাজ, হাসানুল হক ইনু, সিরাজুল আলম খানসহ অনেককেই যাবজ্জীবন কারাদ-সহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা প্রদান করে। জিয়াউর রহমানের সিদ্ধান্তে প্রচলিত আইনকানুন লঙ্ঘন করে সামরিক আদালতে ১৯৭৬ সালের ২১ জুলাই পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল তাহেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়।

দালাল আইন বাতিল ও যুদ্ধাপরাধীদের পুনর্বাসন
১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী চক্র এক আদেশে ১৯৭২ সালের দালাল আইন বাতিল করে। এরপর Second Proclamation Order No. 3 of 1975-এর প্রথম তফসিল থেকে বাংলাদেশ দালাল আইনের যে সেফগার্ড ছিল তা তুলে দেওয়া হয়। দালাল আইনে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য বঙ্গবন্ধুর সরকার ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি এক অধ্যাদেশ জারি করে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী দালালদের বিচারের জন্য সারাদেশে ৭৩টি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। এরপর বঙ্গবন্ধু সরকার ১৯৭৩ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। জিয়াউর রহমান দালাল আইন বাতিল করে ১১ হাজার সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীকে কারাগার থেকে মুক্তি দেন। ১৯৭৬ সালের ১৮ জানুয়ারি দেশত্যাগী পাকিস্তানি নাগরিকদের নাগরিকত্ব ফেরত পাবার জন্য মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে বলা হয়।
১৯৭৬ সালের ৩ মার্চ জিয়াউর রহমান এক সামরিক ফরমান বলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূলুণ্ঠিত করে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ঘোষণা করেন।
১৯৭৬ সালের ৩ মে জিয়াউর রহমান এক অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে সংবিধানের ৩৮নং অনুচ্ছেদ বাতিল করে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির নষ্টপথ উন্মোচন করেন। Second Proclamation Order No. 3 of 1976 জারি করে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের শর্তাবলী তুলে দেওয়া হয়। Second Proclamation জারি করে সংবিধানের ১২২ অনুচ্ছেদ তুলে দিয়ে দালালদের ভোটার হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। যা ১৯৭৭ সালের ২২ এপ্রিল সংবিধানের নবম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনে পরিণত করেন জিয়াউর রহমান। Proclamation No. 1 of 1977 জারি করে সংসদে নির্বাচিত হওয়ার লক্ষ্যে সংবিধানের কিছু অংশ তুলে দেওয়া হয়। যার ফলে স্বাধীনতাবিরোধী মুসলিম লীগ, জামাতে ইসলাম, পিডিপি, নেজামে ইসলামসহ অপরাপর ধর্মভিত্তিক উগ্রসাম্প্রদায়িক দলসমূহ তৎপরতা শুরু করে। পুনর্বাসিত হয় যুদ্ধাপরাধী মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে জড়িত রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর সদস্যরা।
জিয়া কুখ্যাত স্বাধীনতাবিরোধী শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী বানান। এই শাহ আজিজুর রহমান ’৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জাতিসংঘে গিয়ে বলেছিল, ‘পাকিস্তানি সৈন্যরা পূর্ব পাকিস্তানে হামলা চালিয়ে অন্যায় কিছু করেনি। স্বাধীনতা নামে সেখানে যা চলছে, তা হলো ভারতের মদদপুষ্ট বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন। বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের উচিত সেটাকে পাকিস্তানের ঘরোয়া ব্যাপার হিসেবে গ্রহণ করা।’
জিয়ার মন্ত্রিসভায় আরও বেশ কয়েকজন রাজাকার ছিলেন। এরা হলেনÑ মসিউর রহমান, সামসুল হুদা, মির্জা গোলাম হাফিজ, শফিউল আলম, আবদুল আলিম, আবদুর রহমান বিশ্বাস।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর আবদুল আলিম, মসিউর রহমান, শাহ আজিজুর রহমানকে পাকিস্তানের দালাল হিসেবে জেলে পাঠানো হয়েছিল। মসিউর রহমান পাকিস্তান সরকারের ঠিকাদার ছিলেন। সামসুল হুদা ছিলেন পাকিস্তান বেতারের একজন প্রযোজক। সে সময় তিনি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করে পাক বেতার থেকে কতগুলো অনুষ্ঠান প্রচার করেছিলেন। মির্জা গোলাম হাফিজ ছিলেন পাকিস্তান চীন মৈত্রী সমিতির সভাপতি। তিনি বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে স্বাধীনতাবিরোধী প্রচার চালাতেন। তিনি তার বিবৃতিতে বলেন, বাংলাদেশের এই তথাকথিত মুক্তিযুদ্ধ আসলে একটা ভারতীয় ষড়যন্ত্র।
১৯৭৮ সালের ১১ জুলাই পাকিস্তানের পাসপোর্ট নিয়ে গোলাম আজম ঢাকায় আসেন তিন মাসের ভিসা নিয়ে। তার মেয়াদ ফুরিয়ে গেলেও জিয়া সরকার তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। গোলাম আজম আড়ালে থেকে জামাত দলের কাজ চালিয়ে যান। একসময় গোলাম আজমকে জামাতের আমির বলে ঘোষণা দেওয়া হয়।
জিয়া জাতীয় সংসদে যেমন মুক্তিযোদ্ধা আর পাকিস্তানি দালালদের একই আসনে বসান তেমনি মুক্তিযুদ্ধের প্রণোদনা স্বরূপ ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিকে জিন্দাবাদে পরিণত করার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ধ্বংসের ষড়যন্ত্র চালাতে থাকেন। জিয়া বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিদেশে বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেন।

রাজনৈতিক দলবিধি ও ঘরোয়া রাজনীতির বদ্ধ প্রকোষ্ঠে গণতন্ত্র
১৯৭৬ সালের ২৮ জুলাই রাজনৈতিক দল বিধির আওতায় নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক তৎপরতার সুযোগ দেওয়া হয়। শর্ত দেওয়া হয়, ঘরে বসে রাজনীতি করতে হবে, রাজপথে বা মাঠে যাওয়া যাবে না। অদ্ভুত এই রাজনীতির নাম দেওয়া হয় ‘ঘরোয়া রাজনীতি’।
৪ আগস্ট ১৯৭৬ রাষ্ট্রপতি সায়েম রাজনৈতিক দল গঠনের নীতিমালা (পিপিআর) ঘোষণা করে। কিন্তু শাসকচক্র আওয়ামী লীগের সামনে মেনে নেওয়া অসম্ভব এমন একটি শর্তের প্রাচীর তুলে দেয়। ‘কোনো ব্যক্তিবিশেষের প্রতি ভক্তি বা বিশ্বাস গড়ে তুলতে পারে এমন কোনো নাম দল গঠনের প্রস্তাবিত গঠনতন্ত্রে উল্লেখ থাকতে পারবে না।’ এমন শর্ত জুড়ে দেওয়া ছিল আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুর অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিনষ্টের ষড়যন্ত্র। নানা শর্তের শৃঙ্খলে বন্দী রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই ৯ আগস্ট থেকে নতুন ভোটার তালিকা প্রণয়নের কাজ শুরু হয় এবং ৯ অক্টোবর ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়। একদিকে ভোটার তালিকা প্রণয়ন-প্রকাশ, ঘরোয়া রাজনীতির অনুমতি অন্যদিকে সারাদেশে সামরিক আদালত প্রতিষ্ঠা করে তথাকথিত রাষ্ট্রবিরোধী এবং ধ্বংসাত্মক কাজের শাস্তি মৃত্যুদ- কার্যকর করা হতে থাকে। ১৪ সেপ্টেম্বর ২৭টি মহকুমায় সংক্ষিপ্ত সামরিক আদালত গঠন করা হতে থাকে। ৪ নভেম্বর তুমুল বিতর্কের মধ্যেই হৃদয়ে এক সাগর রক্তক্ষরণ বহন করেই বঙ্গবন্ধুর নাম উল্লেখ না করে অনুমোদন নিতে বাধ্য হয় আওয়ামী লীগ।
১৯৭৬ সালের ২১ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এএসএম সায়েম এক ঘোষণার মাধ্যমে পূর্ব প্রতিশ্রুত ফেব্রুয়ারি ১৯৭৭-এর নির্বাচন স্থগিত করতে বাধ্য হন। অথচ ১৯৭৫ সালের ২ ডিসেম্বর সায়েম ঘোষণা করেন ‘দেশে জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরই বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য।’ ১৫ ডিসেম্বর তিনি নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। ১৯৭৬ সালের ২২ মার্চ নির্বাচনী এলাকার সীমা নির্ধারণের খসড়াও তৈরি হয়।

জিয়ার জোরপূর্বক রাষ্ট্রপতির পদ দখল ও হ্যাঁ-না ভোট
২৯ নভেম্বর ১৯৭৬ সেনাপ্রধান ও উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল জিয়া প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক পদ গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বিচারপতি সায়েমকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগে বাধ্য করে জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হন। প্রকৃতপক্ষে, নির্মোহ চিত্তে জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবন পর্যালোচনা করলে কেবল জিয়াউর রহমানের আমলকে জোরপূর্বক পদ দখল আর বন্দুকের নলের খোচায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিনষ্টের অধ্যাদেশ, আদেশ ও আইন জারির সময়কাল বা ষড়যন্ত্রের অমানিশা বলা যেতে পারে। জেনারেল জিয়াউর রহমান নিজেই এক সামরিক ফরমান জারি করে তিনি নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক তো ঘোষণা করেছিলেনই, আবার নিজেই আরেক ফরমান জারি করে ঘোষণা দেন তিনি দেশের ‘প্রেসিডেন্ট’ও। কে তাকে প্রস্তাব দিল, কে তাকে ভোট দিল! কোনো ঘটনারই প্রয়োজন পড়ল না, শুধু সামরিক ফরমান জারি করে বলেছিলেন, ‘এখন থেকে তিনিই দেশের প্রেসিডেন্ট।’
১৯৭৭ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান একা ‘প্রেসিডেন্ট প্রার্থী’ হয়ে ‘হ্যাঁ কিংবা না’ ভোট দেন। কিন্তু এককভাবে নির্বাচনে প্রার্থী বিষয়ে গণতন্ত্রের প্রশ্ন ছাড়াও বাংলাদেশ সামরিক বাহিনীর যে বিধিমালা রয়েছে তাতেও তিনি প্রার্থী হতে পারেন না। বাংলাদেশ আর্মি অ্যাক্ট ২৯২ ও ২৯৩ বিধিতে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, সামরিক বাহিনীর কোনো সদস্য তার চাকরির মেয়াদ শেষ না হতে কোনো নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে সামরিক বাহিনীতে সেনাবাহিনী প্রধান হিসেবে চাকরিরত ছিলেন। সুতরাং, ‘হ্যাঁ-না’ ভোটে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া ছিল সম্পূর্ণ বেআইনি ও আইনের বরখেলাপ। সে হিসেবে জিয়াউর রহমান ছিলেন অবৈধ রাষ্ট্রপতি। ১৯৭৮ সালের ২৮ এপ্রিল জিয়াউর রহমান একই সাথে সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি থাকার জন্য একটি সামরিক ফরমান জারি করেন। দেশের সংবিধান, আইন-কানুন, সামরিক বাহিনীর বিধি অবৈধভাবে বারবার নিজের স্বার্থে পরিবর্তন এবং জারি করেছেন জিয়াউর রহমান।

তথাকথিত অভ্যুত্থান ও সামরিক বিচারের
নামে দেশপ্রেমিক সৈনিকদের হত্যা
১৯৭৭ সালের ২ অক্টোবর ঢাকায় সামরিক বাহিনীর একটি ক্ষুদ্রাংশের অভ্যুত্থানের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে সেনাশাসক জিয়াউর রহমানের নির্দেশে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের কথিত বিচারে সেনা ও বিমানবাহিনীর সদস্যদের ফাঁসি দেওয়া হয়। ২ অক্টোবরের অভ্যুত্থানের অভিযোগে গঠিত ট্রাইব্যুনালের কথিত বিচারে ঢাকায় ১৯৭৭ সালের ৯ অক্টোবর থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত এবং কুমিল্লা ২৯ অক্টোবর থেকে ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ফাঁসিগুলো কার্যকর করা হয়। এদের মধ্যে ১৯৩ জনের নাম-পরিচয় পাওয়া যায়। ওই ঘটনার পূর্বাপর মৃতের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় এটা স্পষ্ট যে, বিচারের আওতার বাইরে অনেককে মরতে হয়েছে। এমন কী দেশবাসীকে জানানো হয়নি ওই ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে কাদের এবং কতজনকে সুস্পষ্ট কী অপরাধে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। অভিযুক্ত কয়েকজনের ভাষ্যমতে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী দুই মাসে ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ সৈনিককে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কিংবা ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যা করা হয়। ঢাকায় ১২১ জন আর কুমিল্লায় ৭২ জনের ফাঁসি হয়। এ ছাড়া ঘটনার সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে ৫ শতাধিক সৈনিককে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদ-ে দ-িত করা হয়। ১৯৮৭ সালে বিমান বাহিনী থেকে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ইতিহাস’ পুস্তিকার একটি অধ্যায়ে বলা হয়, ঐ ঘটনার পর প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ৫৬১ জন বিমানসেনা প্রাণ হারায়। ঐ পুস্তিকা পরবর্তীকালে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ১৯৭৮ সালের ৫ মার্চ লন্ডন টাইমস-এর এক প্রতিবেদন বলা হয়, ঐ ঘটনায় সামরিক বাহিনীর ৮ শতাধিক সদস্যের সাজা হয় এবং প্রায় ৬০০ জনকে ফাঁসির মাধ্যমে কিংবা ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যা করা হয়, যার অধিকাংশই বিমানবাহিনীতে ছিলেন। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদ রচিত ‘মিলিটারি রোল অ্যান্ড দি মিথ অফ ডেমোক্রেসি’ গ্রন্থে এই তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে, ১৯৭৭-এর ৩০ সেপ্টেম্বর ও ২ অক্টোবর যথাক্রমে বগুড়া ও ঢাকায় ব্যর্থ সেনা-অভ্যুত্থানের পর গোপন সামরিক ট্রাইব্যুনালে দ্রুত বিচার করে সেনা ও বিমানবাহিনীর শত শত ননকমিশন্ড অফিসার ও সৈনিককে ফাঁসিতে ঝোলানে হয়। ১৮, ১৯, ২০ ও ২১ অক্টোবর রাজশাহী কারাগারে এদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। জিয়া ঘোষিত মার্শাল ল’ ট্রাইব্যুনালগুলোতে বিচারের নামে প্রহসনে এক একজন সৈনিকের জীবন-মরণের সিদ্ধান্ত নিতে ট্রাইব্যুনাল প্রধানরা এক মিনিটেরও কম সময় নিতেনÑ যাদের অনেকেরই আর্মি অ্যাক্ট অনুসারে বিচারক হবার যোগ্যতা ছিল না। অভিযোগ রয়েছে জিয়া একদিকে অভ্যুত্থানের নামে, বিদ্রোহের নামে হাজার হাজার সৈন্য ও সৈনিক অফিসার নিধন করেন, অন্যদিকে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকেও শক্ত হাতে দাবিয়ে রাখেন। এ সময় সেনাবাহিনী ও বিমান বাহিনীর আড়াই হাজার অফিসার হত্যা করা।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ১৯৭৭ সালের এপ্রিলের রিপোর্টে বলা হয়েছে, ঐ সময় বাংলাদেশে রাজনৈতিক বন্দীর সংখ্যা ছিল ১০ থেকে ১৫ হাজার। বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলোর মতে এই সংখ্যা আরও বেশি, প্রায় ৬২ হাজার।
এসব বন্দীর মধ্যে বেশ কিছু সংখ্যক ছিলেন সাংবাদিক, লেখক ও অন্যান্য শ্রেণির বুদ্ধিজীবী। এদের মধ্যে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য পদার্থবিজ্ঞানী ড. মতিন চৌধুরীর নাম অন্যতম। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় ৭টি মামলা। পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থা বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি ড. চৌধুরীর মুক্তি দাবি করে জিয়া সরকারকে চিঠি দেন। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। ড. চৌধুরীর অপরাধ তিনি বঙ্গবন্ধুর প্রিয়পাত্র ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নতুন করে গড়ে তোলার জন্য। জেলে ড. চৌধুরীর স্বাস্থ্য একেবারে ভেঙে পড়ে। ১৯৮১ সালের ২৪ জুন হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি মারা যান।

বিএনপির জন্ম ও যুদ্ধাপরাধীদের প্রতিষ্ঠা
১৯৭৭ সালের ১৫ ডিসেম্বর জিয়াউর রহমান এক বেতার ভাষণে বাংলাদেশি জাতীয়বাদের ভিত্তিতে একটি ফ্রন্ট ঘোষণার কথা বলেন। অতঃপর ১৯৭৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জিয়াউর রহমান জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। তিনি নিজে এই দলের নেতৃত্বে না থাকলেও উপ-রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তারের নেতৃত্বে এই দল গঠিত হয়। কিন্তু জাগদল সুপরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আকৃষ্ট করতে ব্যর্থ হওয়ায় জিয়া রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রাক্কালে অন্যান্য দলের সমন্বয়ে জাতীয়বাদী ফ্রন্ট গঠন করেন।
১৯৭৮ সালের ২১ এপ্রিল এক ঘোষণার মাধ্যমে ১৯৭৮ সালের ৩ জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ঘোষণা দেয় জিয়াউর রহমান। জিয়া বিরোধী দলগুলোকে মাত্র ৪০ দিনের নোটিসে নির্বাচনে আহ্বান করেন এবং মাত্র ২৩ দিন তাদের প্রচারণার সুযোগ দেন। অন্যদিকে তিনি নিজের নির্বাচনী প্রচারণার জন্য সরকারি প্রশাসনযন্ত্রকে পুরোপুরি কাজে লাগান। সরকারি মালিকানাধীন টিভি, রেডিও এবং সংবাদপত্রকে একচ্ছত্রভাবে কাজে লাগানো হয়। সর্বোপরি জিয়াউর রহমান একাধারে প্রেসিডেন্ট, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক, সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং সেনাবাহিনীর স্টাফ প্রধান ছিলেন। আর কিছু ঘটুক বা নাই ঘটুক, এসব ক্ষমতার বলে এটা নিশ্চিত হয়েছিল যে, পুলিশ এবং সরকারি কর্মচারীরা তার পক্ষে কাজ করবে। স্বয়ং জিয়া কর্তৃক ঘোষিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অধ্যাদেশ-১৯৭৮ অনুযায়ী ঐ ব্যক্তি প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হতে পারবেন না যিনি সরকারি চাকরি করেন এবং এতে বেতন গ্রহণ করতে থাকেন। জিয়া এই অধ্যাদেশ লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে ১৯৭৮-এর নির্বাচনে দাঁড়িয়ে অবৈধ প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন।
১৯৭৮ সালের আগস্ট মাসে জিয়া জাতীয়বাদী ফ্রন্ট ভেঙে দেন এবং ২৮ আগস্ট নিজের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়বাদী দল (বিএনপি) নামে একটি দল গঠন করেন। তখনও জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান। একজন সেনাপ্রধানের নেতৃত্বেই জন্ম হয় বিএনপির। কার্যত, জন্মগতভাবেই বিএনপি স্বৈরশাসন ও গণতন্ত্রবিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের উত্তরাধিকার। পরে ১৯৭৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়া এক ফরমান জারি করে রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এনে প্রেসিডেন্টের হাতে প্রায় সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেন। সকল ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পর নির্বাচনী প্রচারের স্বল্প সুযোগ দিয়ে ১৯৭৯ সালের ২৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হয়। এ সময় আওয়ামী লীগসহ বেশ কয়েকটি দল আপত্তি জানায়। আপত্তির মুখে ২৭ জানুয়ারির পরিবর্তে ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পুনঃতফসিল ঘোষণা করা হয়। জিয়া সরকার নিয়ন্ত্রিত কারচুপির এ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পায় বিএনপি। চলতে থাকে গণতন্ত্রের মুখোশে সামরিক শাসন। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন তার ‘বাংলাদেশ : রক্তাক্ত অধ্যায় ১৯৭৫-৮১’ গ্রন্থে বলেছেন, জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে জনতাই ক্ষমতার উৎস বললেও তার মৃত্যু পর্যন্ত সশস্ত্র বাহিনীই তার ক্ষমতার উৎস হয়ে থাকে।

পঞ্চম সংশোধনী ও খুনিদের সুরক্ষায় জিয়াউর রহমান
১৯৭৯ সালের ২ এপ্রিল জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনেই জিয়ার বিএনপি সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বিল উত্থাপন করে। এই পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের নির্মম হত্যাকা-, ক্ষমতা দখলকারী খুনি মুশতাক কর্তৃক সংবিধান স্থগিত করা ও অক্টোবরে সংসদ ডাকা, ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের হত্যাকা-ের সাথে জড়িতদের বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া এবং পরবর্তীকালে বৈদেশিক মিশনে তাদের চাকরির ব্যবস্থা করা, খালেদ মোশাররফ, হুদা, হায়দার ও তাদের সহযোগীদের হত্যা, বিচারপতি সায়েমের প্রেসিডেন্ট ও সিএমএল’র পদ গ্রহণ, ডিসিএমএলএ থেকে জিয়ার সিএমএলএ হওয়া, বিচারপতি সায়েমের পদত্যাগ ও জিয়ার প্রেসিডেন্ট পদ দখল, হ্যাঁ-না ভোট, সামরিক পোশাক পরা অবস্থায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে নিজে প্রেসিডেন্ট হওয়াসহ সকল কর্মকা-কেই সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। সামরিক আইনের বা সামারি ট্রায়ালের মাধ্যমে এক মিনিটে বিচার করে সেনাবাহিনীর সদস্যদের ফাঁসিতে ঝুলানোর বিষয়টিও আইনসম্মত করা হয় এই পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে।
মাত্র তিন দিন সংসদে আলোচনার মধ্য দিয়ে ৫ এপ্রিল পঞ্চম সংশোধনী বিল পাস করে বিএনপি। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের হত্যাযজ্ঞ তদন্ত করতে ১৯৮০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ আইনপ্রণেতা স্যার টমাস উইলিয়ামসের নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠিত হয়। ওই কমিশনের প্রতিনিধিরা ঘটনা তদন্তের জন্য বাংলাদেশ সফরে আসতে চাইলেও তাদের ভিসা দেয়নি জিয়াউর রহমানের তৎকালীন সরকার। এরপর ১৯৮১ সালের ১৪, ১৫ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাকে সভাপতি নির্বাচিত করা হলে বঙ্গবন্ধু-কন্যাকে দেশে ফিরতে বাধা দেন জিয়া। সকল বাধা ও হুমকি উপেক্ষা করে ১৯৮১-এর ১৭ মে বঙ্গবন্ধু-কন্যা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করলে ধানমন্ডি বত্রিশস্থ বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাকে প্রবেশ করতে দেননি জিয়াউর রহমান।
জেনারেল জিয়া জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সংগীত পরিবর্তনেরও চেষ্টা করেন। ধুঁয়া তোলা হয় জাতীয় সংগীত হিন্দুর রচিত গান। বিশিষ্ট সাংবাদিক আজিজুল ইসলাম ভূইয়া তার ‘বিএনপি ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতি’ গ্রন্থে লিখেছেনÑ চট্টগ্রামে একটি অনুষ্ঠান শেষে সার্কিট হাউসে জিয়াকে তার দলের একজন নেতা বলেছিলেনÑ ‘স্যার, আমাদের পতাকায় ইসলামি রং নেই, এটা আমাদের ভালো লাগে না। এটা ইসলামি তাহজ্জীব ও তমুদ্দুনের সাথে মিলছে না।’ তার কথার প্রত্যুত্তরে জিয়াউর রহমান বলেন, ‘হবে, হবে, সব কিছুই হবে। আগে হিন্দুর লেখা জাতীয় সংগীতটি বদলানো হোক। তারপর জাতীয় পতাকার কথা ভাববো।’

আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত ছিল জিয়ার শাসনামল
প্রেসিডেন্ট জিয়া রাষ্ট্রীয় টাকার বিপুল অপচয় ঘটিয়ে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে নানা কৌশলে দুর্বৃত্তায়নের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৭৮ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এক প্রস্থ ভোটার তালিকার দাম ছিল ৬০ হাজার মার্কিন ডলার। বঙ্গবন্ধুর আমলে যেখানে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় হতো মূল বাজেট বরাদ্দের ১৩ শতাংশ, সেখানে জিয়ার আমলে তা দাঁড়ায় ২৯ শতাংশ।
জিয়া দেশের যুবকদের দুর্নীতিগ্রস্ত করতে যুব কমপ্লেক্সের নামে দেশজুড়ে উন্মুক্ত-চাঁদাবাজির প্রচলন করেন। মাত্র তিন বছরে বাংলাদেশে ৩ হাজার ৬৭০টি যুব কমপ্লেক্স করা হয়। এই যুব কমপ্লেক্সের আয়ের উৎস ছিল দেশের হাট-বাজার ও মেলা থেকে আদায়কৃত টাকা। ১৯৭৯-৮০, ১৯৮০-৮১ এই দুই অর্থবছরে বাজার ও মেলা থেকে আয় হয়েছিল ১২ কোটি ৭৪ লাখ ৮৭ হাজার ২০০ টাকা। এসব টাকা গেছে যুব কমপ্লেক্সের অন্তর্ভুক্ত সমবায় সমিতির পান্ডাদের পকেটে, জিয়া চোখ বন্ধ করে ছিলেন, কারণ ওরাই তো তার রাজনৈতিক সমর্থক। (অ্যান্টনি : বাংলাদেশ : এ লিগেসি অব ব্লাড)।
বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের যেসব সম্পত্তি জাতীয়করণ করেছিলেন, তা জিয়া তাদের ফিরিয়ে দেন। যাদের ফিরিয়ে দিতে পারেন নি তাদের ক্ষতিপূরণ দেন। জিয়া মদ, জুয়া ও পতিতাবৃত্তির লাইসেন্স প্রদান করে সমাজ নষ্টের বিষবৃক্ষ রোপণ করেন। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তখনকার প্রজন্মকে দুর্নীতিগ্রস্ত করে তুলেছিলেন। এটা করেছেন তিনি বিভিন্ন পন্থায়। গ্রাম্য যুবকদের একাংশ তিনি হাট-বাজারের ইজারার অধিকার দিয়ে দলীয় ক্যাডারে পরিণত করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাত খুনের লোমহর্ষক ঘটনায় আটক সর্বহারা পার্টির সদস্য শফিউল আলম প্রধানকে জেল থেকে মুক্ত করে দেন জিয়াউর রহমান। জিয়া মেধাবী ছাত্রদের নষ্ট রাজনীতির পঙ্কিল পথে টেনে আনেন। এর ফলেই সৃষ্টি হয় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। এসব মেধাবী ছাত্ররা লেখাপড়া ভুলে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে টেন্ডারবাজি, তদবিরবাজি, হলের সিট ভাড়া ইত্যাদি বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত হয়।
১৯৮০ সালের ১০ সেপ্টেম্বর টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সরকারি পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, মুজিব আমলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম যতটুকু এগিয়েছিল, জিয়ার আমল তার কাছাকাছিও যেতে পারেনি।
পশ্চিমা ভাষ্যকারদের মত সমর্থন করে ঐ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ‘বাংলাদেশ কঠিন অর্থনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। বাংলাদেশের পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য দিয়ে ঐ প্রতিবেদনে দেখানো হয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন দ্রুত কমতির দিকে।’
পাকিস্তানের পাঁচজন নামকরা সাংবাদিক জিয়া হত্যার মাত্র মাসখানেক আগে বাংলাদেশে বেড়াতে এসে দেশের রাজনীতি আর দুর্নীতির এক করুণ চিত্র তুলে ধরেন।
মারকাস ফ্রান্ডা তার ‘জিয়াউর রহমান : বাংলাদেশ’ নামক সমীক্ষা গ্রন্থে বলেন, ‘একটি ক্ষুদ্র নব্য ধনী শ্রেণির হাতে বৈদেশিক সাহায্যপ্রাপ্ত অর্থের নিয়ন্ত্রণ চলে যাওয়ায় দেশে পরস্পর বিরোধী দুই ধরনের অর্থনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর ফলে, একদিকে ঢাকাকেন্দ্রিক একটি শ্রেণি দিন দিন উন্নত ও ধনবান হচ্ছে, অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলের অবস্থা খারাপ থেকে অধিকতর খারাপ হয়ে পড়ছে।’
জিয়ার পুঁজিবাদী অর্থনীতির ফলে ১৯৭৫ সালে যেখানে ছিল একজন কোটিপতি (জহিরুল ইসলাম), জিয়ার আমলে তার সংখ্যা দাঁড়াল ৬২ জনে। জিয়া সরকারের লাগামহীন দুর্নীতির কারণে সকল ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়ে বাংলাদেশ।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে, ১৯৭২-৭৫ সালে বাংলাদেশের জাতীয় আয় বৃদ্ধির বার্ষিক হার ছিল গড়ে ৫ শতাশ। বাংলাদেশ সরকারের পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে এ সময়ে আয় বৃদ্ধির বার্ষিক হার ছিল ৭ শতাংশ। সেখানে ১৯৭৬-১৯৮০ সালে (মুশতাক-জিয়া আমল) জাতীয় আয় বৃদ্ধির হার কমে দাঁড়ায় ৪.৭ শতাংশ এবং ১৯৮০-৮১ হতে ১৯৮৫-৮৬ সালে (জিয়া-এরশাদ আমল) জাতীয় আয় বৃদ্ধির হার আরও হ্রাস পেয়ে মাত্র ৩.৬ শতাংশে দাঁড়ায়। ১৯২-৭৩ সাল হতে ১৯৭৫-৭৬ সাল পর্যন্ত খাদ্য উৎপাদন ৮.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায় আর ১৯৮০-৮১ সাল পর্যন্ত উৎপাদন ২.১ শতাংশ হারে নেমে যায়। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর আমলে বিদেশি সাহায্য এসেছিল ১ হাজার ৮৩১ কোটি টাকা, যার সিংহভাগ ব্যবহৃত হয় যুদ্ধোত্তর পুনর্বাসন প্রকল্পে। বিএনপি আমলে বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৬৮৭ কোটি টাকা। স্বৈরাচার সরকারের আমলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক সাহায্য আসলেও দুর্নীতি-অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে তা জনগণের কোনো কাজে লাগে নি। মুষ্টিমেয় কিছু লোক রাতারাতি ধনি বনে গেছেন। যার ফলে ৮৬ শতাংশ লোককে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করতে হয়েছে। যেখানে আওয়ামী লীগের সময় যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশেও দারিদ্র্যের হার ছিল ৫০ শতাংশ সেখানে জিয়া ও এরশাদের আমলে দারিদ্র্যের হার যথাক্রমে ৬৫ এবং ৮৬ জনে দাঁড়ায়। এমনকি বঙ্গবন্ধুর আমলে যেখানে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ৮৬ কোটি ডলার সেখানে জেনারেল জিয়া ও এরশাদের আমলে তার পরিমাণ বেড়ে যথাক্রমে ৩৮০ কোটি ডলার ও ১০৩৫ কোটি ডলারে দাঁড়ালেও দুর্নীতি-অনিয়ম ও অপচয়ের কারণে প্রবৃদ্ধির হার কমে যায়, দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি পায় এবং অর্থনীতি প্রায় ভেঙে পড়ে। আওয়ামী লীগ আমলে প্রবৃদ্ধির হার ছিল সর্বাপেক্ষা বেশি ৭.০৬ শতাংশ। জিয়ার আমলে প্রবৃদ্ধি কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৪.৭৫ শতাংশে। বঙ্গবন্ধুর আমলে ভূমিহীনের সংখ্যা ছিল ৩৫ শতাংশ, জেনারেল জিয়ার আমলে ভূমিহীনের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ায় ৫৫ শতাংশ। আওয়ামী লীগের আমলে যেখানে বেকার সংখ্যা ছিল শতকরা ১৫ জন, সেখানে জিয়ার বিএনপি আমলে তা দ্বিগুণ হয়ে ৩০ জনে দাঁড়ায়।

Category:

49.(C)

Category:

সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে সমঝোতা স্মারক

উত্তরণ ডেস্ক: গত ৫ নভেম্বর দেশের প্রথম তরল প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজিভিত্তিক ও সবচেয়ে বেশি উৎপাদনক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রটি স্থাপনে নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি (এনডব্লিউপিজিসিএল) এবং জার্মানির সিমেন্স এজির মধ্যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। এদিন বিকেলে বিদ্যুৎ ভবনে ৩৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কেন্দ্র স্থাপনে এমওইউ সই হয়।
এই দুই কোম্পানির যৌথ উদ্যোগে পটুয়াখালীর পায়রায় স্থাপিত হবে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি। এনডব্লিউপিজিসিএল এবং সিমেন্স এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের সমান অংশীদার ও বিনিয়োগকারী হবে। এই কোম্পানিই এলএনজি আমদানি করে তা পুনরায় গ্যাসে রূপান্তরের পর বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহার করবে। এর সঙ্গে দেশের গ্যাস বা জাতীয় গ্যাস গ্রিডের কোনো সম্পৃক্ততা থাকবে না।
চুক্তি সই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বাংলাদেশকে শুধু বাজার হিসেবে না দেখে এ দেশের জনবল উন্নয়নে কাজ করার আহ্বান জানান সিমেন্সের কর্মকর্তাদের প্রতি।
৩৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ দেশে এই প্রথম। একই ক্ষমতার আরও একটি এলএনজিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এমওইউ সই অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এমপি বলেন, সিমেন্স এজি এবং বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) মধ্যে চলতি মাসের মধ্যেই এ ব্যাপারে এমওইউ সই হতে পারে। তারা কক্সবাজারের মহেশখালীতে যৌথ উদ্যোগে এই কেন্দ্রটি স্থাপন করবে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে জার্মানির রাষ্ট্রদূত টমাস প্রিনজ বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার মতো সবক্ষেত্রেই তারা বাংলাদেশের পাশে থাকবেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন এনডব্লিউপিজিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খোরশেদ আলম। এ ছাড়া পিডিবির চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ, সিমেন্স দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুনীল মাথুর এবং সিমেন্স বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রবাল বোস অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। পরে খোরশেদ আলম ও সুনীল মাথুর এমওইউতে সই করেন।

Category:

এই গল্পটি রাসেলের

মাহবুব রেজা

50এক
বাড়িটা অনেকখানি জায়গাজুড়ে। দূর থেকে বাড়িটাকে দেখলে যে কারোরই মনে হতে পারে একটা বড়-সড় লঞ্চ বুঝি পথ হারিয়ে দূর কোনো দেশে চলেছে!
বাড়িটা এতই বড় যে এর পুরোটা ঘুরে-ফিরে দেখতে গেলে ওর দম ফুরিয়ে যায়।
একতলা।
দোতলা।
তিনতলার খোলা ছাদ, এক পাশে বাবার পড়ার ঘর। শুধু কি পড়ার ঘর! কখনও কখনও সময়-সুযোগ পেলে বাবা সেই ঘরে বসে কি যেন লেখেন।
কি লেখেন বাবা!
খুব জানতে ইচ্ছে করে তার।
একদিন মাকে সে জিজ্ঞেসও করেছিলÑ
‘মা, বাবা টেবিলে ঝুঁকে পড়ে কি লেখে? কবিতা!’
ছেলের কথা শুনে মা বেশ শব্দ করে হেসে ওঠেন। তারপর ছেলের দিকে তাকিয়ে হাসিটা আগের মতো ধরে রেখে বললেনÑ
‘হাসু, শুনে যা তোর ছোট ভাই কি বলে। শুনে যাÑ’
হাসু আপা বারান্দার এক কোণার ইজিচেয়ারে শরীরটা এলিয়ে দিয়ে গল্পের বই পড়ছিলেন।
মার কথা শুনে হাসু আপা ছোট ভাইয়ের দিকে তাকালেনÑ
‘রাসেল তুই নিজে বাবাকে জিজ্ঞেস করিস, বাবা তো এ বাড়িতে তোকেই সবচেয়ে বেশি আদর করে।’
কথাটা বলে হাসু আপা আবার গল্পের বইয়ে মনোযোগী হয়ে উঠলেন।
রাসেলের আর বাবাকে কথাটা জিজ্ঞেস করা হয়নি। সে অনেকবার ভেবেছে সাহস করে একদিন বাবাকে কথাটা বলবে। বলার সময় সে পেয়েছিল ঠিকই কিন্তু সুযোগ হয়ে ওঠেনি। বাবার আশেপাশে সব সময় এত লোকজন ভিড় করে থাকে যে রাসেলের আর ইচ্ছে করেনি মানুষজনের ভিড় ঠেলে গিয়ে বাবাকে কথাটা বলে।
জন্মের পর থেকে রাসেল দেখে এসেছে তার বাবা সব সময় ব্যস্ত থাকেন। ঘরে যতটা সময় থাকেন তখনও কি বাবার একা থাকার জো আছে!
কত রকমের মানুষজন যে বাবাকে ঘিরে থাকে। আর বাবাটাও যেন কেমন!
সবাইকে নিয়ে থাকতেই যেন বাবার ভালো লাগে।
কখনও কখনও ঘুমের ভেতর রাসেল তার গালে, কপালে, মাথায় বাবার আদর মাখানো হাতের পরশ পেত। বাবার হাতের স্পর্শ পেলে, বাবার শরীরের গন্ধ পেলে তার ঘুম আপনা-আপনি হাল্কা হয়ে গেলেও রাসেল গভীর ঘুমের ভাণ করে বিছানায় ঘুমিয়েই থাকত। আর ঘুমের ভাণ করে ঘুমিয়ে থাকা রাসেল ঠিকই টের পেত তার ভীষণ ব্যস্ত বাবা, যে বাবাকে সারাদিন দেশের মানুষ ঘিরে থাকে সেই বাবা অনেক সকালে ঘুম থেকে জেগে গিয়ে একটু সময় বাঁচিয়ে পরম ভালোবাসায় তার ছোট ফুটফুটে রাসেল সোনার কপালে, মাথায়, বুকে, চিবুকে, গালে, চুলে আদর করে দিত।
রাসেল তখন কিছু বলত না। ঘুমের মধ্যেও সে বাবার হাত ধরার চেষ্টা করত। বাবাও নিবিড় মমতায় রাসেলের হাত ধরত, রাসেলের নরম নরম কচি হাতের আঙ্গুলগুলো নিয়ে খেলা করত। বাবা রাসেলের পাশে বসে থেকে এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকেন।

দুই
বাবা সারাদিন পার্টি অফিস, মিটিং মিছিল-বক্তৃতা করে অনেক রাতে ঘরে ফিরে হাসু, রেহানা, কামাল, জামালের সঙ্গে বসে রাতের খাবার খেতে খেতে সবার খোঁজখবর নেন। খাওয়ার সময় বাবা কত্ত রকমের গল্প যে করেন! বাবার গল্প শুনে মা হাসেন। হাসু আপা হাসেন। রেহানা আপা, কামাল ভাই, জামাল ভাইও হাসেন। বাবার কথায় মা না হেসে পারেন না। খাওয়া-দাওয়া শেষ হলে বাবা নিজের পড়ার ঘরে কিছুটা সময় পত্র-পত্রিকা পড়ে, রবীন্দ্রসংগীত-নজরুল গীতি শুনবেন। তারপর পাইপ নিয়ে বারান্দায় গিয়ে কিছুটা সময় দাঁড়িয়ে থেকে সামনের লেকের দিকে তাকিয়ে থাকবেন। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়বেন।
বাবা ঘরে এসে দেখেন রেনু রাসেলকে বুকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে। রেনু আর রাসেলকে অমন করে ঘুমাতে দেখে বাবার বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে যায়।
কেন বাবার বুকের ভেতর থেকে অমন দীর্ঘশ্বাস বের হয়?
আবার কখনও কখনও উল্টোটাও হয়। খুব সকালে রাসেলের ঘুম ভেঙে গেলে সে পাশে শুয়ে থাকা বাবাকে মনপ্রাণ ঢেলে দেখে। বাবাকে কাছে থেকে তার খুব কমই দেখা হয়। আহা রে!
বাবা যখন ঘুমিয়ে থাকেন তখন বাবাকে কেমন বাচ্চা ছেলেদের মতো লাগেÑ রাসেল তার বাবাকে বাচ্চা ছেলেদের মতো দেখার জন্য প্রায়ই সকালবেলা আগে-ভাগে ঘুম থেকে জেগে যেত।
রাসেল যে প্রায় প্রতিদিনই সাতসকালে আগে-ভাগে ঘুম থেকে জেগে উঠত, তা কি কখনও তার বাবা জানতে পেরেছে?
সকালবেলার আকুলি বিকুলি করা বরফিকাটা রোদ যখন বত্রিশ নম্বর বাড়ির দোতলার কোণার ঘরে ঘুমিয়ে থাকা বাবার মুখে এসে পড়ত, তখন বাবাকে যে কি ভীষণরকম সুন্দর লাগত সেটি রাসেল ছাড়া আর কে জানে!

Category:

পাটের নতুন যুগে বাংলাদেশ

52উত্তরণ প্রতিবেদন:  রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে সংসদ ভবনের উল্টো দিকে পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট চত্বরে গবেষণার কাজে ব্যস্ত সংস্থাটির বিজ্ঞানীরা। লিকলিকে লম্বা পাটগাছ বাতাসে নুয়ে পড়ে, কিন্তু ভাঙে না। কারণ, এতে লিগনিন নামে এক ধরনের জৈব রাসায়নিক বেশি থাকে। তুলায় লিগনিন থাকে না বলে তা নরম ও তুলতুলে। কাপড় তৈরির বাজারে পাটের আঁশের চেয়ে তুলার সুতার দাম ও কদর বেশি।
তুলার মতো পাটের আঁশও যাতে নরম হয়, সেই লক্ষ্যে বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা পাটের লিগনিনের জন্য দায়ী জিনকে শনাক্ত করেছেন। এখন তারা প্রয়োজন অনুযায়ী দেশের এই অন্যতম অর্থকরী ফসলের লিগনিনের পরিমাণ বাড়াতে বা কমাতে পারবেন। শুধু তা-ই নয়, পাটের আঁশের মান, দৈর্ঘ্য ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য দায়ী ৪টি জিনের পেটেন্ট (কৃতিস্বত্ব) পেয়েছে বাংলাদেশ। এর মধ্য দিয়ে পাটের নতুন যুগে প্রবেশ করল বাংলাদেশ। এ ছাড়া যে কোনো উদ্ভিদ বা ফল থেকে যাতে দ্রুত রস, জৈব জ্বালানি ও প্রসাধনী তৈরি করা যায়, সেই কাজেও সাফল্য পেয়েছেন ওই বিজ্ঞানী দল। এ জন্য তারা এক ধরনের ছত্রাকের ৩টি জিন শনাক্ত করে সেগুলোর পেটেন্ট পেয়েছেন।
বিশ্ব কৃতিস্বত্ব কর্তৃপক্ষের (ডব্লিউআইপিও) কাছ থেকে পাট ও ছত্রাকের এই ৭টি জিনের কৃতিস্বত্ব পাওয়ার একটি অর্থনৈতিক গুরুত্ব আছে। তা হচ্ছে বিশ্বের কোথাও এ নিয়ে কোনো বাণিজ্যিক গবেষণা হলে বাংলাদেশের অনুমতি নিতে হবে। বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়ম অনুযায়ী এই উদ্ভাবন থেকে কোনো আয় হলে তার একটি অংশ বা রয়্যালটি বাংলাদেশকে দিতে হবে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও হংকং এবং ইউরোপের ২৮টি দেশ এই পেটেন্টকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে ভারত, চীন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ব্রাজিল এখনও তা দেয়নি।

মাকসুদুল আলমের স্বপ্নযাত্রা এখন বাস্তব
পাটের জীবনরহস্য (জিনোম সিকোয়েন্সিং) উন্মোচনের পরবর্তী সাফল্য হিসেবেই বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা পাট ও ছত্রাকের ওই জিনগুলো শনাক্ত করেছেন। এখন পেটেন্ট পাওয়ার পাশাপাশি এই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে নতুন জাত উদ্ভাবন ও শিল্প-বাণিজ্যের কাজে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হলো।
২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বিজ্ঞানী মাকসুদুল আলমের নেতৃত্ব একদল তরুণ গবেষক পাটের জীবনরহস্য উন্মোচন করেন। বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার প্ল্যান্ট-এর চলতি বছরের জানুয়ারি সংখ্যায় এই আবিষ্কারে সব বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। ২০১৪ সালে তিনি মারা যাওয়ার আগেই ওই ৭টি জিনের পেটেন্টের জন্য আবেদন করে বাংলাদেশ। বিভিন্ন ধাপ পার হয়ে চলতি বছর থেকে একের পর এক এসব পেটেন্ট পাওয়া শুরু হয়।
ওই পেটেন্ট পাওয়ার জন্য বাংলাদেশের আইনি পরামর্শক সংস্থা হোসেন অ্যান্ড খান অ্যাসোসিয়েটস এবং যুক্তরাষ্ট্রের আইনি পরামর্শক সংস্থা ফলি হগ ২০১১ সাল থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের হয়ে কাজ করছে। মূলত কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী এমপি ও তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি এমপির উদ্যোগে ওই গবেষণার আন্তর্জাতিক পেটেন্ট পাওয়ার জন্য আবেদন করা হয়।
পাট ও ছত্রাকের ৭টি জিনের প্যাটেন্ট পেয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বে কোথাও নতুন জাতের বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশকে অর্থ দিতে হবে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে হোসেন অ্যান্ড খান অ্যাসোসিয়েটসের আইনজীবী মোতাহার হোসেন বলেন, যেসব দেশে ওই ৭টি জিনের পেটেন্ট পাওয়া গেছে, তার আর্থিক সুবিধা কীভাবে পাওয়া যাবে, তা নিয়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের ওই দুই আইনি পরামর্শক সংস্থা কাজ করছে। অন্য দেশগুলোতেও যাতে বাংলাদেশ পেটেন্ট পায়, সেই লক্ষ্যে তারা কাজ করছে।
পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা গেছে, পাটের শনাক্ত ৪টি জিন কাজে লাগিয়ে ইতোমধ্যে ৪টি নতুন জাত তৈরির শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন বিজ্ঞানীরা। রবি এক ও দুই এবং শশী এক ও দুই নামের ওই জাত ৪টির মধ্যে প্রথমটি ইতোমধ্যে দেশের বেশ কয়েকটি এলাকায় পরীক্ষামূলক চাষ হয়েছে। এতে সাফল্যও পাওয়া গেছে। বাকিগুলো পর্যায়ক্রমে চাষ হবে।

পাটের আঁশের মান
পাটের আঁশের মধ্যে সাধারণত ১২ থেকে ১৪ শতাংশ লিগনিন থাকে। পাট গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, প্রাথমিকভাবে লিগনিনের পরিমাণ কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা যাবে। এতে আঁশ নরম হবে। ফলে পাট দিয়ে শার্ট, প্যান্ট বা সমজাতীয় পোশাক প্রস্তুতের সুতা তৈরি করা যাবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের বিজ্ঞানীরা পাটের সুতা ও তুলার সুতা মিশিয়ে কাপড় তৈরি করছেন। সেগুলো দিয়ে বিভিন্ন পোশাক প্রস্তুত হলেও তা বেশ শক্ত হওয়ায় খুব বেশি বাজার পাচ্ছে না। এমন সুতা মূলত দরজা-জানালায় ব্যবহৃত পর্দা, কার্পেট ও তৈজসপত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পাটের তৈরি জিনসের প্যান্ট ও অন্যান্য পোশাক তৈরি করে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি করলেও মূলত এর কাপড় প্রয়োজনীয় মাত্রায় নরম করতে না পারায় বাজার বড় হচ্ছে না।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ বলেন, এখন নতুন জাত তৈরির কাজ চলছে। এ থেকে তৈরি উন্নতমানের আঁশ পোশাকশিল্পে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।

পাটের রোগ প্রতিরোধ
পাটের জিনোম তথ্য থেকে রোগ প্রতিরোধী জিন শনাক্ত করেছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা। এই জিনের কার্যকারিতা বাড়িয়ে পাট গাছকে রোগ প্রতিরোধী করা যাবে।
পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের বিজ্ঞানীরা জানান, কা-পচা রোগ হলে বেশির ভাগ পাট গাছ পরিপক্ব হওয়ার আগেই মারা যায়। এ ছাড়া ঢলে পড়া ও চারায় মড়ক রোগের আক্রমণ বেশি হয়ে থাকে। দেশে প্রতিবছর কম-বেশি ২০ শতাংশ পাট বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে নষ্ট হয়। ভারত, পাকিস্তান, ব্রাজিল ও চীনেও পাটের নানা ধরনের রোগের আক্রমণ হয়ে থাকে। রোগ সৃষ্টিকারী জিন শনাক্ত করার ফলে রোগ প্রতিরোধী জাত উদ্ভাবন করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
এ ছাড়া পাটের আঁশ বৃদ্ধি ও লম্বার জন্য দায়ী দুটি জিনও শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা। এসব জিন কাজে লাগিয়ে ভালো ও বেশি আঁশযুক্ত পাটের জাত উদ্ভাবন করা যাবে।

ছত্রাকের ৩টি জিন
ম্যাক্রোফমিনা ফেসিওলিনা নামের ছত্রাকের জিনোম তথ্য থেকে পেকটিন, লিগনিন ও সেলুলোজ ভাঙতে পারে এমন এনজাইম উৎপাদনকারী জিন ওই বিজ্ঞানীরা শনাক্ত করেছেন।
এই জিনগুলোর পেটেন্ট পেয়েছে বাংলাদেশ। ক্ষতিকারক হিসেবে পরিচিত এসব ছত্রাককে উদ্ভিদ, ফসল ও ফলের গুণাগুণ বাড়ানোর জন্য কাজে লাগানো যাবে। এর ফলে যে কোনো উদ্ভিদ বা ফল থেকে দ্রুত রস তৈরির কাজে ব্যবহার করা যাবে। জৈব জ্বালানি বা জৈব ইথানল, কাগজ, কসমেটিকস তৈরিতেও ওই এনজাইম কাজে লাগানো যাবে।
ষাটের দশকে দেশে পাটের জৈবপ্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা শুরু করেছিলেন অধ্যাপক শামসুল ইসলাম। পেটেন্ট পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস ও অর্থনীতির সঙ্গে মিশে আছে পাট। এবার বিশ্বের পাট গবেষণার জৈবপ্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশ অগ্রণী ভূমিকা রাখল। এই পেটেন্ট কাজে লাগিয়ে শিল্পের উপযোগী পাটপণ্য উৎপাদন করতে পারলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন ধারার সূচনা করবে। বাংলাদেশকে আরও এগিয়ে নেবে।

Category:

আলু উৎপাদনে নীরব বিপ্লব

54রাজিয়া সুলতানা: বাংলাদেশে খাদ্য তালিকায় ভাতের পরেই আলুর অবস্থান। সামগ্রিকভাবে ভুট্টা, গম ও চালের পর আলু বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম খাদ্যশস্য। পুষ্টিগুণের কারণে খাদ্য তালিকায় ক্রমাগত বাড়ছে আলুর চাহিদা।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী তিন যুগে আলুর উৎপাদন প্রায় ১০ গুণ বেড়েছে। ১৯৮০ সালে আলুর উৎপাদন ছিল প্রায় লাখ টন। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ কোটি লাখ টন। এ সাফল্য বাংলাদেশকে এনে দিয়েছে নতুন এক মাইলফলক। আলু উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন শীর্ষ ১০ দেশের একটি। এ স্বীকৃতিটি দিয়েছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (ফাও)। সম্প্রতি সংস্থাটির প্রকাশিত প্রতিবেদনে ৮২ লাখ ১০ হাজার টন উৎপাদন করে বাংলাদেশ রয়েছে অষ্টম স্থানে। ৮ কোটি ৫৯ লাখ টন উৎপাদন নিয়ে তালিকার প্রথমেই রয়েছে চীন। শীর্ষ পাঁচের বাকি অন্য দেশগুলো হলোÑ ভারত, রাশিয়া, ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্র। ভারত ৪ কোটি ৫০ লাখ, রাশিয়ায় ২ কোটি ৯৫ লাখ, ইউক্রেনে ২ কোটি ৩২ লাখ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ১ কোটি ৯১ লাখ টন আলু উৎপাদিত হচ্ছে। ১ কোটি ৬ লাখ টন উৎপাদন করে জার্মানি রয়েছে ষষ্ঠ তালিকায়। ৯১ লাখ টন আলু উৎপাদন করে পোল্যান্ড রয়েছে সপ্তম স্থানে। বাংলাদেশের চেয়ে কম অর্থাৎ, ৬৯ লাখ টন উৎপাদন নিয়ে বেলারুশের অবস্থান তালিকায় নবম। আর ৬৮ লাখ উৎপাদন নিয়ে দশম স্থানে নেদারল্যান্ডস। অর্থাৎ আলু বাংলাদেশকে আশার আলো দেখাচ্ছে।
বাংলাদেশে আলু উৎপাদনে ঘটে যাচ্ছে নীরব বিপ্লব। বিশেষ করে কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমে আলুর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে স্পর্শ করেছে নতুন এক উচ্চতা। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) বিজ্ঞানীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তারা নেদারল্যান্ডস থেকে আনা বীজআলু আরও বেশি সমৃদ্ধ করে এ দেশের আবহাওয়া উপযোগী করে প্রান্তিক পর্যায়ের চাষিদের হাতে তুলে দিচ্ছে। গত ১২ বছরে দেশীয় বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত নতুন প্রজাতির ৬০টি জাত থেকেই দেশের ৭৫ শতাংশ আলু উৎপাদন হচ্ছে। বর্তমানে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি এলাকা ছাড়া দেশের সব স্থানেই আলুর চাষ হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি আলু উৎপাদন হচ্ছে মুন্সিগঞ্জ, বগুড়া ও রংপুর জেলায়। উৎপাদিত আলু দেশের চাহিদা মিটানোর পরও বিদেশে রপ্তানি সম্ভব হচ্ছে। তবে নানা কারণে আলু মৌসুমে কৃষক আলুর যথাযথ দাম পাচ্ছে না। সাথে আলু সংরক্ষণের পর্যাপ্ত সুযোগের অভাবে উৎপাদিত আলুর একটি অংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অথচ এই আলু যথাযথভাবে উৎপাদন এবং প্রক্রিয়াজাত করে বিদেশে রপ্তানির সুযোগ রয়েছে।
আলু বাঙালির ভাজি-ভর্তার গ-ি পেরিয়েছে অনেক আগেই। আলু থেকেই তৈরি হচ্ছে পটেটো স্যান্ডউইচ, চিপস, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, মিষ্টিসহ মুখরোচক রকমারি খাবার। বাংলাদেশে আলুর আদি জাত হচ্ছে মিষ্টি আলু। আর গোল আলুর আদি জাত দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরুতে। পরবর্তী সময়ে তা পর্তুগিজ ব্যবসায়ী ও নাবিকদের হাত ধরে ইউরোপে প্রবেশ করে। ওই পর্তুগিজ ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে মুন্সিগঞ্জ জেলায় আলুর আবাদ শুরু হয়েছিল প্রায় ২০০ বছর আগে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট নিরসনকল্পে মানুষের খাদ্য হিসেবে আলুর কদর বেড়ে যায়। গোলআলু ও মিষ্টিআলু দুটোই যুদ্ধোত্তর পৃথিবীর খাদ্য সংকট মোকাবিলায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।
চাহিদা ও উৎপাদন উভয়ই বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশেই আলু প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপিত হয়েছে। তা থেকেই উৎপাদিত চিপস ও ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। রপ্তানি ব্যুরো তথ্যমতে, ভিয়েতনাম, রাশিয়া, কাতার, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ প্রায় ৩০ দেশে বাংলাদেশের আলু পাঠানো হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে আলুর রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১০ গুণ।
বিশ্বের অনেক দেশেই রুটি বা ভাতের বদলে আলু খাওয়ার প্রচলন আছে। আমাদের দেশে আলু এখনও পরিপূরক বা সহায়ক খাবার। অথচ আলু ভাতের চেয়ে বেশি পুষ্টিকর। আলু শর্করার জোগান দেওয়ার পাশাপাশি আলু নানা ধরনের ভিটামিন ও খনিজ লবণের চাহিদা মেটায়। পাশাপাশি খাদ্যে আঁশ থাকায় আলু হজমে সহায়ক এবং রক্তে শর্করার হার ঠিক রাখে। আলুতে রয়েছে পানি, শর্করা, আমিষ, স্নেহ, আঁশ, ক্যালসিয়াম, লোহা, ভিটামিন-সি ও ভিটামিন বি-১, বি কমপ্লেক্স, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, জিংক ও ফসফরাস। ভিটামিন-সি থাকায় শর্করার চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আলু শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। আলু রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে, মানসিক চাপ কমিয়ে মস্তিষ্ক কর্মক্ষম রাখে, রোগ প্রতিরোধ করে, হজম সহায়ক, ত্বক ভালো রাখে, রোদে পোড়া ভাব দূর করতে সহায়তা করে আলুর রস। এত গুণ থাকার পরেও প্রান্তিক পর্যায়ে আলু দামের ক্ষেত্রে ঘটে যাচ্ছে নানা বিড়ম্বনা। সাধারণত মৌসুমের শেষ দিকে এসে কৃষিপণ্যের দাম বাড়লেও আলুর ক্ষেত্রে তা দৃশ্যমান হচ্ছে না। এক্ষেত্রে কৃষিবিদদের বাস্তবসম্মত ধারণাÑ চাহিদার চেয়ে উৎপাদন অনেক বেশি, সঠিক সংরক্ষণের অভাব আর অপ্রতুল রপ্তানির কারণে প্রান্তিক আলু চাষিরা সঠিক মূল্য পাচ্ছে না। তারপরও আলুর উৎপাদন প্রতিবছরই বাড়ছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৮৬ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরের উৎপাদনের খসড়া হিসাব অনুযায়ী ১ কোটি টন ছাড়িয়ে যাবে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আলুর উৎপাদন হয়েছিল ৯৪ লাখ ৭৪ হাজার টন। দেশে আলুর বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৭০ লাখ টন। এর সাথে আবার যোগ হয় আগের বছরের উদ্বৃত্ত আলু। ফলে প্রতিবছর অন্তত ৩০ লাখ টন আলু রপ্তানি করা সম্ভব।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০১৩-১৪ অর্থবছরে আলু রপ্তানি করে আয় করেছিল ৩ কোটি ৩৮ লাখ ডলার। নানা কারণে সেই ধারাবাহিকতায় ছেদ পড়েছে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে। এর মধ্যে আলুর নানা পরীক্ষামূলক সহায়ক খাবার উৎপাদনের কারণে রপ্তানিতে ভাটা পড়েছে। চলতি বছর আলু রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে ১ কোটি ৩০ লাখ ডলার। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আয় হয়েছিল প্রায় ১ কোটি ডলার। আলু সবচেয়ে বেশি রপ্তানি হয়েছে মালয়েশিয়ায়। দেশটিতে প্রায় ৮৩ লাখ ডলারের আলু রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া সিঙ্গাপুর, শ্রীলংকা, মধ্যপ্রাচ্যের ব্রুনেই, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে উল্ল্যেখযোগ্য পরিমাণে আলু রপ্তানি করা হচ্ছে।
যে হারে বাংলাদেশে আলু উৎপাদিত হয়; তাতে বিশ্ববাজারে আমাদের আরও জায়গা করে নেওয়া সম্ভব। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগী জাতের অভাব, রপ্তানি-বাজার উপযোগী গ্রানুলা জাতের আলু বাংলাদেশে আবাদ হয়। বিশ্ববাজারে এর দাম খুব কম। পরিবহনেও আলু নষ্টও হয়। হিমাগারে অনেক সময় আলুর রং পাল্টে যায়। ফলে আমদানিকারকদের ওই আলু নিয়ে বিরূপ মনোভাবের সৃষ্টির অবকাশ রয়েছে। ইউরোপিয়ান ও যুক্তরাজ্য হতে পারে বাংলাদেশের জন্য অবারিত বিশ্ববাজার। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশে সবজি রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা এবং যুক্তরাজ্যে সরাসরি কার্গো বিমান পরিবহন বন্ধ থাকায় এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। এর পিছনে একটি অসাধু ব্যবসায়ী চক্র দায়ী। তারা মানছে না ফাইটোস্যানিটারি সনদ (পিসি বা স্বাস্থ্য সনদ)-এর বিধিনিষেধ। যে কোনো পণ্য রপ্তানি করতে গেলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধিপ্রতিষ্ঠান আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে ইআরসি নিতে হয়। একই কাজে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পিসি নিতে হয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর থেকে। কিন্তু তারা এক্ষেত্রে বেজায় অনীহা দেখায়। ব্যবসায়ীদের অসচেতনতায় কারণেই বাংলাদেশ থেকে পাঠানো আলুতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার অস্তিত্ব পেয়েছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ফলে তারা বিধিনিষেধ দিয়েছে। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে ইইউ রপ্তানিযোগ্য পণ্যের একটি ক্রিটিক্যাল কমোডিটির তালিকা করেছে। যেখানে আলুও রয়েছে। ওই কারণে গত দুই অর্থবছরে বাংলাদেশের আলু কম রপ্তানি হয়েছে।
বাংলাদেশের বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকার আলুতে ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাকসহ রপ্তানির ক্ষেত্রে অন্যান্য বাধা দূর করতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। সবজি উৎপাদনের বিভিন্ন স্তরে বিদ্যমান সমস্যা চিহ্নিত করা ও তা সমাধানের উপায় খুঁজছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই)। এ লক্ষ্যে সবজি রপ্তানি প্রস্তুত (ইআরবিভি) প্রকল্পের আওতায় বিশ্ববাজার সম্ভাবনা এবং সমস্যা নিয়ে কাজ করছে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি। ইআরবিভির আওতায় প্রাথমিকভাবে প্রধান রপ্তানির তালিকায় থাকা আলুসহ প্রধান ১০টি সবজি নিয়ে দেশব্যাপী গবেষণা অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি কোন সবজি কোন জেলায় বেশি উৎপাদন হয়, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বীজ থেকে শুরু করে কীটনাশক ব্যবহার এবং রপ্তানি প্রক্রিয়ার সব ধাপে বিদ্যমান সমস্যা চিহ্নিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিশ্বের কোন দেশে বাংলাদেশি সবজির কী ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে, কীভাবে সম্ভাবনাময় বাজারের সাথে সংযোগ তৈরি করা যায়Ñ এ বিষয়গুলো গবেষণায় তুলে আনা হচ্ছে। গবেষণায় প্রাপ্ত ফলের ভিত্তিতে পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছে সংশ্লিষ্টরা। গবেষণা করছে বিভিন্ন ইউনিভার্সিটির গবেষকবৃন্দ। তা ছাড়া সবজি রপ্তানিতে অনিয়মের কারণে বেশ কটি প্রতিষ্ঠানের সনদ বাতিল করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বিদেশে শাক-সবজি রপ্তানি করায় ১১ প্রতিষ্ঠানের ফাইটোসেনিটারি সনদ (পিসি) বাতিল করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। অন্যদিকে পিসি জালিয়াতি করে সবজি রপ্তানি করায় ছয় প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি সনদ বাতিল করেছে আমদানি ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের দফতর।
নিজের দেশের প্রেক্ষাপটে বৃদ্ধি পাচ্ছে নগরায়ন এবং উন্নত হচ্ছে গ্রামীণ বাজার আর সাথে সাথে বাড়ছে আলুর ব্যবহার। আলুর ব্যবহার বৃদ্ধির পাশাপাশি এর সংরক্ষণও বাড়িয়ে তোলা জরুরি। সংরক্ষণের পরিমাণ বাড়িয়ে তোলা এবং রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব হলে আলু ও প্রান্তিক কৃষক উভয়ই নতুন বাতিঘরের আলোতে সমুজ্জ্বল হয়ে উঠবে।

লেখক : গবেষক এবং সমাজকর্মী

Category:

মুক্তিযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন

57আরিফ সোহেল: বিজয়ের মাস। এ মাসেই স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশের। জাতির পিতার নির্দেশে এ দেশের লাখো লাখো মানুষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সেখানে পিছিয়ে থাকেন নি ক্রীড়াবিদ-সংগঠকরা। তারাও স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূমিকা রেখে ইতিহাসের স্মারকগ্রন্থে রক্তাক্ষরে বাঁধিয়ে রেখেছেন তাদের নাম। এ দেশের বীরোচিত ক্রীড়াবিদরা যে অবদান রেখেছেন, তা ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। এ কথায় বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ নামের একটি দেশের অভ্যুদয় ঘটার পেছনে তাদের আত্মত্যাগ ও গৌরবময় অবদানের কোনো তুলনা হয় না।
বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ নামের সবুজ-শ্যামল দেশটির অভ্যুদয় ঘটে অনেক মানুষের সংগ্রাম, বীরত্ব আর আত্মত্যাগে। আমরা একটা মানচিত্র ও জাতীয় পতাকা পেয়েছি অনেক স্বেদ, রক্ত ও আত্মত্যাগ বিনিময়ে। এ দেশের প্রায় প্রতিটি মানুষকে স্পর্শ করে একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রাম। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে এমন সুসময় আর আসে নি। এমন দুঃসময় কখনও আসে নি। ইতিহাসের সেই শ্রেষ্ঠ সময়ে বাঙালি হয়ে ওঠে অজেয় ও অপরাজেয়। নিপীড়িত-বঞ্চিত-লাঞ্ছিত বাঙালি ঘুম থেকে জেগে ওঠে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে। তার উদাত্ত আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাঙালিরা জীবনপণ ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে।
এক্ষেত্রে ক্রীড়াবিদরা মোটেও পিছিয়ে ছিলেন না। স্বাধীনতা সংগ্রামে তাদের রয়েছে অবিস্মরণীয় ভূমিকা। মিছিলে, মিটিংয়ে, আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ার পাশাপাশি অনেক ক্রীড়াবিদ খেলার মাঠ থেকে সরাসরি সশস্ত্রযুদ্ধে অবতীর্ণ হন। লড়াই করেন জীবন বাজি রেখে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেনÑ ফুটবলার মেজর (অব.) হাফিজ, নূরুন্নবী, ইনু, প্যাটেল, শিরু, ক্রিকেটার তান্না, শেখ কামাল, মাসুদ ওমর, হকির হাবিবুল, হাফিজউল্লাহ, বাস্কেটবলের কাজী কামাল, কুস্তিগীর খসরু, ভলিবলের কবীর, সাঁতারু এরশাদন্নবী প্রমুখ। খেলার মাঠের মতো যুদ্ধের মাঠেও তারা দেখিয়েছেন অসম সাহসিকতা।
স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন লড়াকু মুক্তিযোদ্ধা ক্রিকেটার জুয়েল, ফুটবলার মজিবর, সারোয়ার, কুটু মনি, বাবুল, সোহরাওয়ার্দী, বাবুল, মিজান, অ্যাথলেট মিরাজ, তপন চৌধুরী, শাহেদ আলী, দাবার ক্বাসেদ, সাদিক, হকির মীরু প্রমুখ। প্রাণ দিয়েছেন দৈনিক অবজারভার পত্রিকার ক্রীড়া সম্পাদক ও ক্রীড়া সংগঠক আবদুল মান্নান লাড়– ভাই, আজাদ বয়েজ ক্লাবের নিবেদিতপ্রাণ ক্রিকেট সংগঠক মুশতাক, নোয়াখালীর ক্রীড়া সংগঠক ভুলু প্রমুখ।
পাকিস্তান আমলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রের মতো বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনও ছিল উপেক্ষিত। এ অঞ্চলের ক্রীড়াবিদরা যাতে তাদের প্রতিভা বিকাশের মাধ্যমে সাফ্যল্যের দুয়ারে পৌঁছতে না পারে, সে জন্য কূটকৌশলের আশ্রয় নেওয়া হতো। তাদের তাচ্ছিল্য ও পক্ষপাতিত্বের অন্যতম দৃষ্টান্ত হলো ক্রীড়াক্ষেত্রে বাজেট বরাদ্দ। জনসংখ্যার অনুপাতে বাজেট বরাদ্দের কথা থাকলেও এক্ষেত্রে চরম বৈষম্য প্রদর্শন করা হয়। ফলে পর্যাপ্ত সহযোগিতা না পাওয়ায় পূর্ব পাকিস্তানের ক্রীড়াঙ্গন খুব বেশি এগিয়ে যেতে পারে নি। তারপরও যারা শত উপেক্ষা, অবহেলা ও বঞ্চনা ছাপিয়ে ব্যক্তিগত নৈপুণ্য ও ক্রীড়াশৈলী দেখিয়ে সাফল্য দেখালেও তাদের প্রয়োজনীয় সুযোগ ও স্বীকৃতি দেওয়া হতো না। কিংবদন্তি সাঁতারু ব্রজেন দাস ১৯৫৬ সালের অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে অলিম্পিক গেমসে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন প্রধান দাবিদার। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই তাকে সুযোগ দেওয়া হয়নি। তার পরিবর্তে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সাঁতারু পাঠানো হয়। সেই আপেক্ষ থেকেই অনুপ্রাণিত ব্রজেন দাস ছয়বার ইংলিশ চ্যানেল অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে  ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। এক কথায় শুধু সাঁতার নয়; এ অঞ্চলের ক্রীড়াবিদরা যাতে পাদপ্রদীপের আলোয় উঠে আসতে না পারে, পাকিস্তানিরা সর্বদা সেই চেষ্টাই করত।
মুক্তি সংগ্রামের দামামায় এই অঞ্চলের মানুষ ক্ষোভের অনলে জ্বলতে থাকে। তার প্রতিফলন দেখা যায় খেলার মাঠেও। একাত্তর সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকা স্টেডিয়ামে চার দিনের ক্রিকেট ম্যাচ হচ্ছিল পাকিস্তান এবং কমনওয়েলথ একাদশের মধ্যে। ম্যাচের শেষ দিন ১ মার্চ দর্শকরা খেলা উপভোগ করার সময় বেতারে দুপুর ১টার খবরে বলা হয়, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান স্থগিত করে দিয়েছেন জাতীয় পরিষদ অধিবেশন। ওই অধিবেশনে সরকার গঠন করার কথা ছিল জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী লীগের। অধিবেশন স্থগিত করার অর্থ ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভোটে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত বাংলার মানুষের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের গড়িমসি করা। স্বাধিকারের চেতনায় ঢাকা স্টেডিয়ামের দর্শকরা মুহূর্তেই স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে এবং পুড়িয়ে দেয় পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা।
মহৎপ্রাণ এই ক্রীড়াবিদরা স্মরণীয় হয়ে আছেন বাংলাদেশের ইতিহাসে। এই বীর ও সাহসী মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি এক ভিন্নধর্মী ভূমিকায় উজ্জ্বল হয়ে আছেন একদল মহান ক্রীড়াবিদ। একাত্তরের সেই উত্তাল সময়ে, দেশের অস্বাভাবিক অবস্থাকে বিদেশি পর্যটক ও সাংবাদিকদের কাছে স্বাভাবিক বুঝাতে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ঢাকায় ‘আগা খান গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট’ আয়োজনের ঘোষণা দেয়। পাকিস্তানিদের এই কৌশলের পাল্টা চ্যালেঞ্জ হিসেবে এবং মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে বিশ্ব জনমত ও তহবিল গড়ে তোলার জন্য ভারতের মাটিতে খেলা অনুষ্ঠানকে একটি মিশন হিসেবে নিয়ে ১৯৭১ সালের জুন মাসে গঠন করা হয় ‘বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতি’। বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতির উদ্যোগে প্রতিবেশী ভারতের বিভিন্ন স্থানে প্রদর্শনী ফুটবল খেলেন বাংলার দামাল ফুটবলাররা। তাদের চোখে ছিল অন্যরকম স্বপ্ন। বুকে ছিল বাংলা, বাঙালি ও বাংলাদেশের প্রতি অপার ভালোবাসা। ফুটবল খেলার মাধ্যমে তারা গড়ে তোলেন অভূতপূর্ব জাগরণ। স্বাধীনতার মহান মন্ত্রে উজ্জীবিত মুক্তিকামী এই ফুটবলারদের খেলা দেখার জন্য মাঠে দর্শকদের বাঁধ ভাঙা জোয়ার নামে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে গড়ে ওঠে জনমত। খেলা থেকে অর্জিত অর্থ জমা দেওয়া হয় প্রবাসী সরকারের তহবিলে। ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’ বিশে^র ক্রীড়া ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা। সাঁতারু কানাইলাল শর্মা এবং অরুণ নন্দী একটানা সাঁতার কেটে বিশ্বরেকর্ড গড়ে দারুণ সাড়া জাগাতে সক্ষম হন। এ থেকে অর্জিত অর্থ জমা দেওয়া হয় মুক্তিযুদ্ধের তহবিলে। মুক্তিযুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আয়োজিত হতো ক্রিকেট ম্যাচসহ অন্যান্য খেলা। খেলাকে যেভাবে মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ার করা যায়,  বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত বিরল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বপক্ষে ব্যাপক জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে ক্রীড়াবিদদের অত্যুজ্জ্বল ভূমিকা চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। স্বাধীনতা সংগ্রামে যেসব ক্রীড়াবিদ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বীরোচিত ও গৌরবোজ্জ্বল অবদান রেখেছেন, তাদের কথা জাতি কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করে।
আমাদের রক্তে রঞ্জিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শুধু এ দেশেরই গৌরব নয়, এটা বিলীয়মান বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা একটি ঘটনা এবং একুশ শতকের হাতে তুলে দেওয়ার লক্ষ্যে তথা নবপ্রজন্মের জন্য সময়ের দুঃসাহসী চিত্র, যা বিশ্বের সব শ্রেণির সংগ্রামী মানুষের জন্য হয়ে থাকবে আগামীর প্রেরণা। আর তার অংশীদার হয়ে আছেন বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ ক্রীড়াবিদরা।

Category: