Blog Archives

ভিশন-২০৪১-এর সহযোগী হতে আগ্রহী সিউল

Posted on by 0 comment

PMfউত্তরণ প্রতিবেদন: লি  নাক-ইয়োন বলেছেন, বাংলাদেশকে একটি উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য ভিশন-২০৪১ বাস্তবায়নে সিউল সব সময় বাংলাদেশের পাশে থাকবে। তিনি ১৪ জুলাই সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে এ কথা বলেন। বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারার প্রশংসা করে লি বলেন, দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেয় এবং দেশটি বাংলাদেশের ভিশন-২০৪১ বাস্তবায়নে এর উন্নয়ন সহযোগী হতে চায়। সাক্ষাৎ শেষে রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মোহাম্মদ জয়নাল আবেদিন ব্রিফিংয়ে এ-কথা জানান। লি বলেন, যদিও কোরিয়া বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বস্ত্র খাতের মধ্য দিয়ে শুরু করেছে, এখন এ সম্পর্ক আরও বৈচিত্র্যময় হয়েছে। সাক্ষাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার বৈঠকের কথা তুলে ধরে বলেন, বৈঠক অনেক ফলপ্রসূ হয়েছে এবং আগামী দিনে এই সম্পর্ক আরও বেশি শক্তিশালী হবে। গত ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী                 শেখ হাসিনা দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া সকল বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানান। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।
দুদেশের মধ্যে বাণিজ্য কোরিয়ার পক্ষে খুব বেশি ঝুঁকে আছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই বাণিজ্য বৈষম্য কমাতে আমরা আপনাকে দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া সকল বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার দেওয়ার অনুরোধ জানাই।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোরিয়া বাংলাদেশ থেকে ওভেন গার্মেন্টস, ওষুধ, নিটওয়্যার, পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ফ্রোজেন ফুড ও সিরামিক সামগ্রী আমদানি করতে পারে। জবাবে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী লি নাক-ইয়োন দক্ষিণ কোরিয়ার বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবেন। প্রেস সেক্রেটারি বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধানমন্ত্রী ব্যাপক বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে বলে বাংলাদেশকে ‘সম্ভাবনাময় দেশ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। লি বলেন, দক্ষিণ কোরিয়া বৈদেশিক উন্নয়ন সহায়তা (ওডিএ) হিসাবে বাংলাদেশের জন্য ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ করেছে। দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের ইপিজেডগুলোতে টেক্সটাইল, ট্যানারি ও পাদুকা কারখানাসমূহে কোরিয়ার যথেষ্ট বিনিয়োগ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা স্মরণ করি যে, ১৯৯৬-২০০১ সালে আমার প্রথম মেয়াদে কোরিয়ান কোম্পানিগুলো প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতে বিনিয়োগ করেছিল।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোরিয়া এখানে জিটুজি এবং পিপিপি মডেলের অধীনে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব শিল্প নগর’-এ বিনিয়োগ করতে পারে। ওটা বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ কেন্দ্র। তিনি বলেন, কোরিয়া ১.৬১৯ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের জিডিপি নিয়ে বিশ্বের ১২তম অর্থনীতি। তিনি আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য কোরিয়ার আগ্রহকে স্বাগত জানাই।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোরিয়া স্বাস্থ্য, আইসিটি, শিক্ষা, পানি বিশুদ্ধকরণ, জ্বালানি ও পরিবহন খাতে অর্থনৈতিক এবং কারিগরি সহযোগিতাসহ বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান উন্নয়নের অংশীদারদের মধ্যে অন্যতম। তিনি বলেন, ‘কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল                 কো-অপারেশন এজেন্সি-কোইকা আমাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক কল্যাণ খাতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।’ তিনি ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম (আইটিএস)-এর জাতীয় মহাসড়কে করিডরগুলোর নির্ভরযোগ্যতা ও নিরাপত্তার উন্নতির জন্য কোরিয়ান তহবিলের প্রশংসা করেন।
ঢাকা-সিউল ৩টি চুক্তি স্বাক্ষরিত : বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ, কূটনীতি ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ঢাকা ও সিউলের মধ্যে ৩টি চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। ১৪ জুলাই বিকেলে শেখ হাসিনা ও লি নাক-ইয়োনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক বৈঠক শেষে ইনস্ট্রুমেন্টগুলো স্বাক্ষর হয়। এগুলো হলোÑ এক. কোরিয়ার পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ন্যাশনাল ডিপ্লোমেটিক একাডেমি এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফরেন সার্ভিস একাডেমির মধ্যে সহযোগিতা বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর। দুই. বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ কোরিয়া মধ্যে বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষে কোরীয় ট্রেড ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন এজেন্সি এবং বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভলোপসেন্ট অথরিটির মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর। তিন. বাংলাদেশ ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি সংক্রান্ত বিষয়ে দুদেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়।

Category:

‘সেবা ডিজিটাল হলে দুর্নীতি থাকবে না’

Posted on by 0 comment

PMfউত্তরণ প্রতিবেদন: সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে সম্পৃক্ত হয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেছেন, সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে আইসিটির জ্ঞান ও ব্যবহার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তৃণমূলে আইসিটি সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার ফলে জনগণের জীবনমানে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। গত ১০ বছরে বাংলাদেশ ডিজিটাইজসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নয়ন অর্জন করেছে।
এদিকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, দুর্নীতি রোধে সরকার সকল সেবা ডিজিটাল করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ১ হাজার ৫০০ সরকারি সেবার ৩০০টি ইতোমধ্যে ডিজিটালাইজড করা হয়েছে। বাকি সকল সেবাকে ডিজিটাল করার প্রক্রিয়া চলছে। সরকারের সকল সেবা ডিজিটাল হতে থাকায় ক্রমান্বয়ে দুর্নীতিও কমে আসছে। সরকারের সকল সেবা ডিজিটাল করা হলে দুর্নীতির কোনো সুযোগ থাকবে না। আর দ্রুত সময়ে দেশকে ডিজিটালাইজড করার কার্যক্রম বাংলাদেশ ছাড়া খুব কম দেশই পেরেছে। আমরা এখন ই-গভর্নমেন্ট মাস্টারপ্ল্যান করছি। এখন যেহেতু ক্রিটিক্যাল কিছু সিস্টেম হয়ে গেছে। এটার ওপর বেইজ করে অন্যান্য সার্ভিস ডিজিটাইজ করা সহজ হয়ে গেছে।
গত ১০ জুলাই রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে সংসদ সচিবালয় আয়োজিত ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ : সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি’ শীর্ষক কর্মশালায় বক্তব্য প্রদানকালে তারা এসব কথা বলেন। সংসদ সদস্যদের মধ্যে ডিজিটাল বাংলাদেশ নিয়ে ধারণা দিতে এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়। এই অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করেছে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ। জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব ড. জাফর আহমেদ খান-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে ডেপুটি স্পিকার মো. ফজলে রাব্বী মিয়া এমপি, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন এমপি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এমপি প্রমুখ বক্তব্য রাখেন। কর্মশালায় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী, সংসদ সদস্যবৃন্দ এবং জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্য স্পিকার আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিজিটাল বাংলাদেশ উপহার দিয়ে এক নবদিগন্তের উন্মোচন করেছেন। এই ডিজিটাল রূপান্তরের মূল কারিগর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য দৌহিত্র ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা, ডিজিটাল বাংলাদেশের স্থপতি সজীব ওয়াজেদ জয়। সারাদেশের জনগণ মাত্র ১০ বছরে ডিজিটাল সেবার সুফল ভোগ করছে উল্লেখ করে স্পিকার বলেন, মেধাভিত্তিক জ্ঞাননির্ভর সমাজ গঠনে অবদান রাখছে ডিজিটালাইজেশন। তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ মানবসম্পদই উন্নত বাংলাদেশের মূল চালিকাশক্তি হতে যাচ্ছে।
স্পিকার বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার পাশাপাশি ডিজিটাল নেতৃত্ব গড়ে তুলতে সংসদ সদস্যদের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ আয়োজন করেছে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ। তিনি বলেন, জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান বেতবুনিয়ায়                ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে মহাকাশ জয়ের যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের প্রচেষ্টায় ‘বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট’ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে সেই স্বপ্নের বাস্তব রূপ দিয়েছেন।
বিভিন্ন প্রকল্প অনুমোদন, বাস্তবায়ন এবং তদারকিতে ডিজিটাল পদ্ধতি অনুসরণ করতে সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সোপানে নিয়ে যেতে দেশের পুরনো আইন-কানুনে পরিবর্তন আনার পাশাপাশি মানসিকতায়ও পরিবর্তন আনতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করলে তারাই বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরবে। সে লক্ষ্যে তরুণ প্রজন্মের জন্য যথাযথ শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি। বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য বিদ্যমান নীতি ও আইনের পরিবর্তন দরকার উল্লেখ করে জয় বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের প্রতিযোগী হিসেবে না দেখে তাদের সঙ্গে পার্টনারশিপ করে এগিয়ে যেতে হবে। এটা করতে হলে নীতিমালা, আইনের দ্রুত পরিবর্তন প্রয়োজন। করতে পারলে আমরা আরও দ্রুত এগিয়ে যেতে পারব। সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, ‘আমরা ডিজিটাল সেক্টরে এখন যেটা ফেস করছি তা হলো বাইরের অনেক কোম্পানি আসতে চায়। বিনিয়োগ করতে চায়। তবে আমাদের অনেকের মধ্যে একটি ধারণা রয়ে গেছে, বিদেশি কোম্পানি এসে খালি প্রফিট নিয়ে চলে যায়। ভেবে দেখুন, আজকে যদি বিদেশি কোম্পানি বাংলাদেশে না আসত থ্রিজি, ফোরজি আমরা বাস্তবায়ন করতে পারতাম না। আজকে তারা কিন্তু দেশে এসে শুধু প্রফিট নিয়ে চলে যায়নি। তারা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। কত মানুষের লাভ হয়েছে, তারা ট্যাক্স দিচ্ছে। আজকের যুগ বিশ্বায়নের। নিজেদের আলাদা করে রাখতে পারি না। অর্থনীতি আরও ওপেন করতে হবে। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ায় যে কোনো কোম্পানি বিনিয়োগ করতে পারে। আমাদের সেদিকে যেতে হবে। সরকার একা সব পারে না। সরকারের সব কিছু করা উচিতও না। কারণ সরকার যদি সব কিছু করতে যায়, তখন আরেকটি বিষয় দাঁড়ায়। সেটা হলো সিস্টেম লস। বেসরকারি খাত লাভ-লোকসান বেশি দেখে। সেখানে সিস্টেম লস কম।’
বিনিয়োগ বাড়াতে মানসিকতার পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, ‘প্রয়োজন হলো আমাদের নিজেদের মাইন্ড সেট পরিবর্তন করা। তরুণ প্রজন্ম এবং সিনিয়রদের মধ্যে একটা জেনারেশন গ্যাপ থাকে। এটা বাস্তব। আমি একটু অনুরোধ করব, আমরা এখন আধুনিক পদ্ধতিতে নিজেদের চিন্তাধারা, ভয় ছেড়ে আরও অন্যান্য যেসব দেশ এগিয়ে গেছে যেমনÑ সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া তাদের কাছ থেকে উদহারণ নিয়ে নিজেদের নিয়ম-আইন-নীতিমালা একটু দ্রুত পরিবর্তন করব।’
তিনি বলেন, ‘১০ বছর আগে আমাদের দেশে শুধুমাত্র টুজি ছিল। ১০ বছরে আমরা শুধু থ্রিজি নয়, ফোরজিতে চলে এসেছি। আর আমাদের এখন পরিকল্পনা আছে যে সারাবিশ্বে যখন ফাইভজি আসবে তার সঙ্গে সঙ্গে এগোনোর।’ বাংলাদেশে বিদ্যমান টেলিযোগাযোগ নীতিমালা পরিবর্তনের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, ‘আমাদের আইসিটি অবকাঠামো যেটা করেছি, যেমনÑ হাইটেক পার্ক, ডেটা সেন্টার। এগুলো আপনারা দেখেছেন। আরেকটা হলো আমাদের টেলিকমিউনিকেশন। আমাদের ডেটা নেটওয়ার্কটাই আইসিটির রাস্তা। আপনারা যেমন নির্বাচনী এলাকায় রাস্তার কাজ করেন। সেই টেলিকমিউনিকেশনের রাস্তার কাজ আমরা করছি। ১০ বছর আগে আইসিটি মন্ত্রণালয় বলতে কিছু ছিল না। বাংলাদেশ সংসদ বিভিন্ন আইন করে এই মন্ত্রণালয় আজকে বাস্তবায়ন হয়েছে। সেগুলো আমরা নতুন করে করার সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু আমাদের টেলিকমিউনিকেশন এখনও সেই ২০ বছর আগের। এটাকে আমাদের নতুন করে মডেল পদ্ধতিতে আনার প্রয়োজন। আমি উদ্যোগ নিয়েছি। প্রায় ১৫ বছরের পরিকল্পনা করেছি। আমরা সম্পূর্ণ নতুন একটা টেলিকমিউনিকেশন পলিসি করব।

এনআইডি যাচাইয়ে গেটওয়ে ‘পরিচয়’ উদ্বোধনে জয়
চালু হলো জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) যাচাই করার গেটওয়ে ‘পরিচয়’ (www.porichoy.gov.bd)। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় এই ওয়েবসাইটটি অনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। গত ১৭ জুলাই রাজধানীর আগারগাঁওয়ের আইসিটি টাওয়ারে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে ওয়েবসাইটটির উদ্বোধন করা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন আইসিটি বিভাগের প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। এছাড়া আইসিটি বিভাগের সচিব এনএম জিয়াউল আলম, বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হোসনে আরা বেগম, এটুআই-এর পলিসি এ্যাডভাইজার আনির চৌধুরীসহ আইসিটি বিভাগের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জয় বলেন, সরকারি সেবাগুলো সহজে ও দ্রুততম সময়ে জনগণের মাঝে পৌঁছে দিতে চাই আমরা। আর সে-লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের টার্গেট প্রায় ৯০ শতাংশ সরকারি সেবা মানুষের মোবাইলে থাকবে; আঙ্গুলের সামনে থাকবে। সরকারি সেবা পেতে জনগণকে যেন সরকারি অফিসগুলোতে যেতে না হয় তা আমার স্বপ্ন। তারই একটি অংশ হিসেবে বেসরকারি খাতের সঙ্গে পার্টনারশিপ করে আমাদের                এই সফল উদ্যোগ।

Category:

ভয়াবহ ২১ আগস্ট

Posted on by 0 comment

PMfসরদার মাহামুদ হাসান রুবেল: আগস্টের ২১ তারিখ ২০০৪ অশ্রুভেজা রক্তে মাখা আরও একটি দিন। রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ভয়াবহ বর্বরোচিত ও নৃশংস গ্রেনেড হামলার ঘটনাটি ঘটে ওই দিন বিকাল ৫টা ২২ মিনিটে। বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের এক সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে ভয়াবহ জঘন্যতম নজিরবিহীন ওই গ্রেনেড হামলার ঘটনায় তৎকালীন মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের পতœী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। শেখ হাসিনাসহ আহত হন ৪ শতাধিক। শুধু শেখ হাসিনাই নয়, আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব শূন্য করতে এই হামলা চালানো হয়।
সারাদেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গিদের বোমা হামলার প্রতিবাদে ২১ আগস্ট বিকালে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ দলীয় কার্যালয়ের সামনে এক প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে। সমাবেশের প্রধান অতিথি শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানস্থলে বিকাল ৫টায় পৌঁছান। মঞ্চ করার অনুমতি পাইনি বিধায় ট্রাকের ওপর তৈরি মঞ্চে তিনি ২০ মিনিটের বক্তৃতা শেষ করেন। উপস্থিত নেতা-কর্মীদের বিক্ষোভ মিছিল শুরু করার ঘোষণা দেন। ঠিক এ সময়ই মঞ্চ লক্ষ্য করে শুরু হয় গ্রেনেড হামলা। আওয়ামী লীগের নেতারা নিজেদের জীবন বাজি রেখে মানববর্ম করে ঘিরে মার্সিডিজ বেঞ্জ গাড়িতে তুলে দেন শেখ হাসিনাকে। মাত্র দেড় মিনিটের মধ্যে পরপর বিস্ফোরিত হয় ১৩টি শক্তিশালী গ্রেনেড।
এ ধরনের জনসভা বা সভামঞ্চের আশাপাশের বিভিন্ন ভবনের ছাদে ও বিভিন্ন ফ্লোরে পাহারায় থাকে স্বেচ্ছাসেবকরা। কিন্তু সেদিন স্বেচ্ছাসেবকদের কোথাও অবস্থান করতে দেয়নি পুলিশ। এ হামলার অন্যতম মূল নেতা মুফতি হান্নান স্বীকারোক্তি মতে হামলার একদিন আগে ২০ আগস্ট হুজির দুই সদস্য আহসানউল্লাহ কাজল ও আবু জান্দাল ঘটনাস্থলের আশপাশে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে রেকি করে যায়। হুজির সদস্য বাদেও জামাতের ১৫ সদস্য অংশগ্রহণ করে। সমাবেশের মঞ্চটি ছিল পশ্চিমমুখী। হামলাকারীদের প্রতি দলে চারজন করে ৩টি দলে ভাগ করে দেওয়া হয়। মঞ্চে আক্রমণের দায়িত্ব ছিল জান্দাল, কাজল, বুলবুল ও লিটনের সমন্বয়ে গঠিত প্রথম দলের। তাদের অবস্থান ছিল মঞ্চের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশে। সবুজ, জাহাঙ্গীর আলম, মাসুদ ও উজ্জ্বলের সমন্বয়ে দ্বিতীয় এবং মুত্তাকিম, মুরসালিন, আরিফ হাসান ও ইকবালের দায়িত্ব ছিল যথাক্রমে পশ্চিম ও পশ্চিম-উত্তর দিকে অবস্থান নিয়ে সমাবেশে উপস্থিত নেতাকর্মীর ওপর আক্রমণ করা। এই ১২ জনকে ১৫টি গ্রেনেড ভাগ করে দেওয়া হয়। আসামি জাহাঙ্গীর তার জবানবন্দিতে বলেছে প্রথম গ্রেনেড হামলার পর রক্তাত মানুষদের চিৎকার ও ব্যাপক হট্টগোল শুরু হলে সে ভয়ে আর পরের গ্রেনেডটি ছুড়তে পারেনি। প্রথম গ্রেনেড চার্জের পর মঞ্চের জায়গা ফাঁকা হলে দ্বিতীয় গ্রেনেড মারার কথা ছিল বুলবুলের। কিন্তু মানুষের দিগবিদিক ছোটাছুটির মধ্যে ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত বুলবুল আর গ্রেনেড ছুড়তে পারেনি। পরে সেফটি পিন না খুলেই গ্রেনেড মাটিতে ফেলে পালিয়ে যায় সে।
বিস্ফোরণের পরপর ধোঁয়ার কু-লী, মানুষের চিৎকার, ছোটাছুটিতে একটি প্রাণবন্ত সমাবেশের চেহারা পাল্টে হয়ে যায় হাহাকার আর্তনাদ ও ক্রন্দন শিহরিত। উপস্থিত সকলে হয়ে ওঠে উ™£ান্ত, ভিতু ও অপ্রস্তুত। আওয়ামী লীগ কার্যালয় আর রমনা ভবনের সড়কে জায়গায় জায়গায় প্রবাহিত হয় রক্তের স্রোত। ছেঁড়া স্যান্ডেল, রক্ত, পড়ে থাকা ব্যানার, পতাকার সঙ্গে এখানে-সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে নারী-পুরুষের দেহ-কেউ নিথর-স্তব্ধ, কেউবা যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। স্টেডিয়ামের দিক হয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে নেত্রীকে সরিয়ে নেওয়া হয়। শেখ হাসিনা যখন ঘটনাস্থল ত্যাগ করছিলেন তখনও একই দিক থেকে কয়েক সেকেন্ড বিরতি দিয়ে গ্রেনেড এসে ঘটনাস্থলে বিস্ফোরিত হতে থাকে। গ্রেনেড আক্রমণ ব্যর্থ হলে নেত্রীকে হত্যার বিকল্প পন্থা হিসেবে বন্দুকধারীদের তৈরি রাখা হয়। আর এই বন্দুকধারীরাই খুব হিসাব কষে নেত্রীর গাড়ির কাচে গুলি চালায়। এই গুলি বুলেট প্রুফ কাচ ভেদ করতে ব্যর্থ হলে তারা গাড়ি লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছুড়ে মারে। কিন্তু এই চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। সব শেষে গাড়ির চাকা লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে থামানোর চেষ্টা করা হয়। গুলির আঘাতে গাড়ির বাঁ পাশের সামনের ও পেছনের দুটি চাকা পুরোপুরিভাবে পাংচার হয়ে যায়। এ সময় তাকে ঘেরাও করে রাখা মাহবুব স্পটেই মারা যান। কোনোক্রমে শেখ হাসিনা গাড়িতে ওঠার পরপরই গাড়ি চালু করতেই পেছন থেকে বাঁ দিকের সিট লক্ষ্য করে গ্রেনেড ছোড়া হয়। চালক অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সেই গাড়িটি বঙ্গবন্ধু এভিনিউর দলীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে ৬টার দিকে ধানমন্ডির সুধা সদনে নিয়ে আসে। সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা হলো ঘটনার পর উদ্ধার অভিযানকে ব্যাহত করার জন্য পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ করে ও কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। কেউ কেউ উদ্ধারকারীদের বুকে মাথা রেখে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। আওয়ামী লীগের যে কর্মীটি সন্ত্রাসবিরোধী ব্যানার নিয়ে এসেছিল সেই ব্যানারেই তার ক্ষত-বিক্ষত দেহটি বহন করে নিয়ে যায় তার সহকর্মীরা। আহত অবস্থায় প্রথমে প্রায় সবাইকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে বিভিন্নজনকে সরকারি-বেসরকারি নানা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আহতদের আর্তচিৎকার আর স্বজনদের গগনবিদারী আর্তনাদে প্রকম্পিত সেখানকার পরিবেশ। এমনকি নিহতদের নিতে ও জানাজা পড়তেও বাধা দিয়েছে তথাকথিক ইসলামি নামধারি জামাত-বিএনপি সরকার।
গ্রেনেড হামলার পর মামলা হয়েছিল পৃথক ৩টি। এই হামলার তদন্ত কয়েক দফা হলেও শুরুতেই মামলার গতি ভিন্ন পথে নেওয়ার চেষ্টা করে জোট সরকার। শুধু তাই নয়, মামলার আলামত নষ্ট করা হয়। এমনকি মামলার গুরুত্ব নষ্ট করতে হামলার স্বীকার আওয়ামী লীগের দেখে সন্দেহের আঙ্গুল তুলেছিল এই সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও নেতা। এর মধ্যে প্রথম সাত বছরের মধ্যেই তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন হয় মোট ছয়বার। ২০০৫ সালের ৯ জুন আটক জজ মিয়া ‘স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি’ দিয়েছেন বলে জানায় পুলিশ। তীব্র সমালোচনা শুরু হয় যখন গণমাধ্যমে ফাঁস হয় যে জজ মিয়ার বিষয়টি পুলিশের সাজানো নাটক। মিথ্যা সাজানো ঘটনা ‘জজ মিয়া নাটক’ নামে বাংলা প্রবাদে পরিণত হয়েছে। প্রথম তদন্ত হয় বিএনপি-জামাত জোট সরকারের আমলে কিন্তু কোনো প্রতিবেদন দাখিল হয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে নতুন তদন্তে সিআইডির এএসপি ফজলুল কবীর ২০০৮ সালের ১১ জুন অভিযোগপত্র দাখিল করেন। ২০০৯ সালে মুক্তি পান জজ মিয়া। ওই অভিযোগপত্রে মুফতি হান্নানসহ ২২ জনকে অভিযুক্ত করা হলেও গ্রেনেডের উৎস ও মদদদাতাদের শনাক্ত করা হয়নি। বর্তমান সরকার আমলে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পর আদালত মামলার বর্ধিত তদন্তের আদেশ দেন। ১৩-দফা সময় বাড়িয়ে ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার মধ্য দিয়ে ভয়ঙ্কর গ্রেনেড হামলার তদন্ত শেষ হয়। মামলার সাক্ষ্য প্রমাণে উঠে এসেছে হত্যাকা-ের মূল নির্দেশদাতা তারেক রহমান। ষড়যন্ত্রের বৈঠক হয়েছিল কুখ্যাত হাওয়া ভবনে। সার্বিক আয়োজক ছিল সে-সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর। পুরো হামলায় মদদ দিয়েছে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো আর আর্চেস গ্রেনেড এসেছে পাকিস্তান থেকে। ঘটনার ১৪ বছর এক মাস ২০ দিন পর ২০১৮-এর ১০ অক্টোবর চাঞ্চল্যকর এ মামলার রায় ঘোষণা করা হয়। গ্রেনেড হামলা মামলায় মোট ৪৯ জন আসামি ছিলেন। যাদের মধ্যে ১৯ জনকে যাবজ্জীবন এবং ১৯ জনকে মৃত্যুদ- দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে লুৎফুজ্জামান বাবর এবং আবদুস সালাম পিন্টুসহ ৩১ জন বর্তমানে কারাগারে আছেন। এছাড়া তারেক রহমান এবং হারিছ চৌধুরীসহ ১৮ জন পলাতক। বাকি তিনজনের অন্য মামলায় ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় গ্রেনেড হামলা মামলা থেকে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে।

Category:

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে যেমন দেখেছি

Posted on by 0 comment

PMপঙ্কজ ভট্টাচার্য: আমাদের জাতীয় মুক্তি-সংগ্রামের মহানায়ক স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৪৪তম শাহাদাতবার্ষিকী উপলক্ষে এই মহামানবের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।
ষাটের দশকের গণতন্ত্র স্বাধিকার ও স্বাধীনতার সংগ্রামে যে বিরাট যুবজাগরণের উত্থান ঘটে নিজগুণে কালক্রমে তিনি হয়ে ওঠেন তাদের প্রধান পথপ্রদর্শক, হয়ে ওঠেন সকলের প্রিয় মুজিব ভাই। আমাদের মতো গণতন্ত্রের মাঠকর্মীরা না-দেখা বীর বিপ্লবী ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, সুভাষ বসু প্রমুখদের জীবন-সংগ্রাম থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছি আর খুবই কাছ থেকে দেখা তেজদীপ্ত বিশাল মাপের মানুষ সকলের প্রিয় মুজিব ভাইকে পেয়েছি পাকিস্তানের বৈরী ও বন্ধুর পরিবেশে আমাদের পরম নির্ভরতার কা-ারি হিসেবে। দলীয় নেতার পরিচয় ছাপিয়ে, দলের সীমা সরহদ্দ মাড়িয়ে তিনি ক্রমে ক্রমে সমগ্র জাতির আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। জাতির আশা-আকাক্সক্ষা তাকে ঘিরে আবর্তিত হতো সেই দিনগুলোতে। গণতন্ত্র, বাঙালিত্ব, অসাম্প্রদায়িক শোষণহীন সমাজের জন্য আন্দোলন-সংগ্রামের সেদিনকার দল-মত-নির্বিশেষে কর্মীবাহিনীর কাছে তিনি প্রকৃত জাতীয় নেতা হয়ে উঠেছিলেন। তার অনন্য সাধারণ সাহস, জনগণের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা, দুঃসহ কষ্ট ও কারাযন্ত্রণা ভোগ ও ত্যাগের নজির হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে মুজিব ভাই জনমনে হিমালয়ের উচ্চতা অর্জন করেন। অন্যদল এমনকি ভিন্নমতের নেতা-কর্মীদের সাথে তার উষ্ণ আন্তরিকতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল ঈর্ষণীয়। এখন মনে হয় যেন তিনি এক একান্নবর্তী রাজনৈতিক পরিবারের সহৃদয় অভিভাবক হয়ে উঠেছিলেন সেই দিনগুলোতে। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ জাতীয়তাবাদী বাম প্রগতিশীল দলের কর্মীবাহিনী মুজিব ভাইয়ের কাছে পেতেন অঢেল স্নেহ-ভালোবাসা ও অফুরন্ত উৎসাহ-উদ্দীপনা। (কল্পনা করতেও আজ কষ্ট হবে রাজনৈতিক সংস্কৃতি কত মানবিক ও সমন্বিত এবং কত উচ্চ ও উন্নত স্তরে উন্নীত ছিল তৎকালে।)
এই স্বল্প গৌরচন্দ্রিকা শেষে দু-চারটি ঘটনার স্মৃতিচারণের মধ্য দিয়ে এই মহানায়কের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করব। জাতীয় কর্তব্য পালনের অঙ্গ হিসেবে দলীয় বিবেচনায় তাকে ব্যবহার করা বা অতিমানব হিসেবে চিহ্নিত করা তাৎক্ষণিক স্বার্থোদ্ধারে তাকে ব্যবহার করা অথবা রাজনৈতিক বৈরিতায় তাকে খাটো করার যে কোনো প্রয়াস ইতিহাস মেনে নেবে না, মানতে পারে না।
তেষট্টি সনে ছাত্র ইউনিয়নের সম্মেলন এবং ছাত্র আন্দোলনে পরামর্শ ও আর্থিক সহায়তার উপলক্ষে মুজিব ভাইয়ের কাছে একাধিকবার গিয়েছি তার ৩২ নম্বর বাসভবনে। কখনও রেজা আলী, মানিক বা মুর্তজা ভাইয়ের সাথে। আন্তরিকতায় সিক্ত তার পরামর্শ ও সহযোগিতা সব সময়ে পেয়েছি, নিজের কর্মীদের জন্য সংগৃহীত সীমিত সঞ্চয় থেকে তিনি আমাদের বড় অনুষ্ঠানের জন্য হাজার টাকাও দিয়েছেন, এমনকি তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া এবং মিজানুর রহমান চৌধুরীর কাছে তিনি আমাদের পাঠাতেন অধিক অর্থের প্রয়োজনে। একাধিকবার দেখেছি মফস্বল থেকে আসা আওয়ামী লীগের গরিব ও নিম্নবিত্ত কর্মীরা নেতার সাথে দেখা করতে এসেছেন, তাদের তিনি মধুর ব্যবহারে তুষ্ট করে সংগঠন ও আন্দোলনের কাজে জোরদারভাবে নামতে উৎসাহিত করতেন। বিদায় পর্বে কর্মীর মাথায় হাত বুলিয়ে তার পকেটে পুরে দিতেন একটি হোমিওপ্যাথিক পুরিয়ার মতো জিনিস। পরে মুজিব ভাইকে প্রশ্ন করে জেনেছি গরিব কর্মীরা কষ্ট করে ঢাকা আসে, তাদের কিছুটা কষ্ট লাঘব করতে তিনি ৫০, ১০০ ও ২০০ টাকার পুরিয়া করে রাখেন। সেদিনকার সংগঠন-আন্দোলনের কাজে ঐ পরিমাণ আর্থিক সহযোগিতা পাওয়া যেত নেতার কাছ থেকে, যা ছিল উদ্দীপনার রসদ। আজকের বাস্তবতায় এই নজির কল্প-কাহিনির মতো শোনাবে।
পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ও পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা ছিল, সময় সময় বৈরিতাও হয়েছে; কিন্তু ঐক্যবদ্ধ ছাত্র আন্দোলনের ক্ষেত্রে ৬-দফা ও ১১-দফা, গণ-অভ্যুত্থান ঘটানোর ক্ষেত্রে অবিচ্ছিন্ন ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ অব্যাহত থাকার পশ্চাতে ছিল মুজিব ভাইয়ের দূরদর্শী রাজনৈতিক লক্ষ্যসীমা ও তাগিদ, এ-কাজে মণি সিংহ, মুজাফ্ফর আহমদ, সৈয়দ আলতাফ হোসেন, পীর হবিবুর রহমান, খোকা রায়, মোহাম্মদ ফরহাদ, মানিক মিয়া, মিজানুর রহমান চৌধুরী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, শহীদুল্লাহ কায়সার পালন করতেন যথাযোগ্য পরিপূরক-সম্পূরক-ভূমিকা। পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল স্বৈরাচারী সরকার পূর্ব বাংলার বিশেষত ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, নরসিংদী, খুলনা প্রভৃতি অঞ্চলে ১৯৬৪ সালের ১৪ জানুয়ারি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উস্কে দেয়, দিনকয়েক পূর্বে কাশ্মীরের হযরতবাল মসজিদে পয়গম্বরের রক্ষিত পবিত্র চুল চুরির প্রতিক্রিয়ায় পূর্ববঙ্গে এ দাঙ্গা ঘটায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে ভয়ার্ত উদ্বাস্তু নর-নারী-শিশুরা আশ্রয় গ্রহণ করেছিলÑ মাসাধিককাল ধরে। তখন জগন্নাথ হলে ছাত্রদের উদ্যোগে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাবেক পূর্ব পাকিস্তান সংসদ ভবনে একটি আশ্রয়শিবির স্থাপিত হয়, ২ হাজারের বেশি শরণার্থীদের খাদ্য ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে একজন উদ্যোক্তা হিসেবে আমি মুজিব ভাই ও মহীউদ্দীন আহমেদের কাছে চাল, ডাল, হ্যাজাক লণ্ঠন ও কিছু টাকা চেয়ে পত্রবাহক আখলাকুর রহমানকে পাঠাই, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পাঁচ বস্তা চাল, এক বস্তা ডাল, ২ হাজার টাকা এবং দুটি হ্যাজাক পাঠান মুজিব ভাই। পরের দিন মহীউদ্দীন ভাইও পাঠান প্রায় কাছাকাছি পরিমাণের সাহায্য সামগ্রী। ১৫ জানুয়ারি ঢাকা শহরে প্রেসক্লাব থেকে বের করা হয় ঐতিহাসিক দাঙ্গাবিরোধী শান্তি মিছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন মুজিব ভাই, সুফিয়া কামাল, মহীউদ্দীন আহমেদ, আতাউর রহমান খান, সৈয়দ আলতাফ হোসেন, আহমেদুল কবীর, শহীদুল্লাহ কায়সার-সহ অনেকে। সেই শান্তি মিছিল নওয়াবপুর রেলক্রসিং অতিক্রম করে ইত্তেফাকের দিকে অগ্রসর হলে হাক্কা গু-া নামে একজন দাঙ্গাবাজ (শান্তি আন্দোলনের শহীদ নামে খ্যাত) বেগম রোকেয়ার ভাতিজা আমির হোসেন চৌধুরীকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করে। আরেক ঘটনায় মহীউদ্দীন আহমেদ ঐদিন ছুরিসহ এক দাঙ্গাবাজ গু-াকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করেন। ১৫ জানুয়ারি ইত্তেফাক ও সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘পূর্ব বাংলা রুখিয়া দাঁড়াও’ নামে প্রথম পৃষ্ঠার অভিন্ন সম্পাদকীয়।
১৭ অক্টোবর ১৯৬৭ সাল। চার দিন গোয়েন্দা জিজ্ঞাসাবাদের পর আমাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ‘স্বাধীন বাংলা ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে রাষ্ট্রদ্রোহী মামলায় অভিযুক্ত করে পাঠানো হয়। কারাগারে ঢুকেই দেখি কারাগার হাসপাতালে অপেক্ষা করছেন মুজিব ভাই। জিজ্ঞাসাবাদের বিস্তারিত বিষয় তাকে জানালাম, যার সিংহভাগই ছিল মুজিব ভাইয়ের বিরুদ্ধে, মানিক চৌধুরী, বিধান কৃষ্ণ সেন, চট্টগ্রামের ডা. জাফর, হান্নান সাহেব, একে খান প্রমুখ সাথে শেখ মুজিবের বৈঠক ইত্যাদি নিয়ে। পাশাপাশি কয়েকজন সেনা অফিসারদের সাথে বৈঠক প্রসঙ্গও ছিল ঐ জিজ্ঞাসাবাদে। যা হোক ’৬৭ সালের অক্টোবরের ২০ তারিখে আমি তাকে স্মরণ করিয়ে দিই এই মর্মে যে, সেনা-আমলা যুক্ত করে মুজিব ভাইয়ের বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র মামলা তৈরি করা হচ্ছে, যা পরবর্তীকালে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ নামে খ্যাতি পায়।
কারাগারে অবস্থানকালে ঐ সময়কালে কথা প্রসঙ্গে একবার মুজিব ভাইকে একটি বইয়ের কথা বলেছিলাম। বইটির নাম ‘এন এথনিকেল স্টাডি অব পাকিস্তান’Ñ লেখক অধ্যাপক গণকোভস্কী যে গ্রন্থে পাকিস্তানের জাতিসমূহের বিশেষত বাঙালি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে দীর্ঘ সংগ্রাম-সংঘাতের মাধ্যমে রক্তাক্ত পরিসমাপ্তি ঘটবে বলে ভাষ্য দেওয়া ছিল। কবি জসীমউদ্দীন এ বইটি রাশিয়া থেকে নিয়ে আসেন, তার পুত্র জামাল আনোয়ার বাসু বন্ধুবরের কাছ থেকে বইটি নিয়ে আমি পড়ার সুযোগ পাই। মুজিব ভাই এ তথ্যটি নিয়ে একাধিক দিন তর্ক করেন এই মর্মে যে, প্রচ- জনমত সৃষ্টি হলে শাসকগোষ্ঠী আন্তর্জাতিক চাপে ৬-দফা মেনে নিতে বাধ্য হবে। তাছাড়া সশস্ত্র যুদ্ধের পার্টি তো আওয়ামী লীগ নয়, এমনকি ন্যাপও নয়। অবশ্য এ-কথাও তিনি পরে বলেছিলেন, “যদি সশস্ত্র যুদ্ধই করতে হয় তবে আমি হিসাব করে দেখেছি ২৭ জনের বেশি লোক পাব না। সম্ভাব্যদের মধ্যে তৎকালীন ছাত্র নেতারাসহ বিভিন্ন জেলার সার্বক্ষণিক কর্মীদের নাম তিনি বলেন, যাদের মধ্যে একজন ছিলেন সন্দ্বীপের লোক সম্ভবত আবদুর রহমান বয়াতি, তিনি ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার জনসভার পূর্বে লোকগান পরিবেশন করে জনগণকে মাতিয়ে তুলতেন। যাক, আমার জামিনে মুক্ত হওয়ার দিনে তিনি বলেন মামা (শহীদুল্লাহ কায়সারকে) দিয়ে বইটা পাঠিয়ে দিস।” স্বাধীনতার পর ৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বিশ্বজয়ীর বেশে দেশে ফিরেন বঙ্গবন্ধু। ১২ জানুয়ারি তাকে শুভেচ্ছা জানাতে গেলাম। তিনি আবেগ আপ্লুত হয়ে জড়িয়ে ধরলেন আমাকে, পরে বললেন, “কিরে রাশিয়ান বইটা তো দিলি না, বইটা না পড়েও বই-য়ের কথা অনুযায়ী কাজ তো করেছি, কি বলিস।” অবাক হলাম মুজিব ভাইয়ের ঈর্ষণীয় স্মরণ শক্তির বহর দেখে ও শুনে। অথচ ঘটনাটি ভুলেই গিয়েছিলাম বলা চলে।
’৭৩ সালের শেষের দিকে মুজিব ভাইয়ের সাথে দেখা করি। তখন জাতীয়করণকৃত জুটমিলগুলোতে সাবেক মালিকদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, সাবেক মালিকরা ১৮টি মিলের যাবতীয় অর্থ একই দিনে উঠিয়ে মিলগুলো দেউলিয়া করার উদ্যোগ নেন। পূর্ব রাতে এ সংবাদ নিয়ে ফরাসউদ্দীন (পিএস)-এর সাথে দেখা করে তাকে ঘটনা খুলে বলি। তিনি ডিসিকে টেলিফোন করে ঐ সকল জুটমিলের অ্যাকাউন্ট জব্দ করার ব্যবস্থা করেন।
’৭৪ সালে ত্রিদলীয় ঐক্যজোট ‘গজ’ গঠনসহ বহুবার তার সাথে সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়ের সুযোগ পেয়েছি, কারাজীবনে তার সান্নিধ্য ও সাক্ষাৎ সঞ্জীবনীতুল্য অভিজ্ঞতায় পূর্ণ করেছে স্মৃতির ভা-ার। সর্বশেষ সাক্ষাৎ করি বঙ্গবন্ধুর সাথে ১২ জুলাই ১৯৭৫ সাল। বুলগেরীয় রাষ্ট্রদূত ছিলেন ৮৭ বছরের, নাম ছিল বরিস বায়েসদিক, যিনি হিটলারের বন্দিশিবিরে অত্যাচারিত হন, বঙ্গবন্ধু হত্যাসহ মধ্যম পর্যায়ের একটি সেনা অভ্যুত্থানের আশঙ্কা অচিরে ঘটতে পারে মর্মে সংবাদটি রাষ্ট্রপতিকে জানাতে তিনি আমাকে অনুরোধ করেন। আমি সে-কথা কিছু সুপারিশসহ বঙ্গবন্ধুকে জানাই, তিনি প্রথমে স্বভাবগত ঔদার্য নিয়ে বিষয়টি হালকাভাবে নেন, আমার চাপাচাপিতে তিনি বলেনÑ রক্ষীবাহিনীর নুরুজ্জামানকে মার্শাল টিটোর কাছে পাঠিয়েছেন এন্টি ট্যাংক গান আনতে, যা এক মাসের মধ্যে পাওয়া যাবে। উল্লেখ্য, উক্ত রাষ্ট্রপতির সচিব পদমর্যাদার আগন্তক আর কেউ নন, পাকিস্তান পুলিশের দ্বিতীয় ব্যক্তি ছিলেন তিনি এবং ’৬৭ সালে গোয়েন্দা হেফাজতে আমাকে তিনি জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু প্রায় ২০ মিনিট কথা বলেন, কিছু প্রতিশোধক ব্যবস্থার কথাও বলেন। এই সময়ে আবদুর রহিম নামধারী একজন সাবেক পুলিশ কর্তা এবং তৎকালীন সচিব আকস্মিকভাবে ঐ ঘরে ঢুকেন একটা ফাইল নিয়ে, আমি বঙ্গবন্ধুর হাঁটুতে চাপা দিই ঐ প্রতিশোধক বিষয়টি যেন না বলেন, তিনি হেসে বলেন, ‘ও আমার লোক’ এ-কথা বলে কি ব্যবস্থা এক মাসের মধ্যে নেবেন তা পুনরায় উল্লেখ করেন। কথা শেষে যখন বেরিয়ে আসি তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বগোতোক্তি করি “ওরা এক মাসের মধ্যেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করবে”, বিষয়টি সংক্ষেপে ত্বড়িৎ জানাই অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ ও কমরেড ফরহাদ ও মণি সিংহকে। সেদিন মুজিব ভাইয়ের কাছ থেকে বেরিয়ে আসার সময় তিনি রসিকতা করে বলেন, “আমি তোদের বিপদ নিয়ে ভাবি, তোরা সাবধানে থাকিস, আমি ক্ষমতা ছেড়ে জনতার মধ্যে ভিড়ে যাবো, বিপদ হবে তোদের।” রাষ্ট্রপতির অফিস থেকে বের হবার পথে দেখি হনহন করে খোন্দকার মোশতাক টুপিটা ঠিক করতে করতে ঢুকছেনÑ বঙ্গবন্ধু রসিকতা করলেন “কি ‘রিএক্সনারী’ নেতা কেমন আছেন।” ত্বড়িৎ জবাব দিলেন মুশতাক ‘নেতা, আপনার জীবদ্দশায় আমি বিরোধিতা করবো না” খুনি খোন্দকার মুশতাক বঙ্গবন্ধুর হত্যা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পরে ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট ক্ষমতা গ্রহণ করেন। খুনিও তার কথা রেখেছেন।
প্রিয় মুজিব ভাই, দেশবাসীর প্রিয় বঙ্গবন্ধু মৃত্যুঞ্জয়ী, মৃত্যুহীন ও চির ভাস্বর হয়ে বাংলার মানুষের অন্তরে চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেন।

লেখক : ঐক্য ন্যাপের সভাপতি

Category:

বঙ্গবন্ধুর পথে হেঁটেই সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে

Posted on by 0 comment

PM হাসানুল হক ইনু: বঙ্গবন্ধু হচ্ছেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান ও তাদের দোসর জামাত-শিবির চক্র পরাজিত হয়। তারাই ১৫ আগস্ট ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য। শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে থেমে থাকেনি, বাংলাদেশকে পাকিস্তানপন্থার পথে চালিত করার অপচেষ্টা চালায়। ১৫ আগস্টের খুনিরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে জাতির আত্মাকে হত্যা করতে চেয়েছিল। কিন্তু জাতির আত্মাকে কেউ হত্যা করতে পারে না।
১৫ আগস্টের সুফলভোগী হচ্ছে জেনারেল জিয়া ও সামরিক শাসকরা। তাই সামরিক ফরমান দিয়ে খুনিদের রক্ষার জন্য ‘দায়মুক্তি’ বিধান জারি করে এবং সংবিধান সংশোধন করে তা পঞ্চম সংশোধনীতে যুক্ত করে। সংবিধানের মূল চরিত্র, বৈশিষ্ট্য ও রাষ্ট্রীয় মূলনীতি বদল করে। ’৭১-এর রাজাকার সাম্প্রদায়িক চক্রকে রাজনীতিতে আমদানি ও পুনর্বাসন করে। এ পদক্ষেপ ছিল জাতি ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সুস্পষ্ট বেইমানি। ইতিহাসে মীরজাফর প্রথম বেইমান, দ্বিতীয় বেইমান রাজাকাররা, তৃতীয় বেইমান আর চতুর্থ বেইমান হচ্ছে জে. জিয়া। এসব বেইমানের জন্য জাতি অনেক পিছিয়ে পড়ে।
বেইমানদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবেই রুখে দাঁড়ানোর সংগ্রাম শুরু হয়। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণের পর এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার স্বপক্ষ শক্তির ঐক্যের পর ১৯৭১-এর চেতনায় ফেরত যাত্রা শুরু হয়। বাংলাদেশকে আবার বাংলাদেশের পথে ফেরত আনার সংগ্রাম জোরদার হয়। কিন্তু সামরিক শাসকদের রোপিত ‘বিষবৃক্ষ’ বিএনপি এবং বেগম খালেদা জিয়া রাজাকার, জামাত, জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িক চক্রের পক্ষ নেয়। যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি হয়। জঙ্গি তা-ব, আগুন সন্ত্রাস ও আগুন যুদ্ধের ঘটনাও ঘটে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪-দল ও মহাজোট অবশেষে বিজয়ী হয়। বঙ্গবন্ধু নির্বাসন থেকে ফিরে আসেন স্বমহিমায়, ১৫ আগস্টের খুনিদের বিচার ও সাজা কার্যকর করা হয়। সংবিধান থেকে দায়মুক্তির বিধানসহ পঞ্চম-সপ্তম সংশোধনী বাতিল হয়ে যায়। PM1রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি সংবিধানে পুনঃস্থাপিত হয়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও সাজা কার্যকর হতে থাকে। বাংলাদেশ অন্ধকার থেকে আলোর পথে উঠে আসে। আবার পাকিস্তানপন্থার পথের বদলে বাংলাদেশের পথে চলতে শুরু করে। বিএনপি-জামাত চক্র কোণঠাসা হলেও এখনও আত্মসমর্পণ করেনি এবং ভুল স্বীকার করেনি। জাতির পিতা, রাষ্ট্রীয় মূল চার নীতি, স্বাধীনতার ঘোষণা মেনে নেয়নি। বিজয়ের সুফল স্থায়ী করতে এখনও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। আর যাতে অস্বাভাবিক সরকার বা রাজাকার সমর্থিত সরকার না আসে, আর যাতে বঙ্গবন্ধু নির্বাসনে না যায় তার গ্যারান্টি অর্জন করা দরকার। জঙ্গি দমনে অনেকটা সফল হলেও এখন নতুন আপদ হিসেবে দেখা দিয়েছে দুর্নীতিবাজ-লুটেরা-দলবাজ-গু-া-নারী-শিশু নির্যাতনকারীদের দৌরাত্ম্য। এটা বিজয়ের সুফলকে মøান করে দিচ্ছে এবং বিজয় সংহত করার কাজে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাই বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে আর যাতে কেউ স্পর্শ না করতে পারে, সেজন্য মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের ঐক্যের ঢালটা ধরে রাখতে হবে শক্ত হাতে এবং দেশ বাঁচানোর জন্য উন্নয়নের সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছানোর জন্য মুখ দেখে দল দেখে নয়, কঠোর আইনের শাসন কায়েম করতে হবে। তাই এই পর্বে ‘সুশাসনের জন্য রাজনৈতিক চুক্তি’ই পারে দুর্নীতিবাজ-দলবাজ-গু-া-নারী-শিশু নির্যাতনকারীদের দমন করতে। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার পথে এবার এভাবেই প্রতিজ্ঞা করে সবাই একজোট হই এবং তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।

বঙ্গবন্ধু অমর ছিলেন, অমরই থাকবেন।
জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।
লেখক : জাতীয় সংসদ সদস্য, সভাপতি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল
ও ১৪ দলের নেতা

Category:

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে সিআইএ’র সংশ্লিষ্টতা প্রসঙ্গ

Posted on by 0 comment

PMলরেঞ্জ লিফসুলজ: বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে এবং সরকার উৎখাতে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-র সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে মার্কিন সাংবাদিক লরেঞ্জ লিফসুলজ প্রায় তিন দশক ধরে অনুসন্ধান করেন। ঢাকার তৎকালীন রাষ্ট্রদূত ইউজেন বোস্টার বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে ও অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে ছিলেন। তিনিই লরেঞ্জ লিফসুলজকে সত্য উদঘাটনে সাহায্য করেন। এছাড়াও তিনি মার্কিন সিনেট, কংগ্রেস এবং পররাষ্ট্র দফতরের অনেকের সঙ্গে কথা বলেছেন। বাংলাদেশেও তিনি খুনি মোশতাকের সঙ্গে কথা বলেছেন। ফারুকদের সাথে এবং সংশ্লিষ্ট অনেকের সাথে যোগাযোগ করেন। তার রচিত ‘আনফিনিস্ড রেভ্যুলিউশন’ গ্রন্থে বাংলাদেশের ১৫ আগস্টের ঘটনাবলির প্রেক্ষাপটসহ বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। এখানে লরেঞ্জ লিফসুলজ-এর সিআইএ-র সংশ্লিষ্টকতা সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন একটু দীর্ঘ হলেও তুলে ধরা হলো।
১. বাংলাদেশের ১৫ই আগস্টের সামরিক অভ্যুত্থানের ৩০তম বার্ষিকী মার্কিন লেখক উইলিয়াম ফকনারের কথা আবার মনে করিয়ে দিল, “অতীতের মৃত্যু নেই। এমনকি অতীত কখনও অতীত হয় না।” আমাদের মতো যারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭০-এর দশকের প্রত্যক্ষদর্শী, আমরা স্মরণ করতে পারি ঐ দিনগুলো, যা একটি যুগের মাইলফলক। এসব ঘটনা যে পথ নির্দেশ করেছিল সে পথ ধরে আমরা গন্তব্যে চলেছি, অনেকেই সে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি।
২. ৩০ বছর পরও ১৫ই আগস্টের সহিংস সেই রাতের ঘটনাবলি আজও বাংলাদেশে জীবন্ত। ১৯৭১ সালে মার্চের কালরাত্রির মাত্র চার বছর পরের ঘটনা। ’৭১-এর মার্চেই পাকিস্তানি সৈন্যরা জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেওয়ার পরিবর্তে দেশের মানুষের ওপর ট্যাঙ্ক চালিয়ে দিয়েছিল। অথচ এ ফলাফল মেনে নিতে বাঙালিরা সম্মত হয়েছিল। আর স্বাধীনতার মাত্র চার বছরের মাথায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ছোট্ট একটি অংশ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নোংরা ধারা অনুসরণ করে অভ্যুত্থান ঘটায়।
৩. একটি সামরিক অভ্যুত্থানের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাংলাদেশের অনেক মানুষের কাছে স্বাধীনতার প্রতীক শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হন। অভ্যুত্থানকারীরা খুনের নেশায় উন্মত্ত হয়ে গিয়েছিল। মুজিব এবং তার পুরো পরিবারকে হত্যা করা হয়, হত্যা করা হয় তার স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, তাদের স্ত্রী সুলতানা কামাল ও রোজী জামালকে। এমন কি হত্যা করা হয় শিশুপুত্র শেখ রাসেলকে, যার বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর। ঐ রাতে সেনাবাহিনীর দলটি ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে সারা শহরে দাপিয়ে বেড়ায় মুজিবের আত্মীয়স্বজনদের হত্যার উদ্দেশ্যে। নিহত হন মুজিবের ভাই শেখ আবু নাসের, ভগ্নিপতি আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার জীবন বাঁচাতে ছুটে আসা কর্নেল জামিল।
৪. এক গর্ভবতী নারী আরজু তার স্বামী শেখ ফজলুল হক মনিকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন, এ অপরাধে তাকেও হত্যা করা হয়। মনি ছিলেন শেখ মুজিবের ভাগ্নে। মুজিবের দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ঐ সময় দেশের বাইরে ছিলেন। শেখ হাসিনা পরে দেশের প্রধানমন্ত্রী হন। তাকেও মাত্র এক বছর আগেও প্রকাশ্যে দিবালোকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। এ হামলা আবার প্রমাণ করে ফকনারের সেই বাক্য “অতীত আসলে অতীত নয়। এটা খুই বর্তমান।”
৫. ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের ঘটনায় জড়িতদের উত্তসূরিরাই বর্তমান বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া প্রয়াত জেনারেল জিয়াউর রহমানের স্ত্রী, যিনি ঐ সময় সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান ছিলেন। পর্দার অন্তরালে থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, যা পরবর্তীতে অভ্যুত্থান ও অন্যান্য ঘটনা ঘটায়।
৬. ঢাকায় মার্কিন দূতবাস ঐ রাতে রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা অভ্যুত্থান বিষয়ে ঘটতে থাকা ঘটনাগুলোর ওপর নজর রাখতে শুরু করেন। কিন্তু মার্কিন দূতাবাসে তখন একজন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি ঘটনাগুলো জানতেন এবং তিনি অস্থির ছিলেন। কিছু বিষয় তিনি কাউকে বলতে পারতেন না। অভ্যুত্থানের কয়েক মাস আগেই এমনটা ঘটবে তিনি আশঙ্কা করেছিলেন এবং তা ঠেকাতে সর্বোচ্চ প্রয়াস চালিয়েছিলেন।
৭. অভ্যুত্থানের তিন বছর পর ওয়াশিংটনে আমি এই লোকের সঙ্গে দেখা করি। তিনি আমার খবরের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠেন। আমি এ আশায় থাকি যে, তিনি আমাকে এ ব্যাপারে যেসব তথ্য দেবেন তা একদিন অস্বস্তিকর সত্য হয়ে বেরিয়ে আসবে এবং যারা এর সঙ্গে জড়িত তাদের জবাবদিহি করতে হবে। ত্রিশ বছরের মধ্যে এই প্রথমবারের মতো আমি তার পরিচয় জানতে পারি। এতগুলো বছর তার সঙ্গে আঠার মতো লেগে থাকার পরও তার পরিচয় প্রকাশ না করার ব্যাপারে অত্যন্ত আস্থার সঙ্গে সংযম পালন করেছি, যা থেকে আমি এখন মুক্ত। ধৈর্য ধরুন, কেন এবং কীভাবে আমি এ ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলাম, তা বলব।
৮. যেসব বিদেশি সাংবাদিক এ অভ্যুত্থানের ঘটনা কভার করেছিলেন, আমি ছিলাম তাদের একজন। তবে এদের মধ্যে একমাত্র আমি, যে সাংবাদিক হিসেবে বাংলাদেশে বাস করে একটি বড় পত্রিকার জন্য এ বিষয়ে প্রতিবেদন পাঠাই। ১৯৭৪ সালে আমি ছিলাম ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউর ঢাকা সংবাদদাতা। পরের বছর আমি নয়াদিল্লি চলে যাই, আমাকে ঐ পত্রিকার দক্ষিণ এশীয় প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। মুজিবের নৃশংস হত্যা আমাকে বিষয়টি অনুসন্ধানে আকর্ষিত করে। এই ঘটনা জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে আমাকে প্রভাবিত করে। আর এমন ঘটনা ঘটবে তা আমি কখনও ধারণা করতে পারিনি।
৯. আমার অচিরাচরিত সূত্রটি মার্কিন দূতাবাসে কাজ করতেন। ঐ রাতে তিনিই তার সততা ও দায়বদ্ধতার গুণে বিষয়টির গভীরে যেতে আমাকে উৎসাহিত করেন। ঐ সময়কার সরকার আমলাতন্ত্রের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যদের থেকে আলাদা। অভ্যুত্থানে ব্যাপক হত্যাকা- নিয়ে তিনি অত্যন্ত হতাশ ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন সচেতন ব্যক্তি এবং এমন কিছু জানতেন, যা অন্যরা জানতেন না। এ জানাটাই তার বিবেক দংশনের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমারটাও ছিল ঐ ধরনের নৈতিক দায়িত্ববোধের ব্যাপার, যা তার সঙ্গে একাধিকবার মুখোমুখি করেছিল। একজন তরুণ রিপোর্টারের জন্য যা ছিল খুবই স্মরণীয় ঘটনা।
১০. মুজিবের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের পর এ বিষয়ে ক্ষমতাসীনদের সরকাররিভাবে প্রচারিত কাহিনি এবং ঐ সময় সরকারের তল্পিবাহক সংবাদপত্রগুলোর প্রতিবেদন আমাকে বিপাকে ফেলে দেয়। এ দুই পক্ষের বক্তব্য এক ছিল না। অধিকন্তু দুই কাহিনির মধ্যকার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসতে থাকে গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র ও পূর্ববর্তী ঘটনাবলি।
১১. এ ঘটনা সম্পর্কে বলা হয়, ছয়জন জুনিয়র অফিসারের নেতৃত্বে তিনশ সেনা একবারে নিজেদের সিদ্ধান্তে শেখ মুজিবকে ক্ষমতাচ্যুত করে। মুজিব ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে কিছু অফিসারের ব্যক্তিগত ঈর্ষা এবং ঐ সময়ে ব্যাপক দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষের হতাশার বহিঃপ্রকাশ ছিল ঐ অভ্যুত্থান, ছিল একতরফা চিন্তার ফসল, এক বছর বা তার চেয়ে বেশি সময়ের কোনো পরিকল্পনা এটা ছিল না।
১২. যেদিন ভোরে মুজিব এবং তার পরিবারকে হত্যা করা হয়, ঐ সকালেই তরুণ অফিসাররা পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে খোন্দকার মোশতাক আহমদের নাম ঘোষণা করে। আওয়ামী লীগে মোশতাককে ডানপন্থি যুক্তির প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মুজিবের পতনে তার ব্যক্তিগত ভূমিকা সম্পর্কে মোশতাক মুখে কুলুপ এঁটে ছিলেন। অভ্যুত্থানে তিনি তার সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার বা অস্বীকার কোনোটাই করেন নি। জনসমক্ষে আলোচনায় এ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন এলে তিনি সহজভাবে তা এড়িয়ে গেছেন। আসলে তিনি তার সরকারকে স্থিতিশীল করতে সর্বতোভাবে চেষ্টা চালিয়েছিলেন।
১৩. অভ্যুত্থানের তিন মাসের মধ্যে মোশতাককেও ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এরপর দুর্নীতির অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর পুরান ঢাকার বাসভবনে এক সাক্ষাৎকারে মোশতাক এ অভ্যুত্থানের ব্যাপারে তার আগাম ধারণা অথবা অভ্যুত্থানকারীদের সঙ্গে কোনো বৈঠকের কথা অস্বীকার করেন। আর অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত জুনিয়র অফিসারদের এ ঘটনার চার মাসের মধ্যেই দেশের বাইরে যেতে বাধ্য করা হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মধ্যে অস্থিরতার সুযোগে তাদের বাইরে পাঠানো হয়। এরপর বেরিয়ে আসে ভিন্ন কাহিনি।
১৪. অভ্যুত্থানের ব্যাপারে তাদের পৃষ্ঠপোষক ও মিত্রদের কাজে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে এই জুনিয়র অফিসারদের অধিকাংশ ব্যাংকক এবং অন্যত্র সাংবাদিকদের কাছে সাক্ষাৎকার দিয়ে মুখ খুলতে শুরু করে। অভ্যুত্থানের আগে মোশতাক ও তার সহযোগীদের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি তারা নিশ্চিত করে। তখন এ কাহিনি বেরিয়ে আসে যে, মুজিবকে হত্যা ও ক্ষমতাচ্যুত করার এক বছর আগে থেকেই মোশতাক ও তার রাজনৈতিক মিত্ররা বেশ কয়েক দফা গোপন বৈঠক পরিকল্পনা করেছিল।
১৫. অভ্যুত্থানের কয়েক মাস পর মার্কিন দূতাবাসের একজন মধ্যমসারির কর্মকর্তা আমাকে বলেন, আগস্টের ঘটনা নিয়ে মার্কিন দূতাবাসের মধ্যেই চাপা উত্তেজনা ছিল। তিনি বলেন, ঐ সময় দূতাবাসে এ রকম খবর ছড়িয়ে পড়ে যে সিআইএ’র স্টেশন চিফ ফিলিপ চেরি কোনো না কোনোভাবে অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত। এ নিয়ে চেরি ও মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইউজেন বোস্টারের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। তিনি বলেন, আমি বুঝতে পারছিলাম এমন একটা কিছু ঘটছে যা ঘটা উচিত নয়। তিনি আমাকে বিষয়ের আরও গভীরে যেতে আহ্বান জানান।
১৬. যুক্তরাষ্ট্র কেন এ অভ্যুত্থানের জড়াবে তা আমার মাথায় আসছিল না। যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের দুটো কমিটি সিআইএ-র গোপন বেআইনি কর্মকা- তদন্ত করার জন্য তৈরি হচ্ছিল। তখন ওয়াশিংটনের চলছিল সিআইএ-র হাতে বিদেশি নেতাদের খুন হওয়ার ঘটনার তথাকথিত চার্চ ও পাইক কমিটির শুনানি। এ শুনানি যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিক ও গোয়েন্দাদের মধ্যে বড় মাপের আতঙ্ক ও উদ্বেগ তৈরি করে। মার্কিন পত্র-পত্রিকাগুলো খোলাখুলি লিখতে শুরু করে চিলিসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে অবৈধ গোপন তৎপরতা চালানোর দায়ে ঊর্ধ্বতন মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের কারাদ-ও হতে পারে।
১৭. গ্রীষ্মকালে মার্কিন নাগরিকরা মনগোজ, কয়েনটেলপ্রে, এএমল্যাশ, জাতীয় শব্দ সংক্ষেপের সঙ্গে প্রথমবারের মতো পরিচিত হতে শুরু করে এবং কঙ্গোয় লুমুম্বা, কিউবায় ক্যাস্ট্রো এবং চিলিতে আলেন্দেকে হত্যার ষড়যন্ত্রের বিশদ বিবরণ তারা পেয়ে যায়। আসলে মার্কিন ক্ষমতার অদৃশ্য হাত বিশ্বের সর্বত্র পৌঁছে গিয়েছিল। হিমশৈলের চূড়াটি প্রথমবারের মতো মার্কিনিদের চোখে স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়। আর এসব কিছু ঘটছিল ওয়াশিংটন থেকে বহুদূরে ভাপসা ও গুমোটপূর্ণ এক পরিবেশে, যেমনটা দক্ষিণ এশিয়ায় বর্ষাকালে দেখা যায়।
১৮. শেখ মুজিবের মর্মান্তিক মৃত্যু সম্পর্কে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেন, এর নেপথ্যে অবশ্যই বিদেশি শক্তির হাত রয়েছে। স্বাভাবিকভাবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেন নি। ভারতে জরুরি অবস্থার দিনগুলোতে তার সমর্থক মস্কোপন্থি সিপিআই-র বক্তব্য ছিল আরও স্পষ্ট। দলটি বলে এ অভ্যুত্থানের পেছনে রয়েছে সিআইএ। তবে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না থাকায় আমি একে অপপ্রচার বলে নাকচ করে দিই।
১৯. তাহলে কীভাবে অভ্যুত্থানটি হলো? অভ্যুত্থানের কুশীলবরা নিজেদের আড়াল করতে কীভাবে নানা গোলকধাঁধা তৈরি করে তাতে বিচরণ করে এবং শেষ পর্যন্ত ১৫ আগস্টের ঘটনা ঘটতে সক্ষম হয় সে বিষয়ে আমার তখনও অনেক কিছুই অজানা ছিল। অভ্যুত্থানের পর প্রায় তিন বছর আমি ইংল্যান্ডে ছিলাম। আমি ওয়াশিংটনে গিয়ে আমার এক সহকর্মী, নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত দ্য ন্যাশন সাময়িকীর সম্পাদক কাই বার্ডের সঙ্গে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিই। কাই একজন খ্যাতিমান মার্কিন লেখক।
২০. কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস শীর্ষক একটি গবেষণার সূত্র ধরে কাই বার্ড কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতে পেয়ে যান। কার্নেগি মার্কিন নীতি ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গবেষণার উদ্দেশ্যে একটি প্রকল্প হাতে নেন। প্রকল্পের প্রধান ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিসিঞ্জারের সাবেক সহকর্মী রজার মরিস। কিন্তু অস্পষ্ট এক পরিবেশে প্রকল্পটি পরিত্যক্ত হয়। মরিস পরে বলেন, প্রকল্পটিকে বাদ দেওয়ার জন্য কিসিঞ্জার নিজে চাপ দিয়েছিলেন। তারপরও কিছু ফাইল ছিল যেগুলো সত্যিকারের জহুরির কাছে সোনার খনির মতোই মূল্যবান। এসব ফাইলে মূলত পেন্টাগন, সিআইএ এবং পররাষ্ট্র দফতরের দেড়শ মার্কিন কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎকার ছিল।
২১. ওয়াশিংটন সফরের সময় আমি ইউজেন বোস্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। ’৭৫-এর অভ্যুত্থানের সময় ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনকারী বোস্টার তখন ওয়াশিংটনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সদর দফতরে কর্মরত। ঢাকায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বোস্টারের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। একবার নয়াদিল্লিতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল ময়নিহান সংক্ষিপ্ত সফরে বাংলাদেশে গিয়ে আমাকে দেখা করতে বললে আমি বোস্টারের বাড়িতে যাই। ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত আমার একটি লেখা নিয়ে আলোচনা করতে ময়নিহান আমাকে ডেকেছিলেন। লেখাটিতে তার সম্পর্কে কিছুটা সমালোচনা ছিল। করমর্দনের পর লাউঞ্জের এক কোনার টেবিলে আমরা বসলাম। রাষ্ট্রদূত বোস্টার তার বাসভবনে আপ্যায়নের ফাঁকে তিনজনের মধ্যে এটি ছোটখাটো বৈঠকের আয়োজন করেন। অবশ্য ’৭৫-এর অভ্যুত্থানের পর আমি বোস্টারের সঙ্গে আর সাক্ষাৎ করিনি। তাকে দেখার জন্য আমি প্রস্তুতও ছিলাম না। আমি চেয়েছিলাম তাকে যে সব প্রশ্ন আমি করব সেগুলো আমার স্পষ্ট হওয়ার পরই যেন আমাদের দেখা হয়।
২২. ওয়াশিংটনে পৌঁছে আমি বোস্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখলাম তিনিও সাক্ষাতের ব্যাপারে খুব আগ্রহী। বাংলাদেশ বিষয়ক আমার সব লেখা তিনি বছরের পর বছর ধরে পড়ে গেছেন। বৈঠকের দিনক্ষণ ঠিক হলো। কাই বার্ড ও আমি পররাষ্ট্র দফতরে বোস্টারের সঙ্গে দেখা করলাম। করমর্দনের পরপরই লাউঞ্জের কোনার একটি টেবিল দখল করলাম আমরা। এ টেবিল ঘিরেই সারা সকাল আমাদের মধ্যে গুরুগম্ভীর আলোচনা হলো। আমি বোস্টারকে বললাম, আমি জানার চেষ্টা করছি কীভাবে সেদিন অভ্যুত্থানটির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আমি তাকে এও বললাম, আমার কাছে এ বিষয়ে তথ্য রয়েছে যে, ১৯৭১ সালেই মোশতাকের সঙ্গে কলকাতায় মার্কিন কর্মকর্তাদের যোগাযোগ ও সম্পর্ক স্থাপিত হয় এবং এর জের ধরে তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকার ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় তাকে ‘গৃহবন্দি’ করে।
২৩. কলকাতায় মোশতাক ছিলেন যোগাযোগের মধ্যমণি। কিসিঞ্জার আওয়ামী লীগ সরকারের একটি নির্বাসিত অংশের মধ্যে বিভাজন তৈরির চেষ্টা করেছিলেন, যাতে তাদের দিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছানো যায়। তবে শেখ মুজিব এবং আওয়ামী লীগকে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে দেশ শাসন করতে দেওয়া হবে। এ ধরনের কোনো প্রতিশ্রুতি পাকিস্তানিরা দেয়নি। পূর্ব পাকিস্তানে, যা তখন বিশ্বে ‘বাংলাদেশ’ নামে পরিচিতি পেয়ে গেছে, যখন যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে শেখ মুজিব তখন পশ্চিম পাকিস্তানে বন্দী।
২৪. মোশতাক প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারে তার ঊর্ধ্বতন সহকর্মীদের অগোচরেই মার্কিনদের মাধ্যমে এ মধ্যস্থতার প্রক্রিয়া চালান। বিষয়টি জানাজানি হলে মোশতাকের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ ওঠে এবং তাকে গৃহবন্দি করা হয়। আমি এসব খবর জানতে পারি কলকাতায় মোশতাকের একজন প্রদান সহকর্মীর মাধ্যমে। এ সহকর্মটি মোশতাকের ঐ মধ্যস্থতা পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিলেন। এ বিষয়টি কলকাতার তৎকালীন কনসাল জেনারেল হার্ব গর্ডনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে নিশ্চিত হয়েছিলাম।
২৫. পররাষ্ট্র দফতরে সেদিনের বৈঠকে আমি বোস্টারকে বলেছিলাম, এ বিষয়টি খুবই কৌতূহলোদ্দীপক যে, চার বছর পর শেখ মুজিব খুন হলে মোশতাক একজন কিং হিসেবে আবির্ভূত হলেন। এ কথা বলে কাই বার্ড ও আমি বুঝতে চাইলাম যুক্তরাষ্ট্র ও মোশতাক গ্রুপের মধ্যকার ১৯৭১ সালের সম্পর্কটির নবায়ন হয়েছিল, না-কি ঘটনাটি ছিল নিছকই কাকতালীয়। একপর্যায়ে আমরা আসল প্রশ্নটি করলাম, যে মহলটি শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা ও তা সংঘটিত করে তার সঙ্গে মার্কিন দূতাবাসের কি আগে থেকে কোনো ধরনের যোগাযোগ ছিল? আমরা বলছিলাম বোস্টার যথারীতি কূটনৈতিকসুলভ জবাব দেবেন, যা আমাদের কোনো কাজেই লাগবে না।
২৬. বোস্টার আমাদের চোখে চোখ রাখলেন এবং এমন কিছু তথ্য দিলেন, যা শুনব বলে আমরা আশাও করিনি। আমার মনে হলো বোস্টার একটি বোমা ফাটালেন। পরে বিষয়টি আমরা এভাবে লিখলাম : “নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন দূতাবাসের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, ১৯৭৪ সালের শেষ দিকে কিছু লোক শেখ মুজিবুর কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে। দূতাবাস সূত্রমতে, ১৯৭৪-এর নভেম্বর থেকে ১৯৭৫-এর জানুয়ারির মধ্যে দূতাবাস কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের কয়েক দফা বৈঠক হয়। ঊর্ধ্বতন ওই দূতাবাস কর্মকর্তা আরও জানান, ’৭৫-এর জানুয়ারিতে দূতাবাসের মধ্যে আমরা একটি সমঝোতায় আসি যে, আমরা এ বিষয়টি থেকে এবং এসব লোক থেকে দূরে থাকব। তবে জানুয়ারি থেকে আগস্টের (’৭৫) মধ্যে এ লোকগুলোর কেউ দূতাবাসে এসেছিল কি না তা আমি বলতে পারছি না। ঐ সময়ের আগে তারা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিল।”
২৭. আমাদের প্রতিবেদনের এ বিশেষ বিবৃতির উৎস ছিলেন ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনকারী এই ইউজেন ডেভিস বোস্টার। বোস্টার সেদিন আমাদের আরও অনেক কথাই বলেছিলেন। তিনি নিশ্চিত করেন যে, ১৯৭৪-এর নভেম্বর থেকে ১৯৭৫-এর জানুয়ারি মাসের মধ্যে দূতাবাস কর্মকর্তাদের সঙ্গে যে লোকগুলো বৈঠক করে তারা আসলে মোশতাক গ্রুপেরই লোক। বোস্টার আরও বলেন, ’৭৫-এর জানুয়ারিতে তিনি দূতাবাসের সবার প্রতি কঠোর নির্দেশ জারি করেন কেউ যেন আর ভবিষ্যতে এই গ্রুপ কিংবা অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রকারী আর কোনো গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ না রাখে। এ নির্দেশ সিআইএ স্টেশন চিফ ফিলিপ চেরি এবং তার সব স্টাফের জন্যও প্রযোজ্য ছিল।
২৮. বোস্টারের ধারণা, সম্ভবত রাষ্ট্রদূত হিসেবে তার কর্তৃত্বকে পাশ কাটিয়ে ঘটনাটি ঘটানো হয়েছে। ঠিক যে লোকগুলোর সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দিয়েছিলেন তারাই অভ্যুত্থানের দিন দৃশ্যপটে আবির্ভূত হয় এটি একটি সরল কাকতালীয় ঘটনা নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু। আমরা বোস্টারকে প্রশ্ন করেছিলাম, তার অগোচরে ফিলিপ চেরি কিংবা সিআইএ স্টাফরা শেখ মুজিবকে অপসারণের ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছিল কি না। বোস্টার বলেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাইরে গিয়ে তাত্ত্বিকভাবে আমি প্রশ্নটির জবাব দিতে চাই। আমি বলব, না স্টেশন চিফ এ ধরনের কোনো কাজ করেন নি, তবে একজন আমেরিকান হিসেবে আরেকজন আমেরিকানকে বলব, যোগাযোগটা ছিল। আসলে অনেক ফাঁকফোকর ছিল। স্টেশন চিফের দায়িত্ব হচ্ছে তার সব কর্মকা- বা যোগাযোগের ব্যাপারে অবহিত রাখা। রাষ্ট্রদূতের অনুমোদনবহির্ভূত কোনো যোগাযোগ চেরি বাইরের কারও সঙ্গে রাখেন নিÑ এ গ্যারান্টি আমি দিতে পারি না। এখানে আমরা একমত হই যে বোস্টার ‘রাষ্ট্রদূত’ বলতে নিজেকেই বুঝিয়েছেন। বোস্টার নিশ্চিত ছিলেন যে, ঐ যোগাযোগ অব্যাহত ছিল এবং অভ্যুত্থানটি যারা করেছেন, তারা ভেবেছিল মুজিব চলে গেলেই যুক্তরাষ্ট্র তাদের গ্রহণ করবে। অভ্যুত্থান ব্যর্থ হলে আমরা জানব তারা কারা ছিল, তবে তারা সফল হলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বীকৃতি দেবে।
২৯. সেটা ছিল একটা ব্যতিক্রমী মুহূর্ত। মার্কিন রাষ্ট্রদূত দুই মার্কিন সাংবাদিকের কাছে অভিযোগ করলেন, তার সুস্পষ্ট নির্দেশের বাইরে গিয়ে তার সিআইএ স্টেশন প্রধান অভ্যুত্থানে সাহায্য-সহযোগিতা করেছেন।
৩০. একই সঙ্গে আমরা এটাও ভাবছিলাম, ওয়াশিংটন ও ল্যাংলেতে কার এমন কর্তৃত্ব ছিল যিনি ‘সবুজ সংকেত’ দিয়েছিলেন এবং রাষ্ট্রদূতের নির্দেশনা বাতিল করেছিলেন। এক বছর আগে রিচার্ড নিক্সনের পদত্যাগ এবং জেরাল্ড ফোর্ড দুর্বল মার্কিন রাষ্ট্রপতি হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর ওয়াশিংটনে ‘পররাষ্ট্রনীতির কা-ারি’ বলতে একজনই ছিলেন এবং তিনি হেনরি কিসিঞ্জার। কিন্তু ছোট ছোট দেশকে শক্তিধর রাষ্ট্রের অনুগত করার জন্য হেনরি কিসিঞ্জার কি এ ধরনের অভ্যুত্থানকে বিবেচনায় রাখবেন?
৩১. কিসিঞ্জার বাংলাদেশ থেকে এত দূরে থেকে কীভাবে সামরিক অভ্যুত্থান পরিকল্পনার অস্পষ্ট দিক সম্পর্কে অবগত হতেন, সে বিষয়টিতে আমি ব্যক্তিগতভাবে সংশয়ে ছিলাম। কিসিঞ্জারের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের সাবেক সহযোগী রজার মরিসের সাক্ষাৎকার নেওয়ার পরও আমার মধ্যে আরও কিছু সময় এ সংশয় ছিল। তিনি সেই রজার মরিস, যিনি তার সাবেক নিয়োগকর্তা সম্পর্কে সমালোচনামুখর একটি জীবনী লিখেছিলেন। জীবনীগ্রন্থটির নাম ছিল ‘আনসার্টেন গ্রেটনেস : হেনরি কিসিঞ্জার অ্যান্ড আমেরিকান ফরেন পলিসি’।
৩২. ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ও হেনরি কিসিঞ্জার সম্পর্কে কথা বলার জন্য মরিসের সঙ্গে বসেছিলাম। তার সঙ্গে কেউ একমত হন বা না-ই হন তার মন্তব্যগুলো ছিল সুনির্দিষ্টভাবে অকাট্য। মরিসের পর্যবেক্ষণ এবার তুলে ধরা যাকÑ
৩৩. ১৯৭৫ সালের গোড়ার দিকে আমি আমার বইয়ের জন্য একজনের সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলাম, যিনি তখন কিসিঞ্জারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও সবচেয়ে সিনিয়র আস্থাভাজন ছিলেন। আমার সঙ্গে তার ভালোই জানাশোনা ছিল। কিসিঞ্জারের নীতির সমালোচনা করে নয়; বরং গুরুত্বের সঙ্গেই তিনি বললেন, কিসিঞ্জার যুগে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির তিনটি প্রতিশোধের ঘটনা ঘটেছে। কিসিঞ্জারের বিদেশি শত্রুর তালিকায় সবচেয়ে ঘৃণিত তিন ব্যক্তি ছিলেন চিলির আলেন্দে, ভিয়েতনামের থিউ এবং বাংলাদেশের শেখ মুজিব। এটা বন্ধু বা শত্রু অথবা প্রতিপক্ষের বিষয় ছিল না। আসলে এই লোকগুলো নানাভাবে বাধা হয়ে উঠেছিল। আলেন্দের বিষয়টি পরিষ্কার। স্বাভাবিকভাবে তিনি থিউর কথা ভেবেছিলেন; কারণ বর্তমানের রেকর্ড ঘেঁটে দেখা যায়, উত্তর ভিয়েতনামের সঙ্গে কোনো সমঝোতার জন্য থিউ প্রতিবন্ধক হয়ে উঠেছিলেন। সায়গনে গিয়ে বোমা মেরে কিংবা অন্য কোনোভাবে থিউকে সমঝোতায় সম্মত করাতে কিসিঞ্জার চেয়েছিলেন।
৩৪. মুজিব তাদের এই দলভুক্ত নন। তা সত্ত্বেও কিসিঞ্জার সেই সময় (১৯৭১ অনুভব করেছিলেন যে, তার চীনানীতি, যার ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করছিল, সেটিকে ক্ষতি করার মতো বিপর্যয়কর অবস্থা বিরাজ করছিল পূর্ব পাকিস্তানে। ভিয়েতনাম আলোচনার অনেক কিছুই তখন বাকি ছিল। অথচ এখানকার পরিস্থিতি হয়ে উঠেছিল বিরক্তিকর। কিসিঞ্জারের মনে হচ্ছিল, এখানে একজন রাজনীতিক যথাযথ আচরণ করছিলেন না। বোঝাপড়ার পরিবর্তে তার লোকজন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তবে বিষয়টা এমন নয় যে, তা হেনরি কিসিঞ্জারের কূটনীতির ব্যক্তিগত বিষয় হয়ে দাঁড়ায় এবং একপর্যায়ে তা পর্যায়ে তা প্রতিশোধের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়।
৩৫. মরিস বলতে লাগলেন, কেউ কেউ মনে করেন হেনরি কিসিঞ্জার উনিশ শতকের একজন গতানুগতিক কূটনীতিক। কারণ তার আদর্শিক গুরু, অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব এবং নায়করা সব উনিশ শতকের। তাহলে কেউ মনে করতে পারেন, তার নীতি হবে এমন, স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই, আছে শুধু স্থায়ী স্বার্থ। এ নীতির ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র তাৎক্ষণিকভাবে শেখ মুজিবকে স্বাগত জানাতে পারত, তার সরকারকে কাছে টেনে রাখতে পারত। কিন্তু আমি যেমন বলেছি, কিসিঞ্জার ছিলেন প্রতিশোধপরায়ণ লোক এবং ভাবতেন যে মুজিব আমাদের লোক নয়। যদি তিনি আমাদের লোক না হয়ে থাকেন, তাহলে স্থায়ী স্বার্থ বলেও কিছু নেই। এখন যেটা করতে হবে তা হলো, আমাদের লোকজনকে ক্ষমতায় বসাতে হবে এবং তাদের উৎখাত করতে হবে। ঐ সময়ের মার্কিনিদের নথিপত্রে লজ্জা-শরম বা দ্বিধাসংকোচের কোনো উপাদান কেউ খুঁজে পাবে না। বাংলাদেশের বিষয়টি তত বড় নয়, এ নিয়ে কোনো শোরগোলের ব্যাপার নেই এবং সেখানে কিছু ঘটানো খুবই সহজ।
৩৬. আমি মরিসের তত্ত্বের বিষয়ে এখনও সংশয়ে আছি। ১৯৭৯ সালের এপ্রিলে কাই বার্ড ও আমি হেনরি কিসিঞ্জারকে লেখা এক চিঠিতে ১৯৭১ সালে খন্দকার মোশতাক গোষ্ঠীর সঙ্গে গোপন যোগাযোগের বিষয়ে সাতটি প্রশ্ন করেছিলাম। আমরা জানতে চেয়েছিলাম, ১৯৭৪-৭৫ সালে অভ্যুত্থানের আগের মাসগুলোর মার্কিন দূতাবাস কর্মকর্তাদের সঙ্গে মোশতাক গোষ্ঠীর যোগাযোগের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে তিনি অবগত ছিলেন কি না? ১৯৭৪ সালে মোশতাক গোষ্ঠীর সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ ও অভ্যুত্থানের সময় কিসিঞ্জার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। মোশতাক ও তার অভ্যুত্থান পরিকল্পনাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ রাখতে রাষ্ট্রদূত বোস্টারের নির্দেশ সম্পর্কে কিসিঞ্জারের অবহিত থাকার কথা। কারণ পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার সুবাদে সব ধরনের চিঠিপত্র দেখা ও পড়ার সুযোগ তার ছিল।
পরের মাসে কিসিঞ্জার জবাবে আমাদের বিরুদ্ধে ‘বিস্ময়কর চিঠি’র অভিযোগ তুলে বললেন, আমাদের প্রেস ডেডলাইন অনুযায়ী উত্তর দেওয়ার জন্য তাকে যথেষ্ট সময় দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, দোষারোপ আর অস্পষ্ট ধারণার মিশ্রণে লেখা আপনাদের অস্বাভাবিক চিঠিটির কোনো জবাব আমি দিতে পারি না। শুধু এটাই বলতে পারি, বিষয়বস্তুর দিক থেকে এটা সত্য থেকে অনেক দূরে। আমি আপনাদের তথ্য সরবরাহকারীর উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছি। কিসিঞ্জারের এ জবাবের পর আমরা জুনে আবার লিখলাম, ভবিষ্যতে এ বিষয়ে একটা নিবন্ধ লিখব। সেক্ষেত্রে প্রেস ডেডলাইন নিয়ে তার মাথা ঘামানোর প্রয়োজন নেই। আমাদের ধৈর্য আছে। তার কাছে শুধু প্রশ্নগুলোর উত্তর চাই।
৩৭. জুন মাসের চিঠিতে আমরা কিসিঞ্জারকে বললাম, আপনি প্রশ্নগুলোকে ‘সত্য থেকে অনেক দূরে’ বললেও আমরা তা মনে করি না। বরং সত্য জানার জন্যই প্রশ্নগুলো তৈরি করা হয়েছে। যথার্থ সত্য জানার জন্য আমাদের অন্য কোনো পদ্ধতি জানা নেই। কোন বিষয় বা ঘটনা, নাম অথবা ঘটনাক্রমের সঙ্গে আপনি একমত নন, সেটাই বরং আমরা জানতে চাই। ১৯৭১ সালের যোগাযোগ ও ১৯৭৪ সালের যোগাযোগ সম্পর্কে আপনার মনোভাব কী? আমাদের মতে, ‘বিস্মিত হওয়াটা’ চিঠির কোনো সুনির্দিষ্ট জবাব হলো না। ২৬ বছর পর কিসিঞ্জার এখনও চিঠির জবাব তৈরি করতে পারেনি। এর মধ্যে কত প্রেস ডেডলাইন এসেছে আর গেছে।
৩৮. আমাদের মূল চিঠিতে আমি কিসিঞ্জারকে এ কথা লিখতে ভুলে গেছি যে, ১৯৭৬ সালে পুরান ঢাকার বাসায় খন্দকার মোশতাক আহমদের সঙ্গে চা খেতে খেতে সাক্ষাতের সময় তাকেও এই প্রশ্ন করেছিলাম। এ সাক্ষাৎটি হয়েছিল মুজিব হত্যাকা- এবং জিয়াউর রহমান তাকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করার পর। প্রশ্ন শুনে মোশতাক দাঁত খিঁচিয়ে বলে উঠলেন, আমি তাকে এ ধরনের প্রশ্ন করতে পারি না। তিনি আমাকে বললেন, এসব প্রশ্ন বিষয়ে মোশতাকের বক্তব্য শুনে কিসিঞ্জার বিস্মিত হতেন। যে কোনোভাবেই হোক আমার মনে হচ্ছিল, আমাদের প্রশ্নের যে উত্তর তারা দেবে তাতে বেশ পার্থক্য থাকবে।
৩৯. পররাষ্ট্র দফতরে আমরা ইউজেন বোস্টারের সাক্ষাৎকার নেওয়ার পর নিজস্ব কারণেই তিনি ঐ সময় প্রকাশ্যে এ বিষয়ে কিছু বলতে চাননি। সম্ভবত এ কারণে যে, এসব ঘটনায় নাটের গুরু কিসিঞ্জারের যোগসূত্র পরিষ্কার হচ্ছিল না। পরবর্তী কয়েক বছর আমি রাষ্ট্রদূত বোস্টারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছি। এ বিষয়ে নানা আগুনতি ও নতুন নতুন মোড় সম্পর্কে লেখা বিভিন্ন নিবন্ধ ও চিঠি পাঠিয়েছি।
৪০. ঢাকায় ১৯৭৫ সালের ঘটনাবলির বিষয়ে কংগ্রেসীয় তদন্তের জন্য আমার সম্পর্কে বোস্টার জানতেন। আমরা জানতাম, মার্কিন রাজনীতিতে বাংলাদেশ চিলি, ভিয়েতনাম কিংবা ইরান নয়। কয়েক বছর আগে ওয়াশিংটনে থাকাকালে আমি তার সঙ্গে দেখা করেছিলাম। ঐ সময় আমি তাকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিলাম, তিনি যা জানেন তা প্রকাশ করাই শ্রেয়। তিনি আমার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করলেন না; বরং তার মনোভাব এমন ছিল যে আমার বেঁচে থাকতে নয়। এ কথার মাধ্যমে আমি বুঝলাম, তার মৃত্যুর পরই আমি সূত্র হিসেবে তার নাম ব্যবহার করতে পারব।
৪১. চলতি বছর আমি ভার্জিনিয়ায় তার সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা করেছিলাম। গত মাসের জুলাই তৃতীয় সপ্তাহে তার সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। অভ্যুত্থানের ত্রিশতম বার্ষিকী সামনে রেখে তার একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ করার জন্য তাকে রাজি করাব; কিন্তু তা আর হলো না। ইউজেন বোস্টার গত ৭ জুলাই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চলে গেলেন। আমি আবারও মাত্র দুই সপ্তাহের জন্য তার সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ হারালাম।
৪২. সিআইএ-র স্টেশন-প্রধান যে সব ঘটনা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন এবং যেগুলোর সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন, সে বিষয়ে খুব কমই ‘অন দ্য রেকর্ড’ সাক্ষাৎকার রয়েছে। সেটা ছিল এক অস্বাভাবিক সময় এবং বর্তমানে এটা ধারণাতীত যে একজন প্রতিবেদক এবং একজন সিআইএ কর্মকর্তা এ-রকম একটি বিষয় নিয়ে মুক্ত ও খোলামেলা আলোচনা করতে পারেন। ফিলিপ চেরি ১৯৭৫ সালের আগস্টে ঢাকায় সিআইএ-র স্টেশন-প্রধান ছিলেন। ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বরে তার সঙ্গে অভ্যুত্থান বিষয়ে আমার কথা হয়, তখন তিনি নাইজেরিয়ার সাবেক রাজধানী লাগোসে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র থেকে আমরা অভ্যুত্থানে জড়িত থাকার বিষয়ে যে অভিযোগ পেয়েছিলাম, সে-সম্পর্কে আমি তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম। আমরা টেলিফোনে প্রায় ২০ মিনিট কথা বলি।
৪৩. মুজিব সরকারকে উৎখাতের পরিকল্পনাকারী কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে তিনি অথবা তার দফতরের কেউ যোগাযোগ রেখেছিলেন বলে যে অভিযোগ ওঠে, তা তিনি পুরোপুরি অস্বীকার করেন। চেরি আমাকে বলেন, “বাংলাদেশীরা নিজেরাই এটি করেছে।” বাইরের সরকারগুলোর সম্পৃক্ততার কারণে যে কোনো অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়, এ ধরনের চিন্তাভাবনা খুবই ভুল বলে তিনি মন্তব্য করেন। চেরি বলেন, জনগণ নিজেরাই সব সময় অধিকাংশ অভ্যুত্থান সংগঠিত করে।
৪৪. যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মোশতাকের নেটওয়ার্কের গোপন যোগাযোগের আগে ইতিহাস সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে চেরি বলেন, “রাজনীতিবিদরা প্রায়ই দূতাবাসগুলোয় যান এবং সম্ভবত তাদের সেখানে যোগাযোগ থাকে। তারা ভাবেন, তাদের এ ধরনের যোগাযোগ আছে। কিন্তু কোনো দূতবাস অভ্যুত্থানে সম্পৃক্ত থেকে তাদের সহযোগিতা করবে, এটা খুবই অচিন্ত্যনীয় ব্যাপার।” চেরি দাবি করেন, তিনি মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইউজেন বোস্টারের পুরোপুরি তত্ত্বাবধানে ছিলেন। তিনি বলেন, “আমরা জানতাম মুজিব বিপদের মধ্যে আছেন। আমরা এ-ও জানতাম, সেখানে যাই হোক, আমাদের কিছু যায়-আসে না। কে মুজিবকে ক্ষমতাচ্যুত করল বা কী কারণে মুজিব ক্ষমতাচ্যুত হরেন, সেটাও আমাদের বিবেচনার বিষয় নয়। আরও জানতাম, এ ঘটনার জন্য আমাদের দায়ী করা হবে। তাই ভীষণ পরিষ্কার থাকার জন্য আমরা অতিরিক্ত সতর্ক ছিলাম। রাষ্ট্রদূত বোস্টারের নির্দেশনা মেনে চলার বিষয়টি আমরা নিশ্চিত করেছিলাম। সব ধরনের যোগাযোগ আমরা বন্ধ করেছিলাম। আমরা পুরোপুরি রাষ্ট্রদূত বোস্টারের নির্দেশনা অনুসরণ করেছিলাম।”
৪৫. যদিও বোস্টার নিজেই এই মত প্রকাশ করেছিলেন, যে ১৯৭৫-এর প্রথম দিকে তিনি যে ধরনের নির্দেশনা দিয়েছিলেন, সিআইএ-র স্টেশন-প্রধান সে অনুযায়ী এ ধরনের যোগযোগ বন্ধ করেন নি। এটা সম্পূর্ণ বোস্টারের নিজের মতামত। যখন আমি চেরিকে জিজ্ঞেস করি, দূতাবাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা কেন এ ধরনের অভিযোগ করেন, তখন চেরি বারবার দাবি করেন, এ ধরনের অভিযোগ ‘সম্পূর্ণ মিথ্যা’। নিজের পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, “সেখানে সম্ভবত কেউ ছিলেন, যিনি কারও কারও ব্যাপারে ঈর্ষান্বিত ছিলেন। এ কারণে এখন তিনি এ ধরনের বিবৃতি দিচ্ছেন; কিন্তু আমি আপনাকে সাক্ষী রেখেই এ বিষয়ে তার সঙ্গে মোকাবিলা করা এবং আলোচনার সুযোগ নিতে আগ্রহী।”
৪৬. ফিলিপ চেরি অবশ্য এ ধরনের সুযোগ পাননি। রাষ্ট্রদূত বোস্টার যখন আমাদের সঙ্গে কথা বলতেন, তখন তিনি উদ্ধৃত হতে বা ‘অন্য দ্য রেকর্ড’ চিহ্নিত হতে অনিচ্ছুক ছিলেন। আমার ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রে তখন যে ধরনের পরিবেশ বিরাজ করেছিল, রাষ্ট্রদূত সে পরিস্থিতিতে একটি তদন্ত আশা করেছিলেন। অবশ্যই এ ধরনের তদন্তের নিশ্চয়তা ছিল না, কেবল সম্ভাবনা ছিল। চার্চ এবং পাইক কমিটির প্রতিবেদনের কারণে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রে একটা মনোভাব তৈরি হচ্ছিল। যদি কংগ্রেসের কোনো তদন্ত হতো, এটা আমার বিশ্বাস যে রাষ্ট্রদূত বোস্টার এ বিষয়ে এগিয়ে আসতেন এবং শপথ নিয়ে সাক্ষ্য দিতেন।
৪৭. ১৯৭৮ সালে সাক্ষাৎকারে চেরির বক্তব্যের সঙ্গে ১৯৮০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতরের বক্তব্যে মিল পাওয়া যায়নি। পররাষ্ট্র দফতর কংগ্রেসম্যান, স্টিফেন সোলার্জের কাছে স্বীকার করে, ১৯৭৪ সালের নভেম্বর এবং ১৯৭৫-এর জানুয়ারি মধ্যে অবশ্যই বৈঠক হয়েছিল। আর ঠিক এ বিষয়টি কয়েক বছর আগেই দূতাবাসে আমাদের প্রধান সূত্র (ইউজেন বোস্টার) সঠিকভাবেই এ তথ্য জানিয়েছিলেন। সোলার্জের বক্তব্যকে নাকচ করে যে, “কোনো বাংলাদেশী আমাদের অফিসে আসেন নি এবং অভ্যুত্থান বা অন্য কোনো বিষয়ে পরিকল্পনা সম্পর্কে আমাদের কিছু বলেন নি।”
৪৮.    প্রথমেই দুটি সম্ভাব্য বিকল্পের একটি চিন্তায় আসে। জানুয়ারির পরেও মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে হয় মোশতাক গোষ্ঠীর লোকজনের যোগাযোগ অব্যাহত ছিল যেটা বোস্টার বিশ্বাস করতেন : অথবা চেরির দাবিমতে, এ যোগাযোগ ছিল না। যদিও এখানে তৃতীয় একটি সম্ভাবনা থেকে যায়। চেরি যদি সত্য বলে থাকেন, যা এখনও অস্পষ্ট রয়ে গেছে, এটা সম্ভব যে মোশতাকের সহযোগীরা ওয়াশিংটনের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটি স্বাধীন যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছিলেন। আর এটা করা হয়েছিল দূতাবাস বা সিআইএ-র চ্যানেলকে পাশ কাটিয়ে।
৪৯. এভাবে সম্ভবত চেরি রাষ্ট্রদূত বোস্টারের নির্দেশ অনুসরণ করেছিলেন। আর পূর্ব চ্যানেলের বাইরেও যোগাযোগ অব্যাহত ছিল। এটা সম্ভব যে মোশতাকের সহযোগীদের কেউ বাংলাদেশ থেকে বাইরে যুক্তরাষ্ট্র অথবা অন্য কোথাও গিয়ে অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা নিয়ে বৈঠক করেন। পেন্টাগনের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থার অ্যাটাসে বা কর্মকর্তাদের দ্বারা এটি সম্ভব। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তাদের গভীর ঐতিহাসিক যোগাযোগ রয়েছে। এরাও অভ্যুত্থান পরিকল্পনা তদারকি করে থাকতে পারে।
৫০. এই পরস্পরবিরোধী দাবিগুলো আধাবিচারিক ক্ষমতাসম্পন্ন কংগ্রেসনাল তদন্তের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হতে পারত। বাংলাদেশে অভ্যুত্থানের বিষয়ে কংগ্রেসম্যান স্টিফেন সোলার্জ এবং তার সহযোগী স্ট্যানলি রোথের চেষ্টা সত্ত্বেও কোনো তদন্ত পর্যন্ত হয়নি।
৫১. বাংলাদেশ থেকে পাওয়া আরও কিছু প্রামাণিক তথ্যে জানা গেছে, মার্কিন কর্মকর্তারা অভ্যুত্থান পরিকল্পনাকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং অভ্যুত্থান ঘটানোর আগ পর্যন্ত এ পরিকল্পনার ওপর নজর রাখতেন। অভ্যুত্থান পরিকল্পনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও এ বিষয়ে সরাসরি অবগত ছিলেন, এমন এক নির্ভরযোগ্য সূত্রের সঙ্গে আমি ১৯৯৭ সালে সাক্ষাৎ করি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত এ কর্মকর্তা আগস্টের অভ্যুত্থান পরিকল্পনার ভেতরে থেকে নিখুঁতভাবে এ কাজ করেছেন এবং ধাপে ধাপে এ পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালেও ঐ ব্যক্তির সঙ্গে অল্প সময়ের জন্য আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল এবং আবার দেখা করব বলে আশা করেছিলাম।
৫২. আমাদের মধ্যে সে সাক্ষাৎ হয়েছে ঠিকই, তবে এর মধ্যে কেটে গেছে দুই দশকেরও বেশি সময়। তিনিই মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে আমার সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য অনুরোধ জানান। তার নিজের প্রয়োজনেই আমার সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। মধ্যস্থতাকারী যাকে আমি বিশ্বাস করতাম তার মাধ্যমে দীর্ঘ কথার্বাতার পর যুক্তরাষ্ট্র থেকে রওনা হলাম এবং একটি ইউরোপীয় দেশের রাজধানীতে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। তিনিও অন্য এক মহাদেশ থেকে এসেছিলেন। আমরা পাঁচ ঘণ্টা ধরে কথা বললাম।
৫৩. তার সঙ্গে অনেক বিষয়েই কথা হয়েছে। অভ্যুত্থানের ছয় মাসেরও আগে থেকে মোশতাক ও জেনারেল জিয়াউর রহমান উভয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা এবং মেজরদের সঙ্গে তাদের আলোচনার ব্যাপারে তার কাছে থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো জানা হলো। মেজর রশিদ আলাদাভাবে জিয়া ও মোশতাকের সঙ্গে যে সব বৈঠক করতেন, তেমন অনেক বৈঠকেই তিনি ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত ছিলেন। ১৯৭৬ সালের আগস্টে মেজর রশিদ একটি ব্রিটিশ টেলিভিশনকে একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। দ্য সানডে টাইমস-এর সাংবাদিক এন্থনি মাসকারেনহাসের নেওয়া সে সাক্ষাৎকারে জেনারেল জিয়ার সঙ্গে ১৯৭৫ সালের ২০ মার্চ অনুষ্ঠিত এক বৈঠকের বিবরণ দেন রশিদ। অভ্যুত্থানের পাঁচ মাস আগের ঐ বৈঠকে অভ্যুত্থান পরিকল্পনার বিস্তারিত আলোচনা হয়েছিল বলে রশিদ জানান। অভ্যুত্থানের পাঁচ মাস আগে সে বৈঠক হয়েছিল। আমার এই সূত্র সে বৈঠকে উপস্থিত ছিল এবং দাবি করেন, এটা অভ্যুত্থান পরিকল্পনা বিষয়ে প্রথম বৈঠক ছিল না।
৫৪. সে-সময় সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান জেনারেল জিয়া প্রস্তাবিত অভ্যুত্থান পরিকল্পনার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। তবে এ ব্যাপারে সামরিক তৎপরতার নেতৃত্ব দিতে অনাগ্রহ দেখান। রশিদ জেনারেল জিয়াকে বলেন, জুনিয়র কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে একটি পরিকল্পনা তৈরি করে ফেলেছে, এরা শুধু তার সমর্থন আর নেতৃত্ব চায়। জিয়া কিছুটা সময় নিলেন। মাসকারেনহাসকে দেওয়া মেজর রশিদের সাক্ষাৎকারের তথ্য এবং আমার সেই সূত্রমতে, জিয়া রশিদকে বলেছিলেন, একজন সিনিয়র কর্মকর্তা হিসেবে তিনি এতে সরাসরি জড়িত হতে চান না। তবে জুনিয়র কর্মকর্তারা যদি প্রস্তুতি নিয়েই ফেলে, তাহলে তাদের এগিয়ে যাওয়া উচিত।
৫৫. আমার তথ্যদাতার মতে, মেজররা শেষ পর্যন্ত আশা করেছিলেন যে জিয়াই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেবেন। যদিও তারা মোশতাকের সঙ্গে সারাক্ষণ সতর্ক যোগাযোগ রেখেছিলেন; কিন্তু তারা চাইছিলেন এমন একটা ভালো উপায়, যা মোশাতাককে নতুন সরকারের প্রধান করবে না। মেজরদের দিক থেকে সবচেয়ে ভালো উপায়টি ছিল অভ্যুত্থানের পর কর্তৃত্বকারী হিসেবে একটি সামরিক কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা করা। বস্তুতপক্ষে মেজর রশিদই তার গোষ্ঠীর জন্য উপায়গুলো নির্ধারণের জন্য দায়িত্বে ছিলেন। তাদের আশা ছিল, জিয়াই এ ধরনের কাউন্সিলের নেতৃত্ব দেবেন। তবে সম্ভবত জুনিয়র কর্মকর্তারা জিয়ার নেতৃত্বে সিনিয়র কর্মকর্তাদের অভ্যুত্থান আশা করছিলেন। জেনারেল জিয়ার নিরপেক্ষতা অথবা নীরব সমর্থন নিশ্চিত হলে জুনিয়র কর্মকর্তারা শঙ্কামুক্ত থাকতে পারেন যে, সংকটের মুহূর্তে জিয়া তার বাহিনীকে তাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেবেন না।
৫৬. আমার গুরুত্বপূর্ণ সেই সূত্র একটি চমকে দেওয়া তথ্য জানিয়ে বললেন, জিয়া ও মোশতাকের সঙ্গে আলাদা দুটি বৈঠকে তিনি উপস্থিত ছিলেন। সেখানে মেজর রশিদ নিজেই প্রশ্ন তুললেন, পরিকল্পিত অভ্যুত্থানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের মনোভাব কী হবে? ঐ সামরিক কর্মকর্তা জানালেন, জিয়া ও মোশতাক উভয়েই আলাদাভাবে আমাদের বললেন, তারা এ বিষয়ে মার্কিনিদের মনোভাব জেনেছেন। উভয়ের উত্তরই একই রকম ছিল। তারা বললেন, এটা (মুজিবকে সরানো) মার্কিনিদের জন্য কোনো সমস্যা নয়। আমি তখন অনুভব করলাম, মার্কিনিদের সঙ্গে জিয়া ও মোশতাকের আলাদা যোগাযোগের চ্যানেল রয়েছে। পরে আর এ বিষয়ে কথা হয়নি।
৫৭. মেজররা শেষ পর্যন্ত আশা করেছিলেন, অভ্যুত্থানের পরপরই যে সামরিক কাউন্সিল গঠিত হবে, জিয়া তার নেতৃত্ব দেবেন। এমনকি ১৫ আগস্টেও তাদের বিশ্বাস ছিল, এখনও সে সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এই সূত্র জানান, যখন শেখ মুজিব ও তার অন্য আত্মীয়দের বাড়িতে পুরুষদের পাশাপাশি নৃশংসভাবে নারী-শিশু গণহত্যা ঘটে গেল, তখনই জেনারেল জিয়া ছায়ার আড়ালে পিছিয়ে যান।
৫৮. সূত্রমতে রশিদ নিজেও হত্যাকা-ের ঘটনায় মর্মাহত হয়েছিলেন। পরবর্তী কয়েক বছর তার মধ্যে এ বিশ্বাস জন্মেছিল যে অভ্যুত্থান পরিকল্পনার মধ্যেও আরও একটা ‘লুকানো পরিকল্পনা’ ছিল যেটা সম্পর্কে তিনি জানতেন না বা এর ওপর তার নিয়ন্ত্রণ ছিল না। তা সত্ত্বেও দুই জুনিয়র সেনা কর্মকর্তা রশিদ ও ফারুক জনসমক্ষে হত্যাকা-ের দায় অস্বীকার করেন নি। বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখেও তারা তাদের অনুগত এ ছোট সেনাদলের কাজের দায় নিয়েছেন।
৫৯. এই সূত্র দাবি করেছেন, কিছু হত্যাকা-ের পরিকল্পনা ১৫ আগস্ট দিনটির জন্যই করা হয়েছিল। কথা ছিল কমপক্ষে চারজন আওয়ামী লীগ নেতাকে তাদের বাসভবন থেকে তুলে সুনির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে হত্যা করা হবে। এ পরিকল্পনায় শেখ মুজিবকে হত্যা করার বিষয়টিও ছিল। তবে সূত্র দাবি করেন, এরপরও অভ্যুত্থান সংগঠক কর্মকর্তাদের এমন কোনো পূর্ব পরিকল্পনা ছিল না যে তারা পরিবারগুলোর ওপর গুলি চালাবে। এ ধরনের অন্যান্য পরিস্থিতির মতো সেদিনও অনাকাক্সিক্ষত বর্বরতা ঘটে যায়।
৬০. অভ্যুত্থানের পর পরস্পবিরোধী যে ধারণা জন্মেছিল, তা নিয়ে খুব কম বিশ্লেষণ হয়েছে। অভ্যুত্থানের দুই বছর আগে থেকে দেশের বামপন্থি দল, যেমনÑ জাসদ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ভাসানী), সর্বহারা পার্টির মতো গোপন দলগুলো মুজিব শাসনের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি করেছে। কিন্তু বামপন্থিদের ‘বিপ্লব’ যেমনটি আশঙ্কা করা হচ্ছিল, তা শেখ মুজিবের পতন ঘটনায় নি এবং ষড়যন্ত্রটা করেছিল ডানপন্থিদের একটি সংকীর্ণ গোষ্ঠী।
৬১. কট্টরপন্থি জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলো যে চ্যালেঞ্জ গড়ে তুলেছিল এবং এগিয়ে নিয়েছিল, আগস্টের ঘটনা তাতে আরও গতিসঞ্চার করে। এ অভ্যুত্থানটি ঘটিয়েছিল মুজিবের নিজের দল, তার মন্ত্রিসভা, তার সচিবালয়, তার জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা এবং জাতীয় সেনাবাহিনীর ডানপন্থি অংশ যারা মনে করছিল, তাদের স্বার্থে বামপন্থি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মুজিবের নেতৃত্ব আর সক্ষম নয়।
ঢাকার ব্রিগেড কমান্ডার ছিলেন শাফায়াত জামিল। রাষ্ট্রপতি নিহত হওয়ার সংবাদ শুনে শেভ করা অবস্থায় জিয়াউর রহমান শাফায়েত জামিলের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘সো হোয়াট। প্রেসিডেন্ট নেই, ভাইস প্রেসিডেন্ট তো আছেনÑ ইউ এলার্ট ইয়োর ট্রুপস।’

তথ্য সূত্র : নূহ-উল-আলম লেনিন
* মৃত্যুঞ্জয়ী বঙ্গবন্ধুÑ ট্র্যাজিডি * রাষ্ট্রচিন্তা * উন্নয়ন দর্শন শীর্ষক গ্রন্থের অংশবিশেষ।

Category:

চিরজীবী বঙ্গবন্ধু

Posted on by 0 comment

PMরাশেদ খান মেনন: পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টের ভোর। সেই ভোরেই পাশের রাস্তার বাসা থেকে আমার শ্বশুর হন্তদন্ত হয়ে এসে ঘুম থেকে জাগিয়ে যে খবরটি দিলেন, তা শুনে প্রথমে বিশ্বাসই হয়নি। আমার শ্বশুরের বিবিসি শোনার অভ্যাস ছিল। সকালে বিবিসি-র সেই খবরে বঙ্গবন্ধু হত্যার যে সংবাদ দেওয়া হয়েছিল তা অবিশ্বাস্য মনে হলেও সেটা যে সত্য তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি। তারপরও খবরের সত্যতা যাচাই করতে বাংলাদেশ বেতার খুলতেই খুনি মেজর ডালিমের সেই উন্মত্ত কণ্ঠের ঘোষণায় আরও স্পষ্ট হলাম যে বিবিসি সঠিক সংবাদই দিয়েছে। কিন্তু তারপরও বিমূঢ়তা কাটেনি। এই অবস্থায় কি করণীয় তাও বুঝতে পারছিলাম না। কারণ পাকিস্তান আমলের অভিজ্ঞতাতেই জানতাম এ ধরনের পরিস্থিতি গণতান্ত্রিক কর্মী-নেতাদের জন্য বিপজ্জনকÑ তা তিনি সরকার অথবা বিরোধী দল যেখানেই অবস্থান করুন না কেন। অল্প সময়ের মধ্যে এই বিপদের দিকগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল যখন দেখলাম ‘বাংলাদেশ বেতার’ পরিবর্তিত হয়ে গেছে ‘রেডিও বাংলাদেশ’-এ। ‘জয় বাংলা’ পরিবর্তিত হয়ে গেছে ‘জিন্দাবাদ’-এ। ‘জয় বাংলা’কে নির্বাসন দিয়ে ‘জিন্দাবাদ’-এর প্রচলন কোন ভবিষ্যৎ নির্দেশ করে সেটা বুঝতে একজন রাজনৈতিক কর্মীর খুব অসুবিধার হওয়ার কথা না।
বেলা গড়াতে রেডিওতে তিন বাহিনীর প্রধানের খন্দকার মোশতাক সরকারের প্রতি আনুগত্যের ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী বাংলাদেশের প্রথম সরকারের চার জাতীয় নেতা বাদে অধিকাংশ বাকশাল মন্ত্রীদের খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ এবং ঢাকাসহ দেশব্যাপী সামান্যতম তাৎক্ষণিক দৃশ্যমান প্রতিরোধের অনুপস্থিতিÑ এসব ঘটনায় এটা বোঝা গিয়েছিল যে দেশের পরিস্থিতি ১৮০ ডিগ্রি উল্টা দিকে ঘুরে গেছে। যারা বাকশাল নিয়ে অতি উৎসাহ দেখিয়েছে, অন্যকে বাকশালে যোগ দিতে বাধ্য করেছে, তারাই এখন ঘোর বাকশাল বিরোধীতে পরিণত হয়েছে। এ অবস্থাতে যে কথাটি আমার মনে প্রথম এসেছিল, সেটা হলো ’৭৫-এর ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাতের কথা। ইতোমধ্যে ১৯৭৫-এর ২৫ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী পাস হয়েছে। সংবিধানের ঐ চতুর্থ সংশোধনী অনুসারে দেশে একটি জাতীয় দল থাকবে। অন্য সকল রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত হবে। সংসদ সদস্য যারা জাতীয় দলেÑ পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু যার নামকরণ করেন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ, সংক্ষেপে বাকশালÑ যোগদান করবেন না তারা তাদের সংসদ সদস্য পদ হারাবেন। শ্রমিক, কৃষক, নারী, ছাত্র, যুবÑ এ ধরনের সকল ক্ষেত্রেই একটি মাত্র গণসংগঠন থাকবে। অন্যগুলো বিলুপ্ত হবে। এ অবস্থায় আমাদের পার্টির মধ্যেও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছিল। প্রথমে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে পার্টির গোপন অস্তিত্ব ও কাঠামো বজায় রেখে বাকশালের মধ্যে ফ্যাকশনাল কাজ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এ নিয়ে মতপার্থক্য সৃষ্টি হওয়ায় পরে সেটা পরিবর্তন করে সিদ্ধান্ত হয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির কেউ অথবা দেশব্যাপী পরিচিত ব্যক্তি বাকশালে যোগদান করবেন না। তবে দেশে একটিমাত্র আইনসংগত ট্রেড ইউনিয়ন থাকায় কারাখানার কর্মরত শ্রমিকরা সেই ইউনিয়নে থাকবেন।
‘বাকশালে’ এই যোগদানের প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু আমাকে ও বন্ধু হায়দার আকবর খান রনোকে তার সাথে দেখা করার জন্য তার একান্ত সচিব ড. ফরাসউদ্দিনকেÑ যিনি আমাদের সহপাঠী ও বন্ধুÑ দিয়ে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। আর সে অনুসারে ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে বঙ্গবন্ধু ৩২ নম্বরের বাসায় আমাদের সাক্ষাৎ হয়েছিল। তার নিজের লাইব্রেরি ঘরে বসিয়ে তিনি আলাপ করেছিলেন আমাদের সাথে।
বাইরে থেকে ফিরে একটু ফ্রেস হয়ে আসার জন্য ওপরে গিয়েছিলেন। এই ফাঁকে বন্ধু রনো তার লাইব্রেরির আলমারিতে সাজানো বইগুলো দেখছিল। ওপর থেকে নেমে লাইব্রেরিতে ঢুকেই তিনি তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে চোখ টিপে রনোকে বললেন, ‘কি দেখছিস। লেনিনের বইও আছে, মার্কসের বইও আছে।’ তারপর কথা শুরু হলো। তিনি বললেন, ‘শোন। সিরাতুল মুশতাকিনের মানে বুঝিস? মানে হলো সিধা রাস্তা। আমি ঠিক করেছি সমাজতন্ত্র করে ফেলব। বিয়ের প্রথম রাতে বিড়াল মারার গল্প জানিস? আমি অলরেডি লেট। আর দেরি নয়। এবার সমাজতন্ত্র করে ফেলব। তোরা চলে আয় আমার সঙ্গে। আমি পাঞ্জাবি ক্যাপিটালিস্ট তাড়িয়েছি। তাই বলে মাড়োয়ারি ক্যাপিটালিস্ট অ্যালাও করব না। আমি ক্যাপিটালিজম হতে দেব না। আমি সোস্যালিজম করব। তোরা চলে আয় আমার দলে।’
আমাদের উত্তর ছিলÑ ‘সমাজতন্ত্রের জন্য তো আমরা ছাত্রজীবন থেকেই লড়াই করছি। এর জন্য আমাদের ডাকতে হবে না। যদি সত্যিই সমাজতন্ত্র করেন, আমরা থাকব। কিন্তু এখন যা চলছে তা সমাজতন্ত্র নয়। আপনি জানেন আমরা ভয়ও পাই না, প্রলোভনেও ভুলি না।’ তিনি থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তা তো জানি তোদের একটা নীতি আছে। তার জন্যই তো তোদের চাই।’ রনো বলল, ‘এভাবে যদি দেশ চলে তাহলে আমরা কিন্তু আপনার বিরুদ্ধে নামব।’ তিনি তৎক্ষণাৎ বললেন, ‘তোদের আগে আমিই নামব। যারা দেশটার সর্বনাশ করছে তাদের বিরুদ্ধে আমার আগে কে নামবে?’
এ-ধরনের অনেক কথাই হয়েছিল সে-রাতে প্রায় এক ঘণ্টা ধরে যার মধ্যে ছিল বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, বাংলাদেশ-সোভিয়েত সম্পর্ক, মস্কোপন্থি কমিউনিস্টদের কারসাজি, ন্যাপ, ভাসানী, সিরাজ শিকদারÑ এ-ধরনের বিবিধ প্রসঙ্গে যা এখানে লিখতে গেলে পরিসর অনেক বড় হবে। আমরা তাকে বিনয়ের সাথে বলেছিলাম, ‘আমরা বাকশালে যোগ দেব না। প্রকাশ্যেই থাকব। বাকি আপনার ইচ্ছা।’ তিনি শেষে বলেছিলেন, ‘যা, দেখ আমি কি করি। ওয়াচ অ্যান্ড সি।’
কিন্তু সেটার দেখার সুযোগ দেশবাসীর হয় নাই। ঘাতকের বুলেট তার বুক বিদীর্ণ করেছে। চরম নৃশংসতায় তারা সমস্ত পরিবারকে হত্যা করেছে। ঢাকা থেকে দূরে তার নিজ গ্রাম টুঙ্গিপাড়ায় নিয়ে তাকে তড়িঘড়ি দাফন করেছে। ভালোভাবে গোসল, কাফন, জানাজাও সেভাবে করতে দেয় নাই।
কিন্তু টুঙ্গিপাড়ার সাধারণ সেই কবর থেকে তিনি নিজ মহিমায় ভাস্বর হয়ে রয়েছেন প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে। তার দৈহিক মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু তিনি চিরজীবী হয়ে আছেন এদেশের মানুষের মধ্যে।

লেখক : জাতীয় সংসদ সদস্য, সভাপতি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ও ১৪ দলের নেতা

Category:

বঙ্গবন্ধুর প্রতি অনিঃশেষ শ্রদ্ধা ও বিনীত সালাম

Posted on by 0 comment

PMমোহাম্মদ নাসিম: আমার জীবনের স্মরণীয় স্মৃতি হলোÑ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাহচর্য অনুভব করা। এত বড় মহান নেতার স্নেহ ও সান্নিধ্য পাওয়া যে কোনো মানুষের জন্য গৌরবের। শহিদ মনসুর আলীর সন্তান হিসেবে আমার সুযোগ হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর কাছে যাওয়ার, অনেকবার স্নেহ-আদর পাওয়ার। আমি যখন পাবনায় ছাত্রলীগের কর্মী ছিলাম তখনই বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল; আমাদের বাসায়। এরপর এতবার দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে, যা বলে শেষ করা যাবে না।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন মহাপ্রাণ মহাপুরুষ। তিনি হাজার মানুষের মধ্যে একজনকে একবার দেখলেও পরবর্তীতে কয়েক বছর পর দেখা হলেও চিনতে পারতেন। তার স্মৃতিশক্তি অত্যন্ত প্রখর ছিল। তিনি তার তৃণমূলের নেতা-কর্মীদের তরুণ বা বৃদ্ধ যে-ই হোক, তাদের ডেকে কথা বলতেন। তিনি এমন নেতা ছিলেন পায়ে হেঁটে, সাইকেল চালিয়ে প্রায় অর্ধশত বছর কঠিন পরিশ্রম করে বাংলাদেশের প্রতিটি এলাকার কাদা-মাটি ঘেঁটে আওয়ামী লীগ গঠন করেছিলেন। ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। স্বাধীনতার পূর্ববর্তী সময়ে তিনি সাহসিকতা দেখিয়ে ভয়-ভীতি উপেক্ষা করে স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ভাষা আন্দোলন, আইয়ুবের সামরিক-বিরোধী আন্দোলন, ৬-দফার আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান সর্বোপরি স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
তিনি ছিলেন বাঙালি জাতির আলোকবর্তিকা। সততার মূর্ত প্রতীক। একটি জাতিকে নেতৃত্ব দিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। এই মহামানবের সাথে অনেক ঘটনা বা স্মৃতিচারণা আছে। একটি কথা সব সময় স্মরণ করি, তিনি ছিলেন অত্যন্ত হৃদয়বান মহামানব। ১৯৬৮-৬৯ সালে আমি পাবনায় ছাত্রলীগ নেতা থাকা অবস্থায় নকশালের কিছু সন্ত্রাসী আমাকে পাবনায় ছুরিকাঘাত করে। আমি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছিলাম, তখন বঙ্গবন্ধু খবর পেয়ে আমার পিতা মনসুর আলীর সাথে যোগাযোগ করেন। আমাকে বিমানযোগে ঈশ^রদী থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন এবং তখনকার সিটি নার্সিং হোমে (প্রখ্যাত ডা. টিএসএম-এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত) ভর্তি করান। সবচেয়ে বিস্ময়ের ব্যাপার, আমি যখন নার্সিং হোমে ভর্তি হলাম, তার ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে তিনি ৩২ নম্বরের বাসা থেকে আমাকে দেখতে আসেন। তার সাথে শহিদ তাজউদ্দীন আহমদসহ অনেক সিনিয়র নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। তিনি এসেই আমাকে জড়িয়ে ধরেন। তিনি তখন শেখ মুজিব থেকে বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছেন। বঙ্গবন্ধু যখন আমাকে জড়িয়ে ধরেন, আমি তখন অঝরে কাঁদছি। এর চেয়ে বড় কিছু জীবনে আর হতে পারে না। হাসপাতালে থাকাবস্থায় তিনি একাধিকবার আমাকে দেখতে এসেছেন। শেখ কামালকে দিয়ে ফলমূল ও খাবার পাঠিয়েছেন। সন্তানের মতো খোঁজখবর নিয়েছেন। তিনি তার কর্মীদের সমস্যার কোনো খবর পেলেই ছুটে যেতেন, সহায়তা করতেন; সে যে পর্যায়ের নেতাকর্মীই হোক-না-কেন।
১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠনের পর বঙ্গবন্ধু তখন রাষ্ট্রপতি এবং আমার পিতা শহিদ মনসুর আলী প্রধানমন্ত্রী। একদিন আমার পিতা অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তখনকার পিজি হাসপাতালে (বর্তমানে শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয় হাসপাতাল) ভর্তি করি। তখন বাবাকে একটি অপারেশন করানো হয়। ভোরবেলা বঙ্গবন্ধু হাসপাতালে আসেন এবং ডাক্তারদের সাথে কথা বলেন, আমাদের সাহস দেনÑ অপারেশন এখানে যতœসহকারে করা হবে। সে-সময়কার অনেক নেতাকর্মী, যারা সারাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন এবং অনেক সাধারণ মানুষ আছেন, যারা বঙ্গবন্ধুর সাহায্য পেয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর কাছে এসে সাহায্য পাননি এমন কোনো নেতাকর্মী নেই।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো এমন একজন সাহসী-সুদর্শন, ভরাট কণ্ঠের অধিকারী বাঙালি কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ সম্মোহনী শক্তি ছিল। তার শত্রু হলেও তাকে অস্বীকার করার শক্তি কারও ছিল না। শুধুমাত্র কয়েকজন বেইমান ছাড়া।
আমি শহিদ মনসুর আলীর সন্তান হিসেবে তার সাথে আমাদের পারিবারিক সম্পর্ক ছিল। তরুণ বয়স থেকেই ৩২ নম্বরে অনেকবার গিয়েছি। দুই পরিবারের একটি আত্মীয় ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক সব সময় ছিল। বঙ্গবন্ধু এমন একজন নেতা ছিলেন, তিনি তার সহকর্মীদের শুধু রাজনৈতিকই নয়, সকলের পারিবারিকভাবে খোঁজখবর রাখতেন। বঙ্গমাতাও খোঁজখবর রাখতেন। সেই গুণটি আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাও পেয়েছেন। একজন রাজনৈতিক নেতা যখন কর্মীদের খোঁজখবর রাখেন, দুর্দিনে পাশে থাকেন, তখন সেই নেতার জন্য সহকর্মীরা জীবন দিতেও পিছপা হয় না। সে-জন্যই ’৭৫-এ জাতীয় চার নেতা জীবন দিয়েছেন; কিন্তু বঙ্গবন্ধুর রক্তের সাথে বেইমানি করেন নি। আমার পিতা শহিদ মনসুর আলী বঙ্গবন্ধুকে এত বেশি ভালোবাসতেন যে, মনে হতো আমাদের থেকেও তিনি তাকে বেশি ভালোবাসতেন। সন্তানদের থেকেও বঙ্গবন্ধুর সাথে একাত্ম ছিলেন তিনি। শত প্রতিকূলতা ও প্রলোভন সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গ ত্যাগের সামান্য চিন্তাও তাকে স্পর্শ করেনি কখনও। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর আমার বাবাকে দেখেছি অঝর-ধারায় কেঁদেছেন। শোককে শক্তিতে পরিণত করতে চেয়েছিলেনÑ প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু খুনি মোশতাকরা সে-সুযোগ দেয়নি। জাতীয় চার নেতাকে কারাগারেই হত্যা করা হয়। এটা আমাদের দুর্ভাগ্য। সেই সুযোগ তারা পেলে এদেশের ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্ব। বাঙালি জাতি যতদিন থাকবে বঙ্গবন্ধু তত বেশি সমুজ্জ্বল থাকবেন বিশ^বাসীর কাছে। সাহস, ধৈর্য ও ত্যাগের মূর্ত প্রতীক হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাকে কাছ থেকে দেখা, কাছে যাওয়া, আদর পাওয়া অথবা ধমক খাওয়াও হলো একজন কর্মীর জন্য পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম স্মৃতি এবং উপলব্ধি হলোÑ বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য পাওয়া। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে স্মৃতিচারণ শেষ হওয়ার নয়। অনেক স্মৃতি রয়েছে। প্রতি মুহূর্তে প্রতিটি ক্ষণে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করে কাজ করি। তার কাছে আমাদের ঋণ স্মরণ করতে চাই। ১৫ আগস্টের শোকাবহ মুহূর্তে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি অনিঃশেষ শ্রদ্ধা ও বিনীত সালাম।

লেখক : জাতীয় সংসদ সদস্য, ­­­আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ১৪ দলের সমন্বয়ক

Category:

সপরিবারে কেন হত্যা করা হলো বঙ্গবন্ধুকে

Posted on by 0 comment

PMমুনতাসীর মামুন: ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পেছনে রহস্য নেই’Ñ লিখেছিলেন শ্রদ্ধেয় আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী; কিন্তু ‘চক্রান্ত ছিল’। এই মন্তব্যের সত্যতা নিয়ে আজ আর দ্বিমত নেই। পরবর্তীকালের ঘটনাসমূহ এর উদাহরণ। বিশেষ করে লে. জেনারেল জিয়াউর রহমান ও বিএনপির উত্থান তা প্রমাণ করে। বঙ্গবন্ধু হত্যায় ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে লাভবান হয়েছেন কে? জেনারেল জিয়া। প্রতিষ্ঠানিকভাবে, বেসামরিক-সামরিক আমলাতন্ত্র, পাকিস্তানপন্থি দলসমূহ। আন্তর্জাতিকভাবে সৌদি-পাকিস্তানি চক্র, আমেরিকা-চীন চক্র। জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট হয়েছেন, যা তিনি স্বপ্নেও ভাবেন নি। পাকিস্তানের নির্দেশে ১৯৭১ সালে খুনিদের দলগুলোকে নিয়ে বিএনপির ভিত্তি তৈরি করেছিলেন যাতে আরও যোগ দেন দেশবিরোধী রেনিগেড কিছু রাজনীতিবিদ। জাসদের হঠাৎ উত্থান বিশেষ করে কর্নেল তাহের ও মেজর জলিলের পার্টির তাত্ত্বিক ও প্রধান হওয়াকে অনেকে মনে করেন এসব ষড়যন্ত্রের দ্বিতীয় ফ্রন্ট। আরেকটু পেছনের ইতিহাস দেখলে দেখব, ১৯৭১ সালেই মুক্তিযুদ্ধের সময় তরুণ নেতাদের অনেকের প্রকাশ্যে তাজউদ্দীন আহমদের বিরোধিতা, খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একাংশ ও আমলাতন্ত্রের ষড়যন্ত্র। অথচ, বঙ্গবন্ধু তো ২৫ মার্চের আগে চার ছাত্রনেতা ও অন্য নেতাদের সব জানিয়ে গিয়েছিলেন। প্রয়াত নেতা কাজী আরেফ শাহরিয়ার কবিরকে এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেনÑ
“১৮ জানুয়ারি শেখ মুজিব সিরাজুল আলম খান এবং আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। এক পর্যায়ে শেখ মনি ও তোফায়েলকে ডেকে নেন। আন্দোলন পূর্বাপর পর্যালোচনা করে সম্ভাব্য পাকিস্তানি সামরিক শক্তির মোকাবেলার জন্য প্রস্তুত হতে বলেন। জঙ্গি কর্মীবাহিনী তৈরি করে লড়াইয়ের উপযুক্ত ছাত্র-যুব শক্তি গড়ার কথা বলেন। এভাবেই প্রতিষ্ঠিত হয় বিএলএফ বা বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সেস কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বা চার যুবনেতা বা মুজিব বাহিনীর চার প্রধান।”
এরপর ২১ তারিখেও একটি বৈঠক করেন এবং সেখানে তাজউদ্দীন আহমদকে উপস্থিত থাকতে বলেন। শেখ মুজিব যুবনেতাদের বলেন, “আমি না থাকলেও তাজউদ্দীনকে নিয়ে তোমরা সব ব্যবস্থা করো। তোমাদের জন্য অস্ত্র ও ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে।”
কাজী আরেফ আরও লিখেছেন, বঙ্গবন্ধু কলকাতার একটি ঠিকানা দিয়ে তাদের বললেন, “এই ঠিকানায় গেলেই তোমরা প্রবাসী সরকার, সশস্ত্র বাহিনী গঠন, ট্রেনিং ও অস্ত্রশস্ত্রে সহযোগিতা পাবে। নেতাকে বলেন, তোমরা চারজন সশস্ত্র যুবশক্তিকে পরিচালনা করবে। আর তাজউদ্দীন প্রবাসী সরকারের দায়িত্ব নেবে। তিনি বিপ্লবী কাউন্সিল গঠনের কথা বারবার করে বলেন, বিপ্লবী কাউন্সিল প্রয়োজনে স্বাধীনতার পরও পাঁচ বছর থাকবে। তিনি কামারুজ্জামান ও সৈয়দ নজরুল ও ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকেও এই কথাগুলো জানিয়ে রাখেন।”
২২ মার্চ তিনি আবারও চার নেতাকে ডেকে পাঠিয়ে বলেছিলেন, “কোন দুর্ঘটনা ঘটলে তোমরা ঐ হায়েনাদের সাত দিন ঠেকিয়ে রাখতে পারবে তো? চার নেতা তাঁকে কথা দিয়েছিল?”
সুতরাং, অপরিণামদর্শী তিনি ছিলেন না। সবকিছুই ছকে নিয়েছিলেন এবং বিভিন্ন জনকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। পারতপক্ষে একজনকে আরেকজনের কথা জানান নাই। বিপ্লবী দলের পরিকল্পনা যেভাবে ছকা হয় সেভাবেই সব ছকে ছিলেন। কাজী আরেফের সঙ্গে চিত্তরঞ্জন সূতারের বক্তব্যের মিল আছে।
চিত্তরঞ্জন সুতারের সাক্ষাৎকারও নিয়েছিলেন শাহরিয়ার। সূতার তাকে জানিয়েছেন, ১৯৭০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ইন্দিরা গান্ধীর “সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ভারতের সাহায্যের বিষয়টি চূড়ান্ত করার জন্য যে আলোচনা করেছিলেন সেখানে বিএলএফ নেতাদের সম্ভাব্য গেরিলা প্রশিক্ষণের বিষয়টি বিশেষভাবে স্থান পেয়েছিল।”
১৯৭১ সালের ১৮ জানুয়ারি বিষয়টি জানানো হয়েছিল তাজউদ্দীন আহমদকে। ২৫ মার্চের আগে বঙ্গবন্ধু সূতারকে পাঠিয়েছিলেন কলকাতায় দুটি বাড়ি ভাড়া করার জন্য, যাতে সময় এলে আওয়ামী নেতৃবৃন্দ সেখানে জড়ো হয়ে সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন। যাক সে প্রসঙ্গ। জিয়া ও বিএনপি প্রসঙ্গে আসি।
১৫ আগস্ট হত্যাকা-ের পর ঘাতকদের বিচার বন্ধ করতে ইনডেমনিটি জারি করেছিলেন খন্দকার মোশতাক। আর জিয়াউর রহমান সেই অধ্যাদেশটিকে পঞ্চম সংশোধনীর অন্তর্ভুক্ত করেন। ঘাতকদের বিদেশি দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করেন। বিগত চারদলীয় জোট সরকারের শেষ দিন পর্যন্ত সেই পুরস্কার ও এনাম দানের পালা অব্যাহত ছিল। আরও কৌতূহলের বিষয় যে, খন্দকার মোশতাক ৫ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে এক গেজেট নোটিফিকেশনে জেলহত্যা তদন্তের জন্য তিনজন বিচারকের সমন্বয়ে যে তদন্ত কমিটি গঠন করেন, জিয়াউর রহমান সেই তদন্ত কমিটি বাতিল করে দিয়েছিলেন। বিএনপি ও তার সহযোগীরা বরাবর ১৫ আগস্টকে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ ঘটনা বলেও চালিয়ে দিতে চেয়েছে। কিন্তু এটি যে সর্বৈব মিথ্যা, পরবর্তী ঘটনাবলিই তার সাক্ষী। সোহরাব হাসান যথার্থই লিখেছেন, বিরুদ্ধবাদীরা বলেন, আওয়ামী লীগই না-কি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান করেছিল। যদি সেটাই সত্য হয়ে থাকে জিয়াউর রহমানের দল কেন মুজিব হত্যার দায় কাঁধে নিচ্ছে? আওয়ামী লীগের যে অংশ ১৫ আগস্ট চক্রান্তে জড়িত ছিল তারা এখন কোথায়? খন্দকার মোশতাক মারা গেলেও তার সব সহযোগী মারা যান নি। তারা কি আওয়ামী লীগ করছেন না অন্য পার্টি করছেন? ১৫ আগস্টকে যারা ‘নাজাত দিবস’ হিসেবে পালন করত, তারাই বা কোন দলের? বিদেশে মুজিব হত্যাকারীদের পাসপোর্ট করে দিয়েছে কোন সরকার? (যুগান্তর, ১৫.০৮.২০০৫)।
১৫ আগস্ট সম্পর্কে মার্কিন সাংবাদিক লরেঞ্জ লিফসুলজ বলেছেন, কিসিঞ্জার ও সিআইএ এই হত্যাকা-ের উদ্যোক্তা। কিছুদিন আগে ব্রিটিশ সাংবাদিক ক্রিস্টোফার হিচিন্স একটি বই লিখেছেন, নাম ‘ট্রায়াল অন হেনরি কিসিঞ্জার’। হিচিন্স নথিপত্র দিয়ে প্রমাণ করেছেন, কিসিঞ্জার বাংলাদেশ সফরের সময় মার্কিন দূতাবাসে বসেই ১৫ আগস্টের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ‘গো এহেড’ সিগনাল দেন।
ভারতের প্রয়াত প্রখ্যাত সাংবাদিক নিখিল চক্রবর্তী বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার দু-মাস পরই লিখেছিলেন, বিশ্বের রাজনৈতিক চালচিত্র বদলে যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশে মার্কিন ক্লায়েন্ট সরকার স্থাপন করতে হবে। মাধ্যম হবে ঘুষ, ব্ল্যাকমেইল ও হত্যা।
কিসিঞ্জার যে বেইজিংয়ে মাওয়ের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন বা ঢাকাতে যে জঘন্য কা- ঘটেছে এটি সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরই হত্যাকারীরা যেভাবে সহজে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানে আশ্রয় পেল, তা প্রমাণ করে যুক্তরাষ্ট্র ছিল এই হত্যাকা-ের পেছনে।
ইন্দিরা গান্ধী তখন ক্ষমতায়। তার বিরুদ্ধে জয়প্রকাশ নারায়ণ, জর্জ ফার্নান্দেজ প্রমুখ আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। তারা একে আখ্যায়িত করেছেন ‘সম্পূর্ণ বিপ্লব’ বলে। ইন্দিরা গান্ধী সিপিআই নেতা ভুপেশ গুপ্তকে তখন বলেছিলেন, বিরোধীরা শুধু তার মৃত্যু নয়, তার সরকার অর্জিত সব সুফলকেও ধ্বংস করতে চায় এবং এর পেছনে অভ্যন্তরীণ প্ররোচনা ছাড়া বহিঃশক্তির ইন্ধনও আছে।
ইন্দিরা গান্ধীর সেই অনুমান ভুল বলি কীভাবে, যখন দেখি ‘বিপ্লবী’ ফার্নান্দেজ মহানন্দে চরম গণবিরোধী বিজেপি সরকারের মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেন।
মোহিত সেন লিখেছেন, সে-সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দের একটি চিঠি নিয়ে কুৎসোবিন এলেন দিল্লি। কুৎসোবিন সোভিয়েত পার্টি হয়ে ভারতীয় ডেস্ক দেখতেন। তিনি সিপিআই নেতৃবৃন্দের কাছে সেই চিঠি ও কিছু দলিলপত্র হস্তান্তর করেন। চিঠির একটি কপিও করা হয়েছিল এবং বলা হয়েছিল পড়ার পর তা ধ্বংস করে ফেলতে। চিঠির মূল বক্তব্য ছিল, বাংলাদেশ স্থাপনে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা পালন করেছেন, তাদের হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়েছে। উপমহাদেশের তৎকালীন সেই তিনি নেতা হলেনÑ ইন্দিরা গান্ধী, শেখ মুজিবুর রহমান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো। মস্কো থেকে প্রেরিত সেই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছিল, প্রথম দুজন নেতাকে ইতোমধ্যে এ ষড়যন্ত্রের কথা জানানো হয়েছে। সিপিআই নেতৃবৃন্দকে অনুরোধ জানানো হয়েছিল, তারা যেন প্রভাব খাটিয়ে ইন্দিরা গান্ধীকে বোঝান ষড়যন্ত্রের বিষয়টি হালকাভাবে না নিতে। কুৎসোবিন আরও জানিয়েছিলেন, ভুট্টোকে বিষয়টি সরাসরি জানানো হয়নি। কারণ ভুট্টো কমিউনিস্টদের বিশেষ করে সোভিয়েত ইউনিয়নকে মোটেই বিশ্বাস করতেন না। বলে রাখা ভালো, ভুট্টো বিশ্বাস করতেন মার্কিনীদের। কিছুদিন পর জানিয়েছেন, মোহিত সেন, কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির পক্ষে ফিদেল ক্যাস্ট্রোর সই করা একটি চিঠি এলো ভারতীয় কমিউনিস্ট নেতৃবৃন্দের কাছে। ক্যাস্ট্রো জানিয়েছিলেন, ভারতীয় উপমহাদেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করার এই আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র বা মার্কিন ষড়যন্ত্র চলছে। কেউই গুরুত্বসহকারে তা নেননি। মোহিত সেন অবশ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন নি যুক্তরাষ্ট্রই ছিল এর হোতা। তবে ইঙ্গিতটি স্পষ্ট সোভিয়েত এই ষড়যন্ত্র করেনি, করলে কুৎসোবিনকে দিল্লি পাঠানো হতো না। তাহলে বাকি থাকে আমেরিকা ও তার ক্লায়েন্ট স্টেট পাকিস্তান।
উপমহাদেশে সপরিবারে প্রথম নিহত হন বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতা। এতে ভুট্টো সহায়তা করেছিলেন বলে অনুমান করা হয়। স্ট্যানলি ওলপোর্ট ভুট্টোর যে জীবনী লিখেছেন তাতে এর ইঙ্গিতও স্পষ্ট [প্রমাণসহ]। যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক বিশ্ব পরিকল্পনা নস্যাৎ করে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হলোÑ এটি নিক্সন-কিসিঞ্জার মানতে পারেন নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ছিল পাকিস্তানের জন্য চপেটাঘাত। এটি ভুট্টো ও পাকিস্তানের সামরিক এস্টাবলিশমেন্ট মেনে নিতে পারেনি। বঙ্গবন্ধুর পর ভুট্টোকেও যেতে হয়। মার্কিন তত্ত্ব অনুযায়ী বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সামরিক কর্তারা [দুই জিয়া] ক্ষমতায় আসে এবং মার্কিনী সাহায্যে এক দশক ক্ষমতা থাকে। এর আগে একই ঘটনা ঘটানো হয়েছিল চিলিতে। আলেন্দেকে হত্যা করে পিনোচেটকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু কী তাকে হত্যা ষড়যন্ত্র জানতেন না? জানতেন। ভারত ও সোভিয়েত সূত্র থেকে তাকে তা জানানো হয়েছিল। সেই আমলে বাংলাদেশে যারা গুরুত্বপূর্ণ আমলা ছিলেন (গোয়েন্দা বিভাগেও) তাদের কাছ থেকেও জেনেছি, তাকে হত্যার ষড়যন্ত্রের কথা জানানো হয়েছিল। তিনি বিশ্বাস করেন নি। তারা তখন তাকে ৩২ নম্বরের বাসভবন ছেড়ে গণভবনে এসে থাকার অনুরোধ করেছিলেন। তাতে তিনি খানিকটা সম্মতও হয়েছিলেন। কিন্তু বেগম মুজিব ৩২ নম্বর ছেড়ে যেতে না চাওয়ায় তিনি আর গণভবনে যেতে চাননি। তাছাড়া বিষয়টিকে তিনি হালকাভাবে নিয়েছিলেন। মুহূর্তের জন্যও তার মনে হয়নি কোনো বাঙালি তাকে খুন করতে পারে। কারণ তার ভাষায়, “আমি আমার দেশকে, দেশের মানুষকে ভালোবাসি, তারা আমায় ভালোবাসে।” রবীন্দ্রনাথের ভক্ত শেখ মুজিব রবীন্দ্রনাথের সেই কবিতাও বিশ্বাস করেন নিÑ “৭ কোটি মানুষকে বাঙালি করেছ… মানুষ করনি।”
বিএনপি আমলে এমন কী শেখ হাসিনার আমলেও সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিষয়ে বলা হতো এবং অনেক বিএনপি-জামাত অ্যাপলজিস্ট ও ‘নিরপেক্ষ’রা বলতেন এবং বলেন, একদল বিপথগামী সেনাসদস্য শেখ মুজিবকে হত্যা করেছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রায় দু-ডজন সেনা কর্মকর্তার আত্মস্মৃতি বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছি সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ অনেক কর্মকর্তাই ফারুক-রশীদদের ষড়যন্ত্রের কথা জানতেন। এমন কী জিয়াউর রহমানও কিন্তু কেউ বঙ্গবন্ধুকে জানান নি। [বিস্তারিত আমার লেখা ‘বাংলাদেশি জেনারেলদের মন]।
৩৪ বছর পর বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারকাজ সম্পন্ন হয়ে রায় হয়েছে। এ বিচারের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার। গত ৩৪ বছর বিএনপি ও পাকিস্তানপন্থিরা যে প্রচারণা চালিয়েছিল, তার মূল কথা ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যা একটি তাৎক্ষণিক ও স্বতঃস্ফূর্ত ঘটনা। তাদের এ প্রচারণার লক্ষ্য ছিল ঘাতকদের রক্ষা এবং সমাজের সর্বস্তরে পাকিস্তানি ধ্যান-ধারণা পুনঃপ্রতিষ্ঠা। ইতিহাসের একজন ছাত্র হিসেবে মামলায় যেসব নথিপত্র উত্থাপন করা হয়েছে তার আলোকে বলতে পারি, বঙ্গবন্ধু হত্যা, জাতীয় চার নেতা হত্যা ও সংবিধান পরিবর্তন এবং সিভিল সমাজের কর্তৃত্ব অপনোদনÑ সব এক সূত্রে গাঁথা। এসব ঘটনার পেছনে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ছিল, তা বলাই বাহুল্য। বঙ্গবন্ধু যে শুধু একজন ব্যক্তি ছিলেন তা তো নয়। তিনি ছিলেন একটি নতুন আদর্শেরও প্রতীক। ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছিলেন। স্বাধীনতাবিরোধী, তাদের পৃষ্ঠপোষক পাকিস্তান ও মধ্যপ্রাচ্য এটি পছন্দ করেনি। মার্কিন ডিকটেক্ট ও চীনাদের মার্কিন ও পাকিস্তান প্রীতিকে নস্যাৎ করে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি দেশ স্বাধীন করেছিল এটি তাদের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব হয়নি। যে কারণে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৭১ সালে সবচেয়ে বড় গণহত্যার বিষয়টি মার্কিন ও ইউরোপীয় বইপত্রে উপেক্ষা করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর প্রধান কৃতিত্ব ছিল সশস্ত্রদের ওপর নিরস্ত্র বা সিভিল কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা, যা সেই আমলের সেনা সদস্যদের পছন্দ হয়নি। তাদের ধারণা ছিল, বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্রে তাদের কর্তৃত্ব থাকবে। বেসামরিক আমলাতন্ত্রও বাকশাল হলে কর্তৃত্ব হারাত। এমনিতেও তাদের কর্তৃত্ব হ্রাস পাচ্ছিল। অতি বামরাও বঙ্গবন্ধুকে সরানোর জন্য ভুট্টোর সাহায্য চেয়েছিল এবং দেশেও ‘বিপ্লব’-এর নামে অরাজকতার সৃষ্টি করেছিল। এ সমস্ত মিলে তৈরি হয়েছিল বঙ্গবন্ধু হত্যার পটভূমি। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার কারণ ছিল দুটিÑ এক. যেন তার পরিবারের কাউকে কেন্দ্র করে আবার সেই আদর্শ উজ্জীবিত না হয়, দুই. এমন আতঙ্ক সৃষ্টি যাতে কেউ বঙ্গবন্ধুর পক্ষে দাঁড়াতে সাহস না পায়।
এ উদ্দেশ্য দুটির কোনোটিই সফল হয়নি। বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে, বঙ্গবন্ধু ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার হয়েছে, তাদের পৃষ্ঠপোষক বা দল বিএনপি-জামাত হীনবল হয়েছে। কিন্তু, তাতে কি সেই ষড়যন্ত্রের শেকড় উৎপাটিত হয়েছে? হয়নি। এবং সে কারণেই শেখ হাসিনাকে ২২ বার খুনের চেষ্টা করা হয়েছে। ভেবে দেখুন, পরাজিত পাকিস্তানপন্থিদের কাউকে একবারও হত্যার চেষ্টা হয়নি [এবং আমরা সমর্থনও করি না]। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু বা তার আদর্শের শত্রুদের ষড়যন্ত্র এখনও থেমে নেই।
বঙ্গবন্ধুর বিচার সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু কেন, কারা এবং কী কারণে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা হত্যা করল সে-সম্পর্কে এখনও আমাদের জ্ঞান সীমিত। এ কারণে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের ষড়যন্ত্র উদঘাটনে একটি কমিশন হওয়া উচিত, যাতে ষড়যন্ত্রকারীদের শেকড়ের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। কেনেডি হত্যার পর যুক্তরাষ্ট্রে ওয়ারেন কমিশন গঠিত হয়েছিল। সময় এখনও ফুরিয়ে যায়নি। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার সম্পন্ন হয়েছে দেখেও আত্মতৃপ্তির কিছু নেই। ঐ রায়ের পরও দেশে-বিদেশে বাংলাদেশ-বিরোধী প্রচারণা ও ষড়যন্ত্র বিনাশ হবে বলে মনে করি না। এর সর্বশেষ উদাহরণ প্রিয়া সাহা। ষড়যন্ত্রকারীদের শেকড় অনেক গভীরে।

Category:

ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ

Posted on by 0 comment

উত্তরণ ডেস্ক: আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এমপি বলেছেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমরা দলীয়ভাবে তিন দিনের জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি পালন করব। গত ৩১ জুলাই থেকে সারাদেশে এ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকার ডেঙ্গু প্রতিরোধ এবং বন্যাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ অনতিক্রম্য নয়। আমরা সমন্বিতভাবে চেষ্টা করে ডেঙ্গুকে প্রতিরোধ করব এবং বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনব। গত ২৯ জুলাই ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলের সম্পাদকম-লীর সভা শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রায় ২১টি জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে। এটা নিয়ে আমাদের করণীয় আছে। শুধু সরকারি দায়িত্ব পালনের মধ্যে আমাদের কর্মকা- সীমিত রাখতে চাই না। দলীয়ভাবে আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিÑ তিন দিনব্যাপী সচেতনতামূলক, সতর্কতামূলক ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান পালন করব। আগামী ৩১ জুলাই, ২ ও ৩ আগস্ট বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত সারাদেশের জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যন্ত পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলবে। এর সঙ্গে সতর্কতা ও সচেতনতামূলক লিফলেটও বিতরণ করা হবে। এটা আমাদের দলীয় প্রধানের নির্দেশে দলীয় কর্মসূচি।
গত ২৯ জুলাই আওয়ামী লীগের সম্পাদকম-লীর বৈঠক চলাকালীন লন্ডন সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টেলিফোনে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে কথা বলেন। পরে মোবাইল ফোনের লাউড স্পিকারের মাধ্যমে বৈঠকে উপস্থিত নেতাদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। এ সময় প্রধানমন্ত্রী ডেঙ্গু প্রতিরোধে দলীয় কর্মসূচি নির্ধারণ করার জন্য নেতাদের নির্দেশ দেন।
‘ডেঙ্গু নিয়ে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল’Ñ ডাক্তারদের এমন বক্তব্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, ডেঙ্গুর যে ভয়, সে ভয়কে আমরা জয় করব বলে বিশ্বাস করি। অপর এক প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, দীর্ঘদিন ওষুধ পড়ে থাকার কারণে ওষুধের কার্যকারিতা হারাতে পারে, এর জন্যই কার্যকর ওষুধ প্রয়োগের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একজন সরকারি কর্মকর্তার গাড়ির অপেক্ষায় মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ী ঘাটে তিন ঘণ্টা ফেরি দাঁড় করিয়ে রাখায় অ্যাম্বুলেন্সে থাকা এক স্কুলছাত্রের মৃত্যু নিয়ে করা প্রশ্নে ওবায়দুল কাদের বলেন, বঙ্গবন্ধু-কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালীন যে যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, আমাদের বা সরকারের হোক না কেন, অন্যায় করে পার পাবে না। প্রত্যেকটা বিষয় তদন্ত হচ্ছে, খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যদি কেউ অন্যায় করে, তার শাস্তি হতেই হবে।

Category: