Blog Archives

দেশের প্রথম লোহার খনি আবিষ্কার

Posted on by 0 comment

PMউত্তরণ ডেস্ক: দিনাজপুরের হাকিমপুর উপজেলার ইসবপুর গ্রামে লোহার আকরিকের (ম্যাগনেটাইট) খনি আবিষ্কার করেছে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর (জিএসবি)। দীর্ঘ দুই মাস ধরে কূপ খনন করে অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পর গত ১৮ জুন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন জিএসবির কর্মকর্তারা।
তারা জানান, সেখানে ভূগর্ভের ১ হাজার ৭৫০ ফুট নিচে ৪০০ ফুট পুরুত্বের লোহার একটি স্তর পাওয়া গেছে। যা দেশের জন্য একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা এবং বাংলাদেশে প্রথম আবিষ্কার। পরীক্ষা করা হচ্ছে লোহার উপস্থিতি। ১৮ জুন দুপুরে খনন কাজে নিয়োজিত জিএসবির উপ-পরিচালক মোহাম্মদ মাসুম জানান, বিশ্বের যে কয়েকটি দেশে লোহার খনি আবিষ্কার করা হয়েছে, সেসব খনির লোহার মান ৫০ শতাংশের নিচে। আর বাংলাদেশের লোহার ৬৫ শতাংশের ওপরে। জয়পুরহাট বিসিএসআইআর পরীক্ষাগারে পরীক্ষায় এ তথ্য পাওয়া গেছে। ইসবপুরে লোহার খনি আবিষ্কার বাংলাদেশে এটিই প্রথম। যার ব্যাপ্তি রয়েছে ৬-১০ বর্গকিলোমিটার পর্যন্ত। এখানে কপার, নিকেল ও ক্রোমিয়ামেরও উপস্থিতি রয়েছে। ১১৫০ ফুট গভীরতায় চুনাপাথরের সন্ধানও মিলে। তিনি আরও জানান, ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর ২০১৩ সালে এ গ্রামের ৩ কিলোমিটার পূর্বে মুশিদপুর এলাকায় কূপ খনন করে খনিজ পদার্থের সন্ধান পেয়েছিল। সেই গবেষণার সূত্রধরে দীর্ঘ ছয় বছর পর চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল থেকে কূপ খনন শুরু করা হয়। এরপর ১৩৮০-১৫০০ ফুট গভীরতা পর্যন্ত খননকালে সেখানে আশার আলো দেখতে পাওয়া যায়। এ খবর পেয়ে ২৬ মে জিএসবির মহাপরিচালক জিল্লুর রহমান চৌধুরীসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এখানে পরিদর্শনে আসেন। এ-সময় মহাপরিচালক সাংবাদিকদের সুখবর না দিলেও লোহার খনি আবিষ্কার হতে চলেছে এমন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। অবশেষে দীর্ঘ চেষ্টার ফলে ১৭৫০ ফুট গভীরতা খনন করে লোহার খনির আবিষ্কার করা হয়েছে। সেখানে প্রায় ৪০০ ফুট পুরুত্বের লোহার আকরিকের এ স্তরটি পাওয়া গেছে। এ অঞ্চলে ৬০ কোটি বছর আগে সমুদ্র ছিল। সেই কারণে এখানে জমাট বাঁধা আদি শিলার ভেতরে লোহার আকরিকের এ সন্ধান পাওয়া যায়। উপজেলা সদর থেকে ১১ কিলোমিটার পূর্বে ইসবপুর গ্রাম। এ গ্রামের কৃষক ইছাহাক আলীর কাছ থেকে ৫০ শতক জমি চার মাসের জন্য ৪৫ হাজার টাকায় ভাড়া নিয়ে খনিজ পদার্থের অনুসন্ধানে কূপ খনন শুরু করে ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতর।
জিএসবির উপ-পরিচালক (ড্রিলিং ইঞ্জিনিয়ার) মাসুদ রানা জানান, গত ১৯ এপ্রিল থেকে ইসবপুর গ্রামে কূপ খনন শুরু করা হয়। ৩০ সদস্যের বিশেষজ্ঞ একটি দল তিন শিফটে এ কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। আলীহাট ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি গোলাম মওলা ও ইসবপুর গ্রামের বাসিন্দারা জানান, আমরা জানতে পারলাম এখানে লোহার খনি পাওয়া গেছে। এখান থেকে লোহা উত্তোলন করা হলে এখানকার মানুষদের জীবনমান পাল্টে যাবে। কর্মসংস্থান হবে এখানকার মানুষদের। দেশের জন্যও লাভজনক হবে। এমনই আশায় বুক বাঁধছেন এখানকার সর্বস্তরের মানুষ। তাই গুরুত্ব বিবেচনায় সরকারের কাছে খনি বাস্তবায়নে জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

Category:

এলডিসি দেশের মধ্যে বিদেশি বিনিয়োগের শীর্ষে বাংলাদেশ

Posted on by 0 comment

উত্তরণ ডেস্ক: সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে বাংলাদেশের বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। ২০১৮ সালে স্বল্পোন্নত বা এলডিসি দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি এফডিআই এসেছে বাংলাদেশে। এলডিসিগুলোর মধ্যে বেশি বেড়েছেও বাংলাদেশে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি হয়েছে বাংলাদেশের। সারাবিশ্বে ১৩ শতাংশ কমলেও গত বছর বাংলাদেশে আগের বছরের তুলনায় ৬৮ শতাংশ এফডিআই বেড়েছে। বহুজাতিক বেশ কয়েকটি কোম্পানির চুক্তি ও ঘোষণা থেকে চলতি বছরে আরও বেশি এফডিআই আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাডের সর্বশেষ বিশ্ব বিনিয়োগ প্রতিবেদন-২০১৯-এ বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের এ চিত্র উঠে এসেছে। গত ১২ জুন প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে ৩৬০ কোটি ডলারের নিট এফডিআই এসেছে। বাংলাদেশের স্থানীয় কোম্পানি ঢাকা টোব্যাকো কেনার মাধ্যমে গত বছর ১৫০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে জাপান টোব্যাকো। এই একক কোম্পানিতে সর্বোচ্চ বিনিয়োগ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক অঞ্চল সামগ্রিকভাবে এফডিআইয়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ‘বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’কে আঙ্কটাড এ বছরের প্রতিবেদনের প্রতিপাদ্য করেছে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের অর্থনৈতিক অঞ্চলকেন্দ্রিক বিনিয়োগের ওপর আলাদা মূল্যায়ন করেছে আঙ্কটাড।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগ আকৃষ্ট হয় এমন অনেক কাজ ইতোমধ্যে হয়েছে। গ্যাস-বিদ্যুৎসহ অবকাঠামোর উন্নয়ন হয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের মাধ্যমে শিল্প স্থাপনে জমির সংকট দূর হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেন সহজ করতে আইনকানুন শিথিল করা হয়েছে। সহজে ব্যবসা করার সূচকের উন্নয়নের লক্ষ্যে ওয়ান স্টপ সার্ভিস আইনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী এম আমিনুল ইসলাম বলেন, বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধির জন্য যেসব অনুষঙ্গ থাকা দরকার তা এখন দেশে আছে। অবকাঠামো উন্নয়নে অগ্রগতি হয়েছে। ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু হয়েছে। পাশাপাশি তরুণ জনশক্তিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন বিদেশি উদ্যোক্তারা। আর্থ-সামাজিক অর্জনের কারণে বিদেশিদের আস্থা বাড়ছে। ফলে এফডিআই বাড়ছে। তবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও পুরনো আইনের কারণে এখনও কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। এগুলো সংশোধন ও সংস্কারের উদ্যোগ রয়েছে। বর্তমান অগ্রগতির ধারাবাহিকতা থাকলে ও প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হলে আগামীতে এফডিআই আরও বাড়বে।
আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় ২০১৮ সালে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছে ৫ হাজার ৪০০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৪ শতাংশ বেশি। এই বিশাল বিনিয়োগের সিংহভাগ পেয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত। দেশটিতে গত বছর বিদেশি বিনিয়োগ ৬ শতাংশ বেড়ে ৪ হাজার ২০০ কোটিতে ঠেকেছে। বাংলাদেশের মোট বিনিয়োগ কম হলেও বিনিয়োগে প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে।
আঙ্কটাডের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর এলডিসিগুলোতে মোট এফডিআইয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩৮০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেশি। এলডিসিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি এফডিআই এসেছে বাংলাদেশে। মিয়ানমারও বাংলাদেশের সমপরিমাণ ৩৬০ কোটি ডলার এফডিআই পেয়েছে। তবে এই বিনিয়োগ মিয়ানমারের আগের বছরের বিনিয়োগের তুলনায় ১৮ শতাংশ কম। এছাড়া এফডিআই আকর্ষণে এলডিসির শীর্ষ পাঁচ দেশের মধ্যে রয়েছে ইথিওপিয়া, মোজাম্বিক ও কম্বোডিয়া। একক কোম্পানির বিনিয়োগ হিসেবেও বাংলাদেশ শীর্ষে রয়েছে।
সম্পূর্ণ নতুন বিনিয়োগ বা গ্রিনফিল্ড ইনভেস্টমেন্ট আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ অন্যতম। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে তেল ও গ্যাস টার্মিনাল নির্মাণে যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল ইলেকট্রিক, জাপানের মিৎসুবিশি ও সামিট যৌথভাবে ৩০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করার ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া জেনারেল ইলেকট্রিক বাংলাদেশে ফসিল ফুয়েল ইলেকট্রিক পাওয়ার খাতে ৩০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে। একই খাতে চীনের হুয়াদিয়ান কর্পোরেশন প্রায় ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। এছাড়া জেনারেল ইলেকট্রিক গত বছর বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৪৪০ কোটি ডলার বিনিয়োগের অন্য এক চুক্তি করেছে। আঙ্কটাড জানিয়েছে, বিশ্বে ২০১৮ সালে এফডিআই ১৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার, যা বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দার পর বা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। তবে চলতি বছর এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে এফডিআই আরও বাড়বে বলে আশা করছে আঙ্কটাড। সংস্থাটি মনে করে, এই দুই মহাদেশে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও প্রাকৃতিক সম্পদ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করছে। বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক অঞ্চল এফডিআই আকর্ষণ করছে। বিডা আশা করছে, চলতি বছর শেষে দেশে ৩৭০ কোটি ডলার এফডিআই আসবে।

Category:

শস্যবীমা : কৃষকদের নিশ্চয়তার রক্ষাকবচ

Posted on by 0 comment

15 PMরাজিয়া সুলতানা:  কৃষিপ্রধান বাংলাদেশ। শস্য-শ্যামলা এই দেশকে স্বনির্ভরতা এনে দিতে পারে কৃষি খাত। দূরদর্শী বর্তমান সরকারের লক্ষ্য আপামর কৃষক-সমাজকে ধাপে ধাপে বীমার আওতায় নিয়ে আসা। এতে কৃষিনির্ভর জনগণের জীবন, স্বাস্থ্য ও সম্পদের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ঝুঁকি কমে আসবে। নিশ্চিত হবে সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। দেশের সম্পদ ও জীবনের ঝুঁকির শতভাগ বীমার আওতায় নিয়ে আসার একটি পাইলট প্রজেক্ট হলো শস্যবীমা। চলছে কৃষিমন্ত্রীর তত্ত্বাবধানে এই প্রজেক্ট বাস্তবায়নের ব্যাপক তোড়জোড়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকছে বর্তমান সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর। কাজ করবে আবহাওয়া অফিস। প্রজেক্ট বাস্তবায়নের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ, অধিদফতর, কৃষি ব্যাংক ও এনজিও ডিস্ট্রিবিউশন অংশীদার হিসেবে কাজ করবে।
যদিও শস্যবীমা বাংলাদেশে নতুন কোনো উপাত্ত নয়। এর শুরু হয়েছিল ১৯৭৭ সালে। চালু করেছিল সাধারণ বীমা কর্পোরেশন। তবে খরচ বেশি হওয়ায় ১৯৯৬ সালে এটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০১৪ সালে পাইলট প্রকল্প আকারে আবারও শস্যবীমা চালু করে সাধারণ বীমা কর্পোরেশন (এসবিসি)। 37 PMবর্তমান সরকারের নতুন সংযোজন আবহাওয়া সূচকভিত্তিক শস্যবীমা।
কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে প্রতিবছর অতিবৃষ্টি, বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ লেগেই আছে। এ-কারণে কৃষি-অর্থনীতিসহ বাংলাদেশের কৃষকরা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগের নেতিবাচক প্রভাব প্রশমনের লক্ষ্যে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)-এর অনুদানের ওপর ভিত্তি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সাধারণ বীমা কর্পোরেশন (এসবিসি) ও বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদফতর (বিএমডি) আবহাওয়া সূচকভিত্তিক শস্যবীমা প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করে। পরীক্ষামূলকভাবে প্রকল্পটি চালু করা হয় খরাপ্রবণ রাজশাহী, বন্যাপ্রবণ সিরাজগঞ্জ ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ নোয়াখালী জেলায়, যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি নতুন প্রায়োগিক ধারণা। আবহাওয়া কেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত আবহাওয়াজনিত তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এই বীমা পলিসি প্রস্তুত করা হয়। প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে দাবিকৃত বীমা পরিশোধ করা হয়। ভারত, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, মেক্সিকোসহ বিশ্বের বিভিন্ন উন্নয়নশীল কৃষিপ্রধান দেশে ইতোমধ্যে এই বীমা ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য আবহাওয়া সূচকভিত্তিক শস্যবীমার মাধ্যমে জলবায়ু ও প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের আর্থিক ক্ষতি হ্রাস করা। প্রকল্পের আওতায় প্রকল্পভুক্ত জেলায় মোট ২০টি স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ৪টি পাইলটিংয়ের আওতায় ৬ হাজার ৭৭২ কৃষকের অনুকূলে অতিবৃষ্টিপাতজনিত বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও অতিবৃষ্টিজনিত ঝুঁকি আবরিত করে আবহাওয়া সূচকভিত্তিক পরীক্ষামূলক শস্যবীমা পলিসি ইস্যু করা হয়েছে। প্রথম ৩টি পাইলটিংয়ের আওতায় আমন ধান ও আলু ফসলের অনুকূলে ৫ হাজার ৩৯৯টি আবহাওয়া সূচকভিত্তিক শস্যবীমাপত্র ইস্যু করা হয়েছে। এই বীমা পলিসির বিপরীতে উত্থাপিত বীমা দাবি ১৭ লাখ ৫৪ হাজার ৩১৪ টাকা। বীমাগ্রহীতা কৃষকের সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের নিজস্ব তহবিল থেকে তা পরিশোধ করা হয়েছে।
প্রকল্পটির চতুর্থ পাইলটিংয়ের আওতায় প্রকল্পভুক্ত ৩টি জেলায় বোরো ধানের বিপরীতে মোট ১ হাজার ৩৭৩টি পলিসি ইস্যু করেছে। ভ্যাটসহ ৮ লাখ ৪৮ হাজার ২৪০ টাকা প্রিমিয়াম অর্জিত হয়েছে। উক্ত পলিসিসমূহের বিপরীতে মোট ৩২ লাখ ৮৩ হাজার ১০০ টাকা বীমা-দাবি সাধারণ বীমা কর্পোরেশন পরিশোধ করা হচ্ছে। তন্মধ্যে নোয়াখালী জেলায় ৪২৬ বিঘা জমির অনুকূলে ৪০০টি আবহাওয়া সূচকভিত্তিক শস্যবীমা পলিসি ইস্যু করা হয়েছে। ইস্যুকৃত পলিসির বিপরীতে উত্থাপিত দাবিকৃত বীমা ৩ লাখ ৭০ হাজার ১০০ টাকা সাধারণ বীমা কর্পোরেশন পরিশোধের জন্য কার্যক্রম শুরু করেছে। বীমা পলিসির বিপরীতে কৃষকদের বিঘাপ্রতি ভ্যাটসহ মোট প্রিমিয়াম ছিল ৬৯০ টাকা। তন্মধ্যে সরকার বিঘাপ্রতি ভ্যাটসহ প্রিমিয়াম বাবদ ৩৯০ টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। অর্থাৎ বিঘাপ্রতি ৩০০ টাকা কৃষকের কাছ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত সর্বমোট ৬ হাজার ৭৭২ কৃষকের অনুকূলে আবহাওয়া সূচকভিত্তিক শস্যবীমাপত্র ইস্যু করা হয়েছে। এফজিডি, ট্রেনিং এবং বিভিন্ন সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে ইতোমধ্যে ১৩ হাজার ৫৪৪ কৃষককে ডব্লিউআইবিসিআই সম্পর্কে সচেতন করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ট্রেনিং প্রোগ্রাম/ওয়ার্কশপ/সেমিনারের মাধ্যমে বিভিন্ন স্টেকহোল্ডার প্রতিষ্ঠানের ৯০০ জনেরও অধিক কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া বর্তমানে রাজশাহী জেলায় পঞ্চম পাইলটিংয়ের মাধ্যমে আমন ধানের অনুকূলে আবহাওয়া সূচকভিত্তিক শস্যবীমা পলিসি ইস্যুর কার্যক্রম চলছে।
কৃষি জাতির মেরুদ-। দেশের অর্থনীতি ঠিক রাখতে কৃষকের নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে অনেকেই মনে করেন, শস্যবীমা পারে এই নিরাপত্তা বিধান নিশ্চিত করতে। কৃষিবান্ধব কৃষিমন্ত্রী কৃষিবিদ ড. মো. আবদুর রাজ্জাক এমপি কৃষকের উন্নতি তথা দেশের উন্নতি নিয়ে গভীরভাবে ভাবছেন। তার মতে, জনগণের জন্য পুষ্টি ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং উৎপাদনমুখী খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে আমাদের শিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার জন্য কৃষির কোনো বিকল্প নেই। তবে দরকার কৃষকের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা। আর এ জন্যই শুধু ৩টি জেলাই নয়Ñ মন্ত্রী উদ্যোগ নিচ্ছেন সারাদেশকে শস্যবীমার আওতায় নিয়ে আসতে। পাশাপাশি শস্যবীমা নিয়ে উল্টো মতও রয়েছে কৃষি গবেষকদের।
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এমপি সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, আমাদের দেশে হাওর অঞ্চলে অতি বন্যার কারণে ফসল নষ্ট হয়। এতে কৃষকরা চরম ক্ষতির মুখে পড়েন। তাদের এই ক্ষতি কমিয়ে আনতে আগামী বাজেটে কৃষকদের ইন্স্যুরেন্সের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এছাড়া সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যবীমার আওতায় আনারও পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আরশেদ আলী জানিয়েছেন, প্রতিবছরই কৃষকরা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হন। এজন্য কৃষকরা তেমন কোনো ক্ষতিপূরণ পান না। আবার সরকারিভাবে যে ক্ষতিপূরণ পান তাও পর্যাপ্ত না। শস্যবীমা চালু হলে কৃষকরা পরিপূর্ণ ক্ষতিপূরণ পাবেন। তাতে কৃষকরা লাভবান হবেন। এতে তাদের আগ্রহ বাড়ার পাশাপাশি দেশে শস্য উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। ফলে কৃষকের অবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে দেশের উন্নয়ন ঘটবে।
সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের আবহাওয়া ও শস্যবীমা প্রকল্পের পরিচালক ওয়াসিফুল হক এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে প্রতিবছরই অতিবৃষ্টি, বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়। এতে কৃষি-অর্থনীতিসহ দেশে কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হয়। তাই কৃষকদের রক্ষায় শস্যবীমার বিকল্প নেই।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. ফকির আজমল হুদা জানিয়েছেন, পৃথিবীর উন্নত বেশির ভাগ দেশে সরকার ও কৃষকদের সমন্বয়ে শস্যবীমা চালু আছে। আমাদের দেশেও তা চালু করা প্রয়োজন।
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক প্রফেসর ড. এম সালাহ্ উদ্দিন চৌধুরীর মতে, বৈরী আবহাওয়ার ঝুঁকি এড়াতে কৃষকদের জন্য শস্যবীমার কোনো বিকল্প নেই। পূর্ব এশিয়ায় অর্থাৎ আসিয়ান জোটভুক্ত কয়েকটি দেশের শস্যবীমা সংক্রান্ত গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি উৎপাদনের যে বিরাট হুমকি রয়েছে, তা একমাত্র শস্যবীমার মাধ্যমেই সমাধান করা যায়। শস্যবীমা চালু হলে গ্রামীণ কর্মসংস্থান বাড়বে এবং আর্থিক ক্ষতি থেকে কৃষকরা বাঁচবেন, বলছে এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক-এডিবি।
কৃষকরা জানায়, ফসল নিয়ে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় থাকে এক ফসলি জমির চাষিরা। এক ফসলি এলাকার কৃষকরা একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা পুষিয়ে নেওয়া যায় না সহজে। এছাড়া ফসলের ক্ষতি হলে সরকার যে পরিমাণ সহায়তা দেয়, তাতে চলতে কষ্ট হয় কৃষকদের। তাই প্রতিবছর অনিশ্চয়তায় থাকেন এক ফসলি জমির কৃষকরা। এই অনিশ্চয়তা কাটাতে কৃষিতে শস্যবীমা চান তারা।
তবে সার্বিকভাবে কৃষকরা শস্যবীমা করতে ভয় পান। কারণ বীমা প্রতিষ্ঠান প্রথমে এসে বীমা চালু করার কথা বলে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সময় মিষ্টি মিষ্টি কথা বলেন। কিন্তু দাবিকৃত বীমা পরিশোধে চরম মনোভাবের পরিচয় দেন। অনেক হাতুরে প্রতিষ্ঠান টাকা নিয়ে পালিয়েও যায়। থাকে নানা শঙ্কাÑ কষ্ট করে টাকা দিবে যদি ক্ষতি পূরণ না পায় ইত্যাদি। এ-কারণে অনেক কৃষকই বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না। এ-কারণেই শস্যবীমা পলিসি ১৯৭৭-১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বন্ধই ছিল। শস্যবীমা পলিসি অনেকের গলার ফাঁসও হতে পারে। কারণ পলিসির সাফল্য তুলে আনতে হলে ঠিকঠাক প্রিমিয়াম জমা দিতে হবে। সময়মতো তা দিতে না পারা মানেই পলিসি কার্যকারিতা থাকে না। বীমাটিও বাতিল বা স্থগিত হয়ে যায়। চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে দাবিকৃত বীমা পলিসির সুফল ক্লায়েন্ট পায় না। এতে বাজারে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। বিশেষজ্ঞরা শস্যবীমা পলিসির নানা দিক নিয়ে নানা কথা বলেছেন।

* যথেষ্ট প্রস্তুতি গ্রহণের অভাবসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ না দিয়েই তাড়াহুড়া করে প্রকল্প চালু করা;
* কৃষিঋণ প্রথার সঙ্গে এর কোনো সংযোগ না করা;
* এ উদ্যোগের বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো সহায়তা না থাকা;
* বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন না করেই প্রকল্পের আকার বৃদ্ধি;
* আমলাতান্ত্রিক জটিলতা;
* শস্যবীমা কর্মসূচি ঐচ্ছিক ও ব্যক্তিভিত্তিক থাকার কারণে সুবিধাভোগী নির্বাচনে ভুলত্রুটি;
* দুর্যোগ-পরবর্তী সময়ে শস্যঋণ মওকুফের ক্ষেত্রে দলীয় এবং স্বজনপ্রীতির প্রবণতা এবং
* বীমার আওতাধীন বিষয় একাধিক ছিল বন্যা, শিলাবৃষ্টি, খরা, রোগবালাই ইত্যাদি।

বর্তমান সরকার অবশ্য শস্যবীমা কর্মসূচি ব্যবস্থাপনা জটিলতা নিরসনে কিছু সংশোধনী এনেছেÑ
* সরকার ও ঋণদানকারী সংস্থা বীমার প্রিমিয়ামের একাংশ বহন করবে;
* ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা ব্যয় তহবিল গঠিত হবে এবং
* ব্যক্তিভিত্তিক ক্ষতিপূরণের প্রথার পরিবর্তে অঞ্চলভিত্তিক ক্ষতিপূরণের প্রথা চালু হবে।

সর্বোপরি আবহাওয়া সূচক অঞ্চলভিত্তিক ক্ষতিপূরণের মডেল প্রথাই যথাযথভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে। তাছাড়া আরও ফলপ্রসূ করার জন্য বীমা সার্ভেয়ারদের পেশাদারিত্ব মনোভাব তৈরির ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। সরকার সার্ভেয়ারদের একটি আইনি কাঠামোয় আনার চেষ্টা করছে। এবং তারা তা মেনে চলতে বাধ্য। প্রাধান্য পাচ্ছে নথিপত্র, কাগজপত্র সঠিকভাবে উপস্থাপন করা। সময়মতো নথিপত্র সংগ্রহ করা ইত্যাদি।
বীমা প্রকল্প রূপায়ণের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নতুন করে কৃষকদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। স্মার্টফোন ব্যবহার করে ফসল তোলা সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা এবং আপলোড করার পাশাপাশি সব খবরই এখন পেয়ে যাচ্ছেন। ফলে কৃষক ও বীমাকর্মীদের মধ্যে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। শস্যবীমার অর্থ পেতে আর বিলম্ব হবে না। যেহেতু বীমা সম্পর্কে মানুষের মৌলিক ধারণা এই পলিসি অর্থের বিনিময়ে জীবন, সম্পদ বা মালামাল রক্ষা করে। আর শস্যবীমা হলো বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে কৃষকদের রক্ষা করে। তাই আমাদের কৃষিপ্রধান দেশে শস্যবীমা চালুর মাধ্যমে কৃষকদের আর্থিক নিশ্চয়তা প্রদান করা সম্ভব। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের কৃষকই হচ্ছে এ দেশের চালিকাশক্তি। তাই কৃষককে বাঁচাতে পারলেই  বাঁচবে দেশ। গড়ে উঠবে সোনার বাংলা। ঘটবে কৃষি বিপ্লব। আর কৃষক দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তবেই পূরণ হবে বর্তমান সরকারের ভিশন ও মিশন।

লেখক : শিক্ষক; পিএইচডি গবেষক, প্ল্যান্ট প্যাথলজি, শেরে বাংলা কৃষি ইউনিভার্সিটি
raziasultana.sau52@gmail.com

Category:

কবিতা

Posted on by 0 comment

29 (c) copy 30 copy 31 copy

Category:

গড় আয়ু বেড়ে ৭২.৩ বছর

Posted on by 0 comment

উত্তরণ ডেস্ক: ২০১৮ সালে দেশে জনসংখ্যা বেড়েছে ১৯ লাখ। ফলে দেশের জনসংখ্যা এখন ১৬ কোটি ৪৬ লাখ। শুধু তাই নয়, বিগত বছরের চেয়ে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ুও কিছুটা বেড়ে ৭২ দশমিক ৩ হয়েছে। এর মধ্যে পুরুষের আয়ু ৭০ দশমিক ৮ বছর আর নারী ৭৩ দশমিক ৮ বছর। ফলে পুরুষের থেকে নারীর গড়ে তিন বছর বেশি বাঁচে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭২ বছর ছিল।
গত ১২ জুন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) মনিটরিং দ্য সিচুয়েশন অব ভাইটাল স্টাটিসটিক্স অব বাংলাদেশ (এমএসভিএসবি) এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে এ চিত্র উঠে এসেছে। আগারগাঁওয়ের পরিসংখ্যান ভবনে এ প্রতিবেদন প্রকাশনা অনুষ্ঠান হয়। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি সাংবাদিকদের এসব কথা জানান।
আদমশুমারির মধ্যবর্তী অবস্থা তুলে ধরতে এই এমএসভিএসবি প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, জনসংখ্যা বেড়ে পুরুষের সংখ্যা ৮ কোটি ২৪ লাখ এবং নারীর সংখ্যা ৮ কোটি ২২ লাখ। দেশে ২০১৪ সালে জনসংখ্যা ছিল ১৫ কোটি ৬৮ লাখ, ২০১৫-তে ১৫ কোটি ৮৯ লাখ, ২০১৬-তে ১৬ কোটি ৮ লাখ এবং ২০১৭-তে ছিল ১৬ কোটি ২৭ লাখ। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী বা ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮-তে বেড়েছে দশমিক ২ শতাংশ। ওই বছরের জনসংখ্যায় শূন্য থেকে ১৪ বছর বয়সীদের সংখ্যা ২৮ দশমিক ৮ শতাংশ, ১৫ থেকে ৪৯ বছরের ৫৪ দশমিক ৬ শতাংশ, ৫০ থেকে ৫৯ বছরের ৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ৬০ বছরের বেশি বয়সী জনসংখ্যা ৭ দশমিক ৯ শতাংশ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। জনসংখ্যার স্বাভাবিক বৃদ্ধির হার ২০১৮ সালে ১ দশমিক ৩৩ শতাংশ, যা ২০১৭ সালের তুলনায় .০১ শতাংশ কমেছে বলেও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।
২০১৭ সালে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭২ বছর ছিল। আর ২০১৮-তে গড় আয়ুও কিছুটা বেড়ে ৭২ দশমিক ৩ হয়েছে। এছাড়া ২০১৬ সালে ৭১.৬, ২০১৫ সালে ৭০.৯, ২০১৪ সালে গড় আয়ু ছিল ৭০ দশমিক ৭ বছর। ২০১৩ সালে গড় আয়ু ছিল ৭০ দশমিক ৪ বছর। ২০০৮ সালে গড় আয়ু ছিল ৬৬ দশমিক ৮ বছর।

Category:

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মানমন্দির

Posted on by 0 comment

PfcMড. জাফর ইকবাল: আমি আজকাল ভাগ্য বিশ্বাস করতে শুরু করেছি। (না, আমি অন্যদেরও আমার মতো ভাগ্য বিশ্বাস করা শুরু করতে বলছি না!) তবে আমি নিজে কেন ভাগ্য বিশ্বাস করতে শুরু করেছি সেই কাহিনিটা একটু বলি।
সেই ছেলেবেলা থেকে যখন পৃথিবী আঁকতে হয়েছে তখন প্রথমে একটা গোলবৃত্ত এঁকেছি, তারপর তার মাঝে ডান থেকে বামে এবং ওপর থেকে নিচে কয়েকটা রেখা টেনেছি এবং সেটা দেখতে তখন পৃথিবী পৃথিবী মনে হয়েছে। তবে কেন গোলবৃত্তের মাঝে এ-রকম রেখা টানলে সেটাকে পৃথিবীর মতো মনে হয় সেটা নিয়ে মাথা ঘামাই নি। একটু বড় হয়ে জানতে পেরেছি পৃথিবী তার অক্ষের ওপর ঘুরছে বলে দিন-রাত হয় এবং সূর্যের সাপেক্ষে এটা একটু বাঁকা হয়ে আছে (ঠিক করে বলা যায় ২৩.৫ ডিগ্রি) বলে শীত বসন্ত গ্রীষ্ম বর্ষা এসব পাই। তা না হলে সারাবছর একই রকম থাকত, একঘেয়েমিতে আমরা নিশ্চয়ই পাগল হয়ে যেতাম। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যে দিন ছোট-বড় হয় আমরা সবাই সেটা লক্ষ করেছি। কিন্তু তার সঙ্গে আরও একটা ব্যাপার ঘটে, সবাই সেটা লক্ষ্য করেনি। আমরা ধরেই নিয়েছে সূর্য পূর্বদিকে ওঠে, পশ্চিমে অস্ত যায়; কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে সেটা যে কখনও কখনও ঠিক মাথার ওপর দিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে যায় এবং কখনও কখনও একটু দক্ষিণে হেলে পড়া অবস্থায় পূর্ব থেকে পশ্চিমে যায় সেটা কিন্তু সবাই জানে বলে মনে হয় না। সত্যি কথা বলতে কী পৃথিবীর সব মানুষ কিন্তু দাবিও করতে পারবে না যে, তারা বছরের কোনো-না-কোনো সময় সূর্য ঠিক তাদের মাথার ওপর দিয়ে যেতে দেখেছে। পৃথিবীর নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় ছোট একটা অংশের মানুষের সূর্যকে ঠিক মাথায় ওপর দিয়ে যেতে দেখার সৌভাগ্য হয়। সৌভাগ্য শব্দটা ব্যবহার করেছি তার একটা কারণ আছে। কারণ, সূর্য যখন ঠিক মাথার ওপর থাকে তখন আমরা অবাক হয়ে দেখি মাটিতে আমাদের যেন কোনো ছায়া নেই। বিষুব রেখার আশপাশে শুধু বিষুবীয় অঞ্চলে সেটা ঘটে এবং সবচেয়ে উত্তরে যেখানে সেটা ঘটে সেটা একটা রেখা দিয়ে নির্দিষ্ট করা আছে এবং সেই রেখাটির নাম কর্কট ক্রান্তি। ঠিক সে-রকম দক্ষিণে যে পর্যন্ত এটা ঘটতে পারে সেটা আরেকটা রেখা দিয়ে নির্দিষ্ট করা আছে। সেই রেখাটির নাম মকর ক্রান্তি। (কর্কট ক্রান্তি এবং মকর ক্রান্তির মতো আর দুটি গুরুত্বপূর্ণ রেখা আছে দুই মেরুর কাছাকাছি। কিন্তু সেখানে মানুষজন বেশি যায় না বলে আপাতত কিছু বলছি না।) অল্প জায়গার ভেতরে অনেক বেশি জ্ঞান দেয়ার ঝুঁকি নিয়ে হলেও আর দুটি তথ্য দিয়ে শেষ করে দিই। কর্কট ক্রান্তি, মকর ক্রান্তি এবং বিষুব রেখা নামে পূর্ব-পশ্চিম বিস্তৃত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রেখার কথা বলা হয়েছে। মাপজোখ করার জন্য উত্তর-দক্ষিণ বিস্তৃত রেখারও প্রয়োজন। সেজন্য গ্রিনউইচকে শূন্য ডিগ্রি ধরে উত্তর-দক্ষিণ বিস্তৃত একটি রেখা ধরে নেয়া হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই তখন ৯০ ডিগ্রি, ১৮০ ডিগ্রি এবং ২৭০ ডিগ্রি দ্রাঘিমার রেখাগুলোর একটা বাড়তি গুরুত্ব চলে আসে। আমরা যখন পৃথিবী আঁকি তখন একটা বৃত্ত এঁকে তার মাঝখানে এই রেখাগুলো আঁকার চেষ্টা করি এবং তখন বৃত্তটাকে পৃথিবী পৃথিবী মনে হয়!
যারা এখন পর্যন্ত ধৈর্য ধরে আমার লেখাটি পড়ে এসেছেন এবং আমি কী বলার চেষ্টা করেছি বোঝার চেষ্টা করেছেন তারা যদি বিষয়টা পুরোপুরি নাও বুঝে থাকেন তাদের আমি খুব শর্টকাটে মূল কথাটি বলে দিই। ভৌগোলিক কারণে পৃথিবীতে তিনটি পূর্ব-পশ্চিম বিস্তৃত রেখা আছে। সেগুলো হলো কর্কট ক্রান্তি, মকর ক্রান্তি এবং বিষুব রেখা। ঠিক সে-রকম চারটি উত্তর-দক্ষিণ বিস্তৃত রেখা আছে। সেগুলো হলো শূন্য ডিগ্রি, ৯০ ডিগ্রি, ১৮০ ডিগ্রি এবং ২৭০ ডিগ্রি দ্রাঘিমা।
এবারে একটা তথ্য দিতে পারি, যেটা সবার জন্য নিঃসন্দেহে একটি চমকপ্রদ তথ্য হবে। চারটি উত্তর-দক্ষিণ রেখা এবং তিনটি পূর্ব-পশ্চিম রেখা, সব মিলিয়ে বারো জায়গায় ছেদ করেছে। নিঃসন্দেহে এই হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বারোটি বিন্দু। বারোটি বিন্দুর দশটি বিন্দুই পড়ছে সাগরে-মহাসাগরে। তাই মানুষ সেখানে যেতে পারে না। একটি পড়েছে সাহারা মরুভূমিতে। সেখানেও জনমানুষ যায় না। শুধু একটি বিন্দু (হ্যাঁ, শুধু একটি মাত্র বিন্দু) পড়েছে শুকনো মাটিতে, যেখানে মানুষ যেতে পারে। সেই বিন্দুটি পড়েছে আমাদের বাংলাদেশে। জায়গাটি ফরিদপুরের কাছে ভাঙ্গা উপজেলায়। কেউ যদি আমার কথা বিশ্বাস না করে গুগল ম্যাপে গিয়ে ২৩.৫ঘ ৯০উ লিখতে পারে সঙ্গে সঙ্গে সেটি কর্কট ক্রান্তি এবং ৯০ ডিগ্রি দ্রাঘিমা কোথায় ছেদ করেছে সেটা দেখিয়ে দেবে।
সেই শহরে যখন বিষুব রেখা, কর্কট ক্রান্তি, মকর ক্রান্তি এই বিষয়গুলো পড়েছি আমি তখন থেকে জানি বাংলাদেশের ওপর দিয়ে কর্কট ক্রান্তি গিয়েছে। সেটা গিয়েছে কুমিল্লা-যশোর এই এলাকার ওপর দিয়ে। কিন্তু ঠিক কোথায় সেই রেখাটি সেটা জানার অনেক কৌতূহল ছিল; কিন্তু জানার কোনো উপায় ছিল না। কেউ একজন বলেছিল এটা না-কি কুমিল্লা শহরের টমসন ব্রিজের ওপর দিয়ে গিয়েছে। আমি সেই জায়গাটা বের করতে গিয়েছিলাম (আসলে তথ্যটি নয়, প্রকৃত কর্কট ক্রান্তি আরও ২ কিলোমিটার উত্তরে)।
এখন সস্তা থেকেও সস্তা টেলিফোনে জিপিএস থাকে তাই পৃথিবীর যে কোনো জায়গার অক্ষাংশ এবং দ্রাঘিমাংশ বের করে ফেলা যায়। কিন্তু আমি যে সময়ের কথা বলছি তখন পর্যন্ত জিপিএস সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়নি। ২০০০ সালে সেটা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয় এবং বাজারে জিপিএস কিনতে পাওয়া যেতে পারে। আমি একবার আমেরিকা গিয়েছি এবং সেখান থেকে একটা জিপিএস কিনে এনেছি। সেই জিপিএস’কে সম্বল করে আমি প্রথমবার ঢাকা-চট্টগ্রাম রাস্তায় ঠিক কোথায় কর্কট ক্রান্তি পার হয়েছি সেটা বের করে আনন্দে চিৎকার করে উঠেছিলাম। আমার খুব ইচ্ছা হয়েছিল যে, রাস্তার পাশে একটা সাইন বোর্ড লাগিয়ে দিই। সেখানে লেখা থাকবে ‘আপনারা এখন পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক রেখা কর্কট ক্রান্তি পার হতে যাচ্ছেন!’ তবে আমার ইচ্ছা বাস্তবায়িত হয়নি। আমি টের পেয়েছিলাম রাস্তার পাশে ইচ্ছা করলেই সাইন বোর্ড লাগানো যায় না এবং আমি প্রতিবার কর্কট ক্রান্তি পার হলেই যেভাবে আনন্দে চিৎকার করি অন্য সবাই সেভাবে চিৎকার নাও করতে পারে!
তারপর খুব সংগত কারণেই একদিন আমি একজনকে সঙ্গে নিয়ে কর্কট ক্রান্তি এবং ৯০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমার ছেদ বিন্দুটি খুঁজে বের করার জন্য বের হলাম। আগেই ম্যাপে জায়গাটি দেখে রেখেছি; কিন্তু ঠিক কোন দিক দিয়ে যেতে হবে জানি না। খুঁজে খুঁজে সেই জায়গাটি বের করতে হয়েছে। ভয় ছিল হয়তো গিয়ে দেখব আসলে সেটা একটা নদীর ভেতর কিংবা বিলের ভেতর পড়েছে। তখন আমার দুঃখের শেষ থাকবে না। কিন্তু দেখলাম জায়গাটি ছোট রাস্তার পাশে একটা ক্ষেত। যখন আমি গিয়েছি তখন সেখানে মটরশুটি না হয় কলাই লাগানো হয়েছে। আমি কর্কট ক্রান্তি এবং ৯০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমার ছেদ বিন্দুতে দাঁড়িয়ে একটা ছবি তুললাম। আমি নিশ্চিত জমি চাষ করার সময় অনেক মানুষ এই বিন্দুটির ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়েছে; কিন্তু এই জায়গাটির অচিন্তনীয় ভৌগোলিক গুরুত্ব অনুভব করে সম্ভবত আর কেউ এখানে পা দেয়নি।
প্রতিবছর জুন মাসের ২১ তারিখ (অর্থাৎ ঠিক এক সপ্তাহ আগে) দুপুর বারোটার সময় কেউ যদি বাইরে দাঁড়ায় এবং আকাশে মেঘ না থাকে তা হলে আবিষ্কার করবে সূর্য ঠিক মাথায় ওপর এবং সে জন্যে সেখানে তার কোনো ছায়া পড়ছে না। কর্কট ক্রান্তি এবং ৯০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমার সেই ছেদ বিন্দুতে সেটি একেবারে পুরোপুরি আক্ষরিকভাবে সত্যি। তবে বাংলাদেশ যেহেতু ছোট এবং সূর্য যেহেতু ১৫ কোটি কিলোমিটার দূরে তাই সারাদেশেই এটা দেখা সম্ভব। তবে জুন মাস বর্ষাকাল এবং প্রায় সময়েই আকাশ মেঘে ঢাকা থাকে। আমি যখন শাবি প্রবিতে ছিলাম তখন আকাশে মেঘ না থাকলে জুন মাসের ২১ তারিখ দুপুর বারোটায় ছাত্র এবং সহকর্মীদের নিয়ে খেলার মাঠে দাঁড়িয়ে অনেকবার ছায়াহীন মজার ছবি তুলেছি! যাই হোক, আমার কাছে মনে হয়েছে কর্কট ক্রান্তি এবং ৯০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমার জায়গাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং বলা যায় এটি সারা পৃথিবীর একমাত্র এ-রকম একটি জায়গা। মাদাগাস্কার ওপর দিয়ে মকর ক্রান্তি গিয়েছে এবং শুনেছি সেটাকেই তারা গুরুত্ব দিয়ে রক্ষা করার ব্যবস্থা করেছে। আমাদের বেলায় শুধু কর্কট ক্রান্তিই নয়, তার সঙ্গে ৯০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাও আছে এবং সেটি একটি নির্দিষ্ট বিন্দু। বলা যেতে পারে এটি হচ্ছে একটা মানমন্দির তৈরি করার জন্য একেবারে আদর্শতম জায়গা। যেহেতু পৃথিবীর আর কোথাও এ-রকম নেই, তাই অন্যরা কীভাবে করেছে তার সঙ্গে তুলনা করারও কিছু নেই। আমরা যেভাবে করব সেটাই হবে একমাত্র উদাহরণ। এটা যে শুধু একটা মানমন্দির হবে তা নয়, এটা যদি ঠিকভাবে তৈরি করে সবাইকে জানানো যায় তাহলে শুধু যে দেশ থেকে মানুষজন জায়গাটাতে একবার পা দিতে আসবে তা নয়, সারা পৃথিবী থেকেই আসবে। এটা হতে পারে দেশের অন্যতম একটা পর্যটন কেন্দ্র। যদি বিশ্বমানের একটা মানমন্দির তৈরি করা যায়, তাহলে আমরা সেটা বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করতে পারি। আসলে বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু সমার্থক। তাই ছোটখাটো স্থাপনা উৎসর্গ করে হয়তো তাকে যথাযথ সম্মান দেখানো যায় না; কিন্তু সারা পৃথিবীর একমাত্র এ-ধরনের একটি জায়গায় একটা মানমন্দির তৈরি করা হলে সেটি নিশ্চয়ই তাকে উৎসর্গ করা যাবে। বঙ্গবন্ধুর নামেই সেই মানমন্দিরটি তৈরি করা যেতে পারে।
সেটি করার জন্য সবার আগে এই গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটা অধিগ্রহণ করতে হবে। আমি বহুদিন থেকে এই প্রক্রিয়াটা শুরু করার চেষ্টা করে আসছি। এটা নিয়ে বেশি আলোচনা করি না, কারণ যদি কোনো একজন ঋণখেলাপি জমিখেকো কোটিপতি এটা সম্পর্কে জেনে যায় এবং জায়গাটার দখল নিয়ে সেখানে একটা এমিউজমেন্ট পার্ক বানানো শুরু করে দেয় তাহলে কী হবে? বলাই বাহুল্য, পুরো ব্যাপারটাই আমার অসংখ্য স্বপ্নের মতো একটা স্বপ্ন হিসেবে রয়ে গিয়েছিল। মনে হয়েছিল যদি কোনোভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টা জানানো যেত তাহলে তিনি হয়তো কিছু একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারতেন। কিন্তু একটি দেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে কীভাবে নিজের একটি ব্যক্তিগত স্বপ্ন নিয়ে যাওয়া যায় কিংবা আদৌ যাওয়া সম্ভব কি না সেটা আমার জানা ছিল না।
তখন একেবারে হঠাৎ করে আমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো। আমি আবিষ্কার করলাম বঙ্গবন্ধু জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটিতে আমার নাম আছে এবং সেই কমিটির একটি সভায় আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হলো। সেই সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নিজে। শুধু তাই নয়, সেই সভায় সবাই যখন বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী পালন উপলক্ষে কী করা যায় সেটি নিয়ে আলোচনা করছেন তখন হঠাৎ করে আমাকেও কথা বলার সুযোগ দেয়া হলো এবং আমি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আমার এই দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নটির কথা দেশের অনেক গণ্যমান্য মানুষের সামনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলার সুযোগ পেলাম। আমি বেশ অবাক হয়ে এবং আনন্দের সঙ্গে লক্ষ করলাম সভার সকল গণ্যমান্য মানুষ এবং প্রধানমন্ত্রী নিজেও প্রস্তাবটি খুব পছন্দ করলেন। প্রধানমন্ত্রী জায়গাটি কোথায় জানতে চাইলেন। তখন আমি বললাম সেটি ভাঙ্গা উপজেলার কাছাকাছি। তিনি খুশি হয়ে বললেন আমাদের পদ্মা ব্রিজ ঠিক সেখানেই শেষ হবে। একে নিশ্চয়ই বলে সোনায় সোহাগা!
আমি উৎসাহ পেয়ে বললাম, যদি সেখানে সত্যিই বঙ্গবন্ধুর নামে একটা মানমন্দির বসানো হয় তাহলে আমরা দেশের ছেলে-মেয়েদের নিয়ে পুরো কর্কট ক্রান্তি এবং ৯০ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমা বরাবর কৃষ্ণচূড়া গাছ লাগিয়ে দিতে পারি। সেই কৃষ্ণচূড়া গাছে যখন ফুল ফুটবে তখন বাংলাদেশের ওপর দিয়ে যখন কোনো প্লেন যাবে তারা অবাক হয়ে দেখবে সবুজ দেশটির মাঝখানে দুটি লাল রেখা। যে বিন্দুতে ছেদ করেছে সেখানে আমাদের বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করে একটি মানমন্দিরÑ কী চমৎকার!
আমি যখন এই লেখাটি লিখছি তখন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মানমন্দির’ স্থাপন করার জন্য একটা প্রকল্পের কাজ শুরু হয়ে গেছে! কারিগরি কমিটি তৈরি করে তারা একটি সভা পর্যন্ত করে ফেলেছে!
কাজেই আমি যদি বলি আমি ভাগ্য বিশ্বাস করতে শুরু করেছি, কেউ কী আমাকে দোষ দিতে পারবে?

Category:

ইকোসকে বিপুল ভোটে জয় বাংলাদেশের

Posted on by 0 comment
জাতিসংঘে নতুন মর্যাদা

জাতিসংঘে নতুন মর্যাদা

জাতিসংঘ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) সদস্য পদ নির্বাচনে বাংলাদেশ বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছে। গত ১৪ জুন সকালে ১৯১ ভোটের মধ্যে ১৮১ ভোট পেয়ে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে বাংলাদেশ ৫৪ সদস্যবিশিষ্ট মর্যাদাপূর্ণ এই পরিষদের সদস্য হয়। বাংলাদেশ ছাড়া এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে এ নির্বাচনে থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীন জয়ী হয়েছে। এই বিজয় অর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ২০২০-২২ মেয়াদে বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্মে এবং বৈশ্বিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফোরাম ইকোসকে তার দৃঢ় অবস্থান নিশ্চিত করল। এটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের এগিয়ে চলার স্বীকৃতি বলে মনে করেন বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি মারিয়া ফার্নেন্দা এপ্সিনোসা গার্সেজের সভাপতিত্বে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গোপন ভোটে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ফল ঘোষণা হওয়ার পর জাতিসংঘ সদর দফতরের সামনে সাংবাদিকদের কাছে এ বিজয়ের অনুভূতি ব্যক্ত করেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন। তিনি বলেন, এই বিজয় বাংলাদেশের মানুষের জন্য এক অনন্য উপহার। টেকসই উত্তরণ নিশ্চিতে ইকোসকের এই সদস্য পদ লাভ আমাদের আরও সামনে এগিয়ে নেবে। এছাড়া এজেন্ডা ২০৩০ বাস্তবায়নেও এই বিজয় নতুন গতি আনবে।
ইকোসকের সদস্য পদ লাভের মাধ্যমে বাংলাদেশ এর আওতাধীন বিভিন্ন ফোরাম, কমিশন, কমিটি, নির্বাহী বোর্ড ও আঞ্চলিক ফোরাম, যেমনÑ ইউএনএসকাপের সঙ্গে এজেন্ডা ২০৩০ বাস্তবায়নে আরও নিবিড়ভাবে কাজ করার সুযোগ পাবে। ইকোসকে ২০২০ সালের জানুয়ারি মাস থেকে তিন বছর মেয়াদে বাংলাদেশ দায়িত্ব পালন করবে। তিন বছর আগের কমিটিতেও বাংলাদেশ ইকোসকের সদস্য ছিল। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের সদস্য নির্বাচিত হয়ে ২০১৯-২১ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করছে।

Category:

মুক্তিযুদ্ধের গল্প : রক্তঋণ

Posted on by 0 comment

চারপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা ঘিরে ফসলের মাঠ। বেশিরভাগ ক্ষেতেই সোনালি ধান ও পাট। আগের যে কোনো মৌসুমে গ্রামবাসীদের মধ্যে এ সময় ধান কাটার ধুম লেগে যেত। কিন্তু এখন শূন্য মাঠ। কদাচিৎ লোকজন চোখে পড়ে। কেউই মাঠে যেতে সাহস করে না।

PfcMহারুন হাবীব: গারো পাহাড়ের পাদদেশের অঞ্চলটি অপূর্ব সৌন্দর্যম-িত। প্রকৃতি যেন নিখুঁত শৈলীতে অনিন্দধারার সৌন্দর্য এঁকে দিয়েছে নিজের শিল্প ভাবনায়। পুবদিকে ছোট-বড় অসংখ্য পাহাড়। বেশিরভাগই পড়েছে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সীমানায়। বাংলার ভাগ্যে যা জুটেছে তা কেবলই ছিটেফোঁটা। আর সেখান থেকেই সবুজ চা-বাগানের ঢেউ তোলা শরীরের মতো নিচের দিকে নেমে গেছে পেলব সমতল। এখানটায় দাঁড়ালে তফাৎটা স্পষ্ট বোঝা যায়। পাহাড় আর সমতলের দুই শরীর। পাহাড় থেকে চোখ ঘুরিয়ে নিচের দিকে তাকালে চোখে পড়ে বাংলার গ্রাম, তাল ও বটগাছ, বাঁশঝাড়, আঁকা-বাঁকা নদী, খাল-বিল।
এখন হেমন্তকাল। গেল বছরেও এ সময় বৃষ্টি হয়নি। কিন্তু সপ্তাহ খানেক আগে টানা বৃষ্টি হয়েছে। বৃষ্টির পর টানা রোদ। সে-রোদে ধান ও পাটক্ষেতের জমা পানি টানতে শুরু করেছে। পা ফেললে এখন আর কাদামাটি আটকে ধরে না। অপেক্ষাকৃত কাঁচা মাটিতে মানুষের দাগ বসে। পদচিহ্ন আঁকা হয়। রোদে সে-দাগ শক্ত হয়। চিহ্ন থেকে যায়।
পাশেই ধানুয়া গ্রাম। চারপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা ঘিরে ফসলের মাঠ। বেশিরভাগ ক্ষেতেই সোনালি ধান ও পাট। আগের যে কোনো মৌসুমে গ্রামবাসীদের মধ্যে এ সময় ধান কাটার ধুম লেগে যেত। কিন্তু এখন শূন্য মাঠ। কদাচিৎ লোকজন চোখে পড়ে। কেউই মাঠে যেতে সাহস করে না। যে কোনো সময় পাকিস্তানি ক্যাম্প থেকে ছুটে আসতে পারে মর্টারের গোলা কিংবা মেশিনগানের গুলিÑ যা শরীর ছিন্নভিন্ন করে দেবে। নবান্ন উৎসবের বদলে এখন শোনা যায় মর্টারের শেল ফাটার বীভৎস শব্দ, রাইফেল ও মেশিনগানের কানফাটা আওয়াজ। বিস্ময়ের ব্যাপার যে, আকস্মিক এই পরিবর্তনটিও যেন স্থানীয়দের গা সওয়া হয়ে গেছে! তবে এ পরিস্থিতিতেও ফসলের ক্ষেতগুলোতে সন্তর্পণে চলাচল করে মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা।
বিস্তীর্ণ সীমান্ত-ঘেঁষা অঞ্চলটিতে বাঁশ, ঝোপঝাড়, আম-কাঁঠাল আর কলাবাগানের কমতি নেই। কিন্তু ধান পাকার এই সময়টায় সব সৌন্দর্য উপচে দিয়েছে বাতাসে দোল খাওয়া সোনালি ধানক্ষেত। মাঝে মধ্যে বাবুই আর শালিকেরা ঝঁাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসে। এক ক্ষেত থেকে আরেক ক্ষেতে যায়। ওরা ধান সাবাড় করে। অন্য কোনো বছর হলে কৃষকের ছেলেমেয়ে কিংবা গৃহস্থ বউরা পাখিদের ঠোঁট থেকে শ্রম-ঘামের ফসল বাঁচাতে চেষ্টা করত। আজ তারা অসহায়। অতএব আনন্দের সীমা নেই পাখিদের।
সীমান্তের ওপারে ভারতীয় পাহাড়গুলোতে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে নাম লিখিয়েছে বেশিরভাগ যুবক। ভয়ার্ত নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা সীমান্ত বরাবর তৈরি রিফ্যুজি ক্যাম্পগুলোতে আশ্রয় নিয়েছে। পাকিস্তান ও ধর্ম রক্ষাকারী (!) সৈন্যদের নির্বিচার আক্রমণে গোটা দেশ জাহান্নামে পরিণত হয়েছে। অতি-বৃদ্ধ এবং কিছু কিছু বয়স্ক পুরুষ বেঁচে থাকার কৌশল হিসেবে মাথায় টুপি লাগিয়ে, সৈন্যদের লরি দেখলেই ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ সেøাগান দিয়ে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করার চেষ্টা করছে। এতে সৈন্যরা আশ্বস্ত হয়ে গুলি করা থেকে বিরত থাকছে। কারণ ওরা ‘খাঁটি মুসলমান’ চায়!
ওরা পাঁচজন। ধানুয়ার পাঁচ নম্বর বাংকার থেকে ওরা পাঁচজন বেরিয়ে আসে বিকেলের দিকে। জায়গাটা বিপদজ্জনক; মাথা তুলে দাঁড়ালেই মোকাবেলা হতে পারে মৃত্যুর সাথে। নিকটবর্তী পাকিস্তানি ক্যাম্প থেকে হয় ছুটে আসবে ঝাঁক ঝাঁক গুলি, নয় মর্টারের গোলা। মুক্তিবাহিনীর অনেকেই এ ভুলটা আগে করেছে। হতাহতও হয়েছে। এরপরও ওদের পাঁচজনের কাছে অন্য কোনো বিকল্প নেই। ডিউটি শেষে ক্যাম্পে ফিরতে হবে।
আধামাইলেরও কম দূরত্বে পাকিস্তানি সৈন্যদের একটি শক্ত ডিফেন্স পোস্ট। মুক্তিবাহিনীর প্রতিরক্ষা বাংকারগুলো দখল নিতে ওরা বারবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। প্রচ- গোলাগুলির পরও মুক্তিবাহিনী নিজেদের অবস্থান ছাড়েনি। গেল দুদিনেও বেশ কয়েকবার গুলিবিনিময় হয়েছে। একজন কৃষকসহ তিনটি গরু মারা গেছে।
মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা নিজেদের প্রতিরক্ষা বাংকারগুলোতে পালা করে ডিউটি দেয়। রাইফেল ও মেশিনগান তাক করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে। দু-দিন দু-রাত পাহারায় ছিল পাঁচজনের এই দলটি। আজ ডিউটির বদল হয়েছে। একটু আগেই নতুন দল এসে দায়িত্ব বুঝে নিয়েছে। অতএব ওরা পাঁচজন ক্যাম্পে ফিরবে। ধান, পাটক্ষেত ও জঙ্গলের মাঝ দিয়ে। দায়িত্ব পড়বে অন্য কোথাও। হলেও হতে পারে দিনখানেকের জন্য বিশ্রাম পাবে।
Ñ লিডার, চলেন ক্রল করে যাই। ব্যাটারা দেখলেই গুলি করবে। ওদিকে ওদের মেশিনগান পোস্ট আছে Ñ জানেন তো?
প্রথমেই দলনেতাকে সতর্ক করে মাহফুজ। বিশ কি বাইশ বছর বয়স। গায়ের শার্ট, লুঙ্গি এলোমেলো, দুমড়ানো। দু-দিন দু-রাত বাংকারে কাটিয়ে শরীর মাটিমাখা Ñ যেন মাটি ফুটে জন্মেছে মৃত্তিকা-পুরুষ। ঢাকার কাছে বিক্রমপুরে বাড়ি। যুদ্ধের ডামাডোলে ছিটকে পড়ে ঠাঁই নিয়েছে উত্তরাঞ্চলের এই সীমান্তে। এই জনযুদ্ধে কোথাকার মানুষ কোথায় গেছে কে তার খোঁজ রাখে!
Ñ ঠিকই বলেছ, সাবধানে যাওয়াই ভালো। চল, অন্যদিক দিয়ে যাই। প্লাটুন কমান্ডার রাজীব উত্তর দেয়।
কেবল বয়সেই বড় নয়, শিলং-এর পাহাড়ে গেরিলাযুদ্ধের ওপর উচ্চতর ট্রেনিং হয়েছে রাজীবের। প্রথম ব্যাচের মুক্তিযোদ্ধা। তবু মাহফুজের সতর্কবাণীকে সে উপেক্ষা করে না। সন্তর্পণে পশ্চিম দিকের ধান ও পাটক্ষেত লক্ষ্য করে সে হাঁটতে থাকে। প্রথমে রাজীব, এরপর মাহফুজ, বেলাল, এরপর হান্নান ও হেমেন্দ্র। এক বুক উঁচু ধান ও পাটক্ষেতের মাঝ দিয়ে এঁকেবেঁকে হেঁটে চলে ওরা। যতটা সম্ভব মাথা নিচু করে যাতে শত্রুপক্ষ না দেখে। ওদের হাঁটাপথে মাঠের কীটপতঙ্গ উড়তে থাকে। হঠাৎ কয়েকটা শালিক এদিক-ওদিক উড়ে যায়। ভারতের সীমান্তÑ বাঁধটা খানিকটা দূরেই। হয়তো মিনিট পনেরো সময় লাগবে পৌঁছতে। এরপর আর ভয় নেই। পাকিস্তানি সৈন্যরা সচরাচর এদিকে গোলাগুলি করে না। একেবারেই যে করে না তাও নয়। ব্রাহ্মণপাড়ায় ক’দিন আগে মর্টারের শেল পড়ে দুজন ভারতীয় নাগরিক মারা গেছে। পাল্টা গুলি চালিয়েছে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বিএসএফ।
একের পর এক ধান ও পাটক্ষেত। পশ্চিমের রোদ পড়ে গেরিলাদের মুখগুলো লালচে বরণ হয়েছে। সবুজ লকলকে পাট গাছ, এখনও কাটার সময় হয়নি। ধানের ক্ষেতগুলো নদীর ঢেউয়ের মতো। বেশিরভাগই সোনালি। কিছু কিছু গাছ এখনও সবুজ। ক্ষেতে নামলেই কোমর পর্যন্ত ঢেকে যায়। বাতাসে দোল খাওয়া শীষগুলো বারবার শরীর ছুঁইয়ে দেয়। ওদের শিহরণ ধরে।
হঠাৎ বেলাল ‘ধন ধান্য পুষ্পে ভরা আমাদেরই বসুন্ধরা’ বলে গান গেয়ে ওঠে। সাথে সাথেই মাহফুজ শাসিয়ে দেয়, ‘পাগল না-কি তুই, চুপ কর ব্যাটা!’
মেঘালয়ের পাহাড় থেকে চোখ ঘুরিয়ে সমতল ইজেলে আঁকা প্রকৃতির শিল্পকর্ম দেখে গেরিলারা। উঁচু থেকে নিচুর দিকে। এ যেন এক স্বপ্নের রাজ্য। দূর থেকে বহুদূর চোখ যায় বাংলার। কে কোথা থেকে কীভাবে যুদ্ধে যুক্ত হয়েছে কেউ জানবার প্রয়োজন বোধ করেনি। জননীÑজন্মভূমি আজ আক্রান্ত। মা-মাতৃভূমি হানাদারদের হাতে বন্দি। ধান পাটের পাতায় আলতো হাত বুলিয়ে হেমেন্দ্র আকস্মিকভাবে গেয়ে ওঠে, ‘মাগো তোমায় কথা দিলাম জীবন দিব বলে…।’ কে জানে কতদিন এ যুদ্ধ চলবে। কবে পাকিস্তানি আধিপত্য থেকে বঙ্গের মাটি মুক্ত হবে!
এসব ভাবতে ভাবতেই প্রথম ঘটনাটা ঘটল। পুবদিক থেকে মেশিনগানের কড়কড় শব্দ শোনা গেল। কয়েক ঝাঁক গুলি উড়ে গেল চারপাশ দিয়ে। শালিক ও বাবুই পাখির দলগুলো ক্ষেতের ওপর দিয়ে আতঙ্কে উড়তে থাকল। এ-রকম কোনো অঘটন ওরা আশা করেনি। পাকিস্তানি ক্যাম্পটা খুব দূরে নয় Ñ একেবারে কাছেও নয়। কিন্তু প্রশিক্ষিত সৈন্যরা এমন একটা জায়গায় মেশিনগান বসিয়েছে, যাতে দূর থেকেও প্রয়োজনে শত্রুপক্ষকে আঘাত করা যায়।
‘শুয়ে পড়, শুয়ে পড়’ Ñ নির্দেশ দিয়েই ধানগাছ মাড়িয়ে মাটির সাথে গা মিশিয়ে দেয় রাজীব। মাটিতে দ্রুত শুতে গিয়েও হান্নান বাঁ পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোতে থাকে। হাতের লাইট মেশিনগান তাক করে হেমেন্দ্র বলে Ñ ‘ওস্তাদ, ফায়ার অপেন করি? শালারা আবার গুলি চালাবে?’
রাজীব উত্তর দেয় না। সামনে এগুতে থাকে। হান্নান রাইফেলটা পাশে রেখে হাতের কাছে পাওয়া কিছু লতাপাতা ছিঁড়ে দাঁতে চিবিয়ে ক্ষতস্থানটা চেপে ধরে। তবু রক্ত পড়া বন্ধ হয় না। প্যান্ট ভিজে ওঠে। রাইফেলটা একটানে কাছে নিয়ে পজিশন নিয়ে ফেলে সে Ñ ‘ওস্তাদ, অর্ডার দাও। অর্ডার প্লিজ।’
প্লাটুন কমান্ডার নিঃশব্দ। তাকে ভেবেচিন্তে কাজ করতে হবে। হেমেন্দ্র এবার তাগাদা দেয়, ‘ফায়ার শুরু করতে হবে ওস্তাদ, অর্ডার দাও? নইলে ওরা আরও গুলি চালাবে।’
রাজীব হাত তুলে নিষেধ করে। না, এখন নয়। সে বুঝে ওঠতে পারে না শত্রুপক্ষ দূর না ধারে-কাছের কোথাও থেকে গুলি চালিয়েছে। প্রথম গুলিগুলো মেশিনগানের তা সে নিশ্চিত। দ্বিতীয়টি সম্ভবত অটোমেটিক রাইফেলের। যুদ্ধাস্ত্রের শব্দগুলো কয়েক মাসেই তাদের জানা হয়ে গেছে।
পরিস্থিতি বিবেচনা করে বেলাল নিজের এসএলআর ‘কক’ করে পজিশন নিয়ে ফেলে। বেশ কিছুটা সময় ধরে গুলি আসতে থাকে। দুদিন বাংকারে থেকে ওরা ক্লান্ত। ঠিক এ সময় মাহফুজের গলা শোনা যায় Ñ ‘কেউ দাঁড়াবি না, কেউ গুলি ছুড়বি না। ওরা যেন আমাদের ‘পজিশন’ বুঝে ফেলতে না পারে। বি কেয়ারফুল। ক্রল করে আরেকদিকে চল। হারি আপ।’
কমান্ডার রাজীব হাতের ঈশারায় সবাইকে চুপ থাকতে বলে। এরপরও থেকে থেকে গুলি আসতে থাকে। বেশ কিছু শালিক ও বাবুই ধপ করে মাটিতে পড়ে কাতরাতে থাকে। দৃশ্য দেখে বেলাল আর্তনাদ করে ওঠে, ইস্!
মিনিট দশেক পর গুলি বন্ধ হয়। চারদিকে অন্যরকম এক নিস্তবদ্ধতা। সন্তর্পণে মাথা তুলে দাঁড়ায় মাহফুজ। শত্রুপক্ষের আঘাত কোন্ দিক থেকে আসছে Ñ সে বুঝতে চেষ্টা করে।
এরই মধ্যে গামছা দিয়ে হান্নানের ক্ষতস্থানটি শক্ত করে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। রক্ত পড়া কিছুটা বন্ধ হয়েছে। এবার সন্তর্পণে সামনে এগুতে হবে। ওরা চারদিক তাকিয়ে দেখে Ñ না, কিছুই চোখে পড়ে না। পাকিস্তানি ক্যাম্পটাও দেখা যায় না। চারদিক নীরবতা। ধান ও পাট গাছগুলো বাতাসে দুলছে। শালিক ও বাবুই পাখিগুলো চরম উৎকণ্ঠায় দ্রুত উড়ে যাচ্ছে, যার যার নিরাপদ আশ্রয়ে।
সময় ক্ষেপণ না করে মাথা নিচু করেও ওরা দ্রুত সামনে এগুতে থাকে। এমন রসদ ও জনবল নেই যে পাল্টা আক্রমণে যেতে পারে। রক্তক্ষরণ সত্ত্বেও হান্নান সহযোদ্ধাদের সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটতে থাকে। কিছুক্ষণ পর ওরা আরেকটি ক্ষেতে প্রবেশ করে। যেহেতু শত্রুরা দেখে ফেলেছে, কাজেই দ্রুত সরে যেতে হবে তাদের। হান্নানের চিকিৎসা দরকার। একবারের জন্যও ওরা বুঝতে পারে না পিছু নেওয়া পাকিস্তানি দলটি ঝোপঝাড়ের আড়ালে মাথা গুঁজে তাদের অনুসরণ করছে।
ধান ও পাটক্ষেতে হাঁটা, পাকা ধানের শীষ আলিঙ্গন করার অভিজ্ঞতা এই দলের সকলেরই আছে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলেও ওরা সবাই গ্রামে বড় হয়েছে। পড়াশোনার টেবিল থেকে, কবিতা লেখা ও সংগীতচর্চা থেকে ওদের মুক্তিযুদ্ধের মাঠে নামিয়েছে ১৯৭১। সেনাশাসক ও তাদের স্থানীয় দালালেরা ধর্মের নাম ভাঙিয়ে যে পাকিস্তান রক্ষা করতে চায়, সেই পাকিস্তান আর তাদের দেশ নয়। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। তাকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে গেছে সরকারি বাহিনী। পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ১০ এপ্রিল সরকার গঠন করেছে। ১৭ এপ্রিল সে সরকারের আনুষ্ঠানিক শপথ হয়েছে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার সাধারণ যুবতারুণ্য প্রশিক্ষিত পাকিস্তানি সৈন্যদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেছে। সৈন্যদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ চলছে সশস্ত্রভাবে।
কিছুক্ষণ আগের গোলাগুলির ব্যাপারটা অবশ্য খুব বেশি অবাক করেনি গেরিলাদের। এসব হরহামেশাই ঘটে। অতএব ওরা স্বাভাবিক হতে থাকে। বিস্ময়কর হলেও সত্য যে, ওরা যেন ভুলেই যায় একটু আগেই শত্রুপক্ষ থেকে যেভাবে গুলি আসছিল Ñ তাতে ওদের মৃত্যু হতে পারত!
ক্ষানিকক্ষণ সময় নিয়ে রাজীব ও বেলাল উঠে দাঁড়ায়। শত্রুপক্ষের অবস্থান বোঝার চেষ্টা করে। মাহফুজ এগিয়ে গিয়ে হান্নানের ঘাড়ে হাত রেখে জিগ্যেস করে Ñ রক্ত বন্ধ হয়েছে, দোস্ত?
Ñ না, আরও কিছু পড়–ক না দোস্ত, মায়ের চরণে সন্তানের রক্তদান কয়জনের ভাগ্যে ঘটে? এই যে দেখ… বলেই রক্তাক্ত বাঁ পা’টা মেলে ধরে আব্দুল হান্নান।
Ñ পাগলামো করবি না দোস্ত Ñ রক্ত পড়া বন্ধ করতে হবে Ñ ক্যাম্পে ফিরতে আরও সময় লাগবে। বলেই মাহফুজ কোমরের গামছাটা ছিড়ে হান্নানের ক্ষতস্থানটা আরও শক্ত করে বেঁধে দেয়। অল্পক্ষণের মধ্যেই বাঁধনটা আবারও রক্তে ভিজে ওঠে।
এরপর আবার হাঁটা শুরু হয় ওদের। হাঁটতে হাঁটতে সীমান্ত বাঁধটার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। সামনেই কয়েকটা বড় পাটক্ষেত। এরপর ফাঁকা একটি জায়গা। তারপর দুই দেশের সীমানা চিহ্নিত করা বাঁধ। বাঁধটা পেরুলেই আশ্রয়দাতা দেশ। কাজেই ভয়ের বিশেষ কিছু নেই।
কিন্তু শেষ ক্ষেতটি পেরোবার আগেই আকস্মিকভাবে আরেক দফা অস্ত্র তাক করে পাকিস্তানি সৈন্যরা। গুলি আসতে থাকে ঝাঁকে ঝাঁকে। পরপর কয়েকটা মর্টারের শেল ফাটে আশপাশে। শত্রুদের এবারের চেষ্টা বিফলে যায় না। চোখের পলকে গুলিবিদ্ধ হয় মাহফুজ ও হেমেন্দ্র। পরিস্থিতি বোঝে ওঠার আগেই রাজীবের চোখের সামনে ছিটকে পড়ে হেমেন্দ্র। ‘জয় বাংলা’ বলে কয়েকটা অস্ফূট শব্দ করে ধানক্ষেতের ওপর গা এলিয়ে দেয় মাহফুজ। বৃষ্টির মতো গুলি আসতে থাকে। কেউ মাথা তুলতে পারে না। মাহফুজকে শক্ত করে চেপে ধরে রাজীব। হেমেন্দ্রের রক্তাক্ত শরীরটাকে কাছে টেনে বেলাল পরিস্থিতি সামলাবার চেষ্টা করে। এলএমজি-টা ছোঁ মেরে হাতে নিয়ে হান্নান ট্রিগারে আঙ্গুল রাখতেই রাজীব চিৎকার দিয়ে ওঠে, ‘সাবধান, শত্রু ধারে-কাছেই। গুলি চালালেই আমাদের পজিশন বুঝে ফেলবে।’
কিন্তু হান্নানকে থামানো যায় না। লাইট মেশিনগানটাকে দু-হাতে তুলে ধরে পাগলের মতো সে গুলি চালাতে থাকে। যেদিকে থেকে গুলি আসছিল সেদিকে নল উঁচিয়ে উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার দিতে থাকে Ñ ‘জয় বাংলা’।
মাঠের পাখিগুলো আবারও প্রবল আতঙ্কে উড়তে শুরু করে। মেশিনগানের ট্যা ট্যা শব্দে গোটা এলাকা দুমড়ে-মুচড়ে যায়। পশ্চিম আকাশে সূর্যের রং বিষণœœ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। যে পাকিস্তানি দলটি ওদের পিছু নিয়েছিল তারা মাটিতে শুয়ে আত্মরক্ষা করার চেষ্টা করে। ওরাও নিজেদের অবস্থান জানান দিতে রাজি নয়।
মাহফুজ আর হেমেন্দ্রের শরীর বেয়ে তখন অবিরল ধারায় রক্ত পড়ছে। মর্টারের শেল লেগে এরই মধ্যে হান্নানের মাথাটা উড়ে গেছে। ধানগাছ, পাটগাছের শরীর বেয়ে টপ টপ করে এঁকেবেঁকে নেমে যাচ্ছে রক্তের ঢল। উপরে হেমন্তের আকাশ। সাদা মেঘ উড়ে যাচ্ছে একের পর এক। পাখিরা উড়তে গিয়ে ভয়ার্ত চোখে নিচের দিকে তাকিয়ে দেখছে। মুক্তিযোদ্ধাদের শরীর থেকে রক্ত পড়ছে মাটিতে। মাটি শুষে নিচ্ছে সে রক্ত।
সন্ধ্যা হতে তখনও খানিকটা বাকি। শেষ সূর্যের রক্তাভ রশ্মি জনযোদ্ধাদের শরীরকে রাঙিয়ে দিচ্ছে। তিন সহযোদ্ধাকে জাপটে ধরে মাটির সাথে শরীর লাগিয়ে যতটা সম্ভব দ্রুত এগিয়ে চলেছে রাজীব ও বেলাল। দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছতে হবে। এভাবে রক্ত যেতে থাকলে বন্ধুদের বাঁচানো যাবে না।
এরই মধ্যে মাহফুজ হঠাৎ মাথা সোজা করে তাকায়। প্রচুর রক্তক্ষরণে ওর শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। এরপরও মুখে হাসি টেনে বলে, ‘আমাদের রক্তের রং কী লাল, দেখ, কী অপূর্ব রং Ñ তাই না বন্ধুরা!’ বলতে বলতেই ওর মাথাটা ঢলে পড়ে। রাজীব ও বেলাল যন্ত্রণায় চোখ ঘুরিয়ে নেয়। চোখ মেলে হেমেন্দ্র একবার মাহফুজের দিকে তাকায়। আরেকবার তাকায় খানিকটা দূরে পড়ে থাকা হান্নানের গুলিবিদ্ধ মাথাটার দিকে। অস্পষ্ট হলেও বোঝা যায় সহযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে সে শেষবারের মতো বলছে, ‘হয়তো আর কোনোদিন একসাথে “অপারেশন”-এ যাওয়া হবে না দোস্ত।’
প্লাটুন কমান্ডার রাজীব কান্নাভেজা কণ্ঠে চিৎকার করে ওঠে, ‘চুপ কর হেমেন্দ্র, চুপ কর। আমরা দু-জন এখনও বেঁচে আছি।’
হেমেন্দ্রের পরিত্যক্ত এলএমজিটা হাতে তুলে নেয় কমান্ডার রাজীব। পাকিস্তানি দলটির অবস্থান সে নির্ণয় করে ফেলেছে। বন্ধুদের রক্তাক্ত শরীর ছুঁয়ে রাজীব ও বেলাল ক্রল করে এগুতে থাকে। আক্রমণে প্রাথমিক সাফল্যে পাকিস্তানি সৈন্যরা দাঁড়িয়ে অবস্থান নির্ণয় করার চেষ্টা করছে। রাজীব ও বেলাল সুযোগের অপেক্ষা করতে থাকে। কিছুক্ষণ পর সে সুযোগ আসে।
পিছু নেওয়া সৈন্যদের ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ কানে আসতেই রাজীবের এলএমজি এবং বেলালের এসএলআর একযোগে গর্জে ওঠে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনজন পাকিস্তানি সৈন্য মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। বাকিরা শুয়ে কিংবা ক্রল করে পালাতে থাকে। ট্রিগারে আঙ্গুল লাগিয়ে গেরিলারা শত্রুপক্ষের দিকে অগ্রসর হয়। যত্রতত্র রক্তের দাগ, গুলির খোসা। শরীর ভেঙে যাচ্ছে; এরপরও মৃত পাকিস্তানি সৈন্যদের দেহগুলোকে টেনে আনে ওরা শহিদ বন্ধুদের কাছে। ওদের চোখে জল নেই, আছে রুদ্র। বলে, ‘কমরেড, দেখ, আমরা ঘাতকদের ক্ষমা করিনি।’
এরপর অবাধ্য পানি গড়াতে থাকে দুই মুক্তিযোদ্ধার চোখ থেকে। গেরিলাদের নতুন একটি প্লাটুন এগিয়ে আসে এরই মধ্যে। আহত সহযোদ্ধাদের বাঁচবার কোনো সুযোগ আছে কি না তারা পরখ করে দেখে। না, হয়তো সব শেষ।

Category:

ভাষা-আন্দোলনে শেখ মুজিব

Posted on by 0 comment

PfcMড. এম আবদুল আলীম: (গত সংখ্যার পর)
ভাষা-আন্দোলনের কর্মপন্থা নির্ধারণে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এবং অন্য সংগঠনের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কারাবন্দি অবস্থায় শেখ মুজিবুর রহমানের আলাপ-আলোচনা ও দিক-নির্দেশনা প্রদানের বিষয়টি নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত রয়েছে। বদরুদ্দীন উমর, মোহাম্মদ তোয়াহা, আবদুল মতিন, আহমদ রফিকসহ অনেকেই এর বিপক্ষে মত ব্যক্ত করেছেন। অন্যদিকে মহিউদ্দিন আহমেদ, অলি আহাদ, গাজীউল হক, কামরুজ্জামান, আবদুস সামাদ আজাদ, এম আর আখতার মুকুল, শেখ আব্দুল আজিজ, জিল্লুর রহমান, কে. জি. মুস্তাফা, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী প্রমুখ ভাষাসংগ্রামী এবং মযহারুল ইসলাম, আনিসুজ্জামান, হারুন-অর-রশিদ, মুনতাসীর মামুন, আবু আল সাঈদ, নূহ-উল-আলম প্রমুখ গবেষক এর পক্ষে জোরালো অভিমত ব্যক্ত করেছেন।
বদরুদ্দীন উমর পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি গ্রন্থের তৃতীয় খ-ে নিরাপত্তাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের ’৫২-র ভাষা-আন্দোলনে ভূমিকার কথা অলি আহাদের বক্তব্য-সূত্রে পরোক্ষভাবে স্বীকার করলেও; পরবর্তীকালে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত লেখায় তা সরাসরি নাকচ করে দেন। এ প্রসঙ্গে তার বক্তব্য হলো : “শেখ মুজিব ফরিদপুর জেল থেকে মুক্তি লাভ করে ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি, যে সময়ে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকারীদেরকে বিপুল সংখ্যায় গ্রেফতার করা হচ্ছে এবং ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি’র অনেক সদস্য আত্মগোপন করে আছেন। এই পরিস্থিতিতে জেল থেকে শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি লাভ থেকেই প্রমাণিত হয় যে তৎকালীন ভাষা আন্দোলনে তারও কোন ভূমিকা ছিল না এবং আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে তাকে মুক্তি দেওয়াটা সরকার নিজেদের জন্য অসুবিধাজনক বা বিপজ্জনক কিছুই মনে করেনি।” বদরুদ্দীন উমরের এ বক্তব্য খ-িত। কারাগারে ছাত্রনেতারা যে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করে ভাষা-আন্দোলনে দিকনির্দেশনা নিয়েছিলেন, সে প্রসঙ্গ তিনি এড়িয়ে গেছেন। বঙ্গবন্ধুর মুক্তিদান প্রসঙ্গে তিনি যা বলেছেন, ১৯৫২ সালের ২৭শে ফেব্রুয়ারি পরবর্তী ভাষা-আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি ও বাস্তবতার সঙ্গে তার মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনে জেলখানা থেকে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ছাত্রলীগ নেতাদের নির্দেশনা প্রদানের বিষয়ে বদরুদ্দীন উমরের বক্তব্যকে যুক্তি দ্বারা খ-ন করেছেন একুশের গান রচয়িতা আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। ’৫২-র ভাষা-আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনা প্রদান সম্পর্কে তিনি লিখেছেন : ‘ফেব্রুয়ারির আন্দোলনের আগে থেকেই শেখ মুজিব জেলে ছিলেন। তিনি তার চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী জেল থেকে তার অনুগত সেপাইদের মাধ্যমে ছাত্রলীগের ও আওয়ামী লীগের তরুণ নেতাদের কাছে গোপনে চিঠিপত্র পাঠিয়ে আতাউর রহমান-শামসুল হক গ্রুপের আন্দোলন-বিমুখতা সম্পর্কে সতর্ক করতে শুরু করেন এবং ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখে সরকার যদি ১৪৪ ধারা জারি করে, তাহলে আওয়ামী লীগ কমান্ডের নির্দেশ যাই হোক, ছাত্রলীগ নেতা ও কর্মীরা যাতে সাধারণ ছাত্রদের আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নেয়, সেই পরামর্শ দিতে থাকেন। সরকারি গোয়েন্দারা যখন টের পেল যে, শেখ মুজিব জেলে বসে সরকারবিরোধী আন্দোলনে তার দল ও অনুসারীদের উৎসাহিত করছেন, তখন আকস্মিকভাবে তাকে ১৫ অথবা ১৬ তারিখে ফরিদপুর জেলে স্থানান্তর করা হয়।… ফরিদপুর জেলে বসেও তিনি চিরকুট পাঠান, যেটি একুশ তারিখে একটু দেরিতে ছাত্রলীগ নেতাদের হাতে পৌঁছে।’
বদরুদ্দীন উমরের প্রত্যেকটি মত বিভিন্ন যুক্তি দ্বারা খ-ন করে একুশের গান রচয়িতা আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী আরও লিখেছেন : ‘উমরকে বাহবা না দিয়ে পারা যায় না। বায়ান্ন সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ধারেকাছেও তিনি ছিলেন না।… একটি আন্দোলনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত না থাকলে পদে পদে যে ভুল হয়, ১৪৪ ধারা সম্পর্কে উমরের বালখিল্য উক্তিই তার প্রমাণ।’
আবদুল মতিন এবং আহমদ রফিক নিরাপত্তাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের ’৫২-র ভাষা-আন্দোলনে যুক্ত থাকা এবং ছাত্রনেতাদের নির্দেশনা প্রদানের বিষয়টিকে ‘ইতিহাসের কল্পকাহিনী’ বলে অভিহিত করে লিখেছেন : ‘একুশের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা ছিল না। অথচ দীর্ঘকাল পর বৃথাই একুশের আন্দোলনে তার ভূমিকা নিয়ে ‘মিথ’ তৈরির চেষ্টা চলছে, ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যসিদ্ধির জন্য ইতিহাস বিকৃত করা হচ্ছে, সে চেষ্টা এখনো চলছে এবং এজন্য দায়ী কয়েকজন স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি। এতে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক মর্যাদা ক্ষুণœ হচ্ছে।’ আহমদ রফিক তার ভাষা আন্দোলন : ইতিহাস ও উত্তরপ্রভাব (২০১৭) গ্রন্থে আগের বক্তব্যেরই পুনরাবৃত্তি করে লিখেছেন : ‘দীর্ঘকাল পর বাহান্নর ভাষা আন্দোলনে তাঁর (বঙ্গবন্ধুর) ভূমিকা সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা সঠিক তথ্য-নির্ভর ইতিহাস নয়। কেউ বলেছেন ‘১৪৪ ধারা ভঙ্গের নির্দেশ তিনিই দিয়েছিলেন’ কেউ বলেন পরিষদ ভবন ঘেরাওয়ের পরিকল্পনা তারই, আবার কেউ দাবি করেছেন ‘আন্দোলনের কর্মসূচি তাঁর কাছ থেকেই এসেছে’। দাবিগুলো এমন ব্যক্তিদের কাছ থেকে এসেছে যারা কমবেশি আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন।’
আহমদ রফিক ও আবদুল মতিনের বক্তব্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তাতে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই, আছে ঢালাও মন্তব্য। তাঁরা বলতে চেয়েছেন যে, ১৯৫২ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান কারামুক্ত হয়ে কেন অসুস্থ অবস্থায়ই ভাষা-আন্দোলনে যুক্ত হলেন না? তাঁদের দাবি ভাষা-আন্দোলন ‘তখনও চলছে’। এবং ২ মাস পর ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে’র সভায় শেখ মুজিবুর রহমান যে বক্তব্য দেন, তার ফলে তাঁরা ’৫২-র ভাষা-আন্দোলনে তাঁর যুক্ত না থাকার ‘ঘটনা সঠিক’ বলে মনে করেছেন এবং মন্তব্য করেছেন। তাদের এ বক্তব্য খ-ন করার যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ রয়েছে।
প্রথমত, তারা বলেছেন, শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তি পান ২৬শে ফেব্রুয়ারি। কিন্তু এ তথ্য ঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে শেখ মুজিবুর রহমান ফরিদপুর কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেন ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২। ঐ সময়কার ইত্তেফাক, ইনসাফ প্রভৃতি পত্রিকায় তার মুক্তির সংবাদ ছাপা হয়। ১৯৫২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি দৈনিক ইনসাফ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘নিরাপত্তা বন্দী জনাব মুজিবর রহমানের মুক্তিলাভ’ শিরোনামের সংবাদে বলা হয় : ‘রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্র হইতে ঘোষণা করা হইয়াছে যে, বিখ্যাত নিরাপত্তা বন্দী জনাব মুজিবর রহমান খানকে [ভুলবশত খান বলা হয়েছে] গতকাল মুক্তি দান করা হইয়াছে।’ অর্থাৎ, শেখ মুজিব কারামুক্ত হন ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২। প্রকৃতপক্ষে, ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তো ভাষা-আন্দোলন চলমানই ছিল না, তাতে শেখ মুজিবুর রহমান যোগ দেবেন কী করে? ২৫ ফেব্রুয়ারি সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সভায় ‘২৬.২.৫২ তারিখ থেকে সাধারণ ধর্মঘট প্রত্যাহার’ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সে অনুযায়ী ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকা ‘শহরের সর্বত্র স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু’ হয়।
দ্বিতীয়ত, ফরিদপুর কারাগারে থাকা অবস্থায় এবং কারামুক্ত হয়ে তিনি ভাষা-আন্দোলন সম্পর্কে নীরব ছিলেন না। সমসাময়িক পত্র-পত্রিকা ও শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং আনিসুজ্জামানের স্মৃতিকথা থেকে এ তথ্য জানা যায়। ঢাকায় গুলিচালনা ও ধরপাকড়ের সংবাদ শুনে শেখ মুজিবুর রহমান অতিশয় মর্মাহত হন এবং শহিদদের শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজনদের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করে বিবৃতি দেন। একই সঙ্গে তিনি দ্রুত ঢাকায় ফিরে আসার অভিপ্রায়ও ব্যক্ত করেন এবং কিছুটা সুস্থ হয়ে তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন। ঢাকায় এসে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে জোরালো বক্তব্য তুলে ধরেন এবং কারাবন্দিদের মুক্তির দাবি করেন। তিনি করাচিতে গিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের সঙ্গে দেখা করে বন্দিদের মুক্তির দাবি জানান। এছাড়া হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাকে দিয়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে বিবৃতি প্রদান করান। তিনি সংবাদ সম্মেলন করে পশ্চিম পাকিস্তানের সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদদের ভাষা-আন্দোলন সম্পর্কে বিভ্রান্তি দূর করেন।
পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাকালীন নেতা অলি আহাদ (পরবর্তীকালে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগে যোগ দেন) ভাষা-আন্দোলনের দুই পর্বেই প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করেন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ হতো এবং ভাষা-আন্দোলন নিয়ে কথা-বার্তা চলত। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন : ‘শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫০ সালের ১লা জানুয়ারী হইতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক ছিলেন। চিকিৎসার কারণে সরকার তাঁহাকে ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করেন। প্রহরী পুলিশের ইচ্ছাকৃত নির্লিপ্ততার সুযোগ গ্রহণ করিয়া আমরা তাঁহার সহিত হাসপাতালেই কয়েক দফা দেখা করি। তিনি ও নিরাপত্তা বন্দী মহিউদ্দিন আহমেদ ১৬ই ফেব্রুয়ারী হইতে মুক্তির দাবীতে অনশন ধর্মঘট করিবেন, সেই কথা শেখ সাহেবই আমাদিগকে জানাইয়াছিলেন।… ১৫ই ফেব্রুয়ারী ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার হইতে শেখ মুজিবর রহমানকে ফরিদপুর জেলা কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয় এবং এই ১৫ই ফেব্রুয়ারী ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার হইতে ফরিদপুর যাওয়ার পথে নারায়ণগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনে নারায়ণগঞ্জ নেতৃবৃন্দের সহিত শেখ মুজিবুর রহমানের সাক্ষাৎ ঘটে।’
শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেখা হয়েছিল তখনকার মেডিকেল কলেজের শেষবর্ষের ছাত্র মির্জা মাজহারুল ইসলামের। তিনি শেখ মুজিবের পূর্বপরিচিত ছিলেন তাই হাসপাতালে একাধিকবার তার চিকিৎসার খোঁজখবর নেন। ঐ সময়কার স্মৃতিচারণ করে তিনি লিখেছেন : ‘১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধু নিরাপত্তা বন্দী অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। আমি তখন এই কলেজের শেষ বর্ষের ছাত্র। দোতলায় ৮ নম্বর ওয়ার্ড-সংলগ্ন একটি কেবিনে তিনি থাকেন। আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলতে চেষ্টা করলাম। রাউন্ড দেয়ার সময় প্রফেসরদের সঙ্গে আমরা যেতাম কিন্তু আমাদেরকে কেবিনে প্রবেশ করতে দিত না। আমি কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না, তবে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে পূর্ব সম্পর্ক ছিল। কলকাতায় আমাদের মাঝে প্রথম পরিচয় হয়, পরে ঢাকা এসেও বহু বার দেখা হয়েছে। একদিন বঙ্গবন্ধু ‘এই মির্জা’ বলে আমাকে ডেকে তাঁর কেবিনের জানালার কাছে নিয়ে যান এবং ভাষা আন্দোলনের খোঁজখবর নেন। তিনি আমাকে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলেন।’
তখনকার গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন ভাষাসংগ্রামী ও গবেষকের সাক্ষাৎকার ও স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, ‘ছাত্রনেতারা গোপনে তাঁর (বঙ্গবন্ধুর) সাথে দেখা করতেন। তাঁর মুক্তির জন্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বিবৃতি দেন। নাইমউদ্দীন, খালেক নেওয়াজ, অলি আহাদ ও মোহাম্মদ তোয়াহা দেখা করেন এবং তাঁরা ভাষা আন্দোলন বিষয়ে তাঁর সাথে পরামর্শ করতেন। সরকার তাঁকে হাসপাতালে বসে রাজনীতি করার অপরাধে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে এবং তাদের সুপারিশে তাঁকে অনেকটা সুস্থ বলে ঘোষণা দিয়ে আবার কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে থাকাকালে তিনি ও মহিউদ্দিন আহমেদ চিঠি দিয়ে সরকারকে জানান, ১৫ই ফেব্রুয়ারি মুক্তি না দিলে ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে তাঁরা অনশন ধর্মঘট শুরু করবেন।’
এভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এক পক্ষ বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা পুরোপুরি খারিজ করে দিয়ে বাহ্বা নিতে চেয়েছেন; অন্য পক্ষ ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে সকল কৃতিত্ব তার কাঁধে তুলে দিতে চেয়েছেন। সম্প্রতি শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং তাঁর সম্পর্কে প্রণীত পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনসমূহ প্রকাশের পর ভাষা-আন্দোলনে তার ভূমিকা কী ছিল, তা দিবালোকের মতো সত্য বলে প্রতিভাত হয়েছে। বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময় কারাগারে বন্দি অবস্থায় ছাত্রনেতাদের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের যোগাযোগ হয়েছে, সরাসরি কথা হয়েছে এবং তিনি আন্দোলন সম্পর্কে দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। এবং সে নির্দেশনা দিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ও ফরিদপুর কারাগারে স্থানান্তরের পথেÑ নারায়ণগঞ্জে।
তাছাড়া কারাগার থেকে চিঠির মাধ্যমে, টেলিগ্রামের মাধ্যমে ফরিদপুর কারাগারে স্থানান্তরের পথে নারায়ণগঞ্জে এবং চিরকুট পাঠিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান ’৫২-র ভাষা-আন্দোলনে ছাত্রনেতাদের নির্দেশনা দিয়েছেন এটিও সত্য। ভাষা-আন্দোলনে তিনি ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন, এটা ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত তার রাজনৈতিক কর্মকা-, বক্তৃতা-বিবৃতি ও সমকালীন পত্র-পত্রিকার সংবাদ পর্যালোচনা করলেই প্রমাণিত হয়।
কারাগারে বসে তিনি এবং মহিউদ্দীন আহমদ ১৯৫২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে অনশন ধর্মঘট শুরু করলে ভাষা-আন্দোলনে কর্মসূচিতে আসে উৎসাহ ও প্রেরণা। তাদের মুক্তির দাবি যুক্ত হয়ে ভাষা-আন্দোলনের কর্মসূচি ভিন্নমাত্রা পায়। ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠনের সভায় যেসব প্রস্তাব গৃহীত হয় তাতে শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবি যুক্ত ছিল। ১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক ছাত্রসভা হয়। ঐদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ মুজিব ও মহিউদ্দিনসহ সকল রাজবন্দির মুক্তি দারি করে পোস্টারও দেওয়া হয়। ২০ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার এক গোপন প্রতিবেদনে বলা হয় : “উরফ ুড়হধষ ফঁঃু রহ ঃযব ঝঁঃৎধঢ়ঁৎ চ. ঝ. ধৎবধ রিঃয ড/ঈ গফ. ণধংঁভ ড়হ ১৯.২.১৯৫২ ধহফ ঃযরং সড়ৎহরহম (২০.২.৫২) ধ ইবহমধষর ষবধভষবঃ ঁহফবৎ যবধফরহম “ঐঁহমবৎ ঝঃৎরশব ড়ভ ঝযবরশয গঁলরনধৎ জধযসধহ” ধহফ গধযরঁফফরহ ধিং ভড়ঁহফ ঃড় নব ফরংঃৎরনঁঃবফ ধঃ ফবভভবৎবহঃ ঢ়ষধপবং ড়ভ উধপপধ ঈরঃু.” এছাড়া তাদের মুক্তির জন্য পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থাপক সভায় আবেদন করা হয়।
সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকার এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় : ‘পাকিস্তান সংগ্রামের জঙ্গী কর্মী, ছাত্র-যুব আন্দোলনের অগ্রনায়ক ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানের বিনা বিচারে দীর্ঘ কারাবাস ও বন্ধ দিনগুলির নিষ্ঠুর নিষ্পেষণে জীর্ণ স্বাস্থ্যের জন্য উৎকণ্ঠার ও ঐক্যবদ্ধ আওয়াজ তুলিয়া প্রদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই প্রদেশের সকল রাজনৈতিক কর্মীÑ বিশেষ করিয়া শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিনের আশু মুক্তির প্রশ্নে পূর্ববঙ্গ পরিষদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে এক আবেদনপত্র পেশ করিয়াছেন। স্বাক্ষরকারীগণ বলেনÑ সর্বশক্তি নিয়োজিত করিয়া আপনারা পাকিস্তানে আইন ও নীতির শাসন, সৌভ্রাতৃত্ব ও গণতন্ত্র কায়েম করুন।… আসুন আসুন, আপনারা পরিষদের ভিতরে আর আমরা বাহিরে পূর্ববঙ্গের রাজবন্দীদের বিশেষ করিয়া শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিনের মুক্তির দাবিতে আওয়াজ তুলি।’ কেবল রাজপথ এবং সভা-সমাবেশে নয়, বঙ্গীয় আইন পরিষদেও শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির দাবি তোলা হয়। তার ‘অনশন পালন বিষয়ে আলোচনার জন্য পূর্ব পাকিস্তান এ্যাসেম্বিলিতে আনোয়ারা খাতুন এমএলএ মুলতবি প্রস্তাব পর্যন্ত উত্থাপন করেছিলেন।’
মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ‘মানবতার নামে’ শীর্ষক এক পৃথক বিবৃতিতে শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিন আহমদের মুক্তির দাবি জানান। রাজবন্দিদের অনশন ধর্মঘট সম্পর্কে ঐ বিবৃতিতে তিনি বলেন : ‘আমি জানিতে পারিয়াছি য়ে, গত ১৬ ফেব্রুয়ারি হইতে নিরাপত্তা বন্দি শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিন আহমেদ আনশন ধর্মঘট শুরু করিয়াছেন। জনসাধারণ অবগত আছেন যে, শেখ মুজিবুর রহমান দীর্ঘদিন হইতে মারাত্মক রোগে ভুগিতে ছিলেন এবং কিছুদিন পূর্বে চিকিৎসার জন্য তাঁহাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও স্থানান্তরিত করা হইয়াছিল। কিন্তু তাঁহাকে রোগ মুক্তির পূর্বেই আবার জেলে প্রেরণ করা হয়। মহিউদ্দিনের স্বাস্থ্যও দ্রুত অবনতির দিকে যাইতেছে। এমতাবস্থায় আমরা সহজেই বুঝিতে পারিতেছি যে, এই অনশন ধর্মঘট তাঁহাদের ভগ্ন স্বাস্থ্যের পরিণতি ঘটাইবে। তাঁহাদিগকে আটক রাখার সম্বন্ধে কর্তৃপক্ষের অনমনীয় মনোভাব দেখিয়া আমি অত্যন্ত মর্মাহত হইয়াছি। আমি মানবতার নামে সরকারের নিকট এই আবেদন করিতেছি যে তাঁহারা মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিনকে মুক্তিদান করেন।’
২৭ ফেব্রুয়ারি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে অত্যন্ত অসুস্থ শরীরেও তিনি গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ থেকেই একুশে ফেব্রুয়ারির গুলিবর্ষণে প্রাণহানির ঘটনায় মর্মাহত হয়ে বিবৃতি পাঠান এবং শহিদদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। এরপর কিছুটা সুস্থ হয়ে ঢাকায় ফিরে এসে নিরাপত্তা-বন্দিদের মুক্তি দাবিতে বিবৃতি দেন। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়ে তিনি একটি সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেন এবং বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। এ প্রসঙ্গে অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে লিখেছেন : “আমি সাধারণ সম্পাদক হয়েই একটা প্রেস কনফারেন্স করলাম। তাতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে হবে, রাজবন্দিদের মুক্তি দিতে হবে এবং যাঁরা ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ হয়েছেন তাঁদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দান এবং যারা অন্যায়ভাবে জুলুম করেছে তাদের শাস্তির দাবি করলাম। সরকার যে বলেছেন, বিদেশী কোন রাষ্ট্রের উস্কানিতে এই আন্দোলন হয়েছে, তার প্রমাণ চাইলাম। ‘হিন্দু ছাত্ররা’ কলকাতা থেকে এসে পায়জামা পরে আন্দোলন করেছে, একথা বলতেও কৃপণতা করে নাই মুসলিম লীগ নেতারা। তাদের কাছে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ছাত্রসহ পাঁচ ছয়জন লোক মারা গেল গুলি খেয়ে, তারা সকলেই মুসলমান কি না? যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের মধ্যে শতকরা নিরানব্বইজন মুসলমান কি না? এত ছাত্র কলকাতা থেকে এল, একজনকেও ধরতে পারল না যে সরকার, সে সরকারের গদিতে থাকার অধিকার নেই।”
১৯৫২ সালের ২৭ এপ্রিল ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর উদ্যোগে এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্য নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা করেন। ‘জনাব মুজিবুর রহমান তার বক্তৃতায় সরকারের স্বরূপ উদঘাটন করেন। তিনি বলেন জনসাধারণের ন্যায্য দাবী আন্দোলনকে সরকার রাষ্ট্রের ও এজেন্টদের বলে অভিহিত করেছেন। তিনি আরও চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেন : এরাও দুশমনের উপর গণআন্দোলন সৃষ্টি করেছেন। আমার বিশ্বাস শত শত মানুষ আমাদের অনুসরণ করিতেছেন। তার মতে রাষ্ট্রে এর চেয়ে আর কোন আইন থাকতে পারে না।’
১৯৫২ সালের জুন মাসে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়ে ভাষা-আন্দোলনের পক্ষে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সমর্থন আদায় করেন এবং বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তাকে দিয়ে একটি বিবৃতি প্রদান করান। বিবৃতিটি ১৯৫২ সালের ২৯শে জুন সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে শেখ মুজিব লিখেছেন : “একটা অনুরোধ করলাম, তাঁকে লিখে দিতে হবে যে, উর্দু ও বাংলা দুইটাকেই রাষ্ট্রভাষা হিসাবে তিনি সমর্থন করেন। কারণ অনেক ভুল বোঝাবুঝি হয়ে গেছে। মুসলিম লীগ এবং তথাকথিত প্রগতিবাদীরা প্রপাগা-া করছেন তাঁর বিরুদ্ধে। তিনি বললেন, ‘নিশ্চয়ই লিখে দেব, এটা তো আমার নীতি ও বিশ্বাস।’ তিনি লিখে দিলেন।” করাচিতে গিয়ে তিনি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সাংবাদিক ও বিশিষ্টজনদের সঙ্গে দেখা করেন এবং সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে ভাষা-আন্দোলনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। ভাষা-আন্দোলন নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানিদের মধ্যে যে বিভ্রান্তি ছিল, শেখ মুজিবুর রহমানের সাংবাদিক সম্মেলনের পর তা দূর হয়। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে তিনি বলেছেন : ‘খাজা সাহেব ও লাহোরের শহীদ সাহেবের ভক্তরা প্রেস কনফারেন্সের আয়োজন করলেন।… প্রেস কনফারেন্সে সমস্ত দৈনিক কাগজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এমনকি এপি’র প্রতিনিধিও উপস্থিত ছিলেন। আমার বক্তব্য পেশ করার পরে আমাকে প্রশ্ন করতে শুরু করলেন, আমি তাঁদের প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পেরেছিলাম। আমরা যে উর্দু ও বাংলা দু’টাই রাষ্ট্রভাষা চাই, এ ধারণা তাঁদের ছিল না। তাঁদের বলা হয়েছে, শুধু বাংলাকেই রাষ্ট্রভাষা করার দাবি করছি আমরা।’
ঢাকায় ফিরে শেখ মুজিবুর রহমান আরেকটি সাংবাদিক সম্মেলন করে পাকিস্তান সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। এ প্রসঙ্গে সাপ্তাহিক সৈনিক পত্রিকার এক সংবাদে বলা হয় : ‘জনাব রহমান [শেখ মুজিবুর রহমান] প্রকাশ করেন যে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন সম্পর্কে পশ্চিম পাকিস্তানে যথেষ্ট ভুল ধারণার সৃষ্টি করা হইয়াছিল, কিন্তু সমস্ত খুলিয়া বলিবার পর সে ভ্রান্তি তাহাদের দূর হইয়াছে। তিনি বলেন, পাশ্চিম পাকিস্তানের বুদ্ধিজীবীরা আজ আর বাংলার দাবীকে অন্যায় মনে করে না। তাহাদের অধিকাংশই আজ অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার দাবীকে সমর্থন করেন। জিন্না আওয়ামী লীগের মামদোতের খান, মানকীর পীর প্রভৃতি নেতৃবৃন্দ বাংলার দাবীর প্রতি কিরূপ মনোভাব পোষণ করেন তাহা জিজ্ঞাসা করা হইলে জনাব রহমান বলেন তাহা আমি বলিতে পারিনা।’
১৯৫২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে শেখ মুজিবুর রহমান শান্তি সম্মেলনে যোগদানের জন্য চীন সফরে যান। সেখানে গিয়ে তিনি ‘মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করেছিলেন।’ এতে বাংলা ভাষার প্রতি তার গভীর ভালোবাসা যেমন প্রকাশিত হয়, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়। ঐ সম্মেলনে যারা যোগদান করেছিলেন তাদের অন্যতম ছিলেন ভারতের মনোজ বসু। চীনের শান্তি সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বাংলা ভাষায় বক্তৃতা প্রদান প্রসঙ্গ এবং বাংলা ভাষার জন্য বাঙালির আত্মত্যাগের মহিমা উচ্চে তুলে ধরে পরবর্তীকালে স্মৃতিচারণ করে তিনি লিখেছেন : ‘মুজিবুর রহমানের বক্তৃতা হলো মাঝে আরও কতকগুলো হয়ে যাবার পর।… ছিয়াশি জন বক্তার মধ্যে বাংলায় মোট দু’জনÑ পাকিস্তানের শেখ মুজিবুর রহমান আর ভারতের এই অধম।’ চীন সফরের সেই স্মৃতি স্মরণ করে অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন : “পূর্ব পাকিস্তান থেকে আতাউর রহমান খান ও আমি বক্তৃতা করলাম। আমি বাংলায় বক্তৃতা করলাম।… কেন বাংলায় বক্তৃতা করব না? ভারত থেকে মনোজ বসু বাংলায় বক্তৃতা করলেন। পূর্ব বাংলার ছাত্ররা জীবন দিয়েছে মাতৃভাষার জন্য। বাংলা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু লোকের ভাষা।… আমি ইংরেজিতে বক্তৃতা করতে পারি। তবু আমার মাতৃভাষায় বলা কর্তব্য। আমার বক্তৃতার পরে মনোজ বসু ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘ভাই মুজিব, আজ আমরা দুই দেশের লোক, কিন্তু আমাদের ভাষাকে ভাগ করতে কেউ পারে নাই। আর পারবেও না। তোমরা বাংলা ভাষাকে জাতীয় মর্যাদা দিতে যে ত্যাগ স্বীকার করেছে আমরা বাংলা ভাষাভাষী ভারতবর্ষের লোকেরাও তার জন্য গর্ব অনুভব করি।”
১৯৫২ সালের ২০ নভেম্বর আরমানিটোলা ময়দানে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের উদ্যোগে বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে আয়োজিত ঐ জনসভায় বক্তৃতা করেন আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান, ছাত্রলীগ নেতা কামারুজ্জামান, দেওয়ান মাহবুব আলী, ইব্রাহিম ত্বাহা, সুলেমান খান, আশরাফ ফারুকী, মুহম্মদ এমাদুল্লাহ, গাজীউল হক প্রমুখ। ১৯৫৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বিকেলে আরমানিটোলা মাঠে আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে আরও একটি জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বন্দিদের মুক্তি ও বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে শেখ মুজিবুর রহমান বক্তৃতা করেন। দৈনিক আজাদ পত্রিকা থেকে জানা যায় : ‘গতকল্য (শুক্রবার) অপরাহ্ণে আরমানীটোলা ময়দানে পূর্ব্ব পাকিস্তান সর্ব্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্ম্মপরিষদের উদ্যোগে “বন্দীমুক্তি দিবস” উপলক্ষে এক বিরাট জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভাপতিত্ব করেন পূর্ব্ব পাকিস্তান আওয়ামী মোছলেম লীগের সহঃ সভাপতি জনাব আতাউর রহমান। সভায় বক্তৃতা প্রসঙ্গে প্রাদেশিক আওয়ামী মোছলেম লীগের সাধারণ সম্পাদক জনাব শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, গত ভাষা আন্দোলনে যাহারা অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন সরকার তাঁহাদের সকলকে বিনা বিচারে জেলে আটক রাকিয়াছেন।… সর্ব্বশেষে সভায় গৃহীত একটি প্রস্তাবে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে জড়িত থাকার অভিযোগে এবং অন্যান্য কারণে বিনা বিচারে আটক সকল রাজনৈতিক বন্দীর অবিলম্বে বিনা শর্তে মুক্তি দাবী করা হয়। অপর একটি প্রস্তাবে বিনা বিচারে আটক মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং অন্যান্য রাজবন্দীর স্বাস্থ্য ভাঙ্গিয়া পড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ এবং সরকারের জেলনীতির তীব্র নিন্দা করা হয়। আর একটি প্রস্তাবে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবী জানান হয়।’
১৯৫৩ সালের শুরু থেকেই শেখ মুজিবুর রহমান বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তোলেন এবং উর্দুকে বয়কট করার ব্যাপারে সোচ্চার হন। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ১৯৫৩ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি ‘ঢাকার এক জনসভায় তিনি ঘোষণা করেন, এ দেশ জুড়ে উর্দু বয়কট করার জন্য আন্দোলন শুরু করা হবে।’ এ বছর ৫ ফেব্রুয়ারি বগুড়ার একটি জনসভায়ও তিনি একই সুরে কথা বলেন। এ প্রসঙ্গে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে : ‘বক্তৃতার সময় শেখ মুজিব বলেন, বাংলাকে পাকিস্তানের একটি রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। এখানকার স্কুল-কলেজে নূরুল আমীন সরকার উর্দু চালু করেছেন, কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তান তার স্কুল-কলেজে বাংলা চালু করেনি। তারা যদি বাংলাকে না মেনে নেয়, তাহলে কয়েকমাস পর আমরাও উর্দুকে বয়কট করব।’
ভাষা-আন্দোলনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ১৯৫৩ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারি ‘শহিদ দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য এবং আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানও ২১শে ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবস পালনের আহ্বান জানান। ঐদিন ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ঢাকার সর্বস্তরের মানুষ প্রভাতফেরি, শোভাযাত্রা, শহিদদের কবর জিয়ারত এবং আলোচনা-সভার আয়োজন করে। এতে নেতৃত্ব দেন আওয়ামী মুসলিম লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান, আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আতাউর রহমান খান, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি কাজী গোলাম মাহবুব এবং ছাত্রলীগ নেতা এম এ ওয়াদুদসহ অনেকে। ভাষা আন্দোলনের বর্ষপূর্তির সংবাদ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হয়। ঢাকা প্রকাশ-এ শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তৃতা প্রসঙ্গে বলা হয় : “আওয়ামী লীগের অস্থায়ী সেক্রেটারী জনাব মুজিবুর রহমান সভায় বক্তৃতা প্রসঙ্গে বলেন যে, গত বৎসর ঠিক এমন দিনে পূর্ব্ব পাকিস্তানের সাড়ে চার কোটি অধিবাসীর ভাষা বাংলাকে আজাদ পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করিবার দাবীতে ঢাকা শহরে ছাত্র ও জনসাধারণ নির্ভীকভাবে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়াছে। তাহারা সেই দিন যে নতুন ইতিহাস রচনা করিয়াছে, সমগ্র জাতি তাহা চিরদিন শ্রদ্ধার সহিত স্মরণ করিবে। ২১শে ফেব্রুয়ারীকে তিনি ‘জাতীয় কারবালা দিবস’ বলিয়া অভিহিত করেন। তিনি বলেন যে, আজ পাকিস্তান সরকারের সম্মুখে শুধুমাত্র দুইটি পথ খোলা রহিয়াছে। হয় তাঁহারা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বলিয়া মানিয়া লইবেন, নতুবা গদি ছাড়িবেন। তিনি সকল রাজবন্দীর আশু মুক্তি এবং নিরাপত্তা আইন প্রত্যাহার করিবার জন্যও দাবী জানান।” শেখ মুজিবুর রহমান তার বক্তৃতায় বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে মর্যাদা দানের দাবি তোলেন। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে শেখ মুজিবুর রহমানের বক্তৃতা সম্পর্কে বলা হয় : “দায়ী ব্যক্তি (শেখ মুজিবুর রহমান) ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন’-এ বিশেষ নেতৃত্বের ভূমিকায় অংশগ্রহণ করেন। ২১.২.৫৩ তারিখে ঢাকার একটি জনসভায় তিনি ঘোষণা করেন যে, পূর্ববাংলার ‘উর্দু’ বয়কট করার জন্য প্রদেশব্যাপী দাবি বা আন্দোলন দিবস পালন করা হবে। ২১.২.৫৩ তারিখ ‘শহীদ দিবস’ উপলক্ষে তিনি ঢাকায় একটি মিছিলে নেতৃত্ব দেন।” ঐ দিনের বক্তৃতায় ‘যতদিন বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা না পাবে, ততদিন আন্দোলন চালিয়ে যাবার জন্য সবার প্রতি তিনি আহ্বান জানান।’
২১শে ফেব্রুয়ারির বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে গাজীউল হক গেয়েছিলেন তার গান : ‘ভুলব না, ভুলব নাÑ একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না!’ বঙ্গবন্ধুর অনুরোধেই তিনি গানটি ঐ অনুষ্ঠানে গেয়েছিলেন। এ সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করে গাজীউল হক লিখেছেন : ‘সভায় জনাব শেখ মুজিবুর রহমান-এর অনুরোধে ভাষা আন্দোলনের ওপর লেখা আমার গানটি আমাকে গেয়ে শোনাতে হয়। এখানে বলা প্রয়োজন, ১৯৫৩-৫৪-৫৫ সালে যে গানটি গেয়ে প্রভাতফেরি করা হতো সে গানটি লিখেছিলাম আমি। গানটির প্রথম লাইন ছিল, ‘ভুলব না, ভুলব নাÑ একুশে ফেব্রুয়ারি ভুলব না!’ সময়ের প্রয়োজনে এ গানটি লিখেছিলাম।’
১৯৫৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি দৈনিক আজাদ পত্রিকায় রাজবন্দিদের মুক্তির দাবি-সম্বলিত শেখ মুজিবুর রহমানের একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়। ১১ মার্চ ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে’র উদ্যোগে ঢাকার বার লাইব্রেরি হলে যে আলোচনা-সভা অনুষ্ঠিত হয় তাতেও বক্তৃতা করেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১২ মার্চ দৈনিক আজাদ-এ ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা দাবী’ শীর্ষক সংবাদে বলা হয় : ‘গতকল্য (বুধবার) শহরের বিভিন্ন ছাত্রপ্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান কর্ত্তৃক রাষ্ট্রভাষা দিবস পালিত হয়। এই উপলক্ষে গতকল্য সর্ব্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্ম্মপরিষদের পক্ষ হইতে ছাত্র জনসাধারণের নিকট ব্যাজ বিক্রয় করা হয় এবং সন্ধ্যায় বার লাইব্রেরী হলে এক আলোচনা-সভা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জনাব আতাউর রহমান। সভায় অধ্যাপক আবুল কাসেম, পূর্ব্ব পাকিস্তান কমিউনিষ্ট পার্টির সদস্য আবদুল মতিন, আওয়ামী লীগের জমিরুদ্দীন আহম্মদ, গণতন্ত্রী দলের মাহমুদ আলী, প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখ ব্যক্তি বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার দাবীতে বক্তৃতা করেন।’
এভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভাষা-আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান অসামান্য। মূলত, ভাষা-আন্দোলনের মাধ্যমেই ঢাকার রাজনীতিতে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রত্যক্ষ সংযোগ স্থাপিত হয়। এই আন্দোলনের মাধ্যমে জাগ্রত জাতীয়তাবাদী চেতনা লালন এবং বাস্তবায়নে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৮ থেকে শুরু করে স্বাধিকার ও মুক্তিসংগ্রামের দিনগুলোতে এবং স্বাধীন বাংলাদেশ ও জাতিসংঘে বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু যে অবদান রেখেছেন, তার ফলে ইতিহাস তাঁকে স্মরণীয় করে রাখবে।

লেখক : গবেষক-প্রাবন্ধিক, সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

Category:

জনগণই আমার আসল পরিবার আমার আপনজন

Posted on by 0 comment
সিটিজিএন’কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

সিটিজিএন’কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তার শুধু একটাই কাজÑ তা হচ্ছে জনগণকে উন্নত জীবন দেওয়া। দারিদ্র্য ও ক্ষুধামুক্ত সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চান তিনি। তার লক্ষ্য বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়া।
চীনের রাষ্ট্রীয় ইংরেজি ভাষার চ্যানেল সিটিজিএন’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। চীন সফরকালে দেওয়া সাক্ষাৎকার গত ৬ জুলাই চ্যানেলটির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
সিটিজিএন’র এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, টাইম ম্যাগাজিনে ২০১৮ সালের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ১০০ জনের তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উত্তরাধিকার বহন করছেন তিনি। ১৯৭৫ সালে পরিবারের প্রায় সব সদস্যকে হারানোর বেদনার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি দেশের উন্নয়নে কাজ করতে ছয় বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে ফিরে আসেন। তিনি চেয়েছেন তার বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে।
বঙ্গবন্ধু-কন্যা বলেন, ‘আমার বাবা কী করতে চেয়েছিলেন তা যখনই ভাবি তখনই আমি তার ডায়েরি পড়ি। সেটা আমার অনুপ্রেরণা। আমার বাবা সবসময় জনগণের কথা ভাবতেন। কারণ তারা ছিল খুবই গরিব। দেশের ৯০ ভাগ মানুষ ছিল গরিব। এই জনগণের জন্যই বাবা আত্মনিয়োগ করেন। তিনি জনগণের দুঃখ-কষ্ট জানতেন। তাদের উন্নত জীবন দিতে চেয়েছিলেন তিনি। তার কাছ থেকে আমরা দেশকে ও দেশের মানুষকে ভালোবাসতে শিখেছি। তিনি আমাকে জনগণের জন্য আত্মনিয়োগ করতে বলেছিলেন।’
সিটিজিএন’র সাংবাদিক প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, ‘আপনি তো বাংলাদেশে অনেক জনপ্রিয় এবং একজন ক্ষমতাধর নারী।’ প্রধানমন্ত্রীর বিনয়ী জবাব, ‘আমি অনুভব করি জনগণের সেবা করতে হবে আমাকে। অবশ্যই জনগণও আমাকে ভালোবাসে। আপনি জানেন, আমি আমার বোন ছাড়া পরিবারের সবাইকে হারিয়েছি। তবে জনগণই আমার আসল পরিবার। তারা আমার আপনজন।’
বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর অংশগ্রহণে সদ্য সমাপ্ত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলন অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, এখানে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন। তারা নিজেদের মধ্যে ব্যবসার নানা পরিকল্পনা নিয়ে মতবিনিময় করেছেন।
শেখ হাসিনা বলেন, এখন আসলে পৃথিবীটা গ্লোবাল ভিলেজ তথা পরস্পরের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত একটি গ্রামে পরিণত হয়েছে। এখানে কেউ একা চলতে পারে না। আমাদের জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণ আর জীবনমান উন্নয়ন করতে আমি সবসময়ই আঞ্চলিক সংযোগকে গুরুত্ব দিয়ে থাকি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চীন ও প্রতিবেশী অন্য দেশগুলোর সঙ্গে কী করে আরও বেশি সহযোগিতা বাড়ানো যায় সে-বিষয়ে কাজ করছি। সত্যি বলতে কি, চীন তো আমাদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করেই যাচ্ছে। আমাদের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে চীনের অনেক কোম্পানিই আমাদের সঙ্গে কাজ করছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাণিজ্য সম্প্রসারণে আঞ্চলিক সহযোগিতার জন্য আরও নতুন পথ খুঁজছে বাংলাদেশ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার মিলে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যেটাকে বলা হয় বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোর। তিনি আশা করেন, এই চুক্তি ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন দ্বার উন্মোচন করবে।
সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী চীনের অর্থনৈতিক উন্নতির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। চীনের উন্নতির ফলে তার প্রতিবেশীরাও লাভবান হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি ভীষণ সন্তুষ্ট। এটা ভিন্ন ধরনের এক সন্তুষ্টি। আমার প্রতিবেশী যথেষ্ট উন্নতি করছে। আমরা চীনের কাছ থেকে শিখতে পারি এবং একযোগে কাজ করতে পারি। সত্যি কথা বলতে কি, ৭০ বছর আগে যখন চীনের পুনর্জন্ম হয়, তখন কী অবস্থা ছিল তা কল্পনাও করা যায় না। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই চীন উন্নতি করেছে। এটা গর্ব করার মতো বিষয়। আমি অবশ্যই বলব যে এটা অসাধারণ অর্জন।’

Category: