Blog Archives

আগামী এক বছরে মাথাপিছু আয় হবে ২ হাজার ডলার

Posted on by 0 comment

‘ভিক্ষা চেয়ে নয়, দেশের নিজস্ব সম্পদ নিয়ে আমরা এগিয়ে যাব। কারণ আমাদের দেশের সম্পদ জনগণ আর দেশের মাটি হচ্ছে উর্বর। আমরা দেশের যে উন্নতি করতে পারি তা আজ প্রমাণিত। আগামী এক বছরে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ২ হাজার মার্কিন ডলারে উন্নীত করতে পারব বলে আমরা আশাবাদী’

PMf উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতার এক দশকে বাংলাদেশ উন্নয়নের মহীসোপানে যাত্রা শুরু করেছে। দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, আমরা দেশকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাব। দেশের যে অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে, তা আরও এগিয়ে নিয়ে যাব। দেশকে আরও সমৃদ্ধশালী করব। ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী, ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী আমরা পালন করব ভিক্ষুকমুক্ত, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে। ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে উন্নত-সমৃদ্ধশালী দেশ।
সম্প্রতি সামাজিক অপরাধ বৃদ্ধি ও শিশুদের ওপর পাশবিক অত্যাচারের বিরুদ্ধে আবারও কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রয়োজনে বিদ্যমান আইনকে আরও কঠোর করা হবে, জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর কেউ সাহস না পায়। এ ব্যাপারে গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করে তিনি বলেন, ধর্ষকদের চেহারা যেন বারবার দেখানো ও প্রকাশ করা হয়। যাতে এই জঘন্য অপরাধীরা লজ্জা পায়। পাশাপাশি পুরুষ সমাজকেও ধর্ষকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নারীরা কেন একা প্রতিবাদ করবে। এ বিষয়ে পুরুষদেরও সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন।
স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে গত ১১ জুলাই রাতে একাদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তৃতায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়কণ্ঠে বলেন, রাজনীতি করি দেশ ও দেশের মানুষের জন্য। দেশের সম্পদ বিক্রি করে ক্ষমতায় আসতে হবে সেই রাজনীতি আমি করি না। আমার প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে দেশের উন্নতি ও দেশের মানুষের কল্যাণ। দেশের মানুষকে একটু সুন্দর জীবন দেয়াই আমার প্রধান লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রীর সমাপনী বক্তব্য শেষে স্পিকার রাষ্ট্রপতির আদেশ পাঠ করে সংসদ অধিবেশনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় আসে তখনই দেশের উন্নয়ন হয়। আওয়ামী লীগের ক্ষমতার গত এক দশকে বাংলাদেশ উন্নয়নের মহীসোপানে যাত্রা শুরু করেছে। সারাবিশ্বেই এখন বাংলাদেশ উন্নয়নের রোলমডেল। তিনি বলেন, দেশের আরও উন্নতি করতে হলে দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। এবারের বাজেটে আমরা প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ২ ভাগে উন্নীত করতে পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। কারণ আমরা দেশকে উন্নয়নের পথে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু বাংলাদেশে নয়, আন্তর্জাতিক বিশ্বেও আজ প্রমাণিত উন্নয়নে বাংলাদেশ দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা এখন বিশাল বাজেট নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন করছি। বাজেটের বৈদেশিক সাহায্যের পরিমাণ মাত্র শূন্য দশমিক ৮ ভাগ। আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি মানুষের কল্যাণের জন্য। ভিক্ষা চেয়ে নয়, দেশের নিজস্ব সম্পদ নিয়ে আমরা এগিয়ে যাব। কারণ আমাদের দেশের সম্পদ জনগণ আর দেশের মাটি হচ্ছে উর্বর। আমরা দেশের যে উন্নতি করতে পারি তা আজ প্রমাণিত। আগামী এক বছরে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ২ হাজার মার্কিন ডলারে উন্নীত করতে পারব বলে আমরা আশাবাদী।
দেশের উন্নয়ন ও সফলতার বিবরণ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মূল্যস্ফীতি আমরা ৪ দশমিক ৯ ভাগে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছি। সবার জন্য খাদ্য নিরাপত্তা আমরা নিশ্চিত করেছি, দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। দেশের মানুষের পুষ্টিও নিশ্চিত করেছি বলেই পুরুষের গড় আয়ু ৭২ দশমিক ৮ ভাগ এবং নারীর গড় আয়ু ৭৩ বছরে উন্নীত হয়েছে। খাদ্য ভেজালের কথা বলা হয়, অথচ মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। রপ্তানি আয় অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
PMf2সংসদ নেতা বলেন, আমাদের সরকার প্রতিটি গ্রামকে শহরে পরিণত করতে চায়। আকাশ, রেল, নৌপথ, সড়কপথ সবক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে তা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। গত ১০ বছরে আমরা ১০ হাজার চিকিৎসককে নিয়োগ দিয়েছি। নার্সদের শিক্ষার মানও বৃদ্ধি করেছি।
চাকরিতে বয়সের সীমা বাড়ানোর প্রস্তাব কার্যত নাকচ করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন আগের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অস্ত্রের ঝনঝনানি নেই। শিক্ষার কার্যকর পরিবেশ রয়েছে। ৩টি বিসিএস পরীক্ষার ফলের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ২৩ থেকে ২৫ বছর বয়সী পরীক্ষার্থীদের পাসের হার ৪০ দশমিক ৬০ ভাগ, ২৫-২৭ বছর বয়সীদের পাসের হার ৩০ দশমিক ২৯ ভাগ, ২৭-২৯ বছর বয়সীদের পাসের হার ১৩ দশমিক ১৭ ভাগ এবং ২৯ বছরের বেশি বয়সীদের পাসের হার মাত্র ৩ দশমিক ৪৫ ভাগ। এক্ষেত্রে চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ বছর করা হলে ঘর-সংসার সামলিয়ে আদৌ পরীক্ষায় পাস করতে পারবে কি না, তাতে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আর নিয়মিত পড়াশোনা করলে এখন ২৩ বছরের মধ্যে মাস্টার্স পাস করা যায়। সেক্ষেত্রে ২৩ থেকে ৩০ বছর পর্যন্ত চাকরিতে প্রবেশের সময় থাকে। এরা প্রতিটি বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে, যা বিশ্বের কোথাও এমন সুযোগ দেয়া হয় না।

Category:

এই সেই ১৫ আগস্ট ’৭৫

Posted on by 0 comment

PMf সরদার ফজুলুল করিম : ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই মর্মান্তিক হত্যাকা-। সেদিনের সেই ঘটনায় আমার ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা কয়টি আজ আবার বলতে ইচ্ছা হচ্ছে নিজের রোজনামচায় নিজের আবেগময় অনুভূতির কথা।
রোজনামচাটির শিরোনাম ছিলÑ ‘মহাত্মা গান্ধী, শেখ মুজিবুর রহমান এবং ইন্দিরা গান্ধী’। সেই শিরোনামটিকে সামনে রেখে লিখেছিলাম :
মহাত্মা গান্ধী, শেখ মুজিবুর রহমান এবং ইন্দিরা গান্ধী : এই যে এদের এমনভাবে কাতারবন্ধি করা হয়েছে এর দান-অবদান আমার নয়। আসলে এমনভাবে এরা কাতারবন্দি হবেনÑ এ কথা আমি কল্পনাও করতে পারিনি। এদের এভাবে কাতারবন্দি দেখে আমার মনটা আলোড়িত হয়ে ওঠে।
বয়সের বিধানেই বোধহয় এখন আমার যখন তখন চোখে পানি আসে, গলা ধরে যায়। কারুর কাছ থেকে একটা ভালো কথা, আশার কথা, অনুপ্রেরণার কথা কিংবা বেদনার কথা শুনলেই চোখে গলায় আবেগের সৃষ্টি হয়। তখন সেই মুহূর্তে আর পরিষ্কার করে বাক্য উচ্চারণ করতে পারিনে।
অথচ সচেতন বুদ্ধি দিয়ে বলি, আমি এ তিনজনের কারুরই অন্ধ ভক্ত কোনোদিন ছিলাম না। এটা কোনো বাহাদুরির কথা নয়। এদের তিনজনের কার্যকলাপকেই আমি নিজের জীবনে নিজের চোখে কিছুটা দেখেছি, নিজের কানে শুনেছি এবং বইপত্র পড়েছি। বলা চলে কিছুটা বিরুদ্ধভাবের পর্যালোচনামূলক মনোভাব।
গান্ধীজিকে হত্যা করা হয়েছে। শেখ মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যা পশুতে করেনি। হত্যা মানুষেই করেছে। আমরা অবশ্য আমাদের অপছন্দের মানুষকে অনেক সময় পশুর সঙ্গে তুলনা করি। বলি : ওটা পশু। ও পশুর মতো আচরণ করেছে। অথচ এমন তুলনা অর্থহীন। মানুষ নিজের চরিত্রহীনতাকে পশুর ওপর আরোপ করতে চায়। অহেতুক, অযৌক্তিক এবং অপাশবিক আচরণের সাক্ষাৎ পাওয়া যায় না। মানুষের মধ্যেই দেখা যায় অমানবিক আচরণ। অমানবিক এ কারণে যে, এমন আচরণ যে প্রজাতি হিসেবে মানবগোষ্ঠীর জন্য আত্মহত্যামূলক, এই কথাটা এই মানুষরা বুঝতে পারে না।
গান্ধীজিকে কে হত্যা করেছিল? সে নামের উচ্চারণ বা অনুচ্চারণে কিছু আসে-যায় না। সে গডসে কিংবা নিডসে, তাতেও কিছু পার্থক্য হয় না। সে মানুষ। গান্ধীজি মানুষ ছিলেন। গডসেও মানুষ। গান্ধীজি জীবনব্যাপী নানা আচরণে নিজেকে প্রকাশ করেছেন। রাজনীতি, অর্থনীতি বা সমাজনীতি, যে ক্ষেত্রের কথাই বলি না কেন, গান্ধীজির আচরণের মধ্যে তার আদর্শ প্রকাশিত হয়েছে। তার এই সব আদর্শকে কি আমি বা আমরা সব সময় সমর্থন করেছি? তা নয়। সেই ’৪৫, ’৪৬, ’৪৭ সালে নানা ব্যক্তি, দল-উপদল নানাভাবে গান্ধীজিকে ব্যাখ্যা করেছে। সমালোচনা করেছে। আবার অসংখ্য তার অনুসারীও ছিল। তার সহযোগী সাথীরা ছিলেন। তারা সব সমাজনীতি বা ধর্মীয় PMf2নীতিকে আমি সমালোচনা করতে পারি। আমরা করেছিও। কিন্তু একটা মৌলিক সত্যকে তিনি তার আচরণ দ্বারা প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন : মানুষকে মানুষের সঙ্গেই বাস করতে হবে। তাদের পারস্পরিক বৈষম্য এবং বিভেদকে দূর করতে হবে। মানুষের ওপর মানুষের নির্যাতনের অবসান আবশ্যক। আমাদের মতপার্থক্য ছিল তার উপায়ের ক্ষেত্রে। কিন্তু তার লক্ষ্যের ক্ষেত্রে নয়। কিন্তু গান্ধীজিকে যারা হত্যা করেছে তাদের আচরণে তাদের কি আদর্শের প্রকাশ ঘটেছে? যা ঘটেছে সেটা এই যে, মানুষ মানুষের সঙ্গে বাস করতে পারে না এবং কারুর যদি অপর কাউকে অপছন্দ হয় তা হলে তাকে অবিলম্বে হত্যা করতে হবে। গান্ধীজির হত্যাকারীরা অদূরদৃষ্টির লোক। তারা অর্বাচীন। আসলে তারা বোঝেনি : গান্ধীজিকে হত্যা করে তারা মানুষ হিসেবে নিজেদের অস্তিত্বকেই হত্যা করেছে। কারণ, তোমার যদি হত্যা করার অধিকার থাকে, অপরকে তাহলে অপরেরও অধিকার আছে তোমাকে হত্যা করার। এমন পারস্পরিক হত্যার ফলে পরিশেষে কাউকে হত্যা করার কিংবা কেউ নিহত হওয়ারই অবশিষ্ট কোনো মানবপ্রাণী থাকে না। এই কথাটি এই অর্বাচীনরা বুঝতে পারেনি। এখানেই গান্ধীজিকে হত্যা করা অমানবিক। এটা পাশবিক নয়। পশুরা অপর এমন কোনো নিরীহ পশুকে হত্যা করে না। গান্ধীজি যখন মানুষের হত্যার আঘাতেই ঢলে পড়লেন তখন তার মুখ দিয়ে কোনো অভিযোগ বাণী উচ্চারিত হয়নি। তিনি নাকি কেবল বলেছিলেনÑ হে ঈশ্বর! হা রাম! সে উচ্চারণে বিস্ময়ের বেদনা থাকতে পারে, এতদিনের তার ভালোবাসার, তার প্রেমের এই প্রতিদানের জন্য বিস্ময় বা বেদনা। কিন্তু অভিশাপ ছিল না। সে উচ্চারণে প্রকাশিত হয়েছিল অধিকতরভাবে এই বিশ্বাস : মানুষের সমাজকে রূপান্তরের পথ অনেক দীর্ঘ। তাকে সহজ ভাবাই ভুল। শেখ মুজিবকে যখন সে রাতে ঘেরাও করে অস্ত্রধারীরা হত্যা করল তখন সাহসী শেখ মুজিব ভীত হলেন না। যারা তাকে গুলি করল, তাদের তিনি চেনেন। তার মুখেও উচ্চারিত হয়েছিল বিস্ময়ের ধ্বনি : তোরা কি করছিস! এই কথা বলেই নিজের ঘরের সিঁড়ির ওপর তিনি গড়িয়ে পড়েছিলেন। হত্যাকারীরা তাকে স্তব্ধ করে দেবার জন্য নিশ্চয়ই আরও গুলি ছুড়েছিল। গুলিবিদ্ধ সে দেহকে দেশবাসী কেউ দেখতে পারেনি। যারা দেখেছিল তাদের কেউ যদি এখনও বেঁচে থাকে হয়তো তারা বলতে পারে, কটা বুলেট সে দেহে বিদ্ধ হয়েছিল, কেমন করে সেই দীর্ঘদেহী ফরিদপুরের এককালের গ্রামের যুবকটি ঢলে পড়েছিল।
’৭৫-এর ১৪ আগস্ট রাতে আমিও চিন্তা করেছিলাম ১৫ আগস্টের কথা। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বেশ কিছুটা উত্তেজনা বিরাজ করছে। শেখ মুজিব আসবেন ইউনিভার্সিটিতে। তিনি কোন কোন পথ দিয়ে যাবেন, কোন বিভাগ থেকে যাবেন কোন বিভাগে, উপাচার্য তাকে কীভাবে সংবর্ধনা জানাবেনÑ ইত্যাদি কর্মসূচি প্রচার করা হয়েছিল। দেশে তখন বেশ কিছুটা রাজনৈতিক উত্তপ্ত অবস্থা। আমি নিরীহ শিক্ষক। কেবল দুই চোখ দিয়ে দেখার চেষ্টা করি। ঘটনা থেকে ঘটনার চমকে চমকিত হই। নিজের ক্ষুদ্র জীবনকে ধন্য মানি। কত ঘটনা দেখলাম। পঞ্চাশ বছর আগেও আমার পূর্বোক্তগণ এত দ্রুত সব ঘটনার সাক্ষাৎ পেতে পারতেন না। ঘটনাই তো জীবন। যত ঘটনা তত সেই জীবনের চঞ্চলতা। ’৭১-এর ঘটনা শুধু দেখলাম না, ’৭১-এর পরে ২৫ মার্চ থেকে নিহত হলাম। মৃত্যুর পরে বাঁচা বলে যদি কিছু থাকে, তবে ’৭১-এর পরে মৃত্যুর পর বাঁচার সেই বোধ হলো। তাতে একটা লাভ আমাদের এই হলো যে, মৃত্যুর ভয়টা একেবারে চলে গেল। মৃত্যুর পর মরার আর কি ভয় থাকে? এবং সে জন্যই বোধ হয় ’৭১-এর পশ্চাৎকালে আমরা যেমন মারতে ভয় পাইনে, তেমনি মরতেও ভয় পাইনে। আমাদের ইতিহাসে কোনো যুগে এত মানুষ কি মানুষকে মেরেছে এবং এত মানুষ মরেছে এবং এখনও চিন্তা করলে কৌতুকের এই বোধটা আসে যে, মৃত্যুর জন্য যদি ভয় না থাকে তবে মরণের আর তাৎপর্য কি রইল? আমরা আগে মানুষকে ভয় দেখাতাম, তোমাকে মেরে ফেলব। অর্থাৎ তুমি ভয় পাও। ভয় পেয়ে আমার অকাম্য কাজ থেকে তুমি নিবৃত্ত হও। কিন্তু আমার উদিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিরা যখন যথার্থই বলে, মৃত্যুকে আমি ভয় পাইনে, তখন তাকে মারের ভয় দেখিয়েও যেমন কোনো লাভ হয় না, তেমনি তাকে মেরে ফেলেও না। কারণ মেরে ফেলে তো কোনো সমস্যার সমাধান করা যায় না।
কথাটি কেবল আমরা হত্যাকারীরা বুঝিনে। মেরে ফেলে কোনো সামাজিক-রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হয় না। সামাজিক-রাজনৈতিক সমস্যার সমাধানের পথ হচ্ছে দীর্ঘ বিবর্তনের পথ। মুক্ত মোকাবিলার পথ। যুক্তির সঙ্গে প্রযুক্তির লড়াইয়ের পথ। এ পথের কোনো বিকল্প নেই।
আমার মাঝে মাঝে মনে হয় এই যে আমার অর্বাচীনের মতো মাথা কাটার পথ নিয়েছি, এ আমরা শিখেছি পাতা কাটা থেকে। আমাদের ছেলেরা পরীক্ষার সময় বইয়ের পাতা কেটে নিয়ে যায়। পরিশ্রম করে পড়বে না। সহজে ব্লেড দিয়ে পাতা কাটবে। তাই ঢাকা ইউনিভার্সিটির গ্রন্থাগারের প্রায় বইয়েরই পাতা কাটা। এখানের দশ পাতা, ওখানে বিশ পাতা। অথচ পাতা কেটে কি জ্ঞান অর্জন করা যায়? না, তা যায় না। অবশ্য এমন ভারি কথা বললে রাস্তাঘাটের এমনকি ক্লাসঘরের যুবকরা বলে : রাখেন স্যার আপনার দর্শনের কথা। জ্ঞান কি আমরা ধুয়ে খাব? পাস হচ্ছে আসল। আমাদের পাস করতে হবে। ‘বাই হক আর বাই ক্রুক।’ যেমন করে হোক, পাতা কেটে, খাতা চুরি করে, মাস্টার মেরে : যে করেই হোক। কথাটার জোর আছে। পরীক্ষার পাস করতে হবে। কিন্তু আমার প্রশ্ন : পরীক্ষা পাস করেই বা কি হবে? এবং তুমি দর্শন বল, আর বড় কথা বল সত্য তো এই যেসব পরীক্ষা নিয়েই তোমার, আমার এবং দেশের জীবনের পরীক্ষা। সে পরীক্ষাতে পাতা কাটা, শটকাট বা ‘মইডইজি’র তো কোনো জায়গা নেই।
১৫ আগস্ট ভোর রাতেই কিছু গুলির শব্দ শুনেছিলাম। ভোরের দিকে একটা মাইকের আওয়াজ : ‘খুনি মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে। খুনি মুজিব কথাটাতে তত চমক লাগেনি। খুন  করতে গেলে উদ্দিষ্ট ব্যক্তিকে খুনি বলতে হয়। তবে অনেককাল আগের একজন জ্ঞানী বলেছিলেন : খুনি কেবল এই কথাটি খেয়াল করে না, খুনিকে যে খুন করে সেও একজন খুনি।’ আমি চমকিত হয়েছিলাম, ‘মুজিবকে হত্যা করা হয়েছে’Ñ এই আওয়াজটাতে। আর যে কিছুর জন্যই সেদিন তৈরি থাকি না কেন, এই চমকটির জন্য নয়। আওয়াজ শুনে ভয়ে ঘরের দরজা-জানালা একটু বন্ধ করে দিয়েছিলাম। পরে একটু আলো ফুটতে ভয়ে ভয়ে ঘরের পুবের জানালাটা একটু ফাঁক করেছিলাম। এই জানালা দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের মূল চত্বরটি দেখা যায়। আতঙ্কিত মনে চাইলাম সেই চত্বরটির দিকে। একেবারে জনশূন্য। হয়তো সকাল ছ’টা কিংবা সাড়ে ছ’টা। দেখলাম, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা উড়িয়ে একটি কালো রঙের গাড়ি নিউমার্কেট-নীলক্ষেতের রাস্তার পশ্চিম দিক থেকে এলো, কলা ভবনের দালানটিকে হাতের ডানে রেখে উত্তর মুখে ঘুরল, কোথাও গেল, হয়তো পরিস্থিতিটা পর্যবেক্ষণ করল। আবার কয়েক মিনিট পর গাড়িটা ফিরে এই পথ দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। এও আমার সেদিনের অভিজ্ঞতার আর এক চমক।
আমি একটু-আধটু শ্রেণিগত বিশ্লেষণের চেষ্টা করি। অপর কারুর জন্য নয়। নিজে বোঝার জন্য। ‘ব্যাপারটি কি’Ñ এই ধরনের আত্মপ্রশ্নের আত্মজবাব হিসেবে। শ্রেণিগত বিশ্লেষণ একেবারে নিরর্থক নয়। আসলে কোনো ব্যক্তিই তো পরিবেশ-বিচ্ছিন্ন কোনো অস্তিত্ব নয়। একজন ব্যক্তি হয় বড়লোক, নয় গরিব। নয়তো মাঝামাঝি এই বড়লোক, গরিব আর মাঝামাঝিÑ এ তো কেবল তার সম্পদের পরিমাণের ভিত্তিতে নয়। তার সম্পদ তো আহরিত হয় কোনো মাধ্যম, কোনো ব্যবস্থায়। এবং সেই মাধ্যম বা ব্যবস্থাই হচ্ছে বিশেষ বিশেষ অর্থনৈতিক কর্মকা-। একেই একটু তাত্ত্বিকভাবে বলা হয় ব্যক্তির শ্রেণিগত অবস্থান। এবং অর্থনৈতিক এই শ্রেণিগুলোর মধ্যে সম্পদ বা সুযোগের তারতম্যের কারণে বিরোধ বিদ্যমান। মানুষের স্বাভাবিক জীবন-বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে সুবিধা-বঞ্চিতরা সুবিধাভোগীদের বিরুদ্ধে লড়াই করে। সুবিধাভোগীরা সে লড়াইকে প্রতিরোধ করতে চায়। তাদের সুবিধাকে অব্যাহত রাখতে এবং বর্ধমান করতে চায়। আসলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাম্য-অসাম্যÑ তথা এর মধ্যকার দ্বন্দ্ব মানুষের সমাজের অন্যতম চালকশক্তি। কিন্তু এ তত্ত্বের আলোচনাও আমার উদ্দেশ্য নয়।
আমার অনুভব হচ্ছে, ব্যক্তিশ্রেণি ঊর্ধ্ব কোনো অস্তিত্ব নয়। প্রত্যেক ব্যক্তিরই শ্রেণিগত একটা অবস্থান আছে। গান্ধীজির ছিল। শেখ মুজিবের ছিল। ইন্দিরা গান্ধীর ছিল। সেই অবস্থান থেকে তারা আচরণ করেছেন। তাদের বিশ্বাসের প্রকাশ ঘটিয়েছেন। সে চিন্তার সাথে অপরের বিরোধ থাকতে পারে। গান্ধীজির রাজনৈতিক বা ধর্মীয় নীতিকে আমি অসমর্থন করতে পারি। আমার, তথা তার বিপরীত পক্ষের যদি কোনো নির্দিষ্ট নীতি থাকে তবে গান্ধীজির যুক্তির বিরুদ্ধে পাল্টা যুক্তি দিয়ে জনসাধারণকে বোঝাতে হবে। গান্ধীজির পক্ষে যদি জনমত প্রবল থাকে, বিপরীত পক্ষকে তার নিজের যুক্তির জোর এবং কর্মের ব্যাপকতা ও গভীরতা দিয়ে সেই জনমতকে পরিবর্তিত করে নিজের দিকে নিয়ে আসতে হবে। অবশ্যই ব্যাপারটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ব্যাপার। গান্ধীজির নিজের জীবনই এর উত্তর দৃষ্টান্ত। এ প্রক্রিয়ায় অধৈর্য হয়ে গান্ধীজির মাথাটি কেটে ফেলে প্রক্রিয়ার পথটিকে হ্রাস করা যাবে না, যায় না। শেখ মুজিবের একটা শ্রেণিগত অবস্থান ছিল। তার রাষ্ট্রনৈতিক পদ, দায়িত্ব এবং ক্ষমতা ছিল। তার কর্মকা-ে, চিন্তা-ভাবনায় পদক্ষেপের বাস্তবতা কিংবা অবাস্তবতায়, চিন্তার গভীরতা কিংবা অগভীরতায়, সমস্যার মোকাবিলায় পারদর্শিতা কিংবা অপারদর্শিতায় মূলত তার শ্রেণিগত শক্তি এবং সীমাবদ্ধতা নিশ্চয়ই প্রকাশিত হয়েছে। তুমি বা তোমরা, যারা তার বিপরীত পক্ষ, যারা তার হত্যাকারী এবং তার হত্যায় ক্ষণকালের আনন্দ-উচ্ছ্বাসে উদ্বেলিত, তোমাদেরও একটি শ্রেণিগত অবস্থান আছে। তোমাদের এমন আচরণেও তোমাদের শ্রেণিগত চরিত্রেরই প্রকাশ ঘটেছে। তোমার মূল অবিবেচনা এখানে, যদি তোমাদের কোনো আদর্শ থেকে থাকে, রাজনৈতিক বা সামাজিক, তবে তাকে অর্জন করার পথ শেখ মুজিব বা তোমার প্রতিপক্ষকে হত্যা করা নয়। অবশ্য আগে উল্লেখ করেছি যে, জ্ঞানীর কথা, তার উক্তিই খাঁটি। তুমি যদি শেখ মুজিবকে ‘খুনি’ বলে খুন করে থাক তবে তুমিও খুনি। ব্যক্তিগতভাবে কাউকে খুন করা সাংঘাতিক কোনো কঠিন ব্যাপারও নয়। ছুরি দিয়ে খুন করা যায়। লাঠি দিয়ে খুন করা যায়। স্টেনগান-ব্রেনগান দিয়ে খুন করা যায়। কঠিন হচ্ছে  আদর্শগতভাবে খুন করা। শেখ মুজিবের ওপর এবং তার স্ত্রীর ওপর এবং তার ছোট ছেলে রাসেলের ওপর স্টেনগানের ব্রাশফায়ার করে খুনিরা মনে করল, সাংঘাতিক সাহসী কাজ তারা করেছে। সশস্ত্র কাপুরুষের দল গোপন আক্রমণে শেখ মুজিব এবং তার পরিবার-পরিজনকে খুন করল।
ফরিদপুরের কৃষকের সন্তান শেখ মুজিবের এই একটা গুণ ছিল যে, সে জানের পরোয়া করত না। এই গুণটা আমাদের ক’জনার থাকে? মরতে হবে, তবু আমরা মৃত্যুর ভয় করি। কিন্তু শেখ মুজিব জন্মগতভাবেই বোধহয় একটু একরোখা ছিলেন, গোঁয়ার ছিলেন। কৃষকের সন্তানের সারল্য থেকে তিনি হয়তো এই বোধটি পেয়েছিলেন : মরছি তো আমরা হরহামেশা, নিত্যমুহূর্তে। তবে আর মৃত্যুর ভয় কী? এমন বোধ থেকেই সাত মার্চে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখো মানুষের জমায়েতে শেখ মুজিব বলেছিলেন : ‘রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব বাংলাকে স্বাধীন করে ছাড়ব।’
সত্যি, লোকটির কথায় যেমন গেঁয়োমি ছিল, তেমনি জোর ছিল। শেখ মুজিব আমাদের প্রিয় এই কারণে যে, শেখ মুজিব আমাদের পরিচিত ছিলেন। বিদেশি নন। অপরিচিত নন। অনাত্মীয় নন। তার বাড়ি আর আমাদের বাড়ির মধ্যে মাইলের দূরত্বও যেমন বেশি ছিল না। এক দেশের লোক। পাশাপাশি জেলার লোক। আত্মীয়তাই ছিল কি না? এবং এদিক থেকে আমি এবং আমরা বলতে পারতাম : ‘আমাদের শেখ মুজিব’।
’৭১ সালের শেষের দিকে যখন আমাকে পাকবাহিনী ধরে নিয়ে গিয়ে আটক রাখল জেলের ২০ ডিগ্রির একটা নির্জন সেলে এবং যখন হতাশায়, আঘাতে প্রায় মুষড়ে পড়েছিলাম, পাহারারত সিপাইটি আমাকে অভয় দিয়ে বলল : সাহেব, আপনি তো আগেও জেল খেটেছেন। মন খারাপ করেন কেন? এই সেলে একদিন শেখ মুজিব ছিলেন। আর যেদিন তাকে গভীর রাতে আগরতলা মামলার বিচারের জন্য ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়, সেদিন সিপাহিদের মধ্যে আমিও ছিলাম। নিশ্চিত ফাঁসির মঞ্চের দিকে যাওয়ার মুখে দেখলাম, শেখ সাহেব সেলের বাইরে এসে নত হয়ে এক মুঠো মাটি নিয়ে মুখে ছোঁয়ালেন, বলে উঠলেন : ‘বাংলা মা আমার, আমি তোমায় ভালোবাসি।’ তারপর আমাদের পাহারাদার সিপাহিদের জড়িয়ে ধরে বললেন : ‘যাই ভাই, তোমরা আমায় দোয়া করো।’
অবশ্য ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর দেশের জীবনে এক নতুন পর্যায় শুরু হয়েছিল। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে শেখ মুজিব এসে যখন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তার জীবনের একটি নতুন পর্বের শুরু। পিছনের পর্যায়ের ত্যাগ-তিতিক্ষা, সাহসের একটি আবেগের সমাধান হবে না। এখানে নতুন দক্ষতা এবং দর্শনের প্রয়োজন হবে। কিন্তু দক্ষতা এবং দর্শন যাই হোক, পর্যায়টি দীর্ঘ এবং কষ্টকর এক নতুন পর্যায়।
এই নতুন পর্যায়ের নতুন দল গঠিত হচ্ছিল। নতুন মোকাবিলার ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছিল। সমাজ রূপান্তরের দীর্ঘপথে এ অনিবার্য। আমি চাচ্ছিলাম, মুজিবের বিপক্ষীয়রা যেমন, মুজিবও তেমনি পরস্পরের সঙ্গে রাজনীতিকভাবে মোকাবিলা করুন : মুক্তির ভিত্তিতে, গণতন্ত্রের ভিত্তিতে। ধৈর্য, ত্যাগ-তিতিক্ষার মাধ্যমে। এমন হলেই মাত্র শেখ মুজিবের যেমন রূপান্তর ঘটত : ভালো কিংবা মন্দ, যাই হোক না কেন, তেমনি তার শক্তি এবং সীমাবদ্ধতা প্রকাশিত হতো। সেই মোকাবিলার মধ্যে দিয়ে তাকে অতিক্রম করে সমাজ রূপান্তরের ক্ষেত্রে নতুনতর সংগঠন ও শক্তি বিকশিত হতো। এমন পর্যায়েও পক্ষ-বিপক্ষের ক্ষয়ক্ষতির প্রশ্ন থাকে। একের বিরুদ্ধে অপরের ন্যায়-অন্যায়ের অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগের ব্যাপার থাকে। কিন্তু হত্যা করার নীতি কোনো বিবেচনার নীতি নয়।
আমি শেখ মুজিবের দলের সদস্য ছিলাম না। আমি শেখ মুজিবের সরকার গৃহীত অনেক সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগতভাবে সমর্থন করতাম না। কিন্তু মানসিকভাবে আমি চাইতাম, দেশ যেন অতিক্রম করতে পারে একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত নেতৃত্বের পর্যায়টি। ব্যক্তিটি অতিক্রম করে যেন সাধারণের যৌথ সংঘশক্তি প্রকাশিত হতে ক্ষমতা, অপার ক্ষমতাবান ব্যক্তির ওপর সব কিছুতে নির্ভর করার প্রবণতা : সাধারণ মানুষের এইসব চারিত্র্য-বৈশিষ্ট্য, ভালো-মন্দ, কটু কথায় নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ক্রমান্বয়ে দূরীভূত হয়ে সংগঠনের যৌথ নেতৃত্বকে অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সংগঠন, তথা যৌথ সাধারণ অতিক্রম করে উঠুক, সেই পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকুক, এই ছিল আমাদের চেতনা-অচেতন মনের কামনা।
শেখ মুজিবকে আয়ুদানের ক্ষেত্রে এখানেই হত্যাকারীদের অবদান। গান্ধীজি স্বাভাবিক মৃত্যুর পরে যতখানি অমর হতে তার হত্যাকারী ব্যক্তিবর্গ তার চাইতে অধিক আয়ু গান্ধীজিকে দান করেছে। শেখ মুজিব স্বাভাবিকভাবে প্রয়াত হলে তার দান-অবদান, শক্তি এবং সীমাবদ্ধতার যে মূল্যায়ন সম্ভব হতো এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে যে আয়ু এবং অবস্থান তিনি লাভ করতেন তার হত্যাকারীর দল তার সেই মূল্যায়নকে রুদ্ধ করে মুজিবের দিকে আয়ুকে দীর্ঘতর করেছে, মুজিবের অবস্থানকে দৃঢ়তর করেছে। শেখ মুজিবের দিকে নিক্ষিপ্ত হত্যাকারীর বুলেটের আওয়াজ থেকে মুহূর্তের মধ্যে জন্ম নিয়েছে অপর এক আওয়াজ : ‘এক মুজিবের রক্ত থেকে লক্ষ মুজিব জন্ম নেবে।’ ইন্দিরা নেহরুর কন্যা। কিন্তু আজ ভারতে ‘নেহরু’ শব্দের যত না উচ্চারণ, তার অধিক উচ্চারণ ‘ইন্দিরা’ শব্দের। এখানে অবশ্যই কন্যা পিতাকে অতিক্রম করে গেছেন। এবং তার এমন অতিক্রমণে তার দেহরক্ষীদের নিক্ষিপ্ত বুলেটের যে একটি অবদান রয়েছে তা তো বলার অপেক্ষা রাখে না।

Category:

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু

Posted on by 0 comment

বিনোদ বিহারী চৌধুরী


 

‘নয়ন সম্মুখে তুমি নাই,
নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই’

PMf ১৯২৯ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে ভর্তি হয়ে এক বছর পড়ি। তার আগে ১৯২৭-এ ফাঁসিতে শহিদ রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের সান্নিধ্যে এসে বিপ্লব মহানায়ক মাস্টারদা সূর্য সেনের বিপ্লবী দলে ঢুকেছি। সখারাম গণেশ দিউস্করের ‘দেশের কথা’ এবং শরৎ চন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের ‘পথের দাবী’ এ দুটি বাজেয়াপ্ত করা বই পড়ি। ক্লাসে অধ্যাপক … একদিন … এর … নামক একটি কবিতা পড়াচ্ছিলেন। মন দিয়ে শুনছিলাম। শেষের চারটি লাইন ভুলতে পারিনি।
… … কথাটির ওপর জোর দিচ্ছিলেন। আমার চোখ খুললÑ মৃত্যুরও মৃত্যু হবে, মানুষ মৃত্যুকে জয় করতে পারেন। তারা মৃত্যুঞ্জয়ী হতে পারেন। মৃত্যুঞ্জয়ী কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধী, প্লেটো, এরিস্টটেল, রুশো, ভলতেয়ার, পাবলো পিকাসো ও আরও অনেকে মৃত্যুকে জয় করেছেন। কবির ভাষায়, ‘সেই ধন্য নরকুলে, লোকে যারে নাহি ভুলে, মনের মন্দিরে নিত্য সেবে সর্বজন।’
জাতির পিতার মৃত্যু নেই। তিনি অমর। আমাদের স্মৃতিপটে তিনি অম্লান। আমাদের প্রতিনিয়ত দেশপ্রেম ও মানুষের সেবার উৎসাহিত করেছেন, অনুপ্রাণিত করেছেন। তাকে ভুলি নাই, ভুলতে পারব না। স্বামী বিবেকানন্দের কোনো এক লেখায় পড়েছিÑ যে জাতি তাদের মাতৃজাতিকে শ্রদ্ধা করে না, সম্মান জানাতে শেখেনি সে জাতি বড় হতে পারে না। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন বর্বর পাকবাহিনী আমাদের দুই লক্ষ নারীকে লাঞ্ছিত করেছে, সম্ভ্রম নষ্ট করেছে এবং পরিণামে নব্বই হাজার সৈন্য নিয়ে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছে। বঙ্গবন্ধু সেই নারীদের সম্মানিত করে পরম মমতায় আখ্যায়িত করেছেন ‘বীরাঙ্গনা’ এ নামে। এ থেকে জাতির জনকের অন্তর বৈভবের পরিচয় পাই। আমাদের মা-বোনদের সম্মান দিতে হবে। আমরা পৌরাণিক মহাকাব্য থেকে জেনেছি নারীর অবমাননা কতখানি সর্বনাশ বয়ে আনে। বঙ্গবন্ধুর ভবিষ্যৎবাণী বাংলাদেশ সোনার বাংলা হবে। তিনি সারাজীবন যুদ্ধ করেছেন, মুক্তিযুদ্ধের আগে করেছেন, পরে করেছেন। তার জীবন নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামেরই ইতিহাস। বাংলার মানুষকে ভালোবেসেছেন তাই ক্ষমাও করেছেন তার বিপক্ষীয়দের অন্তরের ঔদার্য দিয়ে।
বঙ্গবন্ধুর সাথে আমার বেশ কয়েকবার সাক্ষাৎ হয়েছে। অন্তরঙ্গভাবেই কথা বলেছি। দীর্ঘ সুঠাম বলিষ্ঠ তেজোদীপ্ত দেহসৌষ্ঠবের অধিকারী! প্রাণখোলা হাসি তো ভুলবার নয়। আমাদের ধর্মগ্রন্থ গীতায় আছে যিনি সুখে-দুঃখে অবিচলিত, যিনি ভয় ও ক্রোধশূন্য তিনিই স্থিতধী প্রাজ্ঞ ব্যক্তি। জাতির পিতাকে আমি স্থিতধী প্রাজ্ঞ বলে মনে করি। ১৯৭২ সালের একটা সাক্ষাৎকারের কথা বলে আমার ছোট লেখা শেষ করব। সেদিন জাতির জনকের কাছে সাবধান বাণী উচ্চারণ করেছিলাম। প্রথমে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। সঙ্গে ছিলেন মন্ত্রী শ্রীযুক্ত ফণী মজুমদার, আমাদের চট্টগ্রাম শারদীয় পূজা কমিটির সম্পাদক শ্রী পরিমল সাহা, আমার বন্ধু আর, এন দত্তগুপ্ত ও আরও দু’তিনজন। দুর্গাপূজার সময় বিভিন্ন জেলায় প্রতিমা ভাঙচুর হয়েছে। এ বিষয়ে কিছু কথা বলেছিলাম। কিছুদিন আগে বঙ্গবন্ধু জুলিও কুরি পুরস্কার পেয়েছেন। আমি একটি ফুলের স্তবক নিয়ে গিয়েছিলাম। ফুল দিয়ে করজোড়ে তাকে প্রণাম জানালে তিনি বললেন, দাদা, আপনি কেন এসেছেন? আপনার কি চাই বলুন। আমি হেসে হেসে বলেছিলাম, আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি কোনো লাইসেন্স পারমিটের জন্য আসি নি। আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি আপনাকে সাবধান করতে এসেছি। PMf2এখনও চট্টগ্রামে রাতের আঁধারে রাজাকার-আলবদর বাহিনী ট্রাকে করে ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ স্লোগান দিচ্ছে। তাদের কঠোর হাতে দমন করা না হলে ভবিষ্যতে সমূহ বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে। স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালীন ১ কোটি লোক পার্শ¦বর্তী রাষ্ট্র ভারতে আশ্রয় নেয় এবং নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়। আনুমানিক ২ কোটি লোক দেশে থেকেই পাকিস্তানিদের বিরোধিতা করেছে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছে। কিছু লোক নিষ্ক্রিয় ও উদাসীন ছিল। আর বাদবাকিরা পাকিস্তানপন্থি তারা রাজাকার আলবদর বাহিনীর সাথে জড়িত। তাদের সম্পর্কে সজাগ থাকা আমাদের উচিত নয় কি? এ কথাটি আপনার কাছে নিবেদন করতে এসেছি। আর একটি প্রার্থনা আপনার কাছে আমাকে দেশের সেবা করার সুযোগ দেবেন।
বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ একটি মহাকাব্য। এ মহাকাব্যের রূপকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। এ মহাকাব্যের সূচনা বাঙালির জাতীয়তাবোধের উন্মেষকাল থেকেই। বাহান্নর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬-র ৬-দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণআন্দোলন এবং তারই ধারাবাহিকতায় আমাদের স্বাধীনতার আন্দোলন। প্রতিটি আন্দোলনেরই অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস কিছু বাঙালি বিশ্বাসঘাতকদের হাতে সপরিবারে নিহত হলেন বঙ্গবন্ধু। বিশাল এক নক্ষত্রের বিচ্যুতি ঘটল। বাঙালির ভাগ্যাকাশে মেঘ ঘনীভূত হতে লাগল। কিন্তু আমাদের শাস্ত্রে আছে ‘ন হন্যতে, হন্যমানে শরীরে’। স্থ’ল শরীরের মৃত্যু হলেও তার আদর্শের তো মৃত্যু নাই। আমি আশাবাদী। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন তার কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাস্তবায়িত হবেই। পরিশেষে বলি, ‘উদয়ের পথে শুনি কার বাণী, ভয় নাই ওরে ভয় নাই। নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান, ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।’

Category:

বাংলাদেশের ডেল্টা পরিকল্পনা

Posted on by 0 comment

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার পরবর্তীকালে ব-দ্বীপ বেষ্টিত বাংলাদেশের অসহিষ্ণু ভূ-প্রকৃতিকে চিরস্থায়ীভাবে কীভাবে রক্ষা করা যায়Ñ তার সমাধান খুঁজতে নেদারল্যান্ডস ভ্রমণ করেন। কারণ ব-দ্বীপ আকৃতির নেদারল্যান্ডসও ১৯৫৩ সালের ভয়াবহ বন্যার পর দেশরক্ষায় শতবর্ষী কর্মসূচি গ্রহণ করে সফল হয়েছিল। তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান তখনই দেশরক্ষার ডেল্টা প্ল্যানের কথা জানিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু বিমানে চড়ে ডেল্টা প্ল্যানের বিশালযজ্ঞ নিজ চোখে ঘুরে দেখেছিলেন। দেশে ফিরে তিনি অনুরূপ পরিকল্পনার রূপরেখা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তার দেখা স্বপ্নপথেই পরিবেশবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডেল্টা পরিকল্পনা নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

PMfরাজিয়া সুলতানা: নদীমাতৃক দেশ বাংলাদেশ; পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপও বটে। দেশের অর্থনীতিতে অতীত থেকে বর্তমান মুখ্য ভূমিকা পালন করছে নদী। সব সময়ই ব-দ্বীপ অধিবাসীদের বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, নদী ভাঙন ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ পানি দূষণের মতো হুমকি মোকাবেলা করতে হয়। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে দেশ বাঁচাতে গ্রহণ করা হয়েছে ডেল্টা পরিকল্পনা।
ইংরেজি শব্দ ‘ডেল্টা’ অর্থ ব-দ্বীপ। নদীর মোহনাস্থিত প্রায় ব-অক্ষরের আকার বিশিষ্ট যে দ্বীপ, তাকেই বলা হয় ডেল্টা। বাংলাদেশ বিশ্বের সর্ববৃহৎ ব-দ্বীপ অঞ্চল। প্রকৃতপক্ষে নদীমাতৃক এই দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছেÑ যথাযথ পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের ওপর। কেননা এখানকার জনগণের জীবনযাত্রায় নদ-নদী ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে আছে। বিশেষ করে জুন-সেপ্টেম্বরে বৃষ্টি মৌসুমে দেশের ব্যাপক অঞ্চল প্লাবিত হয়। এই পানির ৯২ শতাংশ আসে ভারত, চীনসহ উজানের দেশ হতে। বাকিটা এদেশের বৃষ্টিপাতের যোগফল। বন্যায় আমাদের সাংবৎসরিক ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়। আবার গ্রীষ্মকালে দেখা দেয় খরা। এই উভয়মুখী সংকটে বাংলাদেশের জনগণ দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হন। বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উপনীত হবার স্বপ্ন দেখছে। সেখানে ডেল্টা পরিকল্পনা হতে পারে সংকট সমাধানের চাবিকাঠি। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে নেদারল্যান্ডস। ডেল্টা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেদারল্যান্ডসের সহযোগিতার পেছনে প্রধানতম কারণ নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীর নাব্য রক্ষা এমন কী পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভূমি উদ্ধারের অনন্য অভিজ্ঞতা রয়েছে দেশটির। বাংলাদেশ বন্যাপ্রবণ ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বিধায় এই অভিজ্ঞতা বিনিময় একান্ত দরকার। নেদারল্যান্ডসের একটা অংশ সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে নিচু স্থানে অবস্থিত। নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে যেত। কিন্তু পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তারা এই সংকটের মোকাবেলা করেছে। ১৯৫৩ সালে দেশটিতে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। তখনই তারা ৬০ বছরব্যাপী ডেল্টা প্ল্যান গ্রহণ করে। ফলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত ও টেকসই হয়।
জলবায়ু নিদের্শক বলছেÑ পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা যেভাবে বাড়ছে তাতে ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের ১৪ শতাংশই জমিই প্রায় পানিতে নিমজ্জিত হয়ে যেতে পারে। পরিণামে প্রায় ৩০ মিলিয়ন লোক জলবায়ু শরণার্থীতে পরিণত হবে। কারণ নানা কারণে দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে জলবায়ু। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, নদী ভাঙন, পানি দূষণ, বায়ু দূষণ ইত্যাদি মারাত্মক আকার ধারণ করছে। বাংলাদেশের মতো নেদারল্যান্ডসও একটি ব-দ্বীপ রাষ্ট্র। বাংলাদেশের মতো তারাও একই সমস্যার সম্মুখীন হয়ে কর্মসূচি নিয়েছে। বাংলাদেশেও তা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে এর প্রতিকার ও প্রতিরোধে। সমস্যা উত্তরণের জন্য দরকার পরিকল্পনা ও তার বাস্তবায়ন। গ্রহণ করছে পরিকল্পনা একত্রে বাংলাদেশ ও নেদারল্যান্ডস। এরই নাম ডেল্টা পরিকল্পনা। নেদারল্যান্ডস ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়ন করে ৬ হাজার স্কয়ার কিলোমিটার নতুন ভূমি পেয়েছে। বাংলাদেশও এদিকেই এগুচ্ছে। ডেল্টা পরিকল্পনা হলো দীর্ঘমেয়াদি, একক এবং সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা। দীর্ঘমেয়াদি বলতে বুঝায় পরিকল্পনার লক্ষ্য ২১০০। একক হলো দেশের সব পরিকল্পনার আন্তঃযোগাযোগের মাধ্যমে একক ডেল্টা। আর সমন্বিত বলতে বুজায় পানি সম্পর্কিত সকল খাতকে একটি পরিকল্পনায় নিয়ে আসা। ডেল্টা পরিকল্পনা, কৌশলসমূহের টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমেই ডেল্টা ভিশনে পৌঁছাতে সাহায্য করবে।
একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন পরিকল্পিত পরিকল্পনার মাধ্যমে বাস্তবায়ন সম্ভব। তবে পরিকল্পনাগুলো স্বল্পমেয়াদি, না দীর্ঘমেয়াদি হবে এটি নির্ভর করে কাজের প্রকৃতির ওপর। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশে ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ মহাপরিকল্পনা অনুমোদিত হয়েছে। এর মাধ্যমে যেটি স্পষ্ট তা হলো, বাংলাদেশ এখন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছে। এটি আমাদের জন্য আশাবাদী হওয়ার মতো একটি বিষয়। এই শত বছরব্যাপী পরিকল্পনার মাধ্যমে বন্যা, নদী ভাঙন, নদী শাসন, নদী ব্যবস্থাপনা, নগর ও গ্রামের পানি সরবরাহ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নগর বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। ইংরেজি শব্দ ডেল্টা অর্থ ব-দ্বীপ। বাংলাদেশ পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ব-দ্বীপ অঞ্চল ও নদীমাতৃক দেশ হিসেবে নদী ব্যবস্থাপনা ও এর উন্নয়নের ওপর দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন নির্ভর করছে। বাংলাদেশে আবহাওয়া বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে আমাদের দেশে অনেক অঞ্চল প্লাবিত হয়। এই পানির প্রায় ৯২ শতাংশ চীন ও ভারতের মতো উজানের দেশগুলো থেকে আসে। ফলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানিপ্রবাহের কারণে বাংলাদেশের কৃষিসংক্রান্ত অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ে। এছাড়া মানুষের জীবনযাত্রায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশের বর্ষা মৌসুমে প্রায় ৮০ শতাংশ পানি অন্যত্র চলে যাওয়ায় পানির অপচয় ঘটে, যেটা ধরে রেখে খরার সময় কাজে লাগানো যায়। অন্যদিকে গ্রীষ্মকালে অনেক সময় বাংলাদেশকে খরার মধ্যে পড়তে হয়। এর ফলে পানির অভাবে কৃষি উৎপাদন ও মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। এ-ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাগুলো কীভাবে পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সমাধান করা যায়, তার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন ডেল্টা প্ল্যান বা ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। সকল সূচক বৃদ্ধি, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পাশাপাশি বাংলাদেশের একসময়ের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ক্রমে একটি আধুনিক উৎপাদন ও সেবামুখী অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আকাক্সক্ষা ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ উচ্চমধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে উন্নীত করা। ঢাল হিসেবে ধরা হয়েছে ব-দ্বীপের গঠনগত বৈশিষ্ট্যের শাসন। মাধ্যম ডেল্টা পরিকল্পনা বা ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০, যা হতে পারে প্রধানতম ঘটনা। এই পরিকল্পনাকে যথাযথভাবে সফল করতে সাহায্য করবে নেদারল্যান্ডস অর্থ ও প্রযুক্তি দিয়ে। ডেল্টা প্ল্যান নামে বেশি পরিচিত শত বছরের এই মহাপরিকল্পনার অধীনে আপাতত ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য ৮০টি প্রকল্প গ্রহণ করেছে সরকার, যার প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে কম-বেশি ২,৯৭৮ বিলিয়ন টাকা।
প্রথম পর্যায়ে ৬টি ‘হটস্পট’ ঠিক করে এই ৮০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে ৬৫টি প্রকল্প ভৌত অবকাঠামো সংক্রান্ত এবং ১৫টি প্রতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং গবেষণা সংক্রান্ত। ব-দ্বীপ পরিকল্পনা বাসতবায়নে যে ছয় ধরনের জায়গাকে বাংলাদেশ বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, সেগুলোই ‘হটস্পট’। এগুলো হলোÑ
১. উপকূলীয় অঞ্চল (২৭,৭৩৮ বর্গকিলোমিটার) ২. বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ অঞ্চল (২২,৮৪৮ বর্গকিলোমিটার) ৩. হাওড় ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ এলাকা (১৬,৫৭৪ বর্গকিলোমিটার) ৪. পার্বত্য অঞ্চল (১৩,২৯৫ বর্গকিলোমিটার) ৫. নদী অঞ্চল ও মোহনা (৩৫,২০৪ বর্গকিলোমিটার) এবং ৬. নগর এলাকা (১৯,৮২৩ বর্গকিলোমিটার)।
এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে যাবে। এত লম্বা সময়ের পরিকল্পনা বাংলাদেশে এটাই প্রথম। প্রাথমিকভাবে নেওয়া কাজগুলোর মধ্যে পদ্মার ক্যাপিটাল ড্রেজিংসহ প্রায় সবগুলোই বড় প্রকল্প। ফলে এসব প্রকল্পের সব কাজ ২০৩০ সালের মধ্যে শেষ নাও হতে পারে। ২১০০ সাল পর্যন্ত প্রকল্প বাস্তবায়ন চলতে থাকবে। এসব প্রকল্পের জন্য নিয়মিত অর্থ বরাদ্দও চলতে থাকবে। বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ অঞ্চলের মূল সমস্যা হলো পানির প্রাপ্যতা। এসব এলাকায় এখন পানির অবস্থান ভূপৃষ্ঠের ৭০ থেকে ৮০ হাজারে ফুট নিচে। ডেল্টা প্ল্যানের আওতায় সেসব এলাকায় বৃষ্টির পানি ধরে রেখে চাষাবাদসহ প্রয়োজনীয় কাজগুলো করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। হাওড় অঞ্চলে রয়েছে স্যানিটেশন, সুপেয় পানির দুষ্প্রাপ্যতা এবং পানি সরবরাহ নিয়ে সমস্যা। সেখানেও খরস্রোতা নদীতে ড্রেজিং করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এ পরিকল্পনার আওতায় ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস এবং লবণাক্ততা রোধেও কাজ করা হচ্ছে।
পানি আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, এই পানিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে কৃষিতে আমরা পিছিয়ে থাকব না। বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারব। ডেল্টা প্ল্যানে নতুন নতুন প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বিদ্যমান অবকাঠামো উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে ব-দ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রতি বছর জিডিপির (মোট দেশজ উৎপাদন) আড়াই শতাংশের মতো অর্থের প্রয়োজন। আর ২০৩১ সাল নাগাদ প্রতি বছর বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে ২৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। পরিকল্পনার ধারণা অনুযায়ী, দেশজ আয়ের মোট চাহিদার আড়াই শতাংশের মধ্যে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ অর্থায়ন বেসরকারি খাত থেকে এবং ২ শতাংশ সরকারি খাত থেকে জোগান দিতে হবে।
ব-দ্বীপ পরিকল্পনায় বেশির ভাগ সরকারি অর্থায়ন বন্যা থেকে রক্ষা, নদী ভাঙন, নিয়ন্ত্রণ, নদী শাসন এবং নাব্যতা রক্ষাসহ সামগ্রিক নদী ব্যবস্থাপনা, নগর ও গ্রামে পানি সরবরাহ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নগর বন্যা নিয়ন্ত্রণসহ নদী ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হবে।
সর্বোপরি ডেল্টা পরিকল্পনায় যে বিষয়গুলো বিবেচনায় আনা হয়েছেÑ
১.    জলবায়ু পরিবর্তন : তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, বন্যা, খরা, নদী ভাঙন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততা অনুপ্রবেশ, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস;
২.    উজানের উন্নয়নমূলক কর্মকা-;
৩.    পানির গুণগতমান;
৪.    জলাবদ্ধতা ও
৫.    জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব।

মোদ্দাকথা ব-দ্বীপ পরিকল্পনা একটি দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত ও সামষ্টিক পরিকল্পনা, যা পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত পরিবর্তনগুলো বিবেচনা করে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকে সহায়তার জন্য প্রণয়ন করা হয়েছে। এর ফলে আশা করা হচ্ছে ২১০০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ হবে নিরাপদ, জলবায়ু পরিবর্তনে অভিঘাত সহিষ্ণু ব-দ্বীপ।
চলতি বছর নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুটের আমন্ত্রণে তিন দিনের সফরে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ডাচ্ প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে দুদেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়। দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনার মূল বিষয় ছিল বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, বেসরকারি খাতের উন্নয়ন, কৃষি ও বন্দর উন্নয়ন এবং আইনের শাসনসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বিপাক্ষিক বিষয়। তন্মধ্যে ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নে ঢাকা ও আমস্টারডামের একযোগে কাজ করা। ডেল্টা কোয়ালিশন কাঠামো কর্মসূচির মাধ্যমে এই সহযোগিতা প্রদান করবে। এরূপ কোয়ালিশন সারাবিশ্বের ঘনবসতিপূর্ণ ব-দ্বীপ অঞ্চলগুলোকে নিরাপদ ও অর্থনৈতিকভাবে টেকসই করতে একসঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে।
পাশাপাশি ২০১৯ সালের জুলাইয়ে ঢাকা অনুষ্ঠিত দুদিনব্যাপী জলবায়ু বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপটেশন’ (জিসিএ) বৈঠকে প্রধান অতিথির ভাষণেÑ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জলবাযু পরিবর্তনের বিস্তৃতি এবং এর প্রভাব প্রশমন নিজেদের সক্রিয় উদ্যোগ সম্পর্কে আরও সচেতন হতে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় নেদারল্যান্ডসের সহযোগিতায় প্রণীত শতবর্ষমেয়াদি ডেল্টা পরিকল্পনার উল্লেখ করে বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি মোকাবেলার জন্য আমরা বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ নামে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, শুধু ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে ৭ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় দেড় লাখ মানুষ মারা যায়। ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরে মারা যায় ৩ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ। ২০০৯ সালের মে মাসে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সাইক্লোন আইলার প্রভাবে ১১৯ জনের মতো মানুষ মারা যায়। আর ২০১৯-এর মে মাসে বয়ে যাওয়া সাইক্লোন ফণী’তে কেউ মারা না গেলেও সে-সময় অন্যান্য কারণে ১০ জন প্রাণ হারান। তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উপকূলীয় অঞ্চলে ১৭২টি মুজিব কেল্লা (সাইক্লোন সেল্টার) নির্মাণের মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবেলায় পথ রচনা করেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘জাতির পিতা ১৯৭২ সালে ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে সাইক্লোন প্রিপেয়ার্ডনেস প্রোগ্রাম (সিপিপি) গ্রহণ করেন। সিপিপির বর্তমানে ৪৯ হাজার ৩৬৫ জন প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক রয়েছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুও তার সরকার আমলে ৪৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবকের এক বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন।’ সরকার জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় ৩৭৮টি মুজিব কেল্লা নির্মাণ করছে। এছাড়া, দেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলে ৩ হাজার ৮৬৮টি বহুমুখী সাইক্লোন সেল্টার নির্মাণ করা হয়েছে। আরও ১ হাজার ৬৫০টি সাইক্লোন সেল্টার নির্মাণ করা হবে।’
বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের সমুদ্রের উপকূলবর্তী অঞ্চল বিলীন হয়ে যেতে পারে। এর কারণ সমুদ্রের পানির উচ্চতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে এ পরিকল্পনার মাধ্যমে এটিকে কীভাবে রোধ করে সমুদ্রাঞ্চল উন্নয়নের অবকাঠামো গড়ে তোলা যায়, সে-বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। এছাড়া জাতিসংঘ প্রণীত টেকসই উন্নয়নের ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য ডেল্টা প্ল্যানের বিভিন্ন পরিকল্পনাকে সমন্বিত করার মাধ্যমে বাস্তবায়নের প্রয়োজন রয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব যেমন এ পরিকল্পনার মাধ্যমে কমাতে হবে, তেমনি জলবায়ুর পরিবর্তনকেও বিবেচনায় রাখতে হবে। এর মাধ্যমে কৃষি, ভূমি, পানিসম্পদ, শিল্প, বনায়ন ও মৎস্য সম্পদসহ অন্যান্য সম্পদকে এ পরিকল্পনার আওতায় এনে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, খাদ্য নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নকে সমন্বিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সম্পর্কের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ বাংলাদেশের প্রধান নদী ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গা ও মেঘনার ৯৩ শতাংশ অববাহিকা ও উৎস ভারত, নেপাল ও ভুটানে রয়েছে। এর সঙ্গে ডেল্টা প্ল্যান ২১০০-এর পরিকল্পনার সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর নদী ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনাকে কীভাবে সমন্বিত করে সবার স্বার্থ সংরক্ষণ করে সর্বোচ্চ সুফল পাওয়া যায়, তার কর্মকৌশল গ্রহণ করতে হবে। ভৌগোলিক ও পরিবেশগত ভিন্নতার কারণে ইউরোপ বা আমেরিকার মতো পানি ব্যবস্থাপনাকে অনুসরণ না করে আমাদের দেশের নিজস্ব উপাদানকে বিবেচনা করে প্রযুক্তিগত বিষয়টি ভাবতে হবে। এর কারণ হলো, বাংলাদেশের পরিবেশগত বিষয়টি নিত্য পরিবর্তনশীল হওয়ায় এখানে লবণাক্ততা, পলি, সাইক্লোন, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো ঘটনাগুলো ঘটে। এর সঙ্গে মাটির প্রকৃতি, পানির উপাদান, গাছপালার ওপর প্রভাবসহ এ-ধরনের উপাদানগুলো পরিবর্তিত হয়।
বিভিন্ন পরিবর্তন ও পরিবর্তনের উপাদানগুলো বিবেচনা করে এগুলোর ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। এর সঙ্গে নিরাপদ পানির ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, রাসায়নিক সারের ব্যবহার কমিয়ে এনে দীর্ঘ ও স্বল্পমেয়াদি প্রযুক্তিগত ও আর্থ-সামাজিক কর্মকৌশল গ্রহণ করে এটিকে এ পরিকল্পনার মধ্যে আনতে হবে। এ পরিকল্পনায় ৬টি হটস্পট নির্ধারণ করে সেখানে ৩৩ ধরনের চ্যালেঞ্জ শনাক্ত করা হয়েছে। হটস্পটগুলো হচ্ছেÑ উপকূলীয় অঞ্চল, বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ অঞ্চল, হাওড় ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ অঞ্চল, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল, নদী ও মোহনা অঞ্চল ও নগরাঞ্চল। এ অঞ্চলগুলোকে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কীভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগানো যায়, সে-বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। জীববৈচিত্র্য, সুন্দরবন সংরক্ষণ, বাঁধ-ব্যারাজ সংস্কার ও নির্মাণ, বিভিন্ন নদীতে জেগে ওঠা চর, মোহনার গতিপথ নিয়ন্ত্রণ, জনস্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিসহ ভিশন ২০২১ ও ২০৪১-এর লক্ষ্য অর্জনে সামগ্রিকভাবে এর সঙ্গে যুক্ত প্রধান উপাদানগুলোর সমন্বয়ের মাধ্যমে ব-দ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগ ও নেতৃত্বের মাধ্যমেই ১০০ বছর মেয়াদি এ পরিকল্পনা স্বপ্ন থেকে এখন বাস্তবে পরিণত হয়েছে। এখন দরকার দেশপ্রেমের মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে সবাইকে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে একত্রে কাজ করা, তবেই উন্নয়নের কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জিত হবে।
বন্যা, নদী ভাঙন, নদী ব্যবস্থাপনা, নগর ও গ্রামে পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি কৌশল হিসেবে বহু আলোচিত ‘ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’ সরকারের চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। ‘ডেল্টা প্ল্যান’ নামে বেশি পরিচিত শত বছরের এ মহাপরিকল্পনার অধীনে আপাতত ২০৩০ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের জন্য ৮০টি প্রকল্প নিচ্ছে সরকার, যাতে ব্যয় হবে প্রায় ২,৯৭৮ বিলিয়ন টাকা। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় এ মহা-পরিকল্পনায় অনুমোদন দেওয়া হয়। এ ব্যাপারে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, প্রথম পর্যায়ে ৬টি ‘হটস্পট’ ঠিক করে এই ৮০টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে ৬৫টি প্রকল্প ভৌত অবকাঠামো সংক্রান্ত এবং ১৫টি প্রতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং গবেষণা সংক্রান্ত। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হলে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে যাবে। এত লম্বা সময়ের পরিকল্পনা বাংলাদেশে এটাই প্রথম। তিনি আরও বলেছেন, প্রাথমিকভাবে নেওয়া কাজগুলোর মধ্যে পদ্মার ক্যাপিটাল ড্রেজিংসহ প্রায় সবগুলোই বড় প্রকল্প। ফলে এসব প্রকল্পের সব কাজ ২০৩০ সালের মধ্যে শেষ নাও হতে পারে। ২১০০ সাল পর্যন্ত প্রকল্প বাস্তবায়ন চলতে থাকবে। এসব প্রকল্পের জন্য নিয়মিত অর্থ বরাদ্দ হবে।
বিভিন্ন তুলনামূলক বিশ্লেষণে আমাদের টেকসই উন্নয়ন ব্যবস্থাপনায় নিম্নলিখিত ধাপগুলো একটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ হতে পারে, যেখানে আর্থ-সামাজিক এবং পরিবেশগত বিষয়ে সমন্বিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা যায়। ধাপগুলো হলোÑ
১. একটি পদ্ধতিগত উন্নয়ন, যেখানে বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান এবং এর সমস্ত সম্ভাব্য দিকগুলোর সঙ্গে আমাদের জীববৈচিত্র্যের একটি সম্পর্ক ও স্থিতিস্থাপকতা বিশ্লেষণ;
২. ডেল্টা প্ল্যানের উদ্দেশ্যকে সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করা, যা কি না আর্থ-সামাজিক এবং পরিবেশগত টেকসই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। যেমনÑ এক্ষেত্রে ডাচ্ কমিশনের ওই ৮টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে সফলতার মাপকাঠি নির্ধারণ করা;
৩. কৌশলগত ধাপগুলো নিশ্চিত করা এবং প্রকল্পের উদ্দেশ্যগুলোকে একটি নীতির ফ্রেমে আর্থিক, সামাজিক এবং পরিবেশগত সম্পদ রক্ষা প্রক্রিয়ায় ধাপে ধাপে এগোনো। এক্ষেত্রে নমনীয় কাজের পরিবেশ এবং বিনিয়োগের ওপর যথেষ্ট রিটার্ন নিশ্চিত করে কৌশল ঠিক করা;
৪. কৌশলগত অবলম্বনে ডেল্টা প্ল্যান প্রকল্পের কাজগুলোকে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি হিসেবে কর্মপরিকল্পনা করা ও
৫. কিছু পর্যবেক্ষণ এবং মূল্যায়ন সংক্রান্ত সরঞ্জাম তৈরি করা, যা পুরো বিষয়গুলোকে ধাপে ধাপে মূল্যায়ন করার জন্য সক্ষম। এখানে টেকসই উন্নয়নের সূচক, ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি এবং ‘life cycle evaluation’ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
সর্বশেষ বলতে হয়, বন্ধুপ্রতিম দেশ নেদারল্যান্ডস সরকারের আন্তরিক সহযোগিতায় ডেল্টা প্ল্যান বাস্তবায়নের কাজ সফলভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বোদ্ধাদের ধারণা, উন্নত দেশ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে ডেল্টা পরিকল্পনা মুখ্য ভূমিকা পালন করবে।

লেখক : শিক্ষক; পিএইচডি গবেষক, প্ল্যান্ট প্যাথলজি, শেরে বাংলা কৃষি ইউনিভার্সিটি
raziasultana.sau52@gmail.com

Category:

কবিতা

Posted on by 0 comment

copy

Category:

তিন মোড়লে বন্দী ক্রিকেট নান্দনিকতা

Posted on by 0 comment

ক্রিকেট বলতেই হাতেগোনা কয়েকটি দেশ। কিন্তু সেখানেও মোড়লগিরি ক্রিকেটে নাভিশ্বাস তুলছে। ক্রিকেট তিন মোড়ল অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও ইংল্যান্ডের কাছে চোখ-মুখ বাঁধা পড়ে প্রতিনিয়ত হারাচ্ছে তার নান্দনিকতা ও জৌলুস। অথচ আইসিসি ‘মন্ত্রতত্ত্ব’ বাতিল করেছে অনেক আগেই। মাঠে বসে ক্রিকেটে যারা প্রাণ উজাড় করছেন নিজের অর্থ ও সময়; তারাও হাঁপিয়ে উঠছেন বনেদিপনায়। কারণ মাঠের খেলার চেয়েও মোড়লরা অতিব্যস্ত টেবিলের খেলায়। ক্রিকেটের নিয়ন্তা আইসিসিও তাদের কাছে জিম্মি; তাদের তাঁবেদার। অনেকটা হুকুমের দাস। মোড়লরা যেভাবে চায়- অনেক সময় মাঠে ঘটেও তাই। ফলে অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে বাংলাদেশ-পাকিস্তান-শ্রীলংকা-দক্ষিণ আফ্রিকা-নিউজিল্যান্ডের মতো দেশের ক্রিকেট। আইসিসির তিন ‘শক্তিধর’ দেশের প্রস্তাবই
যেন ক্রিকেটের সব প্রস্তাব।

PMf আরিফ সোহেল: ঘটনা পুরনো। ২০১৪ সালের কথা। আইসিসির সভায় টেস্ট ক্রিকেটকে ‘আকর্ষণীয়’ করার নামে প্রস্তাব করেছিল নতুন এক পদ্ধতির। টেস্ট ক্রিকেটে স্থায়ী প্রথম ১০টি দল টেস্ট খেলতে পারে। মোড়লদের প্রস্তাবিত পদ্ধতি ছিল  টপ-৮ সরাসরি খেলবে টেস্ট ক্রিকেট। আইনটা দ্বি-স্তরবিশিষ্ট টেস্ট ক্রিকেট। র‌্যাংকিংয়ের ৯ ও ১০ নম্বর দলকে ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপে খেলার কথা বলা হয়েছিল। এই ‘আশঙ্কা’ নিয়ে তোলপাড় ছিল ক্রিকেটের দেশে দেশে। প্রকারান্তরে ৮টি দল নিয়ে খেলার কথা বলে বাংলাদেশের মতো ক্রিকেট-পাগল জাতিকে ‘টেস্ট’ আঙ্গিনার সাবলিল সৌরভের বাইরে রাখার ফন্দি-ফিকির করেছিল। ক্রিকেট বিশ্বে বাংলাদেশ যখন অবস্থান ক্রমাগত দৃঢ় করছিল, ঠিক তখনই সংস্কারের নামে ক্রিকেটের তিন মোড়লের এই অদ্ভুত প্রস্তাবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে চক্রান্তের স্বীকারে পরিণত হতে হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার মতো দেশ ওই দ্বিচারিত প্রস্তাব মেনে নেয়নি। তাতেই রক্ষা। অবশ্য তিন মোড়ল ছড়ি ঘুরাতে অন্য একটি নিয়মকে উসকে দিয়েছিল সেই সময়ে। বলেছিলÑ বড় দেশ চাইলে ছোট দেশের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক টেস্ট, ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টির মতো সিরিজ আয়োজন করতে পারবে। দেখানো হয়েছিল আর্থিকভাবে লাভবান হবার অসমৃণ পথও। অর্থাৎ আয় বাড়ার সঙ্গে বড় দলের সঙ্গে খেলার টোপঘোরা কৌশলও বাতলে দিয়েছিল আইসিসি। কিন্তু প্রতিবাদের মুখে আইসিসি সেসব প্রস্তাব পুরোপুরি কার্যকর করতে পারেনি। যেখানে বাংলাদেশও প্রতিবাদের সারথি হয়েছিল। তিন মোড়লদের বিপক্ষে এ অবস্থান নিলেও ক্রিকেট কিন্তু তাদের গ-ির বাইরে আসতে পারেনি। যার সর্বশেষ প্রমাণ ২০১৯ সালের বিশ্বকাপ। ফাইনালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আম্পায়ার ধর্মসেনার অভিনব সিদ্ধান্ত; তা আবারও চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছে। অনেকেই সরাসরি তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেনÑ এবারের বিশ্বকাপে তিন মোড়লের অভ্যন্তরীণ কু-সন্ধি হয়েছিল। যার ফলে ঘুরে-ফিরে; সব সমীকরণ ছাপিয়ে তিন মোড়লই সেমিফাইনালে উঠেছিল। তারা মোড়লত্ব টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে নিজেদের মধ্যে অনুষ্ঠিত ম্যাচে হেরেছে; উল্টোভাবে প্রয়োজনে জিতেছে। কীভাবে করেছে তা বোকা ক্রিকেট-অবুঝ সমর্থকও লজ্জা পেয়েছে। কীভাবে ভারত ইংল্যান্ডের কাছে গ্রুপ পর্বে হেরেছে কিংবা অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ড ম্যাচের ছকগুলো চোখের সামনে ভাসিয়ে নিনÑ আর বলার প্রয়োজন হয় না।
২০১৪ সালে আইসিসির সভায় সংবিধানে সংশোধনী আনা হয়েছিল। গঠনতন্ত্রে আইসিসির হৃৎপি- বলে বিবেচিত এ দুই কমিটিতে ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড স্থায়ী সদস্যপদ পেয়েছিল। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতকে মূল ক্ষমতাধর করা হয়েছিল। এদের অপসারণের সুযোগ ছিল না। ফলে যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার এই তিন সদস্যই নিতে পারত। এটিই ক্রিকেট দুনিয়ায় ‘বিগ থ্রি’ বা ‘তিন মোড়ল’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এছাড়া সভায় আরও যে গুরুত্বপূর্ণ যে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে একটি হচ্ছেÑ স্বাধীন চেয়ারম্যান নীতি। এখন থেকে সদস্য বোর্ডের সভাপতি থেকে কেউ আইসিসির চেয়ারম্যান হতে পারবেন না। ২০১৫ সালের নভেম্বরে এ বিষয়টি নিয়ে নিজের অসন্তোষের কথা জানিয়েছিলেন শশাঙ্ক। উদাহরণ হিসেবে বলেছিলেনÑ ভারতীয় বোর্ডের প্রধান যদি একই সঙ্গে আইসিসি চেয়ারম্যানও হয়, এতে নিরপেক্ষভাবে তার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব হবে না। ভারতীয় বোর্ডের প্রধান ভারতের স্বার্থই তো দেখবেন। ২০১৪ সালে এই কমিটির অংশীদার এন শ্রীনিবাসন, ওয়ালি এডয়ার্ডস ও জাইলস ক্লার্ক (তিনজন যথাক্রমে বিসিসিআই, সিএ ও ইসিবি প্রধান) মিলে আইসিসির রাজস্বনীতিতে বিতর্কিত সংশোধনী এনেছিলেন।
২০১৬ সালে ২০১৪ সালের গৃহীত ‘মোড়লগিরি’র সংশোধন করে আইসিসি। নির্বাহী এবং অর্থ-বাণিজ্য সংক্রান্ত আইসিসির সবচেয়ে ক্ষমতাধর এ দুই কমিটি থেকেও তিন প্রধানের স্থায়ী সদস্যপদ প্রত্যাহার করা হয়। পরবর্তীকালে জুনে অনুষ্ঠিত আইসিসির সভায় বোর্ডের সভায় গোপন ব্যালট ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত করা হয় আইসিসির নতুন চেয়ারম্যান। দুবছর মেয়াদি আইসিসির নতুন চেয়ারম্যান কোনো বোর্ডের কোনো ধরনের পদে থাকতে পারবেন না। আবার চাইলেও সবাই এই পদে নির্বাচনও করতে পারবেন না। মনোনয়নের যোগ্যতা হিসেবে আইসিসির বোর্ড পরিচালক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে, পাশাপাশি পূর্ণ সদস্য ১০ দেশের কমপক্ষে দুটির সমর্থন থাকতে হবে। আইসিসিতে তিন প্রধানের ‘খবরদারি’র যে সুযোগ তৈরি হয়েছে ২০১৪-এর সংশোধনীতে, সেটি দূর করে ২০১৬ সালে। কিন্তু নিয়ম রহিত হলেও ক্রিকেটে এখনও তিন মোড়লে সাম্রাজ্যই অধিষ্ঠিত।
পাশাপাশি ওয়ান ডে বা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটকে ঘিরে ন্যক্কারজনক কর্পোরেট বাণিজ্য শুরু হয়েছে। বনেদি ক্রিকেট বোর্ডগুলো লাখো ডলারের ফায়দা লুটতে বাজিকরদের অনাবিল সুযোগ করে দিচ্ছে। ফলে উন্মাদনা আর ম্যাচ ফিক্সিং (পাতানো খেলা), যা ক্রিকেটকে ক্রমাগত কলুষিত করছে। জুয়া আর ম্যাচ ফিক্সিং শুধু ক্রিকেটকেই আঘাত করছে এমনটাও নয়, তাতে বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষের ক্রিকেটীয় ভালোবাসা ও আবেগ। আর ক্রিকেটাররা ক্রমেই পরিণত হচ্ছেন টাকার পুতুলে, যাদের নিজের মতপ্রকাশের ওপরেও শর্ত আরোপ করে কর্পোরেট কোম্পানি আর কর্পোরেট ক্রিকেট বোর্ড। এলিট ক্রিকেট বোর্ডসমূহ নিজেদের এই বনেদি প্রস্তাবনায় তাদের উচ্চাভিলাষ আর বাণিজ্যের চিন্তাটাকেই তুলে ধরেছে। এই বনেদি তত্ত্ব আর কর্পোরেট প্রভাবে ক্রমেই নিষ্প্রভ হচ্ছে নান্দনিক ক্রিকেটের জৌলুস, যার ভাগশেষ কর্পোরেট ক্রিকেট! যেখানেও সত্যসিদ্ধভাবে তিন মোড়লের ভূমিকা থাকছে অনিবার্যভাবেই। সামান্য টাকার লোভে যেখানে দেশি বোর্ড বিক্রি হয়ে যায়; সেখানে আইসিসিকে দোষ দিয়ে আর কী লাভ। এটা তো জানা কথা, আইসিসির বর্তমান আয়ের সিংহভাগই আসে এই তিন মোড়ল দেশÑ অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও ইংল্যান্ড থেকে।
প্রাণের টানে ক্রিকেটের টানে ক্রিকেটকে তিন মোড়লের খপ্পর থেকে বাঁচাতে বারবার সোচ্চার হয়েছে নিরেট সমর্থকরা। সেখানে বাংলাদেশও বাদ যায়নি। লাল-সবুজের পতাকা, ব্যানার, ফেস্টুন, প্লে-কার্ড নিয়ে কয়েক হাজার ক্রিকেটপ্রেমীরা মানববন্ধন করে তিন মোড়লের আধিপত্য বিনাশে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করেছে। ২০১৭ সালের ২-৪ ফেব্রুয়ারি দুবাইয়ে তিন দিনব্যাপী সভা শেষে আইসিসি জানিয়েছিল ‘বিগ-থ্রি’ নীতি বাতিল করে নতুন একটি সুষম অর্থনৈতিক বণ্টন পদ্ধতিতে যাওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আইসিসির সংবিধানে কিছু সংশোধনী এনে তা পাস করা হয়েছে। ওই বছরই এপ্রিলে আইসিসির পরবর্তী সভায় আফগানিস্তান ও আয়ারল্যান্ড পূর্ণ সদস্য করা হয়েছে। আর ২০১৯ সালে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড প্রধান এহসান মানিকে আইসিসির অর্থ-বাণিজ্য কমিটির প্রধান করার মধ্য দিয়ে তিন মোড়লের ক্ষমতা কিছুটা কমানোর স্বপ্ন-জাগানিয়া পরিবেশ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভবনা হয়েছিল। কারণ অর্থ-বাণিজ্য কমিটিই আইসিসির বিভিন্ন ইভেন্টের বাজেট প্রণয়ন ছাড়াও সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অর্থ বণ্টনের দায়িত্ব পালন করে। উল্লেখ্য, গত ১০ বছর ধরে এই তিন দেশের বাইরে মাত্র একজন কর্মকর্তা নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের সাবেক প্রধান অ্যালান আইজ্যাক (২০১১-১২) অর্থ-বাণিজ্য কমিটিতে ছিলেন। তবে শীর্ষপদে মোড়লদের বাইরে কেউ বসতে পারেন নি। পিসিবি প্রধান এহসান মানি ১৭ বছর পর এই পদে ফিরলেন। কিন্তু তা খেলার মাঠে-অভ্যন্তরে কখনোই প্রমাণিত হয়নি। তা ছিল কাগুজে। অনেকে ধারণা করেছিল এর মধ্য দিয়ে ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড তিন মোড়লের দীর্ঘ এক দশকের শাসনের ক্ষমতা কমবে। বরং মোড়লভুক্ত দেশের সঙ্গে অন্য দেশের খেলা মানেই আম্পায়ার, থার্ড আম্পায়ারÑ সবাই বনেদি দলের প্রতি অনুকম্পায় আগুয়ান সদস্য। ছোটদের বিপক্ষে সিদ্ধান্ত দিতে তাদের আইনও বাধে না।
PMf2দীর্ঘ পথপরিক্রমায় হয়তো কিছুটা ছন্দপতন ঘটেছে মোড়লদের। তারপরও বিশ্ব ক্রিকেটে চলছে ‘তিন মোড়লের’ প্রাধান্য। আর সে-কারণেই নানা সমীকরণ অভ্যন্তরীণ ‘খেলা’ শেষে ক্রিকেটের তিন সম্পদশালী দেশ ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছানোটা কোনো বিস্ময়কর ঘটনা ছিল না। এবারের টুর্নামেন্টের সম্প্রচার থেকে ৪০০ মিলিয়ন পাউন্ড আয় করেছে বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসি। ২০১৬-২৩ সম্প্রচার চুক্তির আওতায় ২০১৯ ও ২০১৩ বিশ্বকাপ হচ্ছে মূল ইভেন্ট। সেখান থেকে অর্জিত অর্থ থেকে ৯৩টি সহযোগী বা জুনিয়র ক্রিকেট দেশ আইসিসি থেকে পাবে মাত্র ১৭৫ মিলিয়ন পাউন্ড। অথচ ভারত একাই পাবে ৩২০ মিলিয়ন পাউন্ড। এর বাইরেও বিগ থ্রি’র আলাদাভাবে রয়েছে ঘরোয়া টুর্নামেন্টের সম্প্রচারের লোভনীয় চুক্তি। অন্যদিকে দলগত আয় কম থাকায় দক্ষিণ আফ্রিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো দেশগুলোকে তাদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়ে ধুঁকতে হচ্ছে। তারা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে খেলোয়াড়দের সরে যাওয়ার হুমকিতে রয়েছে। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) সাফল্যের কারণে এসব খেলোয়াড়রা টি-টোয়েন্টি ফ্র্যাঞ্চাইজির দিকেই ঝুঁকে পড়ছেন।
ক্রিকেট মানেই প্রথমত ভারত। তারপরও উঠে আসে অস্ট্রেলিয়ার নাম। আর প্রথমবার বিশ্বকাপ জিতলেও ইংল্যান্ডের ক্রিকেট আধিপত্য শুরু থেকেই। যেখানে বাংলাদেশ-শ্রীলংকা-পাকিস্তান-ওয়েস্ট ইন্ডিজের মতো দেশগুলো বরাবরই অপাঙ্তেয়ই থেকে যায়। ২০১৫ সালের বিশ্বকাপে বাংলাদেশের বিপক্ষে ভারতের জয়কে অনেকেই স্রেফ আম্পায়ারের মহাকারচুপি হিসেবেই দেখেছেন। এবারও ফাইনালসহ অনেক ম্যাচেই বিস্ময়কর সব সিদ্ধান্ত গেছে মোড়লদের পক্ষে। লজ্জার মাথা খেয়ে আম্পায়াররা বড়দের পক্ষে আঙ্গুল তুলেছেন।
মোদ্দা কথা, মোড়লরা বাংলাদেশের মতো অনেক দেশের উন্নতি সহ্য করতে পারছে না। পাশাপাশি ক্রিকেটকে আরও কী করে পুরোপুরি বাণিজ্যনির্ভর করে ফেলা যায়, তা নিয়েও মোড়লদের মাথা হরদম ঘুরছে। কারণ ক্রিকেট বর্তমানে কেবল খেলার মাঝে আটকে নেই, এটি এখন একটি বড় বাণিজ্যের বিজ্ঞাপন। যেখানে একজন ক্রিকেটারও পণ্যের বিজ্ঞাপন করছেন। কখনও নিজেও পণ্যে পরিণত হচ্ছেন। বিজ্ঞাপনে বিজ্ঞাপিত হচ্ছে পুরো দলও। ফলে তিন মোড়লদের কাছে ক্রিকেট তার নান্দনিকতার আকর্ষণ হারাচ্ছে প্রতিক্ষণ। বাঙালিদের কাছে ক্রিকেট মানেই আবেগের কথারেণু। যাদের রক্তে ক্রিকেট, তারা বরাবরই তিন মোড়লের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার। এবার বিশ্বকাপ চলাকালেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা প্রকাশ করে বুঝিয়ে দিয়েছে। তাদের একজন অনিন্দ্য আরিফ তার স্ট্যাটাসে ফাইনাল ম্যাচের পর লিখেছেনÑ ‘এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা আর মানা যায় না। এবার লড়াই হোক মোড়লগিরির বিপক্ষে। নিপাত যাক বনেদি ক্রিকেটের চক্রান্ত। জয় হোক বিশুদ্ধ ক্রিকেটের।’ আমাদের কথাও তাই।

Category:

অলৌকিক ত্রিচক্রযান

Posted on by 0 comment

PMfঝর্ণা রহমান: তক্ষুনি একটা তক্ষক…
স্টেজে উঠে আমি কতক্ষণ বিমূঢ়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকি।
আমার মুখের সামনে রস্ট্রামে মাইক্রোফোন ঠিকঠাক করে দিয়েছে পিওন ইলিয়াস। অডিটোরিয়ামে উপস্থিত দর্শক শ্রোতার সংখ্যা ছাত্র-শিক্ষক মিলিয়ে দেড়শ থেকে বড়জোর দুশ হবে। অথচ এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষিকাই আছেন আড়াইশর মতো। ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় সাত হাজার।
আমি ইলিয়াসকে বলি, দেখো, বাইরে ছেলেমেয়েরা ঘোরাঘুরি করছে কি না, সবাইকে অডিটোরিয়ামে আসতে বলো। ইলিয়াস বকের মতো গলা উঁচু করে জানালা দিয়ে মাঠে চোখ ঘুরিয়ে আনে, বলে, ‘ম্যাডাম, ইস্টুডেন্ট স্যার ম্যাডাম কেউই আর নিচে নাই। য্যারা আইছে হ্যারা সবাই এইহানে আছে। বন্ধের দিন তো, কেউ আর কলেজে আইতে চায় না। বন্ধ তো বন্ধই। কলেজে আসতে হইলে তা আর ছুটি হইলো কেমনে তাই না ম্যাডাম?’
আমার যে কী হলো, আমি ইলিয়াসকে, যার টেকো মাথার তলায় ক্ষুদে ক্ষুদে ধূর্ত দুটি চোখে কুটকুটে আলো, নিকোটিনের কষে শুঁটকি মাছের মতো কালো হয়ে যাওয়া আমচুর-ঠোঁটে ছাঁৎলা পড়া এক ফালি হাসি, দাঁত খিঁচিয়ে বলি, ‘আচ্ছা, আজকের সরকারি ছুটিটা কী জন্য বলো তো!’
ইলিয়াস একটু ভড়কে যায়। আমার প্রশ্নের উত্তর দেবার আগে মঞ্চে ব্যাকড্রপের লেখাটা দেখার জন্য একটু ঘাড় ঘোরায়Ñ ‘ওই যে ম্যাডাম, আঙ্গুল উঁচাইয়া আছে, ওই বঙ্গবন্দুর জন্য। আজ তো জাতীয় শোক দিবস!’
ইলিয়াসের আঞ্চলিকতার জন্য শোক কথাটার উচ্চারণ হয় ‘শুক’ দিবস আর তা আমার কানে শোনায় ‘সুখ দিবস’। আমি আবার মূঢ়ের মতো ক্ষিপ্ত হয়ে বলি, ‘কী বললে স্টুপিড? সুখ দিবস?’
Ñ শ্যাখ হাচিনা তার বাবার জন্য আইজ সরকারি ছুটি…
ক্লারিফিকেশন দিতে যায় ইলিয়াস।
ঠিক তক্ষুনি একটা তক্ষকের মতো পুরনো কোনো গাছের কোটর থেকে আমার সামনে যেন পিছলে পড়ে বায়োলজির প্রভাষক নূরুল আমিন। ইলিয়াসের নাকের ডগায় নূরুল আমিন থাবা হানে।
Ñ ধেৎ গাড়ল, শুদ্ধু কইরা কথা বল গাধা। সুখ দিবস না শোক দিবস। এমনেই আমার এক কথায় ম্যাডামের মেজাজ গরম অইয়া আছে। ছরি ম্যাডাম, ছরি, আপা। ইলিয়াসের সুখ দিবস আর আমার গুল্লি দিবস এইসব কথা ভুইলা যান। আসলে গায়ের থেইকা এখনও ইন্ভার্সিটির গন্ধ যায় নাই তো, রক্ত গরম, তাই মাঝে মইধ্যে দুই একটা আউল ফাউল কথা বাইর অইয়া যায়, মানে বের হয়ে যায়। আপা, আপনি তো আবার অশুদ্ধ ভাষায় কথা শুনতে পারেন না, তবে ম্যাডাম, আমার মতে এডাই হইল গিয়া শুদ্দু ভাষা, মানে যেডা গণমানুষের ভাষা, আপনের অই বইয়ের ভাষায় কথা কইব, হইল গিয়া ইন্দুর আর বইপোকা মানে বুকওয়র্ম। মানে য্যারা বই খায়, বইয়ের ল্যাখা খায়। অই বঙ্গবন্দুতেও কিন্তু এই গণমানুষের ভাষাতেই কইতো, সাত কোটি মানুষরে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আর এখন কিন্তুক ম্যাডাম, ছরি আপা, সাত দুগুনে চৌদ্দ প্লাস দুই, ষোল্ল কোটি মানুষÑ তাগোও দাবায়ে রাখা যাবে না। তাদের ভাষা তাদের চাহিদা নিয়াই কিন্তুক আপনাদের চলতে হবে বুঝলেন তো ম্যাডাম। সরি, আপা, আবার আপনারে রাগায়া দিতাসি মনে হয়…।
নূরুল আমিন ফিঁচেল হাসিমাখা মুখে কথাগুলো বলতে থাকে।
মাইক্রোফোনটা স্ট্যান্ড থেকে খুলে হাতে নিয়ে ডাংগুলির ঘুঁটির মতো আঙ্গুলের প্যাঁচে খেলিয়ে একটা ডিগবাজি লুফে নেয়। মুখের সামনে যন্ত্রটা নিয়ে কী একটু পরখ করে। সে কি এখন মাইকে তার এসব ‘আউল ফাউল’ কথা বলা শুরু করবে? আমি দাঁড়িয়ে আছি ডায়াসের সামনে। আমাকে শুরু করতে হবে আজকের অনুষ্ঠান। আমার সামনে ছিল মাইক। এখন সেটা ছিনতাই হয়ে গেল নূরুল আমিনের হাতে!
নূরুল আমিন মাউথপিসটাতে প্রচ- একটা ফুঁ দেয়। থুতু ছিটানো একটা ঝোড়ো বাতাস যেন সারা অডিটোরিয়ামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। স্ট্যান্ডে আবার মাইকটি সেট করে দিয়ে সে আবার আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে আসে।
Ñ মাইক ও-কে। নেন ম্যাডাম।
ওর মুখ থেকে কাঁচা পেঁয়াজের গন্ধ বের হচ্ছে। সকালে কী খেয়ে এসেছে কে জানে!
Ñ শুরু করেন ম্যাডাম। অডিয়েন্স বাড়ার আর কোনো আশা নাই। আপনের আশার গুড়েবালি আপা। স্যার-ম্যাডামরা সবাই বাসায় নাকে ত্যাল দিয়া ঘুমাইতেছে নয়তো জি-বাংলায় সিরিয়াল দেখতাসে। আমরা কয়েকজন সিনসিয়ার মানুষই কেবল হাজির। আর পোলাপানে তো এইসব ইতিহাস শুনতে চায় না। তারা ফেসবুক টুইটার হোয়াটস অ্যাপ ভাইবার লইয়া বইসা আছে, নয়তো গুগুলে ইন্দুর চালান দিতাসে, মানে কম্পুটারে মাউস গুতাগুতি করতাসে। আজকালকার পোলাপান হইল বদের বদ, আসল বান্দরের স্পেসিস। এগুলারে কেমনে কী শিক্ষা দিবেন আপনে। আপনে তো ব্লগ ফেসবুক এইসব দ্যাখেন না। কি যে হাবিজাবি পোস্ট দেয়। কী সব ইনফো আর ছবি! যাক ওইসব না দেখাই ভালো। আপনের মাথা গরম হইয়া যাইবো।
নূরুল আমিনের খয়েরি চোখের ভেতরে দুটো বাতিশলা ইঁদুর কুটকুট করে ঘরের বেড়া কাটে। আবার পেঁয়াজের গন্ধ।
Ñ ম্যাডাম-আপা, ঘোষণা শুরু করেন, জনক কলাম রাইগা যাইতাসে। আর ম্যাডাম বলায় আপনি রাইগেন না। সব ম্যাডামরে ম্যাডাম বলি তো শুদু আপনেরে আপা বলতে গিয়া তাই আমার ভুল হইয়া যায়।
আশ্চর্য! আমার রাগ কোথায় গেল। আমি কি রূপকথার গল্পের মতো দুষ্ট জাদুর প্রভাবে পাথরে পরিণত হয়েছি! আমার প্রথম দায়িত্ব তো বেয়াদব-বেল্লিক বাচাল নূরুল আমিনের তামাটে দুই গালে প্রচ- থাবায় দুটি চড় বসিয়ে দেওয়া, তারপর ওর গোময়লিপ্ত মগজটিকে বত্রিশ নম্বরের সিঁড়িধোয়া পানি দিয়ে পরিশুদ্ধ করা। সেটা কীভাবে করব আমি! আমি স্থাণুদেহে চড়চড় করে মোচড় তুলি। পেছনে, ব্যাকড্রপে, আমার দৃষ্টিজুড়ে জনকের অগ্নিভ মুখ। বল্লমের মতো একটি উত্তোলিত হাত।
ব্যাকড্রপের ডিজাইনে রক্তস্নাত বাংলাদেশের মানচিত্রের রেখার ভেতরে আরও কতগুলো জ্বলন্ত রেখায় জমাট বেঁধে ওঠা মুখটি থেকে কি একটা আগুনের চাবুক হিসসস করে ওঠে! কম্পাসের বিশাল কাঁটার মতো নিশানা করা হাতের আঙ্গুল থেকে ছড়িয়ে পড়ে বৈদ্যুতিক কম্পন! আর যদি একটা গুলি চলে…
গুলি চলছে! গুলি চলছেই! কে কাকে হত্যা করছে এখন?
এখন কি আবার আয়ুব-ভুট্টো-ইয়াহিয়ার বন্দুক তাক করা হয়েছে এদেশের মানুষের ওপরে?
ছাত্রের ওপরে? জনতার ওপরে? ব্যারাকের বাঙালি সৈনিকের ওপরে?
গুলি ছুটছে? ছুটে যাচ্ছে অজস্র জ্বলন্ত আগ্নেয় শিলা?
আমি শুনতে পাই একাত্তুরের সাতই মার্চে রমনার ময়দান থেকে ইথারে ছড়িয়ে পড়া সেই অমোঘ বজ্রকণ্ঠÑ আর যদি একটা গুলি চলে… আর যদি আমার লোকদেরকে হত্যা করা হয়…।
তারপরেও ওরা গুলি চালিয়েছিল। লক্ষ লক্ষ মানুষের ওপর। নারী শিশু বৃদ্ধের ওপর।
আর নয় মাসের যুদ্ধ শেষে ওই রমনার ময়দানেই ওদের গুলিভরা বন্দুকগুলো সমর্পণ করতে হয়েছিল।
কিন্তু তারপর? তারপর সেই অস্ত্রগুলোর কী হলো? হাতবদল হলো! আরও হাত! কালো বাদামি খয়েরি লোমশ হাতের থাবায় থাবায় বন্দুক। গুলি চলছে! আবার নূর-ডালিম-রশীদ-ফারুক-মোসলেমদের হাতের আগ্নেয়াস্ত্র ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে বাংলার মানচিত্র? বত্রিশের সিঁড়িতে গড়িয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর শুদ্ধতম গাঢ়তম লাল রক্ত! ঘাতকের গুলিতে উড়ে যাচ্ছে স্ত্রী পুত্র পরিজনের মাথার মগজ। কারাগারের তালাবদ্ধ কক্ষে বন্দী নেতাদের বক্ষ ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে কালো দানবের হাত। সেসব ইতিহাস লোমশ কম্বলের তলায় কেউ চাপা দিয়ে রাখছে। আবার তাতে কেরোসিন ঢেলে বহ্নি-উৎসব করার করতাল তালে উদ্বাহু নৃত্য করছে প্রেতের দল।
চলছে ইতিহাসে গুলি, সংবিধানে গুলি, ভাষা আর সংস্কৃতিতে গুলি, রাষ্ট্রতন্ত্রে গুলি।
গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে পাঠ্যপুস্তক, মেধাবী ছাত্র, বিদ্যাপীঠ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর স্মৃতিসৌধ…।
আমি লক্ষ করি মাইক্রোফোন বাহিত হয়ে আমার কথাগুলো অডিটোরিয়ামের পিলারে ধাক্কা খেয়ে মেঝেতে পড়ে কাতরাতে থাকে। দু-একজন ছাড়া কেউ আমার কথা শুনছে না। সবাই নিজেদের মধ্যে কথা বলছে।
এ প্রতিষ্ঠানের অডিটোরিয়ামটি নির্মাণের পরে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সাউন্ডপ্রুফ করার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত আর তা হয়নি। বাইরে তখন চারপাশে অন্তত চার দুগুনে আট জায়গা থেকে আকাশ ফাটানো তীব্রতায় মাইকে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আর কোরআন তেলাওয়াত বাজানো হচ্ছে। আগে এ দিনটাতে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের গান বাজানো হতো। এখন ‘সময়ের দাবি’ মেনে নিয়ে গভর্নমেন্ট তার পলিসিতে নানারকম ব্যালেন্স আনছে। মৃত্যু দিবসে মৃতের আত্মার মাগফিরাত কামনা তো আর গানবাজনা দিয়ে হয় না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শোক দিবস উদযাপনের সরকারি প্রজ্ঞাপনে তাই আছে রচনা আলোচনা ইত্যাদির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে হামদ না’ত ক্বিরাত প্রতিযোগিতা আর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনায় দোয়া মাহফিল করার নির্দেশ। আমার মনে হচ্ছে, টুঙ্গিপাড়ার মৃত্তিকা গহ্বর থেকে ঝাঁঝরা বুকের ফোকরগুলো দুহাতে চেপে ধরে ওই মানুষটিকেই উঠে আসতে হবে তার মৃত্যু দিবসটিকে একটু শান্তিময় করে তোলার জন্য।
প্রচ- শব্দের তাড়নার মধ্যে আমার কথাগুলো সহকর্মীদের গল্পগাছা আর ছাত্র-ছাত্রীদের চেঁচামেচির ভেতরে পড়ে এখন জল বিনে মাছের মতো তড়পাতে শুরু করে।

গোলাঘরের ইঁদুরগুলো…
আর যদি একটা গুলি চলে… আর যদি আমার লোকদেরকে হত্যা করা হয়…
গুলি চলছে। একটু আগে নূরুল আমিন গুলিতে ফুটো করে দিয়ে গেছে জনকের শোক। তাকে আমি খুনি বলি। ঘাতক। সে দর্শকের আসনে বসে পাশের সঙ্গীর সাথে আমাকে মঞ্চের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে কিছু বলে। কথা বলে। হাসে। পা নাচায়। গালপাট্টা দাড়ি ঘচঘচ করে চুলকায়।
নূরুল আমিনের সহচর আমজাদ হোসেন। প্রায় একই বয়সী। ইসলামের ইতিহাসের শিক্ষক। ‘নন্দিত জীবন নিন্দিত মরণ’ নামে সে একটি বই লিখছে। কদিন আগে আমজাদ তার পা-ুলিপি এনে আমাকে দিয়ে অনুরোধ করল একটু শুভেচ্ছা বাণী লিখে দিতে। আমি সেই বই পড়তে গিয়ে দেখি নন্দিতজনের তালিকায় আছেন সক্রেটিস পিথাগোরাস এডলফ হিটলার ইমাম হাসান ইমাম হোসেন আবু হানিফা মনসুর হাল্লাজ।
হিটলার? নন্দিতজন?
আমজাদ মাথা ঝাঁকায়। অফ কোর্স। নাৎসী নেতা হিসেবে সে হয়তো সমালোচনার পাত্র। কিন্তু তার দেশে তো তিনি বীর। দিকবিজয়ের কী তীব্র বাসনা! এই বাসনা তাকে আমৃত্যু ছুটিয়ে মেরেছে। পরাজয় তাকে ছুঁতে পারেনি। এমন কি মৃত্যুও তার কাছে হার মেনেছে। তাকে কিন্তু এভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি।
Ñ জার্মানির হিটলার গ্রিসের সক্রেটিস ইরানের হাল্লাজ আরবের হাসান হোসেন… কিন্তু বাংলাদেশের…
আমজাদ আমাকে কথা শেষ করতে দেয় না। মোরগের মতো মাথা ঝাঁকায়।
Ñ ইরানের মরমী সাধককবি মনসুর হাল্লাজের কথা ধরেন। কী অদ্ভুত আধ্যাত্মিক শক্তির একজন মানুষ! যে কি না নিজের কলবের ভেতর আল্লাহকে উপলব্ধি করে বলেন আনাল হক, আমিই খোদা, আমাতেই আল্লাহ! সেই সক্রেটিসের মতো Ñ নো দাইসেলফ। আর খলিফার আদেশে তাই তার হাত পা জিভ গলা টুকরো টুকরো করে কাটা হয়। কনুই-কাটা হাত দিয়ে নিজের রক্তে নিজে অজু করে নামাজ পড়তে পারে যে মানুষ তিনি কি সাধারণ মানুষ বলেন, হাল্লাজকে নিয়ে তার দর্শন আর কবিতা নিয়ে আমাদের অনেক চর্চা হওয়া দরকার।
জ্ঞানীগুণী মহান সব মানুষকে নিয়েই চর্চা হওয়া দরকার। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান? তাকে নিয়ে চর্চা হবে না? শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ পুরুষ, নন্দিত যে মানুষটির সমগ্র জীবন উৎসর্গিত ছিল দেশের মানুষের জন্য, যার করুণতম মৃত্যু গ্রিক ট্র্যাজেডিকেও হার মানায়Ñ তাকে ছাড়া এ তালিকার মূল্য কী। নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা, মহাত্মা গান্ধী, ইন্দিরা গান্ধী?  স্বদেশের, প্রতিবেশী দেশের এসব নন্দিতজনদের ট্র্যাজিক মৃত্যু আমজাদের কাছে নগণ্য বলে মনে হলো!
আমি পা-ুলিপিটি গোল করে মুড়িয়ে ফেলি। এ পা-ুলিপির জন্য আমার কোনো শুভেচ্ছা বাণী নেই। এটি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে করা। ‘নিন্দিত বাণী’ লিখে দিতে পারি।
আমজাদ চোখের ভেতর থেকেও সেদিন ইঁদুরের সুড়ঙ্গ বেরিয়ে এসেছিল। নাক ফুলিয়ে কথা বলেছিল আমজাদÑ
Ñ প্রতিবেশী দেশ হলে কী হবে। ওরা আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি। কলকাতায় আমার পরিচিত এক কবি আছেন। আমাকে বলেছিলেন, তোমাদের দেশটা আমরা দখল করে নেব। তাহলে আর ভিসাটিসার ঝামেলা থাকবে না। আসলে একাত্তুরেই ওদের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে দেশ। তা নইলে এই দু হাজার চৌদ্দতে এসে হাসিনা ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারত না। তবে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু অবশ্যই ট্র্যাজিক। কিন্তু অনেকের কাছেই তিনি বিতর্কিত এটা মানতে হবে। তাই… তাছাড়া, হাসান হোসেন হানিফা হাল্লাজ এদের কথা তো আজকের প্রজন্ম তেমন করে জানে না। এদের ট্র্যাজেডিও গ্রিক ট্র্যাজেডির চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
আমজাদ কি এদেশের নাগরিক?
তার পূর্বপুরুষ কি এদেশের জল হাওয়া মাটি শস্য নিয়ে জীবনযাপন করেছে?
বাংলা কি আমজাদের জিভের সচলতায় প্রতি মুহূর্তে ধ্বনিত?
যে জন বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী, সে জন কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।
আমজাদ কি কখনও এ লাইনগুলো শুনেছে?
চরম ক্রোধে নন্দিত জীবনের পা-ুলিপি আমি সিঁড়ির নিচে ছুড়ে দিয়েছিলাম। তাতে করে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল আমজাদ। শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ মহানায়ক সম্পর্কে ওর মুখ থেকে বিকৃত ইতিহাস আর জঘন্য বানোয়াট মিথ্যা কাহিনি ছাগলের পায়ুপথের মলগুটির মতো ছররা গুলি ছুড়তে থাকে।

আগুনরঙা একটি শাটিন ব্যান্ড…
নূরুল আমিনকে আমজাদের সাথে তুমুল বেগে গল্প করতে দেখি আমি।
নূরুল আমিন কি সাড়ম্বড়ে আজ সকালে আমার সাথে তার বচসার কাহিনি আমজাদকে শোনাচ্ছে! আমার দিকে বারবার তার সতর্ক দৃষ্টিনিক্ষেপে সে-কথা বুঝতে মোটেও অসুবিধা হয় না।
জাতীয় শোক দিবস উদযাপন উপলক্ষে আজ সকাল আটটায় ছাত্র-শিক্ষক সবার কলেজে আসার নোটিস ছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১৫ আগস্ট যথাযথ মর্যাদায় উদযাপনের জন্য সরকারি নির্দেশ আছে। কলেজের সাংস্কৃতিক বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে আমার ওপর দায়িত্ব বর্তায় এসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করার। সকালে ব্যস্ততার এক ফাঁকে মাঠের মাঝখানে আমার মুখোমুখি নূরুল আমিন।
মাথার  চুলে পা-ব ভঙ্গিতে হাতের থাবা ঘষতে ঘষতে আমাকে বলে, ‘কী ম্যাডাম-আপা, আপনার গুল্লি দিবসের আয়োজন কতদূর? জলদি-জলদি আমাগোরে ছাইরা দেন। ছুটিডারে মাডার কইরেন না। বাসায় যাইয়া খিচুরি গরুর মাংস খাইয়া ঘুম দিমু।’
Ñ গুল্লি দিবস মানে?
নূরুল আমিন হাতের পাঞ্জা দিয়ে দানবের মতো খাবলে ধরে নিজের মাথার চুলÑ ‘গুল্লি দিবস না? আইজকার দিনে তো বঙ্গবন্দুরে গুল্লি কইরাই মারছিল। তার বউপোলাপান আ-াবাচ্চা সবার জন্য গুল্লি! তাই গুল্লি দিবস। হে হে হে…।’
Ñ আপনি এ নিয়ে মজা করছেন? রসিকতা?
Ñ কী করমু? জনগণের নেতা, হে গুল্লি খাইয়া মইরা গিয়া জনগণের জন্য একটা ছুটির দিনের ব্যবস্থা কইরা গেল। আর আপনেরা সেই ছুটি আমগোরে ভোগ করতে দেন না। নিয়া আইলেন কলেজে।
Ñ আমি নিয়ে আসব কেন, এটি সবারই নৈতিক দায়িত্ব…
Ñ আরে রাখেন আপনের নৈতিক দায়িত্ব। নৈতিক দায়িত্বের মানে জানে কেউ? যে দ্যাশে পরধান মন্ত্রী থেইকা শুরু কইরা মন্ত্রীমিনিস্টার কারও নীতি বইলাই কোনো জিনিস নাই, সেখানে আর নৈতিক দায়িত্বের সুরা পইড়েন না তো আপা! জানেন, আসার সময়ে দেখলাম আমাগো গলির ভিতর থাইকা একটা ক্যাচড়া পোলাপানের মিছিল বাইরাইতাসে। গুল্লি দিবস গুল্লি দিবস জিন্দাবাদ বইলা হেরা সোলোগান দিতাসে। ম্যাডাম দেখেন, আমাগো ছাত্রমাত্র কিন্তু বেশি আসে নাই। তারা আবার তাদের গলিতে গুল্লি দিবস করতে গেল কি না…
নূরুল আমিন আবার দুষ্টু ছাত্রের আদলে একটি সারল্যমার্কা চতুর হাসি হাসে।
আমি স্থানকাল ভুলে একটা চিৎকার দিয়ে উঠেছিলাম। আপনি একটা রাজাকার। একাত্তরের চেয়েও জঘন্য রাজাকার। আপনার ফাঁসি হওয়া দরকার। আপনি আমার সামনে থেকে যান।
চাপাকণ্ঠে নূরুল আমিনও গর্জে উঠেছিলÑ
Ñ কীসের রাজাকার? কে রাজাকার? তাইলে আপনেরা আরও বড় রাজাকার। আপনাদের মতো ভক্তিমানেরা পঁচাত্তরে সেই গুল্লি মারার দিন সবাই যাইয়া গর্তে সান্দাইছিলেন। কেউ তো একটা পরতিবাদ করেন নাই। আপনেগো ভক্তি খালি গালভরা বক্তৃতায়।
আমার চেয়ে পঁচিশ বছরের জুনিয়ার নূরুল আমিন চূড়ান্ত গোঁয়ারের মতো আমার মুখের সামনে আঙ্গুল নাড়িয়ে কথা বলে। ক্লেদাক্ত সরীসৃপের মতো তার আঙ্গুল আমার নাকেমুখে কিলবিল করে বেয়ে উঠতে থাকে। আমার ক্রোধ জমাট বেঁধে কেলাসিত হয়। আমি স্থির চোখে তাকাই নূরুল আমিনের দিকে। তার ধূর্ত ইঁদুর চোখজোড়া লক্ষ করে ঠা-া গলায় বলি, ‘এই মুহূর্তে একটা পিস্তল আমার হাতে থাকলে একটা গুলি আপনার কপালে ফুটিয়ে দিয়ে আমি আর একটা গুল্লি দিবস বানাতাম।’
আমার কথা শুনে নূরুল আমিন মহাকৌতুকে বত্রিশ দাঁত বের করে ‘ওরে বাবা, খাইছে আমারে’ বলে দৌড়ে পালায়।
আমার মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে।
কপাল টনটন করে ওঠে।
রাজাকারের ফাঁসি চাই।
উত্তাল শাহবাগ-এর আগুনরঙা একটি শাটিন ব্যান্ড আমার মাথায় আগুনপটি। নব্য রাজাকারদের ফাঁসি চাই।
কেউ এসে আমাকে হ্যাঁচকা টান মেরে মাইকের সামনে থেকে সরিয়ে নেয়। এসব কী বলছেন? আপনার মাথা খারাপ হয়ে গেছে! এটা কি রমনা না শাহবাগ? কী আবোল-তাবোল বলছেন?

খচমচে প্রেসক্রিপশন…
আমাদের কলেজের ডাক্তার খবিরুল হাসান আমার প্রেশার চেক করেছেন। পাল্স দেখেছেন। দ্রুত চলছে নাড়ি। স্নায়বিক উত্তেজনা, হতেই পারে। এ বয়সে এটা স্বাভাবিক।
Ñ আপা, শুনেন, ব্যক্তিভেদে রাজনৈতিক মতদ্বৈধতা থাকতেই পারে। তবে আপনাকে অনেক ধীরস্থির মাথার মানুষ বলেই জানতাম। আজকে এমন হয়ে গেল কেন…
ভাইস প্রিন্সিপাল টেবিলের কাচে পেপারওয়েটটি উল্টো করে চার আঙ্গুলের কারিশমায় লাটিমের মতো ঘোরাতে ঘোরাতে কথা বলেন।
Ñ ডাক্তার সাহেব, আপাকে ভালো একটা প্রেসক্রিপশান দেন। রিলাক্সিন জাতীয় কিছু। নার্ভাস স্ট্রং করে এমন কিছু। শুনেন আপা, কিছু কিছু জিনিস আছে যেসব নিয়ে বেশি মাতামাতি করতে নেই। জানেন তো কড়া পাকে দড়ি ছেঁড়ে। আমাদের কাজ ছাত্র পড়ানো। বইপুস্তকে যা আছে ক্লাসে তা পড়িয়ে দেবেন। বছর শেষে পরীক্ষাটা যাতে ভালো দেয়। বাপ-মা কিন্তু তার ছেলেমেয়ের ভালো রেজাল্টটাই চায়। কাজেই সব কিছুতে সিলেবাসের পড়াটুকু জানলেই এনাফ…
প্রেসক্রিপশান লেখা হয়ে যায়। আমার চক্ষু কর্ণ নাসিকা জিহ্বা ত্বক, আমার শাড়ির ভাঁজ, খোঁপার ফাঁস, ব্যাগের পকেটÑ সব কিছু প্রেসক্রিপশানে ভরে উঠতে থাকে।

একটি লেবুর ভ্যান…
রাস্তায় নেমে আমি উল্টোদিকের ফুটপাতের ধূলিধূসরিত কাঠচাঁপা গাছটির তলায় একজন বৃদ্ধ চালকসহ একটিমাত্র রিকশা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। রিকশাচালক কী কারণে যেন আমাকে বিনা দরদামেই তার বাহনে তুলে নেন। হয়তো আমার ক্লান্ত বিধ্বস্ত চেহারা তাকে আমার প্রতি মায়ার্ত করে তুলেছিল। আমারও বুড়ো মানুষটির প্রতি এক ধরনের সহানুভূতি জেগে ওঠে। যা ভাড়া চাইবে দিয়ে দেব। ব্যাগ খুলে আমি খুচরো টাকার পরিমাণটা দেখে নিই।
আমার ব্যাগের পকেটে, প্রতিটি চেম্বারে, মগজের কোষে, কানের ফুটোয় প্রেক্রিপশান খচমচ করতে থাকে।
রিকশা চলতে থাকে। চলুক।
আচমকা একটা বন্য সুবাস। তাজা লেবুর গন্ধের একটা ঝাপটা। গন্ধটা আমাকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরল, মনে হলো আমার শরীরই একটা আস্ত লেবুগাছের মতো ডালপালা মেলে দিয়েছে। এতক্ষণ যে বাওকুমটা ধুলোর ঘূর্ণি আমার শরীরের ভেতরটা ড্রিল মেশিনের মতো খুঁড়ে চলছিল সেখানে একটা আরাম আসে। সবুজ লেবুর গন্ধটাকে এখন আমি দিব্যি ভাবতে পারছি পতাকার রং। সেখান থেকে সতেজ হাওয়ার সুগন্ধী রসের গুঁড়া এসে আমার চোখে-মুখে চৈতন্যের ছিটা দিতে থাকে। শীতল সৌরভ রমজানের সন্ধ্যার শরবতের মতো আমাকে ভিজিয়ে দিতে থাকে। আমি ক্যাটক্যাট করে চোখ মেলি। যেন আমার চোখের সামনে এতক্ষণ কিছুই ছিল না। বা কিছু ছিল অসুস্থ, মøান, কুষ্ঠ রোগীর পচে যাওয়া গলিত আঙ্গুল নোখ নাড়িভুঁড়ি কাকচিল বারুদআগুন। আমি দম টেনে রঙিন গন্ধটা নিই। আমার ঠোঁট ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে লেবু-আস্বাদিত কথা।
Ñ ইস, কি দারুণ গন্ধ। খুব তাজা তো লেবুগুলো! মনে হচ্ছে এইমাত্র গাছ থেকে ছিঁড়ে আনা হয়েছে। এত তাজা লেবু আজকাল পাওয়া যায়!
Ñ হ, পাওয়া যায়। লেবু অহনও জাউরা হয় নাই। তাই লেবু ঠিক আছে।
আমার রিকশাওয়ালার মুখ থেকে বন্দুকের গুলির মতো আচমকা বেরিয়ে আসে কথা কটি। লেবুর সবুজ টিলা বসানো ভ্যান গাড়িটি ততক্ষণে আমাদের রিকশা ছাড়িয়ে অনেকটা সামনে এগিয়ে গেছে। আমি সেদিকে চেয়ে জারজ আর বৈধ লেবুর তারতম্য আবিষ্কারে চোখ দুটোকে উড়ন্ত হারপুনের মতো ছুড়ে মারি।
ওদিকে রিকশাওয়ালার স্বগতোক্তি ছটাছট বেরিয়ে বাতাসের পর্দাগুলোকে ফুটো করে দিতে থাকে।
Ñ দেখবেন বাজারে এহন কোনো মাছ আসল নাই। সব অইল চাষ। এরা সব জাউরা। এগো কারও কোনো রং-চেহারা বাপ-দাদার লাহান না, চরিত্র তো না-ই। খাইতে স্বাদ নাই। লাউ-কুমড়া-পটোল-আলুুু-কইডা-ফুলকফি-পাতাকফি সব জাউরা। এগো শইলডা বড়, রঙডা ঘোলা, স্বাদটা পাইনসা। খালি লেবুডা অহনও আসল আছে। তাই লেবুর গাড়ির থাইকা এমুন সুবাস ছড়াইয়া পড়ছে।
নাসারন্ধ্রে লেবুর সৌরভ মুহূর্তের জন্য আমাকে একটি সতেজ সবুজ বাগানে দাঁড় করিয়ে দিলেও বাতাস চিরে তখনও দশ দিকে ছড়িয়ে পড়ছে মাইকে বাজানো বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ। অদূরেই একটি খোলা মাঠে শোক দিবসের জনসভার আয়োজন চলছে। ডিজিটাল পোস্টারে ব্যানারে বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ দীপ্ত মুখের দৃপ্ত ভঙ্গিমার ছবি। ফুটপাতে বাদাম আমড়া ডালপুরি চা সিঙাড়ার অস্থায়ী দোকান। মানুষের ভিড়।
আমার রিকশাচালক সেদিকে চেয়ে আবার ছেড়ে দেওয়া কথার লেজটা ধরে ফেলেন।
Ñ ওই যে কত সব মানুষ। চাইরপাশে সব মানুষগুলা দ্যাহেন না? বাইরে নাকমোখ আছে তয় ভিতরটায় মানুষ নাই। খালি ঝুটা আছে। লেবুর লাহান তাজা আসল মানুষ আছিল একজনই। তারে সইজ্য অয় নাই। জাউরারা তারে মাইরা ফালাইল। জাতির পিতারে কুলাঙ্গার সন্তানেরা মাইরা ফালাইল। জাউরার আবার বাপের চিন্তা থাকে নি?
কী বলতে চান আমার চালক?
প্যাডেলে দ্রুত পা চালান তিনি। বাতাসে তার শুভ্র পাতলা চুল আর দাড়ি উড়তে থাকে।
আমাকে তিনি কোথায় নিয়ে যেতে চান? তিনি কি আস্তাকুঁড় থেকে নিকোনো প্রাঙ্গণের দিকে বোররাক ছুটিয়ে দেওয়া দেবদূত? সত্যের দিকে, ইতিহাসের দিকে, বেদনা আর রক্তময় জন্মমৃত্তিকার দিকে তার বাহনের সম্মুখচক্র তীব্র সেঁধিয়ে দিয়ে তার ধুলোমাখা নগ্ন পায়ের তলায় দৃঢ়ভাবে চেপে রাখবেন প্যাডেল?
বাতাসে আমার শাড়ির কুচি ফুলে ওঠে। আমার খোঁপার ফাঁস খুলে যায়। ডাক্তারের প্রেসক্রিপশান উড়ে যায়।
আমি কাঙ্গালের মতো আমার শ্রবণ মেলে ধরি।
কী বলছিলে গো তুমি? ও ভাই? তোমার নাম কী ভাই? তোমার কথাগুলো বলো আমাকে।
তিনি কেমন উদাস চোখে আমাকে একবার ঘাড় ফিরিয়ে দেখেন। আমাকে যেন তার বলার কিছু নেই। আমি কে-ই বা। হয়তো বা আমাকেও তিনি ভেবে নিয়েছেন জারজগোত্রের একজন। আপনমনেই কথাগুলো তিনি শস্যের চারার মতো তার পায়ের গোড়ালি চেপে চেপে প্যাডেলের ওপরে বসিয়ে দিতে থাকেন।
Ñ আহহা রে! কেমনে এমুন মানুষটারে মারলো? যে মানুষটা দ্যাশের জনগণের জন্য সারাজীবন সংগ্রাম করলো, জীবন ভইরা জ্যাল খাটলো তারাই তার বোকে গুল্লি চালাইলো। ক্যামনে পারলো এমুন এ্যাকটা মানুষের বোকে গুল্লি চালাইতে! তার বোকটা তো আছিলো এই দ্যাশটার সমান বড়। হেই বোকটারে ঝাঁজরা কইরা দিল! এখন এত বছর বাদে তিন-চাইরজন বুইড়া মানুষরে ফাঁসি দিয়া কী অইল। বিষনাগের ছানাপোনায় তো দ্যাশ ভইরা গেছে। অহন দিনে রাইতে হাজারবার হাসিনায় তার বাপের ভাষণ শুনাইয়াও কোনো কামিয়াব অইতে পারবো না। কেমনে অইবো। তার চাইরোপাশে সব ধান্দাবাজ মানুষ। অমানুষ। সব ঘরের ইন্দুর গোলার ধান খাইয়া ফালায়। অই যে বঙ্গবন্দুতে কইতো আমি কম্বল আনলাম গরিবের জন্য আর চাটার দল সব খাইয়া ফালাইল…।
হয়তো বা একটা ক্ষোভের ষাঁড় তাড়াতে লেগেছেন তিনি। দ্রুত প্যাডেল।
আবার লেবুর ভ্যানটাকে ধরে ফেলেছেন তিনি। আবার বাতাসে লেবুর ঝাপটা। এবার তিনি চেতনপুরে।
Ñ খালা, লন গন্ধ লন। তাজা গন্ধ। দেহমন চনমন কইরা উঠবো। চাইরপাশে এত আবর্জনা আর দুর্গন্ধ। তার মাঝে এই লেবুর গন্ধটা য্যান সব কিছু ফ্রেশ কইরা তোলে। সারা দ্যাশে লাখ লাখ লেবুর ভ্যান ছাইরা দিলে ভালো অইতো, না-কি কন!
স্বজ্ঞান হাসিতে দার্শনিকের প্রজ্ঞায় আলোকিত তার মুখ। এক ঝলক আমার দিকে সেই মুখ নিয়ে তাকিয়ে আবার রাস্তা দেখে প্যাডেলে চাপ দেন। কী ভেবে আবার আমার দিকে ফিরে তাকান।
Ñ কিছু মনে কইরেন না খালা। মুখ্যুসুখ্যু মানুষ। মনের খেদে কতক্ষণ বকরবকর করলাম। আপনে আমার নাম জিগাইছিলেন। গরিব রিকশাওয়ালার নাম কেউ জিগায় না। জিগাইলেও তাগো নাম কেউ মনে রাখে না। আমার নাম জসীমউদ্দীন। তয় মজিব ভাই আমার নাম মনে রাখতো। কইতো কী রে জসীম, খবর কী। ভালো আছস না-কি? কত ভালোবাসতো আমারে।
Ñ মজিব ভাই? মানে বঙ্গবন্ধু?
Ñ হ, বঙ্গবন্ধু।
Ñ আপনি রাজনীতি করেন? আমার অজান্তেই তার প্রতি আমার সম্বোধন বদলে যায়।
মাথায় দৃঢ় একটা ঝাঁকুনি দিয়ে চালক মুখ ঘোরান আমার দিকে।
Ñ হ, করতাম, রাজনীতি করছি। আমি অইলাম বঙ্গবন্ধুর সৈনিক। মজিব ভাইয়ের সাথে কত মিছিল করছি! কী একটা মানুষ আছিল মজিব ভাই। কথা কইত মোখ দিয়া না, য্যান কইলজাডা দিয়া। হের মাইয়া হাছিনা তো বাপের লাহান অইতে পারে নাই। বোকের হেই জোরডা-ই তো নাই।
Ñ আপনি কি শেখ হাসিনাকে দেখেছেন?
Ñ হ দেখছি। রাস্তায় যখন আন্দোলন করতো। জনসভায় বক্তৃতা দিতো। রিকশা থামাইয়া রিকশার উপরে খাড়ায়া তারে দেখতাম। মনে করতাম মজিব ভাইয়ের মেয়ে। আমাগো মাইয়া। বলতাম, হাসিনা তুমি এগিয়ে চলো আমরা আছি তোমার সাথে। সে তো তখন আছিল রাজপথেরই নেত্রী। তয় রাজপথ ছাইরা সংসদে গিয়া হে হইয়া গেছে সংসদ নেত্রী। তার চাইরপাশে  নানান কিছিমের মতলববাজ, স্বার্থপর আর চাটুকারের দল। এহন আর তাগোর কাছে আমার মতো গরিব রিকশাওয়ালা যাওয়ার সুযোগ নেই। তাগো দরগা ক্ষমতার গদি। আমাগো দরগা বত্রিশ নম্বর, আমাগো দরগা টুঙ্গিপাড়া। তহ আমাগো ভরসা বঙ্গবন্ধুর মাইয়া শেখ হাসিনা। হে সব বুঝে।
তীব্র স্বরে রিকশার বেল বাজে। সামনে নিশ্চয়ই কোনো বাধা। জসীম শক্ত হাতে রিকশার হ্যান্ডেল ধরে রাস্তার একটি খন্দক পেরিয়ে যান।

Category:

রোহিঙ্গারা যত দ্রুত ফিরে যাবে ততই মঙ্গল

Posted on by 0 comment

জলবায়ু বিষয়ক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী

উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে ১১ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। তাদের আমরা মানবিক কারণে আশ্রয় দিয়েছি। কিন্তু তাদের কারণে আমাদের ঐ অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট হচ্ছে। ঐ এলাকায় আমাদের যত পাহাড়ি এলাকা বা জঙ্গল ছিল সেগুলো কেটে-ছেঁটে বসতি স্থাপন করা হচ্ছে। এর ফলে এলাকাটি অনেকটা অনিরাপদ এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এজন্য আমরা চাই দ্রুততম সময়ে তারা নিজ দেশে ফেরত যাক। তারা যত তাড়াতাড়ি নিজেদের দেশে ফিরে যাবে, ততই বাংলাদেশের জন্য মঙ্গল হবে। গত ১০ জুলাই সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় দুদিনব্যাপী জলবায়ু বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপটেশন’র (জিসিএ) ঢাকা বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ-কথা বলেন। মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের প্রেসিডেন্ট হিলদা সি. হেইন, গ্লোবাল কমিশন অন এডাপটেশন’র চেয়ারম্যান ও জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন এবং সম্মেলনের কো-চেয়ার এবং বিশ্বব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. ক্রিস্টালিনা জর্জিওভা সম্মেলনে জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সামনের সারিতে থেকে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিস্তৃতি এবং এর প্রভাব প্রশমনে নিজেদের সক্রিয় উদ্যোগ সম্পর্কে আরও সচেতন হতে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। শেখ হাসিনা বলেন, বর্তমান বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-উদ্ভাবন ও অর্থায়নের যুগে জলবায়ুর প্রভাব মোকাবিলায় আমাদের অনেক সুযোগ রয়েছে, যা সকলে সহজে কাজে লাগাতে পারি। তথাপি আমি বলতে চাই, অভিযোজনের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সেজন্য সুষ্ঠু প্রশমন ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে অভিযোজন প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে না। গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপটেশন’র সহযোগিতায় আমরা জলবায়ুর ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় সঠিক অভিযোজন কৌশলের পাশাপাশি সাশ্রয়ী পন্থা ও ঝুঁকি নিরসন ব্যবস্থার সুবিধা পেতে চাই। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে অপেক্ষা করছি আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ মহাসচিবের আহ্বানে অনুষ্ঠেয় ক্লাইমেট চেঞ্জ সামিটের প্রতিবেদনের সুপারিশগুলোর জন্য। ঐ সম্মেলনে এলডিসিভুক্ত দেশসমূহ ও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আমাকে বক্তব্য দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। অভিযোজন প্রক্রিয়ায় অগ্রগামী দেশ হিসেবে বাংলাদেশে একটি আঞ্চলিক অভিযোজন কেন্দ্র স্থাপনের দাবি রাখে। বিষয়টি বিবেচনা করতে আপনাদের অনুরোধ জানাচ্ছি। তিনি এ ব্যাপারে সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়ায় বান কি মুনকে ধন্যবাদ জানান।
প্রধানমন্ত্রী গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপটেশন ঢাকা সম্মেলনের সার্বিক সাফল্য কামনা করে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব অনুমিত সময়ের আগেই আমাদের প্রত্যেকের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। সেজন্য, এর প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বকে বিনিয়োগে আরও বেশি অগ্রাধিকার দিতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বড় হুমকি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে প্রাক-শিল্প স্তরের চেয়ে প্রায় ১ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড ওপরে পৌঁছেছে। জার্মান ওয়াচ-র ক্লাইমেট চেঞ্জ ভার্নাবিলিটি ইনডেক্স-২০১৮ অনুসারে, ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৬ সময়ে বাংলাদেশ বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে ছিল ষষ্ঠতম।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তার সরকারের অক্লান্ত পরিশ্রমে গত এক দশকে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক খাতে যে বিশাল উন্নতি হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকূল প্রভাবে আজ তা হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, গত এক দশক যাবত আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসমূহ অভিযোজনের মাধ্যমে নিরসনের জন্য বছরে প্রায় ১০০ কোটি ডলার ব্যয় করছি। এ-সময় তিনি জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড গঠন এবং বাংলাদেশের নিজস্ব তহবিল থেকে জলবায়ু অভিযোজন কর্মসূচির জন্য ৪২ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি এই ফান্ডে বরাদ্দের কথাও উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় নেদারল্যান্ডের সহযোগিতায় প্রণীত শতবর্ষ মেয়াদি ডেল্টা প্ল্যানের কথা উল্লেখ করেন। তিনি প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনের সাফল্য তুলে ধরে বলেন, অনেকের মতো আমরাও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, জলবায়ু পরিবর্তন একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ এবং বৈশ্বিকভাবে আমাদের এটি সমাধান করতে হবে। প্যারিস চুক্তি হচ্ছে এই বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত এবং কার্যকর বৈশ্বিক চুক্তি।
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষয়-ক্ষতি লাঘবে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব মোকাবিলায় আমরা নিজস্ব কৌশল অবলম্বন করেছি। লবণাক্ততা, বন্যা ও ক্ষরা সহিষ্ণু ফসলের প্রজাতি উদ্ভাবন এবং চাষের মাধ্যমে এ বিষয়ে আমাদের সক্ষমতা গড়ে তুলেছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা ১৯৭২ সালে ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে সাইক্লোন প্রিপেয়ার্ডনেস প্রোগ্রাম (সিপিপি) গ্রহণ করেন, উপকূলীয় অঞ্চলে নির্মাণ করেন ১৭২টি মুজিব কেল্লা (সাইক্লোন শেল্টার)। সিপিপি’র বর্তমানে ৪৯ হাজার ৩৬৫ জন প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক রয়েছে। বর্তমান সরকার জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় ৩৭৮টি মুজিব কেল্লা নির্মাণ করছে। এছাড়া দেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলে ৩ হাজার ৮৬৮টি বহুমুখী সাইক্লোন সেল্টার নির্মাণ করা হয়েছে। আরও ১ হাজার ৬৫০টি সাইক্লোন সেল্টার নির্মাণ করা হবে। তিনি বলেন, আমরা ব্যাপক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হাতে নিয়েছি। আগামী পাঁচ বছরে দেশের ২২ থেকে ২৪ ভাগ অঞ্চল গাছপালায় আচ্ছাদিত হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে এক্ষেত্রে ব্যাপক গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী।

Category:

দেশে দেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড

Posted on by 0 comment

PMfসাইদ আহমেদ বাবু: পৃথিবীতে অনেক ক্ষণজন্মা এবং মহাপুরুষের আবির্ভাব ঘটেছে; এদের মধ্যে রয়েছেনÑ জর্জ ওয়াশিংটন, মোস্তফা কামাল পাশা, মহাত্মা গান্ধী, হো-চিন-মিন, ইয়াসির আরাফাত ও নেলসন ম্যান্ডেলা-সহ আরও অনেকে। এরা সবাই স্বপ্ন দেখেছেন স্বাধীন রাষ্ট্রের। আরও উন্নত দেশ ও স্বজাতির অধিকার আদায়ের জন্য। ঠিক তেমনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুও স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের। মহাকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তি যারা মানবের মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদেরই একজন ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’।
বিশ্বের দেশে দেশে যেমন কালজয়ী মহাপুরুষের জন্ম হয়েছে, তেমনি তাদের অনেককেই প্রাণ দিতে হয়েছে আততায়ীর গুলিতে। বিশ্বে রাজনৈতিক হত্যার বহু নিদর্শন রয়েছে। যেমনÑ ভারতের মহাত্মা গান্ধী, ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী, চিলির আলেন্দে, যুক্তরাষ্ট্রের আব্রাহাম লিংকন, মার্টিন লুথার কিং ও জন এফ কেনেডি, মিয়ানমার জেনারেল অং সান, পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান, সিংহলের প্রধানমন্ত্রী সলোমন বন্দর নায়েক। সাম্প্রতিককালে পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোও গুপ্তহত্যার শিকার হন। ব্রিটিশদের বিদায়ের পরপরই ভারত ও বাংলাদেশে স্বাধীনতার পরপরই স্বাধীনতার নায়কদের হত্যা করা হলো। ১৯৪৮ সালে প্রথম রাজনৈতিক হত্যাকা-ে নিহত হন ভারতের জাতির পিতা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হলেন। ‘কায়েদে আজম’ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার এক বছরের মাথায় বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেন। তিনি মুসলিম লীগ করতেন। কিন্তু পরবর্তীতে ক্ষমতার পালাবদল হলেও পাকিস্তানে কখনও জিন্নাহ এবং ভারতে মহাত্মা গান্ধীকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা বা ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা হয়নি, উপমহাদেশের অনেক নেতা হত্যাকা-ের শিকার হয়েছেন; কিন্তু তাদের ব্যক্তি-সিদ্ধান্তের নানা সমালোচনা থাকলেও কখনই সেটা রাষ্ট্রীয়ভাবে কালিমা লেপনের পর্যায়ে পৌঁছায় নি। হত্যাকারীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়ারও চেষ্টা করা হয়নি। উপমহাদেশে এমন রাজনৈতিক হত্যা কিংবা গুপ্তহত্যা কম হয়নি। বঙ্গবন্ধুর মতো ব্যাপক জনপ্রিয় নেতারাও হত্যার শিকার হয়েছেন। তবে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকা-টি বিশ্বের অন্যতম বর্বরোচিত হত্যাকা-। আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নীলনকশার শিকার হয়ে তাদের মতোই বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ক্ষমতাচ্যুত এবং হত্যা করেছে এদেশের সেনাবাহিনীর একটা ক্ষুদ্র অংশ। একটি বিষয়ে পৃথিবীর অন্যান্য ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রপ্রধানের হত্যার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর হত্যার একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। সালভেদর আলেন্দেকে যখন হত্যা করা হয় চিলিতে তার বাসভবনে, তার স্ত্রী ও সন্তানকে হত্যা করা হয়নি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোররাতে ‘ধানমন্ডির ৩২ নম্বর’ বাড়িতে শুধু বঙ্গবন্ধুকে নয়, তাকে তার পরিবারের সদস্যদের, এমনকি বঙ্গবন্ধুর শিশুপুত্র ৯ বছরের রাসেলকে ঘাতকের বুলেটে প্রাণ দিতে হয়েছে। শুধু দু-কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করায় বেঁচে যান। তাদের ফিরে আসার ব্যাপারেও জারি করা হয় নিষেধাজ্ঞা। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয় ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে। ওই বছরেরই জুলাই মাসে হত্যা করা হয় সৌদি আরবের কিং ফয়সলকে। তিনি এক বছরের মধ্যে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের দখলমুক্ত করে পবিত্র আল-আকসা মসজিদে নামাজ পড়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিলেন। ধারণা করা হয়, সিআইএ ও ইসরায়েলের মোসাদের যুক্ত চক্রান্তে তিনি তার পরিবারের এক সদস্যের হাতে তিনি নিষ্ঠুরভাবে নিহত হন। কঙ্গোর প্যাট্রিস লুমুম্বা, চিলির সালভাদর আলেন্দে, ব্রাজিলের জোয়াও গোলার্ট, ইরানের মোহাম্মদ মোসাদ্দেক, গুয়াতেমালার জ্যাকাবো আরবেঞ্জ কিংবা ঘানার কোয়ামে নক্রুমার তারা নিজ নিজ দেশে যখন সংস্কারের কর্মসূচি শুরু করেছেন, সিআইএ’র সাহায্য নিয়ে সেদেশের সেনাবাহিনী তাদের ক্ষমতাচ্যুত করেছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সমাজতন্ত্রী ভাবাপন্ন নেতাদের বিভিন্ন সময় সিআইএ একে একে হত্যা করেছে। ইন্দিরা গান্ধীকে হত্যা করানো হয়েছে শিখ বিছিন্নতাবাদীদের দ্বারা। আনোয়ার সাদাতকে হত্যা করানো হয়েছে চরমপন্থি মুসলিম ব্রাদারহুডের জঙ্গিদের দ্বারা। যদিও বলা হয়, ইয়াসির আরাফাত রোগাক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এখন জানা যাচ্ছে, মোসাদের চরেরা তার শরীরে স্পের পয়জনিংয়ের ব্যবস্থা করেছিল। এ সময়কালে শত ষড়যন্ত্র করেও সিআইএ কিউবার ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে হত্যা করতে পারেনি। ফিদেল ক্যাস্ট্রো ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আপনজন। বঙ্গবন্ধুকে বর্ণনা করতে গেলে কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল ক্যাস্ট্রোর উক্তি সবার আগে মনে পড়বে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, তার সিদ্ধান্ত, অবিচলতা নিয়ে বলতে গিয়ে ক্যাস্ট্রো বলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি; কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতায় তিনি হিমালয়ের মতো।’

আব্রাহাম লিংকন
আব্রাহাম লিংকন ১৮০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ৪ তারিখে আমেরিকার কেনটাকি প্রদেশের একটি ছোট গ্রামে দরিদ্র ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি আজীবন দাস প্রথার বিরোধিতা করেছেন। সংসদে তিনি এই প্রথা বাতিলের জন্য বক্তব্য উপস্থাপন করলে বিতর্কিত হন এবং ব্যর্থ হন। ১৮৪৭-৪৯ সাল পর্যন্ত মার্কিন হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ১৮৫৮ সালে তিনি মার্কিন সিনেট নির্বাচনে মার্কিন রিপাবলিকান দলে যোগ দিয়ে স্টিফেন ডগ্লাসের বিপক্ষে প্রার্থী হন; কিন্তু নির্বাচনে হেরে যান। এ-সময় ‘লিংকন ডগ্লাস বিতর্ক’ এবং কৃতদাস প্রথা সম্পর্কে ক্যানসাস-নেব্রাস্কা আইনের ওপর বিতর্ক অল্পদিনের মধ্যেই লিংকনকে জাতীয় খ্যাতি এনে দেয়। তেমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কিংবা ব্যাপক অর্থ-প্রতিপত্তি না থাকা সত্ত্বেও ১৮৬০ সালে রিপাবলিকানের হয়ে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য নমিনেশন পান লিংকন, যেখানে তার প্রতিপক্ষ ছিল অনেক বেশি প্রভাবশালী। ডেমোক্রেটিক দলকে হারিয়ে ১৮৬০ সালে আমেরিকার ১৬তম প্রেসিডেন্ট হন লিংকন। ১৮৬১ সালের ৪ মার্চ থেকে ১৮৬৫ সালের ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। দাস প্রথাকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের সময় তিনি উত্তরাঞ্চলীয় ইউনিয়ন বাহিনীর নেতৃত্ব দেন এবং দক্ষিণের কনফেডারেট জোটকে পরাজিত করেন। ১৮৬১ সালের ১ জানুয়ারি স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে সই করার মধ্য দিয়ে লিংকন যুক্তরাষ্ট্রে দাস প্রথা বিলুপ্ত করেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি প্রায় ৩৫ লাখ ক্রীতদাসকে মুক্ত করতে সক্ষম হন। ১৮৬৩ সালে গৃহযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে নভেম্বর মাসে পেনসিলভানিয়ার গেটিসবার্গ অঙ্গরাজ্যে তিনি একটি ভাষণ দেন। এই ভাষণই ইতিহাসে বিখ্যাত ‘গেটিসবার্গ ভাষণ’ নামে পরিচিত এবং এটি পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম বিখ্যাত মাত্র ২ মিনিটের, ২৭২ শব্দের শ্রেষ্ঠ ভাষণ। দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর লিংকন বেশিদিন ক্ষমতায় ছিলেন না। কেননা তিনি আততায়ীর হাতে খুন হন নির্বাচিত হওয়ার কিছুদিন পরই। ১৮৬৫ সালের ১৪ এপ্রিল ফোর্ড থিয়েটারে একটি অনুষ্ঠানে নাটক দেখতে যান তিনি। সেখানে জন উইকস বুথ তার মাথার পিছনে গুলি করে হত্যা করে। বুথ লিংকনকে হত্যা করেছিল, কারণ সে কনফেডারেটের একজন সমর্থক ছিল এবং লিংকন ছিলেন কনফেডারেটের বিরোধী।

মহাত্মা গান্ধী
ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর মতো জনপ্রিয় নেতা হয়তো কেউ ছিলেন না। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অগ্রগামী ব্যক্তিদের একজন। ইংরেজদের কাছ থেকে ভারতের স্বাধীনতার আন্দোলনে তার ছিল উল্লেখযোগ্য ভূমিকা। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম জনক তিনি। তার অহিংস সত্যাগ্রহের পথকে সম্মান জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রথম উচ্চারণ করেছিলেন ‘মহাত্মা’ শব্দটি। সেই তখন থেকেই বিশ্ববাসীর কাছে গান্ধী পরিচিত হন মহাত্মা গান্ধী নামে। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে ফিরে এসে স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দেন গান্ধী। ঘুরে দেখেছিলেন গোটা দেশ। বোঝার চেষ্টা করেছিলেন মানুষের সমস্যা। এরপর কংগ্রেসে যোগ দেন। তার নির্দেশেই স্বাধীনতার আন্দোলন করেছে জাতীয় কংগ্রেস। কিন্তু কোনোদিন কোনো পদ গ্রহণ করেন নি গান্ধী। মহাত্মা গান্ধী সব পরিস্থিতিতেই অহিংস মতবাদ এবং সত্যের ব্যাপারে অটল থেকেছেন। নিজের দলের সহিংস আন্দোলনের প্রেক্ষিতেও অনশনে বসেছেন একাধিকবার। ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি গান্ধীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সে-সময় তিনি নতুন দিল্লির বিরলা ভবন মাঝে রাত্রিকালীন পথসভা করছিলেন। তার হত্যাকারী নথুরাম গডসে ছিলেন হিন্দু মৌলবাদী চরমপন্থি সংগঠন হিন্দু মহাসভার আদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত। হিন্দু মহাসভা বিভিন্ন কারণে গান্ধীর মতের বিরোধী ছিল। গান্ধীর ইচ্ছানুযায়ী তার দেহভস্ম বিশ্বের বেশ কয়েকটি প্রধান নদী যেমনÑ গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, সিন্ধু, নীল নদ, ভোলগা, টেমস প্রভৃতিতে ভাসানো হয়।

সলোমন বন্দরনায়েক
সলোমন বন্দরনায়েক। সম্ভ্রান্ত সিংহলি-আমেরিকান খ্রিষ্টান পরিবারে তার জন্ম ৮ জানুয়ারি ১৮৯৯ সালে। তরুণ আইনজীবী হিসেবে সিলন ন্যাশনাল কংগ্রেসে সক্রিয় ছিলেন। ১৯২৬ সালে কলম্বো মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিলের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৩১ থেকে ১৯৪৭ সালে সিলন স্টেট কাউন্সিলে কর্মরত ছিলেন। সিংহলি সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়ের প্রতি আগ্রহ থাকায় ১৯৩৬ সালে সিংহলা মহাসভা আয়োজন করেন। ১৯৪৬ সালে ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টিতে যোগ দেন ও ১৯৪৭ থেকে ১৯৫১ মেয়াদে মন্ত্রী পর্যায়ের বিভিন্ন পদে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৫১ সালে শ্রীলংকা ফ্রিডম পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫৬ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পর সমসমাজ পার্টি, শ্রীলংকার কমিউনিস্ট পার্টিকে নিয়ে চারদলীয় জোট গড়েন ও প্রধানমন্ত্রী মনোনীত হন। দেশের রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে সিংহলিকে গ্রহণ করেন, ইংরেজি ভাষার অবনমন ঘটান, সাম্যবাদের উত্তরণ ঘটান ও পশ্চিমাবিরোধী রাজনীতির প্রবর্তন ঘটান।
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখেন। কাতুনায়েকে ও চীনা বে থেকে ব্রিটিশদের বিমান ঘাঁটি এবং ত্রিকোমালি থেকে নৌ ঘাঁটি গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য করেন। ঘরোয়া রাজনীতিতে অর্থনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি হন ও ভাষার বিষয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ পায়। ১৯৫৮ সালে সংখ্যালঘু শ্রীলংকান তামিলদের দাঙ্গার কবল থেকে মুক্ত রাখতে ব্যর্থ হন। ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৫৯ তারিখে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ৬০ বছর বয়সে তালদুয়ে সোমারামা নামীয় একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী কর্তৃক গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।

পাত্রিস লুমুম্বা
পাত্রিস লুমুম্বা ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোর স্বাধীনতার স্থপতি। তিনি ছিলেন বিপ্লবী জাতীয়তাবাদী নেতা ও সাহিত্যিক। পাত্রিস লুমুম্বা বেলজিয়াম অধিকৃত কঙ্গোতে ১৯২৫ সালের ২ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। তার আসল নাম ছিল এলিয়াস ওকিত আসম্বো। ছাত্র হিসেবে মেধাবী লুমুম্বা ক্যাথলিক ও প্রোটেস্টান্ট স্কুলে পড়াশোনা করেন ও বৃত্তি পান। তিনি ফরাসি, লিংগালা, সোয়াহিলি ও সিলুবা ভাষা জানতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে লুমুম্বার সঙ্গে কঙ্গোর বুদ্ধিজীবী আর উদারপন্থি রাজনীতিকদের সঙ্গে জানাশোনার শুরু হয়। ১৯৪৭ সাল নাগাদ লুমুম্বাকে শ্রমিক ইউনিয়ন আর নানান বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকা-ের সঙ্গে যুক্ত হতে দেখা যায়। আফ্রিকাতে বর্ণ-সম্পর্ক উন্নত করার প্রয়াসেও শামিল হন লুমুম্বা। ১৯৫০-এর দশকের শুরুতেই ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী উদারপন্থি পত্রিকা সম্পাদনা শুরু করেন। এ সময় তার কলমে আরও আসে কবিতা, কঙ্গো আর কালো মানুষের জন্য কবিতা। লুমুম্বার নেতৃত্বে ১৯৫৮ সালের অক্টোবরে গঠিত হয় দ্য ন্যাশনাল কঙ্গোলিজ মুভমেন্ট (এমএনসি)। সংগঠনের কাজে সারাদেশে ঘুরতে শুরু করেন লুমুন্বা। জনগণের মনের কথা পড়তে পারার সক্ষমতায় অনতিবিলম্বে লুমুম্বার কণ্ঠে উচ্চারিত হয় অমোঘ সেই শব্দ, স্বাধীনতা। ১৯৫৮ সালের ডিসেম্বরে ঘানার আক্রাতে অনুষ্ঠিত প্যান-প্যাসিফিক পিপলস কনফারেন্সে যোগ দিয়ে কেবল কঙ্গো নয়, গোটা আফ্রিকায় ঔপনিবেশিক শাসনমুক্তির দাবিতে সোচ্চার হন লুমুম্বা। ১৯৫৯ সাল জুড়ে সব রাজনৈতিক দলকে মতৈক্যে আনতে সর্বশক্তি ব্যয় করেন তিনি। অনেক আঞ্চলিক দল নানা প্রদেশে প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়। ১৯৬০-এর মে মাসে জাতীয় নির্বাচনে লুমুম্বার প্রচেষ্টার পক্ষে কথা বলেনি। ১৩৭ আসনের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে লুমুম্বার এমএনসি মাত্র ৩৩ আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। কঙ্গোর আরেক জাতীয়তাবাদী নেতা জোসেফ কাসাভুবুর আবাকো দল পায় ১৩টি আসন। বিদ্যমান বাস্তবতায় নিরুপায় লুমুম্বা কাসাভুবুকে প্রেসিডেন্ট পদ দিয়ে নিজে হলেন কঙ্গোর প্রথম প্রধানমন্ত্রী। জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের এই নাজুক ধারাবাহিকতাতেই জুনে স্বাধীন হয় কঙ্গো। কঙ্গো হাতছাড়া হয়ে গেলেও কঙ্গোতে অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে রাখতে সক্ষম হয় এত দিনের প্রভুরা। কঙ্গোজুড়ে অরাজকতা ছড়িয়ে দেওয়ায় কাজে লাগানো হয় অনুগত রাজনীতিক ও সেনাবাহিনীকে। ১৯৬০ সালের সেপ্টেম্বরে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে লুমুম্বা ও কাসাভুবুকে পদচ্যুত করা হয়। ডিসেম্বরে গ্রেফতার হন লুমুম্বা। জানুয়ারি মাসের ১৭ তারিখ বন্দী অবস্থায় হত্যা করা হয় কঙ্গোর স্বাধীনতার স্থপতি লুমুম্বাকে। এরপর কঙ্গো চলে যায় সামরিক বাহিনীর হাতে। মাত্র ৩৫ বছরের একটি জীবন পেয়েছিলেন প্যাট্রিস লুমুম্বা। ক্ষণস্থায়ী সে জীবন উৎসর্গিত হয়েছিল জন্মভূমির স্বাধীনতার লড়াইয়ে।

জন এফ কেনেডি
১৯৩৬ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি হার্ভার্ড কলেজে ভর্তি হন। ১৯৪০ সালে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। পিতা জোসেফ পি. কেনেডি সিনিয়র-এর উৎসাহ আর সহযোগিতায় তিনি রাজনীতিতে আসেন এবং ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত ডেমোক্রেটদের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৫২ সালে কেনেডি সিনেটের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির মাঠে তার গুরুত্ব বাড়তে শুরু করে। ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির হোতা রিচার্ড নিক্সনকে তিনি ১৯৬০ সালের নির্বাচনে পরাজিত করে মার্কিনিদের দুঃস্বপ্নের ইতি টেনেছিলেন। ১৯৬১ সালের ২০ জানুয়ারি ৩৫তম মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কেনেডি প্রেসিডেন্ট থাকাকালে কিউবার মিসাইল সঙ্কট, পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি, মহাকাশে স্যাটেলাইট স্থাপনের প্রতিযোগিতা ও নাগরিক অধিকার আন্দোলনের মতো বেশ কিছু বিষয় ঘটে। কেনেডি যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া ঠা-া লড়াইয়ের ইতি টানা ও ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে সরে আসার চেষ্টা করছিলেন বলে মনে করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেট কমানোর পক্ষেও ছিলেন কেনেডি। বর্ণবাদে বিভক্ত যুক্তরাষ্ট্রকে একত্র করতে তিনি কাজ করেছেন। কেনেডি সমর্থন জানিয়েছেন সমান নাগরিক অধিকারের আন্দোলনকে। পাশে দাঁড়িয়েছেন কৃষ্ণাঙ্গদের। সমালোচিত হয়েছেন, তবু বরাবর ওদের হয়েই কথা বলেছেন। বিখ্যাত হয়ে আছে তার সেই মন্তব্য : ‘একটা কালো বাচ্চা জন্মানোর পর, তার স্কুলে পড়ার সুযোগ একটা সাদা বাচ্চার অর্ধেক। কলেজে যাওয়ার সুযোগ তিন ভাগের এক ভাগ। কালোদের চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনাও সাদাদের এক-তৃতীয়াংশ। নিজের একটা বাড়ি হওয়ার স্বপ্ন পূরণের সম্ভাবনাও অর্ধেক। কালোরা সাদাদের থেকে শুধু চার গুণ এগিয়ে আজীবন বেকার থাকার সম্ভাবনায়!’ আফ্রিকান আমেরিকানদের আইনগত অধিকারের পক্ষে কেনেডি ছিলেন সোচ্চার। তাদের পূর্ণ নাগরিক অধিকার দিয়ে কেনেডির তৈরি করা একটি বিলই পরে নাগরিক অধিকার আইন হিসাবে অনুমোদন পায়। ১৯৬৩ সালের ২২ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে এক মোটরশোভাযাত্রায় আততায়ীর গুলিতে নিহত হন ৪৬ বছর বয়সী এই প্রেসিডেন্ট।

মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র
কিংবদন্তি আফ্রিকান-আমেরিকান মানবাধিকার কর্মী মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র ১৯২৯ সালের ১৫ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি গান্ধীর অহিংস আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। এর ফলে ১৯৫৯ সালে গান্ধীর জন্মস্থান ভারত সফর করেন। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় অহিংস আন্দোলনের জন্য ১৯৬৪ সালে তিনি নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ। ১৯৫৫ সালে তিনি মন্টোগোমারি বাস বর্জনের নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৩ সালে ওয়াশিংটনে কৃষ্ণাঙ্গদের অর্থনৈতিক মুক্তি, চাকরির সমতা অর্জন এবং সর্বক্ষেত্রে সমান অধিকার লক্ষ্যে কিং বেয়ারড রাস্তিন এবং আরও ৬টি সংগঠনের সহায়তায় এক বিশাল সমাবেশের আয়োজন করেন। প্রায় ৩ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে কিং তার সেই বিখ্যাত ‘আই হেভ এ ড্রিম’ শীর্ষক ভাষণ দেন, যা এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে শ্রেষ্ঠ ভাষণগুলোর মধ্যে একটা বিবেচিত হয়। এক বর্ণবাদী শ্বেতকায় আমেরিকান ১৯৬৮ সালের ৪ এপ্রিল মার্টিন লুথার কিং-কে হত্যা করে।

চে গুয়েভারা
বিপ্লবী আর্নেস্ত চে গুয়েভারা ১৯২৮ সালের ১৪ জুন আর্জেন্টিনার রোসারিও গ্রামে জন্ম নেন। মানুষের তরে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করতেই সংগ্রামের পথ বেছে নেন চে গুয়েভারা। চে আর্জেন্টিনার নাগরিক হলেও কিউবার বিপ্লবে অংশগ্রহণ করেন। ফিদেল ক্যাস্ট্রোর ঘনিষ্ঠতম বন্ধু চিকিৎসক চে গুয়েভারা ১৯৫৯ সালে কিউবার বিপ্লবের অন্যতম নায়ক। তিনি কিউবার মন্ত্রীও হয়েছিলেন। কিন্তু পরে আর্জেন্টিনাকে মুক্ত করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে গোপনে কিউবা ত্যাগ করেন। আর্জেন্টিনার জঙ্গলে গোপন গেরিলা বাহিনী গড়ে তোলেন। তাতে আঁতকে ওঠে আমেরিকাসহ পুঁজিতান্ত্রিক দেশগুলো। চে’কে তারা মূর্তিমান আতঙ্ক মনে করলে তার বিরুদ্ধে উঠে পড়ে লাগে। চে গুয়েভারা বিশ্ব ইতিহাসে যিনি বিপ্লবের এক মহানায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ১৯৬৭ সালে তাকে সিআইএ আহত অবস্থায় আটক ও ৯ অক্টোবর হত্যা করে।

ডাক্তার সালভাদর আলেন্দে
ডাক্তার সালভাদর আলেন্দের জন্ম চিলির ভালপ্যারাইসোতে, ১৯০৮ সালের ২৬ জুন। সিলি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেডিকেল গ্রাজুয়েট হন তিনি। আলেন্দে ছাত্র-জীবন থেকে চিলির কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ১৯৩৩ সালে জার্মানিতে, হিটলারের অভ্যুত্থানের পর থেকে যে প্রচ- ইহুদি বিদ্বেষ তৈরি হয়, তখন তার প্রতিবাদ করে হিটলারকে এক টেলিগ্রাম পাঠান। ২৫ বছর বয়সে সহকর্মীদের নিয়ে ১৯৩৩ সালে সোস্যালিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন চিলির একাধিক নির্বাচনে লড়েছেন ১৯৫২ সাল থেকে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পপুলার ইউনিটি ফ্রন্ট গঠন করে তিনি জয়লাভ করেন। আলেন্দে সরকার গঠন করে চিলিতে উন্নয়নমূলক নানা সংস্কার আন্দোলন চালু করেন। আলেন্দে ক্ষমতায় এসে প্রথমেই চিলির সমস্ত তামার খনি এবং বিদেশিদের (বিশেষ করে মার্কিন) মালিকানাধীন অনেক ব্যবসা ক্ষতিপূরণ ছাড়াই বাজেয়াপ্ত করেন ও এগুলোর জাতীয়করণ করলেন। বিদেশনীতিতে পরিবর্তন এনে কিউবা ও চীনের সাথে বৈদেশিক সম্পর্ক গয়ে তুললেন। দেশের জনগণের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার জন্য তিনি দ্রব্যমূল্যের দাম স্থির করে ন্যূনতম বেতন বাড়িয়ে দিলেন। আলেন্দের শক্তির মূল উৎস ছিল দেশের কৃষক-শ্রমিক ও নিম্নবিত্ত জনগণ। তারা আলেন্দের এই পদক্ষেপগুলোকে স্বাগত জানায়। চিলির প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি তার খনিজ সম্পদ। সেই সম্পদই আলেন্দের জন্য কাল হয়েছিল। সেখানে মার্কিন পুঁজির মূল বিনিয়োগ ছিল সর্বোচ্চ। চিলির তামার খনি ও অন্যান্য কারখানা জাতীয়করণের ফলে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ ও দেশীয় প্রতিক্রিয়াশীলরা আলেন্দের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। কিছু সরকারি আমলা ও সেনাবাহিনীর একটা অংশ চলে যায় সিআইএ-র খপ্পরে। ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র মদতপুষ্ট সামরিক রক্তাক্ত ক্যু-এর মাধ্যমে চিলির জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করা হয়। মিলিটারি জেনারেল পিনোচে ক্ষমতা দখল করেন, চিলিতে প্রতিষ্ঠিত হয় আমেরিকার মদতপুষ্ট এক স্বৈরতন্ত্রী সরকার। আলেন্দের মৃত্যু হয় এই ক্যু-র ফলে। এই অভ্যুত্থানে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় দেশের শীর্ষ মার্কসবাদী নেতাদের। ঘাতকরা সবাইকে খুন করে।

ইন্ধিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধী
ইন্ধিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধী বিশ্বব্যাপী যার পরিচিতি ইন্দিরা গান্ধী নামে। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ও মা কমলা নেহরুর একমাত্র সন্তান ইন্দিরা। এক বর্ণময় এবং গতিময় জীবনের অধিকারী ছিলেন ইন্দিরা। ব্রিটেনের অক্সফোর্ডে ইতিহাস, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে পড়াশোনা করেন। ইন্দিরা গান্ধী জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯৫৯ সালে। ১৯৬৪ সালে তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সদস্য হন। ইন্দিরা গান্ধী ভারতের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী। তিনি চার-দফা ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। একটি খারাপ সময়ে শক্ত হাতে রাষ্ট্রীয় অখ-তা রক্ষার গুরুদায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিষাদময় পরিণতি বরণ করতে হয় ইন্দিরা গান্ধীকে। এই ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই ইন্দিরা গান্ধী তার জীবন দিয়েছেন। পবিত্র স্বর্ণমন্দিরের অবমাননা আর খালিস্তানের স্বপ্ন ধূলিস্মাৎ করে দেওয়ার প্রতিশোধস্বরূপ ৩১ অক্টোবর ১৯৮৪, সাৎওয়ান্ত সিং ও বেয়ান্ত সিং নামে নিজের দুই শিখ দেহরক্ষীর গুলিতে নিহত হন ইন্দিরা গান্ধী। স্বর্ণমন্দিরে অভিযানের পরের মাসে ‘র’-এর ডিরেক্টর মিসেস গান্ধীকে পরামর্শ দিয়েছিলেন তার নিরাপত্তা কর্মীদের মধ্যে থেকে শিখদের অপসারণ; কিন্তু সেই ফাইল যখন ইন্দিরা গান্ধীর টেবিলে পৌঁছায়, তখন ভীষণ রেগে গিয়ে তিনি নোট লিখেছিলেন, ‘আরন্ট উই সেকুলার?’ অর্থাৎ, ‘আমরা না ধর্মনিরপেক্ষ দেশ?’ দক্ষিণ এশীয় রাজনীতিতে ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তার উল্লেখযোগ্য সমর্থন ইতিহাসে চিরঃস্মরণীয়। ভারতের ইতিহাসে একটি করুণ, অনাকাক্সিক্ষত ও মর্মবিদারক ঘটনা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকা-।

ইয়াসির আরাফাত
ইয়াসির আরাফাত ১৯২৯ সালের ২৪ আগস্ট মিসরের কায়রোতে জন্মগ্রহণ করেন। আরাফাত ১৯৯৪ সালে আইজ্যাক রবিন ও শিমন পেরেজ-এর সাথে অসলো শান্তিচুক্তির জন্য একত্রে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। ২০০২ হতে ২০০৪ সালের শেষভাগ পর্যন্ত আরাফাত ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর হাতে তার রামাল্লার দপ্তরে কার্যত গৃহবন্দি হয়ে থাকেন। ফিলিস্তিনি এই মহান নেতা ২০০৪ সালের ১১ নভেম্বর প্রয়াত হন। ফ্রান্সে চিকিৎসারত অবস্থায় তার মৃত্যুকে এখনও রহস্যজনক মনে করেন ফিলিস্তিনি জনগণ। ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’ তাকে ষড়যন্ত্রের জালে ফেলে এবং শ্লো পয়জনিং করে হত্যা করে বলে দৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে।

বেনজীর ভুট্টো
বেনজীর ভুট্টো ১৯৫৩ সালের ২১ জুন পাকিস্তানের করাচিতে এক ধনাঢ্য এবং রাজনৈতিক সচেতন পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং মাতা ছিলেন বেগম নুসরাত ইস্পাহানি। ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান পিপলস পার্টিকে ঢেলে সাজান বেনজীর ভুট্টো ও তার মাতা নুসরাত ভুট্টো এবং যৌথভাবে তারা পার্টির কো-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৮৭ সালের জুলাই মাসে বেনজীর সিন্ধু প্রদেশের ব্যবসায়ী আসিফ জারদারিকে বিয়ে করেন। এ দম্পতি তিন সন্তানের জনক-জননী হন। ১৯৮৮ সালে পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয় বেনজীর সমর্থিত পাকিস্তান পিপলস পার্টি। মাত্র ৩৫ বছরে প্রধানমন্ত্রীর আসন অলঙ্কৃত করে ইতিহাস গড়েন বেনজীর ভুট্টো। ১৯৯০ সালে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ দুই বছরের মাথায় বিদেশি প্ররোচনায় বেনজীর ভুট্টোকে পদ থেকে অব্যাহতি দেন পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি গুলাম ইসহাক খান। ১৯৯৩ সালে পাকিস্তানের নির্বাচনে আবারও বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয় পাকিস্তান পিপলস পার্টি এবং বেনজীর ভুট্টো দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী পদে নির্বাচিত হন। এ-সময় তিনি পাকিস্তান পিপলস পার্টির সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। এর মধ্যে আততায়ীর হাতে বেনজীরের ভাই মুর্তাজা ভুট্টোর হত্যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল হয়ে পড়ে। বেনজীরকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করে পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ওয়াসিম সাজ্জাদ। এ-সময় তিনি ও তার স্বামী জারদারিকে গ্রেফতার করে কারাদ- দেওয়া হয়। ফলে আবারও তিনি নির্বাসনে লন্ডনে পাড়ি জমান। ২০০৭ সালে পাকিস্তানের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ আর বেনজীর ভুট্টোর মধ্যে রাজনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে এক দফা সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং ফলশ্রুতিতে প্রায় আট বছরের নির্বাসন কাটিয়ে ২০০৭ সালের অক্টোবরে করাচিতে ফেরেন বেনজীর ভুট্টো। পাকিস্তানের রাওলপিন্ডি ২০০৭ সালে নির্বাচনী জনসভায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল দেশটির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোকে। এ ঘটনার ১০ বছর পর সেই হত্যাকা-ের দায় স্বীকার করেছে জঙ্গিগোষ্ঠী তালেবান।

Category:

বাংলাদেশ কে সৃষ্টি করেছেন?

Posted on by 0 comment

PMf আনিসুল হক: “সবাইকে অনেক বড় স্বপ্ন দেখতে হবে। ভাবতে হবে আমাকে যেন মানুষ মনে রাখবে। কিন্তু মানুষ কেন মনে রাখবে, সেটি ঠিক করতে হবে। বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সবাই তাঁকে মনে রেখেছে। এভাবেই সবাইকে স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি তা বাস্তবায়নের জন্য কাজ করতে হবে।”Ñ কথাটা ঢাকায় এক ভাষণে বলেছিলেন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও প্রখ্যাত বিজ্ঞানী এ পি জে আবদুল কালাম (প্রথম আলো ডট কম, ১৭ অক্টোবর ২০১৪)।
প্রতিটা জিনিসেরই একজন নির্মাতা থাকেন। এই চেয়ারটা কে বানিয়েছেন, এই টেবিলটা কে বানিয়েছেন, বলে দেওয়া যাবে। তেমনি যদি প্রশ্ন ওঠে, বাংলাদেশ কে নির্মাণ করেছেন, এই প্রশ্নের উত্তরে বলতে হবে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাই তো তাকে বলা হয়, জাতির জনক।
এ ধারণাটা নিয়ে আমি একটা ছড়া রচনা করেছি :

ফেইসবুকটা কে বানাল, বলতে পারো,
জানলে পরে উত্তরটা জলদি সারো
সবাই পারে, জবাব আসে দু-চার লাখ,
ফেইসবুকটা বানিয়েছেন জুকারবার্গ।

বলো তো কারা করল বিমান আবিষ্কার,
জবাব আসে, সঙ্গে সঙ্গে পরিষ্কার,
রাইট ব্রাদার্স রাইট ব্রাদার্স দুজন ভাই।
কে আছে যার এই জবাবটা জানাই নাই?

বাংলাদেশটা কে বানাল বলো দেখি
সবাই জানে সবাই মানে জবাব একই
সূর্য তারায় উত্তরটা দহমান
শিরায় শিরায় জবাব নিত্য বহমান
স্বাধীনতার মানের সঙ্গে সহমান
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান

বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সমার্থক। ‘যারা ভোর এনেছিল’ কিংবা ‘উষার দুয়ারে’Ñ ইতিহাসভিত্তিক এই উপন্যাসগুলো লিখতে গিয়ে আমাকে ইতিহাসের অলিগলি রাজপথ পরিক্রম করতে হয়েছে। ইতিহাস যতই পড়েছি, ততই এই প্রত্যয় উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়েছে যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মই হয়েছিল বাংলাদেশটাকে তিনি স্বাধীন করবেন বলে। তিনি তার সারাটা জীবন একটা লক্ষ্য নিয়েই কাজ করেছেন, এগিয়ে গেছেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা, বাংলাদেশের মানুষের মুক্তি। এই লক্ষ্য অর্জন করতে গিয়ে তিনি বারবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন, তিনি ও আর তার পরিবার অসহনীয় দুঃখ-কষ্ট-যাতনা ভোগ করেছেন; কিন্তু তিনি লক্ষ্যচ্যুত হননি, তিনি আমাদের স্বাধীন করে গেছেন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন তিনি কখন দেখতে শুরু করেন?
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিজের ভাষায়, “সেই ১৯৪৭ সালে। তখন আমি সোহরাওয়ার্দী সাহেবের দলে।” (অন্নদাশংকর রায়, ইতিহাসের মহানায়ক, প্রকাশক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ২০১১)।
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা বিদায় নিল, পাকিস্তান আর ভারতÑ দুটো দেশ জন্ম নিল। কলকাতার ইসলামিয়া কলেজের সিরাজ-উদ-দৌলা হলে যুবক শেখ মুজিব ডাকলেন তার ঘনিষ্ঠ ছাত্র-যুবা কর্মীদের। বললেন, “স্বাধীনতা সংগ্রাম এখনও শেষ হয়নি। এবার আমাদের যেতে হবে বাংলাদেশের পবিত্র মাটিতে। এই স্বাধীনতা স্বাধীনতাই নয়।”
বঙ্গবন্ধু ১৯৪৭-এ পূর্ববাংলায় ফিরেই মুসলিম লীগ সরকার ও পশ্চিমাদের বাঙালি-বিরোধী অন্যায় PMf2আচরণের প্রতিবাদে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৯৪৮ সালেই তিনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের মিছিলের নেতৃত্ব দেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তিনি কারাবরণ করেন।
তার নেতা সোহরাওয়ার্দীও তাকে চিঠি লিখে বলেছিলেন, বাংলাকে আঞ্চলিক ভাষা হিসেবে মেনে নিতে; কিন্তু রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকেই গ্রহণ করতে। গোয়েন্দা সংস্থার গোপন রিপোর্টে বলা হয়েছে, “শেখ মুজিবুর রহমান ডিজঅ্যাপ্রুভড দি সাজেশন অব মিস্টার সোহরাওয়ার্দী টু গিভ রিজিওনাল স্ট্যাটাস অব বেঙ্গলি। শেখ মুজিবুর রহমান রিসিভড দি সাজেশনস অব মিস্টার সোহরাওয়ার্দী থ্রু এ লেটার। অন্য কর্মীরাও সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে একমত হলো না।” (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জীবন ও রাজনীতি, সম্পাদক : মোনায়েম সরকার)।
শেখ মুজিবের পেছনে গোয়েন্দারা ছায়ার মতো লেগে থাকত। তিনি কখন কী করতেন, সেই ’৪৮-’৪৯ সাল থেকেই তার সম্পর্কে রিপোর্ট করা হতো সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরে। তাকে গ্রেফতার করা হতো। গ্রেফতারের পরই তার মুক্তির দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়ে যেত। তাকে জামিনের জন্য কোর্টে নেওয়া হলে সেখানেও ভিড় জমে যেত। তিনি সেই জনতার উদ্দেশ্যে আবার বক্তৃতা করতে শুরু করতেন মুসলিম লীগ সরকারের অপশাসনের বিরুদ্ধে। ১৪ মার্চ ১৯৫১-এ শেখ মুজিবের গতিবিধি সম্পর্কে সরকারি নথিতে বলা হচ্ছে, “গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার লুৎফর রহমানের পুত্র শেখ মুজিবুর রহমানকে গোপালগঞ্জ কোর্ট থেকে ১৪ মার্চ জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। কিছু সংখ্যক ছাত্র মিছিল সহকারে তাকে নিয়ে বের হয়ে আসে ও সভা অনুষ্ঠিত হয়। মুজিবুর রহমান সভায় ভাষণ দেন। তিনি মওলানা ভাসানীসহ অন্যদের বিনাবিচারে আটক রাখার বিরুদ্ধে সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন এবং ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। মুজিবুর রহমানকে সেদিনই গ্রেফতার করা হয়।… পরের দিন তাঁর মুক্তির দাবিতে গোপালগঞ্জে হরতাল পালিত হয়। স্থানীয় ছাত্ররা শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ও ফ্রান্স কর্তৃক মরক্কোর ওপরে নিপীড়নের প্রতিবাদে মিছিল করে। মিছিল শেষে সভায় শেখ মুুজিবের মুক্তির জন্য লড়াই করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।” (ইংরেজি থেকে অনুবাদ লেখকের) এই ছিল ওই সময়কার নিত্য চিত্র। শেখ মুজিব জেল-জুলুমকে পরোয়া করতেন না। সাহস, দেশপ্রেম আর আপসহীনতা ছিল তার রক্তের কণায়।
সরকারি গোয়েন্দারা তার মুচলেকা আদায়ের চেষ্টা করেছেন, তিনি কখনও মুচলেকা দিতেন না, বলতেন, সরকারের অন্যায়ের প্রতিবাদ তিনি করেই যাবেন। এখন সেই গোয়েন্দাদের সরকারি রিপোর্ট থেকে দেখা যায়, তারা বলতেন, এই বন্দীর অবস্থান খুব শক্ত। তাকে টলানো যায় না।
১৯৫১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারিতে খুলনা কারাগারে তার সঙ্গে সাক্ষাতের রিপোর্ট দিচ্ছেন জনৈক গোয়েন্দা ২৬ ফেব্রুয়ারিতে, “হি ওয়াজ নট উইলিং টু এক্সিকিউট এনি বন্ড ফর রিলিজ ইভেন ইফ দি ডিটেনশন উড কজ হিম টু ফেস ডেথ। হিজ অ্যাটিচুড ওয়াজ ভেরি স্টিফ।” এই বাক্যগুলো খেয়াল করুন, যদি তার অন্তরীণ থাকাটা তার মৃত্যুও ডেকে আনে, তবু তিনি কোনো মুচলেকায় স্বাক্ষর করবেন না। তার মনোভাব ছিল ভীষণ অনড়। যতবার যতজন গোয়েন্দা তার কাছে বন্ড স্বাক্ষর করাতে গেছেন, ততবার তারা একই মনোভাবের পরিচয় পেয়েছেন, একই কথা লিখেছেন। ২২ মে-র গোয়েন্দা রিপোর্টেও বলা হচ্ছে, “তিনি (মুজিব) তাঁর অতীতের রাজনৈতিক কর্মকা- নিয়ে মোটেও অনুতপ্ত নন, বরং তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে তাঁর মুক্তির পর একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে তাঁর কাজ পুরোদমে চালিয়ে যাবেন। কী করবেন, সে-কথা জানাতে তিনি অনিচ্ছুক। মুক্তি পেতে তিনি খুবই আগ্রহী; কিন্তু মুক্তির জন্য কোনো বন্ডে তিনি সই না করার ব্যাপারে স্থিরচিত্ত। হিজ অ্যাটিচুড ওয়াজ ভেরি স্টিফ… তাঁর মনোভাব খুবই অনড়।”
শেখ মুজিব বারবার জেলে যেতেন, তাকে এক জেল থেকে আরেক জেলে বদলি করা হতো, জামিন নিয়ে বেরোনোর সময় কারাগারের ফটকে লোক জমে যেত, তিনি সেখানেই আবার সরকারের অন্যায়ের প্রতিবাদ করে বক্তৃতা করতেন, আবার তাকে জেলে পোরা হতো। কিন্তু তাকে দমানো যেত না।
তিনি তো কারাগারে। আর ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে বেগম মুজিব ভাসতেন অকূল পাথারে। এমনও হয়েছে, আগের দিন শেখ মুজিব মন্ত্রী, কেন্দ্রের এক ঘোষণায় সরকারের পতন হয়ে গেছে, তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, সরকারি বাসা ছেড়ে দিতে হচ্ছে, বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বেগম মুজিব পথে পথে ঘুরছেন, কেউ তাদের বাসা ভাড়া দিতেও সাহস পাচ্ছে না। বেগম মুজিবের অপরিসীম সাহস আর আত্মত্যাগের কাহিনি লিখতে গেলে পুরো একটা বই লিখতে হবে।
১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় কারাগারে বঙ্গবন্ধু অনশন ধর্মঘট করেছিলেন। তাকে কিছুতেই খাওয়ানো যাচ্ছিল না। তার হার্ট দুর্বল ছিল, জীবনহানির আশঙ্কা দেখা দিল। শেষে সরকার তার প্রতিজ্ঞার কাছে নতি স্বীকার করল। তিনি মুক্তি পেলেন। টুঙ্গিপাড়ায় গেলেন। সে-সময়ের একটা ঘটনা তিনি ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখেছেনÑ
“একদিন সকালে আমি ও রেণু বিছানায় বসে গল্প করছিলাম। হাচু ও রাসেল নিচে খেলছিল। হাচু মাঝে মাঝে খেলা ফেলে আমার কাছে আসে আর ‘আব্বা আব্বা’ বলে ডাকে। রাসেল চেয়ে থাকে। একসময় রাসেল হাচিনাকে বলছে, ‘হাচু আপা, হাচু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি।’ আমি আর রেণু দু’জনই শুনলাম। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে যেয়ে ওকে কোলে নিয়ে বললাম, ‘আমি তো তোমারও আব্বা।’ রাসেল আমার কাছে আসতে চাইত না। আজ গলা ধরে ঝুলে রইল। বুঝতে পারলাম, এখন ও আর সহ্য করতে পারছে না। নিজের ছেলেও অনেক দিন না দেখলে ভুলে যায়! আমি যখন জেলে যাই তখন ওর বয়স মাত্র কয়েক মাস।”
এই ছিল বাস্তবতা। শেখ মুজিব লড়ছেন বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য, তাই তাকে জীবনের অনেকটা সময় কাটাতে হচ্ছে কারাগারে, তার ছেলে তাকে ভাবছে আপার আব্বা। শেখ মুজিব যদি তার নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যকে বড় করে দেখতেন, বেগম মুজিব যদি তার পরিবারের সুখ ও নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতেন যে কোনো সাধারণ নারীর মতো, তাহলে এই দেশটা এত সহজে স্বাধীন হতো না। বঙ্গবন্ধু নিজের প্রাণের ভয়ে কোনো দিনও ভীত ছিলেন না। ওই ১৯৫১ সালে কারাগারে জেরা করতে আসা গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে তিনি যে কথা বলেছেন, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তা-ই ছিল তার মূলমন্ত্র, যদি মৃত্যু আসে আসুক, তবু বাংলার মানুষের মুক্তির প্রশ্নে কোনো আপস নয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তার ফাঁসি হতে পারত, ওই সময় বন্দিশালায় তাকে গুলি করে মারার ষড়যন্ত্র হয়েছিল। তার নিজের ভাষায় “আমি দুই দুইবার মরতে মরতে বেঁচে গেছি। প্রথমবার আইয়ুব খানের বন্দিশালায়। ষড়যন্ত্রের মামলায়। আমার এক সাথী আমাকে সতর্ক করে দেয় যে সন্ধ্যাবেলা সেলের বাইরে গিয়ে নিয়মিত বেড়ানোর ব্যাপারটি বিপজ্জনক। পেছন থেকে গুলি করবে আর বলবে পালিয়ে যাচ্ছিল বলে গুলি করেছি। অন্যের বেলা ঘটেও ছিল ওরকম গুলি চালনা। দ্বিতীয়বার ইয়াহিয়া খানের কারাগারে। আমার সামনেই আমার কবর খোঁড়া হচ্ছে। বুঝতে পারছি যে আমার সময় ঘনিয়ে আসছে।” (অন্নদাশংকর রায়)।
আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে এভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। একাত্তর সালে যখন পাকিস্তানের কারাগারে তাকে আটকে রাখা হয়েছে, তখন তার মৃত্যুদ- স্থির হয়ে গিয়েছিল, তার জন্য সেলের পাশে কবর খোঁড়া হয়েছিল। সামান্য আপস বাংলাদেশের মুক্তির পথকে বাঁকা আর দুর্গম করে তুলতে পারত। তা তিনি করেন নি।
অন্যদিকে আছেন বেগম ফজিলাতুননেসা মুজিব। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের প্রিয় রেণু। কী অসাধারণ এক নারীই না পেয়েছিলাম আমরা আমাদের জাতীয় ইতিহাসে! যার কথা ইতিহাসে আসে না। কারণ, নারী ও পরিবারের সদস্যদের ত্যাগ আর অবদানের কথা থেকে যায় ইতিহাসের অন্তরালে। আমাদের ইতিহাসের দুটো খুব মাহেন্দ্রক্ষণে বেগম মুজিব নীরবে আমাদের ইতিহাসের গতি-প্রকৃতিকে ইতিবাচকভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। একটা হলো ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনের সময়। শেখ মুজিব তখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি হিসেবে ক্যান্টনমেন্টে বন্দী। ওই সময় একটা গোলটেবিল বৈঠকে শেখ মুজিবকে অংশগ্রহণ করানোর জন্য প্যারোলে মুক্তি দিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা হচ্ছিল। সারাদেশে প্রচ- আন্দোলন হচ্ছে। আর এই সময় শেখ মুজিব প্যারোলে মুক্তি নিয়ে যাবেন আইয়ুব খানের সঙ্গে বৈঠক করতে! বেগম মুজিব তাড়াতাড়ি ডেকে পাঠালেন বড় মেয়ে হাসিনাকে। শেখ হাসিনার হাতে চিরকুট দিলেন। শেখ হাসিনাও সেই চিরকুটের বার্তাটা মুখস্থ করে নিলেনÑ যদি প্রহরীরা চিরকুট কেড়ে নেয়! বেগম মুজিবের বার্তাটা ছিল, সারাদেশের মানুষ তোমার মুক্তির দাবিতে আন্দোলনরত, খবরদার তুমি প্যারোলে মুক্তি নিবা না। যদি তুমি প্যারোলে মুক্তি নিয়ে আস, আমি তোমার বিরুদ্ধে পল্টনে সভা করব। (শেখ হাসিনার কিছু স্মৃতি কিছু কথা, মঞ্জুরুল ইসলাম, সময় প্রকাশনী)।
সেই বার্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তখনকার ছাত্রী শেখ হাসিনা পৌঁছে দিয়েছিলেন। শেখ মুজিব সেদিন সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তিনি প্যারোলে মুক্তি নেননি। বঙ্গবন্ধু হিসেবে মাথা উঁচু করে বেরিয়ে এসেছিলেন।
একাত্তরের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক জনসভায় যোগ দিতে যাবেন বঙ্গবন্ধু। তিনি খুব অস্থির। একদিকে ছাত্র-জনতার প্রচ- চাপ, আজই স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে হবে। অন্যদিকে সারা পৃথিবী তাকিয়ে আছে ওই ভাষণটির দিকে। আমরা আজ জানি, এমনকি আমেরিকার কাগজপত্রে দেখা যাচ্ছে, আমেরিকার ক্ষমতাকেন্দ্রও নির্ঘুম অপেক্ষা করছিল শেখ মুজিব কী বলেন তা জানার জন্য। ইউনিল্যাটারাল ডিক্লারেশন অব ইনডিপেনডেন্স যদি আসে, তার মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত পাকিস্তানি মিলিটারি। এই অবস্থায় কী করবেন বঙ্গবন্ধু! নিজের ঘরে তিনি পায়চারি করছেন। বেগম মুজিব তাকে বললেন, তুমি এত অস্থির কেন। শুয়ে খানিকক্ষণ রেস্ট নাও। মুজিব শুয়ে পড়লেন। তাঁর মাথার কাছে মোড়া নিয়ে বসা শেখ হাসিনা, পায়ের কাছে বেগম মুজিব। বেগম মুজিব বললেন, তুমি তোমার নিজের বিবেকের কথা বলবা। তোমার সামনে লক্ষ মানুষের হাতে বাঁশের লাঠি, পেছনে বন্দুক। তুমি তা-ই বলবা, যা তোমার অন্তর বলতে চায়। শেখ মুজিব খানিকক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থেকে উঠলেন। যাওয়ার আগে বেগম মুজিবের কপালে চুম্বন করলেন। খানিকটা দেরি করেই তিনি পৌঁছালেন সভামঞ্চে। মানুষ তখন অধীরভাবে প্রতীক্ষা করছে, নির্মলেন্দু গুণের ভাষায়, ‘কখন আসবে কবি?’
‘শত বছরের শত সংগ্রাম শেষে, রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।
… গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শোনালেন তার অমর কবিতাখানি, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’
এত ত্যাগ, এত বীরত্ব, এত ভালোবাসা, এত প্রজ্ঞা দিয়ে মানুষটি আমাদের স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন! ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে স্বাধীনতা ঘোষণার ওই রাতে তিনি সাংবাদিক আতাউস সামাদকে বলেছিলেন, “আই হ্যাভ গিভেন ইউ ইন্ডেপেন্ডেন্স, নাউ প্রিজার্ভ ইট।” (আজকের কাগজ, ২২.০১.৯৩)। আমাকে আতাউস সামাদ একাধিকবার বলেছেন, ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু তাকে বলেছিলেন, “আমি ইউডিআই দিচ্ছি (ইউনিলিটারাল ডিক্লারেশন অব ইন্ডিপেনডেন্স বা স্বাধীনতার একতরফা ঘোষণা)। আমি তোদের স্বাধীনতা দিয়ে গেলাম, যা তোরা রক্ষা কর।”
ইথারে ছড়িয়ে পড়ল সেই ঘোষণা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।
১৯৭২ সালে সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট বঙ্গবন্ধুকে জিগ্যেস করেছিলেন, “আজ এই মুহূর্তে অতীতের দিকে তাকিয়ে আপনি কোন দিনটিকে আপনার জীবনের সব চাইতে সুখের দিন বলে গণ্য করবেন? কোন মুহূর্তটি আপনাকে সব চাইতে সুখী করেছিল?”
বঙ্গবন্ধু বলেন, “আমি যেদিন শুনলাম, আমার বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, সে দিনটিই ছিল আমার জীবনের সব চাইতে সুখের দিন।”
ফ্রস্ট : আপনার জীবনের সব চাইতে সুখের দিন?
শেখ মুজিব : সমগ্র জীবনের সব চাইতে সুখের দিন।
ফ্রস্ট : এমন দিনের স্বপ্ন আপনি কবে থেকে দেখতে শুরু করেন?
শেখ মুজিব : বহুদিন ধরে আমি এই স্বপ্ন দেখে আসছি।
তাকে হত্যা করার জন্য বারবার সব আয়োজন সম্পন্ন করেও পাকিস্তানিরা তাকে মারতে পারেনি! ভুট্টোর হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার আগে ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন, আমাকে আর দুটো দিন সময় দিন, আমি শেষ কাজটা করে নিই, শেখ মুজিবের মৃত্যুদ-টা কার্যকর করি।
সেই মৃত্যুদ- সেদিন কার্যকর হয়নি। হয়েছে আরও চার বছর পরে।
আর তার প্রাণ কেড়ে নেবে বাঙালিরা, এটা বঙ্গবন্ধু কোনোদিনও ভাবতে পারেন নি। তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত হচ্ছে, তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হতে পারে, এসব তথ্য বিভিন্নভাবে তার কাছে পৌঁছানো হয়েছিল, এমনকি ভারতীয়রাও এই তথ্য জানাতে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছিল। আমেরিকার অবমুক্ত নথি থেকে আমরা আজ তা জানি। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাঙালিদের বিশ্বাস করতেন নিজের চেয়েও বেশি। তিনি মৃত্যুকে ভয় পেতেন না, আর এটা তাকে বিশ্বাস করানো অসম্ভব ছিল যে, কোনো বাঙালি তাকে আঘাত করতে পারে। তিনি বলেছিলেন, তার সবচেয়ে বড় গুণ হলো তিনি তার দেশের মানুষকে বেশি ভালোবাসেন। আর তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, তিনি দেশের মানুষকে একটু বেশিই ভালোবাসেন। সেই ভালোবাসা আর বিশ্বাস তার মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠল। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাকে হত্যা করেছে যারা, তাদের ভাষা ছিল বাংলা, তাদের হাতে ছিল গরিব বাঙালির রক্ত পানি করা টাকায় কেনা অস্ত্র। শুধু বঙ্গবন্ধু নন, শুধু বেগম মুজিব নন, শিশুপুত্র রাসেল, গর্ভবতী পুত্রবধূও রেহাই পায়নি সেই হত্যাকা-ের রাতে!
জাতির জনককে হত্যা করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিকেই পেছনের দিকে ফেরানোর চেষ্টা করা হলো। তার নাম মুছে দেবার চেষ্টা হলো নানাভাবে। কিন্তু দিন যতই যাচ্ছে, ততই উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বল হয়ে উঠছেন তিনি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বাঙালির জাতির জনক। বিবিসি বাংলার জরিপে যে উঠে এসেছিল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, তা যথার্থÑ কারণ বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে তিনিই বাঙালিকে একটা স্বাধীন রাষ্ট্র উপহার দিয়েছেন।
আজ বাংলাদেশের স্বাধীনতা আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কথা দুটো সমার্থক হয়ে উঠেছে।

লেখক : কবি, কথাসাহিত্যিক, সাংবাদিক

Category: