Blog Archives

দিনপঞ্জি : আগস্ট ২০১৯

PM2০১ আগস্ট
* ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে সবাইকে যার যার ঘরবাড়ি পরিচ্ছন্ন রাখার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এ রোগ মোকাবেলায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। আওয়ামী লীগের প্রত্যেক নেতাকর্মীকে নিজ নিজ এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করতে হবে। পাশাপাশি দেশবাসীকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। লন্ডন থেকে মোবাইল ফোনে ঢাকার ধানমন্ডির বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে শোকের মাস আগস্ট উপলক্ষে কৃষক লীগ আয়োজিত রক্তদান ও বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘প্রয়োজনে রক্ত দেব।’ তিনি ঠিকই রক্ত দিয়ে গেছেন। বাংলার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই তার রক্তঋণ আমাদের শোধ করতে হবে। তিনি মানুষের জন্য কষ্ট করে গেছেন। তার সেই মহান ত্যাগ কখনও বৃথা যেতে পারে না।

০৩ আগস্ট
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পঁচাত্তরের বিয়োগান্ত ঘটনার স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, একাত্তরে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে একটি দেশের জন্ম দিয়ে বীরের জাতি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিল বাঙালি। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় সেই স্বীকৃতি বদলে গিয়ে বিশ্বব্যাপী তাদের পরিচয় দাঁড়ায় খুনি জাতি হিসেবে। শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ও শেখ রেহানা দেশের বাইরে ছিলেন বলেই এখনও বেঁচে আছেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা দেখে যাবেন বলেই হয়তো আল্লাহ তাদের এখনও বাঁচিয়ে রেখেছেন। বিকেলে সেন্ট্রাল লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার সেন্ট্রাল হলে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ আয়োজিত জাতীয় শোক দিবসের আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
* আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বলেছেন, ডেঙ্গু নিয়ে রাজনীতি করছে বিএনপি। দেড় বছরেও খালেদা জিয়ার জন্য দেড় মিনিট যারা আন্দোলন করতে পারেনি, যারা বিরোধী দল হিসেবে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে ব্যর্থ, তাদের বিপদ-সংকট থেকে উদ্ধার করার জন্যই জরুরি অবস্থা দরকার। সকালে রাজধানীর ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমা হলের সামনে ডিএনসিসির পাঁচ নম্বর অঞ্চলের পরিচ্ছন্নতা অভিযানের উদ্বোধনকালে তিনি এ-কথা বলেন। সারাদেশে ডেঙ্গু প্রতিরোধে আওয়ামী লীগের তিন দিনব্যাপী পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান কর্মসূচির শেষ দিন ছিল ৩ আগস্ট।

০৫ আগস্ট
* জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ পুত্র শহিদ শেখ কামালের ৭০তম জš§বার্ষিকী যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো সকাল ৮টায় ধানমন্ডির আবাহনী ক্লাব প্রাঙ্গণে শহিদ শেখ কামালের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ ও সকাল ৯টায় বনানী কবরস্থানে তার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে কোরআনখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

১২ আগস্ট
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকার বিশ্বপরিম-লে মর্যাদার আসন ধরে রেখে দেশের উন্নয়ন অব্যাহত রেখেছে। এটা সম্ভব হয়েছে দেশের জনগণের কল্যাণে সরকারের ব্যাপক উন্নয়নমূলক কর্মকা-ে সাফল্য অর্জনের মাধ্যমে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ দেশের উন্নয়নের যে অগ্রযাত্রা, সেটা অব্যাহত থাকবে। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে। মানুষ উন্নত, সুন্দর জীবন পাক। এ লক্ষ্যে আমরা নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমরা চাই মাথা উঁচু করেই এগিয়ে যাক বাংলাদেশ। ঈদের দিন সকালে প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, কবি, সাহিত্যিক, লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষসহ সাধারণ জনগণের সঙ্গে ঈদুল আজহার শুভেচ্ছা বিনিময়কালে এসব কথা বলেন।

১৭ আগস্ট
* ভুলের চোরাবালিতে আটকে দেশের রাজনীতিতে বিএনপি নিজেরাই শূন্য হয়ে আছে দাবি করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বলেছেন, নেতিবাচক ধ্বংসাত্মক রাজনীতি করতে গিয়ে বিএনপি ভুলের চোরাবালিতে এসে নিজেরাই নিজেদের শূন্য করে দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ বিএনপিকে শূন্য করতে চায়নি। বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সারাদেশে সিরিজ বোমা হামলার প্রতিবাদে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দক্ষিণ আয়োজিত ‘সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী’ তিনি এসব কথা বলেন। ওবায়দুল কাদের বলেন, খুনের রাজনীতি, হত্যার রাজনীতি, সন্ত্রাসের রাজনীতি, জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি বাংলাদেশে বিএনপি শুরু করেছিলেন।

১৭ আগস্ট
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্প ঠিক করে তা দ্রুত বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয়গুলোকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, যথাযথভাবে বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য মন্ত্রণালয়গুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। আমরা বাজেট দিয়েছি এবং উন্নয়ন প্রকল্প নিয়েছি। কিন্তু তা বাস্তবায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে প্রকল্প অনুযায়ী তাদের কাজের অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে। তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে তার কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী এ নির্দেশ দেন।

২১ আগস্ট
* ভয়াল-বীভৎস ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মূল মাস্টারমাইন্ড লন্ডনে পলাতক তারেক রহমানকে ফিরিয়ে এনে আদালতের রায় কার্যকরের দাবি উঠেছে সর্বত্র। শোকাবহ পরিবেশে বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলায় শহিদদের শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ, সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ-সাম্প্রদায়িকতা ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবেলা করার শপথ এবং গ্রেনেড হামলার মূল পরিকল্পনায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবির মধ্য দিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে পালিত হয়েছে রক্তস্নাত ভয়াল-বিভীষিকার একুশ আগস্টের পঞ্চদশ বার্ষিকী। দিবসটির প্রতিটি অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগসহ স্বাধীনতার পক্ষের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠনের নেতাকর্মীরা ২১ আগস্টের খুনিদের দ্রুত বিচারের কাজ সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে গ্রেনেডের স্পিøন্টারবিদ্ধ জীবন্মৃতদের দাবি, ঘাতকদের সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসি হোক, তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে এনে যাবজ্জীবন নয়, সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হোক। সকাল ৯টায় বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে গ্রেনেড হামলার স্থলে স্থাপিত অস্থায়ী শহিদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিনের কর্মসূচি। প্রথমে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে শহিদদের স্মরণে স্থাপিত বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হয়। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারাও এ সময় শহিদদের শ্রদ্ধা জানান।

PM4২৩ আগস্ট
* রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বলেছেন, বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ। আবহমানকাল ধরে এদেশে সব ধর্মের অনুসারীরা পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বজায় রেখে নিজ নিজ ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করে আসছেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি তাই আমাদের সুমহান ঐতিহ্য। তিনি সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই ঐতিহ্য অব্যাহত রেখে জাতীয় অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি অর্জনে তা কাজে লাগানোর জন্য দেশের সব ধর্মাবলম্বীর প্রতি আহ্বান জানান। জন্মাষ্টমী উপলক্ষে বঙ্গভবনে হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি এ আহ্বান জানান।

২৮ আগস্ট
* প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সব টেলিভিশন চ্যানেল পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করছে। সকালে প্রধানমন্ত্রী তার তেজগাঁও কার্যালয়ে (পিএমও) বাংলাদেশ টেলিভিশন চ্যানেল মালিক সমিতির (এটিসিও) নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে এ-কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে আগে শুধু একটি টেলিভিশন চ্যানেল ছিলÑ বিটিভি। আমরা ’৯৬ সালে সরকার গঠনের পর এটা উন্মুক্ত করে দিয়েছি (বেসরকারি খাতে)। তিনি বলেন, তার সরকার সংবাদ প্রচারেও স্বাধীনতা দিয়েছে। বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল মালিকদের সংগঠন (এটিসিও) নেতারা বলেছেন, তারা বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১-এর মাধ্যমে সম্প্রচার শুরুর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন।
* আইন পরিবর্তন করে হলেও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের ফেরত দিতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোট। জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে বিকালে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ১৪ দল আয়োজিত আলোচনা সভায় জোটের শীর্ষ নেতারা এ আহ্বান জানিয়ে বলেন, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ফিরিয়ে আনতে আইন মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। প্রধান অতিথির বক্তব্যে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাম-লীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমু এমপি বলেন, পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর দেশ সম্পূর্ণ পাকিস্তানের ভাবধারায় চলছিল। সব শোককে শক্তিকে পরিণত করে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করছেন।

৩০ আগস্ট
* বিএনপির সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যে দলের প্রতিষ্ঠাতা নিজেই খুনি, যে দলটি খুনিদের মদদ দিয়েছে ও পুরস্কৃত করেছে, খুনি যুদ্ধাপরাধীদের হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছে, সেই দলটিকে খুনিদের দল ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে? আর কোনোদিন ওই হায়েনাদের হাতে দেশ যেন চলে না যায় সেজন্য দেশবাসীকে সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, যে উদ্দেশ্য নিয়ে খুনিরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল সেটা যেন সফল না হয়, এটাই তার সরকারের লক্ষ্য। বরং জাতির পিতা যে লক্ষ্য নিয়ে এদেশ স্বাধীন করেছেন সেটাই যেন সফল হয়। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৪তম শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগ এই আলোচনা সভার আয়োজন করে।

৩১ আগস্ট
* জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ত্যাগের আদর্শে মানুষের পাশে থাকার জন্য ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, সত্যিকারের বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হতে হলে সব ত্যাগ স্বীকার করে দেশের মানুষের জন্য কাজ করে যেতে হবে। ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের বলব, সব চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে উঠে, নীতি ও আদর্শ নিয়ে এদেশের মানুষের জন্য কিছু করে যেতে পারলেই জাতির পিতার আত্মা শান্তি পাবে। আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, সবাইকে আজ এই আদর্শ নিয়েই চলতে হবে, জাতির পিতা এদেশের মানুষের জন্য জীবন দিয়ে গেছেন। মানুষকে তিনি দিয়েই গেছেন, কোনো কিছুই নিয়ে যাননি। তাই এই প্রতিজ্ঞাই আমাদের করতে হবে, জাতির পিতা এদেশের মানুষের কল্যাণে যেভাবে ত্যাগ করেছেন, তার সেই আদর্শ নিয়েই মানুষের পাশে থাকতে হবে। নিজে কতটুকু পেলাম, সেটি বড় কথা নয়। মানুষকে কী দিতে পারলাম, সেই হিসাবটাই করতে হবে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব স্মরণে গণভবনে ছাত্রলীগের আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। শোকাবহ আগস্ট মাস ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের মাসব্যাপী কর্মসূচির শেষ দিনে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

গ্রন্থনা : আশরাফ সিদ্দিকী বিটু

Category:

এখনও ষড়যন্ত্র চলছে : ওবায়দুল কাদের

সিরিজ বোমা হামলা প্রতিবাদ দিবস


উত্তরণ প্রতিবেদন: ভুলের চোরাবালিতে আটকে দেশের রাজনীতিতে বিএনপি নিজেরাই শূন্য হয়ে আছে দাবি করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বলেছেন, নেতিবাচক ধ্বংসাত্মক রাজনীতি করতে গিয়ে বিএনপি ভুলের চোরাবালিতে এসে নিজেরাই নিজেদের শূন্য করে দিয়েছেন। আওয়ামী লীগ বিএনপিকে শূন্য করতে চায়নি।
গত ১৭ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সারাদেশে সিরিজ বোমা হামলার প্রতিবাদে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দক্ষিণ আয়োজিত ‘সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী’ সমাবেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের অভিযোগের জবাব দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
আওয়ামী লীগ তাদের আধিপত্য একচ্ছত্র করে দেশকে রাজনীতি শূন্য করার পরিকল্পনা করছেÑ বিএনপি মহাসচিবের এমন অভিযোগের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, খুনের রাজনীতি, হত্যার রাজনীতি, সন্ত্রাসের রাজনীতি, জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষকতার রাজনীতি বাংলাদেশে আপনারাই (বিএনপি) শুরু করেছিলেন। দেশে সিরিজ বোমা হামলা, বাংলাভাইয়ের রাজনীতি আপনারাই শুরু করেছিলেন। আজ কোন সাহসে সন্ত্রাসের রাজনীতির কথা বলেন?
মির্জা ফখরুলকে উদ্দেশ্য করে ওবায়দুল কাদের বলেন, আপনাদের দেখলে মনে হয় শিল্পী জয়নুলের আঁকা বিখ্যাত সেই কাদা মাটিতে আটকেপড়া গরুর গাড়ির মতো। কাদায় আটকেপড়া গাড়ির মতো বিএনপি আজ আটকে আছে। ওই কাদা থেকে বেরোতে হলে আপনাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি পাল্টাতে হবে। নেতিবাচক রাজনীতি, খুনের রাজনীতি, সন্ত্রাসের রাজনীতি, জঙ্গিবাদের রাজনীতি, দুর্নীতিবাজ পৃষ্ঠপোষকের রাজনীতি, লুটপাটের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ আপনাদের সঙ্গে নেই। আপনি নির্বাচিত হয়েও নিজের আসন শূন্য করে দিয়েছেন, আপনি তো শূন্য হবেনই। ফখরুল সাহেব বলেছেন আওয়ামী লীগ তাদের রাজনীতি শূন্য করে দিচ্ছে! যিনি নিজেই নির্বাচিত হয়ে আসন শূন্য করে দেন, তিনি কত বড় শূন্য ভেবে দেখ। কত বড় ফাঁপা বেলুনের মতো শূন্য তা ভেবে দেখতে হবে।
এবারের কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে অস্থিরতার বিষয়ে বিএনপির সমালোচনার জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, বাংলাদেশের মানুষ কি ভুলে গেছে সেই হাওয়া ভবনের লুটপাট, দুর্নীতিতে পাঁচবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কথা? আজকে বলেন দুর্নীতিবাজ ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের পৃষ্ঠপোষক তো আপনারা (বিএনপি)। যেমন আজকের এই ১৭ আগস্টের সিরিজ বোমা হামলা, সারাদেশের ৬৩ জেলায় জঙ্গিবাদী এই সিরিজ বোমা হামলার পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন আপনারা। তিনি                     বলেন, অনেক কিছু ভুলে গিয়েছিলাম; কিন্তু বিএনপি ভুলতে দিবে না। পাঁচবার বাংলাদেশকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন করে আজ দুর্নীতির কথা বলেন, লজ্জা                 করে না? একটুও লজ্জা করে না, লজ্জা শরমের                  মাথা কি খেয়েছেন?
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্র এখনও চলছে দাবি করে ওবায়দুল কাদের বলেন, এখনও ষড়যন্ত্র চলছে, এখনও বাতাসে চক্রান্তের গন্ধ আছে। রক্তের গন্ধ আমরা পেয়েছি বারে বারে। আপনাদের (বিএনপি) প্রাইম টার্গেট বিশ্বে জনপ্রিয় ও জননন্দিত নেত্রী শেখ হাসিনা। মির্জা ফখরুলের বক্তব্য বিএনপির দেউলিয়াত্বের প্রমাণ দেয় দাবি করে তিনি বলেন, কত দেউলিয়া হয়ে গেছে এই দল। এই দলের নেতৃত্বের দুর্ভাগ্যে বেগম জিয়ার জন্য আন্দোলন হয়নি। এ ধরনের বুলি, এ ধরনের ফাঁকা কথা, এ ধরনের বক্তব্য তারাই দিতে পারে যাদের রাজনীতি, যাদের আন্দোলন ভুলের চোরাবালিতে আটকে পড়েছে।
ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ দক্ষিণের সভাপতি আবুল হাসনাতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ এমপি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, একেএম এনামুল হক শামীম এমপি, ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এমপি, দফতর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ এমপি, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম এমপি, কেন্দ্রীয় সদস্য আনোয়ার হোসেন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ, উত্তরের সহ-সভাপতি শেখ বজলুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এসএ মান্নান কচি প্রমুখ।

Category:

ঐতিহ্যবাহী আনন্দমুখর নৌকাবাইচ

PM2আরিফ সোহেল: “ছিপখান তিন-দাঁড়-/তিনজন মাল্লা/চৌপর দিন-ভোর/দেয় দূর-পাল্লা!…” মোহনীয় ছন্দে বাঁধা এই কবিতার সঙ্গে বাংলাদেশের নৌকা মাঝিদের দুঃখকথা গভীরভাবে জড়িত। আবার সেই নৌকাই বাঙালিদের বিপুল আনন্দ-বিনোদনের অন্য নাম। নদীমাতৃক বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, আনন্দ-উৎসব আয়োজনের সংস্করণের অন্যতম একটি নৌকাবাইচ। সেখানেও এই নৌকা। নৌকাবাইচ বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি অপরিচ্ছেদ্য অংশ।
লাল-সবুজের এই দেশে হাজার বছরের ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে আছে নৌকাবাইচ। যার আবেশ ছড়ায় ঢাকার হাতিরঝিল-বুড়িগঙ্গা থেকে শুরু নড়াইল-ফরিদপুরের মধুমতিতেও। ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন ছন্দায়িত নৌকাবাইচ আমুদে বাঙালিদের বিপুলভাবে উদ্বেলিত ও আনন্দিত করে।
বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা গেছেÑ পৃথিবীতে সর্বপ্রথম মেসোপটেমিয়ার লোকেরাই নৌকাবাইচের প্রচলন করেছিল। খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ২০০০ বছর আগে ওই অঞ্চলের লোকেরা ইউফ্রেটিস নদীতে এক ধরনের নৌকাবাইচের আয়োজন করত। এর কয়েক শতাব্দী পর মিসরের নীল নদে নৌকা চালনা প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এরপর ছড়িয়ে পড়তে থাকে এর প্রসার। অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতাটি এখনও ব্যাপক জনপ্রিয়। ১৯০০ সাল থেকে অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় নৌকাবাইচ অন্তর্ভুক্ত আছে। শুধু বাংলাদেশই নয়; বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে নৌকা ও নৌকাবাইচ মিশে রয়েছে।
নৌকার সঙ্গে বাইচ শব্দটির সর্ম্পক জুড়ে দিয়ে আমরা বিনোদনের খোরাক পেয়েছি। বাইচ শব্দটি ফার্সি; বাজি বিবর্তনে বাইচ শব্দের সৃষ্টি। এর অর্থ বাজি বা খেলা। এই অঞ্চলে নৌকাবাইচ শব্দটির বুৎপত্তি বিবেচনা করে ধারণা করা হয় মধ্যযুগের মুসলমান নবাব, সুবেদার, ভূস্বামীÑ যাদের নৌবাহিনী ছিল, তারা এই প্রতিযোগিতামূলক বিনোদনের সূচনা করেছিলেন। জনশ্রুতি আছেÑ জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রাকে কেন্দ্র করে মাঝিমাল্লারা নৌকাবাইচের সূচনা করে। অন্যদিকে অনেকেই মনে করেনÑ পীরগাজীকে কেন্দ্র করে নৌকাবাইচের যাত্রা শুরু। আঠারো শতকের শুরুর দিকে কোনো এক গাজীপীর মেঘনা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়েছিলেনÑ তার কৃপা পেতে অন্য পাড়ের ভক্তরা সারিসারি নৌকায় একে অন্যের সাথে পাল্লা দিয়ে ছুটে এসেছিল। এ থেকেই নৌকাবাইচের গোড়াপত্তন হয়েছিল। তবে ইতিহাসে সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে, মুসলিম শাসনামলে বিশেষ করে নবাব-বাদশাহদের রাজত্বকালে নিয়মিত হয়ে উঠেছিল নৌকাবাইচ। তাই অনেকে মনে করেন, নবাব-বাদশাহদের নৌবাহিনী থেকেই নৌকাবাইচের হাতেখড়ি।
বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের নৌকা দেখা যায়। বাইচের নৌকার গঠন কিছুটা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। প্রতিযোগিতার নৌকা হয় সরু ও লম্বাটে। কারণ সরু ও লম্বাটে হওয়ার নৌকা দ্রুত চলতে সক্ষম, যা প্রতিযোগিতার উপযোগী। বাইচের নৌকাটি রঙে-ঢংয়ে নন্দিতভাবে দর্শকের সামনে যথাসম্ভব আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা করা হয়।
বাংলাদেশের অঞ্চল ভেদে বাইচের নৌকা সাধারণত আলাদাই হয়। বিশেষ করে কারুকার্য ও গঠনের দিক থেকে। ঢাকা, গফরগাঁও, ময়মনসিংহ এ অঞ্চলগুলোতে বাইচের জন্য সাধারণত কোশা নৌকা ব্যবহৃত হয়। এর গঠন সরু এবং লম্বায় প্রায় ১৫০-২০০ ফুট পর্যন্ত হয়। টাঙ্গাইল ও পাবনায় নৌকাবাইচে সরু ও লম্বা ধরনের ছিপ জাতীয় দ্রুতগতিসম্পন্ন নৌকা ব্যবহৃত হয়। লম্বায় ১৫০-২০০ ফুট পর্যন্ত হয়। এর সামনের দিকটা পানির সাথে মিশে থাকে আর পেছনের অংশটি পানি থেকে প্রায় ৫ ফুট পর্যন্ত উঁচু হয়। কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, আজমিরিগঞ্জ ও সিলেট অঞ্চলে বাইচের জন্য সারেঙ্গী নৌকা ব্যবহৃত হয়। এটিও সরু। লম্বায় ১৫০-২০০ ফুট। তবে এর প্রস্থ একটু বেশি ৫-৬ ফুট পর্যন্ত। চট্টগ্রাম, নোয়াখালী জেলার নিম্নাঞ্চল ও সন্দ্বীপে বাইচের জন্য জাহাজের মতো দেখতে সাম্পান ব্যবহৃত হয়। এর দৈর্ঘ্যে প্রায় ১০০-১২৫ ফুট; মাঝখানে ৮-৯ ফুট প্রশস্ত। আর বাইচে বিভিন্ন নামের নৌকা ব্যবহত হয়। বাইচের নৌকাগুলোর নাম হচ্ছেÑ অগ্রদূত, ঝড়ের পাখি, পঙ্খিরাজ, ময়ূরপঙ্খী, সাইমুন, তুফান মেল, সোনার তরী, দ্বীপরাজ।
অঞ্চল ভেদে পোশাকের ভিন্নতা থাকলেও বাইচে ব্যবহৃত নৌকার মধ্যখানে থাকেন নৌকার নির্দেশক। ৭, ২৫, ৫০ বা ১০০ জন মাঝির প্রতিযোগিতায় শামিল হতে পারে এক একটি দলীয় নৌকা। মাঝিরা সার বেঁধে বৈঠা ঠেলে নৌকা চালান। মাঝিদের বৈঠা টানাকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা এবং অনুপ্রাণিত করতে গলুইয়ে একজন পরিচালক থাকেনÑ যাকে বলা হয় গায়েন। তিনি গানছন্দে মাঝি-মাল্লাদের উদ্বীপ্ত করেন। সঙ্গে অনবরত বাজিয়ে চলেন কাঁসি। আগে যাওয়ার জন্য মাঝিদের উৎসাহিত করতে কখনও কখনও শব্দের মাত্রা বাড়িয়ে দেন। এছাড়া এই সময় দেহ ও মনের উত্তেজনার বশেই গানের মধ্যেÑ হৈ, হৈয়া এ-ধরনের শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। বৈঠার টানের সঙ্গে গানেও সমবেত সুর তোলেন মাঝিমাল্লারা। কোনো কোনো বাইচের সময় ঢোল-তবলারও ব্যবহার দেখা যায়।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও বিভিন্ন ধরনের নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় দীর্ঘকাল থেকেই। এর মধ্যেÑ ড্রাগন বোট রেস, বোয়িং বোট রেস, সোয়ান বোট রেস, কাইয়াক ও কেনিয় বোট রেস খুবই জনপ্রিয়।
এক সময়ে বছরের নানা সময়ে কখনও পদ্মায়; কখনও যমুনা, কালীগঙ্গা, ধলেশ্বরী, ইছামতিতে নৌকাবাইচ প্রাচীন সংস্কৃতি জাগিয়ে তোলে। বাংলাদেশের বৃহত্তর ফরিদপুর, বরিশাল, খুলনা এলাকাতেই নৌকাবাইচের প্রচলন ও উপস্থিতিটা চোখে পড়ার মতো। দেখা যেত নদীর দু-ধারে হাজার হাজার জনতার বাঁধভাঙা আনন্দ-উচ্ছ্বাস। নৌকার সাইরদারের কণ্ঠে অবিরাম গান। প্রমত্তা নদীবক্ষে সংগীতের তাল-লয়ে মাঝিমাল্লাদের বৈঠার ছন্দময় প্রতিযোগিতায় আন্দোলিত হয়ে উঠত মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। আবেগ-উত্তেজনার নৌকাবাইচ হয়ে উঠত আপামর মানুষের নির্মল আনন্দের খোরাক। নদীমাতৃক বাংলাদেশে সেখানেই নৌকাবাইচ হয়ে উঠত প্রাণোচ্ছল ক্রীড়াসঙ্গী। ছিল বর্ষার দিগন্ত পানির রাজ্যে নৌকা দৌড় হাজার বছরের বাঙালির নদীমাতৃক সভ্যতার এক অনন্য লোকসংস্কৃতি। কিন্তু সেদিনের উৎসবমুখর নৌকাবাইচ আজ হুমকির মুখে।
নৌকা দৌড়ের উৎসব একটি অসাম্প্রদায়িক সার্বজনীন লোকজ উৎসব। হাওর অঞ্চলে এই উৎসবের উদ্ভব হলেও এর ব্যাপ্তি বাংলার সর্বত্রই ছিল। নগর সংস্কৃতির আগ্রাসনের কারণে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের লোকায়ত নৌকাবাইচের মতো গ্রামীণ ধ্রুপদী ক্রীড়া। এমন কী হারিয়ে যাওয়ার এই ধাবমান প্রক্রিয়াটি দ্রুত থেকে দ্রুততর হচ্ছে।
নৌকাবাইচকে উৎসাহিত করতে ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখার লক্ষে প্রতিবছর জাতীয় নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে বাংলাদেশ রোয়িং ফেডারেশন। এই প্রতিযোগিতার দূরত্ব কম-বেশি ৬৫০ মিটার। অনুষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী মোগল-সুবেদারদের বুড়িগঙ্গায়। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের নৌকাবাইচকে কাঠামোর মধ্যে আনতে বাংলাদেশ বোয়িং ফেডারেশন গঠিত হয়। এছাড়া দেশে বিভিন্ন অঞ্চলে লোকায়িত ঐতিহ্যের নৌকাবাইচের পৃষ্ঠপোষকতায়ও এই ফেডারেশন সম্পৃক্ত থাকে। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-প্রতিষ্ঠান থেকে নানা দিবসে নৌকাবাইচের আয়োজন করে বাঁচিয়ে রাখা অবিরাম চেষ্টা চলছে। ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানগুলোও নানা উৎসবকে মাতিয়ে তুলতে নৌকাবাইচের আয়োজন করছে। নাগরিক জীবনের প্রাণকেন্দ্র হাতিরঝিলেও বসছে নৌকাবাইচের উৎসব। উপচে পড়ছে দর্শক। আর তাতেই স্বপ্ন বেঁচে থাকছে অনন্তকাল।

Category:

‘প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছেছে’

PM2উত্তরণ ডেস্ক: বিবিসি বাংলার মানসী বড়–য়াকে দেওয়া দীর্ঘ এক সাক্ষাৎকারে গণতন্ত্র, পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন, বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থাসহ নানা ইস্যুতে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, বাংলাদেশে হেফাজতে নির্যাতনের ইতিহাস দীর্ঘদিনের, যা সব সরকারের আমলেই দেখা গেছে। আওয়ামী লীগ সরকার এটি বন্ধে কী পদক্ষেপ নিয়েছে? জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, এমন মানসিকতা আমাদের নেই এবং আমরা সেটি করি না। ঘটনাচক্রে কিছু ঘটতে পারে। বরং আপনি যদি গত ১০ বছরে আমাদের অবস্থান দেখেন, আমরা কিন্তু অপরাধ নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পেরেছি। তিনি বলেন, আপনি আমার নিজের কথাই চিন্তা করেন, যখন আমি আমার বাবা-মা সবাইকে হারালাম, গুলি করে মারা হলো- কই আমি তো বিচার পাইনি। খুনিদের বিচার না করে তাদের ইনডেমনিটি দেওয়া হলো। হেফাজতে মানুষ হত্যা করার সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী আমার দলের নেতাকর্মীরা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অসাংবিধানিক সরকারের সময় যারা বেশি সুযোগ ভোগ করেছে বা ক্ষমতাটা যারা উপভোগ করেছে, তারা কখনোই চায়নি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত থাকুক। তিনি বলেন, একটা শ্রেণি হেফাজতে মৃত্যুর বিষয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তাদের মধ্য কিছু আছে অসাংবিধানিক সরকার, জরুরি অবস্থা অথবা মার্শাল ল’ বা মিলিটারি রুলার আসলে তাদের খুব দাম বাড়ে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে বিবিসি বাংলার প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন শেখ হাসিনা।

Category:

মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর

১৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়


উত্তরণ ডেস্ক: ১৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের প্রথম গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ হতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের উন্নয়ন অগ্রগতি প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাসের অপেক্ষায় রয়েছে। ২ সেপ্টেম্বর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) বৈঠকে ডিপিপির ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারের ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ (বিগ-বি)-এর আওতায় মহেশখালীর মাতারবাড়ী এলাকায় গভীর সমুদ্রবন্দরটি নির্মাণের চূড়ান্ত স্থান নির্ধারিত হয়েছে। ২০১৫ সাল থেকে জাইকা মাতারবাড়ী কয়লা-বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ করতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সম্ভাবনাটি উদঘাটন করে। সেই থেকে উক্ত স্থানে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের দ্বার উন্মোচিত হয় বলে জানা যায়। চট্টগ্রাম বন্দরের অতিক্রান্ত সক্ষমতা, বড় আকারের জাহাজের প্রবেশের সীমাবদ্ধতা, কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যকে সামনে রেখে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। প্রস্তাবিত এই গভীর সমুদ্রবন্দরে ১৬ মিটার গভীরতার এবং ৮ হাজার কনটেইনারবাহী জাহাজ সহজে যাতায়াত করতে পারবে। সরকারের রূপকল্প ২০৪১ সালে দেশে বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে ১৪ মিলিয়ন এবং জাহাজের সংখ্যা দাঁড়াবে ৮ হাজার ২০০টি। এই বিপুল সংখ্যক কনটেইনার ও জাহাজ হ্যান্ডলিং সক্ষমতা দেশের বর্তমান বন্দরগুলো দিয়ে সম্ভব নয়। তাছাড়া, দেশে বর্তমানে কোনো গভীর সমুদ্রবন্দর না থাকায় ডিপ ড্রাফটের জাহাজ এ সকল বন্দরে ভিড়তে পারে না। ফলে মাদার ভেসেল থেকে গভীর সমুদ্রে লাইটারেজ জাহাজের মাধ্যমে পণ্য খালাস করে বন্দরে নিয়ে আসা হয়। মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দরের উন্নয়নের পাশাপাশি আধুনিক কনটেইনারবাহী জাহাজ, খোলা পণ্যবাহী জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারকে জেটিতে ভেড়ার উপযোগী করে তোলা হবে। দেশের ও আঞ্চলিক দেশসমূহের চাহিদার সাথে সঙ্গে মহেষখালী ও মাদারবাড়ী এলাকায় গড়ে ওঠা শিল্পাঞ্চলের পণ্য পরিবহনে সহযোগিতা করাই এই বন্দরের মূল উদ্দেশ্য।
১ হাজার ২২৫ একর জমির ওপর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মিত হবে। মাতারবাড়ী ও ধলঘাট মৌজার উক্ত জমির মধ্যে ২৯৪ একর জমি জাইকার অর্থায়নে অধিগ্রহণ করা হবে। বাকি ৯৩১ একর জমি চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব অর্থায়নে অধিগ্রহণ করা হবে। কারণ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। উক্ত প্রকল্পের জন্য গত বছরের ২৬ নভেম্বর পরিবেশ ছাড়পত্র নেওয়া হয়েছে। প্রথমপর্যায়ে ২৯৪ একর জমির ওপর টার্মিনাল, নেভিগেশন চ্যানেল, টার্নিং বেসিন, ডাম্পিং অব ড্রেজিং সয়েলের কাজ করা হবে।

Category:

কলকাতায় বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ ভাস্কর্য

উত্তরণ ডেস্ক: গত ৩ আগস্ট কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের (বর্তমানে মওলানা আজাদ কলেজ) বেকার গভর্নমেন্ট হোস্টেলে বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ ভাস্কর্য উন্মোচন করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত ওই হোস্টেলে ভাস্কর্যটির উন্মোচন করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম এমপি। উদ্বোধনী ওই অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য, পশ্চিমবঙ্গের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী জাবেদ খান, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপ-প্রচার সম্পাদক মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম এবং কলকাতায় বাংলাদেশ উপ-দূতাবাসের উপ-রাষ্ট্রদূত তৌফিক হাসান। বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ ভাস্কর্যটি নির্মাণ করেন ভাস্কর লিটন পাল রনি।
উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪২ সালে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হয়ে স্মিথ স্ট্রিটের বেকার হোস্টেলের ২৪ নম্বর কক্ষের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৪৬ সালে ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) নির্বাচিত হন। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ইসলামিয়া কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জন করেন।

Category:

স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলবো

PM2

আওয়ামী লীগের শোক দিবসের আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী

উত্তরণ ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়ে তুলে তার রক্তের ঋণ শোধ করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বলেছেন, এদেশের মানুষের মুক্তি, স্বাধীনতা ও উন্নত জীবন দিতে বঙ্গবন্ধু আজীবন কষ্ট করে গেছেন। দেশের মানুষের জন্য নিজের বুকের রক্ত দিয়ে গেছেন। জাতির পিতার এই রক্তের ঋণ শোধ করতে হবে তার স্বপ্ন বাস্তবায়নের মাধ্যমে। আজকের দিনে এই প্রতিজ্ঞাই আমরা করি যে, পিতা (বঙ্গবন্ধু) তোমাকে কথা দিলাম, তোমার স্বপ্নের সোনার বাংলা আমরা গড়ে তুলব। এটাই আমাদের অঙ্গীকার।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৪তম শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে গত ১৬ আগস্ট রাজধানীর আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের সঙ্গে জিয়াউর রহমান জড়িত দাবি করে বলেন, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের যোগাযোগ ছিল। বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিরা সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেছিল যে, তারা জিয়াউর রহমানের কাছ থেকে ইশারা পেয়েছিল। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে খুনি মোশতাক প্রথমেই জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান করেছিল। তখন বঙ্গবন্ধুর খুনিদের এমন মনোভাব ছিল যে তাদের কিছুই হবে না। তিনি বলেন, স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক নেতারা যদি তৎকালীন পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে পারত, তাহলে হয়তো ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের আঘাত বাঙালির জীবনে আসত না।
জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে ‘সাবেক রাষ্ট্রপতি’ বলা যায় না উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সংবিধান ও সামরিক আইন লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে জিয়াউর রহমান। বন্দুকের নলের জোরে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সায়েমকে সরিয়ে দিয়ে তিনি ক্ষমতা দখল করেন। অবৈধভাবে ক্ষমতায় এসে জেনারেল জিয়া হ্যাঁ/না ভোটের আয়োজন করে। এরপর তিনি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। আর জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ শাসনামল ছিল অবৈধ। দেশের উচ্চ আদালত রায় দিয়ে তাদের শাসনকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। তাই তাদের (জিয়া ও এরশাদ) রাষ্ট্রপতি বলা যায় না, তারা হলেন অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি। আরও বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু এমপি, তোফায়েল আহমেদ এমপি, সভাপতিম-লীর সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী এমপি, মোহাম্মদ নাসিম এমপি, অ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু এমপি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, কেন্দ্রীয় সদস্য অ্যাডভোকেট আজমত উল্লাহ খান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ ও উত্তরের সহ-সভাপতি শেখ বজলুর রহমান। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সদস্য অধ্যাপক মেরিনা রহমান এবং জাতীয় আবৃত্তি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আহকাম উল্লাহ। সভার শুরুতে ১৫ আগস্ট শহিদদের স্মরণে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। সভা পরিচালনা করেন দলের প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ এমপি ও উপ-প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন।
একাত্তরে পরাজিত পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা ও উন্নয়নের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাত্র ১০ বছরে বাংলাদেশের উন্নয়নে সারাবিশ্বই বিস্ময় প্রকাশ করেছে। অক্লান্ত পরিশ্রম করে আমরা দেশকে একটা সম্মানের জায়গায় নিয়ে আসতে পেরেছি। প্রবৃদ্ধি অর্জনে পৃথিবীর হাতে গোনা যে কয়েকটি দেশ সাফল্য অর্জন করেছে বাংলাদেশ তাদের মধ্যে আজ অন্যতম। মূল্যস্ফীতি আমরা কমিয়ে এনেছি, দারিদ্যের হার কমিয়ে এনেছি। দেশের মানুষের আজ খাদ্যের কোনো অভাব নেই। এত অল্প সময়ে বাংলাদেশের এত উন্নয়ন দেখে বিশ্বের বড় বড় দেশও বিস্ময় প্রকাশ করেছে। নীতি ও আদর্শ নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করলে দেশের যে উন্নয়ন করা যায়, আমরা তা প্রমাণ করেছি।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন পাকিস্তানের চেয়েও শক্তিশালী। উন্নয়ন ও অগ্রগতির ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে আমরা পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে পেরেছি। দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি। জাতির পিতা বাংলাদেশকে স্বাধীন করে না গেলে এসব করা সম্ভব হতো না। তিনি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও নীতি অনুসরণ করেই দেশকে আমরা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। জাতির পিতা বেঁচে থাকলে দেশকে উন্নত করতে এত সময় লাগত না। বঙ্গবন্ধু যদি আর মাত্র ছয়-সাতটি বছর দেশ সেবার সুযোগ পেতেন, তবে অনেক আগেই বাংলাদেশ উন্নত-সমৃদ্ধ হতো, দেশের মানুষকে দীর্ঘ ২১ বছরের হত্যা-ক্যু, ষড়যন্ত্র, হত্যা-নির্যাতনের মতো দুঃশাসন ভোগ করতে হতো না।
আবেগজড়িত কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের মাত্র ১৫ দিন আগে ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে বিদেশে গিয়েছিলাম স্বামীর কর্মস্থলে। এ কারণে আমরা দুবোন বেঁচে গিয়েছিলাম। কিন্তু বাবা-মা, ভাইসহ সবাইকে হারিয়ে এ বেঁচে থাকা কষ্ট মৃত্যুর চেয়েও ভালো। ছয়টি বছর দেশে ফিরতে পারিনি, অন্য দেশে রিফিউজি হয়ে থাকতে হয়েছে। সবাইকে হারিয়ে রিক্ত-নিঃস্ব হয়ে শুধু দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য দেশে ফিরে এসেছিলাম। দেশে ফিরে বাবা-মা, ভাইসহ পরিবারের কাউকে দেখতে পাইনি; কিন্তু দেশে ফিরে পেয়েছিলাম দেশের লাখো মানুষের ভালোবাসা, স্নেহ, শক্তি ও অনুপ্রেরণা। আওয়ামী লীগের অগণিত নেতাকর্মী, মুজিবের আদর্শের সৈনিক, তারাই আমাকে আপন করে নিয়েছে। সেখানেই পেয়েছি আমার বাবা-মা, ভাইয়ের ভালোবাসা। এখানেই আমার সব থেকে বড় শক্তি। তাই আমার একটাই লক্ষ্য, দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন করা, তাদের উন্নত জীবন দেওয়া এবং ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত জাতির পিতার স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
জাতির পিতার ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের কথা উল্লেখ করে তার কন্যা শেখ হাসিনা বলেন, ওই ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেষ কথা বলেছিলেনÑ প্রয়োজনে বুকের রক্ত দেব। আর সেই রক্তই তিনি দিয়ে গেছেন। আমাদের সেই রক্তঋণ শোধ করতে হবে তার স্বপ্ন ক্ষুধামুক্ত দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে। তিনি বলেন, আজকে অন্তত এইটুকু বলতে পারি, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়ে আমরা চলেছি। কৃতজ্ঞতা জানাই দেশবাসীর প্রতি। বাবা-মা, ভাই সব একদিনে হারিয়ে নিঃস্ব-রিক্ত হয়েছিলাম। দেশ ছেড়ে যখন যাই সবাই ছিল, যখন ফিরে আসি শূন্য। কেউ নেই। সব হারিয়ে কিন্তু পেয়েছিলাম লাখো মানুষ। তাদের আপন করে নিয়েছি।
একরাতে পরিবারের সব হারানোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বারবার গলা ভারি হয়ে ওঠে বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার। নিজের আবেগ সামলিয়ে তিনি বলেন, সেখান থেকেই আমরা বড় প্রেরণা পেয়েছি। দেশে ফিরে একটা জিনিসই চিন্তা করেছি। আমার বাবা এই দেশ স্বাধীন করেছেন। তাই এই দেশকে গড়ে তুলতে হবে। এদেশের মানুষকে মানুষের মতো বাঁচার সুযোগ করে দিতে হবে। উন্নত জীবন দিতে হবে। ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়তে হবে। সেই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করে আজকে বাংলাদেশকে আমরা বিশ্বে একটা মর্যাদার আসনে নিয়ে এসেছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ সারাবিশ্ব বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারা অবাক হয় যে এত দ্রুত কীভাবে একটা দেশ উন্নত হতে পারে। হতে পারে তখনই যখন যারা স্বাধীনতা অর্জনের জন্য ত্যাগ স্বীকার করে, যারা নীতি আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করে তারা যদি ক্ষমতায় থাকে, তাহলেই একটা জাতি উন্নত হয়। তাহলে একটা জাতি এগিয়ে যেতে পারে। আমরা তা প্রমাণ করেছি। কিন্তু যারা পরাজিত শক্তির দোসর তারা ক্ষমতায় থাকলে কোনো জাতি এগোয় না, কোনো জাতি উন্নত হতে পারে না। তিনি বলেন, আজ জাতির পিতা আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তার আদর্শ আমাদের মাঝে আছে। সেই আদর্শ নিয়ে রাজনীতি করলে দেশের মানুষের আস্থা-বিশ্বাস পাবে, সম্মান পাবে এবং দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন।
স্বাধীনতার পর রাজনৈতিক নেতারা যদি তৎকালীন পরিস্থিতি উপলব্ধি করতে পারতেন, তাহলে হয়তো জাতির জীবনে ১৫ আগস্টের আঘাত আসত না মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনের বিশাল কর্মযজ্ঞ একদিকে করা, অপরদিকে একটি দেশ, যে দেশটি ছিল পাকিস্তান নামের একটি দেশের একটা প্রদেশ। আর যে ভূখ-টা চিরদিন বিদেশিদের, তারাই এদেশের রাজত্ব করেছে। সেই দেশটাকে একটা দেশ হিসেবে, একটা রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করাÑ এই কঠিন কাজ মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে তিনি (বঙ্গবন্ধু) করে গিয়েছিলেন।
স্বাধীনতা-পরবর্তী বঙ্গবন্ধুর দেশ শাসনকালে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সেই সময় নানা চক্রান্ত চলেছেÑ পাটের গুদামে আগুন, থানা লুট করা, আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সাতজন সংসদ সদস্যকে হত্যা করা। যারা স্বাধীনতাবিরোধী, রাজাকার, আলবদর বাহিনী অনেকেই দেশ ছেড়ে ভেগে গিয়েছিল। অনেকেই আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গিয়েছিল। আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে তারা একের পর এক ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে শুরু করে।
ওই সময়কার পরিস্থিতি তখনকার রাজনৈতিক নেতাদের উপলব্ধিতে আসেনি মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমাদের অনেক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ তখনকার যে একটা অবস্থা সেই অবস্থা বুঝতেই পারেন নি। একটা দেশ দীর্ঘদিন বঞ্চিত ছিল, শোষিত ছিল, তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও যুদ্ধ করে বিজয় অর্জন করা হয়েছে। যারা পরাজিত হয়েছে, তারা এত সহজে ছাড়বে না। তাদের দোসররা ছিল রন্ধ্রে রন্ধ্রে। আর তাদের ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত অব্যাহত থাকবে- এই উপলব্ধিটা তখনকার দিনে আমাদের অনেক রাজনৈতিক নেতার মধ্যেও আসেনি। তাই তারা এটা হয় নাই, ওটা হয় নাইÑ নানা ধরনের প্রশ্ন, কথা, লেখালেখি অনেক কিছু শুরু করেছিল।
আওয়ামী লীগ সভাপতি আক্ষেপ করে বলেন, ক্ষত-বিক্ষত একটা দেশ, অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু একটা দেশ, সেই দেশটাকে গড়ে তোলা যে অত্যন্ত কঠিন-দুরূহ কাজ। এটা যে একদিনেই, একটা কথায় গড়ে ওঠে নাÑ এই উপলব্ধিটা যদি সকলের মাঝে থাকত, তাহলে হয়তো ১৫ আগস্টের মতো এত বড় একটা আঘাত এদেশের ওপর আসত না। তিনি আরও বলেন, তখন কিন্তু কেউ সেই উপলব্ধিটা করে নাই, এটা উপলব্ধি করতে অনেক সময় লেগেছিল তাদের। তবে তারা ওই সময় কেন উপলব্ধি করতে পারে নাই, আমি জানি না। এর মধ্যে অনেক জ্ঞানী-গুণী অনেকেই আছেন।
বঙ্গবন্ধুর কন্যা বলেন, ’৭২ সালের পর থেকে ’৭৫ সাল পর্যন্ত অনেক লেখালেখি আছে। কেউ যদি একবার চোখ বুলান, পড়েন তখন দেখবেন কত ভুল সিদ্ধান্ত এবং ভুল কথা তারা বলে গিয়েছিলেন। আর সেই খেসারতটা জাতিকে দিতে হলো ’৭৫-এ জাতির পিতাকে হত্যার মধ্য দিয়ে। তিনি বলেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল সেই আলবদর, রাজাকার, আলশামস এবং পাকিস্তানি বাহিনীর দালাল-দোসর তাদের হাতেই চলে গেল দেশের ক্ষমতা। তাদের হাতে যে ক্ষমতা চলে গেছে সেটাও বোধহয় অনেকে উপলব্ধি করতে পারেন নি। শত ষড়যন্ত্র করেও যখন দেশের অগ্রযাত্রা থামাতে পারেনি, তখনই ষড়যন্ত্রকারীরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করেছে।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ২১টি বছর দেশের কেন উন্নয়ন হয়নি এমন প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে যারা বিরোধিতা করেছিল, যারা কখনও বাঙালি জাতি মাথা তুলে দাঁড়াক তা চায়নি। তারা কখনও বাঙালি জাতির অস্তিত্বে বিশ্বাস করতে চায়নি, যারা বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকারটুকু কেড়ে নিতে চেয়েছিল তাদেরই চক্রান্ত ছিল। কারণ বাঙালি জাতির বিজয় মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে, এই বিজয় এরা কখনই মেনে নিতে পারেনি। তারা দেশকে পিছিয়ে দিতে চেয়েছিল যেন একসময় বলতে পারে বাংলাদেশ রাষ্ট্র হয়ে বা স্বাধীনতা অর্জন করে ভুল করেছে। এটাই ছিল তাদের মনে। সেই জন্য এরা কখনও বাংলাদেশকে উঠে দাঁড়াতে দেয়নি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব ষড়যন্ত্রকারীরা ওই হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী, যারা সেই ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৬-দফা আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে এদেশের মানুষের রক্ত নিয়েছে, গুলি করে হত্যা করেছে, তাদের দালালি করেছে, বাঙালি হয়ে তারা ওই পাকিস্তানি হানাদার বা সামরিক শাসকদের পদলেহন করেছে। তাদের তোষামোদি করেছে এবং মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তাদের স্বরূপ উদঘাটিত হয়েছে। তারা গণহত্যা চালিয়েছে, অগ্নিসংযোগ চালিয়েছে, বুদ্ধিজীবী হত্যা করেছে। একটা জাতিকে সম্পূর্ণভাবে পঙ্গু করে দিতে চেয়েছিল। এরাই জাতির পিতাকে হত্যা করে একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৫ আগস্টের পর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারীরা বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-কে একটি পরিবারের হত্যাকা- হিসেবে দেখাতে চেয়েছিল। কিন্তু কিছুদিন পর কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা এবং পরবর্তী নানা ঘটনা গোটা বিশ্বের সামনে পরিষ্কার হয়ে যায়, ১৫ আগস্টের হত্যাকা- একটি পরিবারের হত্যাকা- নয়, এই হত্যাকা- বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিজয়কে ধূলিসাৎ ও একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতেই। বাংলাদেশকে পুনরায় পাকিস্তানের ভাবধারায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। এ কারণেই বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর স্বাধীনতাবিরোধীদের পুনর্বাসিত করা হয়, খুনিদের পুরস্কৃত করা হয়। খুনিরা তখন দেশের নাম পরিবর্তন করে ইসলামিক রিপাবলিক অব বাংলাদেশ করতে চেয়েছিল। কিন্তু সাহস পায়নি পরিবর্তন করতে।
বঙ্গবন্ধুর খুনিরা অনেকেই জাতির পিতার বাসভবনে যাতায়াত করত উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, দুঃখের বিষয় এই হত্যাকা-ের সঙ্গে যারা জড়িত, তারা তো চেনা। বাংলাদেশ খুব ছোট জায়গা। দিন-রাত আমাদের বাড়িতেই যারা ঘোরাঘুরি করত তারাই তো সেই খুনিরূপে আসলো। তিনি বলেন, জিয়াউর রহমান একটা মেজর ছিল, তাকে প্রমোশন দিয়ে দিয়ে মেজর জেনারেল করা হয়েছিল। মাসে একবার করে হলেও সে (জিয়া) আমাদের বাসায় আসত। কখনও একা বা কখনও খালেদা জিয়াকে সঙ্গে নিয়ে আসত। কারণ খালেদা জিয়াকে সঙ্গে নিয়ে আসলে মার (ফজিলাতুন্নেছা মুজিব) সঙ্গে দেখা করার উছিলায় বাসার ওপরে আসতে পারত। আমাদের ওই লবিতে দুটা মোড়া পেতে বসতো। ঘন ঘন তার যাতায়াত ছিল।
আওয়ামী লীগ সভাপতি আরও বলেন, যারা বাসায় আসত তাদের অনেকেই এই হত্যাকা-টা চালালো। খুনি মোস্তাক তো মন্ত্রী ছিল। পরবর্তীতে অনেক চেহারা আপনারা দেখেছেন, যারা বিএনপিতে যোগ দিয়েছে। অনেকে বড় বড় নীতির কথা এখন বক্তৃতায় শোনায়, তারা কী ছিল? তারা কী এই সমস্ত ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত ছিল না? তারা ভেবেছিল এইভাবেই বোধহয় ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে। তারা ক্ষমতায় টিকেনি। তিনি বলেন, খুনি মোস্তাক নিজেকে অবৈধভাবে সংবিধান লঙ্ঘন করে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা দেয়ার পরপরই জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান করল।
প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, জিয়াউর রহমান কীভাবে খুনি মোশতাকের এত বিশ্বস্ত হলো যে তাকেই (জিয়া) সেনাপ্রধান করল? সেটা খুনি কর্নেল ফারুক-রশিদ বিবিসি’তে যে ইন্টারভিউ দিয়েছিল সেই ইন্টারভিউ থেকেই সবাই জানতে পারেন। খুনিরা যে জিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছে এবং জিয়ার কাছ থেকে তারা ইশারা পেয়েছে এবং জিয়া যে তাদের আশ্বস্ত করেছে। এগুলো করলে পরে সমর্থন পাবে- সেটা তো আত্মস্বীকৃত খুনিরা নিজেরাই বলে গেছে। এরা কারা ছিল? এরা কী স্বাধীনতা চেয়েছিল? এরা কী মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করত? এরা কী যে নীতিমালা নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল তাতে বিশ্বাস করত? তারা তা কখনই করত না বলেই এই হত্যাকা- ঘটিয়েছে।

Category:

বঙ্গবন্ধুর লেখা বইগুলো পড়তে হবে

ছাত্রলীগের শোক সভায় প্রধানমন্ত্রী

উত্তরণ ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, নীতি ও আদর্শ না থাকলে নেতা হওয়া যায় না। হলেও সাময়িক নেতা হওয়া যায়; কিন্তু সেই নেতৃত্ব দেশকে কিছুই দিতে পারে না। নীতি-আদর্শ নিয়ে চললে দেশের মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করা যায়। যা একজন রাজনীতিবিদের কাছে অমূল্য সম্পদ। তাই ত্যাগের মহিমায় বঙ্গবন্ধুর নীতি-আদর্শ নিয়ে এদেশের মানুষের জন্য কিছু করে যেতে পারলেই জাতির পিতার আত্মা শান্তি পাবে। তিনি চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে উঠে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ নিয়ে দেশের মানুষের কল্যাণে আত্মনিয়োগের জন্য ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান। জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ গৃহীত মাসব্যাপী কর্মসূচির সমাপনী দিনে গত ৩১ আগস্ট গণভবনে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সকল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে বাকশাল গঠনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু অর্থনৈতিক মুক্তির ডাক দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর বাকশাল কার্যকর করা গেলে বাংলাদেশ অনেক আগেই বিশ্ব দরবারে মর্যাদার আসনে থাকত। এ কারণে ষড়যন্ত্রকারীরা বাকশালের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার চালানোর পাশাপাশি শুধু বঙ্গবন্ধুকে নয়, বঙ্গবন্ধুর রক্তের উত্তরাধিকারী একজনও যেন বেঁচে না থাকেন, সেজন্য নির্বিচারে সবাইকে হত্যা করে। এজন্য খুনিরা শিশু শেখ রাসেলকে পর্যন্ত ছাড়েনি। তিনি বলেন, বাকশাল বলে অনেকে গালি দেয়! কিন্তু বাকশাল বাস্তবায়ন হলে বিশ্বসভায় বাংলাদেশ ওই সময়ই মাথা উঁচু করে দাঁড়াত।
শেখ হাসিনা বলেন, সারাজীবন বঙ্গবন্ধু বাংলার মানুষকে শুধু দিয়েই গেছেন, কোনো কিছুই নিয়ে যাননি। শেষে বুকের রক্ত পর্যন্ত দিয়ে গেছেন। তার সন্তান হিসেবে আমার ব্যক্তিগত কোনো কিছু চাওয়া-পাওয়ার নেই। সন্তানদের জন্য কি করে গেলাম সেটিও চিন্তা করি না। শুধুমাত্র দেশের মানুষকে কী দিতে পারলাম, তাদের জন্য কতটুকু করতে পেরেছি সেটিই আমার প্রধান লক্ষ্য, বিবেচ্য বিষয়। সেই লক্ষ্য নিয়ে ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বুকে ধারণ করে দিনরাত পরিশ্রম করেছি বলেই বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়ক দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
আবেগজড়িত কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এদেশের মানুষের জন্য বঙ্গবন্ধু আজীবন লড়াই-সংগ্রাম করেছেন, স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন। বুকের রক্তও দিয়ে গেছেন, কিন্তু কিছুই নিয়ে যাননি। আমার মা-ভাইসহ নিহতদের সবাইকে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়, কাফনের কাপড়টুকুও দেওয়া হয়নি। আর রেডক্রসের রিলিফের কাপড়ের পাড় ছিঁড়ে জাতির পিতাকে টুঙ্গিপাড়ায় দাফন করা হয়। এ সময় স্বজন হারানোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। পুরো অনুষ্ঠানস্থলে পিনপতন নীরবতার সৃষ্টি হয়।
মাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের অবদান বলতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার (বঙ্গবন্ধু) পাশে আমার মা সবসময় ছিলেন। প্রকাশ্যে রাজনীতিতে আসেন নি, ছবি তোলে নি, নাম ছাপেন নি। কিন্তু বাবার সঙ্গে থেকে প্রতিটা কাজে সহায়তা করেছেন। নিজের সাধ-আহ্লাদ বিসর্জন দিয়েছেন। এমনকি ছদ্মবেশে ছাত্রনেতাদের কাছে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ পৌঁছে দিতেন, নির্দেশনাও দিতেন। তিনি ছিলেন সবচেয়ে বড় গেরিলা।
জাতির পিতার আদর্শ সম্পর্কে জানতে তাকে নিয়ে লেখাপড়া করার জন্য ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, বঙ্গবন্ধুর ডায়েরি নিয়ে লেখা ‘কারাগারের রোজনামচা’ এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার লেখা রিপোর্ট নিয়ে বই প্রকাশিত হয়েছে। স্বাধীনতার জন্য বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ সংগ্রাম-আন্দোলন, আত্মত্যাগ এবং তার আদর্শ সম্পর্কে জানতে হলে বঙ্গবন্ধুর লেখা বইগুলো পড়তে হবে। তিনি আরও বলেন, দেশের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে ছাত্রলীগের অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে। যদি নিজেকে বঙ্গবন্ধুর সৈনিক হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তাহলে তার মতো ত্যাগী কর্মী হিসেবে দেশের জন্য, মানুষের জন্য কাজ করতে হবে।
ছাত্রলীগের সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসুর জিএস গোলাম রাব্বানীর পরিচালনায় আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি সঞ্জীব দাস, সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসুর এজিএস সাদ্দাম হোসেন, ঢাকা উত্তর ছাত্রলীগের সভাপতি মোহাম্মদ ইব্রাহিম, সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান হৃদয়, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি মেহেদী হাসান ও সাধারণ সম্পাদক জোবায়ের আহমেদ। অনুষ্ঠানে সুদীর্ঘ ৫১ বছরে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ঐতিহ্য, সংগ্রাম নিয়ে তৈরি একটি প্রমাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। দেখানো হয় ছাত্রলীগের কর্মীদের বানানো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক মোবাইল গেম প্রোমো। ছাত্রলীগের বার্ষিক প্রকাশনা ‘মাতৃভূমি’ এবং মাসিক প্রকাশনা ‘জয় বাংলা’র মোড়ক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল এবং কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেলকে নিয়ে আঁকা চিত্রকর্ম প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দেওয়া হয়।

Category:

১৫ আগস্ট কারবালার পুনরাবৃত্তি যেন ৩২ নম্বরে

PM3উত্তরণ প্রতিবেদন: বিএনপির সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যে দলের প্রতিষ্ঠাতা নিজেই খুনি, যে দলটি খুনিদের মদত দিয়েছে ও পুরস্কৃত করেছে, খুনি যুদ্ধাপরাধীদের হাতে জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছে, সেই দলটিকে খুনিদের দল ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে? আর কোনো দিন ওই হায়েনাদের হাতে দেশ যেন চলে না যায় সেজন্য দেশবাসীকে সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, যে উদ্দেশ্য নিয়ে খুনিরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল সেটা যেন সফল না হয়, এটাই তার সরকারের লক্ষ্য; বরং জাতির পিতা যে লক্ষ্য নিয়ে এদেশ স্বাধীন করেছেন সেটাই যেন সফল হয়।
গত ৩০ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৪তম শাহাদাতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগ এই আলোচনা সভার আয়োজন করে।
১৫ আগস্টের হত্যাকা-কে কারবালার পুনরাবৃত্তি অভিহিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একটু চিন্তা করে দেখুন, যেভাবে পাকিস্তানিরা মুক্তিযুদ্ধের সময় নারী-শিশুকে হত্যা করেছিল- ১৫ আগস্ট ঠিক একই রকমের ঘটনা ঘটানো হয়েছিল। কারবালার প্রান্তরে যেভাবে নির্মম হত্যাকা- চলে যেন কারবালার ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল ৩২ নম্বরে। একাত্তরের যে জাতি বুকের রক্ত দিয়ে নিজেদের বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলÑ তারাই পঁচাত্তরে বিশ্বের কাছে একটি খুনি জাতি হিসেবে পরিচিত হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যা নিয়ে বিএনপি নেতারা নতুন সাফাই গাইতে শুরু করেছেন। বিএনপি নেতারা বলছেন, ’৭৫ সালে বিএনপির তো জন্মই হয়নি। তাহলে বঙ্গবন্ধু হত্যায় বিএনপি কীভাবে জড়িত হলো? কিন্তু তাদের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এই হত্যাকা-ে সম্পৃক্ত ছিলেন। যে দলের প্রতিষ্ঠাতা নিজেই খুনি এবং খুনের সঙ্গে জড়িত- তার পক্ষে তো সাফাই গাওয়ার কিছু নেই। আর এটাও তো সবার জানা, আদালতই জিয়াউর রহমানের শাসনামলকে অবৈধ ঘোষণা করেছেন।
শেখ হাসিনা বলেন, জিয়াউর রহমান কেবল বঙ্গবন্ধু হত্যায় জড়িতই ছিলেন না, এই হত্যার বিচার যাতে না হয় সেই ব্যবস্থাও করেছিলেন। ইনডেমনিটি দিয়ে হত্যাকা-ের বিচার বন্ধ করে দিয়েছিলেন। খুনিদের বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃতও করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর এই ঘটনা তদন্তে স্যার টমাস উইলিয়ামের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক দল এদেশে আসতে চাইলেও জিয়াউর রহমান অনুমতি দেননি, তাদের ভিসাও দেননি। বিএনপি খুনিদের দল না হলে কেন তদন্তে আসতে দেয়নি? কেন ইনডেমনিটি দিয়ে বিচার বন্ধ করে দিয়েছিল? কেন খুনিদের পুরস্কৃত করেছিল?
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, পঁচাত্তরের পর যারাই ক্ষমতায় এসেছে তারাই ১৫ আগস্টের খুনিদের মদত দিয়েছে, পুরস্কৃত করেছে। যেভাবে জিয়াউর রহমান খুনিদের পুরস্কৃত করেছিলেন, সেভাবে তার স্ত্রী খালেদা জিয়াও ক্ষমতায় এসে খুনিদের পুনর্বাসন করেছেন। এরশাদও খুনিদের মদত দিয়ে পুরস্কৃত করেছেন। এমনকি খালেদা জিয়া ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে খুনি কর্নেল রশিদ ও বজলুল হুদাকে সংসদ সদস্য করে সংসদকে কলঙ্কিত করেছিলেন। রশিদকে বিরোধীদলীয় নেতাও বানিয়েছিলেন। তাহলে বিএনপি যে খুনিদের দল নয়Ñ এটা তারা বলেন কীভাবে? প্রধানমন্ত্রী হয়ে খালেদা জিয়া যেভাবে খুনিদের পুরস্কৃত করেছিলেন, তাহলে সেই দল খুনিদের না হয় কীভাবে?
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে জিয়াউর রহমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে ১১ হাজার কারাবন্দি যুদ্ধাপরাধীকে ছেড়ে দেন। যুদ্ধাপরাধী শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী করেন, অনেককে মন্ত্রীও করেন। ঠিক একইভাবে খালেদা জিয়াও ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধী নিজামী-মুজাহিদকে মন্ত্রিসভায় স্থান দেন। অর্থাৎ জিয়া যেভাবে গণহত্যাকারী ও বুদ্ধিজীবী হত্যাকারীদের মন্ত্রী করেন, খালেদা জিয়াও সেভাবেই রাজাকার আলবদরদের হাতে শহিদের রক্তরঞ্জিত জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছিলেন। খুনিদের হাতে যারা এভাবে জাতীয় পতাকা তুলে দেয় আর মন্ত্রী বানায়Ñ তারা খুনির দল ছাড়া আর কী?
সরকারপ্রধান বলেন, আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতাও বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন। সবচেয়ে দুর্ভাগ্য আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী খোন্দকার মোশতাক বঙ্গবন্ধু হত্যার পর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে রাষ্ট্রপতি হন। দেশের ভেতর আওয়ামী লীগের যেসব বড় বড় নেতা খুনি মোশতাকের সঙ্গে গিয়েছিলেনÑ তারাও কোনো না কোনোভাবে বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রে যুক্ত ছিলেন। তারা পরে জিয়ার সঙ্গেও গেছেন। তারাও বেইমান ও মোনাফেক। তাদের অনেকে এখনও বেঁচে আছেন, বড় বড় কথাও বলেন।
বক্তব্যের শুরুতে পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার নৃশংসতম ঘটনা তুলে ধরতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা। একপর্যায়ে কেঁদেও ফেলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৫ আগস্ট ইতিহাসের সবচেয়ে কালিমালিপ্ত দিন। নিজের জীবনের সবকিছু ত্যাগ করে যিনি দেশের মানুষের জন্য কাজ করে গেছেন- সেই বঙ্গবন্ধুকেই নির্মমভাবে হত্যা করা হলো! আর হত্যা করল কি না এই বাংলাদেশেরই মানুষ- যাদের বঙ্গবন্ধু বিশ্বাস করতেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইন্দিরা গান্ধী ও ফিদেল কাস্ত্রোসহ অনেকেই বঙ্গবন্ধুকে আগেই সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু কখনও বিশ্বাস করতে পারেন নি, এভাবে বাংলাদেশের মানুষ তাকে হত্যা করতে পারে। যারা হত্যা করেছিল, তারা সবাই কিন্তু আমাদের বাড়িতে আসা-যাওয়া করতেন। মেজর ডালিম, ডালিমের বউ ও শাশুড়ি তো দিন-রাত এই বাড়িতেই পড়ে থাকতেন। বঙ্গবন্ধু ঘুণাক্ষরেও বিশ্বাস করতে পারেন নি এরা তাকে হত্যা করতে পারে? এভাবে বেইমানি মোনাফেকি কেউ করতে পারে? সেই কলঙ্কজনক ইতিহাসই রচিত হয়েছিল বাংলাদেশে।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামাত জোট সরকারের অত্যাচার-নির্যাতন, দুর্নীতি-লুটপাট, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ সৃষ্টি, ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা এবং ১৭ আগস্ট সিরিজ বোমা হামলাসহ দুঃশাসনের বিবরণ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিএনপির জন্মটাই হচ্ছে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে। তাদের এই চরিত্রটা এতটুকু বদলায় নি।
শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ২১ বছর এবং ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। পরিবর্তন হয়েছে তখনই, যখন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর দল ক্ষমতায় এসেছে। পঁচাত্তরের পর যারাই ক্ষমতায় ছিল, তারা বাংলাদেশের উন্নয়ন কখনই চায়নি; বরং এই স্বাধীনতাবিরোধীরা ক্ষমতায় এসে একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে এবং পরাজিত শক্তি পাকিস্তানকে খুশি করতে এদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার ষড়যন্ত্র করেছিল।
১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর থেকে দেশের মানুষের উন্নয়ন ও কল্যাণে তার দীর্ঘ সংগ্রামের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মৃত্যু হাতে করে দেশে ফিরেছি। আর দেশে আসার পর যখন দেশের মানুষের উন্নয়ন করতে পেরেছিÑ তখনই ভেবেছি দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারলে জাতির পিতার আত্মা শান্তি পাবে। বাবা-মা, ভাই সবাইকে হারিয়েছি, তাই হারানোর ভয় নেই। কোনো চাওয়া-পাওয়ারও কিছু নেই। সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে রাজনীতি করেছিÑ তাই কোনো কিছুতে ভয় পাইনি।
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, মানুষ একটা শোকই সহ্য করতে পারে না। আর আমরা এতগুলো শোককে সহ্য করে চলেছি। সেই শোক আর ব্যথা-বেদনা নিয়েই দেশের মানুষের জন্য কাজ করে গেছি যেন বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়। তাদের জীবন এতটুকু উন্নত হলেও বাবার আত্মা শান্তি পাবে। ৪৪ বছর হলো বঙ্গবন্ধু আমাদের ছেড়ে গেছেন। কিন্তু তার দেশের মানুষ এখন শান্তিতে রয়েছে, ক্ষুধার জ্বালায় কষ্ট পায় না। এখনও আরও অনেক কাজ করতে হবে। দেশটাকে আরও এগিয়ে নিতে হবে।
ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি একেএম রহমতুল্লাহ এমপির সভাপতিত্বে সভায় আরও বক্তব্য দেন মহানগর দক্ষিণের সভাপতি আবুল হাসনাত, সাধারণ সম্পাদক শাহে আলম মুরাদ, উত্তরের সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান এমপি প্রমুখ। সভা পরিচালনা করেন মহানগর নেতা আখতার হোসেন ও আজিজুল হক রানা।

Category:

সামাজিক মুক্তির পথযাত্রী

PM2

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। বাংলাদেশের বাম আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। শতাব্দী স্পর্শ করার আগেই গত ২৩ আগস্ট ৯৮ বছর বয়সে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন তিনি। প্রায় আট দশকের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ইতিহাসের ‘নায়ক’ হতে পারেন নি বটে, তবে গুরুত্বপূর্ণ পার্শ¦চরিত্রে অনবদ্য ভূমিকা পালন করেছেন।
ভাষা সংগ্রাম থেকে মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি ও তার দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি অনন্য অবদান রেখেছেন।
অধ্যাপক মোজাফফরের জন্ম ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ এপ্রিল। কুমিল্লা জেলার দেবীদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামের ভূঁইয়া পরিবারের সন্তান তিনি। বাবা ছিলেন স্কুলশিক্ষক। মাত্র ১৫ বছর বয়সে রাজনীতিতে তার হাতেখড়ি। গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকে মোজাফফর আহমদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবন থেকে বিভিন্ন কলেজে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
দেশভাগের আগেই মোজাফফর আহমদ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র মোজাফফর আহমদ দেশভাগের আগে-পরের একঝাঁক মুসলমান তরুণদের অন্যতম হিসেবে কমিউনিস্ট পার্টির অনুসারী ছাত্র ফেডারেশন এবং গণতান্ত্রিক যুবলীগের তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকের প্রাতঃস্মরণীয় বামপন্থি ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী, সরদার ফজলুল করিম, শহীদুল্লাহ কায়সার, আখলাকুর রহমান, অজিত কুমার গুহ, রণেশ দাসগুপ্ত, অলি আহাদ প্রমুখ ছিলেন তার রাজনৈতিক সহযোদ্ধা। এছাড়া তাজউদ্দীন আহমদ, গাজীউল হক, আবদুল মতিন, মোহাম্মদ তোয়াহা এবং হাবিবুর রহমান শেলী (বিচারপতি হাবিবুর রহমান) প্রমুখÑ যারা ছিলেন ভাষা আন্দোলনের সম্মুখসারির নেতা, তাদের সঙ্গেও মোজাফফর আহমদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
ভাষা আন্দোলনে, চরম বৈরী পরিবেশে মূলধারার ছাত্র আন্দোলন, বিশেষত শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেরণায় পরিচালিত ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’-এর সঙ্গে বামপন্থি এসব ছাত্রনেতা ঐক্যবদ্ধ থেকেই ভাষা আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন।
মোজাফফর আহমদ ছিলেন অপ্রকাশ্য কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। পার্টির সিদ্ধান্তেই তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে সার্বক্ষণিক রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আত্মনিয়োগ করেন। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনের পর ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। গোপনে কমিউনিস্ট কর্মী হলেও পার্টির সিদ্ধান্তেই তিনি প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগে কাজ শুরু করেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে দেবীদ্বার থেকে তৎকালীন মুসলিম লীগের শিক্ষামন্ত্রীকে পরাজিত করে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তরুণ পরিষদ সদস্য হিসেবে তিনি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ভাষা আন্দোলন ও আওয়ামী লীগ করার সুবাদে মওলানা ভাসানী, শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার ছিল একান্ত বন্ধুত্বের সম্পর্ক।
১৯৫৭ সালে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে বামপন্থিরা আওয়ামী লীগ ত্যাগ করেন। গড়ে ওঠে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, সংক্ষেপে ন্যাপ। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ কেন্দ্রীয় ন্যাপের অন্যতম নেতা নির্বাচিত হন। ন্যাপ আত্মপ্রকাশের বছর না পেরুতেই পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি হয়। জেনারেল ইস্কান্দার মির্জাকে সরিয়ে ‘ফিল্ড মার্শাল’ আইউব খাঁ প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে ক্ষমতা দখল করেন। আইউব এক দশক পাকিস্তানের ক্ষমতায় ছিলেন।
১৯৫৮ সালে শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা ভাসানীসহ বহুসংখ্যক রাজনৈতিক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। অ্যাবডো আইন জারি সোহরাওয়ার্দী-সহ বিশিষ্ট রাজনীতিবিদদের অনেকই রাজনৈতিক কর্মকা- ও নির্বাচনে অংশগ্রহণে ‘অযোগ্য’ ঘোষিত হন। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ-সহ অনেক বিশিষ্ট রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়। তারা গ্রেফতার এড়াতে আত্মগোপনে চলে যান। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ প্রায় আট বছর হুলিয়ার কারণে আত্মগোপনে ছিলেন। ১৯৬৬ সালে আইউব খাঁ-র সঙ্গে মওলানা ভাসানীর গোপন সমঝোতার ফলে মোহাম্মদ তোয়াহা, অধ্যাপক আসহাবউদ্দিন এবং আবদুল হকের সাথে মোজাফফর আহমদের হুলিয়াও প্রত্যাহার করা হয়। মওলানা ভাসানী মোজাফফর আহমদকে তার অনুসারী মনে করে তার ওপর থেকে হুলিয়া প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছিলেন। পরে প্রমাণিত হয় অধ্যাপক PM3মোজফফর আহমদ তৎকালীন রুশ-চীন মতাদর্শগত বিরোধ ও আইউবের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে মওলানা ভাসানী এবং চীনাপন্থিদের বিরুদ্ধে ছিলেন। তিনি আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের মস্কোপন্থি ধারার সঙ্গে একাত্ম ছিলেন।
রাজনৈতিক ও ভাবাদর্শগত কারণে নিষিদ্ধ ঘোষিত গোপন কমিউনিস্ট পার্টি যেমন ভেঙে যায়, তেমনি কমিউনিস্ট প্রভাবিত ন্যাপও ভেঙে যায়। ১৯৬৭ সালে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ মস্কোপন্থি পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি নির্বাচিত হন। মোজাফফর ন্যাপ হিসেবে পরিচিত প্রগতিশীল দলটি বিকাশমান বাঙালি মধ্যবিত্তের র‌্যাডিক্যাল অংশের মধ্যে নতুন আশাবাদ সৃষ্টি করে। প্রতিশ্রুতিশীল বিপুল সংখ্যক তরুণ ছাত্র-আন্দোলন থেকে ন্যাপে যোগদান করে।
মুক্তিযুদ্ধে মূলধারার বামপন্থিরাÑ ন্যাপ কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের সমবায়ে গড়ে তোলেন বিশেষ গেরিলা বাহিনী। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ জাতীয় নেতা হিসেবে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যই হননি, তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গড়ে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরাম ও দেশ সফর করেছেন।
স্বাধীনতাত্তোর ন্যাপ বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। একটা শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। তবে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বে ন্যাপ এই সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দেখে। ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচনে ন্যাপ ‘বিকল্প সরকারের’ ধ্বনি তোলে। নির্বাচনে যে দু-চারটে আসন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও ন্যাপ প্রত্যাশিত ভোট লাভে ব্যর্থ হয়। দেশে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষাবস্থা, জাসদ-গণবাহিনীর হঠকারী কর্মকা-, পিকিংপন্থি সন্ত্রাসীদের সশস্ত্র তৎপরতা এবং বঙ্গবন্ধুর সরকারকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্তের পটভূমিতে আওয়ামী লীগ, ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির সমন্বয়ে ‘ত্রিদলীয় ঐক্যজোট’ গড়ে ওঠে। কিন্তু ঐক্যজোট কার্যকর হয়নি। বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দেন। জাতীয় ঐক্যের প্লাটফরম হিসেবে বাকশাল গড়ে তোলেন।
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে যায়। শুরু হয় উল্টোরথের যাত্রা। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা- এবং নভেম্বরে চার জাতীয় নেতার নিষ্ঠুর হত্যাকা-ের ফলে বাংলাদেশে এক অদ্ভুত আঁধার নেমে আসে। পাকিস্তানি, আইউব মডেলের সামরিক শাসন চেপে বসে। অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাজনীতি প্রচ- চাপের মধ্যে পড়ে। দেশে সৃষ্টি হয় নেতৃত্বের শূন্যতা।
জেনারেল জিয়াউর রহমান এই নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণের সুযোগ নেন রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে। সামরিক শাসনের পরিপূরক বেসামরিক রাজনৈতিক নেতা হিসেবেও তিনি পাকিস্তানি-মার্কা নতুন ভাবাদর্শ নিয়ে আবির্ভূত হন। জিয়া ভয়ের সংস্কৃতির পাশাপাশি ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের’ আড়ালে খালকাটা এবং স্বনির্ভরতার ধ্বনি তুলে বামপন্থিদের একাংশ এবং সিভিল সোসাইটিকে বিভ্রান্ত করতে সমর্থ হন। অধ্যাপক আবুল ফজল, প্রফেসর ডা. ইব্রাহিম, অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ প্রমুখের মতো সর্বজন শ্রদ্ধেয় বিশিষ্টজনকে তার সামরিক সরকারের ‘উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য’ (মন্ত্রী) করায় বামপন্থিরাও হিসাবে-নিকাশে ভুল করে বসেন।
বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতা নিহত হওয়ার ফলে সৃষ্ট শূন্যতা পূরণের সুযোগ হয়েছিল ঐতিহ্যশালী রাজনৈতিক দল ও নেতাদের। কিন্তু জনগণের কাছে পরিচিত বয়োজ্যেষ্ঠ ‘সংগ্রামী জননেতা’ মওলানা ভাসানী গ্রহণ করেন উল্টো পথ। তিনি ও তার দল এবং সাধারণভাবে চীনাপন্থি বাম দলগুলো জিয়াউর রহমানের সমর্থক হয়ে দাঁড়ান।
প্রফেসর মোজাফফর আহমদের কাছেও এই শূন্যতা পূরণের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু তিনি সে ভূমিকা নেননি; বরং জিয়াউর রহমানের ১৯-দফা ছাপিয়ে বিতরণ করে বিতর্কের সৃষ্টি করেন। বিভ্রান্ত কমিউনিস্ট পার্টিও হয়েছিল।
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ১৯৭৯ এবং ১৯৮৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। অন্যান্য রাজনৈতিক নেতার মতো স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। একাধিকবার গ্রেফতারবরণ করেন। আশির দশকে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়।
গত শতাব্দীর শেষ দশকে আকস্মিকভাবে সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব-ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে ঘটে ক্ষমতার পালাবদল। ঐ দেশগুলোতে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতাচ্যুত হয়। অবসান ঘটে বিদ্যমান সমাজতন্ত্রের। বিশ্বব্যাপী সমাজতান্ত্রিক-ব্যবস্থার এই পতন প্রচ- আলোড়ন সৃষ্টি করে। দেশে দেশে প্রগতিশীল বাম ঘরানার দলগুলো তীব্র ভাবাদর্শগত সংকটে পড়ে। শ্রমজীবী মানুষ এবং সামাজিক মুক্তির প্রত্যাশী রাজনৈতিক নেতা, কর্মী, বুদ্ধিজীবী ও তরুণরা চরম হতাশার শিকার হন। তারা দিক-দিশাহীন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে বাম রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে, বিশেষত মূলধারার কমিউনিস্ট আন্দোলন তথা সিপিবি ভেঙে যায়। নানা উপদলে বিভক্ত হয় ঐতিহ্যবাহী ন্যাপ।
কিন্তু সমাজতন্ত্রের অভ্রান্ততার প্রশ্নে, ভাবাদর্শগত প্রশ্নে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ তার চিরাচরিত অবস্থানে অবিচল থাকেন।
অনেকের মতে, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ যতটা না রাজনৈতিক নেতা, তার চেয়েও বেশি ‘সমাজচিন্তক’। তিনি একজন মার্কসবাদী প-িত। স্বাধীনতার পর ন্যাপের কাছে প্রত্যাশিত ভূমিকা ছিল কমিউনিস্ট পার্টি ও আওয়ামী লীগের মধ্যবর্তী একটি সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির। দলটির বৈশিষ্ট্য হওয়ার কথা ছিল ‘মাল্টি ক্লাস’ পার্টির এবং সংবিধানে বিধৃত জাতীয় চারনীতির নীতিনিষ্ঠ অগ্রবাহিনীর। কিন্তু দৃশ্যত ন্যাপ মাল্টি ক্লাস মনে হলেও, এই দলটি এবং এর মূল নেতা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ শ্রেণি দৃষ্টিভঙ্গির কাঠামো এবং মার্কসবাদী ভাবাদর্শগত অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন নি। দল পরিচালিত হয়েছে দ্বৈত কেন্দ্র থেকে। একদিকে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের প্রকাশ্য ও অফিসিয়াল নেতৃত্ব, অন্যদিকে গোপনে কমিউনিস্ট পার্টির খবরদারি। স্বাধীনতার পরও তিনি কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। দলের মধ্যে এই দুই কেন্দ্রের কারও অবস্থানই নিরঙ্কুশ ছিল না। এক পর্যায়ে কমিউনিস্ট পার্টি কার্যত নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার অবস্থান থেকে সরে আসে। কিন্তু এর ফলে দ্বি-কেন্দ্র থেকে ন্যাপে বহু কেন্দ্রের সৃষ্টি হয়। দলের ভেতর গণতন্ত্র চর্চা ব্যাহত হওয়ায় দলটি একাধিক দল, উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ একজন নীতিনিষ্ঠ সৎ ও ত্যাগী রাজনৈতিক নেতা হিসেবে জাতীয়ভাবে স্বীকৃত। রাজনৈতিক পরিস্থিতির মূল্যায়ন এবং কৌশল নির্ধারণে ভুল-ভ্রান্তি থাকলেও, কোনো সুবিধাবাদ, আপসকামিতা, ক্ষমতার মোহ এবং দুর্নীতির মালিন্য তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। ব্যক্তিগত জীবনে বিলাসিতাবর্জিত সহজ-সরল জীবনযাপনের একটা অনুসরণীয় মানদ- তিনি দাঁড় করিয়েছিলেন। মুসলমানপ্রধান এবং ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রভাবে আচ্ছন্ন একটা দেশে ‘সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম যে কতটা দুরূহ, আমরা সবাই তা জানি। এদেশে ‘সমাজতন্ত্র’কে ধর্মহীনতার নামান্তর হিসেবেই বিপুল জনগণের মনস্তত্ত্বে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। এমনকি ধর্মনিরপেক্ষতাকেও এদেশে ধর্মহীনতার নামান্তর হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা অব্যাহত আছে। আর এই বাস্তবতার কারণেই, অধ্যাপক মোজাফফর তত্ত্ব দেন ‘ধর্ম-কর্ম-সমাজতন্ত্র’। অর্থাৎ তিনি দেশবাসীর মনে এই আস্থা জাগাতে চেয়েছেন যে, সমাজতন্ত্র কোনো ধর্মবিরোধী মতাদর্শ বা ব্যবস্থা নয়।
তার এই চিন্তাধারা বামপন্থি মহলে সর্বজনীন সমর্থন পায়নি। তবে এ-কথা স্বীকার করতেই হবে যে, সমাজবদলের একজন নিষ্ঠাবান সংগ্রামী পথিকৃৎ হিসেবে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ভাবাদর্শগত বিশুদ্ধতা রক্ষা করেও জনগণের কাছে তাকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য নানান সৃজনশীল পন্থার কথা ভেবেছেন।
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক। তিনি দেশপ্রেম, সততা, আত্মত্যাগ এবং একটি ভেদ-বৈষম্যহীন সাম্যের সমাজ নির্মাণের সংগ্রামে চিরদিন আমাদের বাতিঘর হিসেবে নতুন নতুন প্রজন্মকে প্রেরণা জোগাবেন। তিনি আমাদের সামাজিক মুক্তি সংগ্রামের অন্তবিহীন পথযাত্রী। তার স্মৃতির প্রতি সশ্রদ্ধ অভিবাদন।

নূহ-উল-আলম লেনিন

Category: