Blog Archives

দিনপঞ্জি : ফেব্রুয়ারি ২০১৯

Posted on by 0 comment

Mfd০১ ফেব্রুয়ারি
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কত ত্যাগ-তিতিক্ষা, রক্তপাতের মধ্য দিয়ে একটি জাতি তার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারেÑ বাঙালির স্বাধীনতার ইতিহাস তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। নতুন প্রজন্মকে এই ইতিহাস জানাতে হবে। বিকালে রাজধানীর বাংলা একাডেমিতে মাসব্যাপী অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৯-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এ-কথা বলেন।

০২ ফেব্রুয়ারি
* প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বিগত নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক সংলাপে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, জোট ও সংগঠনের নেতাদের সম্মানে এক চা-চক্রের আয়োজন করেন। বিকেলে গণভবনের দক্ষিণ লনের সবুজ চত্বরে আয়োজিত এই চা-চক্রে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা অংশগ্রহণ করেন। এর মধ্যে জাতীয় পার্টি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ-ইনু), জাপা (মঞ্জু), জাসদ (আম্বিয়া), বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ), গণতন্ত্রী পার্টি, সাম্যবাদী দল, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, ইসলামী ঐক্যজোট, তরীকত ফেডারেশন ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বিকাল ৪টা ১০ মিনিটে চা-চক্রের অনুষ্ঠানস্থলে আসেন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

০৩ ফেব্রুয়ারি
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, খাদ্যে ভেজাল দেওয়াও এক ধরনের দুর্নীতি। এর বিরুদ্ধে সরকার অভিযান অব্যাহত রেখেছে। খাদ্যে ভেজাল বন্ধে আরও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস উপলক্ষে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, খাদ্যে ভেজাল দেওয়া কিছু মানুষের চরিত্রগত বদ অভ্যাস। এটা বন্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, ভেজালবিরোধী অভিযান চলছে। আরও ব্যাপকভাবে অভিযান চালাতে একটি কর্তৃপক্ষ করে দেওয়া হয়েছে। হাটে-ঘাটে-মাঠে যেন ভেজালবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকে সেই ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে। শেখ হাসিনা বলেন, খাদ্যে ভেজালের বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা দরকার। এ ব্যাপারে নাগরিকদের সচেতন হতে হবে। জনগণ যদি সচেতন হয় তাহলে তাদের কেউ ঠকাতে পারবে না।

০৪ ফেব্রুয়ারি
* পুলিশ বাহিনীকে জনবান্ধব হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তাদের হাতে নিরীহ মানুষ যাতে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। জনগণ হয়রানির শিকার হলে বা বিপদে পড়লে তাদের সহযোগিতা করতে হবে। জনগণ এটাই প্রত্যাশা করে। জনগণের আস্থা অর্জনে ও জনবান্ধব হতে প্রত্যেক পুলিশ সদস্যকে সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। পুলিশকে সব সময় আইনের রক্ষকের ভূমিকায় দেখতে চাই। সকালে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে পুলিশ সপ্তাহ উদ্বোধনকালে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, জনগণের সমস্যাকে দেখতে হবে একান্ত আন্তরিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে। জনগণের মনে পুলিশ সম্পর্কে যেন অমূলক ভীতি না থাকে সেজন্য তাদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। এজন্য পুলিশ সদস্যদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় জনগণের মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার ও আইনের শাসনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে হবে। দেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখা জরুরি। দেশে শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পুলিশের। শেখ হাসিনা বলেন, নৈতিক স্খলন যে কোনো বাহিনীর মনোবল দুর্বল করে দেয়। জনগণের টাকায় আমাদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়। আমরা সকলেই জনগণের সেবক। তাই জনগণ যাতে কোনোভাবে নিগৃহীত না হয়, সেদিকে সর্বোচ্চ সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। মনে রাখবেন, সকল সফলতার জন্য আপনারা পুরস্কৃত হবেন, পাশাপাশি জবাবদিহিও যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
* আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বলেছেন, বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতারাই শুধু নির্বাচনকে বিতর্কিত করার ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। আসলে বিএনপি নেতিবাচক রাজনীতির গভীর খাদে পড়ে গেছে। তারা বেসামাল ও বেপরোয়া হয়ে যখন যা খুশি নির্বাচন নিয়ে তাই বলছে। এটা ব্যর্থ বিএনপির অসংলগ্ন প্রলাপ ছাড়া আর কিছুই নয়।

০৫ ফেব্রুয়ারি
* আওয়ামী লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র মোহাম্মদ নাসিম এমপি বলেছেন, জামাত নিষিদ্ধ করা এখন জনদাবিতে পরিণত হয়েছে। এ ব্যাপারে বর্তমান সংসদে জোরালো ভূমিকা রাখা হবে। জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট আয়োজিত বর্ষীয়ান রাজনীতিক ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক প্রয়াত সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের স্মরণসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণ ভোটের মাধ্যমে স্বাধীনতাবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। জামাতের সঙ্গ ত্যাগ না করায় বিএনপি শোচনীয় পরাজয় হয়েছে। এখন জনগণের রায়ের প্রতি সম্মান দেখিয়ে জামাতকে রাজনীতি থেকে চিরতরে নিষিদ্ধ করতে হবে।

০৬ ফেব্রুয়ারি
* যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধে সরকারের দৃষ্টি আদালতের দিকে বলে সংসদকে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জামাতকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে আদালতে একটি মামলা রয়েছে। এই মামলার রায় না হওয়া পর্যন্ত দলটিকে নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে সরকারের কিছু করার নেই। আশা করা যায়, শিগগির মামলার রায় হবে এবং জামাত নিষিদ্ধ হবে। তরীকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভা-ারীর সম্পূূরক প্রশ্নের উত্তরে এসব মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, জামাতের কোনো রাজনীতির নিবন্ধন নেই। তবে এটা ন্যক্কারজনক যে, তারা নিবন্ধিত না হয়েও জামাতের নামে ভোট করেছে। বিএনপির সঙ্গে একযোগে জোট করে ধানের শীষ নিয়ে প্রার্থী হয়েছিল। কিন্তু জনগণ তাদের ভোট দেয়নি; সম্পূূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।

০৭ ফেব্রুয়ারি
* সশস্ত্র বাহিনীকে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক অভিহিত করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ভবিষ্যতেও দেশ ও জাতির উন্নয়নে এবং গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত রাখতে ভূমিকা রেখে যেতে হবে। ঢাকার মিরপুর ক্যান্টনমেন্টে ডিফেন্স সার্ভিসেস কমান্ড অ্যান্ড স্টাফ কলেজের শেখ হাসিনা কমপ্লেক্সে ‘ডিএসসিএসসি ২০১৮-১৯ কোর্সের’ গ্র্যাজুয়েশন কোর্সের ডিগ্রি প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা সততা ও দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে বহির্বিশ্বেও সুনাম অর্জন করেছেন। জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে সশস্ত্র বাহিনীর কৃতিত্ব সারাবিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। তিনি বলেন, ভবিষ্যতেও দেশ ও জাতির কল্যাণে এবং গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক ধারা অব্যাহত রাখতে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীকে অবদান রাখতে হবে। বাংলাদেশে যে উন্নয়নের ধারা সূচিত হয়েছে, তা যেন এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি।

১০ ফেব্রুয়ারি
* দেশের উপজেলাগুলোকে সুনির্দিষ্ট উন্নয়ন পরিকল্পনার আওতায় নিয়ে আসার জন্য মাস্টারপ্ল্যান বা মহাপরিকল্পনা তৈরির জন্য এলজিআরডি মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, জনগণের অর্থ সাশ্রয় ও কৃষি জমি রক্ষায় উপজেলাগুলোতে অপরিকল্পিত উন্নয়ন অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং রাস্তা ও চলাচলের ব্যবস্থা পরিকল্পিত হতে হবে। কারণ আমরা দেখি যত্রতত্র দালান হচ্ছে। কারণ টাকা হলেই ধানের জমি নষ্ট করে সেখানে দালান করে দিচ্ছে। কিন্তু কোনো হিসাব-নিকাশ নেই। সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় পরিদর্শনকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

১২ ফেব্রুয়ারি
* বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর (ভিডিপি) ভূমিকার প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, জাতীয় সংকটকালে ও জরুরি মুহূর্তে তারা দক্ষতা ও সফলতার পরিচয় দিয়েছেন। মাদক, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তাদের সব সময় সজাগ থাকতে হবে। গাজীপুরের সফিপুরে আনসার-ভিডিপি একাডেমিতে এ বাহিনীর ৩৯তম জাতীয় সমাবেশ ও কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪০ হাজার ১৮৩টি ভোটকেন্দ্রে প্রায় ৫ লাখ আনসার-ভিডিপি সদস্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ভোটকেন্দ্র, ভোটের নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছেন। একটি সুষ্ঠু নির্বাচন বাংলাদেশের জনগণকে উপহার দিয়েছেন। এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পাঁচ আনসার সদস্যকে জীবন দিতে হয়েছে। তাদের মরণোত্তর সাহসিকতা পদক দেওয়া হয়।
* আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বলেছেন, আদর্শগত দিক থেকে বিএনপি-জামাত দুটি দলই সাম্প্রদায়িক। তাদের চিন্তাচেতনা অনেকটা একই। তাই এই দুই দলের কেউ কাউকে ছেড়ে রাজনীতি করবে না। সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, এটা আমার কাছে মনে হয় না যে, বিএনপি জামাতকে অথবা জামাত বিএনপিকে ছাড়বে। এটা হলেও কৌশলগত হতে পারে।

১৩ ফেব্রুয়ারি
* প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের বিজয়ী সংসদ সদস্যদের সংসদে না আসাকে ‘রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্ত’ উল্লেখ করে বলেছেন, যারা (জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট) নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেও অল্প সিট পেয়েছেন বলে অভিমানে তারা পার্লামেন্টে আসছেন না। আমার মনে হয়, এটা রাজনৈতিক একটা ভুল সিদ্ধান্ত তারা নিয়েছেন। কারণ ভোটের মালিক জনগণ, জনগণ যাকে খুশি তাকে ভোট দেবে এবং সেভাবেই জনগণ ভোট দিয়েছে। কাজেই আমার আহ্বান থাকবে, যারাই নির্বাচিত সংসদ সদস্য তারা সবাই পার্লামেন্টে আসবেন, বসবেন এবং যার যা কথা সেটা বলবেন। এটাই আমি আশা করি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ী হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারতসহ ৯৭টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান এবং বিভিন্ন সংস্থান প্রধানরা তাকে অভিনন্দন জানানোর কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব অভিনন্দন বার্তায় বিশ্ব নেতৃবৃন্দ বাংলাদেশের মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন এবং উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির জন্য আমাদের সরকারের সঙ্গে একযোগে কাজ করার ইচ্ছে পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

১৮ ফেব্রুয়ারি
* বিভিন্ন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মালিকানায় থাকা গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে যাতে মালিকের স্বার্থে ব্যবহার করা না হয়, তা নিশ্চিত করতে বলেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। তিনি বলেন, দেশের বড় বড় ব্যবসায়ী গ্রুপ এখন অনেক গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মালিক। এটা নিঃসন্দেহে গণমাধ্যমের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। বেসরকারি খাতের এ উদ্যোগকে আমি স্বাগত জানাই। তবে একইসঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে, এসব গণমাধ্যম যাতে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে ব্যবহৃত না হয়। রাজধানীর একটি হোটেলে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল পদক প্রদান অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির এ বক্তব্য আসে।

২০ ফেব্রুয়ারি
* একুশের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে সবাই মিলে বাংলাদেশকে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, একুশ আমাদের শিখিয়েছে মাথানত না করা। আমি মনে করি, একুশে পদকজয়ীদের অনুসরণ করে আমাদের আগামী প্রজন্ম নিজেদের গড়ে তুলবে। একুশ আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করা যায়, নিজের মাতৃভাষাকে রক্ষা করা যায়। সঙ্গে সঙ্গে নিজের সংস্কৃতি, শিক্ষা, ঐতিহ্য সবকিছুকেই রক্ষা করা ও তার মর্যাদা দেওয়া। তাই আসুন, আমাদের মাতৃভূমিকে আমরা গড়ে তুলি। আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের ঐতিহ্য নিয়ে বিশ্বে যেন অনন্য মর্যাদায় চলতে পারি। স্বপ্নের ক্ষুধামুক্ত দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়তে পারি। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে একুশে পদক প্রদান ২০১৯ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী এই আহ্বান জানান।

২৪ ফেব্রুয়ারি
* রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, নেতৃত্ব বিকাশের আদর্শ স্থান হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়। জাতি গঠনে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। এখানে কেবল পুঁথিগত বিদ্যা প্রদান করে না, শিক্ষার্থীদের অতীতের সঙ্গে বর্তমানের যোগসূত্র ঘটায়; তাদের সমকালীন আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে সচেতন করে তোলে এবং বিশ্বনাগরিকে পরিণত করে। রাষ্ট্রপতি বিকেলে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) দ্বিতীয় সমাবর্তনে সভাপতির বক্তব্যে এসব কথা বলেন। রাষ্ট্রপতি বলেন, আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের প্রতিটি খাতে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। উন্নয়ন ও অগ্রগতির এ ধারাকে অব্যাহত রাখতে সঠিক ও যোগ্য নেতৃত্বের বিকল্প নেই। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। আর তারই সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে।

২৫ ফেব্রুয়ারি
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, রোহিঙ্গা নাগরিকদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে মিয়ানমার বাংলাদেশের সঙ্গে করা অঙ্গীকার অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। আমরা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিষয়ে মিয়ানমারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে চুক্তি করেছিলাম। কিন্তু মিয়ানমার সরকার এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে অবদানের জন্য মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বন্ধু সম্মাননা অর্জনকারী ড. পল কনেট ও এলেন কনেট সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদ ভবনে তার কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাতে এলে প্রধানমন্ত্রী এ-কথা বলেন। বৈঠকের পরে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।

২৬ ফেব্রুয়ারি
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা এ মাটিরই সন্তান। তারা দেশের চলমান উন্নয়নের ধারাকে এগিয়ে নিতে পারেন। দেশের তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি, শিল্পোৎপাদন, যোগাযোগ এবং সমুদ্রসম্পদ আহরণে ব্যাপক ভূমিকা পালন করতে পারেন তারা। রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে অনাবাসী (এনআরবি) প্রকৌশলীদের প্রথম কনভেনশনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। প্রবাসী প্রকৌশলীদের স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা যারা বিদেশ থেকে এসেছেন, বাংলাদেশের কোনো-না-কোনো গ্রামেই আপনাদের বাড়িঘর, সেখানে আপনাদের শিকড় রয়ে গেছে। শিকড়ের সন্ধান করে আপনারা নিজ নিজ অঞ্চলের কীভাবে উন্নয়ন করতে পারেন, সে অনুরোধ আমি করব। শেখ হাসিনা বলেন, সরকার ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল করছে। সেখানে বিদেশিরা তো বিনিয়োগ করবেনই, প্রবাসীরাও বিনিয়োগ করতে পারেন। প্রবাসীদের বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও সরকার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। সরকারপ্রধান বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন কেবল শহর কিংবা রাজধানীভিত্তিকই নয়, তার সরকার গ্রামভিত্তিক উন্নয়ন করতে চায়। তার সরকার গত ১০ বছরে দেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন করেছে। আজকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে।
* আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য তোফায়েল আহমেদ এমপি বলেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্ন ছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তে কাজ করে যাচ্ছে। একাদশ জাতীয় সংসদে স্বাধীনতাবিরোধীদের কোনো স্থান হয়নি। অথচ বিএনপি সরকারের সময় মন্ত্রী পর্যন্ত তারা করেছে। জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘বাংলা ভাষা আন্দোলন : অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তার বিজয়’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। তোফায়েল আহমেদ বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরিকল্পিতভাবে দেশ চলছে। গত ১০ বছরে বঙ্গবন্ধু-কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশে বিস্ময়কর উন্নয়ন হয়েছে। এই উন্নয়নের একমাত্র কারণ পরিকল্পিতভাবে দেশ পরিচালনা করা। কিন্তু বিএনপি-জামাত কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই দেশ চালিয়েছে।

২৭ ফেব্রুয়ারি
* রাষ্ট্রপতির ভাষণ সম্পর্কিত ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে সংসদ সদস্যরা বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের সঙ্গে নিয়ে বিএনপি-জামাত জোট দেশবিরোধী ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। দেশকে লুণ্ঠন করা, হত্যা-খুন-অগ্নিসন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়ার রাজনীতির দিন শেষ। এদের কোনো ষড়যন্ত্রই এদেশে আর বাস্তবায়িত হবে না। প্রথমে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং পরে প্যানেল সভাপতি শামসুল হক টুকুর সভাপতিত্বে রাতে রাষ্ট্রপতি ভাষণ সম্পর্কে আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা এসব কথা বলেন। আলোচনায় অংশ নেন সাবেক ভূমিমন্ত্রী শামসুল হক শরীফ ডিলু, তরিকত ফেডারেশনের সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভা-ারী, পরিবেশ ও বন উপমন্ত্রী বেগম হাবিবুন নাহার, সরকারি দলের অসীম কুমার উকিল, পংকজ দেবনাথ, নজরুল ইসলাম বাবু, আবদুল মজিদ খান ও বেগম সেলিমা আহমাদ।

Category:

ভেনেজুয়েলায় কী ঘটছে?

Posted on by 0 comment

Mfdসাইদ আহমেদ বাবু: ভেনেজুয়েলা দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর উপকূলে ক্যারিবীয় সাগরের তীরে একটি রাষ্ট্র। ‘একুশ শতকের সমাজতন্ত্র’র রূপকার খ্যাত প্রয়াত ভেনেজুয়েলান প্রেসিডেন্ট হুগো চ্যাভেজ সেই দেশের অর্থনীতিকে বের করে এনেছিলেন পশ্চিমা কর্তৃত্ব থেকে। বলিভারিয়ান বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দেশের অর্থনীতিকে অনন্য উচ্চতায় নিতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি।
স্থানীয় সরকারের এক সদস্য হাইদো ওর্তেগা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘পূর্ববর্তী সরকারের সময় আন্দোলনে যেতে হতোÑ যেন বিদ্যুৎ পাই, পথঘাট ঠিক হয় কিংবা উন্নয়নে অর্থ ব্যয় করা হয়।’ চ্যাভেজ প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নিয়ে পুঁজিবাদ ও সমাজবাদের সমন্বয়ে একটি মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করেন। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত তেল উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠানে সংস্কার আনেন তিনি। মার্কিন প্রতিষ্ঠানের বদলে তেল বিক্রির অর্থ জমা হতে থাকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। ভেনেজুয়েলার তেল থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে সামাজিক সুরক্ষা বিষয়ক বিভিন্ন কর্মসূচি শুরু করেন তিনি।
সম্পদ-সমৃদ্ধ এদেশে চাভেজ সরকার ক্ষমতার আসার আগে ৬৬ শতাংশই প্রচলিত ‘দারিদ্র্যসীমা’র নিচে বসবাস ছিল। দেশের এই সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ ছিল বেশ কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানির, তার সহযোগী ছিল দেশি ধনিকরা। ১৯৯৮ সালে চাভেজ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠনের পর দেশের এই ক্ষমতা ভারসাম্যের আমূল পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিলেন। সব প্রতিকূলতার মধ্যে চাভেজের প্রথম দশকে ভেনেজুয়েলার গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো কমিউনাল কাউন্সিল, যা জনগণকে তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সাংগঠনিক কাঠামো দিয়েছে, যার মধ্য দিয়ে চাভেজ বিদ্যমান রাষ্ট্রের সমান্তরাল রাষ্ট্র তৈরি করতে চেয়েছিলেন। দেশের সম্পদের ওপর সর্বজনের মালিকানা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক নানা সংস্কার শুরু করেছিলেন। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়নে অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রয়োজনীয় পরিবর্তনও শুরু হয়েছিল। ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্ররোচনায় এক সামরিক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেন চ্যাভেজ। সামরিক বাহিনীর অস্ত্র আর আক্রমণ প্রতিহত করে কারাকাসের রাজপথে নেমে এলো গরিব নারী-পুরুষ। সারাদেশে গণ-অভ্যুত্থানের পরিস্থিতি সৃষ্টি হলো। উৎখাতের কয়েকদিনের মধ্যে ক্ষমতায় ফিরে তিনি ভেনেজুয়েলাকে একবিংশ শতাব্দীর সমাজবাদী রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন। ১৯৯৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত তেল বিক্রির আয়ের মাধ্যমে লাখ লাখ ভেনেজুয়েলানকে দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দেন চ্যাভেজ ও ইউনাইটেড সোশ্যালিস্ট পার্টি। দেশটিতে দারিদ্র্য ও বেকারত্বের হার অর্ধেকে নামিয়ে আনেন তিনি। অভূতপূর্ব পরিবর্তন আনেন শিক্ষা, চিকিৎসা আর জ্বালানি সেবায়।
এই সরকারের সঙ্গে বড় বড় বহুজাতিক কোম্পানির বিবাদ তৈরি হয়, বিশ্বের বৃহৎ আর্থিক সংস্থা বড় ব্যবসা হারায়, যুক্তরাষ্ট্র তাই প্রথম থেকেই ‘একনায়ক’ চাভেজ-বিরোধী প্রচারণা চালাতে থাকে। চাভেজ সরকার একের পর এক তাদের আক্রমণ, চক্রান্ত ও অন্তর্ঘাত মোকাবিলা করে অগ্রসর হয়েছে। গরিব সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে নিয়ে ক্রমান্বয়ে পাল্টা প্রতিষ্ঠান দাঁড় করানোর মধ্য দিয়েই এই চেষ্টা চলেছে।
দেশটির সাবেক প্রধান হুগো চাভেজ ২০১৩ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে নিকোলাস মাদুরো হন তার উত্তরসূরি। মাদুরো চাভেজের অনুসারী চাভেজের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন ২০০৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত। শেষে এক বছর চাভেজের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিপুল অর্থনৈতিক অগ্রগতি সত্ত্বেও চাভেজের শাসন শুরুর ২০ বছরের মাথায় এসে ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি দাঁড়িয়েছে একবারে শেষপ্রান্তে। ২০১৫ সাল থেকে কমপক্ষে ২৭ লাখ মানুষ ভেনেজুয়েলা ছেড়ে পালিয়েছেন। যারা দেশের ভেতরে আছেন তারাও ক্ষুধার যাতনা আর স্বাস্থ্যসেবার অভাবে দিশেহারা। সে-কারণেই খোদ পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট-এ উদ্ধৃত সাম্প্রতিক এক জরিপের তথ্য থেকে জানা যায়, বিপন্ন এই অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও এক-তৃতীয়াংশ মানুষ সমাজতন্ত্রে আস্থা হারান নি। সংকট থাকলেও সে-জন্য চাভেজের প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা বা মাদুরোকে দায়ী না করার মতো মানুষ রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, মাদুরোর বিরুদ্ধে নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ ও অর্থনৈতিক সংকটকে পুঁজি করে জুয়ান গুইদোকে ক্ষমতার কেন্দ্রে আনতে। তবে, সিরিয়া প্রেক্ষাপটকে উদাহরণ হিসেবে ধরে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তা এত সহজ হবে না। কারণ, ভেনেজুয়েলায় মাদুরোর সরকারকে সেদেশের সেনাবাহিনী ও বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্রগুলো সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তাই ভেনেজুয়েলায় চলমান সংকটকে আগেভাগেই একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের দিকে নিয়ে যাওয়া বিশ্বনেতাদের এখন আশু কর্তব্য।
মিন্টপ্রেসের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ২০১৪ সালের এক ঘটনা। সে-সময় ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি ধ্বংসের স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি পররাষ্ট্রনীতির উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তৎপর হয় আরেক তেলসমৃদ্ধ শক্তি সৌদি আরব। আর্থিক ক্ষতি ও ঋণের বোঝা বাড়লেও কম দামে তেল বিক্রি অব্যাহত রাখে তারা। বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলার থেকে নেমে আসে ২৮ ডলারে। তেলের দাম কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়ে ভেনেজুয়েলা। শুরু হয় বাজেট কর্তন এবং অর্থনৈতিক ধস। দেখা দেয় খাবারের অভাব। ২০১৫ সালে ভেনেজুয়েলাকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি ঘোষণা করে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল ওবামা প্রশাসন। দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন পর্যন্ত চারবার ভেনেজুয়েলায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বর্তমানে ভেনেজুয়েলা যত তেল রপ্তানি করে তার মধ্যে ৪০ শতাংশ তেলই আমদানি করে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু তেলের ওপর জারি করা এই নিষেধাজ্ঞার কারণে এখন অন্যান্য দেশও ভেনেজুয়েলার তেলের দাম কমিয়ে দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে, ২০১৩ সাল থেকে মাদুরোকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে রাশিয়া, চীন ও তুরস্ক। ফলে হয়তো পরিস্থিতি একই রকম থেকে যাবে।
সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেতা হুয়ান গুয়াইদো নিজেকে দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা দেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে তার এই ঘোষণাকে তাৎক্ষণিকভাবে স্বীকৃতি দেয় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বেশ কিছু দেশ। তবে ইরান, রাশিয়া ও চীনসহ বিশ্বের বহু দেশ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর প্রতি সমর্থন জানিয়ে আসছে। মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রকেই তার দেশের সংকটের পেছনে মূল কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট আন্দ্রে ম্যানয়েল লোপেজ বেশ কূটনৈতিক একটি অবস্থান নিয়েছেন। মাদুরো ও গুইয়াদোর মধ্যে যে দ্বন্দ্ব চলছে তা সমাধানের চেষ্টায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা পালন করতে রাজি হয়েছেন তিনি।
ভেনেজুয়েলায় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাচ্ছে। খাবার ও ওষুধের মতো মৌলিক পণ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন সেখানকার জনগণ। গুয়াইদো জোর দিয়ে বলছেন, লোকজনের সাহায্য প্রয়োজন। অন্যদিকে মাদুরো বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের অংশ হিসেবে দেশের ভেতরে সাহায্য আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বহির্বিশ্বের হস্তক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে চীন। একইসঙ্গে চলমান সংকট সমাধানে ও ভেনেজুয়েলার স্থিতিশীলতা রক্ষায় সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানায় দেশটি। সম্ভাব্য রক্তপাত এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ভেনেজুয়েলাবাসীর প্রতি আহ্বান জানান ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিসও।
ভেনেজুয়েলার জনগণ দুই প্রেসিডেন্টের প্রতি নিজেদের সমর্থন ও আনুগত্য প্রকাশ করায় পুরো দেশের জনগণ এখন দ্বিধাবিভক্ত। বিশ্বের বৃহৎ শক্তিগুলোও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে দুই প্রেসিডেন্টের সমর্থনে এগিয়ে এসেছে। দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে বিশ্বশক্তিগুলোর দুই প্রেসিডেন্টের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করায় রাজনৈতিক সংকট নিরসনের সম্ভাবনা অনেক ক্ষীণ বলেই মনে করা হচ্ছে। আমেরিকা এরই মধ্যে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট গুয়াইডুর প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন চেয়ে বিবৃতি দিয়েছে। আমেরিকা ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরে ভূমিকা রাখার জন্য ভেনেজুয়েলার সেনাবাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে চীন ও রাশিয়া ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট মাদুরোর প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন।
নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে ‘একনায়ক’ আখ্যা দিয়ে অনির্বাচিত এক ব্যক্তিকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, তাকে সমর্থন দিচ্ছে কানাডা, যুক্তরাজ্য ইত্যাদি দেশের সরকার। মার্কিন ও বহুজাতিক পুঁজির স্বার্থ দেখতে সক্ষম এ-রকম সরকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় মরিয়া বিশ্বদুর্বৃত্তরা। কারণ হলো ভেনেজুয়েলার সম্পদ ও দারিদ্র্য। দেখতে হবে এদেশে জনপন্থি নেতা চাভেজের চেষ্টা এবং তাতে কার ক্ষতি কার লাভ।
সম্পদ এবং দারিদ্র্য কীভাবে পাশাপাশি থাকে, তার উদাহরণ বিশ্বের অনেক দেশেই আছে। ভেনেজুয়েলায় পশ্চিম গোলার্ধে প্রমাণিত তেল মজুত এদেশেই সবচেয়ে বেশি। গ্যাস সম্পদেও এদেশ অনেক সমৃদ্ধ, বিশ্বের নবম বৃহত্তম প্রমাণিত গ্যাস মজুত আছে এদেশেই, দক্ষিণ আমেরিকার মধ্যে এটি বৃহত্তম। কয়লা সম্পদ তুলনায় কম হলেও তার মজুতও উল্লেখযোগ্য। এছাড়া আছে লোহা, বক্সনাইট, সোনা, নিকেল ও হীরা। প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে ভেনেজুয়েলার এই সমৃদ্ধিই তার কাল হয়েছে। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গোষ্ঠী এ থেকে লাভবান হয়েছে। দেশের জিডিপি, মাথাপিছু আয়, রপ্তানি বাণিজ্যÑ সবকিছুই বেশ রঙিন হয়েছে, কিন্তু দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জন্য তার সুফল তৈরি হয়নি দীর্ঘকাল। বিশ্বের বহু দেশের মতো এদেশ আবারও দীর্ঘস্থায়ী অশান্তি, সহিংসতা, লুণ্ঠন ও স্বৈরতন্ত্রে প্রবেশের হুমকির মধ্যে।
মাদুরো ট্রাম্পকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, তিনি যদি হস্তক্ষেপ করেন তাহলে ভিয়েতনাম যুদ্ধের পরিণতি বরণ করতে হবে। এদিকে যে কোনো ধরনের ধ্বংসাত্মক অনধিকার চর্চা থেকে বিরত থাকার জন্য পশ্চিমা হুমকিদাতাদের সতর্ক করে দিয়েছে মাদুরোর মিত্র রাশিয়া। ভেনেজুয়েলার সমস্যা এখন আর তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় নয়, এই সংকট এখন পুরো মহাদেশের শান্তির জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে।

Category:

মুক্তিযোদ্ধাদের বাড়ি করে দেবে সরকার

Posted on by 0 comment

উত্তরণ প্রতিবেদন: দেশের উপজেলা পর্যায়ে অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ৮ হাজার ফ্ল্যাট নির্মাণ করার উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। এ-লক্ষ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) সভায় ২ হাজার ২৭৩ কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্পের অনুমোদনও দেওয়া হয়েছিল। তবে মুক্তিযোদ্ধাদের দাবির প্রেক্ষিতে সেই প্রকল্প প্রত্যাহার করে নিয়েছে সরকার। নতুন প্রকল্পের মাধ্যমে ফ্ল্যাটের পরিবর্তে অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধাদের বসতভিটায় বাড়ি করে দেবে সরকার। মুক্তিযোদ্ধা যাদের ভিটা নেই তাদের পার্শ¦বর্তী খাস জমিতে ঘর করে দেওয়া হবে। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এনইসি সম্মেলন কক্ষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সিদ্ধান্ত দেন। একনেক সভা শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার কথা জানান।
এদিন, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় নতুন ১০টি ও সংশোধিত ৩টি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই ১৩ প্রকল্পের জন্য মোট ব্যয় হবে ১২ হাজার ৪৫৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি তহবিল (জিওবি) থেকে দেওয়া হবে ৯ হাজার ৪৮১ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হবে ১৫৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ হিসেবে পাওয়া যাবে ২ হাজার ৮২৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। একনেক সভা শেষে সাংবাদিকদের পরিকল্পনামন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধাদের বিষয়টি নিয়ে বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের দাবির প্রেক্ষিতে এই প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি।
মন্ত্রী বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি ছিল ফ্ল্যাট না দিয়ে নিজস্ব ভিটায় একই টাকা খরচ করে ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার। সেজন্য এখন নতুন করে ঘর নির্মাণ প্রকল্প নেওয়া হবে। জানা গেছে, ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ২ হাজার ২৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বহুতল ভবন নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। এই প্রকল্পের আওতায় সারাদেশে ৫৩২টি ভবনে মোট ৮ হাজার ফ্ল্যাট নির্মাণের কথা ছিল। প্রতিটি ভবন পাঁচতলা হলেও এগুলোতে ওঠানামার লিফটের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। আরও জানা গেছে, নতুন প্রকল্পের জন্য এরই মধ্যে সারাদেশ থেকে প্রাথমিকভাবে ১৬ হাজার মুক্তিযোদ্ধার তালিকা করা হয়েছে। আর নতুন প্রকল্পে একতলা একটি ঘর নির্মাণের সম্ভাব্য খরচ ধরা হয়েছে ২০ লাখ টাকা।

Category:

এএফসি চ্যাম্পিয়নশিপ : চূড়ান্ত পর্বে বাংলাদেশ

Posted on by 0 comment

Mfdআরিফ সোহেল: আবারও প্রমাণিত হয়েছে বাঙালি মেয়েরা এই অঞ্চলের ফুটবলে অনবদ্য। তারা এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ ওমেন্স চ্যাম্পিয়নশিপের মূলপর্ব নিশ্চিত করেছে। ৩ মার্চ ২০১৯ শেষ ম্যাচে শক্তিশালী চীনের কাছে হারলেও ফিলিপাইন এবং স্বাগতিক মিয়ানমারকে হারিয়ে মূলপর্বে নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ। প্রথম দুই ম্যাচ অনায়াসে জিতে চীনও মূলপর্ব নিশ্চিত করেছিল। শেষ ম্যাচটি দুই দলের জন্যই হয়েছিল আনুষ্ঠানিকতার। সেই ম্যাচে বাংলাদেশ হেরেছে ৩-০ ব্যবধানে। এর আগে ২০১৮ সালেও এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ ওমেন্স চ্যাম্পিয়নশিপের মূলপর্বে খেলেছিল মেয়েরা। অবশ্য গতবার দ্বিতীয় রাউন্ড ছিল না। প্রথম পর্বে চ্যাম্পিয়ন হয়ে মূলপর্বে খেলেছে। থাইল্যান্ডে গিয়ে মূলপর্বে প্রত্যাশিত সাফল্য স্পর্শ করতে পারেনি নারী ফুটবলাররা। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরে আসর শেষ করেছিল বাংলাদেশ।
এটা সত্যি, এশিয়া অঞ্চলে অনেক দলের কাছে বাংলাদেশ এক বিভীষিকার নাম হলেও শীর্ষ দলগুলোর চেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে। মিয়ানমারের মাটিতে চীন যেন মারিয়ামান্দাদের সেটাই বুঝিয়ে দিয়েছে। তারপরও ‘বি’ গ্রুপের রানার্সআপ হয়ে মূলপর্বে যাওয়াটই বড়প্রাপ্তি বাংলাদেশের জন্য।
ম্যাচ শেষে বাংলাদেশ কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন তারপরও শীষ্যদের বাহবা দিয়েছেন সর্বোচ্চ চেষ্টা করায়। বলেছেন, ‘প্রথমার্ধে যে-রকম নির্দেশনা ছিল সেভাবেই মেয়েরা খেলেছে। দ্বিতীয়ার্ধে গোলকিপার রুপনার ভুলে একটা গোল খেয়ে যাই। তারপরও মেয়েরা বাকিটা সময় চেষ্টা করে গেছে।’
চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে থাইল্যান্ডে বসতে যাচ্ছে ৮ দলের মূলপর্ব। যেখানে খেলা নিশ্চিত করেছে ৬ দল। গতবারের সেরা ৩ দল উত্তর কোরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের পাশাপাশি সরাসরি খেলছে স্বাগতিক থাইল্যান্ড। আর ‘বি’ গ্রুপ থেকে চীন ও বাংলাদেশ যোগ দিয়েছে সেখানে।
সূচনা ম্যাচে ফিলিপিনকে ১০-০ গোলের ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ। ২৭ ফেব্রুয়ারি আসরের প্রথম ম্যাচে তহুরা খাতুনের হ্যাটট্রিকে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপে ফিলিপিনসকে উড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। আর ১ মার্চ অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ম্যাচে স্বাগতিক মিয়ানমারের বিপক্ষে জয় পায় ১-০ গোলে। বাংলাদেশের জন্য এই আসরে মিয়ানমারই ছিল কঠিন প্রতিপক্ষ।
থাইল্যান্ডে অনুষ্ঠিত হবে ৮ দলের চূড়ান্ত লড়াই। এই লড়াইটি আবার বিশ্বকাপের বাছাই পর্বও। ফিফা অনূর্ধ্ব-১৭ নারী ফুটবল বিশ্বকাপের বাছাই। এই আসরের সেরা ৩ দল সরাসরি খেলবে আগামী অনূর্ধ্ব-১৭ বিশ্বকাপে। চতুর্থ দলের সামনেও থাকবে সুযোগ। সেক্ষেত্রে প্লে-অফ খেলতে হবে তাদের। এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ চ্যাম্পিয়নশিপের চূড়ান্তপর্বে, নাম লেখানোর পর এখন বাংলাদেশের সামনেও আশা জাগানিয়া স্বপ্ন বিশ্বকাপ মঞ্চে জায়গা করে নেওয়ার।
নারী ফুটবল দলের কোচ ছোটন মনে করেন, ‘মেয়েদের ফুটবলের সবচেয়ে বড় অভ্যুত্থানটা ঘটেছে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা স্কুল ফুটবল টুর্নামেন্ট দিয়ে। কারণ ক্রীড়াবান্ধব সরকার এই টুর্নামেন্টে খেলা স্কুলগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক করেছে। ফলে এখান থেকে ভালো ভালো ফুটবলার বেরিয়ে আসছে।’
জাতীয় কিংবা বয়সভিত্তিকÑ বাংলাদেশের মেয়েদের সব রকমের ফুটবলে একের পর এক সাফল্য আসছে। এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ টানা দুবার চ্যাম্পিয়ন। এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ টুর্নামেন্টের বাছাইপর্বে চ্যাম্পিয়ন হয়ে চূড়ান্ত পর্বে। সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ ও অনূর্ধ্ব-১৮ টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ। সিনিয়ররা খেলেছে সাফের ফাইনালে।
স্বপ্না, মারিয়া, আঁখিদের খেলায় মনরাঙানো নৈপুণ্য-স্কিল রয়েছে। এক সময়ের জাপানের কাছে ২৪-০ গোলে হারা বাংলাদেশ উঠে গেছে অন্য উচ্চতায়। দক্ষিণ এশিয়া তো বটেই, আসিয়ান অঞ্চল, এশিয়ার মধ্যাঞ্চলের দলগুলোকেও চ্যালেঞ্জ জানাতে ভয় পায় না তারা।

Category:

বঙ্গোপসাগরে আহরণযোগ্য ৪৪৭ প্রজাতির মাছ ও চিংড়ির সন্ধান

Posted on by 0 comment

উত্তরণ ডেস্ক: বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমানায় মাছ, সামুদ্রিক প্রাণী ও সামুদ্রিক উদ্ভিদের ওপর গবেষণার জন্য সংগৃহীত গবেষণা জাহাজ ‘আরভি মীনসন্ধানী’ আগামী জুন মাস থেকে যুক্ত হচ্ছে নতুন প্রকল্পে। জাহাজটি বঙ্গোপসাগরে গবেষণা ও জরিপ চালাবে টানা পাঁচ বছর। এদিকে চলমান গবেষণা কার্যক্রমে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমানায় সর্বমোট ৪৩০ প্রজাতির আহরণযোগ্য মাছের সন্ধান মিলেছে। পাওয়া গেছে ১৭ জাতের আহরণযোগ্য সামুদ্রিক চিংড়ির সন্ধান।
‘সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ প্রজেক্ট’ নামে প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক অধীর চন্দ্র দাশ বলেন, প্রকল্পটিতে আর্থিক বরাদ্দের পরিমাণ ১ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকা। এই অর্থের ৮৫ শতাংশ দিচ্ছে বিশ্বব্যাংক এবং ১৫ শতাংশ দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। এতে প্রায় ১১ জন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা থাকবেন। ইতোমধ্যে ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন অফিসার আবদুল্লাহ আল মামুনকেও এই প্রকল্পে নিযুক্ত করা হয়েছে। নতুন প্রকল্পের অধীনে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমানায় গবেষণা ও জরিপ পরিচালনাকালে মাছ, সামুদ্রিক উদ্ভিদের পাশাপাশি নতুন ফিশিং গ্রাউন্ডের অনুসন্ধান এবং পুরনো ফিশিং গ্রাউন্ডগুলোর অবস্থাও আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হবে।
তিনি জানান, বর্তমানে গবেষণা জাহাজ আরভি মীনসন্ধানী ২০০৮-০৯ সালের ‘মেরিন ক্যাপাসিটি বিল্ডিং’ নামের একটি প্রকল্পের অধীনে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমানায় জরিপ চালাচ্ছে। এই প্রকল্পটিতে মালয়েশিয়া, অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্স (ওআইসি) এবং বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়ন রয়েছে।

Category:

নারীদের জীবনযাত্রার চালচিত্র

Posted on by 0 comment

Mfdউত্তরা ইপিজেড: জাহাঙ্গীর আলম সরকার: বাংলাদেশের উত্তর জনপদের একটি জেলার নাম নীলফামারী। যেখানে অবস্থিত উত্তরা ইপিজেড। জননেত্রী শেখ হাসিনা নীলফামারীর সাধারণ মানুষের অভাব, মঙ্গা দূর করে নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ২০০১ সালে উত্তরা ইপিজেড প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রতিষ্ঠার প্রায় ১৮ বছর পর নীলফামারীর নারীদের জীবন মানে কী রকম পরিবর্তন ঘটেছে সে বিষয়টি এই লেখার উপজীব্য। বিগত প্রায় দুই দশকে নীলফামারীর নারীদের জীবনে এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। এখানে নারীরা ক্ষমতায়িত হওয়ার পাশাপাশি আধুনিক সুযোগ-সুবিধাগুলো গ্রহণ করতে শুরু করেছে। উত্তরা ইপিজেড প্রতিষ্ঠার পূর্বে নীলফামারীতে অধিকাংশ নারীরা পরিবারের বোঝা হিসেবে পরিগণিত হতো। তারা চিহ্নিত হতো অতিরিক্ত হিসেবে। শুধু তাই নয়, বরং তাচ্ছিল্যের শিকার হতো প্রতিনিয়ত।
নীলফামারীতে ইতোমধ্যে নারী জীবনের এই দীর্ঘ স্থিতাবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। ইপিজেডসহ নানা শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় নীলফামারীর আর্থ-সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনের পাশাপাশি এ অঞ্চলের নারীদের ক্ষমতায়িত করা সম্ভব হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে, গত এক দশক ধরে নীলফামারীর সমাজে রাজনৈতিক এবং আর্থ-সামাজিক অধিকার অর্জনের জন্য যে প্রচেষ্টা চলছে, নারীমুক্তি অর্জন তার অন্যতম। শেইলা রাওবোথাম বলেছেন, ‘নারীর ইতিহাস ছিল লুকিয়ে’; কিন্তু সাম্প্রতিককালে নারী ক্রমশ সবক্ষেত্রেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছেন (দি পলিটিক্যাল রিডার ইন জেন্ডার স্টাডিজ ১৯৯৪:১)। ইদানীং নীলফামারীর প্রান্তিক এলাকাতেও এর প্রভাব ব্যাপকভাবে অনুভূত হচ্ছে। নীলফামারীতে নারীরা এখন আর ঘরে বসে নেই; বরং দলবল নিয়ে ছুটছে। সকালবেলা নারীদের ছুটে চলার দীর্ঘ লাইন দেখে সেটি সহজেই অনুমান করা যায়।
উত্তরা ইপিজেড বদলে দিচ্ছে নীলফামারীর নারীদের জীবনের চালচিত্র। এখানে বর্তমানে কর্মসংস্থান প্রায় ৩২ হাজার নারী-পুরুষের। বিগত ১০ বছরে নীলফামারীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে উত্তরা ইপিজেড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় এ অঞ্চল থেকে মঙ্গা দূর হয়েছে। উত্তরা ইপিজেড ও পার্শ্ববর্তী এলাকার জনগণের আগে দৈনিক গড় উপার্জন ছিল ৪০ টাকা বা তার নিচে। কিন্তু ইপিজেড স্থাপনের ফলে এ এলাকার মানুষের বর্তমান দৈনিক গড় উপার্জন ২৮০-৩২০ টাকায় পৌঁছেছে। এখানে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে মজুরি-ভাতা বাবদ প্রতিমাসে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। অর্থপ্রবাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতিতে অন্যান্য ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ইপিজেডের সার্বিক কর্মকা- বৃদ্ধি পাওয়ায় ইপিজেড সংলগ্ন এলাকায় বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার পাশাপাশি প্রচুর বাণিজ্যিক ও আবাসিক ভবন গড়ে উঠছে। গত দুই দশকে বাংলাদেশের সামাজিক অবকাঠামোর প্রতিটি স্তরে ব্যাপক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে, যেখানে বেঁচে থাকার জন্য আর নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতির লক্ষে মানুষকে একাধিক পন্থায় উপার্জনের পথ অনুসন্ধানে নিরন্তর ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে।
হিমালয়ের পাদদেশের সমতল ভূমির মানুষগুলোর একাংশের বসবাস কৃষিনির্ভর নীলফামারীতে। অনাদিকাল থেকে কৃষিনির্ভর নীলফামারী সম্প্রতি শিল্পায়নের দিকে ঝুকেছে। ফলে কৃষিনির্ভর নীলফামারীর অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা সংযোজন হয়েছে। সংগত কারণেই নীলফামারীর অর্থনীতি বদলে যাচ্ছে। বিষয়টি অর্থনীতির হলেও এর প্রতিক্রিয়া শুধু অর্থনীতির ভাবুক মহলে সীমাবদ্ধ নেই। থাকার কথাও নয়। কেননা যে কোনো সমাজে অর্থনীতি হচ্ছে সমাজের মূলভিত্তি। নীলফামারীও এর ব্যতিক্রম নয়। এই মূলভিত্তিকে কোনো পরিবর্তন অবশ্যই আর্থ-সামাজিক অবস্থা ও চিন্তাচেতনার উপরি কাঠামোতে প্রভাব ফেলবে। নীলফামারীর সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় তা-ই ঘটেছে। বর্তমানে নীলফামারী জেলার বদলে যাওয়া অর্থনীতি জানান দিচ্ছে অতীতের মঙ্গাপীড়িত নীলফামারী এখন একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দিকে ধাবমান।
নীলফামারী জেলার অর্থনীতির এই ইতিবাচক পরিবর্তন নীলফামারীর সমাজের প্রচলিত অন্যান্য ক্ষেত্রের ওপর প্রভাব ফেলেছে। এই জেলায় সব শ্রেণি বা পেশার মানুষই ভালো বা মন্দভাবে প্রভাবিত হয়েছে, এমনকি শিল্প সংস্কৃতির চিন্তায়ও পড়েছে মুক্তবাজারের ছায়া। যে কবি এতদিন শুধু পৃথিবীর রূপ, রং বা প্রিয়ার সৌন্দর্য নিয়ে কাব্য রচনা করতেন, তিনিও আজ অর্থনীতি নিয়ে লিখতে শুরু করেছেন, ব্যবসায়ীরা নতুন করে হিসাব মেলানোর চেষ্টা করছেন, রাজনীতিবিদরা নতুন উপায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। ফলে আলোচ্য নিবন্ধের উদ্দেশ্য নীলফামারীর অর্থনীতিতে ও নারীজীবনে উত্তরা ইপিজেডের প্রভাব। উত্তরা ইপিজেড নীলফামারী জেলার অর্থনীতিতে নতুন এক মাত্রা সংযোজন করার পাশাপাশি নীলফামারীর নারীদের জীবনে গুণগত পরিবর্তন আনতে পেরেছে। এখন নারীরা ঘর থেকে বেরিয়ে অফিসে বসে কাজ করছে, পরিবারের জন্য বাড়তি আয় রোজগার করছে। এখন তারা কর্মব্যস্ত দিন কাটায়।
প্রতিদিন সকালে নীলফামারীতে হাজার হাজার নারী সাইকেল ও ভ্যানে উত্তরা ইপিজেডের দিকে ছুটে চলে। এই নারীদের কাজে আসার চিত্রই বলে দেয় নীলফামারীর নারীরা এখন আর পরনির্ভরশীল নয়। নীলফামারীর অর্ধেক জনগোষ্ঠী, যারা অনাদিকাল থেকেই শুধুমাত্র সংসারের কাজ করেছেন মজুরি ছাড়াই। সেই নারীরাই আজ প্রতিমাসে রোজগার করছেন। নারীদের এই রোজগার পরিবারের শিশুদের উন্নত ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে কাজ করে যাচ্ছে। নারীরা উপার্জনক্ষম হওয়ায় পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারছেন। ফলে নীলফামারীতে একটি জেন্ডারবান্ধব শক্তিশালী কাঠামো সৃষ্টি হচ্ছে। এটাই হচ্ছে বদলে যাওয়া নীলফামারীর বর্তমান চিত্র।
অথচ মাত্র দুই যুগ পূর্বেও এখানকার নারীরা বাড়ির বাইরে বের হতো না। পরপুরুষের সাথে কথা বলত না। উন্নয়নে নীলফামারীর নারীরা আজ উত্তরা ইপিজেডে কাজ করছেন, ফলে বদলে যাচ্ছে এখানকার জীবনধারা। এই বদলে যাওয়ার মধ্যে একটি ইতিবাচক বার্তা রয়েছে। ধীরে ধীরে নারীর ক্ষমতায়নে নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেড রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। পিছিয়ে পড়া এ অঞ্চলের মেয়েরা কাজের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থার পরিবর্তনের সুযোগ পেয়েছে। নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি তারা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
উত্তরা ইপিজেড নীলফামারীর নারীর জীবনের চালচিত্র বদলে দেওয়ার পাশাপাশি বদলে দিচ্ছে নীলফামারীর কৃষিনির্ভর অর্থনীতিকে। এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করে নীলফামারীর হাজার হাজার নারী ও পুরুষ নিজেদের খারাপ দিন বদলাতে পেরেছে, ভাগ্যের পরিবর্তন করতে পেরেছে। এভাবে জননেত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে হাজার হাজার নারীর ভাগ্যের পরিবর্তনের পাশাপাশি নীলফামারীর অর্থনীতির একটি ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে। আর এই পরিবর্তনটি ঘটছে নীরবে।

Category:

বাংলাদেশ

Posted on by 0 comment

পেট্রল পাম্প থেকে বেরিয়ে গাড়ি ছুটতে শুরু করল আবার। রিয়াজের চোখে ভাসছে সন্ন্যাসীর দিঘির দৃশ্যাবলি। মসজিদের ঘাটলায় মুসল্লিদের অজু, জালাভিটায় দুই কৃষকের জল সেচা, বৌদ্ধবিহার, গেরুয়া চীবরের ভিক্ষু, বাবা জল্লাশাহর মাজার, বুড়ো খাদেম, ঘোষপাড়া, শুকোতে দেওয়া জাল, মন্দির, শ্মশান, দিঘির ঘাটে ছেলে-মেয়েদের ডুবসাঁতার, কোমরজলে দাঁড়িয়ে লোকটার সূর্যপ্রণাম।

Mfdস্বকৃত নোমান: বাবার মৃত্যুর প্রায় সতেরো বছর পর হঠাৎ একদিন রিয়াজের মনে পড়ে গেল সেসব বিকেলের কথা, নানাবাড়ি থেকে ফেরার পথে ট্রেনের জানালা দিয়ে তার বাবা প্রায়ই সন্ন্যাসীর দিঘির দিকে তর্জনির ইশারা করে বলত, ‘দেখ দেখ বাবা, ঐ দেখা যায় বাংলাদেশ।’ জানালা দিয়ে মাথাটা বের করে প্রতিবারই দিঘিটার দিকে তাকাত রিয়াজ। ততক্ষণ তাকিয়ে থাকত, যতক্ষণ না দিঘিটা গাছগাছালির আড়াল হয়ে পড়ত।
তখন তো তার বয়স কম। পাঠ্যপুস্তকে পড়ছে, আমাদের দেশের নাম বাংলাদেশ। হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানসহ নানা জাতি-গোষ্ঠীর বসবাস এই দেশে। আমরা সবাই মিলেমিশে থাকি। এই দেশে ছয় ঋতু। শাপলা আমাদের জাতীয় ফুল। দোয়েল আমাদের জাতীয় পাখি ইত্যাদি ইত্যাদি। সে ভাবতো, পাঠ্যপুস্তকে যে বাংলাদেশের কথা লেখা আছে সেই দেশটা বুঝি ঐ সন্ন্যাসীর দিঘির পাড়েই অবস্থিত। ক্লাস ফাইভ-সিক্সে ওঠার পরও দিঘিটাকেই সে বাংলাদেশ মনে করত। এইট-নাইনে পড়ার সময়ও কোথাও ‘বাংলাদেশ’ লেখা দেখলেই তার চোখে ভেসে উঠত সেই বিশাল দিঘি।
যখন বুঝতে শিখল বাংলাদেশের আয়তন ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রূপসা থেকে পাথুরিয়া পর্যন্ত এই দেশের বিস্তার, তখন তার বাবা বেঁচে নেই। বেঁচে থাকলে জিজ্ঞেস করতে পারত, প্রতিবারই নানাবাড়ি থেকে ফেরার পথে বাবা কেন ঐ দিঘিটার দিকে আঙুল তুলে কথাটি বলতো।
সেসব রঙিন বিকেলের কথা সে ভুলেই গিয়েছিল। প্রায় কুড়ি বছর ধরে সে ঢাকায়। গ্রামে যাওয়া হয় না খুব একটা। যাবে কার কাছে? বাবা-মা তো সেই কবেই মরেছে, বোনদের বিয়ে হয়ে গেছে, ভাইয়েরাও দেশ-বিদেশে চাকরি-বাকরি নিয়ে ব্যস্ত। বাড়িতে আছে শুধু এক চাচা। তার সঙ্গেও বহুদিন যোগাযোগ নেই। ব্যস্ত নগরীর ব্যস্ত মানুষ সে। প্রায় দশ বছর চাকরি করে নিজে একটা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়েছে। ওটা নিয়ে সারাক্ষণ ব্যস্ত, মাসে মাসে দেশ-বিদেশ করতে হয়, গ্রামের বাড়ির কথা তেমন মনে পড়ে না। পড়লেও সেসব বিকেলের কথা পড়ে না। অসংখ্য স্মৃতির নিচে চাপা পড়ে গেছে সেসব বিকেলের স্মৃতি। মনে হয়তো পড়েছে। কিন্তু সেদিনের মতো অত তীব্রভাবে পড়েনি। স্মৃতিটা তাকে এতটা আকুল, এতটা কাতর করেনি।
সেদিন তার ইচ্ছে হলো শৈশবের সেই হারানো রঙিন বিকেলগুলো দেখতে যাবে। মনতলা স্টেশনে নেমে কাটা ধানের মাঠ পেরিয়ে দিঘিটার কাছে গিয়ে দাঁড়াবে। কেন বাবা দিঘিটা দেখিয়ে ঐ কথাটি বলত, বোঝার চেষ্টা করবে। সময় থাকলে গ্রামে গিয়ে বাবা-মায়ের কবর জেয়ারত করে আসবে। বাবার প্রতি তেমন টান ছিল না তার। পুলিশের চাকরি ছিল বাবার। বছরের বেশিরভাগ সময় বাড়ির বাইরে থাকতে হতো। সংসার সামলাতো মা। বাবার মৃত্যুর পর তেমন কাঁদে-টাঁদেওনি রিয়াজ। এখনও যে বাবার স্মৃতি খুব একটা মনে পড়ে, তা নয়।
পরদিন ভোরে রওনা হয়ে গেল। ছেলেটার পরীক্ষা, কানিজা ব্যস্ত ছেলেকে নিয়ে, নইলে তাদেরও সঙ্গে নিতে পারত। ছেলেকে স্কুলে নিতে হবে, তাই ড্রাইভারকেও নিতে চায়নি। কানিজা বলল, লংড্রাইভে যাচ্ছ, ড্রাইভারকে নিয়ে যাও। আমরা সিএনজি অটোরিকশায় যাতায়াত করতে পারব।
বেলা এগারোটা নাগাদ জেলা শহরে পৌঁছে গেল রিয়াজ। ভেবেছিল গাড়িটি শহরের কোথাও রেখে শৈশবের সেই লোকাল ট্রেনে চড়ে মনতলা স্টেশনে যাবে। তার খেয়ালেই ছিল না অব্যাহত লোকসানের অজুহাতে রেলপথটি সেই কবে বন্ধ করে দিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। অগত্যা গাড়ি নিয়েই যেতে হলো।
জেলা শহর থেকে মনতলা এক ঘণ্টার পথ। দুপুর বারোটা নাগাদ পৌঁছে গেল। স্টেশনটি আগের মতো নেই। যাত্রী বিশ্রামাগার এবং টিকিট কাউন্টারের লাল দালানটিতে শ্যাওলা ধরেছে, প্লাটফর্মের ইটগুলোতে ঘাস গজিয়েছে। এখানে-ওখানে গোবর, নাদি। রেললাইনগুলোও জংয়ে ধরে লাল, কাঠের সিøপারগুলো চুরি হয়ে গেছে, যেগুলো আছে পচে গলে মাটির সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। লোহার সাইনবোর্ডটির ‘মনতলা স্টেশন’ লেখাটি মুছে গেছে। বাংলা সিনেমা এবং বার্ষিক ওয়াজ ও দোয়ার মাহফিলের কয়েকটি পোস্টার সাঁটা সেখানে। চারদিকে কেমন ভুতুড়ে শূন্যতা। স্টেশনের পেছনে শুকিয়ে যাওয়া খালটার ওপারে মনতলা বাজার। সারাক্ষণ সরগরম। কিন্তু স্টেশনের দিকে লোকজন আসে না তেমন।
সন্ন্যাসীর দিঘি যাওয়ার একটা কাঁচা রাস্তা আছে স্টেশনের উত্তরে। কাঁচা হলেও গাড়ি চলাচলের মতো। কিন্তু গাড়ি নিল না রিয়াজ। প্লাটফর্মের কাছে পার্ক করে রেখে ড্রাইভারকে নিয়ে মাঠে নামল। নাড়া মাড়িয়ে, মাটির ছোট ছোট চাঙড় গুঁড়িয়ে দুজন সন্ন্যাসীর দিঘির উদ্দেশে হাঁটে। ড্রাইভার তো মহাবিরক্ত। হবে না? মাথার ওপর চৈত্রের গনগনে সূর্য, ঘামে শার্ট-প্যান্ট ভিজে যাচ্ছে। কে জানত তার স্যার এমন কা- করবে। জানলে একটা ছাতা সে অবশ্যই নিয়ে আসতো। সারাক্ষণ গাড়ির এসিতে থাকা মানুষের কি এমন কড়া রোদ সহ্য হয়?
তারা যখন সন্ন্যাসীর দিঘির পুবপাড়ের মস্ত কাঁঠাল গাছটার তলায় দাঁড়াল, একটা বাজতে তখন দশ মিনিট বাকি। রিয়াজের কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছে দরদর, তবে চোখেমুখে মুগ্ধতা। দিঘি এত বড় হতে পারে তার জানা ছিল না। কখনও দেখেনি। দৈর্ঘ্য-েপ্রস্তে প্রায় দেড় মাইল তো হবেই। চারদিকটা চক্কর দিতে গেলে এক ঘণ্টায় কুলোবে না। উত্তর তীরে ধানের জালাভিটা। দুই কৃষক দোলনা সেচনি দিয়ে জালাভিটায় জল সেচছে। উত্তর-পূর্ব কোণে মোল্লাপাড়া, প্রায় চল্লিশ গিরি মুসলমানের বসতি। ঐ কোণায় একটা শানবাঁধানো ঘাট। ঘাটের কাছেই প্রাচীন কালের মসজিদ। গাছগাছালির ফাঁকে গম্বুজগুলো দেখা যাচ্ছে। মসজিদের মাইকটা বেজে উঠল। আজান হাঁকা শুরু করল মুয়াজ্জিন। মুসল্লিরা অজু করতে ঘাটলায় নামছে।
কাঁঠালতলা থেকে হাঁটতে হাঁটতে তারা মসজিদের শানবাঁধানো ঘাটের কাছে এলো। ড্রাইভার নামাজি। ক্বাজা করে না এক ওয়াক্তও। ঘাটলায় নেমে অজু করে মসজিদে ঢুকে গেল সে। ধর্মকর্মে মতি নেই রিয়াজের। দুই ঈদ, শবেবরাত ও শবেকদরের রাত ছাড়া মসজিদে যাওয়া হয়ে ওঠে না। ঘাটলায় নেমে ভালো করে হাত-মুখ ধুয়ে উত্তরের পাড় ধরে সে দিঘির উত্তর-পশ্চিম কোণায় গেল। ওদিকে পশ্চিমপাড়া। বৌদ্ধপাড়াও বলে কেউ কেউ। প্রায় কুড়ি গিরি বৌদ্ধের বসতি। গোটা উপজেলায় এছাড়া আর কোনো বৌদ্ধবসতি নেই। দিঘির ঐ কোণায় একটা বৌদ্ধমন্দির। দুই ভিক্ষু স্নানে এসেছে ঘাটে। খালি পা, মু-ানো মাথা, গায়ে গেরুয়া চীবর। তাদের সঙ্গে কথা বলে মন্দিরে ঢুকল সে। পুরনো মন্দির। ভেতরে গৌতম বুদ্ধের একটা পেতলের মূর্তি। বারান্দায় একটা কাঠের চেয়ারে বসে এক ভিক্ষু হাতপাখার বাতাস করছে। তার সঙ্গে খানিকক্ষণ কথা বলে মন্দিরটা দেখেটেখে বেরিয়ে এলো রিয়াজ।
দিঘির পাড়ে উঠে দক্ষিণে নজর করে দেখল জমিনের মাঠে গরু-ছাগল চরছে। ছাতা মাথায় কৃষকেরা দূরদূরান্ত থেকে ফিরছে। পশ্চিম পাড় ধরে সে হাঁটা ধরল দিঘির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণার দিকে, যেখানে মস্ত একটা শিরীষগাছ। গাছটার তলায় বাবা জল্লাশাহর মাজার। শৈশবে বাবার মুখে কত শুনেছে জল্লাশাহ দরবেশের নাম। বাবা তার ভক্ত ছিল। ছুটিছাটায় বাড়ি এলে জল্লাশাহর মাজারে ঘুরে যেত। জল্লাশাহ ইন্তেকাল করেছেন বহু বছর আগে, রিয়াজের জন্মেরও আগে। জীবৎকালে সারাক্ষণ ঐ শিরীষতলায় বসে থাকতেন। দূর-দূরান্ত থেকে চাল-ডাল-হাঁস-মুরগি ইত্যাদি হাদিয়া তোহফা নিয়ে ভক্ত-শিষ্যরা আসত। তার ইন্তেকালের পর ভক্তের সংখ্যা আরও বেড়েছে। বাড়বে না? এই যে শত বছর ধরে শিরীষগাছটা বেঁচে, এটা কার কেরামতি? সন্ন্যাসীর দিঘির জল যে কখনও শুকায় না, এটাই-বা কার কেরামতি? পূর্ণিমা রাতে দিঘির বিশাল বিশাল মাছেরা যে লাফ-ঝাঁপ মেরে ডাঙায় উঠতে চায়, এটা কার ইশারা? বড় কামেল পীর জল্লাশাহ। তারা ইশারা ছাড়া এই তল্লাটে কিছুই ঘটে না।
শিরীষগাছটার নিচু শাখাগুলো লাল সুতোয় ঢাকা। ভক্ত-শিষ্যরা এলে সুতো বেঁধে যায়। তাদের বিশ্বাস, এই ইচ্ছেপূরণ গাছে সুতো বাঁধলে ইচ্ছে পূরণ হয়। জল্লাশাহর পাকা কবরটা লালসালুতে ঢাকা। সালুর ওপর লম্বা দুটো কাগজের ফুল। মাজারের বারান্দায় পাকা মেঝেতে বসে হাওয়া খাচ্ছে বুড়ো খাদেম। তার হাতে পাঁচশ টাকার একটা নোট দিল রিয়াজ। চিকচিক করে উঠল খাদেমের মুখখানা। ইতস্তত বলল, ‘আমাকে নয়, দানবাক্সে ফেলুন।’ রিয়াজ বলল, ‘এটা আপনি রাখুন। দানবাক্সে আমি দিচ্ছি।’
ততক্ষণে নামাজ শেষ করে মাজারের শিরীষতলায় পৌঁছেছে ড্রাইভার। তাকে নিয়ে দিঘির দক্ষিণে ঘোষপাড়ার দিকে হাঁটা ধরল রিয়াজ। ঘোষপাড়া, কিন্তু বাস জেলে-মালোদের। প্রায় পঁচিশ গিরি হিন্দু জেলে-মালো, মাছ ধরাই যাদের পেশা। পাড়ার এখানে-ওখানে বড় বড় জাল শুকাতে দেওয়া। পাড়ার পেছনে মা রক্ষা কালীমন্দির। মন্দিরের বাঁয়ে ঘোষপাড়ার শ্মশান। দিঘির দক্ষিণ-পূর্ব কোণায় স্নানঘাট। স্নান করতে কেউ ঘাটে যাচ্ছে, কেউ স্নান সেরে ফিরছে। একদল ছেলেমেয়ে সাঁতার কাটছে দিঘিতে। ঘাটে তিন মহিলা কাপড় কাঁচছে। গামছা কাঁধে স্নান করতে নেমেছে মাঝবয়সী দুটি লোক। কোমরজলে দাঁড়িয়ে একটা লোক জলশুদ্ধির মন্ত্র পড়ছে। এক কোষ জল নিয়ে গঙ্গা, যমুনা, গোদাবরী, সরস্বতী, নর্মদা, সিন্ধু, কাবেরী… এই সপ্ত পবিত্র নদীদেবীকে আহ্বান করে জলকে শুদ্ধ করে মাথায় দিয়ে তীর্থস্নানের ফল নিল। তারপর দুই হাত জোড় করে প্রাণের উৎস সূর্যকে প্রণাম করল। লোকটার সূর্যপ্রণামের দৃশ্য দেখার সময় রিয়াজের চোখ গেল উত্তর-পূর্ব কোণায় প্রাচীন মসজিদে গম্বুজের চূড়ায়। একটা লোহার পাত চকচক করছে রোদে।
এইসব দৃশ্য দেখতে দেখতে আবার কাঁঠালতলায় ফিরে এলো তারা। কাঁঠাল গাছটার উত্তরে মুসলমানদের গোরস্তান। খাঁ-খাঁ শূন্যতা। একটা গুইসাপ দিঘি থেকে উঠে গোরস্তানের বাঁশঝাড়ে ঢুকছে। ড্রাইভারের চোখ গোরস্তানের দিকে স্থির। গোরস্তান দেখে হয়তো মরহুম বাবা-মা বা আত্মীয়-স্বজনের কথা মনে পড়ে গেছে। চোখ দুটো কেমন উদাস।
রিয়াজের সারাশরীর ভিজে গেছে ঘামে। কাঁঠালতলায় একটা বাঁশের মাচায় বসে বাবার কথা ভাবছে সে। বাবার সেই কথাটা কানে ভাসছে, ‘ঐ দেখা যায় বাংলাদেশ।’ এত বছর পরেও বুঝে উঠতে পারছে না বাবা কেন দিঘিটা দেখিয়ে এই কথাটি বলতো।
কাটা ধানের মাঠ ধরে আবার তারা স্টেশনে পৌঁছল। মনতলা স্টেশন থেকে রিয়াজের গ্রামের বাড়ির দূরত্ব প্রায় আট মাইল। রাস্তা পাকা হয়েছে এখন, পৌঁছতে কুড়ি মিনিটের বেশি লাগবে না। চাচাকে ফোন করে বলেছে বাড়ি যাবে। বারবার ফোন দিচ্ছে চাচা। ভাতিজার জন্য বাজার থেকে গরুর মাংস নিয়েছে, ঘরের পালা মোরগ জবাই দিয়ে রোস্ট করেছে, পুকুরে জাল মেরে তেলাপিয়া মাছ তুলেছে। বারোটায় রান্নাবাড়া শেষ করে তার অপেক্ষায় বসে আছে চাচি।
খাওয়া-দাওয়া সারতে সারতে প্রায় সাড়ে চারটা বেজে গেল। রিয়াজ চেয়েছিল আজই ঢাকায় ফিরে যাবে। গ্রামকে সে ভালোবাসে, কিন্তু গ্রামে এসে থাকতে পারে না। সবচেয়ে বেশি অসুবিধায় পড়তে হয় টয়লেট নিয়ে। গ্রামের টয়লেটে তার পোষায় না। মনে হয় সাতবার গোসল করলেও শরীরটা পবিত্র হবে না। একবার রাজশাহীতে এক বন্ধুর বাড়ি গিয়ে এক রাত ছিল। রাতে পায়খানার বেগ পেলে লেট্টিনে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে বেগটা হাওয়া! চাচা বলল, ঘরের পেছনে বাথরুম আছে, গত বছর টাইল্স বসিয়েছি, তোর কোনো অসুবিধা হবে না, একটা রাত থেকে যা বাবা।
থেকে গেল রিয়াজ। প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত চাচা-চাচি আর চাচাতো ভাই-বোনদের সঙ্গে গল্প করে ঘুমাতে গেল। বিছানায় শুতে যাওয়ার আগে সেগুন কাঠের আলমিরাটা দেখে শৈশবটা হানা দিল অতর্কিতে। তার বাবার স্মৃতিধন্য আলমিরা। বাবা তার বইপুস্তকগুলো এটাতে রাখত। মা চাইত সংসারের টুকিটাকি জিনিসপত্র রাখতে, বাবা দিত না। বলতো, এটা বই রাখার জন্য বানিয়েছি, বই ছাড়া আর কিছু রাখা যাবে না।
আলমিরাটার উপরের তাকে কয়েকটা বই এখনও আছে। কাচের দরজাটা খুলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ভারতবর্ষ’ বইখানা হাতে নিল রিয়াজ। ধুলো-ময়লা ঝেড়ে চুমু খেয়ে কপালে ঠেকাল। চোখ থেকে গড়িয়ে পড়তে লাগল বেদনার অশ্রু। বইটাতে লেগে আছে বাবার হাতের পরশ। যেন সে বাবাকে স্পর্শ করছে। বাবার ঘ্রাণ ঝাপটা দিচ্ছে নাকে। বইটা বুকে চেপে ধরে সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
ভোরে ঘুম থেকে উঠে দ্বিতীয়বার বাবা-মায়ের কবর জেয়ারত করল। চাচি তার জন্য পাকন, পাটিসাপটা আর নারকেলি পিঠা বানিয়েছে। কতদিন খায় না এসব পিঠা! পালা-পার্বনে রাত জেগে তার মা এসব পিঠা বানাতো। যেন মায়ের হাতের ছোঁয়া লেগে আছে পিঠাগুলাতে। সে চোখ মুছতে মুছতে খায়। তার কাঁন্না দেখে তার চাচা কাঁদে, চাচিও কাঁদে। বিদায়ের সময় চাচাকে জড়িয়ে ধরে অনেকক্ষণ কাঁদল রিয়াজ। বয়স হয়েছে চাচার, কদিন বাঁচবে ঠিক নেই। আর কি কখনও দেখা হবে? চাচিকে কদমবুচি করল। চাচি তার মাথায় মায়ার হাত বুলিয়ে দিল। তারপর গাড়িতে উঠে বসল সে। গাড়িটা যখন রাস্তার বাঁকে পৌঁছল, পেছনে তাকিয়ে দেখল তখনও হাত নাড়ছে তার চাচা-চাচি। বুকটা হু-হু করে উঠল তার। মনতলা বাজার পৌঁছা পর্যন্ত অশ্রু থামল না।
ছুটির দিন। মহাসড়কে যানবাহনের সংখ্যা কম। রাস্তা ফাঁকা পেয়ে ঝড়ের বেগ তুলল ড্রাইভার। সিটে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল রিয়াজ। প্রায় আধাঘণ্টা ঘুমাল। আরও ঘুমাত, যদি না ড্রাইবার ডাকত। পেট্রল পাম্প থেকে তেল নিতে হবে, টাকা দরকার।
পেট্রল পাম্প থেকে বেরিয়ে গাড়ি ছুটতে শুরু করল আবার। রিয়াজের চোখে ভাসছে সন্ন্যাসীর দিঘির দৃশ্যাবলি। মসজিদের ঘাটলায় মুসল্লিদের অজু, জালাভিটায় দুই কৃষকের জল সেচা, বৌদ্ধবিহার, গেরুয়া চীবরের ভিক্ষু, বাবা জল্লাশাহর মাজার, বুড়ো খাদেম, ঘোষপাড়া, শুকোতে দেওয়া জাল, মন্দির, শ্মশান, দিঘির ঘাটে ছেলে-মেয়েদের ডুবসাঁতার, কোমরজলে দাঁড়িয়ে লোকটার সূর্যপ্রণাম।
এই দৃশ্যাবলির ফাঁকে ফাঁকে ভেসে ওঠে বাবার মুখখানা, তার উত্তোলিত আঙুলখানা। অঙুলি নির্দেশ করে বাবা বলছে, ‘দেখ দেখ বাবা, ঐ দেখা যায় বাংলাদেশ।’ কেন বলতো বাবা কথাটা? সত্যি সত্যি বলতো, না-কি তার সঙ্গে দুষ্টুমি করতো? এতটা বছর কেটে গেল, এত বড় হলো রিয়াজ, অথচ বাবার কথাটি এখনও বুঝতে পারল না। কে জানে কী রহস্য লুকিয়ে কথাটায়।
পাশের সিটে রাখা ‘ভারতবর্ষ’ বইটি হাতে নিল রিয়াজ। বাবার স্মৃতিধন্য বইটি সে ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছে। যতœ করে রাখবে। কালি-ময়লায় বিবর্ণ হয়ে পড়েছে। একটা টিস্যু দিয়ে বইটা আরেক দফা মুছে পাতা উল্টাল। কয়েক পাতা পড়ে আবার পাতা উল্টালে ‘বিজয়া-সম্মিলন’ প্রবন্ধটির একটা জায়গায় চোখ আটকে গেল। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘চিত্তকে প্রসারিত করো। যে চাষি চাষ করিয়া এতক্ষণ ঘরে ফিরিয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো, যে রাখাল ধেনুদলকে গোষ্ঠগৃহে এতক্ষণ ফিরাইয়া আনিয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো, শঙ্খমুখরিত দেবালয়ে যে পূজার্থী আগত হইয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো, অস্তসূর্যের দিকে মুখ ফিরাইয়া যে মুসলমান নামাজ পড়িয়া উঠিয়াছে তাহাকে সম্ভাষণ করো। আজ সায়াহ্নে গঙ্গার শাখা-প্রশাখা বাহিয়া ব্রহ্মপুত্রের কূল-উপকূল দিয়া একবার বাংলাদেশের পূর্বে পশ্চিমে আপন অন্তরের আলিঙ্গন বিস্তার করিয়া দাও…।’
লেখাটা পড়া শেষ করে বাইরে তাকাল রিয়াজ। রৌদ্রতাপে পুড়ছে প্রকৃতি। গাড়ি ছুটছে শাঁই শাঁই। দৃশ্যের পর দৃশ্য মুছে যাচ্ছে। তার চোখে-মুখে বিচলিত ভাব জেগে উঠল হঠাৎ। শ্বাস-প্রশ্বাস ঘন হয়ে উঠতে লাগল। বাবার সেই কথাটির অর্থ সে খুঁজে পেয়েছে। চোখের সামনে আবার ভেসে উঠছে সন্ন্যাসীর দিঘির চারপাশের সেই দৃশ্যাবলি। কল্পচোখে সে দেখতে পায়, তর্জনীর ঈশারায় তার বাবা তাকে বলছে, ‘দেখ দেখ বাবা, ঐ দেখা যায় বাংলাদেশ।’

Category:

কৃষি যন্ত্রপাতিতে ভর্তুকীকরণ নিশ্চিত

Posted on by 0 comment

Mfdরাজিয়া সুলতানা:  কৃষিপ্রধান বাংলাদেশ। কৃষি ও কৃষকের অগ্রগতি-উন্নয়নের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশের সমৃদ্ধি। তাই স্বাভাবিক কারণেই কৃষি যন্ত্রপাতিতে ভর্তুকি দিচ্ছে কৃষিবান্ধব সরকার। উদ্দেশ্য কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। তা ২০৩০ সালের মধ্যে। পরিকল্পিত উৎপাদন বাড়ানোর সাথে সাথে কৃষকের আয় বাড়ানো। কৃষিতে এটা করতে প্রযুক্তির বিকল্প নেই। কৃষিতে আধুনিক যান্ত্রিকীকরণের জন্যই সরকার বিভিন্ন সময় বিভিন্ন হারে কৃষি যন্ত্রপাতিতে ভর্তুকি দিচ্ছে। ফলে কৃষকসমাজ আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে।
সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশের প্রধানতম সম্পদ উর্বর জমি, আলো, বাতাস, পানি। সাথে ঋতুবৈচিত্র্য। ফলে বাংলার কৃষি প্রকৃতির আশীর্বাদপুষ্ট। দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ লোক বিভিন্নভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। মোট উৎপাদনের প্রায় ২৪ শতাংশ আসে কৃষি থেকে। কৃষি প্রবৃদ্ধির হার ৪ শতাংশ। সবুজ বিপ্লবের ফলে স্বাধীনতার পর ফসলের ফলন বেড়েছে কয়েকগুণ। কৃষির অন্যান্য শাখা তথা পোল্ট্রি, গবাদিপশু ও মৎস্য চাষেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের জনসংখ্যা ক্রমবর্ধমান। ফলে কমছে কৃষি জমি। বাড়ছে শিল্প, পরিবহন, নির্মাণ ও অন্যান্য খাত। কৃষি শ্রমিকরা স্থানান্তরিত হচ্ছে ওই সব সেক্টরে। সৃষ্টি হচ্ছে শ্রমিক সংকট। বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (ঋঅঙ) তথ্য অনুযায়ী, কৃষি শ্রমিকের সংখ্যা ২০২০ সাল নাগাদ ৪৩ থেকে ৩৬ শতাংশে নেমে আসবে। আর এ জন্যই আধুনিক ও বাণিজ্যিক কৃষির প্রয়োজনে দেশে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ অপরিহার্য। এটা একটি প্রযুক্তি। কৃষি সেক্টরের উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বীজ, সার ও কীটনাশক, পানি ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি যন্ত্রপাতিই মূলত দেশে ব্যবহৃত কৃষি প্রযুক্তি। এর মধ্যে কৃষি যন্ত্রপাতি তথা কৃষি যান্ত্রিকীকরণ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি। যান্ত্রিকীকরণের ফলে ফসল উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাচ্ছে। ফসল লাগানোর মধ্যবর্তী সময় কমে যাচ্ছে। কৃষকরা দুটো ফসলের স্থানে ৩টি ফসল অনায়াসেই করতে পারছে। এমনকি সুনির্দিষ্ট শস্য বিন্যাস ও স্বল্প জীবনকালের ফসল নির্বাচন করে যন্ত্র ব্যবহারের মাধ্যমে বছরে ৪টি ফসল পর্যন্ত করা সম্ভব হচ্ছে। বর্তমানে দেশে জমি তৈরির ৯০ শতাংশ কাজ পাওয়ার টিলার বা ট্রাক্টর দিয়ে করা হচ্ছে। সার প্রয়োগ ও আগাছা দমনের কাজেও যন্ত্রের ব্যবহার শুরু হয়েছে এবং দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। মাড়াই যন্ত্র বিশেষ করে ধান, গম ও ভুট্টাসহ সকল দানাদার ফসল মাড়াই কাজে মাড়াই যন্ত্র প্রায় ৯৫ শতাংশ ব্যবহার হচ্ছে। এ ছাড়াও বীজ বপন যন্ত্র দ্বারা ফসল মাঠে বুনলে বীজ ২০ শতাংশ সাশ্রয়ের পাশাপাশি সার ১৫-২০ শতাংশ সাশ্রয় হয়। অন্যদিকে ফসলের উৎপাদনও ১২-৩৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে কৃষকের মোট আয় বেড়ে যায় ২৯-৪৯ শতাংশ। কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ফলে ফসলের উৎপাদন খরচ অনেকাংশে, একই সাথে ফসলের নিবিড়তা ৫-২২ শতাংশ বেড়ে যায়। আমরা দেখতে পাই ফসল উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কর্তনপূর্ব, কর্তনকালীন ও কর্তনোত্তর সময়ে ফসলের প্রচুর ক্ষতি হয়। বাংলাদেশে দানাশস্যে ফসল কর্তনোত্তর ক্ষতির পরিমাণ মোট উৎপাদনের ১২-১৫ শতাংশ, যা ফল ও শাক-সবজির ক্ষেত্রে প্রায় ২৫-৪০ শতাংশ। আর এই ক্ষতি হয় শুধু দক্ষ যন্ত্রপাতি ব্যবহারের অভাবে। শুধু ধান ফসল যদি যান্ত্রিক উপায়ে কর্তন করা সম্ভব হয়, তবে কৃষকদের প্রায় ৮ লাখ ৪৫ হাজার টন ধান সাশ্রয় হবে। এক গবেষণায় জানা যায়, দেশে প্রতিবছর প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার খাদ্যশস্য নষ্ট হয়, শুধু পরিকল্পিতভাবে ফসল কর্তন, ফসল কর্তনোত্তর ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে। অন্যদিকে প্রতিনিয়তই সৃষ্টি হচ্ছে কৃষি কাজে শ্রমিকের অভাব। তাছাড়া আকস্মিক বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত অর্থাৎ বৈরী আবহাওয়ার কারণে কৃষকরা সঠিক সময়ে কৃষি কার্যাদি সম্পন্ন করতে পারে না। উপরিউক্ত তথ্যাদি বিচার বিশ্লেষণে কৃষকদের কৃষিকাজে যন্ত্র ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই।
কৃষি যান্ত্রিকীরণে কৃষককে আরও উদ্বুদ্ধ করার জন্য আমাদের চৌকস সরকার কৃষিনীতিতে আনলেন পরিবর্তন। গ্রহণ করলেন বিভিন্ন প্রকল্প। জেলা, উপজেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে কৃষি অফিসের মাধ্যমে শুরু করলেন কৃষককে যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ভর্তুকি সহায়তা। ভর্তুকির পরিমাণ অবস্থা বিশেষে সারাদেশে বিভিন্ন মেশিনের ওপর ৫০ শতাংশ এবং দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা ও হাওড় অঞ্চলে ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ। এ জন্য খামার যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি দ্বিতীয় পর্যায় শীর্ষক প্রকল্পকাজ করছে।
এলাকা বিশেষে কৃষক কোম্পানি কর্তৃক নির্ধারিত মূল্যের মাত্র ৩০ শতাংশ অর্থ পরিশোধ করেই কৃষিযন্ত্র ক্রয়ের সুযোগ পাবেন। অর্থাৎ হাওড় ও দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকরা এখন থেকে ১ লাখ টাকা মূল্যের কৃষিযন্ত্র ক্রয় করতে পারবেন মাত্র ৩০ হাজার টাকায়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর থেকে দেশের প্রতিটি কৃষি অফিসে এ-সংক্রান্ত নির্দেশ আছে। তাছাড়া সরকারের এই নির্দেশনা বাস্তবায়নে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কড়া নির্দেশনা আছে। একই সঙ্গে জোরদার করা হয়েছে কঠোর নজরদারি। খামার যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্পের (দ্বিতীয়) অনুযায়ী দেশের ৩০০টি উপজেলায় একটি করে কৃষক গ্রুপের মাধ্যমে ভাড়ায় কৃষিযন্ত্র সেবা পাওয়া যাচ্ছে। বাড়ানো হয়েছে খামার যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধিÑ দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রকল্পের মেয়াদ। প্রতিটি উপজেলায় চালু করা হয়েছে কৃষি যন্ত্রপাতি সেবাকেন্দ্র। তাছাড়া ব্যক্তি মালিকানা, সমবায় সমিতিও এগিয়ে এসেছে কৃষি যান্ত্রিকীকরণে। তারা সরকারের সহায়তায় কৃষি যন্ত্রপাতি কিনছে এবং নির্দিষ্ট মূল্যে ভাড়া দিচ্ছে। তবে এক্ষেত্রে সরকারের হস্তক্ষেপ জরুরি। যেমনÑ মূল্য নির্ধারণ করা, উবারের মতো অ্যাপস ব্যবহার করা, কৃষকদের কৃষি যন্ত্রপাতির ওপর ট্রেনিং দেওয়া ইত্যাদি। এতক্ষণ যেসব যন্ত্রপাতি নিয়ে কথা হলো সেগুলো হলোÑ ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, রিপার (ধান ও গম), পাওয়ার থ্রেসার, কম্বাইন হারভেস্টার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, সিডার, ফুট পাম্প, বপন যন্ত্র, বেড প্লান্টার, জমি নিড়ানি যন্ত্র, গুটি ইউরিয়া প্রয়োগ যন্ত্র, ভুট্টা মাড়াই যন্ত্র, শস্য মাড়াই যন্ত্র, ধান-গম কর্তন যন্ত্র ও শস্য ঝাড়াই যন্ত্র, ফগিং স্প্রে ইত্যাদি।
ফিরে তাকালে দেখা যায়, ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার পর দেশে কৃষি প্রযুুক্তি যান্ত্রিকীকরণে স্বর্ণযুগের আরম্ভ। ওই বছর বিদেশ থেকে আমদানিকৃত কৃষি যন্ত্রপাতির ওপর থেকে ‘কৃষি যন্ত্রপাতির মান নিয়ন্ত্রণ কমিটি’-এর শর্তগুলো শিথিল করলে দেশে পাওয়ার টিলার আমদানি বেড়ে যায়। আর এভাবে কৃষিকাজে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের স্বর্ণ যুগ শুরু হতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায়, কৃষি সেক্টরের প্রতি স্তরে রোপণ থেকে শুরু করে শস্য ঘরে উঠানো পর্যন্ত কৃষি যান্ত্রিকীকরণের বিপুল উৎসাহ বিরাজ করছে কৃষকের মধ্যে।
বিগত জুলাই ২০১০ সাল থেকে বারি, ব্রি ও ডিএই’র সম্মিলিত ‘কৃষি যন্ত্রপাতি প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প’ চালু হলেও বর্তমান সরকার কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প আরও ফলপ্রসূ করার জন্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
কৃষি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি। তাই উৎপাদন খরচ কমিয়ে উৎপাদন বাড়ানো গেলেই বাংলাদেশের কৃষি তথা সমস্ত উন্নয়নের চাকা গতিশীল থাকবে। আর তাই কৃষি যন্ত্রপাতিতে ভর্তুকি দেশের জন্য উন্নয়ন-অগ্রগতির প্রধান উৎস্য হয়ে থাকবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সোনার বাংলা গড়তে কৃষিবান্ধব আওয়ামী লীগ সরকার বদ্ধপরিকর। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২০১৯ সালের নির্বাচনী ইশতেহারেও কৃষিকে অন্যতম প্রধান খাত হিসেবে বিচেনায় নিয়ে বলা হয়েছে, ‘খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত ও কৃষি পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধি করা টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এখন খাদ্যোৎপাদন বৃদ্ধি এবং সবার জন্য খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা বিধানে এগিয়ে যাওয়া আমাদের সুদৃঢ় প্রত্যয়।’

লেখক : পিএইচডি গবেষক, প্ল্যান্ট প্যাথলজি
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

Category:

অমর একুশে গ্রন্থমেলা : নতুন বই ৪ হাজার ৮০০

Posted on by 0 comment

উত্তরণ ডেস্ক: অমর একুশে গ্রন্থমেলা শেষ হয়েছে গত ২ মার্চ। বাংলা একাডেমি চত্বর ও ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে বিশাল পরিসরে এবার মেলার আয়োজন করা হয়। প্রায় ৩ লাখ বর্গফুট জায়গাজুড়ে মেলায় অংশ নেয় ৪৯৯টি প্রতিষ্ঠান। ৩০ দিনের মেলায় প্রায় ৪ হাজার ৮০০ নতুন বই প্রকাশিত হয়েছে। বিক্রি হয়েছে আনুমানিক ৮০ কোটি টাকার বই। প্রতিবারের মতোই বাঙালি জাতিসত্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের প্রতীক বাংলা একাডেমি এ মেলার আয়োজন করে। একাডেমি প্রাঙ্গণে ১ ফেব্রুয়ারি মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একাডেমি প্রাঙ্গণে ছিল ১০৪ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। তারুণ্যের প্ল্যাটফর্ম লিটল ম্যাগাজিন চত্বরও ছিল এ অংশে। বয়ড়াতলায় ১৮০ লিটলম্যাগকে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১৫৫ স্টল। বইয়ের মূল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে। চার চত্বরে বিন্যস্ত উদ্যানে ৩৯৫ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান স্টল ও প্যাভিলিয়ন সাজায়। বাংলা একাডেমিসহ ২৪ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয় ২৪ প্যাভিলিয়ন। সব মিলিয়ে এবার মেলায় অংশ নেয় ৪৯৯ প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানগুলোকে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৭৭০ ইউনিট।

Category:

সংসদে প্রধানমন্ত্রী : রাজনীতি করি মানুষের জন্য

Posted on by 0 comment

Mfdউত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, রাজনীতি করি দেশের মানুষের জন্য, নিজের জন্য নয়। মানুষের সমস্যা জানার ও তা সমাধানের চেষ্টা করি। রাজনীতিবিদ হিসেবে এটাই আমার কর্তব্য বলে মনে করি। ক্ষমতা ভোগ করার বিষয় নয়, জনসেবার বিষয়। সেজন্যই কীভাবে দেশের মানুষের কল্যাণ করতে পারি, সে লক্ষ্য নিয়েই কাজ করে যাচ্ছি।
সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে মাদকমুক্ত দেশ ও সমাজ গড়ে তোলার ওপর সবাইকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এমপি নিজ নিজ এলাকায় কেউ যাতে মাদকাসক্ত না হয়, সে-বিষয়ে সচেষ্ট থাকতে হবে। অন্য জনপ্রতিনিধিদেরও সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সচেষ্ট থাকতে হবে। মাদক ব্যবহার, বিক্রি বা বহন এগুলো যে অপরাধ, জনগণ এ বিষয়ে এখন যথেষ্ট সচেতন।
তিনি বলেন, সরকার যাদের আত্মসমর্পণ করাচ্ছে (মাদক কারবারি), তাদের চিকিৎসা ও কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে মাদক থেকে দূরে রাখার পদক্ষেপ নিয়েছি। মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে যারা আত্মসমর্পণ করছে তাদের সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক সাহায্য দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা অন্য কোনো ব্যবসায় নিয়োজিত হয়ে ভালোভাবে চলতে পারে। এভাবে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কারণ বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার দেশে আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। দেশব্যাপী আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন, সন্ত্রাস দমন, চাঁদাবাজি রোধ ও জঙ্গিবাদ দমনে এবং মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে আমরা সর্বদা তৎপর। ইতোমধ্যে জঙ্গিবাদ দমনের সাফল্য বিশ্বে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি সংসদ অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে একাধিক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। কাজী ফিরোজ রশীদের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেখানে যেখানে মাদক চোরাচালান হয়, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে মাদক নিয়ন্ত্রণ ও চোরাচালান বন্ধে সরকার পর্যাপ্ত পদক্ষেপ নিয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ১৮ অনুযায়ী মাদক পরিবহন ও চোরাচালানের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তির (মৃত্যুদ-) বিধান রাখা হয়েছে। প্রতিটি জেলায় মাদক নিরাময় কেন্দ্র স্থাপনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

প্রতিটি গ্রামে শহরের সুবিধা
জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য মুজিবুল হক চুন্নুর প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে দেশের সকল গ্রামকে শহরের সুযোগ-সুবিধা দিতে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য এসেছে। কৃষিজ ও অকৃষিজ উভয়ক্ষেত্রে কর্মকা- বহুগুণ সম্প্রসারিত হয়েছে। ফলে গ্রামীণ পরিবারের আয় ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে অকৃষি খাতের অবদান বেড়ে চলেছে। আমাদের মূল লক্ষ্যই হলোÑ সব গ্রামে শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সকল ধরনের নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দেওয়া। তিনি বলেন, প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণ বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যতম নির্বাচনী অঙ্গীকার। এ অঙ্গীকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার গ্রামকেন্দ্রিক নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তিনি জানান, স্বাধীন দেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নগর ও গ্রামের বৈষম্য ক্রমাগতভাবে দূর করার উদ্দেশ্যে কৃষিবিপ্লব, গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতায়ন, কুটির শিল্প ও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষা, যোগাযোগ-ব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের আমূল রূপান্তর সাধনের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে অঙ্গীকার করেছিলেন। সে-লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমরা প্রতিটি গ্রামকে শহরে উন্নীত করার কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। শেখ হাসিনা বলেন, গত দুই মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের বহুমাত্রিক তৎপরতা, যেমনÑ শিক্ষা সম্প্রসারণ, কৃষি ও অকৃষি খাতে দক্ষ জনবল বাড়াতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা-প্রশিক্ষণের সুযোগ বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ, গ্রামাঞ্চলে আর্থিক সেবা খাতের পরিধি বিস্তার, কৃষি প্রযুক্তির সম্প্রসারণ, বিদ্যুতায়ন, গ্রামীণ অবকাঠামো ও যোগাযোগ-ব্যবস্থার উন্নয়ন ইত্যাদি গ্রামোন্নয়ন প্রয়াসকে ত্বরান্বিত করেছে। প্রবাসীদের প্রেরিত অর্থের প্রবাহ বৃদ্ধি গ্রামীণ অর্থনীতির এই বিকাশ প্রক্রিয়ায় সহায়ক হচ্ছে।
ঢাকার চতুর্দিকে বৃত্তাকার রেলপথ
সরকারি দলের সংসদ সদস্য দিদারুল আলমের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা মহানগরীর যানজট সমস্যা নিরসনের লক্ষ্যে গত ১০ বছরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মাধ্যমে বেশকিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং অনেক প্রকল্প এখন বাস্তবায়নাধীন। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে খুব শীঘ্রই ঢাকার যানজটমুক্ত করা হবে আশা করা যায়। আগামী দিনের পরিকল্পনার মধ্যে ঢাকা শহরের চতুর্দিকে বৃত্তাকার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পও রয়েছে। তিনি জানান, ’৩০ সালের মধ্যে ঢাকা মহানগরী ও তৎসংলগ্ন পার্শ্ববর্তী মহানগরীর সঙ্গে দ্রুতগতির আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে কমলাপুর হতে নারায়ণগঞ্জ রুটে প্রায় ১৬ কিমি দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৪ নির্মাণ, গাবতলী থেকে চট্টগ্রাম রোড পর্যন্ত ২৪ কিমি দীর্ঘ এমআরটি লাইন-২ নির্মাণ করা হবে।
পরিকল্পনার মধ্যে ঢাকা শহরের চারদিকে দুটি রিং রোড (ইনার ও মিডল) নির্মাণ, পিপিপি ভিত্তিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ, যান্ত্রিক কার পার্কিং সিস্টেম চালুকরণ, পথচারীবান্ধব সড়ক ও ফুটপাথ উন্নয়ন, আমিনবাজার হতে গাবতলী-রাসেল স্কয়ার-নিউমার্কেট হয়ে পলাশী/আজিমপুর পর্যন্ত মিরপুর রোডে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমে এলিভেটেড র‌্যাপিড ট্রানজিট বাস নির্মাণ প্রকল্প রয়েছে।

রাজধানীর পাশেই চার স্যাটেলাইট সিটি
এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজধানীর জনসংখ্যার চাপ কমানোর জন্য ইতোপূর্বে পার্শ্ববর্তী এলাকায় ৪টি স্যাটেলাইট সিটি নির্মাণের লক্ষ্যে পিপিপি পদ্ধতিতে প্রকল্প গ্রহণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। তিনি জানান, ওই ৪টি স্যাটেলাইট সিটি হচ্ছেÑ বংশী-ধামরাই স্যাটেলাইট টাউন উন্নয়ন, ধলেশ্বরী-সিংগাইর স্যাটেলাইট টাউন উন্নয়ন, ইছামতি-সিরাজদিখান স্যাটেলাইট টাউন উন্নয়ন ও সাভার স্যাটেলাইট টাউনে হাইরাইজ অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প। প্রকল্পগুলো পিপিপি পদ্ধতিতে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কার্যক্রম চলছে। এ ছাড়াও গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় রাজধানীর পার্শ¦বর্তী এলাকায় ৪টি স্যাটেলাইট সিটি, ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণে রাজউকের দুটি এবং গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ঢাকার পশ্চিমে ও দক্ষিণে দুটি প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

Category: