Blog Archives

সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স

2-6-2019 8-33-23 PM

সিএনএন নিউজ ১৮-এর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা

উত্তরণ প্রতিবেদন: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ, নির্বাচন সম্পর্কে বিরোধী দল এবং কিছু বিদেশি সরকার ও এনজিওর অভিযোগ, ভবিষ্যতে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কসহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যম সিএনএন নিউজ ১৮-এর সঙ্গে কথা বলেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথোপকথনে অংশগ্রহণ করেন গণমাধ্যমটির ডেপুটি নির্বাহী এডিটর জাকা জ্যাকব। গত ২০ জানুয়ারি গণমাধ্যমটি তাদের ফেসবুক পেজে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে হওয়া এই কথোপকথনের ফুটেজটি প্রকাশ করে।
প্রশ্ন : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
শেখ হাসিনা : টানা তৃতীয়বারের মতো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনের সুযোগ দেয়ার সর্বপ্রথম আমি আমার জনগণকে ধন্যবাদ দিতে চাই। মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আওয়ামী লীগ গঠিত হয়েছিল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এই দল এদেশের মানুষকে সংগঠিত করে এবং আমরা স্বাধীনতা অর্জন করি। কাজেই মানুষের কাছে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। মানুষ এটা বুঝতে পেরেছে যে শুধু এই দল ক্ষমতায় এলে দেশের উন্নতি হয়।
প্রশ্ন : ভারতীয় উপমহাদেশে একটা কথা প্রচলিত আছে যে ক্ষমতাসীন দলের প্রতি দেশের জনগণ ক্ষুব্ধ থাকে। কিন্তু আপনি টানা তৃতীয়বারের মতো নির্বাচিত হলেন। আপনার এই জয়ের কারণ কী বলে মনে করেন আপনি?
শেখ হাসিনা : দেখুন, ক্ষমতাসীন দল যদি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করতে পারে, তবে তাদের ক্ষুব্ধ হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আমরা আমাদের জনগণের ভালোর জন্য কাজ করেছি বলেই, তারা আমাদের গ্রহণ করেছে। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর এদেশের মানুষ সেনা অভ্যুত্থান, স্বৈরতন্ত্র, স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, অর্থপাচার, সন্ত্রাসবাদ দেখেছে। একটা পর্যায়ে যখন তারা বুঝতে পারল যে ক্ষমতায় এলে শুধু আওয়ামী লীগ দেশের জন্য কাজ করে, তখন তারা আমাদের প্রত্যাখ্যান করেনি। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বাংলাদেশের জনগণ খুবই সচেতন। তারা তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন। যদি আমরা ভুল কিছু করতাম, তবে তারা অবশ্যই আমাদের ভোট দিত না।
প্রশ্ন : বিরোধী দল, কিছু আন্তর্জাতিক এনজিও এবং বিদেশি সরকার এই নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের অভিযোগ বিরোধী দলের প্রার্থীরা প্রচারণা চালাতে পারেনি এবং নির্বাচনের আগে তাদের অনেক নেতাকর্মীকে হামলা ও গ্রেফতার করা হয়েছে। এসব সমালোচনার জবাবে আপনি কী বলবেন?
শেখ হাসিনা : গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সমালোচনা একটা সাধারণ বিষয়। আপনার জানার কথা যে আমাদের দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে। যে কেউ তার মতপ্রকাশ ও আলোচনা করতে পারে। একইভাবে আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোও সমালোচনা করতেই পারে। কিন্তু তারা বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করছে না। কেউ যদি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি এবং ২০০১ সালের নির্বাচনসহ অতীতের যে কোনো নির্বাচনের সঙ্গে এটার তুলনা করে, তবে সহজেই বিষয়টি বুঝতে পারবে। তাই যারা এই নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা করছে, তাদের অবশ্যই বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাস জানতে হবে। আর এই নির্বাচনে বিরোধী দল তাদের কর্মী, সমর্থক ও ভোটারদের সামনে কোনো নেতা উপস্থাপন করতে পারেনি। যদি তারা ক্ষমতায় আসে, তবে সরকারপ্রধান কে হবে, তা তারা স্পষ্ট করতে পারেনি। এছাড়া তাদের মনোনয়ন বাণিজ্য এবং জামাতের সঙ্গে সম্পৃক্ততাকে মেনে নেয়নি বাংলাদেশের জনগণ।
প্রশ্ন : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ হয়েছে। এখন তাদের সক্রিয়তার বিষয়টি কোন পর্যায়ে?
শেখ হাসিনা : এখন জামাতের বেশিরভাগ নেতাকর্মী বিএনপিতে। নির্বাচন কমিশন তাদের নিবন্ধন বাতিল করেছে; কিন্তু বিএনপি তাদের সহযোগী হিসেবে নিয়েছে এবং এই নির্বাচনে তাদের মনোনয়ন দিয়েছে। জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই যারা আমাদের সমালোচনা করছে, তাদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে এই নির্বাচনে বিরোধী দল কী করেছে। তাছাড়া নির্বাচনের সময় কেন জানি না বিরোধী দল নিষ্ক্রিয় ছিল। হয়তো নেতৃত্বে সমস্যার কারণেই এমনটি হয়েছে। যে দলের নেতারা অভিযুক্ত ও দ-প্রাপ্ত, সেই দলকে জনগণ কেন ভোট দেবে?
প্রশ্ন : আপনার দলের গত মেয়াদে বাংলাদেশ থেকে বেশ কিছু ভারত-বিরোধী কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। তাৎক্ষণিক বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে নানা ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, ভবিষ্যতের পদক্ষেপগুলো কেমন হতে পারে?
শেখ হাসিনা : আমরা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছি। সুতরাং বাংলাদেশের মাটি ব্যবহার করে দেশে বা দেশের বাইরে কোথায় আমরা সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালাতে দেব না। তাই এসব সন্ত্রাসী কার্যক্রম প্রতিহত করতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, তা আমরা নেব। আমি দেশের ও মানুষের উন্নয়নের জন্য কাজ করতে চাই। তাই এদেশে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপই নেব।
প্রশ্ন : সম্প্রতি ভারতের আসামে নাগরিক নিবন্ধনের সময় অসংখ্য বাংলাদেশি পাওয়া গেছে, যারা অবৈধভাবে দশকের পর দশক ধরে সেখানে বাস করছে। এই বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
শেখ হাসিনা : দেখুন, সারাবিশ্বে অভিবাসন একটি সাধারণ বিষয়। অনেক ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের দেশগুলোসহ বিশ্বের অনেক দেশে বসবাস করছে। পাশাপাশি দেশের ক্ষেত্রে তো এটা আরও সাধারণ বিষয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো এখন আমাদের অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছে, চাকরির সুযোগ আছে, দরিদ্রের হার কমেছে এবং সামাজিক নিরাপত্তা আছে, তবে বাংলাদেশের মানুষ কেন সেখানে যাবে এবং বসবাস করবে? তারপরও যখন প্রশ্নটি উঠেছে, তখন আমরা দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান করতে পারি। আমি মনে করি, তারা সেখানে কোনো ধরনের ঝামেলায় জড়াচ্ছে না। তাছাড়া এর আগে ১৯৯৬ সালে যখন আমি সরকার গঠন করি, তখন আমি ভারতে শরণার্থী হিসেবে থাকা ৬৪ হাজার মানুষকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনেছিলাম।
প্রশ্ন : রোহিঙ্গা ইস্যুতে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের কাছ থেকে কী ধরনের ভূমিকা আশা করছেন আপনি?
শেখ হাসিনা : বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারা আমাদের জন্য বড় ধরনের বোঝা। আমি মনে করি দ্রুত সমস্যাটির সমাধান হওয়া উচিত। তাদেরও উচিত নিজেদের দেশে ফিরে যাওয়া। এক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে ভারত। মিয়ানমারের সঙ্গে ভালো সম্পর্কও আছে ভারতের। সুতরাং এক্ষেত্রে তারা রাষ্ট্রীয়ভাবে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করতে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই সমস্যাটি সমাধানের ক্ষেত্রে আমরা প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সহযোগিতা কামনা করি।
প্রশ্ন : আপনার গত দুই মেয়াদের তিস্তা চুক্তি আলোর মুখ দেখেনি। এবার এক্ষেত্রে আশাব্যঞ্জক কিছু হতে পারে বলে মনে করেন কী?
শেখ হাসিনা : এক্ষেত্রে আমরা আশাবাদী। এটি মূলত নির্ভর করছে ভারতের কেন্দ্রীয় ও পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ওপর। রাষ্ট্রীয়ভাবে নেয়া ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পদক্ষেপ ও সমর্থনে আমি সন্তুষ্ট। সমস্যা থেকে গেছে দিদিমণির (পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়) সঙ্গে। আমি তার সঙ্গে কথা বলেছি। তিনিও রাজি হয়েছেন কিন্তু যে কারণেই হোক এটি বাস্তবায়িত হয়নি। আমি আশা করি ভবিষ্যতে এটার সমাধান হবে।
প্রশ্ন : ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড সম্পর্কে আপনার চিন্তা-ভাবনা কী?
শেখ হাসিনা : এখন বিশ্ব একটা গ্রামে পরিণত হয়েছে। তাই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কানেকটিভিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার ও চীন ইতোমধ্যে কানেকটিভিটি সংক্রান্ত একটি চুক্তিতে সই করেছে। তাছাড়া এর ফলে ৪টি দেশের বাণিজ্যই বৃদ্ধি পাবে। এরপর ভারতের উদ্বেগের কোনো কারণ আছে বলে আমি মনে করি না। তবু যদি ভারতের কোনো সমস্যা থাকে, তা নিয়ে দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক আলোচনা করতে পারে। আমি মনে করে, যে কোনো সমস্যার সমাধান আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব।
প্রশ্ন : পাকিস্তানের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সার্ক সম্মেলন আয়োজনের জন্য বেশ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এই বিষয়ে আপনি কতটা আশাবাদী?
শেখ হাসিনা : আমি ইমরান খানকে অভিনন্দন জানাই। একজন ক্রিকেটার হিসেবে আমি অবশ্যই তার প্রশংসা করব। তিনি খুব ভালো ক্রিকেট খেলতেন। ক্রিকেটের মাঠে তিনি ছক্কা হাঁকানোতে অভ্যস্ত ছিলেন। এখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি কী করেন, সেটাই দেখার অপেক্ষায় আছি। সার্ক সম্মেলনে দ্বিপাক্ষিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করা যায় না। এক্ষেত্রে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কিছু সমস্যা আছে। বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে কিছু সংবেদনশীল বিষয় আছে। আজ বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। এখন আমাদের নিজস্ব এজেন্ডা ও প্রোগ্রাম আছে। কিন্তু আমি মনে করি, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতার বিকল্প নেই। এখন পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধান করে ইমরান সার্ক সম্মেলন সফল করতে পারেন কি না সেটাই দেখার বিষয়।
প্রশ্ন : নির্বাচনের আগে বেশ কিছু বিদেশি সরকার ও আন্তর্জাতিক এনজিও বাংলাদেশে মানবাধিকার নিয়ে যে প্রশ্ন তুলেছে, সেই বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?
শেখ হাসিনা : আমরা শান্তি, সংহতি, খাদ্য নিরাপত্তা, শিক্ষা, চিকিৎসা নিশ্চিত করেছি। এখন জনগণ আমাদের সরকারের নেয়া উদ্যোগের সুবিধা ভোগ করছে। এখন কিছু মানুষ মানবাধিকারের কথা বলছে। কিন্তু যখন এদেশে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে, তখন তাদের ভূমিকা কী ছিল? আমরা এসব সন্ত্রাসী কার্যক্রম প্রতিহত করার মাধ্যমে ইতোমধ্যে জনগণের মানবাধিকার নিশ্চিত করেছি। মানবাধিকার বলতে শুধু সিকিউরিটি বা সেফটিকে বুঝি না আমি। আমি মনে করি এর সঙ্গে খাদ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসার নিরাপত্তাও যুক্ত। একজন মানুষ চায় ভালোভাবে বাঁচতে। আমরা সেটা নিশ্চিত করতে পেরেছি। এর মানে আমরা মানবাধিকার নিশ্চিত করতে পেরেছি। তবু কিছু মানুষ ও এনজিও আমাদের সমালোচনা করছে। একজন রাজনীতিক হিসেবে আমি ভালো করেই জানি যে সমালোচনা থাকবেই। আমি ভালো করেই জানি যে যত বেশি কাজ করবে, সে তত বেশি সমালোচনার মুখে পড়বে।
প্রশ্ন : ভারতের আসন্ন লোকসভা নির্বাচন উপলক্ষে নরেন্দ্র মোদিকে কী বার্তা দেবেন?
শেখ হাসিনা : অবশ্যই আমি তার সফলতা কামনা করি। দুই দেশের মধ্যে বর্তমানে যে সুন্দর সম্পর্ক আছে, তা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে আমি আশা করি।

Category:

গাইবান্ধা-৩ আসনে আওয়ামী লীগের ডা. ইউনুস নির্বাচিত

2-6-2019 8-31-55 PMউত্তরণ ডেস্ক: স্থগিত থাকা গাইবান্ধা-৩ (সাদুল্লাপুর-পলাশবাড়ী) আসনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ডা. ইউনুস আলী সরকারকে বেসরকারিভাবে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছে। ১৩২টি ভোটকেন্দ্রে ইউনুস আলী (নৌকা) পেয়েছেন ১ লাখ ২১ হাজার ১৬৩ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় পার্টি (এরশাদ) প্রার্থী ব্যারিস্টার দিলারা খন্দকার শিল্পী (লাঙ্গল) পেয়েছেন ২৪ হাজার ৩৮৫ ভোট ও জাসদের খাদেমুল ইসলাম খুদি পেয়েছেন ১১ হাজার ৬৩০ ভোট। গত ২৭ জানুয়ারি রাতে সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সাদুল্লাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রহিমা খাতুন এবং সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও পলাশবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মেজবাউল হোসেনের কাছ থেকে প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে এ তথ্য জানা যায়।
প্রসঙ্গত, গত ২০ ডিসেম্বর এই আসনের ঐক্যফ্রন্ট সমর্থিত জাতীয় পার্টির (জাপা জাফর) প্রার্থী টিআইএম ফজলে রাব্বী চৌধুরীর মৃত্যু হয়। ফলে এই আসনের নির্বাচন স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন পুনঃতফসিল ঘোষণা করে।

Category:

প্রথমবার দলীয় প্রতীকে উপজেলা নির্বাচন

2-6-2019 8-29-26 PMরায়হান কবির: জাতীয় নির্বাচনের উদ্দীপনা না কাটতেই দেশজুড়ে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচনী হাওয়ায় সরগরম হয়ে উঠেছে রাজনীতির মাঠ। ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসজুড়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে একাধিক নির্বাচন। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে মেয়র পদে উপনির্বাচন এবং উত্তর ও দক্ষিণ উভয় সিটি কর্পোরেশনে সংযুক্ত ৩৬টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। একই সাথে কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) সংসদীয় আসনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে পুনর্নির্বাচন।
প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হচ্ছে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। ইতোমধ্যে নির্বাচনের তফসিল ঘোষিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী পাঁচ ধাপে অনুষ্ঠিত হবে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন। পঞ্চমবারের অনুষ্ঠিতব্য উপজেলা নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ব্যবহৃত হচ্ছে ইভিএম। জেলা সদরের উপজেলায় ভোটগ্রহণ করা হবে ইভিএমের মাধ্যমে। উপজেলা চেয়ারম্যান এবং উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ৩টি পদেই থাকছে দলীয় প্রতীক।
উত্তর সিটিতে আওয়ামী লীগের মনোনীত মেয়র প্রার্থী আতিক : আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র পদের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি, ব্যবসায়ী নেতা আতিকুল ইসলাম। গত ২৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় গণভবনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি বোর্ড এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের যৌথসভায় সর্বসম্মতিক্রমে তাদের এই মনোনয়ন দেওয়া হয়।
কিশোরগঞ্জ-১ আসনের নির্বাচন ২৮ ফেব্রুয়ারি : কিশোরগঞ্জ-১ (সদর-হোসেনপুর) সংসদীয় আসনের পুনর্নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পেয়েছেন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সদ্য প্রয়াত সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের বোন ডা. সৈয়দা জাকিয়া নূর লিপি। গত ২৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় গণভবনে আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি বোর্ড এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের যৌথসভায় সর্বসম্মতিক্রমে তাদের এই মনোনয়ন দেওয়া হয়।

পাঁচ ধাপে অনুষ্ঠিত হবে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন
পাঁচ ধাপে সারাদেশে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। পঞ্চমবারের মতো স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রতীকে অংশগ্রহণ করবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। গত ৩ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ১০ মার্চ প্রথম দফায় ৮৭টি উপজেলায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দ্বিতীয় দফায় ভোট হবে ১৮ মার্চ, তৃতীয় দফায় ভোট হবে ২৪ মার্চ এবং তৃতীয় দফায় ৩১ মার্চে ভোট নেওয়া হবে। বাকি উপজেলায় রমজানের পরে ভোটগ্রহণ করা হবে বলে কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
প্রথম ধাপের তফসিল ঘোষণা করা হলেও বাকি চার ধাপের খসড়া তফসিল প্রস্তুত করেছে কমিশন সচিবালয়। প্রথম দফায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী আগামী প্রার্থীদের ১১ ফেব্রুয়ারির মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে মনোনয়নপত্র দাখিল করতে হবে। বাছাই হবে ১২ ফেব্রুয়ারি। ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ধার্য করা করা হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে তফসিল ১০ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা, মনোয়নপত্র দাখিল ১৯ ফেব্রুয়ারি, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি এবং ভোটগ্রহণ ১৮ মার্চ নির্ধারণ করা হয়েছে। তৃতীয় ধাপে তফসিল ১৬ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা, মনোনয়নপত্র দাখিল ২৬ ফেব্রুয়ারি, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ৫ মার্চ ও ভোটগ্রহণ ২৪ মার্চ। চতুর্থ ধাপে তফসিল ২০ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা, মনোনয়নপত্র দাখিল ৪ মার্চ, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ১২ মার্চ ও ভোটগ্রহণ ৩১ মার্চ। সর্বশেষ পঞ্চম ধাপের তফসিল ১২ মে ঘোষণা, মনোনয়নপত্র দাখিল ২১ মে, প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ২৯ মে ও ভোটগ্রহণ ১৮ জুন নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রথম ধাপে যেসব উপজেলায় ভোট : প্রথম ধাপে আগামী ১০ মার্চ যেসব উপজেলায় ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে সেগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ পঞ্চগড় জেলার সদর, আটোয়ারী, বোদা, দেবীগঞ্জ ও তেঁতুলিয়া। কুড়িগ্রাম জেলার সদর, ভুরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ী, উলিপুর, নাগেশ্বরী, রাজারহাট, রাজিবপুর, চিলমারী ও রৌমারী।
নীলফামারী জেলার সদর, ডোমার, ডিমলা, জলঢাকা, সৈয়দপুর ও কিশোরগঞ্জ। লালমনিরহাট জেলার সদর, পাটগ্রাম, হাতীবান্ধা, কালীগঞ্জ ও আদিতমারী।
জামালপুর সদর, সরিষাবাড়ী, মেলান্দহ, ইসলামপুর, বকশীগঞ্জ, দেওয়ানগঞ্জ ও মাদারগঞ্জ।
নেত্রকোনা সদর বারহাট্টা, দুর্গাপুর, খালিয়াজুরী, কলমাকান্দা, কেন্দুয়া, মদন, মোহনগঞ্জ, পূর্বধলা।
সুনামগঞ্জ সদর, ছাতক, দোয়ারাবাজার, জামালগঞ্জ, শাল্লা, ধর্মপাশা, বিশ্বম্ভবপুর ও তাহিরপুর।
হবিগঞ্জ সদর, বাহুবল, মাধবপুর, চুনারুঘাট, নবীগঞ্জ, আজমিরীগঞ্জ, বানিয়াচং ও লাখাই।
সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি, চৌহালী কাজিপুর, রায়গঞ্জ, শাহজাদপুর, তাড়াশ ও উল্লাপাড়া।
জয়পুরহাট জেলার সদর, পাঁচবিবি, আক্কেলপুর, কালাই ও ক্ষেতলাল।
নাটোর সদর, বাগাতিপাড়া, গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম, লালপুর ও সিংড়া।
রাজশাহীর তানোর, গোদাগাড়ী, পবা, মোহনপুর, বাগমারা, পুঠিয়া, দুর্গাপুর, চারঘাট ও বাঘা।
দ্বিতীয় পর্যায়ে ১৮ মার্চ ভোটগ্রহণ ও উপজেলার তালিকা (সম্ভাব্য) : ঠাকুরগাঁও সদর, বালিয়াডাঙ্গী, রানীশংকৈল, পীরগঞ্জ, হরিপুর, গঙ্গাচড়া, তারাগঞ্জ, বদরগঞ্জ, কাউনিয়া, পীরগাছা, পীরগঞ্জ, গোবিন্দগঞ্জ, সাঘাটা, পলাশবাড়ী।
গাইবান্ধা সদর, সাদুল্লাপুর, ফুলছড়ি, বীরগঞ্জ, কাহারোল, বিরল, বোচাগঞ্জ।
দিনাজপুর সদর, খানসামা, চিরিরবন্দর, পার্বতীপুর, ফুলবাড়ী, নবাবগঞ্জ, বিরামপুর, হাকিমপুর, ঘোড়াঘাট, সদর, আদমদীঘি, দুপচাঁচিয়া, ধুনট, কাহালু, গাবতলী, নন্দীগ্রাম, সারিয়াকান্দি, শাজাহানপুর, শেরপুর, শিবগঞ্জ, সোনাতলা, রানীনগর, মহাদেবপুর, নিয়ামতপুর, সাপাহার, পতœীতলা, বদলগাছী।
নওগাঁ সদর, আত্রাই, পোরশা, ধামইরহাট, মান্দা, সদর, বাগাতিপাড়া, গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম, লালপুর, সিংড়া।
কুষ্টিয়া সদর, ভেড়ামারা, কুমারখালী, মিরপুর, খোকসা, দৌলতপুর, শার্শা, ঝিকরগাছা, চৌগাছা।
যশোর সদর, বাঘারপাড়া, অভয়নগর, মনিরামপুর, কেশবপুর, দীঘলিয়া, কয়রা, ডুমুরিয়া, পাইকগাছা, রূপসা, তেরখাদা, ফুলতলা, বটিয়াঘাটা, দাকোপ, মেহেরপুর সদর, মুজিবনগর, গাংনী, রাজবাড়ী সদর, গোয়ালন্দ, পাংশা, বালিয়াকান্দি, আলফাডাঙ্গা, বোয়ালমারী, মধুখালী, নগরকান্দা, সালথা, সদর, চরভদ্রাসন, সদরপুর, ভাঙ্গা, হাতিয়া, মীরসরাই, সীতাকু-, সন্দ্বীপ, ফটিকছড়ি, রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, হাটহাজারী।
তৃতীয় পর্যায়ে ২৪ মার্চ ভোটগ্রহণ ও উপজেলার তালিকা (সম্ভাব্য) : চুয়াডাঙ্গা সদর, আলমডাঙ্গা, দামুড়হুদা, জীবননগর, মাগুরা সদর, শ্রীপুর, শালিখা, মহম্মদপুর, নড়াইল সদর, কালিয়া লোহাগড়া, ঝিনাইদহ সদর, শৈলকুপা, হরিণাকু-ু, কালীগঞ্জ, ফকিরহাট, মোল্লাহাট, চিতলমারী, বাগেরহাট সদর, কচুয়া, রামপাল, মোংলা, মোড়েলগঞ্জ, শরণখোলা, আশাশুনি, শ্যামনগর, কালীগঞ্জ, কলারোয়া, সাতক্ষীরা সদর, তালা দেবহাটা, ভোলাহাট, গোমস্তাপুর, নাচোল, শিবগঞ্জ, পুঠিয়া, দুর্গাপুর, চারঘাট, বাগা, সদর, আটঘরিয়া, বেড়া, ভাংগুড়া, চাটমোহর, ফরিদপুর, ঈশ্বরদী, সাঁথিয়া, সুজানগর, সদর, টুঙ্গিপাড়া, কোটালীপাড়া, কাশিয়ানী, মুকসুদপুর, শিবচর, কালকিনি, রাজৈর, সদর, জাজিরা, নড়িয়া, ভেদরগঞ্জ, ডামুড্যা, গোসাইরহাট, নালিতাবাড়ী, শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী, হালুয়াঘাট, ধোবাউড়া, ফুলপুর, গৌরীপুর, সদর, মুক্তাগাছা, ফুলবাড়ীয়া, ত্রিশাল, ঈশ্বরগঞ্জ, নান্দাইল, গফরগাঁও, ভালুকা, সিলেট সদর, বিশ্বনাথ, দক্ষিণ সুরমা, ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, জকিগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, বড়লেখা, জুড়ী, কুলাউড়া, রাজনগর, সদর, কমলগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, বোয়ালখালী, পটিয়া, আনোয়ারা, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, বাঁশখালী।
চতুর্থ পর্যায়ে ৩১ মার্চ ভোটগ্রহণ ও উপজেলার তালিকা (সম্ভাব্য) : বরিশাল সদর, বাকেরগঞ্জ, বাবুগঞ্জ, বানারীপাড়া, উজিরপুর, গৌরনদী, আগৈলঝাড়া, মুলাদী, হিজলা, পটুয়াখালী সদর, মির্জাগঞ্জ, দুমকী, বাউফল, দশমিনা, গলাচিপা, কলাপাড়া, ভোলা সদর, দৌলতখান, বোরহানউদ্দিন, লালমোহন, তজুমদ্দিন, চরফ্যাশন, মনপুরা, বরগুনা সদর, আমতলী, বেতাগী, বামনা, পাথরঘাটা, পিরোজপুর সদর, ইন্দুরকানী, মঠবাড়ীয়া, ভা-ারিয়া, কাউখালী, নেছারাবাদ, নাজিরপুর, ঝালকাঠি সদর, নলছিটি, রাজাপুর, কাঁঠালিয়া, ধনবাড়ী, মধুপুর, গোপালপুর, ভূঞাপুর, ঘাটাইল, কালিহাতী, টাঙ্গাইল সদর, দেলদুয়ার, নাগরপুর, মির্জাপুর, বাসাইল, সখীপুর, কিশোরগঞ্জ সদর, হোসেনপুর, কটিয়াদী, পাকুন্দিয়া, তাড়াইল, করিমগঞ্জ, ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, নিকলী, বাজিতপুর, কুলিয়ারচর, ভৈরব, দোহার, নবাবগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, সাভার, ধামরাই, কাপাসিয়া, কালিয়াকৈর, শ্রীপুর, কালীগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ সদর, টঙ্গীবাড়ী, লৌহজং, শ্রীনগর, সিরাজদিখান, গজারিয়া, সোনারগাঁ, আড়াইহাজার, রূপগঞ্জ, নরসিংদী সদর, পলাশ, শিবপুর, মনোহরদী, বেলাব, রায়পুরা, দৌলতপুর, ঘিওর, শিবালয়, সিঙ্গাইর, হরিরামপুর, মানিকগঞ্জ সদর, সাঁটুরিয়া, তিতাস, মুরাদনগর, দেবিদ্বার, বুড়িচং, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চান্দিনা, বরুড়া, লাকসাম, নাঙ্গলকোট, মনোহরগঞ্জ, চৌদ্দগ্রাম, মেঘনা, হোমনা, কচুয়া, মতলব উত্তর, মতলব দক্ষিণ, চাঁদপুর সদর, ফরিদগঞ্জ, হাজীগঞ্জ শাহরাস্তি, চাটখিল, সেনবাগ, কোম্পানীগঞ্জ, কবিরহাট, সুবর্ণচর, বেগমগঞ্জ, সোনাইমুড়ী, নাসিরনগর, আশুগঞ্জ, সরাইল, সদর, আখাউড়া, কসবা, নবীনগর, ফেনী সদর, দাগনভূঞা, সোনাগাজী, ফুলগাজী, ছাগলনাইয়া, পরশুরাম, লক্ষ্মীপুর সদর, রামগঞ্জ, রায়পুর, কমলনগর, রামগতি, পেকুয়া, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, কক্সবাজার সদর, রামু, উখিয়া, টেকনাফ।
পঞ্চম পর্যায়ে ১৮ জুন ভোটগ্রহণ ও উপজেলার তালিকা (সম্ভাব্য) : আটপাড়া, শেরপুর সদর, নকলা, নলডাঙ্গা, সদর, কামারখন্দ, রংপুর সদর, সুন্দরগঞ্জ, মেহেন্দিগঞ্জ, রাঙ্গাবালী, তালতলী, কোটচাঁদপুর, মহেশপুর, গাজীপুর সদর, বন্দর, মাদারীপুর সদর, কালুখালী, শায়েস্তাগঞ্জ, বাঞ্ছারামপুর, বিজয়নগর, হাইমচর, আদর্শ সদর, সদর দক্ষিণ, সাতকানিয়া।
উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে জেলা সদরে উপজেলা পরিষদে ইভিএমের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ করা হবে। সদর উপজেলার প্রত্যেকটা কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার করা হবে। উপজেলায় ইভিএম বিধিমালা ইতোমধ্যে কমিশন অনুমোদন করেছে।
তিন পৌরসভায় মেয়র পদে মনোনয়ন পেলেন যারা : আসন্ন তিন পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা হলেনÑ বরগুনার আমতলী পৌরসভায় মতিয়ার রহমান, পটুয়াখালী সদর পৌরসভায় কাজী আলমগীর ও ঝিনাইদহের কালিগঞ্জ উপজেলায় মো. আশরাফুল আলম আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন।
এদিকে আসন্ন ২৯টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের একক প্রার্থীরা হলেনÑ দিনাজপুর জেলার বিরল উপজেলার আজিমপুর ইউনিয়নে মো. আবদুল আউয়াল, ফরক্কাবাদে মো. হুসেন আলী, বিরলে মো. মারুফ হোসেন, নীলফামারী উপজেলার ডোমার উপজেলার পাঙ্গা মটুকপুরে মো. এমদাদুল ইসলাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল উপজেলার নাচোলে মো. আবদুস ছালাম, খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার লতায় দেবী রানী বিশ্বাস, সাতক্ষীরা জেলার কালিগঞ্জ উপজেলার কৃঞ্চনগরে মোস্তফা কবিরুজ্জামান, যশোর জেলার মনিরামপুর উপজেলার খেদাপাড়ায় মো. আবদুল আলীম, বরিশাল জেলার উজিরপুর উপজেলার জল্লায় বেবী রানী দাস, ভোলা জেলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার হাসান নগরে মো. মানিক হাওলাদার, পিরোজপুর জেলার ভা-ারিয়া উপজেলার তেলিখালীতে মো. শামসুদ্দীন, গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার রায়েদে মো. শফিকুল হাকিম মোল্যা হিরণ, ফরিদুপুর জেলার নগরকান্দা উপজেলায় তালমায় দেলোয়ারা বেগম, ফরিদপুর সদরের চাঁদপুরে মোসা. শামসুন্নাহার, মধুখালী উপজেলার নওপাড়ায় মো. হাবিবুর রহমান মোল্লা, শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জের কাচিকাটায় আবুল হাশেম, মাদারীপুর জেলার শিবচরের চরজানাজাতে জাহাঙ্গীর আলম রায়হান সরকার, নেত্রকোনা জেলার খালিয়াজুরী উপজেলার কৃঞ্চপুরে সৈয়দ মনিরুল ইসলাম, ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইলের বীর বেতা গৈরে আবদুল মতিন, চর বেতা গৈরে মো. আবুল হোসেন, সুনামগঞ্জ জেলার ছাতকের সিংচাপইড়ে মো. আশিকুল ইসলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুরের রূপসদীতে (পশ্চিম) মহসিন মিঞা, নারিনগরের গোকর্ণে ছোয়াব আহমেদ হূতুল, কুমিল্লা জেলার বরুড়ার গালিমপুরে মো. রবিউল আলম, নোয়াখালী জেলার সুবর্ণচরের মোহাম্মদপুরে মোহাম্মদ আবুল কালাম, চট্টগ্রাম জেলার ফটিকছড়ির নানুপুরে সৈয়দ ওসমান গণি বাবু, খিরামে মুহাম্মদ শহীদুল আলম এবং খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার মানিকছড়ি উপজেলার তিনটহরীতে মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ।
গত ২৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় গণভবনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি বোর্ড এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ডের যৌথসভায় সর্বসম্মতিক্রমে তাদের এই মনোনয়ন দেওয়া হয়।

Category:

দক্ষ লিডারশিপের ম্যাজিকে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ

2-6-2019 8-25-55 PM

এসডিজি কর্মশালায় কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক

উত্তরণ প্রতিবেদন: আমরা একটা দক্ষ লিডারশিপ পেয়েছি, যার ম্যাজিকে দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বলে জানিয়েছেন কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক এমপি। গত ২২ জানুয়ারি রাজধানীর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল মিলনায়তনে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট এসডিজি রোড ম্যাপ প্রণয়ন শীর্ষক কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, বাংলাদেশ খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ বলেই নেপালে ভূমিকম্পের সময় আমরা ২০ হাজার টন চাল সাহায্য করেছি।
তিনি আরও বলেন, মানুষ এখন না খেয়ে আর মারা যায় না। দরিদ্র মানুষগুলোও পেট ভরে দুবেলা খেতে পারে। উত্তরবঙ্গে আর মঙ্গা নেই। সেখানকার মানুষ অনাহারে আর দিনযাপন করে না। আমরা ২০৩০ সালের ভেতর খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছি। কৃষিমন্ত্রী বলেন, আমরা ২০১৩ সালেই দানাদার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছি। এখন আমরা পুষ্টি জাতীয় খাদ্য উৎপাদনের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে চাই। দেশের মানুষের পুষ্টি খাদ্যের সমস্যা রয়েছে। সবাইকে পুষ্টি খাদ্যর আওতায় নিয়ে আসতে সরকার কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, এসডিজির রোডম্যাপ লক্ষ পূরণ করতে সবচেয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ কৃষির মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। পেটে যদি খাবার থাকে তাহলেও মানুষ তাদের সঠিক শ্রম দিয়ে দেশকে এগিয়ে নিতে পারবে। তাই খাদ্য উৎপাদন আরও বৃদ্ধি করতে হবে।
কৃষিমন্ত্রী বলেন, আমরা প্রচুর পুষ্টি জাতীয় খাদ্য উৎপাদন করি; কিন্তু তা বিদেশে রপ্তানি করতে পারি না এটা আমাদের একটা ব্যর্থতা। তাই আমাদের নিজেদের পুষ্টি জাতীয় খাদ্যর চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করতে হবে। এতে করে দেশের অর্থনীতি আরও এগিয়ে যাবে।
কৃষকরা খাদ্য উৎপাদনের প্রকৃত মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই কৃষকদের সাহায্য করতে সরকার প্রতিনিয়ত কাজ করছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা ৪ কোটি ১৩ টন খাদ্য উৎপাদন করেছি, যা ২০৩০ সালে লক্ষ্যমাত্রা ৮ কোটি টন খাদ্য উৎপাদন করা। আমরা কৃষি, প্রাণিজ ও মৎস্যÑ এই তিন খাতেই ২০৩০ সালের ভেতর দ্বিগুণ উৎপাদন করতে দিন দিন নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। গবেষণার মাধ্যমে উৎপাদনের নতুন ফর্মুলা বের করতে হবে। কৃষিমন্ত্রী বলেন, বিদেশ থেকে আগে আমরা ১৪-১৫ ভাগ সাহায্য পেতাম; কিন্তু এখন ২-৪ ভাগ সাহায্য পাই। তাই নিজেদের স্বয়ংসম্পূর্ণতা আরও বাড়াতে হবে।
তিনি আরও বলেন, দারিদ্র্যতার সঙ্গে কৃষির একটা সম্পর্ক আছে। কৃষি যদি উন্নত হয় তাহলে দারিদ্র্যতাও হ্রাস পাবে। বর্তমানে দারিদ্র্যতার নিচে ২১ ভাগ মানুষ বাস করে। ২০৪১ সালে অতি দারিদ্র্যের হার শূন্যের কোটায় নামিয়ে নিয়ে আসা হবে। মূলত সরকারের সবার জন্য পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
এসডিজি রোডম্যাপ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেনÑ কৃষিবিদ আবদুল মান্নান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ, সদস্য (সিনিয়র সচিব) সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ, পরিকল্পনা কমিশনের ড. সামসুল আলম, কৃষি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব নাসিরুজ্জাম এবং সম্মানীয় অতিথি ছিলেন ড. কাজী এম বদরুদ্দোজা, এমেরিটাস সায়েন্টিস।
কৃষিবিদ আবদুল রাজ্জাক বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দক্ষতায় আজ সকল শাখাতে উন্নতের ছোঁয়া লেগেছে। কৃষি খাতও পিছিয়ে নেই। দেশ আজ খাদ্য পরিপূর্ণ। ২০৩০ সালের ভেতর খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ হবে।
তিনি আরও বলেন, সবার সহযোগিতায় ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কাজ করতে হবে এবং কৃষি খাতে প্রচুর গবেষণার প্রয়োজন, তাই এই খাতে অতি জরুরিভাবে দক্ষ গবেষক নিয়োগ দেওয়া উচিত। মূল বাজেটের মাত্র পয়েন্ট ৬ শতাংশ গবেষণা খাতে ব্যয় করা হয়। গবেষণার বাজেট আরও বৃদ্ধি করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ পাওয়ার পয়েন্টের মাধ্যমে সরকার এসডিজির রোডম্যাপ প্রদর্শন করেন।
সারাবিশ্বের মানুষের শান্তি, সমৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিতকরণে বাংলাদেশে ২০৩০ সালের ভেতর ১৭টি লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করছে সরকার।

Category:

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও প্রাসঙ্গিক কথা

2-6-2019 8-24-44 PMঅ্যাডভোকেট আফজাল হোসেন: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এক মাস পার হলো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু-কন্যা দেশরতœ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন সরকার পূর্ণ উদ্যমে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অক্ষুণœ রাখতে কাজ করে যাচ্ছে। নির্বাচনোত্তর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে ভালো। মানুষ শান্তিতে আছে, স্বস্তিতে আছে, ভালো আছে।
চতুর্থবারের মতো সরকার পরিচালনার দায়িত্ব প্রাপ্তিতে শেখ হাসিনার রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞা ও নেতৃত্বকে অভিনন্দিত করছে বিশ্ববাসী। অতীতের সন্ত্রাস নৈরাজ্যকে প্রত্যাখ্যান করে শান্তি ও গণতন্ত্রের অভিযাত্রায় দেশের মানুষ আজ ঐক্যবদ্ধ। মানুষের প্রত্যাশাÑ অযুত রক্তের বিনিময়ে পাওয়া এই ভূখ- শান্তি, উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের ধারায় এগিয়ে যাক। সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ যেন আমাদের পথ আগলে না দাঁড়ায়। একটা কল্যাণকামী রাষ্ট্র বিনির্মাণের স্বপ্নযাত্রা থেকে আমরা যেন আর পিছিয়ে না যাই। ষড়যন্ত্র, বিভাজনের অপরাজনীতির কারণে আমাদের অনেক মূল্য দিতে হয়েছে। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো মহান নেতাকে আমরা হারিয়েছি। হত্যা, খুন, সন্ত্রাসের ধারাবাহিকতায়Ñ স্বাধীন দেশে জীবন দিতে হয়েছে অনেক মুক্তিযোদ্ধাদের। ক্ষমতাকে সম্পদ অর্জনের হাতিয়ার করে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি করা হয়েছে এক লুটেরা গোষ্ঠীর। একরকম এক অন্ধকার সময় পার করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাঙালি জাতি আলোকোজ্জ্বল এক ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়িয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের দৃশ্যমান ভালো কাজের প্রশংসা আজ মানুষের মুখে মুখে। দেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আস্থাশীল। কিন্তু একটি গোষ্ঠীর মুখে কুলুপ আঁটা। সরকারের উন্নয়নের সকল সুফল ভোগ করার পরও ভাবটা এমন যেন কিছুই হয়নি। এই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। দেশ-জাতির মঙ্গলে মৌলিক বিষয়ে ঐকমত্য থাকতে হবে। যে মূল আদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলাম সে-পথেই আমাদের ফিরে আসতে হবে। দীর্ঘ চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে বাংলাদেশ এখন শেখ হাসিনার হাত ধরে সেই পথেই হাঁটছে। স্বাধীনতার পর প্রায় পাঁচ দশক অতিক্রান্ত হয়েছে। এ-সময়ে পৃথিবীর অনেক দেশ অনেক দূর এগিয়েছে, উন্নত হয়েছে। আমরা পারিনি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জাতি নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে। সেনাশাসনে বাংলাদেশ নিপতিত হয়। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করে, বঙ্গবন্ধুর সৃষ্টিশীল উন্নয়ন-অগ্রযাত্রাকে স্তব্ধ করে দেয়। দীর্ঘ ২১ বছর হত্যা, ক্যু, পাল্টা ক্যু, খুন, ধর্ষণ, সন্ত্রাস, লুটপাটের এক দুষ্টচক্রে ঘুরপাক খাচ্ছিল বাংলাদেশ। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে দীর্ঘ ২১ বছর পর দেশ পরিচালনার সুযোগ পায় আওয়ামী লীগ। সাম্প্রদায়িক স্বৈরতান্ত্রিক ধারার অবসান ঘটে। রাষ্ট্র ও সমাজ-জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। বিশ্বসভায় বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। এই সময়কাল বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ২০০১ সালে ষড়যন্ত্রমূলক ভোট ডাকাতির নির্বাচনে বিএনপি-জামাত ক্ষমতা দখল করে। জেনারেল জিয়া সৃষ্ট স্বৈরতান্ত্রিক ধারায় ফিরে যায় বিএনপি-জামাত জোট। ক্ষমতার প্যারালাল কেন্দ্র হাওয়া ভবনের নির্দেশে চলতে থাকে দমন-নিপীড়ন, সন্ত্রাস ও লুটপাট। জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে উসকে দেওয়া হয়। একযোগে ৬৩ জেলার ৫০০ স্থানে বোমা হামলা চালানো হয়। জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা হয়। রাষ্ট্রীয় মদদে প্রতিহিংসার রাজনীতির নিষ্ঠুরতার সাক্ষী এই বাংলাদেশ। এই অপকর্মের হোতা বিএনপি-জামাত। এই জোটের অপরাজনীতির কারণে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি পটপরিবর্তন হয়। বিএনপি-জামাতের পাঁচ বছরে স্বৈরশাসন ও সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিরাজনীতিকরণের হীন প্রচেষ্টাকে প্রতিহত করে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। এ-সময় দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে, ক্ষুধা-দারিদ্র্যের অবসান, মাথাপিছু আয়, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে দেশের অভাবনীয় সাফল্যে অর্জিত হয়। ২০১৪ সালের নির্বাচন পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে জনসম্পৃক্ততাহীন বিএনপি-জামাতের আগুন সন্ত্রাস প্রতিহত করে গণতান্ত্রিক ধারায় দেশ এগিয়ে যায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ধৈর্য, সাহস, প্রজ্ঞায় উন্নয়নের ধারায় দেশ পরিচালিত হয়। বিশ্বসমাজে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে ঘুরে দাঁড়ায় বাংলাদেশ।
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান এইচএসবিসি’র (হংকং সাংহাই ব্যাংকিং কর্পোরেশন) বার্ষিক রিপোর্টে বলা হয়েছেÑ বাংলাদেশ বিশ্বের ২৬তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিক থেকে ফিলিপাইন, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও মালয়েশিয়াকে পেছনে ফেলে দেবে।
এছাড়া ‘বিশ্ব অর্থনীতির অবস্থা ও সম্ভাবনা-২০১৯’ নামে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনের পূর্বাভাস রয়েছে যে, চলতি বছর বিশ্বের যেসব দেশে ৭ শতাংশ বা এর বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম। গত তিন মেয়াদের আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়নের ফিরিস্তি স্বল্প পরিসরে দেওয়া সম্ভব নয়। এবার মূল প্রসঙ্গে আসি। আওয়ামী লীগ সরকারের কোনো ভালো কাজই বিএনপি-জামাতের সহ্য হয় না। বক্তৃতা-বিবৃতি-টকশো’তে তারা নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে। বিএনপি-জামাত ঐক্যফ্রন্টের যতই মন কষ্ট হোক না কেন, এবারের নির্বাচনে যুদ্ধাপরাধী সাম্প্রদায়িক শক্তির বিদায় ঘণ্টা বেজেছে। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে। অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতায় যাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়েছে।
তবে সুখের বিষয় অতীতের মতো বিএনপি-জামাতের সাথে কোরাস তোলার লোকের সংখ্যা দেশে কমে যাচ্ছে। অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতায় যাওয়ার ছিদ্রপথ বন্ধ হওয়াতে অনেকেই হতোদ্যম হয়েছে। সামরিক শাসন ও অগণতান্ত্রিক শক্তির উচ্ছিষ্ট ভোগকারীরা এখন বিএনপি-জামাতের কাঁধে সওয়ার হয়েছে। যদি কিছু পাওয়া যায় এই আশায়। দেশের স্বার্থ তাদের কাছে বড় না।
শেখ হাসিনার সরকার পরিচালনার নীতি-কৌশল নিয়ে কঠিন নিন্দুকরাও খুব একটা খুঁত ধরতে পারছে না। তাদের একটাই কথা ‘নির্বাচনটা ভালো হয়নি’। তাহলে তাদের কাছে নিশ্চয়ই ভালো নির্বাচনের একটা সংজ্ঞা আছে, উদাহরণ আছে। দেশবাসী কি ১৯৭৭ সালের হ্যাঁ-না ভোটকে ভালো নির্বাচন বলবে। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিনা ভোটের নির্বাচনকে কোন সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করবেন। এছাড়া হোন্ডা-গু-ার মহড়ায় ‘মাগুরা মার্কা’ নির্বাচন তো আছেই। এখন যারা ভালো নির্বাচনের কথা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলছেন, তারা তো ভুলেও ২০০১-এর ভোট ডাকাতির নির্বাচনের কথা মুখে আনেন না।
১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদ শেষ করে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিল আওয়ামী লীগ। দেশবাসী নিশ্চয়ই ভুলে যায়নি কীভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রথম দিনেই ১৩ জন সচিবকে চাকরি থেকে বের করে দিয়ে নির্বাচনকে প্রভাবিত করার জন্য মাঠ প্রস্তুত করা হয়েছিল। কোনো রকম সৌজন্যবোধের তোয়াক্কা না করে সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের ফোনের লাইন ও বিদ্যুতের লাইন কেটে দেওয়া হয়েছিল। ভোটের দিন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ভোটকেন্দ্রের কাছে যেতে পারেনি। পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনামাফিক বিএনপি-জামাত ক্ষমতায় আসে। এরপর শুরু হয় তা-ব, গ্যাং রেপ। হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়। এখন যারা বিবেকের তাড়নায় ঘুমোতে পারছেন না। তাদের বিবেক তখন কোথায় ছিল? বিবেকবানদের দৃষ্টিতে ২০০১ সালের নির্বাচন যদি ভালো নির্বাচন হয়। তাহলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তাদের বক্তব্যকে দেশবাসী কীভাবে নেবে? এই নির্বাচনের আগে-পরে প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের চাকরিচ্যুতি ঘটেনি। রাজপথ রক্তাক্ত হয়নি। অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে নির্বাচনের পূর্ব ও পরে সংঘাতমুক্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে। চাকরিজীবীরা সন্তুষ্টমনে চাকরি করছেন। ব্যবসায়ীরা হাওয়া ভবনের উৎপাতমুক্ত পরিবেশে ব্যবসা করছে। ২০১১ সালে কানাডা সফরের সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ‘ভালোর পসরা’ নামে একটা প্রবন্ধ লিখেছিলেন। লেখাটা এ-সময়ের জন্যও খুব প্রাসঙ্গিক। শেখ হাসিনা যত ভালো কাজই করুক না কেন, তাতে তাদের মন ভরে না। নির্বাচন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য ছবিযুক্ত ভোটার তালিকা, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্সসহ যত বিধিবিধান করা হয়েছে, সবই করেছে আওয়ামী লীগ সরকার। অথচ সামরিক সরকার বা তার উচ্ছিষ্ট ভোগকারীরা যখন ক্ষমতায় ছিল তখন নির্বাচন ব্যবস্থাকে সমূলে ধ্বংস করেছিল, এখন আবার তারাই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য ‘ভালোর পসরা’ নিয়ে হাজির হয়েছে। এই ভালোর দল নিয়ে জননেত্রী শেখ হাসিনার কয়েকটা লাইন দিয়েই লেখার ইতি টানছি।Ñ

“…অগণতান্ত্রিক বা অসাংবিধানিক সরকার থাকলে এদের দাম থাকে। এই শ্রেণিটা জীবনে জনগণের মুখোমুখি হতে পারে না। ভোটে জিততে পারে না। কিন্তু ক্ষমতার লোভ ছাড়তে পারে না। তাই মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে কিন্তু অগণতান্ত্রিক বা অসাংবিধানিক সরকারের যে খোশামোদি, তোষামোদি ও চাটুকারের দলের যে প্রয়োজন হয়Ñ এরা সেই দল।”

লেখক : তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

Category:

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অভিনন্দনপত্র

2-6-2019 8-22-43 PMগণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযুদ্ধের-চেতনাদৃপ্ত রাষ্ট্রনায়ক : দেশরতœ শেখ হাসিনা

আজ আমাদের গর্বের দিন। যে ঐতিহাসিক উদ্যানে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদাত্ত আহ্বানে মুক্তির শপথ নিয়েছিল বাংলার মুক্তিকামী মানুষÑ সেই প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে অভিনন্দন জানাই আমাদের প্রাণপ্রিয় জননেত্রী শেখ হাসিনা আপনাকে। মৃত্যুর মিছিলে দাঁড়িয়ে আপনি কতবার পেয়েছেন জীবনের জয়গান। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আপনি বারবার উড়িয়েছেন সৃষ্টির পতাকা। উত্তাল সাগরে প্রগাঢ় অন্ধকারে বাঙালির বাতিঘর জননেত্রী শেখ হাসিনা আপনাকে অভিবাদন। সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশকে আপনি সেই উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, যা আজ বিশে^র বিস্ময়। সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত স্বপ্ন বাস্তবায়নে আপনি নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন, আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ দেশ নির্মাণের ব্রত নিয়েÑ সতর্ক প্রহরীর মতো আপনি জেগে থাকেন বলে বাংলাদেশ নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নবাহু আপনি এই দেশমাতৃকাকে তার আপন সত্তায় ফিরিয়ে এনেছেন। আপনি বলেছিলেন, এই মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবেÑ আপনি এও বলেছিলেন, এই মাটিতে বিচার হবে বঙ্গবন্ধুর ঘৃণিত খুনিদের। কথা দিয়ে কথা রাখার রাজনৈতিক সংস্কৃতি আপনি ফিরিয়ে এনেছেন। আপনার আলোকসঞ্চারী দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সৎ সাহসী নেতৃত্বের বিভায় উদ্ভাসিত আজ বাংলাদেশ। জনগণ তাদের রায়ের মধ্য দিয়ে প্রমাণ দিয়েছেন তারা স্বাধীনতাবিরোধী-সাম্প্রদায়িকতামুক্ত বাংলাদেশের পক্ষে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অবিনাশীÑ চিরভাস্বর।
আপনার প্রজ্ঞাবান নেতৃত্বের গুণে কেবল জল-স্থল নয় অন্তরিক্ষেও আজ আমাদের গৌরবময় বিচরণ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাঙালি বলে পরিচয় দিতে আজ আমরা অহংকার বোধ করি। মৃত্যুর মুখে পতিত দশ লক্ষের অধিক রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে আপনি আজ ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ উপাধিতে ভূষিত। যতদূর প্রসারিত বঙ্গোপসাগর তার চেয়েও বড় স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশকে আরও একটি নতুন শতাব্দীর উপযোগী করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে আপনার গৃহীত ডেল্টা প্ল্যান নতুন প্রজন্মকে আত্মবিশ^াসী করেছে। আজ আপনি শুধুমাত্র একজন রাজনৈতিক নেতা নন, আপনার উচ্চতা আজ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বিশ^ নেতৃত্বের কাতারে। বিশ^ শান্তির জন্য জাতিসংঘে প্রস্তাবিত আপনার শান্তি-মডেল আগামী প্রজন্মের জন্যেও এই সত্যকে তুলে ধরেÑ ‘তোমার জন্য এনেছি আমার আজন্ম সূর্যোদয়’।
আপনার সুযোগ্য নেতৃত্বে আমরা আমাদের হারিয়ে যাওয়া উজ্জ্বল দিন ফিরে পেয়েছি। হাজার বছরের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির ঐতিহ্য বহনকারী একটি জাতি যখন স্বাধীনতার জন্য উন্মুখÑ সেই মাহেন্দ্রক্ষণে বঙ্গবন্ধু এনে দিয়েছিলেন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, একটি উজ্জ্বল পতাকা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল সেই গৌরবের কালÑ একটি জাতি আঁতুড়ঘরে পথ হারিয়ে ফেলেছিল।
আপনি সেই দেশ, সেই জাতিকে স্পর্ধিত সাহস, আত্মবিশ^াস ফিরিয়ে দিয়েছেন। বিশে^র বুকে আমরা আবার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছি। বাঙালির এই নবযাত্রায়, সীমার মাঝে অসীমের আহ্বানে আপনার কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে প্রায় ১৭ কোটি প্রাণ সমস্বরে এই সত্য বাণী উচ্চারণ করবÑ ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’।
আপনারই হাত ধরে আমরা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং আমাদের গৌরবোজ্জ্বল স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করব।

প্রিয় নেত্রী,
আপনার জয়, বাঙালির জয়।
আপনার কল্যাণ হোক, মঙ্গল হোক। দীর্ঘ হোক আপনার কর্মময় জীবন।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর পক্ষে
ওবায়দুল কাদের এমপি
সাধারণ সম্পাদক

Category:

জনগণকে দেয়া প্রতিটি প্রতিশ্রুতি পূরণ করব

2-6-2019 8-20-31 PM

সোহরাওয়ার্দীর বিজয় মহাসমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

উত্তরণ প্রতিবেদন: ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উত্তাল জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত, উন্নত-সমৃদ্ধ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষসহ দলমত নির্বিশেষে পুরো দেশবাসীর সহযোগিতা কামনা করেছেন। তিনি বলেন, আসুন, সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলি। নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে দেশের মানুষ আমাদের প্রতি যে আস্থা-বিশ্বাস রেখেছে, প্রয়োজনে নিজের জীবন দিয়ে হলেও জনগণের সেই আস্থা-বিশ্বাসের মর্যাদা আমরা রক্ষা করব। বুকের রক্ত দিয়ে হলেও জনগণের ভোটের মর্যাদা রক্ষা করব।
টানা তৃতীয়বারসহ চতুর্থবারের মতো ভোট দিয়ে আওয়ামী লীগকে আবারও দেশ সেবার সুযোগ দেয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে দেশের জনগণ সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, মাদক ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। বিজয় পাওয়া যত কঠিন, সেটি রক্ষা করে জনগণের সেবা করা আরও কঠিন। সেই কঠিন কাজটিই আমাদের করতে হবে। দেশের জনগণ রায় দিয়েছে শান্তি ও উন্নয়নের স্বপক্ষে। অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রার জন্য রায় দিয়েছে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারের পক্ষে জনগণ রায় দিয়েছে।
একাদশ জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর গত ১৯ জানুয়ারি বিকেলে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিজয়োৎসব উপলক্ষে আয়োজিত বিশাল সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেনÑ জনগণ ভোট দিয়েছে, তাদের সেই ভোটের সম্মান যাতে থাকে সেটি অবশ্যই আমরা মাথায় রেখে সার্বিকভাবে সুষম উন্নয়ন করে যাব। নির্বাচিত প্রতিনিধি যারা তাদের এটা মনে রাখতে হবে। দেশের মানুষের আকাক্সক্ষা পূরণ করা আমাদের কর্তব্য। বিজয় পাওয়া যত কঠিন, সেটি রক্ষা করে জনগণের জন্য কাজ করা আরও কঠিন। সেই কঠিন কাজের দায়িত্ব পেয়েছি, তা পালন করতে হবে। জনগণের ভোটের সম্মান যেন থাকে সেটা আমাদের নির্বাচিতদের মনে রাখতে হবে। আমরা সুষম উন্নয়ন করে যাব, জনগণের স্বার্থে কাজ করে যাব। আমাদের ওয়াদা, বাংলাদেশকে আমরা ক্ষুধামুক্ত ও দারিদ্র্যমুক্ত করব। জনগণকে দেয়া আমাদের প্রতিটি প্রতিশ্রুতি পূরণ করব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে তরুণদের জন্য সুন্দর বাংলাদেশ, ডিজিটাল বাংলাদেশ, আধুনিক বাংলাদেশ এবং মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে দেশ গড়তে জনগণ রায় দিয়েছে। মানুষ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দেশ গড়ে তোলার রায় দিয়েছে। তিনি বলেন, আমরা যে অঙ্গীকার করেছি সেই অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে পালন করব। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার পক্ষে রায় দিয়েছে দেশের মানুষ। দেশের মানুষ আমাদের ভোট দিয়ে যে আস্থা-বিশ্বাস রেখেছে, যে কোনো মূল্যের বিনিময়ে প্রয়োজনে নিজের জীবনের বিনিময়ে হলেও সেই মর্যাদা আমরা রক্ষা করব। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। যে কোনো ত্যাগের বিনিময়ে হলেও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সেই সোনার বাংলা আমরা গড়ে তুলবই।
এর আগে বেলা আড়াইটার দিকে এ বিজয়ের সমাবেশ শুরু হয়। শুরুতেই পবিত্র কোরান তেলাওয়াত, গীতা, বাইবেল ও ত্রিপিটক পাঠ করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে আওয়ামী লীগের বিজয়োৎবের বিশাল জনসভায় বক্তব্য রাখেন দলটির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু এমপি, তোফায়েল আহমেদ এমপি, সভাপতিম-লীর সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী এমপি, মোহাম্মদ নাসিম এমপি, মুক্তিযোদ্ধা বিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এমপি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য মির্জা আজম এমপি, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তরের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান এমপি, দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ, যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, তাঁতি লীগের খগেন্দ্র চন্দ্র দেবনাথ ও ছাত্রলীগের সভাপতি রেজোয়ানুল হক চৌধুরী শোভন।
সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়ে অভিনন্দনপত্র পাঠ করেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি। ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা অভিনন্দনপত্রটি শেখ হাসিনার কাছে হস্তান্তর করেন। পুরো সমাবেশ পরিচালনা করেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এমপি এবং উপপ্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন। এ সময় মূলমঞ্চে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা ছাড়াও নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ এবং উপদেষ্টা পরিষদের অধিকাংশ নেতাই উপস্থিত ছিলেন।
বেলা আড়াইটায় বিজয় উৎসবের সময় নির্ধারণ থাকলেও সকাল ১০টা থেকেই উৎসবস্থল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মানুষের ঢল নামতে শুরু করে। সকাল থেকেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে জনস্রোত নামে। বেলা ১২টার মধ্যেই জনসভাস্থলসহ চারদিক লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে। রাজধানীর প্রতিটি অলিগলি থেকে বাদ্য-বাজনার তালে তালে নেচে-গেয়ে বিজয়োৎসবে মাতোয়ারা হাজার হাজার নেতাকর্মী, সমর্থক আসতে থাকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। নির্বাচনী প্রতীক নৌকা, জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে এবং কণ্ঠে ‘জয় বাংলা’ সেøাগানের সঙ্গে ঢাকঢোলের বাদ্যে মুখর হয়ে আসা লাখো মানুষকে দুপুরে গানে গানে মাতিয়ে রাখেন দেশের জনপ্রিয় শিল্পীরা।
বেলা আড়াইটায় বিজয় সমাবেশ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরুর আগেই পুরো উদ্যান ছাপিয়ে জনস্রোত শাহবাগ থেকে টিএসসি, দোয়েল চত্বর, মৎস্য ভবন, হাইকোর্ট মাজার, কাঁটাবন, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালসহ আশপাশে এলাকাও তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ছাপিয়ে চতুর্দিক প্রায় এক বর্গকিলোমিটার জনসমুদ্রে রূপ নেয়। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে নৌকার পক্ষে যেমন গণজোয়ার উঠেছিল তেমনি গণজোয়ারের সৃষ্টি হয়েছিল আওয়ামী লীগের বিজয়োৎসবের সমাবেশে।
বেলা ৩টা ৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন নির্বাচনী প্রতীক নৌকার আদলে এবং পেছনের ব্যানারে সাজানো দলের এবারের ইশতেহারের মলাটের রঙে সুদৃশ্য ও নান্দনিক সুবিশাল মঞ্চে উপস্থিত হন তখন ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের অনেক ঘটনার সাক্ষী ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। বৈঠাসহ ছোট-বড় ৪০টির বেশি নৌকা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার ছবি সংবলিত ফেস্টুনে বর্ণাঢ্য সাজে সাজানো হয়েছিল সমাবেশের মাঠ।
নির্বাচনের আগে এবং বিজয়ের পরে চার শিল্পী যখন গানটি শুরু করেন, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীসহ তখন জনসমুদ্র থেকেও ‘জয় বাংলা, জিতবে আবার নৌকা, জয় বাংলা, জিতল আবার নৌকা’ গানের সঙ্গে কণ্ঠ মেলালে পুরো উদ্যান প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। হাজার হাজার নেতা-কর্মী-সমর্থক গানের তালে তালে নেচে-গেয়ে পুরো সমাবেশকে মাতিয়ে তোলেন।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে নির্বাচন কমিশনসহ পুলিশ-বিজিবি, আনসারসহ সকল সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ধন্যবাদ জানান। তিনি ভোটার ও তৃণমূলের নেতা-কর্মীদেরও ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, তৃণমূলের নেতাকর্মীরা এবার ঐক্যবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। নিশ্চয়ই একটা কথা উপলব্ধি করেছে, ঐক্যবদ্ধ শক্তি সব সময় বিজয় অর্জন করে, এ নির্বাচনে তা প্রমাণ হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় সকল রাজনৈতিক দলকে অংশগ্রহণ করে নির্বাচনকে অর্থবহ করায় ধন্যবাদ জানান। তাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, জয়-পরাজয় স্বাভাবিক ব্যাপার। যখন দায়িত্ব পেয়েছি জনগণের সেবা করার, দলমত নির্বিশেষে সবার জন্য আমাদের সরকার সুষমভাবে কাজ করে যাবে। প্রত্যেকে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করবে। রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা হবে। আর দেশের প্রতিটি নাগরিক আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। সকলের তরে, সকলের জন্য আমরা কাজ করব। তিনি বলেন, বিপুল বিজয়ের পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছে। তাই বর্তমান সরকার সবার জন্য কাজ করবে। সেখানে কোনো দলমত দেখা হবে না। যারা ভোট দিয়েছেন বা যারা ভোট দেননি তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাইÑ আওয়ামী লীগ সবার জন্য কাজ করবে। উন্নয়নের জন্য কাজ করবে, রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলার মানুষ আমাদের ভোট দিয়েছে। বাংলাদেশের জনগণ দীর্ঘদিন পর স্বতঃস্ফূর্তভাবে ভোট দিয়েছে। মা-বোন, নারীদের, তরুণ প্রজন্মকে যারা প্রথম ভোট দিয়েছে, কামার, কুমার, জেলে, কৃষক, শ্রমিক, মজুর সর্বস্তরের মানুষকে আমি ধন্যবাদ জানাই। আপনারা নৌকা মার্কার পক্ষে রায় দিয়ে আমাদের সুযোগ দিয়েছেন আপনাদের সেবার করার। জনগণের এ রায় অন্ধকার থেকে আলোর পথের যাত্রার রায়। আমরা জনগণের কাছে যে অঙ্গীকার করেছি তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে। যে কোনো ত্যাগের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে।
দেশকে সম্পূর্ণ দারিদ্র্যমুক্ত করতে সবার সহযোগিতা কামনা করে টানা চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসা শেখ হাসিনা বলেন, একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে আমাদের এটাই মূল লক্ষ্য যে, আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব। একটি উন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে গড়ে তুলব। যেখানে দেশের সকল মানুষের সহযোগিতা চাই। ছাত্র-শিক্ষকসহ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে আহ্বান জানাই, আসুন সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমাদের বর্তমানকে উৎসর্গ করি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। যাতে তারা একটি উন্নত ও সুন্দর সমাজ পায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখন যেমন বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে এবং যেন বিশ্বে মাথা উঁচু করে চলতে পারে, সেভাবেই আমরা আমাদের দেশকে গড়ে তুলতে চাই। সে জন্য যা যা করার দরকার করব। প্রতিটি গ্রামের মানুষ শহরের সকল নাগরিক সুবিধা পাবে। তৃণমূলে মানুষের জীবন উন্নত করব। শিক্ষার আলো প্রতিটি ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবে। প্রতিটি জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় হবে, প্রতিটি উপজেলায় কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হবে। ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে।
পঁচাত্তরে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ছয় বছর নিজের নির্বাসিত জীবনযাপন এবং দেশে ফিরে মানুষের গণতান্ত্রিক ও ভোট-ভাতের অধিকার আদায়ে দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের কথা তুলে ধরতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা। ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীতে এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত হয়ে বাংলাদেশ তা উদযাপন করবে ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ হবে উন্নত-সমৃদ্ধ সেটাই আমাদের প্রতিজ্ঞা। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে দেশ থেকে যেমন দুর্নীতি দূর করতে হবে, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একই সঙ্গে মাদকমুক্ত, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদমুক্ত দেশ করতে হবে, যেখানে মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। এদেশের মাটিতে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ, মাদকের কোনো স্থান হবে না।
দেশবাসীকে উদ্দেশ্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যে অঙ্গীকার করেছি তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করব। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। আমি আমার জীবন উৎসর্গ করেছি এদেশের মানুষের জন্য। স্বজন হারানোর বেদনা নিয়েও এদেশকে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছি। আমার জীবনে ব্যক্তিগত কোনো চাওয়া-পাওয়ার নেই। কী পেলাম বা না পেলাম সেটি বড় কথা নয়, দেশের মানুষকে কতটুকু দিতে পারলাম সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় কথা। তাই বাংলাদেশের একটি মানুষও ক্ষুধার্ত থাকবে না, গৃহহীন থাকবে না। সবাই চিকিৎসা পাবে, তরুণরা কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবে। বাংলাদেশ হবে একটি উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ। এটাই আমাদের প্রতিজ্ঞা, লক্ষ্য। দেশের জনগণ ও তরুণ প্রজন্ম আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে। আমরা সে লক্ষ্যে কাজ করব। আরও আধুনিক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।
কবি সুকান্তের কবিতার পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করে প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্য শেষ করেন। বলেন, ‘তবু যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ, প্রাণপণে পৃথিবীর সরাবো জঞ্জাল, এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমিÑ নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’

Category:

‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধির অর্ধশতক পূর্তি

2-6-2019 8-19-12 PMনূহ-উল-আলম লেনিন: মানবেতিহাসে যুগন্ধর ব্যক্তিদের মহিমান্বিত করার লক্ষ্যে উপাধি প্রদান বা বিশেষ বিশেষণ সহযোগে তাদের নামোচ্চারণ এবং পরিচিতি তুলে ধরা একটা প্রাচীন ঐতিহ্য। ধর্ম, দর্শন, শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি প্রভৃতি ক্ষেত্রে অবদান ছাড়াও রাজনীতি, স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রাম, যুদ্ধে বীরত্বব্যঞ্জক ভূমিকা এবং দুঃসাহসিক অভিযানে ঐতিহাসিক সাফল্য প্রভৃতির জন্য কখনও দেশবাসী এবং কখনওবা রাষ্ট্র এই বিশেষণ দিয়ে থাকে। এসব বিশেষণের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিবিশেষের প্রতি জনগণের ভালোবাসা এবং গৌরববোধের অভিপ্রকাশ ঘটে। এমনকি লোকমুখের মিথও একসময় ব্যক্তিবিশেষের নামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
৩২৮০ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে মেনেজ নামে এক রাজা সমগ্র মিসরের নগর রাষ্ট্রগুলোকে একীভূত করে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এই রাষ্ট্র বা সাম্রাজ্যের অধিশ্বর হওয়ার পর ‘ফারাও’ উপাধি ধারণ করেন, যার আভিধানিক অর্থ মহান নিবাস বা রাজপ্রাসাদের অধিবাসী।
জগৎজয়ী গ্রিক বীর আলেকজান্ডারের নামের সাথে যেমন ‘গ্রেট’ শব্দটি বিশেষণ হিসেবে উচ্চারিত হয়। প্রাচীন ভারতেও এ জাতীয় উপাধির প্রচলন ছিল। প্রাচীন ও মধ্যযুগে রাজ-রাজারা বিশেষ বিশেষণযুক্ত নাম ধারণ করে সিংহাসনে আরোহণ করতেন। ওইসব নাম কখনোই তার স্বদেশবাসীর স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা থেকে উৎসারিত হতো না। ধর্ম-সাধকরাও কোনো একটা পর্যায়ে সিদ্ধি অর্জন করলে নানা ধর্মীয় উপাধি বা বিশেষণে ভূষিত হতেন।
কিন্তু স্বদেশের কল্যাণে, স্বদেশবাসীর মুক্তি, স্বাধীনতা ও দেশপ্রেমের পরাকাষ্ঠা প্রদর্শনের প্রেক্ষিতে দেশে দেশে কালে কালে বিশেষ কোনো নেতা, সংগঠক বা ব্যক্তিকে ভালোবেসে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যে বিশেষণে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে, সেটি কোনো আরোপিত বিষয় না। এই উপমহাদেশেই তার অসংখ্য প্রমাণ আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ‘বিশ্ব কবি’ অথবা কাজী নজরুল ইসলামের নামের আগে ‘বিদ্রোহী কবি’ অভিধাÑ বাঙালির ভালোবাসা, গৌরববোধ ও আবেগের বহিঃপ্রকাশ। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরোধা মোহন দাস করমচাঁদ গান্ধীকে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ‘মহাত্মা’ হিসেবে আখ্যায়িত করায় এখনও বিশেষণটি তার নামের অংশ হয়ে গেছে। তেমনি ‘দেশবন্ধু’, ‘চিত্তরঞ্জন দাস’, ‘শেরে বাংলা’ এ. কে. ফজলুল হক, ‘নেতাজী’ সুভাষ বসু প্রভৃতি অভিধাও দেশবাসীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অভিপ্রকাশ। উপমহাদেশের বাইরে নব্য তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা কামাল পাশা সে-দেশের মানুষের কাছে আতাতুর্ক (তুর্কি জাতির মহান পথ প্রদর্শক) হিসেবে শ্রদ্ধার আসনে প্রতিষ্ঠিত। ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা আহমেদ শোয়েকার্নো হয়ে উঠেছিলেন, তার দেশবাসীর বাং কার্নো বা ভাই কার্নো হিসেবে। ভিয়েতনামের স্বাধীনতা, জাতীয় মুক্তি এবং সমাজতান্ত্রিক সংগ্রামের মহান নেতা নগুয়েন থাট তান (১৮৯০-১৯৬৯) ভিয়েতনামের জনগণের কাছে হো-চি মিন অর্থাৎ আলোকিত মানুষ (ঐব যিড় যধং নববহ বহষরমযঃবহবফ) হিসেবে পরিচিত ছিলেন। যাকে আদর করে আনকল হো (চাচা হো) বলেও অভিহিত করা হতো। এরকম দৃষ্টান্তের দীর্ঘ তালিকা দেওয়া যেতে পারে।
এই গৌরচন্দ্রিকাটুকু দিলাম, আমাদের এক অকৃত্রিম বন্ধুর পবিত্র নাম উচ্চারণের পাদটীকা হিসেবে। শেখ মুজিবুর রহমান। একেবারে আটপৌরে নাম। বাংলাদেশে হাজার হাজার মুজিবুর রহমান আছে। অথচ একজন ‘মুজিবুর রহমান’ হয়ে উঠলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। আর তারও আগে, যখন তিনি নির্বাচিত জননায়ক নন, রাষ্ট্রনায়ক বা রাষ্ট্রের স্থপতি বা জাতির পিতা নন, দলীয় কর্মীদের কাছে কেবল প্রিয় ‘মুজিব ভাই’, সেই তিনি হয়ে উঠলেন সমগ্র বঙ্গবাসীর বন্ধুÑ ‘বঙ্গবন্ধু’ শেখ মুজিবুর রহমান। সত্য বটে বাঙালির দীর্ঘ জাতীয় জাগরণের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান আগরতলা মামলার নামে অনিবার্য মৃত্যুদুয়ার থেকে ফিরে আসার অব্যবহিত পর ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানের অযুত লক্ষ মানুষের পক্ষ থেকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত হন। কিন্তু এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই এই মানুষটি বাঙালির হৃদয় জয় করে, তাদের অন্তরের গভীরে ‘বন্ধুর’ আসনে সমাসীন হয়েছিলেন। আর কালের বিবর্তনে এই আসনটি চিরস্থায়ী হয়ে গেছে। এখন পৈতৃক নাম ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ উচ্চারণ না করে কেবল ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দবন্ধটি উচ্চারণ করলেই মহিমান্বিত সেই মহামানবের শালপ্রাংসু চেহারার সাথে বাংলাদেশের মানচিত্রটি দীপ্যমান হয়ে ওঠে। একটা অভূতপূর্ব রসায়ন বটে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বাংলাদেশ যেন অভিন্ন সত্তা, অভিন্ন শব্দবন্ধ এবং অভিন্ন আইডেনটিটি হয়ে উঠেছে।
শেখ মুজিবুর রহমানের বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠা কোনো আকস্মিক ব্যাপার ছিল না। আনুষ্ঠানিক ঘোষণাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য। কিন্তু কেবল এই ঘোষণার মাধ্যমেই তিনি প্রকৃত অর্থে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন নি। বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠতে তাকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। জীবন-মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে টুঙ্গিপাড়ায় শেখ লুৎফর রহমান ও সায়রা খাতুনের জ্যেষ্ঠ পুত্র, কলকাতার তৎকালীন ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের নেতা তরুণ শেখ মুজিবুর রহমানকে তার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিনগুলো গরাদের আড়ালে কাটাতে হয়েছে। পাকিস্তান আন্দোলনের তুখোড় কর্মী হওয়া সত্ত্বেও দেশভাগের আগেই বুঝেছিলেন, এক কারাগার থেকে বাঙালি জাতি আরেক কারাগারে বন্দি হতে চলেছে। এই উপলব্ধি ছিল বলেই তার রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশেম এবং শরৎবসুÑ কিরণ শঙ্কর রায়ের ফর্মুলা অনুযায়ী অভিন্ন স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলার পক্ষে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। সাম্প্রদায়িক বর্ণ হিন্দুদের নেতৃত্বাধীন বেঙ্গল কংগ্রেস এবং সাম্প্রদায়িক অভিজাত মুসলমানদের নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগের বাংলা ভাগের ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু সোহরাওয়ার্দী-শরৎবোসদের সেই অসময়োচিত ও বিলম্বিত উদ্যোগ সফল না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত দেশভাগ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
দেশভাগ হলেও তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান জন্মলগ্ন থেকেই কৃত্রিম রাষ্ট্র পাকিস্তানকে মেনে নিতে পারেন নি। স্বাধীনতার পর বিশ্বখ্যাত সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট এবং বিশিষ্ট ভারতীয় বুদ্ধিজীবী ও বাংলাদেশের অকৃত্রিম সৃহৃদ অন্নদা শঙ্কর রায় পৃথক পৃথকভাবে বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা আপনি কখন থেকে চিন্তা করেছেন।’ বঙ্গবন্ধুর উত্তর; ‘যেদিন থেকে পাকিস্তান হয়েছে, সেদিন থেকে।’
এই বিশ্বাস ও বোধই যে বঙ্গবন্ধুকে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত পরিচালিত করেছে, তার বর্ণাঢ্য, সংগ্রামমুখর রাজনৈতিক জীবনই তার শ্রেষ্ঠ প্রমাণ। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠা, ১৯৪৮ সালের মার্চের ভাষা আন্দোলন, ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা, ১৯৫২-এর ভাষা সংগ্রাম, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট গঠন ও নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি, আইউবের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৪-এর ছাত্র আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধ এবং ১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তিসনদ ৬-দফা ঘোষণা এবং বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন এবং ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলন ও ৭ মার্চের ভাষণের পথ বেয়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের অভ্যুদয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের তরুণ বয়সের স্বপ্নেরই সার্থক রূপায়ণ।

দুই
শেখ মুজিবুর রহমানের আনুষ্ঠানিক ‘বঙ্গবন্ধু’ হয়ে ওঠার ৫০ বছর পূর্তি হতে চলেছে। জাতি হিসেবে এ ঘটনাটি আমাদের জন্য অত্যন্ত শ্লাঘার বিষয়। ১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী দলগুলোর গোলটেবিল বৈঠকের বিষয় নির্বাচনী কমিটিতে শেখ মুজিবুর রহমান তার ঐতিহাসিক ৬-দফা দাবি পাঠ করেন। তিনি তার ৬-দফা দাবি পরের দিন অনুষ্ঠিতব্য গোলটেবিল বৈঠকের এজেন্ডার অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। পশ্চিম পাকিস্তানের অংশগ্রহণকারী সকল দল একযোগে এই দাবিকে এজেন্ডার অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধিতা করেন। শেখ মুজিব তার দাবি আলোচ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত না করলে বৈঠক বয়কটের ঘোষণা দেন। ফলে পূর্ব নির্ধারিত ৭ ফেব্রুয়ারির  সর্বদলীয় বৈঠকটি ভেঙে যায়।
শেখ মুজিব লাহোরেই তার প্রস্তাব সাংবাদিকদের কাছে প্রকাশ করেন। শেখ মুজিব করাচি হয়ে ঢাকায় ফিরে আসেন। ঢাকা বিমানবন্দরেও তিনি ৬-দফা ব্যাখ্যা করেন।
৬-দফা আওয়ামী লীগ ওয়ার্কিং কমিটিতে আলোচনা এবং অনুমোদন না করেই শেখ মুজিব লাহোরের বৈঠকে উত্থাপন করেছিলেন। ফলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের একাংশ তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। ১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৬, আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভা আহ্বান করা হয়। অনুমোদন ছাড়া ৬-দফা উত্থাপনের প্রতিবাদে আওয়ামী লীগের সভাপতি মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ তার কয়েকজন অনুসারীসহ ওয়ার্কিং কমিটির সভা ত্যাগ করেন। প্রবীণ নেতা অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম খান প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন। অনেকের মধ্যেই ছিল দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও ভয়-ভীতি। শেষ পর্যন্ত সহ-সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওয়ার্কিং কমিটির সভায় শেখ মুজিবের ৬-দফা প্রস্তাব গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত হয় ১৮ মার্চ হোটেল ইডেনে অনুষ্ঠিতব্য দলের কাউন্সিলে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ৬-দফা পেশ করা হবে।
১৯৬৭ সাল থেকেই ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) ও ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন)-এর মধ্যে শিক্ষা কমিশন রিপোর্টকে সামনে রেখে ঐক্যবদ্ধ ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৯৬৮ সালের মাঝামাঝি খোদ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ভেতরেই আইউব-বিরোধী শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ’৬৫-এর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এবং তাসখন্দ চুক্তিকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর পেছনে পাকিস্তানের প্রকৃত শাসকগোষ্ঠীর একাংশ বিশেষত, সেনাবাহিনীর প্রচ্ছন্ন সমর্থন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মধ্যেই মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়। পাকিস্তানি সেনা ও আমলাতন্ত্রের একাংশের সমর্থনে জুলফিকার আলী ভুট্টো পিপলস পার্টি নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। সে-সময়ে বাংলাদেশেও ভুট্টো তার দল গঠনের ব্যর্থ চেষ্টা করেন। তবে সরকার সমর্থক ‘জাতীয় ছাত্র ফেডারেশন’ বা এনএসএফ-এর একটি অংশ আইউবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। তৎকালীন পূর্ব বাংলায় ঐক্যবদ্ধ ছাত্র আন্দোলন গড়ে তোলার একটা অনুকূল বাতারণ সৃষ্টি হয়।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর ১ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় খোলে। বিশ্ববিদ্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়। ২ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিবাদ সভাকে কেন্দ্র করে পুলিশের সাথে ছাত্ররা সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। স্বতঃস্ফূর্তভাবে  আন্দোলন সূচিত হলেও তখন পর্যন্ত আন্দোলনের কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি প্রণীত হয় নি। ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া), ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) গ্রুপের নেতৃবৃন্দ অবিলম্বে একটি কর্মসূচি প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ২ জানুয়ারি থেকে ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত এ সংগঠনগুলোর মধ্যে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর একটি কর্মসূচি প্রণীত হয়। ৫ জানুয়ারি তিন ছাত্র সংগঠনের ছয় নেতার নামে এই কর্মসূচি সংবাদপত্রে প্রেরণ করা হয়। যা ৬ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়। কিন্তু পরের দিন ছাত্র নেতৃবৃন্দ এই কর্মসূচিকে আরও সুনির্দিষ্ট করেন। এবার ওই তিন ছাত্র সংগঠন ছাড়াও ডাকসু ও এনএসএফ’কেও কর্মসূচির স্বাক্ষরদাতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
ডাকসু, ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া), ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) ও এনএসএফ ৬-দফাভিত্তিক ১১-দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করেন। এতে ৬-দফার পূর্ণ বয়ান, শিক্ষার দাবি, শ্রমিক, কৃষকদের আশু দাবি, বৃহৎ শিল্প জাতীয়করণ, ভূমি সংস্কার এবং জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি প্রভৃতি দাবিসহ প্রণীত হয় ঐতিহাসিক ১১-দফা দাবি। তবে ওই দাবিনামায় আগরতলা মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবসহ রাজবন্দির মুক্তির দাবিও গুরুত্বের সাথে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৬৯ সালের তৎকালীন ইকবাল হল ক্যান্টিনের দোতলায় ছাত্রসংসদ কার্যালয়ে ৬ জানুয়ারি চূড়ান্তভাবে ছাত্র নেতৃবৃন্দ ঐতিহাসিক ১১-দফা কর্মসূচিতে স্বাক্ষর দান করেন। গঠিত হয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। প্রত্যেক ছাত্র সংগঠন থেকে দুজন, অর্থাৎ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে নিয়ে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ঐতিহ্য অনুসারে ডাকসুর সহ-সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকও ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য বলে গণ্য হন। আর প্রথাগতভাবে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভায় সভাপতির দায়িত্ব ছিল ডাকসুর ভিপিÑ তোফায়েল আহমদের। একইসঙ্গে তিনিই ছিলেন ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের মুখপাত্র ও সমন্বয়ক। সাকুল্যে ১০ সদস্য বিশিষ্ট ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ আন্দোলনের প্রাথমিক কর্মসূচি হিসেবে ১০ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে সমাবেশ ও মিছিলের কর্মসূচি গ্রহণ করে। তোফায়েল আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে প্রথম ১১-দফা দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক খালেদ মোহাম্মদ আলী পাঠ করেন। সরকার মিছিল নিষিদ্ধ করে। ১৪৪ ধারা জারি করে। প্রতিবাদে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১৭ জানুয়ারি আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করে।
১৭ জানুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল করার ভেতর দিয়ে অগ্নি-স্ফুলিঙ্গের মতো ছাত্র আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলন অপ্রতিরোধ্য গণ-অভ্যুত্থানে পরিণত হয়। ২০ জানুয়ারি ছাত্রনেতা আসাদকে গুলি করে হত্যা, রাতে কারফিউ জারি, আর ২৪ জানুয়ারি নবকুমার ইনস্টিটিউটের ছাত্র কিশোর মতিউরকে হত্যাসহ একাধিক স্থানে গুলিবর্ষণ ও হত্যাকা-ের ফলে রাজধানী ঢাকায় সর্বস্তরের মানুষ রাস্তায় নেমে আসেন। সৃষ্টি হয় অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থান। আন্দোলনের মুখে সরকারকে পিছু হটতে হয়। কারফিউ ও ১৪৪ ধারা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।
১১-দফা আন্দোলন বাংলার মানুষের প্রাণের দাবিতে পরিণত হয়। তবে ৬-দফাভিত্তিক ১১-দফার প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন থাকলে দেশবাসীর কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় দাবি হয়ে ওঠে, শেখ মুজিবের মুক্তি, আগরতলা মামলা প্রত্যাহার এবং আইউবের পতনের দাবি।
জাগো জাগো বাঙালি জাগো, তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা, পিন্ডি না ঢাকা-ঢাকা ঢাকা, তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব শেখ মুজিব, জেলের তালা ভাঙবো, শেখ মুজিবকে আনবোÑ প্রভৃতি সেøাগান সর্বজনীন সেøাগানে পরিণত হয়।
বস্তুত, ১১-দফা দাবির ব্যানারে ৬-দফার মধ্য দিয়ে বাঙালির যে জাতীয় জাগরণ ও স্বাধীনতার আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, সেই আন্দোলনই দেশব্যাপী ব্যাপক জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়। বৈপ্লবিক মেজাজ নিয়ে আন্দোলনে শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র, যুব, বুদ্ধিজীবী, নারীসমাজসহ সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ বাড়তে বাড়তে কূলপ্লাবী হয়ে ওঠে।
কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রামের পাশাপাশি ওই সময়ে পাকিস্তানের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও আইউব শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়। ১১-দফার মতো জাতীয়তাবাদী চরিত্রের না হলেও বিরোধী দলগুলোর জোট একটা ৮-দফা দাবি প্রণয়ন করে। আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ-ওয়ালী-মোজাফ্ফর) নবাবজাদা নসরুল্লাহ খানের পিডিএম ও জমিয়াতুল উলেমা-ই-ইসলাম প্রভৃতি দল মিলিত হয় ‘ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটি’ সংক্ষেপে ‘ডাক’ গঠন করে। ডাক গঠনের ফলে জনমনে উৎসাহের সঞ্চার হয় এবং ছাত্র আন্দোলনে নতুন গতিবেগ সঞ্চারিত হয়।
ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনে ‘ডাক’ ছিল সহযোগীর ভূমিকায়। বস্তুত আন্দোলন পরিচালিত হয়েছে ছাত্র সমাজের নেতৃত্বে। ঐ সময় পশ্চিম পাকিস্তানেও আইউববিরোধী আন্দোলন ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। ফলে সামগ্রিকভাবেই গোটা পাকিস্তানে আইউব-বিরোধী আন্দোলন প্রবল হয়ে ওঠে। আইউব সরকার কেবল বাংলাদেশের না, সমগ্র পাকিস্তানের জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দিয়ে বিচার প্রহসনের নামে শেখ মুজিবকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ হিসেবে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলাবার ষড়যন্ত্র করেছিল। কিন্তু আগরতলা মামলা তাদের জন্য বুমেরাং হয়ে যায়। সামরিক আদালতের মামলার শুনানি প্রতিদিন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হতে থাকে। শেখ মুজিবের জবানবন্দি এবং সওয়াল জবাব যখন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয় তখন তা বাঙালির মনে গভীর আবেগের সঞ্চার করে। যা ছিল অজানাÑ অজ্ঞাত, মামলার সুবাদে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শেখ মুজিবের অকুতোভয় আপসহীন সংগ্রামের কাহিনিÑ বাঙালির মনে দেশপ্রেম ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রতিজ্ঞাকে আরও শাণিত করে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সৃষ্টি হয় তীব্র ঘৃণা। কারাবন্দি শেখ মুজিব হয়ে ওঠেন বাঙালির নয়নমণিÑ মুক্তির দিশারী। তার জনপ্রিয়তা আকাশস্পর্শ করে। যে কোনো মূল্যে তাকে মুক্ত করাই হয়ে ওঠে  অপ্রতিরোধ্য গণদাবি।
দুটি ঘটনা এই আন্দোলনের অগ্নিতে ঘৃতাহুতি দেওয়ার কাজ করে। ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি অবস্থায় আগরতলা মামলার অন্যতম অভিযুক্ত সার্জেন্ট জহুরুল হককে সেনাবাহিনী গুলি করে হত্যা করে। ঢাকায় প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন গণবিস্ফোরণের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। শেখ মুজিবের নিরাপত্তা নিয়ে সমগ্র জাতি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। সংগ্রামী জনতা ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাওয়ের জন্য ছাত্র নেতৃবৃন্দকে চাপ দিতে থাকে। ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহাকে পাকিস্তানি সেনারা বেয়োনেট চার্জ করে নির্মমভাবে হত্যা করে। সমগ্র পরিস্থিতি তখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার উপক্রম হয়।
আন্দোলনের ব্যাপক বিস্তার, গণ-অভ্যুত্থানের বিপ্লবী মেজাজ এবং শেখ মুজিবের মুক্তির প্রশ্নে বাঙালির মনে গভীর আবেগ আইউব সরকারকে প্রমাদ গুনতে বাধ্য করে। আইউব সরকার উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতির সমাধানকল্পে ইসলামাবাদে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠানের কথা ঘোষণা করে। এমনকি শেখ মুজিবকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে গোলটেবিলে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেয়।
ইতিহাসের এই বিশেষ মুহূর্তটিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার নিয়ামক ভূমিকা পালন করেন মহীয়সী বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব। তার কাছে এটা স্পষ্ট হয়ে যায়, আইউবের পতন এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর শেখ মুজিব প্যারোলে মুক্তি নিয়ে গোলটেবিলে গেলেই বরং আন্দোলন ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। দেশবাসীর মনে শেখ মুজিবের যে অতিমানবিক বীরত্বব্যঞ্জক বিভূতি গড়ে উঠেছে, তা ভেঙে যাবে। বেগম মুজিব শেখ মুজিবকে বার্তা পাঠান কোনোক্রমেই তিনি যেন প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাবে রাজি না হন। আগরতলা মামলা প্রত্যাহার করে বিনা শর্তে তাকে মুক্তি দিলেই কেবল ‘মুক্ত মানুষ’ হিসেবে তিনি গোলটেবিলে অংশ নিতে পারেন।
যথারীতি শেখ মুজিব প্যারোলে মুক্তির প্রস্তাব ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি আগরতলা মামলা প্রত্যাহার এবং তিনিসহ সকল রাজবন্দির নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেন। অন্যথায় সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনার সম্ভাবনা তিনি নাকচ করে দেন।
১৯৬৯-এর ২১ ফেব্রুয়ারি পল্টন ময়দানে জনাব তোফায়েল আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় বিশাল ছাত্র-জনসভা। এই জনসভা থেকে ছাত্রসমাজ আইউব সরকারের প্রতি ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম ঘোষণা করে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আগরতলা মামলা প্রত্যাহার, নিঃশর্তভাবে শেখ মুজিব এবং সকল রাজবন্দির মুক্তি দাবি করা হয়। এই আল্টিমেটাম শাসকগোষ্ঠীর ভিত নাড়িয়ে দেয়। দাবি আদায়ে বাংলার মানুষ যে কোনো ত্যাগের জন্য প্রস্তুত হয়।
সমগ্র বাংলাদেশ তখন উর্মিল সাগরের মতো উত্তাল। শেখ মুজিবের আপসহীন বীরোচিত ভূমিকা, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ক্রমবর্ধমান গণ-অভ্যুত্থান এবং খোদ শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে বিভেদের পটভূমিতে শেষ পর্যন্ত লৌহমানব আইউব খান মাথানত করতে বাধ্য হয়। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা মামলা প্রত্যাহার এবং নিঃশর্তভাবে শেখ মুজিবের মুক্তি প্রদান করা হয়। একইসঙ্গে সারাদেশে অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদেরও নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়া হয়।
আজ থেকে ৫০ বছর আগে এভাবেই বাঙালির সংগ্রামুখর ইতিহাসে একটি বড় অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে। আবেগে আপ্লুত বাঙালি শেখ মুজিবকে এক নজর দেখার জন্য পাগলপারা হয়ে ওঠে। কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ২৩ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবকে তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) গণসংবর্ধনা দেওয়া হবে।
১৯৭১-এর ৭ মার্চের আগে সর্ববৃহৎ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় রেসকোর্স ময়দানে। লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাবেশ ঘটে। ডাকসুর সহ-সভাপতি তোফায়েল আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বিশাল জনসমুদ্রে ছাত্রনেতাদের মধ্যে ভাষণ দেন ছাত্রলীগের সভাপতি আবদুর রৌফ, ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি সাইফউদ্দিন আহমেদ মানিক, ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) সভাপতি মোস্তফা জামাল হায়দার প্রমুখ।
সভাপতির ভাষণ দেন তোফায়েল আহমেদ। তোফায়েল আহমেদ তার ভাষণে শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ছাত্র নেতৃবৃন্দ ও সমবেত জনগণ দু’হাত তুলে এই ঘোষণাকে সমর্থন জানায়। রেসকোর্স ময়দানে এক অভিনব আবেগঘন পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
প্রসঙ্গত, একটা কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। শেখ মুজিবকে ২৩ ফেব্রুয়ারি এককভাবে গণসংবর্ধনা দেওয়ার প্রশ্নে প্রথমে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে ঐকমত্য ছিল না। দুই ছাত্র ইউনিয়নই চেয়েছিল শেখ মুজিবসহ অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের একসঙ্গে সংবর্ধনা দিতে। কিন্তু ছাত্রলীগ এই প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। তারা শেখ মুজিবকে ২৩ ফেব্রুয়ারি এককভাবে সংবর্ধনা দেওয়ার প্রশ্নে অনড় ভূমিকা নেয়। তবে আলাদাভাবে অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাকেও পল্টন ময়দানে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেওয়ার ব্যাপারে তাদের সম্মতির কথা জানান। শেষ পর্যন্ত অন্যান্য ছাত্র সংগঠনও ছাত্রলীগের এই প্রস্তাব মেনে নেয় এবং ২৩ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ঐক্যবদ্ধভাবে রেসকোর্স ময়দানের সংবর্ধনার আয়োজন করে।
কিন্তু রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবকে যে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেওয়া হবেÑ এ কথাটি ঘোষণার আগে পর্যন্ত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে আলোচিত হয়নি। আমরা তৎকালীন ছাত্রনেতাদের কাছ থেকেই জেনেছি, ডাকসুর সহ-সভাপতি ও রেসকোর্সের গণসংবর্ধনা সভার সভাপতি তোফায়েল আহমেদ এ কথা ঘোষণার আগে পর্যন্ত কাউকে বলেন নি। যদ্দুর জানি, তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতৃবৃন্দের কারও কারও সাথে এবং সাবেক কোনো কোনো ছাত্রলীগ নেতার সাথে তোফায়েল আহমেদের এ ব্যাপারে পরামর্শ হয়। তাদের পরামর্শই তিনি ঘোষণার আগে পর্যন্ত বিষয়টি প্রকাশ করেন নি।
আশঙ্কা ছিল, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে আলোচনা করলে যদি ঐকমত্য না হয়, সেই ধারণা থেকেই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে পূর্বাহ্নে আলোচনা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে ঐতিহাসিক বাস্তবতা হচ্ছে, রেসকোর্স ময়দানে তোফায়েল আহমেদ যখন শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণা দেন তখন মঞ্চে উপস্থিত ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া), ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) ও ডাকসুসহ সকল ছাত্র নেতৃবৃন্দ রেসকোর্সের লক্ষ জনতার সাথে দু-হাত তুলে এই ঘোষণার প্রতি সমর্থন জানান। বস্তুত, সর্বসম্মতিক্রমেই শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করা হয়।
কেউ কেউ কিছু না জেনেই ভিত্তিহীন মতদ্বৈধতার প্রশ্ন তুলতে চান, কেউ আবার ‘বঙ্গবন্ধু’ শব্দটি আগেই চয়ন ও ব্যবহারের কীর্তি দাবি করেনÑ যার কোনো ঐতিহাসিক মূল্য নেই।
আগরতলা মামলা প্রত্যাহারের ৫০ বছর পূর্তি এবং শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করার ৫০ বছর পূর্তিতে আমাদের মনে রাখতে হবেÑ এ দুটি ঘটনাই ছিল ইতিহাসের অনিবার্য পরিণতি এবং বাঙালি জাতির সম্মিলিত ইচ্ছার মহত্তম প্রকাশ। জয় বঙ্গবন্ধু।

পরিশিষ্ট
প্রসঙ্গটি শেষ করছিÑ ২৪ ফেব্রুয়ারি ইত্তেফাকে প্রকাশিত স্টাফ রিপোর্টার প্রদত্ত সংবাদ প্রতিবেদনটির হুবহু উদ্ধৃতি দিয়েÑ

‘বঙ্গবন্ধু’ শেখ মুজিব
(স্টাফ রিপোর্টার)
‘ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের গণমহাসাগর গতকাল (রবিবার) পূর্ব বাংলার নির্যাতিত জন-নায়ক শেখ মুজিবর রহমানকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করে।
কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ও গতকল্যকার গণসম্বর্ধনা সভার সভাপতি জনাব তোফায়েল আহমদ শেখ মুজিবর রহমানের বাংলা ও বাংগালীর স্বার্থে অবিচল ও অবিরাম সংগ্রামের কথা স্মরণ করাইয়া দিয়া ঢাকার ইতিহাসে সর্বকালের সর্ববৃহৎ জনসমাবেশের উদ্দেশ্যে বলেন যে, আমরা বক্তৃতা-বিবৃতিতে শেখ মুজিবর রহমানকে নানা বিশেষণে বিশেষিত করার প্রয়াস পাই। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক জীবন বিশ্লেষণ করিলে যে সত্যটি সবচাইতে ভাস্বর হইয়া উঠে তা হইতেছে তিনি মানব দরদীÑ বিশেষ করিয়া বাংলা ও বাঙ্গালীর দরদী, প্রকৃত বন্ধু। তাই আজকের এই ঐতিহাসিক জনসমুদ্রের পক্ষ হইতে আমরা তাঁকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করিতে চাই। রেসকোর্সের জনতার মহাসমুদ্র তখন একবাক্যে বিপুল করতালির মধ্য দিয়া এই প্রস্তাব সমর্থন করেন।’

Category:

‘বইমেলা বাঙালির প্রাণের মেলা’

2-6-2019 8-17-19 PMআনিস আহামেদ: বায়ান্নর চেতনায় উদ্ভাসিত অমর একুশে গ্রন্থমেলা শুরু হয়েছে। প্রতিবারের মতোই বাঙালি জাতিসত্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষের প্রতীক বাংলা একাডেমি এই মেলার আয়োজন করছে। একাডেমি প্রাঙ্গণে গত ১ ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী মেলার উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় গ্রন্থমেলাকে প্রাণের মেলা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি শুধু বই কেনা-বেচার জন্য নয়, আমাদের বাঙালির প্রাণের মেলা। মনটা পড়ে থাকে এই গ্রন্থমেলায়।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ এমপি। স্বাগত বক্তব্য রাখেন আয়োজক বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী। সম্মানিত বিদেশি অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলা ভাষার প্রখ্যাত কবি শঙ্খ ঘোষ এবং মিসরের প্রখ্যাত লেখক-সাংবাদিক ও গবেষক মোহসেন আল-আরিশি। প্রকাশক প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ফরিদ আহমেদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।
প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগে যখন ক্ষমতায় ছিলাম না তখন গ্রন্থমেলায় আসতাম। ঘুরে বেড়াতাম। এখন বলতে গেলে এক ধরনের বন্দী জীবনযাপনই করতে হয়। আসার আর সুযোগ হয় না। আসতে গেলে অন্যের অসুবিধা হয়। নিরাপত্তার কারণে মানুষের যে অসুবিধা হবে তা বিবেচনা করে আর আসার ইচ্ছাটা হয় না। তবে সত্যি বলতে কী মনটা পড়ে থাকে এখানে।
নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যতই আমরা যান্ত্রিক হই না কেন, বইয়ের চাহিদা কখনও শেষ হবে না। নতুন বইয়ের মলাট, বই শেলফে সাজিয়ে রাখা, বইয়ের পাতা উল্টে পড়ার মধ্যে যে আনন্দ আছে, আমরা সব সময় তা পেতে চাই। তবে একইসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সব বই অনলাইনে বই দেয়া এবং ডিজিটাল লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার ওপরও জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। বাংলা একাডেমিকে ধন্যবাদ জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, গ্রন্থমেলা আয়োজন করে বাংলা একাডেমি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
প্রধানমন্ত্রী এদিন ইতিহাস জানার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। বাঙালির ইতিহাস আত্মত্যাগের উল্লেখ করে আগামী প্রজন্মকে ইতিহাস সম্পর্কে জানার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ গ্রন্থ সিরিজের দ্বিতীয় খ-ের আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি বলেন, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা ১৯৪৮ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত গোয়েন্দাগিরি করে জাতির জনকের বিরুদ্ধে যেসব রিপোর্ট দিয়েছিল, সেগুলোর ভিত্তিতে এই সিরিজ গ্রন্থ প্রকাশ করা হচ্ছে। আগে প্রথম খ- প্রকাশ করা হয়েছে। এবার এলো দ্বিতীয় খ-।
বই আকারে প্রকাশের উদ্যোগকে সাহসের উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো নেতার বিরুদ্ধে গোয়েন্দা সংস্থার দেওয়া রিপোর্ট বই আকারে প্রকাশ করার নজির নেই। আমি জানি না পৃথিবীর কোথাও অতীতে কেউ এ ধরনের প্রকাশনা করেছে কি না। এসব দলিলে আপনারা অনেক তথ্য পাবেন। একজন নেতা কোথায় যাচ্ছেন, কী করছেন, কী বললেন, কারাগারে থাকা অবস্থায় তার কাছে লেখা চিঠি বা তিনি যেসব চিঠি লিখেছেন বা যোগাযোগ করেছেনÑ এসব বিষয় নিয়ে বই প্রকাশ করছি আমরা।
তিনি বলেন, এসব তথ্য ইতিহাস বিকৃতি থেকে মুক্তি দিতে পারে। সত্যকে উদ্ভাসিত করতে পারে। দুর্লভ দলিল উদ্ধারের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে সরকারে আসার পরই আমি গোয়েন্দা রিপোর্টগুলো সংগ্রহ করি। একটি করে কপি আমার কাছে রেখে মূল দলিল এসবির কাছে পাঠিয়ে দিই। পরে আমি এবং আমার বান্ধবী বেবী মওদুদ দুজন দিনের পর দিন একসঙ্গে বসে পড়ি। তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করি। তখন আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করি যে, এগুলো অমূল্য সম্পদ। তিনি বলেন, এখানে ৪৬টি ফাইল ৪৮টি খ- ছিল। ২০০৯ সালে সরকারে আসার পর প্রকাশ করার পদক্ষেপ নিই। সিরিজের মোট ১৪ খ- প্রকাশিত হবে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী এদিন গুরুত্বপূর্ণ দলিলের ভিত্তিতে ভাষা আন্দোলনে শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালে। জাতির পিতা যখন আইন বিভাগের ছাত্র সে-সময় এই আন্দোলন শুরু করেন। সদ্য প্রকাশিত বইতে তথ্য পাওয়া যায় যে, জাতির পিতা ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগ নামে একটি সংগঠনও গড়ে তুলেন। তমদ্দুন মজলিস ছাত্রলীগ অন্যান্য ছাত্র সংগঠন সকলকে নিয়ে একটি ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে আন্দোলন শুরু করেন। ১১ মার্চ থেকে সে আন্দোলন কর্মসূচি শুরু হয়।
বই থেকে একটি প্রতিবেদন পড়ে শোনান প্রধানমন্ত্রী, যেখানে বলা হয়Ñ শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেফতারের প্রতিবাদে ১৯৪৮ সালের ১৬ মার্চ গোপালগঞ্জে হরতাল ডাকা হয়। বিকেলে এসএম একাডেমি এবং এমএন ইনস্টিটিউটে ৪০০ ছাত্র শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। সেøাগান ছিলÑ রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। নাজিম উদ্দীন নিপাত যাক। মুজিবকে মুক্তি দাও। তিনি বলেন, অর্থাৎ আন্দোলনের শুরুতেই ১১ মার্চ শেখ মুজিবসহ অনেক ছাত্রনেতাকে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৪৯ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকায় জুুলুম প্রতিরোধ দিবস পালিত হয়। এ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে ছাত্র-ছাত্রীদের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভায় শেখ মুজিব, দবিরুল ইসলাম ও নাদিরা বেগম বক্তৃতা করেন। সভায় শেখ মুজিব বলেন, এক মাসের মধ্যে ছাত্রদের ন্যায্য দাবি পূরণ করা না হলে ছাত্ররা প্রত্যক্ষ সংগ্রামে নামবে। শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের ১৯৭ নম্বর পৃষ্ঠা থেকে পড়ে শোনান প্রধানমন্ত্রী। এই পাঠ থেকেও ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা সম্পর্কে জানা যায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির পরও আন্দোলন করতে হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমান অনশন করে কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করেন। এবং ৩০ মে খাজা নাজিমুদ্দিনের কাছে স্মারকলিপি পেশ করতে করাচিতে যান। সেখানে পেশ করা স্মারকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হয় বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। এভাবে ভাষা আন্দোলনে মুজিবের অজানা অধ্যায় সবার সামনে তুলে ধরেন তারই কন্যা। পরে অমর একুশে গ্রন্থমেলা ঘুরে দেখেন তিনি।
শেখ হাসিনাকে নিয়ে নতুন অনুবাদ গ্রন্থ
বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছে আরবি ভাষায় বইয়ের অনুবাদ ‘শেখ হাসিনা : যে রূপকথা শুধু রূপকথা নয়।’ মিসরের সাংবাদিক লেখক মোহসেন আল-আরিশি রচিত বইয়ের বাংলা অনুবাদ প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী।

বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রদান
উদ্বোধনী মঞ্চে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ২০১৮ প্রদান করা হয়। এ বছর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যে আফসান চৌধুরী, প্রবন্ধ ও গবেষণায় সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ, কবিতায় কাজী রোজী, কথাসাহিত্যে মোহিত কামাল এই পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন। প্রত্যেকের হাতে পুরস্কার তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।

দুই ভেন্যু বর্ধিত পরিসর
অমর একুশে গ্রন্থমেলা বইকেন্দ্রিক সবচেয়ে বড় আয়োজন। কালক্রমে আয়োজনটি বঙ্গ সংস্কৃতির মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। প্রতিবারের মতো এবারও দেশের সৃজনশীল সকল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এই মেলায় অংশ নিয়েছে। বর্তমানে মেলার দুটি ভেন্যু। একটি বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ। অন্যটি ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। দুই অংশ মিলিয়ে প্রায় ৩ লাখ বর্গফুট জায়গায় মেলা আয়োজন করা হয়েছে। একাডেমি প্রাঙ্গণে স্থান পেয়েছে ১০৪টি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। আছে তারুণ্যের প্ল্যাটফর্ম লিটল ম্যাগাজিন চত্বর। বয়ড়াতলায় ১৮০টি লিটলম্যাগকে ১৫৫টি স্টল দেওয়া হয়েছে। ২৫ স্টলে দুটি করে লিটল ম্যাগাজিন প্রদর্শন করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আর মূল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো থাকছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে। চার চত্বরে বিন্যস্ত করা উদ্যানে ৩৯৫টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান স্টল ও প্যাভিলিয়ন সাজিয়েছে। বাংলা একাডেমিসহ ২৪ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে ২৪টি প্যাভিলিয়ন। সব মিলিয়ে মেলায় অংশ নিচ্ছে ৪৯৯টি প্রতিষ্ঠান। বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৭৭০টি ইউনিট। একক ও ক্ষুদ্র প্রকাশনা সংস্থার বই পাওয়া যাবে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের স্টলে। গ্রন্থমেলায় আগতরা ২৫ শতাংশ ছাড়ে বই কিনতে পারবেন। এছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে থাকছে শিশুচত্বর। বন্ধের দিনগুলোতে রাখা হবে বিশেষ শিশুপ্রহরও।

লেখক বলছি
মেলার নির্বাচিত বই নিয়ে থাকছে নতুন আয়োজন ‘লেখক বলছি।’ এই মঞ্চে প্রতিদিন পাঁচজন লেখক তাদের বই নিয়ে পাঠকের মুখোমুখি হবেন। প্রত্যেক লেখক নিজের বই সম্পর্কে ২০ মিনিট বলার সুযোগ পাবেন। কিশোর লেখকদের উৎসাহিত করতেও থাকবে বিশেষ উদ্যোগ।

সেমিনার কবিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
২ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রতিদিন বিকাল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সেমিনার। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-রাজনীতি-সমকালীন প্রসঙ্গ নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন এবং আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। পাশাপাশি বিশিষ্ট বাঙালি মনীষীদের জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নতুন যোগ হয়েছে কবিতা। প্রতিদিনই থাকবে কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ এবং আবৃত্তি। শিশু-কিশোরদের জন্যও থাকবে নানা আয়োজন। চিত্রাঙ্কন, সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতা এবং সংগীত প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হবে।

Category:

বাঙালির জয় কবিতার জয়

2-6-2019 8-13-23 PM

জাতীয় কবিতা উৎসব ২০১৯

উত্তরণ প্রতিবেদন :
কবিতা মানেই জীবনের ধারাভাষ্য। কবির বাণীতেই উদ্ভাসিত হয় সুদূর অতীত থেকে সমকাল। কবিতার আশ্রয়েই কবিরা লড়ে যান অমানবিকতার বিরুদ্ধে। চারপাশে যখন ছায়া নামে শঙ্কার তখন কাব্যবীজের স্ফুরণে জেগে ওঠেন আলোর পথযাত্রীরা। এভাবেই সত্য ও সত্তাকে একসঙ্গে প্রকাশ করেন কবি, সৃষ্টি হয় কবিতা। শব্দের পিঠে শব্দের সংযোজনে উচ্চারিত হয় অন্তর্নিহিত বিষয়। সেই শব্দমালায় থাকে দ্রোহ, প্রেম ও সময়ের দিনলিপি। সময়ের ওই দিনপঞ্জিকেই বেছে নিল জাতীয় কবিতা উৎসব। অশুভ শক্তিকে পরাজিত করার বারতায় উচ্চকিত হলো বাঙালির বিজয়গাথা। শিল্পিত উচ্চারণে ব্যক্ত হলো কাক্সিক্ষত স্বদেশের স্বপ্নগাথা, আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশের কথা। দিনভর দেশ-বিদেশের কবিদের কবিতা পাঠে মুখরিত হলো উৎসব। ‘বাঙালির জয় কবিতার জয়’ সেøাগানে গত ১ ও ২ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাকিম চত্বরে অনুষ্ঠিত হয় ৩৩তম এই উৎসব।
হাকিম চত্বর নামে পরিচিত ঢাবির কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার প্রাঙ্গণে ১ ফেব্রুয়ারি শীতের রোদেলা সকালে বাঙালির বিজয়ের প্রতিধ্বনিত জাতীয় কবিতা পরিষদ আয়োজিত দুদিনব্যাপী উৎসব। এবার এই উৎসব উৎসর্গ করা হয়েছে ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ আসাদ, ডা. শামসুজ্জোহা, সার্জেন্ট জহুরুল হক ও মতিউর রহমানকে। সারাদেশের কবিদের সঙ্গে ৩৩তম এই উৎসবে অংশ নিচ্ছেন ভিন দেশের ২০ কবি। ৩৩তম উৎসব উদ্বোধন করেন প্রখ্যাত কবি আসাদ চৌধুরী। উদ্বোধনী দিনেই হয়েছে কবিতা পাঠ, আবৃত্তি পরিবেশনা ও মুক্ত আলোচনায় সাজানো ৬টি অধিবেশন। পারস্পরিক ভাববিনিময়ের পাশাপাশি দিনব্যাপী বিভিন্ন পর্বে কবিরা পাঠ করেছেন কবিতা। আমন্ত্রিত কবিদের সঙ্গে নিবন্ধনের মাধ্যমে স্বরচিত কবিতা পাঠে অংশ নিয়েছেন দেশের নানা প্রান্তের কবিরা। ছিল অন্য ভাষার কবিতা পাঠ ও খ্যাতিমান বাকশিল্পীদের অংশগ্রহণে আবৃত্তি পর্ব। সকাল থেকে রাত অবধি খ্যাতিমান কবিসহ নানা বয়সী কবিতাপ্রেমীদের বিপুল উপস্থিতিতে সরব ছিল উৎসব আঙিনা। ৩০০ নিবন্ধিত কবির মধ্যে প্রথম দিনেই কবিতা পড়েছেন দু-শতাধিক।
জাতীয় কবিতা উৎসব উদ্বোধন করেন গীতিময় কবিতার কবি আসাদ চৌধুরী। পরিষদ সভাপতি মুহাম্মদ সামাদের সভাপতিত্বে উৎসবের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন রুবী রহমান। সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য দেন তারিক সুজাত। বিগত বছরের প্রয়াত শিল্পী-সাহিত্যিকদের স্মরণে শোক প্রস্তাব পাঠ করেন আমিনুর রহমান সুলতান। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয় কবি বেলাল চৌধুরী, চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেন, মুস্তাফা নূর-উল ইসলাম, ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, আলোকচিত্রী ও চিত্রগ্রাহক আনোয়ার হোসেন, ব্যান্ডসংগীত শিল্পী আইয়ুব বাচ্চুসহ প্রয়াত গুণীজনদের। এর আগে বেলা ১০টা থেকে শুরু হয় কার্যক্রম। শীতের রোদমাখা সকালে কবিরা পদব্রজে এগিয়ে যান জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, পটুয়া কামরুল হাসানের সমাধি প্রাঙ্গণে। সেখানে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে বায়ান্নর ভাষা শহিদদের প্রতি নিবেদন করেন সশ্রদ্ধ ভালোবাসা। এরপর হাকিম চত্বরে এসে সবাই মিলে পরিবেশন করেন ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’। সেই সুরে তাল মিলিয়ে উত্তোলিত হয় জাতীয় পতাকা ও পরিষদের পতাকা। মঞ্চ থেকে বিভিন্ন সংগঠনের শিল্পীরা গেয়ে শোনান একুশের গান ও উৎসব সংগীত ‘হাজার বছরের চর্যার পরি/বাঙালির জয় কবিতার জয়’।
সভাপতির বক্তব্যে মুহাম্মদ সামাদ আগামী বছর থেকে ১ ফেব্রুয়ারিকে সরকারি পর্যায়ে জাতীয় কবিতা দিবস হিসেবে ঘোষণার আহ্বান জানান। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বাঙালির বিজয়ের বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, বাঙালির মাটিতে বঙ্গবন্ধু হত্যার, জেলহত্যার এবং একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে জাতি কলঙ্কমুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ অনুন্নত দেশ থেকে উঠে এসেছে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে। ২০১৮-এর ডিসেম্বরে আসে আরেক যুদ্ধÑ নির্বাচনের যুদ্ধ। এ যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে ভয় পেয়ে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় দেশ-বিদেশের মাটিতে। বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে বঙ্গবন্ধু-কন্যার আহ্বানে দেশের কবি-শিল্পী-কৃষক-শ্রমিক-ছাত্র-শিক্ষক-নারীকর্মী-অভিনয়শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মীসহ সর্বস্তরের মানুষ লাখো শহিদের রক্তে রঞ্জিত স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হয়। তারা ছিনিয়ে আনে বিজয়। জাতির দীর্ঘ পথপরিক্রমায় এ এক নতুন বিজয় বাঙালির, নতুন বিজয় কবি ও কবিতার। বাংলাদেশে আর কোনোদিন যেন মুজিববিরোধী, মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অন্ধকারের শক্তি মাথা তুলতে না পারেÑ এখন আমাদের সেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়ার সময় এসেছে। এ কারণেই ৩৩তম জাতীয় কবিতা উৎসবের বারতা ‘বাঙালির জয়, কবিতার জয়’।
সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্যে তারিক সুজাত বলেন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক্সটারনাল পাবলিসিটি উইংয়ের কার্যক্রম আরও গতিশীল করা দরকার। একজন কবি-লেখকের প্রধান দায়িত্ব তার সৃজনশীল ক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা। আর সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব সেই সৃষ্টিকর্ম নিজ দেশ ও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া। আজ পর্যন্ত আমাদের দেশের লেখকদের সেরা সাহিত্যকর্ম নিয়ে কোনো রাইট ক্যাটালগ তৈরি করে কোনো আন্তর্জাতিক বইমেলায় নিয়ে যাওয়া হয়নি। প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, তাহলে মাতৃভাষার জন্য প্রাণ বিসর্জন দেওয়া জাতির সাহিত্যকর্মের বিশ্বের সংযোগ ঘটানোর দায়িত্ব কে নেবে? প্রগতির পক্ষে কবিদের চিরকালীন অবস্থানটি তুলে ধরে তিনি বলেন, বাংলাদেশের কবিরা চিরকালই অবস্থান নিয়েছে প্রগতিশীলতার পক্ষে। আপসের চোরাবালিতে হারিয়ে যাওয়ার কোনো নজির আমাদের নেই। তাই তিন দশকের বেশি সময় কবিরা এই উৎসবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মানুষের মুক্তির কথা বলেছেন। উৎসবে অংশ নেওয়া বিদেশি কবিরা স্ব-স্ব ভাষায় অনুবাদ করেছেন বাংলাদেশের কবিদের কবিতা। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের কবিতার পরিধি বিস্তৃত হয়েছে বিশ্বময়।
উদ্বোধনী দিনের মুক্ত আলোচনা ও কবিতা পাঠ পর্বে অংশ নেন ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা কবি জ্যোতির্ময় দত্ত, মিনাক্ষী দত্ত, সেমন্তী ঘোষ, সুমন গুণ, দিলীপ দাস, মৃণাল দেবনাথ, বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী, শোভা দেববর্মণ, দীপক হালদার ও বিধানান্দ পুরকায়স্ত। কবিতা পাঠে অংশ নেন তুরস্কের কবি তারিক গুনারসেল, যুক্তরাজ্যের কবি ক্লারি বুকার, চীনের তানজিয়ান কাই, শ্রীলংকার জয়শঙ্কর সুব্রমনিয়াম, ইরাকের আলী আল সালাহ, মালয়েশিয়ার মালিম ঘোজালি, স্পেনের জুলিও পাভানেত্তি, উরুগুয়ের অ্যানাবেল ভিলার, কঙ্গোর কামা কামান্দা ও নেপালের পুষ্প কাহনাল।
উৎসবে স্প্যানিশ কবিতা পড়েন কামা কামান্দা। একই ভাষায় নারীদের উৎসর্গ করে কবিতা পড়েন কবি অ্যানাবেল ভিলার।
১ ফেব্রুয়ারি প্রথম দিন রাত ৯টা পর্যন্ত চলে মুক্ত আলোচনা ও কবিতা পাঠে সজ্জিত উৎসব। বেলা ১টায় শুরু হয় নিবন্ধনের মাধ্যমে কবিতা পাঠের প্রথম পর্ব। দেশের নানা প্রান্ত থেকে সমাগত নবীন-প্রবীণ কবিরা মেলে ধরেন স্বরচিত কবিতাসম্ভার। এ পর্বের সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারজয়ী কবি কাজী রোজী। এ পর্বের অন্য ভাষার কবিতা নিয়ে মঞ্চে আসেন কবিরা। পাঠ করেন চাকমা, মনিপুরী, পাংখোয়া কিংবা রাখাইন ভাষার কবিতা। এ অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন দিলারা হাফিজ। শুধু আমন্ত্রিত কবিদের নিয়ে অনুষ্ঠিত কবিতা পাঠের তৃতীয় পর্বের সভাপতিত্ব করেন জাতিসত্তার কবিখ্যাত মুহম্মদ নুরুল হুদা। প্রথম দিনের কবিতা পাঠের চতুর্থ অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন মহাদেব সাহা। রাত ৮টায় শুরু হওয়া আবৃত্তি পর্বের মাধ্যমে শেষ হয় প্রথম দিনের আয়োজন। কবিতাপ্রেমীদের কাছে অন্যতম আকর্ষণীয় হয়ে ধরা দেয় আমন্ত্রিত আবৃত্তি শিল্পীদের অংশগ্রহণের এই পর্ব। দেশের খ্যাতনামা বাচিকশিল্পীদের কণ্ঠস্বরে উঠে আসে দেশ-বিদেশের বরেণ্য কবিদের কবিতা। সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী, নন্দিত অভিনেতা ও আবৃত্তিশিল্পী আসাদুজ্জামান নূরের সভাপতিত্বে হয় প্রথম দিনের সমাপনী অধিবেশনটি।
উৎসবের দ্বিতীয় দিনের সকাল শুরু হয় সেমিনারের মাধ্যমে। কাব্যনাটক বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাজেদুল আউয়াল। এ অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর। বেলা সাড়ে ১২টায় অনুষ্ঠিত হয় উৎসবের দ্বিতীয় সেমিনার। বাঙালির জয় বাংলা কবিতার জয় বিষয়ক প্রবন্ধ পাঠ করবেন কাজল বন্দ্যোপাধ্যায়। সভাপতিত্ব করেন ড. নূহ-উল-আলম লেনিন। বেলা আড়াইটায় নিবন্ধিত কবিদের অংশগ্রহণে কবিতা পাঠের পঞ্চম পর্বে সভাপতিত্ব করেন কবি কাজী রোজী। নিবন্ধিত কবিদের কবিতা পাঠের ষষ্ঠ পর্বে সভাপতিত্ব করেন আনোয়ারা সৈয়দ হক। ছড়াকার আসলাম সানীর সভাপতিত্বে আমন্ত্রিত ছড়াকারদের নিয়ে ছড়া পাঠের সপ্তম পর্ব অনুষ্ঠিত হয় বিকাল সাড়ে ৪টায়। বিকাল সাড়ে ৫টায় ২০১৮ সালের জাতীয় কবিতা পুরস্কারটি তুলে দেওয়া হয় কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর হাতে। সন্ধ্যায় শিহাব সরকারের সভাপতিত্বে কবিতা পাঠের অষ্টম পর্বে অংশ নেন অতিথি কবিরা। আমন্ত্রিত কবিদের অংশগ্রহণে কবিতা পাঠের নবম পর্বে সভাপতিত্ব করেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। সমাপনী দিনের শেষ আকর্ষণ হিসেবে থাকবে কবিতার গান। সুরের পথ ধরে কবিতা থেকে নির্মিত হয়েছে অনেক গান। সেসব গান শোনাবেন দেশের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পীরা। এ পর্বে সভাপতিত্ব করবেন নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার।

Category: