Blog Archives

মাসব্যাপী নানা আয়োজনে : বঙ্গবন্ধু-স্মরণ

PM2হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, মহান স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৪তম শাহাদাতবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে সর্বস্তরের মানুষ স্মরণ করে জাতির পিতাকে। বরাবরের মতো এবারও সরকারি-বেসরকারিভাবে পালিত হয়েছে বিভিন্ন কর্মসূচি। জাতীয় শোক দিবস সামনে রেখে আগস্টের প্রথম দিন থেকেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী অঙ্গসংগঠনসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে।
১ আগস্ট গোপালগঞ্জে ১০০ শিশুর অংশগ্রহণে জাতির পিতা উৎসর্গীকৃত ‘পুষ্পকানন’ নির্মাণের আয়োজন করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি।
২ আগস্ট গোপালগঞ্জে মুজিববর্ষে নির্মিতব্য সফল শিল্পের নির্মাণ ভাবনা ও কর্মপরিকল্পনা বিষয়ক এক কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এই কর্মশালার আয়োজন করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি।
৫ আগস্ট বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি জাতীয় নাট্যশালার সেমিনার কক্ষে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানে ওপর রচিত ১০০টি গ্রন্থের পাঠ পর্যালোচনা করা হয়।
৬ আগস্ট বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি জাতীয় নাট্যশালায় আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ‘মুজিব মানে মুক্তি’ নাটক মঞ্চায়িত হয়।
১১ আগস্ট রাঙ্গামাটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের নিজস্ব হলরুমে বিভিন্ন উপজেলার স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীর মাঝে ছড়াগান, দেশাত্মবোধক গানের প্রতিযোগিতার আয়োজন করে।
১৫ আগস্ট সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের সকল সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোয় জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করার মধ্য দিয়ে শুরু হয় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জাতীয় শোক দিবস পালন। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন ও রেডিওগুলো দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করে এবং সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণীতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ১৫ আগস্টের সকল শহিদের রুহের মাগফেরাত কামনা করেন। এ উপলক্ষে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর মাসিক সচিত্র বাংলাদেশে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে এবং বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করে। শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালার ১নং গ্যালারিতে ১ আগস্ট থেকে ‘শিল্পের আলোয় বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক মাসব্যাপী কমসূচি পালন করা হয়। ফ্রেমে ফ্রেমে ঝুলানো শিল্পীদের রংতুলির আঁচড়ে বঙ্গবন্ধু ওপর চিত্রকর্ম ও আলোকচিত্র প্রদর্শিত হয়। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এবং শুক্রবার বেলা ৩টা হতে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয় এবং তথ্যভবনে পক্ষকালব্যাপী এক আলোকচিত্র প্রদর্শনী চলে।
জাতীয় জাদুঘরে কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে ‘ভয়াবহ আগস্ট’ শিরোনামে এক সেমিনার আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে ‘বঙ্গবন্ধুকে জানো বাংলাদেশকে জানো’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত ছড়া পাঠ, শিশু বক্তাদের অনুভূতি প্রকাশ, শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, শিশু একাডেমি হতে প্রকাশিত বঙ্গবন্ধুর জীবনীভিত্তিক ২৫টি বইয়ের প্রদর্শনী এবং বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ বিষয়ক আলোকচিত্র প্রদর্শনী। বেইলী রোডস্থ অফিসার্স ক্লাবের আয়োজনে নিজস্ব মিলনায়তনে মহাকাল নাট্য সম্প্রদায়ের প্রযোজনায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার-পরিজনদের নির্মম হত্যাকা-ের প্রেক্ষাপটে গবেষণালব্ধ নাটক ‘শ্রাবণ ট্র্যাজেডি’ মঞ্চস্থ হয়। মহাপ্রয়াণের শোক আখ্যান ‘শ্রাবণ ট্র্যাজেডি’ রচনা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আনন জামান এবং মহাকাল নাট্য সম্প্রদায়ের ৪০তম এ প্রযোজনার পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার ও পারফরমেন্স স্ট্যাডি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আশিক রহমান লিওন।
সারাদেশের অলিগলিতে মাইকে প্রকম্পিত হয় বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের কালজয়ী ভাষণ, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত গান, কবিতা-ছড়া, দেশাত্মবোধক তথা স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণামূলক গান। শোক দিবসের পোস্টার, ফেস্টুন, ব্যানার, কালো পতাকা ও কালো ব্যাজ ধারণ করা হয়। মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গান, কবিতা-ছড়া, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং হামদ-নাত, মিলাদ মাহফিল ও দোয়ার আয়োজন করা হয়।
১৭ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণে বিশেষ সাহিত্য আসর আয়োজন করে খেলাঘর। অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে স্ব-রচিত কবিতা পাঠ, আবৃত্তি, স্মৃতিচারণ ও শিশুদের সংগীত পরিবেশনা।
২১ আগস্ট ২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার ভয়াবহতা নিয়ে ৫১ জন শিল্পীর অংশগ্রহণে স্থাপনা শিল্প ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিনাশী ধ্বংষযজ্ঞ’ শিরোনামে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি।
২৩ আগস্ট বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে ‘বাউল কণ্ঠে বঙ্গবন্ধু’ এবং বঙ্গবন্ধু ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’ পাঠ ও চিত্র নির্মাণের আয়োজন করা হয়। এছাড়াও একাডেমির নাট্যশালায় ইন্টারন্যাশনাল ডিজিটাল কালচারাল আর্কাইভে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর নির্মিত প্রামাণ্য চলচ্চিত্র : ‘অসমাপ্ত মহাকাব্য’, ‘চিরঞ্জীব বঙ্গবন্ধু’, ‘স্বাধীনতা কী করে আমাদের হলো (ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ অবলম্বনে)’ এবং ‘BANGABANDHU Forever in our hearts’ প্রদর্শিত হয়। সকল জেলা উপজেলা শিল্পকলা একাডেমিতে শিশু চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।
২৪ আগস্ট বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নাট্যশালায় ইন্টারন্যাশনাল ডিজিটাল কালচারাল আর্কাইভে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ওপর নির্মিত প্রামান্য চলচ্চিত্র : ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম (বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের বিশ্ব স্বীকৃতি বিষয়ক তথ্যচিত্র)’, ‘আমাদের বঙ্গবন্ধু (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনভিত্তিক একটি প্রামাণ্যচিত্র)’, ‘সোনালি দিনগুলো (বঙ্গবন্ধু সরকারের সাড়ে তিন বছর)’, ‘বিরতি’, ‘ওদের ক্ষমা নেই’ এবং ‘হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু’ প্রদর্শিত হয়। জাতীয় চিত্রশালায় বরেণ্য চিত্রশিল্পীদের অংশগ্রহণে ‘শিল্পের আলোয় বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক আর্ট ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়।
২৫ আগস্ট জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণে কবিতা ও গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনের ইন্দিরা গান্ধী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র (আইজিসিসি)।
২৬, ২৮ ও ২৯ আগস্ট তিন দিনব্যাপী জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের আয়োজনে ‘বঙ্গবন্ধু বিষয়ক পুস্তক প্রদর্শনী ও পাঠ’ অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালায়।
৩০ আগস্ট বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি জাতীয় চিত্রশালায় ‘আমার বঙ্গবন্ধু’, ‘আমিই মুজিব’, ‘২০৪১ সালে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা’ তিন বিষয়ের ওপর স্কুল ছাত্রদের শ্রেণিভিত্তিক শিশু চিত্রাঙ্কান প্রতিযোগিতার আয়োজন করে।
৩১ আগস্ট বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালায় বঙ্গবন্ধু বিষয়ক আলোকচিত্র প্রদর্শনীর মাধ্যমে শেষ হয় বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ ও আর্কাইভ ’৭১-এর মাসব্যাপী এই আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন।
শোকাবহ আগস্টের মাসজুড়ে বিনম্র শ্রদ্ধায় বঙ্গবন্ধুকে স্মরণে সরব ছিল সাংস্কৃতিক অঙ্গন।

শাহ্ সোহাগ ফকির

Category:

বিশ্বায়ন এবং নারী

এম এম আকাশ:


 

ভূমিকা
একজন নারীর জীবনে বিশ্বায়ন একদিকে যেমন সুযোগের স্বর্ণ দুয়ার খুলে দেয় তেমনি তার মধ্যে তৈরি করে অজানা-অচেনা জগতের ভীতি। শুধু ভীতি নয়, কখনও কখনও তা বাস্তব ক্ষতি ও বেদনায়ও পরিণত হয়। বিশ্বায়ন নারীকে অন্য নারীর জগতের সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দেয়। গ্রামের গৃহবন্দি নারী মোবাইলের মাধ্যমে বা টেলিভিশনের স্যাটেলাইট চ্যানেলের বদান্যতায় দেখতে পায় কীভাবে তার মতোই একজন একাকী নারী ঢাকা শহরে পোশাক শিল্পে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। কীভাবে সেই পোশাক শিল্পের পণ্য বহু হাত ঘুরে আমেরিকার হাল ফ্যাশান তরুণীর প্রিয় পোশাকে পরিণত হচ্ছে। যুগ যুগ ধরে গ্রামের মহিলারা কুটিরে বসে ছেলে-মেয়েদের কাপড় সেলাই করে যে ক্ষিপ্র অঙ্গুলীর অধিকারী হয়েছেন তা আজ বিশ্বায়নের কল্যাণে সর্বাধুনিক পোশাক তৈরির কাজে নিয়োজিত হয়েছে। ‘ক’-এর মা, ‘খ’-এর বোন অথবা ‘গ’-এর বউ এখন আর অন্যের পরিচয়ে পরিচিত হচ্ছেন না। তার ভুলে যাওয়া নাম এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ পরিচয় নিয়ে বিশেষ একজন শ্রমিকের পরিচয়পত্র নিয়ে জগতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। তিনি বলতে পারছেন আমার নিজস্ব পরিচয় আছে। আমি শুধু একজনের মা বা বোন বা কন্যা বা বধূ নই। তবে বিশ্বায়নের এই ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্য ও মর্যাদা সর্বত্র সমানভাবে বিকশিত হয়নি। যদিও নারীদের মনের আয়নায় এর একটি স্থায়ী ছায়াপাত ঘটে গেছে।
অ-আধুনিক চিরায়ত নারীদের আজন্ম লালিত অভ্যাস বিশ্বায়নের এই হাতছানিতে সবসময় দ্বিধাহীনভাবে সাড়া দিতে সক্ষম হয় না। ভয় থাকে অনেক কিছুর। বাড়ির নিরাপদ আশ্রয় ছাড়ার ভয়। রানা প্লাজার মতো ছাদ ভেঙে অকাল মৃত্যুর ভয়। রাত-বিরাতে ঘরে ফেরার সময় আকস্মিক হামলার ভয়। সবচেয়ে বড় ভয় নিজের সংসার কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয়। নষ্ট মেয়ে অপবাদের ভয়। বিশ্বায়ন নারীকে সমুদ্রযাত্রার আহ্বান জানায়, সুযোগ উন্মুক্ত করে দেয় ঠিকই; কিন্তু এমন কোনো নিশ্চিত গ্যারান্টি দিতে পারে না যে সমুদ্রপথে ঝড়ে আক্রান্ত হয়ে সে কখনোই ডুবে যাবে না। এ যেন অনেকটা এক নিরুদ্দেশ তীর্থযাত্রার মতো। কূলে ফেরার গ্যারান্টি নেই। পথেই মৃত্যু হতে পারে। তাই বিশ্বায়ন নারীর মনে এক অনিবার্য দোলাচলের সৃষ্টি করছে এবং তাকে নিক্ষেপ করেছে এক অস্থির দ্রুত পরিবর্তনশীল ঘূর্ণিপাকে। এই ঘূর্ণিপাককে আমাদের বিশ্লেষণ করতে হবে তার ইতিবাচক-নেতিবাচক উভয় দিক থেকে। আমরা চাই না চাই এর থেকে আমাদের আজ আর কোনো পরিত্রাণ নেই। তাই কীভাবে নারীর কল্যাণে এর সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করা যায় সেটাই আজ আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। এ প্রবন্ধের মূল প্রশ্ন ও উত্তর একে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হবে।
বিশ্বায়ন কী?
মানব সমাজের প্রারম্ভে যেসব শিকারি গোত্রকে আমরা দেখতে পাই তাদের চরিত্র ছিল ‘বিচরণশীল’। কোনো এক জায়গায় বেশি দিন তাদের পক্ষে থাকা সম্ভব ছিল না। কারণ শিকার করতে করতে ঐ জায়গার বা ঐ অঞ্চলের পশু-পাখি ফল-মূল ফুরিয়ে যেত এবং গোত্রের জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলেও তাদের পক্ষে ঐ সীমিত জায়গায় বসবাস করা অসম্ভব হয়ে উঠত। অতএব শিকারি সমাজ বিশ্বের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে বেড়াতে বাধ্য হতো। অনুমান করা যায় যে এ সময় গোত্রে গোত্রে ‘বনের’ মালিকানা নিয়ে ঝগড়া ও লড়াই হতো এবং সম্ভবত পরাজিত গোত্রের সদস্যদের ‘দাসে’ পরিণত করে বৃহত্তর দাস সমাজের সূচনা হয়েছিল।
গোত্রের বিচরণশীলতা বা চারণশীল মানব গোষ্ঠীর (Nomadic Tribes) ঘুরে বেড়ানোকে আমরা ‘বিশ্বায়ন’ বলছি না। কিন্তু দাস সমাজ যখন স্থিতিশীল হয়ে গ্রিসে বা প্রাচ্যের কোথাও কোথাও (মিসরে, মধ্যপ্রাচ্যে, আফ্রিকায়) সাম্রাজ্য হিসেবে গড়ে উঠল তখন পৃথিবীতে একটি নতুন প্রক্রিয়ার সূচনা ঘটেÑ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রক্রিয়া। তখন দাস সাম্রাজ্যের অধীনে রাজ্যে-রাজ্যে দাসের বাণিজ্য, বিভিন্ন পণ্যের বাণিজ্য, সৈন্যদের আগমন-প্রত্যাগমন শুরু হয়ে গেল। এই আন্তর্জাতিক লেনদেনই হচ্ছে বিশ্বায়নের প্রাথমিক সূত্রপাত।
বিশ্বায়নকে তাই আমরা সংজ্ঞায়ন করতে পারি ‘আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্রমবিবর্তনশীল এক প্রক্রিয়া হিসেবে’। এই লেনদেনের আধেয় (Content) ক্রমশ পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে, গুণের দিক থেকে বিচিত্র থেকে বিচিত্রতর হয়েছে এবং তাদের পরিসরও বিস্তৃত থেকে আরও বিস্তৃততর হয়েছে। এক কথায় বলা যায়, প্রাচীন সাম্রাজ্যের পত্তনের পর থেকে বিশ্বায়নের এই প্রক্রিয়া ক্রমাগত কম-বেশি প্রসারিত হয়ে চলেছে। কোনো মানবগোষ্ঠী, কোনো অঞ্চল বা কোনো দেশ যদি সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন ও স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবনযাপনে নিয়োজিত হয়, তাহলে তা প্রবাহমান বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ঠিকই; কিন্তু শেষ পর্যন্ত আত্মতাগিদেই তাকে আবার আপন খোলস ভেঙে বিশ্বায়নের রথে চড়তে হয় নতুবা বিশ্বায়নের রথ নিষ্ঠুরভাবে তাকে মাড়িয়ে সামনে অগ্রসর হয়ে যায়।
বিশেষ করে মুদ্রাভিত্তিক (স্বর্ণই হোক বা টাকাই হোক!) অর্থনীতির সূচনার পর থেকে সারাবিশ্বে বিশ্বায়নের প্রবাহমান শক্তি প্রায় অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই অপ্রতিরোধ্য লেনদেনের প্রক্রিয়াগুলো হচ্ছে-
ক. পণ্যের লেনদেন
খ. পুঁজির লেনদেন
গ. শ্রমের লেনদেন
ঘ. জ্ঞান ও প্রযুক্তির লেনদেন
ঙ. তথ্যের লেনদেন
চ. সাংস্কৃতিক লেনদেন
ছ. মনের লেনদেন
জ. অন্যান্য নানা ধরনের সম্পর্কের বহুমুখী মাত্রায় ও গভীরতায় নিত্যনতুন লেনদেনের উদ্ভব হচ্ছে প্রতিদিন। যার বস্তুগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে একবিংশ শতকের সর্বগ্রাসী যোগাযোগ বিপ্লব। আর অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে মুদ্রা ও অর্থ।
তাই সব মিলিয়ে বিশ্বায়নকে আমরা একটি বহুমুখী-জটিল-বৈচিত্র্যপূর্ণ প্রক্রিয়া হিসেবে দেখতে পাচ্ছি এবং এই প্রক্রিয়ার দুটি পরস্পরবিরোধী অনিবার্য দিক হচ্ছেÑ
ক. ক্রমাগত সম্পর্কের বিস্তৃতি, গভীরতা, ঐক্য ও সংহতি। এবং একই সময়ে একই সঙ্গে
খ. ক্রমাগত সম্পর্কের টানাপড়েন সংগ্রাম, বিচ্ছেদ ও যুদ্ধ।
তাই এক কথায় বলা যায়, উত্থান-পতনের এবং শান্তি ও সংঘর্ষের এক দ্বান্দ্বিক গতির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে বিশ্বায়ন।

বিশ্বায়ন নেতিবাচক ও ইতিবাচক দিক
বিশ্বায়ন সম্পর্কে বর্তমানে তাই দুটো পরস্পরবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি বিদ্যমান। যারা বামপন্থি তাদের অধিকাংশের অভিমত হচ্ছেÑ বর্তমানে যে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া চালু আছে তার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বভার বিরাজ করছে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর হাতে, যার শীর্ষে রয়েছে ‘আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ’। আর প্রভাবশালী আমেরিকান তত্ত্ববিদদের মতে, পশ্চিমা সংস্কৃতি ও সভ্যতা হচ্ছে এক উন্নততর গণতান্ত্রিক সভ্যতার বাহন। তাই পূর্ব বা দক্ষিণের পশ্চাদপদ দেশগুলোকে এই সভ্যতাই গ্রহণ করতে হবে এবং সেই প্রক্রিয়ায় সেখানে যেসব দ্বন্দ্বের উদ্ভব হবে, তা আসলে হচ্ছে দুই ভিন্ন ভিন্ন সভ্যতার দ্বন্দ্ব, যার মধ্যে অগ্রণী প্রতিনিধি হচ্ছে পশ্চিম। সেজন্য পশ্চিমা শক্তিবিরোধী সকল ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগ করেই পশ্চিমকে জিততে হবে এবং সেখানে নীতি-নৈতিকতার কোনো বালাই না থাকলেও চলবে। এমনকি নিজেদের উন্নততর সভ্যতা বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠার জন্যই পশ্চিমকে দ্বৈতনীতি অবলম্বন করতে হবে। এই ধারার প্রধান প্রবক্তা স্যামুয়েল পি. হান্টিংটন তার বিখ্যাত গ্রন্থ “The Clash of Civilization and the Remaking of World Order”-এ লিখেছেন-“Hypocrisy, double standards and ‘but nots’ are the price of universalist pretensions. Democracy is promoted, but not if it brings Islamic fundamentalists to power; non proliferation is preached for Iran and Iraq, but not for Israel; free trade is the elixir of economic growth, but not for agriculture, human rights are an issue for china, but not with Saudi Arabia; aggression against oil owning Kuwaits is massively repulsed, but not against non oil owning Bosnians. Double standards in practice are the unavoidable price of universal standards of principle.”
(“ভ-ামী, দ্বিচারিতা এবং ‘কিন্তু না’ হচ্ছে সর্বজনীনতার মুখোশের দাম। গণতন্ত্রকে উৎসাহিত করা হবে; কিন্তু যদি এতে ইসলামি মৌলবাদীরা ক্ষমতায় আসে তাহলে নয়, আণবিক বোমার বিচ্ছুরণ নিষিদ্ধ করা হবে ইরান এবং ইরাকের জন্য; কিন্তু ইসরায়েলের জন্য নয়, মুক্ত বাণিজ্যকে বলা হবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জীবনসুধা; কিন্তু কৃষির জন্য তা নয়, মানবাধিকার অবশ্যই চীনের জন্য একটি সমস্যা বটে; কিন্তু সৌদি আরবের জন্য তা ঠিক নয়, তেলের মালিক কুয়েতকে আক্রমণ করাটা প্রবলভাবে ঘৃণিত হবে; কিন্তু তেলের মালিক নয় এ-রকম রাষ্ট্র বসনিয়া আক্রান্ত হলে অত আপত্তির কোনো কারণ নেই। সুতরাং সর্বজনীন নীতির আদর্শ রক্ষার অনিবার্য মূল্য হচ্ছে বাস্তব অনুশীলনের ক্ষেত্রে দ্বিচারিতা করা।”)

এই উদ্ধৃতির পর সহজেই মনে হয় যে বিশ্বায়ন এবং পশ্চিমাদের আধিপত্য সমার্থক। চরম বামপন্থিরা এবং চরম রক্ষণশীল দক্ষিণপন্থিরা উভয়েই এই নেতিবাচক ‘প্রিজমেই’ বিশ্বায়নকে দেখে থাকেন।
এ ধরনের আগ্রাসী পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে এবং এর সূচনা ইউরোপের ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লব থেকে। ১৫০০ থেকে ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে পুঁজিবাদী বিশ্বের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে ইংল্যান্ড তার বিশ্ব সাম্রাজ্যটিকে বিস্তৃত করতে সক্ষম হয়েছিল। ভারতবর্ষ, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা সব অঞ্চলই এই সময়কালে ইংল্যান্ডের আধিপত্যে চলে আসে। এই আধিপত্য ছিল পুঁজির আধিপত্য। এই বিশ্বায়ন ছিল পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন। ব্রিটেন ও অন্যান্য ইউরোপীয় উপনিবেশ বিস্তারকারী দেশগুলো ১৮০০ সালের মধ্যেই সারাবিশ্বের ৩৫ শতাংশ স্থলভাগে কর্তৃত্ব স্থাপনে সক্ষম হয়েছিল। আর পরবর্তী মাত্র ৩৫ বছরের মধ্যে ১৮৩৫ সালে তা ৬৭ শতাংশে পরিণত হয়। এরপর ১৯১৪ সালে তা সর্বোচ্চ ৮৫ শতাংশে পরিণত হয়। কিন্তু এর পরেই নেমে আসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ১৯১৭ সালে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। এরপর উপনিবেশগুলোর স্বাধীন হওয়ার পালা। সদ্য-স্বাধীন দেশগুলোকে নিয়ে গঠিত হয় জোটনিরপেক্ষ তৃতীয় বিশ্ব। আর ধীরে ধীরে তৈরি হয়ে যায় একটি দুই মেরুর বিশ্ব। সাম্রাজ্যবাদের একাধিপত্যের মধ্যে ফাটলের সূচনা হয়। ঠা-া যুদ্ধের পুরো আমলটাই ছিল সমাজতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থা এবং পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার টানাপড়েন ও দ্বন্দ্বের যুগ। তাই বিশ্বায়ন প্রক্রিয়াগুলো সর্বদাই ছিল দ্বন্দ্বে ভরপুর। ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় প্রকার ঘটনায় আকীর্ণ। উত্তরের শিল্পায়িত সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বের মধ্যে ছিল দক্ষিণের মতো অসম বিকশিত প্রান্তিক জোটনিরপেক্ষ মিত্র। আবার দক্ষিণের নেতা সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক শিবিরের মধ্যেও ছিল নানা প্রান্তিক মিত্ররাষ্ট্র। এর মধ্যে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধও অনুষ্ঠিত হয়ে যায়, যা সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের এই পার্থক্যকে আরও স্পষ্ট করে দেয়। চীন নতুন সমাজতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং ১৯৬০-এর পর থেকে নিজের জাতীয় স্বাতন্ত্র্য নিয়ে দাঁড়াতে শুরু করে। তাই বর্তমান বিশ্বকে একটি জটিল বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার ফলাফল হিসেবেই দেখতে হবে, যার মাইলফলকগুলো হচ্ছেÑ
ক. আদি যুগের ও মধ্যযুগের দাস ও সামন্ত সাম্রাজ্যসমূহ।
খ. আধুনিক যুগের পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব।
গ. বিংশ শতকে পুঁজিবাদী-সমাজতান্ত্রিক এই দ্বৈত মেরুতে বিভক্ত বিশ্ব।
ঘ. এবং বর্তমানে বহু মেরুতে বিভক্ত বিচিত্র বিশ্ব। এই বহু মেরুর মধ্যে রয়েছেÑ আমেরিকান জোট, ইউরোপিয়ান জোট, ল্যাটিন আমেরিকান জোট, চীন-রাশিয়া-ভারত জোট ইত্যাদি।
বিশ্বায়নের এই দীর্ঘকালব্যাপী ঐতিহাসিক পরিক্রমায় পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন পর্বটি সম্পর্কে বহু নেতিবাচক বিবরণ ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে। কিন্তু প্রধানত নেতিবাচক হলেও এর কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে, যা ভুললে আমাদের চলবে না। পুঁজিবাদের সর্বাধিক নির্মম সমালোচক কার্ল মার্কস, যিনি পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের বদলে সাম্যবাদী বিশ্বায়নের প্রবক্তা ছিলেন, তিনি নিজেই পুঁজিবাদের ইতিবাচক দিকগুলোর ভূয়সী প্রশংসা করে গেছেন এবং বলতে চেয়েছেন যে পুঁজিবাদের প্রতিষ্ঠিত সভ্যতা ও প্রাচুর্যকে ব্যবহার করেই গড়ে উঠবে নতুন বিশ্বায়নÑ যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তির স্বাধীনতা এবং সকল ব্যক্তির স্বাধীনতা পরস্পর পরিপূরক হিসেবে গড়ে উঠবে এবং ব্যক্তি যখন বিশ্বমানব তথা বিশ্বরাষ্ট্রের সুসভ্য নাগরিকের প্রতিনিধিতে পরিণত হবেন। মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বায়নের বিষয়গত ইতিবাচক দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলোÑ
ক. স্বয়ংসম্পূর্ণ, কুসংস্কার ও কূপম-ূকতার আড্ডাখানা মধ্যযুগীয় ছোট ছোট অঞ্চল ও গ্রামগুলোকে তা একত্রিত করেছে। বিচ্ছিন্নতার অবসান ঘটিয়েছে।
খ. বদ্ধতা, সংকীর্ণতা ও আঞ্চলিকতার বদলে তা তৈরি করেছে মুক্ত গতিশীলতা, বিস্তৃতি ও বিশাল সামষ্টিক জাতীয় বাজার।
গ. রেল বিপ্লব, বিদ্যুৎ বিপ্লব, কম্পিউটার বিপ্লব, ইত্যাদির মাধ্যমে তা সমগ্র পৃথিবীকে আরও যুক্ত ও আরও ছোট করে ফেলেছে। যা ছিল একশ বছরের ব্যাপার, তা এখন হচ্ছে এক মুহূর্তে।
ঘ. জ্ঞান ও প্রযুক্তির বিচ্ছুরণ ঘটিয়েছে। প্রত্যন্ত জঙ্গলেও বিদ্যুতের আলো, সোলার প্যানেলের আলো পৌঁছে যাচ্ছে।
ঙ. চরম দারিদ্র্য ও চরম অভাব দূর করেছে অনেক জায়গায়। দরিদ্র না থাকা এখন বিশ্বব্যাপী একটি মানবাধিকারে পরিণত হয়েছে। এটা আজ আর সুদূর কোনো স্বপ্ন নয়। যদিও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এখনও ক্ষুধার্ত লোকের অস্তিত্ব আছে।
চ. ভোগের প্রাচুর্য বৃদ্ধি করেছে, যদিও তা সবার জন্য সমান হয়নি।
ছ. মোট সম্পদের সৃষ্টি ও পরিবর্ধন ঘটিয়েছে। যদিও তা সর্বত্র ও সবার জন্য এক রকম হয়নি।
জ. পৃথিবীর সীমানা পেরিয়ে উপগ্রহ, রকেট ইত্যাদির মাধ্যমে বিশ্বব্রহ্মা-কে জয় করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। যদিও এসব করতে গিয়ে রুষ্ঠ প্রকৃতির রোষানল থেকে রেহাই পাওয়া যায়নি।
ঝ. শ্রম ও পুঁজির যে দ্বন্দ্ব তাকে যেমন এই পুঁজিবাদী বিশ্বায়ন উসকে দিয়েছে, তেমনি দুই যমজের মতো শ্রম ও পুঁজি উভয়ে উভয়কে আরও বড় আকারে আঁকড়ে ধরেছে। তৈরি করেছে বিশ্বব্যাপী বৃহৎ বহুজাতিক উৎপাদন ইউনিট। এসব প্রতিষ্ঠানের ভেতরে যত বৈষম্যই থাকুক না কেন, এর সামাজিক ও বৈশ্বিক যুক্ততা আজ অনস্বীকার্য।
ঞ. এ ধরনের পুঁজিবাদী বিশ্বায়নে বৈষম্য ও দ্বন্দ্বের বিষয়টা বণ্টনের ও অসম বিকাশের বৈষম্যের সঙ্গে জড়িত হলেও মোট বা সামগ্রিক উৎপাদন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে, মোট সম্পদ সৃজনের ক্ষেত্রে, মোট অগ্রগতির ক্ষেত্রে এর গতিশীলতা এখনও অনস্বীকার্য।
তাই সামগ্রিক বিচারে আমরা বলব ‘বিশ্বায়নের’ যেই স্তরে আমরা আজ এসে দাঁড়িয়েছি সেখানে আমরা বিপুল সম্ভাবনা যেমন দেখছি, তেমনি ঐ সম্ভাবনার বাস্তবায়নের ক্ষমতার ক্ষেত্রে রয়েছে বিপুল এক বৈষম্য। এই বৈষম্যের মূল কারণ হচ্ছে ঐতিহাসিকভাবে গড়ে ওঠা এক অসম কাঠামো এবং তার থেকে উদ্ভূত অসম বিকাশের প্রক্রিয়া। বিশ্বায়নের প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দিয়ে এ সমস্যার সমাধান হবে না; বরং ঐ অসম প্রক্রিয়া ও কাঠামোকে সংস্কার ও মৌলিক পরিবর্তনের মাধ্যমেই এর সমাধানকে খুঁজে বের করতে হবে। বিশ্বায়নকে পরিত্যাগ করে নয়, গণতান্ত্রিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করেই এর সংকট ও ঝুঁকিগুলো হ্রাস করতে হবে।

নারী প্রত্যয়ের বিবর্তন
বিশ্বায়নের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নারী প্রত্যয়ের অর্থ ও দ্যোতনারও পরিবর্তন হয়েছে। একদম আদিম সমাজে যখন গোষ্ঠীগুলো শ্রেণিহীন সমাজে বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করত, তখন ‘নারী’ ছিল সমাজের স্বাভাবিক বংশ লতিকার বাহন। সমাজটা তখন নারীদের কেন্দ্র করেই গড়ে উঠত এবং সমাজটাকে তাই বলাও হতো মাতৃতান্ত্রিক সমাজ। গোত্রের প্রতীক হতো সেই ‘মহা-মাতা’, যার থেকে পুরো বংশের সূত্রপাত। কিন্তু সমাজে বহুগামী বিবাহের বদলে এক-গামিতা যখন চালু হলো, যখন পিতারা উত্তরাধিকারীকে চিনতে পারলেন এবং তার সঞ্চিত সম্পদ তাকে দিতে শুরু করলেন, যখন কন্যা-সন্তানরা শুধু পুরুষ-সন্তান জন্মদানের যন্ত্রে পরিণত হলো তখন থেকে সমাজে নারীদের ওপর পুরুষদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলো এবং মাতৃতান্ত্রিক সমাজ পিতৃতান্ত্রিক সমাজে পরিণত হলো। ইতিহাসে দেখা যায়, শিকারি সমাজে বিষয়টি দ্রুত ঘটেছে আর কৃষিভিত্তিক স্থিতিশীল সমাজে নারীদের ক্ষমতা দীর্ঘকাল অটুট থেকেছে। মধ্যযুগে ক্রমশ নারীকে গৃহের মধ্যে রান্না, সন্তান পালন ও স্বামীসেবার ভূমিকায় আটকে ফেলা হয়েছে। যুদ্ধ, কঠোর পরিশ্রম, শিকার, বাণিজ্য, দেশ-দেশান্তর গমন, এসব ঝুঁকি বহনের কাজ থেকে নারীদের বিরত রাখা, তাদের একটি কমনীয় কোমল সৌন্দর্যের আধার রূপে আদর্শায়িত করা, এসবই ছিল দাস ও সামন্ত-সমাজের সাধারণ মূল্যবোধ। তাই এ যুগটা ছিল নারীদের বিশ্বব্যাপী পরাজয়ের যুগে এবং এ যুগে যে বিশ্বধর্মগুলোর উদ্ভব হয়েছে (হিন্দু ধর্ম, বৌদ্ধ ধর্ম, খ্রিষ্ট ধর্ম ও ইসলাম ধর্ম) সেগুলোর সর্বত্র ঈশ্বরের প্রতিনিধি হচ্ছেন পুরুষ এবং সংসারের সর্বত্র নারীর মূল্য ও অবস্থান নির্ধারিত হয়েছে দ্বিতীয় হিসেবে।
কিন্তু পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে পুরুষ নিজেই বুঝতে পেরেছে যে মানব সমাজের অর্ধেককে জগৎ-বিচ্ছিন্ন করে, ঘরের মধ্যে বন্দী করে শুধু নিজের আনন্দ ও সম্ভোগের বিষয় (Object) পরিণত করলে জগতের বিকাশই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। যাকে সে পশ্চাতে রাখবে সেই তাকে পশ্চাতে টেনে রাখবে। নিজের প্রয়োজনেই তাই পুরুষকে নারীর জন্য শিক্ষা ও একটু একটু স্বাধীনতা দিতে হয়েছে। সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা শুরু হয় শিল্প বিপ্লবের পর এবং মুদ্রা অর্থনীতি চালু হওয়ার পর। পুঁজিপতিরা তখন দুটো বিষয় বিবেচনা করতে শুরু করে। প্রথমত; ম্যানুফেকচারিং প্রযুক্তি এমন যে একই ছাদের তলে অনেক শ্রমিককে জড়ো করতে হয়। আর সেই শ্রমিক বাহিনীর মধ্যে এমন কতকগুলো কাজ রয়েছে, যা নারীদের পক্ষে অনায়াসেই করা সম্ভব। দ্বিতীয়ত; তারা এটাও খেয়াল করেন যে নারী ও শিশুরা অবিচ্ছেদ্য এবং এদের উভয়কেই শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ করলে তাদের জন্য মজুরি দিতে হবে পুরুষদের তুলনায় অনেক কম। অতএব, অধিক মুনাফার জন্যই পুঁজিবাদ অসচেতনভাবে নারীর কর্মের পরিসর গৃহ থেকে বাইরে নিয়ে এসেছে। নারীর এই বহিরাগমন ও নববিদ্যা ও দক্ষতা অর্জনই নারীমুক্তির প্রথম সোপান হিসেবে কাজ করেছে। নারী এখন আর সন্তান উৎপাদনের জন্য স্বামীর ওপর নির্ভরশীল স্বত্বা নয়, নয় সে সন্তানদের জননী বড়-মাতা, সে এখন স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবিকা ও সম্পদ আহরণকারী একজন পেশাজীবী। তার একটি পৃথক সামাজিক আত্মপরিচয় এখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- এরপর কী? গৃহমুক্ত নারী কি এরপর তার পুরুষ সঙ্গীদের সঙ্গে সমসুযোগ নিয়ে, সমনিরাপত্তা নিয়ে, সম-অধিকার নিয়ে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে পারছে? পারছে কি এই প্রতিয়োগিতায় জয়লাভ করে শীর্ষস্থানে আরোহন করতে? নিঃসন্দেহে আমাদের বলতে হবে যে তা হচ্ছে না এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুঁজিবাদী বিশ্বায়ন নারীর ওপর দ্বৈত শোষণের (Double Exploitation) বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। বস্তুত, পুঁজিবাদী বিশ্বায়ন শুরুই হয়েছে নারীদের বৈষম্যমূলক মজুরি প্রদানের মাধ্যমে। তাই অতি উন্নত পুঁজিবাদী বিশ্বেও নারী-পুরুষ বৈষম্য টিকে আছে, যদিও দীর্ঘদিনের বিকাশ ও সংগ্রামের মাধ্যমে নারীরা এখন সেখানে শিক্ষার অধিকার, নিজের শরীরের ওপর নিজের অধিকার (অর্থাৎ মা হওয়া বা না হওয়ার অধিকার), ভোটের অধিকার, সম্পত্তির অধিকার, মাতৃত্বকালীন বিশেষ ছুটির অধিকার, পথে-ঘাটে চলাচলের সময় নিরাপত্তার অধিকার, পছন্দমতো বিবাহ বিচ্ছেদের অধিকার, শ্রমবিভাজনের ক্ষেত্রে সর্বত্র গামিতার অধিকার (যেমন- পুলিশ, পাইলট বা মিলিটারি পেশায় যোগদানের অধিকার) ইত্যাদি অধিকারগুলো আংশিক বা বহুলাংশে অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এক্ষেত্রে নারী অধিকারের চাম্পিয়ন হিসেবে কোনো কোনো সমাজতান্ত্রিক এবং কল্যাণ পুঁজিবাদের অনুসারী স্ক্যান্ডিনভীয় দেশগুলো অধিকতর সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে বলেই ধারণা করা হয়। সাধারণভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সর্বত্রই নারীর মুক্তি ও অগ্রগতিও অর্জিত হতে থাকে, তবে কোনো কোনো দেশ নিজস্ব অঙ্গীকার, বিশেষ ইতিহাস ও নীতিমালার কারণে এক্ষেত্রে বিশেষ সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়। বিপরীতক্রমে কোথাও কোথাও বল প্রয়োগ করে নারীর স্বতঃস্ফূর্ত অগ্রগতিকে আটকে রাখা হয়।
ব্যতিক্রম বাদ দিলে বিশ্বায়ন তাই অবশেষে বিংশ শতকে মানব-মানবী, নারী-পুরুষ এই ধরনের পৃথকায়নের বদলে নতুন একক যে প্রত্যয়ের প্রবর্তন করেছে, তা হচ্ছে ‘মানুষ’ এবং ‘মানুষ’ প্রত্যয়কে কেন্দ্র করেই প্রণীত হয়েছে আধুনিক যুগের বিশ্বব্যাপী সর্বজনীন মানবাধিকার সনদ। ‘Man’ or ‘Woman’ নয়, ‘‘Human being’’ এবং ‘Human Right paradigme’-ই বিশ্বায়নের বর্তমান পর্যায়ের সর্বজনীন দিগ্দর্শন। শ্রেণিহীন সাম্যবাদী সমাজের স্বপ্নের সঙ্গে এর কোনো বিরোধ নেই। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বিশ্বের মানুষকে আজ হতে হবে শিক্ষিত, স্বাস্থ্যবান, দীর্ঘজীবী, প্রাচুর্যশালী এবং সর্বত্রগামী। যদিও এই আদর্শের থেকে এখনও পর্যন্ত বহু দেশ বহুভাবে পিছিয়ে রয়েছে। নারী-পুরুষের বৈষম্যের পাশাপাশি ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যের সমস্যাটিরও কোনো পূর্ণ সমাধান এখন পর্যন্ত আমরা বর্তমান বিশ্বে করে উঠতে পারিনি।

বিশ্বে নারীদের অবস্থান : তুলনামূলক চিত্র (২০১৪)
২০১৪ সালের গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্টে আমরা দেখতে পাই, সেখানে বলা হয়েছে, “Through the golbal gender gap Report 2014, the world economic forum quantifies the magnitude of gender based dispairties and tracks their progress over time while no single measure can capture the complete situation, the global gender gap Index presented in this Report seeks to measure one important aspet of gender equality : the relative gaps betwen women and men across four key areas : health, education, economy and politics.” (World Economic Forum, 2014)
ভূমিকায় লিখিত উপরোক্ত বক্তব্যের পেছনে বিশ্ব অর্থনীতিবিদদের প্রধান উদ্দীপনাটি খুব সহজ এবং সাধারণ। তারা মনে করেন যে একসময় অর্থনীতির বিকাশের বা সম্পদ বৃদ্ধির চাবিকাঠি ছিল প্রাকৃতিক সম্পদ। যদি প্রাচুর্যশালী বন থাকত, যদি নদী তীরের উর্বর ভূমিসম্পদ থাকত, যদি লোহা বা ব্রোঞ্জ বা তামার আকরিক পাওয়া যেত তাহলে সেই জায়গায় সেই মানবগোষ্ঠী দ্রুত প্রাচুর্যশালী হয়ে উঠতেন। কিন্তু শীঘ্রই মানুষ প্রকৃতি বশে আনার জন্য প্রযুক্তি, কৃৎ কৌশল ইত্যাদি আবিষ্কার করা শুরু করল। তখন ‘উৎপাদিত উৎপাদনের উপায়ই’ হয়ে গেল অর্থনীতির বিকাশের প্রধান চালিকাশক্তি। পরে সেটাই পরিণত হলো পুঁজিতে এবং পুঁজির বিভিন্ন রূপবৈচিত্র্য তৈরি হলোÑ বাণিজ্যিক পুঁজি, শিল্প পুঁজি এবং সর্বশেষে ‘ফিন্যান্স’ বা আর্থিক পুঁজি। তখন থেকে প্রাচুর্যের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে গেল পুঁজি। পুঁজিবাদের চালিকাশক্তি এই পুঁজি বিশেষত ফিন্যান্স পুঁজি যখন অঢেল হয়ে গেল, তখন প্রশ্ন এলো ‘শ্রমের’ সঙ্গে পুঁজিকে আরও যুক্ত করা যায় কীভাবে? পুঁজি তখন দেশ-দেশান্তরে শ্রমের সন্ধানে পাড়ি জমালো। পণ্য রপ্তানির জায়গায় এই পুঁজি রপ্তানি বিশ্বায়নকে নতুন এক মাত্রায় নিয়ে গেল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে এই শ্রম শুধু পশ্চাৎপদ অদক্ষ শ্রমশক্তি হিসেবে থেকে গেলে চলবে না, তাকে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা দিয়ে উপযুক্ত মাত্রায় বিকশিত করে না তুলতে পারলে তাকে দিয়ে আধুনিক কৃৎকৌশলভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা স্বার্থকভাবে চালু রাখা সম্ভব হবে না। তাই আজকের যুগে বিশ্বায়নকে সচল রাখতে হলে পুঁজির নিজের জন্যই দরকার হয়ে পড়েছে বিশাল সুশিক্ষিত আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন ‘মানবসম্পদের’। আর মানবসম্পদের অর্ধেককে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখার অর্থই হচ্ছে প্রয়োজনীয় বিশাল এই মানবসম্পদ বিকাশের সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে রাখা। তার ফলে পুঁজির সম্ভাব্য ফলপ্রসূতাও বাস্তবে সংকুচিত হয়ে অর্ধেক হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশের একটি সহজ পরিসংখ্যান থেকেই এই সত্য ফুটে ওঠে। বিশ্বব্যাংক তার ২০১৩ সালের রিপোর্টে উল্লেখ করেছে যে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উচ্চতর প্রবৃদ্ধি ও দারিদ্র্য নিরসনের প্রধান চালিকাশক্তি হচ্ছে নারীদের শ্রমবাজার বর্ধিত হারে অংশগ্রহণ। যদিও পুরুষদের তুলনায় তা এখনও অনেক কম। যে জায়গায় কর্মক্ষম পুরুষরা প্রায় শতভাগ অর্থনৈতিক কাজে অংশগ্রহণ করছে সে জায়গায় বাংলাদেশের নারীদের মাত্র ৩০ শতাংশ এখন অর্থনৈতিক কাজে নিয়োজিত। যদি এটাকে ৮৭ শতাংশে উন্নীত করা যেত, তা হলে বাংলাদেশের বর্তমান প্রবৃদ্ধির হার এমনিতেই ৬ থেকে ৮ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হতো বলে বিশ্বব্যাংক হিসাব করে দেখিয়ে দিয়েছে। এই ছোট একটি তথ্য প্রমাণ করে gender gap কীভাবে পুঁজিবাদী উন্নয়নকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে? এই Report-G gender gap score নির্ণয় করা হয়েছে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নারীরা পুরুষদের তুলনায় কতখানি কম বা কত শতাংশ পিছিয়ে আছে, সেটা দিয়ে।
ধরা যাক, কোনো দেশে শিক্ষিত নারীর অনুপাত ৩০ শতাংশ; কিন্তু পুরুষদের অনুপাত ৬০ শতাংশ, তাহলে সেদেশে gender gap ratio হবে  PM2    = ৬০% অর্থাৎ শিক্ষার ক্ষেত্রে নারীরা পুরুষদের তুলনায় সেদেশে ৪০ শতাংশ গ্যাপে আছে বা পিছিয়ে আছে। এভাবে ৪টি মাত্রায় অনুপাতগুলো বের করে একটি সম্মিলিত সামগ্রিক gender gap ratio নির্ণয় করা হয়েছে বিভিন্ন অঞ্চলের দেশের জন্য। সেটি থেকে আমরা এই বিশ্বে নারীদের তুলনামূলক পশ্চাৎপদতার একটি পরিসংখ্যান চিত্র পেতে পারি। এক্ষেত্রে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে অনুপাতটি যখন ১০০ শতাংশ হবে তখন নারী-পুরুষে বৈষম্য নেই বলে ধরে নিতে হবে, আর যদি তা ১০০-র বেশি হয় তাহলে নারীদের তুলনায় পুরুষ পিছিয়ে আছে বলে ধরতে হবে। তবে ২০১৪ সালের এই জবঢ়ড়ৎঃ-এ দেখা যায় এই মধঢ়-টি সর্বনিম্ন হচ্ছে আইসল্যান্ডে (অর্থাৎ পূরণকৃত গ্যাপের মাত্রা হচ্ছে ৮৬ শতাংশ) এবং সর্বোচ্চ হচ্ছে পাকিস্তানে (অর্থাৎ পূরণকৃত গ্যাপের মাত্রা হচ্ছে মাত্র ৫৬ শতাংশ)। অর্থাৎ সবচেয়ে ভালো অবস্থাতেও পুরুষদের তুলনায় নারীরা ১৪ শতাংশ পিছনে রয়ে যায়। আর সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পিছিয়ে থাকার অনুপাত ৪৪ শতাংশ। আমরা উদাহরণ হিসেবে আরও কয়েকটি দেশের ২০১৪ সালের gender gap ratio নিচের তালিকায় তুলে ধরছি।
এই তালিকা থেকে আমাদের কতকগুলো অনুসিদ্ধান্ত প্রাথমিকভাবে বেরিয়ে আসে।
ক. প্রথমত সারাবিশ্বে এখনও পর্যন্ত নারীরা সর্বত্রই পুরুষদের তুলনায় পিছিয়ে আছেন। পৃথিবীর কোথাও এখন পর্যন্ত নারী-পুরুষ সমতা স্থাপিত হয়নি (অন্তত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও রাজনীতিÑ এ ৪টি ক্ষেত্রের জন্যই এ-কথা সত্য)।
খ. তবে নারী-পুরুষ বৈষম্য সবচেয়ে কম দেখা যাচ্ছে কল্যাণ ধনতন্ত্রের অনুসারী নরডিক দেশসমূহে।
গ. ইউরোপ ও আমেরিকায় নারী-পুরুষ বৈষম্য এখনও রয়েছে। তাদের গ্যাপ পূরণ স্কোর এক্ষেত্রে .৭৩৮ থেকে .৭৭৮-এর মধ্যে বিরাজমান। অর্থাৎ তুলনামূলক গ্যাপের পরিমাণ মোটামুটি ২৫ শতাংশ।
ঘ. অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক দেশে এই গ্যাপ সবচেয়ে কম কিউবায় এবং সবচেয়ে বেশি চীনে। এখানে প্রায় ৩০ শতাংশ গ্যাপ বিরাজমান।
ঙ. দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সবচেয়ে ভালো অবস্থান দখল করে আছে বাংলাদেশ। এখানে প্রায় ৩১ শতাংশ গ্যাপ বিরাজ করছে। তবে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা পাকিস্তানে। এখানে গ্যাপের হার প্রায় ৪৫ শতাংশ।
চ. মধ্যপ্রাচ্যে সাধারণভাবে নারীদের অবস্থান ভালো না। এখানে সৌদি আরবে নারীদের মধ্যে গ্যাপের হার প্রায় ৪০ শতাংশ। তবে ইরানে তা আরও বেশি প্রায় ৪২ শতাংশ এবং ইয়ামেনে তা সর্বাধিক অর্থাৎ ৪৯ শতাংশ, এমনকি পাকিস্তানের চেয়েও বেশি।
বিশ্বব্যাপী নারী অগ্রগতির এই অসম বিকাশের পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে নারীবান্ধব আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক নীতি ও নীতিপ্রণেতার অভাব। কোনো দেশগুলো তুলনামূলকভাবে এগিয়ে গেছে, আর কোনো দেশগুলো তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে রয়েছে, তা যদি ঘনিষ্ঠভাবে আমরা বিশ্লেষণ করি তাহলেই আমাদের উপরোক্ত বক্তব্যের যথার্থতা সুপ্রতিষ্ঠিত হবে।

জেন্ডার গ্যাপ অনুপাত-২০১৪
Untitled-1 copy

বিশ্বব্যাপী ‘জেন্ডার’ বৈষম্য সূচকের গতিপ্রবণতা ও নীতিগত তাৎপর্য
‘Gender Gap Report’ প্রথম প্রকাশিত হয় ২০০৬ সালে। এরপর থেকে ২০১৪ পর্যন্ত আরও ৮টি বার্ষিক রিপোর্ট আমাদের হাতে রয়েছে। এসব রিপোর্ট থেকে আমরা বিশ্বব্যাপী ‘এবহফবৎ এধঢ়’-এর সূচকের গতিশীলতার একটি চিত্র পাই। সামগ্রিকভাবে বিশ্বে এটা কমছে না বাড়ছে? কমলে কোন ক্ষেত্রে কমছে? কোন ক্ষেত্রে বাড়ছে? কোন ক্ষেত্রে বর্তমানে বৈষম্য সর্বোচ্চ? কোন ক্ষেত্রে বৈষম্য অপেক্ষাকৃত নিম্ন?, ইত্যাদি প্রশ্নগুলোর উত্তর খুবই জরুরি। কারণ এখান থেকেই আমরা সন্ধান পেতে পারি নারীদের বৈষম্য হ্রাসের সংগ্রামের রণনীতি ও রণকৌশল কি হওয়া উচিত তার। তাছাড়া এসব ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত সফল দেশগুলোর অভিজ্ঞতা আমাদের সারাবিশ্বের ‘Best Practise’-গুলোর উদাহরণ শেখাতে পারে এবং সেগুলো আমরা আমাদের দেশ বাংলাদেশেও প্রয়োগ করতে পারি কি না, তা ভেবে দেখতে পারি। এ জন্য ব্যবহৃত চিত্রটি মূল রিপোর্টটি থেকে নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো।

চিত্র-১
PM3চিত্র-১ এ gender gap ratio-এর ৪টি ক্ষেত্রে ২০০৬ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত বৈষম্যের মাত্রাগুলোর সূচকের বিশ্ব পরিমাপের গতি প্রবণতা তুলে ধরা হয়েছে। এই চিত্র থেকে আমরা আমাদের উল্লিখিত প্রশ্নগুলোর নিম্নরূপ উত্তরগুলো পেয়ে যাচ্ছি। প্রথমত; দেখা যাচ্ছে geneder gap-এর মাত্রা সবচেয়ে বেশি হচ্ছে ‘রাজনৈতিক ক্ষমতার’ সূচকের ক্ষেত্রে। ১নং চিত্রে দেখা যাচ্ছে ২০০৬ সালে এক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের তুলনায় প্রায় ৮৬ শতাংশ পিছিয়ে ছিলেন।১  ২০১৪-তে এসেও তারা এখনও এক্ষেত্রে ৭৯ শতাংশ পিছিয়ে রয়েছেন। অন্যদিকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য বঞ্চনার ক্ষেত্রে মাত্রাটি সাধারণভাবে অপেক্ষাকৃত কম। কিন্তু শিক্ষার ক্ষেত্রে তা কম হলেও তার উন্নতি খুবই শ্লথগতিতে হচ্ছে। ২০০৬ সালে এই বঞ্চনার অনুপাতটি ছিল ৮ শতাংশ, ২০১৪-তে তা কমে হয়েছে ৬ শতাংশ। সাধারণভাবে তাই বলা যায়, বিশ্বে শিক্ষার ক্ষেত্রে নারীদের তুলনামূলক ফারাক অনেক কম এবং ক্রমশ তা ধীরগতিতে কমছে। পক্ষান্তরে স্বাস্থ্য ও আয়ুর ক্ষেত্রে ফারাকের সূচকটি শ্লথ গতিতে বৃদ্ধিই পাচ্ছে। ২০০৬ সালে তা ছিল ৩ শতাংশ, ২০১৪-তে এসে তা হয়েছে ৪ শতাংশ। তবে সাধারণভাবে এখানেও পূর্ণতার সূচকটির মাত্রা বেশিই রয়েছে বলতে হবে। কিন্তু অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগের অপূর্ণতার সূচকটি এই দুই পরিমাপের তুলনায় অনেক বেশি। ২০০৬ সালে গ্যাপের এই সূচকটি ছিল ৪৪ শতাংশ। ২০১৪-তে এসে তা সামান্য হ্রাস পেয়ে ৪০ শতাংশে অবস্থান করছে।
এই সামগ্রিক চিত্র থেকে আমরা gender gap ratio এর প্রণেতাদের পক্ষ থেকে যে নীতি-নির্দেশনার পরামর্শ পাই, তা হচ্ছে-
১. শিক্ষার সুযোগ নারীদের ক্ষেত্রে এখন যে বিশ্বব্যাপী দিতে হবে এবং দেওয়া যে শুরু হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই শিক্ষা লাভ তাদের পরবর্তীতে অর্থনৈতিক মুক্তি প্রক্রিয়ায় এগিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে পারছে না। পুরুষরা যেমন তাদের শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে অর্থনীতিতে ও রাজনীতিতে দ্রুত ক্ষমতাবান হয়ে উঠতে পারছেন, নারী ঠিক তেমনটা পারছেন না। এ জন্য নারী শিক্ষার গুণগত মানকে আমাদের বৃদ্ধি করার দিকে বেশি নজর দিতে হবে। শিক্ষাকে আরও বেশি প্রয়োগমুখী ও কর্মমুখী হতে হবে এবং একই সঙ্গে অতি উচ্চমানের শিক্ষাগুলোকেও নারীদের আয়ত্ত করে সমাজের উচ্চতর পেশাগুলোতে নারীদের অংশগ্রহণ অবাধ ও নিশ্চিত করতে হবে।
২. স্বাস্থ্যক্ষেত্রে নারীদের জন্য বিশেষ ইতিবাচক নীতি গ্রহণ করতে হবে। তা না হলে বর্তমান অবনতির প্রবণতা রোধ করা যাবে না। নারীদের তুলনায় এখনও পুরুষরা স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে এগিয়ে আছে এই অমানবিক বাস্তবতাটি স্বীকার করে নিয়ে এক্ষেত্রে নারী স্বাস্থ্য সুবিধা তুলনামূলকভাবে অধিকতর হারে বাড়াতে হবে।
৩. অর্থনীতি ও বিভিন্ন পেশায় নারীদের অভিগম্যতা এখনও নারীমুক্তির প্রধান সমস্যা হিসেবে সারাবিশ্বে বিরাজ করছে। এখানে শুধু নারীদের যোগ্যতার অভাব এবং পুঁজিবাদী আধুনিক শিল্পায়নের ঘাটতিই প্রধান বাধা নয়, বাধা হিসেবে বিরাজ করছে নারীদের নিজেদের মধ্যে ও সমাজের ভেতরে নানা সংস্কার ও দ্বিধা। তাছাড়া এই অংশগ্রহণের সুযোগের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে সর্বদাই একটি বৈষম্য ও দ্বিচারিতা (Double Standard) বিদ্যমান। নারীরা অংশগ্রহণ করলেও সেক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণের শর্তগুলো পুরুষের তুলনায় অধিকতর প্রতিকূল হয়ে থাকে, তাই এখানেও ইতিবাচক নীতির স্বীকৃতি থাকতে হবে।

নারীবান্ধব নীতিমালা ও বাংলাদেশ
বিশ্বব্যাপী নারী-পুরুষ বৈষম্য যে এখনও বহাল তবিয়তে বিরাজমান তা আমরা পূর্ববর্তী অধ্যায়ের ‘Gender Gap Report’-এর পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্টই দেখতে পাই। এই বৈষম্যের ৪টি মাত্রাও পরিদৃশ্যমান- সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মাত্রাটি হচ্ছে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের অংশগ্রহণের বৈষম্য, যাকে প্রধানত সুযোগের, অধিকারের ও প্রাপ্তির বৈষম্য বলা হচ্ছে, আরেকটি মাত্রা হচ্ছে- শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের বৈষম্য, যার ফলাফল দুদিক থেকে পরিদৃশ্যমান, প্রথমত; দরিদ্র শ্রেণিগুলোর স্বাভাবিক বঞ্চনা তো রয়েছেই, তদুপরি দরিদ্র শ্রেণির পরিবারগুলোর মধ্যে নারীদের প্রতি আবার বিশেষ ধরনের অবহেলা ও বঞ্চনা রয়েছে। তৃতীয় সবচেয়ে ব্যাপকও গভীর বৈষম্য মাত্রাটি রাজনৈতিক। উচ্চক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পদগুলো থেকে নারীদের বিরত রাখার বঞ্চনা এবং সর্বশেষে আমরা এসবের পরে যোগ করতে পারি এই ৩টি বঞ্চনার সম্মিলিত ফলাফল হিসাবে সামগ্রিকভাবে নারীদের যুগ-যুগব্যাপী সঞ্চিত হতাশা ও মানসিক হীনমন্যতা বোধের বাস্তবতা। কেউ কেউ এটাকে ‘মনোভঙ্গির’ (Mindset) সমস্যা হিসেবেও চিত্রিত করেছেন।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে সাধারণভাবে আজ এ-কথাও স্পষ্ট হয়ে গেছে যে মুক্তবাজার দর্শন তথা নিওলিবারেলিজমের মাধ্যমে নারীমুক্তির সার্বিক অগ্রগতি সম্ভব নয়। এ জন্যই নারী বৈষম্য সূচক কমানোর ক্ষেত্রে উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর মধ্যেও সর্বোচ্চ সাফল্য আমেরিকা বা ইউরোপের নয়া উদারনীতিবাদী রাষ্ট্রগুলো দেখাতে পারেনি। এই সাফল্য বরং সবচেয়ে বেশি অর্জিত হয়েছে নরডিক দেশগুলোতে। এরা সবকিছু বাজারের হাতে ছেড়ে দেয়নি। গ্রহণ করেছে নিয়ন্ত্রিত বাজারের নীতি। বিশেষত; শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুযোগকে তারা সকলের জন্য বিস্তৃত করেছে। একে ব্যক্তি খাতে ও বাজারের হাতে ছেড়ে দেয়নি। তদুপরি নারী, প্রতিবন্ধী, শিশু, পশ্চাৎপদ গোষ্ঠী ও শ্রেণিগুলোর জন্য এরা গ্রহণ করেছেন বিশেষ ইতিবাচক নীতিমালা (Special Affirmative Policies)। বাংলাদেশকেও তাই আজ এসব ভালো অভিজ্ঞতা থেকেই শিক্ষা নিতে হবে। তথাকথিত ‘মুক্তবাজার’ ও ‘নয়া উদারনীতিবাদ’ থেকে পুরোপুরি সরে আসতে হবে।
২০০৬-এর পর থেকে এ যাবৎ বাংলাদেশ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের এগিয়ে নিয়ে যেতে যথেষ্ট পারদর্শিতা দেখাতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৩ সালে বিশ্বের ১৩৬টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের সার্বিক সূচকে অবস্থান ছিল বিশ্বে ৭৫তম। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২০১৪ সালেই এ অবস্থানের উন্নতি ঘটে হয়েছে ৬৮তম (আরও বেশি সংখ্যক তথা ১৪২টি দেশের মধ্যে!)। এই একই সময়ে অর্থাৎ ২০১৪ সালে আমাদের পাশের দেশ ভারতের দিকে তাকালে দেখা যাবে যে, এক্ষেত্রে ভারতের অবস্থান ছিল আমাদের চেয়ে অনেক নিচে। ১৪২টি দেশের মধ্যে ১১৪তম। বাংলাদেশের এই তুলনামূলক বিশেষ সাফল্যের স্বীকৃতি মেলে নোবেল বিজয়ী নারীবান্ধব অধ্যাপক অমর্ত্য সেনের সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থে। তিনি তার সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থ ‘‘An Uncertain Glory : India and its Contradictions’এ বলেছেন-
“To point to just one contrast, even though India has significantly caught up with China in terms of GDP growth, its progress has been very much slower than China’s in indicators such as longevity, literacy, child undernourishment and maternal mortality. In South asia itself, the much poorer economy of Bangladesh has caught up with and overtaken India in terms of many social indicators (including life expectancy, immunization of children, infant mortality, child undernourishment and girls’ schooling).”
[Jean Dreze and Amartya Sen, 2013]

কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের স্বীকার করতে হবে যে এরপরেও আমাদের আত্মসন্তুষ্ট হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বাংলাদেশের সামনে এখনও প্রধান প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছেÑ
ক. উন্নত বিশ্বে উৎপাদনশীল উচ্চতর পেশাগুলোতে নারীরা যে হারে অংশগ্রহণ করেন তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সমতা বিধান করতে হবে। সকল পদেই নারীদের সম-উপস্থিতি দৃষ্টিগ্রাহ্য হতে হবে।
খ. এ উদ্দেশ্যে নারী শিক্ষার ক্ষেত্রগুলো উচ্চতর গুণের ও মানের হতে হবে এবং সেখানে ইতিবাচক কোটা ব্যবস্থার প্রবর্তন করতে হবে। যাতে পুরুষের সঙ্গে নারীর যোগ্যতা ও সক্ষমতার ফারাক কমে আসে।
গ. সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন সম্পদ। তাই সম্পদের ওপর নারী ও পুরুষের সম-অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
ঘ. অগ্রগতির জন্য চাই সচলতা। তাই পথে-ঘাটে চলাফেরায় নারীদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে হবে।
ঙ. অল্প বয়সেই নারীর মা হওয়া তার স্বাস্থ্য ও আয়ুর জন্য ক্ষতিকর। তাই বাল্যবিবাহ থামাতে হবে।
চ. ফতোয়া ও ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতাগুলো অপসারণ করতে হবে। নারী-পুরুষ উভয়ের মনোভঙ্গি (গরহফংবঃ) বদলাতে হবে।
অমর্ত্য সেনের পর্যালোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি যে এক্ষেত্রে ‘বিশ্বায়ন’ আমাদের বন্ধু হতে পারে, তবে কতখানি বন্ধু হবে তা অনেকখানি নির্ভর করবে আমাদের নিজস্ব সক্ষমতা ও সুযোগের সদ্ব্যবহারের মাত্রার ওপর। অমর্ত্য সেন বিশ্বায়ন সম্পর্কে তার ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইজঅঈ আয়োজিত ঢাকাস্থ এক সেমিনারে বলেছিলেনÑ
‘ও ধস ধহঃর ধহঃর-মষড়নধষরুধঃরড়হ.’  অর্থাৎ
‘আমি বিশ্বায়ন বিরোধীদের বিরোধী।’
এই জটিল অবস্থানের বা দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন যে পুঁজিবাদী বিশ্বায়নের নানা সমালোচনা ও সীমাবদ্ধতা তিনি স্বীকার করেন; কিন্তু এর অর্থ বিশ্বায়নকে চরম খারাপ অভিহিত করে তাকে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে বদ্ধ অর্থনীতি বা স্বয়ংসম্পূর্ণ কোনো সমাজ বা সংস্কৃতিতে সীমাবদ্ধ হয়ে যাওয়া নয়। নয়া চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের অতীত অমøমধুর অভিজ্ঞতা সে সত্য প্রমাণ করেছে। সুতরাং বিশ্বায়ন ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ সেটি মূল প্রশ্ন নয়। মূল প্রশ্ন হচ্ছেÑ কোন ধরনের বিশ্বায়ন আমরা চাইব এবং কীভাবে সেটাকে আমাদের জাতীয় স্বার্থে আমরা ব্যবহার করব।
নারীমুক্তি অর্জনের সংগ্রামেও আমাদের একই ধরনের একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজন রয়েছে। সেনের ‘‘Cooperative Conflict’-এর ধারণাটি এক্ষেত্রে আমরা গ্রহণ করতে পারি। নারীমুক্তি হোক কিন্তু পুরুষকে বাদ দিয়ে নয়। এ ধারণা অনুসারে পরিবারের অন্তর্ভুক্ত নারী ও পুরুষের মধ্যে যেমন সহযোগিতার ক্ষেত্র আছে, তেমনি আবার ‘বিরোধেরও’ ক্ষেত্র আছে। দুটোকেই কাজে লাগাতে হবে। ‘বিরোধ’ সর্বদা এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া যাবে না যখন পরিবারের নারী-পুরুষ বিচ্ছেদ হয়ে পরস্পর শত্রুতে পরিণত হয়ে গেল। আবার সহযোগিতা, ভালোবাসা, যতেœর নাম করে নারীকে চিরকাল একতরফা প্রেমের শিকলে আটকে রাখলেও নারীমুক্তি অগ্রসর হবে না। এক্ষেত্রে তাই আমাদের আধুনিক বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ যেমন পরিবারকে উন্মুক্ত করতে হবে এবং সেজন্য নারীকে পুরুষদের সহযাত্রী যেমন হতে হবে তেমনি সেখানে নারীদের ন্যায্য হিস্যাটুকুও পুরুষদের নিশ্চিত করতে হবে। পরিবারের ভেতরেও ন্যায্য শ্রম বিভাজন মেনে নিতে হবে। পারলে নারীদের জন্য প্রথম দিকে সুষম প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার স্বার্থে কিছুটা ইতিবাচক স্বীকৃতির (An Uncertain Glory : India and its Contradictions’ বিধান বা বাড়তি সুবিধা প্রদানের নীতি অনুসরণ করতে হবে। বিশ্বায়ন হোক; কিন্তু তা হোক অন্তর্ভুক্তিমূলক ও গণতান্ত্রিক (Inclusive and Democratic)।

গ্রন্থপঞ্জি
১. রেহ্মান সোবহান ও নাসরীন খন্দকার (২০০১) ‘গ্লোবালাইজেশান এন্ড জেন্ডার : চেঞ্জিং প্যাটার্নস অফ উমেনস এমপাওয়ারমেন্ট ইন বাংলাদেশ’, ইউপিএল এবং সিপিডি, ঢাকা, বাংলাদেশ।
২. বিনা আগারওয়াল, জেন হামফ্রিস এবং ইনগ্রিড রবিনস (২০০৬), ‘কেপেবিলিটিজ, ফ্রীডম এন্ড ইকুয়ালিটি : অমত্য সেনস ওয়ার্ক ফ্রম এ জেন্ডার পারস্পেকটিভ’ অক্সফের্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, দিল্লী, ভারত।
৩. এন্থনী গীডেনস্ (২০০৩), ‘রানওয়ে ওয়ার্লড’, রুটলেজ পাবলিশার্স, নিউইয়র্ক।
৪. জ্যাঁ দ্রেজে এবং অমর্ত্য সেন (২০১৩), ‘এ্যন আনসার্টেইন গ্লোরী-ইন্ডিয়া এন্ড কনট্রাডিকশানস্’, পেঙ্গুইন বুকস্, লন্ডন, ইউকে।
৫. ওয়ার্লড ইকনমিক ফোরাম, (২০১৪), ‘দ্য গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট-২০১৪’, জেনেভা, সুইজারল্যান্ড।
৬. বিশ্বব্যাংক (২০১৩), ‘বাংলাদেশ পভার্টি এসেসমেন্ট : এসেসিং এ ডিকেড অফ প্রোগ্রেস ইন রিডিউসিং পভার্টি-২০০০-২০১০’, ঢাকা।

লেখক : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Category:

33 32copy

Category:

ইয়েমেন কাঁদছে

PM2সাইদ আহমেদ বাবু: মানব ইতিহাসের অন্যতম প্রাচীন বসতি আর আরব বিশ্বের সবচেয়ে গরিব দেশ ইয়েমেন। গৃহযুদ্ধে দেশটি পুরোপুরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ইয়েমেন সংকট সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ববাসীর মনে দাগ কেটেছে। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ বর্তমানে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এটি কেবল একটি যুদ্ধাহত দেশ নয়। বর্তমানে ইয়েমেন স্মরণকালের সর্বোচ্চ ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কবলে পড়েছে, যা থেকে নিস্তার পাওয়ার কোনো উপায়ই দেখা যাচ্ছে না। যতদিন যাচ্ছে ততই ইয়েমেন সংকট ঘনীভূত হচ্ছে।
ইয়েমেন মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রাচীন বাণিজ্যকেন্দ্র এবং এই বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল এক সমৃদ্ধশালী দেশ। লোহিত সাগরের বাব আল মানদাব প্রণালির মুখে অবস্থিত ইয়েমেন সৌদি আরবের জন্য বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। ১৯৩২ সালের সৌদ পরিবারের নামানুসারে গঠনের পর থেকেই ইয়েমেনের ওপর প্রভাব বিস্তারে সক্রিয় ছিল সৌদি আরব। ১৯৩৪ সালে এই দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। তায়েফ চুক্তির মাধ্যমে এই যুদ্ধের অবসান হলেও সৌদি আরব নানা উপায়ে ইয়েমেনের ভেতর বিশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। সীমান্ত বিরোধ নিয়ে কখনও কখনও সামরিক অভিযানও পরিচালনা করেছে।
বাণিজ্য এবং কৌশলগত ভৌগোলিক কারণে এই অঞ্চলের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল পার্সিয়ান, অটোমান, ব্রিটিশ। ১৯৬৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর তথা ব্রিটিশ বাহিনী প্রত্যাহারের পরে দুটো নতুন রাষ্ট্র উত্তর ইয়েমেন (গণপ্রজাতন্ত্রী) এবং দক্ষিণ ইয়েমেন (কমিউনিস্ট) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইয়েমেনিদের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার গোড়া পত্তন ঘটে। জাতি হিসেবে এই বিভক্তি তাদের রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, ধর্মÑ সব কিছুকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। ১৯৯০ সালের ২২ মে ইয়েমেনের একটা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন দুই ইয়েমেন ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে একত্রিতভাবে একটি অভিন্ন রাষ্ট্র গঠন করে প্রাতিষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয় রিপাবলিক অব ইয়েমেন। দুই ইয়েমেন একত্রিত হলেও দেশটির রাজনৈতিক সংকট কখনোই দূরীভূত হয়নি।
আজকের ইয়েমেন সংকটের শুরু ২০০৪ সালে এবং তখন এই সংকটের পটভূমি ছিল শিয়া-সুন্নির মধ্যকার বৈষম্যের পরিপ্রেক্ষিতে শিয়াদের তরফ থেকে সুন্নি নিয়ন্ত্রিত সরকারের বৈষম্যের বিরুদ্ধে শিয়াদের সংগঠিত হওয়া। কিন্তু সৌদি আরবের পক্ষ থেকে এ তৎপরতা রোধে সৌদি আরব হুথিদের ওপর হামলার জন্য ইয়েমেনের সরকারকে তার ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ায় সংঘর্ষ নতুন মোড় নেয়। সৌদি আরব ইয়েমেন সীমান্তের জাবাল দোখান ঘাঁটিটি হুথিদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ইয়েমেনকে অনুমতি দেওয়ার পরপরই হুথিরা তা দখল করে নেয়। এরপর এই অজুহাতে সৌদি আরব হুথিদের ওপর সরাসরি হামলা শুরু করে।
উপরোক্ত অবস্থার আলোকে বর্তমান ইয়েমেন সংকট কেবল ইয়েমেন তথা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সংকটের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তারে ভূমিকা পালন করবে, তা-ই নয়। তার চেয়ে বড় আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে, এতদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে বহিঃশক্তির প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপের নতুন সংস্করণ হচ্ছে তাদের পরোক্ষ মদতে বর্তমানে নিজেরাই এমন সংকটে জড়িয়ে পড়ছে, যা সমগ্র আরবের নিরাপত্তার প্রয়োজনে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপকে অনিবার্য করে তুলবে।
২০১১ সালের আরব বসন্তের সময় থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার শুরু। তা থেকে রেহাই পায়নি ইয়েমেনও। দেশটিতে তখন গণবিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। আরব বসন্তের প্রথম ধাক্কায় তিউনিসিয়ার পর দীর্ঘ ৩৩ বছর সময়ের একনায়ক আলী আবদুল্লাহ সালেহ সরকারের পতনের পর মনসুর হাদি নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন হলেও পুরো দেশের সব জাতিগোষ্ঠীকে একত্র করে একটি জাতীয় সরকার পরিচালনার পরিবর্তে মূলত সৌদি আরবের এবং পশ্চিমা পরামর্শে রাষ্ট্র শাসনের ফলে আজকের এ অবস্থা। ২০১৫ সালের জন্য একটি সংবিধানের খসড়া তৈরি করা হয়। এতে বলা হয়, ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে একটি পার্লামেন্ট গঠন করা হবে। এছাড়া খসড়া সংবিধানে ফেডারেল ব্যবস্থার সরকার গঠনের কথা বলা হয়। কিন্তু হুথি বিদ্রোহীরা প্রত্যাখ্যান করায় এ উদ্যোগ ভেস্তে যায়। ২০১৫ সালের শুরুতে আন্দোলনের মুখে মানসুর হাদির সরকার পদত্যাগ করে এবং হুথি নেতা আবদুল মালেক আল-হুথির নেতৃত্বে রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে চলে যায়। হুথি আন্দোলনের প্রতি সমর্থন দেন সাবেক প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ। ফলে এই আন্দোলন আর শুধু হুথিদের আন্দোলন থাকল না। রাজধানীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহর-বন্দরেরও নিয়ন্ত্রণ নেয় হুথি ও সালেহর সমর্থকরা। এরই মধ্যে সংসদ বাতিল করা হয় এবং বিপ্লবী কমিটি গঠনের মাধ্যমে মুহাম্মদ আলী আল-হুথিকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দিয়ে নতুন অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। তাই হাদি প্রশাসন কার্যত দুর্বল হয়ে পড়ে। আর নতুন প্রেসিডেন্টের দুর্বলতার সুযোগে ইয়েমেনের যাইডি শিয়া মুসলিম নেতৃত্বের হুথি আন্দোলনের কর্মীরা সাডা প্রদেশ এবং আশপাশের এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। এ-সময় অনেক সুন্নিরাও তাদের সমর্থন জোগায়। ২০১৪ সালে সর্বশেষ তিনি রাষ্ট্রক্ষমতা ছেড়ে তার মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে সৌদি আরবে পালিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করার নেপথ্যে সেদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর বহুধাবিভক্তিও অন্যতম কারণ। কিন্তু গণবিপ্লবের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বিপ্লবী কমিটির কোনো কাজ ও ঘোষণা মেনে নিতে পারেনি সৌদি আরব ও তার সমর্থকরা। একই অবস্থানে চলে যায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা জগৎ। নতুন সরকারের পক্ষে ২০১৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নতুন সাংবিধানিক ঘোষণাকে তারা অবৈধ বলে আখ্যায়িত করে। সৌদি আরব ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা ইয়েমেনের ‘নীরব গণবিপ্লব’কে হুথি শিয়াদের আন্দোলন বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। আর চিরাচরিত প্রথায় বিল্পবী শক্তির বিরোধিতা করে মাঠে নামে আমেরিকা। শুরু হয় হুথি নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী কমিটিকে ক্ষমতাচ্যুত করার কর্মকা-।
২০১৪ সালে হুথিরা দেশটির রাজধানী সানাসহ উত্তরাঞ্চল দখল করে নেয়। কিন্তু দক্ষিণের ৪টি সুন্নি প্রধান প্রদেশ হুথিদের কর্তৃত্ব মেনে নেয়নি। এমন অবস্থায় হাদি সানা থেকে পালিয়ে গিয়ে এডেনে অবস্থান নেন এবং পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করে আবার নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেন। এতে দেশটি আবার দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তরের নিয়ন্ত্রণ থাকল হুথিদের হাতে আর সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ দক্ষিণের নিয়ন্ত্রণ থাকল বৈধ প্রেসিডেন্ট হাদির হাতে। এখন হুথিরা চাচ্ছে দেশটিতে শিয়াদের আধিপত্য বিস্তার করতে আর সুন্নিরা চাচ্ছে হাদি সরকারকে। পলায়নরত ইয়েমেনের শাসক হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদিতার অভিযোগ এনে সৌদি আরবের সাহায্য চান। ২০১৫ সালের মার্চে তাকে আবারও ক্ষমতায় বসাতে হামলা শুরু করে সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোট। এর পরেই ইয়েমেনে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর মানবিক বিপর্যয় দেখা দেয়। দেশের দুই দলের কোন্দল যে গৃহযুদ্ধে রূপ নেবে এমনটা ভাবেনি কেউ।
ইয়েমেনের বর্তমান সংকটটি মধ্যপ্রাচ্যের ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শিয়া-সুন্নির বিরোধকে ছাপিয়ে বর্তমান ইয়েমেন সংকট বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। যেমন ইয়েমেনে দৃশ্যত সুন্নি সরকার ও হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে যুদ্ধ, পাশাপাশি দুটি ইসলামি জঙ্গিগোষ্ঠী সামরিক দিক থেকে সক্রিয় এবং তাদের স্বার্থ ভিন্ন। এর একটি হচ্ছে একাপ অর্থাৎ আল কায়দা ইন দা এরাবিয়ান পেনিনসুলা। অন্যটি হচ্ছে ইসলামি স্টেট, যে গোষ্ঠীটি ইরাক, সিরিয়ায় ব্যাপকভাবে তৎপর। ইয়েমেনের অস্থিতিশীল রাজনীতি এবং পশ্চাৎপদ অর্থনৈতিক সুযোগ নিয়ে আল-কায়দা থেকে শুরু করে বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠী শক্তিশালী ভিত তৈরি করে আছে। ফলে এই সংকটে আইএস চাচ্ছে তাদের প্রভাব বৃদ্ধি করতে, অন্যদিকে একাপ চাচ্ছে তাদের প্রভাব বলয় সৃষ্টি করতে। হুথি বিদ্রোহীরা চাচ্ছে শিয়াদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে। অন্যদিকে সুন্নিগোষ্ঠী হাদী সরকারের অবস্থানকে চাচ্ছে আরও সুদৃঢ় করতে। আর লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্ব চাচ্ছে ইয়েমেনে তাদের ভূ-রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থ বজায় রাখতে। ফলে দেখা যাচ্ছে, ইয়েমেন রাষ্ট্রটি গভীর থেকে গভীরতর সামরিক সংকটে নিপতিত হচ্ছে। যেখানে বহির্বিশ্বের বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব ক্রমাগত দৃশ্যমান। ফলে পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। এই সংকট থেকে বের হওয়া একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। কয়েক বছর ধরেই ইয়েমেনের মানুষ ভালো নেই। একদিকে হুথিদের আক্রমণ, অন্যদিকে সৌদি আরবের বর্বরোচিত বিমান হামলা। এর সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছে আল-কায়দার জঙ্গি তৎপরতা। আমেরিকা, রাশিয়া, ইরান, চীন ও সৌদি আরব নিজ নিজ স্বার্থ রক্ষার জন্য ইয়েমেনের সরকার, হুথি বিদ্রোহী, দক্ষিণের স্বাধীনতাকামী ও জঙ্গিদের সহায়তা দিচ্ছে। কিন্তু ইয়েমেনের জনসাধারণের কথা কেউ বিবেচনা করছে না। মার্কিন সহায়তাপুষ্ট সৌদি আরব শুধু সামরিক হামলা করেই ক্ষান্ত হয়নি; ইয়েমেনের জল ও আকাশসীমায় অবরোধও আরোপ করেছে। জাতিসংঘ মানবতার ভয়াবহ বিপর্যয় হচ্ছে বলে বিবৃতি দিয়েই দায়িত্ব পালন করছে। এভাবেই ইয়েমেনের সংকট জটিল থেকে জটিলতর হতে থাকে। এরপর ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ আর অভ্যন্তরীণ লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ক্রমেই আঞ্চলিক লড়াই থেকে আন্তর্জাতিক আবহ লাভ করে। ইয়েমেন মূলত মার্কিন ও ইরানিদের যুদ্ধ চলছে। মার্কিনের পক্ষে প্রক্সি দিচ্ছে সৌদি আর হুথিদের পক্ষে দাঁড়িয়েছে ইরান। মাঝ থেকে দুর্দশায় পড়েছে সিভিলিয়ানরা।
ইরানকে পেছন থেকে সমর্থন দিচ্ছে রাশিয়া ও চীন। চীনের লক্ষ যদি হয় বাণিজ্য, তবে রাশিয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য খর্ব করা। চীন এডেন বন্দরকে নিয়ন্ত্রণে নিতে চায় বাণিজ্যিক কারণে। ইরান ও রাশিয়ার উদ্দেশ্য সামরিক। অন্যদিকে, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটকে যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করছে আরবে ক্রমবর্ধমান রাশিয়া ও ইরানের প্রভাবকে প্রতিহত করতে। ইরানের প্রভাব বৃদ্ধি কেবল শুধু যুক্তরাষ্ট্রের মাথাব্যথার কারণ না; একই সঙ্গে ইসরায়েলের নিরাপত্তার বিষয়টিও যুক্তরাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হচ্ছে।
সবকিছু মিলে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে নানা দল লড়াই করছে। সৌদি সমর্থন পুষ্ট ইয়েমেনের সরকারকে ত্রিমুখী আক্রমণ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ইরানের সহায়তাপুষ্ট শিয়া হুথিগোষ্ঠী, দক্ষিণের স্বাধীনতাকামী ও ধর্মীয় জঙ্গিগোষ্ঠী। সরকারবিরোধী তিন পক্ষ আবার নিজেদের মধ্যে লড়াই করছে। হুথিদের ওপর সৌদি জোট যেমন হামলা করছে; আবার হুথি বিদ্রোহীরাও সৌদিকে লক্ষ্য করে মিসাইল ছুড়ছে। ইয়েমেনের বিপ্লবী যোদ্ধারা গত দুই বছরের বেশি সময় ধরে সৌদি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বীরবিক্রমে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে এবং প্রথম দিকে তারা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হলেও এখন তারা সৌদি আরবের অভ্যন্তরে আঘাত হানছে। মানবিক বিপর্যয় ঘটলেও হুথিরা দুর্বল হয়নি; বরং সৌদির সামরিক খরচ বাড়ছেই। শিয়া-সুন্নি বিভেদের রূপ দিয়ে সৌদি আরবে ইয়েমেন ইস্যুতে অন্যান্য সুন্নি দেশের সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছে।
আমেরিকা ও ইসরায়েলের সর্বাত্মক সাহায্য সমর্থন নিয়েও সৌদি আরব ইয়েমেন যুদ্ধে কোনো সাফল্যই অর্জন করতে পারেনি। ২০১৬ সালের ২৬ মার্চ যুদ্ধ শুরু করে সৌদি আরব ভেবেছিল, খুব সহজেই তারা জনপ্রিয় আনসারুল্লাহ বাহিনীকে পরাজিত করে ইয়েমেন দখল করে নেবে এবং পছন্দের সরকার বসাবে। কিন্তু যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি, ইয়েমেন যুদ্ধ সৌদি আরবের জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। ইয়েমেনের তেল এবং গ্যাসের ওপর মার্কিন নজরও রয়েছে।
সৌদি-ইয়েমেন সংঘর্ষের কারণটা আসলে শুধু ভূ-রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখানে কারণের পিছনের কারণ দেখা যাচ্ছে। মুসলিমদের অভ্যন্তরীণ বিভাজন। শিয়া-সুন্নির ঐতিহাসিক দ্বন্দ্ব। ইয়েমেনের যুদ্ধ বুঝতে হলে বুঝতে হবে ক্ষমতার কেন্দ্র। মধ্যপ্রাচ্যের শিয়া অধ্যুষিত দেশগুলোর শাসকগণ সুন্নি রাজ পরিবার বা নেতা আর খুব স্বাভাবিকভাবেই তারা কোনোদিন শিয়াদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে আগ্রহী নয়। শিয়াদের ক্ষমতার পালাবদল ঠেকিয়ে রাখতে দরকার সামরিক আগ্রাসন। বোমাবর্ষণ করে জয় সুনিশ্চিত করতে চাইছে সৌদি আরব। আরব দুনিয়ায় নিজের কর্তৃত্ব কায়েম করতে তৎপর সৌদি। ইয়েমেনের সরকার এবং হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যকার জনযুদ্ধে এ পর্যন্ত নিহত হয়েছে ১০ হাজার মানুষ, ইতোমধ্যে বাস্তুহারা হয়েছে ৩০ লাখ নিরীহ মানুষ আর অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে আর্থিক ক্ষতি হয়ে গেছে ১৪ বিলিয়ন ডলার। ইয়েমেনে এ মুহূর্তে চলছে পৃথিবীর সর্বাধিক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়।
গত আট বছরেও ইয়েমেন তার সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সৌদি আরবসহ মুসলিম বিশ্বের বেশির ভাগ দেশ ইয়েমেনের বৈধ সরকারের পক্ষে। বিশ্বের বেশির ভাগ শক্তিশালী রাষ্ট্র যখন ইয়েমেনের বৈধ সরকারের পক্ষে তখন বিশ্বের অন্যতম দুই পরাশক্তি রাশিয়া ও চীন এক্ষেত্রে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে; যা পরোক্ষভাবে ইরানকেই সমর্থন করে। তাই সবদিক থেকে মনে হচ্ছে সুবিধাবাদী আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো ইয়েমেনের সমস্যার কোনো সমাধান করতে পারবে না। ইয়েমেনকে তার সমস্যা নিজে থেকেই সমাধান করতে হবে। তা না হলে এই অচলাবস্থা আরও দীর্ঘায়িত হবে। দেশের স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে তাদের নিজে থেকে আলোচনার মাধ্যমে একটি সমাধানে পৌঁছতে হবে। আর সেটি সম্ভব না হলে বিশ্ববাসী আরেকটি ধ্বংসযজ্ঞ দেখবে।

Category:

ডেঙ্গু জ্বর : আছে সহজ প্রাকৃতিক চিকিৎসা

PM2আলমগীর আলম: দেশজুড়ে এখন আতঙ্কের নাম ডেঙ্গু। এই জ্বর যা ব্রেকবোন ফিভার নামেও পরিচিত, একটি সংক্রামক ট্রপিক্যাল ডিজিজ, যা ডেঙ্গু ভাইরাসের কারণে হয়। কিছু ক্ষেত্রে অসুখটি প্রাণঘাতী ডেঙ্গু হেমোর‌্যাজিক ফিভার-এ রূপান্তরিত হয়, যার ফলে রক্তপাত, রক্তের প্লাটিলেট মাত্রা কমে যায় ডেঙ্গু শক সিনড্রোম-এ পর্যবসিত হয়, যেখানে রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে কম থাকে। আমরা ইতোমধ্যে জেনে গেছি, ডেঙ্গু প্রজাতি এডিস দ্বারা পরিবাহিত হয়। প্রধানত A. aegypti নামক মশকী (স্ত্রী মশা) এই রোগের জন্য দায়ী। যেহেতু কোনো ভ্যাকসিন নেই, তাই মশার সংখ্যা বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ ও মশার সংখ্যা বৃদ্ধি হ্রাস এবং মশার কামড়ানো সম্ভাবনা কমানোর মাধ্যমে প্রতিরোধ প্রয়োজন।
অ্যাকিউট ডেঙ্গুর চিকিৎসা ধীর প্রকৃতির, স্বল্প বা মাঝারি রোগের ক্ষেত্রে রিহাইড্রেশন ওরাল বা ইন্ট্রাভেনাস পদ্ধতিতে ইন্ট্রাভেনাস ফ্লুইড এবং আরও প্রবল ক্ষেত্রে ব্লাড ট্রান্সফিউশন।
ডেঙ্গু জ্বরের ঘটনা ১৯৬০ সালের পর থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, প্রতি বছর প্রায় ৫ থেকে ১০ কোটি লোক এতে আক্রান্ত হয়। ১৭৭৯ সালে এর প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় এবং এর ভাইরাসঘটিত কারণ ও সংক্রমণ বিষয়ে বিশদে জানা যায় বিংশ শতকের প্রথম ভাগে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময় থেকে ডেঙ্গু দুনিয়াজোড়া সমস্যা হয়ে দাঁড়ায় এবং ১১০টিরও বেশি দেশে মহামারীর আকার নেয়। শিশু ও ছোট বাচ্চাদের মধ্যে রোগ বেশি দেখা যায় এবং অন্যান্য সংক্রমণের তুলনায় এটি বাচ্চাদের পক্ষে বেশি সাধারণ আর এর পরিচর্যা তুলনামূলকভাবে ভালো। এতে পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের বিপদ বেশি। যাদের ক্রনিক অসুখ আছে যেমনÑ ডায়াবেটিস ও অ্যাজমা তাদের পক্ষে ডেঙ্গু প্রাণঘাতী হতে পারে।
ডেঙ্গু জ্বর বা ফ্লু আমাদের দৈনিন্দন জীবনে যে কোনো মুহূর্তে প্রবেশ করে ফেলতে পারে, সাধারণ জ্বর কখনও সিজেন চেঞ্জের সময় হয়, বৃষ্টিতে ও পরিবেশগত কারণে, আবার নানান পানিবাহিত কারণেও জ্বর হয় বা কোনো বড় ধরনের রোগের আগমনী বার্তা নিয়েও জ্বর হয়ে থাকে। কিন্তু ডেঙ্গু সাধারণত বৃষ্টিভেজা পরিবেশে বাড়তে থাকে, এডিস লার্ভা স্বচ্ছ পানিতে তৈরি হয়, দিনের বেলায় কামড়ায়।
প্রথমে এই জ্বর নিয়ে আমরা সাধারণত ওষুধের দোকান থেকে প্যারাসিটামল ট্যাবলেট এনে খেয়ে ফেলি, অতি সাধারণভাবে আমরা দু-তিন দিন ঔষধ খেয়ে জ্বরের মাত্রাটি কমিয়ে আনার চেষ্টা করি, ডেঙ্গু জ্বর এমন কোনো সাধারণ জ্বর নয়, যা শুধু সিটামল টাইপের ওষুধ খেলে কমবে, এর নানান সিম্পটম থাকে যার দরুন বমি, র‌্যাশ, চোখের ভিতরে রক্ত জমা, শরীরে রক্তক্ষরণ হয়ে থাকে। আর ফ্লু জ্বরে গলায় শ্লেষ্মা জমে, কণ্ঠ চিকন হয়ে ওঠে, গলা ব্যথা, শরীর ব্যথা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে জ্বরের মাত্রা ১০২ থেকে ১০৩ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠতে পারে; কিন্তু ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে দ্রুত ১০৪ থেকে ১০৫ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠে যায়।
এই যে আমার জ্বর এলো, কেন এলো, কী ছিল জ্বরের পিছনে, জ্বরের সাথে আর কী সমস্যা হয়েছেÑ এসব হিসাব করি না। আমরা গা গরম তা কমানোর জন্য নাপা বা সিটামল খেয়ে শরীরের তাপমাত্রা কমিয়ে ফেললেই মনে করি সুস্থ হয়ে গেছি। অথচ ডেঙ্গুর কারণে রক্তের প্লাটিলেট কমতে থাকে, যা খুবই ভয়ঙ্কর অবস্থা সৃষ্টি করতে পারে, তখন শরীরে তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকতে পারে।
মনে রাখা প্রয়োজন, এই যে আমাদের মাঝে জ্বর বা ফ্লু আসে আবার চলে যায়, কোথা থেকে আসে কোথায় চলে যায়, অপ্রয়োজনী কিছু টেস্ট দিয়ে আমাদের অনুমানভিত্তিক চিকিৎসা করা হয়, গত বছর হাজার হাজার চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত মানুষ টের পেয়েছে। সত্য কথা বলতে কী আমাদের এখানে টেস্ট করানোর অভ্যাস নেই, যা আমাদের আক্রান্ত ভাইরাসের সঠিক তথ্য দিতে পারে, যার দরুন জ্বর নিয়ে দেরি করে ফেলা হয় আর বিশেষ করে আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। যার দরুণ রোগীর সমস্যা বেড়ে যায়, সেই সাথে শরীরে ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়ে পড়ে। শরীরে ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হলে কোনো মানুষই স্বাভাবিক খাবার গ্রহণ করতে পারে না, বিশেষ করে বমি হয়ে যায়। তাই তখন সর্তক থাকতে হয় খাওয়ার ক্ষেত্রে। তখন আমাদের সামাজিক অবস্থা হলোÑ জ্বর হলে বেশি খাবার খেতে দেওয়া হয়, তখন মনে হয় যে খেলেই বুঝি শক্তি চলে আসবে রোগী সুস্থ হয়ে উঠবে। আসলে ব্যাপারটি উল্টো। তখন দরকার শুধুমাত্র ভিটামিন ‘সি’ আধিক্য তরল খাদ্য গ্রহণ একমাত্র উপায়। ডেঙ্গু বা ফ্লু ভাইরাসজনিত সকল জ্বরের জন্য খাদ্য পথ্য ও আকুপ্রেসার একটি উত্তম প্রাকৃতিক উপায়, যা আক্রান্ত ব্যক্তি শুধু জানে বাঁচবে তা নয়, নানান ঔষধ এবং হয়রানি থেকেও মুক্তি পাবেন।

কী করবেন?
আকুপ্রেসার : আকুপ্রেসার করতে পারেন, এর জন্য কোনো পয়েন্ট জানা প্রয়োজন নেই, আপনার হাতের তালুতে এবং আঙ্গুলে আস্তে আস্তে করে ম্যাসাজ করুন, লক্ষ করবেন যে হাতুর তালুর মাঝ স্থানে একটু ব্যথা অনুভূত হবে ছবিতে দেওয়া পয়েন্টগুলো বেশি চাপ দিন। সেখানে কেন্দ্র ধরে পুরো তালুতে পাঁচ মিনিট ম্যাসাজ করুন, তারপর কবজির নিচের অংশে এক মিনিট বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে চাপ দিন গুনে গুনে ৫০ বার, এভাবে দুই হাতে ১০ মিনিট সারাদিনে তিনবার ছয় ঘণ্টা অন্তর আকুপ্রেসার করুন। ছবিতে পয়েন্ট দেওয়া হলো।

খাদ্যপথ্য
প্রথমে আপনার জন্য তিন দিন কোনো ধরনের স্বাভাবিক খাবার, যা আমরা খেয়ে থাকি তা বন্ধ করতে হবে।
খাদ্য তালিকা : যখন থেকে টের পাবেন আপনার জ্বর তখন থেকেই স্বাভাবিক খাবার বন্ধ করে এক গ্লাস কুসুম গরম পানির সাথে এক টেবিল চামচ লেবুর রস মিশিয়ে এক ঘণ্টা পরপর চার ঘণ্টায় চার গ্লাস কুসুম গরম পানি ও লেবুর রস খাই। এতে শরীরে জ্বরের প্রকোপ কমে আসবে, বমি কমে আসবে, ডায়রিয়া হলে তাও কমে আসবে। তারপর সারাদিন দুই ঘণ্টা পরপর এক গ্লাস কুসুম গরম পানি এক টেবিল চামচ লেবুর রস ও এক টেবিল চামচ মধু মিশিয়ে সারাদিন আট গ্লাস পানি পান করুন, মাঝে একটি কচি ডাবের পানি পান করুন। তাতে শরীরের মিনারেলের ভারসাম্য ঠিক থাকবে। রাত ৮টা অবধি এই পানিটুকু পান করে আর কোনো ধরনের খাদ্য গ্রহণ না করে শুয়ে পড়–ন। পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আবার আগের দিনের মতোই একই কাজ করুন। দ্বিতীয় দিন শরীরে ক্ষুধা বেশি লাগবে; কিন্তু শরীর হালকা অনুভূত হবে। সকালে চার ঘণ্টায় এক ঘণ্টা অন্তর লেবু পানি খেয়ে একটি কচি ডাবের পানি পান করুন, দুপুরে একটি শসা ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে খেতে হবে, তাতে শরীরে ডিহাইড্রেশন থাকবে না, সাথে এদিন আট গ্লাস কুসুম গরম পানির সাথে আট টেবিল চামচ লেবুর রস, আট টেবিল চামচ মধুই প্রধান খাদ্যপথ্য। এর বাইরে কোনো কিছু খাওয়ার প্রয়োজন নেই। তৃতীয় দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আবার একই কাজ করুন দুপুরে এক ঘণ্টা পরপর এক গ্লাস কমলা, জাম্বুরা, আনারস বা লেবুর জুস, একটি কচি ডাবের পানি পান করুন এবং এক বাটি কুচি করে কাটা শসা, এটাই দুপুরের খাবার, তারপর রাত অবধি আনারস, কমলা, ডালিম, মাল্টা, লেবু, আমড়া ফলের জুস খান রাত আটটা অবধি। এভাবে তৃতীয় দিন পার করে পরের দিন সকালে পেট ভরে মিক্সড ফ্রুট (রকমারি ফল) খান এক বাটি। দুপুরে স্বাভাবিক খাবারে ফেরত চলে আসুন।
এই তিন দিনে আপনার শরীর থেকে অজানা অচেনা অনেক ধরনের বর্জ্য বেরিয়ে যাবে, মাথা ধরে থাকবে, প্রচ- ক্ষুধা লাগবে, শরীর দুর্বল লাগবে ইত্যাদি সমস্যা দেখা দিলেও আপনি নিয়মটি পালন করুন।
চতুর্থ দিন আপনার শরীরে যা ঘটবে তাতে আপনি আশ্চর্য না হয়ে পারবেন না। ডেঙ্গু কমে যাবে, জ্বর ফ্লু থাকলে তা চলে যাবে, শরীরে সকল ধরনের অস্বস্তি কেটে যাবে, শরীর হালকা হয়ে যাবে, শক্তি পাবেন, শরীরের সকল ব্যথা চলে যাবে, পেটে গ্যাসের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। চোখে জ্যোতি বাড়বে, মাথা হালকা লাগবে। ডেঙ্গু জ্বর তাড়ানোর প্রথম ধাপ পার করে আপনি হয়ে উঠবেন আত্মবিশ^াসী। মাত্র তিন দিন এ নিয়মটি পালন করলে আপনি আপনার হাতের আকুপ্রেসার পয়েন্টগুলো যেখানে চাপ দিলে ব্যথা অনুভব করতেন এখন আর সেখানে ব্যথা পাবেন না। দ্বিতীয়ত শরীরে কোনো ধরনের সমস্যা অনুভব করবেন না। আপনার পেটের সকল ধরনের সমস্যা থেকে মুক্ত হয়ে যাবেন।
এই প্রাকৃতিক নিয়মটি পালনে মনোবলটাই জরুরি আর কিছু নয়। এর চেয়ে সহজ পদ্ধতিতে আপনার এই জটিল সমস্যা দূর করার আর কোনো সহজ পদ্ধতি নেই।
এ নিয়মটি মেনে চার দিন পর আধুনিক টেস্ট করে দেখুন আপনার ডেঙ্গু আছে কি না, আমরা পরীক্ষিত এতে ডেঙ্গু কমে যায়, তখন শরীরে কোনো ধরনের উপসর্গ থাকে না, অস্বস্তি কমে যায়, রোগ নিরাময় হয়ে যায়।

লেখক : ন্যাচারোপ্যাথি ও আকুপ্রেসার বিশেষজ্ঞ

Category:

শুকলাল ডোম

PM2স্বকৃত নোমান: শুরুতেই আপনাদের জানিয়ে রাখি, বহুদিন ধরে একটি চরিত্র আমার মাথায় বসবাস করছে। এই চরিত্রের কথা আমি শুনেছিলাম সাংবাদিক জাহীদ রেজা নূরের কাছে। জাহীদ ভাইকে চেনেন তো? সেই জাহীদ রেজা নূর, যার বাবা সিরাজুদ্দীন হোসেনকে একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার, রাজাকার ও আলবদরের পা-ারা ঢাকার চামেলীবাগের বাসা থেকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। প্রায়ই ভাবি, জাহীদ ভাইর কাছে শোনা চরিত্রটি নিয়ে আমি লিখব। কিন্তু হয়ে ওঠে না। আজ বরং আপনাদের চরিত্রটি সম্পর্কে কিছু কথা জানিয়ে রাখি।
ধরা যাক তার নাম শুকলাল। পেশায় ডোম। আপনারা তো জানেন, ডোমেরা মূলত মৃতদেহ পরিচর্যা, ব্যবচ্ছেদ ও সেলাইয়ের কাজ করে। বর্ণপ্রথার কারণে এখনও সমাজে তারা অস্পৃশ্য হিসেবেই চিহ্নিত। বাংলাদেশে বাঙালি ও অবাঙালি, এই দু-ধরনের ডোম আছে। অবাঙালি ডোমদের ব্রিটিশ শাসনামলের মাঝামাঝিতে বিভিন্ন কাজের জন্য ভারতের উত্তর প্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, উড়িষ্যা, কুচবিহার, রাঁচি, মাদ্রাজ ও আসামের বিভিন্ন স্থান থেকে নিয়ে আসা হয়। অনেকের ধারণা, মধ্যযুগে ডোমেরা দাক্ষিণাত্য থেকে বাংলায় এসেছে। তবে ‘চর্যাপদে’ ডোম শব্দের উল্লেখ দেখে আপনারা ভাবতে পারেন, ডোমেরা এই বাংলায় বসবাস শুরু করে আর্যদেরও আগে। হতেও পারে। ডোমদের একটা সময় চাঁড়াল বলা হতো। আপনারা নিশ্চয়ই কমলকুমার মজুমদারের ‘অন্তর্জলীযাত্রা’ পড়েছেন। এই উপন্যাসে আমরা বৈজু চাঁড়ালের কথা পাই। আহা কী অসাধারণ এক উপন্যাস! শুরুটাই কী চমৎকার : ‘আলো ক্রমে আসিতেছে। এ নভোম-ল মুক্তাফলের ছায়াবৎ হিম নীলাভ। আর অল্পকাল গত হইলে রক্তিমতা প্রভাব বিস্তার করিবে, পুনর্ব্বার আমরা, প্রাকৃতজনেরা, পুষ্পের উষ্ণতা চিহ্নিত হইব। ক্রমে আলো আসিতেছে…।’
শুকলাল ডোমের পূর্বপুরুষেরা হয়তো উত্তর প্রদেশ থেকে, বা অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে, বা মধ্যপ্রদেশ থেকে, বা আসাম থেকে একদিন চারশ’ বছরের এই প্রাচীন নগরী ঢাকায় এসে বসতি পত্তন করেছিল বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে। শুকলাল কখনও যুদ্ধ দেখেনি, কখনও মন্বন্তর দেখেনি, কখনও দাঙ্গা দেখেনি, কখনও মানুষের সারিসারি লাশ দেখেনি। সে কাজ করত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে। মর্গে তো আর সারি সারি লাশ আসত না। কখনও একটি, কখনও দুটি, কখনও পাঁচটি লাশ আসত। সেসব লাশের শরীর ব্যবচ্ছেদ আর সেলাই করা ছিল তার কাজ। সে মনে করত, পৃথিবীটা এমনই। পৃথিবীতে কেউ চিরকাল থাকতে পারে না, সবাইকে মরতে হয়। মৃত্যু স্বাভাবিক। কেউ বার্ধক্যজনিত কারণে মরে, কেউ অপঘাতে মরে। যারা অপঘাতে মরে তাদের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য কাটাছেঁড়া করতে হয়। এটাও পৃথিবীর নিয়ম। তার পূর্বপুরুষেরা অপঘাতে মৃত মানুষদের লাশ কাটাছেঁড়া করেছে, সেও করে। তার কাছে এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়, খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। আর সে তো তখন মাতাল থাকত। গলা অবধি চোলাই খেয়ে সে যখন কোনো লাশের গলা থেকে তলপেট পর্যন্ত চিরে ফেলত; স্টমাক, কিডনি, হার্ট, লাঞ্চ, লিভার বের করে আনতো, কিংবা মাথার খুলিটা আলাদা করে মগজগুলো বের করে আনতো, একবারও তার বুক কাঁপত না, হাত কাঁপত না। কখনও একটিবার মনে হতো না একদিন তাকেও মরতে হবে। হয়তো বার্ধক্যজনিত কারণে কিংবা কোনো অপঘাতে। হয়তো তার লাশও একদিন তার মতো কোনো ডোম এভাবে কাটাছেঁড়া করবে। সে-কথা বলতো তার মাতৃভাষায়। ডোমাই ভাষা। কিন্তু জন্ম তো তার এই গানের দেশ, ভাবের দেশ বাংলাদেশে। লাশ কাটতে কাটতে সে গাইত বাংলা গান, ‘ও কী ও বন্ধু কাজল ভ্রমরারে/কোনদিন আসিবেন বন্ধু কয়া যাও কয়া যাও রে…।’
শুকলাল ডোমের তখন বয়স কত? এই ধরুন পঁয়ত্রিশ। চল্লিশও হতে পারে। তার বাবা-মা তো কোথাও তার জন্ম তারিখ লিখে রাখেনি। তারা ডোম। তারা কি আর জন্ম-মৃত্যুর হিসাব রাখে! জন্ম তারিখ লিখে রেখে কী হবে, তারা তো আর জন্মদিন পালন করে না। এসব তো বড়লোকদের ব্যাপার। ধরা যাক তার বয়স তখন চল্লিশ। শুরু হলো যুদ্ধ। পঁচিশে মার্চের কালরাতে পাকিস্তানের বর্বর হানাদার বাহিনী শুরু করল অপারেশন সার্চলাইট। সেই গণহত্যার কথা কী আর লিখব, আপনারা তো সবই জানেন। আপনারা বাংলাদেশের মানুষ। এই বাংলাদেশে সংঘটিত সেই বীভৎস্য হত্যাযজ্ঞের ইতিহাস আপনাদের জানতে হয়েছে। আপনারা জানেন সেই কালরাত্রির ইতিহাস। শুধু জানেন না, সেই রাতে ঠিক কত মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। এটা কি জানার কথা! কোনো গবেষকের পক্ষে কি গবেষণা করে বের করা সম্ভব! ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়, রাজারবাগ পুলিশ লাইন আর পিলখানায় কত মানুষকে হত্যা করেছিল, হত্যাকারীরা তো লিখে রাখেনি। তারা তো মানুষ গুনে গুনে হত্যা করেনি। যাকে সামনে পেয়েছে তাকেই মেরেছে। আমরা শুধু অনুমান করতে পারি, সে-রাতে ঢাকা শহরে পাকিস্তানি খুনিরা হত্যা করেছিল প্রায় এক লক্ষ মানুষ।
সাতাশে মার্চ দুপুর। শুকলাল ডোমের তখনও ঘুম ভাঙেনি। রাত এগারোটা পর্যন্ত চোলাই খেয়ে ঘুমিয়েছে সেই বারোটায়। একটা বালিশ কোলে নিয়ে এখনও ঘুমাচ্ছে। উঠতে ইচ্ছে করছে না। উঠে কী করবে, দুদিন ধরে তো হাসপাতালে যাচ্ছে না। কী করবে গিয়ে, কাজ তো নেই। সে শুনেছে, গোটা ঢাকা শহরটাই না-কি লাশকাটা ঘরের রূপ নিয়েছে। চারদিকে কেবল লাশ আর লাশ। শুনে সে হেসেছে। যত্তসব আজগুবি কথা! এক রাতে কি আর এত মানুষ হত্যা করা যায়! হয়তো একশ’, বা দুইশ’, বা বড়জোর পাঁচশ’ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। অথচ মানুষ গুজব ছড়াচ্ছে, লাশ না-কি হাজার হাজার! রক্তে না-কি লাল হয়ে গেছে বুড়িগঙ্গার জল। তিলকে তাল বানিয়ে মানুষের কী যে সুখ!
বাইরে হঠাৎ বিপিন দাসের গলা শোনা যায়, ‘শুকলাল! এ শুকলাল! তো ঘর মে হ্যায় না? বাহির আ যা। দেখ কোন আয়া।’
শুকলাল উঠে বসে। আড়মোড়া ভেঙে হাই তোলে। গামছাটা গায়ে চড়িয়ে দাওয়ায় এসে দাঁড়ায়। দেখে, মাঝিরঘাটের আড়ৎদার হারেস উদ্দিন। সঙ্গে দুই সেপাই। গায়ে খাকি, পরনে বুট, মাথায় হেট, কাঁধে রাইফেল। শুকলাল একটু ঘাবড়ে যায়। হাসপাতালে যাচ্ছে না বলে সেপাইরা কি তাকে ধরে নিতে এলো! সে হেসে বলল, ‘কেমন আছেন ভাইসাহাব? আচ্ছা হ্যায় তো?’
হারেস উদ্দিন বলে, ‘আচ্ছা আচ্ছা। জলদি রেডি হও মিয়া। কাজে যাওন লাগবো। স্যারেরা এসেছেন তোমাকে নিতে।’
শুকলাল জানতে চায় না কী কাজ। নিশ্চয়ই জরুরি কোনো কাজ। নইলে কি স্যারেরা আসতেন! গেঞ্জিটা গায়ে দিয়ে দ্রুত সে বের হয়। সেপাইরা তাকে নিয়ে যায় বুড়িগঙ্গার উত্তরের ঘাটে। সেখানে লাশের স্তূপ। শিশুর লাশ, কিশোর-কিশোরীর লাশ, তরুণ-তরুণীর লাশ, বৃদ্ধ-বৃদ্ধার লাশ। বিপিন দাসসহ আরও চার ডোমকেও আনা হয়েছে। এসব লাশ ঘাট থেকে সরিয়ে মাটিচাপা দিতে হবে। গর্ত খোঁড়া আছে। শুকলাল কি আর অমত করতে পারে? সে কি বলতে পারে, এ কাজ আমার পক্ষে সম্ভব নয়! বললে ধড়ে কি আর মু-ু থাকবে!
ডোমেরা কাজ শুরু করে। শুকলালও। আঁকশি দিয়ে একটা একটা লাশ টেনে গর্তে ফেলতে থাকে। জীবনে প্রথমবারের মতো একসঙ্গে এত লাশ দেখে শুকলালের অবাক লাগে। পাকিস্তানিরা এত এত মানুষ মারল, অথচ সে কি না গুজব বলে উড়িয়ে দিল! লাশের পর লাশ দেখে তার বুকে কাঁপুনি ওঠে। আঁকশি দিয়ে লাশ টানতে গিয়ে হাতটা বারবার কেঁপে উঠছে। তার মনে পড়ে যায় পট্টির অনন্ত দাসের কথা। খুব গল্পবাজ ছিল লোকটা। কত গল্প যে জানত! একদিন অনন্ত দাস বলেছিল কুরুক্ষেত্রের কথা। পা-ব ও কৌরবের মধ্যে যুদ্ধ হয়েছিল কুরুক্ষেত্রে। সেই যুদ্ধ ছিল ধর্মের জয় আর অধর্মের বিনাশের যুদ্ধ। হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল। কিন্তু এ কোন যুদ্ধ! কেন এই যুদ্ধ! কোন অপরাধে এত এত মানুষকে হত্যা করা হলো!
লাশ টানতে টানতে শুকলাম ঘেমে ওঠে। কপালে ঘাম, দুই গালে ঘাম, গলায় ঘাম, বুকে ঘাম, সারাশরীরে ঘাম। শুকলাল খিদার কথা ভুলে গেছে। কতক্ষণ পরপর সে বিড়ি টানে, অথচ এখন বিড়ির কথা ভুলে আছে। লাশ টানতে টানতে দিন ফুরিয়ে যায়। সূর্যটা চলে গেছে অস্তাচলে। লাল গোলাকার সূর্য ক্রমে ডুবে যাচ্ছে।… অন্ধকার ক্রমে আসিতেছে। শুকলালের হাতের কাঁপুনি দ্বিগুণ বেড়ে যায়। নিজের প্রতি ভীষণ রাগ ওঠে। লাশ নিয়ে তার কারবার। জীবনে কত লাশ কাটাছেঁড়া করেছে, কখনও হাত কাঁপেনি, এখন তো কাটাছেঁড়া করছে না, আঁকশি দিয়ে টেনে টেনে শুধু গর্তে নামাচ্ছে, তবু তার হাতটা এভাবে কাঁপছে কেন!
এক নারীর লাশে আঁকশি বসিয়ে শুকলাল দেয় জোরসে টান। লাশটা এলো না, ফিরে এলো আঁকশিটা। আঁকশির টানে পেটের চামড়াটা চিরে গেল বুক অবধি। বেরিয়ে এলো ফুটফুটে এক শিশু। শুকলাল থমকে দাঁড়ায়। শিশুটার মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে। কী সুন্দর মুখ। কী সুন্দর হাত-পা! শুকলালের চোখের সামনে ভেসে ওঠে শিশু শ্রীকৃষ্ণের মুখ। যেন সাক্ষাৎ ভগবান মায়ের পেট থেকে বেরিয়ে এসেছেন! একটু পরেই বসুদেব আসবেন। পুত্রকে গোপনে তুলে দেবেন যশোদার কোলে।
নাড়িসুদ্ধ শিশুটিকে পরম মমতায় কোলে তুলে নেয় শুকলাল। শিশুটি মৃত, অথচ মনে হচ্ছে জীবিত। মায়ের আদর পেয়ে যেন ঘুমাচ্ছে। কচি মুখটার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে শুকলাল। ‘হা ভগবান’ বলে সে পশ্চিমে তাকায়। সূর্য ডুবে গেছে।… ক্রমে অন্ধকার আসিতেছে। বিহ্বল শুকলাল এবার তাকায় নারীটির মুখের দিকে। মুখটা হাঁ হয়ে আছে। মাথার কয়েক গাছি চুল ঢুকে আছে মুখের ভেতর। যুবতী। বিশ-একুশের বেশি হবে না বয়স। শুকলাল টের পায়, বুকের কাঁপুনিটা বেড়ে গেছে দ্বিগুণ। বুকের ভেতরে যেন ট্রাকের ইঞ্জিন চলছে। তার পা দুটো কাঁপতে থাকে। থরথর করে। সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। চট করে বসে পড়ে। শিশুটি ছিটকে পড়ে যুবতীর বুকের কাছে।
গামছায় মুখ মুছে শুকলাল উঠে দাঁড়ায়। কম্পিত হাতে শিশুটিকে ঠেলে ঢুকিয়ে দেয় যুবতীর পেটে। গামছা দিয়ে পেটটা শক্ত করে বেঁধে লাশটা তুলে নেয় কোলে। হাঁটা ধরে গর্তের দিকে। খুঁড়ে রাখা অসংখ্য গর্তের একটাতে লাশটা নামায়। মাটি ভরাট করে কবরের রূপ দেয়। কবরের সিথানে সে উবু হয়ে বসে। অন্ধকার হয়ে ওঠে গাঢ়। শকুনের ডানা ঝাপটানির শব্দ শোনা যায়। টের পাওয়া যায় শেয়ালের আনাগোনা। হাত দুটো জোড় করে কবরের মাটিতে মাথাটা ঠেকায় শুকলাল। বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে, ‘ভগবান!’
সারারাত শুকলাল কোথায় ছিল কে জানে। পরদিন সকালে বিপিন দাস এসে দেখে, দু-হাতে আঁকশিটা ধরে সে বসে আছে ঘাটের পাকুড়তলায়। বিপিন তাকে ডাক দেয়, জলদি কাজ শুরু করার তাগাদা দেয়। সন্ধ্যার আগে সব লাশ গর্তে নামিয়ে মাটিচাপা দিতে হবে। নইলে সেপাইরা গুলি করে খুলি উড়িয়ে দেবে।
আঁকশি হাতে শুকলাল উঠে দাঁড়াল। সঙ্গীদের সঙ্গে লাশের স্তূপের কাছে গেল। সঙ্গীরা শুরু করল কাজ। গতকালের মতো। একটা একটা করে লাশ আঁকশিতে টেনে গর্তে ফেলতে থাকে। শুকলাল দাঁড়িয়ে থাকে। চোখেমুখে উ™£ান্তি। এদিক-তাকায়, ওদিক তাকায়। হঠাৎ হেসে ওঠে। হা হা করে হাসতে থাকে। হাসতে হাসতে কেঁদে ওঠে। হহু করে কাঁদতে থাকে। কান্নার মধ্যেই আবার অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। হাসি থামিয়ে বিড়বিড় করে কী যেন বলে। সঙ্গীরা কিছুই বুঝতে পারে না। তারা ভাবে, শুকলাল হয়তো চোলাই বেশি খেয়ে ফেলেছে।
দুপুর গড়িয়ে যায়। শুকলাল দাঁড়িয়ে থাকে। বিকেলও গড়িয়ে যায়। সূর্য আবার চলে যায় অস্তাচলে।… আর অল্পকাল গত হইলে আকাশে জাগিয়া উঠিবে রক্তিম আবির। সব লাশ মাটিচাপা দেওয়া হয়ে গেছে। অস্তাচলের দিকে মুখ করে শুকলাল আগের মতোই দাঁড়িয়ে থাকে। হাসে, কাঁদে আর কীসব বলে যায় বিড়বিড় করে।
এবার বলুন, এই শুকলাল চরিত্র নিয়ে কি কোনো গল্প লেখা যায়? আমি বহুবার চেষ্টা করেছি। পারিনি। লিখতে বসলেই বুকটা কেমন ভারী হয়ে ওঠে। একটা পাথর যেন চেপে বসে বুকের ওপর। দু-চোখের কোণে বয়ে যেতে চায় বুড়িগঙ্গার স্রোত। আমি কোনোদিন হয়তো শুকলালকে নিয়ে লিখতে পারব না। কোনোদিন না। শুকলাল তার আঁকশি হাতে দাঁড়িয়ে থাকবে আমার মাথায়। আমৃত্যু।

Category:

PM2

Category:

জানা-অজানা আতঙ্কের নাম : ডেঙ্গু

PM2রাজিয়া সুলতানা: চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছেÑ ডেঙ্গু থেকে বেশির ভাগ লোকই কোনো স্থায়ী সমস্যা ছাড়াই আরোগ্য লাভ করে। মৃত্যুহার চিকিৎসা ছাড়া ১-৫ শতাংশ এবং চিকিৎসা হলে তা ১ শতাংশেরও কম; তবে রোগের চরম পর্যায়ে মৃত্যুহার প্রায় ২৬ শতাংশ। অথচ সাধারণ মানুষের ধারণা ডেঙ্গু হলেও নিস্তার নেই। ডেঙ্গু এখন জনমানুষের কাছে এক মহাআতঙ্কের নাম। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, ডেঙ্গুতে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। প্রয়োজন সময়োপযোগী ব্যবস্থাপত্র।
আসলে ডেঙ্গু কী? ডেঙ্গুর সঙ্গে এডিস মশা এবং জ্বর শব্দটির নিবিড় সম্পর্ক। ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে রোগীর গায়ে জ্বর আসবে। সাধারণত ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত গ্রীষ্মম-লীয় রোগ। এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে ভাইরাস সংক্রমণের ৩-১৫ দিনের মধ্যে ডেঙ্গু জ্বরের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা, বমি, পেশি ও গাঁটে ব্যথা এবং চামড়ায় ফুসকুড়ি ওঠা। ঠিকঠাক ব্যবস্থাপত্র নিলে দু-সাত দিনের মধ্যে ডেঙ্গু থেকে আরোগ্য লাভ করা যাবে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে রোগটি মারাত্মক রক্তক্ষয়ী রূপ নিতে পারে। যাকে ডেঙ্গু রক্তক্ষরী জ্বর (ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার) বলে। ফলে রক্তপাত হয়, রক্তে অনুচক্রিকার মাত্রা কমে যায় এবং রক্ত হতে প্লাজমার নিঃসরণ ঘটে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডেঙ্গু শক সিনড্রোমও দেখা দেয়। ডেঙ্গু শক সিনড্রোম রক্তচাপ বিপজ্জনকভাবে কমে যাওয়া। এক্ষেত্রে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু আশঙ্কাও থাকে। মূলত বর্ষার আগেই এপ্রিলে ডেঙ্গুর আবির্ভাব। কিছু বুঝে ওঠার আগেই রোগটি মহামারীর দ্বারপ্রান্তে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী এ বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৫৭ হাজার ৯৯৫ জন, মারা গেছে ৪১ জন। তবে বেসরকারি তথ্যমতে ১৮৫ জন।
আগস্ট মাসের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, মহাখালী, ঢাকা-এর মতে ঢাকা মহানগরীর ৪১টি হাসপাতালে ৩ হাজার ৩৩২ জন ও ঢাকার বাইরে ২ হাজার ৮১৫ জন ডেঙ্গু রোগী নানা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ সময়কালে ঢাকায় নতুন ভর্তির সংখ্যা ৭৬১ জন, হাসপাতাল ছেড়েছেন ৭৮৯ জন। ঢাকার বাইরে নতুন ভর্তি ৮৩৬ জন, ছাড়প্রাপ্ত রোগী ৯৩৯ জন। এ বছর ২৪ ঘণ্টায় সংক্রামিত হয়েছেন সর্বোচ্চ ১ হাজার ৭১২ জন রোগী; যা একদিনে আক্রান্ত হওয়া রোগীর সংখ্যার দিক থেকে নতুন রেকর্ড। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) ধারণা করছে যে ডেঙ্গুর প্রকোপ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হতেই ডেঙ্গু আগ্রাসী রূপ ধারণ করে। বর্তমানে এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা ও অন্যান্য মহাদেশের ১১০টির অধিক দেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। পৃথিবীজুড়ে বছরে ৫০-১০০ মিলিয়ন লোকের মধ্যে ডেঙ্গু সংক্রামিত হয়, যার মধ্যে ৫ লাখকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়; তাদের মধ্যে প্রায় ১২ হাজার ৫০০ থেকে ২৫ হাজার জনের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটে।
চীনা মেডিকেল এনসাইক্লোপিডিয়ায় (বিশ্বকোষ) বলছেÑ ডেঙ্গু ভাইসের প্রথম বিবরণ পাওয়া যায় জিন বংশের ২৬৫-৪২০ খ্রিষ্টাব্দে। যেখানে উড়ন্ত পতঙ্গের সাথে সম্পর্কযুক্ত জলীয় বিষ উল্লেখ আছে। আর ১৭৭৯ সালে ডেঙ্গুর প্রথম প্রামাণিক উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৭৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পদার্থবিদ্যার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বেঞ্জামিন রাশ তার একটি রিপোর্টেÑ ব্রেক বোন ফিভার শব্দটি প্রথম প্রয়োগ করেন, যা ছিল ১৭৮০ সালের ফিলাডেলফিয়ার মহামারীর ওপর ১৭৮৯ সালে লিখিত। তিনি বিলিয়াস রেমিটিং ফিভার শব্দটিও ব্যবহার করেন। কালপ্রবাহে যা ডেঙ্গু হিসেবে ১৮২৮ সালে ব্যবহার শুরু হয়। ব্রেকহার্ট ফিভার এবং লা ডেঙ্গু একই ভাইরাসের ভিন্ন দুটি নাম। ডেঙ্গু শব্দের উৎপত্তি স্প্যানিস সোয়াহিলিÑ যার অর্থ ‘ডিঙ্গা’ হতে এসেছে। ডিঙ্গা অর্থ খুঁতখুঁতে বা সাবধানী, যা ডেঙ্গু জ্বরের হাড়ের ব্যথায় আক্রান্ত ব্যক্তির চলনকে বর্ণনা করে। অন্যদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রীতদাসদের মধ্যে যাদের ডেঙ্গু হতো। ডেঙ্গুর ফলে তাদের ভঙ্গিমা ও চলন ডান্ডি (নৌকা)-র মতো হয়ে যেত। এই অঞ্চলে এ রোগটি ডান্ডি জ্বর নামেও পরিচিত।
প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, ডেঙ্গু জ্বর রোগটি প্রথম ১৯৫২ সালে আফ্রিকাতে দেখা যায়। পরবর্তীতে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ যেমনÑ ভারত, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার এবং ইন্দোনেশিয়াতে এটি বিস্তার লাভ করে। বাংলাদেশে ২০০০ সালে প্রথম এডিসবাহিত ডেঙ্গু রোগীর সন্ধান পাওয়া যায়। এদেশের চিকিৎসকদের কাছে অপরিচিত এ রোগের চিকিৎসা দিতে সেবার হিমশিম অবস্থা হয়েছিল। সে-বছর মৃতের সংখ্যাও প্রায় শত ছুঁয়েছিল। পরের বছরগুলোতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেও সংখ্যা অনেক কমে আসে। ২০১৫ সালের পর ডেঙ্গু আবার বাড়তে থাকে। সে-বছর আক্রান্ত হন ২ হাজার ৬৭৭ জন। গত বছর ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বাড়ে। ইতিহাসে ডেঙ্গু মহামারীর প্রথম তথ্য জানা যায় চীনে। খ্রিষ্টপূর্ব ২৬৫-৪২০ অব্দে জিন সাম্রাজ্যের সময় এ রোগের প্রাদুর্ভাবের কথা জানা যায়।
বিংশ শতকের প্রথমভাগে ডেঙ্গু ভাইরাসের উৎস ও সংক্রমণ সম্পর্কে বিশদভাবে জানা যায়। এই ভাইরাস থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায়ও গবেষণায় উঠে এসেছে। মশক নিধনই বর্তমানে ডেঙ্গুর প্রতিরোধের প্রধান উপায়। সরাসরি ডেঙ্গু ভাইরাসকে লক্ষ্য করে ওষুধ উদ্ভাবন হয়নি। এ নিয়ে এখনও বিস্তর গবেষণা রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০টি অবহেলিত গ্রীষ্মম-লীয় রোগের অন্যতম একটি হিসেবে ডেঙ্গুকে চিহ্নিত করেছে।
সাধারণভাবে এই জ্বর উপসর্গবিহীন ৮০ শতাংশ, সাধারণ জ্বরের মতো সামান্য উপসর্গ ৫ শতাংশ। তবে জটিল এবং স্বল্প অনুপাতে এটি প্রাণঘাতীও বটে। রোগটিতে ইনকিউবিশন পিরিয়ড (উপসর্গসমূহের সূত্রপাত থেকে রোগের প্রাথমিক পর্যায়ের মধ্যবর্তী সময়) স্থায়ী হয় ৩-১৪ দিন; কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা হয় ৪-৭ দিন। ডেঙ্গু আক্রান্ত বাচ্চাদের সাধারণ সর্দি এবং গ্যাস্ট্রো এন্টারাটাইটিস (বমি ও ডায়রিয়া) দেখা দেয়। বড়দের চেয়ে ছোটদের উপসর্গের তীব্রতা কম হলেও জটিলতার শিকার বেশি হয়। পাশাপাশি মেরুদ- ও কোমরে ব্যথা হওয়া এ রোগের বিশেষ লক্ষণ। সংক্রমণের কোর্সকে ৩টি পর্যায়ে বিভক্ত করা যায়। যেমনÑ প্রাথমিক, প্রবল এবং আরোগ্য।
প্রাথমিক পর্যায়ে থাকে অত্যধিক জ্বর, প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি। সঙ্গে থাকে বিরতিহীন মাথাব্যথা। প্রাথমিক পর্যায়ে ৫০-৮০ শতাংশ উপসর্গে রোগীর শরীরে র‌্যাশ দেখা যায়। যা দু-তিন দিনের মাথায় লাল ফুসকুড়ি হিসেবে দেখা দেয়। কখনও কখনও হামের মতো র‌্যাশও দেখা দিতে পারে। জটিল পর্যায়ে মুখ ও নাকের মিউকাস মেমব্রেন থেকে অল্প রক্তপাতও হতে পারে।
রোগটির জটিল পর্যায়ে প্রচ- জ্বর হয়। যা সাধারণত এক থেকে দুদিন স্থায়ী হয়। বুকে এবং অ্যাবডোমিনাল ক্যাভিটিতে (বর্ধিত ক্যাপিলারি শোষণ ও লিকেজের কারণে) প্রচুর পরিমাণে তরল জমে। ফলে রক্তপ্রবাহে তরলের পরিমাণ কমে যায়। গুরুত্ব¡পূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে রক্ত সরবরাহ হ্রাস পায়। ফলে শরীরে বিকলতা এবং রক্তপাত হয়। চরম পর্যায়ে (৫ শতাংশেরও কম ক্ষেত্রে) শক (ডেঙ্গু শক সিনড্রোম) এবং হেমারেজ (ডেঙ্গু হেমারেজিক ফিভার) ঘটে। তবে সেকেন্ডারি ইনফেকশনে বিপদের মাত্রা অত্যধিক।
২০১৮ হতে বাংলাদেশ বিশ্বের নানা দেশে ডেঙ্গু জ্বরে নতুন একটি সমস্যা যোগ হয়েছে। ডেঙ্গুতে লিভার আক্রান্ত হওয়া। ফলে রোগী দুর্বল বোধ করে, খেতে পারে না, বমি হয়, লিভার ব্যথা করে। এটি সাধারণত জ্বর কমে যাওয়ার পর পর দেখা দেয় এবং পাঁচ-সাত দিনও থাকতে পারে।
ডেঙ্গু জ্বরের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। রোগের লক্ষণের ওপরই মূলত চিকিৎসানির্ভর করে। কখনও বাড়িতে ওরাল রিহাইড্রেশন থেরাপি; আবার কখনও বা হাসপাতালে ভর্তি করে ইন্ট্রাভেনাস থেরাপি বা ব্লাড ট্রান্সফিউশন করতে হয়। সাধারণত ইন্ট্রাভেনাস হাইড্রেশনের প্রয়োজন মাত্র এক-দুদিন হয়। তবে তা নির্ভর করে- urinary output
প্রসারের আয়তনিক বিশ্লেষণের ওপর। আগ্রাসী মেডিকেল পদ্ধতি, যেমনÑ ন্যাসোগ্যাস্ট্রিক ইন্টিউবেশন, ইন্ট্রামাসকুলার ইঞ্জেকশন এবং আর্টারিয়াল পাংচার এড়িয়ে চলতে হবে। প্রধান কারণ ডেঙ্গু ভাইরাস রক্ত জমাটকারী অনুচক্রিকা তৈরি হতে দেয় না। ফলে কারণ এতে রক্তপাতের সম্ভাবনা থাকে। জ্বর ও অস্বস্তি কমাতে শুধু প্যারাসিটামল (অ্যাসিটামিনোফেন) ব্যবহার করা যাবে। আর NSAID যেমন- আইবিউপ্রোফেন এবং অ্যাসপিরিন এড়িয়ে চলতে হবে। কারণ এগুলো রক্তপাতের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধী টিকা কয়েকটি দেশে অনুমোদিত হয়েছে। তবে এই টিকা শুধু একবার সংক্রমিত হয়েছে এমন ব্যক্তির ক্ষেত্রেই কার্যকর। মূলত এডিস মশার নিয়ন্ত্রণ ও কামড় এড়িয়ে চলাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রধান উপায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ৫টি মৌলিক একমুখী নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সুপারিশ করেছেÑ
১. প্রচার, সামাজিক সক্রিয়তা, জনস্বাস্থ্য সংগঠন ও সমুদয়সমূহকে শক্তিশালী করতে আইন প্রণয়ন;
২. স্বাস্থ্য ও অন্যান্য বিভাগসমূহের মধ্যে সহযোগিতা (সরকারি ও বেসরকারি);
৩. সম্পদের সর্বাধিক ব্যবহার করে রোগ নিয়ন্ত্রণে সুসংঘবদ্ধ প্রয়াস;
৪. যে কোনো হস্তক্ষেপ যাতে সঠিক লক্ষ্যবস্তুতে হয়, তা সুনিশ্চিত করতে প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং
৫. স্থানীয় অবস্থায় পর্যাপ্ত সাড়া পেতে সক্ষমতা বৃদ্ধি।
জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে ঘাতক মশা এডিস। মশা নয়; আসলে কয়েক প্রজাতির এডিস মশকী (স্ত্রী মশা) ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রধান বাহক। এদের দুটি প্রজাতি ‘Aedes aegypti, Aedes albopictus’ এই ভাইরাসের মূল বাহক। Aedes aegypti মেজর এবং Aedes albopictu মাইনর। চেনার উপায় হলো Aedes aegypti-এর ওপরের অংশে দুটি সাদা দাগ এবং Aedes albopictus-এ থাকে একটি সাদা দাগ। এদের পায়েও কালো এবং সাদা চিহ্ন রয়েছে। এদের জীবনচক্রে ডিম, লার্ভা, পিউপা, এডাল্ট বা পূর্ণবয়স্ক এই ৪টি পর্যায় রয়েছে। সম্পূর্ণ জীবনচক্র সম্পন্ন হতে ১৯-২৬ দিন সময় লাগে। এরা লার্ভা ও পিউপা অবস্থায় সাইফন নামক অঙ্গের মাধ্যমে শ্বাসকার্য চালায়। লার্ভা ও পিউপা অবস্থায় এরা যখন পানিতে থাকে তখন সাইফনটি পানিতে ভাসিয়ে রাখে এবং বাতাস হতে শ্বাসকার্য চালায়। পরিণত অবস্থায় স্ত্রী মশা মেরুদ-ী প্রাণীর, যেমনÑ স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি, সরীসৃপ, উভচর প্রাণী এবং এমন কী কিছু মাছের শরীর থেকে রক্ত শোষণ করে। তবে মানুষের আশপাশে এরা থাকতে পছন্দ করে। অর্থাৎ বাড়িঘরের কাছাকাছি এদের বাস। তাই এদের হাউস মসকিউটও বলা হয়। সক্রিয় থাকে কেবল দিনের বেলায় অর্থাৎ কামড় দেয়। প্রধানত সূর্যাস্তের দুই ঘণ্টা আগে এবং সূর্যোদয়ের দুই ঘণ্টা পর মানুষকে কামড়ায়।
১৯টি জায়গায় এডিস মশা বেশি বসবাস করে থাকে বলে জানিয়েছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের প্রধান কীটপতঙ্গ বিশেষজ্ঞ ভুপেন্দর নাগপাল। এগুলো হলোÑ পুরনো টায়ার, লন্ড্রি ট্যাংক, ঢাকনাবিহীন চৌবাচ্চা, ড্রাম বা ব্যারেল, অন্যান্য জলাধার, পোষা প্রাণীর পাত্র, নির্মাণাধীন ভবনের ব্লক, ফেলে রাখা বোতল ও টিনের ক্যান, গাছের ফোকর ও বাঁশ, দেয়ালে ঝুলে থাকা বোতল, পুরনো জুতা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত খেলনা, ছাদে, অঙ্কুরোদগম উদ্ভিদ, বাগান পরিচর্যার জিনিসপত্র, ইটের গর্ত ও অপরিচ্ছন্ন সুইমিংপুল। এডিস মশা খুব অল্প পানিতে (৫ মিলি বা এক চা-চামচ পানি) ডিম পাড়ে, যা পানি ছাড়াও প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে। ডিমের সংখ্যা ৬০ থেকে ১০০। তবে এক জায়গায় এরা সব ডিম পাড়ে না। অর্থাৎ এরা খুবই স্মার্ট, যাতে এক জায়গার ডিম নষ্ট হয়ে গেলে অন্তত অন্য জায়গার ডিম থেকে বাচ্চা রেব হয়। ডিম পাড়ার পর তা অন্তত এক বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকে। এই এক বছরের মধ্যে স্বচ্ছ পানি পেলে আর সেই পানি তিন দিনের অধিক থাকলে ওই ডিম থেকে এডিস মশার বিস্তার ঘটতে পারে। ডিম হতে লার্ভা বের হয় প্রায় দু-তিন দিন পর। এডিস মশাকে লাজুক মশা নাম দিলেও মন্দ হয় না। কারণ তাদের স্বভাবসুলভ আচরণ। দিনের আলোয় বের হয় না। লুকিয়ে থাকে সাধারণত টেবিল, খাট, চেয়ার, সোফাসহ বিভিন্ন ফার্নিচারের নিচে, ফাঁক-ফোকরে, জানালা-দরজার পর্দা বা ঝুলিয়ে রাখা জামা কাপড়ের আড়ালে, আলমারি, ওয়্যারড্রবের পিছনে, ঘরের কোনায়-কোনায়, যেখানে একটু অন্ধকার। এরা কখনোই ঘরের দেয়ালে বসে না।
ডেঙ্গু ভাইরাস বা ডেঙ্গি ভাইরাস (Dengue Virus) একটি মশাবাহিত এক সূত্রক বা আরএনএ (RNA) ভাইরাস। যাদের প্রত্যেকেই রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম। ভাইরাসটির একটি সেরোটাইপ সংক্রমণ করলে সেই সেরোটাইপের বিরুদ্ধে রোগী আজীবন প্রতিরোধী ক্ষমতা অর্জন করে; কিন্তু ভিন্ন সেরোটাইপের বিরুদ্ধে সাময়িক প্রতিরোধী ক্ষমতা অর্জন করে। পরবর্তীতে ভিন্ন সেরোটাইপের ডেঙ্গু ভাইরাস সংক্রমিত হলে রোগীর মারাত্মক জটিলতা দেখা দিতে পারে। কয়েক ধরনের টেস্টের মাধ্যমে ভাইরাসটি শনাক্ত করা যায়। আসলে ভাইরাসটি বা এর আরএনএ (RNA) প্রতিরোধী এন্টিবডির উপস্থিতি দেখেই ডেঙ্গু ভাইরাসটি শনাক্ত করা যায়। এই ভাইরাসের প্রাথমিক ধারক মানুষ; কিন্তু মানুষ ছাড়াও অন্য প্রাণীদের মাঝেও সংক্রামিত হয়। বাহক মশা একবার কামড়ালেই সংক্রমণ হতে পারে। প্রথমে স্ত্রী মশা ডেঙ্গু আক্রান্তর রক্তপান করে নিজে সংক্রমিত হয় ও পেটে ভাইরাস বহন করে। প্রায় ৮-১০ দিন পর ভাইরাস মশার দেহের অন্যান্য কোষে ছড়িয়ে দিতে পারে। যার মধ্যে আছে মশার লালাগ্রন্থি এবং শেষে এর লালায় চলে আসে। সারাজীবনের জন্য আক্রান্ত হলেও মশার ওপর এই ভাইরাসের কোনো ক্ষতিকারক প্রভাব পড়ে না। যখন একটা ভাইরাস বহনকারী ডেঙ্গু মশা একজন ব্যক্তিকে কামড়ায়, তখন ভাইরাসটি মশার লালার সঙ্গে চামড়ার মধ্যে প্রবেশ করে। চামড়ার মধ্যে রয়েছে ল্যাঞ্জারহান্স কোষ, যা ডেনড্রাইটিক কোষের সমষ্টি। এর কাজ রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণুকে শনাক্ত করা। আর ডেঙ্গু ভাইরাসটি সেই কোষেই বাসা বাঁধে। এরপর ভাইরাসটি ল্যাঞ্জারহান্স কোষে ভাইরাল প্রোটিন ও মেমব্রেন প্রোটিনের বন্ধন সৃষ্টির মাধ্যমে শ্বেতকণিকাতে প্রবেশ করে। এরপর সেখানে প্রজনন করে এবং যা সারাশরীরে ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত কোষকে রক্ষার জন্য সাথে সাথে শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়। অ্যান্টিবডি হলো দেহের সৈনিক। সঙ্গায়িত করলে দেহে বহিরাগত পদার্থের বা প্রতিরক্ষা-উদ্দীপকের (অ্যান্টিজেন) উপস্থিতির প্রত্যুত্তর হিসেবে দেহের প্রতিরক্ষাতন্ত্র কর্তৃক উৎপন্ন এক ধরনের ইংরেজি ওয়াই-আকৃতির (গুলতির মতো দেখতে) প্রতিরক্ষামূলক প্রোটিন জাতীয় পদার্থই হলো অ্যান্টিবডি। অ্যান্টিবডিগুলো প্রতিরক্ষা-উদ্দীপকগুলোকে শনাক্ত করে এবং এগুলোকে তাদের ওয়াই-আকৃতির বাহুদ্বয়ের অগ্রপ্রান্তগুলো মাধ্যমে আবদ্ধ করে দেহ থেকে বিতাড়ন করার চেষ্টা করে। অ্যান্টিবডিগুলো লক্ষ লক্ষ ধরনের হতে পারে। এগুলো দেহের লসিকাকোষ নামক এক ধরনের কোষে স্বাভাবিকভাবেই উৎপন্ন হয়। তবে সম্ভবত ডেঙ্গু ভাইরাসের এই পদ্ধতির গতি শ্লথ করে দেবার ক্ষমতা আছে। এরপরও অ্যান্টিবডি ভাইরাল প্রোটিনকে শক্তভাবে বেঁধে ফ্যাগোসাইটোসিস (বিশিষ্ট কোষ দ্বারা ভক্ষণ ও ধ্বংস) প্রক্রিয়ায় ধ্বংস করে। কিন্তু কিছু অ্যান্টিবডি ভাইরাসকে ভালোভাবে বাঁধে না এবং ভাইরাসকে ফ্যাগোসাইটের অংশে পরিণত করে ধ্বংস না করে আরও প্রতিরূপ বানাতে সক্ষম করে তোলে। আর তখনই ঘটে যত বিপত্তি। ভাইরাসের সংখ্যা যায় বেড়ে। ভাইরাসের সংখ্যা বৃদ্ধির ফলে রক্তনালীগুলোর রক্ষাকারী কোষ কাজ বন্ধ করা বা কাজ করার পরিবেশ পায় না। ঘটে রক্ত তঞ্চন-এর বিশৃঙ্খলা। রক্তনালী থেকে বুক ও পেটের গহ্বরে লিকেজ হয় আর কো-অ্যাগুলেশনে জটিলতা বাড়ে। অন্যান্য অঙ্গও ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। সংক্রামিত অঙ্গের কোষগুলো মারা যায়। এর ফলেই রক্তের অনুচক্রিকা ব্যাপক হারে কমে যায়। এ প্রক্রিয়া চলতে থাকলে রোগীর মৃত্যু অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।
ডেঙ্গু জ্বর, এডিস মশা, ডেঙ্গু ভাইরাস সম্পর্কে করণীয় কি একটু জেনে নেই। মার্চ এপ্রিল মাসে আমাদের দেশে বৃষ্টি শুরু হয়। আর এডিস মশার উৎসের অন্যতম একটি বৃষ্টির জমা পরিষ্কার পানি। প্রতিরোধক ব্যবস্থা তখন থেকেই নিতে হবে। আর এজন্যই সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ (সিডিসি) ইউনিট ২০১৯-এর মার্চ মাসেই রোগের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে সতর্ক করেছিল। জানুয়ারিতে তারা ঢাকা শহরে একটি জরিপ সম্পন্ন করে। যেখানে তারা শহরের বিভিন্ন স্থানে লার্ভা এবং প্রাপ্তবয়স্ক এডিস মশার উপস্থিতি দেখতে পায়। জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে, তারা উভয় সিটি কর্পোরেশনকে আগামী মাসগুলোতে প্রাদুর্ভাবের সম্ভাবনা সম্পর্কে সতর্ক করেছিল। তারা ভবিষ্যতের প্রকোপ হওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করে ফেব্রুয়ারি থেকে চিকিৎসক ও নার্সদের প্রশিক্ষণও দিয়েছে। তদুপরি জরিপ বলে চিকিৎসক ও নার্সরাও রেহাই পায়নি এই রোগের হাত হতে। তাহলে আমাদের রোগ নিয়ন্ত্রণে আরও সাবধান হতে হবে। গড়ে তুলতে হবে সচেতনতা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রচুর পরিমাণে ডেঙ্গু সচেতনতামূলক হেলথ বুলেটিন বের করছে। এগুলো স্কুল-কলেজ তথা দেশের প্রতিটি মানুষের হাতে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। জনগণকে জানাতে হবে এডিস মশা পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে। তাই বাড়ির ভিতর ও এর আশপাশের পানি জমা পাত্রগুলো চিহ্নিত করতে হবে। পানি ফেলে উল্টে রাখতে হবে। নিয়মিতভাবে সপ্তাহে অন্তত দুদিন পাত্রগুলো ঘষেমেজে পরিষ্কার করতে হবে। সিমেন্টের ট্যাংক, চৌবাচ্চা, ড্রাম, মটকা, পরিত্যক্ত টায়ার, ফুলের টব ও সরা বা ঢাকনা, প্লাস্টিক বা টিনের ফেলে দেওয়া পাত্র, ফুলদানি, ফ্রিজের নিচে পানি জমার পাত্র, ছাদে ফেলে রাখা পাত্র, ডাব বা নারিকেলের খোল ইত্যাদি যেখানে পানি জমতে পারে, তা নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। এলাকার নির্মাণাধীন বাড়ি ও এর আশপাশের পানি জমার স্থান বা পাত্রগুলো সবসময় ঢেকে রাখতে হবে। নিয়মিভাবে কমপক্ষে পাঁচ দিন পরপর পানি পরিষ্কার করতে হবে। কারণ এডিস মশার জীবনচক্রের সময় ১২-১৫ দিন। নির্মাণাধীন ভবনের প্রজননস্থল ধ্বংস করে প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত রোগের প্রাদুর্ভাব কমানো সম্ভব।
নির্মাণ শ্রমিক, গৃহপরিচারক বা পরিচারিকা, আবর্জনা পরিষ্কারকারী, নিরাপত্তাকর্মী সর্বোপরি পরিবারের সকল সদস্য এবং এলাকার বাসিন্দাদের এই কাজে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। রাতে মশারি টানাতে হবেই। রেহাই নেই দিনের বেলাও। দিনের বেলায় ঘুমানো বা বিশ্রাম নেওয়ার সময়ও মশারি ব্যবহার করতে হবে। ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে সবসময় মশারির ভিতর রাখতে হবে, যাতে কোনোভাবেই মশা কামড়াতে না পারে। তাছাড়া হালকা রঙের কাপড় পরিধান করতে হবে। শরীরের বেশির ভাগ অংশ যাতে ঢেকে থাকে, সে-ধরনের কাপড় বাছাই করতে হবে। মসকুইটো রিপেলেন্ট বা মশা নিবারক ক্রিম বা লোশন ব্যবহার করা যেতে পারে। ঘরের দরজা-জানালায় মশা প্রতিরোধক নেট ব্যবহার করতে হবে। এক কথায় ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধে সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মধ্যে ইনসেক্টিসাইডও ব্যবহার করতে হবে। প্রথমে এডিস মশার প্রজনন স্থান শনাক্ত করতে হবে। এরপর বিভিন্ন লার্ভিসাইড যেমনÑ টেমোফস, পারমেথরিন, টেট্রামেথরিন, ডেল্টামেথরিন, কেরোসিন, ডিজেল ইত্যাদি যে পানিতে লার্ভা থাকতে পারে সেখানে উপযুক্ত মাত্রায় প্রয়োগ করতে হবে। এই লার্ভিসাইড বাজারে যে নামে কিনতে পাওয়া যায়, তা হলোÑ টেমপার ৫০ ইসি, এমবোস, টেট্রামেথরিন, ডেসিস, জেট এ ওয়ান, ডিজেল। তবে গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে উপরিউক্ত ৬টি লার্ভিসাইডের মধ্যে অর্গানো ফসফেট লার্ভিসাইট ১.৫ মিলিলিটার/লিটার মাত্রা সবচেয়ে বেশি কার্যকর এবং এতে পরিবেশেরও তেমন কোনো ক্ষতি হবে না। যেহেতু আমরা মশার জীবনচক্র জানি তাই লার্ভা ধ্বংসের জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় সাত দিন পরপর লার্ভিসাইড স্প্রে করলেই হবে। আর পূর্ণাঙ্গ মশা মারার জন্য ফগিং সিস্টেমে নির্দিষ্ট জায়গায় পাঁচ-ছয় দিন পরপর স্প্রে করতে হবে। এমনটা যাতে না হয়, কয়েক সপ্তাহ মশা নিধনকর্মীর কোনো দেখা নেই। এরপর তথাকথিত ওপরমহলের চাপে দিন-রাত কোনো ব্রেক না দিয়েই লোকসম্মুখে ইচ্ছেমতো মশা মারার ঔষধ স্প্রে শুরু, যাতে বাদ পড়ে না হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীও। এতে ভেঙে পড়বে আমাদের ইকোসিস্টেম। কারণ অনেক উপকারী পোকা মারা যাবে। রেহাই পাবে না সৃষ্টির সেরা জীব মানুষও। কীটতত্ত্ব বিভাগ অন্যভাবেও চেষ্টা করছে মশা নিধনের। যেমন- জমা পানিতে গাপ্পি ((Poecilia reticulata)) বা copepods-এর চাষ করে, যা মশার লার্ভা খেয়ে ফেলে। Wolbachia প্রজাতির ব্যাক্টেরিয়া দ্বারা মশার বংশকে আক্রান্ত করানোর চেষ্টা চলছে তোড়জোড়ে।
বসে নেই চিকিৎসাবিজ্ঞানও। চলছে ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিরাময়ের প্রচেষ্টা। তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে ডেঙ্গু বিরুদ্ধে কার্যকরী ভ্যাকসিন এবং অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগ। ডেঙ্গু ভাইরাসের ৪টি সেরোটাইপের সবগুলোর মোকাবিলা করতে পারে- এমন ডেঙ্গু ভ্যাকসিনের ওপর অনেকগুলো প্রকল্প কাজ করছে। সবশেষে কাজ চলছে ভাইরাস ইন হিবিটর তৈরির। এই ইন হিবিটর ভাইরাসকে চামড়ায়ই প্রবেশ করতে দেবে না। সেদিন আর দূরে নেই- যখন আমরা ডেঙ্গু জ্বরকে প্রতিকার ও প্রতিরোধ দুইই করতে পারব।

লেখক : শিক্ষক, পিএইচডি গবেষক, উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরে বাংলা নগর, ঢাকা
raziasultana.sau52@gmail.com
কৃতজ্ঞতা : প্রফেসর ড. আব্দুল লতিফ, কীটতত্ত্ব বিভাগ, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরে বাংলা নগর, ঢাকা

Category:

সেই যে মধুর স্মৃতি

PM2জেসমিন আমিন: দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ, যাকে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হয়ে থাকে, সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়ে আমি ধন্য এবং অভিভূত হয়েছিলাম। এখানে শ্রদ্ধেয় মুনীর চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, মুহম্মদ আবদুল হাই, আহমেদ শরীফ, আনিসুজ্জামান, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, নীলিমা ইব্রাহীম, রফিকুল ইসলাম প্রমুখকে আমরা শিক্ষক রূপে পেয়েছি। এত বড় সৌভাগ্য ক’জনের হয়! এদের মধ্যে প্রথম তিনজনকে আমরা একাত্তরে হারিয়েছি।
পড়াশোনার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুদের সঙ্গেও বড় চমৎকার দিন কাটে। এখানে সতীর্থ হিসেবে পেয়েছি বেবী মওদুদ, কণা, মিনু, আলেয়া, সেলিমা, বেলিদের এবং শেখ হাসিনাকে, যিনি বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। কলেজেও আমরা সতীর্থ ছিলাম।
লম্বা ছিপছিপে গড়নের হাসি-খুশি প্রাণচঞ্চল সুশ্রী মেয়েটিকে ভালো লাগত। কৌতুকময় চঞ্চল চোখ, পিঠের ওপর লম্বা একটি বেণি, পোশাক-পরিচ্ছদে সাদাসিধা এবং সুরুচিসম্পন্ন। কলেজে পড়াকালীন সাদা সালোয়ার-কামিজেও দেখেছি সম্ভবত। সদালাপি মেয়েটি মজা করে কথা বলত। হাসাতে পারত।
সেই সময় শনিবার ১০টায় বলাকা সিনেমা হলে বাংলা ছবি হতো। আমাদের ক্লাসের মেয়েরা দল বেঁধে ছবি দেখতে যেতাম। আমি তো সবসময় ছবির পোকা ছিলাম। দেখা ছবি বলে যদি না যেতে চাইতাম, হাসিনার কথামতো কণা সবার কাছ থেকে একআনা করে চাঁদা উঠাত আমার টিকিটের দাম দেওয়ার জন্য। পনেরোআনার টিকিট দিয়ে দল বেঁধে রিয়ারস্টলে বসে সবাই হাসি-গল্পে মজা করে ছবি দেখতাম। আনন্দ করাটাই ছিল মুখ্য।
মনে হয়, ১৯৬৭ সালে ১৭ নভেম্বর শেখ হাসিনার ড. ওয়াজেদ সাহেবের সঙ্গে শুভবিবাহ সম্পন্ন হয়। সেই সময়ে বঙ্গবন্ধু জেলে ছিলেন। হাসিনার বিয়ের পরদিন জেলগেটে বাবার সাথে দেখ হয়। বিয়ের পরও হাসিনার সাজপোশাকে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরাবরের মতো সাদাসিধাই ছিল। তবে দু-হাতে স্বর্ণের চুড়ি পরত ও মাঝে মাঝে খুব হালকা রঙের শাড়ি।
একবার আমাকে নিয়ে নিউমার্কেটে গিয়ে টুকিটাকি সেরে বলাকা সিনেমা হলের পিছন দিকটায় (বর্তমানে গাউছিয়া) গিয়ে ব্যাংকে কাজ সেরে সম্ভবত ধানমন্ডির ২ নম্বর রোডে তার নিজের বাসায় নিয়ে গেল। সেখানে ওয়াজেদ সাহেব ছিলেন। আমরা একসাথে বসে ভাত খেলাম। ইলিশ মাঝের মাথা দিয়ে পুঁইশাক ছিল মেন্যুতে, মনে আছে।
PM3১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর আমাদের বন্ধু বেবী মওদুদের সঙ্গে হাসিনার ওখানে গিয়েছি। বঙ্গবন্ধুর স্মরণে মিলাদেও যেতাম বত্রিশ নম্বরের বাড়িতে। আমার স্বভাব একটু মুখচোরা গোছের। ছাত্র-জীবনে তার সঙ্গে প্রথমে তুই তুকারি সম্বোধন করলেও পরে তুমির দূরত্বে সরে যাই। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ওটাই রয়ে গিয়েছে।
সত্তরের মে মাসে আমার বিয়ের কার্ড দিতে গিয়েছিলাম বন্ধুদের। কার্ড হাতে নিয়ে বললÑ ‘যদি ভিপি আর জিএস’-এর ভোটটা দিয়ে যাস, তাহলে বিয়েতে যাব।’ সেদিন রোকেয়া হলে ছাত্র সংসদের ইলেকশন চলছিল। তুমুল হৈচৈ-ব্যস্ততা।
হাসিনা প্রকৃতিপ্রেমী। ওর কাছে গাছপালা খুব প্রিয়। খবরের কাগজে পড়েছিলাম একবার অনেকটা পায়ে হেঁটে একটা তমাল গাছ দেখতে গিয়েছিল টাঙ্গাইল অথবা মধুপুরের দিকে, ঠিক মনে নেই।
প্রথম গণভবনে যাওয়ার পর বেবী বলল, হাসিনা বনসাই খুব পছন্দ করে। খুব সুন্দর একটা বনসাই তাকে গিফট করলাম, যা পরে আমাকে দেখিয়েছে, ওটা ব্যালকনিতে লেখার টেবিলের সামনে রেখেছে। ওর ইচ্ছানুসারে রাজশাহী থেকে এক দক্ষ বনসাইবিদের সাহায্যে কুড়িটা বনসাই আনিয়ে দিলাম। আমার নিজের থেকেও দিলাম দুটি। ডালপালা বড় হয়ে গেলে মাঝে মাঝে গিয়ে ওগুলোর ডালপালা ছেঁটে দিতাম, অয়্যারিং করে দিতাম। বনসাই বিষয়ক একটি বই তাকে দিয়েছিলাম।
সেই সময় হাসিনার সঙ্গে বসে গল্প করতাম, চা-নাস্তা খেতাম। আমাকে গণভবনের চারপাশ ঘুরিয়ে দেখিয়েছে। গাছপালা, মাশরুম ঘর, পীচ ফল প্রভৃতির গাছ, কুর্চি ফুলের গাছ। আমার কুর্চি গাছটা মরে গিয়েছে শুনে টবসহ একটা গাছ আমাকে দিল। আমি খুব খুশি। দেখলাম মালি তমাল গাছের দু-পাশে বিস্তৃত সুন্দর ডালগুলো ছেঁটে ফেলেছে। ডালই তো এ গাছের সৌন্দর্য। এ-কথা শুনে মালিকে ডেকে বলে দিল। অ্যাসপারা গাছের বেডের কাছে নিয়ে গিয়ে কচি ডগা ভেঙে দিয়েছে। বলেছেÑ ‘খেয়ে দেখ ভালো লাগবে।’
আসলেই খেতে বেশ। আগে কখনও এই সবজিটা এভাবে খেয়ে দেখিনি। যখনই গিয়েছি, দিয়েছে। বর্তমানে সম্ভবত এই গাছের বেড এবং রক গার্ডেন সামনের বাগানে নেই।
তার ছেলে বউ নিয়ে দেশে এলে সুধাসদনে আমরা কয়েকজন বউ দেখতে গেলাম। বেবী মওদুদ, জাহানারা নিশি, হীরাফুলরা ছিল। হাসিনার জন্য বেশ কিছু অর্কিড প্ল্যান্ট নিয়ে গিয়েছিলাম।
লিখতে ভুলে গিয়েছি, ১৯৯৬ সালে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর গণভবনে আমাদের বাংলা বিভাগের সতীর্থদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। প্রায় সবাই গিয়েছি। আনন্দ করেছি।
প্রতি বছর পহেলা বৈশাখ ও ঈদের সময় নিয়মিত প্রধানমন্ত্রীর শুভেচ্ছা কার্ড পেয়ে থাকি। রমজানের সময় ইফতারির নিমন্ত্রণ থাকে। গণভবনে গেলে বন্ধু-বান্ধব, পরিচিতদের সঙ্গে দেখা হয়। হাসিনা ঘুরে ঘুরে হাসিমুখে কুশলবিনিময় করে সবার সঙ্গে।
একসময় কিছুটা ঘনিষ্ঠতা থাকলেও দিনে দিনে ওর ব্যস্ততা বেড়ে গিয়েছে অনেক বেশি। আমাদের যোগাযোগ সেতু বেবী মওদুদও আর বেঁচে নেই। কিন্তু পুরনো দিনগুলোকে মিস করি খুব।

লেখক : সতীর্থ

Category:

যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের নাগরিক শোকসভা

উত্তরণ ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেছেন, তার ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার কিছুই নেই। যতদিন বেঁচে আছি ততদিন জাতির পিতার সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে যাব। গত ৩ আগস্ট স্থানীয় সময় বিকালে লন্ডনের বিখ্যাত সেন্ট্রাল হলে অনুষ্ঠিত এক নাগরিক সভায় প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। ভাষণে তিনি আরও বলেন, আমার ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। যে আদর্শ নিয়ে জাতির পিতা দেশ স্বাধীন করেছিলেন, তার বাস্তবায়নই আমার একমাত্র লক্ষ্য। তিনি তার শেষ নিঃশ্বাস অবধি জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে যাবেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৪তম শাহাদাতবার্ষিকী এবং জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ এই নাগরিক সভার আয়োজন করে। সভায় যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন স্থানসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রবাসী বাংলাদেশিরা কালোব্যাজ ধারণ করে দলে দলে যোগদান করেন। হলরুম ভর্তি শ্রোতার পিনপতন নীরবতার মধ্যে শেখ হাসিনা তার ভাষণের শুরুতে ১৫ আগস্ট নৃশংস হত্যাকা-ের শিকার মা-বাবা-ভাই এবং তাদের স্ত্রীসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের স্মরণ করেন ও এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এ সময় তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভূমিকার কথা স্মরণ করেন এবং বিভিন্ন গণ-আন্দোলনে তাদের ভূমিকারও প্রশংসা করেন। তিনি বাংলাদেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য দেশে প্রবাসীদের আরও বিনিয়োগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের শিল্পায়নে এবং জনগণের কর্মসংস্থানের জন্য আমরা দেশব্যাপী ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলছি। দেশের বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের সুযোগ নিয়ে আপনারাও এখানে বিভিন্ন মিল, ফ্যাক্টরি গড়ে তুলতে পারেন।
দেশের কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে তার সরকারের উন্নয়নের উল্লেখযোগ্য চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা বজায় থাকাতেই দেশ আজকে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতার খুনিদের শাস্তি না দিয়ে জিয়াউর রহমান তখন খুনিদের পুরস্কৃত করেন। ইনডেমনিটি অর্ডিন্যান্স জারি করে খুনিদের শুধু দায়মুক্তিই দেননি উপরন্তু বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের কথা স্মরণ করে বলেন, তাকে এবং তার বোন শেখ রেহানাকে ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর শাসকরা আর দেশে ফিরতে দেয়নি। বিদেশে নির্বাসিত জীবনযাপনের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর জোর করে দেশে ফিরলেও একের পর এক তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজিদুর রহমানের সঞ্চালনায় বিশিষ্ট সাংবাদিক কলামিস্ট আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন এবং যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি সুলতান মাহমুদ শরিফ এতে সভাপতিত্ব করেন। আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী মুহম্মদ ফারুক খান এমপি এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম এমপি মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।

Category: